Page loading ... Please wait.

অপেক্ষা
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
একটি অলৌকিক ঘটনার জন্য তারা সবাই অপেক্ষা করছিলো। এবার দেখা যাবে এই সর্বনাশা গাঙের _ পদ্মার _ কতো শক্তি, কতো সাহস! বছরের পর বছর ধরে তারা পদ্মার ভাঙন দেখে এসেছে _ বাড়িঘর, স্কুল, বাজার, মসজিদ, মন্দির, থানা, টেলিফোন অফিস, জমিজমা, মাঠঘাট কাউকেই সে ছাড় দেয়নি। যে লেছড়াগঞ্জ একসময় এক সম্পন্ন বন্দর ছিলো _ ওপাড়ে গোয়ালন্দ, এপাড়ে লেছড়াগঞ্জ _ এখন শুধু তার নামটাই রয়ে গেছে, বাকি সব গাঙের পেটে। ওই যে বিশাল বড় ওয়্যারলেসটা _ যেটার গল্প এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে, কিংবা সেই দেখার মতো থানা ভবনটা, বা সেই বিরাট লেছড়াগঞ্জ বাজারটা, স্টিমার ঘাট, পাটগ্রাম স্কুল _ সবই গেছে, তাও কতোকাল আগে! সবই হার মেনেছে পদ্মার কাছে _ এমনকি মন্ত্রী, এম.পি, প্রেসিডেন্টও। কতোজন এলো-গেলো, ভাঙন ফেরানোর জন্য প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে গেলো, কিন্তু পদ্মার রাগের কাছে তারাও শিশুমাত্র, কিছুই করতে পারেনি। থানা, বাজার আর স্কুল বারবার পিছিয়ে এসেছে। আসতে আসতে এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, লোকে বলে _ পদ্মা আর এগুতে পারবে না। সেই ক্ষমতাই তার নাই। তারা, এই অঞ্চলের মানুষগুলো, এখন সেই ঘটনার সামনে, যেখানে এসে পদ্মা থমকে দাঁড়াবে। দাঁড়াতেই হবে। তার এতো বড়ো সাহস নাই যে, এই বাড়িও পেটের মধ্যে নেবে।

কারণ, এই বাড়িতে ঘুমিয়ে আছেন তিন তিনজন কামেল পীর _ যেনতেন পীর না, একেবারে জিন্দাপীর।

পদ্মা এখন এসে দাঁড়িয়েছে এই বাড়ির _ মৌলবী বাড়ি নামে যার বিশাল পরিচিতি _ সীমানায়। বাড়ির নামটি অবশ্য হয়েছে একজনের নামেই _ তিনি 'বড় মৌলবী'। খুবই গরম পীর। তাঁর পিতার পরিচিতি 'দাদা হুজুর' হিসেবে, আর পুত্রের পরিচয় 'ছোট মৌলবী' _ কারো কারো কাছে 'দরবেশ'। বংশানুক্রমে এরা কামেল হুজুর। মৃতু্যর এই এতোদিন পরও তাদের কারামতি সর্বজনবিদিত। নানা বিপদ-আপদে লোকজন তাদের সাহায্য-সহানুভূতি-সুদৃষ্টির প্রত্যাশা করে এসেছে বরাবর। যে যতো কথাই বলুক _ নব্য শিক্ষিত যুবকদের কেউ কেউ এসবের বিরুদ্ধে বলে বৈকী _ তাদের বিশ্বাসে এতোটুকু চির ধরেনি। খরার সময় _ চৈত্র-বৈশাখ এমনকি জ্যৈষ্ঠ মাসেও যখন খা খা রোদে মাঠঘাট ফেটে চৌচির, মেঘ নাই, বৃষ্টি নাই, তখন কি তারা বৃষ্টির আশায় এই মাজারে এসে দুধ ঢেলে দেখেনি যে, দু'দিন পরেই কেমন আসমান জুড়ে মেঘ জমা হয়, দুধের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে এমনকি কালবৈশাখি পর্যন্ত বয়ে যায়, বৃষ্টিতে মাঠে রীতিমতো পানি জমে যায়! মেঘবৃষ্টির ফেরেশতা মিকাইল (আঃ) পর্যন্ত যদি ইনাদের কথা শোনেন, বৃষ্টি নামাতে বাধ্য হন, সেখানে এই পদ্মার এতোবড়ো সাহস কোত্থেকে হবে যে, ইনাদের বাসস্থান ভেঙে নেবে? তাছাড়া, পদ্মা তো আর নিজে ভাঙে না, ওটাও ওই ফেরেশতাদেরই কাজ। পানির নিচে বাস করেন যে নবী খিজির (আঃ) _ যাকে আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত হায়াত দারাজ করেছেন _ তাঁরই নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে অনুগত ফেরেশতারা পাপপূর্ণ জনপদ সংলগ্ন নদীর নিচের মাটি কাটছে। নিচের মাটি কেটে নিলে ওপরের মাটির দাঁড়াবার অবলম্বন থাকে না বলেই না পদ্মা ভাঙে! তো সেই খিজির (আঃ) কি তাঁর বন্ধুদের কবরের নিচের মাটিও কাটার নির্দেশ দেবেন? তাই কি হয়? তাদের তো বেশ ঘনিষ্ট বন্ধুত্বই আছে _ অনেকে তার প্রত্যক্ষ সাক্ষীও।

কেন, তারা কি সেইসব বয়স্ক মানুষদের স্মৃতিচারণ ভুলে গেছে? সেই যে, বহুকাল আগে, যখন সুতালড়ী-আজিমনগর ভাঙনের মুখে পড়েছিলো আর লোকজন এসে বড় মৌলবী সাহেবের পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলো _ যেন তিনি তদবির করে এই ভাঙন ফিরিয়ে দেন! হুজুর শর্ত দিলেন _ তার সব কথা মানতে হবে, নইলে তিনি তদবির করবেন না। লোকজন শর্তে রাজি হলে তিনি চললেন তাদের সঙ্গে, এই গ্রামের বহু লোকও সঙ্গী হলো তার। সুতালড়ী গিয়ে তিনি পদ্মার পাড়ে দাঁড়ালেন, একটা ধবধবে সাদা বেহেশতি কাগজে জাফরান রঙের কালি দিয়ে আরবিতে চিঠি লিখলেন, তারপর ওই এলাকার সবচেয়ে সাহসী সাঁতারুকে বললেন _'এই চিঠি নিয়ে ডুব দাও। যতো কষ্টই হোক, যতোক্ষণ পর্যন্ত না একজন নূরানী মানুষের দেখা পাবে, তুমি থামবে না। তাঁকে পেলে আমার সালাম জানিয়ে এই চিঠিটা দেবে, এবং উত্তর নিয়ে আসবে।' লোকজন কি সেই সাঁতারুর মুখেই তার অভিজ্ঞতার কথা শোনেনি? _ 'ডুব তো দিলাম, নামতেছি তো নামতেছিই, নামা আর শ্যাষ অয় না। দম ফুরায়া যায়, মনে লয় য্যান মইরা যাইতেছি। বড় মৌলবী সাবের মুখ মনে আইনা শান্তি পাইতে চাই। কতক্ষুণ এইভাবে নামছিলাম মনে নাই, হঠাৎ দেহি আমার আর শ্বাসকষ্ট নাই, দেহি পানির নিচে য্যান ঘরবাড়ি, আলো-বাতাস, আর একজন ফেরেশতার লাহান মানুষ গদীতে বইসা আছেন আরাম কইরা। আমারে দেইখা উনি বললেন, আসো আসো, আমার দোস্ত তোমারে পাঠাইছে তো, তা কি সমাচার? আমি সালাম দিয়া তারে হুজুরের চিঠিডা দিলাম; উনি পড়বার ফাঁকে ফাঁকে চাইরদিকে চাইয়া দেহি _ হাজার হাজার মানুষ, য্যান আগুনের তৈরি, মাটি কাটতাছে। চিঠি পইড়া তিনি তাগোরে থামতে কইলেন। কইলেন _ আমার দোস্ত দূত পাঠাইছে, তোমরা থামো। দোস্ত লেখছেন _ এই জায়গার মানুষ আর পাপ করবো না। তোমরা চলো দেহি অন্যদিকে যাই। তারপর আমার দিকে ফিরা বললেন _ দোস্তরে আমার সালাম বলবা, আর বলবা আমি তার কথা রাখছি।' শুধু কি প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা? সেই দিন থেকেই কি আজিমনগর-সুতালড়ী-ধূলশুরায় পদ্মার ভাঙন থেমে যায়নি? এইরকম জলজ্যান্ত প্রমাণ সত্ত্বেও তারা বিশ্বাস না করে পারে কিভাবে?

