রফিক সচরাচর বাড়িতে আসেনা, বছরে-দু'বছরে
একবার এলেও তিন/চার দিনের বেশি থাকে না কখনো। আর ফিরে যাওয়ার সময়
তার আচরণে এমন কোনোকিছু দেখা যায়না যা দেখে মনে হতে পারে _ সে আবার
কোনোদিন এদিকে পা বাড়াবে। মাঝে মাঝে সে এতো দীর্ঘদিন যোগাযোগ
বিচ্ছিন্ন থাকে যে, সবাই প্রায় ভুলেই যায় _ এ বাড়িতে রফিক নামের
কোনো একজন ছিলো কোনোদিন। তবু, এই কিছুদিন আগে প্রায় সপ্তাহখানেক
বাড়িতে কাটিয়ে যাবার পর, এতো তাড়াতাড়ি হঠাৎ করে আবার তাকে আসতে
দেখে, তার চাচা _ উদাসপুর হাই স্কুলের হেড মৌলবী দীন মোহাম্মদ
ভুঁইয়া _ শুধু অবাকই হলেন না, এক গভীর দার্শনিক চিন্তায় ডুবে
গেলেন। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন _ প্রতিটি ঘটনার মধ্যেই কোনো
না কোনো ইশারা বা ইঙ্গিত লুকোনো থাকে; মানুষ তা খুঁজে দেখেনা বলেই
বুঝতে পারে না। বিশেষ করে অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ,
আল্লাহপাক এসবের মাধ্যমে বান্দাদের কাছে পরবর্তী ঘটনাসমূহের জন্য
গভীর কোনো ইশারা পাঠান। রফিকের এই হঠাৎ বাড়ি আসার মধ্যেও গভীর কোনো
ইশারা আছে এবং তিনি এর সঙ্গে পরীর মা'র মৃতু্যর একটা যোগসূত্র আছে
বলে মনে করছেন _ কিন্তু সেটা যে কী তা বুঝে উঠতে পারছেন না। পরীর
মা _ এ বাড়িতে আশ্রিতা এক ভিখারী, একসময় প্রতিটি সম্ভ্রান্ত সচ্ছল
পরিবারে এমন দু'চারজন আশ্রিত মানুষ থাকতো, তেমনি একজন _ আজ সকালেই
মারা গেছে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরেই মৃতু্য যন্ত্রণায় কাতরাতে
কাতরাতে এই মহিলা, আর কারো কথা নয়, কেবল রফিকের নামই উচ্চারণ
করছিলো। দীন মোহাম্মদ সাহেব একবার রফিককে খবর দেবার কথা ভেবেছিলেন,
কিন্তু ব্যাপারটাকে সে আদৌ পাত্তা দেবেনা ভেবে আর দেয়া হয়নি। রফিক
বাড়িতে তো আসেই না, কোনোদিন একটু খোঁজও নিয়ে দেখে না, কে কেমন আছে।
দীন মোহাম্মদ সাহেব মাঝে মাঝে দায়িত্ব মনে করে চিঠি লেখেন, রফিকের
কুশলাদি জানতে চান _ সে তার উত্তর দেবারও প্রয়োজন মনে করে না। এখন
আর এ নিয়ে কোনো অভিযোগ-অনুযোগ বা অভিমান প্রকাশ করে না বাড়ির কেউ,
কিন্তু একবার সবাই তার আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছিলো। দীন মোহাম্মদ
সাহেবের বড় মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলার সময় রফিককে আসার জন্য
অনুরোধ করেছিলেন তিনি। যতোই দায়িত্বহীন হোক, সে যে এ বাড়ির বড়
ছেলে, কথাটা কেউ কখনো ভুলে যায় না, কিন্তু রফিক তখন আসেনি। এমনকি
বোনের বিয়ের সময়ও আসেনি। প্রায় দু'বছর হয়ে গেলো, আজ পর্যন্ত সে
জানতেও চায়নি _ বোনটার কোথায় কার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, কেমন আছে সে
ইত্যাদি। এই ছেলেটিকে তিনি, তার বড় ভাই রইস আহম্মদ ভুঁইয়ার হঠাৎ
মৃতু্য এবং ভাবীর অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাবার পর, কোলেপিঠে করে বড়
করেছিলেন, এখন সেটা আর নিজেরই বিশ্বাস হয় না। মানুষ কিভাবে এমন
অকৃতজ্ঞ হয়? যা হোক _ যে ছেলে নিজের বোনের বিয়েতে আসার প্রয়োজন বোধ
করে না, সে পরীর মা'র অসুস্থতার খবর পেয়ে আসবে _ সেটা ভাবা নিশ্চয়ই
বাড়াবাড়ি। দীন মোহাম্মদ সাহেব তাই খবর দেবার প্রয়োজন মনে করেননি।
অথচ কী আশ্চর্য, সকালে পরীর মা মারা গেছে, আর দুপুরের মধ্যেই কী না
ছেলেটা বাড়ি এসে হাজির! আজকে সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, এই
ঝড়-বাদলের মধ্যে কেউ বাইরেই বেরুতে চায় না, আর সে কী না ঢাকা থেকে
এসে হাজির হয়েছে! এর মানে কি? যদিও পরীর মা'র মৃতু্যসংবাদ তাকে
দেয়া হয়নি, তবু তার এই আসার সঙ্গে যে ব্যাপারটার যোগসূত্র আছে দীন
মোহাম্মদ সাহেবের সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আছে ইশারা ও ইঙ্গিত।
তিনি নিশ্চিত। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও ইঙ্গিতটা তিনি ধরতে পারছেন
না।
রফিক পরীর মার মৃতু্যসংবাদ পেয়েছে বাড়িতে পেঁৗছার পরপরই। শুনে
গম্ভীর হয়ে দীন মোহাম্মদ সাহেবকে শুধু জিজ্ঞেস করেছে _
লাশ কোথায় রেখেছেন?
বাইরের ঘরে।
বাইরের ঘর মানে 'বাহির-বাড়ির' ঘর। এ বাড়িটা অনেক বড়, তার আবার
দু'টো অংশ। বাইরের অংশে একটি ঘর, পারিবারিক কবরস্থান, মসজিদ ছাড়াও
অনেকখানি খালি জায়গা। অন্দরমহলও অনেকখানি জায়গা নিয়ে। সেখানে দু'টো
দালান। একটি বেশ পুরনো _ রফিকের দাদার আমলের _ কিন্তু আজও বেশ
মজবুত, একটা গাঁথুনিও হালকা হয়নি এখনো। বাড়িতে এলে রফিক এঘরেই
থাকে, সবাই ওটাকে 'রফিকের ঘর' বলে। অন্য দালানটি নতুন _ দীন
মোহাম্মদ সাহেব বানিয়েছেন।
বাইরে কেন, ভেতরে এনে রাখেন।
ভেতরে এনে লাভ কি? দাফন করতে হবে না?
সেটা তো বৃষ্টি থামার আগে করতে পারছেন না, ততোক্ষণ ভেতরেই থাকুক।
দীন মোহাম্মদ সাহেব আর ঘাটাননি। লাশ এনে রফিকের ঘরের বারান্দায়
রেখেছিলেন, বৃষ্টির ছাঁট আসে বলে ঘরের ভেতরে রাখতে হয়েছে।
রফিকের হাবভাব সুবিধের মনে হচ্ছে না তার কাছে। যদিও এমন কিছুই সে
করেনি, তবু তার মনে হচ্ছে _ কোথাও কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। একটা
সমস্যা, ইশারা বা ইঙ্গিতের চিন্তায় তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন।
২.
