ঘুম ও জাগরণের কিংবা স্বপ্ন ও বাস্তবতার
ভেতরকার দেয়ালটি ভেঙে গেলে মাহবুবের জীবনে ভীষণ বিপর্যয় নেমে আসে।
কোনটা যে স্বপ্ন আর কোনটা বাস্তব, কোনটা যে সত্যি আর কোনটা বিভ্রম
সেটা নির্ণয় করা তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এতে তার স্বাভাবিক
জীবনযাত্রা দারুণভাবে ব্যাহত হয় _ যদিও এ নিয়ে তার খুব বেশি উদ্বেগ
দেখা যায় না, উদ্বিগ্ন হয় বরং তার কাছের মানুষেরা, বিশেষ করে তার
স্ত্রী নাজমুন নাহার, যাকে অহরহ স্বপ্ন-বাস্তব, সত্য-বিভ্রম গুলিয়ে
ফেলা তালগোল পাকানো পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠতে হচ্ছে।
মাহবুবের স্বপ্নগুলোকে অবশ্য স্বপ্ন না বলে দুঃস্বপ্ন বলাটাই সঙ্গত
হবে _ বিচিত্র-ভয়াবহ-বীভৎস সব দুঃস্বপ্ন দেখে সে, যার কোনো আগামাথা
নেই, পারম্পর্য নেই, কার্যকারণ খুঁজে বের করাও কঠিন। মাহবুবের
দুঃস্বপ্নগুলোর মধ্যে যেটি সবচেয়ে কম ভয়ংকর, নিরাপদও বলা যায়, সেটি
হলো _ একটি পাঁচ মাথাওয়ালা বিরাটাকার সাপ তাকে তাড়া করছে, আর সে
এখানে পালাচ্ছে, ওখানে পালাচ্ছে, সিঁড়ি বেয়ে চবি্বশ তলায় উঠে
যাচ্ছে বা এঁকেবেঁকে দৌড়াচ্ছে, সাপ সিঁড়ি ভাঙতে পারে না বা
এঁকেবেঁকে চলতে পারে না _ ছোটবেলা থেকে জেনে আসা এই জ্ঞানগুলো কাজে
লাগানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু স্বপ্নে সেগুলো কোনো কাজেই লাগছে না,
সাপও তাকে অনুসরণ করে তার পেছনে পেছনে ধেয়ে আসছে, সিঁড়ি ভেঙেই বা
এঁকেবেঁকেই। একসময় পালাতে পালাতে সে হাঁপিয়ে ওঠে, স্বপ্নের মধ্যেই
চিৎকার করে ওঠে, নাজমুন নাহার হয়তো তখন ধাক্কা দিয়ে তার ঘুম ভাঙায়,
কিন্তু স্বপ্নের ঘোর সে সহসা কাটিয়ে উঠতে পারে না। ঘোরতর শীতের
রাতেও তার সারা শরীর ঘামে ভিজে চুপচুপে হয়ে যায়, বুকটা হাঁপরের মতো
ওঠানামা করে, অস্বাভাবিক দ্রুততায় শ্বাস-প্রশ্বাস পড়তে থাকে,
বিকারগ্রস্তের মতো সাপ সাপ বলে চিৎকার করতে থাকে সে। নাহার বহুক্ষণ
ধরে তাকে বোঝায় _ 'তুমি স্বপ্ন দেখছিলে, এখন জেগে আছো' _ তবু তার
আস্থা ফিরে আসতে সময় লাগে; মশারি টানানোর দড়ি, আলনায় ঝুলে থাকা
নাহারের শাড়ি ইত্যাদির দিকে আঙুল তুলে তুলে _ 'ওই তো সাপ, ওই তো' _
বলে চেঁচায়। নাহার তখন সেগুলো ধরে ধরে দেখায়, অবশেষে তার ঘোর ভাঙে
_ 'ও, তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম' _ বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে, পানি
খেতে চায়, তারপর হাত পা গুটিয়ে শিশুর মতো নাহারকে জড়িয়ে ধরে আবার
ঘুমায়। তার শরীর তখন অল্প অল্প কাঁপে, শীতে না ভয়ে _ নাহার তা বুঝে
উঠতে পারে না। নাহার সারারাত জেগে বসে থাকে, মাহবুবের শিশুর সারল্য
মাখা নিস্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বুকটা মমতায় ভরে
ওঠে, বুঝতে পারে না _ কী করলে লোকটা এই দুঃসহ সমস্যা থেকে মুক্তি
পাবে। মাহবুবের জগৎ দুঃস্বপ্নে ভরে যেতে থাকে, ঘুমোলেই দুঃস্বপ্ন _
