Page loading ... Please wait.

ঘুমোবার সব আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবার পর
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
এখন সে ঘুমোতে চায়, দীর্ঘ-নিরবিচ্ছিন্ন-গভীর ঘুম, স্বপ্নের উৎপাতহীন নিবিড় ঘুম, মায়ের কোলের মতো উষ্ণ-কোমল-মায়াময় ঘুম। কিন্তু অমন ঘুম নাকি সহজে পাওয়া যায় না, অন্তত তার চিকিৎসক _ সজল বাবু _ তেমনটিই মনে করেন, শান্তিপূর্ণ ঘুমের জন্য একটি ভাবনাহীন সুস্থির সময় কাটানো দরকার, 'ঘুমের মধ্যে বালকের পেচ্ছাবের মতো' যে সময় অলক্ষ্যে কেটে যায়, মনের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করে না। কিন্তু চাইলেই কি একটি ভাবনাহীন সময় কাটানো সম্ভব? সম্ভব নয়, সেটা ডাক্তারও মানেন _ 'বিশেষ করে আপনার মতো লোকের পক্ষে সেটা খুবই কঠিন' _ তিনি বলছিলেন _ 'কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কি?'

সে এখন সেই চেষ্টাই করছে। ঘুমোবার জন্যও এমন আয়োজন করতে হবে _ স্বপ্নেও ভাবেনি সে কোনোদিন। উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধও তাকে ঘুম পাড়াতে পারেনি শুনে ডাক্তার নিজেই অবাক, তারপর দীর্ঘ আলোচনার পর এই থেরাপি। ডাক্তার সাহেবকে আজ কী প্রীতিপূর্ণ বলে মনে হলো _ অবশ্য বরাবরই তিনি যথেষ্ট প্রীতিপূর্ণ, সত্যি বলতে কি, অনেকের কাছ থেকে তাঁর চমৎকার ব্যবহারের কথা শুনেই সে এখানে এসেছিলো _ কিন্তু আজ যেন একটু বেশিই ভালো ব্যবহার করলেন তিনি। সারাক্ষণ হেসে হেসে কথা বললেন, ঠাট্টা দুষ্টুমি করলেন, মানুষের স্বভাব চরিত্র নিয়ে নানা কৌতুক করলেন, সে-ও মহা উৎসাহে এসবকিছুতে যোগ দিলো। তার ঝুলিতেও অনেক গল্প, সেগুলো শুনতে শুনতে তিনি হেসেই অস্থির, বললেন _ 'অনেকদিন পর এমন করে হাসলাম। ভালোই হলো, আপনার সাথে কথা বলবো বলে আজকে কম রোগী দেখেছি, তাতে আমার রোজগার একটু কম হয়েছে, সেটা পুষিয়ে গেলো এই হাসিতে। হা হা হা। টাকার বিনিময়ে হাসি কেনা... আপনি হাসাতে না পারলে পুরোটাই জলে যেতো।' সে ডাক্তারের আড্ডাবাজিতে মুগ্ধ হচ্ছিলো। ডাক্তারদের নিয়ে এর আগে তার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, বলতে গেলে সে এদের প্রায় ঘৃণাই করে। এখানে না এলে তার জানাই হতো না _ এই দেশে, এই ভয়াবহ কমার্শিয়াল যুগে এমন একজন ডাক্তার থাকতে পারেন, যিনি রোগীর কষ্টে নিজেই বিবর্ণ হয়ে যান, রোগীদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের গল্প করেন, ব্যাপক চাপ থাকা সত্ত্বেও সন্ধ্যা থেকে রাত তিনটে পর্যন্ত দশজনের বেশি রোগী দেখেন না। ভদ্রলোক একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, তার হার্টের কোনো সমস্যা নেই, অন্তত তার সেরকমই ধারণা, সেই অর্থে তার এই ডাক্তারের কাছে আসারই কথা ছিলো না, সে আসলে খুঁজছিলো একজন হৃদয়বান ডাক্তার যিনি তার সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করবেন _ এখানে এসে তাকে নিরাশ হতে হয়নি। প্রথমবারের কথপোকথনটি ছিলো মজার। প্রাথমিক আলাপের পর _ নাম কি, বয়স কতো, সিগারেট খান কী না, অ্যালকোহলে আসক্তি আছে কী না ইত্যাদি _ তিনি জানতে চেয়েছিলেন,

