বাইরে তুমুল বৃষ্টি, রাতও অনেক _ বারোটা পার
হয়েছে আধঘন্টা আগেই। প্রায় দু'ঘন্টা ইলেকট্রিসিটি ছিলো না, মিনেট
দশেক হলো এসেছে। বৃষ্টিটাকে মোটেই মধুর বা রোমান্টিক বলে মনে হচ্ছে
না, বরং ভীতিকর লাগছে। এমন তুমুল, একরোখা, দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টি
বহুদিন হয় না। ইলেকট্রিসিটি না থাকার ফলে ভূতুড়ে অন্ধকারে মনে
হচ্ছিলো পৃথিবীটা বুঝি ধ্বংসই হয়ে যাবে _ এখনও সেই আতঙ্ক রয়ে গেছে
মনে। পরিবেশটা ভৌতিক গল্পের জন্য চমৎকার _ কিন্তু একা একজন
মানুষের জন্য সেটা মোটেও ভালো লাগার বিষয় নয়। এমনিতে আমি বৃষ্টি
খুব পছন্দ করি, ছুটির দিনে ঘরে বসে বৃষ্টি দেখতে, বৃষ্টির শব্দ
শুনতে কিংবা মৃদু ঠান্ডা ভেজা হাওয়ায় আলস্যভরে শুয়ে থাকতে বেশ
লাগে, তাই বলে এমন বিধ্বংসী বৃষ্টি! ঠিক এমন একটা সময়ে যদি আবার
কলিংবেল বেজে ওঠে, তাহলে অনুভূতিটা কেমন হতে পারে ভেবে দেখুন। অল্প
বৃষ্টিতেই এই গলিতে পানি জমে _ এই তিনঘন্টার বৃষ্টিতে বাইরের যে কী
অবস্থা তা এই পাড়ার লোকজনই কেবল আঁচ করতে পারছে, আর কেউ নয়। এমন
দুর্যোগ পেরিয়ে যে আমার কলিংবেল বাজাচ্ছে সে আর যাই হোক, কোনো
সুসংবাদ নিয়ে আসেনি। দ্রুত চিন্তা করছি _ কে হতে পারে, আর
দুঃসংবাদটিই বা কি হতে পারে! কারো মৃতু্য, কারো এ্যাকসিডেন্ট,
কিংবা হার্ট অ্যাটাকে কারো হাসপাতালে যাওয়ার খবর নয়তো! এইসব
নানারকম আশঙ্কা মাথায় নিয়ে দরজা খুলে যাকে দেখলাম _ তাকে কোনোভাবেই
আশা করিনি। আমার কবি বন্ধু আহসান [সঙ্গত কারণেই আসল নামটা গোপন
রাখছি, নইলে আপনারা অনেকেই তাকে চিনে ফেলবেন আর তার জীবনের একটা
গোপন অধ্যায় জেনে যাবেন। বন্ধুর পোপন কথা প্রকাশ করে দেয়া কোনো
কাজের কথা নয়।] জিজ্ঞেস করলাম,
কি রে তুই এতো রাতে!
কেন, এতো রাতে তোর বাসায় আসতে নিষেধ আছে নাকি, থাকলে বল, চলে যাই।
না তা নেই। তাই বলে এই দুর্যোগের মধ্যে...
তুই কি ঢুকতে দিবি, নাকি দরজা থেকেই ফেরত পাঠাবার মতলব করেছিস?
ওকে ঢুকতে দিলাম ঠিকই, কিন্তু আমার বিস্ময় যাচ্ছে না। ওর কাপড়-চোপড়
চুপচুপে ভেজা, চোখ দুটো টকটকে লাল, [গাঁজা-টাজা খেয়ে আসেনি তো!]
আচরণটাও একটু অস্বাভাবিক লাগছে। ওর গা গড়ানো পানি দিয়ে আমার ঘর
ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু ও এসব বিষয়ে নির্বিকার। আরাম করে চেয়ারে বসে ও
বললো,
তোর সঙ্গে খুব জরুরী কথা আছে।
আগে গোসল করে শুকনো কাপড় পড়ে নে।
শুকনো কাপড় দিয়ে কি হবে? বৃষ্টি তো থামবে বলে মনে হয় না, খামোখা
তোর কাপড় ভেজাবো কেন?
মানে! তুই চলে যাবি নাকি?
তোর এখানে থাকতে এসেছি ভেবেছিস?
থাকলে অসুবিধা কি? এমন তো নয় যে কোনোদিন থাকিসনি। এই বৃষ্টিবাদলের
মধ্যে তুই যাবি কোথায়?
যাবো কোথায় মানে? বাসায় যাবো। তোর এইসব ফালতু প্রশ্ন রেখে আমার কথা
শোন।
তোর ভাবসাব আমার ভালো লাগছে না আহসান।
না লাগুক _ বলে সে তার ব্যাগ থেকে একগাদা কাগজ বের করলো _ নে ধর।
কি এগুলো?
ডায়রির পাতা।
কার ডায়রি?
কার আবার! আমার। গাধার মতো প্রশ্ন করছিস কেন বলতো কামাল?
তোর ডায়রি দিয়ে আমি কি করবো? অচিরেই মরেটরে যাওয়ার প্ল্যান করেছিস
নাকি যে ডায়রি দিয়ে যাচ্ছিস?
সেরকম কোনো মহৎ উদ্দেশ্য এখনো তৈরি হয়নি। এগুলো এনেছি তোর পড়ার
জন্য।
তোর ডায়রি আমি পড়বো কেন? এ তো অনধিকার চর্চা।
আমি যখন বলছি তখন তোর পড়তে অসুবিধা কোথায়?
ঠিক আছে, পড়লাম। তারপর?
তারপর একটা গল্প লিখবি।
ডায়রি পড়ে গল্প! ভালোই বলেছিস, লিখিস তো কবিতা, গল্প সম্বন্ধে যদি
এতোটুকু ধারণা থাকতো...
দ্যাখ কামাল _ ও আমাকে থামিয়ে দেয় _ আমি জানি তুই পারবি। আমি তোর
ক্ষমতা দেখেছি _ তুই একটা শব্দ থেকেও একটা গল্প বানিয়ে ফেলতে
পারিস, অসাধারণ সব গল্প...
তেল। স্পষ্ট তেল। আমার ওই রকম কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু ওকে
এই কথা বলা অর্থহীন। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ও-ই বলে _
এখানে একটা চরিত্রের দেখা পাবি তুই...
নারী?
বলাই বাহুল্য। তোর গল্পে এই চরিত্রটিকে তুই অমর করে রাখবি।
যাকে আমি চিনিই না, তাকে গল্পে অমর করে রাখবো? তোর কি মাথার ঠিক
আছে আহসান?
কামাল _ ও এবার উঠে দাঁড়ায় _ আমি বন্ধু হয়ে তোর কাছে মিনতি করছি,
ব্যাপারটাকে তুই সিরিয়াসলি নে। তোর পক্ষেই সম্ভব ওকে অমর করে রাখা।
সেটা তো তুই নিজেই করতে পারিস। তোর চেনা চরিত্রকে অমর করে রাখার
দায় তুই আমার কাঁধে চাপাচ্ছিস কেন?
ওকে অমর করে রাখার ক্ষমতা আমার নেই। এজন্যই ইচ্ছে করছে _ পৃথিবীর
সমস্ত কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চিত্রকরদেরকে ওর কথা
বলি। তোর কথা প্রথম মনে এলো _ তাই এলাম। প্লিজ কামাল তুই ফিরিয়ে
দিস না।
চরিত্রটিকে আমি চিনি না _ ওকে অমর করে রাখার দায়ও আমার নেই। তাছাড়া
আমি লিখলেই যে সে অমর হয়ে যাবে _ এমন ভাবাটা বাতুলতা মাত্র। আমার
কোনো অমরত্বের তৃষ্ণা নেই। যাপনের জন্য যে জীবনটি আমি না চাইতেই
পেয়েছি তার অর্থহীনতা ভুলে থাকার জন্য দুচারটে গল্প লিখি। সেগুলো
আদৌ গল্প হয় কী না, হলেও সেসবের চরিত্ররা অমরত্ব পাবে কি পাবে না,
তা নিয়ে আমার একেবারেই মাথাব্যথা নেই। একটা জীবন কোনোরকম করে পার
করে দিতে পারলেই হয়। মানব জীবনে মৃতু্যই একমাত্র চূড়ান্ত সত্য, আর
কিছু নয় _ এই উপলব্ধি অনেক আগেই ঘটে গেছে আমার। এসব নিয়ে আহসানের
সঙ্গেও প্রচুর কথা হয়েছে _ জীবনের অর্থহীনতা নিয়ে আমরা দু'জনেই
সমানভাবে বিচলিত _ কিন্তু এখন আহসানকে এসব বোঝায় কে? ও যেন
ঘোরগ্রস্থ হয়ে আছে। আমার একটু কৌতূহল হলো _ কোন সে নারী যে
আহসানকে অমরত্বের পক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? কি এমন বৈশিষ্ট্য তার?
