[এই গল্পের একটা ভূমিকা আছে, সেটাই আগে দেয়া
যাক।
লেখক হওয়ার অনেক বিড়ম্বনা, তবু কিছু কিছু মানুষ নিজেদের স্বভাবদোষে
সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য (কখনো কখনো নিগৃহিত) এই গোষ্ঠীতে সানন্দে
নিজের নাম অন্তর্ভূক্ত করেন। কী কী বিড়ম্বনা লেখকদের পোহাতে হয় তা
লেখক মাত্রই জানেন। যেমন, লেখালেখি ব্যাপারটিকে সমাজের আর দশটা
মানুষ কোনো কাজ বলেই গন্য করে না, ফলে 'লেখক' পরিচয়টি এই সমাজে
কোনো আইডেন্টিটিই নয়। আবার একটু ব্যতিক্রমী জীবন যাপন করার ফলে
প্রায়ই লেখকদেরকে অসামাজিক, ভিন্ন গ্রহের কোনো এক অদ্ভুত জীব
হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইত্যাদি। কিন্তু আমি বিশেষ করে একটি
বিড়ম্বনার কথা বলবো _ আমি নিজে বহুবার এর শিকার হয়েছি _ এক শ্রেণীর
লোক স্যোৎসাহে নিজেদের জীবনকাহিনী লেখকদেরকে শোনানোর চেষ্টা কওে,
শুধু শুনিয়েই ক্ষান্ত হলে কথা ছিলো না, তারা আবার অনুরোধও করে যেন
তাদের জীবনের এই অসামান্য কাহিনীটি নিয়ে একটি উপন্যাস, নিদেনপক্ষে
একটি গল্প লেখা হয়। তারা বোঝে না _ বোঝার কথাও নয়, লেখকের যন্ত্রণা
বুঝতে হলে লেখকই হতে হয়, অন্য কারো পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব নয় _
একজন মানুষের জীবনকাহিনী 'শুনে' গল্প লেখা কতো কঠিন। তবু এই ধরনের
কিছু গল্প আমি এর আগে লিখেছি এবং অজ্ঞাত কারণে পাঠকরা তা পছন্দও
করেছেন। কিন্তু এবার এরকম একটি অনুরোধ এলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত
একটি জায়গা থেকে। কিছুদিন আগে আমার এক কবি-বন্ধু, যে তার কবিতার
ব্যাপারে খুবই কনফিডেন্ট এবং উচ্চকণ্ঠ _ কবিরা যেমন হয় আর কি,
নিজেদের কবিতা সম্বন্ধে খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করে এবং নিজেদের
প্রতিটি কবিতাকেই পৃথিবীর সেরা কবিতা বলে মনে করে _ আমার হাতে একটা
লেখা ধরিয়ে দিয়ে কুণ্ঠিতভাবে বললো _ 'একটা গল্প লিখেছি দোস্ত, তুই
একটু পড়ে দেখিস তো কিছু হলো কী না। যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে তুই
নিজের নামে চালিয়ে দিতে পারিস _ আমার গল্পকার হবার কোনো সাধ নেই।'
ব্যাপারটা আমার জন্য যথেষ্ট অপমানজনক। এর আগে অনুরোধে অনেক গল্প
লিখেছি বটে, লেখার সময় তাদের অভিজ্ঞতা, ডায়েরি, চিঠিপত্র ইত্যাদি
ব্যবহার করেছি _ কিন্তু গল্পগুলো আমারই লেখা, অন্য কারো গল্প
'নিজের নামে' চালিয়ে দেই নি। ওর গল্প আমি নিজের নামে চালিয়ে দেবো _
এর মানে কি? আমি কি গল্প লিখতে পারি না? আমার কি গল্পের অভাব পড়েছে
যে, অন্যের লেখা গল্প নিজের নামে চালিয়ে দিতে হবে! অপমানিত হলেও
