Page loading ... Please wait.

ঘনায়মান সন্ধ্যা অথবা বেজে ওঠার গল্প
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
অনেকদিন পর হঠাৎ তার ফোন পেলাম। অপ্রত্যাশিত। ওর ফোন আসবে, কিংবা ও নিজেই, সেজন্য একসময় প্রতীক্ষা করে থাকতাম। এখন আর থাকি না। বুঝে গেছি _ এই অপেক্ষা অর্থহীন। অনেকদিন পর তাই অপ্রত্যাশিত ফোনটি পেয়ে ভালো লাগলো আমার, মনটা ভরে উঠলো। একবার হ্যালো বলে _ ওপাশে সে, বুঝতে পেরে ইচ্ছেকৃতভাবেই কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওর কণ্ঠের ব্যাকুলতা শুনলাম কান পেতে। ও হয়তো ভেবেছে _ লাইনটা কেটেই গেছে, তাই হ্যালো হ্যালা বলেই চলেছে! একটুক্ষণ পর সাড়া দিলাম আমি, ওর স্বস্তির নিঃশ্বাস শুনলাম তখন। প্রথম হ্যালোতেই চিনতে পেরেছি তবু জিজ্ঞেস করলাম,

কে?
আমি।
আমিটা কে?
আমি। আপনার গানের পাখি।
'আপনার' শব্দটা বুকে গিয়ে লাগলো। ওকে আমি গানের পাখি বলে ডাকতাম, চমৎকার গান গায় বলে, কিন্তু কখনো 'আমার গানের পাখি' বলিনি। ও নিজেই কথাটি বলে ফেললো। ভুল। ভুলে, অসাবধানে বলে ফেলেছে _ যদিও এতোটা অসাবধান মেয়ে সে নয়। এতোটা তো নয়ই, বলা যায়, একটুও নয়। বরং একটু বেশি মাত্রায় সাবধানী ও সচেতন। এতো সাবধানী একজনের এই মধুর ভুলটুকু তাই ভালো লাগলো আমার। আমি অল্পে সুখী হই, অল্পেই ভালো লাগে আমার।

ও। কেমন আছো? জিজ্ঞেস করলাম আমি। কিন্তু কুশল বিনিময়ের ধারে কাছে গেলো না ও। জিজ্ঞেস করলো _ যেন এই কথাটি জিজ্ঞেস করার জন্যই ফোন করেছে, এমনভাবে _
অনেকদিন এদিকে আসেননি আপনি, কেন?
'কেন যাবো?' _ প্রায় বলেই ফেলেছিলাম। কিন্তু সামলে নিলাম। কথাটার মধ্যে অভিমান মেশানো আছে _ সেটা আমি প্রকাশ করতে চাই না। যার কাছে আমার অভিমানের কোনো মূল্য নেই, তার কাছে সেটা প্রকাশ করাটা নিছক বোকামি।
কি হলো? _ আমাকে চুপ করে থাকতে দেখেই হয়তো আবার জিজ্ঞেস করলো ও।
কি!
কিছু বলছেন না যে!
কি বলবো?
এদিকে আসেন না কেন, সেটাই বলেন।
এমনি। এমনিতেই আসা হয় না।