হয়তো এই কৌতূহলের জন্যই আমি ওর ডায়রিটা রেখে দিলাম। পড়েই দেখি না!
লিখতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা তো আর নেই! আমি না লিখলে কার কি
বলার আছে?
আমার শত অনুরোধ উপেক্ষা করে ওই ঝড় বাদলের মধ্যে, গলির নোংরা পানি
ভেঙে আহসান চলে গেলো। গাঁজা খেয়েছে, সন্দেহ নেই _ নইলে এমন
অস্বাভাববিক আচরণ করবে কেন? যা হোক, কৌতূহল মেটানোর জন্য ও যাওয়ার
পরপরই ডায়রির ছেঁড়া পাতাগুলো নিয়ে বসলাম; আর পড়তে পড়তে নানামুখী
প্রতিক্রিয়া হতে লাগলো আমার। এমনিতেই আহসানের লেখার হাত চমৎকার _
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওর প্রবল আবেগ। এতোই প্রবল যে আমার রীতিমতো
লজ্জাই লাগে _ ভাবি, ও তো এতো ইমোশনাল নয়, এই আবেগ ও পেলো কোথায়?
আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় _ এই বিষয় নিয়ে আমার পক্ষে গল্প লেখা
কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এরকম আবেগ থরথর টইটম্বুর প্রেমের গল্প লিখলে
আমার বুদ্ধিজীবী এবং সিরিয়াস লেখক বন্ধুরা নির্ঘাত আমাকে ইমদাদুল
হক মিলনের বাসায় দারোয়ানের চাকরিতে নিয়োগ দেবে। মান-ইজ্জত নিয়ে
টানাটানি করার সুযোগ কে-ই বা করে দিতে চায়?
ঘটনাটি বছর পাঁচেক আগের। অর্থাৎ আহসান প্রায় পাঁচ বছর আগে কোনো এক
রাতে ডায়রিটা আমাকে দিয়ে গিয়েছিলো। তারপর অনেকদিন পর্যন্ত ওটা ফেলে
রেখেছিলাম; ভেবেছিলাম ব্যাপারটা স্রেফ ভুলে যাবো। কিন্তু হলো না।
লেখাগুলো আমাকে খোঁচাতে লাগলো। যদিও গল্প লিখবো না বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ
হয়েই ছিলাম, তবু ওগুলো মাঝে মাঝে বের করে পড়তাম। ধীরে ধীরে
ব্যাপারটা আমার অভ্যাসে পরিণত হলো _ প্রায় ঘোরগ্রস্থ হয়ে পড়লাম
আমি। মেয়েটার সম্বন্ধে আমার কৌতূহল বাড়তে লাগলো, আর নিজের অজান্তে
আমি ওকে খুঁজতে শুরু করলাম; এবং একসময় তাকে পেয়েও গেলাম। আপনারা
নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, এই শহরে একটি মেয়েকে খুঁজে পাওয়া এমন কিছু
কঠিন বিষয় নয়, বিশেষ করে সে যদি হয় তীব্র রূপসী [আহসানের
ভাষ্যমতে], এবং বন্ধুর প্রেমিকা _ এবং তাকে যদি মন দিয়ে খোঁজা হয়!
তো, মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়ার পর আমার কী অনুভূতি হলো বা তার সঙ্গে কী
কথা বিনিময় হলো, সেসব না হয় পরেই বলি। তার আগে বরং আহসানের ডায়রির
কিছু অংশ অবিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যাক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে থার্ড
ব্র্যাকেটে আমি নিজের মন্তব্য উপস্থাপন করছি _ আপনাদের সুবিধার্থে।
আগেই বলে রাখি, এই আবেগসর্বস্ব লেখাগুলোর কোনোটাই আমার নয় _ অতএব
আশা করি আমার বুদ্ধিজীবী সিরিয়াস বন্ধুরা আমাকে দায়ী করা থেকে বিরত
থাকবেন _ একান্তই যদি কিছু বলতে হয় সেটা আহসানকে বললেন _ সোজা কথা
হচ্ছে, এই লেখাগুলোর দায়দায়িত্ব আমি নিতে রাজি নই।
তাহলে আসুন প্রিয় পাঠক, আহসানের আবেগময় প্রেমকাহিনী পড়া যাক।
০৯.০৭.১৯৯৭
তুমি আমার কৈশোরিক অভিমান ফিরিয়ে এনেছো, মেয়ে। কতোদিন আমি এমন
তীব্র অভিমান বোধ করিনি কারো জন্য। কতোকাল ধরে কারো সামান্য
উপেক্ষাও আমার বুকের ভেতর এমন সুখের কষ্ট তৈরি করেনি! কতোকাল! অথচ
আমি তো অপেক্ষা করেছি এই অনুভূতির জন্য, কৈশোরিক অভিমানের জন্য,
সামান্য কষ্টে বুক বিদির্ন হয়ে যাবার মতো কষ্টের জন্য!
তুমি আমার সেইসব কষ্ট ফিরিয়ে এনেছো।
তোমার কণ্ঠস্বর স্বপ্নের মতো বাজে সারাক্ষণ। কী এক ঘোর, কী এক মোহ
এখন আমার জীবনে। সারাবেলা সুখের কষ্ট; একটু যদি মুখ ফিরিয়ে নাও
আমার দিক থেকে, একটু যদি উপেক্ষা টের পাই, আমার ঠোঁট কিশোরের মতো
অভিমানে কাঁপে। বুকের ভেতর অচেনা কষ্ট টের পাই।
সেদিন সকালে ঘুম ভাঙলো তোমার ডাকে। কেন তুমি আসতে চাইলে অমন করে?
তুমি না চাইলে তো একজীবনে আমার সাহস হতো না তোমাকে ডাকার।
তুমি এলে, বললে _ তোমার অনেক কাজ, আমি যেন সঙ্গ দেই। আমার
প্রস্তুতি তো তেমনই ছিলো; তুমি কেন অমন পাগলামীকে মেতে উঠলে হঠাৎ?
সব কাজ তুলে রেখে 'মৃগয়া'য় বসলে আমাকে নিয়ে। সিগারেটের প্যাকেট
কিনে দিলে। আমি তো বলেছিলাম, সিগারেট কিনে দেয়াটা খুব প্রতীকী,
মেয়েরা একমাত্র তার প্রিয়তম মানুষকে _ প্রিয়তম, অথচ যাকে সে
ভালোলাগার কথা বলতে পারছে না _ সিগারেট কিনে দেয়। তবু তুমি
জেনেশুনে আমাকেই সিগারেট কিনে দিলে কেন?
আমি কি তোমার প্রিয়তম মানুষ, অথচ সেটা বলতে পারছো না?
সেখানেই শেষ হলো না। তুমি ছাড়লে না আমাকে। বিকেল পর্যন্ত আটকে
রাখলে, এখানে সেখানে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়ালে। বাসায় কয়েকজন
বন্ধু আসার কথা ছিলো, আমি চলে আসতে চাইলাম, তুমি তবু ছাড়লে না।
সন্ধ্যে পর্যন্ত এভাবেই। আমার না হয় তাড়া নেই কোনোকিছুর, কিন্তু
তোমার তো সংসার আছে। তুমি কি ভুলেই গিয়েছিলে সেসব?
বাসায় ফেরার পর আর কিছু ভালো লাগে না। চারপাশে তুমি, শুধু তুমি।
আমার স্বপ্নে দেখা সেই মুখ, সেই কণ্ঠস্বর।
[পাঠক, আবারও বলছি, আবেগের এই বন্যা যদি আপনাকে লজ্জিত করে _ আমার
কোনো দোষ দেবেন না। দায়-দায়িত্ব সব আহসানের, এবং আপনারা তাকে
চেনেন, একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন। যাহোক, এটাই ওর ডায়রির প্রথম
পৃষ্টা। পড়ে আমার সন্দেহ হলো _ ব্যাপারটা পরকীয়া কী না। ওই যে
মেয়েটের সংসারের কথা বলা হয়েছে _ এর মানে কি? হঁ্যা, তাই, আমি পরে
তা জানতে পেরেছি।]
১১.৭.১৯৯৭
কালকে তুমি এসেছিলে।
যদিও সকালেই কথা হয়েছিলো ফোনে, তুমি কিন্তু বলোনি একবারও। অথচ
বেরুনোর সময় প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়েছো আমার কাছে আসার। দুপুরে আবার
ফোন। আমি বুঝিনি _ তুমি আসতে চাইছো। জিজ্ঞেস করলাম _ আসবে?
