সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করে যে এত বিপত্তির মধ্যে
পড়তে হবে, সে, আবু নাসের তা আগে বুঝতে পারেনি। বুঝতে শুরু করলো
বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই, যখন সে আবিষ্কার করলো _ নানা
অফিসিয়াল-আনঅফিসিয়াল পার্টিতে, সামাজিক অনুষ্ঠান-আয়োজনে, বন্ধুদের
আড্ডায় সে, অবশ্যই সস্ত্রীক, হয়ে উঠেছে অপরিহার্য এবং এই
আয়োজনগুলোর সবকিছূ আবর্তিত হয় তার স্ত্রী আফরোজা সুলতানা মিতুলকে
কেন্দ্র করে। তবে প্রথমদিকে এটাকে তার বিপত্তি বলে মনে হয়নি, বরং
এমন একজন রূপসী মেয়ে যে তার বউ এ নিয়ে একধরনের প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ
ছিলো তার এবং বউয়ের কারণে নিজের গুরুত্ব হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার
ব্যাপারটাকে উপভোগও করতো। যে করেই হোক একটি রূপসী মেয়েকে বিয়ে করতে
হবে এই জেদ তার ছিলো এবং তার পেছনে যথার্থ কারণও ছিলো। কৈশোর থেকেই
রূপসী মেয়েদের প্রতি তার তীব্র আকর্ষণ ছিলো এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো
_ কোনো রূপসী কোনোদিন তার দিকে ফিরেও তাকায়নি। এই মেয়েগুলো কেন যে
তাকে পাত্তা দিলো না সে বুঝেই উঠতে পারেনি কোনোদিন। এমন তো নয় যে
ওরা কোনোদিনই কারো সঙ্গে সম্পর্কিত হয় না! হয়, এবং অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই মিডিওকার ছেলেদের সঙ্গে ইনভলভড হয়ে পড়ে। সে-ও সব অর্থেই
মিডিওকারদের দলের লোক। তার চেয়ে ফালতু ছেলেদের দিকেও সে সুন্দরীদের
ঝুঁকতে দেখেছে, তাহলে কেন তাকে কেউ পাত্তাই দিলো না এসব ভাবতে
ভাবতেই তার মনে ঐ তীব্র জেদটি জন্মায়। সে জানতো প্রেমের বাজার আর
বিয়ের বাজার এক জিনিস নয়, বিয়ের বাজারে অভিভাবকদের পছন্দ-অপছন্দ
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ-ও অবশ্য অজানা ছিলো না যে, চাইলেই
বিয়ের জন্য সেরকম পাত্রী পাওয়া যায় না, বিয়ের বাজারে রূপসী মেয়েরা
খুবই মূল্যবান পাত্রী, রূপ থাকলে পাত্রপক্ষ অনেক কিছু ছাড় দিতে
প্রস্তুত থাকে, আর এইসব পাত্রীর জন্য পাত্রকেও হতে হয় মূল্যবান।
নিজেকে মূল্যবান করে তোলার অভিপ্রায়ে অনেক ভেবে সে 'প্রথম শ্রেণীর
গেজেটেড সরকারী কর্মকর্তা' হওয়ার চেষ্টায় প্রাণপনে ঝাঁপিয়ে পড়ে,
জীবনের যাবতীয় চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে ছাত্রজীবনের চেয়ে দশগুণ
বেশি পড়াশোনা করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে 'বিসিএস' যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়
এবং দীর্ঘ যুদ্ধের শেষে নিজেকে আবিষ্কার করে সরকারী চাকরির সবচেয়ে
লোভনীয় পদ _ প্রশাসন ক্যাডারের একজন সদস্য হিসেবে। প্রাথমিক স্বপ্ন
পূরণ হওয়ার পরই অবশ্য বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে ওঠেনি সে, বছর পাঁচেক
সময় নিয়ে 'প্রথম শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তা' সুলভ আদব-কায়দা,
আচার-আচরণ, বেশ-ভূষা, চাল-চলন, কথা-বার্তা, ম্যানার-কার্টেসি
আয়ত্ত্ব করে নেয়, বাড়তি কাজ হিসেবে চিনে নেয় তদ্বির-ধান্ধাবাজির
নানা ফাঁক-ফোকর, অলিগলি, রাস্তাঘাট এবং এইসব ব্যবহার করে ঢাকায়
পোস্টিং নিয়ে বিয়ের বাজারে হাজির হয় একজন
লোভনীয়-কেতাদুরস্ত-আকর্ষণীয়-মূল্যবান পাত্র হিসেবে। মা-বাবা এর
মধ্যেই পাত্রী খোঁজা শুরু করেছিলেন এবং নাসের সোজা জানিয়ে দিয়েছিলো
_ তার বিশেষ কিছু চাওয়ার নেই কিন্তু পাত্রীকে অবশ্যই সুন্দরী হতে
হবে। সব মিলিয়ে বিয়ের বাজারে পছন্দের পাত্র বা পাত্রী খুঁজে পাওয়া
আর লটারিতে চলি্লশ লাখ টাকা পেয়ে যাওয়া একই রকম অলৌকিক ব্যাপার _
আফরোজা সুলতানা মিতুলকে বিয়ে করতে গিয়ে নাসেরকে তাই বেশ খানিকটা
ছাড় দিতে হলো। এই পাঁচ বছরে সে প্রচুর বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছে,