এদিকে এই অঞ্চলের ভাঙন তো থামলো _ কিন্তু লেছড়াগঞ্জ যে যায় যায়। অতএব লোকজন আবার এসে পায়ে পড়লো বড় মৌলবী সাহেবেরই _ 'হুজুর আপনে সুতালড়ীর ভাঙন ফিরাইলেন, এদিকে যে আমাগো সব যায়! আপনে আমাগো বাঁচান।' তিনি আবার গেলেন পদ্মার কাছে _ আগের মতোই চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিলেন সেই সাঁতারুকে। কিন্তু এবার খবর এলো অন্যরকম। সাঁতারু এসে জানালো _ পানির নিচের সেই ফেরেশতার মতো লোকটা হুজুরকে জানাতে বলেছেন যে, এই অঞ্চলের মানুষ বড়ো বেশি পাপ করে _ এইসব পাপ না থামা পর্যন্ত তিনি তাঁর দোস্তের এই অনুরোধ রাখতে অক্ষম। কি পাপ? কি পাপ? লোকজন বিরাট চিন্তায় পড়ে গেলো। পানির নিচের নবী তো তা বলে দিলেন না! কি পাপ জানার জন্য হুজুর বসলেন মোরাকাবায় (ধ্যান)। মুখ খুললেন দু'দিন পর। শত শত লোকের সামনে বললেন _ তিনটি পাপ থেকে তোমাদের বিরত থাকতে হবে। (১) বাজারের দোকানীরা মাপে কম দিতে পারবে না এবং দুধ বিক্রেতারা দুধে পানি মেশাতে পারবে না। [শুনে দোকানি আর দুধওয়ালাদের মুখ শুকিয়ে গেলো। এ যে তাদের ব্যবসার অঙ্গ। দুনিয়াতে এমন কোন দোকানদার আছে যে একটু হলেও মাপে কম না দেয়, কোন গোয়ালা আছে যে একটু হলেও দুধে পানি না মেশায়! এসব না করলে যে ব্যবসায় বরকত হয় না, হুজুর কি তা জানেন না? আর বরকত না হলে তাদের সংসার চলবে কি করে?] (২) জেনা (অবৈধ সঙ্গম) বন্ধ করতে হবে। [শুনে প্রেমিক-প্রেমিকাদের বুক কেঁপে উঠলো। শুধু তারাই কেন, দূর-দেশে কাজের খোঁজে যাওয়া কোনো কৃষকের অতৃপ্ত যুবতী বধু, তরুণী, বিধবা বা স্বামী-পরিত্যক্ত নারীরা _ আল্লাহ যাদের স্বামী কেড়ে নিয়েছেন তাদের যৌবন থাকতেই ফলে অবৈধ সম্পর্ক ছাড়া যাদের কোনো উপায়ও নেই, আর এসবের সঙ্গে জড়িত পুরুষরা একবার কেঁপে উঠলো। যদি 'জেনা'-ই বন্ধ করতে হয়, তাহলে জীবনের আনন্দ আর থাকে কোথায়?] (৩) এ অঞ্চলে কোনো গান বাজনা যাত্রা সার্কাস ইত্যাদি কিছুতেই চলবে না। এবার উপস্থিত সবার মুখই শুকিয়ে গেলো। তারা তো নদীপাড়ের মানুষ। আর কে না জানে যে, গান ও নদী এক সুতোয় বাঁধা! গান ছাড়া তারা চলবে কিভাবে? উপলক্ষ্য ছাড়াই তারা নানারকম গান বাজনার আয়োজন করে, কিংবা বলা যায় গানবাজনা সামাজিক মেলামেশার একটা উপলক্ষ্য হিসেবে কাজ করে _ কবি গান, জারি গান, বয়াতি গান, বছরে অন্তত একবার যাত্রা, একবার সার্কাস। যাত্রা বা সার্কাস দল আনতে না হয় অনেক টাকা লাগে, দেখতেও লাগে; কিন্তু কবিগান বা জারি বা বয়াতিগান বা কীর্তন শুনতে তো আর পয়সা লাগে না! আর তাছাড়া দু-চার গ্রাম ঘুরলেই যেখানে ৫/৭ জন কবিয়াল কি বয়াতি কি কীর্তন গায়ক পাওয়া যায়, সেখানে তারা গান ছাড়া কিভাবে দিন কাটাবে?] বড় মৌলবী সাহেব তিন পাপের কথা উল্লেখ করে প্রতিশ্রুতি দেন _ তোমরা যদি এগুলো থেকে বিরত থাকো তাহলে আমি এই পদ্মাকে ফিরিয়ে দেবো। উপস্থিত লোকজন অনিচ্ছা সত্ত্বেও সমস্বরে অঙ্গীকার করে _ আগে তো পদ্মা ফিরুক, তারপর না হয় দেখা যাবে। তারা সবাই মিলে না হয় আবার মৌলবী সাহেবের পায়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়বে _ অন্তত গান-বাজনার অনুমতিটা যেন তিনি দেন। গান ছাড়া যে তাদের বাঁচার কোনো মানেই থাকে না, এ কথাটি তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন! তিনি তো তাদেরই লোক। যদিও এ অঞ্চলের সবাই জানে _ কোনো এক সুদূর অতীতে মৌলবী সাহেবের কোনো এক পূর্বপুরুষ আরব দেশ থেকে এই দেশে এসেছিলেন ইসলাম প্রচার করার জন্য, সেই অর্থে তিনিও হয়তো আরব দেশেরই লোক _ কিন্তু এতোকাল ধরে এই দেশে বসবাস করার ফলে তাদের ওপর তো মানুষের অধিকারও জন্মে গেছে। তাছাড়া তারা এদেশের মানুষের মনের কথা বোঝেন, সমস্যা সংকট বোঝেন, তাদের ভাষায়ই কথা বলেন, অতএব তাদের দাবি তিনি নিশ্চয়ই রাখবেন।

