ঘটনাটি শুরু হয়েছিলো কবীরুল আলমের ঘর থেকেই। সেদিন, টিভিতে সম্ভবত
নাটকের কোনো একটি করুণ দৃশ্য দেখতে দেখতে তার স্ত্রী, শারমীন
সুলতানা, হঠাৎ বলে উঠেছিলো- 'জানো, আমি আর আগের মতো কাঁদতে পারি
না। আগে কতো সহজে কেঁদে ফেলতাম! নাটক-সিনেমা দেখতে দেখতে কাঁদতাম,
বই পড়তে পড়তে কাঁদতাম, কারো কাছে কোনো করুণ গল্প শুনলেও আমার চোখ
ভিজে উঠতো। অথচ এখন বুক ভারি হয়ে থাকে, চোখ জ্বালা করে কিন্তু
কিছুতেই চোখে পানি আসে না। কাঁদতে খুব ইচ্ছে করে, জানো! মনে হয়,
কাঁদতে পারলে ভালো লাগতো। বাবা মারা গেলেন- এমন অপ্রত্যাশিত-হঠাৎ
মৃতু্য, অথচ আমি আজ পর্যন্ত একটুও কাঁদতে পারলাম না।' বলতে বলতে
তার গলা ভারি হয়ে উঠেছিলো, আর কবীর একটু অবাক হয়ে বউয়ের দিকে
তাকিয়ে দেখেছিলো- শারমীনের চোখ লাল হয়ে উঠেছে, আর সেই লালের আভা
ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত মুখমণ্ডলে। সে কিছু বলতে পারেনি। কান্নার
ব্যাপারটাই যে ভীষণ ব্যক্তিগত, এতটাই ব্যক্তিগত যে, এ নিয়ে কথা বলা
চলে না। কে যে কখন কাঁদবে, কেন কাঁদবে, এটা সম্ভবত সে নিজেও জানে
না।
বাবার মৃর্তুতে শারমীনের একেবারেই না কাঁদার ব্যাপারটা অবশ্য কবীর
আগেই খেয়াল করেছে, অবাকও হয়েছে। এমনকি ওর ভাইবোনেরা যখন বারবার
বলছিলো- 'কবীর ভাই ওকে একটু কাঁদান, ও তো বুক ফেটে মরে যাবে!'
-
তখনও তার পক্ষে শারমীনকে কাঁদানোর উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়নি। মানুষকে
আবার কাঁদায় কিভাবে, যদি সে নিজে না কাঁদে! এইসব বিষয়ে কবীর খুব
অসহায় বোধ করে, বড়জোর কারো কাঁধে একটু হাত রেখে সহমর্মিতা জানায়।
তাতে যদি শোকার্ত মানুষটি বোঝে তো ভালো, না বুঝলে তার কিছুই করার
থাকে না। শারমীন অবশ্য বোঝে, কবীরের কথার চেয়ে তার এক্সপ্রেশনটাই
শারমীন বেশি বোঝে। তো, কান্নার মতো এমন একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার যে
কিছুদিন পর এক জাতীয় বিষয়ে পরিণত হবে, উঠে আসবে মানুষের নিত্য
আলোচনায়- কবীর তখন ভাবতেও পারেনি। আসলে ভাবার মতো সময়ও ছিলো না
তার- সে তখন টেলিভিশনের মধ্যরাতের লাইভ টক-শো গুলোর একটিতে যাবার
জন্য তৈরি হচ্ছিলো। এটি এখন তার দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে গেছে। এক
সময়ের তুখোড় তাত্তি্বক সে- আশির দশকের সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র
আন্দোলনের পুরো সময় জুড়ে পরিস্থিতির নানামাত্রিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
করে যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করতো সে, তার প্রায় শতকরা পচানব্বই ভাগ মিলে
যেত বলে বন্ধুদের কাছ থেকে এই উপাধি লাভ করেছিলো- এতদিন প্রায়
চুপচাপ কাটিয়ে এখন হঠাৎ করেই যেন সরব হয়ে উঠেছে। শুধু টেলিভিশনে
নয়, পত্রপত্রিকায়ও। এতদিন কথা বলার কোনো তাগিদ সে নিজের ভেতরে
অনুভব করেনি, কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে- চুপ করে থাকার সময় এটা নয়,
থাকলে সে নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে যাবে।
হয়তো দীর্ঘ বিরতির কারণেই, তার মধ্যে এক বিপুল ক্ষোভ জমেছিলো। ফলে,
যখন সবাই কেবল মৃদু সমালোচনা আর প্রকাণ্ড আশাবাদের তুবড়ি ছোটাচ্ছে
তখন একমাত্র কবীরই তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। এইরকম কঠোর
সমালোচনায় টক-শো গুলো জমজমাট হয়ে ওঠে। কখনো কখনো এতটাই কঠোর হয়ে
ওঠে তার বক্তব্য যে, কতৃপক্ষের কাছে তা রীতিমতো বিপদজনক বলে মনে
হয়। বিব্রত উপস্থাপক হয়তো তখন একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলেন- 'আপনি
উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন কবীর ভাই, তারচেয়ে বরং চলুন এমন একটি বিষয়
নিয়ে কথা বলি যা আপনার উত্তেজনা প্রশমন করবে! বাংলাদেশের অমুক
চলচ্চিত্রটি অমুক দেশের অমুক উৎসবে তমুক পুরস্কার লাভ করেছে, এ
বিষয়ে যদি কিছু বলেন!' দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে
উদ্বিগ্ন একজন সংবেদনশীল নাগরিকের 'উত্তেজনা প্রশমনের' জন্য
চলচ্চিত্র পুরস্কারের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানোর এমন সুস্পস্ট
অপমানেও কবীরুল আলম বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না। উপস্থাপকের চেয়ে
সে-ও কম চতুর নয়, সে-ও মুচকি হেসে বলে- 'এটা উত্তেজনার প্রশ্ন নয়।
আমি কোনো অযৌক্তিক কথা বলছি না। আপনার যদি এসব কথার বিরুদ্ধে কোনো
যুক্তি থাকে সেটাও বলতে পারেন।' এবং কবীর তখন 'লাইভ শো'র একটা
সুযোগ গ্রহণ করে। যেহেতু এডিট করার কোনো সুযোগ নেই, কথাগুলো
সরাসরিই দর্শকদের কাছে পেঁৗছে যায়, সে তাই বলে ফেলে - 'এই যে
আপনারা নৈশকালীন সমস্যা সমাধান প্রকল্প খুলেছেন, আর আমরা এসে দেশের
তাবৎ সমস্যার সমাধান বাতলে দিচ্ছি, আশাবাদের আলো জ্বালিয়ে হাসিমুখে
ঘরে ফিরছি, এটা আসলে দর্শকদেরকে আরামে ঘুম পাড়ানোর একটা ব্যবস্থা।
এসব সমাধান আর আশার আলো দেখে তারা নিশ্চিত মনে ঘুমোতে যান, কিন্তু
সকালে উঠেই টের পান- কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি, সহসা হবারও কোনো
সম্ভাবনা নেই। আপনি যে আলোচনাটিকে ঘুরিয়ে চলচ্চিত্রের দিকে নিয়ে
গেলেন এটাও ওই একই উদ্দেশ্য। যেন ভালো ভালো কথা দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ
করা যায়। এন্টারটেইনমেন্ট! সেটাই আপনাদের মূল লক্ষ্য। যাহোক,
বাংলাদেশের যে কোনো সাফল্যে আমি আনন্দিত হই। অমুক চলচ্চিত্র
পুরস্কার লাভ করেছে এজন্যও আমি আনন্দিত।' হতকচিত উপস্থাপক অবশেষে
নিজেই আশাবাদের কথা শুনিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন।
কবীরুল আলম টেলিভিশনওয়ালাদের একাধিকবার এইরকম বিপদে ফেলেছে, কিন্তু
তারপরও তাকে বয়কট করা সম্ভব হয়নি। কারণ, দর্শকরা চিঠি লিখে, ফোন
করে, ই-মেইল করে, এসএমএস পাঠিয়ে কবীরুল আলমের প্রতি তাদের মুগ্ধতা
এবং সমর্থন প্রকাশ করেন এবং তাকে নিয়মিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ
জানানোর অনুরোধ করেন। তাছাড়া, কবীর থাকলে অনুষ্ঠান যতোটা জমজমাট
হয়ে ওঠে অন্য কারো ক্ষেত্রেই তা হয় না। আর জমজমাট না হলে সেই
অনুষ্ঠান করে লাভ কি? সুতরাং বিপদের সম্ভাবনা সত্ত্বেও কবীরুল
আলমকে ডাকতেই হয়।
সেদিনও, অর্থাৎ যেদিন শারমীন কান্নার প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলেছিলো,
কবীর একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। আলোচনার শেষদিকে এসে
চৌকস উপস্থাপিকা যখন অতিথিদের কাছ থেকে সংক্ষিপ্ত 'সামারি'
নিচ্ছিলেন, তখন কবীর হয়তো তার আগের তিনজন আলোচকের আশাবাদে-গদগদ
আলোচনায় বিরক্ত হয়েই ক্ষিপ্ত স্বরে বলে ফেলে : 'আশাবাদী হবার মতো
কোথাও কিছু দেখতে পাচ্ছি না আমি। সবকিছু যেভাবে চলছে তাতে বরং মনে
হচ্ছে, সামনে আমাদের জন্য গভীর সংকট অপেক্ষা করছে। আলোর রেখা আমার
চোখে পড়ছে না, দেখছি গভীর অন্ধকার।'
এই পর্যায়ে এসে উপস্থাপিকা বিপদের গন্ধ টের পেয়ে হস্তক্ষেপ করেন-
'আমরা আশা করবো এই অন্ধকার, যদি সত্যিই তা থেকে থাকে, কেটে যাবে।
মানুষ তো আশা নিয়েই বাঁচে। এটুকু আশা না করতে পারলে আমরা বাঁচবোই
বা কিভাবে!'
