সাদামাটা সামান্য একজন মানুষ হঠাৎ করে দেবতার আশীর্বাদ অথবা অভিশাপ
পেয়ে গেলে তার জীবনযাপনে যে পরিবর্তনের ধাক্কা লাগে তাকে মোটামুটি
বিপর্যয় বলেই মনে হতে পারে এবং ঘটনাটি কাহিনী হয়ে লোকের মুখে মুখে
ফিরতে পারে, কিংবা কোনো লেখকের হাতে পড়ে তা রূপায়িত হতে পারে
গল্পেও। আমরা পুরো ঘটনাটিকে রূপকথার ঢঙেই বর্ণনা করতে পারি, কারণ,
বিষয়টি রূপকথার মতোই রোমাঞ্চকর। আসুন তাহলে প্রিয় পাঠক, আমরা ওই
সামান্য লোকটির অসামান্য রূপকথা শুনি-
এক দেশে এক লোক ছিলো (লোক বললে কেমন বয়স্ক বয়স্ক শোনায়, বয়সে সে
যুবকই, কিন্তু হাবভাবে, আচার-আচরণে সে বয়স্ক লোকের মতো একা ও
গম্ভীর। তবু এই গল্পের জন্য যুবক শব্দটিই মানানসই হবে বলে আমরা
ওটাই ব্যবহার করবো)। তো যুবকটি বয়স্ক লোকের মতোই নিঃসঙ্গ ও গম্ভীর,
একা একা সারাক্ষণ কী যেন ভাবে, মাঝে মাঝে আবার মুচকি একটু হাসেও,
কখনো বা ঘরের মধ্যে অবিরাম পায়চারি করে, আর একা একা কথা বলে। এক
চিলতে এক কামরায় তার নিজস্ব পৃথিবী, আর সেই পৃথিবীর সে একক সম্রাট।
দেখতে শুনতে আহামরি গোছের কিছু না হলেও একেবারে উপেক্ষা করার মতোও
নয় সে। অবশ্য নিজের চেহারা-সুরত সম্বন্ধে তার ভাবনা সামান্যই;
চুলগুলো বেড়ে বেড়ে ঘাড়ের কাছে পড়লে মনে পড়ে-
অনেকদিন চুল কাটা হয়নি, মাঝে মাঝেই খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ নিয়ে
হেঁটে বেড়ায়, কাপড়-চোপরের কথা না হয় বাদই থাকলো। আর এসবের দিকে নজর
দেয়ার সময় কোথায় তার, সে কেবল কী যেন ভাবছে সারাক্ষণ। কী যেন!
যেন এক ধ্যানমগ্ন ঋষি সে, কোনোকিছুই তার ধ্যান ভাঙাতে পারবে না।
ভীষণ চুপচাপ আর শান্ত বলে লোকজন কখনো কখনো তাকে বোবা বলে ভুল করে।
অফিসে বড় সাহেবের অকারণ ধমক, সহকর্মীদের বিদ্রূপ-ঠাট্টায়ও সে
অবিচল, প্রতিক্রিয়াহীন। কেউ তার সঙ্গে মেশে না, বিদ্রূপ ছাড়া প্রায়
কথাই বলে না, পিয়নেরও বেতন বাড়ে কিন্তু তার বাড়ে না- তবু সে
নির্বিকার। (রূপকথার পাত্রপাত্রীরা চুলকাটার কথা ভাবে কী না বা
চাকরি-বাকরি করে কী না, এসব অবান্তর প্রশ্ন সঙ্গতকারণেই পাঠকরা
তুলবেন না বলে আশা করছি, কারণ এটি হচ্ছে রূপকথার আদলে একটি সত্য
ঘটনা, পাঠকরা তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন!)
অফিস থেকে ফিরে এক দীর্ঘ গোসল দেয় সে। যেন সব গ্লানি আর লজ্জা
ধুয়ে-মুছে ফেলবে। তারপর কিছু খেয়ে নিয়ে ঘুম। সন্ধ্যায় ঘুমায় বলে
অনিবার্যভাবে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়, আর সে তার এক চিলতে কামরায়
একমাত্র জানালায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে- কী যেন দেখে সে। কী দেখে? কখনো
জোছনায় চরাচর ভেসে যায়, কখনো বৃষ্টিতে; আর যুবকের চোখ অকারণে ভিজে
ওঠে। বড়ো একা লাগে।
'কেন আমি এমন একা?'- সে ভাবে।
আবার কোনো কোনো সন্ধ্যায় ঘুম আসে না বলে সে বেরিয়ে পড়ে। একা একা
দীর্ঘপথ হেঁটে যায়, যেন পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কহীন, এমনভাবে।
চারপাশের কোলাহল যেন স্পর্শই করে না তাকে। সে তো ধ্যানমগ্ন ঋষি, কে
তার ধ্যান ভাঙাবে?
