Page loading ... Please wait.

বড়ো বেদনার মতো বেজেছ
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
ঢাকার বাইরে গেলে, ফিরে আসার পর বেশ কয়েকদিন মন খারাপ হয়ে থাকে। নতুন কিছু নয় অবশ্য, এমনটি আমার সব সময়ই হয়, কিন্তু এবারেরটি যেন একটু অন্যরকম। এবার মনে হচ্ছে- ওখানে যেন কী ফেলে এসেছি! এমনটি হবার কথা নয়, ওখানে ফেলে আসার মতো কিছু নেই আমার। কেন এমন লাগছে জানি না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম ডিপ্রেশন কাটাতে, ডাক্তারের পরামর্শে, বলেছিলেন-'বহুদিন একঘেয়েমিপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য ডিপ্রেশনে ভুগছেন, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকার বাইরে থেকে বেড়িয়ে আসুন, দেখবেন ভালো লাগবে। সম্ভব হলে বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ুন, কয়েকটা দিন হৈ-হল্লা করে কাটিয়ে দিন; জীবনে মাঝে মাঝে চেঞ্জ আনা দরকার।' কিন্তু দিন সাতেক কাটিয়ে আসার পরও আমার অবস্থার এতটুকু উন্নতি না হয়ে বরং অবনতি হয়েছে। ডিপ্রেশন আরো বেড়েছে। কোনো কাজে মন বসছে না, কোনো কিছু ভালো লাগছে না। কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছি না- থেকে থেকে কেবলই মনে হচ্ছে, ওখানে কী যেন ফেলে এসেছি! কী ফেলে এলাম?

যাওয়ার সময় বন্ধুদের পাইনি। এখন কি আর অতো সহজে বন্ধুদের পাওয়া যায়? সবাই খুব ব্যস্ত। সবার তো আর আমার মতো ডিপ্রেশনের সমস্যা নেই, সবাইকে তো আর আমার মতো রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে হয় না, সবাই তো আর আমার মতো এমন ভয়ংকর ক্লান্তিতে ভোগে না
- আমার ডাকে ওরা সাড়া দেবে কেন? অথচ এককালে- কোনো এককালে, সেইসব দিন আমার জীবনে এসেছিলো এখন আর তা বিশ্বাসই হতে চায় না- আমরা কী না করেছি! চাইতে না চাইতে হুট করে বেরিয়ে পড়েছি শহর ছেড়ে, দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেরিয়েছি। তখন পকেটের অবস্থা ভালো ছিলোনা, কিন্তু মনটা ছিলো তাজা ফুরফুরে- পকেটের কথা চিন্তাতেই আসতো না। এখন আমাদের সবার অবস্থাই বেশ ভালো, কিন্তু মনটা আর আগের মতো নেই। সবার সংসার হয়েছে, বউ-ছেলেমেয়ে হয়েছে; চাকরি বা ব্যবসা নিয়ে, সমাজ-সংসার নিয়ে সকলেই কমবেশি ব্যস্ত- কেবল আমারই কিছু হলো না। চাকরি করছি, নিতান্ত কিছু না করলেই নয় বলে, কিন্তু আর কিছু নেই। সংসার হয়নি, এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহই বোধ করিনি কোনোদিন। বরং সংসারের কল্পনা বরাবর আমাকে ক্লান্ত করে তুলতো বলে ও পথ মাড়াইনি আর- ঘরে তাই কোনো আকর্ষণ নেই। অবশ্য সংসারী মানুষদের ঘরে যে কোন আকর্ষণটা থাকে তাও আমি বুঝতে পারি না। স্ত্রী! আমি ভাবতেই পারি না, একজন মাত্র মানুষের কাছে- যার কাছে দায়বদ্ধ থাকার দাসখস্ত বিয়ের সময়ই লিখে দেয়া হয়- বারবার ফিরে আসার মধ্যে কোনো আকর্ষণ থাকতে পারে! সন্তান! সেটাও বা আকর্ষণের কেন্দ্র হয় কী করে? সংসার হয়নি বলে আমার মধ্যে কোনো অপূর্ণতার বোধ নেই। বরং কষ্টবোধ আছে সেইসব বন্ধুর জন্য- বিয়ে করে যারা খুব সংসারী হয়ে গেছে, সন্ধ্যা হতে না হতে যারা দায়িত্বশীল স্বামী বা পিতার মতো ঘরে ফেরে, সন্ধ্যার পর টিভি দেখে, বাচ্চাদের পড়া দেখে, বউয়ের সঙ্গে শপিংয়ে যায়, সপ্তাহ শেষে কাঁচাবাজারে যায়, শুক্রবার দুপুরে টুপি মাথায় দিয়ে মসজিদে যায়। ওদের জন্যই আমাদের আড্ডাগুলো ভেঙে গেছে। একসময় যারা মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে ঘরে ফিরে মায়ের বকা শুনতো, তারা এখন বউয়ের ভয়ে সন্ধ্যা হতে না হতেই ঘরে ফেরে- ভাবা যায়! এ যে কতো বড় অধঃপতন ওরা তা বুঝতেই চায় না, উল্টো শুনিয়ে দেয়- সংসারের মর্ম তুই কী বুঝবি? তা বটে। ও আমার কোনোদিন বোঝা হবে না, বোঝার সাধও নেই। কিন্তু বিয়ে না করেও তো আমাকে ওই সন্ধ্যাতেই ঘরে ফিরতে হচ্ছে! সেই প্রাচীন, পরিবর্তনহীন, ম্লান, বিষণ্ন ঘর। না ফিরেই বা করবো কী? যাবো কোথায়? এই শহরে যাবার জায়গা-ই বা কোথায়? গ্রাম থেকে আসা মানুষদের মধ্যে এই শহর ক্ষণিক বিভ্রম জাগায় বটে, কিন্তু যারা বসবাস করে তারা বোঝে, কী সাংঘাতিক মনোটোনাস এই শহর। আর বন্ধুহীন এই শহর যে কী পরিমাণ বীভৎস হতে পারে, তা কেবল বন্ধুহীনরাই বোঝে। দীর্ঘদিন ধরে এমন এক জীবনযাপনের মধ্যে থেকেই কী না জানি না- অন্তত ডাক্তার তাই মনে করেন- আমি ভয়াবহ ডিপ্রেশনে ভুগছি। সারা রাত আমার ঘুম আসে না, এমনকি ঘুমের ওষুধও এখন আর কাজ দেয় না, সকালের দিকে চোখ ভেঙে ঘুম নেমে এলেও অফিসের তাড়া থাকে বলে বেরোতেই হয়। দিনের পর দিন তাই না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিতে হচ্ছে। এত দীর্ঘদিন ধরে না ঘুমালে শরীরে ক্লান্তি আসবেই, হয়তো সেজন্যই আমি এত ক্লান্ত হয়ে থাকি আজকাল।

