Page loading ... Please wait.

ঘর
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
উচিত নয়, তবু ঘর জুড়ে প্রগাঢ় অন্ধকার ঝিম ধরে জমে আছে। রোজীর চোখে এতটুকু ঘুম নেই, এমনকি চোখ বুঁজে পড়ে থাকতেও অসহ্য লাগছে; কিন্তু খোলা রাখলেও অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না বলে ভয় লাগে। এত অন্ধকার! অথচ পর্দাটা তুলে দিলে স্ট্রিট লাইটের আলোয় খানিকটা ছায়াছন্নতা তৈরি হয়; এমনকি লোডশেডিং আর চাঁদনী রাতের কম্বিনেশন হলে এই অট্টালিকাময় শহরের চাঁদও কিছুটা জোছনা ঢেলে দেয় এ ঘরে। কিন্তু জানালার গাঢ় রঙের পুরু পর্দা, ভেন্টিলেটরের ছিদ্রগুলো পর্যন্ত কাগজ দিয়ে বন্ধ করা- কারণ 'তিনি' অন্ধকার ভালোবাসেন, এতটুকু আলোর উপস্থিতিও তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ছোটবেলা থেকে রোজীর অন্ধকারে ভয়, আলোর প্রতি প্রেম- আর সে, রোজীর স্বামী ইফতেখার, ঠিক এর উল্টো। অথচ এই ভয়ংকর বৈপরীত্য নিয়ে উভয়ের সংসার দিব্যি সাত বছর ধরে চলছে। এই মুহূর্তে রোজী চুপচাপ, নিঃশব্দ, প্রায় শ্বাস-প্রশ্বাসহীন। রোজীর একবার উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়াতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু দুটো কারণে ইচ্ছেটা পুরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। উঠতে গেলে শব্দ হবে। তাতে লোকটার ঘুম ভেঙে যেতে পারে, ভেঙে গেলে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করতে এতটুকু দ্বিধা করবে না। এই নির্জন-কোলাহলহীন-মায়াবী রাতে ওই বিরক্তি সহ্য করা মুশকিল। এত হালকা ঘুম লোকটার! সামান্য আলোর মতো, সামান্য শব্দেও তার ঘুম ভেঙে যায়! তাছাড়া তীব্র শীত পড়েছে। উঠলে গায়ে চাঁদর জড়াতে হবে- আলনায় রেখে দেয়া চাদর নিশ্চয়ই ঠাণ্ডা বরফ হয়ে আছে! কথাটা মনে হতে লেপের নিচ থেকে ওঠাটা আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। এই শীতার্ত রাতে পাশাপাশি শুয়ে আছে স্বামী নামক লোকটি- একই লেপের নিচে- সোজা চিৎ হয়ে, একবার পাশ ঘিরে তাকে জড়িয়েও ধরছে না! রোজী নিজে যে ধরবে তারও উপায় নেই- ওই যে তার ঘুম ভাঙার ভয়, ভেঙে গেলে বিরক্তিতে কুৎসিত হয়ে ওঠার ভয়! এই সাত বছরে কতোটাই না বদলে গেছে সব! সপ্তাহান্তে একবার- কখনো কখনো আরো দীর্ঘ বিরতিতে- ম্রিয়মাণ শারীরিক মিলন ছাড়া বাড়তি একটা চুমুও বিনিময় হয় না কতোদিন! সবকিছু কী বদলে যায়, পুরনো হয়ে যায়! রোজী জানে, তার রূপ এখনো ম্লান হয়ে যায়নি- অন্তত বহু পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টি থেকে সে এখনো বঞ্চিত হচ্ছে না। এই রূপের জন্যই, জানে সে, প্রায় কৈশোর থেকে সে পেয়ে এসেছে মুগ্ধদৃষ্টি, প্রেমপত্র, মিনতি, স্তুতি, সমর্পণ। এমনকি ইফতেখারও একসময় তার জন্য সর্বস্ব পণ করতে প্রস্তুত ছিলো। সে তো আরো বহু প্রেমারর্থির মিনতি উপেক্ষা করেই এই লোকটিকে বেছে নিয়েছিলো। অথচ এখন, দ্যাখো, সে কেমন মৃতের মতো শুধু পড়ে পড়ে ঘুমায়!