বড় মৌলবী সাহেবের কাছে সমস্বরে অঙ্গীকার করলেও গোপনে গোপনে অঙ্গীকার ভঙ্গও হতে থাকে। দোকানিরা তাদের স্বভাবসুলভ পদ্ধতিতে মাপে কম দিতে থাকে, দুধওয়ালা দুধে পানি মেশাতে থাকে _ যদিও প্রতিবারই মনে মনে হুজুরের কাছে মাফ চেয়ে নেয়, প্রেমিক-প্রেমিকারা গোপনে মিলিত হওয়া অব্যাহত রাখে, আর লোকজন খুব গোপনে _ হুজুরের বাড়ি থেকে দু'চারগ্রাম দূরে হলেও গানের আয়োজন করে। শুধুমাত্র সার্কাস এবং যাত্রার দল আর এই অঞ্চলে আসে না। কিন্তু হায়, এরা মুর্খের দল, যে হুজুরের নাকি পানির নিচের নবী খিজির (আঃ) এর সঙ্গে বন্ধুত্ব, তার কাছে কি এসব গোপন থাকে? থাকে না। ফেরেশতারা এসেই সব খবর দিয়ে যায়। অতঃপর লোকজনের কথার বরখেলাপে ক্রুদ্ধ হয়ে বড় মৌলবী অভিশাপ দেন _ এই জনপদ ধ্বংস হবে। লোকজন এসে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ে, কেঁদে জার জার হয়ে যায়, নিজেদের মৃত মা বাবা আর আল্লাহ-রসুলের নামে শপথ নিয়ে আবার অঙ্গীকার করে, কিন্তু বড় মৌলবী কোনোভাবেই তাঁর অভিশাপ ফিরিয়ে নেন না। মৃতু্যর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর কথায় অটল থাকেন, আর পদ্মা ভাঙতেই থাকে।

বড় মৌলবীর মৃতু্যর পর লোকজন এসে পড়ে ছোট মৌলবীর কাছে, কিন্তু তিনিও তাদেরকে ফিরিয়ে দেন এই বলে যে, তিনি কোনো তদবির করতে পছন্দ করেন না। ছোট মৌলবী ছিলেন ঠিক তার বাপের উল্টো স্বভাবের, চুপচাপ থাকতেন _ লোকে তাকে ডাকতো দরবেশ বলে _ হয়তো ইচ্ছে হলে কারো কোনো জটিল সমস্যার সমাধানও করতেন, কিন্তু বলে কয়ে তাকে দিয়ে কিছু করানো যেতো না। দু'য়েকবার তিনি পদ্মার পাড়ে গিয়ে _ 'এই থাম'_ বলে ধমকে উঠেছেন। পদ্মা থেমেও গেছে বেশ কিছুদিনের জন্য। হয়তো বছর খানেক কি দুই বছর থেমে থাকার পর আবার ভাঙন শুরু হয়েছে _ কিন্তু সব সময় অমন ধমক দেয়ার ইচ্ছে ছোট মৌলবীর হয়নি। এক সময় এই অঞ্চলের মানুষ এই ভাঙনকে অনিবার্য বাস্তবতা বলেই মেনে নিয়েছে। মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছে নিজেদের সর্বনাশ দেখার। কিন্তু এখন _ 'শালার গাঙ, তুমি তো ভাঙতে ভাঙতে এ্যাতদূর আইলা, এহন ভাঙ্গো তো দেহি তুমার কত সাহস।' এবার আর খিজির (আঃ)-এর কোনো উপায় নাই, ফেরেশতাদের নিষেধ না করেই পারবেন না তিনি। তাঁর দোস্তরা শুয়ে আছেন এখানে, মাইলের পর মাইল ভেঙে এলেও ওই সাড়ে তিন হাত মাটি ভেঙে দেখুক তো!

ছোট মৌলবী সাব এক ধমকে সব বন্ধ করে দেবেন না!

২.

