Page loading ... Please wait.

নিছক প্রেমের গল্প
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
এমন হঠাৎ করে দেখা হয়ে যাবে, ভাবতেও পারিনি। দূর্বল লেখকদের গল্প-উপন্যাসে বা টেলিভিশনের সস্তা নাটকে বা গাঁজাখুড়ি সিনেমায় এমনটি ঘটে। বাস্তবে কখনোই নয়। অন্তত আমার জীবনে তো নয়ই। আমি একবার যাদেরকে হারিয়ে ফেলেছি তাদের সঙ্গে আর কখনো ফিরে দেখা হয়নি। বাস্তবে যেহেতু হয় না, আমার গল্পেও তাই এমনটি ঘটে না। যেচে পড়ে খামোখা নিজেকে দূর্বল লেখকদের সারিতে কে-ই বা দাঁড় করাতে চায়? যাহোক, আসলে খুব সাদামাটা নিরামিষ জীবন আমার, সারপ্রাইজের কোনো ব্যাপারই নেই এখানে। বরিশাল যাবার জন্য স্টিমারে উঠে মৃন্ময়ীর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, এমনটি তাই সুদূর কল্পনায়ও আসেনি। মৃন্ময়ী! চমকে গেলেন, পাঠক? ভাবছেন, একদম রাবিন্দ্রীক নাম! আমিও তাই ভাবতাম একসময়, পরে মনে হয়েছে 'মৃন্ময়ী' ছাড়া ওর নাম অন্য কিছু হবার সুযোগই ছিলো না। স্টিমারে উঠে, অস্বীকার করবো না, মৃন্ময়ীর কথা আমার মনে পড়ছিলো। মনে অবশ্য সবসময়ই পড়ে, কিন্তু এবার বিশেষভাবে মনে পড়ার কারণ হয়তো এই যে, ও বরিশালেরই মেয়ে। মনে হচ্ছিলো- আমি মৃন্ময়ীর বাড়িতে যাচ্ছি, যেখানে এর আগে কখনোই যাওয়ার সুযোগ ঘটেনি। সত্যি বলতে কি, ওদের বাড়িতে যাওয়া তো দূরের কথা, আমি কখনো বরিশালই যাইনি। এটাই প্রথম যাওয়া, তা-ও নিতান্তই দায়ে পড়ে- অফিসের কাজে। কিন্তু না গেলে কী হবে, সেই দিনগুলোতে- একযুগেরও বেশি সময় আগের দিনগুলোর কথা বলছি- বরিশালের সবকিছুই ভালো লাগতো আমার। বরিশালের কীত্তনখোলা বা ধানসিঁড়ি নদীর নাম শুনে আমার মনটা হু হু করে উঠতো। মনে হতো জীবনানন্দ তো বরিশালেই জন্মাবেন, প্রকৃতি তাঁকে আগেই পাঠিয়েছে মৃন্ময়ীর জন্য ভিত্তিভূমি তৈরি করার কাজে! সদরঘাটে গিয়ে বরিশালগামী লঞ্চ-স্টিমারের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, মনে হতো- আহা ওরা কী সৌভাগ্যবান, ওদের জন্মই হয়েছে বরিশাল যাবার জন্য! মৃন্ময়ীর কপালে ছোট্ট কালো টিপটার দিকে তাকালে মনে হতো- মানুষ না হয়ে যদি ওই টিপ হতে পারতাম, তাহলে ওই টিপজীবনই অনেক বেশি সার্থক হতো! এইরকম আরো কতো কী! আবেগের তীব্রতা কি বোঝা যাচ্ছে, পাঠক? হ্যাঁ, ওর ব্যাপারে আমি সত্যিই অমন আবেগপ্রবণ ছিলাম। আবার ভাববেন না যে, মৃন্ময়ী আমার টিন-এজ প্রেম। মাস্টার্স পরীক্ষার আগে আগে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো আমার। ততোদিনে কৈশোরিক আবেগের বয়স পেরিয়ে এসেছি, অনেক মেয়ের সঙ্গে ঘুরেছি-ফিরেছি, মেয়েবন্ধুও হয়েছে কিছু, প্রেমেও পড়েছি দু-চারবার। কৈশোরে মেয়েদের ব্যাপারে যে তীব্র কৌতূহল ছিলো, ততোদিনে সেটি ফিকে হতে শুরু করেছে। খুব বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি এই সম্পর্ক। কিন্তু তাতে কি! ওকে প্রথম দেখায় ভালো লেগেছিলো, দ্বিতীয় দেখায় যেচে পড়ে পরিচিত হয়েছিলাম, তৃতীয় দিনেই মনে হয়েছিলো- এই মেয়েটিকেই আমি সারাজীবন ধরে খুঁজছি। অর্থাৎ যে কথাটি আর কোনোদিন কারো ব্যাপারে মনে হয়নি, মৃন্ময়ীর ব্যাপারে সেটিই মনে হয়েছিলো। আর সেজন্যই ওর সঙ্গে সম্পর্কটি অন্য সব সম্পর্ককে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো।
 
মনে পড়ে- কোনো এক খরাতপ্ত চৈত্রের দুপুরে কার্জন হলের ব্যালকনিতে হাঁটতে হাঁটতে আর ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এসেছিলো। আর একসময় অঝোরধারায় নেমে এসেছিলো বৃষ্টি। দীর্ঘ খরার পর প্রথম বৃষ্টি, ওর চোখেমুখে এক অজানা বিষণ্নতা, বৃষ্টিমাখা প্রবল হাওয়া ওর চুলগুলো উড়িয়ে এনে আমার চোখেমুখে ফেলছিলো আর ও ছিলো ভ্রুক্ষেপহীন। সেদিনই ও আমাকে প্রথমবারের মতো প্রায় নিজের অজান্তে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেছিলো। আর আমি বুঝে নিয়েছিলাম, এতদিনে মৃন্ময়ী আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। ওকে বলা হয়নি ভালোবাসি, সে-ও বলেনি। আমাদের সময় অতো বলা-কওয়ার চল ছিলো না, অনেককিছু ইঙ্গিতে-আচরণে বুঝে নিতে হতো। যেমন, এখনকার মতো পরিচয়ের শুরুতেই 'তুমি' করে বলার চল ছিলো না আমাদের, 'আপনি' থেকে 'তুমি'তে পৌছতে অনেকখানি সময় লাগতো। প্রথমবার 'তুমি' বলার মধ্যে যে কী সাংঘাতিক রোমাঞ্চ ও রোমান্টিকতা ছিলো সেটি বলে বোঝানো যাবে না। শুধু তাই নয়, কোনো মেয়ে যদি একবার আপনি থেকে তুমিতে পৌছতো তাহলে তার মুখ ফুটে আর কিছু বলতে হতো না, অন্যপক্ষ বুঝে