আমরা, এই ছোট্ট মফস্বল
শহরের কয়েকজন বেকার যুবক, আপাতত রাজধানী থেকে বেড়াতে আসা তরুণ লেখক হাসিব
জামিলের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছি। হাসিব ভাই
কিংবা জামিল ভাই বয়সে আমাদের চেয়ে খুব বেশি বড় নন, কিন্তু ইতোমধ্যেই তার
সাফল্য আমাদেরকে প্রায় স্তম্ভিত করে দিয়েছে। আমরা যেখানে এই ক্ষুদ্র শহরটার
বাইরেই যেতে পারলাম না, সেখানে তিনি রাজধানী ছাড়িয়ে চলে গেছেন আরো অনেকদূর,
হয়তো দেশ জুড়ে এখন তার নাম ছড়ানো। তার লেখা প্রায় নিয়মিত জাতীয়
পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, আর আমরা, সম্ভবত, তার লেখা আছে কী না এই খোঁজেই
প্রতিটি দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, ও মাসিক
পত্রিকাগুলোর সাহিত্য বিভাগ এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন - আমাদের এই শহরে
যেগুলো আসে আর কি - খুঁটিয়ে দেখি। তার লেখা পেলে আমাদের আনন্দ ও গৌরবের
সীমা থাকেনা, আমরা পত্রিকাটি নিয়ে ঘুরে বেড়াই, শহরের শিক্ষিত গণ্যমান্য
লোকদের দেখাই, তরুণরা গোল হয়ে বসে তার লেখা পড়ি। মনে হয়, আহা এমন অসাধারণ
লেখা কোনোদিন পড়িনি। একথা শুনে অনেকে ভাবতে পারেন - আমাদের পড়াশোনার দৌড়
নিশ্চয়ই সামান্য, [নইলে তার লেখাকে এত অসাধারণ লাগবে কেন!] কিন্তু কথাটি
ঠিক নয়। আমাদের কলেজ লাইব্রেরি কিংবা শহরের ক্ষুদ্র পাবলিক লাইব্রেরির
অধিকাংশ বই-ই আমরা পড়ে ফেলেছি, কিন্তু সেসবের সঙ্গে আমরা আমাদের হাসিব
জামিলের তুলনা করতে চাইনা। তার প্রতি আমাদের একটা অন্ধ অনুরাগ ও ভালোবাসা
রয়েছে। তার কারণও আছে; আমাদের এই শহরটি - নামটা বলেই ফেলি, মানিকগঞ্জ -¬
ঠিক শিল্প-সাহিত্যের জন্য উপযুক্ত নয়। আমাদের একজন লেখকও জাতীয় পর্যায়ে এমন
কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি, যা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। সেক্ষেত্রে হাসিব
ভাই [কারো কারো কাছে জামিল ভাই] এই অল্প বয়সেই যা করছেন তা রীতিমতো গৌরবের।
হয়তো এটিই একমাত্র কারণ নয়; নইলে তো সারা শহরই আমাদের গৌরবের অংশীদার হতো,
আমরা কয়েকজন যুবক শুধু এমন হই চই করতাম না। করি, কারণ - সত্যি কথাটাই বলি -
আমরাও দু-এক ছত্র লেখার চেষ্টা করি। জানিনা কিছু হয় কী না; অন্তত ঢাকার
পত্র-পত্রিকাগুলোর ভাবসাব দেখলে মনে হয়, কিছু হচ্ছেনা। আমরা লেখা পাঠাতে
পাঠাতে ক্লান্ত হয়ে গেছি, ছাপা প্রায় হয়ই না। আমরা তবু লেগে আছি; লেগে
থাকতে থাকতে অন্য সব কাজের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছি এবং সবার কাছে বাউন্ডুলে,
অকর্মার ধাড়ি ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত হওয়া শুরু করেছি অনেক আগেই। তো, এই
অবস্থায় হাসিব জামিল রীতিমতো প্রেরণা আমাদের। তিনি এসেছেন, আমাদেরকে
মূল্যবান সময় দিচ্ছেন, সত্যি বলতে কি - সবসময়ই আমাদের সঙ্গে রেখেছেন। আমরা
এতে ধন্য বোধ করছি। কত কথা, কত গল্প, কত বিস্ময় জাগানিয়া অভিজ্ঞতা! শামসুর
রাহমানকে তিনি যখন রাহমান ভাই সম্বধোন করে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্কের
গল্প করছেন, কিংবা সৈয়দ শামসুল হককে হক ভাই; হাসান আজিজুল হককে হাসান ভাই;
অথবা ইলিয়াস ভাই (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস), বটু ভাই (মাহমুদুল হক) সাবের ভাই
(মঈনুল আহসান সাবের) - এইসব স্বপ্নের মতো মানুষগুলোর কথা যখন বলছেন একেবারে
আপনজনের মতো করে, আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছি। শুধু কি এঁদের কথা? আরো
কতশত বিষয়! জামিল ভাই গল্প লেখেন - অসাধারণ সব গল্প [অন্তত আমাদের কাছে
ওসবের কোন তুলনা নেই], কিভাবে লেখা হয় ওসব গল্প - আমরা প্রশ্ন করলে কতসব
চমৎকার কথা বললেন!
গল্প লিখতে হলে তোমার দরকার হবে একটি নিজস্ব ভাষা, গল্প বানাবার নিজস্ব
স্টাইল। এর জন্য তোমাকে পড়তে হবে প্রচুর, জানতে হবে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছো
তুমি। ঠিক কোন ভাষায় বললে সেটি একটু ব্যতিক্রমী শোনাবে।
আর বিষয়? বিষয় কোথায় পাবো?
