OF WHAT IS SIGNIFICANT in one’s own
existence one is hardly aware,
and it certainly should not bother the other fellow.
What does a fish know about the water in which he swims all
his life?
— Albert Einstein / Out of my later years.
এই যে শুয়ে আছি _ হাসপাতালের শুভ্র বিছানায় _ খোলা জানালা দিয়ে
আকাশ দেখছি, আর আমার চারপাশে এখন কেউ নেই; এটা আমার জীবনের এক বড়
ধরনের, একমাত্রই বলা যায়, শখ পূরণের আনন্দ দিচ্ছে। সারা জীবনই আমার
শখ, সাধ, বা ইচ্ছে বলতে তেমন কিছু ছিলো না ; কিন্তু কেন-কখন-কিভাবে
জানি না, আমার ভেতরে এমন একটি অদ্ভুত সাধ জন্ম নিয়েছিলো যে, _ আমার
মৃতু্য যেন হয় হাসপাতালে। না, ওয়ার্ডের হৈ হল্লার মধ্যে নয় _
নিঃসঙ্গ কেবিনে। সেখানে বিছানায় ধবধবে সাদা চাদর বিছানো থাকবে,
দরজা-জানালার পর্দা হবে অফ-হোয়াইট (বা একটু ঘিয়ে রঙেরও হতে পারে),
আর জানালার পর্দা সরিয়ে দিলে আকাশ দেখা যাবে। এবং অবশ্যই আমার
চারপাশে তখন কেউ থাকবে না, নিঃসঙ্গ এই আমি নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়বো।
এখন অবাক হয়ে ভাবছি, আমার সেই সাধ সত্যি সত্যি পূরণ হতে চলেছে।
যদিও মরিনি এখনো, কিন্তু আমার কল্পনার সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়ার মতো
এই হাসপাতালের কেবিন, সেইরকম ধবধবে শুভ্র বিছানা, অফহোয়াইট পর্দা,
আর জানালা দিয়ে আকাশ দেখা _ এর আগেও তো আমি কয়েকবার হাসপাতালে
এসেছি, কই এমন হুবহু মেলে নি তো কখনো ! এখন মিলে যাচ্ছে _ কল্পনার
হিসেব এইভাবে মিলে গেলে কার না ভালো লাগে ? আমারও লাগছে ; বিশেষ
করে, যে জীবন আমি কাটিয়ে এলাম কোনো হিসেব না মিলিয়েই, কোনো সাধ
আহ্লাদের তোয়াক্কা না করেই, সেখানে মৃতু্য মুহূর্তের সাধ পূরণ হওয়া
কি কম কথা ?
কিন্তু কেনই বা বারবার মৃতু্যর কথা ভাবছি আমি ? খুব শিগগীরই যে
মারা যাবো কিংবা এবার আর হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরা হবেনা এমন কি
কথা আছে ? না, তা নেই। ডাক্তাররা স্পষ্ট করে কিছুই বলেন নি আমাকে,
কিন্তু, তবু আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে, আমি আর বেশিদিন নেই।
আত্নীয়-স্বজনদের বিরামহীন আনাগোনা, আর তাদের হাবভাবই বলে দিচ্ছে _
আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। আমার ধারণা, ডাক্তাররা আমাকে কিছু না
বললেও নিশ্চয়ই আত্নীয়-স্বজনদের সেরকমই ইঙ্গিত দিয়েছেন _ তাই তো এমন
দেখতে আসার ধুম। একমাত্র শেষবারের মতো দেখার জন্যই এমন ধুম পড়ে
যেতে পারে। আত্নীয়-স্বজনদের সঙ্গে কোনোদিনই কোনোরকম সম্পর্ক ছিলো
না আমার, বড় হয়ে ওঠার পর আমার দু\'বোনের বাসা ছাড়া আর কোথাও গিয়েছি
বলেও মনে পড়ে না ; অথচ আমাকে দেখতে আসছেন এমন সব লোকজন যাদের
অনেককেই আমি ভালো ভাবে চিনিও না, বোনরা বলে না দিলে স্মৃতি হাতড়ে
সম্পর্ক উদ্ধার করা আমার জন্য রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ব্যাপারটা
একই সঙ্গে আমাকে অভিভূত ও বিরক্ত করে তুলছে। বিরক্ত, কারণ, জীবনের
শেষ মূল্যবান মুহূর্তগুলো এদের সঙ্গে সৌজন্য দেখাতে দেখাতেই
ফুরিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অভিভূতও, কারণ, যাদের সঙ্গে আমি ইচ্ছে
করেই কোনো সম্পর্ক রাখি নি, বিয়ে-জন্মদিন-এমনকি মৃতু্যর মতো
সামাজিক অনুষ্ঠান-আয়োজনেও যাদের কাছে যাই নি কখনো, তারাও ছুটে
আসছেন, পাশে বসছেন, গভীর মমতা নিয়ে কথা বলছেন। আচ্ছা, মানুষ এতো
সামাজিক হয় কিভাবে ? আমি তো পারলাম না ! সারা জীবন সবার কাছ থেকে,
সবকিছু থেকে দূরে সরে রইলাম, বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলাম, আর নিঃসঙ্গতার
পুজো করলাম।
তো, এই যে চেনা-অচেনা আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের এতো অনাগোনা,
এ কি খামোখা ? এর আগেও তো আমি অসুস্থ হয়েছি, কই তখন তো এতোটা দেখি
নি ! এরা কি তবে আমার নিশ্চিত মৃতু্যর কথা জেনেই শেষবারের মতো
দেখতে আসছেন আমাকে ? আমার সেরকমই সন্দেহ। কিন্তু একটা ব্যাপার
কিছুতেই বুঝতে পারছি না _ আমি মরে যাচ্ছি, এই সংবাদেই বা এতো
বিচলিত হওয়ার কি হলো ? আমি কোনো বিখ্যাত মানুষ নই, সামাজিক জীবনেও
অসফল _ প্রায় ব্যর্থই বলা চলে _ সফল কিংবা বিখ্যাত মানুষদের অনেক
দূর-দূরান্তের আত্নীয়-স্বজন থাকে _ অমুক আমার এই হয়, এই পরিচয় দেয়া
যায় যে ! আমার তো তেমন কোনো খ্যাতি নেই, সাফল্যও নেই, বরং সবার
মধ্যে ভীষন রকম বেমানান, খাপছাড়া এক মানুষ আমি। কেউ কখনো পাশে পায়
নি আমাকে _ না পরিবার-পরিজন, না আত্নীয়-স্বজন, না বন্ধু-সহকর্মী।
এই যে আমাকে ভীড় করে দেখতে আসা _ এটাই অবশ্য আমার সন্দেহের একমাত্র
কারণ নয়, আরো একটি গভীর কারণ আছে। এই করুণ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে
আমার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা একসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে। শুনেছি,
মৃতু্যর আগে আগে মানুষের চোখের সামনে তার সমগ্র জীবনটাই উপস্থিত
হয়, যেমনটি আমারও হচ্ছে। কতো তুচ্ছ সব ঘটনা _ যা এতোদিন বিস্মৃতির
আড়ালে পড়ে প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিলো _ কতো সামান্য সব বিষয়ও এসে
আমার চোখের সামনে দাঁড়াচ্ছে, যে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি। দু\'য়েকটা
উদাহরণ দিই।
ছোটোবেলায়, আমার বয়স তখন ৭/৮ বছর, আব্বা কোরবানী দেবেন বলে ঈদের
৪/৫ দিন আগেই একটা খাসি কিনে এনেছিলেন, যেন শেষ মুহূর্তে কেনার
ঝক্কি পোহাতে না হয়। দু'দিনেই খাসিটার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে
গেলো। কতো কথা ওটার সঙ্গে, কতো গল্প ! একতরফা কথাবার্তা, বলাই
বাহুল্য, কিন্তু আমার মনে হতো _ ও যেন আমার কথা বুঝতে পারছে।
অন্যান্য বাসা থেকে যেমন একই উদ্দেশ্যে কিনে আনা ছাগলদের অসহিষ্ণু
ডাক শোনা যেতো, ওটা তেমন বিরক্ত করতো না। কিন্তু এই বন্ধুত্ব যে
দু'দিনেই সাঙ্গ করতে হবে, তা বোঝার মতো বয়স আমার ছিলো না।
আব্বা-আম্মা সম্ভবত আমার মাতামাতি দেখে শংকিত হয়ে পড়েছিলেন, হয়তো
সেজন্যই ঈদের আগের রাতে আমাকে বললেন,
'ওটাকে কিন্তু কালকে জবাই করা হবে। সকালে উঠে তুমি ওকে গোসল করিয়ে
দিয়ো।'
'কেন, জবাই করা হবে কেন?'