নিতো। যাহোক, আমি তখন জানতাম না, ওটাই ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। সেদিনই ওর বাবা এসে প্রায় বিনা নোটিসে ওকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ব্যাপারটা এতই আকস্মিক ছিলো যে, ও আমাকে বলে যাবার সুযোগই পায়নি। ওর এক বান্ধবীর- শীলা- কাছে বলে গিয়েছিলো, ওর মা নাকি খুব অসুস্থ, তাই হঠাৎ করে যেতে হচ্ছে, আমাকে যেন জানায়। তখনো বাংলাদেশে মোবাইল ফোন আসেনি যে, যখন-তখন যোগাযোগ করা যাবে। তাছাড়া দু-জন থাকতাম দুই হলে। মেয়েদের হলগুলোতে তখন আবার সান্ধ্য-আইন চালু ছিলো, অর্থাৎ সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে হলে ঢুকে যেতে হতো। এরপর একমাত্র মৃত্যু ছাড়া অথবা অনুমোদিত অভিভাবকের উপস্থিতি ছাড়া বেরোবার কোনো উপায়ই ছিলো না। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, মাত্র বছর পনের আগেও খোদ ঢাকা ইউনিভার্সিটিতেই এই আইন জারি ছিলো। এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে এসব তো গাঁজাখুড়ি গল্প বলে মনে হবে! মাত্র দেড় দশকেই যুগ-বিভাজন ঘটে গেছে, এখনকার ছেলেমেদের দোষ দিয়ে লাভ কি? যাহোক, মৃন্ময়ী সেই যে গেলো, আর ফিরলো না। আমি অপেক্ষা করি, শীলার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, সে-ও কিছু বলতে পারে না। একটা চিঠি যে লিখবো তারও উপায় নেই। ওর বরিশালের ঠিকানা বা ফোন নম্বর জিজ্ঞেস করিনি কখনো, করার কথা মনেও আসেনি। শীলার বাড়িও বরিশাল, সে-ও মৃন্ময়ীর বাড়ির ঠিকানা বলতে পারলো না। যাহোক, অবশেষে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবার সময় আমি শীলার কাছে একটা চিঠি দিয়ে দিলাম মৃন্ময়ীকে পৌছে দেবার জন্য। সেই চিঠিতে আমি মৃন্ময়ীকে দিযেছিলাম আমার সকল আনন্দ-বেদনার ভার আর আমাকে পোড়াবার মোহনীয় অধিকার। ছুটি শেষে শীলা ফিরে এলো, মৃন্ময়ী এলো না, আমার চিঠির কোনো উত্তরও এলো না। শীলাও যেন একটু এড়িয়ে চলতে লাগলো আমাকে, মৃন্ময়ীর কথা জিজ্ঞেস করলে বলতে চাইতো না, এ-কথা ও-কথা বলে এড়িয়ে যেত। অনেক চেষ্টা-চরিত্রের পর জানলাম, মৃন্ময়ীর মা-র ক্যান্সার হয়েছে, মেয়ের বিয়ে দেয়ার জন্য তিনি অস্থির হয়ে গেছেন, জোরেশোরে পাত্র দেখা চলছে। তারও কিছুদিন পর জানলাম_ মৃন্ময়ীর বিয়ে হয়ে গেছে। অতঃপর প্রেমের সমাপ্তি। এই হচ্ছে গল্প। নিতান্তই সাদামাটা। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে এত সরল নয়। এত সহজে কি প্রেমের গল্পের সমাপ্তি হয়? হয় না। অন্তত আমার হয়নি। হলে তো এই গল্প লেখার দরকারই পড়তো না। দরকার পড়েছে, কারণ, বুকটা ভীষণ ভারি হয়ে আছে, গল্প লিখে এই ভার খানিকটা কমাতে হবে। এ আমার এক বিচিত্র স্বভাব। কোনোকিছু নিয়ে খুব যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকলে একটা গল্প লিখে ফেলার চেষ্টা করি, লিখে ফেলতে পারলে যন্ত্রণার লাঘব হয় অনেকখানি। এই নিয়ে আমার বউ প্রায়ই আমাকে ক্ষেপায়, বলে_ 'যন্ত্রণা তো তোমার গল্পের খোরাক, তোমার যন্ত্রণাই পাওয়া উচিত। সেটা নিয়ে তো আর বেশিদিন ভুগতে হবে না, উপরি পাওনা হিসেবে একটা গল্প হয়ে যাবে!' নিজের যন্ত্রণা লাঘবের জন্য লিখি বলে আমার গল্পে নাকি জনজীবনের যন্ত্রণার কথা আসে না, সব নাকি ম্যাড়ম্যাড়ে গল্প- এই অভিযোগও আমার বউয়ের। বেচারি! বিয়ের আগে বামপন্থী রাজনীতি করতো, আমার 'প্রগতিশীল' চিন্তায় মুগ্ধ হয়েই নাকি আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলো! আগে বোঝেনি, লেখকরা শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই বন্দি, নিজের কাছেই দায়বদ্ধ! হতাশ হয়ে সে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, অবশ্য সংসার সামলাতে গিয়ে রাজনীতিটাও ছেড়েছে সে। তবে স্বীকার করে নিই, আামার বউ আমাকে যন্ত্রণা দেয় না। খুবই ভালো একটা মেয়েকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি আমি।