কিন্তু কবীর থামে না : 'মানুষ এক অলৌকিক প্রাণী। সে শুধু আশা
নিয়েই বাঁচে- এই কথাটি ঠিক নয়। আশা না থাকলেও সে বাঁচে, যে কোনো
মূল্যে বাঁচে। কিভাবে বাঁচে, কিংবা আমাদের দেশের মানুষ এরকম
পরিস্থিতিতেও কিভাবে বেঁচে আছে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন। হয়তো আমাদের
অভিধানে 'অসম্ভব' বলে কোনো শব্দ নেই! আপনাদের মতো আমিও মনে করি যে,
একটা পরিবর্তন আসছে। কিন্তু যেমনটি আপনারা বলছেন, পরিবর্তনটা হবে
তারচেয়ে অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী। এটা হবে ইতিহাসের বাঁক
পরিবর্তন। বাংলাদেশের ইতিহাস, খেয়াল করে দেখুন, মোটামুটি ১৯/২০ বছর
পরপর একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নেয়। ১৯৫২-১৯৭১-১৯৯০। এবং এর কোনোটিই
রক্তপাত ছাড়া হয়নি। রক্তপাত ছাড়া ইতিহাস পাশ ফেরে না। আগামী
পরিবর্তনটিও সেইরকমই হবে এবং রক্তপাতের মাধ্যমেই তা অর্জিত হবে।
হ্যা, আমি রক্তপাতের কথাই বলছি।'
অনেক সাবধান থেকেও উপস্থাপিকা শেষ পর্যন্ত এরকম একটি বিপদজনক
মন্তব্য থেকে তার অনুষ্ঠানকে মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হন। শেষ করবার সময়
আশাবাদের কথা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে যায়, এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা
করেন- কবীরুল আলম থাকলে আর কোনো লাইভ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে তিনি
কিছুতেই রাজি হবেন না।
কবীর যে খুব সচেতনভাবে কথাগুলো বলেছে তা নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই
যেন কথাগুলো তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। হয়তো বউয়ের মায়াবী
চোখদুটো তখন তার চোখে ভেসে উঠেছিলো, যে চোখে এখন পানির অভাবে
রক্তের আভা- কিন্তু তখনও সে জানতো না, এই কথাটি বলে নিজের জন্য সে
কতোবড়ো বিপদ ডেকে এনেছে। রাস্তায় বেরিয়েই সে একটা পরিবর্তন টের
পেলো। কোনোদিন যা হয় না, আজ হঠাৎ মনে হলো- কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
অস্বস্তি লাগতে লাগলো তার। কিন্তু কিছু করারও তো নেই।
টেলিভিশনওয়ালারা অতিথিদের ডেকে এনেই খালাস, এতরাতে তাদেরকে বাসায়
পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব অনুভব করে না। করবেই বা কেন? তারা তো
অতিথিদের দয়া করে ডেকে ধন্য করছে, আবার পৌঁছে দেবে কেন? অবশ্য এ-ও
ঠিক যে, মধ্যরাতের এইসব লাইভ অনুষ্ঠানে কোনো গরীব লোক কথা বলতে আসে
না, যারা আসে তাদের সবারই গাড়ি আছে। নেই কেবল কবীরের, তাকে তাই
বাধ্য হয়ে রিকশাই নিতে হয়। এখন রাত দেড়টা। রাস্তাঘাট একবারে শুনশান
নীরব হয়ে গেছে, কিন্তু সারাপথ জুড়েই অস্বস্তিটা জিইয়ে থাকে। মনে হয়
ঘাড় ঘোরালেই দেখতে পাবে- কে বা কারা তাকে অনুসরণ করছে! বাসায ঢুকেও
তার সন্দেহ দূর হয়না বলে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে, এবং
দেখতে পায় সত্যিই দুজন লোক তার গেটে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে চলে
গেলো।
বাসায় শারমীনের উদ্বিগ্ন প্রতিক্ষিত মুখ। প্রতিদিনই তার মনে হয়, এত
রাতে কবীর নিরাপদে ফিরতে পারবে তো! কিন্তু এ-ও ঠিক- কবীরের এই
ব্যস্ততা তার ভালো লাগে। শারমীন জানে- কবীরের মধ্যে নিজেকে আড়ালে
রাখার একটা মানসিকতা আছে, নইলে আরো অনেক আগেই বিখ্যাত হয়ে যেত সে।
এই এখন যেমন, মাত্র কয়েক মাসেই কবীর উঠে এসেছে মানুষের নিত্যদিনের
আলোচনায়। চেনা মানুষ তো বটেই, অনেক অচেনা মানুষকেও কবীরের সাহস,
আপোসহীন অবস্থান, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি, কথাবার্তায় প্রখর যুক্তি
ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে দেখেছে শারমীন। কবীরের এই গ্রহণযোগ্যতা
দেখে শারমীনের মন ভরে যায়- লোকটা জীবনের কোনো পর্যায়ে, কোথাও, কারো
সঙ্গেই নীতির প্রশ্নে আপোস করেনি। তার মেধা-প্রতিভা-সাহস-প্রতিজ্ঞা
নিয়েও কোনো সংশয় নেই শারমীনের। তবু লোকটা যে তার প্রাপ্যটুকু
পায়নি, সমসাময়িকদের চেয়ে অনেকখানি পিছিয়েও পড়েছে- তার কারণ হয়তো
তার ওই আপোসহীন অবস্থান। অবশ্য কবীরের এই স্ট্যান্ডটাই ভালো লাগে
শারমীনের। নিজের মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে, আত্না পর্যন্ত বিকিয়ে দেয়াটা
কোনো কাজের কথা নয়।
অনেকটা সময় কাটলো একসাথে, তবু শারমীনের মনে হয়- এই তো সেদিনের কথা!