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব নেই তার। যা-ও বা ছিলো, সবাই তার
ব্যাপারে আশা ছেড়ে দিয়েছে। কবে যে সবার হিসাবের খাতা থেকে তার নাম
কাটা পড়েছে, কেউ তা মনে রাখেনি। এসবে অবশ্য তার কিছু যায় আসে না।
শান্ত-নিরুপদ্রব-ঘটনাবিহীন জীবন তার। নিজের এক চিলতে পৃথিবীর একক
সম্রাট।
যুবকটি সম্বন্ধে আর কিছু বলার আছে বলে মনে হয় না। জীবন তার ভালোই
চলছিলো। ঘটনাবিহীন, পৃথিবীর সঙ্গে প্রায় সম্পর্কবিহীন, শান্ত,
নিরুপদ্রব। কিন্তু শান্তিপ্রিয়তা ঈশ্বরের পছন্দের বিষয় নয়। তার
কাছে তাই পাঠানো হলো অন্ধ দেবতাকে। এই দেবতাকে নিয়ে নানারকম বিতর্ক
আছে। কেউ কেউ বলেন- তিনি শুধু ঝামেলা পাকান, আবার কারো কারো মতে-
তাঁর কাজকর্ম মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত। যা হোক, এ বিতর্কে
আপাতত আমাদের বিশেষ উৎসাহ নেই। আমরা এখন যুবকের গল্প বলছি। তো,
দেবতা বললেন- ওহে যুবক, তুমি বড়ো ম্রিয়মাণ। তোমার জীবন বড়ই
নিস্তরঙ্গ, ঘটনাবিহীন। এ রকম জীবনের কোনো মানে হয় না বুঝেছ?
দেবতা একটু থামতেই যুবক বললো- যদিও সে খুব শান্ত ও চুপচাপ, তবু
দেবতার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তো আর সহজে পাওয়া যায় না, তাই এবার আর
চুপ করে থাকলো না- তুমি তো অন্ধ, তুমি শুধু আমার বাইরের জীবনটির
কথাই জানো, আমার ভেতরে যে প্রতিনিয়ত বয়ে চলে ঝড়, তুমি তা দেখ না?
আমার অস্থিরতা, আমার ক্লান্তি, আমার বিপন্নতা তোমার চোখে পড়ে না?
কিন্তু দেবতা শুধু অন্ধই ছিলেন না, ছিলেন বধিরও। তাই যুবকের কোনো
কথাই তার কর্ণগোচর হলো না। তিনি একইভাবে বলা শুরু করলেন_
আমি তোমার জীবন পাল্টে দেবো। এমন এক জীবন পাবে তুমি, যা কখনো
কল্পনাও করনি। তখন বুঝতে পারবে ঈশ্বর কতো নিপুণ শিল্পী!
আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দেবতা অন্তর্হিত হলেন আর যুবক পড়ে
গেলো ভাবনায়। ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুম ভাঙলো মধ্যরাতে। অবাক
হয়ে সে দেখলো তার ভাঙাচোরা মলিন ঘরের মধ্যে এক অতি রূপসী
জ্যোতির্ময়ী তরুণী দাঁড়িয়ে। সে হতবাক। একবার ভাবলো সে বুঝি স্বপ্ন
দেখছে। গায়ে চিমটি কেটে দেখলো- না, জেগেই আছে। ভীষণ অবাক হয়ে সে
জিজ্ঞেস করলো-
তুমি কে?
বিনিময়ে মেয়েটি মৃদু হাসলো শুধু। কিন্তু কোত্থেকে যেন অলৌকিক এক
কণ্ঠস্বর ভেসে এলো- ও হচ্ছে অচিনপুরের রাজকন্যা।
চমকে উঠে যুবক জিজ্ঞেস করলো- কে কথা বলছো?
সেটা তোমার না জানলেও চলবে। তুমি বরং অন্য কিছু জানতে চাও।
ঠিক আছে, তুমি বলো, রাজকন্যারা তো রূপকথায় থাকে, আমার ঘরে এলো কী
করে?
আমি সব পারি যুবক। অচিনপুর থেকে এই রাজকন্যাকে এনেছি তোমার জীবন
বদলে দেয়ার জন্য।
কিন্তু আমি তো আমার জীবন বদলাতে চাইনি।
তোমার চাওয়া না চাওয়ায় কিছু যায় আসে না।
ও, বুঝেছি। তুমি হচ্ছো ঈশ্বর। একমাত্র ঈশ্বরের কাজকর্মই সব
অবিবেচকের মতো। প্রশ্নহীন আনুগত্যে তোমার এই স্বেচ্ছাচারিতা আমাকে
মানতে হবে, না? আমি মানবো না।
তুমি বোকা, তুমি নির্বোধ। আমার সিদ্ধান্ত কারো না মেনে উপায় নেই।
তাছাড়া এটাই অন্ধ দেবতার অন্ধত্ব মোচনের শেষ সুযোগ।
মানে?
