হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াই। কতোদিন পর প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে হাঁটছি,
তবু থমকে দাঁড়াতে হয়! বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকি। ভুল দেখছি
না তো-
ভেবে, চশমা খুলে কাঁচ মুছি, চোখ মুছি, তারপর আবার চোখে লাগিয়ে
তাকাই। না, দৃশ্যটি চোখের ভুল নয়, এখনো দিব্যি জীবন্ত। পুতুলদি!
পুতুলদি এখানে! অসম্ভব! কিন্তু সেই রকম আলো ঝলমলে হাসি, দীঘল কালো
চুল, মাখনের মতো রঙ, আর কী যে কোমল! সেই বিপুল গভীর মমতা জড়িয়ে আছে
চোখে-মুখে, যেমনটি আমি দেখেছিলাম শৈশব-কৈশোরের চোখ আর হৃদয় দিয়ে,
ঠিক তেমন! হঠাৎ আনিসের-
কি রে কি হলো-
প্রশ্ন শুনে ঘোর ভাঙে আমার। পুতুলদি মরে গেছে সেই কবে-
ফেলে আসা সেই সুদুর কৈশোরে; আজ এতদিন পর কী না তারই মতো একজনকে
দেখে চমকে উঠেছি! আনিস প্রশ্ন করে প্রতীক্ষায় আছে বুঝতে পেরে
জিজ্ঞেস করি-
মেয়েটা কে রে?
কোন মেয়েটা?
আঙ্গুল তুলে দেখাতে ও বলে-
পলি দি।
কোন ডিপার্টমেন্টের?
আমাদেরই।
আগে কখনো দেখিনি তো! কোন ইয়ার?
আমাদের দু-বছরের সিনিয়র। দেখেছিস। আগেও দেখেছিস।
হতেই পারে না। আগে দেখলে আজকে এমন চমকাতাম না।
হয়তো। তুই তো ডিপার্টমেন্ট ছেড়েই দিয়েছিলি। কিন্তু পলিদিকে দেখে
তুই অমন চমকে উঠলি কেন?
আনিসের ওই কথাটি আমাকে একটু নাড়া দিয়ে যায়।
হ্যাঁ,
আমি ছেড়েছিলাম- শুধু ডিপার্টমেন্ট নয়, সবই। মানুষ এবং শিল্প উভয়ই।
একবার ভেবেছিলাম- সব ছেড়ে চলে যাবো দূরে কোথাও। সিদ্ধার্থের মতো
গৃহত্যাগী হবার ইচ্ছেও হয়েছিলো এক সময়। পারিনি। সব ছেড়ে তাই বন্দী
হয়েছিলাম নিজেরই সৃষ্ট নিঃসঙ্গ-বিষণ্ন কারাগারে। আমার সেই কারাগারে
কারো মমতাময় প্রবেশ ঘটেনি। একা একা দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। তারপর এক
সময় নিজেকেই বেরিয়ে আসতে হয়েছে। কেউ ডাকেনি, কেউ প্রতীক্ষায়
থাকেনি।
আনিস প্রশ্ন করে চুপ হয়ে আছে- হয়তো আমার উত্তরের অপেক্ষায়। আমি
কিছুই বলি না, শুধু অপলক তাকিয়ে থাকি পলিদির দিকে। হুবহু পুতুলদি।
একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজনের এতটা মিল থাকতে পারে? আমি বিভ্রমের
মধ্যে পড়ে যাই। এক কিশোরকে ছুটে যেতে দেখি দুই হাত বাড়ানো এক
মমতাময়ী তরুণীর দিকে। আহ! আরেকবার যদি পারতাম অমন ছুটে যেতে!
পুতুলদি ছিলো বুবুর বান্ধবী। সেই সুদুর কৈশোরে তাকে পেয়েছিলাম আমি।
তখনো গায়ে কাদা-মাটি মেখে সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি
শুনি। তখনো মাছ ধরার প্রবল নেশায় জলের কাছাকাছি থাকি সারাদিন। তখনো
মুখ থেকে, শরীর থেকে কৈশোরের নম্রতা উঠিয়ে নেয়নি কেউ। পুতুলদি কি
দেখেছিলো, কি পেয়েছিলো আমার ভেতর?
