অবশেষে আমিও লিখবো বা
আমারও লিখতে ইচ্ছা করবে - ভাবিনি কোনোদিন। আমার ভাই, হাসিব জামিল, আপনাদের
কাছে এর মধ্যেই বেশ সুপরিচিত হয়ে উঠেছে, জানি - কিন্তু আমি তো তার ধারে
কাছেও নেই। শুধু আমি কেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের কেউ লেখক ছিলেন বলেও
শুনিনি। তাই আমাদের পরিবারে ওর লেখক হয়ে ওঠাটাই একটা ঘটনা। আমার অন্য ভাইরা
কিংবা কাজিনরা যেখানে নিজেদের ক্যারিয়ার, টাকা-পয়সা, সহায়-সম্পত্তি আর
ভবিষ্যত ভাবনায় মহাব্যস্ত সেখানে ও অবলীলায় এসব কিছু অস্বীকার করে, অবহেলায়
সবকিছু দূরে সরিয়ে রেখে - নিজের একচিলতে রুমে বসে চুপচাপ পড়ছে বা লিখছে বা
তার উড়নচণ্ডী লেখক বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা বসিয়েছে - এই দৃশ্য এখন এই বাসায়
স্বাভাবিক হয়ে এলেও কারো কাছেই সুখপ্রদ নয়। মা’র কিঞ্চিত প্রশ্রয় থাকলেও
কিংবা বাবা মন্তব্যহীন নীরবতা পালন করলেও ভাইরা বেশ বিরক্ত ওকে নিয়ে - আগে
এ নিয়ে অনেক গঞ্জনাও সইতে হয়েছে ওকে। খানিকটা অভিমান করেই ভার্সিটিতে পড়ার
সময় ও হলে চলে গিয়েছিলো; এখনও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না, তবে
ভাইরা ওর ব্যাপারে আর মাথা ঘামায় না, বরং ওর জীবনটা যে বিফলে গ্যালো - এই
ভেবে কষ্ট পায়। হাসিব ভাই - ওকে আমি ‘দাদা’ বলে ডাকি - অবশ্য এসব বিষয়ে
নির্বিকার; আর আমি - অস্বীকার করবো না - বোন হিসেবে ওকে নিয়ে বরং গর্ববোধ
করি। আমার অন্য ভাইরা তাদের কর্মজীবনে বেশ সাফল্য পেলেও দাদার মতো খ্যাতি
পায়নি। একটি জীবনে খ্যাতিও তো কম মূল্যবান নয়! আমার মাঝে মাঝে মনে হয়,
দাদার এইরকম জীবন যাপনের জন্য যারা – অর্থাৎ আমার অন্য ভাইরা - ওকে এত কথা
শুনিয়েছে একদিন তারাই হয়তো - ‘আমি হাসিব জামিলের ভাই’ - বলে গর্ব করে পরিচয়
দেবে।
সে যাহোক, বলছিলাম ওর লেখালেখি নিয়ে। এই একটি বিষয়ে ওর মগ্নতা - পৃথিবীর
সমস্ত কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে থেকে, সমস্ত গ্লানি ও বেদনা গায়ে মেখে এই
নির্লিপ্ত একাগ্রতা - আমাকে দারুন মুগ্ধ করে। বলতে দ্বিধা নেই - ওর
গল্প-টল্প আমি খুব একটা বুঝিনা - কী যে কঠিন ভাষা, কঠিন সব কথাবার্তা! তবু
পড়ি; আফটার অল দাদার লেখা - না পড়লে কেমন দ্যাখায়! অনেক সময় না বোঝা
বিষয়গুলো জিজ্ঞেস করলে ও খুব আগ্রহ নিয়ে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে দেয়। আমি
অবশ্য এমনিতেও গল্প-উপন্যাস পড়িনা - যেটুকু পড়েছি তা-ও ওর প্ররোচনায়। আমার
পছন্দের লেখকরা - হুমায়ূন, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ - আবার ওর দুচোখের
বিষ। এদেরকে ও লেখক হিসেবেই গন্য করেনা, অবলীলায় খারিজ করে দেয়। তা দিক, এ
নিয়ে ওর সঙ্গে কখনো তর্ক করিনা আমি। সাহিত্য- টাহিত্য নিয়ে যেহেতু আমার
তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই , বিষয়গুলো খুব ভালো বুঝিওনা, তাই ওর বক্তব্যকেই
সঠিক বলে ধরে নেই। কিন্তু আমার লেখার উদ্দেশ্য এসব কিছু নয়। বেশ কিছুদিন
ধরেই দেখছি - ওকে নিয়ে ওর বন্ধু-বান্ধবী-পরিজনদের নানারকম গল্প প্রকাশিত
হচ্ছে এবং ওকেও বেশ উত্তপ্ত মনে হচ্ছে। লেখাগুলো আমি পড়েছি - যদিও
মাথামুন্ডু কিছু বুঝিনি কিংবা বুঝিনি সেখানে দাদার প্রশংসা করা হলো নাকি
নিন্দা করা হলো, কিংবা কেনই-বা দাদা ওগুলো পড়ে তপ্ত হয়ে উঠছে। আমার ওগুলো
বোঝার কথাও নয়; তবু মনে হলো - আমিও দু-কলম লিখিনা কেন? অতসব তত্ত্বকথা
না-ইবা লিখতে পারলাম অথবা আমার লেখা অত উঁচুমাপের না-ইবা হলো অন্তত এটুকু
তো লেখা যায় - আমারই ভাই ক্রমেই কিভাবে অচেনা হয়ে উঠছে আমাদের কাছে! ও যে
গল্পগুলো লেখে, মুড এলে যে কথাগুলো বলে তা যেন আমাদের এই মধ্যবিত্ত পরিবারে
কেমন খাপছাড়া, বেমানান শোনায়। ওর সব কথা বোধগম্য হয়না, কিন্তু অন্তত এটুকু
বুঝি - একই ঘরে বসবাস করে, একই খাবার খেয়ে, একই স্নেহহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েও
দাদা হয়ে উঠেছে অন্যরকম। কই, আমার অন্য ভাইয়েরা তো কোনো বিষয় নিয়ে এত
গভীরভাবে চিন্তা করেনা, একটি ঘটনার সর্বজনগৃহীত ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ বিপরীত
ব্যাখ্যা দেয়না; এমনকি বাবার মুখেও তো কোনোদিন এরকম কথাবার্তা শুনিনি! দাদা
তাহলে অন্যরকম হলো কিভাবে? ছোটবেলা থেকেই ওর ব্যাপারে একটি পরিচিত দৃশ্য
ছিলো - মুখের কাছে বই খুলে বসে থাকা। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে, মা’র কাছে