না, এমনিতেই নয়। সুনির্দিষ্ট কারণ আছে ওর কাছে না যাবার। ব্যাপারটা এই রকম : আমরা দুজন একই অফিসের দুটো ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে কাজ করি। একটি বিখ্যাত এবং বড়সড় প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান এটি। এই ১৪ তলা ভবনের ৮ তলা জুড়ে আমাদের অফিস, তারই ৭ তলায় আমি বসি, আর সে ৪ তলায়। প্রচুর সহকর্মী আমাদের। সবার সঙ্গে ভালো করে পরিচয়ও নেই। ওর সঙ্গেও কুশল বিনিময়ের সম্পর্কটুকুই ছিলো শুধু। কিন্তু ও আমার চোখে পড়েছিলো অনেক আগেই। একটা অনুষ্ঠানে ওর অদ্ভুত মাদকতাময় কণ্ঠে গান শুনে একবার খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। যারা গাইতে পারে, তাদেরকে সবসময় সুদূর নক্ষত্রের মতো মনে হয় আমার। ছোটবেলায় আমার শিল্পী হবার খুব সাধ ছিলো, হতে পারিনি বলেই হয়তো শিল্পীদেরকে এমন দূরের মনে হয়। তো, আমি যে মুগ্ধ হয়েছি সেটা কখনো প্রকাশ করিনি। এখানে আমি ওর সিনিয়র, বয়সেও, পদমর্যাদায়ও। সিনিয়রদের অনেক ব্যাপার মেইনটেইন করে চলতে হয়, ইচ্ছে করলেই তারা মুগ্ধতা প্রকাশ করতে পারে না। অবশ্য শুধু যে গানের কারণেই ওকে চোখে পড়েছিলো, তা নয় _ ও দেখতেও খুব রূপসী, সেটাও একটা কারণ। যেটাকে আমি 'সফট বিউটি' বলি, ও হচ্ছে তাই। মেয়েদের সৌন্দর্য দু ধরনের _ অন্তত আমার তাই মনে হয়। একটা 'অ্যাগ্রেসিভ বিউটি' _ খুব সহজেই যাদেরকে চোখে পড়ে, দেখলেই পাওয়ার সাধ জাগে _ যতোটা না জীবনসঙ্গী হিসেবে, তারচেয়ে বেশি শয্যাসঙ্গী হিসেবে _ পেয়ে গেলে ফুরিয়ে যায়। আরেকটা হলো 'সফট বিউটি'। এদেরকে ভালো লাগে ধীরে ধীরে, ভালো লাগাটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, পাওয়ার আগে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, পেয়ে গেলেও ফুরিয়ে য়ায় না _ মমতা দিয়ে, প্রেম দিয়ে বুকে করে রাখতে ইচ্ছে করে। আমার দ্বিতীয়টিই পছন্দ। ওকে তাই ভালো লেগেছিলো আমার, কিন্তু সে কথা তো আর ডেকে নিয়ে বলা যায় না, আমাদের সম্পর্কটা তাই কুশল বিনিময় পর্যন্তই ছিলো। কিন্তু একদিন, কোনো এক অবসর মুহূর্তে, কী কারণে জানি না _ ও এসেছিলো আমার কাছে। আমার কাছে ওর কোনো কাজ নেই, কাজ থাকে না। তবু কেন এসেছিলো, ওরও কি কোনো গোপন ভালো লাগা ছিলো আমার প্রতি? সেদিন আমি কথার ঝাঁপি খুলে বসেছিলাম। এমনিতে আমি কম কথা বলি, স্বলপভাষী হিসেবে আমার সুনাম আছে, কিন্তু ওর সঙ্গে কেন যে এতো কথা বলেছিলাম _ তা নিজেও জানি না। ওইদিন _ যাকে বলে 'টিউনিং' _ আমাদের মধ্যে তা হয়ে গেলো। আবিষ্কার করলাম _ ওর সঙ্গে কোনো হিসেব-নিকেশ ছাড়াই কথা বলতে ভালো লাগছে আমার। যেন ওকে সব কথা বলা যায়, যেন ও অনেকদিনের আপন। ওরও নিশ্চয়ই এর কাছাকাছি কিছু একটা মনে হয়েছিলো _ নইলে আমার জন্য এতোটা সময় ও দিতো না। এরপর থেকে আমি ওর ডিপার্টমেন্টে যেতাম, ও-ও আসতো _ সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ ছাড়াই। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেলো _ সে আর আসছে না আমার কাছে; তারও কিছুদিন পর দেখা গেলো _ আমি ওখানে গেলে সে আমার সামনে পড়তে চাইছে না, পড়লেও সহজভাবে কথা বলছে না। আমার সন্দেহ হলো, মনে হলো _ ও আমাকে এড়াতে চাইছে। একদিন জিজ্ঞেসও করলাম। ও বললো _ এটা শোনার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না _ 'এই অফিসে আপনার অনেক সুনাম। শুধু তাই নয়, ছোট-বড় সবাই আপনাকে খুব রেসপেক্ট করে। সবার সম্বন্ধেই কিছু না কিছু কমপ্লেইন শোনা যায়, কেবল আপনার সম্বন্ধেই সেটা নেই। সবাই একবাক্যে আপনার প্রশংসা করে। আমি চাই না আমার কারণে আপনার সেই সুনাম ক্ষুণ্ন হোক।'