ঘুমোলে নাকি?- অনেকক্ষণ চুপচাপ পড়ে থেকে প্রায় নিজের অজান্তেই বলে ফেলে রোজী টের পায়- ভুল হয়ে গেছে।
উঁ।
ঘুমিয়েছ? - এখন আর ফেরার উপায় নেই। কথা বলতেই হবে।
উঁহু।
তার মানে, তুমি জেগেই ছিলে! আমারই মতো! কি ভাবছিলে একা একা? জেগেই যদি আছো- একটু কথাও তো বলতে পারো! এমন মরার মতো শব্দহীন পড়ে থাকো কেন? কোনো গল্পই কি আর অবশিষ্ট নেই আমাদের দু-জনের? ওই তো পাশের ঘরে আমাদের একমাত্র সন্তান শুভ্র, তার দাদুর সঙ্গে ঘুমোচ্ছে- আর কিছু না হোক, আমরা তো ওকে নিয়েও কথা বলতে পারি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারি। নিজেদের স্বপ্ন প্রত্যাশার যদি মৃত্যু ঘটেই থাকে, ওকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন নির্মাণ করতে পারি! কিন্তু এসব রোজী মনে মনে বলে, মুখে অন্য কথা- কী শীত পড়েছে, না!
হু্ঁ।
সমীতের না জানি কতো কষ্ট হচ্ছে!
সমীত- মানে তার দেবর, সবচেয়ে ছোটটি, এ বাসায় তার জায়গা হয়েছে ব্যালকনিতে। রেলিংগুলো নেট দিয়ে ঘিরে পর্দা টানিয়ে দেয়া হলেও ফাঁকফোকর দিয়ে শীতের আসা-যাওয়া তাতে বন্ধ হচ্ছে না। কিন্তু হঠাৎ করে সমীতের কথা এলো কেন? আর এলোই যদি, রাতদুপুরে স্বামীকে ঘুম থেকে ডেকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে সমীতের কথা বলা হলোই যদি- এখন চুপ করে থাকার কোনো উপায় তো নেই; কিন্তু এ প্রসঙ্গে আর কী-ই বা বলা যায়? অথচ আরো দু-চারটে কথা না বললে ব্যাপারটা খারাপ দেখায়, শুধু তাই নয়- এটাও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে, এতক্ষণ শুয়ে শুয়ে সে সমীতের কথাই ভেবেছে। (ভাবলে দোষ কিছু নেই, কিন্তু ইদানীং তার ভয় হচ্ছে_ সমীতের সঙ্গে তার সম্পর্কটিকে কেউ সন্দেহের চোখে দেখছে কী না, ভেবে।) কিন্তু সত্যিই তো সে আর তা ভাবছে না। নাকি ভাবছিলো? গোপনে, প্রায় নিজের অজান্তেই! অনেকক্ষণ ধরে কি সে সমীতের বেহালার সুর শুনছে না? এই নিথর রাতে একমাত্র ওই করুণ-বিলম্বিত সুরই কি তাকে অনেকক্ষণ ধরে দখল করে রাখেনি? একটু আগেও কি কান্নার মতো ওই সুর তার চোখ ভিজিয়ে তোলেনি? আর একবার কান্না পেলে যা হয়- কান্না পাবার মতো যাবতীয় ঘটনা একসঙ্গে মনে পড়ে যায়, অনেক পুরনো কষ্ট ও হাহাকার একসঙ্গে ফিরে আসে- তারও কি তা হয়নি? রোজী এবার আয়োজন করে সমীতের কথাই ভাবতে থাকে। আর সবকিছু ছেড়ে ছেলেটা যে কেন বেহালা পছন্দ করলো, কে জানে! অনেক দিন আগে- সমীত তখন কেবল কলেজে পড়ছে- তার কাছে এসে একটা বেহালা কিনে দেয়ার আবদার করলো। তখন সে অবাক হয়েছিলো- গিটারও তো চাইতে পারতো, আজকাল ছেলে-মেয়েরা কী সুন্দর গিটার বাজায়- ভেবে! কিন্তু কথাটা সে জিজ্ঞেস করেনি। তার মুখচোরা, লাজুক, চুপচাপ, বিষণ্ন্ন দেবরটির ওই প্রথম দাবি, শেষও। আর কখনো ও কিছু চায়নি। এই পাঁচ বছরে সমীতের হাতে কী যে অসাধারণ সুর এসেছে! যখন বাজায়_ মনে হয় যেন পৃথিবীর সবকিছু একসঙ্গে কেঁদে উঠছে, যেন সব মানুষের সমস্ত কষ্ট, অপ্রাপ্তি আর হাহাকার সে তার আঙুলে ধারণ করে আছে। সমীতের সবকিছুই এমন অদ্ভুত, ব্যাখ্যাহীন। চুপচাপ-নিঃসঙ্গ ছেলেটা রাত গভীর না হওয়া পর্যন্ত বেহালাটা হাতে পর্যন্ত নেয় না কেন, তা-ও এক রহস্য। রোজী কখনো কখনো শুনতে চাইলে ও হেসে এড়িয়ে যায়- 'রাতে তো শোনোই। শোনো না? তাহলে আর আয়োজন করে বাজানোর কি হলো?' হ্যাঁ, রাতে শোনে রোজী, কিন্তু অন্য কোনো সময় শুনে দেখতে চেয়েছিলো- সবকিছু একইরকমভাবে কেঁদে ওঠে কী না! কিন্তু সমীত ওই রাত ছাড়া অন্য কোনো সময় বাজাতে রাজিই হয় না।
শুনেছ? - রোজী তার অসামপ্ত কথার রেশ ধরে আবার শুরু করে।