না বললে আসি কিভাবে?
এসো।
আচ্ছা।
এখনি আসবে?
হঁ্যা।
তুমি আসার পর বুঝলাম _ প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়েছো। একবার তো বলতে হয়
মেয়ে, নইলে বুঝবো কিভাবে যে তুমি আসতে চাও! তুমি যে স্বপ্ন, আমার
কি অতো সাহস আছে যে স্বপ্নকে ডেকে আনবো? তুমি তো জানো না, চেন না
নিজেকে _ বোঝ না, তুমি এই পঙ্কিল পৃথিবীর নও। স্বপ্নের পৃথিবীতে
বাস কর তুমি _ তুমিই পারো একজন নিঃসঙ্গ যুবকের হৃদয়ে হীরন্ময়
স্বপের জন্ম দিতে, তুমিই পারো একজন ক্লান্ত মানুষের সুখের কৈশোর
ফিরিয়ে আনতে।
তুমি এলে তিনটের দিকে। এসেই বললে _ তাড়া আছে, পাঁচটার মধ্যে ফিরতে
হবে। বুকটা দুলে উঠলো। এতো তাড়াতাড়ি চলে যাবে? তা, স্বপ্ন তো
ক্ষণিকের জন্যই আসে _ ভেবে দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম। কিন্তু তুমি অতো
নিষ্ঠুর স্বপ্ন নও। হঠাৎ করে ভেঙে গেলে যে কষ্ট পাবো _ জানো তা।
কথা শুরু হলে স্থির হয়ে বসে রইলে তুমি। কখনো মেতে উঠলে দুষ্টুমি আর
পাগলামীতে।
কতো যে কথা হলো! আমার কাছে এই আসা যাওয়া নিয়ে তোমার ভেতরে দ্বন্দ্ব
আছে, প্রশ্ন আছে, সংশয় আছে _ বোঝা যায়। হয়তো ভাবো, কাজটা ঠিক হচ্ছে
তো? আমার এ নিয়ে তোমাকে কিছু বলার ছিলো। বললাম _
মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে একই সঙ্গে একাধিক মানুষকে
ভালোবাসা। কিন্তু আমরা নানারকম নিয়ম-কানুন-সংস্কার-মূল্যবোধ দিয়ে
সেই প্রবণতাকে ধ্বংস করছি, বলছি _ তুমি শুধু একজনকেই ভালোবাসতে
পারবে। ভাবছি না, মানুষের হৃদয়ের বিসতৃতি যেহেতু অপরিসীম, সে কখনো
একজনের জন্য এংগেজড হতে পারে না। কেউ বিবাহিত হলে বা কারো একটি
প্রেম থাকলে সে বলে দেয় _ আমি এংগেজড। এটা একটা বিরাট ভুল। কোনো
মানুষই এতো বড় নয় যে সে একজন মানুষের পুরোটা হৃদয় জুড়ে থাকতে
পারবে। অন্য একজনের প্রবেশ সেখানে ঘটবেই।
তুমি আমার সঙ্গে একমত হয়েছিলে। এই তোমার এক চমৎকার গুণ _ নিজের
বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিপক্ষে গেলেও সত্যটাকে তুমি অস্বীকার কর না।
মানুষ একই সঙ্গে একাধিক মানুষকে ভালোবাসে, কিন্তু তা প্রকাশ করে না
তার পারিপাশ্বর্িকতার কারণে, তার মূল্যবোধের কারণে, তার
সমাজ-সংস্কার-সংসারের কারণে; আর এভাবেই, আমরা _ সভ্য মানুষেরা _
কতোগুলো বানোয়াট মূল্যবোধ নিজেদের ওপর চাপিয়ে নিজেদের
স্বাভাবিকতাগুলোকে হত্যা করছি _ একথা আমি একমাত্র তোমাকেই বোঝাতে
পেরেছি। আর বুঝেছো বলেই জেনেছো _ তোমার হৃদয় কী চায়! কিন্তু সে যে
আমার জন্য কী বিশাল এক প্রাপ্তি _ তুমি কি তা বোঝ? কালকে বলছিলে _
তোমার প্রিয়জনের বিকল্প হিসেবে নিজের অজান্তেই নাকি আমার কথা ভাবো
তুমি। _ মানুষের মন কী অদ্ভুত! _ তুমি বলেছিলে। হঁ্যা, মানব-হৃদয়ের
মতো রহস্যময় আর কিছু নেই পৃথিবীতে। নইলে কিছুই তো নেই আমার, তোমারও
অভাব নেই কোনোকিছুর, তবু কেন তুমি আমার কাছেই আসবে? কালকে বৃষ্টি
হচ্ছিলো খুব। মাতাল বৃষ্টি কি নিয়মছাড়া করেছিলো আমাদের দুজনকেই?
আমরা কি নিয়ম ভাঙার শক্তি অর্জন করেছিলাম প্রকৃতির কাছ থেকেই? আমি
বললাম_
তুমি বরং আজকে থেকে যাও।
কার কাছে থাকবো বলুন!
প্রশ্নটাই উদ্দেশ্যপূর্ণ। আমি কি আর কিছু বুঝি, মেয়ে! কি শুনতে চাও
বুঝেশুনেও তাই রহস্য করি _
তুমি তা জানো।
না জানি না, আপনি বলুন।
তোমার ওই শোনার আকুলতাটুকু ভালো লাগে আমার, বলি_
আমার কাছে থাকবে।
আমি কি তা পারি? _ তোমার কণ্ঠে তখন কী এক বেদনা, এক হাহাকার, এক
মিনতি ছিলো _ আমার বুকটা দুলে উঠেছিলো খুব।
কেন পারো না?
আমার যে সংসার আছে! সমাজ-সংসারের দায় আছে!
থাকুক। তা-ও তুমি পারো।
কিভাবে?
কারণ, মানুষ খুবই ইনডিভিজুয়াল প্রাণী, তুমিও তাই। তোমার সমস্ত
ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার একমাত্র তোমারই, সেখানে হস্তক্ষেপ
করার অধিকার সমাজ-সংসারের নেই।
কিন্তু আমি তো এসবকিছুকে কেয়ার করি।
সেটা আলাদা ব্যাপার। তোমার ওপর চাপিয়ে দেয়া মূল্যবোধ তোমাকে এসব
কেয়ার করতে শিখিয়েছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে এই যে, তোমার যে কোনো
বিষয়ে তোমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
তুমি ম্লান হেসেছিলে। আমি বললাম_
তুমি থাকতে পারছো না পরিস্থিতির জন্য, বুঝলাম। প্রশ্ন সেটা নয়,
প্রশ্ন হচ্ছে _ তোমার থাকতে ইচ্ছে করছে কী না।
আচ্ছা্ ধরুন ইচ্ছে করছে, তাহলে কি হবে?
ধরলে-টরলে হবে না, এখানে ধরাধরির কোনো সুযোগই নেই, তোমাকে
ডেফেনিটলি বলতে হবে _ হঁ্যা অথবা না।
হঁ্যা, ইচ্ছে করছে। এবার বলুন, আপনার কাছে থাকলে এর ফলাফল কি হবে?
সেটা তো সেই সমাজ-সংস্কারের প্রশ্ন। মূল্যবোধ ও নীতিবোধের প্রশ্ন।
এর কোনোকিছুই ঘটনাটিকে মেনে নেবে না। কিন্তু মানুষ কি এতোই
সীমাবদ্ধ প্রাণী যে তার ওপর যা-ই চাপিয়ে দেয়া হবে _ সে তাই-ই মেনে
নেবে? উচিৎ নয়, আমরা তবু তা মেনে নেই। আর এভাবেই আমরা কেটেছেঁটে
নিজেদেরকে ছোট করে ফেলি। মহীরুহ হবার জন্ম নিয়ে যে বৃক্ষের জন্ম,
তাকে কেটেছেঁটে কলাগাছ বানিয়ে ফেলি।
এসব কথা হয়তো তোমকে প্রভাবিত করে। তুমি বলেছিলে_
আজকাল নিজেকে আমার অন্যরকম লাগে। মনে হয়, এর আগে কখনো কেউ আমাকে
এমন করে দেখেনি। আপনার কথা শুনে নিজেকে আমার ইউনিক মনে হয়, মনে হয়
পৃথিবীতে আমার মতো আর কেউ-ই নেই। অবাক হয়ে ভাবি, একজন মানুষ আরেকজন
মানুষকে কী ভীষণভাবে প্রভাবিত করতে পারে, নিজের সম্বন্ধে সারা
জীবনের ধারণাগুলো বদলে দিতে পারে। প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতর
একটা গোপন জগৎ থাকে, আর সেই জগতে থাকে একজন বিশেষ মানুষ। এতোদিন
আমার এইসব কথা জানা ছিলোনা। এখন মনে হয় _ আপনিই সেই মানুষ।
[প্রিয় পাঠক, পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে বুঝতেই পারছেন। আমাদের কবি
সাহেব তার সমস্ত শক্তি ও পংক্তি নিয়ে নেমে পড়েছেন ওই মেয়েটিকে তছনছ
করে দেবার জন্য। কবিরা স্বভাতই অবিবেচক ও মিথু্যক। ভবিষ্যত পরিণতির
কথা না ভেবেই মিথ্যের ফুল ঝরিয়ে ঘটনাকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে
নিয়ে যায়।]
১৩.৭.১৯৯৭
তুমি দরজায় হেলান দিয়ে বসেছিলে ধ্রুপদী ভাস্কর্যের মতো। কী এক
আবেশে চোখ বুজে বসে আছো। বাইরে মুখর বৃষ্টি, মাতাল হাওয়া; দরজায়
তুমি, স্বপ্নময়ী দূরতম দ্বীপ আমার; আর ভেতরে আমার মলিন ভাঙাচোরা
ঘর, এলোমেলো আসবাব। এই বৈশিষ্ট্যহীন ঘরে তোমাকে মানায় না _ তুমি তো
স্বর্গের দেবী মেয়ে, এই ধুলোমলিন পৃথিবীতে ওই শুভ্র পা রেখেছো কেন?
