অনেকদিন পর দেশে ফিরে
একটা অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি ঘটে যায় আমার। ঘটনাটিকে আমি প্রাপ্তির মর্যাদা
দিচ্ছি, বহুদিন পর হাসিব জামিলের খোঁজ পাওয়াটা, যদিও দেখা হয়নি, অন্তত আমার
জন্য এক বিশাল প্রাপ্তিই বটে। কিন্তু দেখা হয়নি অথচ খোঁজ পেয়েছি- এর মানে
কী! ঘটনাটা তাহলে খুলেই বলি। প্রতিদিনের অভ্যাসে পত্রিকার পাতা উল্টাতে
উল্টাতে হঠাৎ একটা গল্পের নাম দেখে ভালো লেগে গেলো- আমরা একটি
গল্পের জন্য অপেক্ষা করছি- এবং পড়তে শুরু করে অচিরেই আবিষ্কার করলাম,
গল্পটা হাসিব জামিলকে নিয়ে লেখা। গল্পটল্প যে খুব পড়ি আমি তা নয়, তবু কেন
যে এটা পড়তে শুরু করেছিলাম নিজেও ঠিক জানি না। কাকতালীয়! হতে পারে। হয়তো
হাসিবের কথা জানা যাবে বলেই নিয়তি আমাকে ওটা পড়তে প্রলুব্ধ করেছিলো। যাহোক,
পড়তে গিয়ে আটকে যেতে হলো এবং বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে ভাবতে হলো- হাসিব তাহলে
নিজেই এতদিনে গল্পের চরিত্র হয়ে গেছে! যাহোক, যতটা ঘনিষ্টভাবে আমি হাসিবের
কথা বলছি, এ লেখাটা যদি কখনো প্রকাশিত হতো (সে সম্ভাবনা নেই) তাহলে নিশ্চয়ই
পাঠকরা ভ্রু কুঁচকে ভাবতো- এই মেয়েটির সঙ্গে হাসিব জামিলের সম্পর্ক কি? এ
নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কি উত্তর দিতাম আমি? না, কোনোই উত্তর নেই এ প্রশ্নের। ওর
সঙ্গে সম্পর্কটির সত্যিই কোনো নাম হয় না, হয়তো আদৌ কোনো সম্পর্কই ছিলো না,
আমি কেবল ওর কোনো একটি গল্পের চরিত্র হতে চেয়েছিলাম। হতে পারিনি, ওদিকে
হাসিব নিজেই এখন গল্পের চরিত্র। আমার বেশ মজাই লাগছে। ওর সঙ্গে এখন আর কোনো
যোগাযোগ নেই- জানি না কোথায় আছে ও, কেমন আছে! হয়তো খুঁজে বের করা সম্ভব-
ইচ্ছে করেই খুঁজি না। কি দরকার? যে জীবন আমি পেছনে ফেলে এসেছি, তা পেছনেই
থাক। কথাটার মধ্যে কি কোনো দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে? হয়তো। হাসিবের সঙ্গে
আমার কোনোই সম্পর্ক ছিলোনা, তবু ওর জন্য দীর্ঘশ্বাস কেন? কারণ নিশ্চয়ই আছে!
বলবো? বলেই ফেলি!
ইউনির্ভাসিটিতে পড়ার সময় আমি ছিলাম বহু তরুণের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
ছেলেদের কাছ থেকে স্তুতি শোনাটা ছিলো আমার নিত্যদিনের রুটিনের অংশ। কিন্তু
ওরা আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। ব্যতিক্রম ছিল হাসিব। অন্য সবার থেকে
কথাবার্তায়, পোশাক-আশাকে, চাল-চলনে যে খুব বেশি আলাদা ছিলো হাসিব, তা নয়-
তবু ও আমার কাছে ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছিলো দু-একটা বিশেষ কারণে। তখনও ওর
লেখালেখি সম্বন্ধে আমরা, ওর সহপাঠীরা, কিছুই জানতাম না। এখন যেমন ও
অনেকখানি খ্যাতি পাওয়া গল্পকার- তখন তো আর তা ছিলোনা - বলা যায় তখন কেবল
শুরু করেছে ও। নিজে থেকে না বললে কিভাবে বুঝবো যে, ওর একটা আলাদা গুণ আছে!