চেয়ে-চিন্তে, আরো পরে - টিউশনি করে, দাদা শুধু বই কিনতো - অন্য কিছু নয়।
দিনরাত ঘরে বসে শুধু বই পড়া আর বই পড়া। এই বই পড়াই কি ওকে এমন অচেনা করে
তুললো? একসময় মা-বাবা ওকে নিয়ে খুব নিরাপদ বোধ করতেন - তাদের ছেলে বাইরে
যায় না, পাড়ার খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মেশে না - এ নিয়ে তারা খুব তৃপ্ত ছিলেন।
এখন সেই দাদাকে নিয়েই তাঁরা সম্ভবত সবচেয়ে বেশী উৎকন্ঠায় ভোগেন তাদের সব
ছেলেরাই এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, কেবল ‘হাসিবেরই কিছু হলো না’। মাঝে মাঝে
মা-বাবার কথপোকথন শুনি। একজন আরেকজনকে বলেন - ‘আচ্ছা আমাদের এই ছেলেটা এতো
জ্ঞানী হলো কোত্থেকে বলতো? ও যখন কথা বলে তখন কান পেতে শুনতে ইচ্ছে করে।
মনেই হয়না - আমাদেরই ছেলে এসব কথা বলছে।’ ব্যাপারটা মাঝে মাঝে আমিও ভাবি।
দাদার জ্ঞান-বুদ্ধি, বিচার-বিশ্ল্লেষণ সবার থেকে আলাদা। একেকটা ঘটনাকে ও
এমন ভাবে ব্যাখ্যা করে যা ভুলেও চিন্তা করা যায় না।
একটা ঘটনার কথা বলি।
ঘটনাটা খুব দুঃখজনক এবং বহুল আলোচিতও। আপনারা যারা নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন
তাদের কাছে এই ঘটনার নায়ক-নায়িকাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার দরকার নেই,
কারণ মাসের পর মাস বিপুল প্রচারের ফলে তারা এখন সুপাস্টারদের মতো পরিচিত।
কিন্তু নিউজপেপারগুলোতে যেভাবে এই ঘটনার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তার
পেছনেও যে ঘটনা আছে, অন্য ধরনের একটি ব্যাখ্যা আছে সেটা আমি দাদার কাছ থেকে
জেনেছিলাম।
আপনাদের নিশ্চয়ই জাহিদ আর যুঁথীর কথা মনে আছে! সেই জাহিদ - যে প্রেম করে
বিয়ে করার দুই বছরের মাথায় যুঁথীকে খুন করে এখন আদালতের রায়ে ফাঁসির জন্য
অপেক্ষা করছে। তো জাহিদ হচ্ছে দাদার বন্ধু আর ঘটনাক্রমে যুঁথী আমার
বান্ধবী। একসময আমাদের বাসায় ওদের নিয়মিত আসা যাওয়া ছিলো; ওদের অনেক ঘটনার
সাক্ষী আমি - এবং দাদাও। তো যুঁথী খুন হওয়ার পর পত্র-পত্রিকাগুলো একদম
ঝাঁপিয়ে পড়লো; প্রতিদিন নিত্যনতুন তথ্য, ঘটনা ও সেগুলোর অভূতপূর্ব বিশ্লেষন
- যা আমরা ওদের এত কাছের হয়েও কোনোদিন জানতে পারিনি - সাংবাদিকরা যেন
সেগুলো একদম মাটি খুঁড়ে বের করে আনতে লাগলো। কিছুদিনের মধ্যেই এটা প্রায়
প্রতিষ্ঠিত হয়ে গ্যালো - এই জাহিদ নামের লোকটি একটা লোভী, লম্পট, হদয়হীন,
দূরাচার মাত্র। এবং সারাদেশে এমন একটা জনমত তৈরী হয়ে গ্যালো যে, যুঁথী নামক
ফুলের মতো পবিত্র-সুন্দর একটি মেয়েকে হত্যার দায়ে জাহিদের প্রকাশ্য
জনসমক্ষে ফাঁসি হওয়া উচিত - যেন ভবিষ্যতে আর কোনো বদমাশের হাতে কোনো ফুলের
জীবন এভাবে অকালে ঝরে না পড়ে। জাহিদ ভাই নিজের অপরাধ অস্বীকার করলো না।
বললো, ‘এই হত্যার জন্য আমি একা দায়ী, আমার পরিবারের অন্য কোনো সদস্য
কোনোভাবেই এর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অতএব তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ
প্রত্যাহার করে আমার একার বিচার করুন।’ তো তার বিচার হলো - ফাঁসির আদেশও
হলো; কিন্তু তার অনুরোধ রাখা হলো না। একই সঙ্গে তার মা, ভাই এবং বোনেরও
বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হলো। নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে
আপিল করা হলে জাহিদ ভাইয়ের ফাঁসির আদেশ বহাল থাকলো, তবে অন্যদের শাস্তির
মেয়াদ একটু কমিয়ে দেয়া হলো - এসব ঘটনা আপনারা জানেন, তবু একটু মনে করিয়ে
দেয়ার জন্য বললাম; কিন্তু যা আপনারা জানেন না সেটাই আজকে বলবো আপনাদের।
এতসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছিলো, দাদা কিন্তু একদম চুপ, এমনকি একটা মন্তব্য পর্যন্ত
করছে না। জাহিদ ভাই ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যুঁথীও ওর স্নেহধন্য ছিলো - এই জুটির
জীবনের মর্মান্তিক পরিণতি হয়তো ওকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলো। কিন্তু ওদিকে
আমাদের বাসায় এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হলো সাংঘাতিক। এরকম একটি ঘটনার
পাত্র-পাত্রী যদি খুব পরিচিত হয় এবং প্রতিদিন সকালে এ সম্বন্ধে খবরের কাগজে
যদি নিত্যনতুন কাহিনী জানা যায় - তাহলে ঘটনাবিহীন মধ্যবিত্ত জীবনে সেসব
কতটা আলোড়ন তুলতে পারে সে তো বুঝতেই পারছেন! আমার মা-বাবা-ভাই-ভাবীরা
সবগুলো পত্রিকা পড়তে শুরু করলো, ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রতিদিন অন্তত
একশ’বার জাহিদ ভাইয়ের ফাঁসি কামনা করে - একটি নাগরিক দায়িত্ব পালন করা হলো