বলেন, আপনার সমস্যা কি?
আমার ঘুম হয় না।
ঘুম হয় না! আচ্ছা। আর কি সমস্যা?
আর কোনো সমস্যা নেই।
শুধু ঘুম হয় না এই সমস্যা নিয়ে আমার কাছে এসেছেন কেন, আমি তো হৃদরোগ নিয়ে কাজ করি।
আমি জানি...
তাহলে? আমার কাছে আসার কারণটা একটু বলবেন? এখানে এ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া তো কঠিন, এত ঝক্কি পেরিয়ে কেবলমাত্র সিরিয়াস রোগীরাই আসে, আপনার যদি আর কোনো সমস্যা না-ই থাকে...
আমার মনে হয়েছে, ঘুম না হওয়ার কারণটি আপনি ধরতে পারবেন। কারণটা জানা খুব দরকার আমার। আর তাছাড়া, অনেকদিন ধরেই মনে হচ্ছে আমার বুকের ওপর ভারি কিছু একটা পাথরের মতো চেপে বসে আছে, কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না। এ এক অদ্ভুত যন্ত্রণা, ঠিক ব্যথা নয়, কেমন যেন একটা অস্বস্তি, একটা খালি খালি ভাব, বুকের ওপর ভারি কিছুর চাপ না দিয়ে শুতে পারি না, এটা হার্টের কোনো সমস্যা কী না বুঝতে পারছি না।
ঠিক আছে, সেটা নিয়ে না হয় পরে কথা বলি। এখন বলেন, আপনার ঘুম হয় না এটা একটা সমস্যা, অন্য সবকিছু স্বাভাবিক?
অন্য সবকিছু মানে কি?
বাথরুম ক্লিয়ার?
না, মাঝে মাঝে সমস্যা হয়।
ব্লাড প্রেসার নরমাল?
নরমালই তো থাকার কথা!
থাকার কথা, কিন্তু আছে কী না চেক করে দেখেছেন কখনো?
না দেখিনি, এই বয়সে কারো ব্লাড প্রেসার অ্যাবনরমাল হয় নাকি?
হবে না কেন? হতে পারে _ বলতে বলতে তিনি প্রেসার মাপলেন। একবার নয়, দুবার, তারপর বললেন,
আপনার প্রেসার তো নরমাল নয়ই, বরং অ্যাবনরমালি হাই। ১৬০ বাই ১১০। এই প্রেসার নিয়ে আপনার তো হাসপাতালে যাওয়ার কথা, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন কীভাবে?
আমি তো বুঝতে পারিনি...
ডাক্তার এবার তার প্রতিদিনের রুটিন জানতে চাইলেন। সে মোটামুটি খুঁটিয়ে বললো _ সারাদিন অফিসে, সন্ধ্যার পর থেকে রাত প্রায় ১২টা পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, তারপর বাসায় ফিরে খেয়েদেয়ে একটু টিভি দেখা বা বইটই পড়া...
ঘুমোতে যান কখন?
সাড়ে তিনটা থেকে চারটার মধ্যে।
আমার ধারণা ছিলো, এই শহরে আমিই সবচেয়ে বেশি রাত জাগি, আপনি দেখি আমাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। যাই হোক, তারপর বলুন।
তার আর পর কি? বিছানায় যাই, কিন্তু সহজে ঘুম আসে না। এলেও কিছুক্ষণের মধ্যে স্বপ্ন দেখে জেগে উঠি।
কি ধরনের স্বপ্ন?
মনে থাকে না। তবে অধিকাংশই দুঃস্বপ্ন। জেগে মনে হয় আমি আদৌ ঘুমোইনি।
এবার কয়েকটা স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড প্রশ্ন করি, ভেবেচিন্তে উত্তর দেবেন।
আচ্ছা।
আপনি কি সেনসিটিভ মানুষ?
হঁ্যা। একটু বেশিই সেনসিটিভ।
কি রকম?
খুব সামান্য ঘটনায় আমার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। যে সব ঘটনা মানুষ অবলীলায় এড়িয়ে যায়, আমি তো তা পারিই না, উল্টো একেবারে মুষড়ে পড়ি।
দু-একটা উদাহরণ দিতে পারেন?

যেমন.. যেমন.. একবার রাস্তায় খুব বুড়ো এক মহিলাকে ভিক্ষা করতে দেখেছিলাম। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শরীর তার; কোঁচকানো চামড়া, পাটের আঁশের মতো চুল, ক্লান্ত-বিবর্ণ মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো _ বহুকাল তার কপালে কোনো যত্ন-আত্তি জোটেনি। তীব্র রোদ ছিলো সেদিন। তিনি বসেছিলেন রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডে। সিগন্যাল পড়লে এগিয়ে যাচ্ছিলেন থেমে থাকা রিকশা বা গাড়ির কাছে, অনেকেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছিলো তাকে। আমার কাছে যখন এলেন, মনে হলো এমন অসহায় মুখ আমি জীবনে আর কখনো দেখিনি। মায়ের কথা মনে পড়ছিলো আমার। আমি পকেট থেকে দশ টাকা বের করে দেয়ার পর তিনি যে হাসিটি দিয়েছিলেন এমন সুন্দর কৃতজ্ঞ হাসিও দেখিনি কোনোদিন, তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিলো, এমন কান্নাও কখনো দেখিনি আমি। বহুদিন পর্যন্ত আমি তার মুখটা ভুলতে পারিনি। আবার ধরুন _ রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে যখন বাসায় ফিরি তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের দেখে আমার কান্না পায়, মনে হয় ওরা আমার বোন, ওদের জন্য কিছুই না করতে পারার কষ্টে আমি ছটফট করতে থাকি...
এক মিনিট। আপনি কি কোনো ক্রিয়েটিভ কাজের সঙ্গে জড়িত? যেমন লেখালেখি বা আঁকাআঁকি বা মিউজিক...