ও আবার কখনো এসব নিয়ে কিছু বলতো না, সম্ভবত আমাদেরকে এসব কথা বলার যোগ্যই
মনে করতো না। যা হোক, ওই সময়েই মাঝে মাঝে দেখতাম- ও একা হেঁটে যাচ্ছে। কী
যে উদাসীন সেই হেঁটে যাওয়া, না দেখলে বোঝা যাবে না। যেন পৃথিবীর সঙ্গে
সম্পর্কবিহীন, অচেনা, দুঃখী, নিঃসঙ্গ এক মানুষ। এসব মুহূর্তে ও হয়ে উঠতো
সবার চেয়ে আলাদা। ওর এই উদাসীন হেঁটে যাওয়া দেখে বুকের ভিতরটা হু হু করে
উঠতো। কেউ একথা শুনলে নিশ্চয়ই বলবে- তোমার এত মনোযোগ দিয়ে ওর উদাসীনতা
দেখার কি দরকার ছিলো? স্বীকার করছি, ওর প্রতি কিঞ্চিত আগ্রহ ছিলো আমার,
হয়তো এ জন্যই। আগ্রহের কারণ হয়তো শুধু ওই উদাসীনতা নয়, বরং ওর চরিত্রের
বৈপরীত্যই আমাকে আকর্ষণ করতো বেশি। এমনিতে খুব দুষ্টু ছিল ও, সারা ক্লাস
মাতিয়ে রাখতো আর রোমান্টিক কথা বলতো এত সাজিয়ে-গুছিয়ে যে, যে কোনো মেয়ের
মাথা খারাপ হয়ে যেত। এগুলো যে ও নির্দিষ্ট কাউকে বলতো তা নয়, বলতো প্রায়
সবাইকেই, চান্স পেলেই এবং সবার সামনেই। কিন্তু এতকিছুর মধ্যে হঠাৎ করে ও মাঝে মাঝে অন্যরকম হয়ে যেত; সবার মধ্যে
থেকেও একা, বিচ্ছিন্ন, অচেনা, পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কবিহীন। ওর এই হৎ বদলে যাওয়াটাই আমাকে কৌতূহলী করে তুলেছিলো ভীষণ।
একদিন এ বিষয়ে জিজ্ঞেসও করলাম-‘কিছু না’- বলে এড়িয়ে গেলো ও। কিছুতেই বের
করা গেলো না- কেন ও এমন হয়ে যায় মাঝে মাঝে। বরাবর এভাবে এড়িয়ে যেতো ও,
নিজের সম্বন্ধে কিছু বলতো না। আরো পরে, যখন ওর লেখালেখির কথা জানতে পারলাম,
মনে হলো- কবিরা বোধহয় এমনই হয়। আমার ধারণা ছিলো- যারা লেখালেখি করে সবাইকেই
বোধহয় কবি বলে। পরে এটা নিয়ে ধমকও খেয়েছি-
জীবনে এক লাইনও কবিতা লিখিনি। তুমি আমাকে কবি বল কোন আক্কেলে?
কবিতা লেখ না, গল্প তো লেখ।
চেষ্টা করি।
ওই হলো আর কি, একটা লিখলেই হলো।
না একই হলো না, শিক্ষিত মেয়ে হয়ে মূর্খের মতো কথা বলছো কেন?
ঠিক আছে আর কবি বলবো না, লেখক বলবো।
তা-ও বলো না, এখনও ওটা হতে পারিনি।
অথচ ওই সময়েই হাসিবের বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হচ্ছে পুরোদমে। বিচিত্রা ঈদ
সংখ্যায় গল্প বেরুলো। ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে অ্যাবসার্ড নাটকের ওপর
প্রবন্ধ বেরুলো। অবশ্য আমাদের কাছে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। পাবে কি
করে? অ্যাবসার্ড নাটকের আমরা বুঝিটা কি যে, তার ওপর সমালোচনা পড়তে যাবো?