এইরকম ভেবে - তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ঘুমাতে যেতে লাগলো।
কিন্তু দাদা, আপনাদের হাসিব জামিল, এর কোনোকিছুতেই অংশ নিলোনা। ওর এই
অদ্ভূত নীরবতা আমার কাছে একটু বিস্ময়করই মনে হলো। কিন্তু কয়েকদিন পরেই
দাদার ঘর গুছাতে গিয়ে ওর টেবিলে একটি গল্পের খসড়া দেখে ওর নীরবতার কারণ
বুঝতে পারলাম। যে বিষয় নিয়ে দাদা গল্প লেখার কথা ভাবে, সেটা নিয়ে কখনই কারো
সাথে কথা বলে না - ওর স্বভাবই এরকম। তো কৌতূহলবশত গল্পটি পড়তে গিয়ে আমাকে
রীতিমতো চমকে উঠতে হলো। কারণ গল্পটি জাহিদ ভাই আর যুঁথীকে নিয়ে লেখা এবং
সেখানে জাহিদ ভাইয়ের চরিত্রটা খুব পজিটিভ। ন্বিমধ্যবিত্ত ঘরের একটি মেধাবী
ছেলেকে ঘিরে ঐ পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষা; এসব ধারণ করেই তার বেড়ে ওঠা;
অন্যদিকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় তার প্রানবন্ত রূপ, হাসি-ঠাট্টা-দুষ্টুমি
এবং মাঝে মাঝে গোঁয়ারের মতো রেগে ওঠা - সবই যেন জাহিদ ভাইকে একদম চোখের
সামনে এনে হাজির করে দিচ্ছে। পড়তে পড়তে আমি যেন জাহিদ ভাইয়ের একটা
জীবন্তরূপ দেখতে পাই - হ্যাঁ, উনি তো এরকমই! কিন্তু দাদা তাকে এত
ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে কেন? যে লোকটি বিয়ের দুই বছরের মাথায় তার
স্ত্রীকে খুন করে, সে আর যাই হোক - অন্তত পজিটিভ মানুষ নয়। যুঁথী আমার
বান্ধবী বলে বলছি না, অন্য যে কোনো ক্ষেত্রেই এরকম ঘটলে আমি একই কথা বলতাম।
এটা তো একটা নীতির প্রশ্ন। একজন খুনিকে আমি পজিটিভ মানুষ হিসেবে দেখি
কিভাবে? কিন্তু দাদার মনোভাবটি বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্য গল্পে যুঁথীও ইতিবাচক
চরিত্রই। তার আহ্লাদী কথা বলা, নানারকম ছেলেমানুষী আর - কখনো কখনো প্রায়
অযৌক্তিক ইমোশন দেখে যুঁথীকে চিনতে পারি - মনে হয় ওকে যেন আমার চেয়ে দাদাই
ভালো চেনে। আমার কষ্ট হয়; ওর জীবনের এই মর্মান্তিক পরিণতির কথা ভেবে আমার
চোখ ভিজে ওঠে। যাহোক, দেখা যাচ্ছে, গল্পটি ওদের বিয়ে পর্যন্ত এসে থেমেছে।
অনেকদিন পর্যন্ত গল্পটি ওখানেই থেমে থাকে। ওর ঘর গুছিয়ে দেয়ার সময় প্রতিদিন
আমি সেটা উল্টে-পাল্টে দেখি - আর কিছু লেখা হলো কী না - না, একটি শব্দও নয়।
আমার কৌতূহল বাড়তে থাকে - কেন দাদা আর লিখছে না, কি হলো ওর। সাধারণত আমি
ওকে এসব বিষয়ে অন্তত লেখার সময় কিছু জিজ্ঞেস করিনা - লেখা শেষে যখন পড়ি,
তখন বুঝতে না পারলে জিজ্ঞেস করে নেই। কিন্তু এখন আর কৌতূহল ধরে রাখা যাচ্ছে
না। স্বাভাবিক কারণেই গল্পটি নিয়ে আমার প্রবল আগ্রহ; এর প্রতিটি চরিত্র
আমার পরিচিত, শুধু পরিচিত নয় - ঘনিষ্ঠ, এমনকি কোথাও কোথাও আমারও উপস্থিতি
আছে। যে ঘটনা নিয়ে গল্পটি লেখা হচ্ছে তার পরিণতিও আমার জানা - শুধু জানতে
ইচ্ছে করছে দাদা কিভাবে এই গল্প শেষ করবে। অনেক আগে দাদা একবার আমাকে
বলেছিলো - গল্প কখনও পুরোপুরি বাস্তব নয় - কল্পনাই সেখানে প্রধান। সেই
কল্পনার ওপরে বাস্তবের প্রজেকশন পড়ে মাত্র। এ্যান্ড ইফ এ্যানিওয়ান ক্যান
প্রজেক্ট দ্য রিয়্যালিটি আপন আ ডেফিনিট ইমাজিনেশন ইন আ স্টোরি সাকসেসফুলি;
ওনলি দ্যাট স্টোরি উইল বি সাকসেসফুল, আদারওয়াইজ নট।’ তো এরকম একটি
জলজ্যান্ত বাস্তব ঘটনাকে দাদা কিভাবে ‘ইমাজিনেশনের’ ওপর প্রজেক্ট করবে -
কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না।
দিনের পর দিন কেটে যায় - দাদা আর একটি শব্দও লেখে না; এমনকি এ বিষয়ে একটি
শব্দও উচ্চারণ করে না। অতপর আর ধৈর্য ধরতে না পেরে একদিন রাতে খাবার পর চা
নিয়ে - এটি আমার নিয়মিত এবং প্রিয় একটি দায়িত্ব - ওর সামনে বসি। দাদা
টুকটাক কথা বলে, আমার পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করে - বুঝতে পারি, ও একটু
অন্যমনস্ক আর তখনও ওর সামনে অসমাপ্ত গল্পটি পড়ে আছে। হয়তো আমার উঠে আসার
কোন লক্ষণ না দেখেই জিজ্ঞেস করে -
কিছু বলবি?
ওর এই অন্যমনস্কতার মধ্যে কিছু জিজ্ঞেস করাটা আদৌ ঠিক হবে কি না ভাবতে
ভাবতেই বলে ফেলি -
তুই গল্পটা অনেকদিন ধরে ফেলে রেখেছিস কেন দাদা?
কোন গল্পটা?
ওই যে যুঁথীকে নিয়ে লিখছিস!
ওটা দেখেছিস?
হ্যাঁ। পড়েছিও।
ও - বলে দাদা চুপ করে যায়।
তুই আর লিখছিস না কেন?
উঁ। দাদা যেন এখন আরো অন্যমনস্ক।
এভাবে থেমে আছিস যে!
গল্পটা লেখা হবে না রে সুমী।
কেন? - আমি ভীষণ অবাক হই।
সে অনেক কথা; অনেক বিষয়।
সত্যিই লিখবি না?
না।
কিন্তু কেন?
বললাম তো, সে অনেক কথা।
বল তো শুনি।
শুনবি?