আমি যা বোঝার বুঝে নিলাম। আমাদের এই যাওয়া আসা, কথা বলা, কিংবা সহজ সম্পর্কটাকে কেউ কেউ সহজভাবে নিচ্ছে না। কিন্তু আমাকে সেটা কেউ বলছে না, বলবেও না। এ অফিসে যে আমার খুব সুনাম, সেটা আমিও জানি। আমার সম্বন্ধে কেউ কিছু বলার আগে দশবার ভেবে নেবে। তাই, কথা যা শোনার ওকেই শুনতে হচ্ছে। কিংবা প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও ইশারা-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিংবা এর কোনোটাই হয়তো ঘটেনি এখনো _ ও নিজে থেকেই ভেবে নিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন কোনো কিছু একটা ঘটতে পারে। শেষের সম্ভাবনাটাকেই সত্যি বলে মনে হলো আমার। ও খুব রূপসী তো, রূপসীরা এসব বিষয়ে খুব সচেতন হয়। প্রায় কৈশোর থেকেই তাদেরকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যে! তারা কারো সঙ্গে কথা বললেই সবাই ধরে নেয় _ এখানে কিছু একটা ব্যাপার আছে। সাবধান তাদেরকে তাই হতেই হয়। সাবধান হতে হতে তারা আর সহজভাবে কিছু ভাবতেই পারে না, জটিল সব চিন্তাভাবনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। নইলে আমাদের সম্পর্কটা তো সহজই ছিলো, সে এমন জটিল করে ফেললো কেন? যাহোক, ওই দিনের পর থেকে আমি আর কখনো তার কাছে যাইনি, সে-ও আসেনি। আগে যাওয়া-আসা ছাড়াও ফোনে মাঝে মাঝে কথা হতো, অনেকদিন ধরে সেটাও বন্ধ। দেখা হলেও এখন কথা বলতে খুব কুণ্ঠা বোধ করি। নানা রকম জটিল চিন্তা আমার মধ্যেও ঢুকে গেছে। জানি, রূপসী মেয়েরা নানরকম জটিলতায় ভোগে। জীবনে এতো অসংখ্যবার তাদেরকে প্রেমের প্রস্তাব ফেরাতে হয় যে, একসময় তারা আতংকে ভুগতে থাকে _ এই বুঝি তাদেরকে কেউ প্রেম নিবেদন করে বসলো! আমার সম্বন্ধেও ওর এমনটি মনে হয়েছিলো কী না, ভেবে আমি কুণ্ঠায় ম্লান হয়ে যাই। আমার কোনো আচরনে কি এমন কিছু ছিলো? আমি আসলে ওর কাছে কি চেয়েছিলাম? প্রেম? আমার মুগ্ধতা ছিলো, তার প্রকাশও ছিলো, ওর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগতো আমার, ওর সঙ্গ খুব উপভোগ করতাম, আমার সময়গুলো ভালো কাটতো _ আর আমি ওটুকুই চেয়েছিলাম। এর বেশি কিছু নয়। ওভাবে চলতে থাকলে আমাদের মধ্যে প্রেম হলেও হতে পারতো হয়তো, কিন্তু যে সময় ও কথাগুলো বলেছিলো তখন পর্যন্ত এমন কোনো কিছু ছিলো না। তবু সে হঠাৎ করে এমন সম্পর্কছেদ ঘটালো কেন, বোঝা মুশকিল। আমি তাই ইচ্ছে করেই ওকে এড়িয়ে চলি, দেখা হলে মৃদু হাসি বিনিময় ছাড়া আর কিছু হয় না। দীর্ঘদিন এমন চলার পর হঠাৎ করে সে ফোন করলো কেন, কে জানে! তা-ও এই অবেলায়। অফিসের সময় পার হয়েছে ঘন্টা দুয়েক আগেই। আমার পিওন, দারোয়ান আর আমি ছাড়া অফিসে সম্ভবত আর কেউ নেই। আমি সবসময়ই দেরি করে বাসায় ফিরি। খুব যে কাজ থাকে তা নয়। তবু অফিস-আওয়ার শেষ হবার পর আমার বেরোতে ইচ্ছে করে না। অবসন্ন শরীর এলিয়ে চুপচাপ বসে থাকি কখনো, কখনো বই-টই পড়ি, কখনো কম্পিটারে গেম নিয়ে পড়ে থাকি। অবশ্য সবচেয়ে বেশি করি অন্য একটি কাজ। আমার রুমের জানালার পর্দা সরিয়ে দিলে এক চিলতে আকাশ দেখা যায়; আমি চুপচাপ আকাশ দেখি, বিকেলের জন্ম ও মৃতু্য দেখি, সন্ধ্যার নেমে আসা দেখি। এসবকিছুর মধ্যে আজ তার ফোন। ওপাশে প্রশ্নের ভঙ্গিতে অপেক্ষমান সে, এপাশে আমি প্রশ্নটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টায় রত। ও একটা প্রশ্ন করেছে, আমি এড়িয়ে যাবার জন্য একটা উত্তর দিয়েছি, কিন্তু সে সেটা মানতে রাজি হলো না। বললো _