তো, এতদিন পর মৃন্ময়ীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সেই পুরনো কষ্টবোধ, অভিমান, অপেক্ষার যন্ত্রণা সব একসঙ্গে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। ভাবিনি, এভাবে দেখা হয়ে যাবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, স্টিমারে উঠে কেবিন থেকে আর বেরোবো না। শুয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ বই পড়বো, তারপর খেয়েদেয়ে লম্বা একটা ঘুম। জার্নি আমার ভালো লাগে না, সবসময় মনে হতে থাকে- কতোক্ষণে এই পথ শেষ হবে! জলপথের জার্নিতে অবশ্য অতোটা কষ্ট হয় না, শব্দহীন জার্নি তো, ঘুম হয় ভালো। কিন্তু পরিকল্পনা সফল হলো না। কেবিনে বসে বসেই দেখলাম- বিকেলের আলো মুছে আসছে, তখন আর ভেতরে বসে থাকতে পারলাম না। স্টিমার ততোক্ষণে বুড়িগঙ্গা ছেড়ে শীতলক্ষ্যায় প্রবেশ করেছে। আমি রেলিং-এ ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে দাঁড়ালাম। বিকেলের আলো মুছে গিয়ে আকাশ ও পৃথিবী জুড়ে এখন কনে-দেখা-আলো। এই আলোতে সমস্ত পৃথিবীর রঙই পাল্টে যায়। আর নদীর বুকে দাঁড়িয়ে বিকেলের মৃত্যু, কনে-দেখা-আলো আর ঘনায়মান সন্ধ্যা দেখার অভিজ্ঞতাটা ঠিক বর্ণনাযোগ্য নয়। কেউ যদি দৃশ্যটি না দেখে থাকেন তাহলে তিনশো পৃষ্ঠা বর্ণনা দিয়েও তাকে সেটি বোঝানো যাবে না। মানুষ আসলে তখন নিজের মধ্যে থাকে না, থাকে 'অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।' হয়তো সেজন্যই এই ফাঁকে আমার পাশে এসে যে কেউ দাঁড়িয়েছে সেটি টেরই পাইনি। অনেকক্ষণ ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থেকে কষ্ট হচ্ছিলো বলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই দেখলাম, আমার পাশে মৃন্ময়ী দাঁড়ানো! বিশ্বাস করিনি। ভেবেছি, বিভ্রম। ওই যে, অন্য কোথাও ছিলাম- তারই কন্টিনিউয়েশন! কিন্তু ও যখন জিজ্ঞেস করলো- কেমন আছেন- তখন সত্যি মনে হলো আর আমূল চমকে উঠলাম। এবং স্বভাবমতো সেটি তাকে বুঝতে দিলাম না।
কেমন আছেন, বললেন না তো!
এই তো! তুমি কেমন আছো?
এই তো, ভালো-মন্দ মিলিয়ে।
এরপর কি বলবো? এতদিন পর এমন অপ্রত্যাশিতভাবে একসময়ের প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে কী-ই বা বলার থাকে? অবশ্য ও-ই উদ্ধার করলো-
কোথায় যাচ্ছেন?
বরিশাল।
কাজে, না বেড়াতে?
কাজে। আমার তো বেড়াবার জায়গা নেই।
ক-দিন থাকবেন?
তিন-চারদিন। তুমি?
বাড়িতে যাচ্ছি। বাবা অসুস্থ।
ও। একা?
হ্যাঁ।
বর কোথায়?
ও ছুটি পায়নি। শুক্রবার যাবে।
ছেলেমেয়ে?
ওদের স্কুল খোলা, ওদের বাবার সাথে যাবে।
ভয় লাগে না?
ভয়!
এই যে একা একা যাচ্ছ!
নাহ! অভ্যেস হয়ে গেছে তো! কতোবার যাওয়া আসা করেছি!
আমি কথা খুঁজে পাই না। বিস্ময়ের ধাক্কা কাটেনি এখনো। অভিমান এসে গলার কাছে জড়ো হয়েছে যেন, সহজে কথা বলতে পারছি না। কিন্তু ওর মধ্যে এসবের কিছু নেই। কী সহজ, স্বাভাবিক! যেন প্রতিনিয়তই দেখা হচ্ছে আমাদের! যেন কোনো অজানা অধ্যায় নেই আমাদের জীবনে, যেন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বেদনায় কোনো কালো দাগ পড়েনি পুরনো সম্পর্কে। অবশ্য, আপনারা বলতে পারেন- (আমার বউও বলে, ও আবার এসবকিছুই জানে কী না!)- মৃন্ময়ী তো আমাকে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেয়নি কখনো। কিন্তু প্রেমই তো এক অলিখিত প্রতিশ্রুতি, হাতে হাত ধরে বলতেই হবে- এই যে প্রতিশ্রুতি দিলাম- এমন তো কোনো কথা নেই! আর তাছাড়া, আমাদের সম্পর্কটি হাত ধরার পর্যায় পর্যন্ত পৌছায়ওনি কখনো। তাহলে? ওর কি উচিত ছিলো না আমাকে জানানোর? এতদিন এত তীব্রভাবে কথাগুলো মনে না হলেও এখন প্রশ্নগুলো জেগে উঠছে। সত্যি বলতে কি, গত পনের বছরে ওর প্রতি অভিযোগ-অভিমান ক্ষীণ হতে হতে প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিলো, জেগে ছিলো মধুর কিছু মুহূর্ত। আমার সবসময় মনে হয়- মানুষ আসলে সম্পর্ক নিয়ে বাঁচে না, বাঁচে সম্পর্কের স্মৃতি নিয়ে। আমিও ওর সঙ্গে সম্পর্কের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি।
বিয়ে করেছেন?- ও-ই আবার জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ।
ছেলেমেয়ে?
এক ছেলে।
কতো বড় হলো?
এই তো ৪/৫ বছর।
এ আবার কেমন কথা! হয় ৪, না হয় ৫। নিজের ছেলের বয়স জানেন না?
না জানি না। তাতে কি তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে? এমন তো নয় যে, আমার ছেলে মানে তোমার ছেলেও!_ বলতে গিয়েও থেমে যাই। রাগ দেখিয়ে লাভ কি, আমি তাই চুপ করেই থাকি। আসলে বউ-বাচ্চা-সংসার এসব নিয়ে কথা বলতে বা শুনতে ভালো লাগছে না। রেলিং ধরে দূরে তাকিয়ে থাকি। অন্ধকার হয়ে এসেছে, কিন্তু নদীর বুকে চেপে বসতে পারছে না। সম্ভবত আকাশে চাঁদ, এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না যদিও, কিন্তু জোছনার আভাস দেখে বোঝা যাচ্ছে। জানি, ভাবছেন- দূর্বল লেখকদের মতো আমিও প্রেমের গল্পে চাঁদ উঠিয়ে ফেললাম। নারে ভাই, আমি উঠাইনি। সত্যি সত্যি উঠেছে, সত্যিই উঠলে আমার কি করার আছে? লেখকদেরকে আপনারা এত সন্দেহের চোখে দেখেন কেন?