যাদের অধিকাংশই সামরিক বা বেসামরিক আমলা বা বড় মাপের ব্যবসায়ীর
কন্যা এবং এসব প্রস্তাবই তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, সে যথেষ্ট
মূল্যবান পাত্র। সবদিক বিবেচনা করলে তার এসব প্রস্তাব পাওয়ার কথা
নয় _ সে নিতান্তই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, বাবা মাঝারি মাপের
সরকারী কর্মকর্তা, তা-ও সৎ, ফলে শহরের এক প্রান্তে পৈত্রিক সূত্রে
পাওয়া তিন কাঠা জমিতে একটা একতলা দালান খাড়া করতেই তাঁর বয়স বেড়ে
গেছে বিশ বছর। সে মা-বাবার বড় সন্তান, তার ছোট আরও তিনটে ভাই-বোন
আছে, এই সংসারটি চালাতে গিয়ে বাবার হিমশিম খেয়ে যাওয়ার অবস্থা।
বিলাসিতা দূরে থাক প্রয়োজনটুকুও সব সময় মেটে না। নিজের পারিবারিক
অবস্থার কথা বিবেচনা করেই নাসের ওইসব হাই-ক্লাস প্রস্তাব গ্রহণ
করেনি। করলে হয়তো তার ওপরে ওঠার পথঘাট মসৃন হতো, কিন্তু মেয়েটি এ
পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতো না। সে তাই অন্যান্য দিক বাদ
দিয়ে শুধু সুন্দরী মেয়ের শর্তে অটল রইলো এবং মধ্যবিত্ত _
নিম্নমধ্যবিত্তও বলা যায় _ পরিবারের শিক্ষিত মেয়ে মিতুলকেই বিয়ে
করলো। মিতুল মন খারাপ করে দেয়ার মতো রূপসী, অর্থাৎ ওকে দেখলে _ এই
মেয়েটিকে আমার কোনোদিন পাওয়া হবে না _ ভেবে যে কোনো যুবকের
চিরদিনের জন্য মন খারাপ হয়ে যেতে বাধ্য। বিয়ের পর সে আবিষ্কার করলো
মিতুলরা দরিদ্র শ্রেণী থেকে উঠে আসা মধ্যবিত্ত নয়, বরং উল্টো _
একসময় অভিজাত ছিলো, নানা কারণে অবস্থা পড়ে গেছে, কিন্তু নিজেদের
রুচি, আভিজাত্য এবং আত্নসম্মানবোধ বিসর্জন দেয়নি। মিতুলের মধ্যে
দিয়েও সেই আভিজাত্য প্রকাশিত হয়, অসম্ভব রূপসী হলেও সে হঠাৎ
ফুলেফেঁপে ওঠা বড়লোক-কন্যাদের মতো প্রদর্শনপ্রিয় নয়, কাপড়-চোপর,
আচার-আচরণ, কথাবার্তায়ও আশ্চর্যরকমের মার্জিত ও রুচিশীল। সারা গায়ে
সে এমন নিখুঁতভাবে শাড়িটা জড়িয়ে রাখে যে কোনোভাবেই তার শরীরের কোনো
অংশ _ পিঠ-পেট-কোমর _ কারো সামনে প্রকাশিত হয় না, এমনকি বুকের
আভাসটুকুও বোঝা যায় না। কিন্তু তার অনিন্দ্য-সুন্দর মুখায়বয়ব,
ঠোঁটে প্রায় সারাক্ষণ লেগে থাকা মৃদু মায়াময় হাসি, আর আচার-আচরণে
এমন এক সি্নগ্ধ রুচিবোধের প্রকাশ ঘটে যে মুহূর্তে সবার মনোযোগ
আকর্ষণ করে নেয়। মিতুলের কারণেই নাসেরের স্ট্যাটাস বেড়ে যায় _ কোনো
অনুষ্ঠান বা পার্টিতে গেলে বন্ধুবান্ধব, জুনিয়র ও সমমানের
সহকর্মীরা তো বটেই এমনকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পর্যন্ত মিতুলের
সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য, ওর একটু দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য
নির্লজ্জভাবে চেষ্টা করতে থাকে।
তার বউয়ের প্রতি সবার এই আকর্ষণ তাকে এক মিশ্র অনুভূতি উপহার
দিয়েছে। সে একইসঙ্গে গর্বিত এবং বিরক্ত ও শংকিত বোধ করে। শংকার
পেছনে অবশ্য তেমন কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। মিতুল স্ত্রী হিসেবে
খুব ভালো, বলা যায় পতিপরায়ন। সে যে নাসেরের স্ত্রী এবং স্বামীর
প্রতি অনুগত সেটা সবাইকে বুঝিয়ে দিতে সময় নেয় না। তবু এক অজানা
শংকায় তার মন ভরে থাকে। এত মধুলোভী ভ্রমর চারপাশে, একটি ফুল যতোই
নিস্পাপ হোক, কতোক্ষণই বা নিজেকে পবিত্র রাখতে পারে! ভ্রমরদের
উৎপাত কমে যাওয়ারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাদের বিয়ের দু-বছর
পার হলো গতমাসেই কিন্তু উৎপাত যেন বেড়েই চলেছে।
বন্ধুরা তো বলা-কওয়ারও ধার ধারে না, যখন তখন এসে পড়ে _ আগে ওদের এত
আনাগোনা কখনো দেখা যায়নি। পুরনো-ঘনিষ্ট বন্ধুদের নিয়ে অবশ্য কোনো
সমস্যা নেই। ওদের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই গভীর ও পরিষ্কার, কারো
কাছে কেউ কিছু গোপন করে না, অনেক আগে থেকেই তারা পরস্পরের
পারিবারিক সদস্যের মতো হয়ে গেছে। এদেরই একজন _ রাজিব _ একদিন এক
