মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে আদিত্য শুনতে
পেলো _ কোথায় যেন একটানা ঝিরঝির একটা শব্দ হচ্ছে। নাকি শব্দটাই তার
ঘুম ভাঙালো? ঘুম ভাঙানো যে কোনো শব্দই খুব বিরক্তিকর, কিন্তু এটাকে
তেমন মনে হচ্ছে না, বরং ভালো লাগছে , সে তাই কান পেতে অনেকক্ষণ ধরে
ওই মিষ্টি শব্দ শুনতে থাকে। একবার ভাবলো, উঠে গিয়ে শব্দের উৎস
আবিষ্কার করবে, কিন্তু কী এক গভীর আলস্য তাকে জড়িয়ে ধরলে সে
গুটিশুটি মেরে শুয়েই থাকে। চোখ বুজে পড়ে থাকতে থাকতে ঝিমুনি ধরে
যায়, কিন্তু ঘুম আর আগের মতো ফিরে আসে না। বরং ওই একটানা অনির্ণীত
শব্দ বহু মানুষের ফিসফিস হয়ে তাকে কী যেন বলে যায়! কী বলে যায়!
একটির পর একটি মুখ স্থিরচিত্রের মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে
থাকে। তারপর ধীর গতিতে সরে গিয়ে আরেকটি মুখকে জায়গা করে দেয়। কতো
মুখ! বাবা-মা-বন্ধু-ভাই-বোন আর তার ভালোবাসা। কান্নার মতো একটানা
ওই ঝিরঝির শব্দ, এই সব প্রিয় মুখ, আর তাদের ফিসফিস কথা নিয়ে
নাড়াচাড়া করতে করতে আদিত্য টের পায় _ তার চোখ ভিজে উঠেছে।
কেন এমন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় আমার? কেন এতো মনে পড়ে সব? কেন এমন
অযাচিত ভাবে চোখ ভিজে ওঠে !
হঠাৎ ভেঙে যাওয়া ঘুম সহসা আর ফিরে আসবে না ভেবে, আদিত্য এবার উঠে
পড়ে। গা থেকে লেপ সরাতেই শীত এসে তীর বেঁধালে সে চাদরটা টেনে গায়ে
জড়ায়, আর উঠে এসে জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই তার মুখ উজ্জ্বল
হাসিতে ভরে ওঠে। বৃষ্টি! এই অসময়ে, এই শীতের রাতে বৃষ্টি! আদিত্য
দরজা খুলে ব্যালকনিতে আসে, রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দুচোখ ভরে তুলে নিতে
চায় বৃষ্টির মোহনীয় পতন। কতোদিন পর, কতোদিন! কতোদিন পর এই শহরে আজ
বৃষ্টি নামলো _'এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর
বৃষ্টি হলো। ..... আমার জানালায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক,
পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল ; অনেকদিন পর আজ
আমার ভারি ভালো লাগছে। ছমছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম
লোনলী-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনোদিন নয়। বৃষ্টি-বুনোট
এইসব রাতে আমার ঘুম আসে না, বৃষ্টিকে ভারি অন্যরকম মনে হয়, বৃষ্টি
একজন অচিন দীর্ঘশ্বাস। এইসব রাতে কিছু পড়তে পারি না আমি, সামনে বই
খোলা থাকে, অক্ষরগুলো উদাস বয়ে যায়, যেনো অনন্তকাল কুমারী থাকবার
জন্যে একজন রিক্ত রক্তাক্ত জন্মদান করলো এদের। চায়ের পেয়ালায় তিনটে
ভাঙা পাতা ঘড়ির কাঁটা হয়ে সময়কে মন্থর কাঁপায়। ষাট পাওয়ারের বাল্বে
জ্বলছে ভিজে আলো, আর চিনচিন করে ওঠে হঠাৎ,........ সেই সোনার শৈশবে
ভুল করে দেখা একটি স্বপ্ন, স্বপ্নের মতো টলটল করে। আমার ঘুম আসে
না, আলোর মধ্যে একলা জেগে রই' _ ইলিয়াসের কোনো এক গল্পে পড়েছিলো
এরকম একটি বর্ণনা, একবার নয়, বহুবার, কবিতার মতো করে মুখস্থ করে
রেখেছে, এখন এই হঠাৎ বৃষ্টিপাত দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেলো; আর
অনেকক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার কেমন ক্লান্তি লাগলে সে
এসে চেয়ারে বসলো। একটা হিমেল হাওয়া বইছে, শীতে একবার কেঁপে উঠলে সে
এবার চেয়ারের ওপর পা তুলে গুটিশুটি হয়ে বসে থাকে। কিন্তু তার চোখ
কেন ঝাঁপসা হয়ে আসছে ?