৮৫ তে পরিচয়, ৯১-এ বিয়ে। ওই বছরই একমাত্র সন্তান যৌথর জন্ম।
ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে কবীর ঢুকলো সাংবাদিকতায়- এখন একটি দৈনিক
পত্রিকার নিউজ এডিটর সে। তখনও বাংলাদেশের মিডিয়ার জগৎটি এতটা
বিস্তৃত হয়নি, পেশাটিও ছিলো অনুজ্জ্বল, সম্ভাবনাহীন- তবু কবীর
ওদিকেই গেলো। আর শারমীন বিসিএস দিয়ে একটা সরকারী কলেজে ঢুকে পড়লো।
সবই এই সেদিনের ঘটনা বলে মনে হয়। অথচ দেখতে দেখতে ছেলেটার বয়সও ১৫
ছাড়িয়ে গেলো। কী মিষ্টি ছিলো বাচ্চাটা, আর এখন দ্যাখো চেহারাটা
কেমন রুক্ষ হয়ে উঠেছে- কেমন যেন অস্থির-অসুখী ভাব। যেন অনেক
ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে এসেছে, অনেক দ্বন্দ্ববিক্ষুব্ধ সময়ের মুখোমুখি হতে
হয়েছে! এই বয়সের ছেলেদের যেমন হয় আর কী!
কাজটাজ সেড়ে গভীর রাতে কবীর বাসায় ফিরলে দুজন টুকটাক গল্প করে,
হাসাহাসি করে। কিন্তু আজ যেন একটু গম্ভীর হয়ে আছে কবীর।
কি হয়েছে তোমার?
কই! কিছু হয়নি তো!
কোনোকিছু নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করছো?
না তো...না, মানে হ্যা, তা একটু হচ্ছে।
কেন, কি হয়েছে?
আজকে দুজন লোক আমাকে ফলো করতে করতে বাসা পর্যন্ত এসেছে- বলবেনা
বলবে না ভেবেও কবীর নিজেকে সামলাতে পারে না।
শারমীন যেন একটু কেঁপে ওঠে। কী এক অমঙ্গল আশংকায় মন ছেয়ে যায়।
কিন্তু কবীরকে সেটা বুঝতে না দিয়ে একটু হেসে বলে- 'এ আর নতুন কী!
তুমি তো সেই অল্প বয়স থেকেই এগুলো ফেস করছো!'
তখন তো সামরিক শাসন চলছিলো! তাছাড়া বয়স অল্প ছিলো বলেই অতোটা কেয়ার
করিনি। কিন্তু এখন...
বাদ দাও। এ নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। ওরা ফলো করেই বা কি করবে?
কি করবে বা আদৌ কিছু করবে কীনা তা তো জানি না। কিন্তু এখন তো আর
আমি একা নই, সেজন্যই চিন্তা হয়...
চিন্তা করো না। ওরা কিছু করার সাহস পাবে না।
শারমীন বলে বটে, কিন্তু নিজেই দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। এমনকি
রাতে ভালো ঘুমও হয় না। সমস্যাটা কবীরকেও পেয়ে বসে। তবে
দুঃশ্চিন্তার চেয়ে অস্বস্তিটাই হয় বেশি। পরদিন সকাল থেকেই দুজন লোক
যে তাকে অনুসরণ করছে সেটাও চোখ এড়ায় না। অস্বস্তিটা সেজন্যেই বাড়ে।
লোকগুলো নিজেদের লুকানোর কোনো চেষ্টাই করছে না, বরং তারা যেন
নিজেদের উপস্থিতি জানাতেই চায়। তার এক বন্ধু, সেই আশির দশকে,
টিকটিকি চিনতে ও খসাতে শিখিয়েছিলো। সে বহুবার খসিয়েছেও এবং অনাবিল
আনন্দ লাভ করেছে। কিন্তু দুই যুগ আগের সেই অভিজ্ঞতা এখন কোনো কাজেই
আসছে না। এগুলো কেমন ধরনের টিকটিকি যারা নিজেদের অস্তিত্বের জানান
দিয়ে অনুসরণ করে!
কিন্তু এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবারও সুযোগ পায় না কবীর। অফিসে গিয়ে
ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। দুপুরের দিকে খবর আসে- মগবাজার বস্তিতে আগুন
লেগেছে। আরো অনেকের মতো সে-ও টেলিভিশনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। একটা
চ্যানেল লাইভ সমপ্রচার করছে। মানুষের দৌড়াদৌড়ি আর আহাজারিতে
সমস্ত শহরের বাতাস যেন ভারি হয়ে উঠেছে। রাতের খবরে টেলিভিশন
চ্যানেলগুলো বস্তি পুড়ে যাওয়ার খবর গুরুত্ব সহকারে প্রচার করে।
বুদ্ধিমান-সৃজনশীল রিপোর্টার যারা, তাদের রিপোর্টে মর্মস্পর্শী সব
দৃশ্য দেখা যায়। পরদিন পত্রপত্রিকায় প্রথম পাতায়ও খবরটি স্থান করে
নেয়। প্রায় সবই গতানুগতিক রিপোর্ট। যেন এটি যে কোনো সাধারণ খবরের
মতোই একটি খবর, যেন কোনো মানবিক বিপর্যয় ঘটেনি এখানে। শুধুমাত্র
একটি পত্রিকায় বক্স আইটেমের একটি বিশেষ রিপোর্ট পাঠকদের নাড়া দিয়ে
যায়। একটি পরিবারের কথা লেখা হয়েছে ওই রিপোর্টে। পরিবারের কর্তা
হোসেন মিয়া একসময় হকার ছিলো, উচ্ছেদের শিকার হয়ে এখন বেকার। ঐ সময়
সে কোনো-একটা কাজের সন্ধানে বেরিয়েছিলো। তার বউ, মমতাজ বেগম,
গিয়েছিলো বাসাবাড়িতে ঠিকে ঝি'র কাজ করতে। ঘরে ছিলো তার দুই শিশু
সন্তান। একজনের বয়স ছয়, আরেকজনের দুই। প্রতিদিন এমনটিই ঘটে- ছয়
বছরের ভাই দেখে রাখে দুই বছরের বোনকে। কিন্তু কালকে আগুন দেখে ভয়ে
দিশেহারা হয়ে বোনটিকে ঘরে রেখেই ভাইটি দৌড়ে বাইরে চলে এসেছিলো।
যখন বোনের কথা তার মনে পড়ে ততক্ষণে আগুনে ছেয়ে গেছে পুরো বস্তি।
কেউ তার চিৎকার-কান্না-আহাজারি-মিনতি শোনেনি। ঘর পুড়ে গেছে, সেই
সঙ্গে ছাই হয়ে বাতাসের সঙ্গে মিশে গেছে ছোট্ট মেয়েটি। রিপোর্টার
লিখেছেন- 'হোসেন মিয়া আহাজারি করছিলেন : আপনেরা আমার প্যাডে লাত্থি
মারলেন। রাস্তায় বইসা দুইডা জিনিস বেইচা সংসার চালাইতাম, হেইডা
আপনেগো সইহ্য অইলো না। এহন আবার মাতা গুজার ঘরডাও পুড়াইয়া দিলেন।
চাইরদিক থেইকা আগুন না লাগাইলে এমনইে লাইগা হারা বস্তি পুইড়া যায়?
