প্রস্তাবনা
জুবায়ের ইকবালের সঙ্গে সূচী ফারহানার বিয়েটা প্রায় অসম্ভব একটি
ঘটনা, তবু তা সম্ভব হয়েছিলো আরেকটি আপাত অসম্ভব কারণে। বিয়ের আগে
সূচী জুবায়ের ইকবালের গল্প লেখার প্রতিভার কথা জানতে পেরেছিলো _
বলা ভালো, আবিষ্কার করেছিলো _ কারো মুখে শুনে নয়, নিজেই পত্রিকায়
পড়ে, এবং এই আবিষ্কারটি তাকে বিয়েতে দ্রুত মত দিতে সহায়তা করেছিলো।
বিয়ের পাত্র গল্প লেখে, এই কথা শুনে কোনো পাত্রী অন্যকিছু বিবেচনা
না করেই বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেছে _ এমন ঘটনা কেউ কখনো শুনেছে বলে
মনে হয়না, কিন্তু এক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছিলো। ঘটনাটি প্রায় অসম্ভব;
এবং এটাকে জুবায়ের ইকবালের সৌভাগ্য বলেই মানতে হবে যে, তার বিয়ের
প্রস্তাবটি কাকতালীয়ভাবে একটি গল্প পড়ুয়া মেয়ের জন্য পাঠানো
হয়েছিলো। তা-ও যেমন তেমন পাঠক নয়, মেয়েটি তার মতো স্বল্প পরিচিত
একজন তরুণ লেখকেরও কয়েকটি গল্প পড়ে ফেলেছিলো। এমন তো সচরাচর ঘটতে
দেখা যায় না _ পাঠকরা সাধারণত জনপ্রিয় বা খ্যাতিমান লেখকদের লেখাই
পড়ে থাকে। না, গল্প পড়ে তাদের মধ্যে প্রেম-ট্রেম হয়নি _ এমনকি,
বিয়ের আগে পরিচয় পর্যন্ত হয়নি। বিয়ের প্রস্তাবটি যখন সূচীদের
বাড়িতে গিয়েছিলো এবং সবদিক বিবেচনা করে সূচীর বাবা যখন প্রায়
ফিরিয়েই দিচ্ছিলেন, তখন কি মনে করে যেন মেয়ের মতামত জানতে চাইলেন।
বিয়ের প্রস্তাব এলে অবশ্য তিনি বরাবরই সূচীর সঙ্গে আলোচনা করতেন,
তার মতামত জানতে চাইতেন, কিন্তু শুধুমাত্র সেগুলো সম্বন্ধেই,
যেগুলো কিঞ্চিৎ সম্ভাবনাময়; বহু প্রস্তাব তিনি কারো সঙ্গে
বিন্দুমাত্র আলোচনা ছাড়াই অবলীলাক্রমে নাকচ করে দিয়েছেন। তো, তিনি
এসে সূচীকে বললেন, ছেলের নাম জুবায়ের ইকবাল [নামের ব্যাপারে সূচীর
কিছু বাছবিচার আছে, সে জানিয়েই দিয়েছে _ আবুল হোসেন, আব্দুল
কুদ্দুস, আব্দুল কাদের, গোলাম মোস্তফা বা মোস্তফা কামাল _ এ ধরনের
কোনো নামের ছেলেকে সে কিছুতেই বিয়ে করবে না, সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ
ছেলে হলেও। তার স্বামীকে কেউ আবুল বা আব্দুল বলে ডাকছে, বা তার
স্বামীর নামে অন্তত কয়েক লাখ লোক আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বা ওই
নামটি প্রায় বিনামূল্যেই সের দরে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে _ এটা সে
ভাবতেই পারে না।]; বাড়ি মানিকগঞ্জ; [এ ব্যাপারেও তার বাছবিচার আছে।
তার ধারণা _ বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের ছেলেরা মেরুদণ্ডহীন, নোয়াখালির
ছেলেরা ঘিরিঙ্গিবাজ, চট্টগ্রামের ছেলেরা ঘাড় ত্যাড়া ধরনের,
বরিশালের ছেলেরা বোকা কিন্তু মারদাঙ্গা স্বভাবের ইত্যাদি।]; ছেলে
একটা সরকারী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এবং আপাতত পোস্টিং ঢাকায়ই [এই
বিষয়ে অবশ্য তার বাছবিচার নেই, শুধুমাত্র সামরিক বাহিনীর লোকজনের
বুদ্ধি-সুদ্ধি সব পায়ের গোড়ালিতে থাকে বলে তার ধারণা, ফলে এখানে
তার একটু আপত্তি আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, পূর্বোক্ত দু'টো বিষয়
ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে তার বিশেষ কিছু জানবার নেই। অন্য সব কিছুু সে
মা বাবার ওপরই ছেড়ে দিয়েছে। তার যেহেতু কারো সঙ্গে কোনোরকম প্রেমের
সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, এবং বিয়ে করতে হলে শেষ পর্যন্ত একজন অচেনা
লোককেই বেছে নিতে হবে, অর্থাৎ পুরো বিষয়টির মধ্যেই একধরনের রিস্ক
আছে, তাই বিষয়টিকে মা বাবার ওপর ছেড়ে দেয়াটাকেই সে বুদ্ধিমানের মতো
কাজ হবে বলে মনে করেছে, তাতে আর যাই হোক মা বাবা তো তাদের মেয়ের
ভূমিকায় খুশি হবেন!] ; এরপর ছেলের পারিবারিক অবস্থা ইত্যাদি
জানানোর পর তার মতামত জানতে চাওয়া হলো। সূচী সবসময় যা বলে, এবারও
তাই-ই বললো _ 'তোমরা যা ভালো মনে কর।' কিন্তু কথাটা বলে এবার সে
খুব একটা শান্তি পেলো না। কারণ, ওই নামটা তার কাছে খুব পরিচিত
লাগছে, কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না _ কোথাও কি পরিচয় হয়েছিলো এই নামের
কারো সঙ্গে অথবা কারো কাছে কি শুনেছিলো এই নামের কারো গল্প? বাবা
বললেন,
আমি তো আমার মতো করে ভালোটাই ভাববো, তোর মতামতটা বল।
তুমি কি কিছু ভেবেছো?
ভেবেছি। আহামরি কোনো প্রোপোজাল না, আবার একেবারে ফেলে দেয়ার মতোও
না। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ছেলেটা ভালো, ক্যারিয়ারও প্রোসপেক্টিভ।
এবার তুই বল...
আমি আর কি বলবো?
সব শুনে তোর কি মনে হলো?
সূচীর মাথায় তখনও নামটা ঘুরছে, একটা সূত্র খুঁজে পেতে চাইছে, তাই
বললো _ তুমি কি উনার সঙ্গে কথা বলেছো?
বলেছি দু'চারটা। তুই কি আবার কথা বলতে বলিস?