দাঁড়িয়েই থাকবেন, না বসবেন?- বুঝতে পারছি মৃন্ময়ী কথা চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক। ইচ্ছে আমারও করছে, কিন্তু পারছি না। প্রশ্নের উত্তর না পেয়েও খুঁজেপেতে বসার জায়গা বের করে মৃন্ময়ী। এখনকার স্টিমারগুলো অভিজাত হয়ে উঠেছে, যাত্রীদের- বিশেষ করে কেবিনের যাত্রীদের- জন্য চমৎকার সব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করেছে। ডেক-এ মুখোমুখি বসার জন্য জোড়ায় জোড়ায় চেয়ারও পেতে রেখেছে। তারই এক জোড়ায় গিয়ে দুজনে মুখোমুখি বসলাম।

আপনি একদমই চুপ করে আছেন। আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?
করবে না কেন?
তাহলে এত চুপচাপ যে! আগে তো এমন ছিলেন না!
আমি বরাবরই কম কথা বলি।
আমার সাথে কিন্তু অনেক কথা বলতেন।
হ্যাঁ, শুধুমাত্র তোমার সঙ্গেই।
তাহলে এখন বলছেন না কেন?
আমি সোজাসুজি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলি- দ্যাখো, তোমার সঙ্গে আমার কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে। সেগুলো পরিষ্কার না হলে শুধু কার্টেসি করে কথা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
জীবন তো কতোগুলো অমীমাংসিত বিষয়েরই সমষ্টি- কথাটা একসময় আপনার কাছেই শুনেছিলাম। যাহোক, আমিও বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে চাই।
বলো।
আপনি জিজ্ঞেস করুন।
আমার একটিই প্রশ্ন। যা কিছু ঘটে গেছে, তুমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছ বা নিতে বাধ্য হয়েছ, সেসব নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু একটিমাত্র প্রশ্ন।
কি প্রশ্ন?
তুমি আমাকে কিছু জানালে না কেন?
জানানোর সুযোগ পাইনি। মা-র অসুস্থতার খবর পেয়ে হঠাৎ চলে যেতে হলো। গিয়ে এমন এক অবস্থার মধ্যে পড়লাম যেটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমার ছিলো না। মা আমার বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন, বাবা পাত্র দেখছেন এসবের কিছুই আমার জানা ছিলো না। মা-র ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছিলো, ওই সময়টায় তার অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছিলো, কিন্তু কথাটা কাউকে বলার মতো অবস্থা ছিলো না। আমার বিয়ের জন্য মা-র এত অস্থিরতা ছিলো কেন জানেন? কারণ, মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার হলে মেয়েরও হয়_ এরকম একটা ধারণা এখন পর্যন্ত আমাদের সমাজে চালু আছে। মা-র খবরটা জানাজানি হয়ে গেলে আমার আর বিয়েই হবে না, এই জন্য এত লুকোচুরি। এদিকে চিকিৎসার অভাবে মহিলা মরতে বসেছেন! তো অবস্থাটা তখন এতটাই প্রতিকূলে চলে গেলো যে, আপনার কথা মা-বাবাকে বলারই সাহস পাচ্ছিলাম না। আর বলবোই বা কোন ভরসায়? আপনার মুখে তো কোনোদিন বিয়ে-সংসার এইসব প্রসঙ্গে কিছু শুনিনি।
সেসব বলার মতো সম্পর্ক কি তৈরি হয়েছিলো আমাদের? আমি কি সেই সময়টুকু পেয়েছিলাম?
না। হতে পারতো, হয়নি। সেজন্য আমি আপনাকে দায়ী করছি না। দায়টা আমারই। আমিই বেশি সময় নিয়ে ফেলেছিলাম।
কেন নিয়েছিলে?
সেটাও বলবো। তার আগে ওই প্রসঙ্গটা শেষ করি। আমি ওই সময় অন্তত একটিবারের জন্য ঢাকায় আসতে চেয়েছিলাম, শুধুমাত্র আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য। বাবা আসতে দেননি। জোর করে আসার মতো পরিস্থিতিও ছিলো না। তো, তখন একবার শীলা গিয়েছিলো আমাদের বাড়িতে। কিন্তু ও আমাকে বলেইনি যে, আপনার সাথে ওর দেখা হয়েছে বা আপনি চিঠি দিয়েছেন। আমার অভিমানও হয়েছিলো খুব, আমি আপনার কাছ থেকে একটা চিঠি আশা করেছিলাম।
কিন্তু শীলা তোমাকে চিঠিটা দেয়নি কেন? ওর এই আচরণের মানে কি?
সেটা তখন জানতাম না। বিয়ের অনেকদিন পর ও একদিন আমার বাসায় গিয়ে বলেছিলো_ 'আমি হয়তো ভুল করেছি, কিন্তু তোর অমঙ্গল কামনা করিনি। ওই পরিস্থিতিতে তোকে চিঠিটা দিলে তুই বিপদে পড়তি। বিয়েতে রাজিও হতে পারতি না। ওদিকে কামাল ভাইয়েরও কোনো ঠিকঠিকানা নেই যে তোকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে! কিন্তু এই চিঠিটার ভার আমি আর বইতে পারছি না। তোর চিঠি তোকেই দিতে এলাম।' বিয়ের পর স্বামী-সংসার-শ্বশুরবাড়ি-মায়ের মৃত্যু এই সবকিছু মিলিয়ে আপনাকে প্রায় ভুলেই যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো_ যা হয়েছে ভালোই হয়েছে, এরচেয়ে বেশিকিছু পাওয়ার কথা ছিলো না আমার। কিন্তু ওই চিঠিটা পড়ে সবকিছু ওলোটপালট হয়ে গেলো। মনে হলো, সবকিছু অস্বীকার করে আপনার কাছে চলে না গিয়ে বিরাট অপরাধ করেছি। আমার সেই অপরাধবোধ এখনো কমেনি। এখন তো পুরোপুরি সংসারী, স্বামী-সন্তান, তবু সবসময় মনে হয় আপনাকে আমি ঠকিয়েছি।
না, ঠকানোর প্রশ্ন নয়। আমার ওই একটাই প্রশ্ন ছিলো। উত্তর পেয়ে গেছি। আরেকটা প্রশ্ন করতে পারি?
