Page loading ... Please wait.

আমাদের শহরে একজন অচেনা লোক ২
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
আমরা কয়েকজন 'শিক্ষিত' বেকার যুবক, কোনো কাজকর্ম নেই বলেই হয়তো সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এই শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াই। আর এভাবেই এখানকার প্রায় প্রতিটি অলিগলি, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, মার্কেট-স্টেশন, এমনকি প্রতিটি মানুষও যেন, মুখস্থ হয়ে গেছে আমাদের। এই শহরে আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তারপর কাউকে কাউকে হয়তো কিছুদিনের জন্য পড়াশোনা বা অন্য কোনো কাজে অন্য কোথাও যেতে হয়েছিলো, কিন্তু বেকারত্ব আমাদেরকে আবার এখানেই ফিরিয়ে এনেছে। দিনের পর দিন _ বলা ভালো, বছরের পর বছর _ বেকার বসে থাকতে থাকতে আমরা অর্জন করেছি পরিচিতদের করুণামাখা দৃষ্টি, আত্নীয়পরিজনদের বিরক্তি আর প্রিয়তমাদের উপেক্ষা। তাদের চোখের আড়ালে থাকার জন্য প্রায় সারাদিনই আমরা বাড়ির বাইরে থাকি, খেয়ে না খেয়ে সারাদিন কাটিয়ে দেই, তারপর গভীর রাতে বাড়ি ফিরে টেবিলে ঢেকে রাখা ঠান্ডা ভাত, টক ডাল, আর উচ্ছিষ্ট তরকারী অমৃত সমান মনে করে খেয়ে শুয়ে পড়ি। এই হচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবন। বহুদিন ধরে এর ব্যতিক্রম ঘটছে না। কিন্তু একটা ঘটনা _ আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, একজন অচেনা লোক _ হঠাৎ করেই আমাদের এই পরিবর্তনহীন গতানুগতিক জীবনে আলোড়ন নিয়ে এলো। শুধু আমাদেরই বা বলি কেন, সারা শহরেই দেখা দিলো এক গভীর পরিবর্তন। সেই গল্পটিই আপনাদেরকে বলবো।

এই যে শহরময় ঘুরে বেড়াই, এর মধ্যে আমাদের প্রিয় কয়েকটি জায়গার মধ্যে একটি হলো রেলস্টেশন। আর তাই দিনের মধ্যে কম করে হলেও দু-বার এখানে আসি আমরা। কোনো কারণ নেই, এমনিতেই আসি। তো, একদিন সকালে _ ট্রেন ছেড়ে যায় ওই সময় _ স্টেশনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেনের চলে যাওয়া, বিদায় দিতে আসা লোকজনের চোখমুখের বিষণ্নতা, আর বিদায় নিয়ে যাওয়া লোকজনের বিচ্ছেদবেদনা দেখলাম। ট্রেন ছেড়ে যাবার পর স্টেশনে হঠাৎ করে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে, কারণ তখন বিদায় জানাতে আসা লোকজন ফিরে যায়; কুলি, ফেরিওয়ালা, এমনকি ভিখারিরাও থাকেনা _ আর আমরা এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করি। শূন্য, নীরব, বিষণ্ন স্টেশন দেখে আমাদের বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে _ কেন জানি না এই অনুভূতিটি আমাদের সবার খুব ভালো লাগে। কিন্তু সেদিন দেখলাম আমরা ছাড়াও আরেকজন লোক বসে আছে, অনেকটা যেন আমাদেরই মতো _ উদ্দেশ্যহীনভাবে। একজন লোক তো ওভাবে বসে থাকতেই পারে, বিষয়টিকে তাই বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে আরো কিছুক্ষণ ওখানে কাটিয়ে চলে এলাম। কিন্তু বিকেলে গিয়ে আবার তাকে আবিষ্কার করলাম একইভাবে। বিকেলে ট্রেন আসে। সকালে থাকে বিদায়-বিচ্ছেদ, বিকেলে ফিরে আসার আনন্দ, ঘরে ফেরার স্বস্তি, প্রিয়জনদের অপেক্ষার অবসান _ আমাদের দেখতে ভালো লাগে। তো, এই সময়েও স্টেশন একসময় শূন্য আর নীরব হয়ে যায়, আর আমরা আবিষ্কার করি _ সেই লোকটি ওই একই জায়গায় একইভাবে বসে আছে। আমাদের তখন কৌতূহল হয়, সন্দেহও। ব্যাপারটা কি? একটা লোক সারাদিন ধরে ওই একই জায়গায় বসে থাকবে কেন? আর কী এক অদ্ভূত উদাসীনতা নিয়ে লোকটা বসে আছে, চারপাশে কি ঘটে যাচ্ছে সে ব্যাপারে যেন তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। যেন পৃথিবীর এতসব কোলাহল, এতসব আয়োজন কোনো এক গূঢ় কারণে তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে, যেন সে পেয়ে গেছে অন্য কোনো এক জগতের খোঁজ, সে বাস করছে সেই জগতেই। তাকে দেখে স্পষ্টতই বিষণ্ন আর একাকী মনে হয়। সে কি কারো জন্য অপেক্ষা করছে? না, তা কি করে হয়? অপেক্ষা করলে না হয় ট্রেন আসার সময় তার স্টেশনে বসে থাকার ব্যাপারটা মেনে নেয়া যায়, কিন্তু যাওয়ার সময়ও বসে থাকবে কেন? তবে কি কোনো মূল্যবান স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার এই স্টেশনের সঙ্গে, আর সেটাই ঝালাই করে নিতে এসে আটকে গেছে, ফিরে যেতে পারছে না! এটাকেও খুব যুক্তিপূর্ণ বলে মনে হলো না আমাদের। তাই যদি হতো, তাহলে তো প্রায়ই তাকে এই স্টেশনে দেখতে পাওয়া যেত _ কই, আগে তো কখনো দেখিনি! তবে কি সে গোয়েন্দা সংস্থার লোক? শুনেছি চোরাকারবারীদের ধরার জন্য বিভিন্ন ট্রেনস্টেশন, বাসস্টেশন, লঞ্চ-স্টিমার ঘাট, বিমানবন্দরে গোয়েন্দা সংস্থার লোক থাকে। কিন্তু আমাদের এই শহরটি কোনোভাবেই চোরাকারবারীদের রুটের মধ্যে পড়ার যোগ্যতা রাখেনা। কোনো সিদ্ধান্তে পেঁৗছতে না পেরে তাকে গিয়েই তার পরিচয় জিজ্ঞেস করার কথা ভাবি আমরা। কিন্তু যে লোক তার পরিপাশ্বর্ের কোলাহল সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এমন গভীর উদাসীন হয়ে বসে থাকতে পারে, তাকে গিয়ে কোনো কথা জিজ্ঞেস করা অতো সহজ কাজ নয়! ফলে তার কাছে যেতে যেতেই আমরা খেই হারিয়ে ফেলি, গিয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করি,