এতোক্ষণে সূচীর মনে পড়েছে, বললো, বলে দেখতে পারো।
আচ্ছা। তুই কি বিশেষ কিছু জানতে চাস? ইচ্ছে করলে তুইও কথা বলে
দেখতে পারিস।
আমার বলতে হবেনা। তুমি শুধু জিজ্ঞেস করো _ উনি গল্প লেখেন কী না।
এই নামে কোনো লেখক আছে বলে তো শুনি নি। আচ্ছা ঠিক আছে, জিজ্ঞেস
করবো। আর কিছু?
না আর কিছু না।
কথা বলে এসে কয়েকদিন পর সূচীর বাবা জানালেন _ ছেলেটাকে তার
মোটামুটি পছন্দ হয়েছে এবং সূচীর জিজ্ঞাসার উত্তরে জানালেন _ হঁ্যা,
ছেলে গল্প লেখে। এ বিষয়টিতে তাঁর বিশেষ উৎসাহ বা আগ্রহ নেই, থাকার
কথাও নয় _ কোনো বুদ্ধিমান মানুষেরই তা থাকে না _ কিন্তু তার মেয়ের
কাছে বিষয়টি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, নইলে আর সব বাদ দিয়ে সে শুধু এই
একটি কথাই জানতে চাইবে কেন?
ওদের বিয়েটা হয়ে গেলো। হওয়ার কথা নয়, কারণ সূচী তার মা বাবার অতি
আদরের একমাত্র কন্যা _ অতিশয় রূপসী ও মেধাবী। আবার রূপবতীদের
বদস্বভাবগুলো তার মধ্যে নেই। ভাগ্যক্রমে সে পেয়েছে রূপসীদের রূপ আর
রূপহীনদের গুণ একসঙ্গে। এ এক বিরল সমন্বয়। সূচী শুধু রূপসী এবং
মেধাবীই নয় _ ঘরের কাজে পটু, শান্তশিষ্ট, লক্ষ্নী, তার কোনো
অ্যাফেয়ার নেই বরং আছে সব ব্যাপারে মা বাবার প্রতি অগাধ আস্থা ও
বিশ্বাস। অর্থাৎ, যে ধরনের সন্তান থাকলে মা বাবা বুক ফুলিয়ে
হাঁটেন, সূচী হচ্ছে সেই ধরনের মেয়ে। সেই মেয়েকে তো যার তার সঙ্গে
বিয়ে দেয়া যায়না ! অন্তত মা বাবা হিসেবে তারা মনে করতেই পারেন যে,
পৃথিবীর সেরা ছেলেটিকেই তারা তাদের মেয়ের জন্য নির্বাচন করবেন।
ইকবাল সে রকম কোনো ছেলে নয়। দেখতে 'মোটামুটি', ক্যারিয়ারটাও
'ভালোই' _ কিন্তু এ রকম মোটামুটি বা ই-প্রত্যয় যুক্ত 'ভালো'রা
তাদের মেয়ের যোগ্য নয়, ওরকম বহু প্রস্তাব তারা ফিরিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু তবু এখানে সূচীর বিয়ে হলো দু'টো কারণে _ এক. কথা বলে
ছেলেটাকে ভালো লেগেছে। ভদ্র মার্জিত রুচিবান ছেলে। কথা বলে
ভেবে-চিন্তে, শব্দ চয়নে দারুণ সচেতন। এই গুণটি মানুষের অনেক ত্রুটি
ঢেকে রাখতে পারে। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো _ মেয়ের আগ্রহ। ছেলেটির
সঙ্গে কথা বলার পর সূচীর বাবা দ্বিতীয়বার মেয়ের মতামত জানতে
চেয়েছিলেন। উত্তর দিতে একমুহূর্ত দেরি করেনি সূচী, বলেছে _ 'তুমি
যদি ভালো মনে কর, তাহলে আমার তরফ থেকে কোনো আপত্তি নেই।' এর আগে
অন্য কোনো প্রস্তাবে এতো সরাসরি কিছু জানায়নি যে মেয়ে, তার এই
তাৎক্ষণিক ও স্বতস্ফূর্ত মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নিজের সামান্য
দ্বিধাটুকু ঝেড়ে ফেলে বিয়ের আয়োজন করলেন তিনি।
উঁকি দিয়ে দেখা
বিয়ে তো হলো, কিন্তু একজন গল্প লেখক আর একজন গল্প-পাঠিকার বিরল
সংসার কেমন চলছে? লেখকদের স্ত্রীরা প্রকৃতির কোনো এক অদ্ভুত খেয়ালে
পাঠবিমুখ হয়। এ ক্ষেত্রে তা হয় নি _ সূচীকে রীতিমতো একজন সিরিয়াস
পাঠকই বলা যায়, নইলে অচেনা একজন তরুণ লেখকের লেখা সে পড়তে যাবে
কেন? অতএব এই জুটিটিকে বিরলই বলা যায় এবং সেক্ষেত্রে তারা আমাদের
কৌতূহলের বিষয়বস্তুও হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু
অশোভন হলেও আমরা তাদের এই বিরল সংসারে উঁকি দিয়ে দেখতে পারি।
তারা ভালোই আছে। একজন তরুণ লেখক, খানিকটা উদাসীনতা ও মগ্নতা আছে
ইকবালের স্বভাবে, যা তাকে সূচীর কাছে অধিকতর আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
সে যে পুরোপুরি অবৈষয়িক একজন মানুষ তা কিন্তু নয়, চাকরিটা সে বেশ
মন দিয়েই করছে। তবে তাকে আবার পুরোপুরি বৈষয়িক বা ক্যারিয়ারিষ্টও
বলা উচিত হবে না। মিশ্র চরিত্র তার _ বাউণ্ডেুলে নয়, তবে দৈনন্দিন
জীবনের অনেক আয়োজন প্রয়োজনকে সে অবহেলা করতে পারে। ওদিকে সূচী _
হবু বর গল্প লেখে শুনে আগপিছু বিবেচনা না করেই যে বিয়েতে রাজি হয়ে
গেছে _ সে-ও এই লোকটিকে নিয়ে সুখেই আছে। এমনিতে সে বেশ ঘরোয়া
স্বভাবের মেয়ে। একটি যৌথ পরিবারে তার বাস, সূচীর শ্বশুর-শাশুড়ী
আছেন, দেবর-ননদ আছে, ভাশুড়-জা ও তাদের পুত্রকন্যারা আছে। এবং এদের
সবার সঙ্গেই সূচীর সম্পর্ক ভালো। অনেকটা সময় তাদের নিয়েই কাটে।
বলতে গেলে যৌথ পরিবারের সুবিধাগুলো সে খুব উপভোগ করে। ইকবাল অফিসে
চলে গেলে দীর্ঘ সময় একা থাকার দুঃসহ যন্ত্রণা পোহাতে হয় না, কিংবা
ওর লেখালেখির সময় ওকে ডিস্টার্ব না করেই অন্যদের সঙ্গে গল্প-টল্প
করে সময় কাটিয়ে দেয়া যায়। আর স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক? সেটিও এক