অবশ্য কিছু বললাম না আমি, এমনিতেই আমি কম কথা বলি, অপমানিত হলে আরো
চুপচাপ হয়ে যাই। আর তাছাড়া কবিরা যে সাধারণত অবিবেচক হয় সে তো
জানিই। যাহোক ওর গল্পটি আমি এখানে তুলে দিচ্ছি _ নিজের নামে
চালাচ্ছি না, এটুকু পরিস্কার করার জন্যই এই দীর্ঘ ভূমিকা। এটা কোনো
গল্প হয়েছে কী না, সেটা আমার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না, বরং
সিদ্ধান্তটি আপনাদের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি, প্রিয় পাঠক। এই গল্পের
নাম, ও দিয়েছে, সহজ জীবন।]
প্রতিটি সকাল যেন সকাল নয় _ একেকটি টর্নেডো হয়ে আসে শফিক-রুবিনার
ছোট্ট দু'রুমের সংসারে। অবশ্য সংসারটি ঠিক দুরুমের নয়, নয় দুজনেরও।
দুটো রুমের সঙ্গে আছে একটি ব্যালকনিও _ শফিক যেটাকে পার্টিশন দিয়ে
ডাইনিং রুমে পরিণত করেছে _ আছে বাথরুম এবং ছোট্ট কিচেনও। তারা দুজন
ছাড়াও সংসারে আছে আরও দুজন মানুষ _ তাদের একবছর বয়সী সন্তান বাবু,
আর কাজের মেয়ে মালতী। তো প্রতিদিনই শফিকের ঘুম ভাঙে দেরিতে, পাথরের
মতো ঘুমায় সে _ যেখানে সেখানে, যখন তখন। একবার ঘুমোলে ভূমিকম্প
হলেও তার ঘুম ভাঙে না। ফলে রাতে এগারোটা সাড়ে এগারোটার দিকে ঘুমিয়ে
পড়ার পর সকাল সাতটা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত তার আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া
যায় না। এরমধ্যে বাবুটা কমপক্ষে ৪/৫ বার হিসি করে, রুবিনাকেই সবসময়
কাঁথা বদলে দিতে হয়, দু-একবার চিৎকার করে কেঁদেও ওঠে, দুধ মুখে
চেপে দিয়ে রুবিনা তার কান্না থামায় _ শফিক কিছু টেরও পায় না।
সারারাত এমন সাড়াশব্দহীন কাটায় বলেই হয়তো সকালে উঠে এমন চিৎকার
চেঁচামেচি শুরু কওে সে যেন এই দীর্ঘ নীরবতাটুকুর ক্ষতি পুষিয়ে যায়।
ঘুম ভেঙেই দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তার প্রথম বাক্য _ 'শালা আজকেও
দেরি হয়ে গেলো।' তারপর তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ডাইনিং রুমে গিয়ে একটা
সিগারেট ধরায় _ এ তার বহুকালের অভ্যাস, সকালে উঠে সিগারেট না খেলে
নাকি তার ঘুম ঘুম ভাব কাটে না _ তারপর গিয়ে বাথরুমে ঢোকে। তার
একটুক্ষণ পরই বাথরুম থেকে তার হুংকার শোনা যায় _ 'এই মালতি
দারোয়ানকে পানি ছাড়তে বল। শুয়োরের বাচ্চাটা একদিনও ঠিক সময়ে পানি
ছাড়ে না।'
এই সময়টায় রুবিনা-মালতি দুজনেই খুব তটস্থ থাকে। রুবিনার ভয়
দ্বিবিধ। এই চেঁচামেচিতে যদি বাবুর ঘুম ভেঙে যায় তাহলে ঝামেলা হবে।
সে বাবুকে সামলাবে, নাকি বাবুর বাপকে সামলাবে? আর তাছাড়া এই সময়