'সেটাই নিয়ম, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানী দিতে হয়।'
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকে মোটেই
পাত্তা না দিয়ে আমি মর্জি শুরু করলাম, ওকে আমি কিছুতেই মারতে দেবো
না সেটাও ঘোষনা করলাম। আব্বা তখন নরম সুরে আমাকে বোঝাতে বসলেন _ '
শোনো বাবা, কোরবানীর পশুরা বেহেশতে যায়, তুমি যখন বেহেশতে যাবে,
তখন ওর সঙ্গে তোমার দেখা হবে, ও তোমাকে পিঠে নিয়ে বেড়াবে, সেটা কতো
ভালো হবে না ?'
কিন্তু্তু বেহেশত, কোরবানী, আল্লাহর সন্তুষ্টি এইসব ধোঁয়াটে
ব্যাপারে আমার মন গললো না, ঈদের দিন সকালে আমি ওটার গলা জড়িয়ে ধরে
বসে রইলাম। ঈদের দিন, যেখানে আমার সমবয়সী বাচ্চারা সবাই নতুন
কাপড়চোপর পড়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে, সেখানে আমি ওসব কোনোদিকে
ভ্রুক্ষেপ না করে বসে আছি ছাগল নিয়ে, এমন কি আমার জন্য কেনা নতুন
জামা কাপড় পর্যন্ত পড়ি নি। আব্বা-আম্মা কতো বোঝালেন, কিন্তু আমি
নাছোড়বান্দার মতো বসেই রইলাম। তারপর দেখলাম আব্বা খানিকটা বিরক্ত
হয়েই বেরিয়ে গেলেন, আর ঘন্টা দ'ুয়েক পর কোত্থেকে একটা বাচ্চা ছাগল
নিয়ে এলেন। নিশ্চয়ই ওটা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিলো
তাঁকে, আর ঈদের সকালেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলায় বিরক্তও হয়েছিলেন
খুব, কিন্তু আমাকে সেটা এতোটুকু বুঝতে না দিয়ে বললেন,
'দ্যাখো, তোমার জন্য কতো সুন্দর একটা বাচ্চা ছাগল এনেছি, এটাকে
তুমি বড় করে তুলো, এখন ওটা দাও। ওটা কোরবানীর জন্য এনেছি তো,
কোরবানী না দিলে আল্লাহ গোনাহ দেবেন।'
আবার সেই ধোঁয়াটে ব্যাপার। কিন্তু গোনাহ যে খুব খারাপ একটা জিনিষ,
আব্বা-আম্মা অনেক আগেই সেই অনুভূতিটি আমার ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে
পেরেছিলেন। অতএব ওটাকে ছাড়তেই হলো, তাছাড়া নতুন একটা পেয়ে আমি আরও
খুশি। কী সুন্দর সাদাকালো রঙ, আর চোখ দু'টো কী মায়াময় ! কোরবানীর
খাসিটাকে দূরে নিয়ে গিয়ে জবাই করলেন আব্বা, নতুন একটা পেয়েছি, তবু
ওটার জন্য মনটা কাঁদতে লাগলো, আর সেই প্রথম মনে হলো _ কোরবানী একটা
নিষ্ঠুর ব্যাপার _ সারাজীবনেও এই ধারণা বদলায় নি আমার। কোরবানী
ছাড়াও যে প্রতিদিন হাজার হাজার পশু জবাই করা হচ্ছে, সেসবের মাংস
আমিও খাচ্ছি, এটা বুঝেও আমি কখনো কোরবানীর ব্যাপারটাকে মেনে নিতে
পারি নি।
তো, বাচ্চা খাসিটাকে মহা আনন্দে পালতে লাগলাম। ওটার সঙ্গেও সহজেই
বন্ধুত্ব জন্মে গেলো আমার। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে ওর নাম দিলাম
_ 'খোকন।' আব্বা ছিলেন সরকারী কর্মকর্তা, কলোনিতে বিরাট বাসা,
বাসার সামনে বড় মাঠ, ওটাকে বড় করে তুলতে তাই তেমন বেগ পেতে হলো না।
বাসার পেছনের দিকের বারান্দায় খোকনের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন
আব্বা। কিন্তু বাসার ভেতরেও ওর ছিলো অবাধ যাতায়াত। অচিরেই ও আমাদের
পরিবারেরই একজন হয়ে উঠলো যেন; আব্বা-আম্মা, বোনরাও ওকে আপন করে
নিলো। আর না নিয়ে উপায়ও ছিলো না। খুব আহ্লাদ শিখে গিয়েছিলো ও। যেমন
ছুটির দিন সকালে আব্বা যখন মহা আরাম করে পেপার পড়তেন, খোকন তখন
তাঁর দু'পায়ের মাঝখানে মাথা গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকতো আর আব্বাও ওর
মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতেন। আবার মা'র সঙ্গেও ছিলো ওর দারুণ ভাব।
রান্না ঘরে গিয়ে মা'র কাছে দাঁড়িয়ে থাকতো ও, মা আদর করে বলতেন,
'এখানে কি চাস, মাঠে গিয়ে খেলা কর, যা।' কিন্তু ও যেতো না, উল্টো
নতুন গজানো শিং দিয়ে মা'র পিঠে আস্তে আস্তে গুঁতো দিতো। বোনদের মনও
জয় করে নিয়েছিলো খোকন। বোনরা যখন পড়তে বসতো, বা সাজতে দাঁড়াতো
আয়নার সামনে, তখন ও গিয়ে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো
চুপচাপ। ওরা দুষ্টুমি করে বলতো, 'তুই তো ছেলেদের মতো দুষ্টু হয়েছিস
রে খোকন, শুধু মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকিস !' খোকন তখন ছেলেদের
মতো হওয়ার আনন্দে, অথবা অপমানেও হতে পারে, লাফ-ঝাঁপ শুরু করতো, আর
বোনরা হেসে কুটিপাটি হতো। আমার সঙ্গে তো ওর আহ্লাদের কোনো সীমাই
ছিলো না। আমি যখন স্কুলে যেতাম, ও আমার সঙ্গে সঙ্গে কলোনির গেট
পর্যন্ত আসতো, মা দাঁড়িয়ে থাকতেন বাসার দরজায়, আমি মাকে দেখিয়ে
খোকনকে বলতাম _ 'ওই যে মা দাঁড়িয়ে আছে, মা'র কাছে যাও, আমি স্কুল
থেকে এসে তোমাকে নিয়ে খেলতে যাবো।' ও আমার মুখের দিকে একটু তাকিয়ে
থেকে কি বুঝতো কে জানে, একছুটে মা'র কাছে গিয়ে দাঁড়াতো। স্কুল থেকে
ফিরলে কোত্থেকে যেন লাফাতে লাফাতে এসে হাজির হতো। পড়তে বসলে
টেবিলের নিচে গিয়ে আমার পায়ের কাছে বসে থাকতো, খেতে বসলে কাছে এসে
দাঁড়িয়ে থাকতো, নিজে গিয়ে আদর করে ওকে শুইয়ে দিয়ে না এলে ঘুমাতে
যেতে চাইতো না _ ঠিক যেন একটা মানবশিশু, এমনই আচরণ ছিলো ওর। বিকেলে
যখন মাঠে খেলতে যেতাম, তখন ও-ও যেতো সঙ্গে, আর এই নিয়ে বন্ধুরা
ক্ষেপাতোও খুব, বলতো _ 'ছাগলের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে তুইও ছাগল হয়ে
যাচ্ছিস। ওটাকে বেঁধে রেখে আসতে পারিস না !' বন্ধুদের ওইসব
টিটকারীতে অতিষ্ট হয়ে আমি খেলতে যাওয়াই বন্ধ করে দিলাম। খেলাধুলা
ছাড়া যায়, তাই বলে তো খোকনকে আর ছাড়া যায় না!