অলৌকিক ঘটনাটির জন্য অন্য সবার অপেক্ষার চেয়ে মিনহাজের _ মানুষের মুখে ঝরে যেতে যেতে যার নাম অবশেষে মিনা'য় পরিণত হয়েছে _ অপেক্ষাটা অন্যরকম। কারণ সে-ই এখন এই বাড়ির একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা। হুজুরদের উত্তরাধিকারীরা এখন শহরবাসী। 'আরবি লাইনে' না গিয়ে তারা ইংরেজি পড়েছে, শিক্ষিত হয়ে বড় চাকরি নিয়ে শহরে থেকে 'সাহেব' হয়ে গেছে। ফলে বাড়িটা হয়ে গেছে বিরানভূমি, বিরাট বাড়িটার খা খা শূন্যতা বুকে খুব বাজে মিনার। সে-ই যতোটুকু সম্ভব বাড়ির শ্রী ধরে রেখেছে, বিনিময়ে পেয়েছে নিশ্চিত আশ্রয় আর খাবারের নিশ্চয়তা। এতোদিন ধরে সে ভেবে এসেছে বাকি জীবনটা সে এখানেই কাটিয়ে দেবে _ আর মরলে যেন এই বাড়ির কবরস্থানে তার জন্য একটু জায়গা তার কপালে আল্লাহ নসিব করেন। কারণ সে শুনেছে _ যে গোরস্থানে অন্তত একজন অলিআল্লাহ শায়িত থাকেন, সেই গোরস্থানের অন্যান্য বাসিন্দাদের কোনো কবরের আজাব হয়না। তাতে ওই কামেল লোকটির 'ডিস্টাব' হয়। আল্লাহ তার প্রিয় বন্ধুর শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে চান না বলেই নাকি এই ব্যবস্থা। তো এই বাড়ির গোরস্থানে তিন তিনজন অলিআল্লাহ শুয়ে আছেন _ এখানে যদি একটু জায়গা পাওয়া যায় _ তাহলে কবরের আজাব তো দূরের কথা আল্লাহ তার পাপের শাস্তির কথা ভাববেনই না। এদেরই সম্মানে সে বিনা হিসাবে বেহেশতে চলে যেতে পারবে। কিন্তু বাড়িটা যদি ভেঙেই যায় তাহলে তার কি উপায় হবে? কোথায় আশ্রয় মিলবে তার, আবার? যদিও সে ঠিকঠাক বোঝে না, বাড়িটা কেন ভাঙবে না! পদ্মা তো সবই ভেঙে নেয় _ এই বাড়িটাকে কেন ছাড় দিতে যাবে? কিন্তু না বুঝলেও লোকজনের কথায় তারও বিশ্বাস জন্মেছে _ এ বাড়ি ভাঙবে না। এই বিশ্বাস তার জন্য খুব জরুরীও বটে। কারণ, ভাঙলে সর্বপ্রথম আশ্রয়চু্যত হবে সে-ই। কিন্তু বড় সাহেব শহর থেকে এসে কেন বাড়ির সব গাছপালা পানির দরে বিক্রি করে গেলেন তা বোঝা যাচ্ছে না। বাড়ি যদি না-ই ভাঙবে তাহলে গাছপালা বিক্রি করার দরকার কি? গাছপালা না থাকলে বাড়ির কোনো শ্রী-ছাঁদ থাকে নাকি? তবে কি বড় সাহেব ধরেই নিয়েছেন _ লোকজনের এইসব বিশ্বাস মিথ্যা? পদ্মার গ্রাস থেকে বাড়ি বাঁচানো যাবে না? এই সব দেখে-শুনে মিনহাজের মনে সন্দেহ জেগেছে _ আসলে কোনটা সত্যি হবে! লোকে তাকে 'বুগদা' (বোকা, নির্বোধ) মিনা বলে ডাকে। জীবনের অনেককিছুই তার না বোঝা থেকে গেছে। এইসব সংশয়-সন্দেহ তার না বোঝা ঘটনার সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই না বোঝার জন্য জীবনে কম যন্ত্রনা পোহাতে হয়নি মিনহাজকে। জন্ম থেকেই তার কপাল খারাপ _ বাবাকে তার মনেই পড়ে না, মায়ের স্মৃতিও ধুসর। ছিলো এক ভাই _ বিয়ের পর সে-ও কেমন যেন হয়ে গেলো। তখন তাদের বাড়ি ছিলো _ ওই লেছড়াগঞ্জের কাছেই, অল্প কিছু চাষের জমিও ছিলো। আর কিছু না পারুক _ গাধার মতো খাটতে পারতো মিনা। ফলে কিছুটা আদর যত্ন পাওয়া যেতো ভাই-ভাবীর কাছ থেকে। সেই বাড়িটাও গেলো গাঙের পেটে। বাড়ি ভাঙার পর তারা এসে ঘর তুললো এই গ্রামে। ভিটের ওই জমিটুকু কিনতেই হালের গরু দুটো বিক্রি করতে হলো। চাষের জমি নাই, হালের গরু দিয়েই বা কি হবে _ পরের বাড়িতে কামলা দেয়া ছাড়া দুই ভাইয়ের আর কিইবা করার আছে এখন? কামলা হিসেবে মিনার বেশ ভালোই চাহিদা ছিলো _ তা তার ওই গাধার মতো খাটনির জন্যই _ কিন্তু সারা বছর সে কাজ পায় কোথায়? বিশেষ করে বর্ষাকালে _ যখন চারপাশে থৈ থৈ পানি, লোকজন হাতপা গুটিয়ে বসে থাকে, কি ছোলা ভাজা খায়, আর ইচ্ছে হলে মাছ-টাছ মারতে যায় _ সেখানে মিনাকে কাজ দেয় কে? ফলে ভাবীর মুখ ঝামটা খাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না _ 'বুইড়া গাধাডারে বসাইয়া খাওয়াইতে খাওয়াইতে আমার হাড্ডি কালা অইয়া গেলো। পাডাডা মরেও না।' তার মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করলেও আজরাইল তার কথা শোনে না। ভাই একবার চেষ্টা করেছিলো তাকে বিয়ে করিয়ে আলাদা করে দিতে। কিন্তু তার মতো বুগদা আবড়ের কাছে কেউই মেয়ে দিতে রাজি হয়নি। এভাবে বেশিদিন চলা যায় না, মিনহাজ তাই ঝগড়া করেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলো। কিন্তু বেরিয়ে এলেই তো হলো না, সে যাবেটা কোথায়? কে তাকে আশ্রয় দেবে? ওই সময় যদি বড় সাহেব তাকে ডেকে আশ্রয় না দিতেন তাহলে গলায় কলসি বেঁধে গাঙে ডুবে মরা ছাড়া তার গতি ছিলো না। শুধু আশ্রয়ই নয় _ একই সঙ্গে সে পেয়েছিলো বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব আর বছর ভর খোরাকির নিশ্চয়তা। ৮/১০ বিঘার ওপর বিশাল বাড়ি। আশেপাশের দশ গ্রামে এমন বাড়ি আর একটাও নাই। আনাচে কানাচে তরিতরকারি আর শাকসব্জি ফলিয়েই মিনার দিব্যি চলে যেতে পারে। সঙ্গে আছে বাড়ি ভর্তি নানা ফলমূলের গাছ। কোন গাছটা এ বাড়িতে নেই? আবার আম-জাম-কাঠাল-নারকেল-আতা-জাম্বুরা-পেপে-তাল-খেজুর-সুপারি ইত্যাদি নানান কিছু বিক্রি করলেও সাহেব কিছু বলেন না। সময় মতো এসে ফসল বিক্রি করা ছাড়া সাহেবরা আর অন্য কোনো কিছুর খোঁজই নেন না। ফলে মিনহাজের ভালোই চলে _ একে-ওকে দিয়ে-থুয়ে বছরে সে ২/৩ হাজার টাকা জমিয়ে ফেলে। একবার সে এই টাকা বড় সাহেবকে দিতে গিয়েছিলো; সাহেব খুব খুশি _ 'তুমি এতো টাকা জমাইছো মিনা। বাহ বাহ খুব ভালো। তা এইটা তুমিই রাইখা দাও। শখ-আহ্লাদে খরচ কইরো।' মিনা ভেবেই পায়না এতোগুলো টাকা কিভাবে সাহেব তাকে এক কথায় দিয়ে দিলেন! তখন তার মনে পড়েছিলো _ এরা তো মানুষ না, ফেরেশতা। সরাসরি আসমান থেকে নেমে এসেছে। আর এরকম হবেই বা না কেন? দেখতে হবে না, কাদের রক্ত এদের গায়ে! শুধু তো বড় সাহেবই না, তার ছোট ভাইবোনগুলো _ এমনকি তাদের ছেলেমেয়েগুলো পর্যন্ত একেবারে ফেরেশতার মতো। নইলে এরা তো শহরে থাকে, দেখতে-শুনতেও একবারে রাজপুত্র-রাজকন্যাদের মতো, কিন্তু গ্রামে এসে মানুষের সঙ্গে এমনভাবে মেশে যে বছরে একবার এলে তার ঘোর সারা বছরেও গ্রামের মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারে না। আর তাকে যখন মিনা ভাই ও মিনা ভাই বলে ডাকে তখন একেবারে বুক জুড়িয়ে যায়। আহা এমন মিষ্টি ডাক _ পৃথিবীর কেউ কোনোদিন শোনেনি। তো, এইসব সুখ-সন্তুষ্টি নিয়ে তার দিন ভালোই কাটছিলো। তা হারামজাদা গাঙ, কেবল আসছে তো আসছেই, আসতে আসতে এই বাড়ি পর্যন্ত ধরে ফেলেছে _ তবু তার খিদে মেটে না।

লোকজনের কথায় সে বিশ্বাস রেখেছে যে এই বাড়ি ভাঙবেনা। হুজুররাই ফিরিয়ে দেবেন। তারা তো আর সত্যিই মরেন নাই, মরলে তো আর তাদের মাজারে দুধ ঢাললে আসমানে মেঘ জমতো না! কিন্তু মনের মধ্যে এতো কু-ডাক ডাকে কেন? থেকে থেকে কেন মনে হয় ওই রাক্ষুসি পদ্মা এই হুজুরদেরও মানবে না? এই কথা মনে এলে অবশ্য সে শিউড়ে ওঠে; ভাবে তার মনের কথা আবার হুজুররা টের পেয়ে যাচ্ছেন না তো? তাহলেই সর্বনাশ। কিন্তু এই যে বড় সাহেব বাড়িতে এসে গাছপালা বিক্রি করে দিলেন, আবার যাওয়ার সময় কবরস্থানের কাছে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করে গেলেন _ এই বিষয়টা তাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। শুধু বড় সাহেব কেন, অন্য সবাই-ও তো মুখ অন্ধকার করে রেখেছে! বাড়ি এসেছে প্রায় সবাই _ মেজ, সেজ, ছোট সাহেব, এই বুড়ো বয়সেও সাহেবদের মা, বড় আর মেজ সাহেবের ছেলেমেয়েরা। সবার চোখেই পানি। বাড়ি যদি নাই ভাঙবে তাহলে এরা কাঁদে কেন _ মিনহাজ তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না।

৩.