হঁ্যা, আমি লেখালেখি করি।
ও, তাহলে আপনি একজন লেখক! আগে বলবেন তো! তা কি ধরনের লেখক আপনি?
কি ধরনের মানে?
মানে সৌখিন লেখক, নাকি সিরিয়াসলি লেখালেখি করেন?
সিরিয়াসলি করি। লেখালেখি ছাড়া আমি অন্য কিছু ভাবতে পারি না।
কি লেখেন?
গল্প।
আচ্ছা। বলে যান।
আর কি জানতে চান?
আপনি কি রাগী?
হঁ্যা, প্রচণ্ড রাগী। আমার সবকিছুই এক্সট্রিম। রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ _ সবই খুব তীব্র।
এসব প্রকাশ করেন কীভাবে? তীব্রভাবেই?
না, প্রকাশই করি না।
কখনো না?
না, কখনো না। নিজের ভেতর মুখ গুঁজে থাকাই আমার স্বভাব।
শুনুন, আপনার সম্বন্ধে আমার আরও কিছু প্রশ্ন আছে। কিন্তু সেটা আজকে না। কালকে বিকেলে আসবেন, আগে আপনার ইসিজি করবো। তারপর অন্য কথা হবে। আর হঁ্যা, আপনার কোনো বই বেরিয়েছে?
হঁ্যা।
তাহলে কালকে আমার জন্য একটা বই নিয়ে আসবেন। আমি পড়ে দেখতে চাই।
এটাও কি চিকিৎসার অংশ?
হঁ্যা, অবশ্যই।
কীভাবে?
শুনুন, অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, অধিকাংশ রোগের ফিফটি পার্সেন্ট মানসিক, বাকিটা শারীরিক। এজন্যই আপনাকে এত কথা জিজ্ঞেস করা। আপনি যেহেতু লেখেন, বইটা পড়ে নিশ্চয়ই আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যাবে।

পরের দিন ইসিজি রিপোর্ট দেখিয়ে ডাক্তার বললেন, আপনার এই রিপোর্টটাও অ্যাবনরমাল, এতসব অ্যাবনরমালিটি নিয়েও দেখি আপনি দিব্যি আরামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!

সে মৃদু হাসলো, 'আরাম' শব্দটাই তার ঠোঁটে হাসি এনে দিলো, ঘুরে সে বেড়াচ্ছে বটে, কিন্তু আরামে! এ জীবনে ওটা আর পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

ডাক্তার আবার তার প্রেসার মাপলেন, বললেন, এই প্রেসার নিয়ে আপনার এত ফ্রি মুভমেন্টে যাওয়া উচিৎ নয়, সব মিলিয়ে একটু রিস্কের মধ্যেই আছেন আপনি, প্রেসারের জন্য ওষুধ দিচ্ছি, ঘুমের জন্যও। আশা করছি আস্তে-ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে ঠিক এক সপ্তাহ পর আবার আসবেন।

আপনার এখানে আসা তো রীতিমতো একটা যুদ্ধ...

না, আপনাকে অতোটা কষ্ট করতে হবে না, অ্যাপয়েন্টমেন্ট তো করাই থাকলো, শুধু আগের দিন ফোন করে আমাকে একটু মনে করিয়ে দেবেন। br /> ডডাক্তারের এই মনোযোগটুকু তার ভালো লাগলো, মনে শান্তি পেলো, মনে হলো একজন ডাক্তারের ভালো ব্যবহারই তার রোগীকে অর্ধেক সুস্থ করে দিতে পারে। ব্যাপারটা যদি সব ডাক্তার বুঝতো! কিন্তু ওষুধ খেয়েও ঘুম-সমস্যার সমাধান হলো না। বুকের ওপর চেপে থাকা ভারটা একটু কমলো অবশ্য। এক সপ্তাহ পর দেখা করতে গেলে ডাক্তার বললেন _ আপনার বইটা পড়েছি। আপনি লেখেন ভালো, কিন্তু জীবন সম্বন্ধে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি খুব একপেশে।

একথা মনে হলো কেন আপনার? br /> আআপনার গল্পের চরিত্ররা প্রায় বীভৎস জীবন যাপন করে, কোথাও যেন পজিটিভ কিছু নেই, পৃথিবী থেকে যেন সমস্ত শুভ ও সুন্দরের মৃতু্য ঘটে গেছে। জীবন কি কেবল এরকম নাকি, কোথাও কি আশা ও আনন্দের কিছু নেই?

আছে নিশ্চয়ই, নইলে মানুষ বাঁচে কী নিয়ে!

তাহলে আপনার গল্পে সেগুলোর দেখা পাওয়া যায় না কেন? জীবন সম্বন্ধে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি এত নেতিবাচক কেন? br /> না, জীবন সম্বন্ধে আমার দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক নয়। কিন্তু এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ যে প্রায় অমানবিক আর বীভৎস জীবন যাপন করে সেটা তো ঠিক! আমি শুধু সেটুকু দেখিয়ে বোঝাতে চাই এই জীবন আমাদের কাম্য হতে পারে না...
ডডাক্তার মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিলেন। প্রসঙ্গ পাল্টালেন হঠাৎই _ আপনার ঘুমের কি অবস্থা?

আগের মতোই। br /> আগের মতোই? বলেন কী! ওষুধ খেয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না?
তাই তো মনে হচ্ছে।
কেন এমন হচ্ছে বলেন তো! আপনি কি কোনোকিছু নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করেন?
না, নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার তেমন কোনো অভিযোগ নেই। কিছু সমস্যা-টমস্যা আছে, কিন্তু সেটাকে আমি স্বাভাবিক বলেই ভাবি, এরকম তো সবার জীবনেই কম বেশি থাকে, তাই না!
তাহলে? আচ্ছা বলেন তো, আপনি যখন ঘুমোতে যান, মানে বিছানায় শুয়ে, কি ভাবেন?
নির্দিষ্ট কিছু নয়। কিন্তু ওই সময় আমার একটা সমস্যা হয়।
ককি সমস্যা?