ডাক্তার বলার পরও সিদ্ধান্ত নিতে কয়েকদিন কেটে গেলো। সিদ্ধান্ত নিয়ে বন্ধুদের অনুরোধ করতে করতে গেলো আরো কয়েকদিন। কেউই রাজি হলো না, সবাই খুব ব্যস্ত, নানা সমস্যা একেকজনের। তারপর, এই তো গত সপ্তাহে, একাই বেরিয়ে পড়লাম। কোথায় যাবো কিছুই ঠিক করতে পারছিলাম না। শেষ মুহূর্তে রেলস্টেশনে গিয়ে চট্টগ্রামের টিকেট কিনেছি। শহরটা আমার খুব চেনা, প্রিয়ও বটে। বহুবার গিয়েছি, বহুদিন থেকেছিও। এখন আর নতুন কোনো শহরে গিয়ে নতুন করে সবকিছু আবিষ্কার করার বয়স নেই, বরং চেনা শহরই ভালো। কেটেছিলাম তুর্ণা-নিশীথার টিকেট। রাতে সবাই ঘুমায় বলে ট্রেনের কম্পার্টমেন্ট থাকে তুলনামূলকভাবে নিঝুম, নীরব। 'রাত্রি নিঝুম গাড়ি ভরা ঘুম, রাত্রি নিঝুম গাড়ি ভরা ঘুম' বলতে বলতে ট্রেন এগোয়
- বেশ লাগে। কিন্তু ট্রেনে উঠেই এটা ধাক্কা খেতে হলো। আমার যেখানে বসার কথা তার পাশের সিটে একজন বেশ রূপসী মেয়ে বসে আছে। এমনটি হবার কথা নয়, এমনটি কখনো হয়নি। জীবনে বহু জার্নি করেছি আমি- সব রকম জার্নি- কিন্তু কোনোদিন সহযাত্রী হিসেবে কোনো রূপসী তরুণীকে পাইনি। বন্ধুরা আমাকে এজন্য কুফা বলতো, বলতো- তোর সঙ্গে জার্নি করা পাপ। সেই আমার ঠিক পাশের সিটে রূপসী তরুণী! অবিশ্বাস্য! আমি পকেট থেকে টিকেট বের করে দেখলাম। না ঠিকই আছে, আমার এখানেই বসার কথা- জানালার পাশে ২২ নম্বর সিট। মেয়েটি বসে আছে, সে উঠে না দাঁড়ালে জানালার পাশে গিয়ে বসাও সমস্যা। আমি ইতস্তত করছিলাম, মেয়েটি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বললো- এটা আপনার সিট?

