Page loading ... Please wait.

কনফেশন
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
এই গল্প আমার বন্ধু আসিফকে নিয়ে। আমরা সচরাচর যা করতে পারিনা বা করতে চাইনা, আসিফের মধ্যে সেই বৃত্ত ভাঙার সাহস ও স্বপ্ন দেখেই ওর প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলাম। অন্য সবার মতো গতানুগতিক জীবনযাপনে বিশ্বাস নেই ওর _ চাকরি-বাকরি, প্রেম-প্রণয়, সংসার-টংসার এইসবের চেয়ে ওর চোখ জুড়ে সমাজটাকে বদলে দেবার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষারা ভিড় করে থাকে। বলাবাহুল্য, ব্যাপারটা আমাকে অবাক করে দেয়, কারণ ওর ঠিক এমনটি হবার কথা নয়। একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকতার একমাত্র সন্তান ও। এই শ্রেণীর কারো মধ্যে সমাজ-বদলের স্বপ্ন পাওয়াটা বেশ দুস্কর। আমলা পিতা তার এই স্বপ্নবাজ পুত্রকে নিয়ে মহাচিন্তিত, কয়েকবার দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেবার চেষ্টা করেও আসিফের প্রবল বাধার মুখে নিরস্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। তো, ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হবার পর আমি আবিষ্কার করি, বাইরে থেকে ওকে যতোটা নিরস-কঠোর বলে মনে হয়, ও ঠিক অতোটা নিরস নয় _ বরং এক কবিসুলভ কোমল মন ওর মধ্যে আছে। হয়তো সেজন্যই আমাদের বন্ধুত্ব আরো গভীর হয়ে ওঠে _ কারণ আমি ওর মতো মোটেও বিপ্লবী নই, কোনোদিন হতে পারবো বলেও মনে হয় না। বলাবাহুল্য দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের মধ্যে একসময় ব্যক্তিগত নানা প্রসঙ্গ ঢুকে পড়ে, আর তারই একটা পর্যায়ে জানতে পারি _ আসিফের আপন কোনো ভাইবোন না থাকলেও, চাচাতো বোন মিলিকে ও নিজের বোন বলেই মনে করে, এবং তাদের সম্পর্কটা দেখে বাইরে থেকে কেউ বুঝবেই না যে ওরা আপন ভাইবোন নয়। মিলি ওদের বাসায় থেকেই পড়াশোনা করে _ ওর বাবা, মানে আসিফের চাচা, থাকেন গ্রামে। সেখানে তিনি যথেষ্ট প্রভাবশালী। মিলির আপন একটা ভাইও আছে। তবে সে বাউন্ডুলে, বাপের প্রভাবে সে রীতিমতো ভিলেনমার্কা জীবনযাপন করে বলে মিলি বা আসিফ কেউই তাকে পছন্দ করে না। মিলি বরাবর খুব মেধাবী ছাত্রী ছিলো বলে আসিফের বাবা ওকে ছোটবেলায়ই তার কাছে নিয়ে এসেছেন, মিলির বাবাও খুশি মনেই মেয়েকে বড় ভাইয়ের কাছে ছেড়ে দিয়েছেন।

বন্ধুর পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ নিয়ে যেভাবে তার বোনের ফিরিস্তি দিতে বসলাম, তাতে যে কারো কারো মনে এই গল্পের পরিণতি সম্বন্ধে একটা ধারণা ইতিমধ্যে জন্মে গেছে _ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানে সচরাচর যেমনটি ঘটে থাকে আর কি _ বন্ধু, বন্ধুর বোন, তারপর এই একটু ইটিসপিটিস, একটু প্রেমট্রেম ইত্যাদি। এইসব সন্দেহপ্রবণ পাঠকদের আমি আশ্বস্ত করতে চাই যে, তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে এই গল্পে মিলির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বলেই তার কথা একটু বিশেষভাবে বলার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। অন্তত এটুকু জানানো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যে, আসিফ তার বোনকেও নিজের আদর্শ ও স্বপ্নের সঙ্গী করে নিতে সক্ষম হয়েছে। যাহোক, আসল ঘটনায় আসি। আমি আর আসিফ প্রায়ই এখানে সেখানে বেড়াতে যাই। বেড়ানোর এই রোগটি আমার, আমি সফলভাবে সেটা আসিফের মধ্যে সঞ্চার করতে পেরেছি। তো, এবার বেড়াতে যাবার প্রসঙ্গ উঠলে আসিফ বললো _ অনেক জায়গায়ই তো যাওয়া হলো, এবার চল আমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসবি।

তোদের বাড়ি কি বিশেষ কোনো আনন্দ দেবে আমাকে? আআমাদের বাড়ি নয়, তবে গ্রামটা দেবে। এমন গ্রাম তুই কখনো চোখেও দেখিসনি।

গ্রামের কথা বলার সময় আসিফ আনন্দে প্রায় ঝলমল করে। গ্রামের সঙ্গে আমার নিজের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই, এই জীবনে সাকুল্যে দুবার ওখানে গিয়েছি, কিন্তু ভালো লাগেনি। আসিফের অভিজ্ঞতাও আমারই মতো হওয়ার কথা _ গ্রামের সঙ্গে ওরও কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। আমার মতো ওর জন্মও এই শহরে, এখানেই বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, এবং বসবাস। হয়তো গ্রামে ওর যাওয়া আসা একটু বেশি তবে বেশিরভাগ সময়ই ও যায় মিলির সঙ্গে, নইলে মিলিকে আনতে। এবারও বললো _ মিলি তো বাড়িতে গেছে, ওকে গিয়ে নিয়ে আসি। ও বাসায় না থাকলে একদম ভালো লাগে না।