এই বাড়িতে জন্ম হয়েছে বলে মাঝে মাঝে আমার খুব গর্ব হয়। এ বাড়ির ছেলে _ একমাত্র এই যোগ্যতায় মানুষের কাছে যে সম্মান-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা পেয়েছি তা যে কারো জন্যই কল্পনাতীত বিষয়। কিন্তু আমার এই গৌরববোধ নিরংকুশ নয়, আছে অপরাধবোধও। মনে হয় যেন অন্যায়ভাবে মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি _ তেমন কোনো যোগ্যতাই আমাদের নেই। আমার দাদা ছিলেন পীর। মানুষের কাছে তাঁর পরিচয় _ বড় মৌলবী হিসেবে। আমার বাবা ছোট মৌলবী আর বাবার দাদা হচ্ছেন দাদা হুজুর। বোঝাই যাচ্ছে আমার পূর্বপুরুষেরাও একই রকমভাবে মানুষের কাছ থেকে সম্মান-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা পেতে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু এ নিয়ে আমার মধ্যে সংশয় ও প্রশ্ন আছে। এই যে আমাদের বিপুল সম্পত্তি _ এগুলোর উৎস কি? যতোদূর জানি এই অঞ্চলে আমরা বহিরাগত _ দাদা এসে এখানে বাড়ি করেছিলেন। তার আগে কয়েকপুরুষ ধরে তারা ছিলেন ফরিদপুরের বাসিন্দা। সেই আদি নিবাসও পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়লে নদী পাড়ি দিয়ে এসে এপাড়ে বাড়ি করেন দাদা। তখন পদ্মা ভাঙতো ওই পাড়ে, এখন ভাঙে এই পাড়ে। তো একটি ভাঙনকবলিত পরিবার কিভাবে এতো বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হলো? দাদা বা বাবার কোনো সুনির্দিষ্ট পেশা ছিলো না বলেই তো জানি। তার মানে কি এই নয় যে, ভক্তদের দান ও নজরানায় সঞ্চিত হয়েছে এই সম্পত্তি যা আমার নির্লজ্জভাবে ভোগ করছি? তবু ভালো যে আমরা তাঁদের ধারাটি অনুসরণ করিনি। এজন্য অবশ্য বাবাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত। তিনিই প্রথম বড় ভাইকে আধুনিক শিক্ষার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন _ বড় ভাই আবার সেটাই কন্টিনিউ করেছেন আমাদের মধ্যে। বাপদাদার পথ অনুসরন না করায় আমরা কেউ আর 'মৌলবী' নই _ 'সাহেব'। এমন কি আমি তো কেবলমাত্র ইউিিনভার্সিটিতে পড়ছি, তাও লোকজনের কাছে 'ছোট সাহেব'। আমাদের এই পথচু্যতি বা পদচু্যতি নিয়ে লোকজনের মধ্যে অভিযোগ ও অসন্তোষ আছে, যদিও তা থাকা উচিত ছিলো আমার পূর্বপুরুষদের প্রতি। তা তো নেই-ই উল্টো এঁদের উপস্থিতিকে তারা সৌভাগ্য বলে মানে। কিছু অদ্ভুত-উদ্ভট-অযৌক্তিক বিশ্বাস তারা লালন করে। যে কোনো বিপদ থেকে এঁরা তাদেরকে রক্ষা করবেন বলে আস্থা পোষণ করে তারা। এই যেমন নদী ভাঙনের বিষয়টি। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস _ পদ্মা এই বাড়ির সীমানায় এসে থেমে যাবে। কারণ খিজির নামে যে নবী পানির নিচে বসে ফেরেশতাদেরকে দিয়ে এই ভাঙন কার্য চালান তিনি এদের বন্ধু! অতএব বন্ধু হয়ে বন্ধুর কবর তিনি ভাঙতেই পারেন না।

নদীর ভাঙন পুরোপুরি একটা ভূতাত্তি্বক বিষয় _ এখানে অলৌকিক কোনো ব্যাপার নেই। নদীর স্রোত যেখানে প্রবল সেখানে ওই স্রোতের জন্যই মাটি ক্ষয়ে যায়, ফলে ওপরের মাটি হয়ে পড়ে অবলম্বনহীন। যতোদূর জানি এই হচ্ছে নদী ভাঙনের সাধারণ ব্যাখ্যা। কিন্তু এই কথা এই লোকগুলোকে কে বোঝাবে? এই ভাঙন ফেরানো যেতে পারে একটি মাত্র বাঁধ দিয়ে স্রোতের মুখটিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলে। খিজির (আঃ)-এর জন্য বসে থাকার কোনো দরকারই নেই। বাংলাদেশের আরো অনেক জায়গায়ই নদী ভাঙে _ অনেক জায়গায় বাঁধ দিয়ে সেই ভাঙন ফেরানোও সম্ভব হয়েছে। দেখা যাচ্ছে মানুষের তৈরী একটি বাঁধ দেখেই প্রবল প্রতাপশালী খিজির নবী তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ সহ সটকে পড়েন। বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলের এমপি, মন্ত্রী এমনকি প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করা হয়নি। একটি বাঁধ হলে শুধু ভাঙন রোধই নয়, এই বিপুল সংখ্যক মানুষ একটি উদ্ভট বিশ্বাস থেকে মুক্তি পেতো। হয়তো আর দু'একদিনের মধ্যেই এই কবরগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। যাবেই। নদীর তীব্র স্রোতই বলে দিচ্ছে _ এই ভাঙন সহসা থামবে না। ঘটনাটা হাজার হাজার মানুষের জীবনে কী ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে ভেবে শিউরে উঠছি। একটি অলৌকিক ঘটনা তাদেরকে সমূহ সর্বনাশ থেকে রক্ষা করবে বলে তারা অপেক্ষা করেছে, গভীর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছে এই মৃত মানুষগুলোর প্রতি _ এর পরিণাম কি?

