Page loading ... Please wait.

বাজনদার
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
দু-বছর আগে যখন প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নেমেছিলো জামিল তখন কল্পনাও করেনি এত অল্প সময়ের মধ্যে তার সামনে কোটিপতি হবার সম্ভাবনা দেখা দেবে। অথচ অভাবিতভাবে তাই ঘটেছে। সম্ভাবনা নয়, প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়, আর মাস ছয়েকের মধ্যে সে কোটিপতি হতে যাচ্ছে। অবশ্য এ দু-বছরে অনেক ঝড় গেছে তার ওপর দিয়ে _ অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে, বাবা-মা-ভাই-বোন-আত্নীয়স্বজনদের কাছ থেকে বিরূপ আচরণ পেতে হয়েছে _ কিন্তু এখন এসবের কিছুই মনে পড়ছে না, চোখর সামনে কেবল ঝুলে আছে কোটিপতি হবার সম্ভাবনাটুকু। আর মাত্র কয়েকটা মাস, তারপরই তার চৌদ্দপুরুষ যা চোখেও দেখেনি সে তাই পেতে যাচ্ছে। কোটি টাকা! ভাবতেও দম বন্ধ হয়ে আসে।

জামিল যে দ্রুত বড়লোক হওয়ার জন্য ব্যবসায় এসেছিলো তা নয়, সে চেয়েছিলো জীবনটাকে পাল্টে ফেলতে। সে এবং তার ভাইবোনেরা তাদের বাবার জীবনেরই রুগ্ন উত্তরাধিকারীত্ব বহন করে চলেছিলো, এটা তার ভালো লাগছিলো না। অন্তত একজনের এই ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার বলে মনে হয়েছে তার বরাবর। বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসাইটে অধ্যাপক, দেশজোড়া তাঁর খ্যাতি, মা একটা নামী স্কুলের শিক্ষক, বড় ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে না পেরে বিসিএস দিয়ে সরকারী কলেজে ঢুকে গেলেন, বিয়ে করলেন এক সহকর্মীকে, মানে ভাবীও শিক্ষক, বোনটা ঢুকলো এক বিখ্যাত প্রাইভেট কলেজে, তার বিয়ে হলো বাবার এক বন্ধুর ছেলের সঙ্গে, সেই ছেলে আবার বুয়েটের শিক্ষক _ এর মানে দাঁড়ালো এক পরিবারের সবগুলো সদস্য শিক্ষক। এরকম পরিবার এ দেশে আর একটিও আছে কী না সন্দেহ। জামিল চেয়েছিলো অন্য কোনো ধরনের চাকরিতে ঢুকতে, কিন্তু ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বেরুতে না বেরুতে প্রায় অযাচিতভাবে অফার পেলো এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে; তখনও চাকরি-বাকরি-ক্যারিয়ার নিয়ে সুনিদিষ্টভাবে ভাবেনি সে কিছু, অন্য কিছু করতে হবে _ এইটুকু কেবল ভাবছিলো, তখন এই অফার পেয়ে নিছক সময় কাটানোর জন্য, কিংবা অন্য কিছু পাওয়ার আগের সময়টা বেকার না থাকার জন্য ঢুকে পড়লো, আর ঢুকেই আটকে গেলো। ওখানে জয়েন করার সিদ্ধান্তটি যে ভুল ছিলো, সেটা সে বুঝতে পারলো বেশ কিছুদিন পরে। একবার এই পেশার আনন্দ এবং স্বাধীনতার সাধ পেয়ে গেলে অন্য কোনো পেশায় যাওয়া কঠিন। অন্যদিকে শিক্ষকতাই যদি করতে হবে তবে সেই চিরপরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয় কেন, এ কথাও সে ভেবেছে অনেকদিন, কিন্তু অর্থনৈতিক কারণেই আর ওদিকে যাওয়া হলো না। ওখানে সে বেতন পেতো অনেক বেশি, এমনকি গত সাত বছরে বেতন বাড়তে বাড়তে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিলো যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করা তার বন্ধুদের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি। একবার এত টাকা আয় করার অভ্যাস হয়ে গেলে আবার অল্পতে ফিরে যাওয়াও কঠিন। নইলে, চেষ্টাচরিত্র করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়া যেতো। তার রেজাল্ট ভালো, বাবার পরিচিতিটাও একটা বাড়তি সুবিধা, ডিপার্টমেন্টে দলমত নির্বিশেষে সব শিক্ষকেরই স্নেহের পাত্র ছিলো সে, ঢুকতে চাইলে কেউ বিরোধিতা করতেন না। তো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডাকসাইটে অধ্যাপকের দুই পুত্র কন্যা কলেজ শিক্ষক, আরেক পুত্র একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক _ এই ঘটনাকে পিতার জীবনের রুগ্ন উত্তরাধিকারীত্ব ছাড়া আর কীই-বা নাম দেয়া যায়! আর তাছাড়া সব মিলিয়ে পারিবারিক জীবন কাঠামোটিকে জামিল কোনোদিন পছন্দ করতে পারেনি। বাবা-মা সারাজীবন পাই-পয়সা হিসেব করে চলেছেন, ছেলেমেয়েদের একটা শখ মেটানোর আগে দশবার করে ভেবেছেন, অনেক সময় শখ পূরণও হয়নি, ছাত্রজীবনে একটা কম্পিউটারের জন্য কতই না শখ ছিলো, কিন্তু বেশি দামের জন্য বাবা-মা নানা অজুহাতে তাকে নিরুৎসাহিত করেছেন। তার ছেলেমেয়ের জীবনেও এমন ঘটনা ঘটুক সে তা চায়নি। যদিও আর্থিকভাবে সে অনেক ভালো অবস্থায় ছিলো, তবু সেটাকে যথেষ্ট বলে মনে হয়নি তার কাছে। ইচ্ছে করলেই একটা গাড়ি কেনা যায় না, শহরে একটা ফ্ল্যাট বা প্লট কেনা যায় না _ এরকম অবস্থাকে ভালো বলে বিবেচনা করেনি সে। কিন্তু যা-ই ভাবুক, ইচ্ছে করলেই তো এই জীবন পাল্টে ফেলা যায় না, চাইলেই বড়লোক হওয়া যায় না, সে তাই পরামর্শ চাইতে গেলো সহপাঠী ব্যবসায়ী বন্ধু রকির কাছে। রকি পৈত্রিক সূত্রে ব্যবসায়ী, টাকা পয়সা বাড়ি গাড়ির কোনো হিসাব নিকাশ নেই ওদের। সব শুনে প্রথমেই রকি বললো,

চাকরি ছাড়তে পারবি?
চাকরি ছাড়ার কথা জামিল ভাবেনি, ভেবেছিলো পাশাপাশি কিছু করার কথা। নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থাটি কি এত সহজে ছাড়া যায়? সে তাই জিজ্ঞেকস করে,
চাকরি ছাড়তে হবে কেন?
ব্যবসা করতে হলে ওটা ছাড়তে হবে। পিছুটান রেখে ব্যবসা হয় না, সব ছেড়েছুড়ে সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে না পড়লে কোনোদিনই ভালো ব্যবসায়ী হতে পারবি না। চাকরি করলে ঢিলেমি আসবে, ভাববি ব্যবসায় সফল না হলেও অসুুিবধা নেই, চাকরি তো আছেই, দিন তো চলে যাচ্ছে। কিন্তু যখন দেখবি সফল হওয়া ছাড়া তোর কোনো উপায় নেই, ব্যর্থ হওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া তখন জান প্রাণ দিয়ে খাটবি।
কিন্তু চাকরি ছাড়লেই যে সফল হওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা কি?
কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু দোস্ত, বড়লোক হতে চাইলে তো রিস্ক নিতেই হবে। ঝুঁকি ছাড়া ব্যবসা? অসম্ভব।
কিন্তু আমার তো টাকা পয়সা নেই, ইনভেস্ট করবো কোত্থেকে?