আজ আমার বাড়িতে আসার কথা নয় _ সত্যি বলতে কি, কোনোদিনই আসার কথা
থাকে না _ তবু সকালে উঠেই কি যে হলো, একদিন থাকার মতো কাপড়চোপর
ব্যাগে ভরে দ্রুত বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। কয়েকদিন ধরেই, কেন
জানি না, খুব অস্থির লাগছিলো। কোনো কাজে মন বসাতে পারছিলাম না,
থেকে থেকে মনে হচ্ছিলো _ কে যেন আমাকে ডাকছে _ যদিও আমাকে ডাকার
মতো কেউ নেই কোথাও; আর একা থাকলেই মনে হচ্ছিলো _ কোথাও কিছু যেন
ভেঙে পড়ছে। আমি রীতিমতো ভেঙে পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম! নিজের এই
অবস্থার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে ছিলো না। আমি যুক্তিবাদি মানুষ,
নিষ্ঠুরভাবে সব আবেগ জীবন থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছি _ আমার এই
হঠাৎ আসা তাই নিজের কাছেই অস্বাভাবিক লাগছে। এসে পরীর মা'র
মৃতু্যসংবাদ পেয়েছি। জেনেছি এ কথাও যে, কয়েকদিন ধরেই সে কেবল
আমাকেই দেখতে চাচ্ছিলো। আমাকে খবর দেয়া হয়নি কেন, এ প্রশ্ন আমি
নিশ্চয়ই করতে পারতাম, করিনি। বাড়ির যে কোনো বিষয় থেকেই আমি দূরে
থাকতে চাই, একথা অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছি সবাইকে। তো, পরীর মা মারা
গেছে, বা কয়েকদিন ধরে সে আমাকে দেখতে চাচ্ছিলো _ এর সঙ্গে আমার গত
কয়েকদিনের অস্থিরতা বা আজকে হঠাৎ করে বাড়ি চলে আসার কোনো সম্পর্ক
আছে কী না সেটা একটা প্রশ্ন বটে। এমন কোনো জৈবিক তরঙ্গের কথা আমার
জানা নেই যার মাধ্যমে দু'জন মানুষ ভিন্ন জায়গা থেকে কোনো যোগাযোগ
মাধ্যম ছাড়াই পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। অতএব, এটা আমার
জন্য মেনে নেয়া কষ্টকর যে, পরীর মা'র মৃতু্যর সঙ্গে আমার মানসিক
অস্থিরতা বা হঠাৎ করে বাড়িতে আসার কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু বিষয়টি
আমি ব্যাখ্যাও করতে পারছি না। তার মৃতু্যসংবাদে কেনই বা আমি এমন
গভীর শোকে আক্রান্ত হয়েছি সেটাও বুঝতে পারছি না। আমার ভেতরে
রীতিমতো ভাঙচুর চলছে। এমন হওয়ার কারণ কি? পরীর মা তো আমার কেউ ছিলো
না। এ বাড়িতে আশ্রিত এক অন্ধ বুড়ো ভিক্ষুক সে _ ছোটবেলা থেকে তাকে
দেখে আসছি; বলার অপেক্ষা রাখে না, তার সঙ্গে একটা সম্পর্কও তৈরি
হয়েছিলো আমার। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তার মৃতু্যতে আমি একেবারে
ভেঙে পড়বো। ব্যাপারটা আমি গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছি। এমন কি হতে
পারে যে, যে সমস্ত বন্ধন আমি ছিন্ন করেছি, যেসব আশ্রয় আমি অস্বীকার
করেছি _ তার সবকিছু ওই একটি জায়গাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছিলো? তা যদি
হয়ও, কেন সেটা হবে, তা-ও ভাবছি। বাবাকে আমার মনে পড়ে না, আমার খুব
ছোটবেলায় _ তার যুুবক বয়সেই _ তিনি মারা গেছেন এবং তার মৃতু্যর
বছরখানেকের মাথায় আমার মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়েছে। এ দু'টো বিষয় কি
আমাকে এমন এক চরিত্রে পরিণত করেছে? মনে হয় না। বাবার মৃতু্য আমার
মধ্যে কখনো তীব্র কষ্টের অনুভূতি তৈরি করেনি। আসলে বাবা থাকা ও না
থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্যই বুঝতে পারিনি কোনোদিন _ যেহেতু আমি
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার মৃতু্য হয়েছিলো। কোনো কিছুর অনুপস্থিতি
তীব্রভাবে টের পাওয়া যায় তখনই যখন ওই জিনিসটির উপস্থিতি জীবনে গভীর
ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমার জীবনে বাবার উপস্থিতি টেরই পাইনি।
মা'র ব্যাপারটাও তাই। আমাকে এ বাড়িতে ফেলে রেখে তিনি যখন আবার
বিয়ের পিড়িতে বসেছিলেন _ তখন আমার কেমন লেগেছিলো তা বলতেই পারবো
না। মা নেই এ জন্য ওই ছোটবেলায় হয়তো দু'চারদিন কেঁদেছিলাম, তারপর
তার অনুপস্থিতির সঙ্গেই মানিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। যেমন পৃথিবীর
সবচেয়ে পবিত্র সৃষ্টি, শিশুরা _ আস্তে-ধীরে পৃথিবীর কুৎসিত সব
দৃশ্য ও মানুষদের সঙ্গে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নেয়। মাকে আমি ভুলেই
গিয়েছিলাম। বড় হয়ে যখন তার কথা জানতে পারি _ আমার মধ্যে তীব্র
অভিমান তৈরি হয়েছিলো। আমাকে রেখে এমন একটা কাজ মা করতে পারলো _ এই
অভিমান দীর্ঘদিন বয়ে বেরিয়েছি আমি। কিন্তু একটা সময় তার অসহায়ত্বের
বিষয়টিও বুঝে নিয়েছি। মা নাকি খুব রূপসী ছিলেন, তরুণী বয়সেই বিধবা
হওয়াটা তার জন্য বিপদ-বিপত্তি ও অসহায়ত্ব ডেকে এনেছিলো। আমাদের
সমাজে সব স্তরেই যেমন বিধবারা নিগৃহিত হয়, রূপসী হলে তো কথাই নেই _
তাকেও নিশ্চয়ই সেসবের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো! শুনেছি, আমার নানা
মাকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে, প্রায় জোর করেই আবার বিয়ে দিয়েছিলেন _
রূপসী মেয়ের অকাল বৈধব্য তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। তাছাড়া ওই
সময় এ বাড়িটা মা'র বসবাসের জন্য নিশ্চয়ই উপযুক্ত ছিলোনা _ আমার
দাদা-দাদি ছিলেন না, স্বামী মারা গেছে, থাকার মধ্যে এক দেবর _ আমার
চাচা, তার কাছে থাকাটাই বা কেমন দেখায়! আমার চাচা অবশ্য, প্রচলিত
অর্থে, খুব ভালো মানুষ। মা-বাবার অনুপস্থিতিতে আমাকে তিনিই বুকে
তুলে নিয়েছিলেন, স্নেহ-আদর-শাষন-মমতা-ভালোবাসা দিয়ে চাচা-চাচী
আমাকে বড় করে তুলেছেন, বহুদিন পর্যন্ত আমি তাদেরকেই আমার মা-বাবা
বলে জেনেছি, ডেকেছিও। বড় হওয়ার পর চাচাই সত্যটা জানান আমাকে, চাচীর
তাতে তীব্র আপত্তি ছিলো। আমি যখন তাকে চাচী বলে ডাকতে শুরু করি,
তখন তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন তিনি, বলতেন _ আমিই তোর মা,
উনি তোকে মিথ্যে বলেছেন! তুই আমাকে চাচী ডাকবি না, খবরদার। এরপর
থেকে আমি আর তাকে চাচী ডাকিনি, মা-ই ডেকেছি। যাহোক, মা-বাবার
অনুপস্থিতি আমার গভীর অবচেতনে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে কী না
আমি জানি না, সচেতনভাবে করেনি। এবং তাদের অনুপস্থিতিতে আমি কখনো
স্নেহ-মমতার অভাবে ভুগিনি। বিপুল ভালোবাসায় চাচা-চাচী আমাকে বড় করে
তুলেছেন, এ নিয়ে তাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তবু যে তাদের
সঙ্গে আমার দূরত্ব সেটা ইচ্ছেকৃতভাবে তৈরি। ব্যাপারটা ছিলো এই রকম
: ছোটবেলা থেকে আমি চাচার কাছে আমাদের পরিবারের মহিমান্বিত কাহিনী
শুনে এসেছি। আমার দাদা ছিলো এই, তার বাবা ছিলো ওই ইত্যাদি ইত্যাদি।
যেন তারা কতো মহান, কতো বিশাল, যেন তারা না এলে এই পৃথিবীর কতোই না
ক্ষতি হয়ে যেতো! এবং অদ্ভুত ব্যাপার হলো _ এ অঞ্চলে 'ভুঁইয়া বাড়ি'
সত্যিই একটি ব্যাপার। সেটা বিশেষভাবে বোঝা যায় ইলেকশনের সময়। যে
কোনো ইলেকশনে _ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সংসদ নির্বাচন _ ভুঁইয়া
বাড়ির সমর্থন অন্তত ৪/৫ টি গ্রামের মানুষকে প্রভাবিত করে! এখন
অবশ্য অবস্থা ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে _ গ্রামে কৃষকদের ছেলেমেয়েরা
শিক্ষিত হচ্ছে, স্থানীয় স্কুল-কলেজে ছাত্রদল-ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির
ইত্যাদি নানাবিধ ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছে; ১০/১২
বছর আগেও এমনটি ছিলো না _ তারা এখন অনেককিছু বোঝে, নিজেদের
সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারে; সেটা শুধু রাজনৈতিক ব্যাপারে নয়, যে
কোনো ব্যাপারেই। ভুঁইয়া বাড়ির মহিমা তাই দিন দিন ম্লান হতে চলেছে।
অবশ্য এই মহিমাটা এতোদিন ধরে ছিলো কেন সেটাই কোনোদিন ঠিকঠাক বুঝে
উঠতে পারিনি আমি। চাচা আমাকে যতোই এই পরিবারের গৌরবগাঁথা শোনান না
কেন _ আমি বুঝি, এর ভেতরটা ফাঁপা, গৌরব করার মতো আসলে তেমন কিছু
নেই। আমার পূর্বপুরুষেরা কিছু জমিজমার মালিক ছিলেন, পরিমাণে সেটা
যথেষ্টই, অল্পবিস্তর শিক্ষাদীক্ষাও ছিলো। এই দিয়ে কোনো মহান ভূমিকা
রাখা যায় না, কিন্তু কলার বাগানে একটা খেজুর গাছকে যেমন যথেষ্ট
লম্বা দেখায় আমার পূর্বপুরুষেরাও ছিলেন তেমন _ এই অজপাড়াগাঁয়ে
তাদেরকে লম্বাই দেখাতো _ যদিও অতোটা লম্বা তারা নন। সন্দেহ নেই
শিক্ষাদীক্ষা না থাকলেও এদের বুদ্ধি ছিলো যথেষ্ট, নইলে একটি
বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের মনোজগতে তাদের প্রতি এমন নির্ভরশীলতা এবং
প্রভাব তৈরি করা এবং তা অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হতো না। এই প্রভাব
ছিলো এমনই যে, ভুঁইয়া বাড়ির ছেলেদের সব অপরাধও তাদের প্রশ্নহীন
আনুগত্যে ম্লান হয়ে যেতো। তো চাচার অব্যাহত গৌরব-কীর্তনে এবং
লোকজনের এসব অ্যাটিচিউড দেখে আমার মধ্যেও অনেকদিন পর্যন্ত
'বংশগৌরব' বিদ্যমান ছিলো। সেটা প্রথম চিড় খায় আমি স্কুল পাশ করে
শহরের কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। স্কুলের পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করায়
এটা ছিলো চাচার কাছ থেকে আমার জন্য একটা পুরস্কার, তিনি নিজে এসে
আমাকে ঢাকার নামজাদা কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ তার নিজের
ছেলেমেয়েরা কেউ গ্রামের কলেজে, কেউ বা বড়োজোর মফস্বলের কলেজে পড়ার
সুযোগ পেয়েছে। তিনি বোঝেননি তার এই পুরস্কার তার জন্যই আত্নঘাতি