যে দেবতাকে তোমরা অন্ধ বলে জানো, সে তো আগে অন্ধ ছিলো না। এই
রাজকন্যার রূপের দ্যুতি তাকে অন্ধ করে দিয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি,
ওকে যারাই দ্যাখে তারাই অন্ধ হয়ে যায়।
ভীষণ অবাক হয়ে যুবক বললো_ কই, আমি তো অন্ধ হলাম না।
হবে, তুমিও হবে। এখনো তুমি তার রূপের দ্যুতি দেখনি। দেখলেই অন্ধ
হয়ে যাবে।
না না, আমি অন্ধ হতে চাই না।
ভালো করে ভেবে বলো যুবক, আমার মনে হয় তোমার অন্ধ হয়ে যাওয়াই ভালো।
না না, আমি অন্ধ হতে চাই না।
বেশ। আমি তোমাকে চিরদৃষ্টি দিলাম।
তা অন্ধ দেবতার কথা কি যেন বলছিলে?
হ্যাঁ, বলছি। সে শুধু অন্ধই নয়, বধিরও। এই রাজকন্যার কণ্ঠস্বর শুনে
সে বধির হয়ে গেছে।
সে কি!
হ্যা, তুমিও শুনলে বুঝবে এ রকম কণ্ঠস্বর পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি
সৃষ্টি হয়নি। এই কণ্ঠস্বর শোনার যোগ্যতা তার ছিলো না, তোমারও নেই,
তুমিও বধির হয়ে যাবে।
না না, আমি বধির হতে চাই না।
ভালো করে ভেবে বলো যুবক, আমার মনে হয় তোমার বধির হয়ে যাওয়াই ভালো।
না না, আমি বধির হতে চাই না।
বেশ। আমি তোমাকে চির-শ্রবণশক্তি দিলাম। এবার শোনো। এই রাজকন্যা
ঘুমিয়ে আছে। তুমি যদি তাকে জাগাতে পারো, তাকে পাবে, সেই সঙ্গে
তোমার জন্য থাকবে অসামান্য পুরস্কার। তুমি আমার কাছে যা চাইবে, আমি
খুশি হয়ে তার সহস্রগুণ তোমাকে দেবো, সেক্ষেত্রে অন্ধ দেবতার
অন্ধত্ব মুছবে না, বধিরতা ঘুচবে না। আর যদি না পারো তাহলে সে আবার
দেখবে-শুনবে আর তুমি হারাবে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার। তবে
সাবধান যুবক, এর আগেও রাজকন্যার ঘুম কেউ ভাঙাতে পারেনি। কথা ছিলো_
সহস্র ব্যক্তি যদি ব্যর্থ হয় তার ঘুম ভাঙাতে, তবে আমি অন্ধ দেবতার
দৃষ্টি আর শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেবো। তুমি হচ্ছো সহস্রতম বক্তি, এটাই
শেষ সুযোগ।
কিন্তু এ রকম কঠিন একটা কাজের জন্য আমাকেই কেন বেছে নিলে ঈশ্বর!
আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ, দেখতে শুনতে ভালো নই, জীবনযাপনে ম্লান
আর ব্যর্থ, জীবনে কেউ আমার সঙ্গী হলো না...
নিজের সম্বন্ধে এত বর্ণনা দেবার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি সব জানি। এর
আগে সব ধরনের মানুষকে দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে। অবশেষে তোমাকেই বেছে
নেয়া হয়েছে। এ হচ্ছে আমার করণ-কৌশল, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার
তোমাকে দেয়া হয়নি মানব সন্তান। আমিই সৃষ্টি করি সব, আমিই রেখে দিই
সাধারণের মধ্যে অসাধারণত্বের সম্ভাবনা। আর কিছু জানতে চাও তুমি?
তুমি তো সব পারো, ইচ্ছে করলেই পারো রাজকন্যার ঘুম ভাঙাতে, দেবতার
অন্ধত্ব ঘুচাতে, তবে কেন মানুষকে এর মধ্যে টেনে আনছো? খামোখা
মানুষগুলোকে এমন কষ্ট দিচ্ছো কেন?
তুমি বড় আজেবাজে প্রশ্ন করছো যুবক। এর আগে কেউ এসব প্রশ্ন করার
সাহস পায়নি, তারা ব্যস্ত ছিলো রাজকন্যার রূপদর্শনে আর তুমি ব্যস্ত
আমার করণ কৌশল নিয়ে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পছন্দ করি না আমি,
তবু তুমি সাধারণ জীবনযাপনকারী মানুষ বলেই বলছি। তুমি শিল্পী নও,
হলে বুঝতে, কখনো কখনো শিল্পীর শিল্পকর্ম তার স্রষ্টার ভাবনার চেয়েও
অনেক অনেক বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। শিল্পী নিজেই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে
তাকিয়ে থাকে তার সৃষ্টির দিকে। এই রাজকন্যাকে সৃষ্টির সময় আমি
ভাবিনি যে, সে এত সুন্দর হবে! কিন্তু সৃষ্টির পর আমার আর কিছুই
করার রইলো না, আমি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলাম পৃথিবীর মানুষের প্রতি।
ওরা পাবে এই রাজকন্যাকে_ এটা ভাবতেই ঈর্ষায় জ্বলে উঠলাম। শুরু হলো
আমার খেলা। কিন্তু এসব গুঢ় তত্ত্ব নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করো না।
রাজকন্যাকে আমি ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি, চেষ্টা করো তার ঘুম ভাঙাতে। আমি
আবার আসবো, হয়তো পুরস্কার নিয়ে, নইলে শাস্তি...