আপনার মানে আপনি ...
আমাদের কথা শেষ না হতেই তিনি ফিরে তাকালে তার অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দেখে আমরা একেবারে ঘাবড়ে যাই। তার প্রশ্নবোধক চোখের দিকে তাকানোর সাহস অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ায় আমাদের মধ্যে একজন হড়বড় করে বলে ফেলে,
মানে ইয়ে.. আপনি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন?
তিনি কোনো কথা বলেন না, কেবল তার একটি ভ্রু সামান্য উত্তোলিত হলে আমাদের মনে হয় _ প্রশ্নটা তার মনোপূত হয়নি। কিন্তু যে প্রশ্ন করা হয়ে গেছে সেটা তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না, বরং সংশোধন করতে গিয়ে আরেকটি বোকা প্রশ্ন জন্ম নেয়, আরেকজন তাই বলে ফেলে,
না মানে.. আমরা জানতে চাচ্ছি আপনি কি কোনোকিছুর জন্য অপেক্ষা করছেন?
হঁ্যা _ তিনি ভরাট কণ্ঠে বললে আমরা ভরসা ফিরে পাই যে, আমাদের প্রশ্নটা ভুল হয়নি। কিন্তু তিনি কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন এটা জিজ্ঞেস করা নিশ্চয়ই শোভন হবে না! না হলে কি হবে, একজন প্রশ্নটা করেই ফেলে,
কার জন্য?
তিনি এবার কিছু বলেন না, ফলে সে আবার জিজ্ঞেস করে,
মানে, কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন?
সেটা তো আমারও প্রশ্ন।
জি্ব! _ আমরা প্রায় সমস্বরে বলি।
কার জন্য অপেক্ষা করছেন? কিসের জন্য?

আমরা কিছুক্ষণ বুঝেই উঠতে পারি না যে, প্রশ্নটা তিনি আমাদেরকেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। এর মানে কি? আর কেনই বা তিনি এ প্রশ্ন আমাদেরকে করবেন? আমাদের দেখে কি মনে হয় যে, আমরা কারো জন্য বা কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছি? নাকি তিনিও আমাদেরকে লক্ষ্য করেছিলেন _ দু-বেলা স্টেশনে আসতে দেখেই প্রশ্নটা করলেন? আমরা তাৎক্ষণিকভাবেই বলতে পারতাম _ আমরা কারো জন্য অপেক্ষা করছি না; কিন্তু উত্তরটা দিতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো তার এই প্রশ্নের অন্য কোনো অর্থ আছে। তাকে কী বলা যায় ভাবতে ভাবতে আমাদের বেশ খানিকটা সময় চলে যায়, যখন কিছু একটা বলবো বলে ভাবছি _ দেখি তিনি নেই। কখন যে চলে গেছেন টেরই পাইনি। আমরা ভেবে পাইনা এভাবে চলে যাওয়ারই বা মানে কি! একটা নূন্যতম সৌজন্যবোধ থাকা উচিত! আমাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বা তার প্রশ্নের উত্তর না নিয়ে এভাবে চলে যাওয়াটাকে ভদ্রলোকের কাজ বলে মেনে নেয়া যায় না। উত্তরই যদি না নেবেন, তাহলে প্রশ্ন করলেন কেন? আমাদের মনে হলো _ লোকটা নিছক ফাজলামো করার জন্য বা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য বা আমাদের কাছ থেকে পালিয়ে যাবার জন্যই প্রশ্নটা আমাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অতএব এ নিয়ে আর বাড়তি চিন্তাভাবনার কোনো মানে হয় না। কিন্তু ব্যাপারটা সহসা ভুলে যাওয়াও সম্ভব হয় না আমাদের পক্ষে। অন্য কোনো বিষয়ে আমাদের আলাপ আলোচনা আর জমেনা। যে কথাই বলতে যাই ঘুরে ফিরে একই প্রসঙ্গ আসে, এবং আমরা গভীরভাবে ভাবতে শুরু করি _ আমরা কার জন্য বা কিসের জন্য অপেক্ষা করছি! তার চেয়েও জরুরী প্রশ্ন অবশ্য এই যে, আমরা আদৌ কোনোকিছুর জন্য অপেক্ষা করছি কি না! বলা বাহুল্য _ করছি, সবাই করে, আমরা করবো না কেন? কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা কিসের জন্য অপেক্ষা করছি সেটা বলা একটু মুশকিল। এই বছরখানেক আগেও কেউ আমাদেরকে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলে তাৎক্ষনিক একটা উত্তর দেয়া যেত; তখনও আমাদের মধ্যে কিছুটা আশা কাজ করতো _ একটা না একটা চাকরি আমাদের হয়েই যাবে, আর আমরা তখন একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারের জন্য অপেক্ষা করতাম। কিন্তু শত শত ইন্টারভিউ দিয়েও যখন সেটা পাওয়া গেলো না, আমরা আশা ছেড়ে দিলাম, বুঝে নিলাম _ এভাবে হবে না, এভাবে হয় না। আসলে যে কিভাবে হয় তা-ও আমরা জানি না। কিন্তু এখন আমরা কি বলি? ভাবতে ভাবতে আমরা সবাই চুপচাপ হয়ে গেলাম, এমনকি নিজেদের মধ্যেও কথা বলতে ভালো লাগছিলো না আমাদের। একসময় স্টেশন থেকে বেরিয়ে কাছের একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। একটু চা-টা খাওয়া যায় কীনা দেখা যাক। ঢুকতেই একদল তরুণের সঙ্গে দেখা। এরা সবাই কলেজে পড়ে, শহরের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এদেরকে বেশ সক্রিয় দেখা যায়। বয়সের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও এদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ সহজ-স্বাভাবিক। ওদের মধ্যে আমরা হয়তো নিজেদেরই ফেলে আসা দিনগুলোকে দেখতে পাই। অবাক হয়ে শুনলাম পাশের টেবিলে ওরাও ওই একই প্রসঙ্গে কথা বলছে _ ওরাও নাকি তাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলো এবং তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্নটা ওদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। আমাদের একজন বললো _ শোনো, লোকটার সঙ্গে আমাদেরও দেখা হয়েছিলো, আমাদেরকেও তিনি একই প্রশ্ন করেছেন।