কেন এমন চোখ ভিজে ওঠে আমার? কেন এমন স্মৃতিক্লিষ্ট আমি? সবাইকে কেন
এতো মনে পড়ে? আমি এমন একা বলে? আমার দীর্ঘ দিনরাত্রির কোনো ঘনিষ্ট
সঙ্গী নেই বলে?
আদিত্যর মাঝে মাঝে মনে হয় _ সে হয়েছে তার বাবার মতো। তিনি ছিলেন
নিঃসঙ্গ _ হয়তো আমার চেয়েও _ সে ভাবে। কারণ, তাঁর ঘরসংসার ছিলো,
স্ত্রীপুত্রকন্যা ছিলো, তবু তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ, কারো সঙ্গেই তাঁর
কোনো সম্পর্ক ছিলো না। একই বাড়িতে থেকেও সবার সঙ্গে তাঁর ছিলো এক
অনতিক্রম্য দূরত্ব। নিজের বাড়িতে তিনি যেন ছিলেন এক অনাহুত
অবাঞ্চিত অতিথি _ যার ব্যক্তিত্ব আছে, দাপট আছে, কিন্তু সবই
গুরুত্বহীন, মূল্যহীন। এক বৃষ্টিভেজা নভেম্বরের রাতে তিনি মারা
গেলেন। তার কি খুব খারাপ লেগেছিলো ? নাহ, সে আসলে বুঝতেই পারে নি _
বাবা না থাকা মানে কি!
বাবার সঙ্গে তো আমারও কোনো সম্পর্ক ছিলো না। কোনোদিন কোনো ব্যাপারে
তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ আলোচনা হয় নি। তিনিও জানতে চান নি _ আমি কি
করছি, কেমন আছি। তবু তাঁর মৃতু্যর পর আমার যেন চোখ খুলে গেলো। মনে
পড়লো _ গরমের দিনে বাইরে থেকে ফিরলে, বাবা মাকে ডেকে ফিসফিস করে
বলতেন _ 'ওকে ঠান্ডা শরবত বানিয়ে দাও। তুমি কিছু খেয়াল কর না।
ছেলেটা রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেলো।' কেন বাবা এসব কথা এতো চুপি চুপি
বলতেন, যেন কোনো গর্হিত অন্যায় বা ষড়যন্ত্র করছেন! স্নেহ প্রকাশের
ব্যাপারটি কি তার কাছে অন্যায় বলে মনে হতো ?
