কেউ বোঝেনি, কখন-কীভাবে তার ভেতরে জন্ম
নিয়েছে এক সর্বগ্রাসী ভয় আর আতংক, কেড়ে নিয়েছে তার সুখ-স্বস্তি ও
আনন্দ, আর তাকে নিক্ষেপ করেছে এক দুঃসহ দুঃস্বপ্নের জগতে। বন্ধুরা
তাকে নিয়ে _ বলা ভালো, তার অসুস্থতা নিয়ে _ আলোচনা করে, যদিও এর
কোনোকিছুই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তাদের মনে হয় _ ওর পরিবর্তনটা
একদিনে হয়নি, খুব আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছিলো বলেই হয়তো ব্যাপারটা
তেমন করে কারো চোখে পড়েনি। একসময় তো ও একাই তুমুল উচ্ছ্বলতায়
মাতিয়ে রাখতো চারপাশ, কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরেই কী এক অজানা কারণে ও
যেন কেমন বিষণ্ন আর চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিলো, সবার মধ্যে থেকেও কেমন
যেন একা, আত্নমগ্ন। তুমুল আড্ডার মধ্যেও ও বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতো।
হয়তো কোনো একটা বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড হাসাহাহাসি হচ্ছে, অথচ ও গম্ভীর,
যেন এসবের মধ্যেই নেই, যেন গভীর কোনো চিন্ত্তায় মগ্ন। বন্ধুরা জোরে
তার নাম ধরে হাক দিলে সে চমকে উঠে ফিরে আসতো বাস্তবতায়, বিহ্বল হয়ে
জিজ্ঞেস করতো _ কী, কী হয়েছে, ওরকম চিৎকার দিয়ে উঠলি কেন! বন্ধুরা
ঠাট্টা করতো _ 'চিৎকার দেই নাই চান্দুমিয়া, আপনের নাম ধইরা ডাকছি,
তা আপনে কোন দুনিয়ার আছিলেন জনাব, নয়া প্রেমে পড়ছেন মনে লয়!' তারা
আসলে ব্যাপারটাকে গুরুত্বই দেয়নি, ভাবতো _ হয়তো কোনো কারণে মন
খারাপ, কিংবা 'ভাবে' আছে! তা ও থাকেও। আফটার অল, আর্টিস্ট তো! গান
লেখে, সুর করে, গায়ও। ওর কয়েকটা গান ইতিমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
পত্রপত্রিকায় ওকে নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে _ 'ক্ষীয়মান সঙ্গীত জগতে এই
শিল্পী নিয়ে এসেছেন কথা ও সুর ও গায়কীর বৈচিত্রে ভরা নতুন
সম্ভাবনা।' সেই সম্ভাবনাময় শিল্পী এখন গান করা তো দূরে থাক, কারো
সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাই বলে না। যদি কখনো বলেও সেগুলো
পারম্পর্যহীন, উল্টোপাল্টা কথা। তার কণ্ঠে এখন সুর নেই, আছে কেবল
সীমাহীন ভয় ও আতংক। একবার তারা, অনেকদিন ওর কোনো খোঁজখবর না পেয়ে,
চার বন্ধু মিলে ওর বাসায় গিয়েছিলো। মা দরজা খুলে দিলে তারা গিয়ে
দেখলো _ ও যেন ভূতগ্রস্থের মতো বসে আছে, গুটিশুটি মেরে, এই এতোটুকু
হয়ে। ওদের দেখে চমকে উঠলো সে, বললো _ 'আপনারা কারা? কেন এসেছেন
এখানে? কি চান? এ ঘরে ঢুকলেন কিভাবে? মা, ও মা, তুমি দরজা খুলে
দিয়েছো কেন? তোমাকে না বলেছি অচেনা লোককে ঘরে ঢুকতে দিওনা!' তারা
হতবাক হয়ে গিয়েছিলো, ও আমাদের চিনতে পারছে না! অবস্থা এতোটা খারাপ!
মা এসে শান্ত্ত স্বরে বোঝালেন _ 'ওরা না তোর বন্ধু, অচেনা লোক হবে
কেন!' তারপর একেকজনের নাম ধরে ধরে ওর কাছে নিয়ে গেলেন। এতোক্ষণে
যেন একটু স্বস্তি ফিরে পেলো ও। বললো _ 'ও তোরা! চারজন একসাথে
এসেছিস কেন? জানিস না আমি চারজনকে একসঙ্গে দেখলে ভয় পাই! একা আসতে
পারিস না! কিংবা দুজন বা তিনজন বা পাঁচজন বা আটজন মিলে! চারজন মিলে
এসেছিস কেন? চলে যা, এখান থেকে তোরা চলে যা, ভাগ, ভাগ এখান থেকে,
তাড়াতাড়ি ভাগ, ও মা ওদেরকে চলে যেতে বলো।' তারা তাকে বোঝায় _ 'আমরা
কতোজন এলাম তাতে কি আসে যায়, আমরা তোর বন্ধু না!' _ 'আসে যায়' _ সে
চিৎকার করে বলে _ 'আসে যায়, চারজন হলে আসে যায়। তোরা আমাকে মেরে
ফেলবি। আমি মরে গেলে মা'র কী হবে বল! আমি ছাড়া তো মা'র আর কেউ নেই!