তো, ওর বাড়ি যাবার জন্য বাসে উঠে আমি ওর পারিবারিক ইতিহাস শুনতে থাকি _ 'আমার দাদার তেমন কোনো শিক্ষাদীক্ষা ছিলো না, তবে প্রচুর জমিজমা ছিলো। কিন্তু শুধু জমিজমা দিয়ে তিনি যথেষ্ট পরিমাণ মর্যাদা পাচ্ছিলেন না বলেই হয়তো আমার বাবা-চাচাদের পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলেন। তার সেই উদ্দেশ্য বাবা পূরণ করতে পারলেও চাচা পারেননি। বাবা পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকে বেশ উঁচু জায়গায় পেঁৗছলেও চাচাকে থেকে যেতে হয় গ্রামেই। এতে বিশেষ কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না _ কারণ দাদার যে বিশাল সম্পত্তি তা ঠিকভাবে দেখাশোনা করতে পারলে দু-চারটে পরিবার নিশ্চিন্তে জীবন পার করে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। যার ভাই এতবড় 'অফিসার' সে তো স্রেফ কৃষক হয়ে জীবন কাটাতে পারে না! তাতে সম্মান ক্ষুণ্ন হয় দুজনেরই। ফলে বাবার বুদ্ধিতে চাচা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করেন _ এবং বিপুল ভোট পেয়ে কোনোরকম কারচুপি-টারচুপি ছাড়াই বিজয়ী হন। ঘটনাটা বাবাকে ভাবিয়ে তোলে। চাচার এই ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণ অনুসন্ধান করে তিনি দেখতে পান _ মানুষের সঙ্গে মেশার এবং তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হবার এক সহজাত ক্ষমতা তার মধ্যে আছে, আর এই একটি জায়গায় তিনি বাবার চেয়ে এগিয়ে আছেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েও তিনি তার জনপ্রিয়তা বজায় রাখতে সক্ষম হন। গম চুরির ধান্ধা ছিলো না বলে তিনি জনগণের জন্য কিছু কাজ করতে সক্ষম হন এবং পরপর তিনবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জিতে আসেন। শুধু নিজ ইউনিয়নেই নয়, আশেপাশের ইউনিয়নেও তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে, এবং একজন ভালো ও সফল চেয়ারম্যানের উদাহরণ হিসেবে তিনি নিজেকে দাঁড় করাতে সক্ষম হন। কিন্তু ব্যাপারটা তার জন্য একইসঙ্গে আনন্দ ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরশাদের আমলে যেবার প্রথম উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হয় সেবার বাবার পরামর্শে এবং রাজনীতিতে আরো খানিকটা এগিয়ে যাবার আশায় তিনি সেই নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। আর বিপত্তি দেখা দেয় তখনই। তখনও জাতীয় পার্টি গঠিত হয়নি _ 'জনদল' তখন পর্যন্ত এরশাদের দল, সেই জনদলের সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রকে বোঝাতে সক্ষম হন যে ফেয়ার ইলেকশন হলে নির্বাচনে তার পক্ষে জিতে আসা সম্ভব নয়, জিতবে আরিফ মৃধাই, অতএব জেতার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তিনি আশা করেছিলেন যে, কেন্দ্র থেকে প্রশাসনের কাছে তাকে সহযোগিতা করার নির্দেশ আসবে _ কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে ফল হলো উল্টোটা। এক মন্ত্রী এই এলাকায় সফরে এসে চাচার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এবং জনদলে জয়েন করে পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচন করার অনুরোধ করলেন _ এবং তা না করলে প্রশাসন যে তার বিপক্ষে কাজ করবে এবং যে কোনো মূল্যে তাকে হারিয়ে দেয়া হবে _ এই হুমকি দিতেও ভুললেন না। চাচার কাছে এই প্রস্তাব ছিলো অপ্রত্যাশিত _ তিনি তখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। স্বাধীনতার পরে, জাসদের প্রবল জোয়ারের সময় তিনি ছিলেন ওই দলের একজন সক্রিয়-অনুগত-ডেডিকেটেড কর্মী। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তিনি সেই যে জাসদ রাজনীতি থেকে সরে এসেছিলেন, আর কখনো কোনো দলের কার্যক্রমে তাকে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়নি। সরকারী দল থেকে এই প্রস্তাব আসার পর তাই তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকেন। নিজের ওপর চাচার যথেষ্ট কনফিডেন্স ছিলো _ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে যে তিনিই জিতবেন এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু মন্ত্রীর এই হুমকির পর নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা করার মতো বোকা তিনি ছিলেন না। তো, নানান বিবেচনায় তিনি অবশেষে জনদলে যোগ দেন, নির্বাচন করেন, এবং বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। কিন্তু এবার বিজয়ী হয়ে তিনি আর আগের মতো নিজের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে পারলেন না। যেহেতু তিনি এখন সরকারী দলের নেতা, এবং নব্য-সৃষ্ট উপজেলা ব্যবস্থায় নতুন করে তৈরি হওয়া টাউট, বাটপার, উঠতি মাস্তানদের _ সবাই-ই সরকারী দল করে _ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে গিয়েই তার জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামে। এইসব টাউট-বাটপার-মাস্তানদের বিরুদ্ধে জনগণের ব্যাপক ক্ষোভ ও অভিযোগকে তিনি আমলে নিতে ব্যর্থ হন _ তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতেও ব্যর্থ হন। আর হবেন না কেন _ এসব মাস্তানদের নেতা ছিলো স্বয়ং তার পুত্র, আমার গুণধর ভাই নিজাম। এহেন কোনো অপকর্ম নেই যা আমার এই ভাইরত্নটি করেনি। অতএব চাচার ব্যর্থতাটা ছিলো ইচ্ছেকৃত ব্যর্থতা। তিনি আসলে এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতেই চাননি, কারণ তখন তিনি প্রায় নিশ্চিত ছিলেন আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তিনিই সরকারী দলের মনোনয়ন পাবেন এবং এরাই তাকে নির্বাচনী যুদ্ধে পার করে নেবে _ যে জনগণের ভালোবাসা আর সমর্থনের ওপর ভর করে তিনি এতদূর এসেছিলেন তিনি তাদের কথা ভুলে গেলেন। কিন্তু এতবড় নির্বাচন করতে হলে প্রচুর টাকার দরকার; তার তো অতো টাকা নেই, সৎভাবে সেটা উপার্জন করাও সম্ভব নয়, তিনি তাই অসৎ পথই বেছে নিলেন। উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার পর উপজেলা ভবন, কোর্ট-কাচারি, অফিসারদেরদের জন্য কোয়ার্টার, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মাণের একটা জোয়ার এসে পড়েছিলো; তার মানে তো বুঝতেই পারছিস _ ঠিকাদারদের দেয়া টেন্ডার একটু এদিক ওদিক করে দিলেই অনেক টাকা। আর ঠিকাদারও তারই লোকজন _ তার আর তার পুত্রের সুনজরে না থাকলে কোনো কাজ পাওয়া তখন প্রায় অসম্ভব ছিলো। আর এইসব কাজে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সমস্ত সরকারী কর্মকর্তাদেরই সহযোগিতা পাচ্ছিলেন। একে তো তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান, দ্বিতীয়ত সরকারী দলের নেতা, তৃতীয়ত একজন জয়েন্ট সেক্রেটারির ছোট ভাই। এতসব ক্রাইটেরিয়া একসঙ্গে কয়জন পূরণ করতে পারেন? চাচার এসব কাজে যে বাবারও কোনো সমর্থন ছিলো না, তা বলা যায় না। এরশাদ সাহেব ক্ষমতায় আসার পর যে কয়জন সরকারী আমলা তার সঙ্গে দেখা করে তাকে সর্বাত্নক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন, আমার বাবা তাদের একজন। অতএব সরকারী দলের সংসদ সদস্য হবার জন্য নিজের ভাই যা যা করছে তাতে তার প্রকাশ্য না হলেও প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকারই কথা। যাহোক, ততোদিনে জনদল বিলুপ্ত হয়ে জাতীয় পার্টি গঠিত হয়েছে, চাচা ওই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতেও স্থান পেয়েছেন _ সংসদ সদস্য না হওয়ার কোনো কারণও তিনি খুঁজে পাননি। কিন্তু এবার তার হিসাবে ভুল ছিলো। তার জনপ্রিয়তায় যে ধ্বস নেমেছে _ সেই খবর কেন্দ্রে ঠিকই পেঁৗছে যায়, তার মূল্য কমে যায়, ওদিকে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন, এবং সংসদ নির্বাচনে পার্টির নমিনেশন পান, ফলে চাচা সাফল্যের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েন। যাই হোক, সেই বিচারপতিকে যখন উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তখন ওই শূন্য আসনের উপনির্বাচনেও চাচাকে নমিনেশন না দিয়ে অন্য একজন লোককে দেয়া হলে চাচা একেবারে ভেঙে পড়েন। এরই মধ্যে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠছিলো _ ওই অঞ্চলে বিরোধী দলগুলোর অবস্থা তেমন ভালো না হলেও সেই আন্দোলনের ঢেউ একটু-আধটু সেখানে গিয়েও পেঁৗছেছিলো। এরশাদের পতনের সময় বিরোধী দলগুলোর স্থানীয় শাখা এরশাদের সহযোগীদের গণশত্রু এবং এলাকায় অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। চাচার রাজনৈতিক জীবনে দুর্যোগ নেমে আসে। একানব্বইয়ের ইলেকশনের আগে তিনি আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু-দলের সঙ্গেই যোগাযোগ করেন _ কিন্তু যেহেতু নব্বইয়ের গণঅভূ্যত্থান তখনও পুরনো হয়ে যায়নি আর এসব দল কোনো গণশত্রুকে নিজ দলে জায়গা দেবে না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলো _ তিনি তাই সুবিধা করতে পারেননি। এদিকে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা ব্যবস্থাও বাতিল করে দেয় _ ফলে তার আর উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগও থাকে না। তবে টাকার জোরে আর ভাইয়ের জোরে তিনি তার প্রভাব এতটুকু টলে পড়তে দেননি। এমনকি রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টায় বিভিন্ন দলে যোগ দেয়ার সাধনাও প্রাণপনে করে যাচ্ছেন তিনি ...'