বাবা মারা যাওয়ার পর আদিত্য বদলে যাচ্ছিলো। বেঁচে থাকতে সে কখনো
তাঁর কাছে যায় নি, বাবা বলে ডাকে নি, চলে যাওয়ার পর তীব্রভাবে মনে
হলো _ বাবা বলে ডাকার সুযোগ সে চিরকালের জন্য হারিয়েছে। মনে হলো,
বাবা না থাকা মানে চিরদিনের জন্য বাবা বলে ডাকার সুযোগ হারিয়ে
ফেলা, বাবা না থাকা মানে সন্তানের হঠাৎ করে অনেকখানি বয়স বেড়ে
যাওয়া। মনে পড়লো টুকটাক অনেক কথা, ফিসফিসিয়ে ষড়যন্ত্রের মতো করে
স্নেহ প্রকাশের ভঙ্গিটি। মনে পড়লো, বাবা মাকে বলছেন _ 'এই ছেলেটা
ঠিক আমার মতো হবে, তুমি দেখে নিও।'
আমি কখনো তাঁর মতো হতে চাইনি। তাঁর মধ্যে এমন কোনো বিষয় ছিলো না
যে, তিনি কোনো কিশোর বা তরুণের আদর্শ হতে পারেন। অথচ তাঁর মৃতু্যর
পর আমি সত্যি ওরকম হতে থাকলাম। নিঃসঙ্গ। বিচ্ছিন্ন। বুঝতে চাইলাম _
বাবা কেন এমন নিঃসঙ্গ ছিলেন! কেন সারা জীবন একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ
হয়ে, একজন অতিথির মতো আমাদের মধ্যে বসবাস করে গেলেন! জীবন ও জগতের
প্রতি তাঁর যে বিপুল বৈরাগ্য ছিলো, তার কারণ কি? আমি পারি নি সেই
কারণটি আবিষ্কার করতে। কিন্তু ক্ষতি যা হবার তা হয়ে গিয়েছিলো। তাঁর
কথা ভাবতে ভাবতে আমি ভীষণ রকম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম। সেই হৈ চৈ করা
মাতিয়ে তোলা স্বভাবটিও হারিয়ে ফেলেছিলাম। বাবা কেন বলেছিলেন যে,
আমি তার মতো হবো? আমার মধ্যে কি দেখেছিলেন তিনি? তার সঙ্গে আমার
স্বভাবের তো কোনো মিলই ছিলো না! এই ভাবনাই আমাকে তার মতো বিচ্ছিন্ন
দ্বীপে পরিণত করলো। আমার পরিবর্তন সবার চোখে পড়েছিলো, ভাইবোনরা
চেষ্টা করেছিলো আমাকে আগের মতো করে তুলতে, পারে নি। কিন্তু মা কোনো
চেষ্টাই করেন নি। তিনি যেন স্বামীর ভবিষ্যদ্বাণীকেই শিরোধার্য করে
নিয়েছিলেন। শুধু মাঝে মাঝে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অবিরল
কাঁদতেন। কিন্তু আমার চোখ থাকতো শুকনো খটখটে। আর এখন দ্যাখো, কারণে
অকারণে কেবলই চোখ ভিজে ওঠে। অবশেষে বাড়ির সবাই বোধহয় ধরে নিলো _
তারা আর কোনোদিনই তাদের আগের আদিত্যকে ফিরে পাবে না।
এক সময় আদিত্য আবিষ্কার করলো _ সবাই তার অস্তিত্বকে প্রায় বিলুপ্ত
বলে ধরে নিচ্ছে। যে কোনো সিদ্ধান্তে তার মতামত নেয়ার প্রয়োজন বোধ
করছে না কেউ, এমন কি কোনোকিছু তাকে জানাবারও দরকার মনে করছে না।
সবার এই ব্যবহারে সে অবাক হয়নি, বরং সে যেন জানতো _ এরকমই হবে,
এমনই হবার কথা। এতোদিনে যেন সে তার বাবার মতো হতে পেরে একটু খুশিই
হলো। সে-ও দেখলো, বাসায় হয়তো কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে, সে তা জানেই না।
বাইরে থেকে ফিরে ব্যাপক আয়োজন দেখে, এতোটুকু অবাক না হয়ে, অতিথির
মতো খেয়েদেয়ে নিজের রুমে ঢুকে গেলো। কোনো কিছুতেই তার আর কোনো
অংশগ্রহণ রইলো না।
এভাবে অতিথির মতো, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো তোমাদের মধ্যে বসবাস করা
আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। বাবা পেরেছিলেন, আমি পারি নি। তোমাদের
ছেড়ে তাই চলে এলাম, শহরের এই প্রান্তসীমায়, একটি বৈশিষ্ট্যহীন
বাড়ির দোতলার এক চিলতে কামরায়। সঙ্গে একটা ব্যালকনি। এই আমার
পৃথিবী। বাবা বলতেন, আমি নাকি তার মতো হবো। অথচ আমি হয়েছি তার
চেয়েও প্রকাশ-অক্ষম। বাবা মমতা প্রকাশ করতেন ফিসফিস করে হলেও, আমি
তা-ও পারি না। তোমরা কি জানো, আমি কি পরিমাণ ভালোবাসি তোমাদের?