হ্যাঁ
মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিলো, আর আমি তার এই অযাচিত ভদ্রতায় প্রায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কিন্তু বসেও আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না। বরাবর আমি জানালার পাশে বসতে পছন্দ করি, কিন্তু আজকে বিপদে পড়া গেলো। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌছতে প্রায় সাত ঘণ্টা সময় লাগবে। এখন এগারোটা বাজে, বড়োজোর এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে পুরো ট্রেন ঘুমিয়ে পড়বে, আমার পার্শবর্তিনীও জেগে থাকবে বলে মনে হয় না। অথচ আমার ঘুম আসবে না। এমনিতেই আমার ঘুম হয় না, আর জার্নিতে! অসম্ভব। আর এ কারণেই বারবার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে আমার। ট্রেন জার্নিটা আমি পছন্দ করি এই কারণেই, একটু হাঁটাচলা করে সময়টা পার করে দেয়া যায়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে- এই সাত-আট ঘণ্টা আমাকে পা গুটিয়েই বসে থাকতে হবে। পার্শবর্তিনী ঘুমন্ত সহযাত্রীকে ডিঙিয়ে কতোবারই বা বাইরে বেরোনো যায়, বিশেষ করে সে যদি হয় বিপরীত লিঙ্গের? এ কী বিপদে পড়া গেলো! মেয়েটিকে জানালার পাশে এসে বসতে বলবো নাকি? কিন্তু তা-ই বা বলি কীভাবে, যদি কিছু মনে করে! একজন রূপসী তরুণী কিভাবে একটি জার্নিকে বীভৎস করে তুলতে পারে তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আমার ক্রমান্বয়ে অস্বস্তি বাড়তে লাগলো, পাবার কথা নয় তবু সিগারেটের তেষ্টা পেতে লাগলো, হালকা হয়ে ট্রেনে উঠেছি তবু তলপেটে চাপ অনুভূত হতে লাগলো, এমন নয় যে অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি তবু পায়ে ঝিঁঝি ধরে গেলো, একটু হেঁটে আসার জন্য মনটা আকুপাঁকু করতে লাগলো। এইসব বিবিধ সমস্যায় আমার মুহূর্তগুলো জর্জরিত হতে লাগলো। সাধারণত জার্নিতে আমি সিগারেট খাই না, সহযাত্রীদের অসুবিধার কথা ভেবেই- আমার সিভিক সেন্স খুব প্রবল- ট্রেনে খেলেও সিট থেকে উঠে গিয়ে দুই কম্পার্টমেন্টের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খেয়ে আসি, এখন আর সইতে না পেরে সিগারেট বের করে ঠোঁটে লাগালাম। কিন্তু ধরাবার আগেই মেয়েটি বলে উঠলো-'এঙ্কিউজ মি, আপনি কি কাইন্ডলি সিগারেটটা বাইরে গিয়ে টেনে আসবেন?' ধরা খাবো জানা কথা। আজ আমার ধরা খাওয়ার দিন। নইলে যে আমি সিভিক সেন্সের জন্য বন্ধুদের কাছে বিখ্যাত, প্রবলভাবে সমালোচিত এবং কখনো কখনো নিন্দিত, সেই আমিই কী না পার্শবর্তিনী সহযাত্রীর কাছে অনুমতি না নিয়েই সিগারেট ধরাবার আয়োজন করলাম! আমি 'সরি' বলে ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে ফেললাম, মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বেরুবার পথ করে দিলো। চমৎকার। মেয়েটির কমনসেন্স আছে, বোঝা গেলো। এখন আমার সিগারেট না খেলেও চলে, স্রেফ অস্বস্তি কাটাবার জন্য খেতে চাইছিলাম, কিন্তু সে কথা আর বলার উপায় নেই। ঘটনা অনেক দূর এগোনোর পর আর ফেরা যায় না; মেয়েটি আমাকে বাইরে বেরোবার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে জায়গা করে দিয়েছে, এখন যদি আমি না গিয়ে সিটেই বসে থাকি, সে নির্ঘাত ভাববে- কী ভাববে কে জানে- যা-ই ভাবুক সেটা অন্তত আমার পক্ষে যাবে না। অতএব আমি দাঁড়ালাম। বাইরে গিয়ে চা খেলাম, সিগারেট খেলাম, টয়লেট থেকেও একপ্রস্থ ঘুরে এলাম- যেন একটু পরে আবার তলপেটে চাপ অনুভূত না হয়। তারপর প্রায় আধাঘণ্টা পর ফিরে এলে মেয়েটি আবার উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে ভেতরে যাবার জায়গা করে দিলো। কী বিব্রতকর! একটা মেয়েকে বারবার উঠাচ্ছি-বসাচ্ছি ভাবতেও নিজেকে অপরাধী মনে হলো। নিশ্চিতভাবেই আমার চেহারায় এখন অপরাধী ভাব, সেটা দেখেই হয়তো মেয়েটি বললো_

সরি।
কেন?
আমার জন্য আপনাকে উঠতে হলো যে! আসলে সিগারেটে আমার এত অসুবিধা হয় যে...
না না, আপনি সরি বলবেন কেন, আমারই তো লজ্জিত হওয়া উচিত।
আমার বিব্রত-ভাব আরো বেড়ে গেলো। মেয়েটি সহৃদয় সন্দেহ নেই, নইলে আমাকে বিব্রত রেখেই চুপ করে যেতে পারতো। তা না করে প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করলো_
চিটাগাং যাচ্ছেন?
হ্যাঁ।
বেড়াতে?
হ্যাঁ। আপনি?
আমি বাড়িতে যাচ্ছি, মা-বাবার কাছে।
ও, আপনি চাটগাঁর মেয়ে! কোথায় বাড়ি আপনাদের? শহরেই?
হ্যাঁ। হালিশহর।
ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন?
না, পড়াশোনা করি।
কোথায়?
ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে।
ও। কোন সাবজেক্টে?
ফিজিক্স
ফিজিক্স! কোন ইয়ারে?
সেকেন্ড ইয়ারে।