আশ্চর্য অফার নিয়ে এলে নাসের-মিতুল দুজনেই হতবাক হয়ে যায়। রাজিব
খ্যাতিমান বিজ্ঞাপন নির্মাতা, ছাত্রজীবন থেকেই সে এই জগতের সঙ্গে
জড়িত, এখন সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান করছে, কতোসব মজার গল্প ওর কাছে
শোনা হয়েছে এই জগৎ নিয়ে! রাজিব চায় মিতুল তার নতুন বিজ্ঞাপনের মডেল
হোক। এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার মতো রক্ষণশীল নয় নাসের, কিন্তু
জীবন তো শুধু নিজেকে নিয়ে নয়, পারিবারিক আপত্তি থাকতে পারে,
সামাজিকভাবে ব্যাপারটা গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে _ এসব তো ভাবতে
হয়! রাজিব নানাভাবে বোঝাতে থাকে, এটা সমাজের দৃষ্টিতে আর খারাপ বলে
বিবেচিত হয় না, এখন তো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা পর্যন্ত মডেল
হচ্ছেন, এটাতে মর্যাদা বাড়ে বৈ কমে না ইত্যাদি। এসব বলতে বলতেই ও
সুকৌশলে এই বিজ্ঞাপনের পারিশ্রমিক বা সম্মানি বাবদ মিতুল কতো পেতে
পারে সেটাও বলে দেয়। পরিমাণটা শুনে নাসের চমকে ওঠে _ এ যে তার পাঁচ
মাসের বেতনের সমান! ছোট্ট একটা বিজ্ঞাপনের জন্য ২/৩ দিন কাজ করে এত
টাকা পাওয়া যায়! সব মিলিয়ে বিষয়টি তাদের জন্য জটিল হয়ে ওঠে। না করে
দিলে পরে যে আফসোস হবে এ ব্যাপারে নাসের নিশ্চিত, কিন্তু চট করে
হঁ্যা-ও তো বলা যাচ্ছে না! তাদের এই দোলাচল দেখে রাজিব
আনুষ্ঠানিকভাবে মিতুলকে অফারটা দিয়ে বলে _ তোরা ব্যাপারটা নিয়ে
সিরিয়াসলি ভেবে দ্যাখ, দিন সাতেক পরে আমাকে জানালেই হবে।
এর পরের কয়েকদিন কাটলো শুধু এই বিষয় নিয়েই, তারা দুজনে আলাদাভাবে
খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করলো, দুই পরিবারের সদস্যদের জানানো
হলো, তারাও একবার একসঙ্গে বসে ভালোমন্দ নানাদিক বিবেচনা করে _
ফ্যামেলিতে একজন এই লাইনে থাকা ভালো, নানা সুবিধা পাওয়া যায় _ এরকম
সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সক্ষম হলো।
এদিকে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ার পর মিতুল জানায়, সে রাজিবের সঙ্গে
বিস্তারিতভাবে কথা না বলে রাজি হবে না । রাজিব খানিকটা অনিশ্চয়তার
মধ্যে থাকলেও শেষ পর্যন্ত মিতুল যে রাজি হবে এই বিশ্বাস তার ছিলো।
রঙিন পর্দায় নিজের মুখ দেখার লোভ খুব কম লোকই সামলাতে পারে। আর
তাছাড়া বিজ্ঞাপন হচ্ছে এখন সবচেয়ে লোভনীয় 'শিল্পমাধ্যম' _ কারণ এর
কালারফুল প্রেজেন্টেশন মুহূর্তে একজন মডেলকে লোকপ্রিয় মুখ হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। বলা যায় না, বিজ্ঞাপনটা হিট করলে এক
বিজ্ঞাপনেই স্টার হয়ে যাবে মিতুল _ বিখ্যাত হওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ
কেই-বা ছাড়ে? কিন্তু মিতুল তাকে নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলে।
নতুন কেউ তো দূরের কথা প্রতিষ্ঠিত মডেলদের কাছেও তাকে কখনো এত
প্রশ্ন শুনতে হয়নি কোনোদিন। মডেলরা এখন এমনকি স্ক্রিপ্ট পর্যন্ত
দেখতে চায় না। মিতুল প্রথমেই নিরীহ গলায় জিজ্ঞেস করে_
এটা কিসের অ্যাড রাজিব ভাই?
কিসের মানে?
মানে, প্রোডাক্টটা কি?
রাজিব বাজারে নতুন আসা একটা কোমল পানীয়ের নাম বললে মিতুল সোজাসুজি
আপত্তি জানায় _ তাহলে তো আমি করতে পারবো না।
কেন?
সফট ড্রিংকসের অ্যাড যেমন নাচে-গানে ভরপুর থাকে সেটা আমার পক্ষে
করা সম্ভব না।
এটাতে নাচ-গান তো না-ও থাকতে পারে।
তাহলে কেমন হবে?
আমি এখনও স্ক্রিপ্ট করিনি, ভাবিওনি। তুমিই না হয় বলো কেমন অ্যাড
করতে চাও।
আর্টিস্টিক অ্যাড।
আর্টিস্টিক! কেন গান থাকলে বুঝি অ্যাড আর্টিস্টিক হয় না!
হয়। নাচ থাকলেও হয়। কিন্তু আমি কোন ধরনের নাচ-গানের কথা বলছি তা তো
বুঝতেই পারছেন।
হঁ্যা তা পারছি। আচ্ছা ঠিক আছে, তেমন নাচ-গান থাকবে না। কিন্তু
তোমার দু-একটা পছন্দের অ্যাডের কথা বলো তো দেখি...