জানো না। বাবাকেই বোঝনি কোনোদিন, এখনও তোমাদের দৈনন্দিন আলোচনায়
বাবা আসেন না কখনো _ এখনো তিনি এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ তোমাদের কাছে।
আমাকে আর বুঝবে কি করে? আর কেউ না হোক, মা, তুমিও কি জানো, তোমার
জন্য আমার কী পরিমাণ চোখ ভিজে ওঠা ভালোবাসা? মা, মাগো, বলো না,
তুমি কি জানো ?
মা, ও মা, মাগো _ এভাবে অনেকবার সে মাকে ডাকলো, তার চোখ ভিজে উঠলো
আবার। আহ, কতোদিন আমি ওই বিষণ্ন, দুঃখী, পবিত্র মুখটি দেখি নি!
এখানে আসার পর কেউই তার খুব একটা খোঁজখবর নেয় নি, মা-ও আসেন নি
কখনো। তারও খুব একটা যাওয়া পড়ে না। তবু মাঝে মাঝে মায়ের মুখটি
দেখার জন্য সে এমন আকুল হয়ে ওঠে।
আমাকে কি কারো এমনভাবে দেখতে ইচ্ছে করে? মা, অথবা ভাই-বোন, যাদের
সঙ্গে একই ছাদের নিচে, একই সুখদুঃখ নিয়ে আমি বড় হয়ে উঠেছি? ইচ্ছেই
যদি হবে, তাহলে কেউ আমার কোনো খোঁজখবর নেয় না কেন _ এই ভেবে সবার
প্রতি তার একটা গাঢ় অভিমান হলো। কিন্তু, পরমুহূর্তে, না নিক, আমি
খারাপ আছি নাকি _ ভেবে ঠোঁট উল্টালো। তারপর, এসব ভেবে আর কি হবে,
তার চেয়ে বরং চাঁদ দেখা যাক _ মনে মনে এ কথা বলে সে উঠে গিয়ে রেলিং
ধরে দাঁড়ালো, একটু ঝুঁকে, কার্নিশ এড়িয়ে চাঁদটাকে দেখে নিতে চাইলো,
পারলো না, বরং বৃষ্টির ছাঁট তাকে একটু ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। চাঁদটা
আবার গেলো কোথায় _ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবলো। এই শহরে চাঁদ
দেখাটাও এক ঝামেলা, প্রায় আয়োজন করে দেখতে হয়। আজকে, এই ঘন্টা
তিনেক আগেও অবশ্য আদিত্য এখানে বসে চাঁদ দেখতে পেয়েছে। আর এক সময়,
চাঁদটা অমন বেকুবের মতো ঝুলে আছে কেন, খসে পড়লেই হয় _ মনে হতেই _
তুমি অমন বেকুবের মতো ঝুলে আছো কেন _ চাঁদকে এই প্রশ্ন করে নিজেই
অনেকক্ষণ হেসেছে। তারপর নিজের মনেই বলেছে _ তুমি আসলেই একটা বেকুব,
নইলে অনন্তকাল ধরে কেনই বা পৃথিবী ও মানুষের চারপাশে ঘুরে বেড়াবে?