হ্যাঁ।
ভালোই হয়। বিষয়টা খুব জ্বালাচ্ছে আমাকে। লিখতেও পারছি না, ছাড়তেও পারছি না।
কারো সঙ্গে কথাও বলতে পারছি না - সবাই-ই তো ঘটনাটার ভুল ব্যাখ্যা করছে।
কাউকে বলতে পারলে একটু রিলিফ পাওয়া যেত।
তুই বল দাদা; আমি শুনবো।
আমার ভাই, হাসিব জামিল, আপনাদের প্রিয় লেখক - বলতে শুরু করে। সম্পূর্ণ নতুন
একটি ব্যাখ্যা, ঘটনার পেছনে অজানা একটি গল্প আমাকে স্তব্ধ করে দেয়। সেটি
বলার জন্যই এতো কথা বলতে হলো আমাকে। তাহলে শুনুন ওর কথাগুলো :
‘যে বিষয়টি নিয়ে গল্পটি লিখতে চাচ্ছিলাম তার পরিণতি তুইও জানিস, আমিও জানি;
শুধু আমরাই নই দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষও জানে। পত্রপত্রিকার কল্যানে জাহিদ
ইতিমধ্যেই জনতার কাছে ভিলেন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাহলে এমন একটি
বিষয় নিয়ে গল্প লেখার দরকার কি যার পরিণতি সবাই জানে? হ্যাঁ, দরকার আছে আর
সেটা হলো - একটি ঘটনার ওপর ভিন্ন কোণ থেকে আলো ফেলে দেখা যে, সেটা কেমন
দেখায়। আর এই প্রয়োজনটা তীব্র হয়ে ওঠে তখনই যখন বুঝতে পারি - আমি যা জানি
জনগণ তা জানে না; অথচ তারা একজন লোককে ভিলেন হিসেবে মেনে নিয়ে প্রতিদিন লাখ
লাখ টন ঘৃণা উৎপাদন করে যাচ্ছে। পত্রপত্রিকা পড়লে মনে হবে, সাংবাদিকরা যেন
কোনো এক অজানা যন্ত্রে এই দুটো চরিত্রের স্ক্যান করে নিয়ে তাকে বিশ্লেষণ
করছে। তাদের জানার পরিধি এতটাই বেশী! এমনকি একজন মৃত মানুষের
স্বভাব-চরিত্র-আচার-আচরণ নিয়ে তারা এমন এক ভঙ্গিতে লিখছে যেন তারা তাকে খুব
ভালো করে চেনে! তাদের এই কাল্পনিক জানাশোনায় এবং বিশ্লেষণে যে অনেক
বিভ্রান্তি আছে তা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো আর
এতো চিন্তাশীল নয়, তাই জাহিদ তাদের কাছে ভিলেন হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
কিন্তু সত্যিই কি ও ওরকম? না, ওরকম নয়। জাহিদের সঙ্গে আমার প্রায় এক যুগের
বন্ধুত্ব , আমি অন্তত বোল্ডলি বলতে পারি - ও ওরকম নয়। তাহলে কি রকম? আমাদের
দেশে ‘মেধাবী ’ বলতে যাদেরকে বোঝানো হয় জাহিদ ছিলো তাই। অর্থাৎ স্কুলে
ফার্স্ট/সেকেন্ড হওয়া, এস.এস.সি, এইচ.এস.সিতে স্টার মার্কস পাওয়া কি
ইউনির্ভাসিটিতে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া - এই তো মেধাবী ছেলেদের লক্ষণ! তা, এর
সবগুলোই জাহিদ পূরণ করেছিলো। আর এই ধরনের ছেলেদের নিয়েই একটি পরিবারে
যাবতীয় আশা-আকাঙ্খা-স্বপ্ন-কল্পনা তৈরী হয়।
মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো হচ্ছে স্রোতে ভেসে যাওয়া
সাঁতার-না-জানা মানুষের মতো - একটা কিছু পেলেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে উঠতে চায় -
বিবেচনা করেনা ঐ একটা কিছুর আদৌ ক্ষমতা আছে কীনা তাকে বাঁচাবার।
দূর্ভাগ্যক্রমে জাহিদ ছিলো ওর পরিবারের কাছে ওই একটা কিছু - যাকে কেন্দ্র
করে তারা বেঁচে উঠতে চেয়েছিলো। ওর মা-বাবা-ভাই-বোন ভাবতো জাহিদ নিশ্চয়ই বড়
একটা কিছু হবে আর তাদের দুঃখ-কষ্ট-অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দেবে। বাস্তবতার সঙ্গে
এই ধরনের লোকজনের সম্পর্ক সামান্যই। ওই বড় একটা কিছু বলতে তারা কি বোঝে,
তা-ও স্পষ্ট নয়। একজন তরুণ - যতই মেধাবী হোক না কেন, সে এমন কী-ই বা হতে
পারে! বড় জোর বি.সি.এস ক্যাডারের কর্মকর্তা, ব্যাংকের অফিসার বা বেসরকারী
অফিসের এক্সিকিউটিভ কি বিদেশে গেলে ছোট-খাটো চাকরিজীবি। এই তো! এর যে কোনো
একটা বেছে নিলে তা দিয়ে একটা টোটাল ফ্যামিলির আকাশ ছোঁয়া প্রত্যাশা কিভাবে
পূরণ করা সম্ভব? সম্ভব যে নয় সেটা ওর ফ্যামিলির সদস্যরা না বুঝলেও জাহিদ
ঠিকই বুঝতো। কিন্তু বুঝলে কি হবে - এই প্রত্যাশাগুলোকে ও ধারণ করতো - এমনকি
এই পয়েন্টে ও ছিলো রীতিমতো স্পর্শকাতর। আর এখানেই ওর জীবনের প্রধান
দ্বন্দ্ব। যে প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার নয়, তাকে ধারণ করে মহিমা দেয়ার কোনো
অর্থ তো নেই। অথচ ও তাই করতো। হয়তো নিজের আপনজনের চিরকালীন বঞ্চনা,
দুঃখ-কষ্ট ও অপূর্ণতা ওকে এই প্রশ্নে অন্ধ,স্পর্শকাতর, ও আপোসহীন করে
তুলেছিলো। তোর মনে হতে পারে এই পারিবারিক গল্পের সঙ্গে যুঁথীর খুন হওয়ার
সম্পর্ক কি? সম্পর্ক আছে, গভীর সম্পর্ক; পত্রিকাওয়ালারা সেটা কখনো আবিষ্কার
করতে পারে না। আর ওখানেই লেখকদের সঙ্গে সাংবাদিকদের পার্থক্য। সাংবাদিকরা
শুধু ঘটনার বর্ণনায় ইচ্ছুক এবং পারদর্শী; কিন্তু লেখকরা আগ্রহী ঘটনার
অন্তর্নিহিত কারণটি আবিস্কার করতে। তো যাই হোক, জাহিদ আমাদের সঙ্গেই পাশ
করলো; চাকরিও পেলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, বি.সি.এস ক্যাডারের কর্মকর্তা হলো
আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে সবার আগে। জাহিদ চাকরি পেলো আর ওর ফ্যামিলি মনে
করলো - এবার তাদের দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটবে, তাদের চিরদুঃখী মুখে হাসি
ফোটাবে জাহিদ। কিন্তু এই ভাবনা যে কি পরিমাণ অবাস্তব এবং হাস্যকর সেটা
বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই - একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়। সরকারী
চাকরিগুলোতে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের প্রারম্ভিক বেতন কত জানিস? নতুন