তোরা আমাকে মারবি, মেরে আবার মাকে সান্ত্বনা দিবি _ আল্লার মাল
আল্লায় নিয়া গেছে, কাইন্দা আর কি অইবো! বল, এসব কথা তোরা বলবি না!
অবশ্যই বলবি! চারজন যে! তারপর আমার মা কিভাবে চলবে, তার জন্য কিছু
একছু এটা করা দরকার _ এরকম একটা মহৎ ভাবনা থেকে তোরা মাকে একটা
ছাগল কিনে দিবি! কালো রঙের ছাগল। রয়েল ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট। দিবি না
বল! অবশ্যই দিবি! চারজন এসেছিস না। এরকম না করেই পারিস না!' _ তারা
এসব কথার কোনো আগামাথা খুঁজে পায় না। চারজন এলে কী এমন সমস্যা হয়,
চার সংখ্যাটির প্রতি ওর এমন ভীতি কেন, কেনই বা ওকে মেরে ফেলার
প্রশ্ন এলো, সঙ্গে এলো ছাগলের কথা _ এসবের মাথামুণ্ডু তারা কিছুই
বুঝতে পারে না। কিন্তু মনে হলো _ ভুল হয়ে গেছে, বড্ড ভুল হয়ে গেছে,
ওর দিকে অনেক আগেই নজর দেয়া দরকার ছিলো, ওর ডিপ্রেশনকে গুরুত্ব
দেয়া উচিত ছিলো, দিলে পরিস্থিতি এতোটা খারাপ হতো না।
বন্ধুরা তার অসুস্থতা নিয়ে আলোচনা করে নিজেদের করণীয় সম্বন্ধেও
সিদ্ধান্ত নিলো _ তারা তাকে একজন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যাবে।
কিন্তু কথাটা ওকে কিভাবে বলা যায়? এদেশের মানুষ মনের রোগের জন্য
ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না, ও গেলেও কথা বলবে তো? বন্ধুদের সঙ্গেই
বলে না, ডাক্তারের সঙ্গে যে বলবে তার নিশ্চয়তা কি? এসব ভেবে তারা
সিদ্ধান্ত নিলো _ ওর ব্যাপারটা নিয়ে বরং নিজেরাই আগে ডাক্তারের
সঙ্গে কথা বলবে, ওর স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ, ওর আবেগ-ভালোবাসা আর
বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে অন্তত তারা যতোটুকু জানে ততোটুকু আগেই
জানিয়ে রাখবে।
২.
ডাক্তার সাহেব সজ্জন লোক, রোগীকে না এনে তার বন্ধুরা এসেছে তার
অবস্থা নিয়ে আলাপ করতে, ব্যাপারটা তিনি সহজভাবেই নিলেন, খুঁটিয়ে
অনেক কথা জিজ্ঞেসও করলেন। বন্ধুরা জানালো _ ও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে
মেধাবী, সবচেয়ে ক্রিয়েটিভ হওয়া সত্ত্বেও সবকিছুর প্রতি এক অদ্ভুত
উদাসীনতার জন্যই হয়তো ক্যারিয়ারের ধার ধারেনি _ এমনকি পড়াশোনাও শেষ
করেনি। অসাধারণ সব গান আছে তার, কিন্তু আরো অনেকের মতো গান গেয়ে
বিখ্যাত হওয়া, অ্যালবাম বের করা, মিডিয়ায় যাওয়ার তেমন কোনো গরজই
দেখায়নি সে _ এসব কথাও জানালো। তার বর্তমান অবস্থা, চার-সংখ্যা
ভীতির কথাও জানাতে ভুললো না।
সব শুনে ডাক্তার সাহেব বললেন _ উনাকে নিয়ে আসুন, কথা বলে দেখি।
তারা তাদের আশংকার কথা বললো, সে যে কারো সঙ্গেই কথা বলে না, সেটাও
জানালো। ডাক্তার সাহেব বললেন, দেখুন নিয়ে আসতে পারেন কী না, এলে
কথাও বলবে।
তারা ভেবেছিলো সে বেঁকে বসবে, কিন্তু সেরকম কিছু ঘটলো না। সে নিজেই
বললো _ আমিও সেরকমই ভাবছিলাম। মনে হচ্ছে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি,
কোনোভাবেই সহজ-স্বাভাবিক-সুন্দর চিন্তা করতে পারছি না, কেবল
দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা-ভয়-শংকায় জীবনটা একেবারে দুঃসহ হয়ে উঠেছে।
আমাকে তোরা বরং ডাক্তারের কাছেই নিয়ে চল, দেখি উনি কোনো হেল্প করতে
পারেন কী না। এভাবে আর পারছি না রে।
তারা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো _ যাক, ও অন্তত যেতে রাজি হয়েছে।
৩.
ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে তারও টিউনিংটা হয়ে গেলো সহজেই। প্রথম
দেখাতেই হাসতে হাসতে তিনি বললেন, আপনার বন্ধুরা তো দুশ্চিন্তা করছে
যে, আদৌ আপনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন কী না! কি, বলবেন তো?
সে-ও মৃদু হাসলো _ আমার বন্ধু ভাগ্য খুব ভালো, আমাকে নিয়ে আমি নিজে
যতোটা না ভেবেছি, তার চেয়ে ওরা অনেক বেশি ভাবে।
ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখেন আপনি?
