Page loading ... Please wait.

স্বগতোক্তি
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
এত কথা জানতে চাস তুই, তপু, এমন সব প্রশ্ন করিস যেগুলোর উত্তর আমি নিজেই ঠিকঠাক জানি না। তোর ছোটবেলায় অদভুত অদভুত সব প্রশ্ন করে যেমন সবাইকে বিপাকে ফেলে দিতি, তোর মা সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে এক ধমকে তোকে পাঠিয়ে দিতো, আর তুই ধমক খেয়ে আমার কাছে এসে মন খারাপ করে বসে থাকতি, বেশিক্ষণ নয় অবশ্য, একটু পরই শুরু হতো তোর প্রশ্ন, কতোশত প্রশ্ন তোর ছোট্ট মনে যে জাগতো, আমি নিজেই অবাক হয়ে যেতাম - এই এতটুকু একজন মানুষ, তার মাথায় এত প্রশ্ন আসে কিভাবে? সেসব প্রশ্নের যথাসম্ভব উত্তর দিতে চেষ্টা করতাম আমি, আবার কিছু প্রশ্ন ছিলো যেগুলোর উত্তর দেয়া একটু মুশকিল, মানে একটা বাচ্চাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলাটাই কঠিন কাজ, আর কিছু প্রশ্নের উত্তর আমার জানাই ছিলো না। তোর স্বভাব এই এতদিন পরও পাল্টায়নি। কতো বড় হয়ে গেছিস তুই, ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছিস, অথচ প্রশ্নের পর প্রশ্ন - আমি কি এত প্রশ্নের উত্তর জানিরে বোকা! এগুলো তো এখন তোর জানার কথা। এই যেমন ধর - এই এতদিন পর আমার এই বাড়ি ফেরা, কতোদিন পর, অথচ এটাকে আমার বাড়ি বলেই মনে হচ্ছে না, এটাকে তুই কিভাবে ব্যাখ্যা করবি? আমার তো মনে হচ্ছে, বাড়ি কোথায়, এ তো ভাইয়ের কেনা শহুরে ফ্ল্যাট - সুসজ্জিত, পরিপাটি, কিন্তু প্রাণহীন - বাড়ি মানে তো কেবল কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বাড়ি মানে অনেক অনেক স্মৃতি ও সম্পর্ক। মনে হচ্ছে অভিজাত-সুসজ্জিত এই বাসাটির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই নেই, আমার যা কিছু সম্পর্ক, যা কিছু স্মৃতি তার সবই রয়ে গেছে উদাসপুরে, সেখানে আর ফেরা হয়নি, হবেনা কোনোদিন। তবু একে হয়তো বাড়ি ফেরাই বলবে সবাই, অন্তত আপনজনের কাছে ফেরা তো বটেই, আপনজন মানেও তো বাড়িই, তাই না! আমার আর আছেই বা কে বল, ওই সবেধন নীলমনি এক পাগল বোন, তোর ফুপু, ভাই-ভাবী মানে তোর বাবা-মা, আর তোরা তিনভাইবোন - নক্ষত্রের মতো আমার তিনটে সন্তান। কতো বদলে গেছে সব, তোদেরকে ছোট রেখে গিয়েছিলাম, এখন সব বড় বড়। সবচেয়ে ছোটটা, রীতুকে, তো আমি দেখিইনি, ও-ও আমাকে দেখেনি কোনোদিন, কেবল আমার গল্পই শুনেছে, সে-ও এখন স্কুলে উঁচু ক্লাসে পড়ছে। আর তুই, আমার কী ন্যাওটাই না ছিলি একসময়, এখন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক! মিতুর বিয়ে হয়ে গেছে - জানিস ওকে কখনো নাম ধরে ডাকিনি, তোর দাদুর চেহারা পেয়েছিলো বলে সবসময় মা বলে ডাকতাম, - ওর সঙ্গে তো এখনো দেখাই হলো না। ভাই- ভাবীর চেহারায় বয়সের ছাপ - চুলে পাক ধরেছে দুজনেরই, সেই মিষ্টি ভাবী, পাকা চুলে তাকে কেমন অচেনা লাগে। বাড়ি থেকে যখন চলে গিয়েছিলাম, আর কোনোদিন ফিরবো না এমন সংকল্প করেই, তখনও ভাবী নতুন বউয়ের মতো মিষ্টি, আকর্ষণীয়, দুটো বাচ্চা হবার পরও একই রকম সুন্দর, আমি তাকে বলতাম - ‘ভাবী, আমি তোমার প্রেমে পড়েছি, কিন্তু ভাবীর প্রেমে পড়ে তো লাভ নেই, অন্তত আমার জন্য তোমার মতো একটা মেয়ে খুঁজে রেখো।’ ভাবীও দুষ্টুমি করতো - ‘এসব কথা বলো না গো, আমার মন কেমন করে, নিতান্তই তোমার ভাইয়ের ঘর করি, অন্য কারো ঘরনী হলে কবে তোমার কাছে চলে আসতাম!’ অবাক লাগে না এসব শুনে? তোর মার সঙ্গে আমি এরকম দুষ্টুমি করতে পারি তোর বিশ্বাস হয়! অথচ এমনই মধুর ছিলো আমাদের সম্পর্কগুলো। এখন সবকিছুতে ধুলো জমেছে, এই কদিনে ভাবীর সঙ্গে কুশল বিনিময় ছাড়া আর কোনো কথাই হয়নি। খাওয়ার সময় স্নেহময়ী হয়ে বসে থাকে বটে, ভাবীর এই স্বভাবটা মা’র মতো - কিন্তু কোনো কথা বলে না, কিছু জিজ্ঞেসও করে না, এতদিন কোথায় ছিলাম, কেমন ছিলাম, কেনই বা আবার ফিরে এলাম, আবার উধাও হয়ে যাবার মতলব আছে কী না - এসবের কিছুই না। মা থাকলে হয়তো জিজ্ঞেস করতো। যখন গিয়েছিলাম মা বেঁচে ছিলো। মনে পড়ে, সেদিনের কথা আজও খুব মনে পড়ে। মা ঘুমিয়েছিলো আর আমি তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছিলাম, মা জানতেও পারেনি, কিন্তু আমি জানতাম - ওটাই আমার শেষ দেখা। ওই পবিত্র দুঃখী মুখটি আজকাল খুব মনে পড়ে। একজন মা কি তার সন্তানকে কখনো শেষ বিদায় জানাতে পারে, কিন্তু আমার মা একাধিকবার সেই কাজটিই করেছে - সেই যুদ্ধের সময়, যখন প্রতিটি যাওয়াই ছিলো শেষবারের মতো যাওয়া, আর কখনো না ফেরার সম্ভাবনা সব সময়ই থেকে যেতো। আবার যখন লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা করতে আসতাম, এমনভাবে আদর করতো, যেন ওটাই শেষ আদর, আর কখনো সন্তানকে ফিরে পাওয়া হবে না তার, বিদায় নেয়ার সময় বলতো - তোকে আমি দেশের জন্য কোরবানী করেছি, ফিরে এলে বিজয়ী হয়ে ফিরিস - সেসব কথা এখনকার ছেলেমেয়েরা বিশ্বাসই করতে পারবে না, ভাববে গালগল্প করছি, ভাববে রূপকথা শোনাচ্ছি - হ্যাঁ, রূপকথার মতোই ছিলো সময়টি। একদল সুসজ্জিত দৈত্যের সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিল যারা, তাদের কেউ রাজপুত্র ছিলো না, ছিলো কৃষকপুত্র, তাদের শিরস্ত্রাণ ছিলো না, হাতে অস্ত্র ছিলো না, ছিলো ধুলোর টুপি - তারা সেগুলো দিয়েই দৈত্যদের পরাজিত করেছিলো - এ এক ভীষণ গাঁজাখুড়ি রূপকথা ছাড়া আর কী-ই বা মনে হবে! তো শেষবার যখন বিদায় নিলাম, তখন আর বলিনি, মা জানতেও পারেনি আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম - আরেকটি বিজয় না নিয়ে ফিরবো না, আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি - মা বেঁচে থাকতে আর ফিরিনি, এমনকি মা’র মৃত্যুসংবাদ পেয়েও আসিনি। বিজয় যে অর্জিত হলো না, আমি কোন মুখে তার কাছে ফিরি! আজ ফিরেছি বটে, কিন্তু একে ফেরা বলে না। মা নেই, বাড়িটাও পদ্মায় ভেঙে নিয়ে গেছে যেখানে আমার মা-বাবা চিরদিনের জন্য ঘুমিয়েছিলেন। এ-ও একদিক থেকে ভালোই হয়েছে - পরাজিত মুখে অন্তত তাদের কবরের পাশেও দাঁড়াবার কোনো সুযোগ আর রইলো না। নিজের কাছে যে প্রতিজ্ঞা সেটা কখনো ভাঙতে নেই, আমি ভাঙিনি, যদিও পরাজিত হয়েই ফিরেছি - এর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো ছিলো, মরতে চেয়েছিও অনেকবার, হয়নি, মৃত্যু কেন যেন আসি আসি করেও আসেনি আর। তুই যে সারাক্ষণ আশেপাশে ঘুর ঘুর করছিস - গল্প শুনতে চাস, যুদ্ধের গল্প - কোন যুদ্ধের কথা বলবো আমি তোকে, জয়ের গল্প, না পরাজয়ের? আমার যুদ্ধ তো একটা নয়, আমার যুদ্ধ যে আজও শেষ হয়নি, কেবল বয়সের ভারে ক্লান্ত সৈনিক যেমন অবসর নেয় আমিও তেমন অবসরে এসেছি - ক্লান্ত, বিপন্ন, খানিকটা বিভ্রান্তও বটে। কিন্তু বিশ্বাস করি - এখনও যুদ্ধ শেষ হয়নি, যুদ্ধ কখনো শেষ হবার জিনিস নয়! একবার যে যুদ্ধে যায়, অন্তত মন থেকে যায় সে কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে ফেরে না, ফিরতে পারে না, আমৃত্যু যুদ্ধ করে যাওয়াটাই তার নিয়তি। আর যদি ফেরেই তাহলে তার পরাজয় ঘটে যায়, যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজিতরা মাঠ খালি পেয়ে দখল করে নেয়, আমি অন্তত তেমনটিই মনে করি, মনে করি তেমনটিই ঘটছে এই দেশে, এই