আমরা বুজিনা এইসব? আপনেগো শহরে আমাগো থাকপার দিতে চান না, বুজি।
কিন্তু আমার দুধের বাচ্চাডা কি দোষ করলো? তারে ক্যান পুড়াইয়া
মারলেন? -তার আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছিলো ঢাকার বাতাস। আহাজারি
করছিলেন মমতাজ বেগমও। আর ছয় বছরের শিশুটি, যে কীনা তার বোনকে রেখেই
প্রাণভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলো, ঘটনার পর থেকে স্তব্ধ হয়ে বসে
আছে। একটা কথাও বলছে না কারো সঙ্গে। কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধুটু
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কী আশ্চর্য! এত কান্না, এত
আহাজারি, আর শিশুটির মর্মান্তিক স্তব্ধতা অথচ কারো চোখে জল নেই।
বরং যেন রক্ত এসে জমাট বেঁধেছে চোখে- এমন টকটকে লাল হয়ে ছিলো
চোখগুলো!'
এই শেষ বাক্যটিই কবীরকে মুষড়ে দেয়। শারমীনকেও তো সে এমনই দেখেছে!
কিন্তু বেশি কিছু ভাবার আগেই সে সমস্যাটিকে প্রকট হয়ে উঠতে দেখে।
পরের দিন পত্রপত্রিকায় প্রায় একই ধরনের খবর প্রকাশিত হয় অনেকগুলো।
রংপুরের আহমদ আলী পথে বসেছে। সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে বদরগঞ্জ বাজারে
একটা টেইলারিং-এর দোকান দিয়েছিলো সে। আয়ের উৎসও ছিলো ওই একটিই।
বাপদাদার আমল থেকে চালু ওই বাজারটি নাকি অবৈধ ছিলো! খাসজমি
উদ্ধারের নামে বাজারটি উচ্ছেদ করা হলে আরো অনেকের মতো আহমদ আলির
দোকানও উচ্ছেদ হয়ে যায়। আহমদ আলী আর তার মতো আরো অনেকের দিন কাটে
না খেয়ে, পরিবারের ভরণপোষণ না করতে পারার অকথ্য যন্ত্রণায়। 'আহমদ
আলী প্রতিদিন ভেঙে দেয়া বাজারে এসে নিজের দোকানের জায়গাটিতে বসে
মাটি চাপড়ে বিলাপ করেন। তার হাহাকারে আশেপাশের মানুষদের মুখে
অমাবস্যার অন্ধকার নামে। অথচ তাদের চোখে জল নেই, আছে জমাট হয়ে বসে
থাকা রক্ত। সেই অন্ধকারে মনে হয় চোখগুলো যেন জ্বলছে। যেন কামারের
দোকানে কয়লা পোড়ানো লাল লোহার খণ্ড একেকটি চোখ!
জিনিসপত্রের আকাশচুম্বি দাম। ক্ষুদ্র চাকরিজীবী মহিউদ্দিন সাহেব গত
তিনমাসে একদিনও বাচ্চাদের মুখে দুধ বা মাংস তুলে দিতে পারেননি। রাত
পর্যন্ত বাজারে বসে থাকেন কমদামে সবচেয়ে পচা মাছগুলো কিনবেন বলে।
তা-ও ভাগ্যে জোটে না। তার মতো আরো অনেকেই পচা মাছ কেনার জন্য একই
পদ্ধতি অবলম্বন করছে। কোনোদিন যদিও জোটেও, কুচো চিংড়ি, পচা-গলা
পুটি, লেগুনের পাঙ্গাস এইসবের ওপরে যায় না। 'ছেলেমেয়েগুলো মুরগীর
মাংস খাবে বলে বায়না ধরেছে মাসখানেক ধরে। ডালভাতই জোটাতে পারিনা,
মুরগী কিনবো কিভাবে! অথচ প্রতিদিন ওরা বসে থাকে, ভাবে আমি বুঝি
মুরগী নিয়ে ফিরবো। বাবা হয়ে এইসব সহ্য করতে হচ্ছে!' তার গলা ধরে
এসেছিলো বলতে বলতে, আশেপাশের লোকগুলোও- তারা হয়তো মহিউদ্দিন
সাহেবেরই প্রতিবিম্ব্ব- বিষণ্ন হয়ে গেলো তার কথা শুনে। আর আমি তার
চোখে তাকিয়ে দেখলাম ইটভাটার মতো জ্বলছে সেই চোখ, লাল টকটকে।
এইরকম অসংখ্য খবর পত্রিকাগুলোর পাতায় পাতায় প্রায় প্রতিদিনই ছাপা
হতে লাগলো। বন্ধ পাটকলের শত শত শ্রমিক-কর্মচারিদের হাহাকারের খবর,
বানভাসি মানুষদের দুর্দশা-অনাহার-আহাজারি- এতদিন হয়ে গেলো একমুঠো
ত্রাণ পেঁৗছেনি কোথাও, ক্ষুদ্রঋণওয়ালাদের অত্যাচার নিপীড়ন, গরু
নিয়ে যাওয়া, শাড়ী খুলে নেওয়ার হুমকির খবর, সারাদেশে উচ্ছেদ হয়ে
যাওয়া হকার, বস্তিবাসি, হাটবাজারের দোকানদারদের হা-হুতাশের খবর,
ক্রসফায়ার আর নিরাপত্তা হেফাজতে নিহতদের স্বজনদের হাহাকারের খবর;
এবং সব খবরের শেষে তাদের কাঁদতে না পারার প্রসঙ্গ, রক্ত-জমে-ওঠা
চোখের বর্ণনা। উপসম্পাদকীয় লেখা হলো অনেক, কলাম লেখকরা নতুন বিষয়
পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, আর সরকারের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়টিকে সরকারের
ভাবমূর্তি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।
টেলিভিশনওয়ালারাও এরকম বার্নিং ইসু্য নিয়ে 'লাইভ শো' করার সুবর্ণ
সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলো না। দেশবরেণ্য সব বুদ্ধিজীবী আর একজন
সরকারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ উপস্থিত হলেন এরকম একটি অনুষ্ঠানে, ডাক
পেলো কবীরও।
গত কয়েকদিনের এসব খবর কবীরকে খানিকটা বিমূঢ় করে তুলেছিলো। মনে
নানারকম প্রশ্নেরও জন্ম হচ্ছিলো। ঘটনার একদম প্রথম থেকেই বিষয়টি
তার মনোযোগ কেড়েছিলো, প্রতিটি পত্রিকার ছাপা হওয়া খবর তো বটে,
এমনকি নিজের পত্রিকায় যেসব খবর নানা কারণে ছাপা সম্ভব হয়নি,
সেগুলোও খুঁটিয়ে পড়েছে সে। বলাবাহুল্য, সবগুলো রিপোর্ট নানা কারণে
বিপর্যস্ত মানুষদের নিয়ে লেখা 'হিউম্যান স্টোরি'। রিপোর্টাররা কেউই
সাংবাদিক-সুলভ নিরাসক্তি ধরে রাখতে পারছেন না, রিপোর্টগুলো লিখতে
গিয়ে হয়ে উঠেছেন আবেগপ্রবন। যারা সম্পাদনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত,
তারাও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আবেগপ্রধান অংশগুলো এডিট করছেন না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো সারাদেশেই একসঙ্গে এমন ঘটনা ঘটে কিভাবে? কোথাও
কি কোনো ষড়যন্ত্রের ব্যাপার আছে- সরকার যেমন দাবি করছে? কিন্তু
সারাদেশের বিভিন্ন পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধিরা নিশ্চয়ই একত্রিত
হয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেননি যে, তারা একই ভাষায় রিপোর্টগুলো
লিখবেন! বাস্তব কারণেই সেটা সম্ভব নয়! তাহলে কি পত্রিকার ভেতর
থেকেই কেউ এমনটি করছে? তা-ও বা কি করে হয়? আর কোনো পত্রিকার কথা সে
জানে না, কিন্তু নিজের পত্রিকায় আসা রিপোর্টগুলো তো নিজের চোখেই
দেখেছে।
এতসবকিছুর মধ্যে তার নিজের জীবনে যে সংকট নেমে এসেছে সেটা সে প্রায়
ভুলতে বসেছিলো। তাকে অনুসরণ করার মধ্যেই সেই সংকট সীমাবদ্ধ নেই আর,
বেশ কয়েকবার ফোনেও তার সঙ্গে কথা বলেছে অচেনা কেউ। অত্যন্ত শালীন
ভাষায় তাকে বলা হয়েছে- 'আপনি টেলিভিশনে যান, তাতে আমাদের আপত্তি
নেই। বরং, না গেলে মানুষ সন্দেহ করবে। দর্শকরা তো আপনাকে বেশ পছন্দ
করে! কিন্তু গিয়ে এমন কোনো কথা বলবেন না যা দেশের শান্তি শৃঙ্খলা
স্থিতিশীলতা নষ্ট করে, যা মানুষকে নৈরাজ্যের দিকে উসকে দেয়। এরপর
যখনই যাবেন ইতিবাচক কথা বলবেন। আপনার উত্তেজক কথাবার্তা আমরা ভালো
চোখে দেখছি না। আশা করি সেসব বলে আমাদের বিরাগভাজন হবেন না। আপনার
জীবনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটুক সেটা আমরা চাইনা।'
শুধু তাকেই নয়, শারমীনকে ফোন করেও একইরকম হুমকি দেয়া হয়েছে। অনেক
চেষ্টা করেও লোকটির পরিচয় উদ্ধার করা যায়নি, জানা যায়নি- কাদের
বিরাগভাজন হবার কথা বলা হচ্ছে, কেনইবা প্রায় বন্ধুর মতো ভাষায় এমন
বিপদজনক হুমকি দেয়া হচ্ছে!