এড়িয়ে যাবেন না, কেন আর আসেন না, বলতে হবে। সে জানে, কেন যাই না। তবু এ প্রশ্ন করার অর্থ কি? এ কোন ধরনের হেঁয়ালি? আমি চুপ করেই রইলাম। আর সে আবার জিজ্ঞেস করলো,
কি হলো, বলবেন না?
আমার বুক হঠাৎ অভিমানে ভরে উঠলো। নিজেকে সামলাতে পারলাম না, বললাম,
এই তো ভালো আছি। চুপচাপ আছি, একাকি আছি। এক কোণে নির্জনে ফুটে আছি নিঃশব্দে ঝরে পড়ার জন্য।
এ কথাটার মানে কি?
কোন কথাটার?
এএই যে বললেন _ নির্জনে ফুটে আছি নিঃশব্দে ঝরে পড়ার জন্য!

এই পৃথিবীটাকে একটা বাগান বলে ভাবো, আর মানুষগুলোকে ভাবো সেই বাগানের ফুল হিসেবে। কতো ধরনের ফুল ফুটে আছে এই পৃথিবী নামের বাগানটিতে! কেউ কেউ সূর্যমুখীর মতো। সবসময় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, আলো ও উজ্জ্বলতার দিকে তাকিয়ে থাকে। এ হচ্ছে সেই ধরনের মানুষ যারা সবসময় অর্থ-খ্যাতি-ক্ষমতার দিকে মুখ করে থাকে। খুব বড়সড় ফুল সূর্যমুখী, অনেক দূর থেকে চোখে পড়ে, কিন্তু সৌরভহীন। কেউ তাদেরকে চায় না। আজ পর্যন্ত আমি কাউকে বলতে শুনিনি, সূর্যমুখী তার প্রিয় ফুল। ভেবে দেখো এতোটা চোখে পড়ার মতো হয়েও কী দুর্ভাগ্য তার _ কেউ তাকে চায় না! আবার কিছু মানুষ গোলাপের মতো। সুন্দর, আকর্ষনীয়, সৌরভময়। এমন কেউ নেই যে গোলাপের রূপে মুগ্ধ হয় না। কিন্তু তাকে ছিঁড়ে আনলে দ্রুত শুকিয়ে যায়, সৌরভ হারিয়ে যায়। কেউ কেউ রজনীগন্ধার মতো। শুভ্র, সুন্দর, সৌরভময়। গোলাপের চেয়ে তাদের সৌরভ অনেক দীর্ঘস্থায়ী। গোলাপের কুঁড়িকে ছিঁড়ে আনলে সে আর ফোটে না, কিন্তু রজনীগন্ধা মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পরও ফোটে। নিজেকে সর্বোচ্চ বিকশিত করার আগে তার মৃতু্য হয় না। তুমি হচ্ছো রজনীগন্ধার মতো। আছে বেলীফুলও। ফোটার আগেই সৌরভে যে সবাইকে সচকিত করে তোলে। আছে রক্তজবা কিংবা কদম ফুলও _ সুন্দর, আকর্ষনীয় কিন্তু সৌরভহীন। এইভাবে নানা ধরনের ফুলের সঙ্গে নানা ধরনের মানুষের তুলনা করে নিতে পারো তুমি। কিন্তু এতোসব বিখ্যাত ফুলের কথা ভাবতে ভাবতে নিশ্চয়ই কোনো ঘাসফুলের কথা তোমার মনে পড়বে না! অথচ বাগানে ঘাসফুলও তো থাকে! নির্জনে একাকী ফুটে থাকে _ কেউ তাকে দেখে না, কেউ তার খবর নেয় না, প্রিয় ফুল বলে কেউ তার নাম নেয় না _ বরং অবহেলায় মাড়িয়ে যায়, কিংবা একদিন নিঃশব্দে ঝরে যায়। সে ঝরে গেলে তার জন্য কারো মন খারাপ হয় না, কেউ তার জন্য কাঁদে না। আমি হচ্ছি সেই ঘাসফুলের মতো _ নিঃশব্দে ঝরে যাবার জন্য ফুটে আছি।

