Page loading ... Please wait.

নগর জীবন : ১
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
সকালে ঘুম ভেঙেই মনে হলো _ আজ আমি কোথাও যাবো না। এই মনে হওয়াটা অবশ্য নতু কিছু নয়, প্রায়ই এরকম হচ্ছে ইদানিং, কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না, কিছু করতে ইচ্ছে করছে না _যদিও, ইচ্ছে না করলেও সবই করতে হচ্ছে। জীবন এমনই হয়তো, এভাবেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। জীবনের হা এত বড় যে সবকিছু সে গিলে ফেলে, সেই বিরাট হা-এর মধ্যে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে কোনোরকমে টিকে আছি। তবু, একেকদিন যেন পুরোনো স্বপ্নগুলো জেগে ওঠে, একেকদিন সকালে উঠেই মনে হয় _ আজ আমি কোথাও যাবোনা, কোনো দায়িত্ব পালন করবো না, শহুরে নাগরিকদের সঙ্গে কোনো কার্টেসি মেইনটেইন করবো না। মনে হয় _ যে জীবন আমি যাপন করছি, তা নিজে বেছে নিইনি, এ জীবন নিয়তি-নির্ধারিত, আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব মনে হলে মন খারাপ হয়ে যায় আমার, অজানা কারো ওপরে প্রচণ্ড অভিমানে বুক ভরে ওঠে। প্রতিদিন সকালে উঠে আমি সেভ করি, তখন মনে হয় ্ল_ আজ আমি সেভ করবো না; প্রতিদিন আমি শুভ্র-সুন্দর পোশাক পড়ি _ ওইদিন মনে হয় আজ আমি মলিন থাকবো, খুঁজে-পেতে তাই পুরনো ময়লা প্যান্ট-শার্ট পড়ি। এমনিতে প্রতিদিন আমি আসা-যাওয়ার পথে মেঘের সঙ্গে কথা বলি, পাখি ও গাছের সঙ্গে কথা বলি _ ওইদিন মনে হয়, আজ আমি আকাশের দিকে তাকাবো না, পাখিদের ডাক কানে এলে দুই কানে আঙুল দেবো, আমি আজ কোনো ফুল দেখবো না, পাতাদের ফিসফিসানি শুনে থমকে দাঁড়াবো না, কোনো শিশুর দিকে তাকিয়ে আশায়-আনন্দে বুক ভরিয়ে তুলবো না, রূপকথার রাজকন্যাদের মতো কোনো রূপসী তরুণী দেখে বিস্ময়ে বলে উঠবো না _ বাহ, কী সুন্দর! হঁ্যা, একেকটি দিন আসে এমন...

কিন্তু আজকের দিনটি অন্যান্য দিনের মতো নয়, আজকে যে কোথাও যাবো না সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছি। ছুটির দিন। অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই, কালকে ফেরার পথে কাঁচাবাজারটাও সেরে ফেলেছি, বাজারেও যেতে হচ্ছে না, সম্ভাব্য সমস্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল করেছি, বউকে বাচ্চাসমেত বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি, কেউ যেন যোগাযোগ করতে না পারে সেজন্য সেলফোনটা বন্ধ করে রেখেছি। হয়তো জরুরী কোনো কাজে কেউ খুঁজবে। খুঁজুক। অন্তত একটি দিন আমি নিজের মতো করে থাকতে চাই। একদম নিজের মতো করে! ব্যাপারটা এমন কিছু নয় অবশ্য, একটি দিন যা ইচ্ছে তাই করাটাই আমার কাছে অনেক বড় বিষয়। কারো ইচ্ছেয় চলবো না, সকালে ঘুম থেকে উঠবো দেরি করে, কিংবা উঠবোই না _ দুপুর পর্যন্ত শুয়েই থাকবো, উঠে খালিপেটে সিগারেট ধরিয়ে কষে টান দেবো, বাথরুমে গিয়ে ঘণ্টাখানেক ধরে গোসল করবো, সেভ করবো না, গোসল থেকে বেরিয়ে লুঙ্গি-গেঞ্জি পড়ে চা হাতে প্রিয় কোনো বই নিয়ে বসবো, প্রিয় কোনো গান শুনবো, কিংবা চোখ ফেলে রাখবো টিভি-পর্দায় কিন্তু