তার মানে মেয়েটি বয়সে আমার প্রায় এক যুগের ছোট। কারণ বারো বছর আগে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ারে পড়তাম। ফিজিক্সেই। কো-ইন্সিডেন্স? কিন্তু মেয়েটিকে ব্যাপারটা বললাম না। আর জিজ্ঞেস না করলে বলিই বা কিভাবে? অবশ্য একই ডিপার্টমেন্টের ভিন্ন সময়ের দুজন শিক্ষার্থীর মধ্যে এই বিষয়টি নিয়েই আলাপ জমে উঠতে পারে। শিক্ষকদের কথা জিজ্ঞেস করা যায়, তাদের নিয়ে মজার মজার গল্প করা যায়, ডিপার্টমেন্টের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলাপ করা যায় ইত্যাদি। কিন্তু আমি, কেন জানি না, কুণ্ঠা বোধ করছিলাম। বারো বছরের ছোট একটি মেয়ের সঙ্গে এভাবে আলাপ জমানোটা শোভন বলে মনে হচ্ছিলো না।

আপনি?
জি!
মানে, আপনি কি করেন?
চাকরি করি।
কোথায়?
একটা প্রাইভেট ফার্মে।
চিটাগাং বেড়াতে যাচ্ছেন বলছিলেন, কার কাছে?
কারো কাছে নয়।
তাহলে? থাকবেন কোথায়?
থাকবো কোনো হোটেলে।
ও।

এভাবে আমাদের প্রাথমিক আলাপ শেষ হলো। অবশ্য প্রথম পরিচয়ের কঠিনতম অংশটি- পরস্পরের নাম জেনে নেয়া- এর মধ্যে হয়ে গেছে। ও বীথি। আর আমি তো আমিই। এরপর আর কী থাকে? আলাপ শেষ। এবার চুপচাপ বসে থাকা যায়। কিন্তু গেলো না। ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি এলে আর আমি অন্য সবার মতো জানালা নামিয়ে দিলে বীথি বললো-

জানালাটা বন্ধ করলেন কেন? বেশ তো লাগছিলো।
কি?
বৃষ্টি। কী চমৎকার বৃষ্টি হচ্ছে!
বৃষ্টি দেখতে আপনার ভালো লাগে?
হ্যাঁ, খুব। আপনার?
আমার লাগে না।
কেন?
বৃষ্টিকে কান্নার মতো মনে হয়।
বীথি পূর্ণ চোখে আমার দিকে তাকালো। বললো, আপনি খুব রোমান্টিক মানুষ তাই না?
এ কথার কী উত্তর দেবো? বলবো যে, আমি খুব বিষাদগ্রস্ত মানুষ? বিষাদ কি রোমান্টিসিজমেরই আরেকটি প্রকাশ নয়? প্রশ্নটার কোনো উত্তর হয় না, তাই অন্য কথা বললাম-
আপনি এখানে এসে বসবেন? জানালা খুলে দিই। বৃষ্টি দেখুন।
মেয়েটি বোধহয় লজ্জা পেলো। বললো- না, ঠিক আছে।

একটু পর উঠে দাঁড়ালো বীথি। সম্ভবত টয়লেটে যাবে। আমার দিকে একবার চকিতে তাকিয়ে সোজা হেঁটে গেলো, আর আমি পেছন থেকে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটির কোমর পর্যন্ত একরাশ মেঘবর্ণ রেশমি চুল। অসামান্য সুন্দর। যতটা ভেবেছিলাম, মেয়েটি তার চেয়ে অনেক বেশি রূপসী। অকারণে, প্রায় নিজের অজান্তে, একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো আমার। আর দীর্ঘশ্বাসটি আমাকে ভাবিয়ে তুললো। দীর্ঘশ্বাস পড়লো কেন? মেয়েটি অত্যন্ত রূপসী- এই ভাবনার সঙ্গে দীর্ঘশ্বাসের সম্পর্ক কি? নিজেকে বাড়তি ভাবনার সুযোগ দেয়াটা রিস্কি মনে হলো, ব্যাপারটা ভুলে থাকার জন্য বাইরের দিকে তাকালাম। জানালার কাঁচ বৃষ্টি পড়ে ধূসর হয়ে গেছে। আমি আঙুল দিয়ে লিখলাম- বনলতা সেন। কেন লিখলাম? মেয়েটির চুল দেখে? 'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার দিশা!' নিজেকে ভাববার সুযোগ দিতে চাইনি, তবু নিজের অজান্তে ওকেই ভেবে চলেছি, মনটা শাসন মানতে চাইছে না। একটু পরই বীথিকে ফিরে আসতে দেখে আমি নিজের সিট থেকে উঠে দাঁড়ালাম- এবার ওকে জানালার পাশে বসতে বলতে পারি, বৃষ্টি দেখুক। বললামও। ও বিনা-বাক্য-ব্যয়ে মৃদু একটা হাসি দিয়ে আমার সিটে বসতে বসতে বললো- 'তা আপনার বনলতা সেনটা কে?' জানালার কাঁচে লেখাটা ওর চোখে পড়েছে, আর প্রশ্নটাও উদ্দেশ্যপূর্ণ- সারা জীবন দেখেছি, এ ধরনের প্রশ্ন স্বল্প-পরিচিত দুজন মানুষের সম্পর্কের ধরন পাল্টে দেয়। এবারো তাই হলো। আমার মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, প্রায় নিজের অজান্তে বেরিয়ে

এলো- আপনি।
আমি! - বীথি ভীষণ অবাক- আমি আপনার বনলতা সেন হলাম কিভাবে?
কেন, হতে পারেন না?
কীভাবে, বলুন!