দৃশ্যটি নিশ্চয়ই বাস্তব ছিলো না। আমার দরজায় তুমি _ এ কি ভাবা যায়?
যায় না। ও ছিলো এক স্বপ্নদৃশ্য, আমার সারাজীবনে দেখা শ্রেষ্ঠতম
স্বপ্নদৃশ্য।
হঠাৎ চোখ খুলে কী মনে করে হাত বাড়িয়ে দিলে তুমি । কী শুভ্র, সুন্দর
হাত! কোনো ভাষাই যেন যথেষ্ট বা উপযুক্ত নয় ওই সৌন্দর্য বর্ণনার
জন্য। তুমি হাত বাড়ালে, আর আমার বুকটা দুলে উঠলো। আহ, এতো কাছে
স্বপ্ন আমার, একটু যদি ছুঁয়ে দেখতে পারতাম। কিন্তু স্বপ্নকে কি
ছোঁয়া যায়, নাকি কেউ কোনোদিন পেরেছে ছুঁতে? আমার ইচ্ছের কথাটি
তোমাকে বলতেই একটু থমকালে তুমি, তারপর একটু বিরতি নিয়ে বললে _
আমারও ইচ্ছে করছে আপনাকে ছুঁয়ে দিতে।
আহ, তখন যদি বলতাম _ এই নাও আমার সমগ্র। শুধু স্পর্শ নয়, আলিঙ্গন
কর গভীরভাবে _ বলা হলো না। আসলে হতবাক হয়ে গেছি তোমার ওই কথা শুনে।
তুমি হয়তো তা বোঝোইনি। একটুক্ষণ পর তাই বিষণ্ন হয়ে বললে _ আমাকে
ছোঁয়ার মধ্যে কিছু নেই।
আছে কি নেই তুমি তার কি বুঝবে মেয়ে! সে তো বোঝার কথা আমার!
তুমি যে জ্যোতির্ময়ী। তুমি ছুঁয়ে দিলে আমার বুকের ভেতর মোহময়ী আলোর
প্রদীপ জ্বলে উঠবে। একটু ছোঁবে আমাকে? তোমাকে ছোঁয়া মানে তো
স্বপ্নকে ছোঁয়া। পৃথিবীতে কে কবে পেরেছে তার প্রিয়তম স্বপ্নকে
ছুঁতে? আমিও কি পারবো? পাবো কি তোমার একটুখানি হীরন্ময় স্পর্শ?
১৫.৭.১৯৯৭
মমন ভালো নেই আমার।
কতোকাল দেখিনি তোমাকে, কতোদিন কথা হয়নি!
এ কথা শুনলে তুমি হাসবে। বলবে, এই তো সেদিন দেখা হলো, কথা হলো _
কতোকাল কোথায়? আক্ষরিক অর্থে হয়তো তা সত্যি, এই তো সেদিন! কিন্তু
আমার বুকের গোপন কোটরে যে কিশোর ঘুমিয়েছিলো তুমি তাকে জাগালে কেন,
নইলে তো আর 'এই তো সেদিন' কে 'কতোকাল' বলে মনে হতো না আমার।
মন ভালো নেই আমার। তুমি পাশে নেই, তুমি কাছে নেই _ কি করে ভালো
থাকি বলো? শুনলে তুমি বলবে _ আমার তো পাশে থাকার কথা নয়, আমি তো
আপনার কেউ নই! হয়তো সত্যি এসব। তবু মেনে নিতে কষ্ট হয়। মনে হয় _
যদি তুমি পাশে থাকতে, যদি তুমি আমার হতে! মনে হয়, আমারই জন্য
তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো _ ভুল করে চলে গেছ অন্য কোথাও। তুমি যদি
পাশে থাকতে _ ভাবতেই কেঁপে উঠি আবেগে, উচ্ছ্বাসে। তোমাকে বড়
প্রয়োজন ছিলো আমার। তুমি তো জানো না মেয়ে, কী গভীর দুঃখ বুকে নিয়ে
বেড়াই আমি। কী ভয়াবহ অস্থিরতা আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। আজ
পর্যন্ত আমি স্থির হতে পারিনি কোথাও। আমার কখনো কোনো গন্তব্য ছিলো
না। আমি শুধু বয়ে চলেছি _ ঘটমান ঘটনাসমূহে আমার কোনো অংশগ্রহণ নেই,
ছিলো না; যেন কেবলই দর্শকের ভূমিকা পালন করবার জন্য জন্ম হয়েছে
আমার। কখনো চাইনি কিছু _ না অর্থ, না প্রতিপত্তি, না অন্যরকম কোনো
বৈষয়িক সাফল্য। পৃথিবীর কাছে আমি এক বেমানান জীব মাত্র। জীবনকে
দেখেছি ঈশ্বরের এক নিষ্ঠুর এক খেলা হিসেবে, কোনোরকম সাফল্যের জন্য
আমার তাই কোনো চেষ্টাই ছিলোনা। পড়াশোনা ছেড়েছিলাম, ভালো একটা
চাকরিবাকরির চেষ্টাও করিনি কোনোদিন। কি হবে এসব করে, কি লাভ? _
ভেবে ভেবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি সমস্ত কিছু থেকে। আর তা
করতে গিয়ে কতোই না কষ্ট পেতে হয়েছে আমাকে, হচ্ছে। ক্ষতবিক্ষত হয়ে
গেছি বিদ্রুপে, কটাক্ষে, নির্মম ঠাট্টায়। আমি তবু কাউকে বলিনি
কিছু। আমি তো জানি জীবন কতো অর্থহীন। কোনো মানেই হয় না এতোসব
আয়োজনের।
আমি শুধু চেয়েছি লিখতে।
একটি ভালো কবিতা লেখার জন্য আমার যে কী চোখ ভিজে ওঠা তৃষ্ণা ও
প্রতীক্ষা, তুমি যদি জানতে স্বপ্নময়ী! আমি জানি _ লেখাই আমার সব,
অথচ আমার আপনজনরা বিষয়টিকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। এ পৃথিবী শুধু
অর্থ ক্ষমতা প্রতিপত্তি চায় _ সৃষ্টি বা শিল্প চায় না। অথচ, তুমিই
বলো, শিল্পের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কি হতে পারে?
আজকাল খুব মনে হয়, তুমি আমার হলে আমি পেতাম এক সুনিশ্চিত আশ্রয়।
এইসব গ্লানি থেকে, বেদনা থেকে, হাহাকার থেকে রক্ষা করে আমারই জন্য
তুমি তৈরি করতে এক সুখের গৃহকোণ। br />
২১.৭.৯৭
ততুমি চলে গেলে, আর আমি কী বিপুল গভীর একাকিত্বে নিমজ্জিত হলাম!
তুমি তো থাকবে না আমার কাছে _ জানি তা, তবু কেন প্রতিবার এমন একা
হয়ে যাই, তুমি চলে গেলে? কেন আমার পৃথিবী এমন শূন্য হয়ে যায়?