তাই নাকি?
হঁ্যা।
কি বলেছেন আপনারা?
তোমরা কি বলেছো সেটা আগে বলো।
বলার সুযোগ পাইনি। তার আগেই তিনি স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।
আমাদেরও ওই একই অভিজ্ঞতা। তা কি উত্তর হতে পারে এই প্রশ্নের, বলো তো শুনি।

ওরা যেন মজা পেয়ে গেলো। নিজেদের টেবিল টেনে এনে আমাদেরটার সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। বললো _ আপনারাই বলুন না, কি উত্তর হয় এ প্রশ্নের।

দ্যাখো, আমাদের চিন্তাভাবনা ভোঁতা হয়ে গেছে _ আমাদের অপেক্ষাটাও হয়তো সেইরকম, মনে হচ্ছে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারের জন্যই অপেক্ষা করছি। যেন সেটা পেলেই জীবনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। তোমরা হয়তো এর চেয়ে ভালো উত্তর দিতে পারবে। তোমরাই বরং বলো, আমরা শুনি।

আমরাও অনেক কথাই বলতে পারি _ যেমন, আমাদের যে বন্ধুটি রাজনীতি করে তার ধারণা দেশের এই করুণ ভয়াবহ অবস্থা কিছুতেই চিরস্থায়ী হতে পারে না, এ সবই আসলে আসন্ন বিপ্লবের পূর্বলক্ষণ _ যে কোনো বিপ্লবের আগে নাকি দেশে এমন চরম অবস্থা বিরাজ করে। ওর অপেক্ষাটা সেই বিপ্লবের জন্য। আবার আমাদের আরেক বন্ধুুর অপেক্ষা একটা চিঠির জন্য। প্রতিদিন ও একটা মেয়েকে চিঠি লেখে, পোস্টও করে এবং অপেক্ষা করে, একদিন না একদিন মেয়েটা সাড়া দেবেই। আমাদের এক বান্ধবী খুব ভালো গান গায়। কোনো অনুষ্ঠানে রাজধানী শহর থেকে বড় বড় শিল্পীরা এলে সে তাদের গান গেয়ে শোনায়, সেইসব শিল্পীরা মুগ্ধ হয়ে ফিরে যাওয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায় _ ঢাকায় গিয়েই তারা ওকে টিভিতে গান গাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। ও অপেক্ষা করে থাকে _ কিন্তু সেই শিল্পীরা আর কখনোই যোগাযোগ করেন না। আমাদের যে বন্ধুটি ভালো ক্রিকেট খেলে তার অপেক্ষা জাতীয় দলে না হলেও অন্তত 'এ' দলে ডাক পাওয়ার। এই শহরেরই একজন বড় ক্রিকেটার _ যিনি জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলে থাকেন _ ওর খেলা দেখে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ও অপেক্ষা করে আছে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার, কিন্তু ডাক আর আসছে না। এভাবে তো কতো কথাই বলা যায় কিন্তু তাতে কি ওই প্রশ্নের উত্তর মেলে? আপনারাই বলুন!

আমরা কিছু না বলে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। মনটা এলোমেলো হয়ে আছে, মনে হলো, আজ না হয় বাসায় না-ই ফিরলাম, প্রতিদিন ওই কারাগারে ফিরে যেতে আর ভালো লাগে না, বরং ঘুরে ঘুরে এই শহরের রাতের রূপ দেখা যাক। কোনোদিন সারা রাত ধরে এ শহর দেখিনি, আজ তাই দেখবো। রাতভর হেঁটে বেড়াবো শহরের পথে পথে। সবার পকেট জড়ো করে দেখলাম _ রাতের খাবার এবং রাত ভরে চা সিগারেট খাবার পয়সা হয়ে যাবে। তাহলে আর কি? বেকাররা এর চেয়ে আর বেশি কি আশা করে?
সস্তা হোটেলে যথাসম্ভব পয়সা বাঁচিয়ে রাতের খাবার খেলাম আমরা। ভাগাভাগি করে চা খেলাম, তারপর আরাম করে সিগারেট ধরালাম। আমাদের তাড়াহুড়া নেই, সামনে দীর্ঘ রাত পড়ে আছে। বারোটার দিকে রেস্টুরেন্ট বন্ধ করার জন্য তোড়জোর শুরু হলে আমরা বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তাঘাট অনেকটাই নির্জন হয়ে গেছে। এই শহরের মানুষ রাত জাগতে জানে না। সন্ধ্যা হতে না হতে ঘরে ফিরে দশটার মধ্যে খেয়েদেয়ে এগারোটা বড়োজোর সাড়ে এগারোটার মধ্যে বিছানায় যায়। এমন একটা শহরে কীনা আমরা সারা রাত ধরে হাঁটার পরিকল্পনা করেছি! কি হয় কে জানে! আজ আমাদের ওপর বাউলিয়ানা ভর করেছে, আজ আর কোনোকিছুতেই যেন কিছু যায় আসে না। অবশ্য এত সুন্দর মুডটা বেশিক্ষণ ধরে রাখা গেলো না। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বেরসিক পুলিশের খপ্পড়ে পড়তে হলো। দায়িত্ব পালনরত অফিসার আমাদেরকে ডাকলেন, বললেন,

