বাড়ি থেকে হঠাৎ টেলিফোন এলে সহসা বুঝে উঠতে
পারি না _ আমার এখন কী করা উচিত। যে গ্রামের সঙ্গে আমার প্রায়
সম্পর্কচু্যতি ঘটে গেছে অনেকদিন আগেই, সেখান থেকে টেলিফোন আসাটা
খুব স্বাভাবিক নয়; আর যে বিষয়ে আমাকে জরুরী তলব দেয়া হয়েছে সেটাও
প্রায় অস্বাভাবিকই লাগছে। ফোন করেছিলেন বড় চাচা, বলেছেন _ 'তোমার
খালার অবস্থা খুব খারাপ, তোমাকে বারবার দেখতে চাচ্ছে, যতো তাড়াতাড়ি
সম্ভব চলে এসো।' খালা, মানে আমাদের সৎ মা, আমরা কখনো তাকে মা বলে
ডাকিনি, সত্যি কথা বলতে কি _ মা বলে তাকে স্বীকৃতিই দেইনি।
নিতান্তই কিছু একটা বলে ডাকতে হয়, তাই খালা ডাকি। তাছাড়া মহিলা
বোধহয় আমার মৃত মায়ের কোনো এক ধরনের বোনও। তো, এই খালা যে
মৃতু্যমুহূর্তে আমাকে দেখতে চাইতে পারে না আমি তা বলছি না _ সৎ মা
হলেও আমি তার কাছেই বড় হয়েছি, আবার তার নিজের কোনো ছেলেমেয়ে না
থাকায় হয়তো আমিই তার মাতৃত্বের অভাব পূরণ করেছি, আমাকে দেখতে
চাওয়াটা তাই কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। যেটা অস্বাভাবিক তা হলো _ ওই
মহিলা যেমন আমার সৎ মা, তেমনি আমার অন্য ভাইবোনেরও, অতএব খবরটা
তাদেরও দেয়া যেতো। আর তাছাড়া এসব বিষয়ে বরাবর বড় ভাইজানই
দায়িত্ব-টায়িত্ব পালন করে _ তাকে না জানিয়ে আমাকে জানানোর মানে কি?
অবশ্য এমনও হতে পারে _ বড় চাচা ভাইজানকেই আগে জানিয়েছেন, কিন্তু
যেহেতু খালা আমাকে দেখতে চাইছে, তিনি তাই আলাদা ভাবে আমাকে ফোন
করার দরকার মনে করেছেন। সত্যিই অন্য সবাইকে জানানো হয়েছে কী না
প্রশ্নটা মনে এলে আমি একে একে সব ভাইবোনকে ফোন করলাম _ না, কেউ এ
বিষয়ে কিছু জানে না। ভাইজান স্বভাবমতো বেশ উদ্বিগ্নস্বরে বললো _
'তাই নাকি! না, আমি জানি না তো! সকাল থেকে মিটিং-এ ছিলাম, সম্ভবত
আমাকে পায়নি।' আমি যখন তাকে বললাম যে, খালা আমাকে দেখতে চাচ্ছে _
ভাইজান মনে হয় বেশ গম্ভীর হয়ে গেলো, বললো _ 'তাহলে তো তোর যাওয়া
উচিত।' তার কণ্ঠস্বরই বলে দিচ্ছে _ আমার যাওয়াটা সে পছন্দ করবে না,
কিন্তু একজন মৃতু্যপথযাত্রী মানুষ কাউকে দেখতে চাইলে তো আর তাকে
বাধা দেয়া যায় না, সেটা শোভনও নয়, অন্তত ভাইজানের নীতিবোধে সেটা
বাধছে। ব্যাপারটা বুঝে আমি বললাম _ 'আমার যে কালকে একটা জরুরী কাজ
আছে ভাইজান, কি করে যাই!' _ 'ও, তাহলে ভেবে দ্যাখ, আর সম্ভব হলে
চলেই যা।' _ এবারও আমার মনে হলো ব্যাপারটা সে মোটেই পছন্দ করছে না।
নাকি আমি নিজেই ওখানে না যাওয়ার জন্য মনে মনে কারো সমর্থন খুঁজছি?
যাই হোক, সবাইকে ফোন করার পর ব্যাপারটা আরও অস্বাভাবিক মনে হলো
আমার কাছে। তার মানে, বড় চাচা শুধুমাত্র আমাকেই ফোন করেছেন, আর
কাউকে জানানোরও প্রয়োজন মনে করেননি। কেন? ব্যাপারটা খুব ভাবাচ্ছে
আমাকে। যাবো কি যাবো না, না গেলে কি হবে ভেবে পাচ্ছি না। বিষয়টি
নিয়ে কিছুতেই সিদ্ধান্তে পেঁৗছাতে পারছি না। ফোনটা এসেছে দুপুরের
দিকে _ লাঞ্চের আগে আগে, এখন বিকেল হতে চললো _ সেই থেকে কোনো কাজে
মন বসাতে পারছি না, সিদ্ধান্তও নিতে পারছি না। এখনও সময় আছে,
বেরুলে হরিরামপুরের শেষ বাসটা ধরা যেতে পারে, যদিও যেতে যেতে রাত
হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে রাতটা থেকে কাল সকালে রওয়ানা দিলে দুপুরের
মধ্যে ঢাকায় পেঁৗছানো যাবে, আর নীলুর সঙ্গে বিকেলের
অ্যাপয়েন্টমেন্টটা ঠিক রাখা যাবে। কিন্তু গিয়ে যদি দেখি মহিলা মারা
গেছে তাহলে ঝামেলা বেঁধে যাবে। ভাইজানকে খবর দিতে হবে, ভাইজান গিয়ে
পেঁৗছলে কবর দেয়া হবে _ মৃত লাশ ফেলে তো আর চলে আসা যায় না, যতো
কাজই থাকুক না কেন _ তারপর রওয়ানা দিতে দিতে কমপক্ষে সন্ধ্যা।
তাহলে আর নীলুর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টটা ঠিক রাখা যাচ্ছে না। নাকি
নীলুর জন্য একটা মেসেজ রেখে যাবো? নাহ, তাতেও কোনো লাভ হবে না, ও
খুব সেনসেটিভ মেয়ে _ অনেকদিন পর দেখা হচ্ছে, সেখানে বাগড়া লাগলে ও
ভীষণ ক্ষেপে যাবে। এমনিতেই আমরা দু'জনেই বিচ্ছেদের অনুভূতিতে
ভুগছি। নীলু সিলেট মেডিকেল কলেজে চান্স পাওয়ার পর আমাদের দু'জনেরই
মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। ইউনিভার্সিটির পড়া ছেড়ে ও চলে গেলো ডাক্তার
হতে, আমি পড়ে রইলাম ঢাকায়। আগে তবু মাঝে মাঝে হুটহাট চলে যাওয়া
যেতো। চাকরিতে ঢোকার পর তা-ও হয় না। ব্যাংকের চাকরি, ছুটি পাওয়াও
দুস্কর। অনেকদিন পর নীলু আসছে ঢাকায় কি এক জরুরী কাজে, একদিনের
জন্য। আজ রাতে আসবে, কালকে রাতে চলে যাবে। কাল বিকেল থেকে ট্রেনে
ওঠার আগ পর্যন্ত আমার কাছে সময় দাবি করেছে ও, এই সময়ে এমন উৎকট
ঝামেলা কার ভালো লাগে! না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে
হচ্ছে। কিন্তু একজন মৃতু্যপথযাত্রী মানুষ আমাকে দেখতে চাচ্ছে, না
গেলে ব্যাপারটা কেমন দেখায়! কে কি মনে করবে সেটা বড় বিষয় নয়, নিজের
কাছেই তো কেমন যেন লাগছে! সত্যি সত্যি মারা গেলে ব্যাপারটা মনের
মধ্যে কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকবে না! আমার কাছে হয়তো ওই মহিলার তেমন
কোনো গুরুত্ব নেই, কিন্তু তার কাছে আমার গুরুত্ব নিশ্চয়ই অপরিসীম,
নইলে মৃতু্যমুহূর্তে তো আর আমাকে দেখতে চাইতো না! এইসব আগাপাশতলা
