অফিস থেকে বেরিয়ে যদিও ক্লান্তি ও অবসাদে শরীর ও মন ভরে থাকে, আর
অনন্তকাল চুপচাপ শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে- তবু বাসায় ফিরতে ভালো লাগে
না। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বলে আর এই বিশাল ঝলমলে শহরের কোথাও তার
জন্য কোনো আনন্দিত ঘটনা ঘটছে না বলে অবশেষে বাসায়ই ফিরে আসতে হয়
এবং ফিরে মন খারাপ হয়ে থাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য। অবসাদ তীব্র হয় আরো,
ক্লান্তি হয় আরো গভীর। বাসায় ফিরে করার নেই কিছু, সময় কাটতে চায় না
কোনোভাবেই। এ বাসার সদস্য সংখ্যা অল্প। বড়ো ভাই-ভাবী, তাদের আট
বছরের বাচ্চা আবীর, কাজের মেয়ে পারুল আর সে- সাকুল্যে এই পাঁচজন।
ভাইয়ের সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় হয়ই না বলতে গেলে। এক ধরনের দূরত্ব
রয়েছে দুজনের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই, দুজনেই চাপা স্বভাবের। ভাবী
বাসার কাজে ব্যস্ত, অথবা ভাইয়ের সেবায়, কি বাচ্চার পরিচর্যায়, কি
টিভি দেখায়। অবশ্য কথাবার্তা যেটুকু ওই ভাবীর সঙ্গেই, টুকটাক
গল্পস্বল্প, মাঝে-মধ্যে ইয়ার্কি-দুষ্টুমিও। সম্পর্কটা মিশ্র ধরনের।
সিনেমা-নাটকের মতো দা-কুমড়া যেমন নয়, তেমন তুই-তোকারি বন্ধুত্বও
নয়। ভাবী ভালো-মন্দ মিলিয়ে মোটামুটি ইতিবাচক মানুষই, সেই অর্থে তার
পছন্দেরও। সে নিজেও ওরকম- ভালো-মন্দে মেশানো। অনেকদিন সে ভাই-ভাবীর
সঙ্গে ছিলো না- ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় প্রায় পাঁচ বছর হলে
থেকেছে। হল ছেড়ে বাসায় ওঠার সময় সংকোচ ছিলো। এতদিন পর হঠাৎ
ভাই-ভাবীর সাজানো-গোছানো ছিমছাম সংসারে নিজেকে উটকো ঝামেলার মতো
লাগছিলো। ফলে কথাটা তাকে পাড়তে হয়েছিলো এভাবে-
হল তো ছাড়তে হবে ভাবী, কোথায় ওঠা যায় বলতো! ব্যাচেলরদের তো কেউ
বাসা ভাড়া দিতে চায় না।
ভাবী রহস্যময় হেসে বলেছিলো- এখনই বাসা খুঁজছো নাকি? তুমি খুব
অদ্ভুত তো! লোকে শুনলে বলবে কি? আর এখনই বাসা খোঁজার কি মানে হলো?
চাকরিবাকরি পেলেও না হয় কথা ছিলো!
তাহলে থাকবোটা কোথায়?
থাকবে কোথায় মানে? এখানে থাকবে।
তার তখন একটু লজ্জাই লাগলো। সে তো আসলে ভাবীর কাছে থেকে এই কথাটিই
শুনতে চেয়েছিলো। কিন্তু বড়ো নগ্নভাবে ধরা পড়ে গেলো সে। এভাবে
আদিখ্যেতা না দেখালেও চলতো।
বাসায় ওঠার সমস্যা তো মিটলো, কিন্তু প্রথম কয়েকদিন মানিয়ে নিতে
সমস্যা হলো খুব। হলে থেকে অভ্যাসটাই খারাপ হয়ে গেছে। হলের জীবনটা
খুব অদ্ভুত- যারা সেই জীবনযাপন করেনি তারা বুঝবেই না। কতিপয়
সৌভাগ্যবান তরুণ-তরুণীর জীবনেই এই অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা হয়। এক
অদ্ভুত নিয়ম-কানুনহীন, বাধা-বন্ধনহীন, মুক্ত, স্বাধীন জীবন।
পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের গণ্ডি ছিঁড়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ বুঝে
নেয়া ছেলেমেয়েরা তবু অবাধ স্বাধীনতার অপব্যবহার করে না। অন্তত সে
করেনি। রুমে ফেরার তাড়া ছিলো না, নির্দিষ্ট সময় বাঁধা ছিলো না
কোনোকিছুর, তবু সে কখনো খুব বেশি অনিয়ম করেনি। হয়তো টুকটাক ইচ্ছে-
যেমন রাত তিনটের সময় চা খেতে চানখাঁরপুল চলে যাওয়া- পূরণ করতো।
সেটা বড়ো কথা নয়, বড়ো কথাটি হচ্ছে- নিজেকে মুক্ত মনে হতো। আর
তাছাড়া, সব কাজেই এক বা একাধিক সঙ্গী জুটে যাওয়াও তো কম কথা নয়।
হলের জীবন সব সময়ই প্রাণ-প্রাচুর্যপূর্ণ। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে
এসে হলবাসী ছেলেরা একে অপরের আপনজন ও নিকটাত্নীয় হয়ে ওঠে। সেও
ওসবের অংশ ছিলো। সময় কাটানোটা তখন কোনো সমস্যা ছিলো না, কোনো না
কোনোভাবে কেটে যেতোই। সে বরাবরই পড়াশোনার মনোযোগী, সেই অর্থে কিছু
সময় কাটতো পড়াশোনায়, বাকিটা কার্ড খেলে, কি ঘুরে বেড়িয়ে, কি আড্ডা
দিয়ে। বাসায়ও মাঝে মাঝে আসা হতো, কিন্তু মা-র মৃতু্যর পর থেকে
বাসার প্রতি টান তেমন নেই। আসলে, সে যে বাসা ছেড়ে হলে গিয়ে উঠেছিলো
তা এই মা-র মৃতু্যর জন্যই। কিছুতেই সহ্য হচ্ছিলো না মা-র
অনুপস্থিতি। তারপর পাঁচ বছর হলে কেটে গেলো। হল ছাড়ার পর প্রথম
প্রথম বাসায় তিন-চারটা বন্ধ কলাপসিবল গেট তার মধ্যে কারাগারে বন্দী
আসামির অনুভূতি এনে দিতো। এখনো মাঝে-মধ্যে দেয়। দম আটকে আসে,
হাঁসফাঁস লাগে, কি করবে ভেবে পায় না। এই কারাগারে সময় কাটে না তার,
সময় কাটে না।
বড়ো ভাই-ভাবী খুব নিয়মানুবর্তী দশ-টার মধ্যে খেয়েদেয়ে এগারো-টার
মধ্যে ঘুম। তখন বাসাটা একদম নিঝুম। কেবল রান্নাঘর থেকে পারুলের
টুকটাক কাজের শব্দ পাওয়া যায়, তাও খুব বেশি হলে বারো-টা পর্যন্ত।
তারপর একেবারে সুনসান নীরবতা। অথচ তার ঘুম আসে না। বহুদিনের পুরোনো
অভ্যাস- রাত জেগে পড়াশোনা করা। ছাত্রজীবনে, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে
পড়তে বসতো, তখন যতটা মন বসতো পড়ায়, অন্য সময় তার ছিটেফোঁটাও নয়। সে
তাই অপেক্ষা করে থাকতো ওই নিঝুম রাতের। শুধু কি পড়াশোনা, নিজেকে
নিয়ে একটু ভাবা, নির্জনে একটু গান শোনা- সব ওই গভীর রাতেই জমতো
বেশি! রাত জাগতো বলে কোনোদিন সে সকালের ক্লাসটা ঠিকমতো ধরতে
পারেনি- দেরি হতোই। অথচ এখন দ্যাখো, অনিবার্যভাবেই ঠিকঠাক সময়ে
অফিসে পৌঁছতে হয়- এক মিনিটও দেরি হয় না। চাকরি বড়ো খারাপ জিনিস-
মানুষকে ভেতর থেকে ছোট করে দেয়। প্রতিদিন বসের ধমকের ভয়, কাজের
চাপ, টেনশন, সিনসিয়ারিটির পুরস্কার হিসেবে প্রশংসাহীন বাড়তি
দায়িত্ব, একটি দিনের অধিকাংশ সময় এমন একটি কাজের জন্য সমস্ত মেধা
ব্যয় করা যার বিনিময়ে নিজের কোনো প্রাপ্তি নেই- এসবকিছুই আসলে ছোট
হয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু উপায় নেই। এই