ওইসব কঠিন লেখালেখির জন্যই ওর কীর্তি আমাদের কাছে উপেক্ষিতই থেকে গেলো।
আমাদের প্রথম টনক নড়লো যখন ও ডলিকে নিয়ে একটা চমৎকার গল্প লিখে ফেললো। ডলি আমাদের সহপাঠী,
বান্ধবী, আমাদের সিনিয়র আরশাদ ভাইয়ের সঙ্গে ওর অ্যাফেয়ার, বিয়েও ঠিকঠাক। এই
অবস্থায় ওকে নিয়ে গল্প লেখার মানে কী, কে জানে! তা-ও ইমোশোনাল গল্প! পড়ে
ডলির প্রতি ওর টানটা স্পষ্টই বোঝা যায়। এই প্রথম আমরা হাসিবের অনুপস্থিতিতে
গোল হয়ে বসে, কঠিন মনোযোগ দিয়ে ওর গল্প পড়লাম, আর পড়ে আমাদের মাথা খারাপ
হয়ে গেলো। ডলি তো এমন কিছু রূপসী ছিলোনা, কিন্তু গল্প পড়ে মনে হলো- এমন
রূপবতী মেয়ে পৃথিবীতে একটিই আছে। এমন কিছু বৈশিষ্টপূর্ণ ছিলোনা ডলির চোখ,
অথচ হাসিব যখন লিখলো - ওর চোখের দিকে তাকালে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত দেখে
নেয়া যায়- তখন আমরা সবাই ডলির খুব কাছে গিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে
শুরু করলাম- সত্যি যদি সমুদ্রের তলদেশ দেখা যায়! ছেলে বন্ধুদের কেউ কেউ
অভিমত প্রকাশ করলো- অবিলম্বে ডলির উচিত আরশাদ ভাইকে ছেড়ে হাসিবের কাছে চলে
আসা! আমরা, মেয়েরা, অবশ্য এর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাইনি! আরশাদ ভাই কতো
প্রসপেকটিভ ছেলে! ডলিও এ ভুল করেনি ; কিন্তু ওর বারোটা বেজে গিয়েছিলো ওকে
নিয়ে লেখা হাসিবের দ্বিতীয় গল্পটা পড়ে। ওর বিবাহিত জীবন কেমন হবে- এরকম
কিছু ভবিষ্যদ্বাণী ছিলো ওই গল্পে। ডলি একটা সাংসারিক যন্ত্র বা পুতুলে
পরিণত হবে, কেউ ওর সৌন্দর্য দেখবেনা, তখন ওর অর্ন্তগত আশ্রয় হবে হাসিবের
ভালোবাসা- ইত্যাদি। ওই গল্পের ভবিষ্যদ্বাণী ডলি পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলো-
সেটা ওর আচরণেই বোঝা গেছে। কেঁদে-কেটে অস্থির হয়ে, হাসিবকে যা-তা বলে
গালাগালি করে সে তার নার্ভাসনেসকেই প্রকট করে তুলেছিলো। এর কিছুদিন পর
হাসিব আরেকটি গল্প লেখে পলিদিকে নিয়ে। পলিদি ডিপার্টমেন্টে আমাদের দু-বছরের
সিনিয়র। হাসিবের সঙ্গে তার কখন কি হলো আমরা বুঝতেই পারলাম না। কিন্তু
গল্পটা পড়ে মনে হলো-‘দে আর মেড ফর ইচ আদার।’ আর সে কী ইমোশোনাল গল্প সেটা!