আমি খুব ঘুরতে পছন্দ করি। সময় পেলেই ঢাকা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি, চেনা অচেনা নানা জায়গায় যাই, বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলি, তারা আমাকে তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা বলে। রাতে শুয়ে তাদের কথা মনে পড়ে আমার। মনে হয় তাদের ওই জীবনটি আমি নিজেই যাপন করছি, তাদের যন্ত্রণাগুলো আমি নিজেই ভোগ করছি, তাদের বিভীষিকাময় জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকি, আমার ঘুম আসে না..

ডাক্তার সাহেব চুপচাপ শুনছিলেন, সে কথা শেষ করার পরও অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর এক আশ্চর্য মন্তব্য করলেন _ পৃথিবীর সব শিল্পীই বোধহয় একেকজন গৌতম বুদ্ধ, তাই না? br /> সসে এই মন্তব্যে ভীষণ অবাক হয়েছিলো, বললো _ এ কথা বলছেন কেন?

গৌতম বুদ্ধ যেমন সবার দুঃখকষ্ট নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন সেই অমোঘ বাক্য _ জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক _ আপনারাও তেমনই। অন্য অনেক মানুষের যন্ত্রণা ভোগ করছেন নিজেই, কেউ তো আপনাকে সেই দায়িত্ব দেয়নি, তবু আপনি সেটা করেন কেন? আমার কি মনে হয় জানেন? মনে হয় বুদ্ধ বা যিশু বা মুহম্মদ পৃথিবীতে বারবার জন্মগ্রহণ করেন, এবং করেন শিল্পীদের রূপ নিয়ে। হিন্দু শাস্ত্রে যেমন অবতারের কনসেপ্ট আছে _ অধঃপতিত মানবজাতিকে উদ্ধার করার জন্য পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে একেক রূপ ধরে অবতারের আবির্ভাব হয় _ আমার মনে হয় শিল্পীরাই এ যুগের একেকজন অবতার...

সে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়েছিলো। শিল্পীদের প্রতি কারো এতটা শ্রদ্ধাবোধ থাকতে পারে, সে তা কল্পনাও করেনি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ডাক্তার বললেন _ বুদ্ধের মতো সবার যন্ত্রণা স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেবেন, আবার নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চাইবেন তা তো হয়না, তাই না! আসলে নিরবিচ্ছিন্ন-গভীর-শান্তিপূর্ণ ঘুমের জন্য একটি ভাবনাহীন সুস্থির সময় কাটানো দরকার, যে সময় মনের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করে না, আপনার মতো লোকের পক্ষে সেটা খুবই কঠিন, জানি, কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কি?

কি রকম? আমি একটা সাজেশন দিচ্ছি, এটা একটা এক্সপেরিমেন্ট, আশা করছি ভালো ফল পাওয়া যাবে।
ববলুন।

এখান থেকে বেরিয়ে কোনো একজন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাবেন, হালকা কোনো বিষয় নিয়ে গল্পগুজব করবেন, কোনো মজার স্মৃতি নিয়ে কথা বলবেন, বাসায় ফিরে প্রিয় কোনো গান শুনবেন, প্রিয় কোনো বই পড়বেন, প্রিয় একজন নারীর সঙ্গে কথা বলবেন, তারপর একটি নিটোল-কোমল প্রেমের গল্প লেখার চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমোতে যাবেন। একটি মিষ্টি প্রেমের গল্পের ভাবনা ছাড়া আর কোনো চিন্তা মাথায় আনবেন না, ওই গল্পেই নিজেকে কনসেন্ট্রেট করবেন, আপনি তো জানেনই কীভাবে সেটা করতে হয়... সসে এখন সেই চেষ্টাই করছে। একজন প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে বার-এ গিয়ে প্রিয় ব্র্যান্ডের হুইস্কি শিভাস রিগাল খেতে খেতে হালকা সব বিষয় নিয়ে কথা বলেছে, বাসায় ফিরেছে চমৎকার এক ঘোর নিয়ে, ফিরে জীবনানন্দের কবিতার বই খুলে বসে ফরিদা পারভীনের গান শুনেছে, তারপর রাত দুটোর দিকে মনে পড়েছে সেই মেয়েটির কথা, যার সঙ্গে সম্ভাব্য প্রেমটি হতে হতেও হলো না। এত রাতে ফোন করাটা অশোভন হবে ভেবেও সে মেয়েটির মোবাইলে ফোন করলো। মেয়েটি ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বললো, কেমন আছেন?