কিছুই দেখবো না। দুপুরের খাবার খাবো বিকেলে, খেয়ে আবার ঘুমোবো, কিংবা ঘুমোবো না, প্রিয় কোনো সিনেমাও দেখে নিতে পারি আরেকবার, পুরনো দিনের স্মৃতি রোমোন্থন করবো, না পাওয়া প্রেমের কথা ভেবে সুখ-সুখ কষ্ট পাবো _ এই তো! এসব মানেই আমার কাছে নিজের মতো করে দিন কাটানো। আমি এরচেয়ে বেশি আর কিইবা করতে পারি, চাইতে পারি! কতদূরই বা যেতে পারি! যেটুকু পারি, সোজা কথায় _ আলস্য করবো। আমার কাছে আলস্যের মতো প্রিয় কোনো বিষয় নেই। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এমন এক জীবন আমি যাপন করছি যে, সবসময় ছুটে বেড়াতে হচ্ছে। এমনকি ছুটির দিনগুলোতেও আমার এমন কোনো না কোনো কাজ পড়ে যায় যে না গিয়ে উপায় থাকে না। বললে কেউ বিশ্বাস করবে না জানি, তবু বলি _ গত প্রায় সাড়ে চার মাসে আমি একটি দিনও ছুটির দিন হিসেবে কাটাতে পারিনি। একটানা একশ বত্রিশ দিন ধরে আমি সকাল-সন্ধ্যা ছুটে চলেছি। কেন ছুটছি, কোথায় যাচ্ছি বা কোথায় যেতে চাই, কী করছি বা কী করতে চাই সেসব নিয়েও ভাবার সময় পাই না। আমার চার বছর বয়সী বাচ্চাটার সঙ্গেও প্রায় দেখাই হয় না। এই বয়সী বাচ্চারা কী আকর্ষণীয় হয়! তাদের সঙ্গেই সারাটি জীবন কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। অথচ আমার ভাগ্যে যেন তা-ও নেই। সকালে যখন বেরোই তখন সে ঘুমিয়ে থাকে আর রাতে যখন ফিরি ততক্ষণে সে আবারও ঘুমে। মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলে, আকুল হয়ে ডাকে, আমি সাড়া দিতে পারি না। মন খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু সেসব কথা কাউকে বলতে পারি না। মায়ের জন্য, বাচ্চার জন্য মন খারাপ! এগুলো তো প্রাচীনকালের সস্তা সেন্টিমেন্ট, এ-কালে এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। মন আমার অনেক কারণেই খারাপ হয়, অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে _ না বলতে বলতে বুকের ভেতর কথার পাহাড় জমেছে, কিন্তু বলা হয় না। কাকে বলবো, শোনার মানুষ কোথায়? বন্ধুরাও আমার মতোই ছুটে চলেছে, কারো সাথে কারো দেখা নেই, কথা নেই, অনেক সময় ফোনে কথা বলার সময়টুকু পর্যন্ত হয় না। ব্যস্ত। সবাই খুব ব্যস্ত। আর রইলো বউ। হঁ্যা, এককালে _ এখন মনে হয় সেসব বহুকাল আগের কথা _ ওর সঙ্গে কথা বলতাম বটে, প্রচুর কথা, কথার স্রোত যাকে বলে, ও-ও আগ্রহ নিয়ে শুনতো, সরস মন্তব্য করতো, খুনসুটি-দুষ্টুমি করতো _ কিন্তু সেসব বিয়ের পরপর রোমান্টিক-সময়ের কথা। ধীরে ধীরে সংসারের ভার সে নিজেই তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে, পূর্বতন সংসার-কত্রী আমার মা এখন বউয়ের দাপটে নির্বাসনে গেছেন, গ্রামের বাড়িতে; আমি শুধু টাকার জোগান দেয়া ছাড়া আর কিছুই করি না _ আর বউয়ের আচার-আচরণ-অ্যাটিচিউড সব পাল্টে গেছে। এখন কোন কথা বললে সে রেগে যাবে, কোনটা বললে ক্ষুণ্ন হবে এসব হিসেব করে চলতে হয় আমাকে। আমার অনেক কথা নাকি সংসারের শান্তি-স্থিতিশীলতা-নিরাপত্তার জন্য হুমকি বয়ে নিয়ে আসতে পারে, তাই সেসব কথা বলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। আমি তা মেনেও নিয়েছি। খুবই 'শান্তিপ্রিয়' লোক আমি, ভয়াবহরকমের কমপ্রোমাইজিং। সে যদি বলে_ তোমার মা একটা বেশ্যা আর তুমি তার জারজ সন্তান _ আমি বোধহয় তা-ও মেনে নেব। সংসারের যাবতীয় ক্ষমতা তার হাতে, পেছনে আবার তার ষণ্ডামার্কা মারদাঙ্গা ভাইরা আছে, মেনে না নেয়া ছাড়া উপায় কি? মুশকিল হলো _ এটা বলা যাবে না ওটা বলা যাবে না বলে সে এক লম্বা তালিকাই তৈরি করে ফেলেছে, কিন্তু কোনটা যে বলা যাবে, আর কোন কাজটি যে করা যাবে _ সে ব্যাপারে কিছুই বলে না। ফলে আমাকে থাকতে হয় ভয়ে ভয়ে। এমনিতেই দেখা হয় কম, তারওপর কোন কথাটা শান্তি-স্থিতিশীলতা-নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয় এসব ভাবতে ভাবতেই আমার আর কিছু বলা হয় না। চুপ থাকতে থাকতে প্রায় বোবাই হয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে মনে হয় চিৎকার করে উঠি, মনে হয় ইচ্ছেমতো গালাগালি করি, মনে হয় _ এইসব অদ্ভুত-উদ্ভট নিয়ম কানুনের ওপর মুতে দেই। অসহ্য হয় উঠেছি। মানুষের একটা সহ্য ক্ষমতা থাকে, সেটা পেরিয়ে গেলে সে যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারে। আমি দুদিক থেকেই _ শারীরিক এবং মানসিক উভয়ই _ সেই সহ্য-ক্ষমতা অতিক্রম করে এসেছি। এখন যে কোনো সময় যে কোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। ঠিক এরকম একটি সময়ই একটা দিন বেছে নিয়েছি নিজের মতো করে কাটানোর জন্য, নিজের দিকে ফিরে তাকানোর জন্য।

কিন্তু এত পরিকল্পনা করেও খুব একটা লাভ হলো না। ঘুম ভেঙে গেলো সকালেই। প্রতিদিন এই সময় ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয় তার, চোখ থেকে কোনোভাবেই ঘুম যেতে চায় না, অথচ আজকে না চাইতেই ঘুম ভেঙে গেলো। কিন্তু ওঠার তাড়ার নেই বলে বিছানায়ই শুয়ে রইলো অনেকক্ষণ। হঠাৎ মনে হলো _ সারাজীবন যদি এইভাবে শুয়ে থাকা যেতো! মনে হলো _ শরীরটা খারাপ লাগছে, কেমন অস্থির লাগছে, পা-হাত ভেঙে আসেছে, বুকের পাঁজরগুলো যেন কেউ দু-হাতে শক্ত করে ধরে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে _ একটুক্ষণ পর চোখজুড়ে ফের ঘুম নেমে এল তার। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো্ল _ দুপুর গড়িয়ে বিকেল, ল্যান্ডফোনটা বেজে বেজে ক্লান্ত হয়ে থেমে গেলো কয়েকবার, সন্ধ্যায় বউ বাসায় ফিরে কলিংবেল চাপতে চাপতে হয়রান হয়ে গেলো, কিন্তু ভেতর থেকে কেউ দরজা খুললো না। এ কেমন ঘুমরে বাবা, কোনোভাবেই ভাঙছে না_ বউ স্বগতোক্তি করে আবার চলে গেলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো, ল্যান্ডফোন-কলিংবেল বেজে চললো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিলো না।

মাঝরাতে উদ্বিগ্ন আত্নীয়স্বজনবন্ধুবান্ধব দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখলো _ সে ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে চোখ খুলে কোনো এক অনন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। কান্না, আহাজারি, হৈচৈ কোনোকিছুতেই সে আর সাড়া দিলো না।