অনেকক্ষণ ধরে আসিফের কথা শুনতে শুনতে আমি অবাক হচ্ছিলাম _ কেউ কি তার নিজের পরিবারের এতসব অপকর্মের কথা এত অকপটে স্বীকার করে? নাকি এটা ওর এক ধরনের কনফেশন _ স্বীকারোক্তি? ওকে একটু খোঁচানোর জন্যই আমি বললাম _ তুই তো রীতিমতো একটা গণবিরোধী পরিবারের সন্তান, তুই কিভাবে বিপ্লবী রাজনীতিতে এলি?

আসিফ বললো _ আমি সত্যিই গণবিরোধী পরিবারের সন্তান, কিন্তু এরকম একটি পরিবারের সন্তান হয়ে কেউ বিপ্লবী রাজনীতিতে আসতে পারবে না এমন কোনো কথা তো কোথাও লেখা নেই। আসলে বিপ্লবী হওয়ার জন্য একজন লোকের তো পারিবারিক ঐতিহ্যের কোনো প্রয়োজন নেই, তাকে কেবল শ্রেণীচু্যত হতে হয়। কাজটা অবশ্য খুব সহজ নয় _ তবে সচেতন হলে আর চেষ্টা থাকলে সেটা সম্ভব। আমি সেই চেষ্টাটাই করে যাচ্ছি...

এইসব গল্প করতে করতে আমরা যখন আসিফদের বাড়িতে পেঁৗছলাম, তখন বিকেল। আসার সময় যতোটুকু দেখেছি তাতে এই গ্রামকে বিশেষ কিছু মনে হয়নি। ওদের বাড়িটা অবশ্য বেশ সুন্দর। বিশাল বাড়ি, মূল ঘরটা পাকা _ অর্থাৎ দালান, এ ছাড়াও বাড়ির ভেতর দিকেই আছে আরো দুটো ঘর, বাইরের দিকেও বেশ বড়সড় একটা ঘর _ সম্ভবত অতিথিদের জন্য, বা চাচার কাছে আসা লোকজনকে বসানোর জন্য। গ্রামের বনেদি বাড়িগুলো যেমন হয় আর কি। বাড়ির পুবদিকে আবার একটা বিরাট পুকুর। সম্ভবত সেটাও এ পরিবারের আভিজাত্যেরই অংশ _ অন্তত মাছচাষ বা এই ধরনের কোনো বাণিজ্যিক কারণে যে সেটা তৈরি করা হয়নি, তা পুকুরের আকার, শানবাঁধানো ঘাট, পুকুরের চারপাশে বাগানের মতো করে যত্ন করে গড়ে তোলা গাছের সারি ইত্যাদি দেখলেই বোঝা যায়। পুরনো রাজবাড়ি-টাড়ি ছাড়া এই ধরনের পুকুরও আর চোখে পড়েনা। তো, সেই পুকুরের গা ঘেঁসেও একটা ঘর আছে। ঘরটা আমার খুব পছন্দ হয়ে গেলো। আসিফকে বললাম, আমরা এ ঘরেই থাকবো, তুই ব্যবস্থা কর। এসেই যখন পড়েছি সময়টা যতোটা সম্ভব ভালোভাবে কাটানোর চেষ্টা করা ভালো।

আমাদের দেখে মিলি খুব খুশি। আমাকে বললো _ আপনি আসবেন ভাবতেই পারিনি। আসিফকে বললো _ আজকে এসে খুব ভালো করেছিস দাদা।  কেন, আজকে বিশেষ কিছু আছে নাকি?
হঁ্যা, খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার।
কি সেটা?
আজকে একটা সালিশ আছে। আমাদের বাড়িতেই বসবে। বাবাই বিচারক।
এটা এমন কি বিশেষ ব্যাপার? চাচা নিশ্চয়ই এই প্রথম বিচার-শালিস করছেন না!
তা না হলেও এটার গুরুত্ব তুই পরে বুঝতে পারবি।
মিলির এই উচ্ছ্বাসের বিপরীত প্রতিক্রিয়া অবশ্য দেখা গেলো তার বাবার মধ্যে। আসিফকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বললেন, এমন হঠাৎ করে আসলা কেন? আর আসলাই যখন বন্ধুকে নিয়ে আসলা কেন?
আমি কখনো খবর দিয়ে আসি নাকি?
তা আসো না। কিন্তু বন্ধুকে নিয়ে আসলে তো একটু আগে থেকে জানাইতে হয়!
ওওটা নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। ওর সাথে কোনো ফর্মালিটির দরকার নেই...

তাদের এই আলাপ শোনার পরও আমার কোনো সংকোচ হলো না। হঠাৎ করে বাড়িতে অতিথি হাজির হলে, বিশেষ করে সে যদি একেবারে নতুন কোনো অতিথি হয়, গৃহকর্তা একটু বিব্রত হনই। তাকে তো আদর-আপ্যায়নের কথা ভাবতে হয়! কিন্তু আসিফ বললো ভিন্ন কথা _ 'মনে হচ্ছে চাচা আমাদের আসাটাকে স্বাভাবিকভাবে নেননি। আমার ধারণা এর সঙ্গে আজকের ওই সালিশের কোনো সম্পর্ক আছে। চাচা বোধহয় সেখানে আমাদের উপস্থিতিটা বিপদজনক বলেই ভাবছেন। সেক্ষেত্রে আমাদের উপস্থিত থাকাটাই তো জরুরী, নাকি বলিস? ভদ্রলোক তো লোক সুবিধের না। যাকগে সেটা পরে দেখা যাবে, এবার চল নদীর পার থেকে ঘুরে আসি।' আআমার জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছিলো। বাড়ির এত কাছে এত বিশাল একটা নদী আছে _ কল্পনাই করিনি। আসিফ অবশ্য এই নদীর গল্পও অনেক করেছে। কিন্তু সেটা যে এত বিশাল তা ভাবতে পারিনি। রীতিমতো কূল নাই কিনার নাই অবস্থা। অর্থাৎ নদীর ওই পাড় দেখা যায় না। শেষ হেমন্তের শান্ত পদ্মা। মৃদু মন্দ হাওয়া বইছে। আকাশ পরিষ্কার। বিশাল লাল সূর্যটা পদ্মায় ডুব দেবো দেবো করছে _ এমন অসাধারণ সূর্যাস্ত আমি কক্সবাজারেও দেখিনি। মুহূর্তের মধ্যেই এ গ্রামকে ভালো লেগে গেলো আমার। এরকম সূর্যাস্ত দেখার জন্য হলেও এ গ্রামে মাসখানেক থেকে যাওয়া যায়। অবশ্য সেখানেই মুগ্ধতার শেষ নয় _ আমার জন্য আরো বিস্ময় ছিলো। সন্ধ্যা হতে না হতে কুয়াশা পড়তে শুরু করলো, আমি যেন কুয়াশার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। বললাম _ এই আসিফ, তোর গ্রামের সব লোকের তো কবি হয়ে যাবার কথা। এখানে কোনো কবি নেই?