উঁ!
সমীতকে ব্যালকনিতে রাখাটা ঠিক হচ্ছে না।
ইফতেখার নিরুত্তর।
কিছু বলছো না যে!
কি বলবো?
ওকে ব্যালকনিতে থাকতে বললে কেন?
কোথায় থাকতে বলবো?
তোমরা তিন ভাই আলাদা রুম নিলে, মা-র রুম হলো, ড্রইং রুমও হলো, শুধু ওরই জায়গা হলো না!
আর রুম নেই তো!
ড্রইং রুমটা ওকে দিয়ে দাও।
তাহলে ড্রইং রুম কোথায় হবে?
ওই ব্যালকনিটাই তো একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে নিলে হয়।

ইফতেখার চুপ করে যায়। বোঝা যাচ্ছে- এই প্রস্তাবে তার সায় নেই। সুসজ্জিত ড্রইং রুম ছাড়া কি আর প্রেস্টিজ রক্ষা হয়! প্রেস্টিজের চেয়ে সমীত এদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয় কিছুতেই। নইলে কেউ কথাটা একবারও ভাবলো না কেন? সে আবারও বলে- আরেকটু বড় দেখে বাসাটা নিলেও তো পারতে।
এবারো কোনো উত্তর পাওয়া যায় না, নির্বিকার শুয়ে থাকে ইফতেখার। থাকুক, রোজী ভাবছে- নির্বিকার থাকুক, আমি নিজেই সমীতের জন্য আশপাশে কোথাও একটা রুম ভাড়া করে দেবো। ভাবতে ভাবতে পরিকল্পনাটা মনে ধরে গেলো। কাজটা করা গেলে সমীতের কষ্টটা কমবে। তাছাড়া, ও যেমন নির্জনতাপ্রিয়, একা থাকার এই সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে নিশ্চয়ই আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। এই বাড়তি খরচে ইফতেখার কিছু মনে করবে না- রোজীর অন্তত তা-ই মনে হচ্ছে- তার বেতনের টাকাটা তো প্রায় খরচই হয় না। সে যে একটা চাকরি করে, ইফতেখারের বোধ হয় সেটা মনেই নেই- সেদিক থেকে দেখতে গেলে, চাকরিটা তার প্রয়োজনও নয়- অনেকটা শখের বসে করতে গিয়ে ফেঁসে গেছে। চাকরি হচ্ছে জুয়ার মতো, একবার ধরলে ফতুর না হওয়া পর্যন্ত ছাড়া যায় না। এই দাসত্বের অভ্যাস যার হয়েছে, সে আর ওখান থেকে বেরোতে পারে না কোনোদিন। তাছাড়া, সময়টাও তো কেটে যাচ্ছে! নইলে এই পাঁচ রুমের বাসায় দম বন্ধ হয়ে মরে যেতে হতো। এই বাসা থেকে বাবার বাসা, কি দু-একজন আত্নীয়-স্বজনের বাসায় বেড়ানো ছাড়া ঘরের বউদের আর যাওয়ার জায়গা কোথায়? এভাবে আর কতোদিনই বা চলে? আরেকটি কারণও অবশ্য আছে- সেটিও অপ্রকাশ্য, কারো কাছে বলা যায় না, কিন্তু রোজী নিজে জানে- সে অন্যের চোখে নিজেকে দেখে নিতে ভালোবাসে। চাকরিটা করে বলে, সহকর্মী বা অফিসে বিভিন্ন কাজে আসা লোকজনের চোখে নিজেকে দেখে নেয়া যায় এবং সেসব চোখে মুগ্ধতায় ছায়া দেখে তৃপ্ত ও প্রীত হওয়া যায়। কোনো কোনো চোখে যে লোভও থাকে না, তা নয়- রোজী বোঝে; কিন্তু সে কিছু মনে করে না। এ এক অনিবার্য বিষয়- শুধু রূপ বা সৌন্দর্য দেখেই সুখী হওয়ার মতো মানুষ নেই, নিজের করে পেতে চাই, তবেই না সুখ- মানুষের এই প্রবণতাকে সে অস্বাভাবিক বলে মনে করে না। সে তো সত্যিই আর ওইসব লোভাতুর মানুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করছে না! সমীত কি থেমে গেলো- রোজী সমীতের ভাবনায় ফিরে এলো আবার। ছেলেটা যে কেন এমন_ এই প্রশ্ন তার বহুদিনের। কেনই বা ওর সঙ্গেই তার সম্পর্কটা এমন গভীর হয়ে গেলো তা-ও জানে না সে। একা থাকতে পছন্দ করে ও, ইউনিভার্সিটি ছাড়া অন্য কোথাও যায় না, ঘরে বসে গান শোনে, বই পড়ে, আর রাতে সবাই শুয়ে পড়লে আপন মনে বেহালা বাজায়। এরকম একজন মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জন্মানোর কোনো কারণ নেই। তবু সেটাই ঘটেছে। যত দিন যাচ্ছে, সমীতের জন্য তার মমতা যেন বেড়েই চলেছে। সে জানে, বিষয়টি একতরফা নয়; তার প্রতিও সমীতের টানটা- আর কেউ না হোক- সে নিজে খুব ভালোভাবেই টের পায়।