আমার এই ছাগলপ্রীতি আব্বা-আম্মা-বোনরা ছাড়া আর কেউ কখনো ভালো চোখে
দেখে নি। পরবর্তী জীবনেও যখন কোনো বন্ধু-বান্ধবী, এমন কি বিবাহিত
জীবনে স্ত্রীর কাছেও, খোকনের কথা বলতে গেছি, সবাই হাসতে হাসতে
অস্থির হয়ে গেছে। ছাগল ! একটা ছাগলের জন্য এতো ভালোবাসা ! কেউ কখনো
ভেবেই দেখে নি এই প্রাণীটি কী নিরীহ আর মায়াময় !
যাহোক, খোকনকে নিয়ে আমি ভালোই ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গ ছেড়ে, খেলাধুলা
ছেড়ে, কেবল ওকে নিয়েই আমার সময় বেশ কেটে যেতো। কিন্তু একদিন স্কুল
থেকে ফিরে ওকে আর দেখা গেলো না। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, দারোয়ান
কাকাকে জিজ্ঞেস করলাম, মালিকে জিজ্ঞেস করলাম, না, কেউই অনেকক্ষণ
ধরে খোকনকে দেখে নি। না খেয়ে, না কাপড় ছেড়ে আমি ওকে খুঁজতে
বেরুলাম, খোকন খোকন করে ডাকাডাকি করলাম _ ও এলো না। মা বললেন,
'নিশ্চয়ই আছে কোথাও, এসে পড়বে, তুই আগে খেয়ে নে।' কিন্তু মা'র কথায়
ভরসা পেলাম না। সারাদিন যেখানেই থাকুক, আমার ফেরার সময় হলেই তো ও
বাসায় চলে আসে ! তাহলে ? ও কি হারিয়ে গেছে ? সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলো,
তবু ওকে ফিরতে না দেখে আব্বা-আম্মাও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আব্বা,
দারোয়ান কাকা, মালি আর পিওন বিভিন্ন দিকে বেরিয়ে পড়লো খুঁজতে,
কিন্তু ওকে আর পাওয়া গেলো না। আমি ততোক্ষণে কাঁদতে শুরু করেছি। মনে
পড়ে, সেই রাতে আমি কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
খোকন আর ফিরে আসে নি।
কী যে ঘটেছিলো ওর ভাগ্যে, কে জানে ! নিশ্চয়ই কেউ চুরি করে নিয়ে
বেচে দিয়েছিলো !
খোকনের জন্য এরপরও আমি অনেকদিন কেঁদেছি, মনে মনে খুঁজেছি আর
অপেক্ষায় থেকেছি ওর ফিরে আসার। শুধু আমিই নই, বাসার অন্য সবাইও
কেমন মন-মরা হয়ে গিয়েছিলো। ও যেন নিছক একটি প্রাণীই ছিলো না, হয়ে
উঠেছিলো আমাদের পরিবারেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এমন কি মাকেও
আমি খোকনের কথা বলতে বলতে চোখ মুছতে দেখেছি। একদিন শুনেছি, মা
আব্বাকে বলছেন _ 'খোকাটা কেমন হয়ে গেছে দেখেছো ! শুধু মন খারাপ করে
চুপচাপ বসে থাকে। তুমি ওর জন্য আরেকটা ছাগল কিনে নিয়ে এসো।' উত্তরে
আব্বা বলেছিলেন _ 'না, খোকার মা। এটা করা ঠিক হবে না। আরেকটা কিনে
আনলে ওটাকেও ও একই রকম ভাবে ভালোবেসে ফেলবে। কিন্তু ওটাও তো একই
ভাবে হারিয়ে যেতে পারে। তখন খোকা আবার আরেকটা শোক পাবে। আর তাছাড়া
একটা ছাগল আর কতোদিনই বা বাঁচে, বলো ! খোকন হারিয়ে না গেলেও তো আর
বেশিদিন বাঁচতো না। বড়জোর ২/৩ বছর। কেমন বুড়িয়ে যাচ্ছিলো, দেখো নি?
খোকা যা শুরু করেছিলো, খোকন টা হঠাৎ মরে-টরে গেলে ওকে আর সামলানো
যেতো না। আমার তো চিন্তাই হতো মাঝে মাঝে। এই ঘটনার পূণরাবৃত্তি
ঘটানো ঠিক হবে না। তার চেয়ে ওকে এমনিতেই ভুলে যেতে দাও।'
আমি খোকনের শোক ভুলেছিলাম। সব শোকই একদিন ম্লান হয়ে যায়, সব
স্মৃতিই একদিন ধূসর হয়ে যায়। এমনকি প্রিয়জনের মৃতু্যর শোকও একদিন
মানুষ কাটিয়ে ওঠে। আমিও উঠেছিলাম। বড় হয়ে হয়তো হঠাৎ কখনো খোকনের
কথা মনে পড়তো আমার, মনটাও খারাপ হয়ে যেতো, কিন্তু সেই তীব্র কষ্টের
অনুভূতি টা আর হতো না। কিন্তু কালকে, এখানে শুয়ে, ওকে মনে পড়তেই
চোখ ভিজে গেলো জলে। আমি অস্ফূট স্বরে খোকন খোকন বলে ডাকতে লাগলাম
আর হু হু করে কাঁদতে লাগলাম।
এখন ভেবে অবাক লাগছে, এই এতোদিন পর _ ৩০/৩২ বছর তো হবেই _ খোকনের
কথা মনে করে আমার এমন কান্না পেলো কেন ? মনটা কি খুব দুর্বল হয়ে
গেছে আমার ? আমি তো কাঁদতে ভুলেই গিয়েছিলাম, এমন কি আব্বা-আম্মার
মৃতু্যর পরও আমি কাঁদি নি। এতোসব জমানো কান্না কি কালকে একসঙ্গে
বেরিয়ে এসেছিলো ?
খোকন হারিয়ে যাবার পর আমি ভীষন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলাম। বন্ধুদের
সঙ্গে খেলাধুলা তো আগেই বাদ দিয়েছিলাম, এবার কথাবার্তাও বন্ধ হলো;
কারণ আমাকে দেখলেই ওরা টিটকারি করতো _ 'কিরে ছাগল হারিয়ে তুই পাগল
হয়ে গেলি নাকি ?' খোকনকে নিয়ে এরকম টিটকারি সহ্য করা আমার পক্ষে
সম্ভব ছিলো না, ওদের সঙ্গ তাই ছাড়তেই হলো। আমার এই অবস্থা দেখে
আব্বা-আম্মা নিশ্চয়ই খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন ! আব্বা তাই একদিন
কয়েকটা গল্পের বই এনে দিয়ে বললেন _ 'এগুলো পড়ে দেখ, ভালো লাগবে।'
সত্যি তাই। বইগুলো পড়তে পড়তে যেন ভিন্ন একটি জগতের দেখা পেলাম আমি,
যা আমার চেনা নয়, আবার ঠিক অচেনাও নয়। বইগুলো দ্রুতই পড়া হয়ে
গিয়েছিলো আমার, আব্বা আবার কিছু বই এনে দিলেন। এভাবেই বইয়ের সঙ্গে
প্রেম জন্মালো আমার। খোকনের শোক থিতিয়ে আসতে লাগলো আস্তে আস্তে। বই
আমাকে যে নতুন পৃথিবীর সন্ধান দিয়েছিলো _ ওতেই ছিলো আমার আনন্দময়
পরিভ্রমণ। এমন কি বন্ধু-বান্ধবের প্রয়োজনীয়তাটাও রইলো না আর। তখন
কি আর জানতাম _ এ এক সর্বনাশা নেশা _ মানুষকে যা একা করে দেয়,
পরিপাশর্্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে!