মৃন্ময়ী হাসলো_ খুব কার্টেসি করছেন যে!
তোমার মা-র অবস্থা তুমি আগে থেকেই জানতে, সেটা আমাকে জানাওনি কেন তা-ও বললে। কিন্তু আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে তুমি এতখানি সময় নিয়েছিলে কেন?
তার কারণ ছিলো। আপনার নামে ক্যাম্পাসে অনেক আজেবাজে কথা ছড়ানো ছিলো। এরকম একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়ার ব্যাপারে যে কোনো মেয়েই অনেক সময় নেবে, কেউ কেউ হয়তো প্রথম বিবেচেনাতেই বাদ দিয়ে দেবে।
আজেবাজে কথা! আমার নামে! কি রকম?_ আমার সাংঘাতিক-রকম বিস্ময়বোধ হলো।
এই যেমন, আপনি নেশাটেশা করেন...
কিন্তু আমি তো কখনো নেশা করিনি।
নেশা ঠিক নয়। মদটদ খান...
তা খেতাম অবশ্য। সুযোগ পেলে, মাঝে মাঝে। নিয়মিত নয়। কিন্তু নেশা করা বলতে যা বোঝায়, অর্থাৎ অ্যাডিকশন, সেটা আমার কখনো ছিলো না। রোজ রোজ মদ খাওয়ার মতো পয়সাই তো ছিলো না।
প্রতিদিন খান নাকি মাঝে মাঝে খান, সেটা তো প্রশ্ন নয়। বিষয়টা আামর জন্য খুব বিপর্যয়কর ছিলো। মদ খাওয়া নিয়ে আমার মধ্যে একটা অযৌক্তিক ভীতি আর আতংক ছিলো। মদ খাওয়া লোকও যে ভালো হতে পারে, সেই ধারণাই আমার ছিলো না। বোঝেনই তো, মফস্বলের মধ্যবিত্ত একটা মেয়ের পক্ষে এসব সংস্কার কাটিয়ে ওঠা কতো কষ্টের!
এখন কেটেছে?
হ্যাঁ। না কেটে উপায় আছে? আমার বর তো নিয়মিতই খায়।
তুমি কিছু বলো না?
নাহ। বললেও শুনবে না। তাই ঝামেলা না বাড়িয়ে মেনে নিয়েছি। সংসার করতে গেলে মেয়েদেরকে অনেককিছু মেনে নিতে হয়।
শুধু মেয়েদেরকে নয় ম্যাডাম, ছেলেদেরকেও অনেক কিছু মেনে নিয়েই সংসার করতে হয়।
আমার গলায় হয়তো সহজ ভঙ্গিটি টের পেয়ে হেসে ফেললো মৃন্ময়ী। বউকে খুব মেনে চলেন বুঝি!
তা তো চলতেই হয়...
গল্পটা ঠিক এই পর্যন্ত লেখার পর হন্তদন্ত হয়ে বউ এলো- এল এই কিছু টাকা দাও তো।
টাকা! কিসের টাকা!
কিসের টাকা আবার, কাগজের টাকা!
ইয়ার্কি করো না। হঠাৎ করে টাকা চাচ্ছো কেন?
হঠাৎ করে চাইলাম কোথায়? ঘরে বাজার বলতে কিচ্ছু নেই। তুমি তো পৃথিবীর সেরা অলস, আমাকে একটু বাজারটা তো করে দিতে পারো!
মাফ করে দাও। কিন্তু সেদিনই না এক হাজার টাকা দিলাম, এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো?
এক হাজার টাকা! বাজারে তো যাও না, গেলে বুঝতে, এক হাজার টাকার বাজার করলে তিন-চারদিনও চলে না। সংসারটা তো চালিয়ে নিতে হবে!
কি বলছো তুমি? দেশটা কি জাপান হয়ে গেলো যে, ব্যাগভরতি টাকা নিয়ে অর্ধেক ব্যাগ বাজার নিয়ে আসতে হবে!
অবস্থা তার চেয়েও খারাপ জনাব। ওদের তবু ব্যাগ ভরতি করে টাকা নেয়ার ক্ষমতা আছে। আমাদের তো তা-ও নেই। আচ্ছা তুমি কি লিখছো এত মনোযোগ দিয়ে বলো তো!
গল্প লিখছি, প্রেমের গল্প।
প্রেমের গল্প! সেদিন না দুঃখ করে বললে, বুড়ো হয়ে যাচ্ছো, অচেনা তরুণীরা এখন আর ভাই বলে ডাকে না, আংকেল বলে ডাকে! তা আংকেলের হঠাৎ নতুন প্রেম জন্মালো কিভাবে?
নতুন প্রেম নয় ম্যাডাম। পুরনো প্রেমই। মৃন্ময়ীকে নিয়ে গল্প। সেদিন দেখা হলো তো, মনটা ভারি হয়ে আছে, বুঝেছ! গল্প লিখে নামিয়ে ফেলতে চাচ্ছি।
তুমি বেশ আছো। গল্প লিখে মাথা থেকে নামিয়ে ফেলছো। আচ্ছা, একটা গল্প লিখে বাজারদরটা একটু নামিয়ে দিতে পারো না!
বাজে কথা বলো না। গল্প লিখে ওসব হয় না।
না-ই বা হলো, তবু তো লিখতে পারো! মানুষ এত সাফার করছে, সারাদেশের মানুষ আধপেট খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, আর তুমি লিখছো প্রেমের গল্প! মানুষের জন্য তোমার কোনো মায়া-মমতা নেই?
টাকা নিয়ে এখান থেকে ভাগো তো! তোমার লেকচার শুনতে ইচ্ছে করছে না। আমার মুডটাই নষ্ট করে দিচ্ছো!