একবার বলে ফেলেছি, কথাটা তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না! নিজের কথায় নিজেই ধরা খেয়েছি। এমন একটি কথা সদ্যপরিচিত একটি মেয়েকে বলা যায় নাকি? কিন্তু বলে ফেলার পর, এবং এ রকম জেরার মুখে, চুপ করে থাকাও শোভন নয়। তাই বললাম-

একটা প্রশ্ন করি, ভেবে উত্তর দেবেন।
আচ্ছা।
জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে বনলতা সেনের ক-বার দেখা হয়েছিলো?
একবারও না। বনলতা সেন তো কাল্পনিক চরিত্র।
কে বলেছে! নামটা কাল্পনিক হতে পারে, মানুষটা নয়। আর তার সঙ্গে জীবনানন্দের দেখা হয়েছিলো মাত্র একবার।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
কিভাবে বলছেন যে, একবারই মাত্র দেখা হয়েছিলো?
কবিতাটির কথা ভেবে দেখুন, বুঝতে পারবেন।
বীথি ভাবলো কী না বোঝা গেলো না, কিন্তু মেনে নিলো।

প্রকৃতপক্ষে বনলতা সেন নামে আদৌ কেউ ছিলো কী না, থাকলেও তার সঙ্গে জীবনানন্দের দেখা হয়েছিলো কী না_ তা কি আমি নিজেই জানি! কিন্তু আমার তখন মনে হচ্ছিলো, জীবনানন্দদের সঙ্গে বনলতাদের একবারই মাত্র দেখা হয়। আমার কাছে ওটাই তখন সত্যি ছিলো_ বীথিকে আমি মিথ্যে বলিনি।
এএবার বুঝতে পারছেন তো, কীভাবে আপনি বনলতা সেন হতে পারেন?

বীথি কিছু বললো না, মৃদু হাসলো শুধু। তারপর চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি হাত বাড়িয়ে জানালাটা খুলে দিলাম। প্রবল বৃষ্টি। ঝাপটা হাওয়ায় বৃষ্টি ভেতরে চলে আসছে_ কিন্তু মেয়েটি ভ্রূক্ষেপহীন, মগ্ন। দৃশ্যটি প্রায় অপার্থিব। অন্তত আমার বিষাদগ্রস্থ পৃথিবীতে এমন দৃশ্যের জন্ম হয় না। বৃষ্টি নয়, আমি দেখছিলাম বীথিকেই। মেয়েটিকে এখন আরো অনেক বেশি সুন্দর আর রহস্যময়ী লাগছে। কিন্তু চুলগুলো বেঁধে ফেলেছে কেন? আমার খুব ইচ্ছে হলো ওর খোলা চুল দেখতে। নিজেকে সামলাতে না পেরে ডেকেও ফেললাম।

বীথি। br /> উউঁ।- যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠলো মেয়েটি।
চুলগুলো খুলে ফেলুন না। br /> ববীথি আবারও আমার দিকে পূর্ণ চোখে তাকালো। এ হচ্ছে সেই ধরনের চোখ, যা এঙ্প্রেশন লুকাতে পারে না। এমন চোখ যার থাকে তাকে সব কথা খুলে বলতে হয় না, চোখই বলে দেয় অনেক কিছু। বীথি সেই চোখে তাকালো আমার দিকে, রহস্যময় হাসলো একটু। বললো- বাতাসে উড়ে গিয়ে আপনার চোখেমুখে পড়বে তো!

পড়ুক। আমি সেটাই চাই। - আমি প্রেমিকের মতো বললাম।
বীথি সত্যি সত্যি চুল খুলে ফেললো। ও আমার কথা রাখবে, আশা করিনি। আমি একটু অবাক হলাম- আর যে কথাটি চুল খোলার আগে জিজ্ঞেস করার কথা ছিলো ওর, সেটা জিজ্ঞেস করলো পরে-

চুল খোলার কথা বললেন কেন?
আমি এক মুহূর্ত সময় নিলাম- টের পাচ্ছি, ভেতরে কথারা ভিড় করছে বেরিয়ে আসার জন্য, সুন্দর-মনোহর সব কথা। কিন্তু মেয়েটিকে এসব বলা কি ঠিক হচ্ছে? নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছি না, মনে হচ্ছে- কথাগুলো মনে আসার আগে ঠোঁটে এসে যাচ্ছে। মেয়েটি তাকিয়ে আছে বুঝতে পারছি। কিন্তু কিছু বলবো কী না সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। হয়তো আমাকে চুপ করে থাকতে দেখেই ও বললো-
 
কই, বললেন না তো, চুল খুলতে বললেন কেন। br /> আআপনি যখন চুল খুলে হেঁটে যাচ্ছিলেন, আপনাকে রাজকন্যার মতো লাগছিলো।
ওকে আমার সত্যিই রাজকন্যার মতো মনে হচ্ছিলো। কোনো বাস্তব রাজকন্যা নয়, মনে হচ্ছিলো- এই মাত্র রূপকথার জগৎ থেকে উঠে এসেছে সে। আর এটি ট্রেনের কোনো কম্পার্টমেন্ট নয়, যেন এক ঘুমন্ত দৈত্যপুরী।
 
মেয়েটি তাকিয়ে আছে, ঠোঁটে মৃদু-রহস্যময় হাসি। আমার মনে হলো, রাজকন্যা বললাম কেন সেই ব্যাখ্যাটা ওকে দেয়া দরকার। বললাম-