সেটা আপাতত তোর না থাকলেও চলবে। আমি নতুন একটা ব্যবসা শুরু করছি, তোকে ওয়ার্কিং পার্টনার করে নিতে পারি, লাভ-ক্ষতির থার্টি পার্সেন্ট পাবি। পার্টনার না হলেও আমার চলে, হলে সুবিধা। আমি তোর জন্য এতটুকু করতে পারি। তবে সব কাজ তোর একা হাতে করতে হবে, আমি বড়জোর ইনস্ট্রাকশন দিতে পারি। একা কাজ করতে গিয়ে আবার বিরক্ত হওয়া চলবে না, যেহেতু ইনভেস্টমেন্ট আমার, তুই ওয়ার্কিং পার্টনার, তোকেই কাজ করতে হবে। আর যেহেতু তুই পার্টনার, তোকে কোনো বেতন দেয়া হবে না, নিজ খরচে চলতে হবে। প্রপোজালটা নিয়ে ভেবে দ্যাখ, পছন্দ হলে তাড়াতাড়ি জানাবি।

এই প্রস্তাব নিয়ে একনাগাড়ে সাতদিন ভেবেছিলো জামিল। বাবার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ধমক খাওয়ার পর একাই সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার ছিলো। খুব কঠিন সময় গেছে সেটা। চাকরিজীবী পরিবারের ছেলেদের জন্য একটা ভালো চাকরি ছেড়ে দিয়ে অনিশ্চয়তার দিকে পা বাড়ানো যে কত কঠিন ব্যাপার সেটা শুধু তারাই জানে। তাছাড়া পুরো পরিবারের দায়িত্ব ছিলো তার কাঁধেই, সেটাও একটা দুশ্চিন্তা আর পিছুটান হয়ে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছিলো। বাবা-মার পেনশনের টাকার ওপর ভরসা করে সংসার চালানো যায় না, বড় ভাই স্ত্রী-পুত্রকন্যা নিয়ে মফস্বলবাসী এবং নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত _ তার ওপর সাময়িকভাবে নির্ভর করারও প্রশ্ন ওঠে না, বাবার সূত্রে পাওয়া ইউনিভার্সিটির কোয়ার্টারও ছেড়ে দেয়ার সময় হয়ে এসেছিলো, বউ আছে বাচ্চা আছে, বাচ্চাটাকে একটা ভালো স্কুলে দিতে হবে _ এইসব শতেক ঝামেলা মাথায় নিয়ে চট করে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। তবু সে সাহস করে রিস্কটা নিয়েছিলো। যতটা কষ্ট হবে বলে ভেবেছিলো ততটা অবশ্য হলো না। সামান্য কিছু টাকা জমানো ছিলো _ সেটার ওপর সে ভরসা করেছিলো, কিন্তু রকিই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো, কিছু না বলতেই ও প্রতিমাসে জামিলের নামে পঁচিশ হাজার টাকার চেক ইসু্য করতে লাগলো ফেরতযোগ্য লোন হিসেবে, বললো _ সংসার তো চালাতে হবে। আপাতত লোন হিসেবে নিতে থাক, সময় সুযোগ মতো শোধ করে দিস। এটা ছিলো এক বিরাট উপকার, সন্দেহ নেই। এমন শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু না থাকলে মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন যুবকের পক্ষে ব্যবসায়ী হওয়া কত কঠিন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলো জামিল। যাহোক, প্রথম কয়েক মাসে লাভের মুখ দেখা গেলো না। ব্যবসাটাও অবশ্য সেরকম নয়। রপ্তানী, তা-ও রেয়ার আইটেম, বাঁশ ও বেতের তৈরি হ্যান্ডিক্র্যাফ্টস। তারা প্রথম অর্ডারটি পায় ব্যবসা শুরু করার মাস ছয়েকের মাথায়। রকির বাবার কানেকশনই এখানে মূল ভূমিকা পালন করেছিলো, বলাই বাহুল্য। নইলে এত তাড়াতাড়ি এই অর্ডার পাওয়া সম্ভব হতো না। ডেলিভারি দিয়ে বিল পেতে পেতে বছর খানেক। লাভ মন্দ নয়। বছর শেষে জামিলের হাতে এসেছিলো লাখ পাঁচেক টাকা। এবারের অর্ডারটি অনেক বড়। কয়েক কোটি টাকা লাভ হবার কথা। জামিলের হাতে, সব খরচ বাদ দিয়ে, কোটিখানেক টাকা আসবে বলে ধারণা করছে সে। লাভের পরিমাণ নির্ভর করছে কত কম দামে তারা জিনিসগুলো কিনতে পারছে তার ওপর। জামিল এখন সেই খোঁজেই বেত-বাঁশের জিনিসপত্র বানায় এমন সব গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর তারই অংশ হিসেবে সে তার আরেক বন্ধু জসিমের সঙ্গে এসেছে তার গ্রামে।