কথাটি আর কোনোদিন জানা হবে না।
আমি কি খুব মায়াময় ছিলাম- যেমনটি এখনো বুবুরা স্মৃতির জাবর কাটতে
কাটতে বলে? এখনকার এই মুখ দেখে ভাবতে কষ্ট হয় বৈকি! ছোটবেলার একটা
ছবিও নেই আমার কাছে বা আর কারো কাছে। নিজেকে খুব মিলিয়ে দেখতে
ইচ্ছে করে। পুতুলদির সঙ্গে আমার অতো ভাব হয়েছিলো কিভাবে জানি না,
জানার ইচ্ছে হয়। এখন আর অতোকিছু মনেও পড়ে না। ছোটবেলার কতোকিছুই তো
ভুলে গেছি! শুধু কিছু দৃশ্য যেন এখনো জীবন্ত, যেন ধ্রুপদীই হয়ে
গেছে! আর এইসব দৃশ্যের অধিকাংশেই পুতুলদি প্রধান চরিত্র। দীঘল কালো
চুল মেলে দিতো সে, বৈশাখী মেঘের মতো রঙ ছিলো সেই চুলের, কিন্তু
মুখটা ছিলো পূর্ণিমার চাঁদ। আর দু-হাত বাড়িয়ে ডাকতো- 'পল্টুরে, আয়,
আয় না, দেখি কতো তাড়াতাড়ি আসতে পারিস'- আমার বড়শির টোনে হয়তো তখন
টান পড়েছে, অথবা বল নিয়ে গোলাপোস্টের কাছাকাছি, এখন গেলে মাছ কিংবা
গোল মিস হয়ে যাবে, তবু গেছি। ওই অতোটুকু বয়সে মাছ কিংবা গোলই তো
ছিলো আমার কাছে মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়- সেই সবকিছু ফেলে; আমি আমার
সম্পূর্ণ পৃথিবী ফেলেই পুতুলদির বাড়ানো হাতের ভেতর ছুটে গেছি। কখনো
ওই ডাককে উপেক্ষা করতে পারিনি আমি! আর কী উষ্ণ ছিলো পুতুলদির কোল!
আমাকে জড়িয়ে ধরে হাসিতে ভেঙে পড়তো- আমার পল্টু সোনা, আমার টুনটুনি
পাখি, আমার ময়না পাখি, টিয়ে পাখি, আমার মানিক... অনেকক্ষণ পর্যন্ত
তার আদুরে সম্বোধন চলতে থাকতো আর আমি চুপ করে, প্রায় ঘাপটি মেরেই
বলা যায়, তার আদর খেতাম। নিজেকে সত্যিই পাখির মতো ঐ অতোটুকু ছোট্ট
মনে হতো। অমন আদর আর কোথাও পাইনি আমি। অমন করে কেউ কখনো ডাকেনি আর।
এখন আমি শিল্প ও মানুষ ছেড়ে দুরে চলে যাই। কেউ ডাকে না। কেউ না।
আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকি; কেউ ডাকুক, আমি আমার সম্পূর্ণ পৃথিবী ফেলে
ছুটে যাবো। অথচ পুতুলদি হারিয়ে যাবার পর আর কেউ ডাকলো না।
হ্যাঁ, হারিয়ে গিয়েছিলো পুতুলদি, আমার জীবন থেকে। একদিন হঠাৎ তাকে
দেখেছিলাম মেঠোপথ ধরে একাকী হেঁটে যেতে। অমন বিমর্ষ আর কোনোদিন
তাকে হতে দেখিনি। পুতুলদি হেঁটে যাচ্ছিলো যেন পৃথিবীর সমস্ত বেদনা
বুকে নিয়ে_ যেন কোনো এক অনির্দিষ্ট গন্তব্যে। আমাকে দেখলো সে,
কিন্তু হাসলো না, ডাকলো না; আমার কী যে অভিমান হয়েছিলো! পলকহীন
তাকিয়ে ছিলাম যতদূর পুতুলদি যায়। এক সময় সেই মমতাময় হাত বাড়ালো সে,
কিন্তু মুখে ডাকলো না। একটুক্ষণ আগে অভিমান হয়েছিলো, মনেই রইলো না।
সমস্ত পৃথিবীকে ফেলে, আকাশ বাতাস মাথায় নিয়ে দৌড়ে গেলাম। পুতুলদি
প্রতিদিনের চেয়ে আরো জোরে আমাকে বুকে চেপে ধরে, কিন্তু হাসে না,
ডাকে না, বলে না_আমার পল্টু সোনা, আমার টুনটুনি পাখি...। আমি অবাক
হয়ে তাকাই_ আজ হলো কী পুতুলদির? দেখি, তার দুই চোখ থেকে জল ঝরছে।
পুতুলদি কাঁদছে! আমারও কান্না পেয়ে যায়। বলি-
তুমি কাঁদছো কেন পুতুলদি?
কোনো কথা নেই, শুধু কান্না বেড়ে যায় তার।
মেসোমশাই মেরেছেন, নাকি মাসিমা বকেছেন?'
এবারো কিছু বলে না পুতুলদি! হায়, মা-বাবার পিটুনি-বকুনি ছাড়াও যে
পৃথিবীতে এত অজস্র কান্নার কারণ আছে, কিশোর কি জানতো তখন?
ও আমার পুতুলদি, বলো না!
পুতুলদির কাছে আমি 'আমার' বলতে শিখেছিলাম। সে যেমন বলতো 'আমার
পল্টু সোনা'। পুতুলদি এবার বসে পড়ে। আমার মুখটা দুই হাতের মধ্যে
নিয়ে বলে_
আমি যদি চলে যাই, তুই কি করবি রে পল্টু?