হবে। যাহোক, কলেজে ভর্তি হয়ে আমি রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গেলাম। সারা
দেশ থেকে সেরা ছেলেরা এসে এই কলেজে ভর্তি হয় _ এদের অন্তত অর্ধেক
শহুরে এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের। তাদের সঙ্গে বসে ক্লাস করি বটে,
কিন্তু নিজেকে একটা গেঁয়ো ভূত ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না, নিজের
গ্রাম্যতা আর অজ্ঞতা নিয়ে কুণ্ঠিত হয়ে থাকি সবসময়। আমার এতোদিনের
লালিত বংশগৌরব ধুলোয় লুটিয়ে যাবার জোগাড় হলো, যে বংশে পরিচয় দেবার
মতো একটি নাম নেই, তার আবার বংশগৌরব! মনে হলো _ কী আশ্চর্য
বিভ্রমের মধ্যে দিয়েই না বড় হয়ে উঠেছি আমি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার
জন্যই যে বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হলাম আমি তা নয়। বিচ্ছিন্ন হলাম অন্য
কারণে, সেটা বলতে গেলে একটু বিস্তৃতভাবেই বলতে হবে। অভিজ্ঞতা থেকে
দেখেছি _ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের ব্রেন ওয়াশ করার জন্য,
অর্থাৎ একজন তরুণকে আমূল পাল্টে দেবার জন্য তিন ধরনের সংগঠন খুব
সক্রিয় থাকে। এর দু'টো রাজনৈতিক, অন্যটি অরাজনৈতিক। রাজনৈতিক সংগঠন
দু'টো আবার পরস্পরবিরোধী _ একটি বামপন্থী, অন্যটি ইসলামিক
মৌলবাদী। অরাজনৈতিক সংগঠনটি ধর্মীয় _ তবলীগ জামাত। কলেজে ভর্তি
হওয়ার তিন মাসের মধ্যে আমি প্রথম মুখোমুখি হলাম তবলীগ জামাতের। এক
শুক্রবার বিকেলে আমার রুমের দরজায় নক করলো তারা, বোঝাতে শুরু করলো
_ ইসলামের মহিমা, ধর্ম-কর্মের প্রয়োজনীয়তা, বিশেষ করে তবলীগের
ফজিলত এবং এর আবশ্যিকতা। তিন চেল্লায় বেহেশত প্রাপ্তির নিশ্চয়তাও
দিলো তারা; কিন্তু লাভ হলো না কোনো। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তারা যে
আমাকে দলে ভেড়াতে পারেনি, তার কারণ দু'টো। প্রথমত, চাচার কারণেই
ধর্ম সংক্রান্ত অনেক পড়াশোনা করতে হয়েছিলো আমাকে, এবং তারচেয়ে বেশি
শুনেছি তার কাছ থেকেই। অনেকরকম সীমাবদ্ধতা ও স্ববিরোধিতা
স্বত্ত্বেও আমি চাচার কিছু গুণের কথা স্বীকার করি। তার মধ্যে একটি
হলো _ ধর্মকে তিনি কেবল মাত্র নামাজ রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে
দার্শনিকভাবে বিচার করার চেষ্টা করেন। এই গুণটি বেশ দুর্লভ। এ দেশে
ধর্ম নিয়ে যা হয় তা আসলে বিরাট অজ্ঞতারই ফল। তো, চাচা কোনোদিন
আমাকে নামাজ-রোজা ইত্যাদির জন্য চাপাচাপি করেননি, যদিও তিনি নিজে
বেশ ধার্মিক। তিনি বলতেন _ তুমি যদি আল্লাহর মহিমা বুঝতে পারো
তাহলে একদিন কৃতজ্ঞতাবশতই তার আদেশগুলো পালন করতে শুরু করবে।
তবলীগওয়ালারা যেমন আমাকে ভয় দেখিয়ে আল্লাহ যে একজন ভীতিকর সত্ত্বা
সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করতো, চাচা কখনো সেটা করেননি। তিনি আমাকে
সুন্দর সব দৃশ্য দেখাতেন, বলতেন _ যিনি এতোসব সুন্দরের স্রষ্ঠা
তিনি কি নিষ্ঠুর হতে পারেন? বলতেন _ বেহেশতের লোভে বা দোজখের ভয়ে
নয়, ধর্ম-কর্ম করা উচিত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য।
চাচার এসব কথাবার্তার প্রভাব আমার মধ্যে রয়ে গিয়েছিলো বলেই তবলীগ
আমাকে আকর্ষণ করেনি। দ্বিতীয় কারণটিও প্রথমটিরই সমপ্রসারণ। আমি
বুঝতেই পারিনি _ কলেজ পড়ুয়া একজন তরুণকে সবসময় আল্লাহর ভয়ে তটস্থ
হয়ে থাকতে হবে কেন _ তার অপরাধটা কোথায় যে, আল্লাহ তাকে শাস্তি
দেবার জন্য একেবারে উদ্যত হয়ে আছেন? তাছাড়া তবলীগওয়ালাদের এই
গাট্টিবোচকাঘটিবাটিবদনাবিছানাবালিশ মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর
দৃশ্যটি আমার কাছে কুৎসিত লাগতো _ মনে হতো, এরা ইসলামের 'খেদমত'
করার বদলে, এর সৌন্দর্য নষ্ট করছে!
তবলীগের পর এলো মৌলবাদী ছাত্র সংগঠনটি। তারাও ইসলামের কথাই বললো,
কিন্তু ভিন্নভাবে। বললো, শুধু ঘরে বসে আল্লাহ আল্লাহ করলে হবে না;
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। মরলে
শহীদ, জিতলে গাজী। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কতোগুলো প্রশ্নের
সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া গেলো না বলে তারাও আমাকে ইমপ্রেস করতে পারলো
না। একটি সত্যিকারের ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সেটা যে একটা
মধ্যযুগীয় ব্যাপার হবে, আধুনিক সময় থেকে ছিটকে পড়ে একটা অন্ধকার
সুড়ঙ্গে পড়তে হবে _ আমার তাই মনে হতো। এ প্রসঙ্গ ধরেই তাদেরকে
জিজ্ঞেস করলাম _ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে নারীদের ব্যাপারে
তাদের অবস্থান কি হবে। তারা বললো, ইসলাম তো নারীদের মুক্তি দিয়েছে,
অতএব যতোটুকু ইসলামসম্মত, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীদের ততোটুকু
অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। নিশ্চিত করবে নিরাপত্তাও। তাদেরকে
পর্দায় ঢেকে দেয়া হবে কী না, জিজ্ঞেস করলে তারা বললো _ নিশ্চয়ই।
পর্দা তো ফরজ। আজকে যে সন্ত্রাস, মূল্যবোধের অবক্ষয়, ড্রাগ
অ্যাডিকশন, সামাজিক অস্থিরতা আর নারী নির্যাতনের ফলে সারাদেশে
নাভিশ্বাস উঠেছে _ তার মূল কারণ নাকি নারীদের বেপর্দা হওয়া!
ইত্যাদি। তাদের এই কথা শুনেই আমার হয়ে গেলো। রূপসীদের দেখার জন্য
আমি প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে কলেজ হোস্টেল থেকে নিউমার্কেটে যাই,
তাদেরকে পর্দায় ঢেকে দেয়া হবে ভাবতেই আমি শিউরে উঠলাম। তাহলে
প্রতিদিন দেখবো কি? অতএব তারাও আমার কাছে পাত্তা পেলো না। এরই
মধ্যে প্রধান দু'টো ছাত্রসংগঠনের মিটিঙে-মিছিলেও বাধ্য হয়ে যোগ
দিয়েছি কয়েকবার। বলাইবাহুল্য, ভয়ে। তারা এসে আদেশ করে, অনুরোধ নয়,
না গেলে ভয়ভীতি দেখায় _ ওরা পারেই এতোটুকু; একজন তরুণকে ইমপ্রেস
করার মতো যেহেতু কোনো আদর্শই তাদের নেই, তাই ভীতিসঞ্চারই তাদের
একমাত্র অস্ত্র। কিন্তু আমাকে ইমপ্রেস করে ফেললো বামপন্থী
ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা। বন্ধুর মতো আড্ডা দিতে দিতে তারা আমাকে
শোনালো শ্রেণীহীন-শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন, ফসলের সুষম বন্টন আর যৌথ
খামারের পরিকল্পনা, প্রগতি ও বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা। নারী-পুরুষ
সম্পর্ক, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, সমাজ-দেশ-জাতির প্রতি দায়িত্ব ও
কর্তব্যবোধ _ এই সমস্ত নিয়েই কথা চললো দিনের পর দিন। আমি একেবারে
মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এমন একটি সমাজের স্বপ্নও যে দেখা যায়, আমার তা
জানাই ছিলো না। আমি এতো বেশি ঘোরগ্রস্থ হয়ে পড়লাম যে, বিপ্লব,
কমরেড, সমাজতন্ত্র _ এই শব্দগুলো আমার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠলো। আমার
পরিবর্তন আসা শুরু করলো তখন থেকেই। বন্ধুরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে
দিলো _ কীভাবে শোষণ করা হচ্ছে, কীভাবে নিপীড়িত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
নিজের তথাকথিত ঐতিহ্যবাহী পরিবারটিকে মনে হলো গণবিরোধী। মনে হলো _
যে শ্রেণীতে আমি বাস করি তাকে শত্রুশ্রেণী বলে বিবেচনা করা উচিত।
এই ভাবনা আর ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েই আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এলাম।
তখনও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা পুরোপুরি তৈরি হয়নি আমার।
উৎসব-অনুষ্ঠানে তো যেতামই, তাছাড়াও কারণে-অকারণে বাড়িতে যাওয়া পড়তো
আমার। গেলে ভাইবোনদের সঙ্গে গল্প-সল্প-আড্ডাবাজি করে সময় কাটতো।
শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবাহী সবকিছু ঘুরে দেখতে ভালো লাগতো। ভাইবোনদের
সঙ্গে নিজেদের বংশ নিয়ে প্রচুর ঠাট্টা-ইয়ার্কি-উপহাসও করতাম।
বলতাম, আমরা হচ্ছি ভুয়া বংশ, আমার দাদার নাম জহুর হোসেন ভূঁইয়া নয়
_ জহুর হোসেন ভুয়া। আর এসব কথা বলতাম চাচাকে শুনিয়ে শুনিয়েই যেন
তিনি বুঝতে পারেন _ আমাকে দেয়া বংশমর্যাদা সংক্রান্ত তার এতোকালের
শিক্ষা বিফলে গেছে।
এই সম্পর্কটুকুও বিলীন হলো ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ই। আমার যে এতো
বাড়ির টান এটা নাকি একধরনের পেটিবুর্জোয়া এ্যাটিচিউড, আর এটা ত্যাগ
না করতে পারলে শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা
রাখা সম্ভব নয়! তখন আমি বিপ্লবের নেশায় বুঁদ হয়ে আছি, মনে হতো _
বিপ্লব বুঝি দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে, ডাকলেই চলে আসবে; কিন্তু
বিপ্লব আর আসতো না _ দরজা ঠেলে আসতো কমরেডরা। সরকার ও প্রধান
বিরোধী দলীয় ছাত্রসংগঠন আর প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর
কার্যকলাপ-অত্যাচার-নির্যাতন নিয়ে আলাপ আলোচনা হতো, শান্তিপূর্ণ
সহাবস্থানের উপায় খুঁজে বের করা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতো দিনের পর
দিন। পরস্পরের সমালোচনাও চলতো প্রচুর। কার কোন আচরণটা বুর্জোয়া,
কোনটা পেটিবুর্জোয়া, কোনটা প্রতিক্রিয়াশীল _ এইসব। মনে আছে _ একবার
আমাদের এক বন্ধু কমরেডের কাছে খবর আসে যে বাড়িতে তার মা অসুস্থ।
খবর পেয়ে, আমাদের সামনেই, যে খবরটা নিয়ে এসেছিলো তার ওপর রাগে ফেটে
পড়েছিলো সে _ মা অসুস্থ তো আমি কি করবো? আমি কি ডাক্তার?