কিন্তু রাজকন্যা হাসলো যে! ঘুমিয়ে আছে কোথায়?
এবার আর অলৌকিক কণ্ঠস্বর শোনা গেলো না, কিন্তু যা শোনা গেলো তা
অলৌকিকের চেয়ে অধিক কিছূ। যেন স্বপ্নের ওপার থেকে বেজে উঠলো এক
অচেনা সুর_ হ্যাঁ, আমি ঘুমিয়ে আছি।
চমকে রাজকন্যার দিকে তাকালো যুবক। বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে রইলো
অনেকক্ষণ। কণ্ঠস্বর এত সুন্দর হয়? এত সুরেলা হয়? যেন হৃদয়ে ছড়িয়ে
পড়লো এক অলৌকিক সুর; হৃদয় থেকে সারা শরীরে। চোখের ঘোর জোর করে
খানিকটা কমিয়ে বললো_ কিন্তু তুমি যে কথা বলছো! ঘুমিয়ে কথা বলছো
কেমন করে?
রাজকন্যা হাসলো_ যেন রিনিঝিনি চুড়ি বাজলো কোথাও। যেন নূপুর পরে
ছুটে গেলো কোনো চঞ্চল কিশোরী।
হ্যাঁ, ঘুমিয়েই কথা বলছি। আমি হাঁটতে পারি, খেতে-বসতে পারি, হাসতে
পারি, কাঁদতে পারি, কথা বলি। অথচ আমি ঘুমিয়ে আছি। পারবে আমার ঘুম
ভাঙাতে যুবক?
কিভাবে তোমার ঘুম ভাঙাবো মেয়ে?
একটা সোনার কাঠি ছিলো, একটা রুপোর। দুটো কাঠি ওলট-পালট করে দিলে
ঘুম ভাঙবে আমার। কিন্তু একটা কাঠি হারিয়ে গেছে যেন কোথায়। কে যেন
নিয়ে গেছে চুরি করে।
কে নিয়েছে?
সেটা তো এখন বলা যাবে না। তোমার সঙ্গে তো আমার এমন কোনো সম্পর্ক
নেই যে, সব কথা খুলে বলবো!
তাহলে অন্তত বলো, কোন কাঠিটা হারিয়েছে!
তাও জানি না, সেটা তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে।
তুমি যদি একটুও সহযোগিতা না করো তাহলে আমি কী করে তোমার ঘুম
ভাঙাবো? তুমি তো কিছুই বলছো না। সবাই মিলে আমাকে এ রকম মহাসগরে
ফেলে দিলে কেনো?
এটা একটা কথা হলো? ঈশ্বর তোমাকে বেছে নিয়েছেন, আমার কী দোষ? আর এত
সহজেই আমার কাছ থেকে সহযোগিতা আশা করো কোন সাহসে? তুমি সফল হলে আমি
তোমার হয়ে যাবো! অথচ ভেবে দ্যাখো, তুমি কি আমার যোগ্য? ছোট-খাটো
মানুষ তুমি, সাদাসিদে দরিদ্র মানুষ, তোমার সাফল্য তো আমার জন্য
বিপদের কারণ। আমি কোন দুঃখে তোমাকে সহযোগিতা করবো?
তা বটে। যুবক ভাবলো। আমি কেন রাজকন্যার দিকটাও ভেবে দেখছি না? সে
তো ঈশ্বরের খেলার পুতুল। আমি সফল হলে ওকে পাবো। রাজকন্যার কোনো
পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারই নেই। আশ্চর্য! ঈশ্বর এত স্বেচ্ছাচারী কেন?
মেয়েটার কথা ভেবে তার কষ্ট হলো। থাক, রাজকন্যা ঘুমিয়েই থাক_ একবার
একথাও ভাবলো। ওকে না পেলে তার ক্ষতি নেই, সে তো তার যোগ্যই নয়!
কিন্তু স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার হারানোর ভয়ে সারারাত তার ঘুমই
হলো না।
সকালে যথারীতি অফিসে গেলো সে। নিয়মমাফিক, প্রায় বিনা কারণে বসের
ধমক খেলো। সহকরর্মীদের বিদ্রূপ-ঠাট্টা শুনলো। কিন্তু সারাক্ষণ তাকে
দখল করে রইলো রাজকন্যার ঘুম ভাঙানোর ভাবনা। অফিসে সারাক্ষণ তাকে
চিন্তাক্লিষ্ট দেখালেও ফেরার সময় তাকে বেশ নির্ভার মনে হলো। যেন
একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছে, যেন সুকঠিন সমস্যার সমাধানটি এখন
তার হাতের মুঠোয়। সমাধানটি আর কিছুই নয়, তার জন্য যেটা স্বাভাবিক,
সেটাই। সে দ্রুত বুঝে ফেলেছে- রাজকন্যার ঘুম ভাঙানো তার পক্ষে
সম্ভব নয়, অতএব খামোখা চেষ্টা করে লাভ নেই, এ নিয়ে চিন্তা করাও
অর্থহীন। বুঝতে পেরে সে নির্ভার হয়ে গেছে।
অফিস থেকে ফিরে রাজকন্যাকে দেখে সে মৃদু হাসলো_ এখনো আছো! আমি
ভেবেছিলাম, রাতে স্বপ্ন দেখেছি।
আশ্চর্য! তুমি ব্যাপারটাকে এত হালকাভাবে নিচ্ছো কেন?