তুমি চলে গেলে হাসিমুখে _ আমারই বন্ধুর সঙ্গে। তোমার চোখে কোনো
বেদনা দেখিনি, কষ্টের ছায়াপাত দেখিনি। কেনইবা আমার কথা ভেবে তোমার
চোখ কষ্টে ম্লান হবে, আমি তো কেউ নই তোমার! আমি কেউ নই, কারো ছিলাম
না, কোথাও ছিলাম না কোনোদিন। তোমার ওই অমল হৃদয়ে আমার জন্য স্থান
থাকবে কেন? তোমার এই নিরাবেগ চলে যাওয়া তাই হয়তো স্বাভাবিক। br />
ততখন বৃষ্টি হচ্ছিলো। রাত আর বৃষ্টি; আর এসবের মধ্যে আমি একা।
রিকশায় উঠতে ইচ্ছে করে না। অন্ধকার পথ ধরে হেঁটে যাই অবিরাম।
বৃষ্টিতে ভিজে যায় সমস্ত শরীর। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ি রাস্তার মধ্যে,
মুখ তুলে আকাশ দেখি। বৃষ্টির মায়াবী জল আমার চোখ ভিজিয়ে দেয়। ভেজা
ঝাঁপসা চোখে হেঁটে যাই আরো দীর্ঘপথ।
কোথায় যাবো আমি? আমার গন্তব্য কোথায়? কোন পথে হেঁটে যাচ্ছি, জানি
না তা। তুমি হয়তো এখন বাড়ি ফিরে পোশাক পাল্টে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
চোখ থেকে কাজল মুছে নিচ্ছো, আর আমি এই চিরচেনা-চিরঅচেনা শহরের পথে
পথে গন্তব্যহীন হেঁটে চলেছি। আর কতো হাঁটবো আমি? আর কতোদূর গেলে
তোমার দেখা পাবো? কতোদূর? আমার কোনো গন্তব্য নেই, অথচ আজকাল তোমার
কাছে যেতে বড় সাধ হয়। এই যে হাঁটছিলাম, মনে হচ্ছিলো _ পৃথিবীতে কি
এমন একটি পথও নেই যার শেষ সীমানায় তুমি আছো? আহা, যদি খুঁজে পেতাম
তেমন একটি পথ, অনন্তকাল হেঁটে হলেও আমি তোমার কাছে যেতাম, বলতাম _
আমি বড়ো ক্লান্ত, আমাকে বুকে তুলে নাও।
[এইখানে একটু পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করা দরকার। যেহেতু আমি ঘটনার
প্রত্যক্ষদর্শী নই, তাই পরে শুনেছি _ ওই সময় আহসান মেয়েটিকে ওর
বন্ধুদের সঙ্গে গর্ব করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলো। এর পরিণাম যে ওর
জন্য ক্ষতিকর হতে পারে ও তা ভাবতেই পারেনি। এখানে সেরকম একটি ঘটনার
বর্ণনা আছে। আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানানো দরকার _ আহসান তখন বেকার
জীবনযাপন করছে। কতৃপক্ষের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় পত্রিকার চাকরিটা
ছেড়ে দিয়ে জমানো টাকায় আবার একটা মোবাইল ফোন কিনে ফেলেছে।
যোগাযোগের জন্য উত্তম ব্যবস্থা। হাতেও অফুরন্ত সময়। প্রেমের জন্য
অতি উৎকৃষ্ট এবং অনূকূল পরিস্থিতি।] br />
২৫.৭.৯৭
ককাল তোমার সারাদিন ছিলো আমার জন্য। আমার জন্য! শুধু আমারই জন্য
তুমি _ ভাবতেই বুক দুলে ওঠে। আহা, যদি তুমি শুধু আমারই হতে, শুধুই
আমার!
সকাল হতে না হতেই তোমার কাছে গিয়েছিলাম। গতরাতে তুমি ডেকেছিলে
আমাকে _ আমার কি সাধ্য তোমার ওই মোহন ডাককে অস্বীকার করবো? গতকাল
বিকেলেই তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিলো, আমি যাইনি [অভিমানে?],
তুমি ফোন করলে, তাও ফিরিয়ে দিয়েছি [এতোটা?], রাতে আবার ফোন। জরুরী
দরকার। জরুরী? আমাকে না দেখে থাকা যাচ্ছে না, না সোনামণি?
তোমার বাড়িতে তুমি কিশোরী সেজে ছিলে। দুই বেণী ঝুলিয়ে, চোখে-মুখে
দুষ্ট হাসি মেখে এক আহ্লাদী কিশোরী। তোমার চোখে কাজল ছিলো। ইদানিং
তোমাকে কাজল পড়তে দেখছি, পায়ে পড়ছো নূপুর। আগে তো এসব পড়তে না! আমি
একদিন বলেছিলাম _ তোমার চোখ হচ্ছে কাজল পড়ার চোখ, আর পা নূপুর
পড়ার। তুমি কি তাহলে আমার জন্যই পড় এখন?
তোমার চোখ, ওই চোখে আমি আমার মরন দেখেছি।
তুমি শাড়ি পড়ে বেরুলে আমার সঙ্গে। তোমার জরুরী কাজ এক ফোনেই সাঙ্গ
হলো। তারপর এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো। এই প্রথম তুমি ভালোবেসে আমার হাত
ধরলে। তোমার চোখ বন্ধ। স্পর্শে কাঁপন। এই স্পর্শ কি কাঙ্ক্ষিত ছিলো
তোমার কাছে? নইলে অমন কাঁপছিলে কেন?
বিকেলের দিকে তুমি বললে _ তোমার ঘুম পাচ্ছে। আমার ঘুরে বেড়ানোর
ইচ্ছে ছিলো _ কিন্তু তোমার কথা শুনে সাহস করে বললাম, তাহলে আমার
বাসায় চলো, ঘুমোবে। তুমি রাজি হয়ে যাবে, কল্পনাও করিনি। এমনি এমনি
আসা আর ঘুমোতে আসার মধ্যে কী বিপুল পার্থক্য, তুমি কি তা বোঝ না?
আমার ভাঙাচোরা মলিন ঘরে তুমি এলে। তুমি তো রূপকথার রাজকন্যা, এই
ঘরে এলে লজ্জায় বিমূঢ় হয়ে যাই। এই ঘরে যে অনেক ধুলো _ তোমার রাঙা
পা যদি ধুলোমলিন হয়ে যায়? স্বর্গের দেবী, তুমি এই মলিন পৃথিবীতে
এসেছো কেন? আমার দরিদ্র ঘরদোর তোমার মোহন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো।
তুমি তো আমার আঁধার ঘরে স্নিগ্ধ প্রদীপ মেয়ে, আমার বুকে তুমি শত
বছরের জমাট অন্ধকার সরিয়ে মায়াবী আলো ছড়াও। তুমি এসে বললে _ আমি
ঘুমোবো। আমার বুক দুলে উঠলো এক অসামান্য ঘটনার আভাস পেয়ে।
তুমি বিছানায় গিয়ে বসলে _ খানিকটা দ্বিধায়, কিছুটা সংকোচে। তবু
অনেকখানি আপনজনের মতো _ পা গুটিয়ে বসে আছো _ আমার অসংজ্ঞায়িত
আপনজন। আমি অপেক্ষা করছিলাম _ সত্যিই কি তুমি ঘুমোবে, ভেবে। একসময়
_ সে এক অলৌকিক মুহূর্ত _ তুমি শুয়ে পড়লে। পা গুটিয়ে, এমনকি পায়ের
পাতাটি পর্যন্ত ঢেকে রেখেছো শাড়িতে, বুকে আঁচল জড়িয়েছো নিপুণভাবে,
যেন একবিন্দু প্রকাশিত হতে না হয়। দুই হাত জড়ো করে মাথার নিচে রেখে
কাত হয়ে শুয়ে আছো। তোমার চোখে সন্ধ্যার শান্ত ছায়া জমে আরো গভীর
আরো মায়াময় করে তুলেছে। তাকিয়ে আছো কী এক অব্যক্ত ভাষা নিয়ে _
অপলক, নীরবে।
আহ, তুমি এতো সুন্দর কেন? কেন এতো সুন্দর? তোমার এই রূপ আমাকে পাগল
করে দেয়।
তুমি শুয়ে আছো _ যেন এক নতুন বউ _ দ্বিধায়, লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে।
আমার ভেতরে তখন রোমাঞ্চের তুমুল হাওয়া। কে বলবে তুমি আমার বউ নও?
কথাটা বলতেই তোমার চোখে ছায়া ঘনিয়ে এলো। গোধূলী লগ্ন তোমার
চোখেমুখে বিষণ্নতার প্রলেপ মাখিয়ে দিলো। কেন অমন বিষণ্ন হয়ে গেলে
মেয়ে? আমার হাত নিজের হাতে টেনে নিয়ে বললে _ আমি তো তোমার বউ নই,
বন্ধু। বন্ধু হয়েই থাকতে চাই _ আমি তো জানি সে কথা। তুমি আমার বউ
হলে, আমার সঙ্গে থাকলে পৃথিবীটা খুব অন্যরকম হতো, আর আমি
নিশ্চিন্তে নির্মাণ করতে পারতাম এমন নিখুঁত-নিপুণ শিল্প যে তা হতো
ঈশ্বরের সৃষ্টির চেয়েও নিপুণ। হয়তো সেজন্যই ঈশ্বর ভয় পেয়ে ছিনিয়ে
নিয়েছেন তোমাকে আমার কাছ থেকে। আমি যে শিল্প সৃষ্টিতে তাঁর
প্রতিদ্বন্দ্বী!