বেতন স্কেলে বেসিক ৪৩০০ টাকা; ৪৫% বাড়িভাড়া আর নাম-মাত্র চিকিৎসাভাতাসহ
টেনে-টুনে মোট সাড়ে ছয় হাজারের মতো। একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার - নামেই
যার স্ট্যাটাসটা নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে - পক্ষে কিভাবে এই সামান্য টাকায়
চলা সম্ভব? সরকারী যেসব সুযোগ-সুবিধার কথা ভেবে লোকজন এইসব চাকরিতে যায় -
এই যেমন সরকারী কোয়ার্টার, কি গাড়ি, এগুলো তো অনেক পরের ব্যাপার। একমাত্র
জব সিকিউরিটি আর বৃদ্ধ বয়সে আরাম-আয়েশ ছাড়া সরকারী চাকরি একটা বাজে
ব্যাপার। ওই বেতনস্কেলে কারো পক্ষে সৎ জীবনযাপন করা অসম্ভব কিংবা অন্যভাবে
বলা যায় এই দুর্মূল্যের বাজারে এই হাস্যকর বেতনস্কেল একজন সরকারী
চাকরিজীবীকে অসৎ হতে বাধ্য করে। জাহিদ তো আর আমার মতো সৌভাগ্যবান নয় -
আমাদের তবু ঢাকায় একটা মাথা গোজার ঠাঁই আছে - ওর তা-ও নেই। ওদের
ফ্যামিলিটাও বড়। ওরা পাঁচ ভাইবোন, মা-বাবা, কাজের মানুষ। ফলে ‘প্রথম
শ্রেণীর কর্মকর্তা’র জন্য শোভনীয় সর্বনিম্ন স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে
তিন/চাররুমের একটা বাসা ভাড়া করলেও তো ৫ হাজার টাকা চলে যায়। তারপর আছে
খাওয়া-দাওয়ার খরচ, ওর ব্যক্তিগত খরচ, ছোট ভাইবোনদের ছোটখাটো শখ-আহ্লাদ
ইত্যাদি ইত্যাদি। বুঝতেই পারছিস ও কিরকম গ্যাড়াকলে পড়ে গ্যালো! ও আবার
তথাকথিত সততার পক্ষে। এই সততা বজায় রাখতে গিয়ে, একই সঙ্গে ফ্যামিলির বিপুল
চাহিদা মেটাতে গিয়ে ওকে অনিবার্যভাবে একটি বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে নিতে হয় -
টিউশনি। আর একজন শিক্ষিত মানুষ যদি জীবনে গ্লানি সঞ্চয় করতে চায় তাহলে তার
জন্য টিউশনিই যথেষ্ট। বাঙালি মধ্যবিত্ত-ন্বিবিত্ত শিক্ষিত তরুণদের জীবনে
এমন ভয়ংকর গ্লানিকর বিষয় আর নেই। প্রাইভেট টিউটরদের চেয়ে গৃহভৃত্যরা অনেক
মর্যাদাসম্পন্ন জীবনযাপন করে। তো এরকম একটি জটিল পরিস্থিতিতে, একটু গুছিয়ে
নেয়ার আগেই জাহিদ বিয়ে করতে বাধ্য হলো। আমি বলছি বাধ্য হলো। তুই তো জানিস,
যুঁথী ওদের ফ্যামেলিতে ওর অ্যাফেয়ারের কথা জানিয়ে কেমন ভেজাল লাগিয়ে
দিয়েছিলো। ও সমৃদ্ধ ফ্যামেলির মেয়ে - তারা কেন জাহিদের মতো হতদরিদ্র একটি
ছেলেকে মেনে নেবে? কিন্তু সেই জাহিদই যখন একটা ভালো চাকরি পেলো, তারাই
চাপাচাপি করতে লাগলো - যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা সেরে ফেলতে। জাহিদ তো তখন
বিয়ের বাজারে মোস্ট ভ্যালুয়েবল পাত্র, বলা তো যায়না - যদি হাত ফসকে বেরিয়ে
যায়! পত্র-পত্রিকাগুলো লিখেছে, জাহিদ নাকি যৌতুকের জন্য যুঁথীকে নির্যাতন
করতো! এটা একেবারে ডাহা মিথ্যে। জাহিদ নীতিগতভাবেই যৌতুকের বিরুদ্ধে; এমনকি
বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে দেয়া ফার্নিচারগুলো নিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো
ও। ব্যাপারটা অশোভন দেখায় বলে বন্ধুদের অনুরোধে ও জিনিসগুলো ফিরিয়ে দেয়নি।
পত্রিকার রিপোর্টের সঙ্গে বরং বাস্তবতার বৈপরীত্ব আছে। যুঁথীর ফ্যামিলি
থেকেই বরং ওকে - তুমি এত কষ্ট করছো কেন, চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা কর,
টাকা-পয়সার কথা তোমাকে চিন্তা করতে হবে না - বলে ক্রমাগত জ্বালিয়েছে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের আদর্শবাদী ছেলেদের আর কিছু না থাক, আত্ন্বসম্মানবোধ খুব
প্রবল হয় - জাহিদেরও তা-ই ছিলো - সুতরাং শ্বশুরপক্ষ থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা
করার কথা ও ভাবতেই পারতোনা। তো বিয়ের পর একদিকে শ্বশুর-পক্ষের ‘উন্নত
জীবনের’ জন্য এই ক্রমবর্ধমান চাপ, আরেকদিকে নিজের পরিবারের
আশা-আকাঙ্ক্ষা-প্রত্যাশা, প্রিয়তম মা-বাবা-ভাইবোনের বেদনার্ত ক্লান্ত মুখ;
অন্যদিকে যুঁথীর ক্রমাগত ঘ্যানঘ্যান - কোনোভাবেই সে এই পরিবারের সঙ্গে
মানিয়ে নিতে পারছেনা - অতএব, তুমি আলাদা বাসা নাও, আলাদা বাসা নাও - বলে
বলে জাহিদকে ত্যক্তবিরক্ত করে তোলা। সব মিলিয়ে ও এক ভয়াবহ দুঃসময়ের ভেতর
দিয়ে যাচ্ছিলো। একজন মানুষকে একটি দিনের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে দেখলেই
তুই বুঝতে পারবি - তার জীবনটা কেমন! সকালে উঠেই অফিস; আর চাকরি মানেই তো
বিরক্তকর, দুঃসহ, গ্লানিময় সব বিষয়-আশয়ের বিপুল সম্বন্নয় - এই সব কিছু
পেরিয়ে, অফিস থেকে বেরিয়েই টিউশনি - পরপর দুটো - তারমানে আরো দুটো গ্লানিময়
জগতে প্রবেশ। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দশটা। সেখানে অপেক্ষারত সেই
অন্ধকারাচ্ছন্ন , অনিশ্চয়তায় ভোগা প্রিয় মুখগুলো। খাওয়ার টেবিলে দরিদ্র
আয়োজন। মুখ বুজে তাই-ই খেয়ে নেয়া। আগে এসবকিছুর মধ্যেও যে হাসিআনন্দটুকু
ছিলো - ফুর্তিবাজ বড় ভাইকে পেয়ে ছোট ভাইবোনগুলো মেতে উঠতো
হাসি-ঠাট্টা-দুষ্টুমি-আহ্লাদে - যুঁথী আসার পর তাতেও ভাটার টান পড়েছে। কারণ
এই সময় তার মুখ সাধারণত অন্ধকার থাকে, তার মানে ঝড়ের পূর্বাভাস; আর সবাই তা
টের পেয়ে গেছে। ফুর্তিবাজ ভাই-ও তাই চুপচাপ, গম্ভীর, ফলে - ভাবীকে পেয়ে
ভাইয়া বদলে গেছে - এই অভিযোগও অনিবার্য। অর্থাৎ সারাদিন পরে ঘরে ফিরেও
দু-দণ্ড শান্তির অবকাশ নেই, আছে যুঁথীর অনন্ত অভিযোগ - সারাদিন তাকে কে কী