চাপটি টেলিভিশনওয়ালাদের কাছেও পৌঁছেছে, সেটা সে টের পেলো
অনুষ্ঠানে গিয়ে। সে যাওয়ার পর অনুষ্ঠানের উপস্থাপক, প্রযোজক,
নির্বাহী প্রযোজক আর অনুষ্ঠান প্রধান তার সঙ্গে বসলেন। বললেন- কবীর
ভাই আমরা খুব চাপের মুখে আছি। আপনাকে আমরা ডাকতে চাইনি। তারাই
ডাকতে বলেছে এবং আমাদেরকে বলা হয়েছে যেন আপনাকে অনুরোধ করি- আপনি
দয়া করে ইতিবাচক কথা বলবেন।
কি ধরনের ইতিবাচক কথা বলবো সেটাও বলে দেন!
আপনি তো বুঝতেই পারছেন কবীর ভাই! আমরা নিশ্চয়ই এমন অনুরোধ আপনাকে
করতে পারি না, কিন্তু নিরুপায় হয়েই করতে হচ্ছে। তারা আপনার জীবনে
দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলেও আমাদেরকে সাবধান করে দিচ্ছে। এমন নয়
যে বিষয়টা আমাদের কাছে নতুন, আদেশ-নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে তো আমরা
অনেক আগে থেকেই অভ্যস্ত। কিন্তু এই ব্যাপারটি অন্যরকম। প্লিজ কবীর
ভাই...
প্রযোজকের কণ্ঠে মিনতি ঝরে পড়ে। সম্ভবত ভয় পেয়েছে। কবীরও একটু
চিন্তিত বোধ করে। তাকে ব্যক্তিগতভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে সেটা এক
ধরনের বিষয়, কিন্তু তারা কেন অন্যদেরকেও তার জীবনের বিপদ সম্পর্কে
সাবধান করে দিচ্ছে!
অনুষ্ঠান শুরু হলো। উপস্থাপক হাসিমুখে কান্নাবিষয়ক আলোচনায়
দর্শকদের আমন্ত্রণ জানালেন এবং শুরুতেই সরকারী স্বাস্থ্য
বিশেষজ্ঞকে অনুরোধ জানালেন বিষয়টির একটি বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্য
দেয়ার জন্য। কিন্তু বিশেষজ্ঞ সাহেব তার ধারেকাছেও গেলেন না,
সরকারের আগের বক্তব্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যই বললেন: যার কোনো
অস্তিত্বই নেই তার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আমি কিভাবে দেবো, বলুন!
এটা যদি কেবল একজন-দুজনের ব্যাপার হতো তাহলে বলা যেত যে, এটি একটি
রোগ। কোনো কারণে অশ্রুগ্রন্থি শুকিয়ে গেলে চোখে পানি না-ও আসতে
পারে, যেটিকে বলা হয় ড্রাই আই সিনড্রোম বা যোগরেন সিনড্রোম। যেহেতু
কান্না মানুষের একটি মৌলিক আবেগ, সুতরাং কান্না পেলে এবং কারো
অশ্রুগ্রন্থি শুকিয়ে গিয়ে থাকলে চোখ জ্বালা করবে, মনে হবে চোখের
ভেতর বালুকণা, চোখ লাল হয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সারাদেশের
মানুষের অশ্রুগ্রন্থি একসঙ্গে শুকিয়ে গেছে- এটা কি আদৌ
বিশ্বাসযোগ্য ব্যাপার বলুন! আমি শুধু আপনাদেরকে এটুকু নিশ্চিত করে
বলতে পারি- এটি আদৌ কোনো রোগ নয়। আসলে এটি ঘটছেই না। কোনো এক কূট
উদ্দেশ্যে এটা প্রচার করা হচ্ছে। সম্ভবত সরকারের অর্জিত সাফল্যকে
নস্যাত করা, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা, সরকারকে বিব্রত করা এবং
মানুষকে অহেতুক আতংকিত করে সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করাই এর মূল
উদ্দেশ্য।
এরপর আসে বুদ্ধিজীবীদের পালা। শুরুতেই আফসার হোসেন, যিনি একযুগেরও
বেশি সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়ে সেখানকার পাসপোর্ট
করায়ত্ত্ব করে সামপ্রতাকিকালে দেশে ফিরে এসেছেনে জাতিকে
বিদ্যাবুদ্ধি উপহার দেবার জন্য। তাঁর কণ্ঠে তীব্র
মার্কিন-বিরোধিতা; তিনি তাঁর নিজস্ব অননুকরণীয় ভঙ্গিতে বলেন- আমরা
যদি ধরেও নিই যে, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদগুলো সত্য, তাহলে
মানুষ কাঁদতে পারছে না, নাকি ইচ্ছে করেই কাঁদছে না সেটা একবার ভেবে
দরকার এবং এটিই সর্বাগ্রে জরুরি ভিত্তিতে ভাবতে হবে। কাঁদতে পারছে
না- এই কথাটি বলা হচ্ছে ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণা থেকে। বৃটিশরা
আমাদেরকে যে মানসিকভাবে দাস বানিয়ে গেছে এটি তার একটি প্রমাণ।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা মানসিকভাবে উপনিবেশবাদের দাস আর
আমাদের চারপাশেই রয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল। পত্রপত্রিকার
খবরগুলো একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখবো, চোখগুলো যেন রক্ত-লাল হয়ে
উঠেছে। আমরা জানি লাল রঙ একটি বিশেষ প্রতীক বহন করে। আমরা সেদিকে
একেবারেই দৃষ্টিপাত না করে 'মানুষ কাঁদতে পারছে না' বলে মাঠ গরম
করে ফেলছি। আসল কথা হচ্ছে- মানুষ কাঁদতে পারছে না তা নয়, ইচ্ছে
করেই কাঁদছে না। কাঁদবে কেন? তারা রুখে দাঁড়াবে। সমস্ত ঔপনিবেশিক
চিন্তাচেতনা এবং সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
আর তারই চিহ্ন তারা মেখে রেখেছে তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ-চোখে।
এরপর আরেক মহাত্না বুদ্ধিজীবি মুরাদ আজহার। দীর্ঘকাল যুক্তরাষ্ট্র
প্রবাসী ছিলেন আজহার সাহেবও, এবং দেশে ফিরে বুদ্ধিবৃত্তিক
কর্মকাণ্ড ছাড়াও একটি বিশাল এনজিওর মালিক বনে গেছেন। এই এনজিওর
ফান্ডগুলো কোত্থেকে আসে তা নিয়ে তাঁর শত্রুমহলে প্রশ্ন থাকলেও (এবং
সম্ভবত মার্কিন কানেকশনই তাঁর এই অর্থের উৎস- এরকম প্রচারণা
থাকলেও) তিনি কখনোই এ বিষয়ে মুখ খোলেন না। তাঁর কণ্ঠেও মার্কিন
বিরোধী ঝাঁঝ এবং মুসলমানদের জন্য প্রেম। বললেন- এটা বাংলার
ঐতিহাসিক ভাবান্দোলনেরই একটা মহিমা। আমরা কাঁদতে পারি না তা নয়,
আমরা কাঁদি না। লালন বলেছেন...বলেছেন... (এ বিষয়ে লালন কী বলেছেন,
অনেকক্ষণ পর্যন্ত তা হাতড়ে ফিরতে হয় এই লালন বিশেষজ্ঞকে, এবং