একদিকে খোকনের হারিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে ক্লাসের বই ছাড়া অন্যান্য বই
পড়ার প্রতি এই হঠাৎ তীব্র ঝোঁকের কারণেই সেবার স্কুলের ফাইনাল
পরীক্ষা খারাপ হলো আমার। সেই প্রথমবারের মতো আমি ফার্স্ট হতে
পারলাম না। ব্যাপারটা আমার জন্য ছিলো অবিশ্বাস্য। আমি যে ফার্স্ট
ছাড়া অন্য কিছু হতে পারি, এটা কখনো ভেবেই দেখি নি, বরাবরের ফার্স্ট
বয়রা হয়তো তা ভাবেও না। বাসায় এসে কান্নাকাটি করলাম খুব,
আব্বা-আম্মা সান্ত্বনা দিলেন, আদর করে বোঝালেন _'একবার খারাপ করেছো
তো কি হয়েছে, এবার মন দিয়ে পড়াশোনা কর, দেখবে আবার ভালো করতে
পারবে।' আজ এসব কথা ভেবে আব্বা-আম্মার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে
উঠছে। আমার কোমল অনুভূতিগুলোর কী মূল্যই না তাঁরা দিতেন, কী
সযত্নেই না লালন করতেন আমার কৈশোরিক আবেগগুলো ! ততো, আমি আবার পুরোদমে পড়াশোনা শুরু করলাম। পজিশনটা একবারের জন্য
হাতছাড়া হতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমি সবসময় ফার্স্ট হতে চাই।
স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত, ওই একবার ছাড়া, আমি বরাবর
ফার্স্ট হয়েছি। এও এক নেশার মতো। অনেক পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম,
'ওই যে ফার্স্ট বয় যায়' _ এই বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক
প্রচ্ছন্ন, না প্রচ্ছন্ন নয় _ প্রকাশ্যই, গৌরব ; এবং সেই মেসেজ _
এই ছেলেটি সবার চেয়ে মেধাবী, তাই, সবার থেকে আলাদা। ফার্স্ট হওয়ার
নামে আসলে আমি সবসময় সবার থেকে আলাদা হতে চেয়েছি, আর আলাদা হওয়ার
জন্য আমার কাছে তখন ফার্স্ট হওয়া ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্রও ছিলো না।
বই পড়া আর আলাদা হওয়া, এই দুই নেশা পরবর্তীকালে আমার জীবনটাকে তছনছ
করে দিয়েছিলো।
ইউনিভার্সিটি থেকে বেরুতে না বেরুতে, যখন কিছুদিন বেকার জীবনযাপনের
কথা ভাবছি, তখনই ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করার সুযোগ এলো। আব্বার ইচ্ছে
ছিলো, মা-ও চেয়েছিলেন, আমি যেন বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকরিতে যাই,
কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, আব্বার চাকরিটা আমার ভালো লাগতো না,
ফলে ওই রকম একটি জীবনের মধ্যে পড়ে যাবার রিস্ক না নিয়ে
ইউনিভার্সিটিতেই জয়েন করলাম। আর তখনই আমি হয়ে গেলাম আর দশজনের মতো
সাধারণ একজন মানুষ। ভার্সিটির অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে আমার
পার্থক্যটা কোথায়, আমি আলাদা কোথায় _ এই চিন্তা আমাকে প্রায় পাগল
করে তুললো। বরং আমার অবস্থান খানিকটা নিচের দিকেই _ কারণ, অনেক
শিক্ষকই বেশ নামকরা; ছাত্রছাত্রী এবং দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা
আছে, এমন শিক্ষকের সংখ্যাও কম নয়। সেই তুলনায় আমি যেন স্রেফ একজন
চাকরিজীবী, অন্যান্য পেশার লোকজনের সঙ্গে আমার তফাৎ সামান্যই।
ইউনিভার্সিটির আবার অদ্ভুত কিছু ট্র্যাডিশন আছে; যেমন, তরুণ
শিক্ষকদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কোর্স দেয়া হয়না, টিউটোরিয়াল ক্লাস বা
ল্যাব ক্লাস নেয়ার মতো অগুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয় তাদের। অর্থাৎ
ইঙ্গিতে তাদের বুঝিয়ে দেয়া হয় _ তুমি অনভিজ্ঞ, তুমি তুচ্ছ, তাই
তুচ্ছ কাজটিই করতে হবে তোমাকে। ছাত্রজীবনে ফার্স্ট বয়ের মতো মহা
গুরুত্বপূর্ণ পজিশন থেকে এই হঠাৎ পতন ভার্সিটি শিক্ষকদের জন্য এক
বিরাট ট্র্যাজেডি, একরকম মৃতু্যই বলা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষকরা তাদের ক্যারিয়ার শুরুই করেন তাদের গৌরবময় অতীতের মৃতু্য
দিয়ে। এই উপলব্ধি আমাকে একটা বিরাট ধাক্কা দিয়েছিলো। আমার আলাদা
হতে চাওয়ার পথপরিক্রমায় ওই প্রথম ছন্দপতন হলো। আমি বুঝতেই পারি নি,
অথবা বুঝতে চাই নি যে এ এক ভিন্ন কমিউনিটি, আজকে যাঁরা বিখ্যাত
শিক্ষক তাঁদের অবস্থানও একদিন আমার মতোই ছিলো।
নিজের উপলব্ধি, জ্ঞান, দর্শন, চিন্তাভাবনাগুলো ছাত্রছাত্রীদের
মধ্যে ছড়িয়ে দেবো, এরকম একটি উচ্চাভিলাষ হয়তো আমার মধ্যে ছিলো, আর
তেমন কোনো সুযোগ সহসা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই দেখে বেশ মুষড়ে
পড়েছিলাম। যেখানে ক্লাসই নিতে পারছি না _ সেখানে এই অভিলাষ পূরণ
করার সুযোগই বা কোথায় ? ব্যাপারটা তো এমন নয় যে একেক জন ছাত্র বা
ছাত্রীকে ধরে ধরে উপলব্ধির কথা বলা শুরু করলাম ! ছাত্র-শিক্ষকের
সম্পর্কটি বেশ জটিল, একদিনে তা গড়ে ওঠে না; এবং গড়ে ওঠার জন্য
ক্লাসরুমটা খুব জরুরী। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রথমে তাদের
শিক্ষকটিকে জরিপ করে, ভালো লাগলে দু'চারদিনেই একধরনের সম্পর্ক গড়ে
ওঠে, স্নেহ-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা ও প্রীতির সম্পর্ক। অন্তত আমি যখন
ছাত্র ছিলাম, তখন এরকমই ছিলো ব্যাপারটা। কিন্তু কোনো কোনো শিক্ষকের
সঙ্গে কোনোদিনই কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে না ছাত্রদের _ বছরের পর বছর
পড়ালেও না। ওই যে পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার ! তা আমি তো নিজেকে
পরীক্ষা করার সুযোগই পাচ্ছি না। কি করে বুঝবো যে ওরা আমাকে গ্রহণ
করছে কী না ! আমার চিন্তার জগত ওদেরকেও আলোড়িত করছে কী না ! আর যদি
ওদের কাছে না-ই পেঁৗছানো গেলো তাহলে এ পেশায় এসে লাভ কি ? এইসব
ভাবনা আমাকে খুব পীড়া দিচ্ছিলো।
আমার আরো বয়স হতে হবে, আরো ডিগ্রী লাগবে, আরো অভিজ্ঞ হতে হবে, তবেই
না আমাকে ক্লাস নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে ! অতএব সবার মতো আমিও বিদেশে
পাড়ি জমালাম। কিন্তু তার আগেই আমার ভালো না লাগার অসুখ শুরু
হয়েছিলো। কিছুই ভালো লাগতো না আমার, কিছুই না। চাকরি-বাকরি,
পড়াশোনা, আড্ডা-টাড্ডা, কিছুই না। তাছাড়া ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়
যে দু'চারজন বন্ধু-বান্ধব জুটেছিলো, তারাও জীবীকার সন্ধানে
দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়লো। কেউ সরকারী চাকরি নিয়ে মফস্বলে, কেউ বা
আবার বিদেশে। দু'একজন ঢাকায় থাকলেও তারা ক্যারিয়ার নিয়ে এতো ব্যস্ত
হয়ে পড়লো যে তাদের সঙ্গে দেখা হওয়াটাই একটা ঘটনা হয়ে দাঁড়ালো।
এদিকে বাসায় আব্বা-আম্মা ছাড়া আর কেউ নেই। দু'বোনেরই বিয়ে হয়ে
গেছে, তারা তাদের সংসার সামলাতেই মহাব্যস্ত। আব্বা অখন্ড অবসর জীবন
কাটাচ্ছেন। মাঝে মাঝে তাকে কী যে বিষণ্ন্ন মনে হতো ! আব্বার সঙ্গে
কখনোই আমার খুব বেশি কথাবার্তা হতো না, যদিও তাঁকে আমি বেশ পছন্দ
করতাম; বাসায় আমি বরাবরই ছিলাম ভীষন রকম চুপচাপ _ নিজের ভেতরে মুখ
গুঁজে থাকা মানুষ, বইয়ের জগতটাই ছিলো আমার নিজস্ব পৃথিবী। তবু
আব্বা আমাকে মাঝে মাঝে ডাকতেন, মজা করে নিজের জীবনের নানা কাহিনী
বলতেন; কিন্তু তাঁর ভেতরে যে গভীর এক বিষণ্নতা আছে, হাহাকার আছে তা
বুঝতে আমাকে খুব বেশি বেগ পেতে হয় নি। এর কারণটি অবশ্য বোঝা সহজ
ছিলো না, তবে একবার, মনে পড়ে, কথায় কথায় তিনি বলেছিলেন _ 'একটি
জীবন কাটিয়ে এলাম, কিন্তু বুঝতেই পারলাম না, এই জীবনের উদ্দেশ্যটা
কি ছিলো !'