আসার সময় একটা ঘটনা ঘটলো। চা খাওয়ার জন্য পথে একবার গাড়ি থামিয়েছিলো তারা। চা-র দোকানে বসেছিলো কয়েকজন তরুণ, তাদেরকে দেখে একসঙ্গে তারা উঠে দাঁড়ালে জামিল ভেবেছিলো _ ওরা বোধহয় জসিমের চেনা। কিন্তু কাছে যেতেই তার ভুল ভাঙে, দেখতে পায় ওদের মধ্যে একজন তার প্রাক্তন ছাত্র। সালাম দেয়ার পর জামিল তাকে চিনতে পারে, যদিও নাম মনে পড়ে না।

আপনি এখানে স্যার? _ ছাত্রটি গভীর বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, যেন এখানে তার আসাটা এক বিরাট আশ্চর্যজনক ঘটনা।

এই তো বেড়াতে যাচ্ছি।
কোথায়?
জসিম ওর গ্রামের নাম বলে।
ও আচ্ছা। ক-দিন থাকবেন স্যার?
কালকেই চলে যাবো। তোমার বাড়ি কি এখানে?
হঁ্যা, আমার দাদার বাড়ি এখানে, বেড়াতে এসেছি। স্যার চলুন না আমাদের বাড়িতে।
না, আজকে আর না।
আজকেই চলুন স্যার, প্লিজ। আপনাকে পেয়ে এভাবে ছেড়ে দেব!
জামিল অতিকষ্টে তাকে নিরস্ত করে। ছাত্রটি মন খারাপ করে জিজ্ঞেস করে _ ইউনিভার্সিটি কেমন চলছে স্যার?
ভালো।