ভাবতে ভাবতে যখন কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না, তখন মেজাজ খারাপ হয়ে
গেলো। যেমনটি জীবনে অনেকবার করেছি _ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায়
ভুগতে ভুগতে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি _ তেমন করেই হঠাৎ
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। অফিসে একটা দরখাস্ত ফেলে, ছুটে মঞ্জুর হলো
কী না সেটা না দেখেই, বাসায় গিয়ে একরাত থাকার মতো
কাপড়চোপরটুথব্রাশপেস্ট ব্যাগে ভরে, ভাবীর কাছে নীলুর জন্য মেসেজ
রেখে গাবতলী চলে গেলাম। যা হবার হবে, এতো ভেবে লাভ নেই, তাছাড়া
একজন মৃতু্যপথযাত্রীর _ হোক সে সৎ মা _ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাটা
মানবিক দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে। হরিরামপুরের শেষ বাসটা ছেড়ে গেছে,
আউট সিরিয়ালের একটা বাস হৈ চৈ করে ডাকাডাকি করছে, আমি গিয়ে উঠে
পড়লে বাস ছেড়ে দেয়। সময় হিসেব করে দেখলাম, এখন সাড়ে ছ'টা _ তার
মানে হরিরামপুর পেঁৗছতে পেঁৗছতে কমপক্ষে দশটা বেজে যাবে, রিকশা
পেলে বাড়ি পেঁৗছতে আরও আধঘন্টা। এ এক অদ্ভুত রুট। মানিকগঞ্জ শহর
থেকে আমাদের বাড়ি পনের কিলোমিটার দূরে। গাবতলী থেকে মানিকগঞ্জ যেতে
বড়জোর ঘন্টা দেড়েক সময় লাগে, তার মানে হরিরামপুর যেতে দু'ঘন্টার
বেশি লাগার কথা নয়, কিন্তু লাগে চারঘন্টা! বাস যেখানে সেখানে থামে,
আমার এক বন্ধু বলতো _ 'এই রুটের বাসগুলো এমন যে, একটা মুরগীও যদি
রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঠ্যাং উঁচু করে, তবুও বাস থেমে যাবে।' এর জন্য
বাসের ড্রাইভাররা তো বটেই যাত্রীরাও অনেকখানি দায়ী। যাত্রীরা
নির্ধারিত বাসস্টপ থেকে বাসে না উঠে বাড়ির আঙিনা থেকে উঠতে চায়।
তাদের যুক্তি হলো _ বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে, একটু স্লো করে উঠিয়ে
নিয়ে গেলে কি হয়! নামার ব্যাপারেও সেইরকম। ফলে দু'ঘন্টার জার্নি
চারঘন্টায় শেষ হচ্ছে। যতোসব বাজে ব্যাপার! অন্তত এই একটি কারণেই তো
বাড়ি আসা বন্ধ করা যায়! ঢাকার এতো কাছে, অথচ চট্টগ্রাম যেতে যে সময়
লাগে তারচেয়ে বেশি লাগে এখানে আসতে! এর কোনো মানে হয়! অবশ্য আজ
একটু তাড়াতাড়িই আসা গেলো। আউট সিরিয়ালের বাস বলেই হোক, কি রাত হয়ে
গেছে বলেই হোক ড্রাইভার বেশ টেনে এসেছে। বাস থেকে নামার সময় ঘড়ি
দেখলাম _ সাড়ে ন'টা। কিন্তু তাড়াতাড়ি এসে তেমন লাভ হলো না।
বাসস্ট্যান্ডে কোনো রিকশা-টিকশা নেই। এখান থেকে বাড়ি প্রায় মাইল
তিনেক। এখন আমি এতোদূর যাই কিভাবে? হাঁটা ছাড়া তো কোনো উপায় দেখছি
না। রাস্তায় কোনো লোকজনও দেখা যাচ্ছে না। ফলে হাঁটতে হবে একা।
এতোদূর হাঁটতে হবে _ভাবতেই পা ভেঙে আসছে। রিকশাওয়ালাদের ওপর রাগ
হলো। শালারা এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে বৌয়ের কোলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে
কোন আক্কেলে? পরমুহূর্তে মনে হলো _ রিকশা তো থাকার কথা নয়। গ্রামের
জন্য এটা প্রায় নিশুতি রাত _ রাত দশটার সময় রিকশায় চলাচল করার কোনো
মানুষই পাওয়া যায় না। তার ওপর কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হচ্ছিলো, পথঘাট
বেশ ভেজা। এই সময় রিকশাওয়ালারা খামোখা বসে থাকবে কেন? এ-তো ঢাকার
রিকশাওয়ালা নয় যে, ভাড়া বাড়িয়ে দিতে পারবে বলে বৃষ্টি দেখে খুশি
হয়ে উঠবে! বৃষ্টি দেখে, আবার রাতও হয়ে গেছে, ওরা বোধহয় সবাই মিলে
ঘুমোতে গেছে। বৃষ্টিভেজা অন্ধকার রাত, নিঝুম-নির্জন, রাস্তাঘাট
ভেজা, কোথাও কোথাও বেশ পিচ্ছিলও _ রীতিমতো ভুতুড়ে মনে হচ্ছে পুরো
ব্যাপারটা। উপায় নেই, খামোখা দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না, তাই
হাঁটতে শুরু করলাম। অনেকদিন পর বাড়ি এলাম। তাতে কি! এখানকার সবকিছু
খুব চেনা আমার, পথঘাট প্রায় মুখস্থই বলা যায় _ ১৫/২০ মিনিট পর একটা
লেফট টার্ন নিতে হবে, তারপর সোজা হেঁটে গেলে আধঘন্টার মধ্যে বাড়ি
পেঁৗছে যাওয়া যাবে। সোজা পথ, যদিও রাস্তাঘাট খুব অন্ধকার আর বেশ
পিচ্ছিল হয়ে আছে তবু না চেনার কোনো কারণ নেই। এই পথ ধরে আমি বহুবার
হেঁটেছি। অবশ্য সেসব বহুকাল আগের কথা। এখানে আমার জন্ম, শৈশব-কৈশোর
কেটেছে এখানে, স্কুল পর্যন্ত পড়েছিও এখানেই _ এসব আমি এখন প্রাণপণে
ভুলে যেতে চাই। শৈশব-কৈশোর নিয়ে অনেকের মধ্যে বেশ আদিখ্যেতা দেখা
যায়, বিশেষ করে লেখকদের মধ্যে। বাঙালি লেখকরা তো শৈশব-কৈশোরকে
রীতিমতো সোনার খনি বানিয়ে ফেলেছেন। আমার মধ্যে ওসব নেই। আমার
ছোটবেলাটা সুখের ছিলো না। যদিও সৎ মায়ের কাছে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি
আদর-যত্ন পেয়েছি, তবু শৈশব থেকেই 'মা নেই' এরকম একটা অপূর্ণতা বোধ
নিয়ে বড় হয়ে উঠেছি আমি। সৎ মায়ের কাছে সব কথা বলা যায় না, সব
আব্দার করা যায় না, এটা আমি ওই বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম, কিংবা আমাকে
বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিলো। খালাকে 'মা' বলে ডাকার ব্যাপারে ভাইবোনদের
কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিলো _ বিশেষ করে বোনেরা এ বিষয়ে নিয়মিত সবক দিতো