পড়ে আমাদের চোখ ভিজে ওঠে, বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে; আর মনে হয়- পলিদির
সঙ্গে হাসিবের বয়স ও ধর্মের বিরূপ ব্যবধান তৈরী করে প্রকৃতি ভুল করেছে।
পলিদি এমনিতেই অসম্ভব রূপবতী। কিন্তু ওই গল্পের পর সে হয়ে উঠলো একটা
আলোকস্তম্ভ। ডিপার্টমেন্টে এলে পুরো ডিপার্টমেন্টটাই আলোয় ঝলমল করে উঠতো।
এসব দেখেশুনে ওর একটা গল্পের চরিত্র হওয়ার স্বপ্ন আমার বুকের ভেতর বড়ো হতে
থাকে। যার বর্ণনার গুণে একজন মাঝারি গোছের মেয়েও অপরূপা হয়ে ওঠে, তার কাছে
আমার রূপ কেমন- খুব জানতে ইচ্ছে করতো। ওর একটা কথা আমাকে খুব ছুঁয়ে
গিয়েছিলো-মানুষ সারা জীবন ধরে অন্যের চোখে নিজেকে দেখে নিতে চায় ; তার শুধু
এই একটিই চাওয়া। তার সবকিছু- অর্থ-বিত্ত-সম্পদ-সৌন্দর্য-রূপ-শিক্ষা-রুচি-
এমনকি চায়ের কাপটি পর্যন্ত ঐ একটি উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত; আমার এসবকিছু দেখে
অন্যের চোখ-মুখ থেকে প্রশংসা ঝরে পড়ুক- মানুষের এই প্রত্যাশা প্রায়
ধ্রুপদী। আমার সব আছে, কিন্তু কেউ ফিরেও দেখলো না- এরকম থাকার কোনো অর্থই
নেই মানুষের কাছে। কথাটা খুব সত্যি মনে হয়েছিলো আমার কাছে। আমার এই রূপের
কি আদৌ কোনো মূল্য থাকতো যদি অন্যের চোখে প্রশংসা ঝরে না পড়তো! কিন্তু
সবচেয়ে সুন্দর করে যে দেখতে জানে তার চোখেই তো নিজেকে দেখে নেয়া হলো না
আামার! হাসিব কখনো আমার রূপের প্রশংসা করেনি- বরং একটু উপেক্ষাই করতো কিংবা
ছিলো নিস্পৃহতা। ওই উপেক্ষা আর নিস্পৃহতাই আমার সর্বনাশ করেছিলো। আমি যে
কতভাবে ওর মন জয় করার চেষ্টা করতাম, আর গোপনে প্রতীক্ষা করতাম- নিশ্চয়ই ও
একদিন আমাকে নিয়েও একটা গল্প লিখবে। কিন্তু নিস্ফল অপেক্ষা। অবশেষে মুখ
ফুটে বলেই ফেললাম আমি। শুনে ও হেসেই বাঁচে না-
আরে দূর, আমি গল্প লিখতে পারি নাকি?
পারোনা না! ঢং করো না বুঝলে!
আসলেই পারি না। বিশ্বাস কর!
ডলি আর পলিদিকে নিয়ে লিখলে যে, ওগুলো কি?
ওগুলো গল্প নাকি?
গল্প নয়!
নাহ ।
তাহলে?
ওগুলো তো গল্পের খসড়া!
খসড়া!
হ্যাঁ।
বুঝলাম না, ওগুলো গল্প না হলে, কোনগুলো গল্প?
কোনগুলো গল্প সেটা তোমাকে বোঝানো যাবে না। অন্তত এগুলোকে গল্প বলা যায় না,
এটা বলতে পারি। এ ধরনের পুতুপুতু প্রেমের গল্প ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অন্তত কয়েক
হাজার লেখা হয়েছে। ফালতু বিষয় সব।
তাহলে তুমি লিখেছ কেন?
হাত মশকো করছি বলতে পারো। এটা হচ্ছে আমার প্র্যাকটিসের সময়। একটা প্রকৃত
গল্প লিখতে হলে আমাকে কমপক্ষে আরো ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে।
হাসিবের এসব তত্ত্বকথার কিছুই বুঝলাম না আমি। বোঝার ইচ্ছেও ছিলো না। এসবের
পর ১০ বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। হাসিব কি ‘প্রকৃত গল্প’ লিখতে পেরেছে?