বউ আমার দিকে একটা অগি্নদৃষ্টি হেনে চলে গেলো, কিন্তু আমাকে ভস্ম করতে পারলো না। আমি এখন মৃন্ময়ীতে আছি। আমি যখন মৃন্ময়ীতে থাকি তখন কিছুই আমাকে স্পর্শ করে না।

আপনারাই বলুন, গল্প লেখার সময় এসব যন্ত্রণা সহ্য হয়? গল্পের সঙ্গে বাজারদরের সম্পর্ক কি? এইসব বিপ্লবীদের সেটা বোঝাবে কে বলুন! যাহোক, মৃন্ময়ীর গল্প বলছিলাম, আবার সেখানেই ফেরা যাক। মৃন্ময়ী জিজ্ঞেস করেছিলো_ বউকে খুব মেনে চলি কী না। আর আমি উত্তর দিয়েছিলাম_ তা তো চলতেই হয়।
তারপর জিজ্ঞেস করলাম_ তা আমার নামে আর কি আজেবাজে কথা শুনেছিলে?
ও হ্যাঁ, এই বিষয়টি নিয়ে আপনার সাথে কথা বলাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা তো বললামই, আরো অনেক কথা...
কিন্তু আমার নামে এত কথা ছড়াবে কেন? কথা ছড়ায় বিখ্যাতদের নামে। আমি তো তেমন কেউ ছিলাম না।
ছিলেন। বিখ্যাতই ছিলেন। যারা রাজনীতি-টাজনীতি করতো তাদের বাইরে আপনিই সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন।
অবিশ্বাস্য।
না, সত্যি বলছি। প্রমিজিং রাইটাররা, কবিরা ক্যাম্পাসে বিখ্যাতই থাকে। আপনার লেখালেখি, জীবন-যাপন নিয়ে অনেক অচেনা ছেলেমেদেরকেও কথা বলতে শুনেছি। চেনারা তো বলতোই। আপনি হয়তো সেটা জানতেন না। কিন্তু ব্যাপারটা আমি টের পেয়েছিলাম আপনার সঙ্গে পরিচয়ের পরপরই। সম্পর্কটা অন্যদিকে যাওয়ার আগেই অনেকেই- বিশেষ করে ছেলেরা- এসে আপনার নামে আজেবাজে কথা বলে যেত।
কি কথা?
আপনি নাকি সারারাত পার্কে গিয়ে খারাপ মেয়েদের সঙ্গে গল্প করেন, আরো কী কী করেন, শহরের সব গুন্ডা-বদমাশদের সঙ্গে নাকি আপনার বন্ধুত্ব!
আমি হা হা করে হেসে উঠলাম।
হাসছেন কেন?
এমনি।
এমনিই হাসেননি, কেন হাসলেন বলতে হবে।
আচ্ছা বলবো। তার আগে তুমি বলো, এসব কথা তুমি বিশ্বাস করতে?
আমি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ধারে-কাছেই যাইনি। এমনকি কথাগুলো সত্যি কী না তা-ও যাচাই করে দেখিনি। আমার বোঝাপড়াটা ছিলো আমার নিজের সাথেই, আপনার সাথে নয়। আমি এর সবকিছুকেই সত্যি ধরে নিয়ে ভাবতাম- আপনার এই চরিত্রটি আমার অচেনা, আর যে চরিত্রটি আমি চিনেছি, এই দুই মিলিয়ে যে আপনি তাকে আমি সারাজীবন ধরে নিঃশর্তভাবে ভালোবেসে যেতে পারবো কী না। আমার জন্য বিষয়টা সহজ ছিলো না। সংস্কারগুলো তো ঝেড়ে ফেলতে পারিনি, সহজ হবে কিভাবে? কিন্তু আপনার আকর্ষণ উপেক্ষা করাও সম্ভব ছিলো না আমার পক্ষে। ওই জন্যই সময়টি নিয়েছিলাম।
শেষ পর্যন্ত কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে?
সেটা কি আপনি বোঝেননি? শেষ যেদিন দেখা হলো, আপনি কি বোঝেননি, আমি আপনার কাছেই এসেছি?
হ্যাঁ বুঝেছিলাম।
আপনি কিন্তু বলেননি, আমার কথা শুনে হাসলেন কেন!
হাসলাম... তুমি যা শুনেছিলে সবই সত্যি, তবে একটু টুইস্ট হয়ে তোমার কানে গেছে। আমি সত্যিই মাঝে মাঝে মদ খেতাম, পার্কে গিয়ে সারারাত ধরে নিশিকন্যাদের সাথে গল্প করতাম...
নিশিকন্যা নামটাও আপনার দেয়া, তাই না? আপনি কখনো আপনার লেখায় পতিতা, বেশ্যা এইসব শব্দ ব্যবহার করেন না। মুখেও বলেন না!
হ্যাঁ, আমারই দেয়া। তো, ওদের সঙ্গে আমার খুব আড্ডা হতো, ওদের কার্যকলাপ দেখতাম। শেষ রাতের দিকে ওদের পাশে শুয়ে ঘুমিয়েও পড়তাম কোনো-কোনোদিন। কিন্তু ওই যে, কী কী যেন করা, ওটা করিনি কখনো। করার সুযোগ ছিলো না। ওদের সঙ্গে একটা সহজ সম্পর্ক তৈরি করতে হলে ওটা করা যাবে না। ওরা যাদেরকে কাস্টমার বলে মনে করে, তাদের সঙ্গে জীবনের কথা বলে না। ওরা আমাকে কি বলে ডাকতো জানো?
কি?
আউলা দাদা।
মানে?
মানে পাগল, এলোমেলো। আমি ওদেরকে ডাকতাম দিদি বলে। হরেকরকম নাম দিয়েছিলাম ওদের- রাঙাদি, বৃক্ষদি, পুষ্পদি, কাঞ্চনদি, মণিদি এইসব...
কিন্তু কেন এসব করতেন আপনি?