তার জীবন। ছাপোষা, আপোসকামী। সারাজীবন সে কেবলই সবার কাছে ভালো হতে
চেয়েছে। ছোটবেলা থেকেই দুষ্টুমি করে মা-বাবাকে ব্যতিব্যস্ত করে
তোলেনি, স্কুলে নিয়মিত পড়া শিখে গেছে, সবাই মিলে যখন বদরাগি
মাস্টারের বেত খেয়েছে সে তখন একা বেঁচে গেছে পড়া শেখার কারণে-
সহপাঠীদের সহযাত্রী না হওয়ায় সবাই তাকে বয়কট করেছে। সব জায়গায়ই সে
ছিলো খুব ভালো ছেলে- বাসায়, স্কুলে। একটু বড়ো হয়েও পাড়ার সমবয়সী
ছেলেরা যখন গলির মোড়ে আড্ডা মারে, রেস্টুরন্টে চা খেয়ে বিল না দিয়ে
বেরিয়ে আসে, বইমেলায় গিয়ে বই চুরি করে আবার ঝগড়া বাধায়, মেয়েদের
খামোখা জ্বালিয়ে মারে- সে তখন বইপত্র নিয়ে মাথা নিচু করে যাচ্ছে
টিচারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে। পাছে লোকে খারাপ বলে, এজন্য কখনো
মাথা উঁচু করে তাকাতো না পর্যন্ত। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ও তার
জীবনযাপন ছিলো নিতান্তই নিরীহ। তুমুল আড্ডায় নেই, অনুষ্ঠানে নেই,
ঝগড়াঝাঁটিতে নেই, শুধুমাত্র মাথা গুঁজে পড়াশোনা, বন্ধুদের
অদ্ভূতপূর্ব কাণ্ড-কারখানায় চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকা,
অধ্যাপকদের আদর-স্নেহে, সহপাঠীদের বিদ্রুপ-ঠাট্টায় তার সময় কেটে
গেছে। হলে থাকতে রুমমেট ও অন্যদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই একটু
ঘনিষ্ঠতা জন্মেছিলো- সবারই জন্মে। কিন্তু তাকে ঠিক বন্ধুত্ব বলা
যায় না। সে তো দেখেছে- তার সহপাঠীদের মধ্যে যারা পরস্পরের বন্ধু
ছিলো তারা গল্পে-আড্ডায় কতো দিনরাত কাটিয়ে দিয়েছে! কী যে এত গল্প
করতো তারা, কী যে এত কথা জমে থাকতো পরস্পরের জন্য- মাঝে-মধ্যে ভেবে
সে অবাক হয়ে যেত। অথচ তার কখনো তেমন কোনো অংশগ্রহণ ছিলো না কোথাও।
কোনো কথা জমে ছিলো না কারো জন্য। সত্যিই কি ছিলো না? বরাবর সে
ঘটমান ঘটনাসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে চেয়েছে; বেদনা থেকে, কষ্ট ও
ক্লান্তি থেকে দূরে সরে থাকতে চেয়েছে। তবু কি থাকা গেছে গা
বাঁচিয়ে? কতো বেদনার্ত মুহূর্ত এসেছে তার জীবনে; কতো অবহেলা,
বিদ্রুপ, কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তাকে- যেমন প্রতিটি মানুষকেই করতে
হয়- তার কি কোনো হিসেব-নিকেশ আছে? অথচ সেসব শেয়ার করার মতো মানুষও
সে খুঁজে পায়নি কোনোদিন। একা, নির্বান্ধব, প্রেমহীন, নিঃসঙ্গ জীবন
তার। যাবতীয় কথা তার নিজের সঙ্গেই- ওই গভীর রাতে। একা একা
হিসেব-নিকেশ করে সে কখনো কখনো। ছোটবেলা থেকে ভালো ছেলে হিসেবে
পরিচিতি; প্রতিভা-মেধা এসব খুব বেশি না থাকলেও চেষ্টার জোরে বরাবর
ভালো রেজাল্ট, শিক্ষকদের স্নেহ-ভালবাসা, সহপাঠীদের ঈর্ষা- এসবই তো
জীবনের খাতায় ইতিবাচক যোগ। এখন চলে যাওয়ার মতো এটা চাকরিও পাওয়া
গেলো। একজন ছাপোষা সাধারণ মানুষ জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কি চায়? তার