কালে - এসব কথা কি তোকে বলা যায়, কিংবা অন্য কাউকে? কেউ কি বুঝবে এসব কথা? মনে হয় না, তারচেয়ে বরং চুপ করে থাকাই ভালো, কথা না বলে যদি বাকি জীবনটা পার করে দেয়া যায় তো মন্দ হয় না। আসলে কথা বলেও কোনো লাভ নেই, কেউ কারো কথা বোঝে না, অথবা বোঝানোর মতো করে বলার ভাষা আমাদের জানা নেই, নইলে যাদের জন্য এতকাল ধরে কাজ করে এসেছি, যাদের জন্য জীবন বাজি রেখেছি, তাদেরকে কেন আমাদের কথা বোঝাতে পারিনি, কেন তাদেরকে আমাদের দলে টানতে পারিনি? নাকি কোথাও কোনো ভুল ছিলো? বোঝার ভুল, জানার ভুল, কিংবা বুঝিয়ে বলার ভুল? আদতেই কি চেষ্টা করেছি কাউকে বুঝিয়ে বলতে? এসব প্রশ্ন আজকাল খুব মনে জাগে, শুধু আজকাল নয়, কয়েক বছর আগে থেকেই মনে জাগছিলো, উত্তর পাইনি, কে-ই বা উত্তর দেবে, উত্তর দেবার মতো যারা ছিলেন সবাই নিহত বা বিচ্যুত কিংবা প্রত্যাখ্যাত, এখন আমারই উত্তর দেবার বয়স, প্রশ্ন করার বয়স নয়, নতুন যারা আসে তাদেরও অনেক প্রশ্ন থাকতো, কিন্তু আমি নিজেই যেসব প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি সেগুলোর উত্তর কিভাবে দেব? এই ভুলের চিন্তাই আমাকে ফিরিয়ে আনলো, নইলে হয়তো ফেরা হতো না। মনে হলো - এভাবে কিছু হয় না, এইভাবে পালিয়ে বেড়িয়ে, রাতের অন্ধকারে দু-চারজন লোককে মেরে বিপ্লব হয় না, বিপ্লবের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ প্রয়োজন, আমাদের সঙ্গে তারা নেই। আরেকটা কথাও মনে হচ্ছিলো - আমার যাওয়াটা ছিলো আদর্শে উদ্বুদ্ধু হয়ে যাওয়া, আমি ওই পথকেই তখন জনগণের মুক্তির পথ বলে বিশ্বাস করে গিয়েছিলাম। আমার একটা দায়বদ্ধতা ছিলো, আমার সামনে তখন আদর্শ হয়ে ছিলেন চারু মজুমদার আর সিরাজ সিকদার। কেউ কেউ হয়তো সেটাকে আমার আদর্শ না বলে রোমান্টিসিজম বলবে, বলতেই পারে, বিপ্লবের জন্য রোমান্টিসিজমের দরকার আছে, প্রত্যেক মহান বিপ্লবী একই সঙ্গে কঠোর বাস্তববাদী আর তুমুল রোমান্টিক। আদর্শই বলি আর রোমান্টিসিজমই বলি আমাদের কিছু একটা ছিলো, এখন যারা আসে তাদের অনেকেই আদর্শের ধার ধারে না। কেউ কেউ নিছক সন্ত্রাসী, কেউ আবার দাগী আসামী, আমাদের দলটিকে তারা বেছে নিতো একটা শেল্টার প্লেস হিসেবে। এদের উদ্দেশ্য ভিন্ন, এসব জেনেও এদেরকে দলে নিতে হতো। কর্মীর এত অভাব এখন, না নেয়া ছাড়া উপায় কি, আশা করতাম বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে এসে ওদের পরিবর্তন ঘটবে, কিন্তু... এখন যারা আসে তাদের কারো কারো মধ্যেও আদর্শ বা রোমান্টিসিজম থাকে, কিন্তু এখন ধানের চেয়ে চিটার সংখ্যা বেশি, বাছতে গেলে গোলা শূন্য হয়ে যাবে। এইসব ভাবি এখন এই অখণ্ড অবসরে একা বসে বসে, আর তো কিছু করার নেই। কারো সঙ্গেই কথা হয় না আমার, কেবল তুই-ই একটু জ্বালাস, এত বড় হয়েছিস তবু ছোট বেলার মতো আহ্লাদ করার স্বভাব যায়নি। আচ্ছা, তোকে তোর ছাত্র-ছাত্রীরা মানে? জানিস, আমরা যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম তখন শিক্ষকদের মনে হতো হিমালয়ের মতো বিশাল মাপের, তাঁদের ধারে-কাছে চাপতে সাহস হতো না, এখনও কি তেমন আছে সবকিছু? থাকে যদি, তাহলে তুইও তোর ছাত্র-ছাত্রীর কাছে হিমালয়ের মতো! ভেবে আমার হাসি পায়, এতটুকু পুচকে ছোড়া... না পুচকে কেন, তোর বয়সও তো ৩০ ছাড়ালো বোধহয়, কতো সালে যেন জন্ম হয়েছিলো তোর, মনে পড়ে না, সময় কিভাবে যায়, এই সেদিন ছোট রেখে গেলাম...