আব্বা তাঁর পেশাগত জীবনে সাফল্যের চূড়ায় উঠেছিলেন, নিজ পেশার
সর্বোচ্চ পদে আসিন হয়েছিলেন, ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত ও আদর্শবান করে
গড়ে তুলেছিলেন, মেয়েদেরকে ভালো ঘর ভালো বর দেখে বিয়ে দিয়েছিলেন _
আপাত দৃষ্টিতে তাদের সুখীই মনে হতো, ছেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিক্ষকতার মতো একটি সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত; শুধু তাই নয়,
আত্নীয়-স্বজনদের অনেককেই তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা-চরিত্র করে দাঁড়
করিয়ে দিয়েছিলেন _ অর্থাৎ একজন সামাজিক-স্বাভাবিক মানুষ যা চায় তার
সবই তিনি পেয়েছিলেন, সাফল্য বলতে সাধারণভাবে যা বোঝায় সবই ছিলো
তাঁর করতলগত _ তবু তাঁর ওই প্রশ্ন, ওই দীর্ঘশ্বাস, ওই হাহাকার
আমাকে জীবন সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিলো। আপাত সফল মানুষদের
ভেতরেও যদি এই হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাস থাকে, তাহলে ওই সাফল্যের জন্য
এতো ব্যগ্রতা কেন, এতো হৈ-হল্লা, এতো চিৎকার চেঁচামেচি, এতো
ব্যস্ততা, এতো চেষ্টা-চরিত্র কেন ? যে প্রশ্ন আব্বা ষাট বছর বয়সে
এসে করছেন _ হয়তো অনেক আগে থেকেই তা তাঁর মধ্যে ছিলো _ আমার মধ্যে
যে তা এখন থেকেই তীব্র আকার ধারণ করে বসে আছে ! এসব প্রশ্ন সঙ্গে
নিয়েই আমি বিদেশে গেলাম। আর গিয়ে আরো মুষড়ে পড়লাম। মানুষ সেখানে
আরো ব্যস্ত ও ব্যগ্র _ প্রায় যান্ত্রিক হয়ে উঠেছে। কিসের নেশায় যে
তারা এমন ঊধর্্বশ্বাসে ছুটে চলেছে আমি তার কারণই খুঁজে পেলাম না।
এমনিতেই ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা আর অচেনা সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে
নিতে কষ্ট হচ্ছিলো, তারপর মানুষের এই যান্ত্রিক রূপ আমাকে একদম
হতবিহ্বল করে তুললো। পড়াশোনা করছিলাম ঠিকই কিন্তু ভালো লাগছিলো না।
দু'বছর পর দেশে ফিরলাম আব্বার মৃতু্য সংবাদ পেয়ে। তাঁকে তো বেশ
সুস্থ-সবলই দেখে গিয়েছিলাম, এতো তাড়াতাড়ি মারা যাবেন _ ভাবতেই পারি
নি। শেষ পর্যন্ত কি তিনি তাঁর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন _
তাঁর মৃতু্যসংবাদ পেয়ে প্রথমে এই কথাটিই মনে হয়েছিলো আমার। [মনে হয়
না। আজ এই মৃতু্যশয্যায় শুয়ে আমার মনে হচ্ছে _ এইসব প্রশ্নের উত্তর
মেলে না, মানুষকে কিছু কিছু প্রশ্ন সঙ্গে নিয়েই কবরে যেতে হয়।]
দেশে এসে আমার মনে হলো আবার বিদেশে ফিরে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।
ইউনিভার্সিটি থেকে পাঁচ বছরের ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম _ ছুটি
ক্যান্সেল করে আবার জয়েন করলাম। পরিচিত সবাই খুব অবাক হয়েছিলো।
সবার একই প্রশ্ন _ কেন আমি এমন করলাম। কেন পড়াশোনা শেষ না করেই
স্থায়ীভাবে ফিরে এলাম। আমি কখনোই এসব প্রশ্নের উত্তর দেই নি। কিংবা
উত্তরটা আমার স্পষ্টভাবে জানা ছিলো না, বরং জীবনযাপনের উদ্দেশ্যটা
বড্ড ধোঁয়াটে মনে হতো। উত্তরটা যেন পেলাম অনেকদিন পর _ এই কয়েক বছর
আগে _ কবি শামসুর রাহমানের একটি সাক্ষাৎকার পড়ে। জীবনের অর্থ
সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন _ 'জীবনের কোনো অর্থ নেই,
আমরা অর্থ আরোপ করি। ব্যাপারটি এরকম : মনে করো, আমরা একটি ঘরে আছি।
সেই ঘরে চারটি শূন্য দেয়াল। দেয়ালগুলোকে আমরা ভরিয়ে তুলতে চাই।
এখানে অবশ্য কয়েকরকম কাজ করা যায়। যেমন, সুন্দর সুন্দর ছবি এঁকে
শূন্য দেয়ালগুলোকে আমরা আরো সুন্দর আর মনোহর করে তুলতে পারি; অথবা
থুথু ছিটিয়ে, প্রস্রাব করে দেয়ালগুলোকে নোংরা করে ফেলতে পারি;
কিংবা স্রেফ শূন্য দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থেকে সারাদিন কাটিয়ে দিতে
পারি; আমি ওই প্রথমটির পক্ষে।' এই সাক্ষাৎকার পড়ে আমি দারুণভাবে
চমৎকৃত হয়েছিলাম। শামসুর রাহমান কবি, তিনি তাই শূন্য দেয়ালে সুন্দর
সব ছবি আঁকতে চান, কিন্তু আমি তো তা নই, আবার থুথু-টুতু ফেলে নোংরা
করার মতোও মানুষ নই আমি _ আমি আসলে ওই তৃতীয় দলের সদস্য। স্রেফ
তাকিয়ে থেকে সময় কাটানো মানুষ। জীবনের পক্ষে আমার তাই কোনো উদ্যোগ
ও আয়োজন ছিলো না। থাকলেও বিশেষ লাভ হতো না। শামসুর রাহমানের মতো