আমার ভালো লাগতো। শুধু ওদের সাথেই নয়, নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত লোকজনের সঙ্গেও আমার সুসম্পর্ক ছিলো। আমি মাঝে মাঝে সারারাত ধরে এই শহরের রাস্তাঘাটে অলিগলিতে ঘুরে বেড়িয়েছি। কতোবার আমাকে পুলিশে ধরেছে, ছিনতাইকারীরা ধরেছে। তারপর আমার কথাবার্তা শুনে ছিনতাই করার বদলে রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাইয়েছে। এই শহরে কেউ যদি সারারাত ধরে ঘুরে বেড়ায় তাহলে মাতাল-ভবঘুরে-চোর-গুন্ডা-হাইজ্যাকার-নিশিকন্যা-পুলিশ এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হবেই। আমি এগুলো খুব এনজয় করতাম।
এনজয় করতেন!
হ্যাঁ। ওরা তো আসলে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়ম-কানুন, আইন-আদালতকে বুড়ো আঙুল দেখানো মানুষ। কেউ তো আর ইচ্ছে করে অপরাধী হয় না, সবার পেছনেই একটা করুণ গল্প থাকে। ওরা সেই গল্প থেকে বেরিয়ে আসা মানুষ, সমাজকে থোড়াই-কেয়ার করা মানুষ। নিজেদের মতো একটা জগৎ তৈরি করে নিয়েছে তারা, ওদের জগৎটা একেবারেই অন্যরকম, সেই জগতেরও নিয়ম কানুন আছে, কিন্তু সেটা প্রচলিত সমাজের ধারেকাছেও যায় না। এসবই আমাকে খুব আকর্ষণ করতো।
আমি কিন্তু আপনার এসব ব্যাখ্যা না জেনেই, এমনকি ব্যাপারটাকে খারাপ ধরে নিয়েই...
কিন্তু তাতে তো কোনো লাভ হলো না মৃন্ময়ী।
হ্যাঁ, কোনো লাভ হলো না। জীবনটা পাল্টে গেলো...ওলোটপালোট হয়ে গেলো- বলতে বলতে ওর গলা ধরে এলো।
আমিও কিছু বললাম না আর। কী-ই বা বলা যায়! সম্পর্ক, সম্পর্কের দায়, সম্পর্কের স্মৃতি এসব তো আর মধুর হয় না সবসময়। কখনো কখনো ভারি হয়ে চেপে বসে কাঁধে। হয়তো ওর ক্ষেত্রে তেমনটিই হয়েছে। একজনের সঙ্গে সম্পর্কিত হবার দায় ও স্মৃতি নিয়ে আরেকজনের সঙ্গে সংসারযাপন কঠিন ব্যাপার। আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি অবশ্য একটু অন্যরকম। আমার মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নেই। কারণ, আমার চাওয়ার মধ্যে যেমন কোনো ফাঁক ছিলো না, চেষ্টার কোনো কমতিও ছিলো না। ছিলো অনন্ত অপেক্ষা, অননন্ত প্রেম। ফলে দিনে দিনে দায়টুকু ঝরে পড়েছে- জেগে আছে স্মৃতি। এখনও, এই এতদিন পরও ওর সঙ্গে আমি নিয়মিত একা একা কথা বলি। আমার যাবতীয় গ্লানি ও বেদনার কথা, দুঃখ ও আনন্দের কথা, অপমান-হতাশা-স্বপ্নভঙ্গের কথা, ব্যর্থতা ও সাফল্যের কথা- যা আমি কাউকে বলতে পারি না, সেগুলো ওকেই বলি। বলতে পারি বলেই এখনো ভালো আছি, ক-জন মানুষেরই বা এমন একজন কথা বলার সঙ্গী থাকে! আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হলে, সংসার হলে সম্পর্কটা কেমন হতো? বুঝতে পারি না। এমনিতে বিয়ে-সংসার এসবের প্রতি ইতোমধ্যেই আমার প্রায় ঘৃণা জন্মে গেছে। আমার বউ যে খুব খারাপ মেয়ে বা ওর সঙ্গে যে আমার অ্যাডজাস্টমেন্ট হয়নি তা নয়, বরং অনেক ব্যাপারেই ও অসাধারণত্বের সীমা ছুঁতে পারে। তবু আমি ক্লান্ত। সংসার ব্যাপারটা ঠিক আমার স্বভাবের সঙ্গে যায় না। মৃন্ময়ীর সঙ্গেও কি আমি এমন ক্লান্ত হয়ে পড়তাম? সেটা খুব মর্মান্তিক ব্যাপার হতো। ভালোবেসে কাউকে বিয়ে করার পর তার সঙ্গে জীবনযাপনে ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো বেদনাদায়ক ব্যাপার আর কি আছে? ওর সঙ্গে সংসার হলে জীবন হয়তো অন্যরকম হতো, কিন্তু সেটি যে সুখকরই হতো তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এসবই বুঝি। তবু কোনো কোনো সময় ওর জন্য বুকের খুব গহন-গভীরে গোপনে যে দীর্ঘশ্বাস পড়ে না, তা-ও নয়। এ হচ্ছে 'লাইফ ইজ এলসহোয়ার' বা 'অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে'র মতো ব্যাপার। কেবলি মনে হয়- এ জীবন আমি চাইনি, আমার কাঙ্ক্ষিত জীবন পড়ে আছে অন্য কোথাও। কিন্তু কোথায়, জানি না।

আমাদের কথা থেমে থাকে দীর্ঘসময়ের জন্য। তারপর একসময় ক্যান্টিন-বয় এসে খাবারের কথা জিজ্ঞেস করে। মৃন্ময়ী রাতের খাবার রেঁধে এনেছে বলে ফিরিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আমার লঞ্চ-স্টিমারের খাবার খুব পছন্দের বলে ওকে দু-জনের খাবার রুমে দিয়ে যেতে বলি। মৃন্ময়ী আমার কেবিনে আসে, দুটো বিছানার মাঝখানে টেবিলটা টেনে এনে মুখোমুখি বসে। ক্যান্টিন বয় এসে খাবার দিয়ে যায়। এই প্রথম একই টেবিলে মুখোমুখি বসে খাওয়ার সুযোগ হয় আমাদের। খাবার পর আবার বাইরে এসে বসি, কিছুক্ষণ সামনের দিকে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। এলোমেলো কথা হয় অনেক, কিন্তু আলাপ জমে না। যেন, যা কিছু জানার ছিলো সব জানা হযে গেছে, যা কিছু বলার ছিলো বলা হযে গেছে। রাত বাড়ে, ডেক-এ ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা যাত্রীরা সব ঘুমোতে চলে যায়, তারপরও আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। কতোক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই, এর মধ্যে কি বলেছি, কি শুনেছি তা-ও মনে নেই। হঠাৎ ওর স্পর্শে আমার সম্বিৎ ফেরে। দেখি আমার হাত ও নিজের দু-হাতে তুলে নিয়েছে। ওর চোখ ভেজা, প্রায়ান্ধকারে ওই ভেজা চোখের ভাষা বুঝে উঠতে পারি না বলেই হয়তো ও বলে- 'জানো, তোমার কথা যখন মনে হয়, তখন আমার স্বামী-সংসার-দুটো বাচ্চা সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায়, ইচ্ছে করে সব ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসি।'
এতদিন পর আবার হাতে হাত, আবার মৃন্ময়ীর 'তুমি' সম্বোধন! আমি কিছু বলি না। আমার তো এমন ইচ্ছে করে না, বলবো কেন? ওর জন্য গভীর এক বেদনাবোধ আছে আমার, কিন্তু ওর সঙ্গে বা আর কারো সঙ্গেই একটি পুরো জীবন কাটানোর সাধ হয় না আমার।
আমার কোনো সাড়া না পেয়েই হয়তো ও বলে, তুমি ঘুমোবে না? অনেক রাত হলো তো!