সম্ভবত কিছু মনে না পড়ায় নিজের বিশাল ব্যক্তিত্ব ফিরিয়ে এনে
বলেন)... যা-ই বলুন না কেন, এরকম তুচ্ছ একটি প্রসঙ্গে লালনের মতো
মহাত্নাকে না টানাই ভালো। বরং আমি পরিষ্কার করে এটাই বলতে চাই- এটি
একটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত। তারা সুকৌশলে তাদের এজেন্ট
ঢুকিয়ে দিয়েছে পত্রপত্রিকায়, আর এই এজেন্টরা মার্কিন পরিকল্পনা
বাস্তবায়ন করছে মাত্র। তারা এর মাধ্যমে আসলে দেখাতে চায়- মুসলমানরা
কাঁদতে পারে না, তাদের হৃদয় কঠিন, তারা হৃদয়হীন। এটা মুসলমানদের
বিরুদ্ধে তাদের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রেরই একটা অংশ। তথাকথিত
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে এ অঞ্চলে টেনে আনার একটা বাহানা
মাত্র। আমাদের অবশ্যই এই ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে হবে। আজকে সমস্ত
ভেদাভেদ ভুলে, ডান-বাম এইসব ফালতু বিতর্ক সরিয়ে রেখে সবাইকে একাত্ন
হয়ে এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হবে।
এবার বৃদ্ধ বুদ্ধিজীবী, যিনি জীবনভর শুধু একটি বাক্যই
ঘুরিয়েপেঁচিয়ে লিখে ও বলে গেছেন ('সমাজ পরিবর্তন করতে হবে') বললেন-
সমাজের উপরিকাঠামোর মধ্যেই থাকে ভেতর-কাঠামোর সমস্ত লক্ষণ, এ কথা
আমরা সবাই জানি। এই যে, মানুষ কাঁদতে পারছে না বলে প্রচার করা
হচ্ছে- এটি হচ্ছে উপরিকাঠামোর ব্যাপার। আর এর ভেতরে আছে আগুন।
মানুষ দীর্ঘকাল ধরে একটি আগুন বয়ে বেড়াচ্ছে। সে আগুন পুঁজিবাদের
বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে,
সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন। এদেশের যে পুঁজিবাদের
থাবা সেটি অত্যন্ত নোংরা, এমনকি বুর্জোয়া অর্থনীতিও সঠিকভাবে
বিকশিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা এখানে নেই। মানুষ অনেক সহ্য করেছে, আর
করতে চায় না। সমাজকে বদলাতে হবে, না বদলালে কিছুই বদলাবে না- মানুষ
এটা পরিস্কার ভাবে বুঝে গেছে। তাদের এই চেতনার সঙ্গে একাত্নতা
প্রকাশ করে তাদেরকে একটি বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধু করাই এ
মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরী কাজ।
এরপরই কবীরের পালা। কিন্তু উপস্থাপক-প্রযোজক-ক্যামেরাম্যান এবং
অতিথিরা আর সেটের সামনে বসা দর্শকরা অবাক বিস্ময়ে দেখতে পান- কবীর
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে; তার চোখে-মুখে প্রচণ্ড বিরক্তি এবং
ক্রোধ। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে- লাইভ অনুষ্ঠানে এমন হঠাৎ
করে উঠে দাঁড়ানো একটি অসম্ভব ব্যাপার- উপস্থাপক একটি বিরতি নেয়ার
কথা ভাবার আগেই কবীর তার বুড়ো আঙুল বন্দুকের মতো
অতিথি-বুদ্ধিজীবীদের দিকে তাক করে বলে : আপনারা আমার ইয়ে বুঝেছেন।
মানুষ মরে যাচ্ছে, আর আপনারা আছেন বইয়ের পাতার বুলি নিয়ে। আপনাদের
এইসব কথাবার্তা আমি ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখান করছি।
বিমূঢ় উপস্থাপকের অপেক্ষা না করেই প্রযোজক ক্যামেরা বন্ধের নির্দেশ
দেন, লাইভ অনুষ্ঠান মাঝপথেই হোঁচট খেয়ে শেষ হয়ে যায়। কবীর কারো
দিকে না তাকিয়ে সোজা স্টুডিও থেকে বেরিয়ে আসে। আর পথে নেমেই টের
পায়- পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরো অনেক বেশি জটিল হয়েছে। তার চারপাশে
অন্তত জনাদশেক লোক, তাকে প্রায় ঘিরে ফেলার উপক্রম করেছে। সে একটা
রিকশা ডেকে তাতে চড়ে বসলে তারা সবাই একটা মাইক্রোবাসে উঠে তাকে
অনুসরণ করতে থাকে। একটা গাড়ি যদি একটা রিকশাকে অনুসরণ করে তাহলে
ব্যাপারটা এতই নগ্ন এবং প্রকাশ্য হয়ে ওঠে যে সেটাকে আর অনুসরণ না
বলে ভীতিপ্রদর্শন বলাটাই সঙ্গত। কবীরের অন্তত তাই মনে হতে থাকে।
তার রিকশার পিছনে পিছনে মাইক্রোবাসটি তার বাসা পর্যন্ত আসে,
নিশ্চয়ই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নয়, আবার তার যে কোনো
ক্ষতি করবে তা-ও মনে হচ্ছে না। করতে চাইলে পথেই করে ফেলতে পারতো।
তাহলে ভয় দেখানো ছাড়া এর অন্য কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে? উদ্দেশ্যটা
বুঝতে না পারলেও পরিস্থিতি যে তার কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ ও
জটিল সেটা টের পেলো যখন তার বাসার দরজা ভেতর থেকে খুলে দিলো একজন
অচেনা লোক। কবীর চমকে উঠেছিলো, সে এতক্ষণ পর্যন্ত মাইক্রোবাসের
রহস্যময় আরোহীদের সম্বন্ধে ভাবছিলো, বাসার ভেতরে কিছু একটা ঘটতে
পারে একথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। কিন্তু ভাবতেই হলো- চমকে উঠে জিজ্ঞেস
করলো-
কে আপনি?
ভেতরে আসুন।
জলদগম্ভীর কণ্ঠে বললো লোকটি। যেন এটা তারই বাসা আর কবীর এখানে অবৈধ
অনুপ্রবেশ করেছে। কবীর ঢুকতেই লোকটি দরজা বন্ধ করে শীতল চোখে
তাকিয়ে বলে-
খুব শান্ত থাকবেন, গলা উঁচু করবেন না। আপনার সঙ্গে আমাদের কিছু কথা
আছে।
কবীর দেখে, ড্রয়িং রুমে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে আরো কিছু লোক।
কবীরের মধ্যে হঠাৎ আতংক জেগে ওঠে। কারা এরা? এর মধ্যেই কোনো
দুর্ঘটনা ঘটে যায়নি তো? যৌথ? শারমীন? সে দ্রুত বেডরুমের দিকে
এগিয়ে যায়। এখানেও দরজায় শান্তভঙ্গিতে দুজন দাঁড়িয়ে, বিছানার ওপর
জড়োসড়ো হয়ে শারমীন বসে আছে। তার মুখ ফ্যকাশে।
শারমীন, কারা এরা? দরজা খুলেছো কেন?