কথায় বলতে গেলে চমৎকার। ইকবাল মানুষ হিসেবে _ অন্তত সূচীর কাছে _
অসাধারণ। এই চুপচাপ নির্জন একা উদাসীন মানুষটিকে সে বলতে গেলে আগলে
রাখে। সূচী তাকে যতোই দেখছে ততোই অবাক হচ্ছে। কী অদ্ভুত একজন
মানুষ! সংসারের খুটিনাটি বিষয়ে কোনো আগ্রহ নেই, সামাজিক
অনুষ্ঠানাদিতে কোনো অংশগ্রহণ নেই _ সে মগ্ন হয়ে আছে নিজের জগতে।
আত্নীয়-স্বজরেনর সঙ্গে সম্পর্ক নেই, এমনকি শ্বশুর বাড়ি নিয়েও কোনো
উচ্ছ্বাস বা উৎসাহ নেই। বাসায় হয়তো খালা ফুপু বা মামা বা চাচা বা
শ্বশুর পক্ষের কেউ এলো _ ও বইতে মুখ গুঁজে আছে তো আছেই; একবার রুম
থেকে বেরিয়ে দু'চারটে কথা বলারও দরকারবোধ করে না। নতুন বিয়ে তাদের
_ এ বাড়ি ও বাড়িতে কতোরকম ফর্মালিটি থাকে, কিন্তু ওকে এসবের কথা
বললে ও এমন অসহায় ভঙ্গিতে তাকায় যেন এইমাত্র ওর ফাঁসির আদেশ হয়েছে।
ফলে স্বামীকে রক্ষা করতে সূচীকে অনেক সত্যি-মিথ্যে তৈরি করতে হয়।
বাসার সবাই ইকবালের এই স্বভাবের সঙ্গে পরিচিত _ তারা মেনেও নিয়েছে
_ কিন্তু জীবন তো শুধু বাসার মানুষ নিয়ে নয়, সামাজিকতা বলে তো একটা
কথা আছে। ইকবাল তার ধার ধারে না বলে ঝালটা পোহাতে হয় সূচীকেই। তাতে
সূচীর কোনো আপত্তি নেই। কারণ, যে যাই বলুক, সূচী তো জানে _ তার
স্বামীটি কতো অসাধারণ মানুষ! বই আর লেখালেখি নিয়ে যে গড়ে তুলেছে
একটি নিজস্ব জগৎ তাকে সবাই কেন এতো ডিস্টার্ব করতে চায় _ সূচী তা
সত্যিই বোঝে না। একজন পুরুষকে তার স্ত্রীর চেয়ে আর কে ভালো চেনে?
সূচী তাই জানে _ বাইরের মানুষের কাছে ইকবাল যেমনই হোক _ নিজের
পরিমণ্ডলে সে কতোটা উদার হাসিখুশি কৌতুকপ্রবণ চমৎকার এক মানুষ।
গল্প শোনার বায়না
এই জুটির সম্পর্কের চমৎকারিত্ব দেখা যায় রাতে। রাতের
খাওয়া-দাওয়া-কাজ-কর্ম-গল্প-সল্প সেরে ইকবালের জন্য চা নিয়ে আসতে
আসতে সূচীর বারোটা সোয়া বারোটা বেজে যায়। তার আগেই ইকবাল খাওয়া
সেরে রুমে চলে আসে। সূচী এসে দেখে ইকবাল বই পড়ছে বা লিখছে। [সব
সময়ই যে এমন হয় তা নয়, মাঝে মাঝে সে সূচীর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে
_ একটার পর একটা বিষয় নিয়ে কথার খই ফোটায় আর সূচী মুগ্ধ হয়ে শোনে];
সূচী কাপড় বদলে বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে মশারি টানিয়ে ইকবালের জন্য
অপেক্ষা করে _ ঘুমিয়ে পড়ে না। কিন্তু ইকবালের বই পড়া আর শেষই হয়
না। একজন মানুষ এতোটা বই পাগল হতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা
কষ্ট। সূচী বসে থাকে, কখনো কখনো নিজেও পড়ে _ কিন্তু ইকবালকে একদম
ডিস্টার্ব না করে। রাত দু'টোর দিকে বোধহয় ইকবালের পরদিন সকালে
অফিসে যাবার কথা মনে পড়ে _ অতএব তাকে বিছানায় আসতে হয়। কিন্তু এসেই
তো ঘুমানো যায় না _ চলে খুনসুটি, গল্পসল্প, আদর সোহাগ ইত্যাদি।
মাঝে মাঝে সূচী বায়না ধরে বসে _ তুমি কিভাবে গল্প লেখ, আমাকে বলতে
হবে।
ইকবাল হাসে _ এটা একটা বলার বিষয় হলো!
অবশ্যই। আমার খুব অবাক লাগে। কীভাবে একটা গল্প সাজাও তোমরা, কীভাবে
তৈরি কর এমন সব চরিত্র যাদেরকে একদম চেনা আর বাস্তব মনে হয়!
তোমরা! প্লুরাল নাম্বার ইউজ করলে মনে হয়! _ ইকবালের গলায় সুস্পষ্ট
ইয়ার্কির আভাস পেয়েও সূচী প্রসঙ্গচু্যত হয় না।
ইয়ার্কি করো না। আমি লেখকদের কথা বলছি।
ও। হঁ্যা, ব্যাপারটা বিস্ময়করই। _ ইকবাল সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করে।
বলো না আমাকে।
আসলে বলার মতো কিছু নেই সূচী। সত্যি। সৃষ্টির প্রক্রিয়া আসলেই
রহস্যময়।
তুমি তোমার অভিজ্ঞতার কথাই বলো, শুনি। এই সেদিন যে গল্পটা লিখলে
সেটার কথাই বলো, কিভাবে লেখা হলো সেটা?
এভাবে বলা যায় না সূচী। গল্পের একটা বাস্তব ভিত্তি তো থাকেই। লিখতে
বসার আগে মাথার মধ্যে একটা খসড়াও তৈরি হয়, কিন্তু সেটা খসড়াই।
লিখতে বসলে কোত্থেকে যে শব্দ আসে একের পর এক, বাক্য তৈরি হতে থাকে
বিরামহীন সেটা স্বয়ং লেখকও জানেন না। বিষয়টা সত্যিই বিস্ময়কর ও
রহস্যময়। একটা লেখার পুরোটা সাজিয়ে গুছিয়ে কেউ লিখতে বসেন না _
সেটা অসম্ভব। তাহলে কোত্থেকে আসে এতো সব শব্দ ও দৃশ্য ও চরিত্র?
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় লেখার সময় একটা ঘোরের মধ্যে থাকেন
লেখকরা _ সেই ঘোর একটা ব্যাখ্যাতীত ব্যাপার। যেন এক অচেনা অজানা
জায়গা থেকে শব্দ আসছে স্রোতের মতো _ লেখকের অজান্তেই। এজন্যই বলা
যাচ্ছে না _ কীভাবে একটা গল্প তৈরি হয়।
তাহলে অন্তত যে গল্পটা লেখার কথা এখন ভাবছো সেটার কথাই বলো। কিভাবে
খসড়া তৈরি হচ্ছে তোমার মাথায়!