একজন কবিরও যে অতৃপ্তি ধরা পড়েছিলো সেই সাক্ষাৎকারে, বলেছিলেন _
'কিছু ছবি আমি হয়তো আঁকতে পেরেছি, আরো অনেক আঁকার ছিলো, হয় নি, হলো
না। হয়তো কোনোদিন হবেও না। আমার নিজস্ব দেয়ালের অনেকখানি শূন্যই
রয়ে গেলো, কেবল দেখে দেখেই কাটিয়ে দিলাম।' _ সেখানে আমার মতো একজন
মানুষ উদ্যোগী হয়েই বা কতোটুকু সুন্দর ছবি আঁকতে পারেেতা ? তার
চেয়ে এই ভালো হয়েছে, নিছক দেখে দেখেই কাটিয়ে দেয়া গেলো একটি জীবন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'একা এবং কয়েকজন' উপন্যাসের বড় বাবু _
বর্ণাঢ্য এক চরিত্র _ জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য খুঁজতে গিয়ে যিনি
কোনোদিন কোথাও থিতু হতে পারেন নি _ মৃতু্যর সময় বিড়বিড় করে
বলেছিলেন _ দেখে গেলাম। উপন্যাসটি পড়ার সময় অতোটা সচেতন ছিলাম না,
কিন্তু পরে আমার মনে হয়েছে _ ওটাই ছিলো তাঁর সারা জীবনের অর্জিত
দর্শন। দেখে গেলাম ! অর্থাৎ, তিনি ছিলেন কেবলই দর্শক। একটি
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কোথাও কোনো অংশগ্রহণ ছিলো
না তাঁর। যদিও আমার জীবনটা মোটেই বর্ণাঢ্য নয়, বরং ভীষনরকম
সাদামাটা, তবু নিজেকে আমার বড় বাবুর মতো মনে হয়।
মনে পড়ে, আমার এইসব চিন্তাভাবনায় বিরক্ত হয়ে আমার এক বন্ধু, নজরুল
_ বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি যার অকুণ্ঠ সমর্থন কোনোদিনই এতোটুকু
ম্লান হয় নি _ বলেছিলো,
'তোর সমস্যাগুলো সব বানোয়াট, মনগড়া।'
'বানোয়াট ?'
'হঁ, বানোয়াটই তো !'
'কেন, বানোয়াট বলছিস কেন ?'
'এইসব হচ্ছে তোর অতিরিক্ত বই পড়ার ফল। ইউরোপীয় বিচ্ছিন্নতাবোধ,
ওদের মতো করে জীবনকে ব্যাখ্যার চেষ্টা করা _ এসবই তুই পেয়েছিস ওসব
দেশের সাহিত্য পাঠের ফল হিসেবে। তুই যেভাবে নিজেকে তৈরী করেছিস,
সেটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অবাস্তব-অসম্ভব, উদ্ভটই বলা যায়।
ইউরোপে সমস্যাটি সামাজিক ভাবেই আছে _ আমাদের তা নেই, আমাদের
সামাজিক বাস্তবতা অন্যরকম, আমরা এইসব সমস্যা কেবল তৈরী করি।'
'নিঃসঙ্গতাবোধ বা বিচ্ছিন্নতাবোধ শুধু ইউরোপীয় মানুষদেরই থাকতে
পারে, আমাদের তা থাকতে নেই ?'
'পারে, আমাদেরও তা থাকতে পারে, তবে এটা বানানো, এসব হচ্ছে বইয়ে পড়া
সমস্যার বিলাসী চর্চা। বৃহত্তর জনজীবনের সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক
নেই, যারা সবকিছু জেনে-বুঝেও চোখ বুজে থাকতে চায়, তারাই এসব
দুঃখবিলাস তৈরী করে নেয়।'
'বুঝলাম, বৃহত্তর জনজীবনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই বলে
বিচ্ছিন্নতাবোধে ভুগছি, কিন্তু তুই তো নিজেকে খুব সংশ্লিষ্ট বলে
দাবি করিস, তোর কখনো নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয়না ? মনে হয় না যে, জীবন
ব্যাপারটাই একটা অর্থহীন বাগাড়ম্বর মাত্র ?'
'হয়, হবে না কেন ? জীবন তো অর্থহীনই। কিন্তু সেই বোধ আমাকে তোর মতো
অসুস্থ করে তোলে নি। জীবনকে অর্থহীন মনে হয় বলে কি আমরা হাত পা
গুটিয়ে বসে থাকি? নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সবই তো করি, শুধু
বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা উঠলেই ওইসব প্রসঙ্গ তুলে নিজেকে বিচ্ছিন্ন
করার চেষ্টা কেন ? আমি তো মনে করি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক
পটভূমিতে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একজন নির্দিষ্ট মানুষের জন্ম নেয়ার
নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য আছে। এর আগে বা পরে যে তার জন্ম হয় নি,
কারণটি নিশ্চয়ই এই যে, এই সময়ে এই সমাজে তার একটি ভূমিকা রাখার
কথা। আমি সেই ভূমিকা রাখার জায়গাটি খুঁজে বের করতে চাই।'
আমি কিছু বলার আগেই ও আবার বলতে শুরু করলো _
'দেশের মানুষের এতো বিপুল সমস্যা যে, তুই যদি তাদেরকে নিয়ে একটু
ভাবতি তাহলে নিজের সমস্যাগুলোকে নিছক দুঃখবিলাস বলে মনে হতো। দেশের
সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যেখানে বেঁচে থাকার নূ্যনতম সুযোগ সুবিধা থেকে
বঞ্চিত, সেখানে জীবনের তথাকথিত দার্শনিক ব্যাখ্যা খোঁজা এক শ্রেনীর
শিক্ষিত মানুষের বিলাসিতা ছাড়া আর কি ?'