ভালোবাসা। বিশুদ্ধ ভালোবাসা। আমার কাছে ওদের পাওয়ার কিছুই নেই,
কোনো স্বার্থচিন্তা ছাড়া এতোটা ভাবা যায় কেবল বিশুদ্ধ ভালোবাসা
থাকলেই।
তাই যদি হবে, তাহলে তাদের সঙ্গে আপনি কথা বলেন না কেন?
কথা আমি কারো সঙ্গেই বলি না।
কেন বলেন না সেটাই তো জানতে চাইছি।
কি বলবো, কেন বলবো, কাউকে তো কিছু বোঝানো যায় না!
মানে, আপনি বলতে চাইছেন, আপনার কথা কেউ বোঝে না!
শুধু আমার কথা কেন, কারো কথাই কেউ বোঝে না।
কেন এরকম মনে হয় আপনার?
একটা ব্যাপার আপনি নিজেই ভেবে দেখুন, ঘুমোনোর সময়টুকু ছাড়া, মানুষ
তো সারাক্ষণই কিছু না কিছু ভাবে, কিন্তু তার কতোটুকু প্রকাশ করে?
ডাক্তার সাহেব চুপ করে রইলেন।
খুব সামান্যই, তাই না!
হঁ্যা।
কিন্তু যতোটুকু প্রকাশ করে, তার কতোটুকু বোঝে মানুষ, বা বোঝার
চেষ্টা করে?
ডাক্তার সাহেব এবার গম্ভীর।
আমার কি মনে হয় জানেন ডাক্তার সাহেব _ সে বলে চললো _ মানুষ যা যা
ভাবে তার নব্বই ভাগ কথাই বুকের মধ্যে জমা করে রেখে কবরে যায়। তাই
যদি হবে তাহলে আর কথা বলে লাভ কি?
তারপর দুজনেই চুপ করে রইলো অনেকক্ষণ।
ডাক্তার সাহেব তাঁর এই নতুন রোগীর চার-সংখ্যা-ভীতির ব্যাপারটা
প্রত্যক্ষভাবে বুঝতে চাইছিলেন, তাঁর পরিকল্পনামাফিক কথাবার্তার এক
পর্যায়ে চারজন তরুণ ডাক্তার প্রবেশ করলে মুহূর্তে তার চেহারা
পাল্টে যায়। একে একে চারজনের দিকেই তাকিয়ে আতংকে নীল হয়ে যায় সে,
কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে _ এরা কারা ডাক্তার সাহেব, কি চায়? এরা
এখানে এসেছে কেন? আমাকে মেরে ফেলবে নাকি?
না, না, আপনাকে মারবে কেন? ওরা সবাই তো ডাক্তার, আমার সহকর্মী।
কিন্তু চারজন একসঙ্গে এসেছে কেন? নিশ্চয়ই কোনো মতলব আছে। নিশ্চয়ই
ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চায়। প্লিজ ডাক্তার সাহেব, আমাকে এদের হাত
থেকে বাঁচান, ওদেরকে চলে যেতে বলুন।
আপনি খামোখা ভয় পাচ্ছেন...
না, না, আপনি বুঝতে পারছেন না, ওরা চারজন, চারজন একসঙ্গে এসেছে
মানেই হলো এটা ভয়ংকর কাণ্ড ঘটাবে, ভয়ংকর, আপনি বুঝতে পারছেন না! _
ডাক্তার সাহেব লক্ষ্য করলেন, তার বন্ধুরা যেরকম বর্ণনা দিয়েছিলো,
ব্যাপারটা সেরকমই। তিনি সহকর্মী ডাক্তারদের চলে যেতে বললেন, তারা
চলে যাওয়ার পরও সে স্বাভাবিক হতে অনেকক্ষণ সময় নিলো।
ডাক্তার সাহেব এ বিষয়ে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ভিন্ন প্রসঙ্গ ধরলেন।
বাসায় কে কে আছে, পারিবারিক কোনো সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন কী না,
বিয়ের কথা ভাবছেন কী না ইত্যাদি। শারীরিক অবস্থাও জানতে চাইলেন।
এলেবেলে আরো অনেক আলাপই হলো _ কিন্তু শুরুতে যে আলোচনা চলছিলো তার
ধারেকাছেও গেলেন না। শুধু বিদায় দেবার সময় বললেন, আপনার সঙ্গে আমি
আরও কয়েকটা সিটিং দিতে চাই। এখন কিছু ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি, একটু
রিল্যাক্স হওয়ার জন্য, আশা করছি আপনার সমস্যাটা কেটে যাবে।
সে বেরিয়ে যাবার পর তার বন্ধুরা এলো খবর নেবার জন্য। জানতে চাইলো,
ওর সমস্যা ঠিক কতোটা জটিল। ডাক্তার সাহেব জানালেন _ বেশ জটিল। আসলে
আমরা সবাই তো একটা দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, সেজন্যই...
দুঃসময় মানে বুঝতে পারছেন না! আপনারা তো এই দেশেই থাকেন, নাকি! চার
সংখ্যাটি কেন তাকে এমন শংকিত করে তোলে বোঝেন না! সামান্য একটু
চিন্ত্তা করলেই তো বোঝা যায়!
হঁ্যা, বুঝতে পারছি। কিন্তু আমরা সবাই-ই তো এই অবস্থার মধ্যে বাস
করছি, সবার তো এরকম হচ্ছে না!