বলেছে, কেন আর এই বাসায় এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব নয় - ইত্যাদি। জাহিদের
অবস্থাটা ভেবে দ্যাখ। সে যেন কোনো মানুষই নয়। তার কথা ভাবার মতো কেউ নেই -
আছে কেবল অনন্ত অভিযোগ। একদিকে সে তার পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ - এই দায়
চাপিয়ে দেয়া নয় - সে নিজেই সেটা বোধ করে। চাপানো দায় সহজে অস্বীকার করা
যায়, কিন্তু ভালোবাসার দায়? এটা সে অস্বীকার করবে কিভাবে? অন্যদিকে যুঁথীকে
কোনোভাবেই মানানো যাচ্ছে না। তাদের নতুন জীবন, অথচ সেখানে কোনো
স্বপ্ন-কল্পনা নেই, রোমান্টিকতা নেই, আছে কেবলই অভিযোগ, মনোমালিন্য,
ক্লান্তি, বিরক্তি, ঝগড়া-ঝাঁটি। এমন একটি সময়ে আবার যুঁথী গর্ভবতী হলো আর
ওর মোক্ষম অস্ত্র - না খেয়ে থাকাটা বেড়ে গ্যালো। অসহায় জাহিদের মিনতি আকুতি
কোনোকিছুই যুঁথীকে তার আপোসহীন অবস্থান থেকে এতটুকু সরাতে পারলো না।
যুঁথী খুন হলো এমন একটা জটিল পরিস্থিতিতে পড়েই। একদিন ঝগড়াঝাঁটির পর যুঁথী
না খেয়ে থাকতে শুরু করলো। আপোসটা বরাবর জাহিদের পক্ষ থেকেই হতো, এবারও তাই
হলো; অনেক মিনতি সত্ত্বেও দেড়দিন না খেয়ে রইলো যুঁথী। ঝগড়াটা শুরু হয়েছিলো
জাহিদের মা’কে নিয়ে, যুঁথী ওই মহিলাকে একেবারেই সহ্য করতে পারতো না। তো
দেড়দিন না খেয়ে থাকার পর আবারও কথা কাটাকাটি হয় জাহিদ আর যুঁথীর। এরই এক
পর্যায়ে যুঁথী - আমাকে খাওয়ানোর জন্য অত অস্থির হচ্ছো কেন; তোমার মা’কে
খাওয়াওগে; ওই খানকি-মাগীই তো সব খেয়ে শেষ করলো - এরকম একটি স্পর্শকাতর
বাক্য বলে ফেললে জাহিদের গোঁয়ার-মার্কা রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। কিছু না
ভেবেই যুঁথীর গলা টিপে ধরলো ও, ধরেই থাকলো যতক্ষণ পর্যন্ত না টের পেলো -
যুঁথী নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। টের পাওয়ার পর আত্ন্বরক্ষার স্বাভাবিক রিফ্লেকশনে
ও তৎক্ষনাত সিদ্ধান্ত নিলো এটাকে আত্ন্বহত্যা বলে চালাতে হবে। অতঃপর ভাইদের
সাহায্য নিয়ে যুঁথীকে ঝুলিয়ে দিলো সিলিং থেকে। কিন্তু মাথা গরম থাকলে এসব
কাজ নিখুঁতভাবে করা যায় না - ফলে ওকে ধরা পড়তে হলো।’
দাদা অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছিলো -একটু ফাঁক পেতেই জিজ্ঞেস করলাম -
খুনের ব্যাপারটা তুই জানলি কিভাবে?
জাহিদের সঙ্গে দেখা করেছি আমি। আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলোনা ও খুন করতে
পারে। কিন্তু ও নিজেই স্বীকার করেছে। কোর্টেও স্বীকারোক্তি দিয়েছে, অনুতপ্ত
হয়ে নিজেই নিজের বিচার প্রার্থনা করেছে - সে তো খবরের কাগজেই পড়েছিস।
প্রশ্ন হচ্ছে জাহিদ আমার কাছে যা বলেছে তা সত্যি কিনা! আমি তা জানি না, তবে
আমি ওর কথা বিশ্বাস করেছি। কারণ ও ওর অপরাধ স্বীকার করেছে, নিজের শাস্তি
কামনা করেছে, এমনকি কারো কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ও কোনোরকম ফেবার আশা করেনি।
ও নিশ্চয়ই এমনটি আশা করেনি যে, আমি ওর পক্ষে গল্প লিখে কি প্রবন্ধ লিখে
প্রকৃত বিষয়টি তুলে আনবো! তাহলে আমার কাছে কেনইবা ও মিথ্যে বলবে! আর তাছাড়া
ওদের বিবাহিত জীবনের দুঃসহ বিপর্যয়ের কথা আমি অনেক আগে থেকেই জানতাম, নতুন
করে জেনেছি শুধু যুঁথীর খুন হওয়ার ঘটনাটি। আমাকে বলার সময় ও কাঁদছিলো -
‘আমি ওকে মেরে ফেলতে চাইনি। মাকে গালাগালি করেছিলো বলে মাথাটা এত গরম হয়ে
গ্যালো! জানিস, আমি টেরই পাইনি - ও যে কখন মরে গেছে। শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত
আমি ওকে অকথ্য গালিগালাজ করছিলাম; মাকে গালি দেয়ার প্রতিশোধ হিসেবে; আমার
বকাবাজি শুনতে শুনতে ও মরে গ্যালো - ভাবলে খুব কষ্ট লাগেরে হাসিব। নিজের
ওপর ভয়ংকর রাগ হয়, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই মুখে আমি কখনো ভালোবাসার কথা
বলেছিলাম।’ তো এইরকম অনুভূতিপ্রবন একজন যুবক; ওকে আমি এভাবেই চিনি;
ঘটনাক্রমে হয়ে গ্যালো ভিলেন। ব্যাপারটা দুঃখজনক। এদিক থেকে দেখতে গেলে
জাহিদ এক ট্র্যাজিক চরিত্র কারণ সবার প্রতি যার অপরিমেয় ভালোবাসা আর
দায়িত্ববোধ, তাকেই মরতে হবে বহু মানুষের ঘৃণা নিয়ে।
জাহিদের এই করুণ ও মর্মান্তিক পরিণতি নিয়ে নানাভাবেই একটা বা একাধিক গল্প
তৈরী হতে পারে। নিছক ঘটনাটির যথার্থ বর্ণনাই একটি গল্প হয়ে উঠতে পারে;
কিন্তু আমি স্রেফ ঘটনার বর্ণনাকারী হতে চাইনা। আমি চেয়েছিলাম সত্য আবিষ্কার
করতে, ঘটনার ওপর ভিন্ন কোণ থেকে আলো ফেলতে। কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখলাম -
সেখানে রয়েছে বহুবিধ দ্বন্দ্ব; পক্ষ-বিপক্ষ; সত্যের আপেক্ষিকতা। একদিক
বিবেচনা করলে জাহিদের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে যেতে হয়
বিপক্ষে। একটু খুলে বলি। দ্যাখ, একজন মানুষ তো আর খুনি হয়ে জন্মায় না। খুন
হচ্ছে একটা এ্যাকসিডেন্ট। এমনকি পেশাদার একজন খুনির ক্ষেত্রেও তার প্রথম
খুনের ঘটনাটা একটা এ্যাকসিডেন্টই। ঘটনাক্রমে সে জড়িয়ে পড়ে, তারপর
আত্ন্বরক্ষার স্বাভাবিক তাগিদে প্রভাবশালী কারো আশ্রয় নেয় আর সেই আশ্রয়দাতা
তার এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে তাকে দিয়ে নিজের ¯স্বার্থসিদ্ধির জন্য দ্বিতীয়
খুনটি করায় এবং একইভাবে দুটো খুনের দায় থেকে বাঁচার জন্য তৃতীয় একটি খুন।