আপনাদের পরিচয় বলুন।
আমরা একে একে নিজেদের নাম বললে তিনি জিজ্ঞেস করলেন _ কি করেন?
কিছুই করি না, বেকার।
বেকার তো তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যান _ এত রাতে কি করছেন?
হাঁটাহাঁটি করছি।
আপনাদেরকে তো এভাবে হাঁটাহাঁটি করতে দেয়া যাবে না।
কেন?
কারণ বেকাররা হচ্ছে পুলিশদের চোখে সবচেয়ে সন্দেহভাজন চরিত্র।
কেন বলুন তো?
এদের যে কোনো আইডেন্টিটি নেই।
ও আচ্ছা। এবার তাহলে বলা যায় আমরা কি করি।
মানে, আপনারা কি মিথ্যে বলেছিলেন?
না তা নয়, তবে একেবারে কিছুই করি না, তা কিভাবে বলি? একজন মানুষ কি কিছুই না করে থাকতে পারে?
বলুন তাহলে, কি করেন আপনারা!
অপেক্ষা করি।
কি বললেন? অপেক্ষা করেন!
হঁ্যা।
কার জন্য, কিসের জন্য?
সেটা তো আমাদেরও প্রশ্ন। কার জন্য অপেক্ষা করেন, কিসের জন্য?

রহস্যময় লোকটার প্রশ্ন এভাবে একজনকে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমাদের ভীষণ আনন্দ হয়। বুঝে দ্যাখো, দিয়েছি ঝামেলায় ফেলে। ঝামেলায় যে ফেলেছি সেটা অফিসারের কণ্ঠস্বর শুনেই বোঝা গেলো। বিভ্রান্ত হওয়ার ভঙ্গি করে বললেন,
আমাকে জিজ্ঞেস করছেন?
হঁ্যা।
কারো জন্য অপেক্ষা করছি এমন কথা তো আমি বলিনি!

কিন্তু এমন কি কোনো মানুষ আছে যে কোনো কিছুর জন্যই অপেক্ষা করে না?
তা ঠিক। কিন্তু আমি কিসের জন্য করি সেটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপার নয়!
এএকদিক থেকে দেখতে গেলে কারোটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, আবার অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে সবারটাই গুরুত্বপূর্ণ... বলেন ভাই আপনি কিসের জন্য অপেক্ষা করেন, শুনি।

দেখলাম তিনি ভাবনায় পড়ে গেছেন। চিন্তিত কণ্ঠে বললেন _ আগে আপনাদেরটা শুনি। আপনারা কার জন্য অপেক্ষা করছেন?  এর উত্তর আমরা জানি না। তবে আপনাকে হয়তো একটা উত্তর দেয়া যায়। আমরা একটা আইডেন্টিটির জন্য অপেক্ষা করছি, নইলে যে আপনাদের চোখে সবচেয়ে সন্দেহজনক চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে হয়! নিজের শহরে একটু শান্তি মতো হাঁটতেও পারি না।
ততিনি বোধ হয় লজ্জা পেলেন, বললেন _ ওটা এমনিতেই বলেছি, কিছু মনে করবেন না ভাই।

বোঝা গেলো, প্রশ্নটা তাকে কাবু করে ফেলেছে। এখন তার মুখে সেই জাঁদরেল পুলিশ অফিসারের ভাব নেই, বরং আমাদের মতোই সংকটে পড়ে যাওয়া একজন সাধারণ মানুষ বলে মনে হচ্ছে তাকে। একজন পুলিশকে কেবল কথা দিয়ে কাবু করার মধ্যে যে কি আনন্দ, যারা তা করেননি তারা কোনোদিনই বুঝবেন না। তার দুরবস্থা দেখে আমরা আরও কথা-পটু হয়ে উঠলাম। বললাম,  না, মনে করবো কেন? কথাটা আপনি যেভাবেই বলে থাকেন না কেন, এটা তো সত্যি যে, আসলেই মানুষের আইডেন্টিটির প্রয়োজন খুবই বেশি! আপনার এই পুলিশ অফিসারের আইডেন্টিটিটা যদি না থাকতো তাহলে কি আমাদেরকে এভাবে আটকে দিতে পারতেন?
বব্যাপারটার জন্য আমি দুঃখিত, বোঝেনই তো, আইন-শৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি তাতে আর কারো ওপর বিশ্বাস রাখা যাচ্ছে না। ফলে অনেক ভালো মানুষও ভোগান্তির শিকার হয়। আর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদেরকে এমন অনেক অপ্রিয় কাজ করতে হয়। আপনারা যান, ঘুরে বেড়ান।

যাবো? আপনি যখন বলছেন তাহলে যাই। কিন্তু আমাদের প্রশ্নের উত্তর তো দিলেন না! উত্তর থাকলে তো দেবো!
এড়িয়ে গেলে চলবে না, উত্তর একটা দিতেই হবে ভাই।
মহা নাছোড়বান্দা তো আপনারা! ঠিক আছে বলছি _ আপাতত এই নাইট শিফটের দায়িত্ব থেকে মুক্তির জন্য অপেক্ষা করছি।
আপাতত?
হঁ্যা, আপাতত।
ততারপর?