শফিকের হাবভাব এতো ভয়ংকর থাকে যে, কথা বলতেও ভয় করে। তো বাথরুম
থেকে বেরোতে বেরোতে নিদেনপক্ষে আটটা, তারপর আর নাস্তা খাওয়ার সময়
থাকে না। কাপড়-চোপর পড়তে পড়তে সে তাই রুবিনার হাতেই খেয়ে নেয়,
দুপুরে খাওয়ার জন্য টিফিন বক্সটা হাতে নিয়ে, ঘুমন্ত বাবুকে ঝড়ের
বেগে চুমু দিয়ে, রুবিনার দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে _ 'গেলাম' বলে
বেরিয়ে যায়। ততোক্ষণে সোয়া আট কি আটটা বিশ। তাদের বাসা শান্তিবাগে,
হেঁটে মালিবাগ মোড়ে গিয়ে বাসে ওঠে সে। এতোটুকু পথ হেঁটে যেতে তার
মেজাজ সপ্তমে ওঠে। রাস্তায় রিকশা-গাড়ি আর মানুষের গাদাগাদি ভিড়।
রাস্তাটাও এমন যে, সারাবছর কাদা জমে থাকে _ যেন এ রাস্তায় সারাবছরই
বর্ষাকাল। রাস্তার দুপাশে মাছ-মাংস-ফলমূল-শাকসব্জী নিয়ে বসা
ফেরিওয়ালারা রাতে ফেরার সময় তাদের জিনিসপত্র ধোয়ার জন্য যে পানি
ব্যয় করে তার জের থেকে যায় সকালেও, আবার সকাল থেকে নিজেদের
জিনিসপত্র তাজা রাখার জন্যও ক্রমাগত পানি মারতে থাকে তারা _ ফলে
রাস্তাটা শুকাবার আর সময়ই পায় না। কাদার জন্য, যতোই শুভ্র পোশাক
পড়ে তুমি বেরোও না কেন, সেগুলো ঠিকঠাক রাখা প্রায় অসম্ভব। জুতো তো
নষ্ট হবেই, এমনকি কাদা ছিটে উঠে প্যান্ট পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়।
প্যান্ট বাঁচাতে গেলে সেটা নিচের দিকে খানিকটা গুটিয়ে নিতে হয়,
তাতে আবার ইস্ত্রি যায় নষ্ট হয়ে _ ফলে এ এলাকার বাসিন্দাদের কোনো
অবস্থাতেই শুভ্র-সুন্দর হয়ে কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না। কিন্তু এই যে
বছরের পর বছর ধরে অন্যায়ভাবে রাস্তা দখল করে বাজার বসছে _ এদের
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কেউ নেই। ব্যবস্থা নেয়ার কথা কেউ বলেও না।
এখানে যারা থাকে তাদের কাঁচাবাজারের কাজটা বাজারে না গিয়েও হয়ে যায়
বলেই সবাই প্রতিবাদহীন। তো, এইসব ভিড়-টিড় ঠেলে বাসে উঠতে উঠতে সাড়ে
আটটা বাজবেই। ভাগ্য ভালো হলে ট্র্যাফিক সিগনালে বেশিক্ষণ না
দাঁড়িয়েই চলে যাওয়া যায়। না হলে একবার যদি সিগন্যালে পড়েছো তো পনের
মিনিট বসে থাকো। ট্রাফিক পুলিশরা হাত উঁচু করে ঘুমিয়ে যায়, ভুলেই
যায় _ এই যে শত শত মানুষকে তারা আটকে রেখেছে তাদের সবারই কাজকর্ম
আছে _ সময় মতো পেঁৗছতে না পারলে জবাবদিহি করতে হবে। মালিবাগ,
মগবাজার আর বাংলামোটরে যে এতো ট্রাফিক জ্যাম তার জন্য দায়ী ট্রাফিক
পুলিশরাই। অন্তত শফিক তাই-ই মনে করে। নইলে একেকটি সিগন্যাল ১০
মিনিট- ১৫ মিনিট- এমনকি ২০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয় কি করে? তো