বিষয় ছড়ানো আছে তোমার জীবনের চারপাশে। সেখান থেকে নেবে; চোখ খোলা রাখো,
দ্যাখো, বোঝার চেষ্টা কর যে, কোন জিনিসটা তোমার গল্পের বিষয় হতে পারে!
কি রকম?
সিগারেট কিনতে গেছো, সয়ং দোকানদার হতে পারে তোমার চমৎকার একটি গল্পের
চরিত্র। প্রেমিকা কি পতিতা, মা কি ভিখারি - কেউ-ই ফেলনা নয় তোমার গল্পের
জন্য। আমি তো প্রতি মুহূর্তে চরিত্র খুঁজে বেড়াই, প্লট খুঁজে বেড়াই।
আমরা অবাক হয়ে তার কথা শুনি। এই না হলে লেখক? প্র্রতি মুহূর্তে লেখার
চিন্তাটা মাথায় না রাখলে কি আর লেখক হওয়া যায়? আমাদের পক্ষে বোধ হয় লেখক
হওয়া সম্ভব নয়, এসব গুণাবলীর ছিটেফোঁটাও যে আমাদের মধ্যে নেই! আর ওই যে
কল্পনার কথা বলেন তিনি, বলেন - শুধু চরিত্র খুঁজে পেলেই চলবে না, তাকে
নির্মাণ করার জন্য তোমার থাকতে হবে চমৎকার কল্পনা শক্তি। বাস্তবের চরিত্র
আর কল্পনার মিশেলে গড়ে উঠবে একেকটি কালজয়ী গল্প। আসলে কল্পনাই প্রধান,
বাস্তবের প্রজেকশন পড়বে তাতে, তবেই না গল্পটা আকর্ষণীয় হবে। ওই যে,
আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন - ইমাজিনেশন ইজ মোর পাওয়ারফুল দ্যান নলেজ - এটাই
সব শিল্পের মূল কথা।
আমরা আবার বিস্মিত। কি চমৎকারভাবেই না জামিল ভাই সাহিত্যের আলোচনায় বিজ্ঞান
নিয়ে এলেন! কিন্তু আমরা ওই কল্পনা পাই কোথায়!
আমরা জামিল ভাইয়ের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকি। তার ‘চরিত্র’ খোঁজা দেখি,
কল্পনার কথা শুনি, লেখকদের নিয়ে কতসব গল্প শুনি! এর মধ্যেই একটা নাটকীয়
ঘটনা ঘটে যায়। বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। বিশেষ করে জামিল ভাই যদি ঢাকায়
ফিরে তার বন্ধুদের বলেন এ ঘটনা, তারা হেসেই উড়িয়ে দেবেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু
ব্যাপারটা সত্যিই ঘটেছিলো। আমরা, এই ছোট্ট মফস্বলের কতিপয় বেকার যুবক,
রীতিমত প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনাটা এরকম :
একদিন আমরা কোর্টপাড়ায় একটা চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। দেখলাম রিকশায়
বসে এক লোক চিৎকার করছে - যাত্রা! যাত্রা! যাত্রা! নিউ গনেশ
অপেরার যাত্রা! আবার এলো - ইত্যাদি। জামিল ভাই বোধহয় একটু মন দিয়ে শুনলেন,
বললেন,
কোথায় হচ্ছে যাত্রা?
এই কাছেই।
কাছেই কোথায়?
জাবড়ায়।
জাবড়া। অমলেন্দু বিশ্বাসের বাড়ি না ওখানটায়?
হ্যাঁ।
অমলেন্দু বিশ্বাস তো যাত্রাসম্রাট; আমাদের গর্ব। ওনার মেয়ে অরুনা বিশ্বাস
ফিল্মে বেশ নাম করেছেন, না?
হ্যাঁ জামিল ভাই।
তোমরা দ্যাখো না যাত্রা?
আমরা দেখি, না দেখে উপায় কি? কিন্তু জামিল ভাইকে তা বলি কি করে? ওখানে যা
সব হয়! অতএব মিথ্যে করে বলতে হয় -
নাহ! না না, দেখা হয় না।
কেন?
সব ভালগার ব্যাপার জামিল ভাই। - আমরা যে বেশ রুচিশীল সংস্কৃতির পক্ষের লোক
সেটা প্রমাণের জন্য সময় মতো ও রকম একটি যুতসই ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে
পেরে যখন বেশ পুলকিত হয়ে উঠছি তখনই জামিল ভাইয়ের শীতল কণ্ঠ শোনা যায় -
ভালগার বলছো কেন? যাত্রাকে তোমরা ভালগার মনে কর?
ইয়ে, না, মানে, ওখানে যে নাচ-টাচ হয়...
সেটাকে তোমরা প্রধান করে তুলছো কেন? শত শত বছর ধরে যে মাধ্যমটি নাটকের
কনসেপ্টটিকে একদম সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে তোমরা তার চেয়ে বড়ো
করে দেখছো নাচটাকে?
আমরা কথা বলি না। এই কথায় জামিল ভাই এত রাগ করবেন, কে জানতো!
লোকজ সংস্কৃতিকে সবসময় অন্তজ শ্রেণীর মর্যাদা দেয়ার ফ্যাশনটি তোমাদের
মধ্যেও রয়েছে দেখছি - তিনি আবার বললেন ।
আমরা চুপ করেই থাকি।
আর তোমরা যে নাচের কথা বললে, কখনো যারা নাচে তাদের ভেতরের জীবনটার কথা ভেবে
দেখেছ?