যেমন.. যেমন _ চৈতি আর শিমুল মিলে কী যেন একটা রঙের অ্যাড করেছিলো
না, বার্জার পেইন্ট না কী যেন .. ওই যে বসার ঘরটা গোলাপি হবে,
শোবার ঘরটা নীল, আকাশের মতো ... কোনটার কথা বলছি বুঝেছেন?
হঁ্যা, বুঝেছি।
ওইরকম। কোনো নাচ-গান থাকবে না _ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক থাকতে পারে,
প্রোডাক্টের সঙ্গে মডেলের সরাসরি কোনো সম্পর্ক দেখানো যাবে না,
ওটা বোঝাতে হবে ইঙ্গিতে, সব মিলিয়ে অ্যাডটা হতে হবে অবশ্যই রুচিশীল
এবং সফট।
রাজিব হেসে ফেললো _ তুমি যেসব কঠিন শর্ত দিচ্ছো, কোনো বিখ্যাত
মডেলও এগুলো দেয়ার সাহস করে না। আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার জন্য একটা
আর্টিস্টিক অ্যাডই বানাবো আমি। আগে স্ক্রিপ্টটা হয়ে যাক, দ্যাখো
তোমার পছন্দ হয় কী না।
সাতদিনের মধ্যে স্ক্রিপ্ট নিয়ে এলো রাজিব, দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলো
মিতুলের সঙ্গে। তারপর শু্যটিং, এডিটিং, আরও কী কী সব করে মাস
দুয়েকের মধ্যে টিভি পর্দায় দেখা গেলো এক অসাধারণ বিজ্ঞাপনচিত্র।
প্রচার শুরু হওয়ার সাতদিনের মাথায় নগরবাসীর বহুবিধ আলোচনামসূহের এক
অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলো এই বিজ্ঞাপন এবং এর মডেল। এমন উচ্চ
রুচিসম্পন্ন অভিজাত এবং শৈল্পিক বিজ্ঞাপনচিত্র নাকি এর আগে আর
একটিও দেখা যায়নি এদেশের টিভি পর্দায়, এবং এমন রূপসী ও আবেদনময়ী
অথচ মায়াবতী ও মার্জিত মডেলও চোখে পড়েনি কোনোদিন। বিজ্ঞাপনের কোথাও
মডেলের হাতে কোমল পানীয়টি দেখা গেলো না, খাওয়া তো দূরের কথা,
কিন্তু পরিষ্কার বুঝিয়ে দেয়া হলো _ এই আকর্ষণীয় মেয়েটির আকর্ষণের
মূলে আছে ওই পানীয়টি। এর পরের একটি বছর খুবই ঘটনাবহুল এবং
বিস্ময়করভাবে কেটে গেলো। পত্র-পত্রিকায় মিতুলকে নিয়ে লেখালেখি শুরু
হলো, একের পর এক বিনোদন সাংবাদিকরা আসতে লাগলেন বাসায়, নানা ধরনের
রিপোর্ট এবং মিতুলের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো, এমন কি দু-একটি
বিনোদন পাক্ষিকের প্রচ্ছদ কন্যা হিসেবেও জায়গা পেলো সে। একের পর এক
বিজ্ঞাপন ও নাটকের অফার আসতে লাগলো, কিন্তু রাজিব এক বছর আর কোনো
কাজ না করে চুপচাপ বসে থাকতে বলেছে, শুরুতেই বেশি কাজ করলে নাকি
মডেলরা সস্তা হয়ে যায়, মিতুল তাই সবগুলো অফার ফিরিয়ে দিলো। আরেকটি
চমকপ্রদ ঘটনা ঘটলো। একটি বহুল প্রচারিত জনপ্রিয় দৈনিকের বার্ষিক
পুরস্কার আয়োজনে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞাপনচিত্রের নির্মাতা হিসেব পুরস্কার
ছিনিয়ে নিলো রাজিব এবং শ্রেষ্ঠ মডেলের পুরস্কারটি পেলো মিতুল।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে রাজিব তার পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য
মিতুলকে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানালো, বললো _ এরকম একটি বিজ্ঞাপনের
আইয়াডিয়াটা আসলে মিতুলের কাছ থেকেই পাওয়া। দর্শকদের কৌতূহলের
জবাবে মিতুল-আবিষ্কারের কাহিনীও বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে হলো তাকে। আর
মিতুল তার অনুভূতি জানাতে গিয়ে সমস্ত কৃতিত্ব দিয়ে বসলো নাসেরকে _
যদিও নাসের নিজেই জানে, বিজ্ঞাপনটির নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সে
কোনোভাবেই জড়িত ছিলো না।
এই এত-এতসব ঘটনার মধ্যে নাসেরের কোনো ভূমিকাই ছিলো না, এবং যে কোনো
কারণেই হোক তার মধ্যে যে একটা সূক্ষ পরিবর্তন এসেছে সেটা মিতুল
ছাড়া আর কেউ বুঝতেই পারলো না। ইতিমধ্যে তাদের জীবনটা আমূল পাল্টে
গেছে। আগেও মিতুলকে নিয়ে বাইরে বেরুনো মুশকিল ছিলো _ লোকজন
নির্লজ্জের মতো হা করে তাকিয়ে থাকতো। এখন শুধু তাকিয়েই ক্ষান্ত হয়
না, ফিসফিসানিও শুরু করে, অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েরা অটোগ্রাফ নিতে
আসে, কেউ কেউ আবার _ আপনি মিতুল না! _ বলে গল্প জুড়ে দেয়ার চেষ্টা
করে। এদের প্রায় সবাই আবার চকিতে নাসেরকেও দেখে নেয় _ সেইসব
দৃষ্টিতে স্পষ্টতই করুণা ও তাচ্ছিল্য, চোখগুলো যেন বলে _ এত সুন্দর