ভাই, আমি কোনো দার্শনিক মানুষ নই। আপনাদের মনের মতো উত্তর দেয়ার সামর্থ্য আমার নেই। কিন্তু আমার মনে হয়, মানুষ সব কিছুর জন্য আপাততই অপেক্ষা করে। সেটা পেয়ে গেলে নতুন কিছুর জন্য অপেক্ষা শুরু করে। থথ্যাংক ইউ। অন্তত একটা উত্তর তো পাওয়া গেলো! আমরা তাহলে যাচ্ছি।

আচ্ছা, যদি মনের মতো কোনো উত্তর খুঁজে পান তো জানিয়ে যাবেন। আমি অপেক্ষা করে থাকবো।

আমরা কিছু না বলে হাসলাম। মনে মনে বললাম _ আপনার তাহলে নতুন একটা অপেক্ষা শুরু হলো! আবার হাঁটতে শুরু করলাম আমরা। পুলিশের সঙ্গে কথাবার্তায় বেশ খানিকটা সময় কেটে গেছে। রাস্তাঘাট এখন ভয়াবহ নির্জন। এমনকি একটা নেড়ি কুকুর পর্যন্ত চোখে পড়ছে না। শহরের আজ হলোটা কি? নাকি এমনই থাকে বরাবর _ আমরাই কেবল খবর রাখি না? দেখে মনে হচ্ছে মড়ক লেগেছে, অথবা যুদ্ধ। গল্প-উপন্যাসে পড়া ব্ল্যাকআউটের রাতগুলোর মতো নির্জন-নিস্তব্ধ-ভয়কাতর এই রাত, অথচ চারপাশে স্ট্রিটলাইটের উজ্জ্বল আলো। আমাদের মাথার মধ্যে ঢুকে গেছে অপেক্ষার পোকা। মনে হচ্ছে এই নির্জন নিস্তব্ধ রাত অপেক্ষা করছে। কার জন্য? ভোরের? ভোর এলে রাতের কি? মনে হচ্ছে এই রাজপথ অপেক্ষা করছে। কার জন্য? পথিকের? হয়তো। পথিক ছাড়া পথের মূল্য কি? কিন্তু পথ জানে না, পথিক কেবল তাকে ব্যবহারই করে, মনে রাখে না, ভালো তো বাসেই না। তবুও কেন এই অপেক্ষা? মনে হচ্ছে লাইটপোস্টগুলো পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। কার? দিনের আলোর? দিন এলে তার বিশ্রাম জোটে। এই তো! কিন্তু তাতে লাভ কি? দিনের বেলায় তো লাইটপোস্ট মৃত। তার অস্তিত্ব তখন টেরই পাওয়া যায় না।

আমরা হাঁটছি। অনেকক্ষণ পর একটা খালি রিকশা টুংটাং বেল বাজিয়ে অলস ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে গেলো। এত রাতে এই মৃতপ্রায় শহরে সে কি করছে? সে-ও কি অপেক্ষা করছে? হাঁটতে হাঁটতে শহরের একমাত্র পার্কের কাছে এলে চোখে পড়ে _ সেখানে গাছপালার সঙ্গে যান্ত্রিক আলোর আলোআঁধারির খেলা। আর তার মধ্যে এখানে সেখানে দাঁড়ানো নিশিকন্যারা। তোমরাও কি অপেক্ষা করছো? কার জন্য? খদ্দেরের? যে তোমাকে ব্যবহারে ব্যবহারে জীর্ণ করে ছুঁড়ে ফেলে দেবে! একজন আমাদের দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ ইশারা করলে আমরা ম্লান হেসে পাশ কাটিয়ে যাই। আমরা শিক্ষিত বেকার! এসবে আমাদের ইচ্ছে নেই, এসব আমাদের মানায়ও না। ইচ্ছে থাকলেও অবশ্য লাভ হতো না, কারণ পকেটে পয়সা নেই। ভোর পর্যন্ত চা সিগারেট তো খেতে হবে। কিন্তু একজনকে পাশ কাটাতে না কাটাতে আরেকজন ধরে বসে। হয়তো চিনে ফেলে আমাদের _ ওরা বোঝে, ওরা কি করে যেন বুঝে যায় কে ওদের খদ্দের, কে নয়। অতএব সে ওসবের কোনো চেষ্টাই করে না, সহজভাবে বলে,

আজ এক পয়সাও কামাই হয় নাই ভাই, আপনারা যা পারেন দিয়া যান, যা ইচ্ছা করেন।

আমাদের কষ্ট লাগে। ওদের অবস্থা আমাদের চেয়েও খারাপ। পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম এবং জটিল পেশাটি বেছে নিয়েও ওদের সুবিধা হচ্ছেনা। আমরা পকেট হাতড়াই। সর্বসাকুল্যে ৬০/৭০ টাকা হবে। পুরোটা দেয়া যাবে না। সিগারেটের জন্য কিছু রাখতে হবেই। নইলে রাত কাটানো যাবে না। আমরা ২৫/৩০ টাকা বের করে ওর হাতে দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলে ও আবার ডাকে,

এমনেই দিয়া গ্যালেন ভাই! কিছু করবেন না? আমরা হেসে অসম্মতি জানালে সে বলে,
ককিছু কথাবার্তা তো কইবেন! নাকি আমাগো সাথে কথা কইতেও ঘিন্না লাগে?