ছোটবেলায় রূপকথা পড়েছেন?
হ্যাঁ।
এক রাজকন্যার কথা মনে পড়ে, দৈত্যরা যাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলো, পায়ের কাছে সোনার কাঠি আর মাথার কাছে রুপোর কাঠি রেখে, আর এক রাজপুত্র বহু অভিযান শেষে সেই দৈত্যপুরীতে এসে সোনার কাঠি মাথার কাছে আর রুপোর কাঠি পায়ের কাছে নিয়ে গেলে রাজকন্যার ঘুম ভেঙে যায়। বহুদনি পর ঘুম ভেঙে রাজকন্যা দেখতে পায়- তার সামনে এক রূপবান রাজপুত্র। বিস্ময়ে-আনন্দে অভিভূত হয়ে যায় সে। সেই মুহূর্তে, সেই ঘুমভাঙা বিস্ময় ও আনন্দের ভেতর রাজকন্যাটিকে কেমন লেগেছিলো কল্পনা করে দেখেছেন কখনো?

না! না তো! br /> চেষ্টা করে দেখুন... আপনাকে ঠিক সেই রকম লাগছিলো।
দদেখতে পাই- বীথির চোখে এবার স্বপ্নেরা এসে ভিড় করছে। এখন আর সে এই জগতের বাসিন্দা নয়, সত্যি সত্যি যেন রূপকথার জগৎ এসে ধরা দিয়েছে তাকে। বহুক্ষণ অনুবাদের অতীত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে দূরাগত কণ্ঠে বলে-

আপনার কথা বলার স্টাইলটি অসাধারণ।

এটি একটি কমপ্লিমেন্ট। কিন্তু শুনে আমার মনে হলো_ এ আমি কী করছি? কেন প্রেমিকের মতো এমন স্তুতি রচনা করে চলেছি অবিরাম? আমি তো এক দুঃস্বপ্নতাড়িত মানুষ। এই এতদিন পর কিভাবে সেই দুঃস্বপ্নের জগৎ থেকে আমার মুক্তি ঘটে গেলো? যেন আমি ফিরে গেছি বারো বছর আগের সেই জীবনে- যখন বন্ধুদের মধ্যে ঈর্ষা জাগিয়ে তাবৎ রূপসীকে নিজের দিকে নিয়ে আসতাম শুধু চমৎকার সব কথা বলে। কিন্তু আমি কখনো প্রেমিক হয়ে উঠতে পারিনি। কথা বলে নিজেই যে স্বপ্নের জগৎ রচনা করতাম, অচিরেই তা ভেঙে পড়তো নিজেরই দোষে, রচিত হতো দুঃস্বপ্নের জগৎ। আমি কখনো সহজ স্বাভাবিক জীবনের পথে হাঁটতে পারিনি। একটি সম্পর্ককে প্রেমের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া, দুজনে বসে ফিসফাস কথা বলা, টুকটাক বাদাম খেতে খেতে দাম্পত্য জীবনের স্বপ্ন দেখা- এসব আমার কাছে হাস্যকর মনে হতো। এতসব সম্ভাবনা থাকার পরও কেন আমার প্রেম হয়নি, তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি। সে প্রসঙ্গে না হয় একটু পরে আসি। তার আগে বলি- আমি বরাবর রূপকাতর মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তীব্র-তুমুল রূপসীরাও কেন আমাকে বাঁধতে পারেনি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় একটি মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকদূর এগিয়েছিলো। মেয়েটি ছিলো অসামান্য রূপসী। অমন রূপ আমি আর কখনো দেখিনি। ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণই ছিলো না। কিন্তু আমি শুধু কথা দিয়ে ওকে জয় করে ফেলেছিলাম। আমি ছিলাম কথার রাজপুত্র। আর কে না জানে যে, রূপকথার রাজকন্যাদের জয় করতে পারে কেবল কথার রাজপুত্ররাই। কিন্তু প্রেম হওয়ার আগেই একটা ভুল করে ফেলেছিলাম আমি। ওকে বলেছিলাম- 'তোমার মতো একজন রূপসী তরুণীর নিরাভরণ শরীর দেখার খুব সাধ হয় আমার।' অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি- মেয়েটি তাতেই রাজি হয়েছিলো। কেন রাজি হয়েছিলো তা নিয়ে আমার মধ্যে তৈরি হয়েছিলো এক গভীর প্রশ্ন। কোনোরকম সম্পর্ক তৈরি হবার আগেই কেউ অমন একটি প্রস্তাবে রাজি হতে পারে! তখন আমি বিষয়টি বুঝিনি, এখন বুঝি- ওর ছিলো আমূল সমর্পণ, নিজের সর্বস্ব সঁপে দিয়ে ও আমাকে পেতে চেয়েছিলো। নিজের শরীর দেখানোটাকে তাই তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কিন্তু আমার না ছিলো সমর্পণ, না ছিলো ওকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আমি কেবল হাওয়ায় ভেসে চলছিলাম। কোথাও দাঁড়াবার সময়ই ছিলো না। যাহোক, সত্যি সত্যি যখন ঘটনাটি ঘটলো, ওর ঈষৎ অবনত স্তনযুগল দেখে আমি বিস্মিত, আশাহত ও দুঃখিত হয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিলো_ তরুণী মেয়েদের বুক হয়, বইয়ের ভাষায়_ পীনোন্নত। সে যে তার নিজের ভারেই খানিকটা অবনত হয়ে যায়, এই কমনসেন্স আমার ছিলো না। আমার তখন মনে হয়েছিলো_ সৌন্দর্যকে কখনো নিরাভরণ করে দেখতে নেই, সুন্দর তার সৌন্দর্য রক্ষা করে রহস্যময়তায়, আবরণে ও আভরণে।। মেয়েটিকে ওভাবে দেখার পর আমার রূপতৃষ্ণা খানিকটা কমেছিলো। সুন্দর কাউকে দেখলেই মনে হতো, বাইরে থেকে তাকে যতটা সুন্দর দেখাচ্ছে, পোশাক খুলে ফেললে ততোটা আর দেখাবে না। আমি তখন এক নিগূঢ় সত্য-জানা লোকের চোখে মেয়েদের দিকে তাকাতাম।
কিন্তু এই এতদিন পর সেই রূপই আমার অর্গল খুলে দিলো আবার। এই যে আমার ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চমৎকার সব কথারা স্রোতের মতো বেরিয়ে আসছে, তার কারণ সম্ভবত মেয়েটির রূপ। অনেকক্ষণ কথা বলিনি, বীথিও না। ও তাকিয়ে ছিলো বাইরে। আজ বোধ হয় চাঁদ ওঠেনি, তবু নক্ষত্রের আলোয় বৃষ্টিস্নাত রাত কী যে মোহময়ী হয়ে উঠেছে! এমনিতেই রাত খুব খারাপ জিনিস- গভীর রাতের কোনো এক ধরনের জাদুময়তা আছে, যা মানুষের ভেতরের মানুষটিকে বের করে নিয়ে আসে। তার সঙ্গে যদি প্রকৃতির রহস্যময়তা যুক্ত হয় তাহলে তো কথাই নেই। মানুষ তখন হয়ে ওঠে অর্গলমুক্ত, অবচেতনের লুকিয়ে থাকা কথাগুলোও বেরিয়ে আসে বাধাহীনভাবে। নইলে এত দ্রুত বীথিকে এসব কথা বলা হয়ে উঠতো না। মেয়েটিও সম্ভবত এবার অর্গলমুক্ত, হয়তো তাই জিজ্ঞেস করে-
 
আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? অনুমতি নেওয়ার দরকার কী? যা মনে আসে বলে ফেলুন।
এ পর্যন্ত ক-জন মেয়ে আপনার প্রেমে পড়েছে?
সম্ভবত একজনও না। কিংবা পড়লেও আমি তা জানতে পারিনি।
বিশ্বাস হচ্ছে না।
কেন?
কেউ আপনার প্রেমে পড়েনি, কিংবা পড়লেও বলেনি_ এ হতেই পারে না।
কেন, আমার প্রেমে কেউ পড়বেই, পড়লে তা প্রকাশ করবেই_ এমন কোনো কথা আছে নাকি?
সেটা আর আপনার বুঝে কাজ নেই। তার চেয়ে বলুন, আপনি কারো প্রেমে পড়েছিলেন কী না!
না।
না! আজ পর্যন্ত কারো প্রেমে পড়েননি?
না পড়িনি।
এটাও বিশ্বাস করা গেলো না।
সত্যি কারো প্রেমে পড়িনি। হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর হয়ে ওঠেনি।
কেন?
সসত্যি জানতে চান?
হ্যাঁ। কেন, আপনার কি মনে হচ্ছে আমি কেবল কথার পিঠে কথা বলার জন্যই জিজ্ঞেস করেছি?
না, তা নয়। আজ পর্যন্ত আমার কাছে এ কথাটা কেউ জানতে চায়নি তো! আমার বন্ধুরা, কিংবা যাদের সঙ্গে প্রেম হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো তারা কেউ আমার কাছে এই ব্যাখ্যা চায়নি যে, সম্ভাবনাময় প্রেমগুলো কেন নস্যাৎ হয়ে গেছে। ওরা সবাই নিজেদের মতো একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নিয়েছে। আপনিই প্রথম জানতে চাইলেন, তাই মনে হলো...
না, অন্য কিছু মনে হওয়ার কিছু নেই, আমি সত্যি জানতে চাইছি।
তাহলে বলি। রবীন্দ্রনাথের একটা গান আছে আছে না_ বড়ো বেদনার মতো বেজেছো তুমি হে আমার প্রাণে/ মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জানে_ শুনেছেন?
হ্যাঁ, শুনেছি।
আমার কাছে প্রেমটা ওরকম। আমার প্রাণের মধ্যে কাউকে বেদনার মতো বেজে উঠতে হবে। যার জন্য আমার মধ্যে কষ্ট ও যন্ত্রণার জন্ম হবে, যাকে না পাওয়ার শংকা অথবা পেয়ে হারানোর ভয় থাকবে, অথবা কোনো কারণ ছাড়াই যার জন্য চোখ ভিজে উঠবে জলে, বুক ভরে উঠবে হাহাকারে, তাকেই আমি প্রেম বলি। আনন্দে প্রেম নেই, প্রেম নেই প্রাপ্তিতে বা উচ্ছ্বাসে। অপ্রাপ্তি আর অপূর্ণতাকেই আমি প্রেম বলি। দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়গুলোর উর্দ্ধে উঠে কারো জন্য যদি মহৎ কোনো বেদনাবোধের জন্মই না হলো, তাকে আমি প্রেম বলবো কিভাবে? কারো জন্য আজ পর্যন্ত আমার ভেতরে এমন বেদনার জন্ম হয়নি বলেই আমার প্রেম হয়নি। আমি আনন্দে পূর্ণ হয়েছি, প্রাপ্তিতে ভরে উঠেছি, উচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছি, কিন্তু মহান কোনো কষ্ট, অপ্রাপ্তি, হাহাকার আর বেদনায় আমার মন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়নি।