আমিও যাবো।
কোথায়? - পুতুলদি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
তুমি যেখানে যাবে। তুমিই তো বলেছ, বিয়ে হলে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে
যাবে।
পুতুলদি আবারও কেঁদে ওঠে- এ এমন যাওয়া নয় রে পাগল। আরো অনেক, অনেক
দূরে চলে যাওয়া।
আমাকে না নিয়ে তুমি অতোদূর যেতেই পারবে না। আমি তোমাকে যেতেই দেবো
না।
কিশোর কি আর জানতো তখন, পৃথিবীর ওপারেও পৃথিবী থাকে! প্রতিদিন ভোরে
সে দেখতো, তার মায়াময় গ্রামের ওপার থেকে সূর্য উঠে আসে। খুব বেশি
হলে আর একটি গ্রাম, তারপরই তো দিগন্ত রেখা, যেখান থেকে সূর্য ওঠে,
যেখানে গিয়ে সূর্য ডোবে! কিশোরের কাছে সেটিই ছিলো পৃথিবীর শেষ
সীমানা, পুতুলদি তার চেয়ে দূরে তো আর যেতে পারবে না!
আমার কথা শুনে পুতুলদির কী যে হয়! আবার আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে
কেঁদে ওঠে। পুতুলদির অবিরাম কান্না আমার ভালো লাগে না। কান্না তাকে
মানায় না। আমি ঠিক বুঝিও না- কেন এত কান্না তার! তাকিয়ে দেখি,
শীতের আকাশে মেঘ করেছে। দেখে আমার কী যে মন খারাপ হয়ে যায়! ওই
কৈশোরেও সারারাত আমার ঘুম আসে না।
পরদিন সকালে উঠেই ছুটে যাই পুতুলদির বাড়ি। মায়ের নিষেধ উপেক্ষা
করে। গিয়ে দেখি- সারা বাড়ি কাঁদছে। পুতুলদি শুয়ে আছে উঠোনে, সাদা
চাদর গায়ে। সেই প্রথম আমার দিদি আমার জন্য তার হাত বাড়ালো না।
শ্মশানঘাটে দিদিকে পোড়ানো হলো। বুবু দাঁড়িয়ে ছিলো আমাকে নিয়ে;
বুবুর চোখে জল। আর আমি কিছুতেই মানতে পারছিনা দৃশ্যটা, শুধু বুবুকে
জিজ্ঞেস করছি-
ও বুবু, পুতুলদিকে পোড়াচ্ছে কেন? দিদির কষ্ট হচ্ছে না?
প্রথম দিকটায় আমার প্রশ্ন শুনে বুবুর কান্না বেড়ে যায়। এক সময় বলে-
ও যে মরে গেছে রে ভাই। মরে গেলে আমাদেরকে যেমন কবর দিতে হয়, ওদের
তেমন পোড়াতে হয়।
আমি কিছুই বুঝলাম না। সেই প্রথম মৃত্যু সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ
পরিচয়, এসব নিয়ম-কানুনের কিছুই জানি না, তাই বুঝলাম না_ মরলেই
মানুষকে পোড়াবে কেন? কবর দেবে কেন? ওদের কষ্ট হয় না বুঝি! আর মানুষ
মরে যা-ই বা কোথায়? বুবুকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে-
আল্লার কাছে যায়।
আল্লা কোথায় থাকে বুবু?
আকাশে। বিরক্ত করিস না তো পল্টু, চুপ করে থাক।
বুবুর ধমক খেয়ে আমি চুপ করে যাই। মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে
থাকি। আল্লাকে দেখার চেষ্টা করি। লোকটি কেমন বোঝার চেষ্টা করি।
পুতুলদি তো তার কাছেই গেছে!
এতকিছু ভাবি, কিন্তু কিছুতেই পুতুলদিকে পোড়ানোর ব্যাপারটা মেনে
নিতে পারি না। বুঝতে পারি না, পুড়ে ছাই হয়ে আল্লার কাছে যাওয়া
দরকারটা কি? আর পুড়েই যদি গেলো, তাহলে আমাকে সঙ্গে নেবে কিভাবে!
পুতুলদি যে বলেছিলো! এখন সেসব কথা মনে হলেও কষ্ট লাগে। কী সরল
ছিলাম! সবার প্রতিটি কথা কী অবলীলায় বিশ্বাস করতাম! কিন্তু
পরস্পরবিরোধী কথাগুলো বিপদে ফেলে দিতো, হিসেব মেলাতে চাইতাম-
পারতাম না। সেই কৈশোর থেকে আজ পর্যন্ত মেলাতে চাওয়া হিসেব কোনোদিন
মেলেনি আমার জীবনে।
পুতুলদির মৃতু্যর পর ওই গ্রামের আর কিছুই ভালো লাগলো না আমার।
কিছুই না। কৈশোর পেরোতে না পেরোতে ঢাকায় এলাম। তখন বুঝিনি- পরে
জেনেছি, পুতুলদির সুগভীর প্রেমকে অস্বীকার করে পলাশদা আরেকটি
মেয়েকে নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরেছিলো। পুতুলদি সইতে পারেনি।
সেই সব দিন আজ যেন হঠাৎ ফিরে এসেছে সমস্ত খুঁটিনাটি সহ। আমি মগ্ন
হয়ে আছি, প্রায় নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার মতো। এক মুহূর্তের জন্যও
ভুলতে পারছিনা সেই চোখ, সেই হাসি, দীঘল চুল।
আমার এই হঠাৎ পরিবর্তন হয়তো লক্ষ্য করেছে আনিস। গভীর রাতে সবাই
ঘুমিয়ে যাবার পর আমরা দু-জন সিগারেট ধরিয়ে হলের বারান্দায় দাঁড়াই।
সামনে পুকুর, ঝিরঝিরে হাওয়া মৃদু ঢেউ তৈরী করছে বলে চাঁদের আলো
ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। পরিবেশটা হয়তো আমাদের খানিকটা উদাস করে দেয়। আমি
বলি_ r />
তুতুই পলিদিকে চিনিস কিভাবে?