পেটে ভাত নেই, কবিতা লিখবে কখন! খালিপেটে শিল্পচর্চা হয় না।

এরকম একটা চমৎকার মুহূর্তে আসিফের এমন বস্তুবাদী কথা মোটেই ভালো লাগলো না আমার। হয়তো সেটা বুঝেই _ কিংবা স্বতঃস্ফূর্তভাবেও হতে পারে _ ও বললো, অথচ অদ্ভুত ব্যাপার কি জানিস, পেটে ভাত না থাকলেও এদের মনটা কবির মতোই। এরা যতোটা না বাস্তব জগতে তারচেয়ে বেশি ভাবের জগতে বিচরণ করে। আমি অনেকদিন ধরে এদের বোঝার চেষ্টা করছি। এত অভাব এত দারিদ্র নিয়েও এরা এত ভাব পায় কোথায়? সুর এদের এত টানে কেন? কোনোরকমে দু-বেলা খাবার জোটাতে পারলেই এদের আর কিছু চাই না। এরা তখন ছুটবে গান শুনতে। কিভাবে তা সম্ভব?

এইভাবে আমাদের নানারকম গল্প চললো। কিন্তু আমি সম্ভবত মূল গল্প থেকে আপনাদেরকে বেশ দূরে নিয়ে এসেছি। এবার বরং প্রসঙ্গে ফেরা যাক। নদীর পাড় থেকে বেড়িয়ে বাড়ি ফিরে আমরা দেখলাম _ বেশ কিছু লোক এসে জড়ো হয়েছে। বোঝা গেলো _ এরা ওই সালিশ উপলক্ষেই এসেছে। আসিফ বলছিলো _ 'এই সালিশের ব্যাপারটা ভীষণ ইন্টারেস্টিং এবং উত্তেজনাকর। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোও যে এমন পঁ্যাচ মেরে কথা বলতে পারে, অদ্ভুত সব যুক্তিতর্ক হাজির করতে পারে, না দেখলে সেটা বিশ্বাস হবে না। আর একটা ব্যাপার হচ্ছে _ এখানে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তার অনেক কিছুরই কোনো আইনগত ভিত্তি নেই, অথচ সিদ্ধান্ত একবার নেয়া হয়ে গেলে সেটা অভিযুক্তকে মেনে নিতেই হবে _ এর কোনো বিকল্প নেই। যুগ যুগ ধরে এই ব্যবস্থা চলে এসেছে _ গ্রামের মানুষ এইভাবে তাদের কলহ-বিবাদ-ঝগড়া-ফ্যাসাদের মীমাংসা করে এসেছে। সেইসব মীমাংসা যে সব সময় সঠিক ছিলো তা নয়, কিন্তু এর সামাজিক ভিত্তিটা নিশ্চয়ই শক্ত, নইলে এত দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপারটা টিকে থাকার কথা নয়।'

পত্রপত্রিকায় এইসব গ্রাম্য সালিশের কথা এত পড়েছি, এত বিতর্ক হয়েছে এসব নিয়ে যে, এতে উপস্থিত থাকাটাও এক বিশেষ ব্যাপার বলে মনে হলো আমার। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো অন্য জায়গায়। আসিফকে ডেকে ওর চাচা বলে দিলেন _ সালিশে ওর এবং আমার উপস্থিত থাকার দরকার নেই। এইসব গ্রাম্য পলিটিক্সের কিছুই নাকি আমরা বুঝবো না, খামোখা এ সম্বন্ধে একটা ভুল ধারণা তৈরি হবে। কিন্তু আসিফ ব্যাপারটাকে নিলো রাজনৈতিকভাবে। চাচা ব্যাপারটা নাকি ওর কাছে এমনভাবে বলেছেন যে ওর মনে হয়েছে _ এই সালিশের রায় পূর্বনির্ধারিত। এবং যেহেতু আজকের সালিশের অপরাধী এ বাড়িরই রাখাল, তাই সালিশের রায় যাবে তার পক্ষে। যে মেয়েটা অভিযোগ এনেছে সে ন্যায্য বিচার পাবে না। জানা গেলো স্থানীয় এক মাঝির মেয়ে লিলিকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই বাড়ির রাখাল আসলাম তার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করেছে, কিন্তু এখন সে সেটা অস্বীকার করছে। লিলির বাবা তাই চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে বিচার দাবি করেছে। ওই মাঝি নিতান্তই দরিদ্র মানুষ, অথচ অদ্ভুতভাবে তার পক্ষে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছে এবং তারা এর একটা বিহিত-ব্যবস্থা করতে চায়, আসলামের শাস্তি চায়।

চাচার নিষেধ না শুনে আমরা সালিশে গেলাম। গ্রামের প্রায় সব মানুষ কুয়াশায় ভেজা ঘাসে বসেছে, একমাত্র চেয়ারটিতে চাচা বসা। মাটিতে বসা মানুষগুলোর বিপরীতে তার বড়সড় চেয়ারটাকে রীতিমতো বিশাল দেখাচ্ছে। আর সেই বিশাল চেয়ারের গা ঘেঁসে বসা লিলিকে লাগছে একটা পুতুলের মতো। আমি দেখে অবাক হলাম। একেবারে বাচ্চা একটা মেয়ে। কতোইবা বয়স হবে _ ষোল কি সতের! আমরা গিয়ে দাঁড়ালে চাচা প্রায় জ্বলন্ত চোখে আমাদের দিকে তাকালেন _ কিন্তু কিছু বললেন না। আসলাম গিয়ে আরো দুটো চেয়ার নিয়ে এলো। আমার মনে হলো আসিফকে দেখে একধরনের ফিসফিসানি শুরু হয়েছে, এবং মাঝির পক্ষের লোকজন বলছে _ আসিফ মিয়াসাব আইছে, চেয়ারম্যান সুবিধা করবার পারবো না।