আমাকে। বহুবার খালা আমাকে বলেছে _ 'ও বাজান, তুই আমারে মা কইয়া
ডাকস না ক্যান? আমি কি দোষ করলাম?' কিন্তু আমি ডাকিনি। খালা বারবার
কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতাম _ 'বাবা ডাকতে না করছে।' খালার মুখটা তখন
খুব করুণ হয়ে যেতো। তার কোনো সন্তান ছিলো না, আর আমার ছিলো না মা।
এই পারস্পরিক অভাববোধটা সহজেই পূরণ করা যেতো তাকে মা ডেকে; সত্যি
কথা বলতে কি _ আমার কখনো কখনো ডাকার ইচ্ছেও হতো। জন্মের সময়ই মা
মারা যাওয়ার ফলে মায়ের কোনো স্মৃতিই আমার নেই । সেক্ষেত্রে যদি
খালাকেই মা বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো তাহলে আমি বুঝতেই পারতাম না
যে, সে আমার সৎ মা _ তার আচরণের মধ্যে সেরকম কোনো ব্যাপার ছিলো না
_ কিন্তু তা হয়নি। এ বিষয়ে আমার ভাই বোনদের অতি স্পর্শকাতরতার জন্য
আমি বড় হয়ে উঠেছি খুবই অপূর্ণতা নিয়ে। ততোদিনে আমার বড় ভাইবোনেরা
সব ঢাকায় সেটেলড, তারা মাঝে মাঝে আমাকে সেখানে বেড়াতে নিয়ে যেতো,
আর ওই রঙিন জগৎ থেকে ফিরে এসে এই অন্ধ কূপের মতো গ্রামের কিছুই
ভালো লাগতো না আমার। মা-বাবাকে পর্যন্ত অসহ্য মনে হতো। বাবার
ইচ্ছেতে স্কুল পর্যন্ত এখানেই পড়তে হয়েছে _ তারপর আমিও অন্য
ভাইবোনের পথ ধরেছি, ঢাকায় গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছি, আর পেছন ফিরে
তাকাইনি। শেষ কবে বাড়ি এসেছিলাম মনে করার চেষ্টা করলাম। দিন তারিখ
মনে পড়ে না, তবে ৭/৮ বছর তো হবেই, আর সেবারও আসতে হয়েছিলো এই খালার
জন্যই। ভাইজান যেন কি কাজে বাড়িতে এসেছিলো, খালা তখন তাকে খুব করে
ধরেছিলো যেন আমাকে একটিবারের জন্য বাড়িতে পাঠায়, বড় ভাইয়ের
নির্দেশে আমাকে তাই আসতে হয়েছিলো। একা। সেবারও যথারীতি খালা খুব
যত্ন-আত্তি করেছিলো। জিজ্ঞেস করেছিলো _ 'ও বাজান, ঢাকায় গিয়া যে
এক্কেরে ভুইলা গেলি। আমারে এট্টু দেখবারও মন চায় না!' _ না চায় না!
_ আমি বলতে চেয়েছিলাম, পারিনি। বলতে পারিনি _ তোমার এই গ্রাম্য
ভাষা, তোমার এই বর্বর আচরণ আমার ভালো লাগে না, আমি এসব ভুলে যেতে
চাই। আমি আমার অন্য ভাইবোনের মতো সভ্য ভদ্র হতে চাই। আমরা এরকম
প্রেরণা পেয়েছিলাম ভাইজানের কাছ থেকে। ভাইজানের
নির্দেশে/উপদেশে/উৎসাহে/প্রেরণায় সবাই মিলে এই গ্রাম, এই বাড়ি, এই
অতীতকে ভুলে যেতে চেয়েছি। বাবা ছিলেন শেষ বন্ধন, তিনি মারা যাওয়ার
পর সবাই যেন দায়মুক্ত হয়েছি, হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছি। বাবা থাকতেও যে
খুব একটা মানসিক টান ছিলো তা নয়। দায়িত্ব ছিলো, কর্তব্য ছিলো।
লোকটা যে খুব ভালো ছিলো তা নয়, কিন্তু তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও
ভালোবাসা ছিলো। এর কারণও ভাইজান। মূলত ভাইজানই এই সমস্ত কিছু তৈরি
করেছে। আমরা ভাইজানকে বরাবর পিতার মতো মান্য করে এসেছি, যা বলেছে
তা পালন করার চেষ্টা করেছি। এবং আমরা যে প্রাগৈতিহাসিক এক অন্ধ
কূপের মতো ওই গ্রাম থেকে এখানে উঠে এসেছি সেজন্য বরাবরই ভাইজানের
প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে থেকেছি _ এখনও আছি। তো, বাবা মারা যাওয়ার পর
ভাইজান স্পষ্ট করেই বললেন _ 'আমাদের শরীর থেকে ওই গ্রামের সমস্ত
চিহ্ন মুছে ফেলতে হবে, ভুলে যেতে হবে আমরা কোত্থেকে এসেছি। তা যদি
পারিস, তাহলে সহজে ওপরে উঠতে পারবি, নইলে ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে
ভুগতে ভুগতেই জীবন শেষ হয়ে যাবে। এই দেশে যারাই ওপরে উঠেছে কিংবা
উঠছে _ তাদের অতীত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে দ্যাখ, সবাই বলবে তাদের
পূর্বপুরুষরা নাকি জমিদার ছিলো। আরে সবার পূর্বপুরুষই যদি জমিদার
ছিলো তাহলে কৃষক ছিলো কে? বাঙালি মুসলমান তো এই সেদিন নেংটি ছেড়ে
লুঙ্গি ধরলো, পাঞ্জাবি পড়া শিখেছে পরশু, প্যান্ট-শার্ট ধরেছে
কালকে, আর সু্যট-টাইয়ের কথা কেবল ভাবতে শুরু করেছে। অথচ সবার
পূর্বপুরুষ নাকি জমিদার ছিলো! তো এই ক্লাসের মানুষের কাছে যদি তোরা
বলে বেড়াস যে, তোদের বাবা ছিলো রেজিস্ট্রি অফিসের কেরানি কিংবা
কৃষক তাহলে তোদের গৌরব বাড়বে না। সবাই তোদেরকে দেখবে করুনার চোখে,
আড়ালে আবডালে হাসাহাসি করবে _ বলবে আরে ওরা তো এখনও কাটা চামচই
ধরতে শেখেনি, যদিও তারাও ওই একই অরিজিন থেকে এসেছে।' _ ভাইজানের এই
আদেশ আমরা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছি। একদিন দেখলাম মেজ ভাই, এখন সে
বেশ বড়সড় ব্যবসায়ী, তার বন্ধুদের কাছে বাবা সম্বন্ধে বলছে _ 'হি
ওয়াজ আ গ্রেট ম্যান। কুড ইউ থিংক, আ ম্যান হু গট হিজ মাস্টার্স
ডিগ্রি ইন নাইনটিন ফরটি ফোর ফ্রম ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, ডিড নট
জয়েন টু এ্যানি সার্ভিস! আমরা তো এখন কেবল সারভাইভ করার জন্যই হা
পিত্যেশ করে মরছি, আর তিনি! হি ওয়েন্ট ব্যাক টু হিজ ভিলেজ, অ্যান্ড
এস্টাবলিশড আ হাই স্কুল অ্যান্ড আ কলেজ। হি থট দ্যাট ইট ওয়াজ হিজ
ডিউটি টু এডুকেট দ্য পিপল। তার তো কোনো জীবীকার সমস্যা ছিলো না,
কারণ, মাই গ্র্যান্ডফাদার ওয়াজ ওনার অফ হিউজ ল্যান্ড প্রোপারটিজ।
না, তিনি জমিদার ছিলেন না। জানিসই তো ঢাকা বেল্টেই আসলে তেমন কোনো
জমিদার ছিলো না। সেইসব অঞ্চলের লোকদেরকেই জমিদারি দেয়া হতো যেখানে
যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলো খারাপ, ট্যাক্স তুলতে সরকারের অসুবিধা হতো।
নইলে আমার দাদার যে ল্যান্ড ছিলো তা যদি দিনাজপুর বা রংপুরের কোনো
লোকের থাকতো, তাহলে তাকে ডবল জমিদারি দেয়া হতো।' _ একেবারে, যাকে
বলে, নির্জলা মিথ্যা। কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করা দূরে
থাক, বাবা কোনোদিন কলকাতা যানই নি _ প্রকৃতপক্ষে তিনি ওই সময়
ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন মাত্র। আর বাবাই ছিলেন আমার পূর্বপুরুষদের
মধ্যে প্রথম ম্যাট্রিক পাশ করা লোক। এমনকি আমার চাচা-ফুপুরা কেউ
স্কুলের চৌকাঠ পেরুতে পারেননি। তেমন বাস্তবতাও হয়তো ছিলো না। আমার
পূর্বপুরুষেরা _ যতোদূর জানি _ কৃষিজীবীই ছিলেন, কিন্তু তাদের
নিজস্ব তেমন কোনো জমিজমা ছিলো না। অন্যের জমিতে বর্গা খেটেই তাদের
জীবন কেটে যাচ্ছিলো। বাংলাদেশের সচ্ছল কৃষকরা কোনো এক নিকট অতীতে
যেমন নিজের ছেলেদেরকে ক্ষেতের কাজে না লাগিয়ে স্কুলে পাঠাতে শুরু
করেছিলেন, আমার দিন আনি দিন খাই দাদার জন্য সেটা খুব স্বাভাবিক
ছিলো না। কিন্তু তিনি সেটাই করেছিলেন। কেন করেছিলেন বোঝা মুশকিল।
আমার বাবাও ম্যাট্রিক পাশ করে তার পিতার মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন।
ম্যাট্রিক পাশ পুত্রের গর্বে নাকি দাদার মাটিতেই পা পড়তো না। শুধু
পাশ করেই ক্ষান্ত হননি বাবা, কিভাবে যেন রেজিস্ট্রি অফিসে একটা
কেরানির চাকরিও জুটিয়ে ফেলেছিলেন। এর পরের ঘটনা খুব চমকপ্রদ। প্রায়
গল্পের মতো। অনুজ্জ্বল-বৈশিষ্ট্যহীন-পরিচয়পরিচিতিহীন-গুরুত্বহীন
আমাদের বংশের ইতিহাসে যা কোনোদিন ঘটেনি তাই ঘটতে লাগলো।
গ্রামবাসীরা অবাক হয়ে দেখতে লাগলো _ ভূমিহীন কালু শেখের পুত্র শেখ
মফিজউদ্দিন কিভাবে শনৈ শনৈ উন্নতি করছে, বছর ঘুরতে না ঘুরতে বাড়িতে
শনের ঘরের বদলে টিনের ঘর উঠছে, জমিজমার মালিক হচ্ছে। বাবা তার
তিরিশ বছরের চাকরি জীবনে নাকি প্রায় একশ' বিঘা জমি কিনেছিলেন। নিজ
গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের গ্রামগুলোর প্রায় সব জমিরই মালিক আমার বাবা।
নিজের বাবা সম্বন্ধে বলতে খারাপ লাগলেও সত্য হচ্ছে এই যে, লোকটা
নগ্নভাবে ঘুষ খেতো। শুধু তাই নয়, এই এতো জমির মালিক হতে গিয়ে তিনি
হয়তো বহু অসহায় দরিদ্র মানুষকে সর্বস্বান্তও করে ফেলেছিলেন।
রেজিস্ট্রি অফিসে চাকরি করার সুবাদে তার জন্য হয়তো সেটা সহজও ছিলো।
'হয়তো' বলছি _ কারণ এই ইতিহাস আমরা জানি না, আমাদেরকে জানানো হয়নি,
তবে অনুমান করতে পারি। একজন সামান্য কেরানির এতো বিপুল সম্পত্তির
মালিক হওয়ার কোনো সৎ রাস্তা আছে বলে মনে হয় না। লোকটার আরো নানারকম
'গুণ' ছিলো। যেমন _ আমার মা মারা যাওয়ার পর বাবা আরো তিনটে বিয়ে
করে সুন্নত কমপ্লিট করেছিলেন। অবশ্য শেষ বউ ছাড়া বাকিগুলোকে তাড়িয়ে
দিতে ভোলেননি তিনি। মেজ ভাই বলছিলো বাবা নাকি নিজ গ্রামের মানুষকে
শিক্ষিত করে তোলার জন্য স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন _ এটাও ডাহা
মিথ্যা। ওগুলো করা তো দূরের কথা, তিনি আমাদের এলাকার একমাত্র
স্কুলটির শিক্ষকদেরকে নূন্যতম সম্মানটুকুও দেখাতেন না, বরং কারণে
অকারণে অপমান অপদস্থ করতে পছন্দ করতেন। তার একটা বিচিত্র স্বভাব
ছিলো। যাকে তাকে অদ্ভুত সব ইংলিশ ট্র্যান্সেলেশন জিজ্ঞেস করতেন।
আমিও তার এই নির্যাতনের শিকার হয়েছি। যেমন একবার আমাকে বলেছিলেন _
'তোরা আজকাল কি যে লেখাপড়া করিস, বলতো দেখি _ পুঁটিমাছ ফরফর করে _
ইংলিশ কি?' ফরফর করা তো দূরে থাক, আমি পুঁটিমাছ ইংলিশই জানতাম না,
এখনও জানি না। আমি যখন বললাম জানি না, তিনি বললেন _ 'জানবি কি করে,
তোর মাস্টাররা জানে নাকি! জিজ্ঞেস করে দেখিস তো তোর ইংরেজির
মাস্টারকে।' পরদিন সরল মনে কথাটা আমাদের ইংরেজির শিক্ষককে জিজ্ঞেস
করে একটা রাম থাপ্পর খেয়েছিলাম। কথাটা বাবাকে এসে বলতে তিনি হেসেই
অস্থির _ 'আরে বুঝলি না, পারে না বলেই থাপ্পর দিয়েছে।' তারপর
বাক্যটার ইংরেজি অনুবাদ করে দিয়ে বলেছিলেন _ 'কালকে গিয়ে তোর
মাস্টারকে বলিস।' আমি আর সেই ভুল করিনি। আরেকটা রাম থাপ্পর খাওয়ার
কোনো মানেই হয় না। বাক্যটা এখন ভুলে গেছি। আমার ধারণা _ 'পুঁটিমাছ
ফরফর করে'র ইংলিশ এই বাংলাদেশে একমাত্র আমার বাবা ছাড়া আর কেউ
জানতেন না, এখনও জানেন না। তো, এতোসব 'গুণ' সত্ত্বেও আমার বাবা
একজন 'গ্রেটম্যান'। ভাইজান অন্তত আমাদেরকে সেরকমই শিখিয়েছেন _ 'নো
ডাউট, হি ওয়াজ এ গ্রেটম্যান। বিকজ হি হ্যাড এ ভিশন। বাবা যদি না
ভাবতেন, তার ছেলেরা অফিসার হবে, তাহলে আমাদেরকে ওই হালচাষ করেই
খেতে হতো।' ভাইজানের মুখে বহুবার এই গল্প শুনেছি _ 'যেভাবেই হোক না
কেন, বাবা প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন, তিনি যদি চাইতেন তার
ছেলেরা ওইসব জমিজমা দেখাশোনা করবে, যদি ভাবতেন মেয়েদের যতো
তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়া দরকার _ তাহলে তাকে দোষ দেয়া যেতো না, বরং তার
জন্য সেটাই স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। তিনি তার
ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে শুরু করলেন। তার তো আর জানা ছিলো না যে,