পলিদি তো আমার গ্রামের মেয়ে, শৈলকুপায় বাড়ি।
এখানে কোথায় থাকে?
রোকেয়া হলে। কিন্তু তুই হঠাৎ পলিদিকে নিয়ে পড়লি কেন?
গভীর নিস্তব্ধতার মধ্যে আমি আমার বুকের হাহাকার শুনতে পাই, দূরাগত
কণ্ঠে আনিসকে পুতুলদির কথা বলতে থাকি। পুতুলদির সঙ্গে পলিদির
আশ্চর্য মিলের কথা বলি। সব বলা হয় না। আনিস কী বোঝে কে জানে,
খানিকটা বিষণ্ন হয়ে যায় সে-ও। কিন্তু ও কি বুঝবে পুতুলদি আমার
কতোখানি জুড়ে আছে?
সেদিনের পরও কয়েকদিন পলিদিকে ডিপার্টমেন্টে দেখি, কিন্তু কথা বলা
হয় না। কি বলবো? সহপাঠী হলেও না হয় কথা বলার বিষয় থাকে- সিনিয়র
একজনের সঙ্গে হঠাৎ করে কি বিষয় নিয়ে কথা বলা যায়? আর তাছাড়া ঐ
মুখের আদলটি আমাকে ইমোশনাল করে তোলে- কথা বলতে গেলে যদি সেই ইমোশন
অযাচিতভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে! পলিদি তো কিছুই জানে না। খামোখা ভুল
বুঝবে! এতসব হিসেব-নিকেশ করে আমি দূরেই থাকি।
এরই মধ্যে আমার বন্ধুদের মাথায় ভূত চাপে- তারা ডিপার্টমেন্টে
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। এই ডিপার্টমেন্টে প্রায় একযুগ ধরে কোনো
অনুষ্ঠান হয় না- বন্ধুরা সেই বন্ধ্যাত্ব ঘোচাতে চায়। শিক্ষক ও
ছাত্র-ছাত্রীদের কৌতূহল এবং শংকা- আদৌ আমরা তা পারবো কীনা! আমার
বন্ধুরা_ মিলু, আনিস, কবীর, জীবন, রানু, জসিম, হাবীব_ সবাই নিজেদের
নেপথ্যে রেখে আমাকে সামনে এগিয়ে দেয়। বুঝতে পারি- ওরা আমাকে আবার
ফিরিয়ে আনতে চাইছে। নেপথ্যে থেকে ওরাই সব কাজ করে, কেবল অনুষ্ঠানের
দিনটাতে পুরো দায়িত্ব আমার। আমরা দিনব্যাপি অনুষ্ঠানের আয়োজন করি।
বিপুল উত্তেজনা ও প্রতীক্ষা শেষে নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠানের সফল
সমাপ্তি ঘটলে যেন আমাদের সবার মধ্যে অবসন্নতা নেমে আসে। পরদিন
ইউনিভার্সিটিতে পূজার ছুটি শুরু হয়- এ যেন আরো বিপর্যয়কর। কয়েকদিন
উত্তেজনা আর ব্যস্ততায় বেশ ছিলাম- এখন এই অফুরন্ত অবসর টেনে নেয়াই
মুশকিল। আনিস প্রস্তাব দেয়-
চল ঘুরে আসি। r />
কোথায়?
আপাতত আমাদের বাড়িতেই চল, পরে দেখা যাবে।
আমআমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাই। ঢাকা ছেড়ে বেরোবার সুযোগ পেলে আমি
ছাড়ি না কখনো। এই শহরটা এত পচে গেছে, এত অসহ্য লাগে যে, মনে হয়
এখানকার সবকিছু আমার গলা টিপে ধরার জন্য ধেয়ে আসছে। আনিসের সঙ্গে
ঢাকা ছেড়ে বেরিয়ে আমার কী যে ভালো লাগে!