না লাগে না। লাগবে কেন? আমরা কি সিভিল সোসাইটির মানুষ? আমরা হচ্ছি সিভিল সোসাইটির বোঝা। তোমাদের মতোই কিংবা তোমাদের চেয়ে বেশি। তোমাদের নিয়ে তারা তবু রাজনীতি-টিতি করতে পারে, এনজিওরা দু-চার পয়সা কামাতে পারে, আমরা এদের কোনো কাজেই লাগি না। তাছাড়া, তোমরাই তো এই সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করছো, নইলে দেশে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়ে যেত কয়েক হাজার গুণ। তোমাদের ঘৃণা করবো কেন? অবশ্য এসব কথা আমরা মেয়েটিকে বলি না। বলি অন্য কথা, চলো তাহলে গল্পসল্প করা যাক।
আমরা পার্কের ভেতরে ঢুকে ঘাসের ওপর গোল হয়ে বসি, মেয়েটিও। যেন সে-ও আমাদের দলেরই একজন সদস্য। আমাদের মধ্যে যে বন্ধুটি সমাজটাকে বদলে দেয়ার স্বপ্ন দেখতো _ দেখলাম সে ভীষণ বিষণ্ন হয়ে উঠেছে। আগে ও বলতো, এদের দেখলে নাকি ওর কান্না পায়। নিজের বোনের কথা মনে পড়ে। মেয়েটি কি জানে _ আমাদের মধ্যে ওর একজন ভাইও আছে? হয়তো। ওরা কিভাবে যেন বুঝে যায়, সেটা তার কথা শুনেই বোঝা যায়, তার কণ্ঠস্বর মমতাময়,
এত রাইতে বাইরে বাইরে ঘুরতেছেন ক্যান? কাউরে খোঁজেন নাকি?
হঁ্যা, খুঁজি, প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। মেয়েটাকে কি এসব কথা বলা যায়? যায় বোধহয়। বলি,
সেটা তোমার জানার দরকার নাই, তারচেয়ে আমাদের একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।
বলেন।
তুমি কি কারো জন্য, মানে কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছো?
হ।
কার জন্য?
কার জন্যে আবার, খদ্দেরের জন্যে!
আর কিছুর জন্য নয়? খদ্দের পেলেই তোমার সব চাওয়া পূরণ হয়ে যায়, আর কিছু লাগে না?
না। লাগে না। আগে মনে অইতো, কেউ আইসা আমারে এই অবস্থা থেইকা উদ্ধার করবো। এহন জানি _ কেউ করবো না। তাই আর অপেক্ষা টপেক্ষা করি না।
সসেই পুলিশ অফিসারের কথা মনে পড়লো। মানুষ সবকিছুর জন্য আপাতত অপেক্ষা করে। চিরকালীন অপেক্ষা বলে কিছু নেই। কেন নেই?

আমাদের ক্লান্ত লাগে। মেয়েটিকে বলি, তুমি এবার যাও বোন, আমাদের বড়ো ক্লান্ত লাগছে। সে চলে গেলে আমরা পার্কের মায়াময় নরম ঘাসের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ি। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিও না। ঘুম ভাঙলো যাঁর ডাকে তাঁকে আমরা সবাই খুব শ্রদ্ধা করি। আমাদের কলেজের শিক্ষক তিনি, বাংলা সাহিত্য পড়াতেন। কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষক তিনি ছিলেন না, গভীর-অতলস্পর্শী ছিলো তাঁর চিন্তাভাবনা _ অনেক বিষয়েই তিনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিলেন। স্যার শুধু আমাদেরই নন, এই শহরের একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় দার্শনিক মানুষ। তার কাছে মানুষ নানা কারণেই আসে, পরামর্শের জন্য, কোনো কিছু জানবার প্রয়োজনে, কোনো সংকটে পড়লে তার থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ পেতে। আপামর মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করে তাঁর ঋষিসুলভ জীবনযাপন এবং দার্শনিক ভাবনা চিন্তার জন্য। তো ঘুম থেকে ডেকে তুলে স্যার বললেন,

কি ব্যাপার তোমরা দল বেঁধে সব এখানে ঘুমোচ্ছো কেন? বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে এসেছো নাকি? না স্যার। আমরা বেকার, আমাদের কি রাগ করা সাজে? _ আমাদের বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পারি না। স্যারের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে না পেরে আমরা আমতা আমতা করতে থাকি। বুঝতে পারি স্যার মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন। সুখী মানুষ নিঃসন্দেহে। কোনো দুঃখী মানুষের পক্ষে মর্নিং ওয়াক করা সম্ভব নয় বলেই আমাদের ধারণা। আমাদের চুপ করে থাকতে দেখে স্যারই আবার বললেন,
ওওঠো ওঠো, চলো নাস্তা করে আসি।

খিদে পেয়েছে অবশ্য, কিন্তু এত সকালে নাস্তা কোথায় পাবো? স্যার যদি বাসায় যেতে বলেন, আমরা অবশ্যই যাবো না। এত ভোরে কোনো ভদ্রলোকের বাসায় নাস্তা করতে যাওয়াটা রীতিমতো অন্যায়। আমাদের মনের কথা বোধহয় তিনি বুঝলেন, বললেন, ওওই সামনের মোড়ে রেস্টুরেন্ট খুলে গেছে ঘণ্টাখানেক আগেই। আমি প্রতিদিনই ওখানে খাই। এত সকালে তো বাসার কেউ ওঠে না। এদিকে আমার খিদে লেগে যায়।

কি জানি, স্যারের কথা ঠিক হলেও হতে পারে। এতকাল ধরে এই শহরে আছি, কিন্তু কোনোদিন ভোর দেখেছি বলে মনে পড়ে না। অতএব কোথায় কোন রেস্টুরেন্ট কখন খোলে খবর রাখি না। রেস্টুরেন্টে বেশ যুতসই হয়ে বসলেন তিনি, সবার জন্য ফুলকোর্স নাস্তার অর্ডার দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন,