আর কি-ই বা চাওয়ার ছিলো! হয়তো তারও একদিন সংসার হবে, ভাগ্য ভালো
হলে একটা লক্ষ্নী- কম্প্রোমাইজিং-সুন্দরী মেয়ে তার বউ হবে, সন্তান
হবে, চাকরিতে প্রমোশন হবে, তার বয়স হবে। এই তো! তারপর একদিন চলে
যাওয়া। এই তো! জীবন তো এরকমই- এর চেয়ে বেশি আর কি ঘটার আছে! তবু
কোনো কোনো মাঝরাতে তার চোখ ভিজে ওঠে। মনে হয়, আরো কিছু যেন পাওয়ার
ছিলো, কি যেন পাওয়া হয়নি। কি পাওয়ার ছিলো? কি পাওয়া হয়নি? মাঝরাত
বড়ো অদ্ভুত জিনিস- খুব এলোমেলো করে দেয় সবকিছু- নইলে তার এমন মনে
হবে কেন? সে সত্যিই জানে না, বুঝতে পারে না, আর কী পেতে পারতো সে।
জানে না বলে আরো কষ্ট হয়; সময় যেন শ্লথ হয়ে আসে। ঘুম আসে না, সময়ও
কাটে না- কী যে কষ্টকর একেকটা রাত! কতোরকমভাবে মানুষ সময় কাটায়-
টিভি দ্যাখে, বই পড়ে, আড্ডা দেয়- তার এগুলোর কোনোটাই নেই। বরবার
একই রুটিন- সকাল বেলায় অফিস, সন্ধ্যাবেলায় বাসা। যাওয়ার কোনো জায়গা
নেই, কোনো শখ নেই, নেশা নেই। বাসায় ফিরে সবাই ঘুমানোর আগ পর্যন্ত
সময়টা প্রধানত আবীরের সঙ্গে কাটিয়ে, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আকাশ-পাতাল
ভাবাভাবি। এই তার জীবন!
ভাবী মাঝেমধ্যে এ নিয়ে কথা বলে-
এভাবে তো তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। তোমার কোনো বন্ধু নেই? ওদের বাসায়
আসতে বলো, নইলে তুমি বেড়াতে যাও। এভাবে একটা ইয়াং ছেলের সময় কাটে?
বই পড়ো না, টিভি দেখো না, তোমার তো কোনো হবিও নেই।
আছে তো ভাবী।
আছে! ও হ্যাঁ- ভাবী হাসে- অদ্ভূত হবি! কিন্তু ওতে তো আর সময় কাটে
না!
অদ্ভুত হবি! হয়তো। তবু ওটাই তার একমাত্র হবি। তার একটা প্রমাণ
সাইজের মাটির ব্যাংক আছে। সেই ব্যাংকে সে নতুন টাকা জমায়। নতুন
টাকা অথবা কয়েন। ব্যাংকে পাঁচশো টাকার নতুন নোট থেকে শুরু করে সিকি
আধুলি সব আছে। বহুদিন ধরে জমাচ্ছে সে। অনেক টাকা হলো বোধ হয়।
পরিমাণটা অবশ্য বড়ো কথা নয়, ব্যাপারটা অনেকখানিই নেশার মতো। নতুন
কড়কড়ে টাকা তো সব সময় আসে না। এলে বড়ো যত্নে, গভীর মমতায় সে এনে
ভাঁজ করে ব্যাংকে ফেলে। মাঝে-মধ্যে ভাবীও কন্ট্রিবিউট করতে চায়।
নতুন টাকা এলে নিয়ে এসে বলে- 'এই যে তোমার সম্পদ। রাখো।' সে রাখে
না। রাখলেও বিনিময়ে সমান টাকা ফেরত দেয়। মাঝে-মধ্যে আবীরও আসে-
'কাক্কু এই যে নতুন টাকা'- সে নিয়ে দ্বিগুন ফেরত দেয়। ঐ ব্যাংক তার
নিজস্ব। একেবারে একান্ত। সেখানে সে অন্য কারো অংশগ্রহণ চায় না।
ভাবী মাঝে-মধ্যে এ নিয়ে হাসাহাসি করে- 'এমন শখের কথা জীবনে কোনোদিন
শুনিনি। তুমি পারোও!' বাপারটা নিয়ে হাসাহাসি তার একদম পছন্দ নয়।
মানুষের কতোরকম শখ থাকে। কেউ স্ট্যাম্প জমায়, কেউ বই বা ক্যাসেট
কালেক্ট করে, বড়লোকরা অ্যান্টিকস বা পেইন্টিংস সংগ্রহ করে- এর