না সেদিন কোথায় সে-ও তো বছর বিশেক আগের কথা, সত্যিই অনেকটা সময় চলে গেছে। এই দীর্ঘ বিরতিতে আমি তোদের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা হারিয়ে ফেলেছি, ঠিক কোন ভাষায় বললে যে তোরা বুঝবি, তা নিজেই বুঝে উঠতে পারি না। তবু এইসব লিখে রাখছি, কেন লিখছি তা-ও জানি না, সময় কাটানোই এক বিরাট সমস্যা। কিছুই ভালো লাগে না, কারো সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না, কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না, আমার কোনো যাবার জায়গাও নেই অবশ্য, বইটই পড়তে বা সিনেমা-নাটক দেখতেও ইচ্ছে করে না, বসে বসে তাই এইসব ছাইভস্ম লিখি। জানি এগুলো কারো কোনো কাজেই লাগবে না, কাজে লাগার জন্য লিখিও না, আমি এক পরাজিত সৈনিক - পরাজিতদের কথা পৃথিবীর কেউ জানতে চায় না। দেখছিস না, আমার এই ফিরে আসা বাড়ির মানুষগুলোকে কেমন অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে! কেমন ব্যবহার করবে আমার সঙ্গে - উষ্ণ না শীতল, সমাদর করবে নাকি অবহেলা - এসব ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তই কেউ নিতে পারছে না। এই এতদিন সবাই আমাকে প্রায় ভুলেই ছিলো, ২০ বছর, হ্যাঁ ২০ বছরই তো, ‘৭৩-এ গিয়েছিলাম এখন ‘৯৩, কম সময় নয় তো! একজন মানুষ এতদিন ধরে অনুপস্থিত এবং যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকলে তার সঙ্গে আর কতোটুকু সম্পর্কই বা থাকে! থাকে না বললেই চলে, তাকে নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না, যেন পরিবারের এক মৃত সদস্য সে, কখনো কখনো দু-চারটে দীর্ঘশ্বাস তার জন্য বরাদ্দ করা যায়, বড়ো জোর দু-চার ফোঁটা অশ্রু; কিন্তু সে যদি ফিরে আসে সমস্যা হয় তখনই, দীর্ঘশ্বাস বা অশ্রু তখন আর থাকে না, অভিমান থাকে হয়তো, এবং নিশ্চিতভাবেই থাকে অসংখ্য অভিযোগ - কিন্তু সেসব জানাবার মতো ভাষা বা উদ্যম কারোরই থাকে না। সমস্যাটা আমারও হচ্ছে, প্রায় সপ্তাহ তিনেক হয়ে গেলো ফিরে এসেছি কিন্তু কারো সঙ্গেই বেশিক্ষণ কথা বলা হয়নি আমার। আগে, সে তো অনেক দিন আগের কথা, ভাবীর সঙ্গে খুব গল্পসল্প-হাসিঠাট্টা-দুষ্টুমি-ফাজলামী করতাম, সেটা বন্ধ হয়ে গেছে সেই কতোকাল আগে, যুদ্ধের পর যখন ফিরে এলাম তখনই বেশ খানিকটা বদলে যাওয়া মানুষ আমি, যুদ্ধ আমার সাদামাটা জীবনটাকে পাল্টে দিয়েছিলো, মনে হয়েছিলো স্বাভাবিক-পারিবারিক-সামাজিক জীবন আমার জন্য নয়। যুদ্ধের পর থেকেই স্বপ্নভঙ্গ শুরু হয়েছিলো, মনে হচ্ছিলো দেশ স্বাধীন হয়েছে বটে, কিন্তু মানুষের মুক্তি আসেনি, মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ তার শেষ হয়নি, আর তখনই যোগাযোগ ঘটলো সর্বহারাদের সঙ্গে, মনে হলো এটাই আমার পথ - যোগ দিলাম ওদের সঙ্গে, তারপর এক রাতে নিঃশব্দে, কাউকে কিছু না বলে চলে গেলাম। তখনও আমার সাহস আর বীরত্বের গল্প তখন এবং পরেও মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। লোকে বলতো - আলম এমন এক মুক্তিযোদ্ধা যে কখনো হার মানতে জানে না, পাকিস্তানীদের হাতে ধরা পড়লে নিজে আত্নহত্যা করবে, তবু ওদের হাতে প্রাণ দেবে না। আমার গল্প-কাহিনী এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো যে, মনে হতো এ যেন এক রূপকথার রাজপুত্র। তখন, সে এক আশ্চর্য সময় ছিলো, সবাই আমাকে নিয়ে গর্ব করতো, বাড়ির মানুষও খুব খুশি ছিলো - মায়ের মুখে গর্ব ফেটে পড়তো - ওকে তো আমি পেটে ধরেছি, ও এমন হবে না তো কে হবে। মাঝে মাঝে ঝড়ের মতো কিছুক্ষণের জন্য বাড়িতে আসতাম, মার কাছে এসে বসতাম, ভাইবোনের সঙ্গে বসে খেতাম, ভাবীর সঙ্গে দুষ্টুমি করতাম - তুমি শুধু বলো ভাবী, দেখ আমি কি করি। দশটা পাকিস্তানি মেজর ধরে এনে ন্যাংটো করে তোমার সামনে খ্যামটা নাচ নাচাবো, হা হা হা - মুগ্ধ বিস্ময়ে সবাই যুদ্ধের গল্প শুনতো, তারপর যেমন এসেছিলাম তেমনই ঝড়ের বেগে চলে যেতে হতো। যাওয়ার সময় সবার মন খারাপ হয়ে যেতো, আমি বলতাম - যদি ফিরি তো পতাকা নিয়েই ফিরবো, নইলে মরে যাবো। কে জানে এটাই হয়তো শেষ দেখা, সবাই মাফটাফ করে দিও। সবার চোখ ছলছল করে উঠতো, আর আমি তখন অট্টহাসিতে ফেটে পড়তাম - আরে পাগল হলে নাকি! পাকিস্তানীরা আমাকে মারতে পারবে বলে মনে কর তোমরা? আমি এই দেশের ছেলে না! দেখো এই দেশের পানিমাটিগাছপালাই আমাকে ঢেকে রাখবে...। হ্যাঁ, সেই এক সময় এসেছিলো, যখন প্রতিটি যাওয়াই ছিলো শেষ যাওয়া। যে যুদ্ধে যেতো সে জানতো না আর কোনোদিন তার ফিরে আসা হবে কীনা এই চিরচেনা মানুষগুলোর কাছে। আমাদের বাড়িভরতি তখন মানুষ। ভাই-ভাবী ছেলেমেয়ে সমেত ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে, মা বাবা তো বাড়িতেই থাকতেন, আর বোনটাকেও ওর স্বামী এখানে রেখে নিজে যুদ্ধে গেছে। বুলুর তখন নতুন বিয়ে হয়েছে। কয়েকমাস যেতে না যেতে যুদ্ধ লাগলো। মতিন - তোর ফুপা - চলে গেলো যুদ্ধে। বুলু ফেরানোর চেষ্টা করেছিলো, পারেনি। মতিন নাকি বলেছিলো - মানুষের জীবনে এমন সময় বারবার আসে না, এই বয়সে যদি যুদ্ধে না যাই, দেশ যখন স্বাধীন হবে, আর নিজের ছেলেমেয়েরা যখন বড় হয়ে জিজ্ঞেস করবে যুদ্ধে যাওনি কেন, কি জবাব দেবো? মতিন আর ফেরেনি। ছেলেমেয়েদের কাছে জবাব দেয়ার কোনো দায় না রেখেই চলে গেছে, মাত্র কয়েক মাসের বিবাহিত জীবন, তবু বুলু স্বামীর মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে পারলো না আর কোনোদিন, ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়লো, মাঝে তো অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিলো, চিকার চেঁচামেচি করতো, জিনিসপত্র ভাঙচুর করতো, লোকজনকে মারধোর করতো, এখন সেটা কমেছে দেখছি, কিন্তু মতিন যে আর ফিরবে না সেটা কিছুতেই বিশ্বাস করে না, আমাকে জিজ্ঞেস করলো - ছোট ভাই, তুমি ফিরলে, ওকে নিয়ে এলে না! ও তো একা একা এই বাসা চিনবে না! এতদিন হয়ে গেলো তবু যেন ও পড়ে আছে সেই আগের দিনগুলোতেই। মতিনের মৃত্যু, বুলুর অসুস্থ হয়ে পড়া আর আমার সর্বহারা পার্টিতে যোগদান - এসবই ছিলো তোর বাবার জন্য বিপর্যয়কর ঘটনা। নিম্নমধ্যবিত্ত স্কুলশিক্ষক পিতার বড় ছেলে হিসেবে তার ওপর একটা অনিবার্য দায়িত্ব পড়েছিলো নিজে বড় হওয়ার এবং ছোট ভাইবোনগুলোকে মানুষ করার। সেই চেষ্টাও করছিলো সে। নিজে আগে দাঁড়িয়ে ভাইবোন দুটোকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে পড়াশোনা করাচ্ছিলো। আমাদের দুজনকেই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করাতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছিলো, বুলুর হঠা করে একটা ভালো বিয়ের প্রস্তাব আসায় দেরি না করে বিয়েও দেয়া হয়েছিলো - এই শর্তে যে ওরা বিয়ের পর বুলুর পড়াশোনাটা বন্ধ করবে না। যখন সংসারটাকে অনেকখানিই গুছিয়ে এনেছে সে, নিজে ভালো চাকরি করছে, ভাইবোনগুলোরও একটা ব্যবস্থা করে দেয়ার যাবতীয় চেষ্টা করে যাচ্ছে, ছেলেমেয়েদের সাফল্যে মা বাবার মুখে গর্বের হাসি ফুটছে - তখনই যুদ্ধটা লেগে গেলো। মতিন আর আমি যুদ্ধে গেলাম, তোর বাবা যায়নি, খুব ভীতু ছিলো তো, কিন্তু যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য খুব লজ্জা বোধ করতো, হয়তো এজন্যেই ভয় থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে না করতে পারেনি। যে ভয়টা সে পাচ্ছিলো তাই হলো - মতিন ফিরলো না, আমি ফিরলাম ঠিকই কিন্তু ভিন্ন মানুষ হয়ে। আমার মাথায় তখন