আমরা নিশ্চুপ।
সেলিম আল দীন কয়েক বছর আগে একটা টিভি-নাটক লিখেছিলেন গ্রন্থিকগণ কহে নামে -
এই যাত্রা দলের কুশীলবদের নিয়ে, দেখেছ?
না, দেখা হয়নি।
না, তা দেখবে কেন? দেখবে তো পুতু পুতু প্রেম অথবা হুমায়ূন আহমেদীয় নাটক,
তারপর বাকের ভাই নামক একটা উদ্ভট চরিত্রের ফাঁসির রায় বদলাবার জন্য মিছিল
করবে - ভেবে দেখেছ এটা কত বড় ভালগার ব্যপার?
জামিল ভাই হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে এমন বিরূপ মন্তব্য করেন যে, খারাপ লাগে।
এত উঁচু মাপের লেখক সম্বন্ধে এভাবে কথা বলাটা কি উচিত? কিন্তু আমরা কিছু
বলি না। এখন জামিল ভাইয়ের ঝাড়ির মুড এসেছে - শুনতেই হবে।
সেলিম আল দীন সেই নাটকে এদের জীবনের ভেতরের রূপটি দেখিয়েছিলেন। দেখার চোখ
থাকতে হয় বুঝেছো! তোমরা লেখালেখি করতে চাও কিন্তু এখনও দেখতেই শেখোনি....
এরকম কিছুক্ষণ চলার পর অবশেষে সিন্ধান্ত হয় - জামিল ভাই যাত্রা দেখতে যাবেন
এবং আমরা তার সঙ্গী হবো।
নাটকীয় ঘটনাটা সেখানেই ঘটে।
আমরা গিয়ে সামনের সারিতে অতিথির আসনে বসি । জামিল ভাইয়ের কল্যানেই এ রকম
ব্যবস্থা ।
মধ্যরাত।
যাত্রা অনুষ্ঠান শুরু হয় । মঞ্চের পাশ থেকে ঘণ্টা বেজে ওঠে। ছুটির ঘণ্টার
মতো শব্দ। মাঝখানে বর্গাকার মঞ্চ, দুপাশে যন্ত্রীরা বসেছে, অন্য দুই পাশে
দর্শক। যন্ত্রীদের পেছনেও দর্শক। একপাশে আবার ড্রেসিং রুম থেকে মঞ্চে
শিল্পীদের আসা-যাওয়ার রাস্তা। ঘণ্টা বাজার কিছুক্ষণ পর যন্ত্রীদের কাছ থেকে
বেজে ওঠে হারমোনিয়াম,অর্গান, তবলা, ড্রামসেট। একে একে মঞ্চে উঠে আসে আটজন
মেয়ে। দুই সারিতে দাড়িয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে তারা গান শুরু করে - আমার দেশ সব
মানুষের...! চড়া মিউজিকে গানের কথাগুলো চাপা পড়ে যায়। মেয়েরা দক্ষিণে ঘুরে
দাঁড়ায়; অতঃপর পুবে ও উত্তরে। আমরা বসেছি মঞ্চের উত্তর-পূর্বদিকে। মেয়েরা
এদিকে ঘুরে দাঁড়ালে আমরা ওদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি - গানের কথা আমাদের
কানে ঢোকে না। এদের অনেককেই আমরা চিনি। নিউ গণেশ অপেরা মানিকগঞ্জেরই দল। এর
অধিকাংশ কুশীলব আমাদের চেনা। ওই তো শেফালি - ওর বাড়ি বাঠুইমুড়ি গ্রা্রমে;
রমা - কৌড়ির; মালতি - নবগা্রমের; দীপালি - কলতার। এদের মধ্যে মালতিই সবচেয়ে
রূপসী। অল্প বয়স, কিন্তু ভরা শরীর। কে জানতো এই মেয়েটিই কিছুক্ষণ পর একটা
নাটকের জন্ম দেবে!
মাঝে মাঝে আমরা জামিল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তার অ্যাটিচিউড বোঝার চেষ্টা
করছি। তার ঠোঁটে এখন মৃদু হাসি, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মঞ্চের দিকে।
নির্দিষ্ট কাউকে কি দেখছেন? মালতিকে? হতে পারে। ওর রূপ যে কাউকেই মুগ্ধ
করে।
গান শেষ হয়। দেশ বন্দনা শেষ করে মেয়েরা এক এক করে ড্রেসিং রুমে ফিরে যায়।
এরপর কি ঘটবে আমরা জানি, জামিল ভাই কি জানেন? এর আগে কি কখনো যাত্রা
দেখেছেন তিনি? না দেখে থাকলে একটা ধাক্কা খাবেন নিশ্চয়ই! এবং তাই-ই হয়।
সামান্য বিরতি দিয়েই উদ্দাম সুরে বেজে ওঠে ড্রামসেট ও অর্গান। আটজনের একজন
উঠে আসে মঞ্চে। এবার তার পোশাক বদলে গেছে। যতোটুকু সংক্ষিপ্ত হলে শরীরের
বিশেষ অঙ্গগুলো ভয়ানক আকর্ষণীয় আর উত্তেজক হয়ে ওঠে - সে তাই পরেছে।
দুর্বোধ্য গানের সঙ্গে শরীরে ঢেউ তোলে সে, গানটা প্রধান নয় এখানে, নাচটাই
আসল। দর্শকরা এখন মহা উত্তেজিত; শিৎকার, চিৎকার, আর বিচিত্র সব মন্তব্যে
ভরে ওঠে প্রাঙ্গণ; মঞ্চের দিকে অশ্লীল ইঙ্গিতসহ ছুঁড়ে দেয় একটি নির্দিষ্ট
সাইজের নানা জিনিস। প্রিন্সেস নাচে, হাসে, দর্শকদের কাছে গিয়ে তাদের এগিয়ে
দেয়া বিভিন্ন ধরনের খাদ্যবস্তু তার সংক্ষিপ্ত পোশাকের ভেতর ঢুকিয়ে শরীরের
ছোঁয়া লাগিয়ে দেয়। আমাদের মাথা হেঁট হয়ে আসে। জামিল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে
দেখি তিনি মাথা নিচু করে বসে আছেন। হা, হাসিব জামিল, দ্যাখো, তোমার লোকজ
সংস্কৃতি দ্যাখো, এখন কেন মাথা নিচু হয়ে আসে? এখনও কি মনে হচ্ছে এসবের চেয়ে
‘বাকের ভাইয়ের’ ফাঁসির বিরুদ্ধে মিছিলটা বেশি ভালগার?