আহারে, এই শীতে ওর না জানি কতো কষ্ট হচ্ছে! নতুন করে এই কথা মনে এলে, রুম ভাড়া করে দেবার পরিকল্পনাটা সমীতকে জানানোর জন্য সে উঠে পড়ে। br />


২.
এএই মাত্র আমার পাশ থেকে রোজী উঠে গেলো, সন্তর্পণে। একটু আগেই আমাকে ডেকে সমীতের কথা বলছিলো- আমি খুব একটা রেসপন্স না করে, ঘুমের ভান ধরে ভারি ভারি নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছি। রোজী বোঝেনি- সাত বছর ঘর করার পরও ও আমার অনেক কিছুই বোঝে না- যে, আমি ঘুমাইনি। জানি, আমার ঘুম ভাঙার ভয়ই ওকে কাতর করে রেখেছিলো। ও তো আর জানে না, রাতের পর রাত আমি ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকি, ঘুম আসে না। কেন এই সমস্যা হচ্ছে কে জানে! আমি তো এমন কিছু কষ্টে নেই, টেনশনে নেই- নিরুদ্বিগ্ন ছাপোষা জীবনযাপন করছি। একটি প্রাইভেট ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমি, ভালো বেতন পাই, সামাজিক মর্যাদাও যথেষ্ট। যা চেয়েছি, তার চেয়ে পেয়েছি বেশি- প্রাপ্যের অধিক প্রাপ্তি। পেশাগত জীবনে কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা নেই পারিবারিক জীবনেও। রোজী খুব ভালো মেয়ে। রূপসী, বুদ্ধিমতী, কনসিডারেট। এই পরিবারের প্রতি আমার রেসপন্সিবিলিটিকে ও নিজের করেই দেখে। মা আর তিনটি ভাই- সবার কাছেই রোজী ভালোবাসা পায়। আর আমাদের একমাত্র সন্তান শুভ্র, এসবকিছুর মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ঘরদোর আলো করে রেখেছে। না, কোথাও কোনো সমস্যা নেই, বরং এখানেও ওই একই ব্যাপার- প্রাপ্যের অধিক প্রাপ্তি। তবু কেন আমার ঘুম আসে না? তবে কি ওই অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিগুলোই আমার সর্বনাশ করলো? যা পাওয়ার কথা ছিলো না, তারচেয়ে বেশি পেয়েছি বলে, আরো বেশি পাওয়ার প্রত্যাশা জেগেছে! নইলে কেন কোনো এক অদ্ভুত ক্ষণে আমার মনে হয়েছিলো- রোজী আমাকে বোঝে না!

একটু আগে রোজী আমাকে এক গাদা কথা শোনালো- সমীতকে কেন ব্যালকনিতে রেখেছি এ নিয়ে। ও কি বোঝে না- এই শহরের ভাড়াটিয়াদের কপালে সুইটেবল বাসা নেই! এই বাসায় পাঁচটি রুম, তবুও আমাদের হচ্ছে না। এখন বাড়িওয়ালারা তো বড় বাসা বানায়ই না। এরচেয়ে বড় আর পেলাম কোথায়! রোজী বলছিলো- ড্রইং রুমটা সমীতের জন্য ছেড়ে দিতে। এসব তো আবেগের কথা! গেস্ট এলে বসাবো কোথায়? তখন তো ও-ই সবচেয়ে বেশি বিব্রত হবে। বারান্দায় সমীতের কষ্ট হচ্ছে, বুঝি, খারাপও লাগে। ওকে তো আমি অন্য কোনো ভাইয়ের চেয়ে কম স্নেহ করি না, বরং ওর প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু রোজীর ভাবসাব দেখে মনে হবে- আমি একজন নিষ্ঠুর মানুষ, সমীতের জন্য আমার কোনো মমতাই নেই।

রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ আসছে। আমি নিশ্চিত- এখন গেলে দেখবো, রোজী চা বানাচ্ছে সমীতের জন্য। একটু আগেও মন খারাপ করা সুর বাজাচ্ছিলো ও। থেমে যেতেই উঠে গেছে রোজী। চা বানিয়ে নিয়ে যাবে, গল্প করবে অনেকক্ষণ। ওদের এই জগৎটি একেবারেই নিজস্ব। কেউ জানে না এই জগৎটির কথা, কিন্তু আমি জানি। আমি কি সন্দেহ করি ওদের? না। ওদের সম্পর্কটাকে সন্দেহের উদ্ধে রাখা যায় অবলীলায়। আর কেউ না চিনুক, একজন নারীকে তার স্বামী খুব ভালো করেই চেনে, মেয়েরা যেমন চেনে তার স্বামীকে। কতোদুর যেতে পারে, সেটা জেনে-বুঝেই পরস্পরকে ঠিক ততোটুকুই ছাড় দেয় তারা। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। রোজী রূপসী- বলা ভালো, অতিমাত্রায় রূপসী। বিয়ের সাত বছরে যখন ওর শরীরের প্রতিটি বিন্দু আমি চিনে ফেলেছি, ব্যবহার করতে করতে পুরনো করে ফেলেছি- তখনো ওর রূপের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করবো না আমি। কিন্তু আমি জানি, রোজী ওর রূপকে ব্যবহার করে না। সমীত তো দূরে থাক, কাউকে জড়িয়েই ওকে আমি সন্দেহ করি না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, সন্দেহ নয়, ওদের সম্পর্কটাকে আমি ঈর্ষা করি। এ রকম একটি সম্পর্কের জন্য আমার লোভ হয়, তুষ্ণায় ছটফট করি। নির্ঘুম শুয়ে থাকি, নিস্ফল প্রতীক্ষায় থাকি, সাধ হয়- রোজী এক কাপ চা আমার জন্যও নিয়ে আসুক, বলুক- খালি মুখে রাত জাগছো, একটু চা নিয়ে এলাম!