[হায় বন্ধু আমার, এতো সিরিয়াস কবি হয়েও তুমি যে এমন ইমদাদুল হক
মিলনের চরিত্র হয়ে উঠেছিলে _ জেনে আমার করুণা হচ্ছে।] br />
৬.৮.৯৭
পপ্রতিমুহূর্তে কি অদ্ভুতভাবেই না বদলে দাও আমার জীবনযাপন। কখনো
আমাকে তুমি করে তোলো বিশ্বজয়ী সম্রাটের মতো গৌরবদীপ্ত, কখনো
দীনহীন ভিখারী। আমার স্বর্ণালী কৈশোর ফিরিয়ে এনেছিলে তুমি, তুমিই
পায়ে দলে চলে গেছো আমার সকল আবেগ। তুমিই পারো এতো প্রেম, এতো মমতা,
এতো ভালোবাসা, এতো আবেগ পায়ে দলে চলে যেতে।
বুকের ভেতর এখন কেবল দিগন্তবিসতৃত হাহাকার, হৃদয়ের অসীম আকাশ জুড়ে
কেবল ধূ ধূ শূন্যতা। তুমি নেই, আমার পৃথিবীতে আর কিইবা রইলো? আমি
তো একাই ছিলাম চিরকাল, ছিলাম প্রায় ঈশ্বরের মতো নিঃসঙ্গ। আমাকে
সবাই দেখেছে কেবল দূর থেকে _ কখনো শ্রদ্ধার চোখে, কখনো ঘৃনার।
প্রশ্নহীন আনুগত্য পেয়েছি কখনো, পেয়েছি কারণহীন বিদ্বেষও। কিন্তু
অমি এসবের কিছুই চাইনি। কেবল চেয়েছি _ কেউ একজন আমার ভেতরের
মানুষটিকে বের করে আনুক। আমার মধ্যে যে বাস করে ভিন্ন এক মানুষ _
মাঝরাতে যে অকারণে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে, বৃষ্টির
সঙ্গে একা একা কথা বলতে গিয়ে নিজেই বৃষ্টি হয়ে যায়, কবিতা লিখতে
গিয়ে নীরবে কাঁদে, অবিরাম খুঁজে ফেরে মোহনীয় এক আশ্রয় _ তাকে কেউ
আপন করে নিক।
তোমাকে দেখে কেন যে মনে হলো _ তুমি-ই সেই মেয়ে! আর কী আশ্চর্য
কুশলতায় তুমি পরতে পরতে খুলে নিচ্ছিলে আমাকে। আমারও যে কী হলো _
সমস্ত অর্গল খুলে দাঁড়ালাম তোমার সামনে।
তুমি পেরেছিলে আমাকে খুলে ধরতে, তুমিই পারতে সব।
অথচ আজ তুমি পায়ে দলে চলে গেছো সমস্ত প্রেম। যেন আমাকে এড়াতে
পারলেই বাঁচো। যেন আমাকে আঘাত করাতেই তোমার সুখ। তোমাকে চেয়েছি
আমি, সেই চাওয়াকে তোমার দখল মনে হলো? আমি তো তোমাকে দখল করে রাখতে
চাইনি _ চেয়েছি কেবল একটুখানি সময়, এতোটুকু মোহন স্পর্শ। অতোটুকু
চাওয়া কি খুব বেশি মনে হলো তোমার? তুমি যে স্বপ্ন আমার, এই একটি
পুরো জীবনে আমার একমাত্র প্রেম, তোমার কাছে না চাইলে আর কার কাছে
চাইবো বলো? তোমার সময় এখন অন্যত্র পরিব্যাপ্ত। এ নিয়ে কি খুব ঈর্ষা
আছে আমার? একে কি ঈর্ষা বলা যায়? হয়তো যায়, কিন্তু ঈর্ষার চেয়েও
গভীর বোধ হয় দুঃখ। আমার জন্য এখন আর একটুও সময় নেই তোমার। কতোদিন
তুমি নিজে থেকে ফোন করনা, আমি করলে ভালোভাবে কথাও বলনা। এখন তুমি
আর বন্ধুহীন নও। হয়তো আমার চেয়ে তার গুরুত্ব তোমার কাছে অনেক বেশি।
এ নিয়ে কি-ইবা বলার আছে আমার?
এখন আর আমার কাছে আসো না তুমি, আমার পাশে বসনা, আমার সঙ্গে কথা
বলনা, একসঙ্গে রিকশায় ওঠো না, আমি সময় চাইলে সেটাকে তোমার কাছে দখল
মনে হয়! এতো উপেক্ষা তোমার? এতোটা? বেশ, তবে তাই হোক। তুমি যেমন
চাও, তেমনই হোক। তুমি আমার জ্যোতির্ময়ী সুদূর নক্ষত্র হয়েই থাকো।
আমি না হয় দূর থেকেই তোমাকে দেখবো। তুমি ভালো থাকো স্বপ্ন আমার,
আমার একমাত্র প্রেম, তুমি সুখে থাকো। আমি ফিরে যাই আমার গন্তব্যহীন
পথচলায়। এক জীবনে পৃথিবীর কাছে খুব বেশিকিছু চাওয়ার ছিলো না আমার;
খুব সামান্য চাওয়াও পূরণ হয়নি কোনোদিন। তুমিও চলে যাবে, তোমার সময়
আর আমার জন্য ব্যয়িত হবে না, এই-ই বোধহয় স্বাভাবিক।
আমার হয়তো কিছু পাওয়ার যোগ্যতাই ছিলো না, তবু তুমি আমাকে অনেক
দিয়েছো। দিয়েছো হীরন্ময় স্পর্শ, তুমুল প্রেম, ফিরিয়ে এনেছো কৈশোরিক
অভিমান। আমি না হয় সেগুলোকেই অমূল্য রত্নের মতো বুকের গোপন
সিন্দুকে সাজিয়ে রাখি। তুমি ভালো থেকো জোনাকি মেয়ে। কোনোদিন পেছন
ফিরে দেখো না। ফিরলেই দেখতে পাবে _ এক ক্লান্ত বিপন্ন যুবকের হৃদয়ে
অবিরল রক্তক্ষরণ। দেখবে মাঝরাতে বৃষ্টির ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক
দুঃখী ছায়া। দেখবে তোমার রূপ ঐশ্বর্যের দিকে কাঙালের মতো তাকিয়ে
থাকা এক নিঃস্ব মানুষ।
আমার জন্য নষ্ট করো না আর একটি মুহূর্ত। আমি আগের মতোই এ শহরের পথে
পথে মধ্যরাত অব্দি ঘুরে বেড়াবো। আর অনন্তকাল হেঁটে যাবো সেই পথ ধরে
যে পথের শেষ প্রান্তে তুমি তোমার এক টুকরো মমতা ছড়িয়ে রেখেছো।
২০.৮.৯৭
ববাইরে থেকে ফিরে দরজায় তালা ঝুলতে দেখেই বুঝে যাই _ ও ঘরে আমার
জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই। এ তো জানা কথা, তবু প্রতিদিন আমার কেমন
মন খারাপ হয়ে যায়, বুক চিরে বেরিয়ে আসে অচিন দীর্ঘশ্বাস।
কেন এমন হয় আমার?
তালা খুলে দরজায় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার সেই বৈশিষ্ট্যহীন মলিন
ঘর _ আমার নিজস্ব পৃথিবী; সেই পুরনো বিছানা, আর সেখানে তুমি।
আমার চোখে ধাঁধাঁ লেগে যায়। তুমি! তুমি শুয়ে আছো! সেইরকম জড়োসড়ো
ভঙ্গি। যেন আমার নতুন বউ তুমি _ তেমনই লজ্জা, সংকোচ, দ্বিধা নিয়ে
গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছো। আমার হাতে রেখেছো তোমার কম্পমান করতল।
তোমার চোখে দ্বিধা আর বিষণ্নতা মাখা এক অলিক সমর্পণ। ঘোরগ্রস্থের
মতো আমি এগিয়ে যাই ধীরপায়ে। শব্দ করতেও ভয় হয় _ যদি দৃশ্যটা হারিয়ে
যায়! হাঁটু গেড়ে বিছানার পাশে বসি। তোমাকে ছুঁতে গিয়ে বুঝতে পারি,
তুমি নেই _ এ এক স্বপ্নদৃশ্য।
তবু তোমার স্পর্শমাখা জায়গাটুকুতে হাত বুলাতে থাকি অবিরাম। এখানে
তোমার স্পর্শ আছে, আমি গাল ঠেকিয়ে সেটুকুই পেতে চাই। আর হঠাৎ করেই
টের পাই _ আমার চোখ ভিজে উঠেছে।
তুমি নেই, আর আসবে না কখনো আমার কাছে, এ তো স্বাভাবিক ঘটনা _ তবু
কেন প্রতিনিয়ত আমার চোখ ভিজে ওঠে, বুকের ভেতর ঘটে যায় শতাব্দীর
ভাঙচুর!