সেটা তো বলা যাবে না।
কেন?
দ্যাখো, লেখালেখিটা আসলে আমার ভাবনারই এক ধরনের প্রকাশ মাত্র। অন্য
কোনোভাবে যদি ভাবনাটা প্রকাশিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেটা লেখার প্রেরণা
ও প্রয়োজনীয়তা প্রায় ফুরিয়ে যায়। অর্থাৎ সম্ভাবনায় গল্পটির আবেদন
লেখকের কাছেই কমে যায়, প্রায় অপমৃতু্যই ঘটে।
বুঝেছি। আসলে আমাকে এই বিষয়ে কিছু বলতে চাচ্ছো না, তাই বলো। এতো
ধানাই পানাইয়ের দরকার কি?
আহা রাগ করো না। যেটা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে আর কথা বলে লাভ কি? আর
যেটা লেখার কথা ভাবছি, সেটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না কেন তা তো
বললামই, তুমি নিশ্চয়ই আমার সম্ভাব্য একটি গল্পের অপমৃতু্য দেখতে
চাও না! তারচেয়ে বরং এমন একটা গল্প বলি যেটা কোনোদিন লেখা হবে না।
মানে?
মানে, হয়তো এটা একটা গল্প হতে পারতো, কিন্তু সেটা লেখার প্রত্যাশা
আমি চিরতরে ত্যাগ করেছি বলে আর কোনোদিন লেখা হবে না।
কেন? কেন লেখা হবে না?
আগে গল্পটা শোনো, তারপর জিজ্ঞেস করো।
আচ্ছা। কিন্তু একটা কথা। গল্পটা তুমি এমনভাবে বলবে যেন তুমি লিখে
তারপর পড়ে শোনাচ্ছো।
দূর পাগলী, এভাবে গল্প বলা যায় নাকি? ঠিক আছে, তবু চেষ্টা করছি।
কিন্তু সেক্ষেত্রে তোমাকে চুপ করে থাকতে হবে। গল্পের মাঝখানে কোনো
প্রশ্ন করা যাবে না। প্রশ্ন মনে এলে মনেই রাখবে, পরে জিজ্ঞেস করবে।
ঠিক আছে?
আচ্ছা।
তাহলে শুরু করা যাক।
জুবায়ের ইকবাল যে গল্পটি বলেছিলো
সজল জেল থেকে বেরুলো ছ'বছর পর। এতো তাড়াতাড়ি বেরোনোর কথা ছিলো না।
কিন্তু দেশে হঠাৎ একটা ওলোটপালট কাণ্ড ঘটে গেছে _ দীর্ঘ সামরিক
শাসনের অবসান ঘটেছে প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে। আরো অনেকের সঙ্গে
সে-ও ছাড়া পেয়েছে। তাকে রিসিভ করার জন্য অবশ্য কেউ আসেনি। আসবে না
তা সে জানতোও, কারণ তাকে রিসিভ করার মতো কেউ নেই। কেউ নেই কারণ,
জন্মের পরপরই সে মাকে হারিয়েছে, বাবাও মারা গেছেন একাত্তরে। না,
যুদ্ধ করে শহীদ হননি তিনি _ আরো লাখ লাখ নিরীহ অসহায় হতভাগ্য
বাঙালির মতো _ যারা শুধু বাঙালি হওয়ার অপরাধে এক নির্বিচার বর্বর
হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলো _ তিনিও কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিহত
হয়েছিলেন। শৈশবেই মা বাবাকে হারিয়ে সে বড় হয়ে উঠেছে এক
সহানুভুতিশীল দূর সম্পর্কের চাচার কাছে। বড় হয়ে সে আপনজন বলতেও
তাদেরকেই চিনেছে। কিন্তু একটা উটকো ঝামেলাকে আর কতোদিনই বা টানা
যায়! ওই বাসায় তাই তার অবস্থান খুব একটা ভালো ছিলো না।
ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় সে জেলে গিয়েছিলো _ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে
দণ্ডিত হয়েছিলো দেশদ্রোহীতার অদ্ভুত অভিযোগে। প্রথম প্রথম কিছুদিন
চাচা খোঁজখবর নিয়েছেন, গিয়ে দেখে এসেছেন, ফিরে আসার সময় চোখ মুছে
বলেছেন _ 'তোর জন্য কিছু করতে পারলাম না বাবা, তোর বাপ আমাকে ক্ষমা
করবে না' _ ইত্যাদি। একসময় সজলই তাকে খামোখা কষ্ট করতে না করেছে।
এরপর প্রায় বছর দুয়েক তার কোনো খোঁজখবর করেনি কেউ। জেলে যাবার আগে
একটা মেয়ের সঙ্গে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা জন্মেছিলো তার, সে-ও কয়েকবার
তাকে দেখতে গিয়েছিলো; তাকেও নিষ্ঠুরভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলো সজল। কারণ
সে স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলো _ মেয়েটি, রীতা, তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে,
এবং আরো বহু বছর যাকে জেলে থাকতে হবে তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ভয়াবহতা
সম্বন্ধে সে খুব বেশি সচেতন নয়। সজল তাই তাকে ফিরিয়ে দিলে মেয়েটি
অভিমানে হোক, দুঃখে হোক কি প্রকৃত ব্যাপারটি বুঝতে পেরেই হোক আর
ফিরে আসেনি। রীতার মধ্যে অবশ্য সজলের জন্য সত্যিই গভীর ভালোবাসা
ছিলো। সজল তা জানতোও। এই মেয়েটির সঙ্গে খুব অদ্ভুত ভাবে পরিচয়
হয়েছিলো তার। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়, সজল তখন রাজনীতি নিয়ে খুব
ব্যস্ত, রীতাকে সে একদিন আবিষ্কার করেছিলো শহীদ মিনারের বেদিতে।
না, সেদিন একুশে ফেব্রুয়ারি ছিলো না _ সারারবছর শহীদ মিনার যেমন
থাকে আর কি, অপরিচ্ছন্ন, বিষণ্ন _ তেমনই কোনো একটি সাধারণ দিনে
শহীদ মিনারে একা একটি মেয়ে, বেদিতে একগুচ্ছ ফুল, আর মেয়েটি বসে
ছিলো যেন ধ্যানমগ্ন ঋষীর মতো। অসামান্য একটি দৃশ্য, দুর্লভ তো বটেই
_ আরো অনেকের মতো সে-ও খুব কৌতূহল বোধ করেছিলো ব্যাপারটা কি জানার
জন্য। সজল অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটিকে লক্ষ্য করেছিলো কিংবা অপেক্ষা
করছিলো তার ধ্যান ভাঙার জন্য। বেশ খানিকটা সময় পর সে উঠে এলে সজল
তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কৌতূহল ঠেকাতে না পেরে, অশোভন হচ্ছে