কোনোটাই যদি দোষের না হয়, তাহলে তার হবিটাই শুধু হাসাহাসির বিষয়
হবে কেন? সে কৃপণ নয়, সঞ্চয়ের জন্য সে এটা করে না। প্রতি মাসে বেতন
পেয়েই সে দেদারসে খরচ করে- ভাই-ভাবী, আবীরের জন্য এটা-ওটা কেনে,
সংসারের খরচ দেয়। অতএব কার্পণ্যের অপবাদ তাকে দেওয়া যায় না। নিছক
শখের বশেই সে মাটির ব্যাংকে নতুন নোট জমায়। গভীর মমতা ও ভালোবাসায়।
এ নিয়ে আসলে তার একটা গোপন পরিকল্পনা আছে। সে শুনেছে- বাসর রাতে
নাকি বউকে কিছু না কিছু উপহার দিতে হয়; সে এই ব্যাংকটি উপহার দিয়ে
বলবে- গুণে দ্যাখো। কোনো মেয়ে নিশ্চয়ই বাসর রাতে এমন অভিনব উপহারের
কথা ভাবে না! এটা পেয়ে সেই অচেনা মেয়েটি বিস্ময়ে কী-রকম অভিভূত হয়ে
যাবে- ভেবে তার লজ্জাই লাগে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে তখন ব্যাংকটার
দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিন্তু এভাবে আর কতোটুকুই বা সময় কাটে? অজগরের মতো একটা রাত পড়ে
থাকে তার সামনে- কিছুই করা হয় না। তার মনটাই কেবল খারাপ হয়ে যায়।
সে কি ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে? মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে- এই
গতানুগতিক রুটিনের বাইরে ব্যতিক্রমী কিছু করে ফেলতে। কি হয়, একদিন
অফিস থেকে বেরিয়ে আর বাসায় না ফিরলে? কিন্তু ওই পর্যন্তই; বাসায় না
ফিরলে সে যাবেটা কোথায়- এই চিন্তাই তাকে ফিরিয়ে আনে।
কিন্তু একদিন- দিনটা ছিলো একটু অন্যরকম- সে সত্যি সত্যি অফিস শেষে
বাসার পথ না ধরে অন্যদিকে হাঁটা দেয়। সারাদিনই মাথাটা ঝিমঝিম
করছিলো- দুপুরের পর সেটা বেড়ে গেলো। মাইগ্রেন- সে বুঝতে পারে।
সন্ধ্যায় যখন সে অফিস থেকে বেরোলো, তখন বেশ তীব্র ব্যথা।
মাইগ্রেনের কষ্ট সে সহ্য করতে পারে না। এত তীব্র ব্যাথা! আলো, শব্দ
কিছু সহ্য হয় না। পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্যটিকেও বীভৎস বলে মনে হয়।
সবচেয়ে প্রিয় খাবারটি খেলেও বমি হয়ে যায়। আর খুব অসহায় লাগে। সে
সেদিন বাসায় না ফিরে ফোন করে বলে দিলো- ফিরতে দেরি হবে। তারপর
পার্কে গিয়ে শুয়ে রইলো কিছুক্ষণ। একা একা হাঁটলো কিছুক্ষণ মিন্টো
রোডের নির্জনতা ঘিরে।
সে বাসায় ফিরলো রাত বারোটার দিকে। ভাই-ভাবী যথারীতি ঘুমিয়ে পড়েছে।
পারুল দরজা খুলে দিলে সে সোজা গিয়ে শুয়ে পড়লো। এত খারাপ লাগছে যে
কাপড়-চোপরও খুলতে ইচ্ছে করছে না। তার এখন কান্না পাচ্ছে। তার কেন
এত কষ্ট? কেন এ রকম একটি দুঃসহ রোগ তাকে বহন করতে হচ্ছে? যন্ত্রণায়
ছটফট করতে করতে সে ভাবছিলো। কিছুক্ষণ পর পারুলের কণ্ঠ শোনা গেলো-
ভাইয়া, ভাত খাবেন না? টেবিলে ঢেকে রেখে তুমি শুয়ে পড়ো। আমি পরে খেয়ে নেবো।
আআর কোনো কথা নেই। তার ব্যথাটা বোধ হয় সীমা ছাড়িয়ে যাবে, মাথাটা
ছিঁড়ে পড়বে। কিছুক্ষণ পর আবার পারুলের কণ্ঠ-
আপনার কি শরীর খারাপ ভাইয়া?