আমি তোমার কাছে কি-ই বা চেয়েছিলাম? এই এতোটুকু সানি্নধ্য, এতোটুকু
মমতা, এতোটুকু ভালোবাসা। চেয়েছিলাম কিছু অমলিন দৃশ্য, কিছু ধ্রুপদী
ভাস্কর্য। অসীম ঐশ্বর্যময়ী তুমি, আমাকে অতোটুকু দিলে তোমার একটুও
কমতো না _ তবু তুমি চলে গেলে। br />
আআজ আর আমাকে মনেও পড়ে না তোমার। একেকটি দিন চলে যায়, যেন একটি
শতাব্দী গেলো _ জীবন এখন এমনই ভারি হয়ে উঠেছে আমার কাছে। কাছে আসা
তো দূরের কথা _ একবার ফোনও করনা তুমি। শেষবার যখন এসেছিলে আমার
হয়ে, বলেছিলে _'তোমাকে না দেখে দুদিনের বেশি থাকা যাচ্ছে না।' আর
এখন অনন্তকাল চলে যায়, ভেবেও দ্যাখোনা তোমার একটুখানি মমতার
প্রত্যাশায় কেউ একজন সমস্ত কাজ ফেলে বসে আছে।
জানি, আমার কাছ থেকে কিছুই পাওয়ার ছিলো না তোমার। যা ছিলো সবই
আমার। আমারই প্রেম, আমার আবেগ, একটুখানি স্পর্শের জন্য তুমুল
প্রতীক্ষা। তুমি এ-সবকিছু নির্দ্বিধায় মারিয়ে চলে গেছো।
আর কখনো আসবে না তুমি । আমার আর কি-ইবা রইলো এক চোখ-ভিজে-ওঠা
হারানোর গল্প ছাড়া! আর কি রইলো আকণ্ঠ বিষপাণে নীল হয়ে যাওয়া ছাড়া!
পপ্রিয় পাঠক, এটাই আহসানের ডায়রির শেষ পৃৃষ্টা।
আগেই বলেছি _ কৌতূহলী হয়ে আমি মেয়েটিকে খুঁজে বের করেছি। ওকে
দেখার পর আমি অসম্ভব বিস্মিত হয়েছিলাম। আহসানের ডায়রি থেকেই জেনেছি
_ মেয়েটি খুবই রূপসী। কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো, ওটা ওর আবেগ,
প্রেমে পড়লে মানুষের সৌন্দর্যজ্ঞান লুপ্ত হয়, মাঝারি গোছের
রূপসীরাও তাদের পাগল-প্রায় প্রেমিকদের কাছে তীব্র রূপসীর মর্যাদা
পেয়ে যায়। মনে করেছিলাম _ এ ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তেমনই ঘটেছে।
তাছাড়া, আহসান কবি মানুষ, হয়তো ওর ওই ভাষার জন্যই মেয়েটিকে অমন
মোহনীয় মনে হয়েছে। কিন্তু ওকে দেখার পর আমার ভুল ভাঙলো। মনে হলো _
মেয়েটি এতোই রূপবতী যে তা প্রকাশ করার মতো ভাষা আহসানের ছিলোনা,
আমার তো নেই-ই। ওকে দেখে প্রথমেই কয়েকটি ব্যাপার চোখে পড়ে যায়।
যেমন _ মেয়েটি যে বিবাহিত তা বোঝার উপায় নেই, অথচ আহসানের সঙ্গে
পরিচয় হওয়ার সময়ই ও বিবাহিত ছিলো, হিসেব করলে মনে হয় _ ওর বিয়ে
হয়েছে অন্তত দশ বছর আগে। তার মানে বিয়েটা হয়েছিলো অল্প বয়সে, কারণ
এখন বয়স ২৬/২৭-এর বেশি হবে না। দ্বিতীয়ত _ মেয়েটির ফিগার চোখে পড়ার
মতো। লম্বায় প্রায় পাঁচ ফুট ছয়/সাত ইঞ্চি, সম্ভাব্য মাপটি
৩৫-২৫-৩৬; উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন ফিগার খুব কম দেখা
যায়। তৃতীয়ত _ রূপসীরা স্বভাবতই প্রকাশপ্রিয়-প্রকাশোন্মুখ হয়,
নানাভাবে নিজেদের রূপ অন্যের সামনে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে।
কিন্তু এই মেয়েটি ব্যতিক্রম। নিজেকে এমনভাবে ঢেকে রাখে যেন _
আহসানের ভাষায় _ 'একবিন্দু প্রকাশিত হতে না হয়।' অর্থাৎ ভীষণ
মার্জিত ওর পোশাক আশাক। কিন্তু ঈশ্বর যাকে এতো দিয়েছেন, সে নিজেকে
কতোটুকুই বা ঢেকে রাখতে পারে? অতএব নিজেকে আড়াল করার জন্য এতো
চেষ্টার পরও ওর ওই দুর্দান্ত শরীরের আভাস ঠিকই পাওয়া যায়। চতুর্থত
_ এ সব কিছু ছাপিয়ে যা চোখে পড়ে _ তা ওর মমতামাখা অনিন্দ্যসুন্দর
মুখখানি। তখন মনে হয় এতো সুন্দর ফিগার না হলেও শুধু এই মুখের দিকেই
তাকিয়ে থাকা যেতো ঘন্টার পর ঘন্টা।
তো মেয়েটির সঙ্গে পরিচয়ের পরে বোকার মতো আহসানের সঙ্গে ওর সম্পর্ক
নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে ওকে বিগড়ে দিইনি। একটা পর্যায়ে এমনিতেই ওর
কথা চলে এসেছে, আহসান যে আমার বন্ধু সেটাও ওর কাছে গোপন করিনি _
এবং এ প্রেক্ষিতে ও খুব অবাক হয়ে বলেছে, 'তাই নাকি? ও ওর এতো
বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, আপনার সঙ্গে দেয়নি কেন?' আমি
বলেছি, 'ওই সময় আমি চাকরিসূত্রে ঢাকার বাইরে ছিলাম।' তো, একদিন _
কোনো এক আবেগপ্রবণ মুহূর্তে _ বেশ ইমোশনাল হয়েই মেয়েটি আহসানের
সঙ্গে তার সম্পর্কের ব্যাখ্যা দেয়। ওর মুখেই সেই ব্যাখ্যা শুনুন।
আহসানের কাছে আমার অনেক ঋণ। ও আমাকে নতুন করে জীবনকে দেখতে
শিখিয়েছে, ভাবতে শিখিয়েছে। আমি তো নিছক এক গৃহবধু ছিলাম, ও-ই আমাকে
বন্দি গৃহকোণ থেকে একটানে বিশাল এক পৃথিবীর কেন্দ্রে এনে দাঁড়
করিয়ে দিয়েছে। আমি নিজেকে চিনতে পেরেছি, বুঝতে পেরেছি, যেসব বিষয়ে
সংশয়-সন্দেহ-সংকট ছিলো সেসব থেকে মুক্তি পেয়েছি আহসানের জন্যই।
যেমন ধরুন _ আমার স্বামীর ব্যাপারে সবসময়ই আমার সংশয় ছিলো যে, ওকে
সত্যিই আমি ভালোবাসি কী না। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে কিছু ভাবার সাহস
পেতাম না। দীর্ঘদিনের লালিত মূল্যবোধ, সংস্কার আর নৈতিকতার ভুল
কনসেপ্ট বয়ে বেড়িয়েছি যে! আহসানই প্রথম ওইসব কুপমণ্ডকতা থেকে
মুক্তি দিয়েছিলো আমাকে। ওর কাছ থেকে আমি পেয়েছি হৃদয়ের মুক্তি, আর
একইসঙ্গে যে অনেক মানুষকে ভালোবাসা যায় এই সত্য ধারণ করার সাহস।
কিন্তু শুধু হৃদয়েরই নয়, একইসঙ্গে আমি চেয়েছিলাম শরীরেরও মুক্তি।
নিজের রূপ নিয়ে আমার কখনো সংশয় ছিলো না _ কোনো রূপসীরই তা থাকে না।
আমার এই রূপ নিয়ে যে গর্ব করা যায়, নিশ্চয়ই তা স্বীকার করবেন! [আমি
অকপটে স্বীকার করছি।] তো, আমার মনে হতো _ এসবকিছু বৃথাই গেলো। ওই
একঘেয়ে পুরনো স্বামী নামক ভদ্রলোকের প্রায় জংধরা শরীরের নিচে পিষ্ট
হওয়া ছাড়া এই রূপের যেন কোনো ভূমিকাই নেই। এরকম মনে হলেও এর অন্যথা
যে সম্ভব, সম্ভব নিজেকে মেলে ধরা _ সেটা ভাবতেও পারতাম না। ওই যে