তার ছেলেমেয়েরা বেশ মেধাবি, সবাই এতো ভালো করবে! কিন্তু নিশ্চয়ই
তার এরকম একটা স্বপ্ন ছিলো যে, এরা পড়াশোনা শিখে বড় মানুষ হবে! আমি
যখন মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করে স্কুল পাশ করলাম, তখন তিনি বললেন _
তুই আর এই গ্রামে থাকিস না, এই গ্রাম অভিশপ্ত, এখানে যে একবার আটকা
পড়ে সে আর বেরুতে পারে না। ঢাকায় চলে যা, ভালো করে পড়াশোনা করবি,
টাকাপয়সা ব্যাপারে কোনো চিন্তা করবি না, যেটা চিন্তা করবি সেটা হলো
_ তোকে এই দেশের সবচেয়ে বড় অফিসার হতে হবে।' বাবার স্বপ্ন নিজ বুকে
ধারণ করে ভাইজান ঢাকায় এলেন, আর রচনা করতে শুরু করলেন ভূমিহীন
কালুশেখের অনুজ্জ্বল বংশের বিশিষ্ট হয়ে ওঠার চমকপ্রদ ইতিহাস। বাবার
টাকা পয়সার কোনো সমস্যা ছিলো না। যাদের একশ' বিঘা জমি আছে তারাই
শুধু জানে _ এটা কি বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি। এই জমিতে উৎপাদিত ফসল
দিয়ে অন্তত দশটা পরিবার জীবন ধারণ করতে পারে। ফলে ভাইজানের সামনে
রইলো একটি মাত্র লক্ষ্য _ 'বড় অফিসার' হতে হবে। ভাইজান
কলেজ-ইউনিভার্সিটি পাশ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সত্যি সত্যি বড়
অফিসার হয়ে গেলেন; এখন তো তিনি অনেক ওপরে, বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম
সচিব। এই উঠে যাওয়াটা বেশ চমকপ্রদ অবশ্যই, কিন্তু তা অস্বাভাবিক
কোনো ব্যাপার ছিলো না। এখন পর্যন্ত ঢাকা ইউনিভার্সিটির কমপক্ষে
পঞ্চাশ ভাগ ছাত্র আসে গ্রাম বা মফস্বল থেকে _ আগে আসতো শতকরা আশি
ভাগ, আর তাদের প্রায় সবাই ছিলো কৃষক পরিবারের সন্তান। বিসিএস
পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয় তাদেরও অনেকেই কৃষক পরিবারেরই। সুতরাং
আমাদের এই গল্প কেবল সিনেমাটিক কল্পকথা নয়। কিন্তু আমাদের
বিশিষ্টতা অন্য জায়গায়। ভাইজান শুধু নিজেকেই টেনে তোলেন নি, এক এক
করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার ভাইবোনদেরকেও। সবাইকে ঢাকায় এনে পড়াশোনা
করিয়েছেন। তারপর যার যার পছন্দের পথে প্রতিষ্ঠা পেতে সহায়তা
করেছেন। শুধু তাই নয়, এই সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য যেসব
'ম্যানার' 'কার্টেসি' ইত্যাদি শেখা দরকার তা-ও হাতে ধরে শিখিয়েছেন
_ এই শিক্ষার মধ্যে কাপড়চোপরের কম্বিনেশন থেকে শুরু করে, খাওয়ার
সময় হুশহাশ শব্দ বা চা খাওয়ার সময় শো শা শব্দ না হওয়া, ইংরেজীতে
কথা বলার জন্য কোর্স করানো পর্যন্ত রয়েছে। ফলে আমরা সবাই এখন এই
'সভ্য' সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পেঁৗছাতে সক্ষম হয়েছি। ভাইজান
বাংলাদেশে সরকারের যুগ্ম সচিব; মেজ ভাই ব্যবসায়ী _ এতোদিনে প্রায়
কোটিপতি হয়ে গেছে; সেজ ভাই সাংবাদিক _ একটি প্রভাবশালী দৈনিকের চিফ
রিপোর্টার হবো হবো করছে, সমাজের নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে তার
ব্যাপক যোগাযোগ; দুই বোনের মধ্যে এক বোনের স্বামী ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; অন্য বোন ডাক্তার স্বামীসহ প্রবাসী; আর
আমি _ ভূমিহীন কালু শেখের পৌত্র, রেজিস্ট্রি অফিসের কেরানী শেখ
মফিজ উদ্দিনের পুত্র চৌধুরী মঞ্জুর হাসান একটি রাষ্টায়ত্ব
ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। তা, শেখের পুত্র চৌধুরী হলো কিভাবে? এটা
কোনো প্রশ্ন নয় _ এরকম হয়, হতে পারে। আমাদের চৌধুরীতে পরিণত হওয়ার
গল্পটাও ভাইজানের মুখে শুনেছি। ভাইজানের এসএসসি পরীক্ষার
রেজিস্ট্রেশনের সময় নাকি বাবা নিজে স্কুলে গিয়ে হেডমাস্টারের
আপত্তি সত্ত্বেও ভাইজানের নামের সঙ্গে চৌধুরী যুক্ত করেছিলেন। সেই
থেকে এই নতুন চৌধুরী বংশের যাত্রা শুরু হলো। এখন আমাদের নামের
সামনে/পেছনে চৌধুরী উপাধিটা সগৌরবে অবস্থান করছে, আমাদের ভবিষ্যৎ
বংশধরদের নামের সঙ্গেও করবে। ইদানিং অবশ্য দেখা যাচ্ছে লোকজন তাদের
সন্তানদের নামকরনের সময় বংশের পরিচয় আর রাখছে না, আগে যেমন থাকতো _
শেখ, মোল্লা, খন্দকার, পাটোয়ারি, ভুইয়া, তালুকদার ইত্যাদি ইত্যাদি
_ তবু আমার মনে হয় বাংলাদেশের অন্য সবাই নামকরণে নিজেদের বংশ পরিচয়
মুছে ফেললেও _ চৌধুরী, খান আর সৈয়দ এই তিন বংশ তা করবে না। কিংবা
করলেও এই তিনটি উপাধির ব্যবহার কখনো কমবে না _ কারণ কেয়ামত পর্যন্ত
আমাদের মতো নতুন নতুন চৌধুরী, খান আর সৈয়দ জন্ম নেবে। আর এজন্যই
এই তিন বংশ নিয়েই আমার ভীষণ সন্দেহ। সবারই বংশ-ইতিহাস আমাদের মতো
নয় তো! এজন্যই কি এই পরিচয় এমন সযত্নে সগৌরবে আকড়ে ধরার চেষ্টা!
বাবার দূরদৃষ্টি ছিলো বলতে হবে। ছেলেদের নামে এই নতুন উপাধির
সংযোজন তার প্রমাণ দেয়। 'হি গট হিজ মাস্টারস ডিগ্রি ইন নাইনটিন
ফরটি ফোর ফ্রম ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, বাট ওয়েন্ট ব্যাক টু হিজ
ভিলেজ উইদাউট জয়েনিং টু এ্যানি সার্ভিস; অ্যান্ড এস্টাবলিশড আ হাই
স্কুল অ্যান্ড আ কলেজ। বিকজ হি থট দ্যাট ইট ওয়াজ হিজ ডিউটি টু
এডুকেট দ্য পিপল' _ বাবা সম্বন্ধে এই ধরনের কথাবার্তা আমাদের
চৌধুরী উপাধির সঙ্গে যতোটা মানিয়ে যায়, শেখের সঙ্গে তা একেবারেই
যায় না। বাবার গুণের কথা অবশ্য বলে শেষ করা যাবে না। আমার অবাক
লাগে _ একজন ভূমিহীন কৃষকের পুত্র এতো বুদ্ধি পেয়েছিলেন কোথায়?