মেয়েটির এমন অভ্যর্থনায় সে অবাকই হলো, মনে হচ্ছে এত রাতে ফোন পাওয়ার জন্য ওর যেন প্রস্তুতি ছিলো, অথচ সে কোনোদিন এমন কাজ করেনি। সে বললো _ তুমি অবাক হওনি? কেন, অবাক হবো কেন?
এই যে এত রাতে ফোন করলাম!
হঁ্যা, এটা তো অবাক হওয়ার মতো ব্যাপারই। দিনের পর দিন যে সৌজন্যের খাতিরেও একটা ফোন করে না, সে হঠাৎ এত রাতে ফোন করলে অবাক তো লাগবেই _ মেয়েটির কণ্ঠস্বর এখন অন্যরকম মনে হচ্ছে, একটু আহ্লাদী, ঘুমের ঘোর এখনো কাটেনি বলে একটু যেন অচেনাও।
তুমি তো আর আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা কর না...
কি করে জানলেন, অপেক্ষা করি কী না!
কর?
সেটাও তো কোনোদিন জানতে চাননি।
এএখন জানতে চাইছি।

বলবো না, নিজে থেকে তো আর জিজ্ঞেস করেননি _ কী প্রীতিময় হয়ে উঠেছে মেয়েটির কণ্ঠ! অবশ্য বরাবরই ও এই রকম। পরিচয়ের পর থেকেই সে দেখেছে, মেয়েটি তার সঙ্গে মায়াময়-প্রশ্রয়পূর্ণ আচরণ করে, তার কতো এলেবেলে অপ্রয়োজনীয় কথাও এমন মনোযোগ দিয়ে মমতা নিয়ে শোনে ও, যেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপারই আর নেই। সত্যি বলতে কি, মেয়েটির প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলো সে, আর তার প্রধান কারণ ছিলো _ মেয়েটির কাছে এক চমৎকার মমতাপূর্ণ আশ্রয় পাওয়া যেত। এমনটি সে আর কোনো মেয়ের মধ্যে দেখেনি। একটা সহজ-স্বাভাবিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিলো তাদের মধ্যে। খুব সুন্দর গান গায় বলে সে মাঝে মাঝে মেয়েটিকে গানের পাখি বলে ডাকতো, কখনো আদর করে ডাকতো মণি বলে, মেয়েটি মৃদু লজ্জায় এইসব সম্বোধনকে কমপ্লিমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করতো। কিন্তু সে যখন তার প্রেমের কথা জানাবার প্রস্তুতি নিলো, তখনই একদিন, মেয়েটি বললো, 'আমি আদারওয়াইজ এংগেজড, নইলে আপনাকে জয় করার চেষ্টা করতাম।' মেয়েটি নিশ্চয়ই তার হাবভাব বুঝতে পেরেছিলো, মেয়েদের ইন্দ্রিয় তো খুব প্রখর হয়, অনেক কিছু ওরা আগেভাগেই বুঝে ফেলে। সে তার প্রেমের কথাটি বলার আগেই তাই মেয়েটি তার সীমাবদ্ধতার কথা কৌশলে জানিয়ে দিয়েছিলো। মেয়েটি তাকে কষ্ট দিতে চায়নি। এই সুন্দর প্রত্যাখানটি তাই ভালো লেগেছিলো তার। এ-ও তো এক ধরনের প্রেমই, আমি অন্য আরেকজনের কাছে কমিটেড, নইলে আপনার কাছেই আসতাম _ এ কথাটির মানে হলো, আমি এসেছি, কিন্তু ওই কমিটমেন্টটা আমাকে পেছন থেকে টানছে। সম্পর্কটি তাই আগের মতোই সহজ রয়ে গেছে। প্রত্যাখানের যন্ত্রণায় তাতে কোনো কালো দাগ পড়েনি। আচ্ছা, একদিন না হয় নিজে থেকে জিজ্ঞেস করে নেব। কিন্তু এত রাতে কেন ফোন করেছি সেটা তো জানতে চাইলে না।
আআপনি আমার কাছে যখন ইচ্ছে ফোন করতে পারেন, এ নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। তবু, জিজ্ঞেস করছি, কোনো বিশেষ কারণে ফোন করেছেন?

হঁ্যা। কারণটা কি?
তোমার ঘুম-ভাঙা কণ্ঠস্বর শোনার জন্য।
মেয়েটি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো, যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। সে একটু ভয়ই পেলো, কিছু মনে-টনে করে বসলো না তো! সে ডাকলো _ কি হলো?
না, কিছু না।
চুপ করে গেলে যে!
কি বলবো? _ ওর কণ্ঠস্বর কি ভেজা শোনাচ্ছে? নাকি শোনার ভুল?
তুমি কাঁদছো?
একটু চুপ থেকে ও বললো _ হঁ্যা।
কাঁদছো কেন?
ইচ্ছে হলো, তাই কাঁদছি।
আমি কি কান্নার মতো কিছু বলেছি?
একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
কর।

আমি যদি আপনার কাছে থাকতাম, তাহলে কি এমনটা আপনার ইচ্ছে করতো? শুধুমাত্র আমার ঘুম-ভাঙা কণ্ঠস্বর শোনার জন্য আমার ঘুম ভাঙাতেন?
হঁ্যা ভাঙাতাম। কিন্তু এ কথা জিজ্ঞেস করছো কেন? আমি তো প্রমাণ করার সুযোগ পাবো না...

আমার মনে হয় ছেলেরা এসব কথাবার্তা বলে মেয়েদের মুগ্ধ করার জন্য, কিন্তু একবার পেয়ে গেলে সব প্রেম উধাও হয়ে যায়। তখন মেয়েরা হয়ে যায় পুরনো...

শরীর পুরনো হয়, হতে বাধ্য, কিন্তু একজন মানুষ কি আর পুরনো হয় কখনো? সারাজীবন পাশাপাশি থেকেও কি একজন মানুষের সবকিছু জানা যায়?
কিন্তু শরীর পুরনো হলে কি মানুষটাও পুরনো হয়ে যায় না, একঘেয়ে হয়ে যায় না? মেয়েদের শরীর তো পলকা, একখণ্ড তুলোর মতো...
না, শরীর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বটে, কিন্তু সেটাই তো সব নয়। তুমি যেমন একতরফা সব ছেলেকে এক কাতারে ফেলে অভিযুক্ত করলে, সবার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। অধিকাংশ ছেলেই একটি মেয়ের মধ্যে কি খোঁজে জানো?
কি?