৩. br /> ররোজীর মাঝে মাঝে মনে হয়- সমীতের মধ্যে থেকে এখনো ছেলেমানুষিটা যায়নি। এত গম্ভীর থাকে ও, এত একা, তবু ওর কিছু কিছু ব্যাপার একেবারেই বাচ্চাদের মতো। এই এখন যেমন, চা বানিয়ে, সন্তর্পণে-নিঃশব্দে সমীতের পেছনে দাঁড়িয়ে সে দেখলো- ও নিবিষ্ট মনে ঘর বানাচ্ছে। ঘর মানে- কাগজ কেটে কেটে আবার জোড়া দিয়ে বানানো খেলনা ঘর। এটা ছেলেমানুষী ছাড়া আর কী? এই একটু আগেই যার হাতে ঝরে পড়েছে পৃথিবীর সমস্ত হাহাকার, যার সুরে রোজীর চোখ ভিজে উঠেছে বারবার- এখন সে-ই কী না আপন মনে খেলনা ঘর বানাচ্ছে! টেবিলের ওপর গোটা দশেক, এখন একটা বানাচ্ছে, বানিয়ে ওটার গায়ে কী যেন লিখলোও। রোজী কৌতূহলী হয়ে শব্দহীনভাবেই এগিয়ে গিয়ে দেখলো- সমীত ওই খেলনা ঘরের গায়ে গায়ে তার নাম লিখে রেখেছে। সে একটা ধাক্কা খেলো, একটু বিমুঢ় হয়ে পড়লো মুহূর্তেই। কী করা উচিত বুঝতে না পেরে পিছিয়ে এলো নিঃশব্দে। সমীতের এই গোপন কর্মকাণ্ডে এ রকম নিঃশব্দ উপস্থিতি নিজের কাছেই অনুচিত মনে হলো। ভাগ্যিস, ও টের পায়নি! পিছিয়ে, ব্যালকনি থেকে বেরিয়ে গেলো রোজী, তারপর চায়ের কাপে ইচ্ছাকৃত শব্দ তুলে ঢুকলো আবার।
সমিত। br /> এএত রাতে চা!-হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিতে নিতে বললো সমীত। ওর চোখে স্পষ্ট আনন্দ।
খালি মুখে রাত জাগছো, তাই নিয়ে এলাম।- রোজী খেয়াল করলো সমীতের মধ্যে ওই ঘরগুলো লুকানোর প্রবণতা নেই, মনে হলো- এজন্য সে বিব্রতও নয়। রোজী স্বস্তিবোধ করলো।
ভালো করেছ। br /> তুমি কি করছো?
কিছু না।
ররোজী গিয়ে টেবিল থেকে একটা ঘর তুলে নিলো- এগুলো কি?
ঘর। br /> এএবার যেন নিজের নাম দেখতে পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে সে তাকালো। কি বলবে সে এই মুহূর্তে? জিজ্ঞেস করবে- এসবের মানে কি? জানতে চাইবে- কেন সমীত এ রকম? এসবের কিছুই না করে সে সমীতের চুলে আঙুল ডুবিয়ে জিজ্ঞেস করলো- এখানে তোর খুব কষ্ট হচ্ছে না রে?
সম্বোধনের হঠাৎ পরিবর্তন রোজী নিজে টের না পেলেও, সমীত এর অর্থ বোঝে। খুব বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লে ভাবী তাকে 'তুই' সম্বোধন করে।
ননা তো! -সমীত সত্যিই খুব অবাক।
অবশ্যই কষ্ট হচ্ছে। তুই কখনো কিছু চাস না, কোনো দাবি-দাওয়া নেই, সবাই যা চাপিয়ে দেয় তাই মেনে নিস- এই জন্যই তো তোকে কেউ একটা রুম দিলো না। এই শীতের মধ্যে এখানে মানুষ থাকতে পারে!
খুব পারে। আমার তো কোনো কষ্ট হচ্ছে না। br /> নিশ্চয়ই হচ্ছে। তুই বলছিস না। তুই কালকেই আশপাশে কোথাও একটা রুম খুঁজে নিবি। ভাড়া যা লাগে আমি দেব।
সমীত হেসে ফেলে।
হাসছিস কেন? রুম খুঁজবি তো?
উঁহু।
কেন?
একটা আলাদা রুম হলে মন্দ হয় না। কিন্তু সেখানে কে আমার জন্য মাঝরাতে চা নিয়ে আসবে শুনি! কে আমার বেহালা শুনে কাঁদবে? কে আমার নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলো আনন্দে আর ভালোবাসায় ভরে দেবে বলো? একটা আলাদা রুম মানে একটা নিজস্ব জগৎ, কিন্তু তুমি ছাড়া সে জগৎ যে খুব শূন্য মনে হবে, তুমি তা বোঝ না?
মমুহূর্তটি ছিলো আবেগপ্রবণ- ফলে রোজীর দীর্ঘক্ষণের জমিয়ে রাখা কান্না প্রকাশ হয়ে পড়বে টের পেয়ে- তুই এমন কেন রে সমীত- বলে, আর না দাঁড়িয়ে কান্না লুকাতে দ্রুত ওখান থেকে চলে আসে।