মেয়েটার ভাগ্যে কী না জুটেছে এই ক্যাবলাকান্ত-ভোম্বলদাস মার্কা
লোকটা! নাসের নিজের সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন, সে যে অন্তত
ক্যাবলাকান্ত নয় সেটা সে ভালো করেই জানে কিন্তু লোকজনের দৃষ্টির
ভাষাকে তো আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না! তার আইডেন্টিটিও ইদানিং বদলে
যেতে শুরু করেছে _ সে আর এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের
প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা নয় _ মডেল কন্যা মিতুলের
হাজব্যান্ড! কিন্তু এসব সমস্যা তার ওই পরিবর্তনের কারণ নয়। কারণ
অন্যত্র। বিজ্ঞাপনটি যেদিন প্রথম প্রচারিত হয়েছিলো সেদিনই মডেল
মিতুলকে দেখে তার মনে হয়েছিলো _ এই মেয়েটিকে সে চেনে না। বিজ্ঞাপনে
মিতুলের প্রেজেন্টেশনটা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনই গর্জিয়াস। এমনভাবে
প্রেজেন্ট করার জন্য শিল্পীর চোখ দরকার _ রাজিবের সেটা আছে সে তা
কুণ্ঠাহীনভাবেই স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু অচেনা লাগার কারণটি সে
ঠিক আবিষ্কার করতে পারেনি। বিজ্ঞাপনে ড্রেস-আপের ব্যাপারে মিতুলকে
একটু কমপ্রোমাইজ করতে হয়েছে _ শাড়িই পড়েছে সে, কিন্তু এমনিতে সে
যেমন আঁচল টেনে পিঠ-কোমর-বুক-পেট ঢেকে রাখে, বিজ্ঞাপনে সেটা করেনি।
পেট-কোমর দেখা যায়নি বটে, কিন্তু আঁচলটা না টেনে একদিকে ঝুলিয়ে
দেয়ায় পিঠের ওপরের অংশ অর্থাৎ ব্লাউজের ওপরের যেটুকু অংশ উন্মুক্ত
থাকে সেটুকু মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এটাই কি অচেনা লাগার
কারণ? না, এটাকে আপত্তিকর বা অশোভন বলে বলে মনে হয়নি নাসেরের কাছে,
বরং যথার্থ মনে হয়েছে। সত্যি বলতে কি মিতুল শাড়ি পড়ে তার নিজের
রুচি অনুযায়ী, কিভাবে পড়তে হবে এ বিষয়ে নাসের কোনোদিনই কিছু বলেনি।
বিজ্ঞাপনেও ওর মার্জিত রুচি এতটুকু ক্ষুণ্ন হয়নি। তাহলে অচেনা
লাগছে কেন _ সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। সে একবার টিভির দিকে
একবার মিতুলের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই
মেলাতে পারে না। এমনকি রাতে মিলন-মুহূর্তেও তার মনে হয় _ তার এই বউ
আর টিভি পর্দার মিতুল এক নয়। ওই মিতুলকে সে ছুঁতে পারবে না, সে
যোগ্যতাই তার নেই।
নাসেরের এই পরিবর্তনটা আর কেউ না পারুক মিতুল ঠিকই ধরতে পারে,
একদিন তাই সে আন্তরিকভাবেই জিজ্ঞেস করে,
সত্যি করে বলো তো, তুমি কি এসব পছন্দ করছো না!
কোন সব?
এই যে মডেলিং, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, পুরস্কার...
না, অপছন্দ করার কি হলো!
তাহলে কি হয়েছে তোমার?
কই কিছু হয়নি তো!
আমার কাছে লুকিয়ো না, সত্যি করে বলো না কি হয়েছে...
কিভাবে যে বলি...
আমার কাছে বলতে সংকোচ করছো কেন, সহজভাবেই বলো।
আসলে...আসলে তোমাকে কেমন যেন অচেনা মনে হয়...
মানে? আমি কি খুব বদলে গেছি?
না, তোমার কথা বলছি না, মানে.. কিভাবে তোমাকে বোঝাই.. মানে, টিভিতে
তোমাকে অচেনা লাগে।
মিতুল হেসে ফেলে _ কেন?
কেন জানি না। মনে হয় ওই মিতুল আমার নয়, ও আমার ধরাছোঁয়ার বাইরের
কোনো মানুষ, দূরের কোনো মানুষ।
দূর, কী যে বলো না! ওই মিতুলও তোমারই বউ, বুঝলে সাহেব, তোমার আদরের
লক্ষী বউ। আসলে ক্যামেরায় মানুষকে একটু অন্যরকম লাগে, এ জন্যই
তোমার ওরকম মনে হয়।
কিন্তু এ ব্যাখ্যায়ও কাজ হয় না। অন্তত ব্যাখ্যাটা তার মনপুত হয় না।
মনে হয় অন্য কোনো কারণ আছে, কোনো গভীর-গোপন কারণ।
এই সমস্যার সমাধান না হতেই নতুন বিজ্ঞাপনে কাজ করার অফার নিয়ে আসে
রাজিব। গত এক বছরে একটি মাত্র বিজ্ঞাপনে কাজ করে মিতুল যেখানে
পেঁৗছেছে _ শূন্য থেকে খ্যাতির চূড়ায় _ তাতে নতুন কাজ সে করবে কী
না এ নিয়ে কোনো সংশয়ই তার ছিলো না। কিন্তু মিতুল শুনেই বললো _ আপনি
আগে ওর সাথে কথা বলেন রাজিব ভাই।
রাজিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে _ আচ্ছা বলছি, তুমি বরং অন্য ঘরে
যাও।
মিতুল উঠে গেলে রাজিব জিজ্ঞেস করে _ কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি দোস্ত?