আরেকটা উদাহরণ দেয়া যায়। আমাদের যেহেতু পিতৃ- বা মাতকূলে পরিচয়
দেয়ার মতো কেউকেটা ধরনের কেউ ছিলো না, তিনি তাই ভাইজানকে
সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে করার বুদ্ধি দিয়েছিলেন _ যেন বড়
আত্নীয়স্বজনের অভাবে জীবনে কোথাও ঠেকে যেতে না হয়! হয়েছেও তাই,
আমার ভাইবোনদের বিয়ে হয়েছে বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারে, আর এসব বিয়ের
সময় বাবার পারফরমেন্সও ছিলো দেখার মতো। তিনি যেহেতু কথিত মাস্টার্স
ডিগ্রি হোল্ডার, এবং শিক্ষার জন্য উৎসর্গকৃত জীবন তার _ তাকে তো
তেমন আচরণই করতে হবে, তিনি তা পারতেনও। ভাই বা বোনদের শ্বশুর বাড়ির
লোকজনের সঙ্গে কথা বলার সময় বোঝাই যেতো না যে, তিনি একজন কেরানি
মাত্র। মনে হতো সত্যিই শিক্ষার জন্য উৎসর্গকৃত এক প্রাণ তিনি। কথা
বলায় তার দুটো গুণ ছিলো _ বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারতেন, এবং
বাক্যের মধ্যে সুকৌশলে দুরূহ সব ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দিতে পারতেন _
যেগুলোর অর্থ বোঝা যে কারো জন্যই বেশ কঠিন হয়ে পড়তো, এবং তার
শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্বন্ধে সবাইকে নিঃসন্দেহ করে তুলতো। এসব তিনি
কোথায় শিখেছিলেন বোঝা মুশকিল। কিন্তু অন্তত এটুকু বলা যায় যে, তার
অধ্যাবসায় ছিলো। ভাইজান অবশ্য এসব প্রসঙ্গ না তুলে সম্পূর্ণ ভিন্ন
এক দৃষ্টিকোণ থেকে বাবাকে বিশ্লেষণ করেন, বলেন _ 'বাবা যেমন
আমাদেরকে গ্রামে আটকে না রেখে, কৃষিকাজে ইনভলভ না করে পড়াশোনায়
উৎসাহিত করেছিলেন, এবং বড় অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন _
সেজন্যই এই দেশ ওই কৃষক পরিবার থেকে একজন যুগ্ম সচিব, একজন
ব্যবসায়ী, একজন সাংবাদিক, একজন ব্যাংক কর্মকর্তা এবং দুজন শিক্ষিত
মা পেয়েছে। এই ঘটনা শুধু আমাদের জীবনেই নয়, ঘটেছে আরো অনেকের
জীবনে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এই দেশে কজন শিক্ষিত লোক ছিলো _ দেশ
চালানোর মতো কজন মানুষ ছিলো? পাকিস্তানিরা যে আমাদের ওপর প্রভুত্ব
করার সাহস করতো তা তো ওই শিক্ষিত লোকের অভাবের কারণেই। আজ যে
প্রতিটি সেক্টরে অসংখ্য যোগ্য লোকের সমাবেশ _ তার জন্য কৃতিত্ব
দাবি করতে পারেন আমাদের কৃষক পূর্বপুরুষেরা যারা তাদের সন্তানদের
শিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাদের প্রতি আমাদের
কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদেরকে তাদের পরিচয় লুকিয়ে
ফেলতে হচ্ছে।' তো বাবার এতাসব গুণ, এতো বুদ্ধি কিন্তু একটা বিষয়
কিছুতেই বুঝতে পারি না _ তিনি এতোগুলো বিয়ে করেছিলেন কেন? তার মতো
একজন বুদ্ধিমান লোকের জন্য এই কাজ সুবিবেচনার পরিচয় বহন করে না।
তিনি এতোকিছু বোঝেন, ছেলেমেয়েদের ভালোমন্দের ব্যাপারে এতোখানি সজাগ
দৃষ্টি তার, অথচ এটুকু বুঝতে পারলেন না যে, এই কাজ তার
ছেলেমেয়েদেরকে সামাজিকভাবে বিপদে ও অস্বস্তিতে ফেলবে! বাবা চারটে
বিয়ে করেছেন _ এই কথা কারো কাছে বলা যায় না কী! 'আমার বাবা কৃষক' _
এই কথা বলা যায়, কারণ এর মধ্যেও এক ধরনের প্রচ্ছন্ন গৌরববোধ
লুকিয়ে আছে। একথা বললে এই বোঝায় যে, দ্যাখো কৃষকের ছেলে হয়েও আমি
কোথায় উঠে এসেছি! আমার কতোখানি যোগ্যতা থাকলে আমি কোনোরকম ব্যাকিং
ছাড়াই এতোদূর উঠতে পারি ভেবে দ্যাখো! কিন্তু বাবার চারটে বিয়ের কথা
কোনোভাবেই বলা যায় না, এর মধ্যে গৌরব তো নেই-ই, আছে নির্জলা
লজ্জা। অবশ্য আমার সৎ মায়েদের গর্ভে যে আমাদের কোনো ভাইবোন জন্ম
নেয় নি, সেটা একটা ইতিবাচক দিক। সৎ মায়েদের ব্যাপারটা না হয় লুকিয়ে
রাখা যায়, কিন্তু ভাইবোনদের ব্যাপারটা! এই বিষয়টি নিয়ে নিজের সঙ্গে
কথা বলাও খুব রিস্কি। মনে পড়ছে, এর আগে যখন শেষ বাড়িতে এসেছিলাম _
খালার অনুরোধে আর ভাইজানের নির্দেশে _ তখন আমার একটা মানসিক সংকট
তৈরি হয়েছিলো। খালার যত্ন-আত্তি, আবেগ, ভালোবাসা দেখে সন্দেহ
হয়েছিলো _ এই মহিলাই কি আমার আসল মা? এবং সন্দেহের যে স্বভাব,
একবার সে তৈরি হলে নিজের পক্ষে নানান প্রমাণ তৈরি করে _ আমার
ক্ষেত্রেও তাই হতে লাগলো। সন্দেহের পক্ষে নানান প্রমাণ পেতে
লাগলাম। মনে পড়লো _ ছোটবেলায় খালা তাকে মা বলে ডাকার জন্য পীড়াপীড়ি
করেছে, আমি রসগোল্লা খেতে খুব পছন্দ করতাম বলে লোভ দেখাচ্ছে _
'একবার আমারে মা কইয়া ডাক, আমি তোরে রোজ রসগোল্লা খাওয়ামু' _
কিন্তু এতো চেষ্টার পরও তাকে মা বলে না ডাকাতে সে গোপনে কেঁদে বুক
ভাসিয়ে দিচ্ছে। মনে পড়লো, বাবা মারা যাওয়ার সময় ভাইজানকে বলছেন _
'আমারে তুই কথা দে, মঞ্জুররে তুই ফেলবি না, তোর অন্য ভাইবোনের মতো
করে মানুষ করবি!' বাবার এই কথা মনে পড়লে আমি এখনও বিভ্রান্ত হয়ে
যাই। ভাইজানকে আমার ব্যাপারে বিশেষভাবে বলার অর্থ কি? তার মানে কি
এই নয় যে, ভাইজান আমাকে দেখবেন কী না সে বিষয়ে বাবার সন্দেহ ছিলো!
কেন এই সন্দেহ? ভাইজান তো এমনিতেই আমাদের ব্যাপারে অসম্ভব সচেতন,
যত্নশীল ও স্পর্শকাতর। তবু কেন শুধু আমাকে নিয়েই বাবার এই উৎকণ্ঠা!