এর মানে কি? এই লোকগুলো কি আসিফকে একটা ভরসার জায়গা হিসেবে দেখে? আসিফ কি এখানে এসেও বিপ্লব ও মুক্তির মন্ত্র শোনায়? কখনো জানা হয়নি তো! সালিশের শুরুতে চাচা প্রায় আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে আসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহের উল্লেখ করে জানতে চাইলেন _ আসলাম, তোর কি কওনের আছে ক'।
আসলাম সমস্ত অভিযোগ একবাক্যে অস্বীকার করে বললো _ আমি তো ওর লগে তেমুন কতাও কই না, অন্য সবাইর লগে দেখা হইলে যেমুন _ কেমুন আছ ভালো আছি _ রকমের কতা অয়, ওর লগেও তাই অয়। ওই ছেমরি আমারে ফাঁসানোর লাইগা এইসব কতা কইয়া বেড়াইতেছে। আমি উপস্থিত সক্কলের কাছে এর বিচার চাই।
বেশ নাটকীয় বক্তব্য _ সন্দেহ নেই। অভিযুক্ত নিজেই এবার বিচার চেয়ে বসেছে! আসরে একটা গুঞ্জন উঠলো। কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব সেখানেই থামলেন না, লিলিকে উদ্দেশ্য করে বললেন _ তোর কি কওনের আছে ক' লিলি।
ললিলি চুপ করে রইলো।

ওই ছেমরি, তোরে কতা কইবার কইছি _ চাচা প্রায় হুংকার দিয়ে উঠলেন। কিন্তু এবারও সে চুপ। একটুক্ষণ পরই গুনগুন একটা শব্দ পেয়ে মনে হলো মেয়েটা কাঁদছে। কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব এসব কান্নাকাটিতে গলবেন না, তার হুংকার শুনেই সেটা বোঝা গেলো। এই ছেমরি ফ্যাছফ্যাছ কইরা কানবি না। যা জানতে চাইছি হেইডা ক'।
লিলি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, কসম-টসম কেটে, মা-বাবার মাথা খেয়ে যা বললো তা এই _ আসলাম তাকে মসজিদের সামনে নিয়ে ওর মাথায় হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছে, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তারপর? _ আবার হুংকার।
হেরপর হে আমারে করছে।
আমি একেবারে চমকে উঠলাম। এরকম ভরা মজলিসে এতগুলো লোকের সামনে _ যেখানে মেয়েটার মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্নীয়-স্বজনও রয়েছে _ এভাবে কেউ তার গোপন সম্পর্কের কথা ফাঁস করে দেয়? কিন্তু ব্যাপারটা ওখানেই শেষ হলোনা, চাচা বললেন _
কই করছে?
ওই বাংলা ঘরে নিয়া করছে।
মিছা কতা, এক্কেরে মিছা কতা _ আসলামের চিৎকার শোনা গেলো।
অঅই তুই চুপ থাক _ চাচা বললেন _ এই মিয়ারা তোমরা কেউ কিছু দেখছো?

প্রশ্নটা করার সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝে গেলাম _ এই সালিশের রায় আসলামের পক্ষেই যাবে। এটা সেই প্রাচীন সমস্যা। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ চাই। এই সুদূর গ্রামাঞ্চলে একটি সালিশের পক্ষপাতদুষ্ট বিচারক যেমন এই প্রশ্ন তোলেন দেশের উচ্চ আদালতও একই প্রশ্ন তোলে। মনে হয় আমরা যেন এখনো দেড় হাজার বছর পেছনে পড়ে আছি; যখন বলা হয়েছিলো _ 'জেনা' বা অবৈধ সঙ্গমের শাস্তি দিতে হলে সাক্ষীর প্রয়োজন হবে, এবং সেই সাক্ষী যেমন তেমন হলে চলবে না; কেউ যদি _ 'কালির দোয়াতের মধ্যে কলম প্রবিষ্ট অবস্থায়' নারী-পুরুষকে দেখে থাকে একমাত্র তার সাক্ষ্যই গ্রহণযোগ্য হবে! ভাবটা এরকম যে, নারী পুরুষ কাউকে দাঁড় করিয়ে রেখে মিলিত হবে _ যেন সে তাদেরকে 'কালির দোয়াতের মধ্যে প্রবিষ্ট কলম' অবস্থায় দেখতে পায়!

যদিও ঐ প্রশ্ন থেকেই এই সালিশের বিচারকের ভূমিকাটি খুব স্পষ্টভাবে বেরিয়ে এসেছিলো, এবং সালিশের রায় সম্বন্ধেও আগাম ধারণা করা গিয়েছিলো _ কিন্তু সেই পূর্বনির্ধারিত রায়টি দিতেও তাকে বেশ বেগ পেতে হলো। কারণ _ যদিও কেউ তাদেরকে মিলিত হতে দেখেনি; দেখা যে সম্ভব নয় সেটাও একজন উল্লেখ করতে ভুললো না; কিন্তু অনেকেই এমন অনেককিছুই দেখেছে যা তাদের প্রেমময় সম্পর্কেরই প্রমাণ দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের এসব বিবরণ আসিফের চাচাকে বেশ বিপদেই ফেলে দিলো বলে মনে হলেও অচিরেই তিনি তার ব্যক্তিত্ব ফিরে পেলেন। হুংকার দিয়ে বললেন _ এইসব দিয়া কি প্রমাণ করা যাইবো যে আসলাম লিলিরে করছে? এই মাগি তো একটা বেশরম, বেহায়া _ মুখে কোনো কতাই আটকায় না, এতগুলান মাইনষের সামনে ফট কইরা এমুন একখান কতা কইয়া ফালাইলো। ময়মুরুবি্বর মান্যিগন্যিও ছেমরির মধ্যে নাই। আমি কই কি মিয়ারা _ জলিল মাঝির মাইয়াগুলার জইন্যে এই গ্রামে ঝামেলা শুরু অইছে। এক গণ্ডা মাইয়া তার, সবগুলাই খানকি স্বভাবের, তোমাগো পোলাগুলার চরিত্র নষ্ট করতাছে। বিচার করতে হইলে এই মাঝিরই করন লাগে আগে। কি কও তোমরা?

চাচার অনুগতরা _ জি্ব চেয়ারম্যান সাব ঠিকই কইছেন _ বলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো। মাঝির পক্ষের লোকজন _ তাদের কোনো নেতা নেই বোঝা গেলো _ মিইয়ে গেলো। একজনকে শুধু মিনমিন করে বলতে শোনা গেলো _ আসিফ ভাইজান কিছু কন। হহে কি কইবো? _ চাচা আবারও হুংকার ছাড়লেন _ হে কি এইখানে থাহে, না কিছু জানে? দুইদিনের জইন্যে পুলাডা বাড়িতে আইছে, খামাখা তারে এসবের মধ্যে জড়াইতে চাও ক্যান?