বুঝতে পেরেও খুব মৃদু কণ্ঠে মেয়েটিকে তার এই আচরণের ব্যাখ্যা
জিজ্ঞেস করেছিলো। মেয়েটি ছিলো নির্বিকার, ছেলেটাকে একটা উটকো
যন্ত্রণা মনে করছে কী না তাও বোঝা যাচ্ছিলো না, তার কণ্ঠ ভারি, চোখ
তখনও ভেজা, কেবল বলতে পেরেছিলো _ 'আজকে আমার ভাইয়ের মৃতু্যদিবস।'
বিষয়টি আগাগোড়া বোধের অগম্য বলে মনে হয়েছিলো সজলের। ভাইয়ের
মৃতু্যদিবসে তার কবরে যাওয়াটা বোধগম্য হলেও সেখানে না গিয়ে এই শহীদ
মিনারে আসার অর্থ কি? ভাষা শহীদরা নিশ্চয়ই এই তরুণী মেয়েটির ভাই
নয়, হলেও এটা ফেব্রুয়ারি মাস নয়। এসবের কিছুই বোঝা না গেলে সজলের
কৌতূহল আরো বেড়ে যায়, মেয়েটি তার তোয়াক্কা না করে চলে গেলেও সজল
কিছুদিন পর আবার মেয়েটিকে খুঁজে বের করে ফেলে। পরে অবশ্য সজল জানতে
পেরেছিলো _ রীতার ভাই কোনো এক গোপন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলো, মারা
গেছে _ ওর লাশটিও ফেরত পায়নি রীতারা, শুধু সতীর্থরা এসে জানিয়ে
গেছে এই মৃতু্যসংবাদ। তার মৃতু্যদিবসে রীতা তাই গিয়েছিলো শহীদ
মিনারে ভাইকে শ্রদ্ধা জানাতে। রীতার এই ভাষ্য সজলকে আমূল চমকে দেয়।
শহীদ মিনার তার কাছে সম্পূর্ণ এক নতুন ব্যঞ্জনা নিয়ে ধরা দেয়।
শুধুমাত্র ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত কোনো স্মৃতির মিনার বলে মনে
হয় না ওটাকে। বরং আবহমান কাল ধরে এই দেশের জন্য, এই মাটি ও মানুষের
জন্য যারা অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে গেছে _ মনে হয় ওই শহীদ মিনার
তাদের সকলের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রীতার ভাই মানুষের
মুক্তির স্বপ্ন দেখতো এবং তার বিশ্বাস ছিলো _ প্রচলিত রাজনীতি
তাদের মুক্তি আনতে পারবে না, সশস্ত্র শ্রেণীযুদ্ধই মুক্তির একমাত্র
পথ; একেকটি অঞ্চল ধরে শ্রেণীশত্রু খতম করতে করতে এগিয়ে আসতে হবে
কেন্দ্রের দিকে। তার এই বিশ্বাস সঠিক কী না _ এই বিতর্ক অর্থহীন _
তার স্বপ্নটাই আসল ও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মুক্তির স্বপে বিভোর
একজন তরুণ মধ্যবিত্তের ঘেরাটোপ পেরিয়ে, মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ও
প্রত্যাশা ডিঙ্গিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে নেমে পড়ে কোন
প্রেরণায় _ সজল সেটা বোঝে। এসব স্বাপি্নক মানুষদের প্রতি তার
অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা রয়েছে অনেকদিন ধরে। সে-ও তো আসলে মানুষের মুক্তির
স্বপ্নই দেখে। এই ঘটনা এবং চিন্তা ও আদর্শের সমধর্মিতা রীতা ও
সজলকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে থাকে।
ওদিকে প্রচলিত রাজনীতির প্রতি সজলেরও বিতৃষ্ণা তৈরি হচ্ছিলো। একটি
রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সাধারণ কর্মি থেকে নিজের মেধা যোগ্যতা
কর্মচাঞ্চল্য ও ত্যাগ তীতিক্ষায় অতি অল্প সময়ে সে নেতৃত্বের
পর্যায়ে উঠে এলেও অতি দ্রুত সে এ-ও বুঝতে পেরেছিলো যে, তার ও
অন্যান্য রাজনৈতিক দলের রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে গণমানুষের
আশা-অকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কবিহীন। এসব দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের
অসাড়তা, অন্তসারশূন্যতা ও হঠকারিতা তাকে হতাশ করে তোলে। সে
আবিষ্কার করে _ মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, একটি সুস্থ,
প্রগতিশীল,কুসংস্কারমুক্ত, দারিদ্র ও ক্ষুধাবিহীন সমাজ ও রাষ্ট্র
গড়ার স্বপ্ন এসব দলের কাছে নির্মমভাবে পদদলিত হচ্ছে। তারা শুধু
পরস্পরের সঙ্গে হানাহানি এবং ক্ষমতা পাবার কামড়াকামড়িতে লিপ্ত।
অস্ত্রের ঝনঝনানি, নীতিহীন ও আদর্শহীন কর্মকাণ্ডের উলঙ্গ উল্লাস
এবং তাতে কেন্দ্রীয় নেতাদের পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ সমর্থন এখন
নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। দেশে তখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে একটা
আন্দোলন গড়ে উঠছে, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ ফেটে পড়েছে ক্ষোভে _
অন্যদিকে ছাত্রনেতাদের চারপাশে টাকা আর ক্ষমতার হাতছানি। এরকম একটি
সময়েই সজল তার দলের একজন বড় নেতার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে।
সরকারবিরোধী আন্দোলনের চেয়ে ওই নেতা অন্যান্য বিরোধী দলের
বিরুদ্ধেই বেশি সময় ব্যয় করতেন, বিরোধী পক্ষের ছাত্রনেতা ও
কর্মীদের নির্বিচারে হত্যা কিংবা সন্ত্রাসের জন্য অস্ত্র ও অর্থের
যোগানদাতা হিসেবে ওই নেতার 'সুনাম' ছিলো আকাশচুম্বী। এসব নিয়ে সজল
তার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং ভুল করে _ 'আমি আপনার মুখোশ খুলে
দেব' _ এ ধরনের একটা হুমকি দিয়ে বসে। সেই সুযোগ অবশ্য সে পায়না,
কারণ_ এক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং দেশদ্রোহীতার