হচ্ছে না, কারণ সবার মানসিক গড়ন একরকম নয়। সবাই তার মতো স্পর্শকাতর
মানুষ নয়। আমরা তো গণ্ডারের চামড়া গায়ে জড়িয়ে বসে আছি, আমাদের তাই
কোনোকিছু স্পর্শ করে না, উনি সেটা পারেননি বলেই ভুগছেন।
ও ভালো হবে তো!
আশা করছি হবে। আমি তো চেষ্টা করবোই, আপনাদের সহযোগিতা দরকার হবে।
উনি যেহেতু চারজন দেখলে অসুস্থ হয়ে পড়েন, কখনোই চারজন মিলে যাবেন
না। পারলে একজন করে যাবেন। উনাকে সময় দেবেন। হয়তো একা গেলে উনি
অনেক কথা বলবেন, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। কখনোই প্রতিবাদ করবেন
না...
৪.
বন্ধুদের চেষ্টা আর ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিত সিটিং তাকে যেন খানিকটা
স্বস্তি এনে দিয়েছে। বন্ধুরা পালাক্রমে তাকে সময় দিযে আর ডাক্তার
সাহেব তাঁর প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার দিয়ে অন্ত্তত এটুকু তাকে বোঝাতে
সক্ষম হয়েছেন যে, তাকে কেউ মেরে ফেলতে চাইছে না। একটু যেন নির্ভার
হয়েছে সে, আগে বাইরে বেরোতে ভয় পেতো, এখন একাই অ আসে ডাক্তারের
কাছে। ডাক্তার সাহেব আলোচনা শুরু করেন এলেবেলে কথা দিয়ে _ তারপর
কোনো একটা বিষয়ে নিয়ে দীর্ঘ আলাপ জুড়ে দেন। আজও তা ব্যতিক্রম হলো
না। এলেবেলে কথা ছেড়ে একসময় মূল প্রসঙ্গে এলেন _ আপনার বন্ধুদের
কাছে শুনেছি, আপনি নাকি আগে গান করতেন, ছাড়লেন কেন?
সেটার কারণ ভিন্ন।
কারণটা কি বলা যাবে?
বলা যায়, তাতে কি কোনো লাভ হবে?
লাভ হোক না হোক অন্তত বিষয়টি তো বোঝার চেষ্টা করতে পারি আমি।
তাহলে বলি...আমি খুব ঘুরতে পছন্দ করি। আগে সময় পেলেই ঢাকা ছেড়ে
বেরিয়ে পড়তাম, চেনা অচেনা নানা জায়গায় যেতাম, বহু মানুষের সঙ্গে
কথা বলতাম। তাদেরকে যখন বলতাম, আমি গানের জন্য তাদের কাছে গিয়েছি,
তখন ওই সহজ সরল মানুযগুলো পরম মমতায় আমাকে আপন করে নিতো, নিজেদের
একজন করে নিতো, তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা বলতো। ওরা একজন
অপরিচিত মানুষকেও এতো বিশ্বাস করে, ভাবলে অবাক লাগে। আমি একবার
একজন লোককে জিজ্ঞেস করেছিলাম _ এই যে আপনারা একজন অচেনা লোককে
থাকতে দিচ্ছেন, খেতে দিচ্ছেন, আমি তো খারাপ লোকও হতে পারি, আপনাদের
বড় কোনো ক্ষতি করে চলে যেতে পারি। লোকটা কি বললো জানেন? বললো _ আমি
নাকি খারাপ মানুষ হতেই পারি না। কেন? আমি যে গানের জন্য ওদের কাছে
গেছি, যে লোক গান এতো ভালোবাসে সে খারাপ মানুষ হবে কিভাবে? কী সহজ
ওদের হিসাব নিকাশ, দেখেছেন? আমি যতো জায়গায় গিয়েছি, সব জায়গাতেই
শিল্পীরা তাদের গান শুনিয়েছেন, ওদের মধ্যে এমন এক সুর আছে, এমন সব
কথা ওরা অবলীলায় রচনা করতে পারে, যে, আমাদের পক্ষে তা কল্পনা করাও
দুস্কর। আমি শুধু তাদেরকেই অনুকরণ করার চেষ্টার করেছি মাত্র, আর
সেইসব গান লিখে, সুর করে, গেয়ে হাততালি কুড়িয়েছি, প্রশংসায় ভরে
উঠেছি। একসময় আমার মনে হলো এ-ও এক ধরনের প্রতারণা। মনে হলো, আমি
আসলে নিজের স্বার্থের জন্য ওদের কাছে যাচ্ছি, ওই সহজ-সরল
মানুষগুলোর ক্ষুধা-দারিদ্র-হাহাকার নিয়ে বাণিজ্য করছি ...মনে হলো
অনিশ্চয়তা ছাড়া আমরা তাদেরকে কিছুই দিতে পারিনি বরং ক্রমাগত
প্রতারণা করে গেছি তাদের সঙ্গে। আপনি বলতে পারবেন ডাক্তার সাহেব,
এতো ভালো আমাদের মানুষগুলো, তবু তাদের জীবন কেন এতো বিভীষিকাময়?
কেন তাদেরকে এতো দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা পোহাতে হয়? তাদের অপরাধটা কি?