মায়ের অসুস্থতাকে এইভাবে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে দেখে আমি লজ্জায়
ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছিলাম। মাকেও যেখানে এইভাবে উড়িয়ে দেয়া হয় সেখানে
আমি কীনা চাচা-চাচী-ভাইবোন নিয়ে এতো আবেগপ্রবন! সেদিনই আমি
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম _ এসব পুতুপুতু আবেগ, পেটিবুর্জোয়া এ্যাটিচিউড
ছাড়তে হবে। এরপর প্রায় একবছর আমি বাড়িতে যাইনি। এমনকি বোনের বিয়ের
সময়ও নয়। ব্যাপারটা নিশ্চিতভাবেই আমার জন্য খুব কষ্টকর ছিলো। চাচীর
জন্য মন কাঁদতো, মনে পড়তো _ আমার মা নেই _ ব্যাপারটা কোনোদিন আমাকে
বুঝতে দেননি তিনি। চাচার জন্য খারাপ লাগতো, বাবার অভাব তিনিই পূরণ
করেছিলেন। বোনটার জন্য বুকটা হাহাকার করে উঠতো , ও যে আমার কতোটা
আদরের সেটা ও নিজেও জানে না। ওর বিয়ের সময় যাইনি, বিয়ের পরও
খোঁজখবর নেইনি। ও হয়তো ভাবছে _ ওর ভাইটা অমানুষ হয়ে গেছে _ কিন্তু
ও জানবে না ওর কথা ভাবলে আমার কতোটা খারাপ লাগে! যাহোক, প্রায়
বছরখানেক পর বাড়িতে গেলে সবার অভিমানমাখা দৃষ্টি চোখে পড়েছিলো,
কিন্তু পাত্তা দেইনি। হয়তো তাদেরকে পাত্তা না দেয়ার জন্যই আমি কথা
বলতে শুরু করি পরীর মা'র সঙ্গে। আর হঠাৎ করেই আমার সামনে এক অদ্ভুত
জগৎ উন্মোচিত হয়। ছোটবেলা থেকেই এই মহিলাকে দেখে আসছি আমি _ কিন্তু
কোনোদিন ভালো করে কথা বলে দেখিনি, যদিও আমার জন্য তার অদ্ভুত একটা
স্নেহ ছিলো _ আমাকে সে ডাকতো 'বাজান' বলে। আমার শৈশব এবং কৈশোরের
কিছু অংশ কেটেছে এই বৃদ্ধ ভিখারীর কার্যকলাপ বিস্ময়ের চোখে দেখে।
অন্ধ ছিলো সে, তবু নিজের সব কাজ নিজেই করতো। ভিক্ষা করতে বেরুতো
গ্রামে, সেখান থেকে বাজারে যেতো, ফিরে এসে নিজেই রান্না করতো,
তারপর তরকারীর একটু অংশ আমার জন্য নিয়ে আসতো। বাড়ির অনেকগুলো
পিচ্চির মধ্যে কি করে আমিই তার বিশেষ স্নেহের পাত্র হয়েছিলাম সেই
রহস্য আজো আমার কাছে পরিস্কার নয়। তো এই মহিলাকে আশ্রয় দেবার জন্য
আমি মনে মনে বাবার প্রশংসা করতাম।
ঠিকানাবিহীন-অন্ধ-বুড়ো-স্মৃতিভ্রষ্ট এই মহিলা নইলে যেতো কোথায়?
কিন্তু বাবা বোঝেননি _ তিনি তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে একটি
জ্বলন্ত প্রশ্ন রেখে যাচ্ছেন। কেন ওই অসহায় সর্বস্বহারানো অন্ধ
বৃদ্ধাকে আমাদের আশ্রিতা হয়েও ভিক্ষা করে, নিজে বাজার করে ও রান্না
করে খেতে হয় _ প্রশ্নটি আমার সেই ছোটবেলাতেই জন্ম নিয়েছিলো, যার
উত্তর আজো পাইনি। আমাদের তো কোনো অভাব ছিলো না, বাড়িতে প্রতি
বেলায়ই হিসাবের বাইরে দু'চারজন লোক বেশী খেতো ; চাচা সীমিত
সামথ্যর্ের মধ্যে গ্রামের দরিদ্র লোকজনকে সাহায্য করতেন; এমন একটি
সচ্ছল পরিবারে একজন মানুষ কোনো বাড়তি ব্যাপারও নয় _ তাছাড়া এ
পরিবারের মানুষও খুব বেশি নিষ্ঠুর নয়, বরং বেশ সহানুভূতিসম্পন্ন।
তাহলে?
এসব নিয়ে অবশ্য পরীর মা'র নিজের কোনো অভিযোগ ছিলো না, কিংবা অভিযোগ
আছে কী না সেটা জানতেও চাইনি। তো এতোদিন পর তার সঙ্গে কথা বলতে
গিয়ে আবিষ্কার করলাম _ সে এক স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষ। কোত্থেকে এসেছে
সে, কোথায় বাড়ি, সেখানে কেউ আছে কী না, কিংবা ছিলো কী না সেসবের
কিছুই মনে নেই তার। কেবল মনে আছে তার মেয়ের কথা, যে মেয়েটিকে পরীরা
তাদের দেশে নিয়ে গিয়েছিলো! অনেক অনুরোধ-মিনতি-সাধ্য-সাধনার পর তাকে
ফেরত দেয়া হলেও পরীরা এর প্রতিশোধ নেয় পরীর মাকে অন্ধ করে দিয়ে।
মেয়েকে পরীরা নিয়ে গিয়েছিলো বলে তার নাম হয় পরীর মা। এসব শুনতে
শুনতে আমার সামনে যেন এক যাদুবাস্তবতার জগৎ উপস্থিত হয়। সে এখন
পর্যন্ত গভীরভাবে বিশ্বাস করে _ যে মেয়েটিকে ওরা ফিরিয়ে দিয়ে
গিয়েছিলো সে প্রকৃতপক্ষে তার মেয়ে নয়, পরীদেরই মেয়ে তার মেয়ের রূপ
ধরে এসেছিলো, আর তার মেয়ে রয়ে গেছে পরীদেরই দেশে! সবার চোখকে ফাঁকি
দিতে পারলেও মায়ের চোখকে যে দেয়া যায় না, সেটা জেনেই তারা তাকে
অন্ধ করে দিয়ে গেছে। পরীর মা'র এই বিশ্বাসে কোনো খাদ ছিলো না, আর
তার জগৎ জুড়ে ওই মেয়েটি ছাড়া আর কেউ ছিলোও না। তাকে কখনো তার
স্বামী বা অন্য কোনো সন্তান বা সংসার বা বাড়িঘর অথবা
মা-বাবা-ভাইবোন সম্বন্ধে কিছু বলতে শুনিনি। কিছুই মনে করতে পারতো
না সে। কথা বলতে বলতেই তার জন্য গভীর মমতা তৈরি হয় আমার। আর তার
সঙ্গে কথা বলার জন্য, তাকে দেখার জন্য আমি আবার বাড়িতে আসতে শুরু
করি।
সেই পরীর মা মারা গেছে। কোনো এক অদ্ভুত কারণে আমার ভয়ংকর কষ্ট
হচ্ছে। এর কারণ কি? গত কয়েক বছরে তার সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কই কি এর
কারণ? এই কষ্ট লাগা কি কোনো পেটিবুর্জোয়া ফিলিং? কমরেডরা থাকলে
বলতে পারতো। আমি বোধহয় বামপন্থা ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।
এখনও নানা ব্যাপারে কমরেডদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আমাকে বিনা বাক্য
ব্যয়েই মেনে নিতে হয়। যাহোক _ বাড়িতে আসার পর থেকে আমি পরীর মা'র
লাশ ছেড়ে এক মুহূর্ত কোথাও যাইনি। এখন বিকেল। বৃষ্টি থেমেছে।
দাফনের ব্যবস্থা হচ্ছে _ কিন্তু ব্যাপারটা এতো সহজে শেষ হবে বলে
মনে হচ্ছে না।
৩.
সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি, কিছুতেই কবর খোড়া যাচ্ছে না _ বৃষ্টির
পানিতে মুহূর্তেই ভরে যায়। দীন মোহাম্মদ সাহেব সকাল থেকেই বৃষ্টি
থামার অপেক্ষা করছিলেন _ বাড়িতে একটা লাশ থাকলে স্বস্তিতে কিছু করা
যায় না _ হোক না সে অনাত্নীয়, আশ্রিত, ভিক্ষুক। সেই অস্বস্তি প্রায়
আশংকায় পরিণত হয়েছে রফিকের উপস্থিতিতে। এই আশংকার কোনো যুক্তিসঙ্গত
কারণ নেই, কিন্তু পৃথিবীর সবকিছু যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না
বলেই বিশ্বাস করেন তিনি _ আল্লাহপাক অনেক রহস্যময় ঘটনার জন্ম দেন,
দিয়েছেন, দেবেন _ যেগুলো মানুষের লব্ধ জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা
অসম্ভব। সেই প্রমাণ তিনি আবারও পেলেন। বিকেলের দিকে যখন বৃষ্টি ধরে
এলো, গোরখোদকরা চলে গেলো কবর খুঁড়তে, তিনি লোকজনকে খবর পাঠালেন
জানাজায় শরিক হতে, আর তখনই রফিক এলো, জিজ্ঞেস করলো, কবর কোথায়
দেবেন বলে ঠিক করেছেন? তিনি, যা স্বাভাবিক, তাই করেছেন _ এ গ্রামে
কোনো গোরস্থান নেই, পাশের গ্রামের গোরস্থানেই কবর দেয়ার ব্যবস্থা
করেছেন; কিন্তু কথাটা রফিককে জানাতেই সে বেঁকে বসলো, বললো _ না, এই
বাড়িতেই পরীর মা'র কবর হবে। শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে _
তাদের পারিবারিক কবরস্থানে পরীর মা'র মতো একজন নামপরিচয়হীন ভিখারীর
কবর হতে পারে _ এ কথা রফিক ভাবলো কীভাবে তিনি তা বুঝতেই পারছেন না।
ঝামেলা একটা হবে সে আশংকা তিনি আগেই করেছিলেন, কিন্তু সেটা ঠিক এই
মাত্রার হবে সেটা কল্পনাও করেননি। দীন মোহাম্মদ ভুঁইয়া ঠান্ডা
মাথায় রফিককে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন _ বলেছেন, এ হচ্ছে তাদের
বংশমর্যাদার প্রশ্ন। প্রবল প্রতাপশালী জহুর হোসেন ভুঁইয়ার পাশে
একজন বেওয়ারিশ ভিখারীকে কি রাখা চলে? কিন্তু এসব কথা রফিক কানেই
নিচ্ছে না। গোঁ ধরে বসে আছে _ না এ বাড়িতেই কবর হতে হবে। দীন
মোহাম্মদ হাল ছেড়ে দিয়ে তার স্ত্রীকে পাঠিয়েছেন রফিককে বোঝাতে,
কিন্তু তিনিও বিফল হয়েছেন। তার খবর পেয়ে আত্নীয়-স্বজন, ইউনিয়ন
পরিষদের চেয়ারম্যান, উদাসপুর হাইস্কুলের হেডমাস্টারসহ অন্যান্য
শিক্ষকরাও ইতোমধ্যে চলে এসেছেন। রফিক আর কারো কথা না শুনুক,
শিক্ষকদের কথা শুনবে বলে তার বিশ্বাস ছিলো, কিন্তু কারো কথাতেই সে
তার অবস্থান থেকে একচুলও নড়েনি। দীন মোহাম্মদ বুঝতে পারছেন না,
রফিক ব্যাপারটা নিয়ে এমন গোঁ ধরে আছে কেন? সন্ধ্যা পার হয়ে রাত
নেমেছে, এখন পর্যন্ত লাশটির কোনো গতি করা গেলো না, এর কোনো মানে
হয়! বাড়ি ভরতি লোকজন, তারা আর কতোক্ষণ বসে থাকবে? দীন মোহাম্মদ তাই
গণ্যমান্য লোকজনকে নিয়ে মিটিংয়ে বসলেন, ডেকে পাঠালেন রফিককে _ সে
যা বলার সবার সামনেই বলুক। সে এলো, কিন্তু বসলো না, দীন মোহাম্মদ
সাহেবকে আলাদা করে ডেকে বললো, আপনি তো বাড়িতে বাজার বসিয়ে দিয়েছেন।
এতো লোককে খবর দিয়েছেন কেন? ব্যাপারটাকে অযথা এতো জটিলই বা করে
তুলছেন কেন?
রফিক যে এমন বেয়াদব হয়ে উঠেছে তা তার জানাই ছিলো না, এ কোন ধরনের
ভাষা? কিন্তু তিনি মাথা গরম করলেন না, বললেন _ জটিল আমি করছি, না
তুমি?
আমি করছি না তো! আমি তো খুবই সিম্পল একটা কথা বলেছি। পরীর মা প্রায়
২০ বছর এ বাড়িতে ছিলো, তার কবর এ বাড়িতে হলে অসুবিধা কি?
অসুবিধা হলো, তাতে আমাদের বংশমর্যাদা...
রাখেন আপনার বংশমর্যাদা! বংশ ধুয়ে পানি খাবেন? যা বলছি, তাই
করেন...
দীন মোহাম্মদ এবার আর সহ্য করতে পারলেন না। বেয়াদবীর একটা সীমা
থাকা উচিত। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন, তোমার কাছে বংশের কোনো
গুরুত্ব না থাকতে পারে, আমার কাছে আছে। ওই মহিলার কবর এ বাড়িতে হবে
না।
হতেই হবে।
না হবে না। দরকার হলে ওই লাশ আমি পানিতে ভাসিয়ে দেবো।
পারবেন না, আমি এখানে থাকতে সেটা আপনি করতে পারবেন না।
তুমি দেখতে চাও, আমি পারি কী না!
যা পারবেন না, তা নিয়ে অযথা চিৎকার করবেন না। যা বলছি শোনেন। এই
বাড়ির ওপর আমার পূর্ণ অধিকার আছে। আইনত এই বাড়ির অর্ধেক এবং দাদার
সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক অংশীদারিত্ব আমার। এসব নিয়ে আমি কোনোদিন
কথা বলিনি, বলতেও চাই না, কোনোদিন এসব দাবিও করতে আসবো না। কিন্তু
অধিকার যেহেতু আছে, তাই বলছি _ উনার কবর এ বাড়িতেই হবে।
দীন মোহাম্মদ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। রফিক যে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে
পারে, তিনি তা কল্পনাই করেননি। সত্যি বটে, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া
এই বাড়ি এবং জমিজমার মালিক তারা দু'ভাই এবং যেহেতু তার বড় ভাইয়ের
একমাত্র উত্তরাধিকার রফিক _ তাই এসব সম্পত্তির অর্ধেক ওরই প্রাপ্য।
তিনি জানেন এ কথা এবং চিরদিন এগুলো নিজের দখলে রাখার কোনো ইচ্ছেও
তার ছিলো না। তিনি ভেবেছিলেন _ রফিককে বিয়েশাদি করিয়ে তাকে তার
অংশটুকু বুঝিয়ে দেবেন। রফিক তার শরিকানার বিষয়টি বোঝে, কিন্তু জানে
না, তার বাবার মৃতু্যর পর আইনত তিনিই রফিকের অভিভাবক এবং সাবালক
হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ওর ভরণপোষণ এবং সম্পত্তি
রক্ষণাবেক্ষণের দায়দায়িত্বও তারই। তিনি তাই করেছেন। হঁ্যা, আরো
আগেই, প্রশ্নটি ওঠার আগেই, সম্পত্তি বিলিবন্টনের ব্যবস্থা তার করা
উচিত ছিলো _ করেননি যে তার পেছনে তার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিলো না।
তিনি ভেবেছিলেন _ ওর বয়স কম _ এগুলো দেখেশুনে রাখতে পারবে না। রফিক
এও জানে না, এসবকিছুর অর্ধেক মালিকানা তার হলেও বাড়ির কিছু অংশ _
মসজিদ, কবরস্থান ইত্যাদি _ এজমাইলি সম্পত্তি, অর্থাৎ ওগুলোর কোনো
ভাগ হয় না, বাড়ির সব শরিকের সমান অধিকার তাতে। ওটার ওপর কোনো
জোরজুলুম চলে না, এক শরিকের আপত্তিতে অন্য কোনো শরিক জোর করে
সেখানে কিছু করতে পারে না। রফিক যেহেতু প্রশ্নটা তুলেছেই, এসব বিষয়
অবশ্যই তাকেও মেনে চলতে হবে; এবং আজই এসবকিছুর একটা বিহিত-ব্যবস্থা
করে ফেলবেন তিনি। এখন বাড়িতে আত্নীয়স্বজন আছে, এলাকার গণ্যমান্য
লোকজন আছে _ তাদের উপস্থিতিতেই এর একটা সুরাহা করবেন তিনি।
রাগ সামলাতে পারছেন না দীন মোহাম্মদ, কষ্টও পাচ্ছেন খুব _ এই
ছেলেটিকে তিনি নিজের সন্তানের চেয়ে অধিক স্নেহে বড় করেছেন _ কোথাও
কোনো ত্রুটি রাখেননি, কোনো আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রাখেননি। সম্পত্তি
নিয়ে যদি তার প্রশ্ন থেকেই থাকে তাহলে সেটা এভাবে বলার কোনো দরকার
ছিলো না। এরকম বেয়াদবের মতো _'বংশ ধুয়ে পানি খাবেন' 'বাড়িতে বাজার
বসিয়ে দিয়েছেন' _ ইত্যাদি আপত্তিকর বাক্য ব্যবহার করারও দরকার ছিলো
না। দুঃখ-কষ্ট-অভিমানে তার বুক ভেঙে যাচ্ছে; এমনিতে শান্ত মানুষ
তিনি, সহজে রাগেন না, কিন্তু রেগে গেলে আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না নিজের
ওপর। বাড়িতে একটা লাশ পড়ে আছে, তার সৎকারের ব্যবস্থা করাটাই এখন
সবচেয়ে জরুরী, তিনি তা ভুলেই গেলেন। আত্নীয়দের কাছে গিয়ে বললেন _
রফিক সম্পত্তি ভাগাভাগির কথা বলছে। আপনারা সবাই আছেন, এখনই বসে
সেটেল করে দিয়ে যান। বাড়ির কোন অংশ ও চায়, কোন কোন জমি চায় _ ও-ই
বুঝে নিক। শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। রফিকের কি মাথা খারাপ হয়ে
গেলো? সম্পত্তি নিয়ে কথাবার্তা এখন না বললেই চলতো না? এসব নিয়ে
মীমাংসা করতে চাইলে কালকে কথা বললেও তো হতো। একটা লাশ বাড়িতে রেখে,
চাচাকে প্রায় জিম্মি করে এটা করতে হবে? তারা সবাই একযোগে গেলেন
রফিকের কাছে; কিন্তু সবার সঙ্গে কথা বলতে রাজি নয় সে, শুধু
হেডমাস্টার সাহেবকে ডেকে নিলো।
৪.
ঝামেলা ভালোই লেগেছে বলে মনে হচ্ছে _ হেডস্যারের কথা শুনে তাই মনে
হলো। চাচাকে আমি সম্পত্তি ভাগ করার কথা বলিনি, কিন্তু তিনি
ব্যাপারটা সেভাবেই নিয়েছেন। স্যারও কথা শুরু করলেন ওই প্রসঙ্গ
নিয়েই,
সম্পত্তি ভাগাভাগির কথা এখন না বললে হতো না রফিক? তুমি মেধাবী,
বুদ্ধিমান, শিক্ষিত ছেলে। এভাবে ওই প্রসঙ্গ উত্থাপন করা তোমার উচিত
হয়নি।
আমি তো সেটা বলিনি।
বলোনি! দীন মোহাম্মদ সাহেব বললেন যে!