আশ্রয়। তুমি দু-একজনকে দিয়ে সবাইকে বিচার করছো, কিন্তু জানো না ছেলেরা কী অসহায়...সম্ভবত তুমি এ-ও জানো না, তোমার মধ্যে ওই আশ্রয়ের ব্যাপারটি প্রবলভাবে আছে। তোমার কাছে গেলে মনে হয়, এখানে আশ্রয় পাওয়া যাবে, এখানে শান্তি পাওয়া যাবে। আমার কখনো কখনো মনে হয় _ তুমি হচ্ছো গ্রীস্মের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে এক খণ্ড মেঘ, এক পশলা বৃষ্টি, এক মধুর-কোমল-প্রশান্তিময় শীতল বাতাস...

সরি, আমি আপনাকে মিন করে কিছু বলিনি। শুনুন আপনি আমাকে চমৎকার একটা কথা বলেছেন..
কোনটা?
এই যে বললেন আমার ঘুম-ভাঙা কণ্ঠ শোনার জন্য ফোন করেছেন।
ও।
বিনিময়ে আপনার যে কোনো একটা উইশ আমি রাখবো, আপনার একটা ইচ্ছের কথা বলেন।
রাখতে পারবে না।
পারবো।
পারবে না। আমি ছোট কিছু চাইতে জানি না, চাইলে খুব বড় কিছু চাই।
চেয়েই দেখুন।
তাহলে শোনো, মৃতু্য নিয়ে আমার কিছু রোমান্টিকতা আছে, সেটাই বলি।
বলুন।
আমি যেদিন মারা যাবো, তুমি খবর পেলে অবশ্যই আসবে।
এসে?
এসে আমার চোখ ছোঁবে, বলবে..
কি বলবো?
যে কথাটি তুমি আমাকে বলতে চেয়েও পারোনি, সেটাই বলবে।
আমি আপনাকে কী বলতে চেয়েও পারিনি, আপনি তা জানেন?
জানি।
মেয়েটি অনেকক্ষণ কোনো কথা বললো না। সে-ই বললো আবার _ ব্যাপারটা তোমার জন্য খুব কঠিন হয়ে গেলো, না? তাহলে আরেকটা অপশন দেই?
কি অপশন?
আমার মৃতু্যসংবাদ তো তুমি সঙ্গে সঙ্গে না-ও পেতে পারো, সেক্ষেত্রে আমার এই ইচ্ছেটা তুমি পূরণ করতে পারবে না। সেজন্যই আরেকটা অপশন দিচ্ছি। মৃত্যসংবাদ যখনই পাও, তুমি আমার কবরে যাবে, সঙ্গে নিয়ে যাবে বেলি ফুলগাছের চারা, তারপর আমার কবরের চারপাশে গুনে গুনে ঠিক পনেরটা গাছ লাগাবে। ঠিক পনেরটা, কমও না, বেশিও না।  কেন, পনেরটা কেন?
তুমি বোঝনি? না।
আমার ধারণা বুঝেছো।
না, সত্যি বুঝিনি। পনের সংখ্যাটির কি কোনো বিশেষ তাৎপর্য আছে?
আমার জন্য আছে।
কি সেটা?
সত্যি তুমি বুঝতে পারোনি?
না, সত্যি।
ততোমার পুরো নামে পনেরটা অক্ষর আছে, এই জন্য...

মেয়েটি আবার অনেকক্ষণের জন্য চুপ করে রইলো। তারপর যখন কথা বললো, তখন তার কণ্ঠে স্পষ্টতই কান্না, বললো _ আপনার কি হয়েছে বলুন তো! এরকম কথাবার্তা বলছেন কেন? আমার ঘুম আসে না মণি, অনেকদিন ধরে আমি ঘুমোতে পারি না, তুমি আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে?
আমি তো আপনার কাছে নেই, কীভাবে ঘুম পাড়াবো বলুন!
একটা গান গাও, আমি তোমার গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়বো।
ঠিক আছে, আগে আপনি শুয়ে পড়ুন।
আমি তো শুয়ে শুয়েই কথা বলছি।

তাহলে এবার চোখ বন্ধ করুন, কল্পনা করুন আমি আপনার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি..

বলতে বলতে গান শুরু করে মেয়েটি, সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের কোনো প্রার্থনা সঙ্গীত _ তব দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে _ আর তখন সে ভাবছিলো, একটি প্রেমের গল্প তো লেখাই যায়। এই একই দেশে একই বাস্তবতার মধ্যে বাস করেও তো অন্যান্য লেখকরা কী চমৎকার প্রেমের গল্প লিখছেন, আমি কেন পারবো না! আর তাছাড়া, প্রেম তো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ও বটে, চরম দুঃসময়েও ওই একটি জিনিসই মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে। যতো খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়েই যাক না কেন, মানুষ তো কখনো তার প্রেমের অনুভূতি হারিয়ে ফেলে না। এই এখন যেমন, আমার যাবতীয় দুর্ভাবনা ও দুঃস্বপ্নের মধ্যেও ঘটছে এক আশ্চর্য ঘটনা, একটি মেয়ে এই মধ্যরাতে আমাকে ফোনে গান শোনাচ্ছে! এটাই তো চমৎকার এক প্রেমের গল্প হয়ে উঠতে পারে! _ এসব ভাবতে ভাবতে ভাবতে আর গানটা শুনতে শুনতে বোধহয় সে ঘুমিয়েই পড়েছিলো, নাকি তখনো শিবাস রিগালের ঘোরেই ছিলো সে বুঝতে পারেনি, হঠাৎ সাইরেনের তীব্র শব্দে তার ঘোর কাটে।
 