শৈলকুপা অবশ্য আমার গ্রামের মতো নয়। এখানে অনেক নাগরিক সুবিধা
পৌছে গেছে। ইলেকট্রিসিটি, ফোন ইত্যাদি। আমার গ্রামে এসব ছিলো না।
সন্ধ্যার পর চাঁদ না থাকলে ভুতুরে অন্ধকার নামতো। বাঁশঝাড়ে বাতাস
উঠলে শোঁ শোঁ শব্দে ঘুম ভেঙে যেত। এখানে ওসব নেই। তবু শৈলকুপাকে
আমার ভালো লেগে গেলো। যে কোনো গ্রামই ঢাকার চেয়ে সহস্রগুণ প্রাণ
সম্পন্ন। তাছাড়া 'শৈলকুপা' নামটির পেছনে রয়েছে এক অসামান্য
কিংবদন্তী। আটশো বছর আগে এ অঞ্চলের রাজা ছিলেন হরিহরা, তাঁরই কন্যা
শৈলবালা। এখানে তাকে কুপিয়ে মারা হয়েছে। সেই থেকে শৈলকুপা। তার
অপরাধ- সে প্রেম করেছিলো। আটশো বছর আগের সমাজ সেই প্রেমকে- যদিও তা
রাজকন্যার প্রেম- মেনে নিতে পারেনি। অবশ্য এই কিংবদন্তী ভাষ্য একটি
নয়- একাধিক। যেমন একজন বললেন-
শৈলবালা ছিলো ছলনাময়ী, আর তার ছিলো একাধিক প্রেম। সে যে কার
প্রেমিকা সেটা বোঝা যেত না। এখনো পর্যন্ত দেখবেন এই অঞ্চলের
মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়ে গেছে- শৈলবালা কার প্রেমিকা? তো, সেই
জন্যই কোনো এক ক্ষুব্ধ প্রেমিক তাকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে।
আবার আরেকজন শোনালেন অদ্ভূত কথা-
আরে দূর! এইসব ফালতু কথা। ঐ যে দেখছেন নদীটা- কুমার নদ- এখানে
একসময় প্রচুর শৈল মাছ ধরা পড়তো। এত মাছ যে গৃহিনীরা কুটে কুলিয়ে
উঠতে পারতো না বলে গৃহস্থরা সেগুলোকে কুপিয়ে সাইজ করতো। সেই থেকে
শৈলকুপা।
শুনে আমার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। বললাম-
আপনার কথাটা যদি সত্যিও হয়, তাহলেও তো আপনার এটা গ্রহণ না করে
শৈলবালার কাহিনীটিই গ্রহণ করা উচিত। এত চমৎকার একটা কিংবদন্তী!
এর মধ্যে আপনি চমৎকারের কি দেখলেন! কয়েক শতাব্দী ধরে শৈলবালা এ
অঞ্চলের যুবকদের স্বপ্নের রাজকন্যা। তাকে কুপিয়ে মেরে ফেলাটাকে
আপনি চমৎকার বলছেন? আর তাছাড়া, আপনিই বলুন- ওইরকম রূপসী এক
রাজকন্যাকে কুপিয়ে মেরে ফেলা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব? সম্ভব নয়।
কিছুতেই না। কিছুতেই তাকে এভাবে মেরে ফেলা যায় না- তিনি উত্তেজিত
হয়ে উঠলেন।
আমি বুঝে গেলাম- শৈলবালার ওরকম মৃত্যু এই ভদ্রলোকের পক্ষে মেনে
নেয়াই সম্ভব নয়। প্রথমে লোকটিকে ভুল বুঝেছিলাম- এখন মনে হচ্ছে, তার
পুরোটা জীবন জুড়ে আছে শৈলবালা। হা, শৈলবালা, তুমি কার প্রেমিকা?
আটশো বছর পরও তার মীমাংসা হলো না!
শৈলবালার কথা শোনার পর থেকে কেমন একটা মমতা জন্মে গেছে রাজকন্যাটির
প্রতি। নাকি আমিও প্রেমে পড়ে যাচ্ছি তার? শৈলবালার সুদীর্ঘ প্রেমিক
তালিকায় তবে কি আরেকটি নাম যুক্ত হতে যাচ্ছে! কেবলই মনে হচ্ছে-
শৈলবালা আর পুতুলদির জীবন কি একইরকম নয়? দু-জনেই দুটো ভিন্ন সময়ে
প্রেমের জন্য প্রাণ দিয়েছে! হঠাৎ মনে পড়ে গেলো- এটাতো পলিদিরও
গ্রাম। ছুটিতে কি বাড়ি এসেছে? শৈলবালা-পুতুলদি-পলিদি। আহ! সব কি এক
সূত্রে গাঁথা?
শৈলকুপার সবকিছু আমার ভালো লেগে যাচ্ছে। বিকেল হলে আমি, আনিস,
হাবিব আর মনির গিয়ে শ্মশানঘাটে বসে থাকি। শৈলকুপার সবচেয়ে সুন্দর
জায়গা ওই শ্মশানঘাট। কী শান্ত, সমাহিত! মনে পড়ে যায়- পতুলদিকে
পোড়ানো হয়েছিলো এমনি এক শ্মশানে। এমনি কতো মুখ পোড়ে এখানে, আর
কতোজনকে পুড়িয়ে যায় সারাজীবনের জন্যে, কে তার খবর রাখে! শ্মশানের
পাশ দিয়ে ক্ষীণপ্রায় কুমার নদ বয়ে চলেছে। সব শ্মশানের পাশেই কি
একটি করে নদী থাকে? কেন? চোখের চলের সঙ্গী হবার জন্যে?