না স্যার, আমি এসব বলিনি।
তাহলে কি বলেছো?
চাচা তো আমার কোনো কথাই শুনছেন না, তাই বলেছি এ বাড়িতে আমার অধিকার
আছে, পরীর মা'র কবর এ বাড়িতেই হবে।
কিন্তু তুমি ব্যাপারটা নিয়ে এতো জেদ করছো কেন বলো তো? কবর এক
জায়গায় হলেই হয়...
তা যদি হয়ই, তাহলে এই বাড়িতে হলে অসুবিধা কি?
সেটা তোমাদের পারিবারিক মর্যাদার প্রশ্ন। কবরস্থানটা পারিবারিক _
এখানে অন্য কারো কবর কখনো হয়নি, কারো না, সে যে-ই হোক না কেন!
তোমার পূর্বপুরুষেরা এই অঞ্চলের সম্মানিত মানুষ ছিলেন, তাদের বংশধর
হিসেবে তোমার চাচা যদি তাঁদের সম্মান রক্ষা করতে চান, তাহলে তাকে
দোষ দেয়া যায় না।
পরীর মাকে এখানে কবর দিলে তাঁদের সম্মান ক্ষণ্ন হবে, এই পরিবারের
আভিজাত্য ভেঙে পড়বে?
তোমার চাচা তাই-ই মনে করেন।
যে সম্মান আর আভিজাত্য এতো ঠুনকো যে, অন্য একজন মানুষের কবর হলে তা
ক্ষয়ে যায়, তাহলে তা যাওয়াই উচিত।
সেটা তোমার দৃষ্টিভঙ্গি, তার নয়! তুমি তার জায়গায় দাঁড়িয়ে
ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর।
আমি সেটা বুঝতে পারছি, কিন্তু তিনি কেন আমার ব্যাপারটা বুঝতে
পারছেন না?
সেটা আমরা কেউ-ই পারছি না। তার অবস্থানটা, যুক্তিটা আমরা
পরিস্কারভাবে বুঝতে পারছি, কিন্তু তুমি কি কারণে এতোটা জেদ করছো
সেটা বুঝতে পারছি না। তুমি আমাকে বুঝিয়ে বলো তো!
ব্যাপারটা আমার কাছে আদর্শিক। আপনিই তো আমাদেরকে বলতেন স্যার,
আদর্শের প্রশ্নে কোনোদিন মাথা নত করো না।
সেটা আমি এখনও বলি। কিন্তু তুমি কোন আদর্শ থেকে কথাটা বলছো সেটা
বলবে তো!
স্যার, এই শ্রেণীবিভক্ত সমাজকে আমি স্বীকার করিনা। আমি শ্রেণীহীন
সমাজের স্বপ্ন দেখি, সেই সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করি। আমি
বিশ্বাস করি _ কাজটা শুরু করা উচিত নিজের পরিবার থেকেই। দেখুন
স্যার, আমাদের পরিবারের মধ্যে এই শ্রেণীবিভাজন কতো তীব্র, মৃতু্যর
পরও আামার পূর্বপুরুষের পাশে পরীর মাকে কবর দিলে তাঁদের আভিজাত্য
ক্ষণ্ন হয়! আদর্শিকভাবেই এই দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করি আমি।
আর তাছাড়া আরেকটা কথাও আমি ভাবছি। বেঁচে থাকতে পরীর মা'র কোনো
স্থায়ী ঠিকানা ছিলো না। কোত্থেকে এসেছে, কে সে তা সে নিজেই জানতো
না। মৃতু্যর পরও কি সে কোনো স্থায়ী ঠিকানা পাবে না? গ্রামের
কবরস্থানে কবর দিলে ৩/৪ বছরের মধ্যে সেখানে আরেকটি নতুন কবর হবে।
এখানে হলে সেটা হবে না। অন্তত মৃতু্যর পর তার একটা স্থায়ী ঠিকানা
হোক!
বাবা রফিক, আমার সারাটি জীবন আমি ব্যয় করেছি একটিই স্বপ্ন দেখে _
আমার ছাত্ররা আদর্শিক মানুষ হবে, এখন বুড়ো হয়েছি, ছাত্রদের মুখে
আদর্শের কথা শুনলে নিজের জীবনটাকে স্বার্থক বলে মনে হয়। তুমি একজন
ভিখারীর জন্য এভাবে ভাবছো দেখে আমার গভীর আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু যে
শ্রেণীবিভাজনের কথা তুমি বললে ওতে তো আমাদের কোনো হাত নেই, শ্রেণী
আল্লাহরই তৈরি।
না স্যার, শ্রেণী তৈরি করেছে মানুষ, আল্লাহর এতে কোনো ভূমিকা নেই।
তুমি কি আল্লাহকে বিশ্বাস কর?
সেটা কি খুব জরুরী ব্যাপার?
না, তা নয়। কিন্তু বিশ্বাস করলে তোমাকে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে,
শ্রেণী ব্যাপারটা তাঁরই তৈরি, মানুষের নয়।
কিভাবে?
একটি শিশু জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গেই তো তার শ্রেণী নির্ধারিত হয়ে যায়।
সে যদি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করে তবে সে-ও দরিদ্র, ধনী পরিবারে
জন্ম নিলে সে ধনী। কিন্তু জন্মের ব্যাপারে তো কারো কোনো হাত নেই,
কে কোথায় জন্ম নেবে সে সিদ্ধান্ত নেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। কাউকে তো
আর জন্মের আগে জিজ্ঞেস করা হয়না যে, সে কোথায় জন্ম নিতে চায়, করলে
কোনো মানুষ দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিতে চাইতো বলে মনে হয় না _
দারিদ্র তো কোনো মহান ব্যাপার নয়! এমনও নয় যে, একটি শিশু জন্মের
আগেই কোনো পাপ বা পূণ্য করে এবং পাপের শাস্তি বা পূণ্যের পুরস্কার
হিসেবে শিশুটিকে দারিদ্র বা প্রাচুর্যের মধ্যে জন্ম দেন তিনি। তো
একজন মানুষকে জিজ্ঞেস না করেই একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতে জন্ম দেয়ার
ঘটনাটিই কি প্রমাণ করেনা যে, তিনি মানুষকে শ্রেণীবিভক্ত হিসেবেই
দেখতে চান?
আপনি এখনকার সিস্টেম দেখে বলছেন _ একটি শিশুকে একটি নির্দিষ্ট
শ্রেণীতে জন্ম দেয়া হয়। কিন্তু তার আগে কি এই প্রশ্ন আসে না যে, এই
শ্রেণী ব্যাপারটা এলো কোত্থেকে? ইতিহাসের প্রাথমিক পর্বে মানব
সমাজে কোনো শ্রেণীবিভাজন ছিলো না। ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা
ইতিহাসের অনেক পরের ব্যাপার। আর এই ধারণা থেকেই শ্রেণীর জন্ম। তো
আদিতে যে শ্রেণী ছিলো না সেটা কি এই প্রমাণ করে না যে, আল্লাহ
শ্রেণী চান না, মানুষই এসবের জন্ম দিয়েছে? ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী
আল্লাহর সৃষ্টি নয়, হলে তিনি দু'জন শিশুর মধ্যে একজনকে শাস্তি
আরেকজনকে পুরস্কার দিতেন না, কারণ তারা দু'জনেই নিস্পাপ।
কিন্তু তিনি তাহলে এই শ্রেণী টিকিয়ে রেখেছেন কেন? যা তাঁর পছন্দের
নয়, যা তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে, ইচ্ছে করলেই তো তিনি তা ধ্বংস করে
দিতে পারেন। দেন না কেন?
দেন না, কারণ তিনি চান, কাজটা মানুষই করুক। মানুষকে তিনি স্বাধীনতা
দিয়েছেন যা ইচ্ছে তাই করার; এমনকি তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ করার
স্বাধীনতাও আছে মানুষের, আর সেটা আছে বলেই মানুষের পাপ-পূণ্যের
বিচার হবে, নইলে তো সব দায়দায়িত্ব আল্লাহর কাঁধেই চাপিয়ে দেয়া
যেতো। মানুষ যে শ্রেণী সৃষ্টি করলো _ এ তাঁর ইচ্ছেবিরুদ্ধ, এ পাপ
মানুষের, মানুষেরই কর্তব্য এ থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়ে তাঁর
ইচ্ছেকে সম্মান জানানো।
এই বিতর্ক প্রাচীন, অন্তহীন। আমরা কোনো সমাধানে পেঁৗছতে পারবো বলে
মনে হয় না, বাবা। তবে আমি তোমার মতামতকে শ্রদ্ধা করি। আর পরীর মা'র
ব্যাপারে তোমার অবস্থানকেও সমর্থন করি, কিন্তু বুঝতেই পারছো, নানা
কারণে প্রকাশ্যে সেটা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমার চাচা আমার
দীর্ঘদিনের সহকর্মী, এখন এই বুড়ো বয়সে আমি তার বিরুদ্ধে অবস্থান
নিয়ে তার সেন্টিমেন্টে আঘাত করতে চাই না।
ঠিক আছে স্যার। আপনি প্রকাশ্যে আমার পক্ষে না থাকলেও অন্তত
বিরুদ্ধে যাবেন না, নীরব থাকবেন। আমি একাই লড়ে যাবো।
স্যার চলে গেলে আমি স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লাম। বোঝাই যাচ্ছে
যুক্তিতর্কে স্যার পরাসত হয়েছেন। আমার আত্নবিশ্বাস বেড়ে গেলো।
উদাসপুর হাই স্কুলের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হেডমাস্টার শামসুদ্দীন
আহম্মদ এম.এ, এম.এড কে পরাস্ত করা সহজ কথা নয়। ৪০ বছর ধরে শিক্ষকতা
করছেন তিনি, এদেশের বহু প্রভাবশালী লোকই তাঁর ছাত্র, কিন্তু তারাও
স্যারের সামনে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতেই অভ্যস্ত _ এমনই
ব্যক্তিত্ব তাঁর। কমরেডদের কথা মনে পড়লো আমার। তারাই আমাকে কৌশল
শিখিয়েছিলেন _ একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিকে ধর্মহীনতার কথা বলতে নেই!