লিখলে, কোনটা ওর ‘প্রকৃত গল্প’? না লিখলে, কেন নয়? আর কতদিন অপেক্ষা করতে
হবে ওকে? এসব আজ আর জানা সম্ভব নয়। হাসিব কি করছে, কোথায় আছে জানি না। আমরা
একটি গল্পের জন্য অপেক্ষা করছি গল্পটা পড়ে মনে হচ্ছে বেশ খ্যাতিমান হয়ে
উঠেছে ও, ঢাকার সাহিত্য জগৎকে বেশ ঘোরপ্যাঁচের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। কি করে
হাসিব এতদূর এলো কে জানে! আমি অনেকদিন ধরে বাইরে, দেশের খোঁজখবর খুব একটা
রাখা হয় না। যেটুকু রাখি তার মধ্যে সাহিত্য-টাহিত্য নেই। ইঞ্জিনিয়ার
স্বামীর সঙ্গে ঝলমলে নিউইয়র্ক শহরে আমার আনন্দিত দিনযাপনের মধ্যে এসব তুচ্ছ
বিষয় আসার কথাও নয়। তবু অস্বীকার করব না, হাসিব এখনো আমার মনের অনেকখানি
দখল করে আছে। দেশে ফিরে ব্যাপারটা তীব্রভাবে টের পাচ্ছি। ও আমাকে উপেক্ষা
করেছে কেন, এই রহস্যই হয়তো এখনো ভাবায় আমাকে। ওর কাছে খুব বেশি কিছু চাওয়ার
ছিলোনা আমার। ওকে কি কখনো বিয়ে করতাম আমি? মনে হয় না । জীবন নিয়ে ছেলেখেলা
চলে না। উড়নচন্ডী, উদাসীন মানুষকে ভালো লাগতে পারে, তাদের সঙ্গে ঘরসংসার
করা যায় না। হাসিব এখন যতই খ্যাতিমান হোক, নিউইয়র্কে আমি যে জীবনযাপন করি,
ও সেই আলো ঝলমলে জীবনের কথা চিন্তাও করে না। কিন্তু তবু ওকে নিয়ে আমার এত
ভাবনা কেন? ওকে কি আমি ভালোবেসেছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা খুব
কষ্টকর। বিয়ের আগে তো ওকে নিয়ে ভাবারও সাহস পাইনি। ওর গল্প পড়ে ডলি
কেঁদে-কেটে অস্থির হয়েছিলো, পলিদিকে নিয়ে লেখা গল্পও সেই মেয়েটিকে বিমূঢ় ও
বিষণ্ন্ন করে দিয়েছিলো। অথচ সেসব ছিলো ওর কাছে ‘পুতুপুতু প্রেমের গল্প’।
গল্প পড়ে ডলি বা পলিদির যে প্রতিক্রিয়া হলো, সেটা ওর কাছে এতোটুকু গুরুত্ব
পায়নি। সেই হাসিবের কাছে ভালোবাসার কথা বলাটা বোকামি। আমি তাই এসব কিছু
চাইনি- চেয়েছিলাম শুধু ওর একটি গল্পের চরিত্র হতে- ওর চোখে নিজেকে দেখে
নিতে।
প্রথমবার লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বলে ফেলার পর আরো বহুবার ওকে বলেছি। ও
লেখেনি। বরং উপেক্ষা আর উদাসীনতায় পাশ কাটিয়ে গেছে। একবার- মনে পড়ে-
মাস্টার্সের শেষদিকে এক্সকারশনে গিয়েছিলাম সহপাঠী সবাই মিলে। কক্সবাজারের
জোসনা-প্লাবিত সৈকতে হাঁটতে হাঁটতে সীমাহীন ঔদাসিন্যের ভেতর প্রোথিত (এইসব
শব্দও আমি ওর কাছ থেকেই শিখেছি) হাসিবকে দেখে যথারীতি আমার বুকের ভেতরটা হু
হু করে উঠেছিলো। ওই মধ্যরাতে সকলের মধ্য থেকে আলাদা হয়ে আমি ওর হাত
ধরেছিলাম। হয়তো মনে মনে অনেকবার ওর হাত ধরার কথা ভেবেছি কিন্তু সত্যি সত্যি
ধরার পর টের পাই- আমার শরীর জুড়ে এক অদ্ভূত শিহরণ। কেঁপে কেঁপে উঠছি
বারবার। অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে ধাতস্থ করে জিজ্ঞেস করেছিলাম- তুমি মাঝে মাঝে
এমন হয়ে যাও কেন?