মনির- আনিসের স্থানীয় বন্ধু- আমারও বন্ধু হয়ে গেছে দুদিনেই, বলে-
'ওপারে পলিদির বাড়ি।' আমি কি একবার কেঁপে উঠি? পলিদিকে দেখতে ইচ্ছে
করে, কিন্তু কি করে যাই, এখনো তো পরিচয়ই হয়নি তার সঙ্গে! কিন্তু
একবার দৈবক্রমে সত্যিই দেখা হয়ে যায়। শৈলকুপা তখন পূজার উৎসবে মেতে
উঠেছে। বিকেল হতে না হতেই নানা বয়সের নারী-পুরুষ নানা রঙে মেতে ঘর
ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। তেমনি এক বিকেলে আমরা চারজন কুমার নদের ওপরে তৈরি
করা ব্রিজের গোড়ায় বসে চা খাচ্ছি আর মেয়েদের দেখছি। শৈলকুপায় খুব
একটা রূপসী মেয়ে নেই বলেই মনে হচ্ছে। সব রূপ যেন ওই একজনই-
শৈলবালা- ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছে চিরদিনের জন্য! আবার দু-চারজন আছে
খুব তীব্র রূপসী, পলিদির মতো! তেমনি একজনকে দেখে অভিভূতের মতো
তাকিয়ে আছি, হঠাৎ আনিস বলে ওঠে- 'এই, পলিদি। পলিদি।' প্রথমটায়
বুঝতে পারিনি, দেখিওনি। যখন দেখলাম, তখন তার রিকশা আমাদের ছাড়িয়ে
অনেকদূর চলে গেছে। আমি হঠাৎই সব ভুলে গেলাম। যে মেয়েটির সঙ্গে
জীবনে কোনোদিন কথা বলিনি, লোকজনকে সচকিত করে তাকেই ডেকে উঠলাম-
পলিদি...।
পলিদি রিকশা থেকেই ফিরে তাকায়। হাসে। সেই হাসি। কিন্তু দাঁড়ায় না।
আমার মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। পলিদি দাঁড়ালো না! পুতুলদিকে আমি
কোনোদিন এভাবে ডাকিনি, তবু সে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। পলিদিকে
ডাকলাম, তবু দাঁড়ালো না। তুলনাটা মনে আসতে আরো খারাপ লাগতে লাগলো।
আমি কার সঙ্গে কার তুলনা করছি!
আমরা সিগারেট ধরিয়ে হাঁটতে থাকি। আমার হাতে একের পর এক সিগারেট
পোড়ে। এক ধরনের গভীর উদাসীনতা ঘিরে ধরে আমাকে। আমরা জনবহুল রাস্তা
ছেড়ে নির্জন পথ ধরি আর সেই নির্জনতার ভেতর অপ্রত্যাশিতভাবে আবার
পলিদির সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। এবার সে রিকশা থামিয়ে আমাদের ডাকে।
বলে-
কবে এসেছো? r />
পরশু।
কদিন থাকবে?
এই, কয়েকদিন।
কাকালকে বাসায় এসো না!
আমি কেবল কালকের জন্য প্রতীক্ষা করি। গ্রামের রাত দ্রুত গভীর হয়।
আনিস-হাবিব ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু আমার ঘুম আসে না। জানালা খুলে অপলক
বাইরে তাকিয়ে থাকি। পুতুলদির গায়ের রঙের মতো জোসনা ফুটে আছে বাইরে।
দূরে, মাঠের ভেতর একতরফা হু হু বাতাস বয়ে গেলে শস্যগুলো মাথা নুইয়ে
অভিবাদন জানায় যেন। ঝিঁঝিঁ পোকাগুলো অহেতুক ডেকে ডেকে হয়রান।
কতোদিন আমি এমন দৃশ্য দেখিনি! চমৎকার করে দৃশ্যটির বর্ণনা লিখে
ফেলতে খুব ইচ্ছে করে। পারি না। আমি বোধহয় আর কোনোদিন লিখতে পারবো
না। আমি কি বেঁচে আছি? জোছনার মধ্যে হাওয়ার লুটোপুটি দেখতে দেখতে
আমার বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে। মনে পড়ে, কাকে যেন মনে পড়ে। এত
একা কেন আমি! কেন এমন গভীর নিঃসঙ্গ! হঠাৎ মনে হয়- কে যেন কাঁদছে।
কে? শৈলবালা! শৈলবালা কি এখনো কেঁদে বেড়ায়? শৈলকুপার মানুষ কেন সেই
কান্না শুনতে পায় না? নাকি আমার পুতুলদি কাঁদছে? সেই বিকেলের মতো!
নাকি পলিদি! নাহ। পলিদি কাঁদবে কেন? কাঁদতেও তো পারে! মানুষের
কতোরকম কষ্ট থাকে! কতো কারণে যে মানুষের চোখ ভিজে ওঠে! এইসব
নানারকম ভাবনা বিরামহীন আমাকে জ্বালায় আর করোটিতে তিনটে নাম
বাবরবার ঘুরেফিরে আঘাত করে। শৈলবালা-পুতুলদি-পলিদি। আহ! সব কি এক
সূত্রে গাঁথা?