তাড়াহুড়োর সময় সিগন্যালে এমন দাঁড়িয়ে থাকতে হলে কার না মেজাজ খারাপ
হয় _ শফিকেরও হয়, অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে ইচ্ছে করে, কিন্তু কি
কারণে যেন বাসযাত্রীরা ইদানিং খুব ভদ্র সভ্য হয়ে উঠেছে _ বাসে উঠে
তারা বিশেষ কথাবার্তা বলে না, ফলে শফিককেও ভদ্র সেজে বসে থাকতে হয়।
বাসের যাত্রীদের মধ্যে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলো কিভাবে _ এ নিয়ে
শফিক অনেক ভেবেছে। বিশেষ করে টিকেট করে লাইনে দাঁড়িয়ে যেসব বাসে
উঠতে হয় _ সেসব বাসেই উঠেই যাত্রীরা এমন ভদ্র হয়ে যায় যে, তাদেরকে
আর বাঙালি বলেই মনে হয় না। কন্ডাক্টরের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি
নেই, ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে অবিশ্রান্ত ধারায় গালাগালি বর্ষণ নেই,
রাজনৈতিক আলাপচারিতা নেই, নেই সরকারের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার। কেউ
কেউ হয়তো কখনো কখনো নিতান্তই বেখেয়ালে বলে বসে _ জীবনটা খুব কঠিন
হয়ে গেছেরে ভাই। তখন হয়তো কেউ তাকে সমর্থন করে _ বাজারে সবকিছুর
আগুনছোঁয়া দাম, রাস্তাঘাট খোড়াখুড়ি, ট্রাফিক জ্যাম, সন্ত্রাস, খুন,
ডাকাতি, ছিনতাই _ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এমন মৃদু গলায় আলাপ করে যেন
কোনো শুভ বিষয়ে আলোচনা করছে। অভিজাত বাস সার্ভিস গুলো যাত্রীদেরকেও
অভিজাত করে তুললো নাকি? সবাই এমন চুপচাপ ভদ্রলোকের মতো বসে থাকে কি
করে? এই লোকগুলোই তো গুলিস্তান-মিরপুরের ১০ নম্বর বাসে বা
সদরঘাট-টঙ্গি রুটের বাসে উঠে নিজেদের চেহারা পাল্টে ফেলে! ট্রাফিক
পুলিশদেরকে গালাগালি করার জন্য শফিকের ঠোঁট, গলা, মুখ একসঙ্গে
খুশখুশ করলেও নিজ উদ্যোগে সেটা শুরু করা তার হয়ে ওঠে না। তবে মাঝে
মাঝে দু-একজন কটূবাক্য ছুঁড়ে দিলে সে-ও জোরের সঙ্গে গলা মেলায়।
নইলে চুপ করে বসে থাকতে হয় অথবা পাশর্্ববর্তী পত্রিকা-পড়ুয়া
সহযাত্রীর পত্রিকার দিকে চোখ ফেলে অন্তত হেডলাইনগুলো পড়ে নেয়। কখনো
কখনো ঝিমুনিও এসে পড়ে, ঘুমিয়ে পড়াটা বিপদজনক জেনেও কখনো কখনো
ঘুমিয়েও পড়ে। তাকে যেতে হয় মালিবাগ থেকে গুলশানে। এই রুটে কোনো
সরাসারি বাস সার্ভিস নেই। 'আবাবিল'-এ চড়ে নতুন বাজারে নেমে সেখান
থেকে গুলশানে যায় সে। একবার ঘুমিয়ে পড়লে এবং কেউ তাকে না জাগালে
তার আর নতুন বাজার নামা হয় না, একটানে টঙ্গিব্রিজ যাওয়ার পর
কন্ডাক্টরের হাঁকডাকে তার ঘুম ভাঙে, তখন আবার ফিরতি বাসে নতুন
বাজার আসতে হয়। তবে ভরসার কথা হচ্ছে নতুন বাজারে অনেক যাত্রী নামে,