ডাক্তার সাহেব কোনো কথা বললেন না। সে-ই বলে চললো,
আমি এদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছি, আর মনে হয়েছে, এতো সবুজ
অন্য কোনো দেশে নেই _ যেদিকেই তাকাবেন কেবল চোখ জুড়ানো সবুজ,
এদেশের ইট-পাথরেও বোধহয় গাছ জন্মে, এতো সবুজ, এতো নদী, এতো গান
আপনি আর কোন দেশে গেলে পাবেন, বলুন? এদেশের মানুষ এতো আন্তরিক, এতো
মায়াময়, এতো সহজ-সরল, এতো দার্শনিক _ এমন মানুষই বা আপনি আর কোথায়
গেলে পাবেন? অথচ তাদের জীবন সম্ভাবনাহীন, কোথাও কোনো আলোও দেখতে
পাই না ডাক্তার সাহেব, পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনাই দেখিনা, মনে
হচ্ছে এই মানুষগুলোকে অনন্তকাল ধরে এরকম বীভৎস জীবন যাপনই করে যেতে
হবে। ...আমি বোধহয় বেশি কথা বলছি, না, ডাক্তার সাহেব?
না, না, ঠিক আছে, আপনি বলুন। আমার শুনতে ভালো লাগছে।
আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন না, আমি আর গান করি না কেন! আমাকে যে লিখতে
বলেন, সুর করতে বলেন, গাইতে বলেন _ কিভাবে করবো এসব বলুন, কান
পাতলে এখন যে আর কোনো সুর ভেসে আসে না, আসে কান্না আর হা-হুতাশের
শব্দ, আসে অসংখ্য বোমা ফাটার শব্দ, বোমা, ডাক্তার সাহেব চারদিকে
বোমা ফুটছে, কান পেতে শুনুন _ শুনতে পাচ্ছেন না? বোমার শব্দ,
কান্নার শব্দ, আহাজারি, হাহাকার, বিলাপ আপনি শুনতে পাচ্ছেন না? _
সে বলতে বলতে হাঁপিয়ে ওঠে, চোখ লাল টকটকে হয়ে ওঠে, শ্বাস-প্রশ্বাস
দ্রুত হতে থাকে, ডাক্তার দেখেন সবই, কিন্তু কিছু বলেন না, বরং
প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেন হঠাৎই _ আপনার ঘুমের কি অবস্থা? ঘুম ঠিকমতো
হয়?
না, ঘুম প্রায় হয়ই না।
কোনো ওষুধ খেয়ে দেখেছেন কখনো?
হঁ্যা, নানা ধরনের ওষুধ খেয়ে দেখেছি, লাভ হয় না।
আচ্ছা বলেন তো, আপনি যখন ঘুমোতে যান, মানে বিছানায় শুয়ে, কি ভাবেন?
নির্দিষ্ট কিছু নয়।
আচ্ছা, আপনার কোনো প্রেম নেই?
এই আচমকা প্রশ্নের জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না, শুনে একটু
থমকালো, একটু চুপ করে থেকে আপনমনে স্বগোক্তির মতো করে উচ্চারণ করলো
_ প্রেম!
হঁ্যা, প্রেম মানে.. অ্যাফেয়ার, মানে কোনো মেয়ের সঙ্গে...
ছিলো।
ছিলো! মানে এখন নেই?
না, নেই। আর থাকবেই বা কেন বলুন। আমি তো একজন অসুস্থ মানুষ, অসুস্থ
মানুষের সঙ্গে কে-ই বা সম্পর্ক রাখে!
ব্যাপারটা কি একটু খুলে বলা যায়?
ব্যাপার আর কি! প্রেমটা ছিলো এক তরফা, মানে আমি একাই ওর প্রেমে
পড়েছিলাম। একেক সময় অবশ্য মনে হতো ও-ও প্রেমে পড়েছে। তেমনই একসময় ও
বললো, আমি যেন ওর কাছ থেকে দূরে থাকি। ব্যস, আমি দূরে সরে আছি।
সে বললো আর আপনি মেনে নিলেন?
হঁ্যা নিলাম। আমি যে ওকে অসম্ভব ভালোবাসি, ওর কথা ফেলি কি করে? আদর
করে ওকে আমি ডাকতাম গানের পাখি বলে _ অসাধারণ গান গায় ও। একেক সময়
মনে হতো, আমি যে গান লিখি, সুর করি তা কেবল গানটিকে ওর কণ্ঠে তুলে
দেয়ার জন্য। তা, ও যদি সেটা না নিতে চায় আমি কি জোর করতে পারি?
আপনাকে একটা কথা বলি?
ববলেন।
আজকে বাসায় ফিরে তাকে আপনি ফোন করবেন, বলবেন, আপনি তার কাছ থেকে
দূরে আছেন দূরেই থাকবেন, কিন্তু সে যেন আপনার লেখা একটা গান গেয়ে
শোনায়। যদি আপনার কথা সে রাখে তাহলে গানটা শোনার সময় ভাবতে চেষ্টা
করবেন _ আপনাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। ভাববেন, ওর কণ্ঠে
গান তুলে দেয়ার জন্যই আপনি আবার গান লিখবেন, সুর করবেন। আমার ধারণা
এটা ভাবতে ভাবতেই সুর আপনাকে ধরা দেবে, আর আবার যদি একটা গান আপনি
সৃষ্টি করতে পারেন আপনার ঘুমও হবে... একটা শান্তির ঘুম আপনার খুব
দরকার। আর হঁ্যা, আমাদের সিটিংটা আরও কিছুদিন চলুক, না কি বলেন!