আমি ঠিক জানি না, শৈলী- ও শুরু করে। এর আগে যতবার জানতে চেয়েছি- তোমাকে
বোঝানো যাবে না, তুমি বুঝবে না- বলে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই জোসনা-প্লাবিত
সমুদ্র সৈকত যেভাবে আমাকে ওর হাত ধরার সাহস যুগিয়েছিলো, ওকেও হয়তো সেভাবেই
অর্গল খুলে দিতে প্ররোচিত করেছিলো। এই প্রথমবারের মতো ‘আমি ঠিক জানি না’
বলে ও শুরু করে।
‘আমি ঠিক জানি না, কেন এমন হয়। মাঝে মাঝে হঠাৎ নিজেকে তুচ্ছ, ক্ষুদ্র, প্রয়োজনহীন মনে হয়। এই
বিপুল-বিশাল মহাবিশ্বের কাছে আমার মর্যাদা কীটপতঙ্গতুল্য বলে অনুভব করি।
জীবন তখন ভীষণ এক অর্থহীন আয়োজন হয়ে ওঠে।’- ওর কথা চলতে থাকে। ইতিহাস থেকে
দর্শন, বিজ্ঞান থেকে সাহিত্য, ধর্ম থেকে রাজনীতি, মানবচরিত্র থেকে প্রকৃতির
বিপুল সৌন্দর্য- অসংখ্য বিষয়ে বিরামহীন বলে যেতে থাকে ও। আর এসবের মধ্যে
কেন আমি, কোথায় আমি- অস্তিত্বের এসব জটিল প্রশ্ন। কখনো এসব নিয়ে এতকিছু
ভাবিনি আমি, এতকিছু যে ভাবা যায় তাইতো বুঝিনি কখনো। এই প্রথমবারের মতো আমার
মনে হয়- এই যুবক আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, এই তরুণ আমাদের সবার মতো নয়। আমার
মুগ্ধতা, ওর সব কথা না বুঝেও, বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই লেখাটি নিশ্চয়ই কেউ পড়বে না! লিখছি নিজের মনে, লিখেই ছিঁড়ে ফেলবো- অতএব,
কয়েকটা গোপন কথা লিখে নিজের কাছেই হালকা হওয়া যাক। এসব কথা আমি কাউকেই
বলিনি- বলা সম্ভবও নয়।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো- একদিন না একদিন আমাকে নিয়ে হাসিব লিখবেই। অতএব ওর
যেন লিখতে সুবিধা হয় সেজন্য আমি নানাভাবে নিজের রূপকে ওর সামনে ফুটিয়ে
তুলতে চাইতাম। আমার শরীরের সব মোহনীয় বাঁকগুলোকে স্পস্ট করে তুলতে চাইতাম।
একদিন- মনে পড়ে- দুষ্টুমি করতে করতে ও বলেছিলো, ওর খুব শখ- একটি রূপসী
মেয়ের নগ্ন শরীর দেখবে। আমাকে জিজ্ঞেসও করেছিলো- আমি দেখাতে রাজি কী না!
কথাটা অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি- আমি রাজি হয়েছিলাম। কথা ছিলো, সময়-সুযোগমত
ঘটনাটি ঘটবে। কেউ ব্যাপারটি শুনলে হয়তো ভাববে- গল্পের চরিত্র হওয়ার জন্য
এতকিছু! অ্যাবসার্ড! হয়তো তাই। আমি নিজেও আমার এই আচরণের সঠিক ব্যাখ্যা
দিতে পারবো না। তো যাই হোক, সেদিনের পর থেকে আমার সে কী প্রতীক্ষা আর
প্রস্তুতি! আহ, কবে আসবে সেই দিন- আমার কল্পনার রাজপুত্র যেদিন আমার সব
দেখবে! বিশেষণটা কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো? সম্ভবত। কিন্তু তখন আমার এরকমই
মনে হতো। তো, একদিন এলোও সেই সুযোগ। চাকরিজীবী মা-বাবা বাসায় থাকতেন না,
ছোট ভাইটা কলেজে, বুড়ো দাদু অন্ধ। হাসিব ফোন করে বললো, আসছি। এলোও। কিন্তু
বৃথাই আমার এতসব প্রস্তুতি। সব বুঝেও ও প্রসঙ্গটা উত্থাপন না করে
ইয়ার্কি-ফাজলামো করে চলে গেলো। আমার মনে হলো- ও হয়তো স্রেফ ইয়ার্কির জন্যই
কথাটা বলেছিলো। এমনই মিস্টিরিয়াস ছিলো ও, নইলে একজন রূপবতী মেয়ের নগ্ন শরীর
দেখার সুযোগ কেউ ছাড়ে? এত প্রতীক্ষা, তবু আমাকে নিয়ে একটি গল্প ও লেখেনি।
কিন্তু আমার বিয়ের আগে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলো হাসিব। অসামান্য এক চিঠি-
অন্তত কয়েকশ’ বার পড়েও আমার সাধ মেটেনি। প্রায় মুখস্থই হয়ে গেছে চিঠিটা।
অবিকল উদ্ধৃতিও দিতে পারবো। ও লিখেছিলো অনেক কথাই, ব্যাখ্যা করেছিলো কেন ও
আমাকে নিয়ে গল্পটা লেখেনি ...