তোমার প্রাপ্তি কি কিছু আছে? তুমি জানো না চাঁদ _ পৃথিবীর
গ্রামগুলোও আস্তে ধীরে তোমাকে অস্বীকার করতে শুরু করেছে, তোমার
অনিয়মিত কোমল আলো এখন আর যথেষ্ট নয় মানুষের কাছে। এখন চাই
বিদু্যতের ঝলমলে আলো। আর এই মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে তো তোমার
অস্তিত্ব বিলীন প্রায়। আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা, তোমাকে দেখতে গেলে
চোখ আটকে যায়, তবু তুমি কিসের টানে এমন বেকুবের মতো আমাদের চারপাশে
ঘুরে বেড়াচ্ছো? সে আরো কয়েকবার চাঁদকে বেকুব বলে গাল দিলো, অভিমানি
কণ্ঠে বললো, একজন নিঃসঙ্গ মানুষ তোমাকে দেখতে চাইলো _ আর তুমি গিয়ে
লুকোলে। তোমাকে যে ভালোবাসে, তুমি থাকো তার চোখের আড়ালে। বলতে বলতে
তার মনে পড়ে গেলো কবিতার একটি পঙক্তি _ 'হায় বোকা চাঁদ, অমাতে
ঝরালে সবটুকু বসন্ত তোমার! _ তার এক কবি বন্ধু, কবীর _ এখন প্রবাসী
_ লিখেছিলো কবিতাটি। চলে যাওয়ার আগে ওর একটা কবিতার বইও
বেরিয়েছিলো। বইয়ের নাম নিয়ে কতো কান্ড। কবীর এসে বলেছিলো, বইয়ের
জন্য একটা নাম ঠিক করিস তো আদিত্য। আদিত্য অনেক ভেবেচিন্তে কবীরের
ভালোলাগা মেয়েটির নামের বাংলা অর্থ করে, তার সঙ্গে মিল রেখে বইয়ের
নাম ঠিক করেছিলো _ শীর্ণ নদী ও পূর্ণিমার চাঁদ। কবীর বড়ো ভালোবেসে
নামটি গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু ওই মেয়েটির কাছে এতো ভালোবাসা ও মমতার
কোনো মূল্যই ছিলো না। ব্যাপারটিকে সে গুরুত্বই দেয় নি। কবীরের এই
অদ্ভুত ভালোবাসার মর্যাদা দেয়ার মতো যোগ্যতা তার ছিলো না, সে বরং
ভালোবেসেছিলো মেনীমুখো এক আমলা-পুত্রকে। কবীর একটি ভুল মেয়েকে
ভালোবেসেছিলো, হয়তো সেজন্যই শোকে-দুঃখে-ক্ষোভে লিখে ফেলেছিলো ওই
পঙক্তি _ হায় বোকা চাঁদ অমাতে ঝরালে সবটুকু বসন্ত তোমার! আদিত্য
একবার মেয়েটিকে এই পঙক্তি শুনিয়ে দিতে চেয়েছিলো, কিন্তু ব্যাপারটি
অর্থহীন হবে ভেবে আর হয়ে ওঠে নি, ওই মেয়ের কাছে এর কোনো মূল্যই
ছিলো না।
আসলে ওরা কিছু বোঝে না, ওরা সবাই একেকটি ভুল মানুষ। নইলে নদী আমাকে
ফিরিয়ে দেবে কেন? আমি কোনোদিন ভালোবাসার ব্যাপারটি কারো কাছেই
প্রকাশ করতে পারি নি, কোনোদিন কাউকে কিছু বলতেও পারি নি, আমার
সঙ্গে তাই কারো কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে নি। তবু কী করে যেন নদীর
সঙ্গে একটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। একটু একটু করে এগিয়ে, এক
বৃষ্টিমুখর অপরাহ্নে _ সেটি অবশ্য এমন শীতের বৃষ্টি ছিলো না, ছিলো
গ্রীস্মের প্রথম বৃষ্টি _ আমি নদীর কাছে নিজেকে প্রায় সমর্পণ
করেছিলাম। অবিচ্ছিন্ন বৃষ্টিপাত _ দীর্ঘ খরার পর ওই শীতল বর্ষণ _
সমগ্র পৃথিবীকে কেমন উদাসীন করে তুলেছিলো। নদীর অপরূপ মুখে ছিলো
আলো-আঁধারির রহস্যময় খেলা, কী এক দিগন্তব্যাপি বিষণ্নতা ওকে আরও
সুন্দর আর রহস্যময়ী করে তুলেছিলো। আমি তখন ওর কাছে যাওয়ার তীব্র
আকুলতা প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু নদীর কাছে ওই আকুলতার কোনো প্রশ্রয়