মেয়েটির নাচ শেষ হয়। আরেকজন আসে। তার ভাবভঙ্গি আরো উত্তেজক। যেন তারা
প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যেন তারা সবাই মিলে দর্শকদেরকে উত্তেজনার শেষ সীমানায়
নিয়ে যেতে চায়। আমরা জামিল ভাইকে লক্ষ্য করি। এসব আমরা প্রচুর দেখেছি,
অভ্যস্ত হয়ে গেছি প্রায়, আমাদের কৌতূহল তাই জামিল ভাইকে ঘিরেই। এবারও তার
মাথা নিচু। একমনে সিগারেট টেনে যাচ্ছেন - যেন সিগারেট খাওয়ার জন্যই এখানে
এসেছেন তিনি। তার দুরবস্থা দেখে আমাদের মজা লাগে। এ নাচটিও শেষ হলো। এবার
মঞ্চে মালতি - এখানে সে ‘সুজাতা’ হিসেবে পরিচিত। দর্শকরা তাকে দেখেই
উত্তেজিত। কিন্তু কি কারণে বোঝা যায় না, সে বেশ শান্ত ভঙ্গিতে গান গায়। যেন
সে গানই গাইতে এসেছে, নাচতে নয়। এবার জামিল ভাই একটু স্বাভাবিক, ঠোঁটে মৃদু
হাসি ফিরে এসেছে, কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছেন মালতি ওরফে সুজাতার দিকে। এক সময়
অবাক হয়ে দেখি, জামিল ভাই নমস্কারের ভঙ্গিতে হাত জড়ো করেছেন মালতির
উদ্দেশ্যে। আরে না, তা কি করে হয়! তিনি কেন ওই মেয়েকে নমস্কার জানাতে
যাবেন? মালতির গান শেষ হয়। চূড়ান্ত উত্তেজনার পর মালতি ওরফে সুজাতা শুধু
গান গেয়ে দর্শকদের শান্ত করে দিয়েছে। কিন্তু প্রায় চমকে দিয়ে আবার বেজে ওঠে
ড্রামসেট। শুরু হয় সুজাতা পর্ব। ভয়ানক উত্তেজনায় রীতিমত কেঁপে ওঠে
দর্শককূল। এ তাহলে মেয়েটির নতুন কৌশল! জেগে ওঠা উত্তেজনায় পানি ঢেলে আবার
তা জাগিয়ে তোলা! পৃথিবীর সব রূপসীই নিজেদেরকে উপস্থাপন করার নানাবিধ কৌশলে
পটু। এমন কি এই মালতিও। গ্রামের সাধারণ একটি মেয়ে হয়েও। আমরা আবার জামিল
ভাইকে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখি। তার জন্য এখন আমাদের খারাপই লাগে।
সম্ভবত তিনি মেনে নিতে পারছেন না ব্যাপারটা। কিন্তু উপায় নেই। এ রকমই তো
হবার কথা। সুজাতা নাচ শেষ করে চলে গেলে আবারও তার ডাক পড়ে। এমনই হয়।
দর্শকরা তাকে চায়, খুব পপুলার সে, সচ্ছল দর্শকদের কেউ কেউ আবার ‘পুরস্কার’
ঘোষণা করে তার জন্য। জামিল ভাইকে কি একটু বিপর্যস্ত মনে হচ্ছে? এখনও
ক্রমাগত সিগারেট টেনে চলেছেন তিনি।
নাচপর্ব শেষ। শুরু হয় নাটকপর্ব। ঘণ্টাখানেক পর জামিল ভাই বলেন - ‘চলো, চা
খেয়ে আসি।’ যাত্রা প্যান্ডেলের ঠিক বাইরেই হরেক রকমের দোকান। আমরা
চা-সিগারেট খাই; জামিল ভাই তবু চুপচাপ। আমাদের খুব জানতে ইচ্ছে করে - তিনি
কি ভাবছেন, কিন্তু জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না। বেশ কিছুক্ষণ অস্বাভাবিক নীরব
সময় কাটিয়ে আমরা যখন আবার ভেতরে ঢুকলাম, তখন নাচের দ্বিতীয়পর্ব শুরু হয়ে
গেছে। জামিল ভাই গম্ভীর। আমাদের বোধহয় ফিরে যাওয়াই উচিত ছিলো। কিন্তু এত
রাতে যাবো কিভাবে! নাচ চলতে থাকে, তেমনই চূড়ান্ত উত্তেজনায়। রাতের
নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। হৈ-হল্লা-কোলাহল-চিৎকার-শিৎকারে মেতে আছে সবগুলো মানুষ। মালতি অর্থাৎ
সুজাতা মঞ্চে এলে সেটা আরো বাড়ে। আগের মতোই সে শান্ত ভঙ্গিতে গান গায়।
দর্শকরা প্রস্তুত গান-পরবর্তী নাচের জন্য এবং যথারীতি ড্রামসেট-অর্গান
বেজেও ওঠে। কিন্তু সুজাতা নাচে না। যন্ত্রীদের কাছে গিয়ে কি যেন বলে।
উদ্দাম সুর থেমে গিয়ে এবার বেজে ওঠে বেহালার মন খারাপ করা সুর। আমরা বুঝতে
পারি না কি ঘটতে যাচ্ছে। এ নিশ্চয়ই মালতির অন্য কোনো কৌশল! মেয়েটি যে কত