২.
কিসের সাইরেন? দেশে কি যুদ্ধ লেগে গেলো? না, বোধহয় অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ, আহা না জানি কার জীবন সংকট দেখা দিয়েছে! নাকি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাচ্ছে সাইরেন বাজিয়ে? হঁ্যা, সেরকমই শব্দটা। কোথায় আগুন লাগলো? কোথায়? গুলশানের বস্তিতে, হতদরিদ্র মানুষগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু পুড়ে ছাই, কিছুই রক্ষা করতে পারেনি; কেউ কেউ এমনকি ঘুমন্ত শিশুকেও উদ্ধার করতে পারেনি, চারটে শিশু জীবন্ত দগ্ধ; মানুষের হাহাকার-আহাজারি, আমাগো সব শ্যাষ অইয়া গ্যালো গো; কেউ একজন জিজ্ঞেস করলো, এখানে তোমাদের কে আসতে বলেছিলো, গ্রাম ছেড়ে সব এখানে এসে শহরটার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছো; একজন উত্তর দিলো, শখ কইরা আসি নাই বাবা, গাঙে আমার সব খাইলো, কই যামু; আরেকজন বললো, এনজিও থাইকা ঋণ নিছিলাম, ফেরত দিবার পারি নাই, ওরা কয় মুরগির খামার কর, আমার প্যাটে নাই ভাত খামার করি কেমনে, কয় তা তুমি কর আর নাই কর ট্যাকা নিছ ঠিকঠাক ফেরত দিবা, আমি দেই কেমনে, তারা ওইসব বোঝে না, অত্যাচার করে, হ্যাষে ভিটাটুক বেইচা রাইতের বেলা পলাইছি, সাধে আসি নাই রে ভাই। আহ, এই শহর, এই বড় বড় অট্টালিকা, রাজপথগুলোতে ভাঙাগড়ার খেলা, আইল্যান্ড ভেঙে নতুন করে গড়া হচ্ছে, গাছ বোনা হবে, শহরকে সবুজ করা হবে, সৌন্দর্য বর্ধন করা হবে, আর ওদিকে ফুটপাতে ছিন্নমূল মানুষ, পুলিসের লাথি ও লাঠি, শিশুটা কাঁদছে _ আজ ভাত জোটেনি, তার মা'র চোখ ভাবলেশহীন; ফুটপাতে, রেলস্টেশনে, লঞ্চঘাটে, পার্কে, বস্তিতে কেবলই ছিন্নমূল মানুষ, পুরো দেশটিই যেন ছিন্নমূলের সংসার। তরুণী মেয়েগুলো সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে, আজ কোনো খদ্দের জোটেনি, তবু পুলিসকে বখরা দিতে হবে; কেমনে দিমু, আইজ যে কুনু কামাই নাই; তয় আয় তরে ইট্টু টিপা দেই, মাগীগো টিপাও শান্তি নাই, দুধ ঝুইলা গ্যাছে গা; তোমরা এমন করে দাঁড়িয়ে থেকো না, আমার বড় কষ্ট হয়, তোমরা যে আমার বোন _ উঁ উনি আবার বুইন মারাইবার লাগছে, পুরুষ মানুষরা আবার ভাই অয় নাকি, তরা পারস খালি লাগাইতে, তোগো তো আছে খালি ধোন, বোন বোন করস ক্যান, খাইতে দিবি, রোজ রোজ খাইতে দিবি, দিলে আর রাস্তায় খাড়ামু না, হেইডা তো পারবি না, আবার দরদ দেহায়, বোন, যা ভাগ এইখান থেইকা। কিন্তু এই বৃষ্টিতে তোমরা দাঁড়াবে কোথায়? ওই তো বজ্রপাত হলো, তোমাদের ভয় লাগে না?... কিন্তু এত আগুন কেন, বস্তির আগুন কি নেভেনি? না, এ-তো আরেক ঘটনা, ঘরভরতি মানুষ, বাইরে থেকে আটকিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে ওরা, পুড়ে মারা গেছে একই পরিবারের এগারো জন সদস্য, তাদের অপরাধ, তারা হিন্দু, সংখ্যালঘু; কেউ একজন তারস্বরে চিৎকার করছে, এ দেশ মুসলমানের, ওদের জায়গা হবে না এখানে, ওদের পুড়িয়ে মারো, তাড়িয়ে দাও, তরুণী মেয়েদের রেপ কর; ঘরের মধ্যে কিশোরী মেয়ে, দরজায় মা মিনতি করছে _ তোমরা একজন একজন করে যাও বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট, একসঙ্গে এতজনকে নিতে পারবে না। জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের তামাশা, মন্ত্রীসভার সদস্যদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী ও দেশের প্রধানমন্ত্রী নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর দলে আল বদর বাহিনীর প্রধান, বীভৎস দাড়িগোঁফের আড়ালে তার উপহাসের হাসিটি বোঝা যায় কী যায় না, আকাশে শহীদদের আত্নারা ভিড় করেছে, চিৎকার