পেশাদারদের জন্ম তো এভাবেই; তারা একটি চক্রে আটকা পড়ে যায়, নিজে খুন হওয়ার
আগ পর্যন্ত সেখান থেকে বেরোতে পারেনা। তো সেক্ষেত্রে তার এই পেশাদার হয়ে
ওঠার জন্য দায়ী কে? হয়তো এজন্য তাকে খানিকটা দায়ী করা যায় কিন্তু পুরোপুরি
নয়। অনেকখানি দায়-দায়িত্ব এই সমাজকাঠামোরও যা তাকে পেশাদার খুনিতে
রূপান্তরিত করেছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে কিন্তু তার পক্ষেই দাঁড়াতে হয়। আর
জাহিদের ব্যাপারটি তো আরো অন্যরকম। এটা সম্পূর্ণভাবে একটা দুর্ঘটনা, কারণ
খুন করার আগ পর্যন্ত এ সংক্রান্ত কোনো পরিকল্পনা ওর ছিলোনা। আর সেজন্যই ওর
পক্ষে দাঁড়াতে কোন নৈতিক বাধা নেই। এটি গ্যালো একদিক। অন্যদিকে, যতকিছুই
ঘটুক না কেন নীতিগতভাবে একটি খুনের ঘটনাকে সমর্থন করা যায় না। যাপন করার
জন্য প্রত্যেকটি মানুষ একটিমাত্র জীবন পায় - সেই জীবন একান্তভাবেই তার
নিজের। অন্য কারো অধিকার নেই সেই জীবনকে স্তব্ধ করে দেয়ার। যদি কেউ তা দেয়
তাহলে তার যথার্থ বিচার হওয়া উচিৎ। সেই অর্থে জাহিদের শাস্তি হওয়াটা
সমর্থনযোগ্য। তাছাড়া জনমত এখন জাহিদের বিরুদ্ধে। আপামর জনগণ বেশিরভাগ
ক্ষেত্রেই অনেক কিছুই না বুঝে, না জেনে, যে কোনো একটি ঘটনার একটি পক্ষ বেছে
নেয়। এই পক্ষ-বিপক্ষ তখন এতোটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, এটা রীতিমত তাদের ইমোশনে
পরিণত হয়। এই ইমোশনের বিপক্ষে কথা বলাটাই রিস্কি। যেমন, এই ঘটনায় তারা
জাহিদের বিপক্ষে গেছে; জাহিদ আসলে কোনো ফ্যাক্টর নয়; ওকে তো সবাই আর
ব্যক্তিগতভাবে চেনে না - তারা মূলত একটি হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকারীর বিপক্ষে
গেছে। এই বিপক্ষে যাওয়াটা সুস্থ সমাজের পক্ষে ইতিবাচক। প্রশ্ন হচ্ছে, একজন
লেখক হিসেবে আমি কোন পক্ষে যাবো? সত্য দু-পক্ষের জন্যই আপেক্ষিকভাবে সমান
গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। এর যে কোনো একটিকে বেছে নেয়া তো আসলে খন্ডিত সত্য বা
সত্যের একাংশকে মেনে নেয়া। সমস্যা এখানেই শেষ হচ্ছে না। আরো আছে। জাহিদের
অপরাধটা শাস্তিযোগ্য নিঃসন্দেহে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে একজন মানুষকে
পুরোপুরি নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরার জন্য সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে,
কল্পনার রং মিশিয়ে, মনের আনন্দে সংবাদপত্রগুলো যা করলো তা করার অধিকার
তাদের আছে কীনা! এ বিষয়ে আইন-আদালত কি বলে? কিছুই বলে না বরং তারাও এই
প্রচারণায় প্রভাবিত হয়। নইলে নিম্ন-আদালত জাহিদের সঙ্গে তার
মা-বাবা-বোন-ভাইদেরও এমন কঠিন শাস্তি দিত না। উচ্চ আদালতও তাদের শাস্তি
মওকুফ করেনি - কেবল শিথিল করেছে। তাদের অপরাধ কি? যুঁথীর হত্যাকান্ডকে
আত্ন্বহত্যা বলে চালানোর প্রচেষ্টায় সহায়তা করা! বলা হচ্ছে তারাও যুঁথীকে
নানা ভাবে নির্যাতন করতো । ঘটনা কি আসলে তাই? পরিবারের প্রতি জাহিদের
দায়বদ্ধতা বা দায়িত্ববোধ যুঁথী কোনোদিন মেনে নিতে পারেনি; ভাবতো তাদের
জন্যই ওর অধিকার খর্ব হচ্ছে - সে তার প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা-সুখ-শান্তি লাভে
ব্যর্থ হচ্ছে। প্রশ্ন হলো এর জন্য কিভাবে ঐ সদস্যদের দায়ী করা চলে? জাহিদের
প্রতি নির্ভরশীলতা কি তাদের অপরাধ? আদালত তাদের শাস্তি দিয়ে কি প্রকারান্তে
একথাই বোঝাতে চায় যে, যৌথ মধ্যবিত্ত পরিবারের এই স্বাভাবিক নির্ভরশীলতার
ব্যাপারটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ? জাহিদের ঘটনাটি জনমনে প্রবল প্রতিক্রিয়ার
সৃষ্টি করেছে এবং দাবি উঠেছে তাকে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দেয়ার, যেন
ভবিষ্যতে কেউ আর এমনটি ঘটানোর সাহস না পায়। এই ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ’
বলতে কি বোঝায়? মৃত্যুদণ্ড? নাকি মধ্যযুগীয় কায়দায় প্রকাশ্য শাস্তি? আর
সেরকম শাস্তি দিলেই যে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর ঘটবে না সে নিশ্চয়তা কে
দিচ্ছে? স্বামী কতৃক স্ত্রী হত্যার ঘটনা এদেশে এই প্রথম নয়; আগেও বহুবার
ঘটেছে; প্রতিবারই ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’র দাবি উঠেছে এবং তা দেয়াও হয়েছে।
তবু কেন আবার ঘটনাটি ঘটে? এর কারণ অনুসন্ধান কি কখনো করা হয়েছে? এরকম কোনো
ঘটনা ঘটলে সংবাদপত্রগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে - একচক্ষু বিশ্লেষণে অপরাধীকে ভিলেন
করে তোলে। এর আগে আমি বিষয়টি কখনো ভেবে দেখিনি - কিন্তু এবার জাহিদ আমার
বন্ধু বলেই আর অনেক কিছু জানি বলেই বুঝতে পারছি সংবাদপত্রের এই ভূমিকা
একপেশে। ভেতরের ঘটনা তাই অনুদঘাটিত রয়ে যায় যেমন রয়েছে জাহিদের ব্যাপারটিও।
কেউ জানলো না, কোন প্রেক্ষাপটে যুঁথী খুন হলো! এমনকি আমাদের
বিচার-ব্যবস্থাও কখনো এ বিষয়ে মাথা ঘামায়নি। আদালত তার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে
কখনও বলবে না - ‘তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো কারণ সে অন্যের জীবনকে স্তব্ধ
করে দিয়েছে।’ বলবে না - ‘এর জন্য সে এককভাবে দায়ী নয়। তার প্রতি পরিবারের