একজন আস্তিককে পরাস্ত করতে হয় আস্তিকতা দিয়েই, নাস্তিকতা দিয়ে নয়
ইত্যাদি।
স্যার চলে যাবার পর অনেকক্ষণ কেটে গেছে, এদিকে কেউ আর আসেনি।
ব্যাপারটার কোনো সুরাহা হলো না। ঠিক আছে, আমিও আমার জায়গা থেকে
নড়ছি না, জয়ী আমাকে হতেই হবে। চাচা ক'দিন এভাবে লাশ ফেলে রাখতে
পারেন আমি তা দেখে নিতে চাই।
৫.
বাড়ি এখন চুপচাপ। অধিকাংশ লোকই চলে গেছে। একটি জমজমাট নাটক _
চাচা-ভাতিজার দ্বন্দ্ব _ যারা দেখতে এসেছিলো, সম্ভবত শেষ পর্যন্ত
সেটা দেখার ধৈর্য তারা ধরে রাখতে পারেনি। যারা রয়ে গেছে তারাও ঝিম
মেরে বসে আছে _ চুপচাপ, নিঃশব্দ।
দীন মোহাম্মদের সবকিছুই আজ এলোমেলো হয়ে গেছে। ঘুম_খাওয়া দূরে থাক,
এশা'র নামাজটা পর্যন্ত পড়া হয়নি। রফিকের জন্য এখন তার খারাপ লাগছে,
মনে হচ্ছে ওর সঙ্গে এতোটা খারাপ ব্যবহার না করলেও চলতো। হেড
মাস্টার সাহেবের কাছে সব শুনেছেন তিনি, শুনে মনটা নরম হয়ে গেছে।
কেন যে ভুল বুঝে এতোগুলো লোকের সামনে সম্পত্তি ভাগের প্রসঙ্গ তুলে
রফিককে অপমান করলেন তিনি, সেজন্য নিজের ওপরই ক্ষুণ্ন হয়ে আছেন।
ছেলেটা পরীর মা'র জন্য একটা স্থায়ী ঠিকানার কথা ভাবছে _ কথাটা
জানার পর তিনি অসম্ভব অবাক হয়ে গেছেন। মনে হচ্ছে _ এই রফিককে তিনি
চেনেন না। যে তার আত্নীয়-স্বজনদের সঙ্গে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলে
না, সে পরীর মা'র জন্য এমন মমতা পোষণ করতে পারে তা কিভাবে ভাববেন
তিনি? ওর ছোটবেলার কথা মনে পড়লো তার, ওর বাবা মারা গেলেন, মায়ের
বিয়ে হয়ে গেলো, ছোট্ট একটা শিশু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার সবচেয়ে বড়
দু'টো আশ্রয় হারালো। তিনি প্রাণপনে চেষ্টা করেছেন যেন এই অসহায়
ছেলেটির কোনোরকম অপূর্ণতা না থাকে। বড় হওয়ার পর সত্যটাও জানিয়েছেন
ইচ্ছে করেই। এসব গোপন রাখতে নেই, গোপন রাখাও যায় না, কারো না কারো
কাছ সত্যিটা জানা হয়ে যায়। জানার পর যদিও খুব কষ্ট পেয়েছিলো সে,
কিন্তু সত্যটার সঙ্গে নিজেকে মানিয়েও নিতে পেরেছিলো _ এখনও সে তার
চাচীকে মা বলেই ডাকে। আগে অনেক আহ্লাদ আব্দারও করতো। তারপর কি যে
হলো _ ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েই কেমন বদলে গেলো _ বাড়িতে আসে না,
এলেও কারো সঙ্গে কথা বলে না, কারো কোনো খোঁজখবরও রাখে না। কেন যে
এমন হয়ে গেলো সে, কেন যে এতোটা চুপচাপ হয়ে গেলো তা তিনি বুঝতেই
পারেন না। আগে মনে হতো ছেলেটা বিগড়ে গেছে, এখন মনে হচ্ছে _ তার
ধারণা ভুল, একজন সামান্য ভিখারীর জন্য যে পারিবারিক মর্যাদা
পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে সে বিগড়ে যেতে পারে না। কে
জানে পরীর মা'র মধ্যে সে কি পেয়েছে, কে জানে এই অপরিচিত ভিখারীটিই
আল্লাহপাকের কাছে তার পূর্বপুরুষদের চেয়ে অধিক প্রিয় কী না, আর
আল্লাহ সেটাই তাদেরই এক বংশধরের মাধ্যমে সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন কী
না! হয়তো তাকে এখানে কবর দেয়া হলে তার উছিলাতেই এই কবরস্থানের
অন্যান্য বাসিন্দারা মাফ পেয়ে যাবে। দীন মোহাম্মদ সাহেবের অভিমান
হচ্ছে _ যে কথা রফিক তার স্যারকে বলেছে, সেটা তাকে বললো না কেন?
এখন, এই অবস্থায়ও, ও যদি এসে বলে তাহলে তিনি আর আপত্তি করবেন না।
নইলে নিজে থেকে ওকে কিছু বলা তার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। সমস্যাটার
সমাধান কিভাবে হবে তিনি ভেবে পাচ্ছেন না, এভাবে লাশ ফেলে রাখাটাও
খুবই অন্যায় হচ্ছে, কিন্তু কি করা যায়, আল্লাহর হাতে সব ছেড়ে দিয়ে
বসে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় তো দেখা যাচ্ছে না।
অন্যঘরে লাশ আগলে বসে আছে রফিক। অনেকক্ষণ ধরে এ ঘরে কেউ আসছে না।
খিদে জানান দিচ্ছে, তৃষ্ণাও। সেই সকালে খেয়ে বেরিয়েছে, বাড়িতে এসে
পরিস্থিতির চাপে কিছু খাওয়া হয়নি আর। খিদে আর ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে
আসছে। কিছু খেয়ে ঘুমোতে ইচ্ছে করছে। আর কেউ না হোক মা তো আসতে পারে
_ সে ভাবছিলো। আমাকে না খাইয়ে রেখে তিনি ঘুমান কিভাবে? কী মমতাময়ী
পবিত্র ওই মুখ। মা নয়, তবু মায়ের স্নেহেই তাকে বরাবর আশ্রয় দিয়েছেন
তিনি। মনে হলো _ কতোদিন সে ওই মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়েও দেখেনি।
অন্যায়, এ খুবই অন্যায়। চাচার জন্যও কষ্ট হচ্ছে এখন। ভাবছে _ এতোটা
কঠোর হওয়ার কি কোনো দরকার ছিলো? এমনভাবে আঘাত করারও কি কোনো
প্রয়োজন ছিলো? একজন মানুষ সারাজীবন ধরে একটা মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে
আছে। এতো সহজে কি তা থেকে তাকে বিচু্যত করা সম্ভব? এভাবে বিপ্লব হয়
না। বিপ্লবের কথা মনে হতেই কমরেডদের কথা মনে পড়লো তার। তার এই
মুহূর্তের ভাবনাগুলোকে নিশ্চয়ই পেটিবুর্জোয়া ইমোশন বলে চিহ্নিত
করতেন তারা। এতোসব তুচ্ছ ইমোশন নিয়ে নাকি বিপ্লব হয় না। বৃহত্তর
জনজীবনের কথা ভেবে ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র সম্পর্কগুলোকে বিসর্জন
দেয়াটাই বিপ্লবী হওয়ার পূর্বশর্ত।
আমি তাহলে পেটিবুর্জোয়াই রয়ে গেলাম _ সে ভাবছিলো _ বিপ্লবী হওয়ার
জন্য আমার এতোদিনের সাধনা তাহলে এবার ধুলোয় লুটাতে বসেছে! নইলে
সবার জন্য আমার এমন মন খারাপ লাগবে কেন?
৬.
ঝিম ধরে বসে ছিলো রফিক। কিছুই ভাবছিলো না। ভাববার মতো অবস্থাও ছিলো
না। খিদে-তৃষ্ণা-ঘুম সব যেন একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার ওপর _
কিন্তু সামনে একটা লাশ রেখে ঘুমানো কি অসম্ভব ব্যাপার সেটা একমাত্র
ভুক্তভোগীরাই জানে। অনেকক্ষণ একা একা বসে থাকতে থাকতে অভিমানে বুক
ভরে উঠছিলো তার _ আর তখনই চাচী এসেছিলো। বলেছিলো _ ঝগড়াঝাটি যা
করার উনার সঙ্গে করবি, আমার সাথে কি? সারাদিন না খেয়ে থাকলি,
হাতমুখ ধুয়ে খেতে আয়। সে প্রথমে জেদ করছিলো, কিন্তু চাচী এসে হাত
ধরতে নরম হয়ে গেছে। মনটা নরম হয়েই ছিলো, ওই স্নেহস্পর্শে সে আরো
ভেঙে পড়ে। তারপর ভাত খেতে খেতে চাচীর অবিরল বকাঝকা শুনতে শুনতে _
তার না আসা নিয়ে, না কথা বলা নিয়ে, যোগাযোগহীনতা নিয়ে, বিচ্ছিন্নতা
নিয়ে _ তার মনে হচ্ছিলো, এতোদিনে সে আবার বাড়ি ফিরে এসেছে। যেন এমন
করে ফেরা সে ভুলেই গিয়েছিলো। এসব কথা মনে হওয়ার সময় কমরেডরা
উঁকিঝুকি দিতে থাকলে সে তাদেরকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে। মায়ের চেয়ে
কমরেডরা বড় নয় _ এমন একটি অবিপ্লবী, প্রতিবিপ্লবীও বলা যায় _
ভাবনায় সে আক্রান্ত হয়। তারপর চাচীর আদর-স্নেহে-যত্নে আর অবিরল
কান্নায় আবেগাক্রান্ত হয়ে সে তার নিজের ঘরে ফিরে আসে। এ ঘরে পরীর
মা'র লাশ, এটা ফেলে সে ঘুমায় কিভাবে? পারিবারিক আভিজাত্যবোধ ভেঙে
দেবার যে জেদ থেকে সে গোঁ ধরে বসেছিলো, এখন সেটা উবে গিয়ে এই
অন্ধ-ভিক্ষুকের প্রতি এক অসংজ্ঞায়িত মমত্ববোধই প্রধান হয়ে উঠেছে।
মানুষের জীবনও এমন হয় _ সে ভাবছিলো। জীবনের অনেকগুলো বছর যাকে
কাটিয়ে দিতে হয় স্মৃতিহীন হয়ে, অনাত্নীয়-অচেনা পরিবেশে, অনাদর ও
অবহেলায়, তাকে কি মানবজীবন বলা যায়?