হালকাভাবে নিইনি তো!
এর আগে কোনদিন কেউ আমাকে রেখে এক মুহূর্তের জন্যও বাইরে যেতে
চায়নি, আর তুমি কী না দিনভর অফিস করে এলে!
বাহ! অফিসে না গেলে চলবে কি করে? তাছাড়া আমি বুঝে ফেলেছি...
কি বুঝে ফেলেছ?
তোমাকে বলবো কেন? তোমার সঙ্গে তো আমার এমন কোনো সম্পর্ক নেই যে,
আমার সব কথা তোমাকে বলতে হবে!
রাজকন্যা মজা পেলো খুব, হাসলো অনেকক্ষণ, হাসতে হাসতেই বললো_ আমার
কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছো, তুমি বেশ লোক তো!
তাদের সম্পর্কটা বেশ সহজ হয়ে গেলো।
এর পরের ঘটনা খুব দীর্ঘ নয়। রাজকন্যার ঘুম ভাঙানোর চিন্তা যেহেতু
মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছে যুবক এবং তাদের সম্পর্কটি বেশ সহজ হয়ে
উঠেছে, পুরো বিষয়টি আর তেমন কঠিন নেই। যুবক নিয়ম-মতো অফিসে যায়,
ফিরে দীর্ঘ গোসল দেয়, তারপর রাজকন্যার সঙ্গে গল্পে মাতে। শুধু
ঘুমটা নিয়ম-মতো হচ্ছে না, এই যা! কী এত গল্প করে যুবক? তার গল্পের
ভাণ্ডার অফুরন্ত নয়, সে তাই শুধু নিজের কথাই বলে। এতদিন তার কথা
শোনার মতো কেউ ছিলো না, এখন একজনকে পেয়ে সে অর্গল খুলে দেয়। সে তার
নিঃসঙ্গতা আর এককীত্বের কথা বলে, শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিময় ঘটনাগুলো
বলে, মায়ের কথা বলে, তার কোনো বন্ধু নেই এখন- ছোটবেলায় যারা ছিলো
তাদের কথা বলে, এমনকি একবার সে প্রেমে পড়েছিলো সেই গল্পও বাদ যায়
না। বলতে বলতে কখনো হাসিতে ভেঙে পড়ে, কখনো বিষণ্ন আর দুঃখী হয়ে
ওঠে, কখনো চোখ ভিজে যায় নিজের অজান্তে। আমরা রাজকন্যার
প্রতিক্রিয়াও লক্ষ করতে পারি। সে খুবই বিস্মিত। যুবক তার সঙ্গে যে
ব্যবহারটি করছে সেটা বন্ধুর মতো। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, তার
ঘুম ভাঙানোর ব্যাপারে যুবকের কোনো ব্যস্ততা নেই কেন! যুবকের চোখে
অবশ্য মুগ্ধতার ছায়া রাজকন্যা বেশ ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছে। কখনো
কখনো সেটা প্রকাশিতও হয়ে পড়ে। যেমন একবার যুবক বলেছিলো- আচ্ছা,
তুমি চোখে কাজল পরো না?
না তো!
কেন? তোমার চোখ হচ্ছে কাজল পরার চোখ। পরো না কেন?
আমার চোখ তো এমনিতেই কাজল-কালো।
কাজল-কালো চোখ আর কাজল-পরার চোখ এক নয়, বুঝেছ রাজকন্যা? তুমি পরলে
বুঝতে পারবে।
বেশ তো, তুমি কিনে দিও।
যুবক সত্যি সত্যি কাজল কিনে এনেছে।
আরেকদিন- আচ্ছা, তুমি পায়ে নূপুর পরো না কেন?
নূপুর তোমার পছন্দ?
হ্যাঁ, খুব। আমি আমার প্রেয়সীকে সব সময় নূপুর-পরা বলে কল্পনা
করতাম।
আমি তো তোমার প্রেয়সী নই।
না হলে। তোমার পা হচ্ছে নূপুর পরার পা। পরে দেখ।
তুমি কিনে দাও।
যুবক সত্যি তাকে নূপুর কিনে দিয়েছে!
এবার আমরা যুবকের দিকে লক্ষ্য করি। যদিও রাজকন্যার ঘুম ভাঙানোর কথা
এখন সে আর ভাবে না, কিন্তু তার দৈনন্দিন জীবনযাপন বেশ খানিকটা বদলে
গেছে। সন্ধ্যার ঘুম তো গেছেই, রাতেও ঘুম হয় না। দুশ্চিন্তায়।
স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার হারিয়ে সে যে কোন জীবন পাবে কে জানে!