আর সে জানালার পাশে না বসে বসে বাইরের দিকে সিটে, ফলে কারো না কারো
ধাক্কায় বা শোরগোলে ঘুম ভাঙার সম্ভাবনা থাকে। যাহোক, এতসব
বাধাবিপত্তি পেরিয়ে অফিসে যেতে প্রায়ই দেরি হয়ে যায় তার। তবু যে
তার নামের পাশে কখনো লাল দাগ পড়ে না, তার কারণ অফিসে তার সুনাম।
ভালো মানুষ হিসেবে, ভালো কাজ জানা মানুষ হিসেবে তার একটা ইমেজ গড়ে
উঠেছে। এর কোনোটাই তার জন্য প্রকৃতপক্ষেই প্রযোজ্য কী না সেটা আসলে
কোনো প্রশ্ন নয়, আসল ঘটনা হচ্ছে সে তার বসের কৃপাদৃষ্টি লাভ করেছে।
আর চাকরিতে ওটাই প্রধান কথা। তুমি বসের প্রিয় লোক তো তোমার সাতখুন
মাফ। তোমার কর্মদক্ষতা, তোমার নিয়মানুবর্তিতা নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে
কোনো প্রশ্নই তুলবে না, বরং সবাই তোমাকে তোয়াজ করে চলবে। প্রইভেট
সেক্টরের যে কোনো চাকরিতে এ কথা আরো বেশি করে সত্যি। প্রাইভেট
প্রতিষ্ঠানগুলো চলে বসদের স্বৈরাচারি স্বেচ্ছাচারিতায়। শফিকের এই
দেরি করে অফিসে যাওয়া নিয়ে বস যে তাকে কোনোদিনই কিছু বলেন নি তা
নয়, কিন্তু বলেছেন এমন মোলায়েম ভঙ্গিতে যে, সেটাকে আর বসের কথা বলে
মনেই হয় নি, মনে হয়েছে কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা তার ভাবী জামাতার সঙ্গে
কথা বলছেন _ অন্তত শফিকের সহকর্মীদের কাছে সেরকমই মনে হয়েছে। তারা
এ বিষয়ে একমত যে, এই দেরিটা শফিক না করে অন্য কেউ করলে সে
টার্মিনেশন লেটার না পেলেও অন্তত শো-কজ লেটার ঠিকই পেতো। অবশ্য
শফিকের এই সৌভাগ্যকে তার সহকর্মীরা ঈর্ষার চোখে দেখলেও, ঈর্ষাটা
ঠিক ক্ষতিকর পর্যায়ে যেতে পারে না শফিকের কারণেই। শফিক, অন্তত
অফিসে, নিপাট ভদ্রলোক। কারো সঙ্গেই সে পারতপক্ষে বিরোধে জড়ায় না।
যতোটা সম্ভব হাসিমুখে কথা বলে, পছন্দের সহকর্মীদের সঙ্গে
হাসিঠাট্টাখুনসুটি করে, জুনিয়র সহকর্মর্ীদের নানাভাবে কাজকর্মে
সহায়তা করে। তো এরকম একজন মানুষের বিরুদ্ধে খুব ক্ষেপে যাওয়াটা
কঠিন। অফিসে তাই শফিকের তেমন কোনো বড় শত্রু নেই। কিন্তু এই
ভদ্র-সভ্য-সজ্জন রূপটি সে হারিয়ে ফেলে অফিস থেকে বাইরে বেরুলেই।
রাস্তার ধুলো-ধুয়া-ট্রাফিক জ্যাম, রিকশাওয়ালাদের স্বেচ্ছাচারিতা,
বাসে গাদাগাদি ভিড় এসবকিছুই মেজাজ খিচড়ে দেবার জন্য কোমর বেঁধে
দাঁড়িয়ে থাকে _ সে করবেটা কি? তার মাঝে মাঝে ইচ্ছে মতো গালাগালি
করতে ইচ্ছে করে, নিদেনপক্ষে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যদি আ আ করে
চিৎকার করা যেতো তা-ও একটু বুকের ভারটা কমতো বলে মনে হয় _ কোনোটাই
সম্ভব হয় না বলে রাগগুলো গিয়ে পড়ে রিকশাওয়ালাদের ওপর, কখনো বাসায়