দরজা উনি খোলেননি- একজন বলে ওঠে।
তাহলে? আপনারা ঢুকলেন কিভাবে? কারা আপনারা?
অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল- নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে আরেকজন।
অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে ঢুকেছেন কেন আপনারা? কিভাবেই বা ঢুকলেন? কি
চান আপনারা?
এত প্রশ্ন করবেন না। আপনাকে বলা হয়েছে, আপনার সাথে আমাদের কিছু কথা
আছে।
কবীর ছুটে যৌথর রুমে যায়। যথারীতি দরজায় দুজন। ঘরের এক কোণে
আতংকিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে যৌথ। কবীরকে দেখে ক্ষীণ স্বরে কেবল
'বাবা' বলে ডাকতে পারলো।
একদম নড়বে না খোকা, যেমন আছো তেমনি থাকো- নির্দেশ এলো দরজা থেকে।
যেন ঈশ্বরের নির্দেশ- এমনভাবে পালিত হচ্ছে সেসব। এবার আর কবীরকে
কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাকে ঠেলতে ঠেলতে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এলো
দুজন।
বসুন। একজন উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসার জায়গা করে দিলো। তাদের ভদ্রতাবোধ
মুগ্ধ করার মতো।
কে আপনারা? কি চান? কেন ঢুকেছেন আমার বাসায়? কিভাবে ঢুকেছেন?
একই প্রশ্ন বারবার করছেন।
করছি, কারণ আপনারা উত্তর দিচ্ছেন না।
গলা উঁচু করবেন না, শান্তস্বরে কথা বলুন।
আপনারা অন্যায়ভাবে...
একজন এগিয়ে এসে তার আইডেন্টিটি কার্ড এগিয়ে ধরলো কবীরের চোখের
সামনে।
এবার চিনেছেন? আমরা এসেছি আপনার সঙ্গে কথা বলতে। ঢুকেছি দরজা ভেঙে।
আপনার স্ত্রী খুলতে চাননি, খুলে দিলে ভাঙতে হতো না। আমরা দুঃখিত।
তাদেরকে অবশ্য দুঃখিত বলে মনে হলো না। বরং বেশ ভালো একটা কৌতুক
করা গেছে এমন ভঙ্গিতে হেসে উঠলো সবাই। নেতাগোছের একজন কথা শুরু
করলো-
আপনাকে আমরা অনেকবার সাবধান করেছি। বলেছি দেশের
শান্তি-শৃঙ্খলা-স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়, এমন কোনো কথা বলবেন না বা কাজ
করবেন না। আপনি শোনেননি। আজকেও একটা সুযোগ আপনাকে আমরা দিয়েছিলাম।
টক-শো টা আমাদের অনুরোধেই আয়োজন করা হয়েছিলো, আপনাকে ডাকাও হয়েছিলো
আমাদের অনুরোধে। কিন্তু আপনি একটা নজিরবিহীন নাটক করে চলে এলেন।
এসবের মানে কি কবীর সাহেব, আপনি কথা শুনছেন না কেন?
কবীর এবার খানিকটা শান্ত। প্রাথমিক আতংক কেটে গেছে। প্রথমে
ভেবেছিলো- কোনো সন্ত্রাসীর দল বুঝি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে এসেছে। তা
যেহেতু নয়, আইডেন্টিটি কার্ড দেখালো যেহেতু, এরা আর কি করবে? একটু
ভয়টয় দেখাবে হয়তো, বড় কোনো ক্ষতি করবে না নিশ্চয়ই!
আমি তো আপনাদের কথা শুনতে বাধ্য নই।
বাধ্য। অবশ্যই আপনি আামাদের কথা শুনতে বাধ্য। শুধু আপনিই নন, সবাই
বাধ্য। সবাই তা মানছেও, আপনিই শুধু মানছেন না। উল্টোপাল্টা কথা
বলে...
আমি কোনো উল্টোপাল্টা কথা বলি না। যা বিশ্বাস করি তাই বলি, যুক্তি
দিয়ে বলি।
তা বলেন অবশ্য, আপনার কথায় খুব চমৎকার যুক্তি থাকে। বিশ্বাস করতে
ইচ্ছে হয়। কিন্তু আর কেউ না জানুক, আমরা জানি, আপনি মিথ্যে বলেন।
না, আমি মিথ্যে বলি না।
খামোখা তর্ক করবেন না। আপনি মিথ্যে বলেন। আপনি কি বলেননি, দেশের
মানুষের জীবনে দুঃসহ বিপর্যয় নেমে এসেছে!
হ্যা। বলেছি। সেটি কি মিথ্যে?
অবশ্যই মিথ্যে। দেশের মানুষ শান্তিতে আছে। এত শান্তিতে তারা
কোনোদিনই ছিলো না। আপনি কেন তাদেরকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছেন না?
আমি? আমি তাদেরকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছি না? দেশের মানুষ না খেয়ে
মরছে, হতাশায় ডুবে যাচ্ছে...
কবীর সাহেব, আপনাকে আমরা শেষ সুযোগ দিচ্ছি। আপনি স্বীকার করে নিন
যে, দেশের মানুষ ভালো আছে, সুখে আছে, এবং আপনি সেসব না বলে
উল্টোপাল্টা কথা বলছেন কারণ আপনি ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম
অর্গানাইজার।
অসম্ভব। এসব মিথ্যে। আমি স্বীকার করবো না।
আপনিই কিন্তু বলেছিলেন - আমাদের অভিধানে অসম্ভব বলে কোনো শব্দ নেই।
হ্যা, সেটা ভিন্ন অর্থে।
যে অর্থেই বলে থাকুন, আমরা কিন্তু সেটা বিশ্বাস করি। আপনি শেষ
সুযোগ পাচ্ছেন- স্বীকার করে নিন, এবং কালকেই একটা টিভি শোতে গিয়ে
নতুন কথাগুলো বলুন।
না।
আপনি সত্যিই বলবেন না?
না।
এর পরিণাম কিন্তু খারাপ হবে কবীর সাহেব।
কী করবেন আপনারা? আমি কোনোভাবেই এরকম কথা বলতে পারবো না।
লোকটি কিছু না বলে কী একটা ইঙ্গিত করে। দুজন লোক যৌথকে, আরো দুজন
লোক শারমীনকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসে। শারমীনকে কবীরের কাছে বসিয়ে
দুজনকেই পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে তারা।
এসব কি করছেন আপনারা? এসবের মানে কি?