চির-দৃষ্টি আর চির-শ্রবণশক্তি পাওয়ার অর্থই বা কী, সে ভেবে পায় না।
আজকাল মনটা খুব খারাপ থাকে- সে তো ভালোই ছিলো তার এক চিলতে পৃথিবীর
সম্রাট হয়ে, খামোখা তাকে এমন জটিলতায় ফেলে দেয়ার কোনো অর্থ হয়!
ইদানীং প্রতিটি মুহূর্ত সে উপভোগ করতে চায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে। মনে হয়-
এই শেষ, আর কোনোদিন এভাবে এই মুহূর্ত ফিরে আসবে না। জীবনযাপনই বদলে
যাবে, তার আবার মুহূর্ত! রাজকন্যাকে সে পাবে না, এ তো জানা কথা,
পাওয়ার কথা সে ভাবে না ভুল করেও, কিন্তু পাওয়ার ইচ্ছে যে করে না তা
তো নয়। এটাও তো একটা সমস্যাই। রাজকন্যার দিকে তাকালেই বুকের ভেতরটা
হু হু করে ওঠে। যতটা না তাকে না পাওয়ার সম্ভাবনায় তার চেয়ে বেশি
নিজের নিঃসঙ্গতার জন্য। কেউ তার সঙ্গী হলো না, কেউ না। সে কোনো
রাজকন্যাকে চায়নি। সে তো নিজের অক্ষমতা আর অযোগ্যতার কথা জানেই।
কিন্তু যাকে চেয়েছিলো সে-ও তো কোনো এক খরাতপ্ত চৈত্রের দুপুরে চোখে
আর পৃথিবীতে বৃষ্টি নামিয়ে চলে গিয়েছিলো। আর ফিরলো না। এসব কথা খুব
মনে হয়। বৃষ্টি হলে সে যে কেন এমন আনমনা উদাসীন হয়ে যায় সে কথা কেউ
জানে না; অবশ্য কেউ জানতেও চায় না। কিন্তু সে তো জানে!
সেদিনও সে সারা সন্ধ্যা তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে টুকটুকে
লাল চোখ নিয়ে বাসায় ফিরেছিলো। রাজকন্যা বোধ হয় এই যুবকের
কার্যকলাপে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, অথবা কৌতূহল হয় কিন্তু প্রকাশ করে
না- রূপসীরা কৌতূহল দেখালে রূপের অহংকার তো খানিকটা ম্লান হয়ে
যায়- যে যুবক তার রূপকে নিস্পৃহভাবে অবলোকন করার দুঃসাহস দেখায়,
তার সম্পর্কে কৌতূহল তো একটু হয়ই। আজ বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় ফিরলে
রাজকন্যা একটু নিস্পৃহভাবেই জিজ্ঞেস করলো- 'হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেজার শখ
হলো কেন, তাও এই অবেলায়!' কিন্তু যুবক নিরুত্তর। আজ কি সে একটু
বেশি উদাসীন?
রাতে যুবকের জ্বর এলো কাঁপিয়ে। নিজের অজান্তে হয়তো সে যন্ত্রণাকাতর
শব্দ করেছিলো, টের পেলো মায়াবি স্পর্শে- 'খুব খারাপ লাগছে?'
তার চোখ ভিজে উঠলো হঠাৎ। কতোকাল সে এমন মায়াবি স্পর্শ পায়নি,
কতোদিন সে এমন উৎকণ্ঠিত কণ্ঠস্বর শোনেনি! ছোটবেলার কথা মনে পড়লো
তার, হঠাৎ।
খারাপ লাগছে তোমার? মাথায় হাত বুলিয়ে দিই?
আবার সেই উৎকণ্ঠিত কণ্ঠস্বর। তার কী যে হয়, খুব সাবধানে, ধীরে
নিজের হাত রাখে রাজকন্যার হাতে। রাজকন্যা সরিয়ে দেয় না বরং এক হাতে
যুবকের হাত ধরে অন্য হাত মাথায় বুলিয়ে দিতে থাকে। আরো কিছুক্ষণ পর
যুবকের মাথায় নিচ থেকে বালিশটি নিজের কোলে নিয়ে বলে_ এখানে শোও।
যুবক রাজকন্যার কোলে মাথা রেখে তার মুখটা দেখার ইচ্ছায় চোখ তুললে
চোখের সামনে এক নতুন পৃথিবী উন্মুক্ত হয়। নিজেকে সংযত করা প্রয়োজন
বুঝতে পেরেও সামলানো যায় না, রাজকন্যার হাত টেনে নিয়ে আলগোছে ঠোঁটে
ছোঁয়ায় সে। রাজকন্যার চোখ বন্ধ, মৃদু কম্পন তার সারা শরীরে। যুবক
তার চিবুকে ঠোঁট ছোঁয়ায়। রাজকন্যা কেঁপে ওঠে। যুবকের মাথাটি টেনে
নিয়ে সজোরে বুকে চেপে ধরে। যুবকের অস্তিত্ব জুড়ে এখন এক অলীক
পৃথিবী। খুব সাবধানে রাজকন্যার আঁচলটি কাঁধ থেকে সরিয়ে দেয় সে, আর
বর্ণনাতীত এক সৌন্দর্যে সে প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এরপর সে ঠিক
কী করেছিলো মনে পড়ে না, শুধু নিজ গালে তপ্ত অশ্রুর ছোঁয়া পেলে সে
নিজের ঠোঁটকে রাজকন্যার ঠোঁটে যুক্ত অবস্থায় আবিষ্কার করে আর তখন
তার মুঠোতে ছিলো মাখন-উষ্ণ দুই অলৌকিক পৃথিবী। খুব বিস্মিত হয়ে
পড়েছিলো সে_
তুমি কাঁদছো!