আমার সঙ্গে কথা বলতে আপনার নিশ্চয়ই অতো খারাপ লাগছে না!
৫.
সসে ডাক্তারের কাছ থেকে বেরুলো অনেক রাতে। রাত অবশ্য কোনো ব্যাপার
নয়, এ শহর তার কাছে নিজের করতলের মতোই চেনা। কতো কতো রাত সে কেবল
এই শহরের পথে পথে হেঁটে হেঁটে পার করে দিয়েছে তার কোনো হিসাব নেই।
এ ছিলো এক নেশার মতো। দিনরাত কেবল হেঁটে বেড়ানো। আর তখন ছিলো
আবিষ্কার করার বয়স, নিজের এই শহরটিকে আবিষ্কার করার আনন্দ তাকে
ঘিরে রাখতো। কতো রাজপথ, অলিগলি, তস্য গলি, অন্ধ গলি তার চেনা হয়ে
গেছে এভাবে। একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো একটি দিনের পুরো চবি্বশ
ঘণ্টা ধরেই এ শহরকে দেখবে, দেখেছেও, আর মনে হয়েছে _ একেক সময়ে এই
শহরের রূপ একেক রকম। চিরচেনা এই শহরকেও তার মনে হয়েছে অনেকখানি
অচেনা। আহা, সেই সব দিন! সেসব দিনও তার জীবনেই এসেছিলো! এখন আর
বিশ্বাসই হতে চায় না। এসব ভাবতে ভাবতে সে হাঁটছিলো। অনেকদিন পর এই
মধ্যরাতে এভাবে হাঁটতে তার ভালোও লাগছিলো খুব। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি
হয়েছে _ বৃষ্টিস্নাত রাজপথে স্ট্রিট লাইট বা গাড়ির হেডলাইটের আলো
পড়ে মুক্তোদানার মতো ছড়িয়ে পড়ছিলো, তার দেখতে ভালো লাগছিলো, একটা
শীতল হাওয়া বইছিলো চরাচর জুড়ে, তার শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছিলো, বৃষ্টির
পর আকাশ এখন মেঘমুক্ত, সেদিকে তাকিয়ে সম্ভবত অষ্টমির চাঁদ দেখে
ভালো লাগছিলো, আর এসবকিছুর মধ্যে সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ছিলো
বারবার। সে তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো, ডাক্তার সাহেব খামোখাই আবার
ফিরিয়ে আনলেন ওকে। বোঝা গেলো না, মেয়েটিকে একটুও বোঝা গেলো না, এতো
চমৎকার সম্পর্ক তাদের, হঠাৎ কি হলো, কেন মেয়েটি তাকে দূরে থাকতে
বললো, কেন সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো কিছুই বোঝা গেলো না।
এক দুর্ভেদ্য রহস্যময়তায় নিজেকে আড়াল করে কি সুখ পেলো ও? জানা হলো
না। এতো মগ্ন হয়ে সে ভাবছিলো এসব যে, খেয়ালই করেনি _ কখন তাকে ঘিরে
ফেলেছে চার ছায়ামূর্তি। সামনে এগোবার পথ নেই, পেছনে তাকিয়ে দেখলো
ওদিকটায় খোলা _ সে ইচ্ছে করলেই ঘুরে দৌড় দিতে পারে, কেন যেন এ-ও
মনে হলো _ ওরা তাকে সেই সুযোগই করে দিতে চায়, এমনকি নিজে থেকে দৌড়
না দিলে ওরাই দাবাড় দেবে! কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তার শরীর শক্ত
হয়ে ওঠে। না, পেছনে যাবার জন্য তার জন্ম হয়নি, সে সামনেই এগোবে।
কিন্তু আগেই এতোসব ভাবনার দরকার কি? ছায়ামূর্তিগুলো তার কাছে কি
চায়, সেটা অন্তত জানার চেষ্টা করা যাক, ছিনতাই করার ইচ্ছে থাকলে
করুক, তার কী-ই বা আছে আর কীই-বা নেবে! কিন্তু তাদের হাবভাব
সুবিধের মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে না যে, কেবল ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য
নিয়ে এরা এসেছে, তেমন উদ্দেশ্য থাকলে এতোক্ষণ সময় নিতো না _
ঝাঁপিয়ে পড়তো, যা কিছু আছে বের করে দিতে বলতো। ওরা সেরকম কিছু করছে
না, চুপচাপ শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে সামনে _ যেন চারটে পাথরের
মূর্তি। সে বুঝে নিলো, কথা তাকেই শুরু করতে হবে। সে বললো _ কি চান
আপানারা?
কিছুই চাই না। তাহলে পথ আগলে দাঁড়িয়েছেন কেন? আমাকে যেতে দেন।
কোথায় যাবেন?
বাসায় যাবো!
বাসায় যাওয়ার দরকার কি?
বাহ, নিজের বাসায় ফিরবো না!
ওটা তো অস্থায়ী ঠিকানা! আমরা বরং আপনাকে স্থায়ী ঠিকানায় পাঠিয়ে
দেই!
মানে!
মানে, মানুষের স্থায়ী ঠিকানা তো একটাই, কবর।
তার সারা শরীরে একটা শিরশিরে ভয়ের ঢেউ খেলে যায়, কাঁপা কাঁপা গলায়
জিজ্ঞেস করে _ মানে?
মমানে...
অই, এই চুতিয়ার লগে অতো তুলুতুলু কইরা কথা কস ক্যান? মানেডা সোজা
বুঝাইয়া দে না _ এতোক্ষণ যে কথা বলছিলো তার কণ্ঠ ছিলো মধ্যপন্থী,
তার কণ্ঠকে ছাপিয়ে ওঠে কর্কশ কণ্ঠটি _ কইয়া দে আমরা হালার পুতরে
খতম করার লাইগা আইছি।
হঁ্যা _ আবার মধ্যপন্থী _ আপনার আর বেঁচে না থাকাই ভালো বলে
সাব্যস্ত করেছি আমরা।
'আপনারা সেটা ঠিক করার কে?' _ এ কথা বলতে চেয়েও তার গলা দিয়ে কোনো
শব্দ বেরোয় না। এরা যা বলছে সেটা সত্যি সত্যি করবে নাকি? নাকি
ইয়ার্কি করছে? কিন্তু অচেনা কতোগুলো লোক তার সঙ্গে ইয়ার্কি করবে
কেন?
আপনি খুবই যন্ত্রণাকাতর জীবন যাপন করছেন _ আবার মধ্যপন্থী _ দেশের
সার্বিক পরিস্থিতিতে আপনি দারুণ উদ্বিগ্ন, যদিও আমরা উদ্বেগের
কিছুই দেখি না। কিন্তু যেহেতু আপনি সবকিছু নিয়ে দারুণ হতাশাগ্রস্থ,
পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না _ এসবই তো আলাপ করলেন ঐ
শুয়োরের বাচ্চা ডাক্তারের সঙ্গে, তাই না _ অতএব এদেশে এই
পরিস্থিতিতে আপনার আর বেঁচে না থাকাই ভালো...
কিন্তু, কিন্তু ...
হহঁ্যা, বলেন _ মধ্যপন্থী বললো _ কিন্তু কি?
এই রকম সময় নিশ্চয়ই থাকবে না! এদেশের মানুষ কোনোদিনই বাড়াবাড়ি
পছন্দ করেনি, নিশ্চয়ই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে ...
সসেটা তো আমাদের জন্য খুব ভালো খবর নয়! আর আপনি যে এরকম বিপদজনক
কথাবার্তা বলছেন...
অই, তুই খালি বেশি পঁ্যাচাল পারস _ এবার চরমপন্থী _ ওই শালা,
স্বপ্ন দ্যাখা চোদাও, সবকিছু ঠিক অইয়া যাইবো, চুতমারানী এ্যাতো
দ্যাশ দ্যাশ করস ক্যান, মুখে অন্য কোনো কথা জোগায় না? শুয়ারের
বাচ্চা, কবিতা ল্যাখো! গান কর! শিল্প চর্চা চোদাও! তোমার এইসব
শিল্প-টিল্প তোমার হোগা দিয়া ভরতাছি _ এইসব বলতে বলতে তারা কখন
তাকে মারপিট শুরু করেছিলো সে বলতে পারবে না। প্রথমে এলোপাথারি
চড়-থাপ্পর-ঘুসি-লাথি, তারপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাথারি কোপ, সে
একসময় অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছিলো। তার চোখ জুড়ে নেমে এসেছিলো ঘোরতর
অন্ধকার...
৬.
কী মধুর আচ্ছন্নতা, কী গভীর-কোমল মায়াময় ঘোর _ ঘুম আসেনি, আর কেউ
না বুঝুক, সে নিজে সেটা বুঝতে পারছে, কিন্তু জেগে থাকার যন্ত্রণাও
এখন আর তাকে পোহাতে হচ্ছে না। ঘুমের জন্য উচ্চমাত্রার ইনজেকশন
দেয়ার আগে হাসপাতালের এই রোগীবহুল ওয়ার্ডটিকে মনে হচ্ছিলো একটা
মাছের বাজার _ এতো কোলাহল, এতো হৈ চৈ, জীবন-মৃতু্যর সন্ধিক্ষণে
দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর যন্ত্রণাকাতর আর্তচিৎকার, তাদের
আত্নীয়-স্বজনদের হাহাকার-কান্নাকাটি-দৌড়াদৌড়ি, ওয়ার্ডবয়দের
ধমক-ধামকি, এতোগুলো মরণাপন্ন রোগীর জন্য যেখানে অন্তত দশজন ডাক্তার
থাকা দরকার সেখানে মাত্র একজনের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেয়া প্রায়
অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তার চোখে-মুখে বিহ্বলতা, ছুটে ছুটে এক রোগীর কাছ
থেকে আরেক রোগীর কাছে যাচ্ছেন, ওষুধ লিখে রোগীর আত্নীয়-স্বজনদেরকে
তাড়াতাড়ি নিয়ে আসতে বলছেন, নার্সরা দুর্ব্যবহার করছে _ এতো লোক
এখানে বসে আছেন কেন, সরেন, সরেন _ এই এতোসবকিছূ তার কাছে দুঃসহ
যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিলো, মনে হচ্ছিলো কেউ তার মাথায় দশহাজার
হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে; তারপর একজন নার্স এসে তাকে ইনজেকশন দিলো,
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বন্ধুকে বললো _ 'এখনি ঘুমিয়ে পড়বে, ওনার
ঘুমানো দরকার, চিন্তার কিছু নেই, লম্বা একটা ঘুম দিলেই দেখবেন
অনেকখানি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।' কিন্তু ঘুম আসেনি, কেবল এক মোহময়
আচ্ছন্নতায় আক্রান্ত সে এখন; কোলাহলগুলোকে মনে হচ্ছে দূর থেকে ভেসে
আসা গুঞ্জনের মতো _ ভালো লাগছে; অনেকগুলো চেনা বা প্রায় চেনা মুখ
চোখে ভেসে উঠতে না উঠতে আবার হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে নতুন মুখ দেখা
দিচ্ছে, এভাবে অনেক অনেক প্রিয় মুখ দেখতেও ভালো লাগছে তার। কিন্তু
ঘুম কেন আসছে না, মনে হচ্ছে যেন তলিয়ে যাচ্ছি কোনো অতল সমুদ্রে,
তবে কি মরে যাচ্ছি আমি, কেন আমার এমন অনুভূতি হচ্ছে _ সে ভাবছিলো।
আহা, যাওয়ার আগে বোধহয় ওই মুখটি আর দেখা হলো না । আমার গানের পাখি।
গানের পাখি পর্যন্ত ঠিক ছিলো _ কিন্তু ও একবার বলেছিলো _ আপনি
আমাকে 'আমার গানের পাখি' বলে ডাকবেন, আমি তো আপনার জন্যই গান করি!