অভিযোগ এনে সামরিক আদালতে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
সামরিক আইনে সবই সম্ভব। আসলে তো ওটা কোনো আইন নয়, কতোগুলো শুয়োরের
বন্য উল্লাস। কিছুদিনের মধ্যেই ওই নেতা সামরিক সরকারের মন্ত্রীত্ব
গ্রহণ করেন, অন্যদিকে সজলের জীবনে নেমে আসে নির্মম অনিশ্চয়তা। তার
পক্ষে লড়ার কেউ ছিলো না, সেই বাস্তবতাও ছিলো না। সেই সময় সে
আবিষ্কার করেছিলো, যে দলের জন্য সে এতোদিন ধরে নিরন্তর কাজ করে
এসেছে তাদের পক্ষ থেকে তার মুক্তির জন্য কোনো দাবিই উচ্চারিত হয়নি।
মুক্তির কোনো সম্ভাবনা না দেখে অতপর সে সারাজীবন জেলে কাটিয়ে দেবার
মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে এবং চাচা ও রীতাকে ফিরিয়ে দেয়। এরপর
কয়েকজন বন্ধু ছাড়া এ কয়েকবছরে কেউ তার খোঁজও নেয়নি।
কিন্তু এই হঠাৎ মুক্তি এখন তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। ছয়টি বছর। কম
সময় তো নয়! পরিচিত সবার জীবন কতোটাই না বদলে গেছে! এই বদলে যাওয়া
পরিস্থিতিতে সে এখন যাবে কোথায়, থাকবে কোথায়, করবেই বা কি? বাইরে
বেরিয়ে মুক্তির আনন্দের বদলে এই সব ভাবনা তাকে বিমর্ষ করে তুললো।
সরকারের পতন ঘটেছে একটি গণঅভূ্যত্থানের ফলে, এই আন্দোলনের প্রাথমিক
পর্যায়ে তার প্রবল অংশগ্রহণ ছিলো তবু, বিষয়টি তাকে আদৌ স্পর্শ
করলো না। জেলে থাকতে তার উপলব্ধি ঘটে গেছে _ এভাবে হবে না। কিন্তু
কিভাবে হবে তা নিয়ে ভাবার আগে তার একটি আশ্রয় দরকার। সে প্রথমে
গেলো চাচার বাসায়। কিন্তু বছর দেড়েক আগে তিনি বাসা বদলেছেন _
বাড়িওয়ালা এতোদিন পর্যন্ত সেই ঠিকানা রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। সে
চাচার অফিসে যেতে পারতো _ গেলো না। অভিমানে। চাচা তাকে বাসা বদল
করার ব্যাপারটা জানানোরও প্রয়োজন মনে করেন নি। তারপর গেলো রীতাদের
বাসায়। জানলো _ রীতার বিয়ে হয়ে গেছে বছর খানেক আগে, সে এখন
প্রবাসী। এরপর সে গেলো বন্ধুদের খোঁজে। দু'চারজন বাদে প্রায় কাউকেই
পাওয়া গেলো না। সবাই তাদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে, পাশটাশ করে
কর্মজীবনে ঢুকে পড়েছে, কেউ কেউ এর মধ্যে প্রবাসী, কেউ বা সরকারী
চাকরিতে পোস্টিং নিয়ে মফস্বলে, যারা ঢাকায় তারাও খুব ব্যস্ত। যাদের
সঙ্গে দেখা হলো তারা সবাই অবশ্য সজলকে খুব খাতির-যত্ন করলো,
দু'চারদিন থাকতেও দিলো _ কিন্তু সে নিজেই থাকতে চাইলো না। এসব
বন্ধুদের কাছে সে নানাভাবেই ঋণী। নিজেদের হাজারটা ঝামেলা সত্ত্বেও
তারা সবসময় সজলের খোঁজখবর নিয়েছে। এখন মুক্তি পেয়ে তাদের ঘাড়ে চেপে
বসাটা খুবই অন্যায় বলে মনে হলো সজলের। তাছাড়া ছোটবেলা থেকেই সে
মানুষের সংসারে উটকো ঝামেলার মতো বসবাস করেছে _ আর কতো?
ধীরে ধীরে সজলের ভেতরে কিছুটা অপ্রকৃতিস্থতা দেখা দিতে লাগলো। সেটা
শুধু নিজের দুঃসহ অনিশ্চয়তার জন্য নয়, বরং যে দেশের মুক্তি ও
মানুষের কল্যাণের জন্য সে নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলো, সেই
দেশের দুর্দশা তাকে প্রায় পাগল করে তুললো। এতোদিনেও কোথাও
কোনোকিছুর পরিবর্তন ঘটেনি। এখনও ডাস্টবিনের পচা খাবার নিয়ে মানুষে
কুকুরে কাড়াকাড়ি, এখনও রাজপথের আলো-আঁধারিতে খদ্দেরের আশায় হতভাগ্য
নিশিকন্যাদের দাঁড়িয়ে থাকা, এখনও ক্ষুধায়-কান্নায় ক্লান্ত শিশু,
খোলা আকাশের নিচে শতচ্ছিন্ন পোশাকে লজ্জা নিবারণের চেষ্টারত মানুষ,
এখনও জীর্ণশীর্ণবুভুক্ষ মানুষের ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার চেষ্টা,
এখনও আলোর ইশারাবিহীন অতল অন্ধকারে পতিত স্বদেশ, ইত্যাদি ইত্যাদি।
না, একে বদলাতেই হবে। কিন্তু কিভাবে? সামপ্রতিক গণঅভূ্যত্থান তাকে
এতোটুকু আশাবাদী করে নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এদেশকে কি দেবে? একটি
সুষ্ঠু নির্বাচন? তার মানে আরেকটি বদমাশ সরকার। তারা এদেশের কি
উপকার করবে? না, এভাবে হবে না। তাহলে কিভাবে? সজল যেন পাগল হয়ে
যাবে। সে তার বন্ধুবান্ধবদের কাছে বলতে লাগলো _ 'আমি তো জেলেই ভালো
ছিলাম রে। ওখানে তবু যারা থাকে তাদের খাওয়ার নিশ্চয়তা আছে, পড়ার
মতো পোশাক আছে _ হোক তা কয়েদির, অন্তত উলঙ্গ তো থাকতে হচ্ছে না!
মাথার ওপরে ছাদ আছে _ অন্তত ঝড়বৃষ্টি থেকে তো বাঁচা যাচ্ছে! আর
ওখানে অন্তত কেউ অপঘাতে মরেনা। এখানে তো স্বাভাবিক মৃতু্যর
গ্যারান্টি পর্যন্ত নেই। ঘর থেকে সকালে বেরুলে যে বিকেলে ফিরে আসা
যাবে সেই নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদিন সকালেই সবার কাছ থেকে চিরবিদায়
নিয়ে বেরুনো দরকার। এ কোন দেশ? এ দেশতো আরো ভয়ংকর কারাগার। এখানে
তোরা আছিস কি করে? এই কারাগার তোরা ভাঙবি না?' _ এইসব কথা সে
প্রথমে তার বন্ধুদের বলতে লাগলো, তারপর চেনা লোকদের, তারপর রাস্তায়
অচেনা লোকদের ধরে ধরে _ 'ভাই এ কারাগার আপনারা ভেঙে ফেলছেন না কেন?