জামিল একবার বলতে চেয়েছিলো, আমি আর ইউনিভার্সিটিতে নেই। পারলো না। কখনোই পারে না। সাত বছরের শিক্ষকতা জীবনে তার ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় হাজার দেড়েক। তাদের সঙ্গে দেখা হলে, বিশেষ করে সে ছেড়ে দেবার আগেই যারা পাশ করে বেরিয়ে গেছে এবং জামিলের ছেড়ে দেয়ার কথা যারা জানে না তারা, ইউনিভার্সিটির কথা জিজ্ঞেস করে। জামিল একবারও বলতে পারে না যে সে আর ইউনিভার্সিটিতে নেই। মাঝে মাঝে মনও খারাপ হয়। ক্লাসরুমে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। অসংখ্য নতুন কচি মুখ _ নতুন কিছু জানার আগ্রহে যাদের চোখগুলো আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে, সেইসব মুখের সামনে গিয়ে নিজের জানাটুকুকে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। ছেড়ে আসার পর জামিল বাবার ব্যাপারটা বুঝতে পারে। শিক্ষক জীবনের আনন্দ, গর্ব, তৃপ্তি _ এসবই আসে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে। এ এক নেশাও বটে। কোনো কোনো মানুষ সেই নেশায় পড়ে সহস্র কষ্ট মেনে নিয়ে একটি জীবন কাটিয়ে দেন। নইলে ছাত্রজীবনে সবচেয়ে মেধাবী আর সফল যে মানুষটি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয় সে চাকরিজীবনে তার মিডিওকার বন্ধুদের চেয়ে অনেক কম সুযোগ সুবিধা পেয়েও কীভাবে একটি জীবন বিনা অভিযোগে কাটিয়ে দেয়? জামিল এখনও ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসার ধরন দেখে মুগ্ধ হয়, ওই জীবনে আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে, অনেকটা সময়ের জন্য মনটা উদাসীন হয়ে থাকে। এবারও তাই হলো। বাকি পথটুকু আর কোনো কথাই বললো না জামিল।

কিন্তু ব্যবসা করতে হলে এসব মন খারাপ টারাপ মূল্যহীন হয়ে পড়ে, জানে সে। ব্যাপারটাকে ঝেড়ে ফেলে তাই পৌঁছেই কাজে নেমে পড়লো তারা, স্থানীয় হাট ঘুরে দেখলো, সেখানে বাঁশ বেতের সামগ্রী সামান্যই। সেরকমই অবশ্য হওয়ার কথা, গ্রামের মানুষ এগুলো তো আর অহরহ কেনে না! ক্রেতা নেই, সাপ্লাই আসবে কেন? বিকেলের দিকে তারা গেল ঋষিপাড়ায়। ওরাই বাঁশ-বেতের কাজ করে। প্রায় শ-খানেক বাড়ি নিয়ে লম্বা একটা পাড়া, জসিমদের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়, ও খুব পপুলারও ওই পাড়ায়, সেটা বোঝা গেলো তাদের সমাদরের ধরন দেখেই। সব বাড়িতেই জসিমের দাদু-ঠাকুমা-কাকা-কাকী-দাদা-বৌদি আছেই, সব বাড়িই তার জন্য উন্মুক্ত। বিনা দ্বিধায় একেকটি বাড়িতে ঢুকে গেলো সে, যত্নআত্তিও পেলো খুব। জসিম জামিলকে বন্ধু বলে পরিচয় করিয়ে দিলে তাকেও দ্রুত আপন করে নিতে দ্বিধা করলো না তারা। প্রায় দু-আড়াই ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন বাড়িতে ঘুরে বেড়ালো জামিল, ঋষিদের হাতের কাজগুলো দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো, আর জসিমের কানে কানে বললো _ 'হাই কোয়ালিটির কাজ, এতটা আমি আশা করিনি।' উত্তরে জসিম বললো _ 'ঋষিদের এই এক গুণ, যখন যেটা করে মন প্রাণ ঢেলে করে, জীবীকাটা তাদের কাছে প্রধান নয়, নিখুঁত কাজ করতেই ভালোবাসে ওরা, তাতে দু-পয়সা কম এলেও আপত্তি নেই ওদের।' ঋষিরা প্রথমদিকে বুঝতে পারেনি, এই অচেনা ভদ্রলোক কেন এত খুঁটিয়ে তাদের কাজগুলো দেখছে, জামিলই সেটা আগেভাগে বলতে চায়নি, পছন্দ হওয়ার পর আর আড়াল রাখলো না। সন্ধ্যার পর পাড়ার বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলতে বসলো পরাণ দাদুর উঠোনে। পরাণ দাদু এই পাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ লোক, সবাই তাকে খুব মানেও। প্রয়োজনে কতখানি সাপ্লাই তারা দিতে পারবে, দাম কেমন পড়বে, বেশি কাজ করতে গিয়ে আবার মান পড়ে যাবে কী না _ এসব নিয়ে কথা হলো। কোনোটায় খুঁত ধরা পড়লে সেটা আর নেয়া হবেনা সেটাও জানিয়ে রাখলো জামিল। ঋষিপাড়ার লোকজন কখনো এমন প্রস্তাব পায়নি, তারা এমনিতে যা তৈরি করে তাই-ই ঠিকঠাক মতো বিক্রি করতে পারে না, এখন কল্পনাতীত এক প্রস্তাব নিয়ে যে যুবক এসেছে তাকে তাই দেবতার মতো মনে হয়। অনেকটা সময় তারা কথা বলে কাটায়, নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করে, একসময় একটা মৌখিক চুক্তিও হয়ে যায়। জামিল সন্তুষ্ট হয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বাড়ি ফেরে _ এরকম একেকটি সাফল্য কোটি টাকার পথে তাকে এক ধাপ করে এগিয়ে দিচ্ছে, এই অনুভূতি কতটা মধুর সে ছাড়া আর কে-ই বা বুঝবে?