কিন্তু প্রসঙ্গটা উঠে যাওয়ার পর তারা এবার বেশ সাহসী। বেশ কয়েকজন একসঙ্গে বললো _ এইখানে না থাকলে কি অইবো, ভাইজান আমাগো সুখ-দুঃখ বুঝে। আপনি কিছু কন ভাইজান।

পরিস্থিতির এই আকস্মিক পরিবর্তনে আসিফকে বেশ নার্ভাস মনে হলো। সে এতক্ষণ পর্যন্ত চুপ করেই ছিলো _ এমনকি তার অনুভূতি কি তা-ও বোঝা যাচ্ছিলো না _ এবারও চুপ করেই রইলো। আসিফের নীরবতা দেখে লোকজন আবার দাবি করলো _ ভাইজান আপনে কিছু কন। আপনের কি মনে অয় হেইডাই নইলে কন, আমরা হুনি।

কিন্তু আসিফ এমন চুপচাপ হয়ে আছে যে, মনে হলো, সে বোবা হয়েই জন্ম গ্রহণ করেছে। তার এই নীরবতাই বোধহয় চাচাকে বুঝিয়ে দিলো, আসিফ তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবে না। ওকে নিয়ে চাচার যে ভয়টি প্রথম থেকেই কাজ করছিলো _ আসিফ বোধহয় তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে _ সেটা কেটে যাওয়ায় এবার তিনি বেশ নরম। স্নেহের সুরে আসিফকে বললেন _ বলো বাবা আসিফ, লোকজন তোমার কথা শুনতে চায়। তুমি শিক্ষিত ছেলে, এরা তোমাকে আপন লোক মনে করে তোমার কথা শুনতে চাইছে _ তোমার যা ইচ্ছে কিছু একটা বল। পপরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ চাচার নিয়ন্ত্রণে _ রাজনীতি না করলেও এই সাধারণ ব্যাপারটি বুঝতে মোটেও কষ্ট হলো না আমার। আসিফ যে আর কথা বলবে না সেটাও বুঝতে পেরেছি। বিপ্লবী আসিফ এবার ম্রিয়মাণ, ম্লান। একদিকে চাচা, তাদের পরিবার ও পরিবারের সম্মান, অন্যদিকে অপেক্ষমান জনতা _ যাদের মুক্তি ও অধিকারের কথা বলতে বলতে সে জীবনটাই পার করে দিচ্ছে! সে কোনদিকে যাবে? আমি বুঝতে পারছি, ও এক অদ্ভুত সংকটে পড়েছে। অন্য যে কারো জন্য হয়তো এটা কোনো সংকটই নয় _ মানুষ নির্দ্বিধায় তার পরিবারের পক্ষেই যায়, কিন্তু ও তো সমাজ বদলের রাজনীতি করে, এত সহজে তাই জনগণের বিরুদ্ধে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভবপর হয় না। শেষ পর্যন্ত বারবার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সে কেবল বলতে পারলো _ আমি আর কি বলবো। আপনারা দশজন যা ভালো মনে করেন তাই করেন।

চাচাকে স্পষ্টতই খুশি ও সন্তুষ্ট মনে হলো। হৃষ্টচিত্তে তিনি রায় ঘোষণা করলেন, শোন মিয়ারা, আমাগো কতা একটাই। তোমাগো পোলাগুলানরে বাঁচানোর লাইগা জলিল মাঝিরে এই গ্রাম ছাইড়া চইলা যাইতে অইবো। আমি আর কোনো শাস্তি দিলাম না _ মাঝিরেও একমাসের সময় দিলাম, সে যেইখানে পারুক সেইখানে গিয়া ঘর তুলুক, কিন্তু এই গ্রামে আর না।

জলিল মাঝি কান্নায় ভেঙে পড়লো। কেঁদেকেটে আমার জন্য প্রায় দুর্বোধ্য এক ভাষায় সে যা বললো তার অর্থ এই রকম _ সে গরীব মানুষ, এতগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে সে এখন যাবে কোথায়? ইচ্ছে করলেই অন্য কোথাও গিয়ে বাড়ি করা যায় নাকি? কেঁদেকেটে নিজের দুর্ভাগ্যের বিবরণ দিয়ে সে চাচার পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো _ আমারে এইবারের মতোন মাপ কইরা দ্যান চেয়ারম্যান সাব, মাইয়াগুলারে আমি পিটাইয়া মাইয়া ফেলুম, ওগোরে আর ঘর থেইকা বাইর অইতে দিমু না...

দৃশ্যটা মর্মান্তিক। বেচারা বিচার চেয়ে বিপদে পড়েছে। আমার আর ভালো লাগছিলো না। এইসব দেখার চেয়ে না দেখাই ভালো ছিলো। পত্রপত্রিকায় গ্রাম্য সালিশের যে বিবরণ পড়েছি _ প্রকৃত অর্থে এটা তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর ও অমানবিক। আমি নিঃশব্দে উঠে গিয়ে বাড়ির বাইরের দিকে গিয়ে দাঁড়ালাম। আকাশে বিশাল চাঁদ উঠেছে। জোসনায় ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী _ প্রকৃতির এই তীব্র রূপ যে কোনো মানুষকে মুগ্ধ করে দিতে পারে, সমস্ত গ্লানি ও বেদনা মুছে দিতে পারে _ কিন্তু এই মুহূর্তে আমার কিছুই ভালো লাগছিলো না, বরং এই পরিবেশে প্রকৃতির এই রূপ-ঐশ্বর্যকে মনে হচ্ছিলো নিষ্ঠুর, বিবেচনাহীন। আর কিছু নয় _ আসিফের ভূমিকাটা কিছুতেই মানতে পারছি না আমি। ও কেন কিছুই বললো না? ঘটনা সম্বন্ধে কিছু না জানলেই কি _ বিচারের রায়টা নিয়ে তো কথা বলতে পারতো! এমনকি মেয়েটিও যদি অপরাধ করে থাকে, তার শাস্তি কেন পেতে হবে পুরো পরিবারটিকেই _ তারা কেন বাস্তুচু্যত হবে! ককিছুক্ষণের মধ্যেই সভা ভাঙলো _ লোকজন ফিরে যেতে শুরু করলো; আর যাবার সময় বলাবলি করতে লাগলো _ কামডা চেয়ারম্যান সাব ভালো করলো না; _ হে ঠিকই বুঝবার পারছে, বুইঝা শুইনা এমুন বিচারডা করলো; _ জলিল মাঝির উপর তার রাগ আছে। হের পুলাও তো ওই ঘরে যাওয়া আসা করে, হেইডা কি আর হে জানে না? _ এইসব টুকরো কথায় আমার ধারণাটা যেন খানিকটা পরিষ্কার হয়। তার মানে আসিফের ভাই নিজামও জলিল মাঝির মেয়েদের দিকে হাত বাড়িয়েছে। নিশ্চয়ই এর বিচার চাওয়ার সাহস হয়নি মাঝির, চেয়েছিলো রাখালের বিরুদ্ধে _ কিন্তু তাও হলো না। আমার মনে হচ্ছিলো _ এই মাঝির ওপর আসিফের চাচার কোনো কারণে ভীষণ রাগ আছে। নইলে এই শালিসের রায়টা এত নিষ্ঠুর হতো না। তিনি যদি তার রাখালকে ফেভারও করেন, তাকে শাস্তি না-ও দেন, তবুও তো মাঝির বিরুদ্ধে এমন একটি রায় দেয়া সম্ভব নয়। এখন বোঝা যাচ্ছে _ এই মাঝিরই কোনো এক মেয়ের সঙ্গে স্বয়ং তার গুণধর পুত্র জড়িয়ে পড়েছে, যা তার জন্য শুধু বিব্রতকরই নয়, অপমানজনকও বটে। যদিও এতে জলিল মাঝির কোনো দোষ নেই, কিন্তু চাচা তার রাগটা ঝাড়ারও কোনো জায়গা পাচ্ছেন না বলে মাঝির ওপরেই ঝাড়লেন।