আসুন আমরা সবাই মিলে ভেঙে ফেলি। আসুন সবাই মিলে নিজেদেরকে মুক্ত
করি। আসুন দেশটাকে জেলখানা বানানোর জন্য যারা দায়ী তাদেরকে হত্যা
করি।' _ সবাই ধরেই নিলো লোকটা পাগল হয়ে গেছে। চেনা লোকজন তবু ওর
সবকিছু জানতো বলে ব্যাপারটা স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছিলো _ এতো
অনিশ্চয়তায় একজন লোকের মাথা ঠিক থাকে কিভাবে? কিন্তু অচেনা লোকজন
প্রথম প্রথম সভয়ে তাকে এড়িয়ে যেতো, পরে দেখা গেলো _ কৌতূহলী হয়ে
অনেকেই ওর কথা শুনছে। আফটার অল, পাগল হলেও অযৌক্তিক কিছু তো আর
বলছে না! এই হচ্ছে মানুষের ভাবভঙ্গি।
ইকবাল একটানা অনেকক্ষণ বলে থামলো। বেশ কিছুক্ষণ থেমে থাকতে দেখে
সূচী জিজ্ঞেস করলো _ তারপর?
ইকবাল দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো _ এইসব বলতে বলতে সে একদিন পেঁৗছলো সেই
নেতার কাছে। দেশের এই অবস্থার জন্য নেতাদের দায়ী করে জ্বালাময়ী
বক্তৃতা দিলো। নেতার সঙ্গে তার আবারও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলো।
নেতা _ 'তোমাকে আমি আবার জেলে ঢুকাবো' _ বললে, সজল এবার আর ভুল
করলো না। ঝাঁপিয়ে পড়লো নেতার ওপর। তার বিক্ষুব্ধ আঙুল নেতার গলা
চেপে ধরলো। সম্ভবত এভাবেই সজল তার অভিযান শুরু করলো।
ইকবাল আবার থামে। সূচী গল্পের নাটকীয়তায় উত্তেজিত _ তারপর?
এই তো গল্প। এর আর পর কি?
তারপর সজলের কি হলো?
গল্প এটুকুই সূচী। এর পরের কথা আর জিজ্ঞেস করো না। অন্য কিছু জানার
থাকলে বলো _ ইকবাল খুব গম্ভীর।
গল্পটি যে কারণে লেখা হয়নি
সূচী জিজ্ঞেস করলো _ গল্পটা কি সত্যি? সজল কি বাস্তব চরিত্র?
হঁ্যা _ ইকবালের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
তুমি এতো কিছু জানলে কি করে? ওনাকে তুমি চেনো?
তাতো বটেই। ও আমার বন্ধু ছিলো।
ছিলো! এখন আর নেই?
ইকবাল চুপ করে রইলো। সূচী তার সব প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছে না। তবু সে
একটার পর একটা প্রশ্ন করে যাচ্ছে। তার অনেক কৌতূহল।
এসব বলতে চাচ্ছো না! আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে এবার আমাকে বুঝিয়ে বলো
এই ঘটনা নিয়ে গল্প লেখার প্রত্যাশা তুমি চিরতরে ত্যাগ করেছো কেন?
সেটা বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে সূচী।
বলো। আমি শুনতে চাই।
এখানে অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথমত গল্প আমি কেন লিখি সেটা স্পষ্ট
হওয়া দরকার। গল্প লিখি, কারণ আমি আমার কিছু উপলব্ধির কথা বলতে চাই
আমার পাঠকদের কাছে। সেক্ষেত্রে একটা গল্পকে উপস্থাপন করতে হয়
বিশ্বাসযোগ্যভাবে। কিন্তু সজলের জীবন এতো নাটকীয় উপাদানে ভরপুর যে,
প্রায় অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। সজল নিজেই এক নাটকীয় চরিত্র। শৈশবে
বাবা মা হারিয়ে দূর সম্পর্কের এক সদয় চাচার কাছে বড় হয়ে ওঠা,
রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া, নেতার সঙ্গে বাদানুবাদ, জেলে যাওয়া,
দেশদ্রোহীতার অভিযোগ, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, আবার আশ্চর্যজনক ভাবে
ছাড়া পাওয়া _ এসবই বেশ নাটকীয়। কিংবা ধরো রীতার সঙ্গে তার পরিচয়ের
ব্যাপারটা _ সেটাও কি ভীষণ নাটকীয় নয়? নিহত ভাইকে স্মরণের জন্য
নিশ্চয়ই কেউ শহীদ মিনারে আসে না! টিভি নাটকে হয়তো এমন দৃশ্য মানায়
_ বাস্তবে তা অসম্ভব, কিন্তু এক্ষেত্রে বাস্তবেই তা ঘটেছিলো। কিংবা
দেখো, ওই নেতা তো সজলকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিতে পারতেন, তা না করে
জেলে ঢুকালেন কেন? কিংবা ধরো, নেতা যখন সরকারী দলে যোগ দিলেন তখন
তো অন্তত তার দল তার মুক্তির দাবি করতে পারতো, করেনি কেন? এসব নানা
রকম প্রশ্ন ঘটনাটিকে একটি গল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থেকে দূরে সরিয়ে
দিচ্ছে। গল্প-পাঠকরা কিন্তু খুব স্পর্শকাতর, গল্পে ছোটখাটো ত্রুটিও
তারা ক্ষমা করে না। এসব অবিশ্বাস্য ঘটনা পাঠকরা মেনেই নেবে না, অথচ
এগুলো সত্যিই ঘটেছিলো। এসব ঘটনা ছাড়া সজলের চরিত্র ঠিকমতো দাঁড়ায়ও
না। মানুষের জীবনে যে কতোরকমের নাটকীয়তা থাকে, অথচ গল্প পাঠকরা
সেটা মানতেই চায় না। পাঠকদের সাইকোলজি বোঝা ভারি কষ্ট। কিন্তু এসব
ছাড়াও গল্পটা না লেখার একটা বড় কারণ আছে। গল্পের শেষাংশটুকু _ যা
তোমাকে বললাম, অর্থাৎ নেতার মুখোমুখি হওয়া এবং নেতাকে হত্যা করা _
এটুকু ঘটেনি, এটুকু মিথ্যে। সত্যি হচ্ছে সজল নিজেই আত্নহত্যা
করেছে।
সূচী চমকে উঠলো _ এরকম একটি কথা শোনার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত
ছিলোনা। আত্নহত্যা করেছে!