পরদিন সকালে পলিদির বাড়িতে গেলে বুঝতে পারি, সে বেশ খুশি হয়েছে।
তার চোখে মুখে আনন্দের অভিব্যক্তি। একটু দূরে বসে গল্প করে পলিদি।
আমি খুব হালকাভাবে পুতুলদির কথা বলি। পলিদি কি বুঝতে পারে? নানা
কথার ফাঁকে আনিস আমার গল্প লেখার প্রসঙ্গ তোলে। হঠাৎ করে এই
প্রসঙ্গ আমাকে লজ্জায় ফেলে দেয়, কিন্তু বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ে
আবার। কতোদিন আমি লিখি না! আমি বোধহয় আর কোনোদিন লিখতে পারবো না!
আমার ভেতরের সবকিছু মরে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে। নইলে আমি আর লিখতে
পারি না কেন?
আমাকে লজ্জা পেতে দেখেই হয়তো পলিদি হাসে। সেই একইরকম হাসি।
পুতুলদির মতো। দুজন মানুষের কী বিস্ময়কর মিল! কিন্তু পুতুলদিকে আমি
'আপনি' বলতাম না, সে আমাকে 'তুমি' বলতো না। তবু আমি পলিদির চোখে
তাকিয়ে মনে মনে বলি- 'পুতুলদি, আমার পুতুলদি।' পলিদি কি বুঝতে
পারে?
ঢাকায় ফিরে শহরটাকে আর অতোটা খারাপ লাগে না। এই শহরে পলিদি আছে। যে
শহরে অমন একটা মেয়ে থাকে সেই শহর খারাপ হতে পারে না। পলিদির সঙ্গে
মাঝে মাঝে কথা হয়। কখনো কখনো সব ভুলে চিৎকার করে ডেকে উঠি। পলিদি
হেসে তাকায়, কাছে আসে, কিন্তু ডাকে না। পুতুলদি ডাকতো। একদিন,
ডিপার্টমেন্টে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে- পলিদি লালপাড় সাদা শাড়ি পড়ে,
হাতভরা কাঁচের চুড়ি নিয়ে, বৈশাখের মেঘের মতো কালো চুল হাওয়ায় উড়িয়ে
এলে আমি মনে মনে বলি- 'আমার দেবী। আমার পুতুলদি!' এত অসহ্য
সুন্দরের সামনে দাঁড়াতে বুক কাঁপে, তবু আমি ডাকি। পলিদি কাছে এলে
বলি- কানে কানে একটা কথা বলবো।
পুরো অডিয়েন্সের সামনে আমার আরো কাছে সরে আসে পলিদি। তার কোমল চুল
এখন আমার চোখেমুখে আঘাত করছে, তার কান আমার ঠোঁটের কাছে। আর তার
শরীর থেকে ভেসে আসছে খুব মৃদু, অথচ নেশা-ধরানো এক আশ্চর্য গন্ধ। এই
গন্ধ আমি পুতুলদির শরীর থেকে পেয়েছিলাম! আমার মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে,
চোখের সামনে থেকে একের পর এক সরে যেতে থাকে বিস্মৃতির পর্দা। দেখি-
অনন্তকাল ধরে দুটো মমতামাখা হাতের দিকে ছুটে চলেছে এক দুরন্ত
কিশোর। আর তখন ইচ্ছে করে- গলা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলি- এতদিন
তুমি কোথায় ছিলে! এতকাছে এই তীব্র সুন্দর, স্পর্শ করার তীব্র সাধ
হয়- পারি না। পৃথিবীর সব সুন্দর কি তাহলে চিরকাল অধরাই রয়ে যাবে
আমার কাছে? পলিদি দাঁড়িয়ে আছে, একটা কিছু বলতে হবে। সত্যিই তো আর
বিশেষ কিছু বলার জন্য ডাকিনি! ইচ্ছে হয়েছিলো, ডেকেছি। সত্যি সত্যি
এমন কাছে এসে দাঁড়াবে কে-ই বা ভাবতে পেরেছিলো। আমি বলি-
আপনি এত সুন্দর কেন? r />
তাতাই! - আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর হয়না বুঝি। সে কেবল লাজুক হাসে।
হ্যাঁ। এত সুন্দর যে সহ্য করা কঠিন।
পলিদি একটু কিছুক্ষণ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থেকে ধীর পায়ে চলে যায়। কিন্তু
ঘটনাটা প্রশ্নের জন্ম দেয় অচিরেই। পলিদি তার রূপের জন্যই বিখ্যাত।
অনেকের চোখই তাকে অনুসরণ করে- আর সে-ই কী না অতোগুলো চোখের সামনে
একটা জুনিয়র ছেলের গালে গাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো- এরকম গুঞ্জন চললো
বেশ কিছুদিন। তারপর তার সহপাঠী বন্ধু-বান্ধবীরা তাকে টিজ করা শুরু
করলো। আমাকে দেখলেই- ওই যে উনি এসেছেন- বলে ক্ষেপাতে লাগলো। আমি
সবই দেখছিলাম, শুনছিলাম এবং অবাক হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, এত কিছু
সত্ত্বেও পলিদির কোনো বিকার নেই কেন, এগিয়ে এসে কথা বলে কেন, ডাকলে
সাড়া দেয় কেন!