মেয়েটি চুপচাপ আমার কথা শুনছিলো, আর আমার এসব বলতে পেরে ভালো লাগছিলো। এই কথাগুলো কখনো কাউকে বলা হয়নি, বলা হয়নি- মহৎ এক বেদনার জন্য আমার কী তুমুল প্রতীক্ষা ছিলো। বীথি এবার বললো- কিন্তু এমনও তো হতে পারে- আপনি আনন্দই চেয়েছেন, প্রাপ্তিতে ভরে উঠতে চেয়েছেন, বেদনা-কষ্ট-হাহাকার এসব চানইনি।

এটা চাওয়া না চাওয়ার ব্যাপার নয়, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই হবার কথা। কারো উপেক্ষা বা অবহেলায় যে কষ্টের জন্ম হয়, আমি তার কথা বলছি না। বলছি ভিন্নতর এক কষ্টের কথা, অকারণে চোখ-ভিজে ওঠা বেদনার কথা।

বীথি আমার কথা বুঝলো কী না বোঝা গেলো না; অভিজ্ঞতা থেকে জানি- রূপসীরা সব কথা বোঝে না, বা বুঝতে চায় না- কিন্তু আর কোনো কথা না বলে বাইরে তাকালো। বাইরে তখন ভোর নামছে। দিগন্তে, জমাট মেঘে জমেছে লাল ছোপ, অন্ধকার কেটে গিয়ে মিষ্টি আলোয় ভরে উঠছে পৃথিবী- আর প্রকৃতির এতসব রূপময় আয়োজনের প্রতিপক্ষ হয়ে বসে আছে এক রহস্যময়ী অচেনা তরুণী। প্রকৃতির কোন সৃষ্টিটা যে বেশি সুন্দর আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারি না।
 
অনেকক্ষণ পর বীথি প্রায় শোনা যায় না এমন ভঙ্গিতে বলে_ দেখেছেন?
হুঁ।
হ্যাঁ, আমি দেখেছি। দেখেছি প্রকৃতির রূপময়ী হয়ে ওঠার যাবতীয় আয়োজন, আর আরেক রূপসীর তার প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার দৃশ্য। তুমি তার একটিই দেখেছ। নিজেকে দেখনি। কিন্তু এসব আমি ওকে বলি না। ওর ঘোরগ্রস্ত মগ্নতা দেখতে ভালো লাগে আমার, ভালো লাগে প্রথম সূর্যের আলোয় বীথিকে দেখতে। আজ বহুদিন পর আমার পৃথিবী খুব সুন্দর হয়ে উঠেছে, আজ বহুদিন পর আমার জীবনে ভোর হলো, বহুদিন পর পৃথিবীর সবকিছু ভালো লাগছে আমার, বহুকাল ধরে এমন ভালো লাগার অনুভূতি থেকে বঞ্চিত হয়ে এসেছি আমি।

অনেকক্ষণ ধরে বীথির ঘোর ভাঙে না; এমনকি আমার দিকে একবার ফিরেও দেখে না। আমি কী করবো বুঝতে না পেরে ওর দিকেই নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকি, আর একসময় দেখি- ও আলগোছে, গোপনে, নীরবে চোখ মুছে নিচ্ছে। কেন যে ওর চোখ ভিজে উঠলো, আমার জানা হলো না। যারা নীরবে কাঁদে, তাদেরকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করতে নেই, জানি। আমি তাই ওকে কিছুই বলি না। নীরব কান্না পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি, এই ভোরে তা দেখার সৌভাগ্য হলো আমার- আমি ধন্য বোধ করলাম।

কিছুক্ষণ পর ট্রেন থামে। আমরা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিই কোনো কথা না বলেই, কেউ কারো ঠিকানাও জানতে চাই না, কেবল এক টুকরো হাসি বিনিময়েই আমাদের এই পর্ব শেষ হয়।

তারপর চট্টগ্রামে সাত দিন কাটিয়ে দিই উদ্দেশ্যেবিহীন ঘোরাফেরা করে, এমনকি পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা করতেও ইচ্ছে করে না। আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে থাকে বীথি, আর কেউ নয়, আর কিছু নয়। তারপর ক্লান্ত হয়ে পড়লে ঢাকায় ফিরে আসি আমি। সেই বিষণ্ন্ন শহর, যেখানে কেউ কারো আপন হয়ে ওঠে না কখনো। আমার দিন কেটে যায়- আগের মতোই, পরিবর্তনহীন, একঘেয়েমিতে পূর্ণ। কেবল টের পাই, আমার বুকের ভেতর বীথির জন্য অচেনা-অসংজ্ঞায়িত এক কষ্ট, হাহাকার আর বেদনা জন্ম নিচ্ছে, জন্ম নিয়ে বড় হচ্ছে, বড় হতে হতে আমার সমগ্র পৃথিবী ছেয়ে ফেলছে।


জুলাই, ২০০৩