এটা কি প্রমাণ করে না যে, আমি আমার ভাইবোনদের আপন ভাই নই? কিন্তু
কথাটা যখনই মনে হয়েছে _ তখনই আমার সমস্ত শরীর ও মন একসঙ্গে তীব্র
প্রতিবাদ করে উঠেছে। না, এটা হতে পারে না, কিছুতেই হতে পারে না।
হলে এতোদিন পর্যন্ত এতো বড় সত্যটা চাপা থাকতো না। তাছাড়া, ভাইবোনের
মধ্যেও আমি এমন কোনো আচরণ দেখিনি। আমি যে পরিমাণ স্নেহ তাদের কাছে
পেয়েছি সেটা কোনো সৎ ভাই পায় না, পেতে পারে না। একটি পরিবারের সবার
ছোট ভাইবোনরা যেমন পায় আমি তার চেয়েও বোধহয় বেশি পেয়েছি। আব্দার
করার আগে শখের জিনিস পেয়ে গেছি, বলার আগে প্রয়োজনের জিনিস পেয়ে
গেছি। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর মেজ ভাই আমাকে না চাইতেই একটা
মোটর সাইকেল কিনে দিয়েছিলো, প্রতি ঈদে ভাবী তার অন্য দেবর-ননদদের
তুলনায় আমার জন্য অন্তত এক সেট ড্রেস বেশি কেনে, এমনকি খাওয়ার
টেবিলেও তার সেই স্নেহের প্রকাশটা ধরা পড়ে। মাছের বড় টুকরোটা পড়ে
আমার পাতে, মাংসে বেশি ঝাল খেতে পছন্দ করি বলে ভাবী সবার জন্য
একরকম আর আমার জন্য আলাদা করে ঝাল দিয়ে মাংস রান্না করে। এসব নিয়ে
আমার ভাইবোনরা ভাবীকে কতো খেপিয়েছে কিন্তু সে কখনো তাতে কান দেয়নি।
স্বামীর সৎ ভাইয়ের জন্য কোনো মেয়ে নিশ্চয়ই এতোটা কেয়ারফুল হয় না!
বোনদেরও তো আমার প্রতি একটু বিশেষ টান। প্রবাসী বোনটা ফোন করলে
আমার সঙ্গে কথা বলবেই, বলবে _ 'তোর জন্য মনটা খুব কাঁদে রে ভাই,
তুই এখানে চলে আয় না!' তো এসব থেকে অন্তত এ সিদ্ধান্তে পেঁৗছানো
যায় যে, আমি তাদের সৎ ভাই নই। কিন্তু নিজের আইডেন্টিটির পক্ষে এতো
যুক্তি দাঁড় করিয়েও আমার সন্দেহ পুরোপুরি দূর হয়েছে, সেটা বলা যায়
না। বিষয়টি আমাকে খুব ভুগিয়েছে কিছুদিন, এখনও মাঝে মাঝে ভোগায়।
আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে, আমি সত্যিই তাদের আপন ভাই নই, কিন্তু
আমার জন্মের পর ভাইবোনরা বাবাকে শর্ত দিয়েছিলো _ আমার আসল পরিচয়
আমাকে বলা যাবে না, বললে আমার কোনো দায়দায়িত্ব তারা নেবে না! বাবা
বেঁচে থাকতে সেই শর্ত প্রাণপণে পালন করেছেন, এমন কি আমার মা
[অর্থাৎ খালা] কে পর্যন্ত বিষয়টি আমাকে না বলতে বাধ্য করেছেন। এবং
এজন্যই বাবার সন্দেহ ছিলো _ তিনি মারা যাওয়ার পর আমার আসল পরিচয়
ফাঁস হয়ে যাবে, ভাইবোনেরা আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে, আর তাই
মৃতু্য-মুহূর্তে তিনি বড় ভাইয়ের কাছে প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন!
কিন্তু এমন একটি বিষয় কি এতোদিন ধরে গোপন রাখা সম্ভব? কারো না কারো
কাছ থেকে কি বিষয়টি জানা হয়ে যেতো না? আমার পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা
আত্নীয়স্বজন কেউ-ই ব্যাপারটা আমাকে বলতো না? আর কেউ না হোক, খালা
যদি সত্যি আমার মা হয়ে থাকে তাহলে তার তো অন্তত বলার কথা! এসব
প্রশ্ন মনে এলে আমি স্মৃতি হাতড়াতে থাকি। আমার মনে পড়ে _ হঁ্যা,
কেউ প্রকাশ্যে না বললেও এমন ইঙ্গিত আমি আরো অনেকবার পেয়েছি। যেমন
আমার চাচা আমাকে একাধিক বার বলেছেন _ 'ওনাকে তুই মা বলে ডাকিস না
কেন, এতো করে বলে যখন, ডাকলে তো কোনো ক্ষতি নাই---।' শুধু চাচাই
নয়, ভাবীও আমাকে এমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলো। একবার প্রায় গল্পচ্ছলেই
বাবার বিয়ের প্রসঙ্গটি তুলেছিলো সে। ভাইজান যে ভাবীর কাছে বিষয়টি
না লুকিয়ে খুলে বলেছে _ এতে আমি আবার তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয়
পেয়েছিলাম। আর যাই হোক, নিজের স্ত্রীর কাছে এমন একটি বিষয় দীর্ঘদিন
ধরে লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। তো, ভাবী বলেছিলো _ 'বাবার একাধিক বিয়ে
তোমাদেরকে খুব লজ্জায় ফেলে দিয়েছে, সেটা খুব স্বাভাবিকও। কিন্তু
বিষয়টা চেপে রাখার জন্য তোমরা যা করছো তাতে কিন্তু প্রকারান্তে
খালার ওপরই অবিচার করা হচ্ছে।' _ 'কেন? অবিচার করা হবে কেন? লুকিয়ে
না রেখে আমরা কি সবাইকে বলে বেড়াবো যে, আমাদের একজন সৎমা আছে?' ্ল_
'না তা নয়, কিন্তু তোমরা তো তার কোনো খোঁজই নাও না, সেটাও কি ঠিক?'
্ল_ 'খোঁজ নিই না, কারণ তার প্রয়োজন পড়ে না। বাড়িতে আমাদের বিপুল
সম্পত্তি, সে নিশ্চয়ই না খেয়ে থাকে না!' _ 'খাওয়া না খাওয়ার প্রশ্ন
এটা নয়। শি নিডস কেয়ার এ্যান্ড অ্যাটেনশন, এ্যান্ড শি ডিজার্ভস
ইট।' _'নো' _ আমি ক্ষেপে উঠেছিলাম _ 'শি কুড নট ডিজার্ভ ইট। টু হুম
শি ডাজ ডিজার্ভ? আমরা তার কেউ নই। আমাদের দেখে সে নিশ্চয়ই বাবার
সঙ্গে বিয়ে বসেনি!' _ 'তুমি খুবই বাজে ল্যাংগুয়েজ ইউজ করছো মঞ্জুর।
তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন এর জন্য শুধু তিনিই দায়ী, বাবার কোনো
দায়দায়িত্ব নেই। তিনি কি জোর করে বাবার সঙ্গে বিয়ে বসেছিলেন, বাবার
কি কোনো ভূমিকাই ছিলো না? অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, তোমারা বাবাকে মনে
কর গ্রেট ম্যান, আর মায়ের ব্যাপারে অতিমাত্রায় নিষ্ঠুর।' ্ল_
'মাইন্ড ইট ভাবী শি ইজ নট আওয়ার মাদার।' _ 'কিন্তু তিনিই তোমাকে
কোলে পিঠে করে বড় করেছেন, একটি শিশুকে বড় করে তোলা কী ভয়াবহ কষ্টের
ব্যাপার সেটা বুঝবে যখন নিজে বাবা হবে।' _ 'তা আমাদের কি করা উচিত
বলে মনে কর তুমি?' _ 'তাকে তোমাদের কাছে এনে রাখা উচিত।' _ 'তা
তুমিই তো সেটা করতে পারো, তুমি এ বাড়ির বড় বউ, তোমার তো একটা
দায়িত্বও আছে।' _ আমি বিদ্রুপের সুরে বলেছিলাম। _ 'আমার ক্ষমতা
থাকলে আমি নিশ্চয়ই সেটা করতাম। করা তো দূরে থাক, একথা তো তোমার
ভাইজানকে বলাই যাবে না।' _ 'ও, ভাইজানকে বলা যাবে না, তাই আমাকে
বলছো!' _ 'শুধু সেজন্যই নয়, ওনার প্রতি তোমার দায়িত্বটাই বেশি
এইজন্য বলছি। তুমি তার কাছে যে সার্ভিস পেয়েছো তার খানিকটা তো ফেরত
দেয়া উচিত। তাকে এখানে এনে না রাখতে পারো, তার খোঁজখবর তো নিতে
পারো, তাকে গিয়ে মাঝে মাঝে দেখে তো আসতে পারো।' _ এসব কথা মনে পড়লে
আমার সন্দেহ আবার গভীর হয়ে ওঠে। ভাবী কেন শুধু আমাকেই ব্যাপারটা
বলেছিলো? খালা কেন শুধু আমাকেই মা বলে ডাকার জন্যই পীড়াপীড়ি করতো?