না, সমস্যা কোথায়!
তাহলে মিতুল যে তোর সাথে কথা বলতে বললো! তোর কি কোনো আপত্তি আছে?
না, আপত্তি থাকবে কেন?
আমার মনে হচ্ছে, কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে। বাসার লোকজন ভালোভাবে
নিচ্ছে না, নাকি তোরই পছন্দ হচ্ছে না?
আরে না, সেসব কিছু না।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমাকে বলতে তো তোর অসুবিধা নেই।
আসলে সমস্যাটা বলার মতো না।
তবু বল, অন্তত শেয়ার কর, তাতে তোর ভালো লাগবে।
কিভাবে যে বলি...আসলে...মানে...ও যে অ্যাডটা করলো, ওটা দেখে আমার
সবসময় মনে হয় _ ওই মেয়েটাকে আমি চিনি না, ও আমার ধরাছোঁয়ার বাইরের
কেউ।
শুনে রাজিবও হেসে ফেলে _ ও এই ব্যাপার! ওটা আসলে মেকাপ আর
ক্যামেরার কারসাজি। আর কিছু না। তুই চাইলে আমি তোকে মডেল করে একটা
অ্যাড বানিয়ে দেখাতে পারি, দেখবি নিজেকেই অচেনা লাগছে।
নাসেরের সমস্যাটা রাজিব বুঝলো না, বুঝবে না সেটা নাসের জানতোও,
মিতুলও বোঝেনি, তবু কেন যে বলতে গেলো! তার সমস্যাটা কতোটা জটিল
আকার ধারণ করেছে সেটা শুধু সে-ই জানে। তার সমস্ত কল্পনার জগৎ জুড়ে
আছে বিজ্ঞাপনে দেখা মিতুল। এমনকি দৈনন্দিন সঙ্গমের সময়ও সে এখন ওই
মেয়েটিকেই পেতে চায় _ ওই লাস্যময়ী, চোখে নেশা ধরানো, গর্জিয়াস
মেয়েটিকে, পায় না বলে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। বাস্তবের মিতুলের
অসম্ভব আবেদনময়ী শরীরও তাকে আর আনন্দ দিতে পারে না, বরং তা যেন হয়ে
উঠেছে না পাওয়ার যন্ত্রণার উৎস। এসব কি কাউকে বলা যায়? যায় না। সে
তাই প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাসুলভ স্মার্টনেস দেখিয়ে বলে,
তাই নাকি? বলিস কি! তোর কথা শুনে তো নিজেরই মডেল হতে ইচ্ছে করছে ..
হা হা হা .. শালার সরকারী চাকরি .. যাকগে তুই মিতুলের সাথে কথা বল।
মিতুল এলে প্রসঙ্গটা নিয়ে তারা দুজনে হাসাহাসিও করে এবং নাসের
ব্যথিত বোধ করলেও ভদ্রতাবশত হাসাহাসিতে অংশ নেয়।
এবারের পণ্য একটি প্রসাধন সাবান। শুনেই আঁতকে ওঠে মিতুল _ না না
রাজিব ভাই, সাবানের অ্যাড করবো না।
রাজিব হাসে _ জানতাম তুমি করতে চাইবে না। তা কারণটা কি শুনি!
সাবানের অ্যাড করতে গিয়ে মডেলরা যেমন ভিজে-টিজে.. না না রাজিব ভাই
আমাকে দিয়ে ওসব হবে না।
কী মুশকিল! স্ক্রিপ্ট না দেখেই হইচই করছো কেন? তোমাকে ভিজতে হবে
একথা কে বললো?
স্ক্রিপ্ট দেখা হলো, শু্যটিং, এডিটিং হলো, যথাসময়ে প্রচারও শুরু
হলো। দেখা গেলো , মিতুলকে ভিজতে হয়নি বটে, তবে মুখমণ্ডল ধোয়ার
দৃশ্য আছে, আছে ধোয়ার পর ভেজা মুখমণ্ডলে লেগে থাকা শিশিরবিন্দুর
মতো ফোঁটা ফোঁটা জলের মন কেড়ে নেয়া দৃশ্য। আগেরটির মতোই এ
বিজ্ঞাপনটি নিয়েও দর্শক এবং মিডিয়া মুখিয়ে উঠলো।
আর সবার অজান্তে নাসেরের প্রতিক্রিয়া হয় অন্যরকম। এই মিতুল আরও
অচেনা। বিজ্ঞাপনে মিতুলকে এত সুন্দর, এত আবেদনময়ী, এত আকর্ষণীয়, এত
অচেনা লাগে কেন সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না।
টিভিতে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে একটি ব্যাপার তার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিলো,
সেটা আবিষ্কার করে দিন সাতেক পরে যখন শহরের বড় বড় বিলবোর্ডগুলোতে
মিতুলের মুখ ধোয়ার দৃশ্য আর ধোয়ার পর শিশির বিন্দুমাখা মুখ
স্থিরচিত্র হয়ে শোভা পেতে লাগলো। প্রথমদিন সে খেয়ালই করেনি। অফিস
থেকে এক সহকর্মীর সঙ্গে বেরিয়ে তার মুখে _ হাউ গর্জিয়াস ইজ শি
লুকিং, মাই গুডনেস! _ এই বিস্ময়বাক্য শুনে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে
বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে নাসের নিজেও অবাক হয়ে যায়। কিন্তু প্রথমেই