কৌশল জানে! বুদ্ধিমতি খুব - বোঝা যায়। আমরা অচিরেই বুঝতে পারি ও আমাদের
দিকে এগিয়ে আসছে। কিঞ্চিৎ ভয়ও লাগে - ও তো আমাদের চেনা, কোনো অকাণ্ড আবার
না ঘটিয়ে ফেলে। ইতিমধ্যে সে তার চুলে বাঁধা মালাটা খুলে ফেলেছে, আমাদের মতো
দর্শকরাও সম্ভবত টেনশনে ভুগছে - কি ঘটে কি ঘটে ভাব - একদম নীরব হয়ে গেছে
প্রাঙ্গণ; শুধু বেহালার বিলম্বিত করুণ সুর ধাক্কা মারছে সবাইকে। মালতি
এগিয়ে এসে সত্যিই একটা নাটক করে, মালাটা জামিল ভাইয়ের গলায় পরিয়ে দেয়,
বিস্মিত আমরা শুনতে পাই, সে বলছে - যাত্রা দলের মেয়ে বলে খুব সস্তা আমি,
কেউ কখনো ভালোবাসেনি, সম্মান তো নয়ই। কেবল আপনিই আমাকে নমস্কার জানিয়েছেন;
- বলে মালতি আর দাঁড়ায় না। স্তম্ভিত দর্শককুল হল্লা করে ওঠে, চিৎকার করে
জামিল ভাইকে মঞ্চে আহ্বান করে। জামিল ভাই মুখ নিচু করে বসে থাকেন। আমরাও
বুঝতে পারি না যে, আমাদের কি করা উচিত ।
ফিরতে ফিরতে আমাদের ভোর হয়ে যায়। ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে। যে যার বাড়ি ফেরার
তাগিদটাই এখন প্রধান হয়ে উঠেছে। জামিল ভাইয়ের দিকে খেয়াল করার সময় কোথায়!
আমরা সম্ভবত ভুলই করেছিলাম। নইলে হয়তো সেই অলৌকিক মুহূর্তটি দেখতে পেতাম -
লেখার পূর্বমুহূর্তে লেখকের মধ্যে যা এসে পড়ে। ব্যাপারটি আমরা বুঝতে পারি
যখন জামিল ভাই বেলা বারোটার দিকে সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে এক জায়গায় জড়ো
করেন। আমরা তার প্রায় বিধ্বস্ত্ত, ক্লান্ত মুখচ্ছবি দেখে চমকে উঠি। নিশ্চয়ই
তিনি ঘুমোননি! টানা নির্ঘুম থাকার ক্লান্তি তার চোখেমুখে, কিন্তু অন্য একটা
উজ্জ্বলতা তার ভেতরে মুখ উঁচিয়ে আছে। তিনি বলেন - ‘একটা গল্পের খসড়া
তোমাদের শোনাই।’ আমরা খুবই অবাক। এর মধ্যে তিনি গল্পের খসড়াও করে ফেলেছেন!
এই না হলে লেখক? আমরা যখন ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছিলাম, জামিল ভাই তখন গল্পের
কথা ভাবছিলেন, গল্পের খসড়া করছিলেন! কি অদ্ভুত! কি অসাধারণ! উত্তম পুরুষে
লেখা জামিল ভাইয়ের গল্পের খসড়াটা ছিল এ রকম মঞ্চের পাশ থেকে ঘণ্টা বেজে
ওঠে। যেন সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার জন্য আহ্বান ওই ঘন্টায়। মঞ্চের দুই পাশে
যন্ত্রীরা বসেছে, অন্য দুই পাশে দর্শক, যন্ত্রীদের পেছনেও দর্শক। যন্ত্রীরা
প্রায় হঠাৎই যেন সক্রিয় হয়ে ওঠে। বেজে ওঠে নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র। এক এক
করে আটটি মেয়ে মঞ্চে এসে পশ্চিমমুখী হয়ে দাঁড়ায়। সুরটা এবার পরিচিত, মেয়েরা
গেয়ে ওঠে - ‘ছোটদের বড়োদের ... আমার দেশ সব মানুষের।’ একটুক্ষণ পর মেয়েরা
দক্ষিণে ঘুরে দাঁড়ায়, তারপর পুবে, সবশেষে উত্তরে। যেন দিকে দিকে তারা ছড়িয়ে
দেবে দেশের কথা। আমি এর আগে কখনো যাত্রা দেখিনি, ফলে পুরো বিষয়টিই আমার
জন্য নতুন এবং মজার বলে মনে হচ্ছে। আমি বসেছি মঞ্চের উত্তর-পূর্ব কোণের
দর্শক সারিতে। মেয়েরা এদিকে ঘুরলে তাদের ভালোভাবে দেখার সুযোগ হয়। উৎকট
মেকাপে সবার আসল রূপ বোধহয় ঢাকা পড়ে গেছে। যারা একটু বেশী রূপসী তাদের
মেকাপ কম, যারা কম রূপসী তাদেরটা প্রায় ভয়াবহ। এক এক করে দেখতে দেখতে একটি
মেয়ের দিকে চোখ আটকে যায়। মেয়েটি সবার মতো গাইছে না, বরং দর্শকদের দিকে
তাকিয়ে হাসছে। অদ্ভুত তো! মেয়েটি রূপসীও খুব, মনে হয় অল্প বয়স কিন্তু শরীরে
ভরা বসন্ত। এই মেয়েকে সিনেমার লোকেরা পেলে বোধহয় জনগণকে পাগল বানিয়ে ফেলতো।