রাত বাড়ে, এখানে সন্ধ্যা হতে না হতেই নিঝুম হয়ে যায় সব, রাত দশটায় সারাগ্রামে কোনো সাড়াশব্দ নেই _ চারদিকে কেবল ঝিঁঝিঁ পোকা আর শেয়ালের ডাক। শুধু জসিমদের বাড়িতে পিঠা বানানোর আয়োজন চলছে বলে এখনও সবাই জেগে। সারাদিনের জার্নি, তারপর ঋষিপাড়ায় দীর্ঘসময়, শরীর ভেঙে আসছে ক্লান্তিতে, তবু জামিলের চোখে ঘুম নেই। কাজটা এত সহজে হয়ে যাবে ভাবেনি সে, ভেবেছিলো আরও অনেক বেশি ঘোরাঘুরি করতে হবে, তাছাড়া এই প্রত্যন্ত গ্রামে ভালো মানের জিনিসপত্র খুব একটা পাওয়া যাবে না। ভাগ্যটা সুপ্রসন্ন বলতে হবে, এখন জিনিসগুলো এখান থেকে ঢাকা পর্যন্ত পেঁৗছানোর দায়িত্বটা জসিমকে দিয়ে দিতে পারলে অনেকখানি নিশ্চিত হওয়া যায়। এতে করে চাকরির পাশাপাশি জসিমেরও কিছু বাড়তি আয় যেমন হবে, তেমনি ঋষিদের সঙ্গে ওর সুসম্পর্কের কারণে কাজটাও স্মুথলি হবে _ ব্যাপারটা নিয়ে ঢাকায় ফিরেই রকির সঙ্গে আলাপ করতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে হয়তো একসময় একটু ঝিমুনির মতো এসেছিলো, সেই ঘোর কেটে যায় দূর থেকে ভেসে আসা ঢোলের শব্দে। শুধু ঢোল নয় _ খোল, করতাল, ড্রাম, বাঁশি সব একসঙ্গে বাজছে। কিছু বুঝতে না পেরে জামিল জিজ্ঞেস করে,

এত ঢোলডগর বাজছে কোথায় রে জসিম, গান টান হচ্ছে নাকি কোথাও?
না, ঋষিরা বাজাচ্ছে।
কেন, কোনো অনুষ্ঠান আছে নাকি ওদের?
না, ওরা এমনিতেই বাজায়। একসময় ওদের মূল পেশা ছিলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানো, কেন ওদের বাড়িতে যন্ত্রপাতি দেখিসনি?
হঁ্যা, দেখলাম তো, কিন্তু বুঝতে পারিনি। কিন্তু ওরা এমনি এমনি এসব বাজায় কেন?
জানি না কেন। সারাদিন কাজ করার পর একটু বিনোদনের জন্য হয়তো। আর তাছাড়া আজকে তো ওদের আনন্দের দিন। যে প্রস্তাব তুই ওদের দিয়েছিস, তাতে করে ওদের আর সারাবছরের খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
ও, ওরা তাহলে এইজন্য বাজাচ্ছে?
তা না-ও হতে পারে। ওরা প্রায় প্রত্যেক রাতেই বাজায়।
দেখতে যাওয়া যায় না?
যেতে চাস?
এত রাতে গেলে ওরা কিছু মনে করবে না তো?
আরে না, বরং খুুশি হবে।