তার চোখে পড়ে _ মিতুল দুই হাত দিয়ে মুখমণ্ডলে পানি দিচ্ছে, ফলে তার
শাড়ি কিঞ্চিৎ স্থানবিচু্যত হয়ে তার পেটের কিয়দংশ এবং ব্লাউজের
খানিকটা মূর্ত করে তুলেছে এবং সেখানে দেখা যাচ্ছে ওর সুউচ্চ স্তনের
আভাস। ক্যামেরাটা সম্ভবত ধরা হয়েছিলো নিচের দিক থেকে, ফলে দৃশ্যটি
অসম্ভব মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে মিতুল এত সচেতন, সবসময়
আঁচল টেনে নিজেকে নিখুঁতভাবে লুকিয়ে রাখে তার বুক-পেটের অংশবিশেষ
উন্মুক্ত হলো কিভাবে? ইচ্ছাকৃতভাবে নাকি বেখেয়ালে? আর টিভি
বিজ্ঞাপনে তো এমনটি দেখা যায়নি, তাহলে হারামজাদা ক্যামেরাম্যান এই
ছবিটা তুললো কখন? নাকি এটাও শু্যটিং-এডিটিং-ক্যামেরা-মেকাপের
কারসাজি? সে হা করে ছবি দুটোর দিকে তাকিয়ে ছিলো। পাশ থেকে সহকর্মী
_ এই নাসের সাহেব, নিজের বউকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওরকমভাবে দেখার কি
হলো, বাসায় গিয়ে দেখেন! আপনার তো ভাই রাজকপাল, বাসায় অমন একটা বউ
... বললে তার ঘোর ভাঙে। বাসায় ফিরে সে মনোযোগ দিয়ে টিভির
বিজ্ঞাপনটি দেখে। হঁ্যা, এখানেও ব্যাপারটা সেরকমই কিন্তু খুব কম
সময়ের জন্য দেখা যায় বলে তেমন করে চোখে পড়ে না। বিলবোর্ডটির ছবিটি
স্থির বলেই এত চট করে চোখে পড়ে।
নতুন বিজ্ঞাপনটি যে নাসেরের মধ্যে আরও গভীর-ব্যাপক পরিবর্তন এনে
দিয়েছে অনেকদিন পর্যন্ত মিতুল তা খেয়ালই করে উঠতে পারেনি। তার
কারণও আছে। গত একবছরে হঠাৎ পেয়ে যাওয়া খ্যাতি সে ইদানিং উপভোগ করতে
শুরু করেছে। নতুন বিজ্ঞাপনটি প্রচার হওয়ার আগ পর্যন্তও নিজেকে নিয়ে
তার সংশয়-সন্দেহ ছিলো, মনে হচ্ছিলো, প্রথমটি আসলে হঠাৎ ঘটে যাওয়া
ঘটনা, একটা অ্যাকসিডেন্টের মতো _ অপ্রত্যাশিত কিন্তু জীবনকে যা
পাল্টে দেয় _ তার আসলে ওইরকম কোনো প্রতিভা নেই, যেমনটি এতদিন ধরে
বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়টিরও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তাকে নিজের
ব্যাপারে কনফিডেন্ট করে তুলেছে। তাছাড়া বিজ্ঞাপন দুটো করে সে একটা
বড় ধরনের মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছে। কৈশোর থেকেই সে নিজের
রূপের ব্যাপারে সচেতন, নানা বয়সের বহু রূপমুগ্ধ লোকের কামনার
দৃষ্টি উপেক্ষা করে তাকে বড় হয়ে উঠতে হয়েছে, ফলে এই রূপকে পুরুষ
মানুষের কামুক দৃষ্টি থেকে ঢেকে রাখার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করে
গেছে। কোনোভাবেই যেন নিজের এতটুকু রূপ প্রকাশিত না হয়, কোনোভাবেই
যেন তার আচার-আচরণ, পোশাক-আশাকে এমন কিছু প্রকাশিত না হয় যা
পুরুষদেরকে লোভী করে তুলতে পারে সে ব্যাপারে অতিমাত্রায় সচেতন
থাকতে থাকতে তার মনের মধ্যে একটা অদৃশ্য পর্দা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো।
মনে হতো চারপাশের পুরুষ মানুষদের চোখে কেবলই লোভ আর জ্বলন্ত কামনা।
কারো দৃষ্টিতে যে পবিত্র মুগ্ধতা বা ভালোলাগা থাকতে পারে সে তা
ভেবেই দেখেনি কোনোদিন। কিন্তু বিজ্ঞাপন দুটো প্রচারের পর তার মনে
হলো _ নিজের রুচি বিসর্জন না দিয়েও রূপ জিনিসটিকে শোভনীয় ও
মার্জিতভাবে প্রকাশ করা যায়। রূপ প্রদর্শনের বিষয় না হলেও
প্রকাশযোগ্য বিষয়, অন্তত ঢেকে রাখার বিষয় নয়। ফলে আগে কেউ তার দিকে
তাকালে সে যেমন কুঁকড়ে যেতো এখন আর তেমনটি হয় না _ মনে হয় এটাই
স্বাভাবিক, যে কোনো সুন্দর-মনোহর দৃশ্য মানুষ যেমন মুগ্ধ বিস্ময়ে
দেখে, একজন রূপসীকেও তেমনভাবে দেখতে পারে। তার ভাবনা জগতের এই
পরিবর্তনের ফলে তার জীবনটা অনেক বেশি সহজ হয়ে যায় এবং সে ভেতরে