হ্যাঁ পারুল। মাথাব্যথা। তুমি জেগে আছো কেন, শুয়ে পড়ো।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর বোঝা গেলো, পারুল শোয়নি। ভাইয়া, চা বানিয়ে দেই? খেলে ভালো লাগবে।
না, লাগবে না। তুমি শুয়ে পড়ছো না কেন? আমার জন্য জেগে থাকতে হবে
না।
ককিন্তু পারুল বোধহয় আজকে কথা শুনবে না। আর জ্বালিয়ে মারবে। দরজায়
দাঁড়িয়ে বকবক করবে। কিছুক্ষণ পর যথারীতি আবার পারুল-
মাথায় পানি ঢেলে দেবো ভাইয়া?
না লাগবে না।
এএবার ও ঘরে এলো- মাথা টিপে দেই, ভাইয়া? আপনি কেমন ছটছট করছেন!
সে টের পেলো, পারুলের গলা কেঁপে যাচ্ছে আর তার চোখ ভিজে উঠছে। এই
রকম কষ্টের সময় মমতাময় একটি স্পর্শের অপেক্ষা তার বহুদিনের। তাই
বলে তো আর পারুলকে অনুমতি দেওয়া যায় না! সে বরং সচেতনভাবেই একটা
দুরত্ব বজায় রাখে পারুলের সঙ্গে। সোমত্ত কাজের মেয়ের সঙ্গে
গৃহকর্তার কুকীর্তির কাহিনী তো কতোই শোনা যায়! পারুল শুধু সোমত্তই
নয়, সুন্দরীও। আর এত পরিপাটি থাকে সব সময় এবং এত শুদ্ধ ভাষায় কথা
বলে যে, কেউ কেউ ওকে এ বাসারই মেয়ে বলে ভুল করে। অতএব কোনোরকম
রিস্ক নেওয়া উচিত নয়। সে তো ভালো ছেলে! এসব সম্ভাবনা থেকে যথাসম্ভব
নিজেকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবেই সে পারতপক্ষে পারুলের সঙ্গে কথা
বলে না। এ জন্যই 'মাথা টিপে দেওয়ার' সাহস সঞ্চয় করতে এতটা সময়
লেগেছে ওর। কিন্তু ওর গলায় ওই মমতাময় উৎকন্ঠা তার চোখ ভিজিয়ে তোলে।
মনে হয় পৃথিবীতে সে বড়ো একা, কেউ নেই তার অসহায় মুহূর্তে সঙ্গ
দেওয়ার জন্য। সে এবার উঠে বসে। মৃদু হেসে বলে- 'না পারুল, লাগবে
না। তেমন কিছু হয়নি।' তারপর বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসে।
বমি হয়ে যাওয়ার ভয়ে খুব একটা খেতে পারে না। পারুলকে ঠায় দাঁড়িয়ে
থাকতে দেখে- 'তুমি শুয়ে পড়ো, ঘুমোলেই আমার ব্যাথা সেরে যাবে'- বলে
সে রুমে ফিরে যায়। টের পায়- পারুল ঘুমোয়নি; তার দরজায় ওর ছায়া। তার
ব্যথা বেড়ে চলেছে- প্রচণ্ড যন্ত্রণার ঘোরে ডুবে যেতে যেতে এই
মমতাময় মেয়েটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার চোখ ভিজে ওঠে আবার।
সপ্তাহখানে পরের কথা। অফিস থেকে ফিরে সে দেখে- বাসার পরিস্থিতি বেশ
উত্তেজনাপূর্ণ। কি কারণ? কারণ- পারুল দুপুরে দোকানে যাওয়ার কথা বলে
বেরিয়ে আর ফিরে আসেনি।
হারিয়ে গেলো না তো?
ননা হারায়নি- ভাবী বলে- পালিয়েছে।
পালিয়েছে!
হ্যাঁ, আমার দুটো শাড়ি, তোমার ভাইয়ের তিনটা শার্ট, আবীরের খেলনা,
আরো কতো কী যে নেই!
তার বিশ্বাস হতে চাইলো না। অবশ্য বিশ্বাস না হওয়ার পেছনে
যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছিলো না, তবু ঘটনাটিকে অবিশ্বাস্য বলে মনে
হচ্ছিলো তার।
ররাতের খাওয়া শেষে ভাবী যখন নিজেই চা বানিয়ে নিয়ে এলো তার জন্য, সে
বললো- ভাবী আমার মাটির ব্যাংকটা পাওয়া যাচ্ছে না। পারুল বোধহয় ওটাও
নিয়ে গেছে।
বলতে বলতে তার ঠোঁটে বিমূঢ়-ব্যাখ্যাতীত একটুকরো হাসি ফুটে উঠেছিলো।
অক্টোবর, ১৯৯৯ |
|
|
| |
 |
|