অনেক কথা বলে ফেললাম। ওর সঙ্গে কথা বলতে গেলেই আমার কথার ঝাঁপি খুলে যায়। কিন্তু ওপাশে কোনো সাড়াশব্দ নেই কেন? ফোন রেখে দিলো নাকি? না, লাইন কেটে যাবার শব্দ তো শোনা যাচ্ছেনা! আমি ওর নাম ধরে মমতা ভরে ডাকলাম, ও সাড়া দিলো _ হঁ্যা। _ ওর কণ্ঠ কি ভেজা শোনালো?
চুপ করে আছো কেন?
আপনি আমার মন খারাপ করিয়ে দিচ্ছেন কেন? এমনিতেই আমার মন ভালো নেই।
মন ভালো নেই! কেন?
জানি না, কেন!
জানো না! এ কেমন কথা!
ককেন, আপনার এমন হয় না কখনো? কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ হয়ে থাকে না কখনো?

হঁ্যা, হয় তো! একেকদিন সকালে উঠেই মনে হয় _ আজ আমি কোথাও যাবোনা, কোনো দায়িত্ব পালন করবো না, শহুরে নাগরিকদের সঙ্গে কোনো কার্টেসি মেইনটেইন করবো না। মনে হয় _ যে জীবন আমি যাপন করছি, তা আমি নিজে বেছে নিইনি, এ জীবন নিয়তি-নির্ধারিত, আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব মনে হলে মন খারাপ হয়ে যায় আমার, অজানা কারো ওপরে প্রচণ্ড অভিমানে বুক ভরে ওঠে। প্রতিদিন সকালে উঠে আমি সেভ করি, তখন মনে হয় ্ল_ আজ আমি সেভ করবো না; প্রতিদিন আমি শুভ্র-সুন্দর পোশাক পড়ি _ ওইদিন মনে হয় আজ আমি মলিন থাকবো, খুঁজে পেতে তাই পুরনো ময়লা প্যান্ট শার্ট পড়ি। এমনিতে প্রতিদিন আমি আসা-যাওয়ার পথে মেঘের সঙ্গে কথা বলি, পাখি ও গাছের সঙ্গে কথা বলি _ ওইদিন মনে হয়, আজ আমি আকাশের দিকে তাকাবো না, পাখিদের ডাক কানে এলে দুই কানে আঙুল দেবো, আমি আজ কোনো ফুল দেখবো না, পাতাদের ফিসফিসানি শুনে থমকে দাঁড়াবো না, কোনো শিশুর দিকে তাকিয়ে আশায়-আনন্দে বুক ভরিয়ে তুলবো না, রূপকথার রাজকন্যাদের মতো কোনো রূপসী তরূণী দেখে বিস্ময়ে বলে উঠবো না _ বাহ, কী সুন্দর! হঁ্যা, একেকটি দিন আসে এমন...