আমি চোখ ফেরাতে পারি না। অবশ্য চোখ ধরে রাখারও সুযোগ হয়না। গান শেষ হয়, ওরা
চলেও যায়। কিন্তু একটু পর উদ্দাম সুর বেজে ওঠে - প্রায় চমকে দেয়ার মতো
ব্যাপার। একটি মেয়েকে মঞ্চে আসতে দেখা যায় - এবার তার পোশাক বদলে গেছে,
যতটুকু না হলে মানুষ উলঙ্গ বলবে ততটুকুই পড়েছে। উদ্দাম মিউজিকের সঙ্গে সে
দুর্বোধ্য গান গাইছে, যার একটি শব্দও বোঝা যাচ্ছে না - আর মঞ্চ দাপিয়ে
বেড়াচ্ছে। এটাকেই লোকে যাত্রার নাচ বলে! শুধু কি তাই, জেগে ওঠা দর্শকদের
বিকৃত অভিলাষকেও প্রশ্রয় দিতে হচ্ছে তাকে। কোনো কোনো দর্শক দুএকটা ফলমূল বা
বিস্কুট মেয়েটির হাতে দিলে আর সে তার সংক্ষিপ্ত পোশাকের ভেতর ঢুকিয়ে তার
শরীরের ছোঁয়া লাগিয়ে দর্শককে ফেরত দিলে সারা প্রাঙ্গণ হর্ষধ্বনি করে ওঠে।
আমার শরীর শিউরে ওঠে। আহ, এসব কি হচ্ছে এখানে! মেয়েটির নাচ শেষ হলে আরেকজন
আসে। সে আরো উদ্দাম ও উত্তেজিত করে তোলে দর্শকদের। আমি লজ্জায় মাথা নিচু
করে বসে থাকি। ভাবি, এ কোন জীবনযাপন করছে আমার দেশের মেয়েরা! বোঝাই যায় -
সাধারণ দরিদ্র ঘরের মেয়ে ওরা, নিশ্চয়ই একটি সুন্দর-ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন
ওদের বুকের ভেতর ঘুমিয়ে আছে! অথচ ওদের নাচতে হচ্ছে প্রায় সারাটা শরীর
উন্মুক্ত করে, প্রকাশ্যে হাজার পুরুষের ভোগের সামগ্রী করে তুলছে নিজের
শরীরটাকে। কেন? আহ, আমি সহ্য করতে পারছি না! ... হঠাৎ চোখ খুলে দেখি - এবার
মঞ্চে সেই মেয়েটি। ঘোষণা থেকে জানতে পারি - তার নাম সুজাতা। বানানো নাম?
হতে পারে। সুজাতা আর সবার মতো নাচছে না, গান গাইছে সত্যিকারের শিল্পীর মতো
- দেখে আমার বড়ো ভালো লাগে। এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধও যেন কাজ করে ভেতরে।
মেয়েটিকে একটা ধন্যবাদ জানাতে পারলে মন্দ হতোনা, কিন্তু এই হাজার লোকের
মধ্যে তো আর সেটা সম্ভব নয়! একটা দুষ্টুমি চিন্তা তাই মাথায় আসে। নমস্কারের
ভঙ্গিতে দুই হাত জড়ো করে রাখি, মেয়েটি সব দিক ঘুরে ঘুরে গান গাইছে, আমার
দিকে ঘুরতেই জোড় হাত তুলে নমস্কার জানাই। মেয়েটা কি একটু থমকে গ্যালো? মনে
হচ্ছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে, আমি হাত জড়ো করেই
রাখলাম। সালামের ভঙ্গিতেও হয়তো হাত তোলা যেত, কিন্তু নমস্কারের ভঙ্গিটি বড়ো
সুন্দর - স্পস্টতই বোঝা যায়। মেয়েটিও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে! তার গান শেষে
আবার উদ্দাম মিউজিক বেজে ওঠে; আমি মনে মনে বলি - নেচো না মেয়ে, ওভাবে
নিজেকে উন্মুক্ত করে দিও না। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই আমার মিনতি তার কাছে
পৌঁছায় না , পৌঁছলেও কেনইবা আমার কথা সে রাখবে? অতএব সে নেচে ওঠে। সে তো
নয়, যেন সারাটি শহরই নেচে ওঠে একসঙ্গে। সবচেয়ে রূপসী মেয়েটি দর্শকদের পাগল
করে তোলে। আমি আবার মাথা নিচু করে বসে থাকি। দেখি, অমলেন্দু বিশ্বাস -
সারাটি জীবন যিনি যাত্রাকে চেয়েছেন শিল্পের মর্যাদায় নিয়ে যেতে, আর তাঁর
গ্রামেই বসেছে এই আসর - এই ভয়ংকর নাচ মঞ্চের পাশে দুঃখিত-ক্লান্ত মুখভঙ্গি
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখি, সেলিম আল দীন - যিনি এদের নিয়ে লিখেছিলেন
অসামান্য এক নাটক ‘গ্রন্থিকগণ কহে’ - বুকে দুই হাত বেঁধে ঠোঁটে মৃদু হাসি
নিয়ে আমাকে পরখ করছেন। আমার মন খারাপ হয়ে যায়, আমার কান্না পায়, কান্না
পায়...’