হঁ্যা _ ইকবালের কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে।
তারপর অনেকক্ষণ আর কোনো কথা বলে না ইকবাল। সূচীও আর কিছু জিজ্ঞেস
করে না। একসময় ইকবাল নিজেই মুখ খোলে, তখন তার কণ্ঠ ভেজা আর বিষণ্ন
শোনায়। সূচীকে এবার আর কিছু জিজ্ঞেস করতে হয় না _ নিজের থেকেই সব
কথা বলে যায় ইকবাল, বোঝা যায় _ অনেকদিন থেকে কথাগুলো তার বুকের
মধ্যে কান্নার মতো জমেছিলো।
শেষ কয়েকটা দিন ও আমার কাছেই ছিলো। তখন ওর অবস্থা বেশ খারাপ।
উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, লোকজনকে উত্তেজিতভাবে কারাগার
ভাঙার কথা বলছে। তারপর হঠাৎ গুম মেরে বসে রইলো দু'দিন। কি যে হলো
ওর, কিছুই বোঝা গেলো না। শুধু দু'দিন পর তার লাশ পাওয়া গেলো
রাস্তায়। ওই উঁচু বিল্ডিংটার ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলো। মৃতু্যতেও
নাটকীয়তা সূচী _ কিভাবে ও ওই এতো উঁচুতে উঠেছিলো কে জানে! আমি ওকে
নিয়ে অনেক ভেবেছি, লিখতে চেয়েছি _ কিন্তু পারিনি। পারবোও না, বুঝে
গেছি। কেন জানো? সবাই ভাবতো _ ও পাগল হয়ে গেছে _ কিন্তু আমি জানি,
ও পাগল ছিলো না। পাগলের কোনো লজিক থাকে না, কিন্তু ওর লজিক ছিলো
অত্যন্ত পরিস্কার। ও আসলে ছিলো এক স্বপ্নে পাওয়া ঘোরগ্রস্থ মানুষ।
স্বপ্ন আর বাস্তবের সীমারেখা মুছে গিয়েছিলো ওর জীবন থেকে। শেষের
দিকে ও প্রচুর কথা বলতো। নিজের অনিশ্চিত জীবনের কথা ভুলে গিয়ে
কেবলই সেই কারাগার ভাঙার কথা। এই দুঃসহ বৃহৎ কারাগারটি ভেঙে ফেলে
সবাইকে মুক্তির আনন্দ দেবে _ এই ছিলো ওর স্বপ্ন। চেনা অচেনা সবাইকে
ও এই কথা বলে বেড়াতো। ওর মৃতু্যর পর ওর ছেঁড়াখোড়া ব্যাগের ভেতর
অসংখ্য টুকরো কাগজ আর পুরনো ডায়রিতে পেয়েছি এসব ঘটনা আর ভাবনা
চিন্তা। ওকে নিয়ে হয়তো গল্প লেখা যেতো যদি সত্যিই ওই নেতাকে ও
হত্যা করতে পারতো। ওই নেতাকে হত্যা করে সজল বীরদর্পে এগিয়ে যাচ্ছে
_ এই যদি হতো গল্পের শেষাংশ, তাহলে লেখা যেতো। কিন্তু ঘটনা তো
সেরকম নয়। সেরকম না হলেও আমি হয়তো তেমন করেই লিখতে পারতাম _ লেখকের
তো এই স্বাধীনতা আছেই। কিন্তু সেটা হতো উইসফুল থিংকিং। সত্যি তো আর
তেমনটি ঘটে না। সত্যি যা ঘটে তা হলো _ ওই নেতা নতুন 'গণতান্ত্রিক
সরকারেও' গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। গল্পের শেষে লাল
সূর্য উঠতে দেখালেই তো আর মানুষের জীবনে সত্যি সত্যি লাল সূর্য ওঠে
না! গল্পে আমি সজলের আত্নহত্যাও দেখাতে পারতাম। কিন্তু একটি গল্পের
পরিণতি হিসেবে আত্নহত্যা হচ্ছে সবচেয়ে সস্তা আর নিকৃষ্ট পদ্ধতি।
তবু আত্নহত্যা দিয়ে গল্প শেষ হতে পারে _ হয়ও। অনিবার্য যেখানে
সেখানে এটা মেনে নেয়া যেতে পারে। এই সমাজব্যবস্থায় সজলের
আত্নহত্যাও হয়তো একটি অনিবার্য ঘটনা, কিন্তু তবু আমার পক্ষে তা
লেখা সম্ভব নয়। আর এখানেই লেখক হিসেবে আমার দর্শন ও দায়বদ্ধতার
প্রশ্নটি এসে যায়। আমি কি লিখবো না লিখবো সেই পছন্দ-অপছন্দের
ব্যাপারটা এসে যায়। দ্যাখো সূচী, আমাদের সময়টা স্বপহীন মানুষে ভরে
গেছে। এই যে আমাকে দেখছো, সজলের মতো একজন ধ্রুপদী স্বাপি্নক
মানুষের বন্ধু, অথচ আমিও মধ্যবিত্তের নিরাপদ বৃত্তে চিরতরে আটকা
পড়ে গেছি। কোনোদিন বেরুতে পারবো না _ হয়তো বেরুতে চাইও না। আমরা
সবাই-ই আসলে এরকমই। যারা সত্যি সত্যি কারাগারটি ভেঙে ফেলার ক্ষমতা
রাখে _ তাদের সেই স্বপ্নটিই নেই, কিংবা তারা হয়তো আদৌ এটাকে
কারাগার বলে মনে করে না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অথচ সজল! নিজেকে
বাদ দিয়ে সবাইকে নিয়ে ভেবেছে সে। পুরো দেশটিকে একটি বিশাল কারাগার
বলে মনে হয়েছে তার _ সেটিকে ভেঙে ফেলে বন্দি মানুষগুলোকে একটি
উজ্জ্বল পৃথিবীর সন্ধান দেয়ার অসম্ভব-গভীর-বিশাল স্বপ্ন দেখেছে।
তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, তার করুণ মৃতু্য হয়েছে _ কিন্তু তার তো তবু
স্বপ্ন ছিলো। ও তবু পেরিয়ে যেতে পেরেছিলো জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডি।
এরকম একজন স্বাপি্নক, বৃত্তভাঙা মানুষের আত্নহননের গল্প আমি আমার
এই মধ্যবিত্ত হাত দিয়ে লিখি কি করে বলো? তার চেয়ে বরং ভেবে নিই না
কেন _ সজল বেঁচে আছে! যেসব মানুষকে ও কারাগার ভাঙার কথা বলতো তারা
হয়তো তাকে প্রথম প্রথম এড়িয়ে গেছে কিন্তু ভেবে নিই না কেন যে, পরে
কথাগুলো তারা ভেবে দেখেছে আর অপেক্ষা করছে আরেকটি আহ্বানের। সজল
বেঁচে আছে, লোকজনকে ডেকে সে তার স্বপ্নের কথা বলছে আর সবাই সে কথা
শুনে নিজেরাও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, উজ্জীবিত হয়ে উঠছে কারাগার
ভাঙার মোহন মন্ত্রে, মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে তাদের শীর্ণ হাতগুলো _
এরকম একটি দৃশ্যের কথা ভাবতে আমার খুব ভালো লাগে, কিংবা আমি এমন
একটি দৃশ্যকেই বুকে করে আছি। আমি তাই ওর মৃতু্যর কথা লিখবো না _
লিখতে পারবো না।
ইকবালের চোখ ভিজে ওঠে, কান্না লুকানোর জন্য সে অন্যদিকে মুখ
ফেরায়।। টের পায় সূচী তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার চোখও ভেজা। সূচীর
চোখের জলে ইকবালের বুক ভেসে যাচ্ছে।
রচনাকাল : মার্চ, ২০০০ |
| |
 |
|