আমার পিঠেপিঠি বোনটা বোধহয় আমার চেয়ে দু'বছরের বড়। তাকে কেন কখনো
বলে নি? তবে কি আমার সন্দেহই সত্যি? এই মহিলাই আমার মা? আর এজন্যই
বারবার আমাকে দেখতে চাওয়া, এমনকি মৃতু্যর মুহূর্তেও! না, তা হতে
পারে না। আমার সমস্ত মনপ্রাণ আবার একসঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো।
কিন্তু পর মুহূর্তেই মিইয়ে এলো উত্তেজনা। মনে হলো, তবে কি সারা
জীবন ধরে আমাকে এই সন্দেহটা বয়ে বেড়াতে হবে? না, এর একটা সুরাহা
হওয়া দরকার। মনে হলো, তিনি যদি এখনো বেঁচে থাকেন তাহলে এবার তাকে
অবশ্যই জিজ্ঞেস করবো। মনে হলো, আমার এই এক্ষুনি কথাটা জিজ্ঞেস করা
দরকার। আমি জোরে পা চালালাম, এবং অনেকক্ষণ পর চিন্তা হলো _ আমি যে
এতক্ষণ ধরে হাঁটছি এখনো বাড়ি পেঁৗছতে পারছি না কেন? এতো দীর্ঘ সময়
তো লাগার কথা নয়! তবে কি অন্যমনস্কতায় পথ ভুল করেছি? তা-ও তো হওয়ার
কথা নয়। বাসস্ট্যান্ড থেকে ১০/১৫ মিনিট হাঁটার পরেই একটা লেফট
টার্ন, তারপর সোজা একপথে বাড়ি। পথই টেনে নিয়ে যাবে। আমি লেফট টার্ন
নিয়েছি অনেক আগে, তারপর হাঁটছি তো হাঁটছিই। পথ যদি ভুল করেই থাকি
এখন আমি তা বুঝি কি করে? কোনোকিছুই চেনা লাগছে না। বোঝা যাচ্ছে, এই
কয়েক বছরে গ্রাম অনেক পাল্টে গেছে। অনেক নতুন বাড়ি ঘর। তবু তো
সবকিছু এতো অচেনা লাগার কথা নয়! অবশ্য এতো গভীর অন্ধকার, আর আমি
হাঁটছি এতো বেশি আন্দাজ এবং স্মৃতির ওপর ভর করে যে, কোথায় কি আছে
তা শুধু কল্পনা করা যাচ্ছে _ সত্যি সেগুলো আছে কী না, বুঝতে পারছি
না। এমন কি অনেকক্ষণ অন্যমনস্ক থাকার ফলে এখন আমি ঠিক কোথায় আছি
তাও বুঝতে পারছি না । আমি পেছন দিকে কিছুদূর ফিরে গেলাম, কিছু চেনা
যায় কীনা দেখতে। কোনো লাভ হলো না। কিছুই পরিস্কার করে দেখা যাচ্ছে
না। জোসনা থাকা তো দূরের কথা, নক্ষত্রের আলোটা পর্যন্ত নেই যে,
কোনোকিছু আবছাভাবে হলেও দেখে নেয়া যাবে। ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে
আকাশ _ কখন যে আবার বৃষ্টি নেমে আসে কে জানে! নিজের ওপর বিরক্তি
লাগলো _ কেন যে ঝোঁকের মাথায় এই রাতের বেলা রওয়ানা দিলাম! আর
দিলামই যদি তাহলে _ টর্চ, ছাতা _ গ্রামে চলাফেরার জন্য এই অতি
প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আনলাম কেন? আমি হাঁটতে লাগলাম, কিছুদূর হেঁটে
আবার ফিরে এসে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করলাম _ আমি ঠিক পথে আছি কী
না, কিন্তু বুঝতে পারলাম না। না বুঝেই আমি এই অন্ধকার নির্জন রাতে
একা হেঁটে চলেছি তো হেঁটেই চলেছি, কিন্তু কিছুতেই বাড়িতে পেঁৗছাতে
পারছি না।
মঞ্জুর যখন হাঁটতে শুরু করেছিলো, তখন ভেবে রেখেছিলো ১৫/২০ মিনিট
হাঁটার পর বামে টার্ন নিতে হবে, তারপর একেবারে সোজা হেঁটে গেলেই
আধাঘন্টার মধ্যে বাড়ি চলে যাওয়া যাবে। সোজা পথ, না চেনা বা পথ ভুল
করার কোনো সম্ভাবনার কথাই সে ভাবেনি। কিছুক্ষণ পর সে ঠিকই টার্ন
নিয়েছিলো, কিন্তু এতোসব ভাবনাচিন্তায় মগ্ন থাকায়, আর সাংঘাতিক
রকমের অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়ায় লক্ষ্য করে উঠতে পারেনি _ তার যেখানে
গিয়ে টার্ন নেবার কথা তার আগেই নিয়ে ফেলেছে। সে আসলে জানতো না যে,
এখানে একটা নতুন রাস্তা হয়েছে, যেটা অনেকদূর পর্যন্ত সোজা গিয়ে
তারপর এঁকেবেঁকে গিয়ে মিশেছে শহরে যাওয়ার মূল রাস্তার সঙ্গে।
হরিরামপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মানিকগঞ্জ শহরের সঙ্গে সংযোগ রাস্তাটি
বর্ষার সময় ডুবে যায় বলে এই বিকল্প রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন গ্রামের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন মঞ্জুরের কথাটা জানা থাকার কথা
নয়, ছিলোও না। ফলে ভুল পথে টার্ন নিয়ে সে আসলে শহরের দিকেই যেতে
থাকে আবার। যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারে যে সে ভুল রাস্তায় এসেছে, তখন
বেশ খানিকটা পেছন দিকে ফিরে এসেও কিছুতেই ঠিক রাস্তাটা খুঁজে পায়
না। রাত বাড়ে, অন্ধকার আরো ঘনিভূত হয়, রাস্তাঘাট ভয়াবহ নির্জন হয়ে
পড়ে, গ্রাম-প্রকৃতির নানা ধরনের নিজস্ব শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা
যায় না, আর সে ক্রমশ অসহায় হয়ে পড়ে। এঁকেবেঁকে সে এ পথ থেকে ও পথে
ঘুরে বেড়ায়, ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়ে, কিন্তু কিছুতেই আর বাড়ি
যাওয়ার পথটি খুঁজে পায় না। এক সময় তার মনে হয় _ সে এক জটিল গোলক
ধাঁধায় প্রবেশ করেছে কিন্তু এতো অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে
এখান থেকে বেরুবার পথটি কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে ভোর না হওয়া
পর্যন্ত এই গোলকধাঁধা থেকে বেরুনোও হবে না তার।
রচনাকাল : জুন ২০০২
|
| |
 |
|