রাজনীতির পোকা! তাও গোপন রাজনীতি। নিম্নমধ্যবিত্ত শিক্ষক পিতার পুত্রের মাথায় এমন সর্বনাশা রাজনীতর ভূত ঢুকবে কেন? যুদ্ধ লেগেছে, বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিস, ভালো কথা, এবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আয়! পড়াশোনা শেষ করে চাকরিবাকরির চেষ্টা কর। আর তাছাড়া একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে তোকে তো সবাই চিনতো, একটা চাকরি বা ব্যবসা জুটিয়ে ফেলা তোর জন্য ছিলো খুবই সহজ, তা না করে তুই গিয়ে ভিড়লি সিরাজ সিকদারের দলে। আরে তোকে কি এসব মানায়? বিপ্লব দিয়ে তুই কি করবি? একজন মানুষ তার দেশের জন্য যতোটুকু করতে পারে তুই তোর সাধ্যমতো সেটুকু তো করেছিসই - হার না মানা যুদ্ধ করেছিস, জীবন হাতে নিয়ে বেরিয়েছিস, আর হয়তো ফিরে আসা হবে না এমন সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবার সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিস - কয়জন মানুষ এই কাজটুকু করতে পারে! এরপরও তোর এত কিসের দায়? কেন তোকেই বিপ্লব করতে হবে? - তোর বাবা আমাকে একদিন এইসব বলেছিলো। না, তোর বাবার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই, তছনছ হয়ে যাওয়ার স্বপ্নের সংসার নিয়ে তার তো হাহাকার থাকারই কথা। মতিনের ফিরে না আসা, বুলুর অসুস্থ হয়ে পড়া, আর আমার চলে যাওয়া - এই তিনটি ঘটনাই এই পরিবার থেকে সমস্ত হাসি আনন্দ চিরদিনের জন্য কেড়ে নিয়েছে, আমি সেটা বুঝি। মা বাবা এইসব শোকেই অকালে মারা গেলেন। একজন মানুষ কতোটুকুই বা সইতে পারে, আর তারা যদি হন তোর দাদা-দাদুর মতো অতি নিরীহ সাধারণ মানুষ। যে মানুষগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের পরিচয় কেবল বইয়ের পাতায় তাদের জীবনেই যদি সেটা নেমে আসে, তার পুত্র বা পুত্রসম কেউ যদি সেই যুদ্ধে মারা যায়, বিপ্লবের নামই যারা কোনোদিন শোনেনি তার পুত্র যদি সেই বিপ্লবের নেশায় স্বাভাবিক জীবন ত্যাগ করে তাহলে এগুলোকে কি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায়? তুই সেদিন নিজের ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে অনেক কথা মনে করিয়ে দিলি, ভুলেই গিয়েছিলাম যে একসময় আমি গান গাইতে পারতাম আর তোকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতাম। তোর কাছে নাকি সেসব রূপকথার বইতে পড়া গল্পগুলোর আকর্ষণীয় ছিলো, কারণ ওইসব গল্পের এক অনিবার্য চরিত্র ছিলো স্বয়ং তোর চাচা! হা হা হা। ভূতের সঙ্গে যুদ্ধ করা, দৈত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে ওদেরকে নাস্তানাবুদ করা - এসব তো ছিলো ডালভাত খাওয়ার মতো সাধারণ ঘটনা, আর তুই নাকি অবলীলায় সব গল্প বিশ্বাস করতি। তুই কখনো সামনাসামনি সাপ দেখিসনি বলে একটা সাপ ধরে নিয়ে এসেছিলাম, এটা অবশ্য এখনও মনে পড়ে, আজকে তোকে বলি, সাপটা নির্বিষ ছিলো। তবু নিরাপত্তার খাতিরে, ওটার মুখটাকে শক্ত করে ধরে তারপর তোকে দেখাতে নিয়ে এসেছিলাম। যে লোক এভাবে জ্যান্ত সাপ ধরে আনতে পারে ভূতপ্রেতদৈত্যদানব তার কাছে আর এমন কি - তোর শিশুমনে এই বিশ্বাস জাগাটা অস্বাভাবিক নয়। বললি ছোটবেলায় তোর কাছে হিরো ছিলাম আমি, আমাকে নাকি তোর মনে হতো - রূপকথার বই থেকে উঠে আসা কোনো এক রাজকুমারের মতো, কিংবা তার চেয়েও স্মার্ট, সুদর্শন, আকর্ষণীয়। হা হা হা। আমার চলে যাওয়াটা ছিলো তার ছোটবেলায় একটা বিরাট বিপর্যয় - সেই বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে উঠতে বহু সময় লেগেছে - বলতে বলতে তোর গলা ধরে এসেছিলো। আমার