একটুক্ষণ পর আসিফ এসে আমাকে ডাকলো _ চল, ভেতরে চল, এই শীতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

সত্যি বেশ শীত লাগছিলো আমার। ঢাকায় এখনো রীতিমতো গরম, অথচ এখানে শীত পড়ে গেছে, সন্ধ্যা হতে না হতে কুয়াশা পড়ছে _ পরিবেশটাই অন্যরকম। আজকের এই সালিশটা না হলে সময়টাকে বেশ উপভোগ করা যেত। কিন্তু উপভোগ করা দূরে থাক, আমার কথা বলতেই ভালো লাগছিলো না, মন খারাপ লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো _ এইরকম অবিচার না জানি সারা দেশের কতো জায়গায়ই ঘটে চলেছে _ আমরা, শহরবাসী মানুষরা, যার খবরও রাখি না। আসিফের সঙ্গে বাড়ির ভেতরে এসেও আমার কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কথা বলে না আসিফও। কে জানে ও কোনো কৈফিয়ত দিতে চাইছে কী না। সে চেষ্টা করলে আজকে কঠিন কঠিন কিছু কথা শুনিয়ে দেবো আমি।

কিছুক্ষণ পর খাওয়ার ডাক পড়লো। টেবিলে আমাদের সঙ্গে চাচাও খেতে বসলেন। বেশ সহজ-স্বাভাবিক তিনি। যেন যা করেছেন তাতে কোনো ভুল নেই, কোনো অন্যায় নেই। অদ্ভুত! একেই বোধহয় পলিটিশিয়ান বলে! খেতে বসে সহজভাবেই গল্প শুরু করলেন তিনি _ আসিফের বাবা মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন, আমার বিষয়ে নানা কথা জানতে চাইলেন। কিন্তু আমাদের দুজনকেই দায়সারা গোছের উত্তর দিতে দেখে হয়তো চাচা কিছু অনুমান করেই আসিফকে উদ্দেশ্য করে বললেন _ আমি জানি বাবা, এই ঘটনায় তুমি আমার ওপর রাগ করে আছো। এ-ও মানি _ আমি জলিল মাঝির ওপর অবিচার করেছি। আসলামের সঙ্গে যে লিলির কোনো সম্পর্ক নেই, তা তো নয়। নিশ্চয়ই আছে, নইলে মেয়েটা এত জোর দিয়ে বলতে পারতোনা। কিন্তু তারপরও আমাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলো কেন জানো? কারণ _ আসলাম ব্যাপারটা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। ওদের সম্পর্কের ব্যাপারটা মেনে নিলে ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে হতো। গ্রামের মানুষের ধারণা _ বিয়েই সকল সমস্যার সমাধান। কিন্তু যে ছেলেটি তার সম্পর্ককে এভাবে অস্বীকার করে _ তেমন একটা বদমাশ ছেলের কাছে মেয়েটার বিয়ে দেয়া কি ঠিক হতো? হতো না। বিয়ে দিলে হয়তো গ্রামের মানুষ শান্তি পেতো, ভাবতো আমি একটা বড়ো কাজ করেছি, ন্যায় বিচার করেছি। কিন্তু তারপর? এরকম একটি বিয়ের পর আসলাম লিলির সঙ্গে খুব ভালোভাবে সংসার করতো বলে কি তোমার মনে হয়? না, করতো না, বরং একবছরের মাথায় তালাক দিতো। তা ছাড়াও আরেকটি ব্যাপার আছে। ওই যে কতোগুলো লোক দেখলে যারা মাঝির পক্ষে খুব সোচ্চার, ভেবো না ওরা নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমনটি করেছে _ এরা সব ইয়াসিন খানের লোক। সে সবসময় আমাকে বিব্রত করার তালে আছে, একটা করে ইসু্য খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি যদি এইরকম একটা রায় না দিতাম, তাহলে ইয়াসিন খান জিতে যেত। হাটে-ঘাটে এমনভাবে এসব বলে বেড়াতো যেন আমার রাখাল নয়, কাজটা আমিই করেছি। আমি সে সুযোগ তাকে দেবো কেন? এই রায়ের মাধ্যমে আমি তাকে বুঝিয়ে দিলাম _ আমি যা চাইবো তাই হবে, তার কিংবা তার ভাড়াটে বাহিনীর সাধ্য নেই এর অন্যথা করে। এসব বড়ো নোংরা পলিটিক্স বাবা, তুমি বুঝবে না। তুমি যে রাজনীতি করতে চাও, সেরকম বিশুদ্ধ রাজনীতি কোথাও পাবে না। তবে হঁ্যা, জলিল মাঝি পরিস্থিতির স্বীকার। দুজন প্রভাবশালী লোকের ক্ষমতার রেষারেষিতে সে হলো ভিকটিম। সে যদি এভাবে প্রকাশ্যে বিচার না চেয়ে আমার কাছে গোপনে এসে এর প্রতিকার চাইতো, আমি নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করতাম। তাকে যে গ্রাম ছাড়ার কথা বলেছি সেটাও করতে হবে না _ এ নিয়ে ইয়াসিন খানকে কোনো ঘোঁট পাকানোর সুযোগই দেবো না। সে আমার সঙ্গে এসব খেলায় জিততে পারবে না। ইয়াসিন কোনোভাবেই আমার চেয়ে বড় পলিটিশিয়ান নয়।

আসিফ অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলো, এবার মুখ খুললো, বললো, আমি আপনাদের এইসব রাজনীতি সত্যিই বুঝি না। কিন্তু রাজনীতির নামে যা করছেন তাকে আমি ঘৃণা করি।

করাই উচিত _ চাচা একেবারে স্বাভাবিক, আসিফের কথায় এতটুকু রাগলেন না _ একে তুমি ভালোভাবে দেখলে আমি বরং দুঃখই পেতাম। তোমার বয়সটা তো এসব মেনে নেয়ার নয়। তোমার বয়সে আমিও খুব স্বাপি্নক ছিলাম। সাম্যের সমাজ, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলতে বলতে আর ভাবতে ভাবতে আমার দিন কেটে যেত। আমি ঘুমোতে যেতাম সমাজতন্ত্রের কথা ভাবতে ভাবতে, ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতাম সমাজতন্ত্রের, ঘুম ভাঙতোও সমাজতন্ত্রের কথা ভাবতে ভাবতেই। তোমার ব্যাপারটা আমি তাই বুঝি। তোমাকে একটা কথা বলি বাবা _ এই ধরনের রাজনীতি যারা করে, তাদের মধ্যে একসময় হতাশা আসবেই। সেটা আসার আগেই তুমি রাজনীতি ছেড়ে দিও। রাজনীতি বড় খারাপ জিনিস, রক্তের মধ্যে এর পোকা ঢুকে যায়, কোনোভাবেই ছাড়া যায় না। কিন্তু আমার মতো এমন রাজনীতি করার চেয়ে না করা অনেক ভালো।