৪. br /> সসমীত আরো অনেকবার এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। এই ভাবী-ই তাকে প্রশ্নটা করেছে বহুবার, করেছে তার হাতে গোনা বন্ধুদের প্রায় সবাই এবং তার প্রেমপ্রত্যাশী মেয়েটিও। কিন্তু কেউ-ই প্রশ্নটি পরিষ্কার করেনি। তুই এমন কেন-'কেমন?'-এই জিজ্ঞাসার উত্তর নেই কারো কাছে। সে কি খুব অস্বাভাবিক একজন মানুষ? কিংবা সামাজিক মানুষ হিসেবে একজন ব্যক্তির যে ভাবমূর্তি থাকে, সেটা কি তার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত? হতে পারে। সে তো কখনো সামাজিক মানুষ হতেই চায়নি। যারা সামাজিক মানুষ তারাও যে সেটি হতে চায় তা হয়তো নয়, এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই হয়ে ওঠার ব্যাপার, তার জীবনে সেটি ঘটেনি। কেন ঘটেনি সেটি বলা কঠিন, কিন্তু সমীত প্রায়ই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবে। ছোটবেলায় সে এরকম ছিলো না, বেড়াতে খুব পছন্দ করতো, স্কুলে-পাড়ায় তার অনেক বন্ধু ছিলো। এজন্য কতো বকা খেতে হয়েছে! কিন্তু একটি ঘটনা তার এই স্বভাবটি পাল্টে দেয়। একবার সে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলো- তখন সে স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে। কী কারণে সে জানে না, ট্রেনটা বেশ ফাঁকা ছিলো, আর সে বেশ আনন্দে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছিলো। একটা কামরায় সে দেখলো- একজন অন্ধ লোক কী যেন একটা বাজাচ্ছে, আর সেই কামরার সবগুলো লোক স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। সে-ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে শুনছিলো। এরকম লোক সে কখনো দেখেনি, কখনো এমন সুর সে শোনেনি। কতোক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো মনে নেই। হয়তো অনেকক্ষণ হবে, কারণ বাবা তাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন, তারপর এ-কামরা ও-কামরা ঘুরে এখানে এসে পেয়েছিলেন। বাবা ছিলেন গম্ভীর মানুষ, তারা সবাই তাঁকে ভয় করে চলতো। তো, সমীতকে পেয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বাবা গম্ভীর-স্বরে ডেকেছিলেন- বাবু। সমীত ফিরে তাকাতেই বাবার গম্ভীর রূপটি ঝরে পড়ে, তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলেন- 'কাঁদছো কেন বাবা, কি হয়েছে?' সে অন্ধ লোকটার দিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করেছিলো- 'ওই লোকটা কি বাজাচ্ছে বাবা?' ততোক্ষণে লোকটার বাজানো শেষ, লোকজন এসে তাকে পয়সা দিয়ে যাচ্ছে। বাবা বললেন- 'ওটার নাম বেহালা। আবার শুনবে? যাও ওকে ডেকে নিয়ে এসো, আমাদের কামরায় নিয়ে যাই।' সমীত রাজি হয়নি, কারণ দ্বিতীয়বার এই সুর শোনার সাহস হয়নি তার। বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে মায়ের কাছে নিয়ে গেলেন, বললেন_ 'দ্যাখো তোমার ছেলের কাণ্ড। বেহালা শুনে কাঁদছে।' সমীতের লজ্জা লাগছিলো, কিন্তু কোনোভাবেই লোকটির কথা মাথা থেকে সরাতে পারছিলো না। সত্যি বলতে কি, কোনোদিনই পারেনি। তো, সেই থেকে তার বেহালা বাজানোর শখ। কিন্তু বাবাকে বলার সাহস ছিলো না বলে বলা হয়নি। তার মনে পড়ে, সেই ঘটনার পর থেকেই সে ক্রমাগত চুপচাপ গয়ে যেতে থাকে। এর বছরখানেক পর বাবা মারা গেলেন। মৃতু্যর আগে আগে বাবা মাকে প্রায়ই বলতেন- 'তোমার এই ছেলেটার দিকে খেয়াল রেখো। ও আর সবার মতো হয়নি।' তারপর ভাবীকে বলে এই বেহালা কেনা, শেখা, তারপর সুর তুলে নেয়া। এখন তার জীবন জুড়ে আছে এই বেহালা, মানুষের সঙ্গ তার ভালো লাগে না। শুধু ভাবীর ব্যাপারটাই ব্যতিক্রম। ভাবীর সঙ্গে সম্পর্কটাও অন্যরকম। রোজীকে নিয়ে তাই সে কল্পনার ঘর বানায়, আর পৃথিবীর সব দুঃখ আঙুলে তুলে নিয়ে গভীর রাতে বেহালার সুরে ছড়িয়ে দেয় আকাশের উদ্দেশ্যে।

৫. br /> ববেশ কিছুক্ষণ আগেই রোজী ফিরে এসে শুয়ে পড়েছে আমার পাশে। শুয়ে শুয়ে প্রায় মিনিট দশেক কেঁদেছে। তারপর থেকে একদম চুপচাপ। ঘুমিয়েই পড়লো হয়তো। ওর কান্না আমাকে বিচলিত করে তুলেছিলো। নিঃশব্দ, বিরামহীন, হু হু কান্নায় ভেসে গেছে রোজী। একবার আমার ইচ্ছে হলো, জিজ্ঞেস করি- 'কাঁদছো কেন, কি হয়েছে তোমার, আমাকে বলো, আমাকে তোমার কান্নার সঙ্গী করে নাও।' ভাবা পর্যন্তই, ইচ্ছেটা নিজের কাছেই হাস্যকর মনে হলো- সম্পর্কটা আর অতোটা সহজ নেই যে, কথাগুলো বিনা দ্বিধায় বলে ফেলা যায়! রোজী হয়তো বোঝেইনি যে, আমি ওর কান্নার কথা জেনে ফেলেছি। বোঝেনি। ও আমার অনেক কিছুই বোঝে না। কোন কুক্ষণে যে এই কথাটা আমার মাথায় ঢুকেছিলো! ওকে নিয়ে আমি কি কোনো অতৃপ্তিতে ভুগছি? নইলে কেন সব এমন এলোমেলো হয়ে গেলো? কেন আমার ঘুম আসে না?

রোজীকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। শুধু কি ভালোবেসে? রীতিমতো পাগল হয়ে। ওকে তখন মনে হতো অচিনপুরের রাজকন্যা। আহা, পুরো জীবনটাই কেন অমন ইমোশনাল হয় না! ওইরকম যুক্তিতর্কহীন, হিসেব-নিকেশহীন! আহা, সেইসব দিন! আর ফিরবে না কখনো! এখন তো কেবল বিচ্ছিন্নতা, একই বিছানায় শুয়েও দু-জন দু-জন থেকে অনতিক্রম্য দূরে সরে যাওয়া। কেন এমন হলো? সেই তীব্র প্রেম কেন এত দ্রুত ম্লান-ফ্যাকাশে হয়ে গেলো? ওর পক্ষ থেকে এই আচরণের কারণটি জানি না, কিন্তু আমার নিজের একসময়- (কোন কুক্ষণে যে!)- মনে হয়েছিলো, রোজী আমাকে বোঝে না! নিশ্চয়ই হঠাৎ করে একদিন মনে হয়নি কথাটি, অনেকদিনের অনেক ঘটনা এক হয়ে এরকম একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছিলো আমার মধ্যে; আর তারপর- যা হয় সাধারণত- এর পক্ষে ক্রমাগত সাক্ষ্য পেতে থাকি আর আমার ধারণা দৃঢ়মূল হতে থাকে। বিষয়টি আমার জন্য বিপর্যকর ছিলো। ভাবিনি এমন হতে পারে! এত প্রেম যার জন্য, সে-ও আমাকে বুঝতে পারছে না- মেনে নিতে ভারি কষ্ট হয়। হয়তো সেই থেকে দূরে সরে যাওয়ার শুরু, ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে- এমন ঘটনা সূক্ষ্নভাবে এড়িয়ে যাওয়া, ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা ওর কাছে লুকিয়ে রাখা। সে-ও নিশ্চয়ই এমনটি করেছে। আর তাই, আমার এত ভালোবাসার বউ নিঃসঙ্গ কেঁদে চলে আমারই পাশে শুয়ে- জানা হয় না, কেন এই কান্না! আস্তে আস্তে কথাবার্তা, আলাপচারিতা কমে এসেছে, এখন পুরো ব্যাপারটি এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যে, রুটিনওয়ার্কের মতো মাসে দু-একবার শারীরিক মিলন ছাড়া কোনো সম্পর্কই যেন আর অবশিষ্ট নেই।

পাশে রোজী ঘুমাচ্ছে, আমার আরেকবার ইচ্ছে হলো- ওকে জাগাই, বলি- 'আমাকে তোমার কান্নার সঙ্গী করে নাও।' বলা হলো না। ইচ্ছে হলো, বলি- 'এই দ্যাখো আমি কী রকম হয়ে গেছি, আমার জীবনে কেমন বিপর্যয় নেমে এসেছে; সারারাত আমার একফোঁটা ঘুম আসে না। আমাকে জাগিয়ে রেখে তুমি যে এমন ঘুমাচ্ছো- তোমার খারাপ লাগছে না?' ভাবিই কেবল; বলা হয় না। নির্ঘুম তাকিয়ে থাকি নিকষ অন্ধকারে। নির্ণিমেষ, নিঃশব্দ।

৬.
সমীতের ওই আবেগপ্রবণ কথাগুলো শুনে এসে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে রোজী। নিঃশব্দে, ভয়ে ভয়ে। ভয়- যদি আবার ইফতেখারের ঘুম ভেঙে যায়! এবার আর বিরক্তির কথা ভেবে নয়, ভয় হচ্ছে- যদি জিজ্ঞেস করে তার কান্নার কথা! সে কি উত্তর দেবে? সমীতের কথাগুলো কি ইফতেখারকে বলা যায়? না, যায় না। রোজী ভেবে খেই পাচ্ছে না- কি অর্থ ওই কথাগুলোর, তার নাম লিখে লিখে ওই ঘরগুলো বানানোর! তার ভয় হচ্ছে- এ-কি প্রেমের ভাষা? তার জীবনে কি আবার প্রেম এলো? সমীত কি তার প্রেমে পড়েছে? সে আর ভাবতে পারছে না_ যদি সত্যি তাই হয়, তাহলে এ যে কী কঠিন সংকট ডেকে আনবে ভাবা যায় না।
 
রোজী অনেকক্ষণ ধরে কাঁদে, এইসব নানা ভাবনায় আক্রান্ত হয়, তারপর একটু সুস্থির হলে তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। চোখে ভেসে ওঠে অনেকগুলো ছোট ছোট ঘর, প্রতিটিতে তার নাম লেখা। এবার সে-ও মেতে ওঠে ঘর বানানোর খেলায়- কল্পনায় অনেকগুলো ঘর- প্রতিটিতে সমীতের নাম লেখা।


অক্টোবর, ২০০১