কি হয়েছিলো তোমাদের? দল ধরে পার্কে গিয়ে ঘুমোচ্ছিলে কেন? মনে হলো তিনি এই রহস্যভেদ না করে ছাড়বেন না। ব্যাপারটা খুলে বলাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাছাড়া তার কাছ থেকে একটা উত্তরও তো পাওয়া যেতে পারে। আমরা তাই বলি,
বড় ঝামেলায় পড়ে গেছি স্যার।
কি ঝামেলা, আমাকে বলা যাবে?
যাবে স্যার।
আআমরা তাঁকে রহস্যময় লোকটির কথা, তার প্রশ্ন ফিরিয়ে দেয়া এবং উত্তর না দিয়েই উধাও হয়ে যাওয়া, এবং এর পর থেকে আমরা যে এই একটি বিষয় ছাড়া অন্য কোনো কিছু নিয়ে চিন্তাও করতে পারছি না _ সবই বললাম। স্যার মনোযোগ দিয়ে চুপচাপ আমাদের কথা শুনে গেলেন, তারপর বললেন,

আমার খুব অবাক লাগছে। কারণ এই একই প্রসঙ্গ কালকে আমি আরো দু-জনের কাছে শুনেছি। বুঝতে পারছি না লোকটা কে, কেন সে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলো যেন লোকজন তাকে এই প্রশ্নটি করতে বাধ্য হয়, কেনই বা প্রশ্নটা সে ফিরিয়ে দিলো এবং উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেলো! প্রশ্নটা শোনার পর আমিও অনেক ভেবেছি...

ভেবেছেন স্যার? হঁ্যা।
কোনো উত্তর পেলেন?
বিষয়টি নিয়ে আমি ভাবছি। প্রশ্নটা তোমাদের মতো আমাকেও ঝামেলায় ফেলে দিয়েছে, অবশ্য ঝামেলায় ফেলার মতোই প্রশ্ন এটা। দেখি, পরে কোনো এক সময় এর উত্তর দিতে পারি কী না। আর এর মধ্যে তোমরা কোনো উত্তর খুঁজে পেলে আমাকেও জানিও।
সস্যারের কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে আমরা অন্যরকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। ভাবি _ আমরা না হয় লোকজনকে প্রশ্নটা করি, তারপর একটা সারসংক্ষেপ করার চেষ্টা করা যাবে। স্যারের দেয়া ফুলকোর্স নাস্তা _ মানে গোটা ছয়েক পরোটা, দুটো ডিমভাজা, লটপটি আর বড় দু-কাপ ভরতি চা _ খেয়ে আমরা এখন বেশ ঝরঝরে। কয়েকটা সিগারেটও কিনে নিয়েছি। এবার অভিযানে বেরুনো যায়। কিন্তু আমাদের জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিলো। পথে যেতে যেতে, বিশ্রামের জন্য কোথাও বসে, পার্কে, রেস্তোরায়, স্টেশনে দেখলাম লোকজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে, জট পাকিয়ে, কোথাও বা ৩/৪ জন একান্তভাবে বসে এই একই আলোচনা করছে। বোঝা গেলো _ রহস্যময় লোকটা কোনো এক অদ্ভুত উপায়ে অনেক লোকের কাছে প্রশ্নটা করেছেন। বিকেলের মধ্যে সারা শহর জুড়ে প্রশ্নটা আরো ছড়িয়ে পড়লো। মানুষ হয়ে উঠলো চিন্তাক্লিষ্ট এবং বিষণ্ন। তাদের আলোচনার ধরন দেখে মনে হলো _ যেন এই প্রশ্নের উত্তর না পেলে তাদের গোটা জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। এই অবস্থায় তাদেরকে গিয়ে আবার ওই একই প্রশ্ন করাটা সমীচীন হবে বলে মনে হলো না। আমরা তাই আবার স্যারের কাছেই ফিরে গেলাম, মনে হলো _ এতক্ষণে নিশ্চয়ই তিনি তাঁর ভাবনাচিন্তাগুলো গুছিয়ে এনেছেন। আমরা আমাদের সারাদিনের অভিজ্ঞতার কথা বলে জানতে চাইলাম _ আসলে এ প্রশ্নের কি কোনোই উত্তর নেই স্যার?

উত্তর হয়তো আছে। সব মানুষই কিছু না কিছুর জন্য অপেক্ষা করে, মুশকিল হলো _ কথাটা পার্টিকুলারলি জিজ্ঞেস করলে বিপদে পড়ে যেতে হয়। মনে হয় আমাদের এতসব তুচ্ছ তুচ্ছ অপেক্ষার কথা কি কাউকে বলা যায়? যায় না। তবে সাধারণভাবে মানুষের অপেক্ষা নিয়ে নিশ্চয়ই কথা বলা যায়। সসেটাই বলেন স্যার।