ফেরার পর বউয়ের ওপর। রুবিনা এমনিতেই তটস্থ হয়ে থাকে, শফিকের রাগে
তার নার্ভাসনেস বেড়ে যায়, কাজকর্ম উল্টোপাল্টা করে ফেলে, তাতে করে
শফিকের রাগ আরও বাড়ে। তবু রুবিনা তার স্বামীকে একজন ভালো মানুষ
বলেই মনে করে। অন্তত শফিক মনে কোনো কথা চেপে রাখে না, রাগ টাগ হলে
ঝেড়ে ফেলে শান্ত হয়ে যায়, পুষে রেখে আরো অনেকের মতো একবছর পর সেই
প্রসঙ্গ তুলে যন্ত্রণা দেয় না _ এই ব্যাপারটা রুবিনা খুবই পছন্দ
করে। তার সবকিছুই তাৎক্ষণিক। রাগ ঝেড়ে ফেলে বলেই বলে হয়তো অল্পতেই
শান্ত হয়ে যায় সে, তখন তাকে বেশ অনুতপ্ত দেখায়। একটা অপরাধী
ভাবভঙ্গি তার চেহারায় ফুটে ওঠে _ রুবিনা সেটা দেখে খুব মজা পায়।
হয়তো কখনো কখনো চেহারায় কৃত্রিম অভিমানও মাখিয়ে রাখে রুবিনা, সেটা
দূর করার জন্যই হোক আর নিজের অপরাধ ঢাকার জন্যই হোক শফিক কোনো
পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ বলে বসে, রেডি হয়ে নাও তো, বাইরে থেকে
ঘুরে আসি। এমনিতে সে দারুণ অলস, মোটে বাইরে বেরুতে চায় না, বাইরে
যাবার বিরুদ্ধে তার অনেক যুক্তি _ গলিতে কাদা, রাস্তায় জ্যাম,
রিকশাওয়ালারা মানুষ না, যখন নিজের গাড়ি হবে তখন না হয় প্রতিদিন
তোমকে নিয়ে বেড়াতে যাবো _ এই সব বলে এড়াতে চায়। কিন্তু অপরাধী
ভঙ্গিটা এসে পড়লে আর নিজ উদ্যোগে বাইরে যাবার প্রসঙ্গ তুললে,
রুবিনা সুযোগটা কোনোভাবেই হাতছাড়া করে না। এইসব মুহূর্তে রুবিনা
রেডি হতে একটু সময় নিলেও শফিক বিরক্তি প্রকাশ করে না। বাইরে অবশ্য
বেড়াবার জায়গা নেই বললেই চলে, পার্কগুলোর বারোটা বেজে গেছে,
আত্নীয়-স্বজনদের বাসা, বা বড়োজোর খামোখাই নিউমার্কেটে ঘোরা ছাড়া আর
কোথায়ই বা যাওয়া যায়? কখনো বা একটু বিলাসিতাও করে শফিক। মাসে অন্তত
একবার চাইনিজ রেস্টুরেন্টে যায় সে, কখনো বেইলি রোডের ব্যাম্বু
ক্যাসেলে। ওখানকার চিকেন গ্রিল রোস্ট তার খুব প্রিয়। তবে এটা তার
রেগুলার রুটিন নয়। বাসায় ফিরে সাধারণত সে আর বাইরে যায় না।
বাচ্চাটাকে নিয়ে খেলে, মুড ভালো থাকলে রুবিনার সঙ্গে গল্পগুজব
হাসিঠাট্টা করে, নইলে ঝগড়া করে অথবা টিভি খুলে সনি বা স্টারপ্লাসের
সিরিয়াল দেখে। রুবিনা কখনো বাজারে যেতে বললে মন খারাপ করে ফেলে সে,
বাইরে বেরোয় বটে, কিন্তু বাজার পর্যন্ত যায় না। গলির দুধারে
সওদাপাতি নিয়ে বসা উদ্বাস্তু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয়
জিনিসটি কিনে দ্রুত বাসায় ফেরে। নিয়ম করে সে অবশ্য সপ্তাহে একদিন
বাজারে যায়। শুক্রবার। এবং যথারীতি মেজাজ খারাপ করে বাসায় ফেরে।
সবকিছুর আগুনছোঁয়া দাম, কিছুতে হাত দেয়া যায় না, এই নিয়ে খামাখাই