দেখলাম ও উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। আমি আর কোনো কথা বলার প্রয়োজন বোধ
করলাম না। উত্তেজিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না আমার।
হয়তো ওর কথাগুলো ঠিক এবং জীবনকে দেখার এও এক চমৎকার দৃষ্টিভঙ্গি,
কিন্তু এটাকে একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে হলো আমার। এর বিপরীতে বলা
যেতো অনেক কথাই, যুক্তি- তর্ক করতে গেলে অনেক তিক্ত প্রসঙ্গ এসে
পড়ার সম্ভাবনা আছে বলে চুপ করে রইলাম। আমি বলতে পারতাম _ জীবনের
দার্শনিক ব্যাখ্যা খোঁজাটা যদি বিলাসিতা হয়, তাহলে শিক্ষিত মানুষের
অধিকাংশ কার্যকলাপই বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ে। বলা যেতো _ তুই যে
প্রেম করছিস, সেটা কি বিলাসিতা নয় ? বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দুঃসহ
জীবনযাপন আর তোর এই প্রেম কি একসঙ্গে যায় ? শুধু তাই নয়,
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবনের সঙ্গে শিল্পকলার কোনোকিছুই
_ অর্থাৎ কবিতা-গল্প-উপন্যাস-চলচ্চিত্র-নাটক-চিত্রকলা- সঙ্গীত এর
কোনোটাই _ যায় না। [ আর এগুলোর মধ্যে দিয়ে যারা সমাজকে চেনাতে চায়
তারা আরো বিভ্রান্তির মধ্যে আছে _ মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে কি
আর দারিদ্র চেনা যায় ?] তাই বলে কি শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্ম থেকে
বিরত থাকবেন, কারণ তা একপ্রকার বিলাসিতা ! বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানচর্চা
থেকে বিরত থাকবেন কারণ তা-ও বিলাসিতা ! এসব ওকে বলে লাভ নেই। তাতে
উত্তেজনা বাড়বে। আমার স্বভাবটাই এমন যে, উত্তেজনার সম্ভাবনা থাকলে
সেখান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে চেষ্টা করি। ফলে আমার বলা হয় না, ও
খুব মৌলিক একটি জায়গায় ভুল করছে। বৃহত্তর জনজীবনের কথা বলছে ও,
কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বৃহত্তর জীবনবোধ, তার কথা ভাবছে
না। যে একটি মাত্র জীবন নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে, সেই জীবনকে যে
কোনোভাবে যাপনের অধিকার তার আছে _ যদি সেই যাপন পদ্ধতিটা অন্য কারো
জন্য ক্ষতিকর না হয়। আমার নিঃসঙ্গতা, কি বিচ্ছিন্নতা তো কারো ক্ষতি
করছে না ! আমি নিজেকে নিয়ে নিজেতেই মগ্ন। আর এ মগ্ন থাকার অধিকার
আমার আছে। এ শুধু ইউরোপীয় মানুষের একচ্ছত্র অধিকার নয়।
আমি এসব নিয়েই ছিলাম। খুব মন্দ ছিলাম তা বলা যায় না। আমার যেহেতু
কোনো ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছিলো না, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো না _ তাই
অংশগ্রহণবিহীন দর্শকের জীবন যাপন করতে আমার কোনো সমস্যা হয় নি।
কিন্তু এর মধ্যেই একটা ভুল করে ফেললাম। বিয়ে। আমার নিস্পৃহ
জীবনযাপনের সঙ্গে এই ব্যাপারটি যায় না, তবু যে কেন আমি বিয়েতে রাজি
হয়েছিলাম _ বহুবার নিজেকে জিজ্ঞেস করেও উত্তর পাই নি। তবে কি আমার
মধ্যেও একজন সংসারাকাঙ্ক্ষী মানুষ লুকিয়ে ছিলো ? হয়তো বা। তো, আমার
নিজের পছন্দের যেহেতু কেউ ছিলো না, বিয়েটা তাই হয়েছিলো প্রধানত
বোনদের পছন্দে আর মা'র আগ্রহে। পৃথিবীর সব বোনের কাছেই যেহেতু
তাদের ভাইরা একেকজন রাজপুত্র, অতএব আমার জন্যও তারা একজন রাজকন্যা
খুঁজে আনলো। নীলা। সে ছিলো রূপসী এবং উচ্ছ্বল আর প্রাণবন্ত। কিন্তু
ওদের ওই পছন্দটি সঠিক ছিলো না। আমি তো আর সত্যিই রাজপুত্র নই, বরং
ছিলাম ওর বিপরীত স্বভাবের। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা শত
প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে জানে _ ও ছিলো সেই
স্বভাবের। কিন্তু আমার সঙ্গে ওর মিলবে কেন ? মিললো না। বুঝতে
পারছিলাম _ ও মেলাতে চাইছে, আমাকে বুঝতে চাইছে, আমার মনের মতো হতে
চাইছে, আমার যাবতীয় অদ্ভুত স্বভাবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে চাইছে।
কিন্তু ও বোঝে নি, আমার মনের মতো হতে চাওয়াটা বোকামী, কারণ, কী যে
আমার মনের মতো _ তা আমি নিজেই জানতাম না। প্রথম প্রথম আমিও ওর
সঙ্গে একটু-আধটু তাল মেলাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার মতো চিরবিষণ্ন
মানুষের পক্ষে কতোটুকুই বা প্রাণবন্ত হওয়া সম্ভব ? আমার সবকিছুই
ম্লান আর ম্রিয়মাণ _ এমন কি শারীরিক সম্পর্কেও আমি উত্তেজনা আনতে
পারি নি। শত চেষ্টা করেও ও আমাকে জীবনের পক্ষে দাঁড় করাতে পারে নি।
তবু কষ্টে-সৃষ্টে বছর দু\'য়েক লেগে ছিলো ও, তারপর চলে গেলো। নজরুল
ওকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলো _ শুনেছি, ও বলেছে _ 'আমি তো
এতোদিন একটা পাথরের সঙ্গে সংসার করলাম, আর কতোদিন করতে বলেন !'
শুনে আমি অবাক হই নি। আমার সম্বন্ধে এরচেয়ে বেশি আর কী-ই বা বলা
যায় ?
বিয়ের মাস ছয়েকের মাথায় মা মারা গিয়েছিলেন, সম্ভবত আমার দায়দায়িত্ব
অন্য আরেকজনের কাঁধে চাপাতে পারার আনন্দ নিয়ে। নীলা চলে যাবার পর
তাই একেবারেই একা হয়ে গেলাম আমি। বাসায় আর কেউ নেই। রান্না করে
দেয়ার জন্য দু\'বেলা একজন ঠিকে ঝি আসে, তাছাড়া বাদবাকি সময়টুকুতে
আমি নিঃসঙ্গ পড়ে থাকি ঘরের ভেতর।
ইউনিভার্সিটি আর বাসা _ এছাড়া আর কোথাও যাওয়াও হয় না। কালে-ভদ্রে
বোনদের বাসায় যেতাম, ওরা কান্নাকাটি আর ওদের কাছে গিয়ে থাকার জন্য
পীড়াপীড়ি করে বলে বিরক্ত হয়ে তা-ও বাদ দিলাম। এমনি এক সময়, কোনো এক
রাতে আমার প্রথম স্ট্রোক হলো। ব্যাপারটা যে স্ট্রোক আমি তা বুঝতেই
পারি নি। কিন্তু এমন অভূতপূর্ব ভয়ংকর কষ্ট হচ্ছিলো যে, বলার নয়।
বাসায় যেহেতু আমি একা, তাই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতোও কেউ ছিলো
না। পরদিন সকালে বুয়া এলে তাকে একটা স্কুটার ডেকে দিতে বললাম,
তারপর একাই গিয়ে হাজির হলাম হাসপাতালে। ডাক্তাররা জানালেন যে, আমার
স্ট্রোক করেছিলো। বললেন, আপনার কপাল ভালো, অল্পের ওপর দিয়ে গেছে।
কপাল ভালো ! কে জানে ! অল্পের ওপর দিয়ে না গিয়ে বেশির ওপর দিয়ে
গেলেই বা কি ক্ষতি হতো ? মরে পড়ে থাকতাম, এই তো ! এ আর এমন কি ঘটনা
? সম্ভবত ওই সময়ই আমার মনে হয়েছিলো _ আমার যেন মৃতু্য হয়
হাসপাতালের শুভ্র বেডে শুয়ে এবং মৃতু্যর সময় যেন আমার পাশে কেউ না
থাকে।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর ভেতরে ভেতরে বেশ দূর্বল হয়ে পড়েছিলাম। খুব