ছোটবেলার একটা দৃশ্যের কথা মনে পড়লো রফিকের। তখন বর্ষাকাল।
গ্রামের, যাকে বলে, থই থই বর্ষা। এ বাড়ি থেকে ও বাড়িতে যেতে নৌকা
লাগে। তেমনই একটি সময়ে একদিন বিকেলে হাটে যাওয়া হচ্ছে। বাড়ি থেকে
হাট অনেকটা দূরে। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে চার/পাঁচজন একই নৌকায় করে
একসঙ্গে যাচ্ছিলো তারা। পরীর মা-ও যাচ্ছে তার অতি ক্ষুদ্র সংসারের
জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে _ কেন তাকেই যেতে হচ্ছে,
এতোগুলো লোকের কেউ কেন ওই সামান্য সদাইটুকু এনে দিতে পারছে না, তখন
অবশ্য এই প্রশ্ন মনে জাগেনি, এখন জাগে। তো, নৌকা হাটে ভিড়লে পরীর
মাকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে বলা হলো, নইলে তাকে রেখেই চলে যাওয়া হবে।
তারা সবাই নেমে পড়লো নৌকা থেকে। চাচা কিছু জিনিসপত্র কিনে তাকে
পাঠালেন নৌকায় গিয়ে বসতে, বাকিটা তিনি কিনে ফিরবেন। রফিক এসে
দেখলো, তার আগেই পরীর মা এসে নৌকায় বসে আছে _ অর্থাৎ যথাসম্ভব
দ্রুত নিজের কেনাকাটা সেরে ফেলেছে সে। অসংখ্য নৌকা এসে ঘাটে
ভিড়ছে, ঘাট ছেড়ে চলে যাচ্ছে, ফলে পানিতে আলোড়ন আর তাতে ছোট্ট
নৌকাটা বিরামহীন দুলছে। অন্ধ ও বৃদ্ধ ওই মহিলা শরীরের ভারসাম্য
ধরে রাখতে পারছে না, খুব ভীতমুখে, দু'হাতে শক্ত করে নৌকার পাশি
ধরে রেখেছে _ যেন ওটাই তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। মনে পড়ছে,
নৌকায় পা রাখতেই পরীর মা বলেছিলো, 'বাজান আইলা?' অন্ধ হয়েও সে,
এমনকি রফিকের পায়ের শব্দ কিভাবে চিনে ফেললো _ সেটা এখনও এক বিস্ময়
হয়েই আছে।
'হঁ্যা। তুমি এতো আগেই এসে বসে আছো কেন পরীর মা ?' এরকম একজন
বৃদ্ধাকে চাচী/খালা বা দাদী ডাকাটাই শোভন হতো কিন্তু কেউ তাকে তা
শেখায়নি; ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে তার মুখে এক ধরণের বিমূঢ়
বিমূর্ত অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো _ 'যদি আমারে থুইয়া চইলা যায়'!
এতোদিন পর হয়তো পুরো পরিস্থিতির একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে সে।
সব হারিয়ে যে বৃদ্ধা শেষ পর্যন্ত এ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলো, তার
অসহায়ত্বের বোধ কত তীব্র ছিলো ঘটনাটি তার ইঙ্গিত দেয়। মানুষের
প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস সে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিলো। ঘোর বর্ষায়
তাকে বহুদূরবতর্ী হাটে ফেলে তার আশ্রয়দাতারা চলে আসবে না _ এই
আস্থা তার ছিলোনা। জীবন তার কাছে কী দুর্বহ ছিলো _ মাঝে মাঝে ভেবে
বিষণ্ন বোধ করে রফিক। সব হারিয়ে তবু নিজের জীবনকে তার টেনে বেড়াতে
হতো, ভিক্ষে করতে হতো; এক টাকার তেল, দু'টাকার মাছ তরকারী, কি চার
আনার লবন কিনতে ওই বষর্ায়ও তাকে হাটে-বাজারে যেতে হতো _ কেউ ছিলোনা
তাকে সাহায্য করার মতো এবং ভয় পেতো যে, তাকে ফেলেই সবাই চলে আসবে,
আর তাকে হাটে বসেই কাঁদতে হবে। ভেঙে পড়া শরীরে জীবনের এই দুঃসহ ভার
সে কি করে বয়ে বেড়াতো ভাবলে হতবাক হয়ে যেতে হয়।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঝিমুনি ধরে গিয়েছিলো, হয়তো ঘুমিয়েই
পড়েছিলো, সে বলতেও পারবে না। হঠাৎ তার ঘুম ভাঙে মৃদু একটি শব্দে।
নিঝুম রাত নেমেছে _ গ্রামে যেমন নামে, বাইরে আবার বৃষ্টি, আর কোনো
শব্দ নেই কোথাও। তবে কি বৃষ্টির শব্দেই ঘুম ভেঙেছে আমার _ ভাবলো সে
_ না বোধহয়, অন্যরকম কোনো একটা শব্দ পেয়েছি। কিসের শব্দ? শব্দ
হওয়াটা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয় অবশ্য, গ্রামের রাতগুলো এমনিতেই
প্রকৃতির নানারকম শব্দে মুখর হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে তো ঘুম ভাঙার
কথা নয়, ঘুমটা ভাঙলো কেন? হঠাৎ তার মনে পড়লো _ পরীর মা মারা গেছে,
আর সে বসে বসে লাশ পাহাড়া দিচ্ছে। লাশের দিকে চোখ গেলো তার। মনে
হলো ওখানে কিছু একটা অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছে। সেটা কি? সে খুব
ভালো করে লক্ষ্য করলো। হঁ্যা, সত্যি একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটেছে
_ মনে হচ্ছে লাশের মুখটা অন্যদিকে ঘুরে গেছে। আগে ডান দিকে মুখ
ফেরানো ছিলো, এখন সোজা করে রাখা, ঊধর্্বমুখী। নিশ্চিত হওয়ার জন্য
সে লাশের মুখের ওপর থেকে সন্তর্পণে কাপড় সরিয়ে দেখলো, যা ভেবেছিলো
তাই _ শুধু তাই নয়, লাশের চোখও খোলা, আগে বন্ধ ছিলো; চোখের পাতাও
কি একটু কাঁপলো? সে কি ভুল দেখছে? নাকি স্বপ্ন? না, এর কোনোটিই নয়।
তার স্পষ্ট মনে আছে, লাশের চোখ বন্ধ ছিলো, মুখ ফেরানো ছিলো
ডানদিকে। তাহলে? এরকম পরিবর্তন হলো কিভাবে? পরীর মা কি তাহলে বেঁচে
আছে? সে ফিসফিসিয়ে, প্রায় শোনা যায় না, এমনভাবে একবার ডাকলো _ এবং,
অদ্ভুত ব্যাপার, প্রতিউত্তরে ঘরঘরে একটা শব্দও এলো লাশের গলা থেকে।
এর মানে কি? তার কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো? কেন এমন ভয় লাগছে?
যুক্তিহীন, অসংজ্ঞায়িত একটা ভয়। সে আস্তে করে দূরে সরে দাঁড়ালো।
কিন্তু এবার এ কি দেখছে সে? লাশটি হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে চাচ্ছে
যেন। সে আরেকটু সরে দাঁড়ালো। হাতটি আরো লম্বা হলো। সে আরো সরে
দাঁড়ালো, লাশটিও তার হাত আরেকটু লম্বা করলো। কোনো মানুষের হাত এতো
লম্বা হতে পারে না। এ কি ভৌতিক কাণ্ড ঘটছে? ভয়ে তার দম বন্ধ হয়ে
আসছে। সে গিয়ে দরজার কাছে, লাশের পায়ের দিকে দাঁড়ালো, এবং এবার
দেখলো তার পা লম্বা হচ্ছে, যেন লাশটি তার পা দিয়ে রফিককে ছুঁতে
চাচ্ছে। সে এবার দরজার বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো, কিন্তু
অচিরেই পা-টিও পেঁৗছে গেলো সেখানে। সে কি ডাকবে কাউকে? ও ঘরে আলো
জ্বলছে, কিন্তু কেউ জেগে আছে কী না বোঝা যাচ্ছে না, ডাকার জন্য
ঠোঁট খুলে সে টের পেলো _ গলা দিয়ে কোনো শব্দও বেরুচ্ছে না। রফিক
একবার উঁকি মেরে ঘরের ভেতরে তাকালো, দেখলো _ লাশের হাত এবার
ঊধর্্বমুখী, বড় হতে হতে সেটা প্রায় ছাদ ছুঁয়ে ফেলেছে। সে আর
দাঁড়াবার সাহস পায় না, দৌড়ে উঠোনে নামে। তার সঙ্গে সঙ্গে পা-টিও
আসছে বলে মনে হলে সে একবার পেছন ফিরে তাকায়, হঁ্যা সত্যি তাই
ঘটেছে। তার বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়, কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই সে
ঊধর্্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকে, দৌড়াতেই থাকে। অনেকদূর এসে নিজেকে
একটু নিরাপদ মনে হলে সে পেছন ফিরে তাকায়। দেখে _ লাশের হাত তাদের
প্রাচীন দালানের ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়েছে _ যেন আকাশ স্পর্শ করার জন্য
তার এই অভিনব যাত্রা, আর পা এগিয়ে চলেছে কবরস্থানের দিকে। এতোদূর
থেকেও সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, তাদের দালান ভেঙে পড়ছে। তার দাদা
বানিয়েছিলেন, সেই কবে, এতো মজবুত করে যে, এতোদিনেও একটা গাঁথুনিও
হালকা হয়নি, আজ কী না সেটাই একটা লাশের হাতের কাছে পরাজিত হলো! সে
আর দাঁড়াবার কথা ভাবতেও পারে না _ আবার দৌড় দেয়, লাশটাও তার পেছনে
পেছনে আসছে বলে মনে হলে তার দৌড়ের গতি বেড়ে যায়। রফিক
ঊধর্্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকে, দৌড়াতেই থাকে _ যেন অন্তহীন এই দৌড়।
অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০০৩
|
| |
 |
|