রাজকন্যা কোনো কথা বলেনি।
তুমি কাঁদছো কেন রাজকন্যা?
রাজকন্যা তাকে নিবিড় করে আরেকবার জড়িয়ে ধরে।
কাঁদছো কেন, বললে না?
আমাকে এখন চলে যেতে হবে।
কেন? - যুবক আকাশ থেকে পড়ে।
তুমি আমাকে জাগিয়ে তুলেছ যুবক।
জাগিয়েই যদি থাকি তাহলে তো তোমাকে আমার পাওয়ার কথা।
এখনো বলবে পাওনি? আর কী চাও তুমি?
কিন্তু আমি তো এভাবে চাইনি তোমাকে!
তুমি কোনোভাবেই আমাকে চাওনি। আমি নিজে থেকে তোমার কাছে এসেছি। এ এক
অদ্ভুত ঘটনা যুবক। এর আগে যারাই আমাকে দেখেছে তাদের একমাত্র নজর
ছিলো আমার শরীরের দিকে। তুমিও নিশ্চয়ই আমার রূপের প্রশংসা করবে,
আমার শরীরের প্রশংসা করবে। হ্যাঁ, আমি জানি, আমার শরীরের মতো এমন
তীব্র আবেদনময়ী শরীর পৃথিবীতে খুব বেশি সৃষ্টি করা হয়নি। আর সেটাই
হয়েছে যন্ত্রণা। রূপ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে আমি অপরাধ করেছি যুবক,
সবাই আমার শরীরটাই দেখেছে, মন দেখেনি। আমার শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে
পড়তে চেয়েছে সবাই, কেউ বুঝতে চায়নি আমি এক দুঃখী রাজকন্যা।
দুঃখী! কি এমন দুঃখ তোমার মেয়ে?
আমাকে এর আগে পেয়েছিলো আর মাত্র একজন। সে-ও দেখেছিলো আমার হৃদয় ও
শরীরকে একসঙ্গে মিলিয়ে। তাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি, অথবা সে চলে গেছে
অজ্ঞাত কোথাও, কিন্তু যাওয়ার সময় নিয়ে গেছে আমার সোনার কাঠি, আমি
আর জাগতে পারতাম না। আর কাউকে ভালোবাসতে পারতাম না। একমাত্র তাকেই
ভালোবেসেছিলাম আগে, এরপর তুমি।
আমি? আমাকে ভালোবেসেছ তুমি?
বোকা ছেলে। ভালো না বাসলে এভাবে কেউ কাছে আসে, এভাবে কেউ নিজেকে
সমর্পণ করে দেয়?
কিন্তু কেন, কবে থেকে আমাকে ভালোবাসলে?
আমি যখন তোমার প্রেয়সীর মতো করে নিজেকে সাজাতে শুরু করেছি, তখনই কি
বোঝনি তুমি?
কী করে বুঝবো? আমি তো ভেবেই দেখিনি।
তোমার ওই নিরাসক্তিই তো সর্বনাশ করেছে আমার। তোমাকে বুঝতে চেয়ে
প্রেমে পড়ে গেছি।
তাহলে আর যাওয়ার কথা উঠছে কেন? ভালো যদি বেসেই থাকো কাউকে, হোক না
সে সাধারণ, তার কাছে রয়ে গেলেই তো হয়!
হয় না। এটা ঈশ্বরের ইচ্ছা নয়। ঈশ্বর বহুবার জানতে চেয়েছেন- ওই
রাজকুমার ছাড়া আমি আর কাউকে ভালোবাসি কী না। উত্তর পেয়েছেন ওই
রকমই- রাজকুমার একজনই আর আমার ভালোবাসাও ইউনিক। এটা ছিলো ঈশ্বরের
চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেছিলেন, আমি নিশ্চয়ই অন্য কাউকে ভালোবাসবো। তার
চ্যালেঞ্জের কাছে হেরে গেছি আমি। কিন্তু জিতে গেছি অন্য জায়গায়।
রাজকন্যাদের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য একজন মানুষের রাজপুত্র হওয়ার
দরকার নেই, যদি তার থাকে একটি কোমল হৃদয় আর খানিকটা নিরাসক্তি।
ঈশ্বর জানলেন না, মানুষ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেক কিছু জেনে যায়।
আর কথা নয় যুবক, এবার আমাকে যেতে হবে...