চেঁচামেচি করে আর অর্থমন্ত্রীদের মুণ্ডুপাত করে। শফিকের বাজারে
যাওয়া মানেই অর্থমন্ত্রীদের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করা। বর্তমান এবং
সাবেক দুই অর্থমন্ত্রীকেই একই ভাষায় গালাগালি করতে দেখেছে রুবিনা।
বেচারা অর্থমন্ত্রী! শফিকের মতো কতোজনের কাছ থেকে যে এমন গালি
শুনতে হয় তাদের! শফিক অবশ্য আরেকটি কারণেও _ শনিবারের সাপ্তাহিক
ছুটিটা বাতিল করায় _ এই সরকারের ওপর ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত। সপ্তাহে
মাত্র একদিন ছুটি রীতিমতো একটা অমানবিক ব্যাপার। পৃথিবীর কোনো সভ্য
দেশেই একদিন ছুটি থাকে না। আর তাছাড়া বেশি কাজ করার যুক্তি দেখিয়ে
সরকার যে সিদ্ধান্তটি নিলো তার মধ্যে যে একটা ধাপ্পাবাজি আছে শফিক
সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারে। আগে, যখন সাপ্তাহিক ছুটি ছিলো দুদিন,
তখনও যাকে বলে ওয়ার্কিং আওয়ার বা অফিস আওয়া ছিলো সপ্তাহে ৪০ ঘন্টা,
এখনও ওই ৪০ ঘণ্টাই। আগে ছিলো প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে পাঁচদিনে ৪০
ঘণ্টা, এখন ৭ ঘণ্টা করে প্রথম ৫ দিনে ৩৫ ঘণ্টা আর বৃহস্পতিবারে ৫
ঘণ্টা। ওয়ার্কিং আওয়ার যদি একই থাকে তাহলে বেশি কাজ করা হয় কিভাবে?
জনগণের সঙ্গে এরকম একটা ধাপ্পাবাজি করতে ওদের একটু বাধলোও না!
শফিকের ধারণা শনিবারের ছুটিটা বাতিল করার দুটো কারণ। প্রথমত _
দুদিন ছুটিটা প্রবর্তন করেছিলো আগের সরকার, স্রেফ তাদের বিরোধিতা
করার জন্য সেটা বাতিল করেছে এই সরকার। দ্বিতীয় কারণটিই মূল কারণ।
সপ্তাহে দুদিন ছুটি থাকলে শিল্প-কলকারখানার শ্রমিকরা ছুটির দিনে,
বিশেষ করে শনিবারে কাজ করলে, ওভারটাইমের পারিশ্রমিক দাবি করে; আইন
অনুযায়ী সেটা মালিকপক্ষ দিতে বাধ্যও _ এই মালিক পক্ষই দুদিন ছুটির
বিপক্ষে জোরালো ভূমিকা নিয়েছে, আর সরকার স্বাভাবিক কারণেই তাদের
পক্ষ নিয়েছে, বিপুল সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারিরা তাদের এতোটুকু
সহানুভূতি পাবার যোগ্যতাও রাখে না।
শফিক অবশ্য রাজনীতির এতো ঘোরপঁ্যাচের ধার ধারে না, তার মূল চিন্তার
বিষয় হলো নিজের শান্তি ও স্বস্তিঅক্ষুণ্ন রাখা, কারা ক্ষমতায় এলো
বা গেলো তাতে তার কিছুই যায় আসে না। দুদিনের বদলে একদিন ছুটির
ব্যবস্থা করায় তার সুখ-শান্তি-স্বস্তি বিঘি্নত হয়েছে, সে তাই
স্বভাবতই ক্ষিপ্ত। একদিনের ছুটিতে কি হয়? সকালে বাজার, দুপুরে
মসজিদ। এমনিতে যে সে খুব ধার্মিক লোক তা নয়, কিন্তু শুক্রবারে সে
বেশ সেজেগুজেই মসজিদে যায়। আর না গেলেই বা কেমন দেখায়!