আমি অবিরাম কথা বলে যাচ্ছি, কিন্তু ওপাশে আবার নিঃশব্দতা, চুপচাপ। চুপ থাকারই কথা। ওপাশে কেউ নেই তো! ওপাশে কেউ থাকে না কখনো, ও এখানে আসে না আর, ফোন করে না, দেখা হলে জিজ্ঞেস করে না _ কেন আর যাই না আমি। যেন আমার না যাওয়া, না ফোন করা, না কথা বলায় ও বেঁচে গেছে। এ আমার নিজের সঙ্গে নিজেরই খেলা, নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা! আমি একাই ফোন তুলে কথা বলে যাই, ওপাশে কেউ ধরে না কখনো, কেউ সাড়া দেয় না।

আমি আস্তে করে ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। মনটা আবার খারাপ হয়ে গেছে। বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। এই শহরেও যে সন্ধ্যা নামে সেটা বোঝার জন্য সাত তলার জানালা দিয়ে তাকাতে হয়! শেষ বিকেলেই জ্বেলে দেয়া স্ট্রিট লাইটগুলো এ শহর থেকে সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারকে কেড়ে নিয়েছে। অথচ শেষ বিকেলের অদ্ভুত কমলা রঙের আলো দেখতে ভালো লাগে আমার, বিকেলের মৃতু্য দেখতে ভালো লাগে, সন্ধ্যার আগমন আর ঘনায়মান অন্ধকার দেখতে ভালো লাগে। আমি তাই সাততলার জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে থাকি _ যদিও অপরাহ্নের এই সময়গুলোতে আমার মন খারাপ হয়ে যায়, আরো বেশি বিষণ্ন হয়ে যাই, কেবলই মৃতু্যর কথা মনে হয়! কেন যে এতো মৃতু্যর কথা মনে হয় আজকাল, বুঝি না। বয়স হচ্ছে বোধহয়। বয়স হয়ে যাচ্ছে!

বাইরে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠছে, আর আমি বসে বসে মৃতু্যর কথা ভাবছি। কিন্তু মৃতু্যর কথা ভাবতে ভালো লাগছে না। বরং তার কথা ভাবা যাক। কি করছে সে এখন? অফিস থেকে কতোক্ষণ আগে ফিরেছে? এখন কি ও সারাদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে শুভ্র হয়ে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ থেকে মুছে নিচ্ছে কাজল? একবার ওকে আমি বলেছিলাম _ তোমার চোখ হচ্ছে কাজল পড়ার চোখ, কাজল পড় না কেন? এসব কথা কি প্রেমিকের মতো শোনাতো ওর কাছে? তারপরদিনই ও কাজল পরে এসেছিলো। এবং তারপরদিন। তারও পরদিন। এখনও কি পড়ে? অনেকদিন দেখা হয়নি। অথচ ওকে প্রতিমুহূর্তে দেখতে ইচ্ছে করে। কেন যে আমার সমস্ত পৃথিবী জুড়ে তার অস্তিত্ব এমন তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়লো, কেন যে আমার ভাবনার জগত জুড়ে একটি মাত্র নামই এমন স্থায়ী হয়ে উঠলো! অথচ আমার জীবনে তার সশরীর উপস্থিতির কণামাত্র নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার জন্যই আমার বন্ধু আলফ্রেড খোকন তার সেই কবিতাটি লিখেছিলো _

সে কোথাও নেই, সে কোথাও থাকে না এমন বিভ্রম
পরাজিত হতে তার কাছে যাই, সে যেন প্রিয় প্রিয়তম
শুশ্রুষা, ক্ষমা, প্রেম, সাধনা, নিবিড় যে আততায়ী ছায়া
আমারই পাশে পাশে বিলি করে সহজ জীবনের মায়া...


আমি সেই সহজ জীবনের মায়ায় বুঁদ হয়ে থাকি _ যদিও সে সবকিছুকেই বড়ো জটিল করে তুলেছে! জানি এই বুঁদ হয়ে থাকা, এই অপেক্ষা _ সবই নিস্ফল, অর্থহীন। জানি, বেহালা সবার হাতে বাজে না _ কারো কারো হাতে বাজে। মানুষও তেমনই। সবার কাছে বাজে না, কারো কারো কাছে বাজে। আমি ওকে বাজাতে পারিনি। আমার অক্ষম আঙুল ওর তন্ত্রীতে কোনোরকম সুর বা ঝংকার তুলতে পারেনি। সে হয়তো আমাকে বাজাতে পারতো, বাজাযনি, বাজাতে চায়নি। অথচ আজকাল খুব মনে হয় _ আমি ওর কাছে বেজে ওঠার জন্য তীব্রভাবে অপেক্ষা করে আছি।