একা আর অসহায় লাগতো আমার। রাতগুলো হয়ে উঠেছিলো দুঃসহ _ এক ফোঁটা
ঘুম হতোনা আমার, আর মনে হতো এই রাত বুঝি কখনো শেষ হবে না। কিছু
ভালোও লাগতো না। এমন কি বই পড়তেও না। কেউ বাসায় এলে বেশ বিরক্ত
হতাম এবং স্পষ্টই তা প্রকাশ করতাম। তবু আত্নীয়-স্বজন,
পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব ছাত্র-ছাত্রীরা আসতো মাঝে মাঝে।
সামাজিকতা ! এই জঘন্য সামাজিকতা থেকে আমার মুক্তি মেলেনি কোনোদিন।
নিজেকে যথাসম্ভব দূরে সরিয়ে নিয়েও আমি এই লোকগুলোর কাছ থেকে রেহাই
পাই নি। তারা এলে কখনো ভালো করে কথা বলতাম না আমি, মুখ ফিরিয়ে
রাখতাম অন্যদিকে, তাদের মুখনিঃসৃত সহানুভূতিপূর্ণ কথাবার্তাগুলোকে
আমার কাছে দুর্গন্ধময় বলে মনে হতো। একসময় এমন হয়েছিলো যে, একমাত্র
নজরুল ছাড়া অন্য কোনো বন্ধুকেও সহ্য করতে পারতাম না আমি। অনেক
মতবিরোধ সত্ত্বেও নজরুলই এখন পর্যন্ত আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। একমাত্র
ও-ই শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বের সকল পরীক্ষায় লেটার মার্কস পেয়ে টিকে
রইলো। সসেই সময় মাঝে মাঝেই খোকনকে মনে পড়তো আমার। ছোটবেলার মতো করে ওর
সঙ্গে মনে মনে কথা বলতাম, আর মনে হতো আমার একটা সন্তান হলে ভালোই
হতো। এমনও মনে হতো যে, খোকনের প্রতি আমার যে আদর-স্নেহ-ভালোবাসা
সেটা আসলে বাৎসল্য স্নেহেরই অপরিণত সংস্করণ। হয়তো একটা বাচ্চা হলে
আমি আবার এক খোকনকে ফিরে পেতাম। কিন্তু দু'বছরের বিবাহিত জীবনে
আমাদের কেন কোনো সন্তান হলো না, কে জানে ! আসলে এ বিষয়ে নীলার
সঙ্গে আমার কোনো কথাই হয় নি। একটা বাচ্চা নেয়া যায় কী না, বা নিলে
কেমন হয়, কিংবা কবে নেয়া যায় _ এসব কিছুই না। এমন কি আমি নিজে কোনো
নিরোধকই ব্যবহার করিনি _ তবু কেন যে হলো না ! হলে নীলাও হয়তো আমাকে
ছেড়ে যেতো না । তবে কি ও-ই গোপনে কোনো প্রোটেক্টিভ ব্যবস্থা
নিয়েছিলো, ওর কি ভেতরে ভেতরে এমন কোনো প্রস্তুতি ছিলো যে, এই
লোকটির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত ওর সংসার টিকবে না ? কথাটা আর কোনোদিনই
জানা হবে না।
প্রথম স্ট্রোকের তিনবছর পর দ্বিতীয় স্ট্রোক হলো। ডাক্তাররা বললেন _
'এবারও টিকে গেলেন, কিন্তু সাবধান, এরপর যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে
যেতে পারে।' দুর্ঘটনা আর কি ? মৃতু্যই তো ! এ আর এমন কি ? আমি তো
সদাপ্রস্তুত হয়েই আছি। ডাক পড়লেই চলে যাবো। এবারও যে গেলাম না তার
জন্য নিজের ওপরই ক্ষুণ্ন্ন হয়ে রইলাম অনেকদিন। আর সাবধান হবারই বা
কি আছে ? ডাক্তাররা টেনশন করতে না করেছেন, অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে
নিষেধ করেছেন _ আমি এর কোনোটাই করি না। সেরকম সুযোগই তো নেই। তবু
আমি তৃতীয়বারের মতো আক্রান্ত হলাম। এবার বোধহয় আর টেকা যাবে না।
অন্তত সবার হাবভাবে সেরকমই মনে হচ্ছে। তা খারাপ হয় না, এই বার শেষ
হোক এই খেলা। ঈশ্বরের সাজানো নাটকে আমরা সব অনিচ্ছুক পাত্রপাত্রী;
সেই নাটকে আমার তো কোনো ভূমিকাই ছিলো না, এবার তবে দৃশ্যপট থেকে এই
অপ্রয়োজনীয় চরিত্রটির প্রস্থান ঘটুক !
বিকেল পড়ে আসছে। গোধূলি লগ্নের ম্লান-কমলা রঙের রোদ পৃথিবীটাকে কী
বিষণ্ন করে তুলেছে ! আর আমি নিঃসঙ্গ শুয়ে আছি হাসপাতালের শুভ্র
বিছানায়। যাওয়ার জন্য চমৎকার এক সময়। কিন্তু এই মহার্ঘ মুহূর্তেও
সামাজিকতা থেকে মুক্তি নেই আমার, কারণ বাইরে কার যেন উপস্থিতি টের
পাচ্ছি। বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু আমার জন্য বিস্ময় অপেক্ষা
করছিলো। দরজা ঠেলে যে প্রবেশ করলো, তাকে কোনোভাবেই প্রত্যাশা করি
নি আমি। নীলা ! আমি নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলাম। এতোদিন পর ও আবার কেন
এলো ? এবার তাহলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আমি সত্যিই যাচ্ছি। নইলে ওর
তো আসার কথা নয় ! যদিও আমাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে ছাড়াছাড়িটা হয়
নি, ও বা আমি দ্বিতীয়বার বিয়েও করি নি, তবু এতোদিন যার আসার কথা
মনে হয়নি _ আজ এলো কেন ? আমি কোনো কথা না বলে তাকিয়ে ছিলাম। এখনও কী সুন্দর রয়ে গেছে ও !
নীলা ঘরের মাঝখানে এসে খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর
কুণ্ঠিতভাবে এগিয়ে এসে আমার মাথার কাছে বসলো। তারও খানিকক্ষণ পর
আরো কুণ্ঠিতভাবে আমার কপালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো _ 'কেমন আছো ?'
ওর কণ্ঠ কি ভেজা ? আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম _ হঁ্যা,
তাই তো ! নীলা কাঁদছে ! ওর ভেজা চোখে উৎকণ্ঠা, আর মমতা আর
ভালোবাসা। আমার সবকিছু হঠাৎ ওলোট পালোট হয়ে গেলো। এতোকাল আমি
নিজেকে একজন দর্শক হিসেবে ভেবে এসেছি; কেবল দেখে যাচ্ছি _ এই ছিলো
আমার দর্শন। কিন্তু হঠাৎ আমার মনে হলো _ সারা জীবনে আসলে আমি কিছুই
দেখি নি। কোনোদিন তো নীলার চোখে তাকিয়ে দেখি নি _ আমার জন্য কী আছে
ওখানে ! প্রেম, উৎকণ্ঠা, মমতা নাকি ঘৃনা ও বিতৃষ্ণা ! এমন কি
তাকিয়ে দেখি নি আম্মা-আব্বা বা বোনদের চোখেও। কি ছিলো তাদের চোখে,
আমার জন্য ? আমার শত উপেক্ষায়ও যে সব আত্নীয়স্বজনবন্ধুবান্ধব আমাকে
এ যাবৎকালেও ছেড়ে যায় নি, আমার বকাটকা শুনেও যেসব ছাত্রছাত্রী
আমাকে উপেক্ষা করে নি, বরং অপমানিত হয়েও বারবার আমার কাছে ফিরে
ফিরে এসেছে _ সেই ফিরে আসার মধ্যে তো কোনো স্বার্থ ছিলো না ! তাহলে
কি ছিলো ? এসব আমার কোনোদিন দেখা হয় নি। আমি আসলে সারাজীবন এক অন্ধ
দর্শকের ভূমিকা পালন করে গেছি। এই কথা মনে হতে জীবনটাকে আরো
ব্যর্থ, ম্লান, আরো ম্রিয়মাণ মনে হলো। আমি অবাক চোখে নীলার চোখে
তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো _ এই এতোদিনে আমার দেখা হলো। দেখা হলো _ কেন
এবং কিভাবে এই দুঃসহ পৃথিবীতে মানবিক সম্পর্কগুলো টিকে থাকে, কেন ও
কিভাবে এই অর্থহীন জীবনের জন্যও মানুষ এমন মমতা বোধ করে, আর জীবন ও
পৃথিবী এমন মধুর ও মোহময় হয়ে ওঠে। যাক, শেষ পর্যন্ত দেখা তো হলো _
এই ভেবে আমি আবার খুশি হয়ে উঠলাম। এবার তাহলে বলা যায় _ দেখে গেলাম
! এবার তাহলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়া যায় !
রচনাকাল : জুন-নভেম্বর, ২০০০
|
| |
 |
|