হঠাৎ ঘর অন্ধকার হয়ে গেলো। যুবক হাতড়ে খুঁজে পেলো না রাজকন্যাকে।
কতোক্ষণ ডাকাডাকি করেও সাড়া পাওয়া গেলো না, কিন্তু শোনা গেলো সেই
অলৌকিক কণ্ঠস্বর_
আমি এসেছি যুবক।
তোমাকে কে আসতে বলছে, ঈশ্বর?
আমার তো আসার কথা ছিলো।
তুমি যাও এখান থেকে।
যাবো তো বটেই। কিন্তু তুমি তোমার পুরস্কার নেবে না? আমি খুবই অবাক
হয়েছি মানব সন্তান। যে কাজ কাউ পারেনি, তোমার মতো একজন সাধারণ লোক
কীভাবে যে সেটা পারলো! আশ্চর্য! খুবই আশ্চর্যের বিষয়! বলো তুমি কী
চাও?
যা চাইবো দেবে?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দেবো। কিন্তু যে কোনো একটি জিনিস চাইতে হবে।
রাজকন্যাকে চাই।
তাকে তুমি পেয়েছো যুবক। এভাবে আর কেউ পায়নি তাকে। দ্বিতীয়বার তাকে
পাওয়া যায় না। তোমাদেরই একজন একটি কবিতা লিখেছিলো না_ এ পৃথিবী
একবার পায় তারে, পায় না কো আর! ওই রকম আর কি! রাজকন্যাকে আর ফিরে
পাওয়া যাবে না, যা পেয়েছ তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকো। তোমাকে এভাবে
বলতে একটু খারাপই লাগছে, কারণ আমি খুবই অবাক হয়েছি। কীভাবে পারলে
তুমি? তোমরা যে বলো, নারীদের মন দেবতারাও বোঝে না, এখন মনে হচ্ছে
রূপসীদের মন ঈশ্বরও বোঝেন না।...
তুমি তোমার বকবকানি থামাও। এসব বাকোয়াজি শুনতে ইচ্ছে করছে না।
যুবক আর কিছু শোনেওনি। আমাদের রূপকথা এখানেই শেষ। এবার বাস্তব
পৃথিবীতে ফিরে আসা যাক।
একজন সামান্য মানুষের জীবনে হঠাৎ করে এক অসামান্য রূপসীর আগমন এবং
চলে যাওয়া এক ধরনের বিপর্যয় ঘটিয়ে দিয়েছে। লোকটিকে আপনারা হয়তো
অনেকেই দেখেছেন বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন জায়গায়। অবশ্য তাকে এখন আর
খুব একটা চেনা যায় না। চুলগুলো বেড়ে বেড়ে জট পাকিয়ে গেছে_ এখন আর
কাটার কথা মনেই থাকে না তার, দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল জমেছে গালে, সাফ
করার নাম নেই। তার চোখ জুড়ে এখন শুধুই রাজকন্যার মুখ, কানে বাজে
সেই অলীক কণ্ঠস্বর। আর কোনোকিছু দেখতে বা শুনতে তার অসহ্য লাগে।
আজকাল মনে হয়_ বোধ হয় অন্ধ আর বধির হয়ে যাওয়াই তার জন্য ভালো ছিলো।
আপনাদের সঙ্গে লোকটির দেখা হয়েছে হয়তো, অথবা হবে। ভালোই হতো যদি
দেবদাসের মতো বলা যেত_ 'এই রকম হতভাগার দেখা পাইলে তাহার জন্য
প্রার্থনা করিও।' বলা সম্ভব হচ্ছে না। কেন সম্ভব হচ্ছে না সেটা এই
লেখক বলতে বাধ্য নন।
বর্তমান লেখক লোকটি সম্বন্ধে এতকিছু জানলেন কীভাবে- আশা করছি,
পাঠকরা এরকম বেয়াড়া ও অবান্তর প্রশ্ন উত্থাপন করবেন না। করলেও
সঙ্গত কারণেই লেখক তা এড়িয়ে যাবেন। লেখকও ঈশ্বরের মতোই
স্বেচ্ছাচারী; এই গল্পের পাত্রপাত্রীরা বাস্তবের চরিত্র হলেও
নির্মাণটি এই লেখকের, অতএব 'এটা হচ্ছে করণ কৌশল' বলে নিশ্চয়ই তিনি
প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে পারেন। কোনো কোনো বেয়াড়া পাঠক আবার প্রশ্ন
করতে পারেন- লোকটি কি লেখক নিজেই? সেক্ষেত্রে লেখক রেগে যাওয়ার
চেষ্টা করবেন এবং বিসদৃশ্যভাবে চুপ হয়ে গিয়ে গল্পটি শেষ করে দেবেন।
জানুয়ারি ১৯৯৯। |
|
|
| |
 |
|