ছিলো না, বলেছিলো, 'যেও না আমার কাছে, আমি আশ্রয় দিতে পারবো না।'
কী তুমুল প্রত্যাখান! তারপরও ওকে আমি একটা চিঠি লিখেছিলাম। আমার
সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে লেখা ওই চিঠিতে আমি ওকে দিতে চেয়েছিলাম আমার
যাবতীয় আনন্দ বেদনার ভার, আর আমাকে পোড়াবার মোহনীয় অধিকার। নদী সেই
অধিকার গ্রহণ করে নি। আমি দিনের পর দিন প্রতীক্ষা করেছি। ও নিশ্চুপ
থেকেছে। আমি একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছি। জীবনে ওই একটি মেয়েরই এতোটা
কাছাকাছি গিয়েছিলাম আমি, শুধুমাত্র নদীর কাছেই খানিকটা প্রকাশ
করেছিলাম নিজেকে । সে-ও আমাকে ভালোবাসে নি। শুধু নদীর কথা বলি কেন,
কেউই কখনো আমাকে চায় নি। ভালোই হয়েছে, নইলে তো জীবন অন্যরকম হতো।
প্রেম-বিয়ে-সংসার-সন্তান অথচ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। তার চেয়ে এই ভালো।
এই একলা আকাশ দেখা, এই একা থাকা _ খুব খারাপ নেই তো আমি।
কিন্তু তুই যা-ই বলিস কবীর, তোর এভাবে চলে যাওয়াটা আমি মেনে নিতে
পারি না। আবার সে কবীরকে নিয়ে ভাবতে বসলো। তার সারাজীবনে বন্ধু
বলতে দু'তিনজন _ কবীর তাদের অন্যতম। জীবনের অনেকগুলো দিন ওর সঙ্গে
কাটিয়েছে সে। প্রতিদিন বিকেলে সে ঘুমিয়ে থাকতো আর কবীর এসে _ এ্যাই
ব্যাটা আদুভাই, ওঠ শালা, ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই তোর জীবনটা গেলো, বলে তার
ঘুম ভাঙাতো। তারপর অনির্দিষ্ট ঘুরে বেড়ানো। ছন্নছাড়া জীবনযাপনের
আনন্দটা সে কবীরের সঙ্গে মিশেই খানিকটা পেয়েছে। কতো জায়গায়ই না
গিয়েছে তারা, কতো কিছুই না করেছে। গাঁজা তো ছিলো প্রায় নিত্যসঙ্গী
_ কবিরা ওরকম একটু আধটু খেয়েই থাকে, আর আদিত্যও একজন কবির সঙ্গে
মিশে..., মদও অবশ্য খেয়েছে মাঝে মাঝে। মদ খেলে কবীর খুব পাগলামী
করতো, আর আদিত্যকে সে সব সামলাতে হতো। এসব কথা মনে পড়তে সে, 'শালা
মাতাল' বলে কবীরকে গাল দিলো, হাসলো একা একা। কবীর চলে যাওয়ার পর সে
বড়ো বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে, অন্য বন্ধুরাও যে যার মতো নিজেকে নিয়ে
ব্যস্ত, কারই বা এতো দীর্ঘ সময় আছে তাকে সঙ্গ দেয়ার ! কবীরের কথা
ভাবতে ভাবতে তার বুক হু হু করে উঠলো। 'কতোদিন তোকে দেখি নি কবীর,
তুই কি কোনোদিনই আর ফিরবি না? একটা চিঠিও তো লিখিস না! আমাকে তোর
মনে পড়ে না? তুই এভাবে চলে গেলি? তুই-ও? শিল্প ছেড়েও মানুষ এভাবে
যায়? এ তোকে মানায় না, তুই ফিরে আয় কবীর, ফিরে আয়।' ফিসফিসিয়ে এসব
বলতে বলতে তার গলা বুঁজে এলো। তারপর _ তুই আর ফিরেছিস, ওখানে তুই
তোর প্রিয় নারীজাতি নিয়ে কি করছিস কে জানে _ এই কথা বললো, আর হঠাৎ
করেই মনে পড়ে গেলো নীলু আপাকে। তার কাজিন, ছোটবেলায় যার কাছ থেকে
সে অফুরন্ত আদর পেয়েছে। নীলু আপার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে কী যে
ভালোবাসতো সে! একবার নীলু আপা বেড়াতে এলে সে যথারীতি তার গলা জড়িয়ে