কিন্তু আর কোনো কথা বলার প্রয়োজন বোধ করে না তারা। বরং যেন খুব
মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে এমন ভঙ্গিতে তাদের দুজনের দুটো মোবাইল ফোন
নিয়ে নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে ভেঙে ফেলে। তারপর ল্যান্ডফোনের লাইন কেটে
দেয়। তারপর যৌথকে এনে তাদের সামনে দাঁড় করায়। যৌথ ভয়ে-আতংকে সাদা
হয়ে গেছে, কবীর-শারমীন বুঝতেই পারছে না, কী ঘটতে যাচ্ছে।
আপনি বলেছিলেন- মানুষ এক অলৌকিক প্রাণী। মানুষ পারে না এমন কোনো
কাজ নেই। বলেছিলেন, অসম্ভব বলে কোনো শব্দ নেই আমাদের অভিধানে। আপনি
অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষ। আপনার সব কথাই আমরা বিশ্বাস করি।
বিশ্বাস করি বলেই একটু পর যা ঘটবে, তা ঘটানো সম্ভব হবে আমাদের
পক্ষে। - বলে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুজন লোকের হাতে চকচকে ছুরি
ঝলসে ওঠে। প্রায় একসঙ্গে তারা যৌথর বুকে ও পিঠে আঘাত করে।
মুহূর্তের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে যৌথ।
আশা করছি এবার আপনার দেশবিরোধী কার্যকলাপ বন্ধ হবে! - বললেও কবীর
কিছু টের পায় না, ঘোরগ্রস্থের মতো যৌথর নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে
থাকে। শারমীনও জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়ে। লোকগুলো শান্তভঙ্গিতে চলে
যায়।
ঘটনাটি জানাজানি হয় পরদিন দুপুর নাগাদ। কবীর সকালে অফিসে না যাওয়ায়
এবং ফোনে কোনোভাবেই তার সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পেরে খবর নেয়ার জন্য
তার বাসায় অফিস থেকে লোক আসে। সে-ই খবরটি অফিসে পৌছায়।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সমস্ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা
এসে কবীরের বাসায় জড়ো হন। সবগুলো দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার
সম্পাদক এবং টেলিভিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আসেন এক এক করে।
কবীরের কাছে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ শুনে সকলেই ক্ষিপ্ত, ক্রুদ্ধ ও
প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। পুলিশ আসে। লাশ চলে যায় ময়নাতদন্তের জন্য।
এবং তারা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন মাত্র দু-ঘণ্টার মধ্যে
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট চলে এসেছে এবং মৃতু্যটিকে আত্নহত্যা বলে
রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। পিঠে যে ছুরির আঘাতের চিহ্ন- সেটি কোত্থেকে
এলো, সে প্রশ্ন উত্থাপিত হলেও সদুত্তর দেয়ার জন্য কাউকে পাওয়া যায়
না।
সংবাদকর্মীরা কবীরুল আলমের বাসা থেকে নড়ে না। একত্রিত হয়ে তারা
সিদ্ধান্ত নেয়, যা হবার হবে- অত্যন্ত শক্ত একটা রিপোর্ট তারা
করবেই। তারা জানতেও পারে না, ততক্ষণে তাদের সম্পাদকেরা এ বিষয়ে
নির্দেশাবলী পেয়ে গেছেন, পেয়ে গেছেন তৈরি করা একটি রিপোর্টও।
টেলিফোনে সম্পাদকদের বলা হয়েছে- এই মৃতু্য সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট
রিপোর্টটি ছাড়া আর কিছুই ছাপানো যাবে না। ছাপালে অত্যন্ত খারাপ
পরিণতি হবে। তৈরি করা ওই রিপোর্টে যৌথর মৃতু্যকে 'মা-বাবার
কলহজনিত কারণে কৈশোরিক আবেগবশত আত্নহত্যা' বলে উল্লেখ করা হয়েছে
এবং দুঃখপ্রকাশ করে বলা হয়েছে- 'সবারই সংযত আচরণ করা উচিত, নইলে
এমন করে সম্ভাবনময় তরুণ প্রাণের মৃতু্যকেও মেনে নিতে হয়।'
কবীরুলের বাসায় তখন অন্য ঘটনা। কালকের ওই হত্যাদৃশ্য দেখার পর থেকে
শারমীন স্তব্ধ হয়ে এক জায়গায় বসে আছে। একটা কথাও বলেনি, এক গ্লাস
পানিও মুখে দেয়নি, ওই জায়গা থেকে একচুলও নড়েনি। আত্নীয়স্বজনের
উপর্যুপরি অনুরোধেও সে এতটুকু সাড়া দেয় না। অবশেষে কবীর এসে তার
সামনে বসে। দুই হাতে শারমীনের কাঁধ ধরে জোরে নাড়া দিয়ে বলে,
শারমীন, তুমি কাঁদো। চিৎকার করে কাঁদো। তোমার সন্তানকে হত্যা করা
হয়েছে, চিৎকার করে সবাইকে সেটা জানিয়ে দাও।
শারমীন দুর্বোধ্য চোখে কবীরের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই চোখে রক্ত
টলমল করছে। অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই করেই যেন ভেঙে
পড়ে সে- তুমি আমাকে কাঁদতে বলছো! তুমি আমাকে কাঁদতে বলছো! - বলতে
বলতে দুই হাতে চোখ ঢেকে ফেলে শারমীন। একটুক্ষণ পর কবীর লক্ষ্য করে-
শারমীনের আঙুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। জোর করে তার চোখ থেকে
হাত দুটো সরিয়ে নিলে কবীর দেখতে পায়- তার দুই চোখ বেয়ে রক্তের ধারা
নেমেছে। বিভিন্ন মিডিয়ার প্রায় শতাধিক সংবাদকর্মী এই ঘটনার
প্রত্যক্ষদর্শী হয়। একটা প্রকাণ্ড ক্ষোভ নিয়ে অফিসে ফেরে তারা।
কিন্তু রিপোর্ট লেখার আগেই সম্পাদকরা তাদের সংবাদকর্মীদের
নির্দেশনাটি এবং পাঠানো রিপোর্টটির কথা জানিয়ে দেন। সাংবাদিকরা এই
নির্দেশনা মানতে অস্বীকৃতি জানালে সম্পাদকরা ধৈর্য ধরার পরামর্শ
দেন এবং এর একটা বিহিত-ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন, যদিও তারা জানেন
এর কোনো বিহিত-ব্যবস্থা করা আদৌ সম্ভব নয়। বিচারটা তারা কার কাছে
দাবি করবেন?
কোনো পত্রিকায় বা টেলিভিশনে প্রকৃত সংবাদটি প্রচারিত না হয়ে
প্রচারিত হয় নকল সংবাদটি। কেউ জানতেও পারে না প্রকৃতপক্ষে সেদিন কী
ঘটেছিলো কবীরুল আলমের বাসায়।
কিন্তু পরেরদিন থেকে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। সারাদেশ থেকে
সবগুলো পত্রিকায়- বিবিধ দুর্ঘটনায় আক্রান্ত বিপর্যস্ত মানুষের চোখ
থেকে পানির বদলে রক্ত ঝরার খবর আসতে থাকে অবিশ্বাস্য সংখ্যায়।
দুদিনের মধ্যে একইরকম সংবাদের স্তুপ জমে গেলে, পত্রিকা অফিসগুলোতে
এক বিমূঢ় অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই ধরনের খবর ছাপানোর আগে সব পত্রিকার
সম্পাদকরা এক সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। জরুরী
সভায় কবীরুল আলমের বাসায় ঘটে যাওয়া ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়
এবং সরকারের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবি করা হয়। এরপর চোখ থেকে রক্ত
ঝরার খবর নিয়ে আলোচনা হয় এবং হিসেব করে দেখা যায়- সব পত্রিকা মিলে
এ পর্যন্ত এইরকম রিপোর্ট এসেছে দু-হাজার নয়টি। বিষয়টি নিয়ে
বিস্তারিত আলোচনা শেষে তারা সিদ্ধান্ত নেন, একটি যৌথ সংবাদভাষ্য
তৈরি করা হবে এবং প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় চারকলাম জুড়ে
সেটি একসঙ্গে ছাপা হবে। কবীরুল আলমের ওপর দায়িত্ব পড়ে ভাষ্যটি
লেখার।
পরদিন প্রত্যেকটি পত্রিকার পাঠকরা দেখতে পান- রক্তলাল অক্ষরে
জ্বলজ্বলে শিরোনাম-
অশ্রু নয়, রক্ত ঝরছে চোখ থেকে : এ
কিসের আলামত? |
| |
 |
|