মূল্যবোধ! বিয়ের আগে আমার একটি প্রেম ছিলো _ আপনি বিশ্বাস করবেন কী
না জানি না [আমি না শুনেই বিশ্বাস করে ফেললাম], তার সঙ্গে আমার
কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি ওই একই কারণে। কিন্তু যখন হৃদয়ের মুক্তি
ঘটে গেলো, যখন ভাবতে শিখলাম _ একই সঙ্গে একাধিক মানুষকে ভালোবাসার
মধ্যে কোনো পাপ নেই, বরং সেটাই মানুষের জন্য স্বাভাবিক _ তখন
চাইলাম শরীরের মুক্তিও ঘটে যাক, এবং সেটা আহসানের মাধ্যমেই।
অস্বীকার করবো না, আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। জানি না ও আপনাকে
বলেছে কী না _ আমি অনেকবার ওর বাসায় গিয়েছি। কিন্তু অন্তত একবার
গিয়েছিলাম একেবারে পরিকল্পনা করে বলে কয়ে যে ওর ঘরে ঘুমোবো। এমনকি
ওর ঘরে গিয়ে ওর বিছানায় পর্যন্ত শুয়ে পড়েছিলাম আমি। একজন যুবতী
একজন যুবকের ঘরে শুয়ে পড়ার অর্থ কি, একথা সবাই বোঝে। আহসানও
নিশ্চয়ই বুঝেছিলো কিন্তু কিছুই করলো না। আমি যেখানে সবটুকু দেয়ার
প্রস্তুতি নিয়ে গেলাম, সেখানে ও শুধু হাত ধরেই সন্তুষ্ট রইলো।
আশাভঙ্গ হয়েছিলো, স্বীকার করছি, কিন্তু কিছু মনে করিনি। আহসান
লাজুক, ভালোমানুষ, শুধু আমার শরীরের প্রতি ওর নজর নেই, ও আমাকে সব
মিলিয়েই ভালোবাসে, অতএব পাওয়া মাত্র আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মানুষ
সে নয় _ এসব ততোদিনে বুঝে গেছি। ওর আরো সময় লাগবে এটাও বুঝলাম।
কিন্তু আমি আর তখন ধৈর্য ধরার অবস্থায় নেই। শরীরের মুক্তি তখন
তীব্রভাবে কাম্য হয়ে উঠেছে। তাই পুরনো প্রেমিকের কাছেই ফিরলাম।
কিন্তু ঘটনাটা সরল বিশ্বাসে আহসানের কাছে বলতেই এক অদ্ভুত ঘটনা
ঘটলো। আমি ভেবেছিলাম _ ওর তত্ত্বকে কাজে পরিণত করেছি জেনে ও খুশি
হবে, কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ও ঈর্ষায় নীল হয়ে যাচ্ছে।
কিছুতেই ঘটনাটা মানতে পারছে না। ও ওর কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আমার
পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো _ এমনকি তাদের সঙ্গে মেলামেশাটা পর্যন্ত
অনুমোদন করছে না। আমার তখন সংশয় জাগলো। তবে কি আহসান যে
তত্ত্বকথাগুলো বলে সেটা আমাকে ওর নিজের দিকে টানার জন্য?
প্রকৃতপক্ষে কি ও নিজের জন্য কথাগুলো বিশ্বাস করেনা? অর্থাৎ ওর
নিজেরর আপনজন একইসঙ্গে একাধিক মানুষকে ভালোবাসবে এটা মানতে পারে
না! আমার মনে হলো ও আমাকে দখল করে রাখতে চায়। কিন্তু আমি তো মুক্তি
চেয়েছি অন্য একজনের দখলে যাবার জন্য নয়। ওদিকে আমার পুরনো
প্রেমিকের অবস্থা আরো খারাপ। তার হাবভাব এমন যে সে আমার স্বামীকে
পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না। রাতে আমি স্বামীর বাহুলগ্ন হই কেন _ এ
নিয়ে রীতিমতো রাগারাগি। আহসান অন্তত তাকে ঈর্ষা করতো না, এ দেখি এক
কাঠি ওপরে। যেন নিজে থেকে তার কাছে এসেছি বলে আমি তার সম্পত্তি হয়ে
গেছি, অথচ আামর বিয়ের পর সে আমার সঙ্গে একবার যোগাযোগ পর্যন্ত
করেনি। বুঝলাম, ইনিও আমাকে দখলে রাখতে চান। মানুষ স্বভাবতই
দখলপ্রবণ, জানি। কিন্তু এ-ও জানি কোনো মানুষই অন্য একজনের দখলে
যেতে চায় না। [আমার বলতে ইচ্ছে করছিলো _ প্রেম তো এমনই। একে কি দখল
বলা যায়? তোমার কোনো প্রেমিক যদি তোমারই সামনে অন্য কারো সঙ্গে
মিলিত হতো তুমি কি সইতে পারতে, মেয়ে? পারতে না। তবে কি বলবো তুমিও
দখলপ্রবণ! প্রেমিককে তুমিও দখলেই রাখতে চাও? _ কিন্তু কিছু বললাম
না। মেয়েটিকে খেপিয়ে দেয়ার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই।] আর আমি? সফল
স্বামীর সুখী গৃহকোণের কথা না ভেবে যে মুক্তির কথা ভেবেছে, তার
পক্ষে কিভাবে এটা মেনে নেয়া সম্ভব? এজন্যই আহসানকে আর আমার পুরনো
প্রেমিককে ছেড়ে এলাম আমি। না, আহসানের প্রতি আমার কোনো রাগ নেই। ও
অন্তত লম্পট নয়। নইলে ওর প্রতি আমার যে মোহমুগ্ধতা ছিলো, এখনও আছে,
সেটাকে ব্যবহার করে ও আমাকে লুটেপুটে খেতে পারতো। ও নিঃসন্দেহে
খাঁটি প্রেমিক, নিপাট ভদ্রলোক। কেবল বন্দি হতে চাইনি বলে চলে
এসেছি। প্রেমিক ভদ্রলোকের প্রতি কিন্তু ওই প্রেমের আর এতোটুকুও
অবশিষ্ট নেই। বহুদিন ধরে তার কথা ভেবে আমি কষ্ট পেয়েছি _ সেসব কথা
মনে পড়লে এখন হাসি পায়। তো, ওদের দুজনকে ছেড়ে এসে আমার প্রেম হলো
আহসানেরই এক বন্ধুর সঙ্গে। [কে সে? আমার জানতে ইচ্ছে হলো। আমাদের
দুজনেরই তো কমন বন্ধু অনেক _ তাদেরই কেউ নয় তো! এতো বড় সৌভাগ্যবান
বন্ধু তো চোখে পড়ছে না!] কিন্তু বেশিদিন চললো না সেটাও। এখন যেটা
আছে, বুঝতে পারছি সেটারও মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। সবাই কেবল দখল
করে রাখতে চায় আমাকে। আমি কেন তা হতে দেব? আপনি হয়তো ভাবছেন _ আমি
এক বিকৃৃত রুচির মেয়ে। ভাবছেন _ আমি আমার স্বামীর সঙ্গে ক্রমাগত
প্রতারণা করে যাচ্ছি। না, তা করছি না। বরং আগে আমি নিজের সঙ্গে
প্রতারণা করতাম, মন যা চাইতো করতাম তার উল্টোটা। এখন আমি আমার
আকাঙ্ক্ষার কাছে সমর্পিত। আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দিতে শিখেছি বলেই
আমি এখন সুখী, আর সুখী বলেই আমি ঘরে আগের চেয়ে অনেক বেশি
মনোযোগী...
ননা, আমি এসবের কিছুই ভাবছি না। ভাবছি অন্য কথা। মেয়েটি আমার ফোন
নম্বর চেয়েছিলো _ লজ্জায় বিমূঢ় হয়ে জানাতে হয়েছে _ আমার কোনো ফোন
নেই। ভাবছি, চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে জমানো টাকায় একটা মোবাইল ফোন কিনে
ফেলবো কী না ! যোগাযোগের জন্য ওটা খুব উত্তম ব্যবস্থা। আর চাকরি
ছেড়ে দিতে পারলে হাতে থাকবে অফুরন্ত সময়, অখণ্ড অবসর...
|
| |
 |
|