মিথ্যে কথা _ বলাই বাহুল্য, তবু কী যে ভালো লেগেছিলো! কী মধুর এক
মিথ্যে! ওর সবকিছুই মধুর, মায়াময়, সুন্দর, আমার পৃথিবীর সুন্দরতম
মানুষটি ও। তুই এখনো আছিস দোস্ত _ সে তার বন্ধুর উদ্দেশ্যে বলে _
আমি বোধহয় মরে যাচ্ছি রে, ওকে একটু খবর দে না! আহ, বুঝতে পারছিস
না, ওকে _ পাখিকে, আমার গানের পাখিকে _ একটু আসতে বল না! আমি
সামান্য মানুষ, আমার পৃথিবীটাও খুব ছোট, আমার চাওয়া-পাওয়াগুলোও ছোট
ছোট, কাজকর্মগুলো সামান্য সামান্য _ অথচ সেই আমিই কী না দেখা পেয়ে
গেলাম ওর... না ওকে ডেকে লাভ নেই, ও আসবে না, আমি তো অসুস্থ মানুষ,
কেনইবা আসবে! তুই বরং মাকে ডেকে আন, আমার মা, কী পবিত্র, কী বিষণ্ন
ওই মুখ! আমার মা, আহারে, আমার দেশের মতো দুঃখী আমার মা, যাবার আগে
ওই মুখ একবার চোখ ভরে দেখে যাই! ওই যে একটা গান আছে না, যদি মরণের
পরে কেউ প্রশ্ন করে কী দেখেছি...আমি কি বলবো জানিস, বলবো, আমার
মায়ের মুখ দেখেছি, আমার মায়ের মুখে বাংলাদেশের ছবি আঁকা আছে, ওই
মুখ দেখলে কী আর কিছু দেখার বাকি থাকে বল! সে এইসব বলছিলো _
(কিন্তু পাশে বসে থাকা বন্ধুটি এসবের কিছুই শুনতে পাচ্ছিলো না,
শুধু দেখছিলো তার ঠোঁট নড়ছে, ঠোঁটের কাছে মুখ নিয়েও সে কিছুই শুনতে
পায় না) _ আর এসব বলতে বলতে তাকে গ্রাস করে নেয় মৃতু্যভয়, সে জেগে
থাকার প্রাণপন চেষ্টা করতে থাকে, মনে হয় একবার ঘুমিয়ে গেলে সেই ঘুম
আর কোনোদিন ভাঙবে না ...
৭.
হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার বন্ধুরা ফিসফিসিয়ে কথা বলে। একটা
আতংক সবার মধ্যে। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। কে বা কারা ওর মতো
একজন নিরীহ লোককে এভাবে পেটালো, কেনই বা পেটালো _ তা কারো বোধগম্য
হচ্ছে না। ছিনতাই-টিনতাইয়ের কোনো ঘটনা নয়, বোঝাই যাচ্ছে। কিছুই
খোয়া যায়নি ওর। তাহলে? সবার মধ্যে প্রশ্ন, আতংক, দুশ্চিন্তা, শংকা।
ও বেঁচে উঠবে তো?
একজন বললো, ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে রে।
এখন না যাওয়াই ভালো, সম্ভবত ঘুমোচ্ছে, আমি গিয়েছিলাম একবার।
কেমন দেখলি? খারাপ কিছু না তো?
বলা যাচ্ছে না। তবে ডাক্তার বললো, হয়তো বেঁচে যাবে। একবার জ্ঞান
ফিরেছিলো, সেটাই আশার কথা।
কথা-টথা বললো?
হঁ্যা, আমাকে দেখে কাছে ডাকলো, খুব দূর্বল হয়ে গেছে, ফিসফিস করে
বললো, আমি একটা গান লিখতে চাই, আবার একটা সুর করতে চাই। ডাক্তার
বলেছে _ এটা করতে পারলে আমার ঘুম আসবে। আমার ঘুম হয় না রে, অনেকদিন
ধরে আমি ঘুমোতে পারি না...
|
| |
 |
|