তুমি অনেকবার বলেছো তোমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখতে। তোমার প্রত্যাশা ও
আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কোনো গলদ ছিলোনা- আমি জানি। আমাকে নিয়ে তোমার একটি
অসংজ্ঞায়িত স্বপ্ন ও অনুভূতি ছিলো, তাও জানি। মনে পড়ে, একবার মিলুর দেয়া এক
পার্টিতে, হঠাৎ ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে বন্ধুদের নিয়মহীন অকাণ্ড ভ্রুক্ষেপ
না করে তুমি বলেছিলে-‘আমার খুব সাধ, তুমি গল্প লিখবে, আমি পাশে দাঁড়িয়ে
থাকবো, ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে হাতপাখা দিয়ে তোমাকে বাতাস করবো যেন তোমার
লিখতে অসুবিধা না হয়’- নিজের অজান্তে বলেছিলে তুমি, বোঝনি কি বলছো- এ তো
আসলে ঘোরের স্বপ্ন, তোমার অবচেতন মনে যা ছিলো! শেষ পর্যন্ত ভুলটা তুমি
করনি। চালচুলোহীন যুবকের গলায় মালা পড়ানোর দুর্বুদ্ধি থেকে নিজেকে মুক্ত
রাখতে পেরেছ। তোমাকে অভিনন্দন। তোমার বিয়ে হচ্ছে জেনে ভালো লাগছে, তুমি
সুখী হবে ভেবে। যা হোক, তোমাকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত আর গল্পটা লেখা হলোনা
আমার। কেন হয়নি- সে ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার রাখো তুমি। তুমি অনেকবার বলেছো,
সত্যি বলছি, আমিও চেয়েছি তোমাকে নিয়ে একটি চমৎকার গল্প লিখতে। এজন্য তোমাকে নানাভাবে বুঝতে
চেয়েছি, তুমিও উজাড় করে নিজেকে মেলে ধরেছো। তবু হলোনা আরাধ্য গল্পটি লেখা।
কেন হলোনা, নিজেকেই জিজ্ঞেস করে জেনেছি- একটি গল্পের চরিত্র হওয়ার জন্য
একজন মানুষের যে পরিমাণ মনোযোগ পাওয়া দরকার তুমি তা পাওনি। আমি বিশ্বাস
করি, লেখকদের চারপাশে আসা দু-ধরনের মানুষ নিয়ে তারা কখনো গল্প লিখতে পারেন
না- এক : যারা লেখকটির খুব গভীরে নাড়া দিয়ে যায়; দুই : যারা একেবারেই
স্পর্শ করতে পারে না। লেখকরা গল্প লেখেন এর মাঝামাঝি কোনো চরিত্র নিয়ে-
যাদের নিয়ে কল্পনা করার অবকাশ থাকে। খুব যারা কাছের তাদের নিয়ে কল্পনা জমে
না, আবার একেবারেই স্পর্শ করলোনা তাদের নিয়েই বা কল্পনা হয় কিভাবে? আর
কল্পনা ছাড়া গল্প? অস্বম্ভব| গল্প কখনো পুরোপুরি বাস্তব নয়; কল্পনার ওপর
বাস্তবের ছায়া মাত্র! এসব তোমাকে বোঝানো যাবে না। কিন্তু ডলি বা পলিদিকে
নিয়ে লেখা গল্পগুলো (!) পড়ে কি বোঝনি, ওগুলোর অনেকটাই কল্পনা? তোমাকে নিয়ে
কখনো কল্পনার ঘোড়া ছোটাতে পারিনি আমি- কারণ, তুমি হচ্ছো ওই দ্বিতীয় দলের
সদস্য, কখনো আমাকে স্পর্শ করতে পারোনি। কথাটা শুনে কি কষ্ট পেলে? এতদিনের
সাজানো ভাবনা কি এলোমেলো হয়ে গেলো? হয়তো। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। শুধু
শোন, কেন স্পর্শ করতে পারোনি। তুমি অসামান্য রূপবতী। সচরাচর এমন রূপ চোখে
পড়ে না। তুমি তাই দূরবর্তী রাজকন্যার মতো, আর আমি এক সাধারণ প্রজা!