আমরা সবাই এক এক করে জামিল ভাইয়ের গল্পের খসড়াটা পড়ে উঠলে তিনি বলেন -
‘সুজাতার ওই কাণ্ডটার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো দরকার। আমি ব্যাপারটা
ভাবছি, বুঝেছো। হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু দেখবে সত্যি আমি একটা গল্প লিখে
ফেলেছি। তখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে - পুরো বিষয়টার সঙ্গেই তো তোমরা ছিলে,
বোঝা সহজ হবে - কিভাবে একটা গল্প তৈরি হয়!’
জামিল ভাই দুদিন পর চলে গেলেন, এই দুদিন তিনি বেশ গম্ভীর, চিন্তিত - সম্ভবত
তিনি গল্প নিয়ে ভাবছিলেন। একবার মনে হয়েছিলো - তাকে বলবো কী না যে, আমরা
সুজাতাকে চিনি, ওই দু’তিন গ্রাম পরেই তার বাড়ি। কিন্তু বলি না। তিনি যেহেতু
নিজে থেকে সুজাতার খোঁজ করছেন না, তার নিশ্চয়ই নিজস্ব একটি চিন্তা পদ্ধতি
আছে, সেটার ওপর হস্তক্ষেপ করার ভয়ে বলি না। চলে যাওয়ার সময় জামিল ভাই বলে
গেলেন - ‘লেখা হলে তোমাদের জানাবো, নিশ্চয়ই কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হবে,
তোমরা দেখেও নিতে পারবে।’
আমরা গল্পটি পড়ার জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। প্রায় এক বছর হয়ে
গেছে - গল্পটা এখনও দেখিনি। জামিল ভাইও কিছু জানাচ্ছেন না। অবশ্য এক বছরের
মধ্যেই একটা গল্প লিখে ফেলতে হবে এমন কোনো কথা নেই - গার্সিয়া মার্কেজের
একটা সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম, তিনি নাকি একটা উপন্যাস ত্রিশ বছর ধরে মাথায়
বয়ে বেড়াচ্ছিলেন; কিন্তু জামিল ভাইয়ের মধ্যে যে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া দেখেছিলাম, তাতে মনে
হয়েছিলো - তিনি দ্রুতই লিখে ফেলবেন। এর মধ্যে আমাদের একজন ঢাকায় গেলে জামিল
ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলো, কথায় কথায় গল্পটির প্রসঙ্গ উঠলে তিনি নাকি
বলেছেন - ‘আমি এখনও ভাবছি।’ শুনে আমাদের মনে হয়, নিশ্চয়ই গল্পটা তাকে খুব
ভোগাচ্ছে! তার কাছে গল্প জিনিসটা তো নিছক একটি ‘গল্প’ বলা নয়! আরো কত কিছু
ভাবতে হয় তাকে! তিনি প্রায় প্রতিটি গল্প শুরু করার আগে একটি করে উদ্ধৃতি
দেন - কখনও সংস্কৃত থেকে, কখনও ইংরেজিতে, কখনও এমন কোনো জায়গা থেকে আমরা
কোনোদিন যার নামই শুনিনি।। আমরা প্রায় সময়ই সেগুলোর অর্থ বুঝি না। তার
ভাষাটাও বেশ জটিল লাগে আমাদের কাছে - সত্যি বলতে কি, ওই ভাষার কারণেই তার
গল্পকে খুব ব্যতিক্রমী বলে মনে হয়। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম - কেন তিনি
এরকম উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন আর তার ভাষাটাই বা এমন জটিল কেন? তিনি বলেছিলেন
- দ্যাখো, গল্প জিনিসটা কোনো এলেবেলে ব্যাপার নয়। আমি চাইওনা যে, আমার গল্প
এলেবেলে লোকজন পড়ুক। আমি তো আর হূমায়ূন আহমেদ নই। আর হূমায়ূনের কথাই বা বলি
কেন, আমাদের জেনারেশনের কেউ কেউও তো এরকমই। যেমন? কামালের কথাই ধর। আহমাদ
মোস্তফা কামাল, বুঝেছ তো! ইদানিং সে নিজেকে গল্পকার ভাবতে শুরু করেছে।
গাধাটা বোঝেই না যে, ওর গল্প কোনো গল্পই নয়। কেন? ওর ভাষাটা কি কোনো গল্পের
ভাষা? এই ভাষায় তো রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু কয়েক হাজার লেখক লিখে ফেলেছেন।
তাহলে ওরটা আর নতুন কি হলো? ওর গল্পে দেখবে, ভাষা ভালো নয়, আঙ্গিক সচেতনতা
নেই, কোনোরকম এক্সপেরিমেন্ট নেই। আমরা একুশ শতকে প্রবেশ করেছি, ও দাঁড়িয়ে
আছে উনিশ শতকে। এই গাধাটা আবার নিজেকে গল্পকার মনে করে - চিন্তা করে
দ্যাখো! সাহিত্য সম্পাদকরাও এমন গাড়ল, গাধাটার গল্প ছাপে! আমি ওদের মতো নই;
শুরুতেই তাই উদ্ধৃতি ব্যবহার করে আমি আসলে এই কথাটাই বলতে চাই - তর্জনি
তুলে সাবধান করে দেই - এ গল্প সবার জন্য নয়। আর ভাষা জটিল? তোমাদের মতো
অশিক্ষিতদের কাছে তো সেটা মনে হবেই। ভাষা যদি একটু জটিলই না হলো, যে গল্পটি
পড়বে, সে যদি সহজেই বুঝে ফেললো তাহলে সেটা নিয়ে আর ভাববে কেন? গল্পকে রাখতে
হয় বোঝা আর না বোঝার মাঝখানে। আমার গল্প যারা পড়ে বা আমার নাম যারা বলে বা
আমার যারা পৃষ্টপোষক - বিভিন্ন সাহিত্য সম্পাদক ও লেখকরা, তোমরা কি মনে কর,
তারা আমার গল্প বোঝে? তারা আমার বালটা বোঝে। কিন্তু বোঝে যে না, সেটা বলে
না, লজ্জায়। একজন তরুণ গল্প লিখছে, তারা বুঝতে পারছে না, এটা তো আর বলা যায়
না। ...