পাড়াপ্রতিবেশীরাই বা কি বলবে? অতএব শুক্রবারের নামাজ সে বেশ আয়োজন
করেই পড়ে। অবশ্য তার ধর্ম-কর্ম ওই শুক্রবার, একমাস রোজা আর দুই
ঈদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; রোজার দিনে আরেক সমস্যা, শফিকের রোজা আদৌ
হয় কী না এ নিয়ে তো রুবিনার রীতিমতো ঘোরতর সন্দেহ আছে, কারণ, রোজা
এলেই সে শফিকের গালাগালিগুলো বর্ষিত হতে দেখে আল্লাহর উদ্দেশ্য।
রোজার নিয়ম-কানুনগুলো নাকি উদ্ভট। যেমন সেহরী খাওয়া এবং দিনশেষে
ইফতারি করা _ এই দুটো সময়ই নাকি খাওয়া-দাওয়ার জন্য অনুপযুক্ত সময়।
খাওয়ার জন্য আল্লাহ এমন উদ্ভট সময় বেছে নিলেন কেন এ নিয়ে শফিকের
ক্ষোভের অন্ত নেই। আল্লাহকে চাকরি করতে হয় না বলেই তিনি এমন সময়
বেছে নিয়েছেন বলে তার ধারণা। শেষ রাতে উঠে সেহরী খেয়ে, নামাজ পড়ে,
সকালে উঠে অফিসে যাওয়া যে কী কষ্টকর ব্যাপার এটা তিনি বুঝবেন কি
করে? তারপর আবার তারাবীর নামাজ। সারাদিন রোজা রেখে ক্লান্ত-
শ্রান্ত একজন লোকের জন্য বিশ রাকাত এক্সট্রা নামাজের বিধান করা
অত্যাচার ছাড়া আর কি? এ শুধু তাদের পক্ষেই পারফেক্টলি করা সম্ভব
যারা শুধুমাত্র ধর্ম-কর্ম করবে আর কিছু নয়। মসজিদে এখন আবার খতম
তারাবীর ব্যবস্থা। অর্থাৎ তারাবাীর নামাজে প্রথম দিন থেকে শেষ দিন
পর্যন্ত পুরো কোরআন পাঠ করা হবে! তার মানে দীর্ঘ একটি সময়। এ-ও তো
একধরনের টর্চার! কিন্তু এতোসব গালাগালি সমালোচনা সত্ত্বেও শফিক
সবগুলো রোজাই করে। 'এতোই যখন আপত্তি তখন রোজা না রাখলেই পারো' _ এ
কথা বলে রুবিনা একদিন ধমক খেয়েছে _ 'এসব তুমি কি বলছো। বছরের এই
একটা মাসেও যদি একটু ধর্ম-কর্ম না করি তাহলে আল্লাহকে কি জবাব
দেব।'
এইভাবে দিন কাটে শফিকের। আগে _ বাবু হওয়ার আগে _ প্রায় প্রত্যেক
রাতেই তারা মিলিত হতো। এখন আর অতোটা উত্তেজনা নেই। তবু সপ্তাহে
একবার দুবার হয়। তারপর শফিক ঘুমিয়ে পড়ে, আর তখন তার চোখেমুখে একটা
শিশুসুলভ সারল্য ভেসে ওঠে। রুবিনা মাঝে মাঝে তার মুখের দিকে অপলক
তাকিয়ে থাকে আর ভাবে _ লোকটা সত্যিই ভালো, নইলে এমন নিস্পাপ আর
সুখী হতে পারতো না।
[এবার উপসংহার। না, উপসংহার দেয়ার আমি কে! শুধু বলি _ গল্পের শেষে
লেখা আছে, এমন একটি সহজ জীবন যাপন করার খুব সাধ হয় আমার।]
|
| |
 |
|