ধরে ঘুমিয়েছিলো, আর গভীর রাতে, ঘুমের মধ্যে হাতে নরম কিছুর
অস্তিত্ব টের পেয়ে খুব আনন্দ পেয়েছিলো, কিন্তু হঠাৎই নীলু আপার ঘুম
জড়ানো কণ্ঠে _ এ্যাই আদি হাত সরা _ শুনে সে ভারি লজ্জা পেয়ে যায়।
পরদিন সকাল থেকে সে আর তার মুখোমুখি হতে পারে নি _ লজ্জায়। একসময়
নীলু আপা তাকে _ এ্যাই আদি, তুই আমাকে দেখে অমন লাল টমেটো হয়ে
যাচ্ছিস কেন রে _ বলে হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে যায়। তারপর ফিসফিসিয়ে
বলে, রাতের কথা ভাবছিস? তুই কোথায় হাত দিয়েছিলি দেখবি? এই দ্যাখ _
বলে ওড়না সরিয়ে দেয়। আদিত্য চোখ তুলতে পারে না। নীলু আপা _ দ্যাখ
না, হাত দিয়ে দ্যাখ _ বলে তার হাত টেনে নিলে তার সারা শরীর শিরশির
করে ওঠে। সেই সুদূর কৈশোরে, সেই প্রথম সে শরীর সম্বন্ধে সচেতন হয়ে
উঠেছিলো।
নীলু আপা, কেন তুমি অমন একটা কাজ করতে গেলে? তারপর থেকে আমি আর
কোনোদিন তোমার সঙ্গে সহজ হতে পারি নি, তোমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে
পারি নি। তোমার কাছে যে আমার উষ্ণ একটি আশ্রয় ছিলো _ কোনোদিন আর
সেখানে ফিরতে পারি নি আমি। তুমি এখন কেমন আছো নীলু আপা? কেমন আছো,
কোথায় আছো, কিছুই জানি না। তুমি কি জানো, তোমাকে আমার কতোটা মনে
পড়ে? এখন আমার কোথাও কোনো আশ্রয় নেই নীলু আপা। এই তীব্র শীতের রাতে
আমি একা শীতে কেঁপে উঠি, আমার জন্য কোথাও কোনো উষ্ণতা নেই। আমাকে
কেউ কখনো ভালোবাসেনি, কেউ বুঝতে চায় নি, কেউ আমাকে পেতে চায় নি,
কেউ আমাকে কিছু দিতেও চায় নি। আমার যাবার কোনো জায়গা নেই, কথা বলার
মতো কোনো মানুষ নেই, আমার জন্য কোথাও কেউ প্রতীক্ষা করে নেই। খুব
ইচ্ছে করে, আর অন্তত একটিবারের জন্য হলেও তোমার গলা জড়িয়ে ধরে,
উষ্ণতা আর মমতার মধ্যে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ি। নিশ্চিত, ভাবনাহীন,
দীর্ঘ ঘুম _ যে ঘুম মাঝরাতে ভেঙে যাবে না, আর আমি এই নিস্তব্ধ রাতে
একা একা দাঁড়িয়ে থাকবো না। কোনোদিন কি আমি পাবো না এরকম একটি মাত্র
ঘুম? ভাবতে ভাবেতে আদিত্যর চোখ ভিজে উঠলো, আর জল গড়িয়ে ভিজিয়ে দিলো
তাকে।
তোমরা সবাই ভালো থেকো, আমার সোনামণি লক্ষী মা, আমার নীলমণি
ভাইবোনেরা, কবীর, নদী, নীলু আপা _ তোমরা সবাই ভালো থেকো। তোমাদের
কী পরিমাণ ভালোবাসি আমি, কোনোদিন বোঝাতে পারি নি। তোমরা বোঝোনি,
না-ই বা বুঝলে, তবু তোমাদের ওই কোমল সুন্দর পবিত্র মুখগুলো আমাকে
বাঁচিয়ে রেখেছে। তোমাদের স্মৃতিগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত মমতার স্পর্শ
দিয়ে যায় বলে আমি এখনও কাঁদতে পারি, বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। আমি
তো বেঁচে থাকতে চাই, যদিও নিঃসঙ্গ আর বিষণ্ন জীবন আমার, তবু এই
পৃথিবীর মোহনীয় রূপ, এই হাসি-কান্না, এই নীরব-নিথর রাত, এই অলৌকিক
বৃষ্টিপাত ছেড়ে আমার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। আদিত্য মনে মনে এসব
কথা বলছিলো, আর দু'হাতে বৃষ্টির জল জমিয়ে নিজের মুখে হাতে মাখিয়ে
নিচ্ছিলো।
|
| |
 |
|