পদ্মা ইতিমধ্যে আমাদের বাড়ির সীমানা ছুঁয়েছে। বাড়িটা বিশাল, প্রায় ১০ বিঘার ওপর। পুরোটা ভাঙতে সময় লাগবে। উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি এই বাড়িটার দক্ষিণ দিক থেকে ধেয়ে আসছে এক ভয়ংকর দানব _ পদ্মা _ যে বাছবিচারহীনভাবে সব নিজের পেটে নিয়ে নেয়। প্রথমেই ভাঙবে মসজিদ। তারপরই আমাদের পারিবারিক কবরস্থান _ যেখানে শুয়ে আছেন এই কথিত মহাপুরুষেরা।

ছোটবেলায় এই ভাঙন দেখতে যেতাম অনেক দূরে। মজা লাগতো। তখন বুঝিনি মানুষের এতো হাহাকারের অর্থ কি! এখন নিজেদের বাড়ি ভেঙে যাচ্ছে বলেই হয়তো অনুভব করছি। বৈষয়িক ক্ষতির একটা দিক তো আছেই। এই যে আমাদের বিরাট বাড়ি আর প্রচুর জমিজমা, ভেঙে গেলে একটা বিপর্যয় তো ঘটবেই। এই জমির ফসল দিয়ে আমাদের সারা বছর চলেও উদ্বৃত্ত থাকতো। যদি আমরা ঢাকায় সেটেলড না হয়ে এখানেই থাকতাম তাহলে এই ভাঙন আমাদেরকে ভিখারীতে পরিণত করতো। দাঁড়াবার একটা জায়গাও থাকতো না। গ্রামের সব মানুষের পরিণতি এই-ই হয়। সম্পন্ন সচ্ছল কৃষক বাড়িঘরজমিজমা হারিয়ে দরিদ্র দিনমজুরে পরিণতি হয়। আমরা শহরবাসী বলে এই সমস্যা থেকে বেঁচে যাবো ঠিকই কিন্তু অন্যরকম একটি যে ক্ষতি আমাদের হয়ে যাবে _ তার ক্ষত কোনোদিন মুছবে না।

এই বাড়িতে আমার জন্ম। শুধু আমার কেন _ সব ভাইবোনেরই। আরো দূরে গেলে বলতে হয় আমার বাবার জন্ম-বিয়ে-মৃতু্য সবই এই বাড়িতে। দাদীও নতুন সংসার শুরু করেছিলেন এই বাড়িতেই। এক দীর্ঘ ইতিহাস যেন _ প্রায় শতবর্ষের।

আমার এং ভাইবোনদের শৈশব কৈশোর কেটেছে এখানে। কতো যে স্মৃতি আমাদের, এই বাড়ি ঘিরে। কতো স্বপ্ন, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা। এ বাড়ির প্রতিটি গাছ আমার চেনা, প্রতিটি ধূলিকণা আমার আপনজন। আমার শেকড় প্রোথিত হয়ে আছে এই গ্রামে। প্রতিটি মেঠোপথ, প্রতিটি পাখি, গাছের পাতা, মাঠ, নদী এবং মানুষ আমাকে আলিঙ্গন করে নেয় গভীর মমতায়। এই প্রগাঢ় মমতা আর তুমুল ভালোবাসা আমি আর কোথায় পাবো? এই বাড়ি, এই গ্রাম ছিলো আমাদের আশ্রয়। শহরের জটিল বাস্তবতা, কঠিন জীবনযাপন ছেড়ে এই বাড়িতে এলে এক গভীর প্রশান্তিতে মন ভরে যেতো। বাড়িভাঙা তাই শুধু বৈষয়িক ক্ষতিই নয়, বরং শেকড় থেকে উৎখাত হয়ে যাওয়া, শৈশব-কৈশোরের স্বপ্ন-স্মৃতি-ভালোবাসা হারিয়ে ফেলা। এই হারানোর কষ্ট কাউকে বোঝানো যাবে না। যার বাড়ি নেই তার আসলে কিছুই নেই। আমাদের আর কোনো স্থায়ী ঠিকানা থাকবে না এখন থেকে, ফেরার কোনো জায়গা থাকবে না _ এ যে কী প্রবল নিঃস্বতা, কে-ই বা তা বুঝবে? হয়তো কালই বাবার কবরটা চলে যাবে নদীতে। মনে হচ্ছে এতোদিন পরে সত্যিই বাবাকে হারাচ্ছি আমরা।

৪.

সকাল হতে না হতে একটা স্বপ্ন বৃত্তান্ত লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।

কানুর মা স্বপ্নে দেখেছে _ বড় মৌলবী আর ছোট মৌলবী সাহেবের মধ্যে তর্ক হচ্ছে। বড় মৌলবী আর এখানে থাকতে চান না _ এ অঞ্চলের মানুষ বড় বেশি পাপ করে, তিনি তাই অন্য কোথাও চলে যেতে চান। অন্যদিকে ছোট মৌলবী এখানেই থাকতে ইচ্ছুক _ এখানকার মানুষ যতো পাপীই হোক _ এ হচ্ছে তাঁর বাড়ি, তাঁর গ্রাম। আর তাছাড়া যাবেনই বা কোথায় _ কোথায় পাপ নাই?

বাতাসের বেগে এই স্বপ্ন্নবৃত্তান্ত ছড়িয়ে পড়লে লোকজনের একমাত্র আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ালো তা। দুশ্চিন্তা, আশংকা এবং একইসঙ্গে আশাবাদ তাদেরকে বিমূঢ় করে তুললো। বাপ-বেটার এই তর্কে বাপ যদি জিতে যায় তাহলে আর রক্ষা নাই। তাঁরা তো যাবেনই _ যাবে সবকিছুই। অন্যদিকে বেটা জিতে গেলে বলা যায়, তাঁরা থাকবেন _ থাকবে এই গ্রামও। কিন্তু কে জিতবে তা বলা মুশকিল। দাদা হুজুরের কোনো মতামত পাওয়া গেলে খানিকটা নিশ্চিত হওয়া যেতো। যদি তিনি ছোট মৌলবী মানে নাতীর পক্ষে থাকেন তাহলে বড় মৌলবী নিশ্চয়ই বাপবেটা দুজনকে ফেলে চলে যাওয়ার কথা ভাববেন না। কিন্তু এই অবস্থায় তাদের করনীয় কি? এই এতো বছর পরও হুজুর তাদের ওপর রেগেই আছেন, সেই রাগ ভাঙানোর জন্য কি করা যায়? তারা তো তাদের যাবতীয় শোকে-দুঃখে, উৎসবে-আনন্দে, বিপদে-আপদে সবার আগে বড় মৌলবীকেই স্মরণ করে। নবদম্পত্তিরা সবার আগে তাঁর কবর ছুঁয়ে সালাম করে যায়, নবজাতককে এনে তার পায়ের কাছে কিছুক্ষণ শুইয়ে রাখা হয়, অসুস্থ লোকজন তাঁর কবর থেকে কিছুটা মাটি তুলে পরম শ্রদ্ধা ভরে নিজেদের গায়ে মেখে নেয় আরোগ্য লাভের আশায়, এমনকি সদ্যমৃত কাউকে কবর দেয়ার আগে কিছুক্ষণ তাঁর পায়ের কাছে শুইয়ে রাখা হয় _ যেন মৃত লোকটি কবরের আজাব থেকে মুক্তি পেতে পারে, যেন কেয়ামতের দিন হুজুরের সুপারিশে তার বেহেশত নসিব হয়! সমস্ত কাজে তারা কায়মনোবাক্যে হুজুরের সুদৃষ্টি কামনা করে। তবু তাঁর রাগ পড়লো না! অন্যদিকে ছোট মৌলবী তো সারাজীবন তাদেরকে ধমক দিয়ে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, অথচ এই চরম বিপদের মুহূর্তে তিনিই কীনা তাদের পক্ষে দাঁড়ালেন!