(জামিল ভাই একটু উত্তেজিত হলে এসব স্ল্যাং ইউজ করেন, আমরা মজাই পাই।
তাছাড়া, আমাদেরই অতি আপন একজন ঢাকার সাহিত্য জগৎকে এরকম একটি ঘোরপ্যাঁচের
মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন - একদম পরিকল্পনা করে, আর তারা তা বুঝতেই পারছে না,
ভেবে বেশ আমোদ পাই); তো গল্প নিয়ে যিনি এত ভাবেন, তার পক্ষে তো এত সহজে
একটা গল্প লিখে ফেলা সম্ভব নয়! কোন উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে ভালো হবে, কোন
ভাষায় বললে ব্যাতিক্রমী শোনাবে, কিভাবে তৈরী করলে গল্পটিকে বোঝা আর না
বোঝার মাঝখানে রাখা যাবে, কোন স্টাইলে সাজালে কল্পনার উপর বাস্তবের
প্রজেকশন পড়বে - কতোকিছুই না ভাবার আছে! (নাহ! আমাদের দিয়ে লেখালেখি হবে
না, এসবের কিছুই তো জানি না আমরা।) গল্প লেখা কি এত সহজ? কিন্তু আমাদের যেন
তর সইছে না। অন্তত খুব চেনা একটি ঘটনা কিভাবে গল্প হয়ে যায়, জানতে ইচ্ছা
করছে খুব।
আমরা মাঝে মাঝে সলাপরামর্শ করি। জামিল ভাইকে যদি কোনোভাবে সহায়তা করতে
পারতাম! আচ্ছা তাকে চিঠি লিখে আসতে বললে কেমন হয়? এলে না হয় সুজাতা ওরফে
মালতির [অথবা মালতি ওরফে সুজাতা] বাড়িতে নিয়ে যাবো। জামিল ভাই না হয় নিজের
চোখেই সব দেখুক। দেখুক মালতির হাড় জিরজিরে শয্যাশায়ী অসুস্থ বাবাকে, জীর্ণ
খিটখিটে মেজাজের মাকে, একমাত্র কঙ্কালসার ছোট ভাইটিকে, তিনটি ছোট ছোট
বোনকে, বিধবা এক পিসিকে। দেখুক এই সংসারটা কিভাবে টিকে আছে, লোকগুলো কিভাবে
বেঁচে আছে, উপার্জনহীন সংসারে কিভাবে এতগুলো লোকের খাবার জোটে। এ অবস্থায়
মালতির সুজাতা হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কি-ইবা উপায় ছিল! গ্রামের বখাটে ছেলেরা
যখন ওদের ভাঙাচোরা বেড়া আরো ভেঙে-কেটে ভেতরে ঢুকে দেখেও না দেখা, বুঝেও না
বোঝার ভান করে শুয়ে থাকা স্বজনদের সামনে ওর শরীর নিয়ে সন্ত্রাস করতো, তখন
চেনা অচেনা পুরুষের টাকার ডাকে সাড়া দেওয়াটা সুজাতার খুব অন্যায় হচ্ছে কিনা
- জামিল ভাই নিজেই বুঝে দেখুক। কিন্তু এসব কি তাকে বলা যাবে? যা মেজাজ তার!
মাঝে মাঝে আমাদের বলতে ইচ্ছে করে - জামিল ভাই, আমরা এসব কিছুর মধ্যে কোনো
গল্প খুঁজে পাচ্ছিনা। এ বড়ো সাদামাটা একঘেঁয়ে হাহাকারের জীবন, এ বড়ো রূঢ়
বাস্তবতা, এর মধ্যে আমরা কোনো ‘কল্পনা’ খুঁজে পাচ্ছি না। আর কল্পনা না
থাকলে সেখানে এই বাস্তবের প্রজেকশন ঘটবে কি করে? আসলে এখানে কোনো গল্প আছে
বলে আমাদের মনেই হয় না। কিন্তু এসব আমরা হাসিব জামিলকে বলবো না। বলার সাহসই
নেই। আমরা গল্পের বুঝিটা কি যে বলবো?
বরং আমরা অপেক্ষা বা প্রতীক্ষা করে থাকি গল্পটির জন্য। একটা না দেখা
বাস্তবতার ওপর হাসিব জামিল কিভাবে কল্পনার প্রজেকশন ঘটান, আমাদের অতি চেনা
একটা ঘটনাকে তিনি কিভাবে, কতটা জটিলভাবে বর্ণনা করে ‘বোঝা না বোঝার
মাঝখানে’ নিয়ে যান - দেখার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি।
রচনাকাল : ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৯ |
| |
 |
|