কিন্তু তারা পৌঁছানোর আগেই ঢোল, করতাল, খোল আর ড্রামের শব্দ থেমে গেলো। জেগে রইলো কেবল বাঁশির বিলম্বিত একটানা করুণ সুর। জসিম সব চেনে বলে যে বাড়িতে বাজছিলো সে বাড়িতে গিয়েই উঠলো তারা। এত রাতেও অনেক মানুষ, সবই এ পাড়ার বাসিন্দা, মূর্তির মতো বসে বসে পরাণ দাদুর বাঁশি শুনছে। তাদের দেখে সবার মধ্যে একধরনের চাঞ্চল্য এলেও, তারা দুজনেই ইশারায় শব্দ করতে নিষেধ করলে, যে যার মতো বসে থাকে নিঃশব্দে। পরাণ দাদু চোখ বুঁজে বাজিয়ে চলেছেন, গলার রগ ফুলে উঠছে তার, আবছা আলোয় চোখের জলটা চিকচিক করছে। একসময় বাঁশিও থামে। জামিল মন্ত্রমুগ্ধ। বাজানো শেষ হলে সে গিয়ে পরাণ দাদুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে, আর হতবিহ্বল পরাণ দাদু অনেকক্ষণ কোনো কথাই বলতে পারেন না। জামিলই বলে,

দাদু, এত সুন্দর বাজান আপনি!

একসময় বাজাইতাম দাদু, অহন আর বাজাই না।

বাজান না! কেন দাদু, বাজান না কেন?

কেউ আর ডাহে না যে আমাগোরে। ডাকবোই বা কে বলেন? বড়লোক হিন্দুরা সব দ্যাশ ছাড়ছে, পাড়ি জমাইছে ইন্ডিয়ায়, পইড়া আছে খালি গরীব হিন্দুরা, যাগো যাওয়ার যায়গা নাই, উপায়ও নাই। অহন আর আগের মতো ঢোলডগর বাজাইয়া বড়সড় কইরা বছর ভইরা পুজা অয় না। বাবুরা থাকতে পুজা অইতো, নানান পালাপার্বন অইতো, বিয়াশাদীও অইতো জমজমাট কইরা _ সবখানেই আমাগো ডাক পড়তো। অহন বাবুরাও নাই, পুজাপার্বনও নাই, মোছলমানেরা আবার বাদ্যিবাজনা পছন্দ করে না, হেগো বিয়াশাদীতে তাই বাজনদারগো কদর নাই, হারা বছর তাই বেকার বইয়া থাকন লাগে। বাপদাদার পেশা তাই ছাইড়া দিতে অইছে গো দাদু। প্যাটের দায়ে বাঁশ-বেতের জিনিস বানাই, কিন্তু মন মানে না গো দাদু, মন পইড়া থাহে বাদ্যিযন্ত্রের কাছে, যন্ত্রগুলা হারাদিন ভইরা খালি ডাক পাড়ে আর ডাক পাড়ে, একদিন বাদ্যি না বাজাইলে হাত নিশপিশ করে, বাঁশি না বাজাইলে পাড়ার কারো ঘুম আহে না, হেই জইন্যে রাত্তির বেলায় একলা একলাই বাজাই। কি করমু দাদু কন, আমাগো যে আর কেউ বাজাইতে ডাহে না...