নির্ভরশীলতা এবং তার নিজের দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ তাকে যুঁথীকে নিয়ে একটি
আলাদা সংসার গড়তে দেয়নি। আর এটা কোনো অপরাধ নয়। এ জন্য তাকে দায়ীও করা চলে
না। এর জন্য মূলত দায়ী তার পরিবারের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা; আর এই অসচ্ছলতার
জন্য দায়ী করা চলে দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে।’
আদালত এ-ও বলবে না - ‘প্রত্যেকটি মানুষকে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার নিশ্চয়তা দেয়া
রাষ্ট্রেরই কর্তব্য। যদি সেটা সম্ভব নাও হয় তাহলে অন্তত প্রতিটি পরিবারের
শিশু-কিশোর-কিশোরী-তরুণ-তরুণীকে যৌথ পরিবারে থেকে একতাবদ্ধ জীবন-যাপন করার
মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়া হোক। অন্যের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হবার মানবিক শিক্ষায়
শিক্ষিত করা হোক।’ বলবে না - ‘ যুঁথী জাহিদের মায়ের ব্যাপারে অশ্লীল,
অসংলগ্ন, আপত্তিকর, স্পর্শকাতর মন্তব্য করে ভুল করেছে। দেশের প্রত্যেকটি
মানুষকে অন্যের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা
যাচ্ছে।’ - এসব তারা বলবে কিভাবে; আবিস্কারই তো করতে পারে না। আদালত
সম্বন্ধে এসব কথা প্রকাশ্যে বলা যাবে না - বললে আদালত অবমাননার দায়ে
অভিযুক্ত হতে হবে। এ এক অদ্ভুত ব্যবস্থা। যেন তাদের কোন ভুল-ত্রুটি হতে
পারে না, হলেও সেটা বলা যাবে না - চুপ করে থাকতে হবে। এদিক থেকে দেখতে গেলে
আদালত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মৌলবাদী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তবু এর একটি
ইতিবাচক দিক আছে, আর সেটি হচ্ছে - এর প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস। এই
আস্থা কিংবা বিশ্বাস ভয়-ভীতি থেকে নয়, শ্রদ্ধা থেকে উদ্ভুত। একটি দেশ বা
রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে প্রধানত তিনটি প্রতিষ্ঠানের ওপর পা রেখে। সরকার ও তার
প্রশাসন, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বিচার ব্যবস্থা। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের ওপর
মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস যত বাড়বে সেই দেশ ততই উন্নত করবে - এবং এর
উল্টোটাও সত্যি। আমাদের দুর্ভাগ্য - এ দেশের মানুষ সরকার ও তার প্রশাসনের
ওপর থেকে পুরোপুরি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। সরকার যে অন্তত দেশের
দরিদ্র-পীড়িত-নির্যাতিত জনগনের সঙ্গে নেই সেটা তারা পরিস্কার বোঝে।
লুট-পাট, অস্ত্রবাজী, হত্যা, সন্ত্রাস, ও দখলের রাজনীতিতে পটু এইসব
রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলে এরকমই হবার কথা। একইভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও আস্থা ও বিশ্বাস রাখা যাচ্ছে না। নকল,
সন্ত্রাস, ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি, ভার্সিটিগুলোতে খুন-ধর্ষণ কিংবা যৌন
নিপীড়নের ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবমূর্তি ধ্বসিয়ে দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত
মানুষ বিশ্বাস করে ঐ বিচার ব্যবস্থাকেই। তারা এখনো মনে করে, আদালতের কাছে
বিচার চাইলে সে সঠিক বিচার করবে। যদিও আদালত এইসব ইমোশনের তোয়াক্কা করে না
- করলে তো আর কোটি কোটি মানুষের ইমোশনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে গোলাম আযমকে
নাগরিকত্ব দেয়া হতো না - এবং সব সময় সঠিক বিচারও করে না তবু এই আস্থা ও
বিশ্বাস ইতিবাচক। মানুষের অন্তত একটি দাঁড়ানোর জায়গা থাকা উচিৎ। আর এখানেই
আমার সমস্যা। আমার লেখার কোনো প্রভাব যদি আধুনিক সমাজে পড়ে - সব লেখকই তো
সেটা প্রত্যাশা করেন - আর যদি আমি তাদের ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেই, তাহলে জনগণ
অত সুক্ষ বিচারে না গিয়ে ভাবা শুরু করবে আদালত ভুল করেছে। তারা বুঝতেই
চাইবে না - জাহিদের শাস্তি হওয়ায় আমি ক্ষুব্ধ নই, আমি কেবল আদালতের কতগুলো
অপূর্ণতার কথা বলতে চেয়েছি।
এসবকিছুর পরও আরেকটি প্রধান কারণ রয়ে যায় - যার জন্য এই গল্পটি লেখা হবে না
আমার । সমগ্র বিষয়টি তুলে আনলে যে কোনো পাঠকেরই জাহিদের প্রতি এক ধরণের
সহানুভূতি তৈরী হবে। কারো জন্য সহানুভূতি সৃষ্টির জলো উদ্দেশ্যে আমি গল্প
লিখতে পারি না। আর কেনইবা আমি ওর জন্য সহানুভূতি তৈরী করতে যাবো? ও তো
সত্যিই খুনটা করেছে। ওদের অ্যাডজাস্ট হচ্ছিলো না তাহলে এর সহজ সমাধানই তো
ছিলো । বোঝাপড়া না হলে, আলোচনা করেই ওরা দুজন ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে
পারতো। খুনের মতো চূড়ান্ত পর্যায়ে তো যাওয়ার দরকারই ছিলোনা। জীবন যে কোনো
সময়েই নতুন করে শুরু করা যায়; ওদের ডিভোর্স হলে আলাদাভাবেই ওরা নতুনভাবে
শুরু করতে পারতো। তা না করে ও একটি মেয়েকে হত্যা করেছে, নিজে ফাঁসিতে ঝুলতে
যাচ্ছে আর পুরো পরিবারকে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে । এই ধরণের মানুষের জন্য
সহানুভূতি সৃষ্টি হবে এমন কোনো গল্প আমি তাই লিখবো না, বুঝলি সুমী।’
কিন্তু প্রিয় পাঠক, দাদার এই দীর্ঘ ব্যাখ্যা শুনে আমি নিজেই যে জাহিদ
ভাইয়ের প্রতি ভীষণ সহানুভূতিপূর্ণ হয়ে উঠেছি, তা কি ও বুঝতে পারছে? |
| |
 |
|