হ্যাঁ, চলো।
আমি গিয়ে নিজের রুমে ঢুকি, আর কী আশ্চর্য- পেছনে পেছনে মৃন্ময়ীও! এবার আমি ওর চোখ পড়তে পারছি, সেই চোখে মদিরতা, আমন্ত্রণ, আকর্ষণ। ও নিজের থেকেই দরজাটা বন্ধ করে দিলে সেই ভাষা আরো পরিষ্কার হয়। মৃন্ময়ী গিয়ে দুটো বিছানার একটিতে শুয়ে পড়ে বলে- 'লাইটটা অফ করে দাও।' আমি লাইট অফ করে অন্য খাটের দিকে এগোতেই ওর কণ্ঠ শুনি- 'এদিকে এসো না!' আমি সেই ডাককে উপেক্ষা করতে পারি না। চুম্বক আকর্ষণে ওর দিকে এগিয়ে যাই। ও নিবিড় করে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমিও। মৃন্ময়ী বলে- 'জানো, আমি যখন আমার স্বামীর সাথে মিলিত হই, তখনও তোমার কথা ভাবি। মনে হয়, ও নয়, তুমিই জড়িয়ে রেখেছ আমাকে। বছরের পর বছর ধরে আমি ওর সাথে এই অভিনয় করে চলেছি। আমার জীবনটা এমন হলো কেন বলতে পারো? তোমাকে ঠকিয়েছি, নিজে ঠকেছি, ওকেও ঠকাচ্ছি। নিজেকে আপাদমস্তক প্রতারক মনে হয়, জানো!

ও এইসব বলে, আর আমার যেন ঘোর লেগে যায়। অন্ধকারে ওকে জড়িয়ে ধরে হঠাৎ করে মনে হয়_ মৃন্ময়ীকে আমি কোনোদিন ভালো করে দেখিনি। অর্থাৎ একজন পুরুষ তার কাঙ্ক্ষিত রমনীকে যে চোখে দেখে নেয়, মেপে নেয়_ তেমন করে দেখিনি। দেখিনি ওর বুক কতোটুকু উঁচু, নিতম্বের মাপ কেমন, কোমরে মেদ জমেছে কী না ইত্যাদি। আমি সেই প্রথমদিন থেকে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, আজও তাই থেকেছি। জানি, আপনারা ভাবছেন, ডাহা মিথ্যে বলছি। না, এ মিথ্যে নয়। আমি নিজেকে সাধুসন্ত হিসেবে দাবি করছি না। আমার কামনা-বাসনা প্রবল। রূপসী মেয়েদের দেখলে মুহূর্তের মধ্যে তার শরীরের আকর্ষণীয় অংশগুলো দেখে নিতে ভুল করি না, বউ ছাড়া আর কাউকে স্পর্শ করিনি এমন দাবিও করবো না, কিন্তু মৃন্ময়ীর ব্যাপারটা আমার কাছে সত্যিই অন্যরকম। এই চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে বুঝতে পারলাম- কেন ও আমার সমগ্র জুড়ে আছে। একবার ইচ্ছে হলো সমস্ত আবরণ খুলে ওকে দেখে নিই, প্রবেশ করি ওর মধ্যে, ওর সমস্ত রস নিংড়ে নিয়ে আদিম উল্লাসে মেতে উঠি। জানি, মৃন্ময়ী এখন এতটুকুও বাধা দেবে না, নিজেকে আমূল সমর্পণ করে বসে আছে সে। এইসব ব্যাপার অনেক আগেই বুঝতে শিখেছি। কিন্তু হঠাৎই মনে হলো- দরকার নেই, কিছু কিছু অপূর্ণতা থাকা ভালো। আমার মনের কথা ও পড়তে পারলো না হয়তো, নিজেই বুক থেকে আঁচল সরিয়ে দিলো, ফিসফিসিয়ে বললো...
গল্পটা আর এগিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বউ বকাবাজি করছে_ সারাদেশ ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে, হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে, লাখ লাখ মানুষ সাফার করছে, দু-দিন ধরে বাসায় কারেন্ট নেই, পানি নেই, আর উনি বসে বসে গল্প লিখছেন। এই তুমি উঠবে টেবিল থেকে? নইলে আমি সবকিছুতে আগুন ধরিয়ে দেবো।

একবার বলতে ইচ্ছে করলো_ আমি এই গল্প লেখা বন্ধ করে দিলে কি ঝড় থেমে যাবে, মানুষের মৃত্যু বা দুর্ভোগ কমবে, ইলেকট্রিসিটি ফিরে আসবে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ শুরু হবে? বলতে পারলাম না। অনেক ঠেকে শিখেছি, সবসময় সব কথা বলতে নেই।

গল্পটা শেষ পর্যন্ত বলা হলো না, পাঠক। এ পর্যন্তই থাক। হয়তো কিছু কিছু অপূর্ণতা থাকাই ভালো।


আগস্ট-নভেম্বর, ২০০৭।