ভেতরে এক ধরনের অচেনা আনন্দের উপস্থিতি টের পায়।
আর তাদের দুজনের এই বিপরীতমুখী পরিবর্তন পরস্পরকে নিজেদের অজান্তেই
পরস্পর থেকে দূরে সরিয়ে নিতে থাকে।
নাসেরের জট পাকানো ধন্ধ তাকে টেনে নিয়ে যায় এক ঘোরের জগতে। অফিস
থেকে সে প্রতিদিনই বের হয় সন্ধ্যার পর _ যদিও ছুটি হয়ে যায় অনেক
আগেই। বেরিয়েই সে বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিদু্যত-বাতির
শুভ্র আলোয় ছবির মিতুল আরও ঝলমলে রূপসী ও অচেনা হয়ে যায়, আর সে
শহরের পথে পথে ঘুরে ঘুরে একের পর এক বিলবোর্ড দেখে বেড়ায়,
হাস্যোজ্জ্বল মিতুলের সঙ্গে এক তরফা কথা বলে যায়। বাসায় ফিরতে
স্বাভাবিকভাবেই রাত হয়ে যায় তার। সে কখনও এত রাতে বাসায় ফেরে না,
এই হঠাৎ রুটিন-পরিবর্তন কারোরই চোখ এড়ায় না, কিন্তু কেউ কিছু
জিজ্ঞেস করলে _ 'অফিসে কাজ ছিলো' _ বলে আলগোছে এড়িয়ে যায়। কিছুদিন
পর মিতুলের সন্দেহ হয় বটে _ প্রতিদিন কি এত কাজ থাকে ওর _ কিন্তু
জিজ্ঞেস করেও সদুত্তর পায় না, বরং নাসেরের ঘোর-লাগা দৃষ্টি তার
কাছে অচেনা বলে মনে হয়। কারণটা সে বুঝে উঠতে পারে না। কী করা উচিৎ
বা আদৌ কিছু করার আছে কী না তা-ও ঠিক করতে পারে না।
ওদিকে এক রাতে নাসেরের জীবনে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। যথারীতি সে
বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে ছিলো। হঠাৎ করে বিদু্যত চলে যায়, সে তাকিয়ে
দেখে _ যতোদূর চোখ যায়, রাস্তাঘাট-দোকানপাট-বাড়িঘর, কোথাও বাতি
জ্বলছে না। মনে হয় শহর জুড়েই লোডশেডিং শুরু হলো। অথচ, অদ্ভুত
ব্যাপার, সারা শহরে ছড়িয়ে আছে এক কোমল-মায়াবী-রহস্যময় আলো। আলোর
উৎস সন্ধান করার জন্য আকাশের দিকে তাকালে সে দেখে সংখ্যাহীন
নক্ষত্র বেলিফুলের মতো আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। নক্ষত্ররাও এমন আলো
ছড়ায়! তার জানা ছিলো না। সেই অচেনা আলোয় মিতুলকে দেখার বাসনায় সে
আবারও বিলবোর্ডের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত-অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে
হতবাক হয়ে যায়। ছবির মিতুল জীবন্ত হয়ে উঠেছে, ওর ঠোঁটের কোণে লেগে
থাকা সি্নগ্ধ হাসিটি ছড়িয়ে পড়ছে সারা মুখে, চুল উড়ছে বাতাসে, মুখে
লেগে থাকা শিশিরবিন্দুর মতো জল মুছে নিচ্ছে হাত দিয়ে। সে শুনতে পায়
মিতুল ডাকছে _ এই দাঁড়াও, আমি আসছি। সে দাঁড়ায়, আর মিতুল সত্যি
সত্যি বিলবোর্ড ছেড়ে তার কাছে নেমে এসে বলে _ তুমি শুধু তাকিয়ে
থাকো, একা একা কথা বলো, একদিনও তো আমাকে ডাকো না, আমার বুঝি খারাপ
লাগে না! আজকে চল একসাথে হাঁটি।
তারা হাঁটতে থাকে। রাস্তাঘাট জনশূন্য, একটা রিকশা পর্যন্ত নেই। যে
মাতাল, নিশিকন্যা ও ভবঘুরেরা সারারাত এ শহরকে জাগিয়ে রাখে তাদের
ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। শুনশান নীরবতা চারপাশে _ যেন এক
অচেনা বনভূমির মাঝখানে একটি পায়ে চলা পথে তারা হেঁটে চলেছে। কতো
রাত হলো, রাস্তাঘাট এত ফাঁকা কেন _ এ প্রশ্ন একবার মনে এলেও নাসের
ব্যাপারটাকে পাত্তা দেয় না। পাশে হাঁটতে হাঁটতে মিতুল অবিরাম কথা
বলে চলেছে _ কতোদিন ও এইভাবে কথা বলে না _ নাসের তাই মনোযোগ দিয়ে
শোনে।
হয়তো সত্যি সেদিন লোডশেডিং ছিলো কিংবা ছিলো না, হয়তো সত্যি আকাশ
জুড়ে নক্ষত্ররা ফুটেছিলো অথবা ছিলো না, হয়তো সত্যি রাস্তাঘাট
জনশূন্য ছিলো অথবা সে ভুলেই গিয়েছিলো _ গভীর রাতে বাসট্রাকগুলো
নিয়ন্ত্রহীন দানবের মতো চলাচল করে _ আর তাই কখন কোনদিক থেকে কে যে
এসে তাকে রাজপথের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে যায়, সে টেরও পায় না।
জুলাই ২০০৫ |
| |
 |
|