করছে _ এই সম্মান আমরা চাই না; অভিশাপ দিচ্ছে _ এই দেশ অভিশপ্ত, এ দেশের জনগণ ওদের ক্ষমতায় বসিয়েছে, যাদের জন্য জীবন দিয়েছি তারা আমাদেরকে ভুলে গেছে, তোমরা ধ্বংস হবে। হঠাৎ বিকট শব্দে বোমা ফুটলো কোথাও, কোথায়, কোথায়; হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত, হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত, হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত। নাকি রমনার বটমূলে বৈশাখ বরণে বোমা ফুটলো, নাকি উদীচীর অনুষ্ঠানে, সিপিবির সমাবেশে, গোপালগঞ্জের গীর্জায়, আহমদীয়া মসজিদে, ময়মনসিংহের সিনেমা হলে, শহীদ মিনারে বোমা পেতে রাখায় এবার কেউ সেখানে যেতে পারেনি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য; শাহজালালের মাজারে বোমা, ব্রিটিশ হাইকমিশনার, এ দেশেরই সন্তান, নিজ জন্মভূমিতে এসে আক্রান্ত। আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, ২১ জন নিহত, আহত অসংখ্য। বোমা, বোমা আর বোমা। দেশজুড়ে কেবল বোমার শব্দ, আর কোনো শব্দ নেই কোথাও। কেবল বোমা ফুটছে _ বোমার শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত, মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির বুলু নিহত, সাংবাদিকদের কাফনের কাপড় পাঠানো হয়েছে সত্য বলার অপরাধে, সত্য বলাটা এখন অপরাধ এদেশে। বিআরটিসি বাসে আগুন, এগারো জন নিরীহ মানুষ পুড়ে ছাই। হা রাজনীতি! 'বাংলা ভাইয়ের পেছনে রয়েছে সরকারী সমর্থন।' কে যেন বলছে, বাংলা হইলো হিন্দু গো ভাষা, পাকিস্তানের মুসলমানরা এই ভাষায় লিখতে-বলতে পারবো না, একান্তই যদি লিখতে হয় তাইলে আরবী হরফে বাংলা লিখতে হইবে, তার সাঙ্গপাঙ্গরা বলছে, না না, সেইটা অবাস্তব, বরং বাংলাকে ইসলামীকরণের জইন্য এর মধ্যে আরবী ফারসী শব্দের সমাহার ঘটাইতে হইবে। আরেকজন বললো, জিহাদ আর শ্রেণীসংগ্রাম সমার্থক, বামপন্থীদের উচিত ইসলামপন্থীদের সাথে মিলামিশা আন্দোলন করা। কেউ একজন বলছে, একাত্তরে আমরা কোনো ভুল করিনি, তার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে মোটাকাটা ক্ষমতাধর এক মন্ত্রী, একাত্তরে পাকিস্তানের অখণ্ডতা চেয়ে তারা কোনো অপরাধ করেনি _ তাহলে যারা দেশটা স্বাধীন করতে চেয়েছিলো তারা অপরাধ করেছিলো, দুই পক্ষ তো একসঙ্গে সঠিক হতে পারে না _ এ্যাই শুয়ারের বাচ্চা তুই খালি উল্টাপাল্টা কথা বলিস কেন, কথা বলার আগে অনুমতি নিয়ে বলবি _ কেন, অনুমতি নিতে হবে কেন, এই দেশ আমার, আমি কেন আপনাদের অনুমতি নিতে যাবো _ এই খানকির পুত তো ঘাওরা, বিলা কইরা দিমু নাকি উস্তাদ _ না, টাইম দে, ভালো হইয়া গেলে কিছু কমু না, নইলে...; শালা এতকিছু দেইখাও শিক্ষা হয় না, যখন হোগার মধ্যে তোর ওই দেশের পতাকা সুদ্ধা বাঁশ ঢুকাইয়া দিমু তখন বুঝবা মজা...

৩.
পরদিন তার বন্ধুরা হাসপাতালে তাকে দেখতে গিয়ে বলাবলি করে,
স্টুপিডটা এত চাপা স্বভাবের, এই বয়সে হার্ট অ্যাটাক, এরকম একটা অসুখ বয়ে বেড়াচ্ছিলো, বুঝতেও দেয়নি।
একজন বললো, ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে রে।
এখন না যাওয়াই ভালো, সম্ভবত ঘুমোচ্ছে, আমি গিয়েছিলাম একবার।
কেমন দেখলি? খারাপ কিছু না তো?
না, এ যাত্রা বোধহয় টিকে যাবে, অল্পের ওপর দিয়ে গেছে।
কথা-টথা বললো?
হঁ্যা, আমাকে দেখে কাছে ডাকলো, খুব দূর্বল হয়ে গেছে, ফিসফিস করে বললো, আমি একটা মিষ্টি প্রেমের গল্প লিখতে চাই। ডাক্তার বলেছে, ওটা লিখতে পারলে আমার ঘুম আসবে। আমার ঘুম হয় না রে, অনেকদিন ধরে আমি ঘুমোতে পারি না...


মার্চ - অক্টোবর, ২০০৪