আর এদিকে আমার ভেতরে পলিদিকে দেখার তীব্র সাধ জেগে থাকে সবসময়।
বন্ধুরা জানতে চায়- কেন এত টান তার জন্য! কি সম্পর্ক আমার, তার
সঙ্গে! আমি উত্তর দিতে পারি না। আমি নিজেই কি জানি, সে আমার কী হয়!
কি নাম দেবো এই সম্পর্কের! দেয়া যায় কোনো নাম? পলিদির কথা দূরে
থাক, পুতুলদির সঙ্গে আমার সম্পর্কের নাম-ই বা কি? সে আমার কী ছিলো?
ওদের প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা না করে তাই হেসে এড়িয়ে যাই। আর
প্রতীক্ষায় থাকি- তার প্রতীক্ষা। কখন আসবে সে!
কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে পলিদি ডিপার্টমেন্টে আসছে না। কেন যে! আমি
প্রতীক্ষায় থাকি প্রতিদিন। তার দেখা নেই। আমার পৃথিবী ক্রমাগত
শূন্য হয়ে যেতে থাকে। শহরটা আবার বিষময় মনে হতে থাকে। কার্জন হলের
প্রাণবন্ত ঘাসগুলোকে মনে হয় আগাছা। আর ধীরে ধীরে আমার শরীর জুড়ে
জীবন পোড়ানো জ্বর নামে। আমার তখন কেবলই মনে হয়- পলিদি এসে একবার
কপালে হাত রাখলে এই জ্বর সেরে যাবে। কিন্তু সে আসে না। জ্বর সারে
এমনিতেই। কিন্তু জন্ডিস এসে বাসা বাঁধে। আমার সারা পৃথিবী পাণ্ডুর
হয়ে যায়। ডাক্তারের নিষেধ- বাইরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু কে শোনে
কার কথা! আমি পলিদির জন্যই প্রতিদিন বাইরে যাই। যদি হঠাৎ এসে পড়ে!
যদি দেখা না হয় আমার সঙ্গে!
তারপর সত্যি একদিন সবকিছু উজ্জ্বল করে তার আগমন ঘটে। দূর থেকে
দেখি- পলিদি হাসছে। আমার পৃথিবী আবার পূর্ণ হয়ে ওঠে। ঘাসগুলোকে
হঠাৎ আরো বেশি সবুজ আর প্রাণবন্ত মনে হয়। ঢাকার বাতাস বুক ভরে টেনে
নিয়ে মনে হয়- এমন বিশুদ্ধ বাতাস পৃথিবীর আর কোথাও নেই! পলিদিকে তার
বান্ধবীরা ঘিরে ধরে। আমি কাঙালের মতো তাকিয়ে থাকি। ইচ্ছে করে ছুটে
যাই। মনে মনে বলি, একবার ডাকো। শুধু একবার। আমি আমার সমস্ত পৃথিবী
ফেলে তোমার কাছে ছুটে যাবো। পলিদি ডাকে না।
কাছাকাছি হতে দেখি, পলিদির সিঁথিতে সিদুর। বিয়ে হয়ে গেছে! একবারও
জানালো না! পুতুলদি বলতো- তার বিয়ে হলে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। আর
পলিদি জানালোও না! ছোটবেলায় একবার পুতুলদির কাছে ছুটে যেতে যেতে
হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে আমার হাত কেটে রক্ত বেরোচ্ছিলো। পুতুলদি ছুটে
এসে তুলে নিয়েছিলো আমাকে। আমি হাতের দিকে তাকোতেই সে বলে উঠেছিলো_
'দেখে না, দেখে না, নিজের রক্ত দেখতে নেই।' কিন্তু ততক্ষণে আমি
দেখে ফেলেছি। এতদিন পর আমার সেই রক্তের রঙের কথা মনে পড়ে। পলিদির
সিঁথিটা যেন অবিকল সেই রঙে আঁকা।
হাঁটতে হাঁটতে পলিদি একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। আমি অভিমানে চোখ
ফিরিয়ে নিই। কতোদিন পর কারো ওপর এমন অভিমান হলো আমার! পলিদি
বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে একটু দূরে ঘাসের ওপরে গিয়ে বসে। আমার দিকে
পেছন ফিরে। আমি তৃষ্ণার্তের মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু সে
ফিরেও তাকায় না। তাহলে কি পলিদি আমার কেউ নয়?
আমি তবু মনে মনে বলতেই থাকি_ একবার তাকাও, একবার ডাকো, আর একটিবার
আমাকে সমস্ত পিছুটান উপেক্ষা করে মমতা আর ভালোবাসার কাছে ছুটে
যাবার সুযোগ দাও।
পলিদি ডাকে না।
পুতুলদির পর আর কেউ কোনোদিন আমাকে অমন করে ডাকেনি।
জুন, ১৯৯৩। |
|
|
| |
 |
|