খুব খারাপ লাগছে তোর জন্য, তপু। জানিস, তোদের - তুই আর মিতু - কাছে এলে আমি নিজেও শিশুর মতো হয়ে যেতাম, চলে যাওয়ার পরও তোদের কথা মনে পড়লে সব ছেড়েছুড়ে আবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করতো। এই সংসার-সমাজ এই গতানুগতিক পারিবারিক জীবন আমাকে বাঁধতে পারেনি, কিন্তু তোরা প্রায় বেঁধে ফেলেছিলি, তোরা আরেকটু বড় হলে হয়তো যেতেই পারতাম না। যুদ্ধটা আসলে এমন এক জিনিস তপু, এ শুধু শত্রুর মোকাবেলা নয়, একই সঙ্গে নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়াও। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যে যোদ্ধারা ভিন্নমানুষ হয়ে ফেরে সেটা ওই বোঝাপড়ার জন্যই, আমি একবার বোঝাপড়া করেছিলাম ৭১-এ, তারপর গত ২০ বছর ধরে। এই যে ফিরে আসা, পরাজিত মানুষের দায় মাথায় নিতে হবে সেটা জেনেই, একজন পরাজিত মানুষের কছে তার পুরো জীবনটাকেই মনে হয় ভুলে ভরা, এখন সেসব নিয়ে কথা বলতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে পড়বে আমার গত ২০ বছরের জীবনযাপনের প্রসঙ্গ - যেটাকে সবাই নিছক এক বিরাট ভুল হিসেবে চিহ্নিত করবে, সেটা কি আমি বুঝিনি! কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়ী হওয়া সত্ত্বেও তো এদেশে অনেকদিন ধরেই বলার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, মুক্তিযুদ্ধের আগেই আমরা ভালো ছিলাম, মুক্তিযুদ্ধটা ভুল ছিলো। যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে যারা জঘন্যতম সব অপরাধ করেছিলো তারা এই দেশে বসে এখন বলার সাহস পাচ্ছে - একাত্তরে তারা কোনো ভুল করেনি। তারা যদি ভুল না করে থাকে তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমরা ভুল করেছিলাম; দুই পক্ষই তো একসঙ্গে সঠিক হতে পারে না! ভুলটা সত্যি কাদের ছিলো? সারাদেশে যেভাবে ওদের হুংকার-হুমকি শোনা যাচ্ছে, ওদের কর্মকাণ্ড যেভাবে বেড়ে চলেছে, আর সরকারীভাবে ওদেরকে যেভাবে প্রোটেকশন দেয়া হচ্ছে বহুদিন ধরে, তাতে মনে হয় - হয়তো আমাদেরই ভুল ছিলো, নইলে তো এই দেশে ওদের অস্তিত্বই থাকতো না। এসব ভাবনা আমাকে আরও চুপ করিয়ে রাখে। অথচ কী আশ্চর্য এক সময় এসেছিলো আমাদের জীবনে, ভাবলে আজও শিহরণ জাগে। পুরো জাতিটাই মেতে উঠলো যেন এক পাগলা ঘণ্টির আহ্বানে - সারাজীবন ধরে যাদেরকে দেখেছি সাধারণ একেকজন মানুষ হিসেবে - তারাও নিমেষে যোদ্ধা হয়ে উঠলো, লাঙল আর কাস্তে ফেলে তুলে নিলো বন্দুক, প্রতিটি মানুষ কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেলো যোদ্ধাদের পেছনে - সাহস দিলো, প্রেরণা দিলো, ইতিহাসের বীভসতম অত্যাচার সয়েও, অকাতরে প্রাণ দিয়েও তারা জানিয়ে গেলো - মুক্তিযোদ্ধারা একা নয়, এদেশের কোটি কোটি মানুষ তাদের পাশেই আছে। মনে পড়ে, পঁচিশে মার্চের ক্র্যাকডাউনের সময় আমরা ঢাকায় ছিলাম, দুইদিন অবরুদ্ধ থাকার পর, আঠাশে মার্চে সবাই মিলে ঢাকা ছাড়লাম - এক অবর্ণনীয় কষ্টকর পথ পেরিয়ে বাড়িতে পৌঁছলাম রাতের বেলা। আর পৌঁছে শুনলাম এক আশ্চর্য খবর - ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী পঁচিশে মার্চ রাতেই মানিকগঞ্জ থানা আক্রমণ করে সাতশ’ রাইফেল লুট করে নিয়ে গেছেন যুদ্ধ করবেন বলে, এখন তিনি যুবকদের সংগঠিত করছেন, হরিরামপুরে আসবেন কালকে, এই উদাসপুর হয়েই যাবেন সেখানে। সারা শরীরে যেন শিহরণ খেলে গেলো। মনে হলো - আমাকেও যুদ্ধে যেতে হবে, আমিও যুদ্ধে যাবো, যাবোই। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো - ঢাকা থেকে আসার সময় রাস্তাঘাটে দেখে আসা ছড়ানো ছিটানো লাশ, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসা হাজার হাজার মানুষ, তাদের চোখেমুখে আতংক, উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে যাচ্ছে তারা, কোথায় যাবে সেটা ঠিকমতো না জেনেই। এই মানুষগুলোর অপরাধ কি? কি কারণে এমন নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালানো হলো, কেন লক্ষ কোটি মানুষকে নিরাপত্তাহীন করে তোলা হলো? আমার চোখমুখ শক্ত হয়ে এলো - টের পেলাম, হাত হয়ে গেলো মুষ্টিবদ্ধ। না, এখন আর বসে থাকার সময় নেই। যুদ্ধ যদি শুরু হয়েই যায়, তাহলে আমাকেও যেতে হবে - আমার মনে হলো। অথচ আমি ওই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত কোনোদিন ভেবেই দেখিনি যে, জীবনে কোনোদিন অস্ত্র হাতে নেয়ার দরকার হতে পারে। আমি সাহসী ছিলাম বটে, কিন্তু কোনোদিন ঢিল ছুঁড়ে একটা পাখিও মারিনি, মায়া লাগতো বলে। সেই আমার হাতে অস্ত্র, মানুষ মারছি - ভাবা যায়? অবশ্য যুদ্ধের সময় আমি কোনো মানুষ মারিনি, পাকিস্তানি সৈন্যদের মেরেছি, ওদেরকে আমার মানুষ বলে মনেই হতো না। যাহোক, ওই খবরটি শুধু আমার মধ্যেই নয়, মানিকগঞ্জের বিপুল সংখ্যক যুবককে উদ্বেল করে তুলেছিলো। ওই খবরটা যে পুরোপুরি সত্য নয় - সেটা আমরা জেনেছিলাম যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু পর। আসলে যে ক্যাপ্টেন হালিম মাত্র সাতটা রাইফেল পেয়েছিলেন সেটা তখন জানলে এত জোয়ার সৃষ্টি হতো না, এত সাহসও পেতনা যুবকরা। তখন আমরা কতোটুকুই বা বুঝতাম? বুঝলে তো এ কথা মনে হতোই যে, একটি সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিপুল অস্ত্র-সম্ভারের কাছে আমাদের ওই রাইফেল, তা সাতই হোক আর সাতশ’ই হোক নিতান্তই খেলনা। ভাগ্যিস আমরা যুদ্ধের কিছুই জানতাম না, কিছুই বুঝতাম না, জানলে এমন এক অসম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সাহসই পেতাম না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ক্যাপ্টেন সাহেব তো বুঝতেন জানতেন, তিনি তো পাকিস্তার আর্মির ক্যাপ্টেনই ছিলেন, ওদের শক্তি আর সামর্থ্যও তাঁর অজানা ছিলো না, জেনেশুনেও ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নেমে পড়ার সাহস তিনি কোথায় পেয়েছিলেন! যাহোক, পরদিন তিনি সত্যি এলেন। যাবেন হরিরামপুরের শেষ সীমা আজিম নগর পর্যন্ত, যাওয়ার সময় উদাসপুর হয়ে গেলেন। উদাসপুরে তাঁর আত্নীয় ছিলো - সেই বাড়িতেই সভা বসলো, তিনি আবেগময় ভাষায় যুবকদের আহ্বান জানালেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। আমরা অনেকে সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া দিলাম। ক্যাপ্টেন সাহেবের যাদুকরী বক্তৃতা, সাতশ’ রাইফেলের গল্প আর এই বিরাট দল দেখে আমরা সবাই সেদিন বুকে সাহস পেয়েছিলাম, মনে হয়েছিলো - আমরা পারবো। শুরুতেই যদি এতোটা সাড়া পাওয়া যায় তাহলে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এই অংশগ্রহণ আরো বাড়বে, অস্ত্রশস্ত্রও জোগাড় হয়ে যাবে আরও, আমাদের তখন ঠেকায় কে? এখন মনে হয় - ওই সাহস আর স্বপ্নই আমাদেরকে জিতিয়ে দিয়েছিলো - নইলে পাকিস্তানীদের অস্ত্রশস্ত্র. লোকবল, ট্রেনিং - এর কোনোকিছুর সঙ্গেই আমাদের পেরে উঠবার কথা ছিলো না। বুঝলি তপু, যুদ্ধ-জয়ের জন্য শুধু সাহস থাকলেই হয় না, স্বপ্নও থাকতে হয়, থাকতে হয় একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও গন্তব্য, আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছবার সম্ভাবনা। এবার যে পারলাম না, তার কারণটা কি বুঝেছিস তুই এখন!



মে, ২০০৬