ঘরে এসে আমার মনে হচ্ছিলো _ এটা কি চাচার কনফেশন? এককালে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা মানুষের পতন-পরবর্তী পাপ-স্বীকার? আমার মজাই লাগছিলো। এই ফ্যামিলিটা বোধহয় কনফেশন করতে ভালোবাসে। আসার পথে যেমন আসিফ করেছিলো, এখন যেমন চাচা করলেন, সুযোগ পেলে হয়তো আসিফের বাবাও এমনটাই করবেন। যাহোক, সব মিলিয়ে আমি নিজের ওপর খুব বিরক্ত হয়ে উঠলাম, এখানে এসে একটা গাড়লের মতো কাজ করেছি বলে নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। ঢাকা থেকে বাইরে বেরোই রিল্যাক্স করার জন্য, এত জটিল ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার জন্য নয়। কালকেই এখান থেকে চলে যেতে হবে, আসিফ যাক আর না যাক। কিন্তু রাতটা কাটানোও তো সমস্যা। আসিফের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না, এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছে দুজনের মধ্যে, এভাবে রাত কাটানো যায় নাকি? মিলিকেও দেখছি না, এই ঘটনায় ওর প্রতিক্রিয়া কি কে জানে! এক কাপ চা পেলে ভালো হতো, কিন্তু বলি কাকে? _ এই ধরনের নানারকম এলোমেলো চিন্তা মাথায় এসে ভর করছিলো। অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই চাচী এলেন চা নিয়ে, আমি মনে মনে খুব কৃতজ্ঞ বোধ করলাম। আসিফ বললো _ মিলি কোথায় চাচী? ও বোধহয় তোমার ওপর রেগে আছে, চা নিয়ে আসতে বললাম, এলো না।
ওকে পাঠিয়ে দেন, বলেন নইলে চা খাবো না।
মিলি এলো একটুক্ষণ পরই _ ডাকছিস কেন?
বোস না।
না বসবো না, কি বলবি বল।
খুব রেগে আছিস, না?
রাগবো না? _ মিলি যেন একেবারে জ্বলে উঠলো _ মেয়েটার ওপর এত বড় একটা অবিচার করা হলো, আর তুই কিছুই বললি না?
আআমি কি বলবো, আমি কি এর কিছু জানি?

এগুলো কি জানতে হয়? এটা তো একটা কমনসেন্সের ব্যাপার। কোনো সম্পর্ক না থাকলে কোনো মেয়ে গ্রামসুদ্ধ লোকের সামনে এসব কথা বলে? অথচ এটা শোনার পর তোর সামনেই বাবাকে এমন একটা জঘন্য কাজ করতে দেখেও তুই কিছুই বললি না? আসিফ চুপ করে রইলো, আর মিলি বলেই চললো _ বাবা পলিটিক্সে হেরে গেলো কি জিতে গেলো, জলিল চাচাকে এই গ্রাম ছাড়তে হবে কি হবে না সেসব নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই, তোরা যে কেউই মেয়েটার কথা ভাবছিস না, সেটাই আমাকে অবাক করে দিচ্ছে _ বোঝা গেলো আমাদের সঙ্গে যখন চাচা কথা বলছিলেন, মিলি তখন আশেপাশেই ছিলো _ মেয়েটার কি হবে তুই একবারও ভেবে দেখেছিস? এতগুলো লোকের সামনে সে এরকমভাবে তার সম্পর্কের কথা বলেছে, এই কথা দুদিনের মধ্যেই আরো দুচারটে গ্রামে বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়বে । মেয়েটার কি আর কোনো সম্মান রইলো? মানুষের কাছে সে মুখ দেখাবে কি করে? আসলামের সঙ্গে বিয়ে হোক না হোক, অন্তত সে যদি শাস্তি পেতো, তাহলে লিলি একটু হলেও শান্তি পেতো। তুই তো অন্তত এই বিষয়েও কিছু বলতে পারতি!

এবারও আসিফ কোনো কথা বললো না। লিলিই প্রশ্ন করলো _ সত্যি করে বলতো দাদা, কেন তুই এমন চুপ করে ছিলি? তুই এ বাড়ির সম্মানের কথা ভাবছিলি, তাই না? বাবা হেরে গেলে তার সম্মানহানি হয়, আসলামের সঙ্গে লিলির সম্পর্ক স্বীকার করে নিলে স্বয়ং নিজামের ব্যাপারটাও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সেটা হলে এ বাড়ির মান সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে _ এই সব ভাবছিলি তাই না দাদা! আসিফ এবার স্বীকার করলো _ হঁ্যা, ভাবছিলাম।

ছি দাদা, ছি! এই তোর কমিটমেন্ট? এই কমিটমেন্ট নিয়ে তুই বিপ্লবী রাজনীতি করিস? নিজের বাড়ির সম্মানের কথা ভেবে তুই এত বড়ো একটা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলি? ছি! তোর সঙ্গে কথা বলতেও আমার ঘৃণা লাগছে। মিলি দুপদাপ পা ফেলে চলে গেলো। লিলি মেয়েটার জন্য আমার সত্যি খারাপ লাগছিলো। নিশ্চয়ই এতসব জটিলতার কথা ভেবে সে ভালোবাসেনি, এ বাড়ির রাখালকে ভালোবাসলে যে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে, সে হয়তো তা ভাবতেও পারেনি। ভুল জায়গায় এসেছিলো ও। আমার মনে হলো আসিফকে শক্ত কিছু কথা বলা দরকার। মনে হলো বলি : 'তুই না শ্রেণীচু্যত হতে চাস? এই তোর শ্রেণীচু্যত হওয়া? তুই না এ সমাজটাকে বদলে দিতে চাস? এই কমিটমেন্ট নিয়ে তুই সমাজ বদলাবি? এতদিন ভরে আমাকে তুই যেসব কথা বলেছিস সব বাকোয়াজি, ভূয়া; বিপ্লব নয় _ তুই আসলে আমার বালটা ছিঁড়বি।' কিন্তু কিছুই বলা হয়না আমার। অনেকক্ষণ ধরে দুজনের মধ্যে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। আমি কোনো কাজ না পেয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। দেখলাম, মৃদু বাতাসে পুকুরের পানিতে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে আর তাতে চাঁদের আলো পড়ায় মনে হচ্ছে জোসনাগুলো ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে _ অদ্ভুত একটা দৃশ্য। আমার আবার মনে হলো _ প্রকৃতি মানুষের এতসব জটিলতাকে কেয়ার করে না।

আরো কিছুক্ষণ পর দূর থেকে গানের শব্দ ভেসে এলো। মনে হলো কেউ একজন গান গাইতে গাইতে এদিকেই আসছে। হঁ্যা তাই। সম্ভবত পুকুরের ওই পাড় দিয়ে পায়ে চলা পথে হেঁটে চলেছে কেউ। আর নিঃসঙ্গতা বা রাতের ভয় দূর করতে গেয়ে চলেছে _ 
আমি ভাবছিলাম কি এই রঙ্গে দিন যাবে সুজনও নাইয়া
পার করো দুখিনী রাধারে।
তুমি তো সুজনও নাইয়া, আমি যে গোপালের মাইয়া রে
ওরে ও রে নাইয়া
তুমি নষ্ট করলা দুগ্ধভাণ্ড ছুঁইয়া
সুজনও নাইয়া, পার করো দুখিনি রাধারে।

অর্থ না বুঝেও গানের ওই বিষণ্ন সুর কি কারণে জানি না, আমার মন খারাপ করিয়ে দিলো নতুন করে।



অক্টোবর, ২০০২