অসামান্য রূপবতী বা মায়াবতীরা- ভেবে দেখেছি- আমার গল্পের চরিত্র হতে
পারেনা। ওরা বরং হুমায়ূন আহমেদের কাছেই ভালো থাকে (এই বিশেষণগুলোও তারই
সম্পত্তি) ; সেদিক থেকে দেখতে গেলে তুমি আমাকে না বলে তাঁকে বললেই একটি
গল্প, এমনকি একটি উপন্যাসের চরিত্রও হতে পারতে- শুনেছি রূপসীদের তিনি খুব
পছন্দ করেন। ‘অসামান্য’ ‘অসাধারণ’- এসব লোকজন আমার কেউ নয়। আমার আপনজন- ওই
সাধারণ মানুষ- ভালো-মন্দ- আলো-অন্ধকার মেশানো সাধারণ মানুষ। সাধারণের জীবনে
যে কখনো কখনো ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে যায় (যেমন: তুমি রূপসী, তোমাকে সবাই পেতে
চাইবে, তোমার রূপের প্রশংসা করবে এটা খুব স্বাভাবিক-সাধারণ ঘটনা কিন্তু
একটি অতি সাধারণ-কালো-কুৎসিত-তুচ্ছ মেয়েকে কেউ পেতে চাইছে, প্রেমিকের কাছে
ওই তুচ্ছ মেয়েটিই হয়ে উঠেছে রাজকন্যার মতো, ভেবে দ্যাখো মেয়েটির জীবনে এটা
কতটা ব্যতিক্রমী আর অসামান্য ঘটনা!) তাই-ই আসলে গল্প। এ আমার বিশ্বাস। আমি
আসলে ওরকম গল্পই লিখতে চাই। একজন লেখকের গল্পের সংখ্যা যা-ই হোক না কেন,
আমার ধারণা, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তিনি একটি গল্পই লেখেন জীবনভর। সাধারণের মাঝে
খোঁজেন অসাধারণত্বের সম্ভাবনা। সেই একটি গল্প আমাকে ধরা দেয়নি এখনো। যা
লিখছি তা খসড়া মাত্র; জানি না, আরাধ্য গল্পটি আদৌ কোনোদিন ধরা দেবে কী না
আমাকে ...
গল্প সম্বন্ধে এরকম আরো অনেক তত্ত্বকথা ছিলো ওই চিঠিতে- আমি যার সবকিছু
বুঝতেও পারিনি। আমার শুধু পড়তে পড়তে চোখ ভিজে ওঠে- আজও মনে হয়, অসামান্য
রূপবতী না হয়ে সাধারণ একটা মেয়ে হলেই ভালো হতো- অন্তত হাসিবের গল্পের
চরিত্র হওয়ার যোগ্যতা থাকতো। আমি তো কখনো হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের নায়িকা
হতে চাইনি, আমার স্বপ্ন ছিলো হাসিবকে ঘিরেই। একমাত্র এই চিঠিটা পড়লেই নিজের
রূপের জন্য রাগ হয আমার। কিন্তু কি আর করা! নিজেকে সান্ত্বনা দেই- সবাই তো
আর সবকিছু পায় না! ওই যে গল্পটা- আমরা একটি গল্পের জন্য অপেক্ষা করছি- ওটার
সুজাতা ওরফে মালতিও তো শেষ পর্যন্ত হাসিব জামিলের চরিত্র হতে পারেনি। ও কি
খুব গভীরে ছুঁয়ে গিয়েছিলো হাসিবকে, যার জন্য হাসিব ওকে নিয়ে কল্পনা করতে
পারেনি? আর কল্পনা না হলে, গল্প হবে কি করে? হয়তো এভাবেই আরো কতজন হাসিবের
চরিত্র হতে পারেনি- আমি তার ক-টার খবরই বা রাখি? আর ওদিকে দ্যাখো, এখন সে
নিজেই অন্য অনেকের গল্পের চরিত্র হয়ে যাচ্ছে!
রচনাকাল : জুলাই-আগস্ট, ১৯৯৯ |
| |
 |
|