তার আগে একটা কথা বলি। তোমরাই বললে, সারা শহর এখন এই একটি বিষয় নিয়েই ব্যস্ত। যেন একটা জাগরণ ঘটে গেছে। প্রশ্নটা সারা শহরের মানুষকে কেন এমন উতলা করে তুললো সেটা ভেবে দেখা দরকার। অন্য কোনো বিষয়ে এই শহরের মানুষগুলোকে এমন একাত্ন হয়ে চিন্তাভাবনা করতে দেখিনি। এমনকি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও এ শহরবাসী কোনোদিন একাত্ন হতে পারেনি। এটা প্রমাণ করে যে, এই মানুষগুলো সত্যিই কিছু না কিছুর জন্য অপেক্ষা করে। এমনিতে হয়তো এ ব্যাপারে তারা ততোটা সচেতন ছিলোনা কিন্তু প্রশ্নটা যখন উত্থাপিত হলো তারা বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে লাগলো, এবং আবিষ্কার করলো উত্তরটা এত সহজে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ কি? কারণ হচ্ছে লোকগুলো প্রশ্নটাকে সহজভাবে নেয়নি, নিয়েছে গুরুতর দার্শনিক প্রশ্ন হিসেবে। এমন কি তোমরাও তাই নিয়েছো। নইলে তো এই প্রশ্নের অনেক সহজ উত্তরই আছে! এই মুহূর্তে তোমার যা কিছুর জন্য অপেক্ষা তাই-ই তো বলে দিলে হয়। কেউ যে তা বলছে না তার কারণ হলো, সবাই ভাবছে তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বিভিন্ন ছোটখাটো জিনিসের জন্য অপেক্ষা করে এবং কখনো কখনো পেয়েও যায় সেটাই তাদের চূড়ান্ত অপেক্ষা নয়। চূড়ান্ত অপেক্ষাটা অন্য কিছুর জন্য। সেটা যে কি তারা ভেবে পাচ্ছে না। এ নিয়ে তাদের হয়তো ভাসা ভাসা ধারণা আছে, কিন্তু ঠিক কনফার্ম নয় বলে সহজভাবে বলতে পারছে না। এ প্রসঙ্গে তোমাদেরকে একটা গল্প বলতে পারি। স্যামুয়েল বেকেটের একটা নাটক আছে ওয়েটিং ফর গডো নামে। ভদ্রলোক মূলত এই নাটকের জন্যই ১৯৬৯ সালে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। ওই নাটকের দুটো প্রধান চরিত্রের নাম ভ্লাডিমির আর এস্ট্রাগন। নাটকে তাদের ব্যক্তিগত জীবন বা সামাজিক পরিচয় সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না, কিন্তু বোঝা যায় _ এরা আসলে পুরো মানব জাতিরই প্রতিনিধি। অদ্ভূত ব্যাপার হলো _ পুরো নাটক জুড়ে কিছুই ঘটে না, এবং চরিত্রগুলো গডো নামক অনির্দিষ্ট একজনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করে না। নাটকের শুরুতে আমরা দেখি তারা অপেক্ষা করছে, শেষেও অপেক্ষারত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে গডোর জন্য তারা অপেক্ষা করে, তাকে তারা চেনে না, কোনোদিন দেখেওনি। তবে তারা বিশ্বাস করে, গডো এলে তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, পৃথিবী তাদেরকে যে ক্লেদাক্ত জীবন উপহার দিয়েছে তারা তা থেকে মুক্তি পাবে। কিভাবে তা হবে তা অবশ্য তারা জানে না, তাঁর কাছে প্রত্যাশাটা কি তা-ও তাদের কাছে পরিষ্কার নয়, এমন কি তারা এ-ও নিশ্চিত নয় যে, তিনি আদৌ আসবেন কী না! তাদের সকল প্রচেষ্টা নিস্ফল হয়ে পড়ে, তীব্র নৈরাশ্য, নিঃসঙ্গতা, দুর্বিসহ পৌণপুনিকতা আর গতানুগতিক জীবনের ভার তাদেরকে নিক্ষিপ্ত করে যন্ত্রণা আর দুঃস্বপ্নে। পরপর দু-দিন তারা অপেক্ষা করে কিন্তু গডো দু-দিনই খবর পাঠান যে, তিনি আজ আসতে পারছেন না _ কালকে নিশ্চয়ই আসবেন। দুদিনের সময়কাল হলেও নাটকটি পড়লে তোমাদের মনে হবে _ তারা চিরদিনই অপেক্ষা করে ছিলো, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কোনোদিনই তাদের এই অপেক্ষার অবসান হবে না এবং গডো কোনোদিনই আসবেন না। _ অনেকক্ষণ ধরে বলে স্যার থামলেন, একটু বিরতি দিয়ে আবার বললেন _ সাধারণভাবে বলা যায়, মানুষ এমন কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করে থাকে যা তাদেরকে এই পৌণপুণিক-গতানুগতিক-দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তি দেবে। ছোটবেলায় স্কুুলে বসে ছুটির ঘণ্টার জন্য অপেক্ষা করনি? কেন করতে? কারণ ওই ঘণ্টায় ছিলো স্কুলের ধরাবাঁধা নিয়ম থেকে মুক্তির বার্তা। আমরা আসলে সারাজীবন ধরে ওইরকম ঘণ্টার জন্য অপেক্ষা করি, কিন্তু সেই ঘণ্টা সহসা বাজে না। জীবন তো আসলে একটা ফাঁদ, চাইলেও এই ফাঁদ থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে না। আমরা তবু মুক্তির জন্য অপেক্ষা করি, ঘণ্টা বাজার জন্য অপেক্ষা করি। অবশেষে শেষ ঘণ্টা বাজে, আমরা ছুটি নিই, কিন্তু মুক্তির আনন্দ আমাদের পক্ষে পাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ শেষ ছুটির পর যে আসলে কি আছে তা আমরা কেউ জানি না। আমার কি মনে হয় জানো, মনে হয় _ মানুষের সব অপেক্ষাই আসলে নিরর্থক ও নিস্ফল, সব কিছুই অনিশ্চিত ও ফলাফলশূন্য।

একসঙ্গে এত ভারি ভারি কথা শুনে আমাদের মাথা এলোমেলো হয়ে গেলো। মনে হলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন। মানুষের সকল অপেক্ষাই যদি নিরর্থক আর ফলাফলশূন্য হয়, তাহলে 'কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন' মানুষকে এই প্রশ্ন করে লাভ কি? করলেও সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া কি সম্ভব? যে রহস্যময় লোকটি এই ভয়ংকর প্রশ্ন এই নিরীহ শহরবাসীর উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেছেন তাকে এখন আমাদের বড়ো দরকার। তাকে বলা দরকার _ মানুষ কার জন্য বা কিসের জন্য অপেক্ষা করে তা সে নিজেই জানে না। শুধু এটুকু জানে _ অপেক্ষা সফল হলে তার জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু মানব-জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়া হয়তো প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ, মানুষ তা জানে না, জানে না বলে অপেক্ষা করতেই থাকে, করতেই থাকে...


আগস্ট - সেপ্টেম্বর, ২০০২