লোকজন জটলা পাকিয়ে এইসব আলোচনা করে। হাটে-বাজারে, মাঠে-ঘাটে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বাড়ির ভেতরে-বাইরে কেবল এই একই বিষয়। অতপর বিনা নোটিশে একত্রিত হয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয় _ যেতে হবে বড় মৌলবীর কাছে, জারে জারে কাঁদতে হবে, মাফ চাইতে হবে, আকুল মিনতি জানাতে হবে _ যেন তিনি চলে না যান। চলে গেলে তারা যে অভিভাবকহীন-এতিম-অসহায় হয়ে যাবে _ এই কথাটি কি হুজুর বুঝবেন না!


৫.

অবশেষে এই বাড়িও ভাঙতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই মসজিদের অর্ধেক অংশ চলে গেছে, তারপরই কবরস্থান। আমরা দাঁড়িয়ে আছি আশেপাশেই। এই তো শেষ দেখা। মনে হচ্ছে এতোদিন যেন বাবা দাদা দাদী _ এরা সবাই ছিলেন। অন্তত কবরটা দেখলেও খানিকটা শান্তি পাওয়া যেতো। আজই চলে যাবে সব _ এই সর্বগ্রাসী নদীর গর্ভে। আমরা সবাই সেই দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। এ এক করুণ, মর্মান্তিক, ভয়াবহ অপেক্ষা। কোনো সন্দেহ বা সংশয় নেই _ আজই বাবার কবরটা শেষবারের মতো দেখতে পারবো। মাথা কুটে মরে গেলেও আর কোনোদিন দেখা হবে না। মার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। বুক ভেঙে আসছে। তার কষ্ট না জানি কতো তীব্র! এই বাড়িতে তিনি নতুন বউ হয়ে এসেছিলেন, নতুন সংসার শুরু করেছিলেন, সন্তানদের জন্ম দিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে মার প্রায় অর্ধশতাব্দীর সংসার। তাঁর মৃতু্যর পর আমরা মাকে ঢাকায় নিয়ে গেছি। তবু তিনি মাঝে মাঝেই বাড়ি আসার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। এখানে তো কেউ নেই, কিছু নেই, তবু কেন এখানে আসার জন্য তাঁর এই আকুলতা? এই প্রশ্নের উত্তর মিলতো যখন দেখতাম, তিনি এসে বাবার কবরের পাশে চুপ করে বসে আছেন। আজ থেকে তাঁর সেই জায়গাটিও আর থাকবে না।

হঠাৎ চোখে পড়ে শত শত মানুষের মিছিল _ এ বাড়ির দিকেই আসছে। কী চায় তারা? নাকি আমাদের মতো তারাও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হতে চায়? অচিরেই আমার ভুল ভাঙে। মানুষগুলো এসে আছড়ে পড়ে। তাদের হাহাকার-আহাজারি-কান্নাকাটি-আকুতি-মিনতিতে বাড়ির বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। বোঝা যাচ্ছে, তারা সবাই দাদার কাছে মিনতি জানাচ্ছে যেন তিনি এদেরকে ফেলে চলে না যান। পরিস্থিতি এতোটাই বিহ্বল হয়ে উঠেছে যে আমাদেরকে বিমূঢ় হয়ে যেতে হচ্ছে। মানুষের এই অবিরল কান্নায় সবারই চোখ ভিজে উঠেছে। দেখি _ মা কাঁদছেন, ভাইরা কাঁদছে, ভাইয়ের ছেলেমেয়েগুলো কাঁদছে, কাঁদছে মিনা ভাইও। এমনকি যে আমি বাবার মৃতু্যতেও কাঁদতে পারিনি, এখন চোখ শুকনো রাখতে পারছি না।

ঈশ্বর বা আল্লাহ বলতে সত্যিই কেউ আছেন কীনা এ নিয়ে আমার সংশয় আছে। থাকলেও তিনি কি মানুষের হাহাকারে বিচলিত হন? বাবা বলতেন _ 'বান্দা যেখান থেকে যেভাবেই ডাকুক না কেন, আল্লাহ সেই ডাকে সাড়া দেন।' যদি তাই-ই হয়, তাহলে এই যে শত শত মানুষের আহাজারি _ তিনি কি এসব শুনছেন না? মানুষ যে নিখুঁত নিরাকার ঈশ্বরের কল্পনা করে তাঁর অসাধ্য তো কিছুই নেই। তিনি কি পারেন না স্রোতের মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে? যিনি সব পারেন এই সামান্য কাজটুকু কেন পারবেন না?

হে ঈশ্বর, নিজের সংশয়ের কথা পুরোপুরি ভুলে গিয়ে আমি মনে মনে বললাম, তুমি আমাদের রক্ষা কর। পদ্মার স্রোত তুমি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দাও, গতিবেগ কমিয়ে দাও।

আজকে সকালেই একটা স্বপ্নবৃত্তান্ত শুনেছি, হয়তো সেজন্যই ক্রমাগত মানুষ আসছে _ হাজার হাজার, কেউ নৌকা দিয়ে নদীপথে, কেউ পায়ে হেঁটে। যেন দশ গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়েছে এখানে। যেন আজ তারা তাদের বড় মৌলবীকে কিছুতেই এখান থেকে যেতে দেবে না।

৬.

চারদিকে এখন একই আলোচনা। মৌলবী বাড়ি ভাঙছে না। গত তিনদিন ধরে পদ্মা এসে থমকে দাঁড়িয়েছে বড় মৌলবীর কবরের কাছে। মসজিদটা ভেঙে গেছে, কিন্তু কবর ভাঙছে না। এখনও পুরোপুরি শংকামুক্ত না হলেও মানুষের প্রত্যাশা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। উত্তেজনায়-আবেগে-কৃতজ্ঞতায় মানুষের চোখে পানি ঝরছে। বড় মৌলবী তাদের মিনতি শুনেছেন _ এরচেয়ে বড় আনন্দের ঘটনা যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে আর ঘটে নি।

৭.

অবশেষে করুণ মর্মান্তিক প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। আজ সকালে ভেঙে গেছে বাবার কবর। কয়েকদিন অবশ্য বেশ উত্তেজনা ছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন সত্যিই অলৌলিক ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে আমি সবসময়ই সন্দিহান ছিলাম _ থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে _ এরকম একটা দোদুল্যমান অবস্থান ছিলো আমার, কিন্তু অলৌকিক ঘটনার প্রতি আমার কখনোই কোনো বিশ্বাস ছিলো না, তখন মনে হচ্ছিলো তবে কি সত্যিই তেমন একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি? বিস্ময়কর ভাবে তিনদিন পদ্মার ভাঙন থেমে ছিলো। অথচ থামার কথা নয়। খুব লক্ষ্য করে দেখেছি, স্রোতের দিক কিংবা বেগ পরিবর্তিত হয়নি। তবু কেন ভাঙছে না _ বোঝা যাচ্ছিলো না। লোকজন ধরেই নিয়েছিলো পদ্মার দৌরাত্ন শেষ। কিন্তু আমি সংশয়মুক্ত ছিলাম না। অপেক্ষা করছিলাম _ সেই করুণ, মর্মান্তিক অপেক্ষা _ কখন বাবার কবরটা ভেঙে যাবে। এর পাশাপাশি ক্ষীণ একটা আশাও যে মনের মধ্যে জাগেনি তা নয় _ মনে হচ্ছিলো হতেও তো পারে যে, সত্যি পদ্মা আর এগুবে না!

অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান হলো।

আমরা দাঁড়িয়েছিলাম কাছেই। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। আমার সকল পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন চলে যাচ্ছে নদীগর্ভে _ তাও দাঁড়িয়ে দেখতে হচ্ছে! সবগুলো কবর বাঁধানো ছিলো বলেই ব্যাপারটা ভালোভাবে বোঝা গেলো _ একসঙ্গে ভেঙে পড়লো পদ্মায়। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন 'আমার তো কিছুই রইলো না বাবা, আমি আর কি নিয়ে বাঁচবো?' _ হা কিছুই রইলো না আর, এ এক ভয়াবহ শূন্যতা। স্মৃতিচিহ্ন নেই, শেকড় নেই, একজন মানুষের তাহলে আর থাকেটা কি?

কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না, তবু হয়তো শেষ পর্যন্ত বহু মানুষের মতো আমরাও আশা করেছিলাম। কেন তিনদিন কবরগুলো ভাঙেনি এখন বুঝতে পারছি। নদী দুইরকমভাবে ভাঙে। ছোট ছোট টুকরো করে, আবার একসঙ্গে অনেকখানি অংশ নিয়ে। সেটা নির্ভর করে মাটির অবস্থার ওপর। প্রত্যাশা এতোটাই গভীর হয়ে উঠেছিলো যে, এই সাধারণ চিন্তাটুকুও মাথায় আসেনি। আর সেজন্যই এখন শূন্যতাটা আরো প্রখর হয়ে বুকে বাজছে।

কালকেই আমরা চলে যাবো _ চিরদিনের জন্য। ফেরার আর কোনো উপায়ই রইলোনা আর। আক্ষরিক অর্থেই উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম আমরা। আমাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা আর রইলো না। ঢাকার ভাড়া বাসা কি আর কখনো নিজের ঠিকানা হয়!

কী যে খারাপ লাগছে সব কিছুর জন্য। এই চেনা পথঘাট-নদী-গাছ-পাখি আর মানুষগুলোর সঙ্গে কোনোদিন দেখা হবে না। আমার শৈশব-কৈশোর রেখে গেলাম এখানে _ আর কোনাদিন ফেরা হবে না।

এইসব মানুষ, যাদের কাছে পেয়েছি অযাচিত সম্মান আর ভালোবাসা; যেন একেকজন রাজপুত্র আমরা, শহরে আমাদের কে-ইবা চেনে, অথচ এখানে দশ গ্রামের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি বারবার _ এদেরকেও চিরদিনের জন্য হারাতে হচ্ছে। আর মিনা ভাই। অদ্ভুত একজন মানুষ। আত্নীয়ের চেয়েও বেশি কিছু সে। বলতে গেলে আমি তার হাতের ওপরই বড় হয়ে উঠেছি। কতো দাবি-দাওয়া, আহ্লাদ-আব্দার হাসিমুখে পূরণ করেছে সে। আজ আর তার কিছুই রইলো না। বোকা-সোকা লোকটাকে বরাবর হাসিখুশিই দেখেছি, কিন্তু এখন কেমন বিষণ্ন-স্তব্ধ হয়ে আছে।

কবরগুলো ভেঙে যাওয়ার পর মানুষের হাহাকার দেখে কান্না এসে গেছে _ সারাদিন ধরে মানুষের সমাগম ঘটেছে বাড়িতে। আমরা চলে যাচ্ছি, আর ফিরবো না _ এই দুঃখে নতুন করে ডুকরে উঠেছে তারা। মিনতি জানিয়েছে _ যেন আমরা তাদেরকে ভুলে না যাই, যেন দেখতে আসি _ তাদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে আমাদের সর্বোচ্চ সমাদর করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা! কিন্তু জানি _ এখানে আর ফেরা হবে না আমাদের। কোথায় ফিরবো, কার কাছে? এই হাহাকার করা শূন্যতার ভেতরে দুঃখ সঞ্চয় করতে কেনই বা আসবো আবার?

৮.

বাড়িটা খালি হয়ে গেছে সকালেই। খা খা বাড়িতে মিনহাজ একা। সারাদিন ধরে আরো কিছু অংশ ভেঙে গেছে। সপ্তাহখানেক লাগবে পুরোটা ভাঙতে। ততো দিন মিনহাজ এখানেই থাকবে বলে মনস্থির করেছে। গাছপালা কিছু নেই, নেড়ে হয়ে গেছে বাড়িটা, কিন্তু দালানটা তো আছে _ সেটা ফেলে রেখে সে যায় কিভাবে? কিন্তু আর কদিন পর যখন এটাও ভেঙে যাবে তখন সে যাবে কোথায়? সে জানে না। আজকে সারাদিন ধরে শুধু এই কথাই ভেবেছে মিনহাজ। সকালে সবাই বিদায় নেবার সময় সে হাউমাউ করে কেঁদেছে কিন্তু তারপর থেকে এই একটিই চিন্তা। সে যাবে কোথায়?

এখন রাত। পদ্মার তুমুল গর্জনে ঘুমানো যাচ্ছে না। তার ওপর বৃষ্টি। মিনহাজ শোয়া থেকে উঠে একটা বিড়ি ধরায়। দরজা খুলে বারান্দায় এসে এক কোনায় প্রস্রাব করতে বসে। বৃষ্টির ছাঁট আর পদ্মা থেকে উঠে আসা শীতল দমকা হাওয়ায় সে কেঁপে ওঠে। তবু বসেই থাকে মিনহাজ।

থেকে থেকে কাশি উঠছে। বৃদ্ধ বুকের কফ উঠে আসে কাশির সঙ্গে। তবু বসে বসে বিড়ি টানে মিনহাজ আর বৃষ্টিতে ভেজে। কোথায় যাবে সে এবার, ভেবেই পাচ্ছে না।

অদূরে পদ্মার রাগী, তুমুল, ভীতিকর তর্জন-গর্জন।

'এতো খাইলি তাও তোর রাগ গ্যালো না _ হারামজাদা গাঙ! আর কী চাস তুই _ মৌলবী সাবগো কবরগুলানও খাইলি। আর কি চাস? কী খাইলে তোর প্যাট ভরবো রে _ খানকি মাগী গাঙ? কী খাইবার চাস? ক আমারে।' _ মিনহাজ এবার আকুল হয়ে কাঁদছে _ 'ক তুই। আমারে চাস, আমারে খাইতে চাস, ক রে মাগী, তুই আমারে খাইতে চাস?'



রচনাকাল : অক্টোবর, ২০০০