সাপের তাড়া খাওয়া, সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হওয়া, রোড অ্যাকসিডেন্টে
মারা যাওয়া, চবি্বশ তলার ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া, চেনা মানুষগুলোর হঠাৎ
ড্রাকুলায় পরিণত হওয়া, ভীষণ ঝড়ে সমস্ত জনপদ লণ্ডভণ্ড হওয়া ইত্যাদি
নানাবিধ দুঃস্বপ্নের আক্রমণে তার চোখের নিচে কালি পড়ে, আর
চোখে-মুখে উদ্ভ্রান্ত-দিশেহারা একটা ভাব, সারাক্ষণ এক অদ্ভুত
অস্থিরতা তাকে যেন অল্প সময়েই বুড়ো করে তোলে।
পরিস্থিতি বিপদজনক হয়ে উঠলে পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শে নাহার
মাহবুবকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়। ভদ্রলোক প্রীতিপূর্ণ
ব্যবহারে মুগ্ধ করেন দুজনকেই, প্রাথমিক আলাপের পর জিজ্ঞেস করেন _
মাহবুবের ঘুম হালকা কী না, অল্পেই ভেঙে যায় কী না। হঁ্যা, নাহার
জানায় _ দরজায় মৃদু শব্দ, বাথরুমে পানি পড়ার শব্দ, এমনকি নাহারের
সাবধানী পায়ের শব্দেও ঘুম ভেঙে যায় তার। তারপর তিনি মাহবুবের
পারিবারিক ইতিহাস জানতে চাইলে মাহবুব যতোটুকু জানে অপকটে বলে যায়,
কোথাও কোথাও তাকে থামিয়ে আরো খুঁটিয়ে জানতে চান তিনি, আবার
পূর্বপ্রসঙ্গ ধরিয়েও দেন। মাহবুব ছোটবেলায় তার বাবাকে হারিয়েছে এবং
তাঁর মৃতু্যটা কোনো স্বাভাবিক মৃতু্য ছিলো না, ওটি ছিলো একটি
হত্যাকাণ্ড এবং মাহবুব ছিলো সেই দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী _ বিষয়টি
সম্ভবত ডাক্তার সাহেবকে ভাবিয়ে তোলে। বহুক্ষণ ধরে তিনি এ নিয়ে কথা
বলেন, মাহবুব যথাসম্ভব স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে সেটার বর্ণনা দেয়,
দিতে দিতে তার চোখে-মুখে ভয়মিশ্রিত যন্ত্রণার অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে,
ডাক্তারের তা চোখ এড়ায় না। তিনি বিষয়টি সম্বন্ধে আরো ভালোভাবে
জানতে চান, মাহবুব আর তেমন কিছু বলতে পারে না দেখে তিনি তখন তার
মায়ের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরদিন মাহবুব তার মাকে
নিয়ে ডাক্তারের কাছে হাজির হলে তিনি আবারও তার বাবার মৃতু্যর
বিষয়টি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেন। যতোটা সম্ভব আবেগ সামলে
ঘটনার বর্ণনা দেন মা _ অজ্ঞাত কারণে তার স্বামীকে হত্যা করা
হয়েছিলো, বাসাতেই, নৃশংসভাবে _ এবং তাকে ও মাহবুবকে সেই দৃশ্য
দেখতে বাধ্য করা হয়েছিলো। তিনি ওই ঘটনার কোনো কূল-কিনারা করতে
পারেননি, বলা উচিৎ _ করতে চাননি, কারণ যে দলটি এসে হত্যাকাণ্ডটি
ঘটিয়েছিলো, তিনি তাদের মধ্যে একজনকে চিনতেন। সেই লোক হুমকি দিয়ে
গিয়েছিলো _ যদি পুলিশের কাছে তার নাম বলা হয়, তাহলে মাহবুবকেও তার
সামনেই এর চেয়েও নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে। তিনি তাই তদন্তকারী
কর্মকর্তাদের কাছে একবারের জন্যও বলেননি যে, তিনি এদের একজনকে
চেনেন। বরং মিথ্যে করে বলেছেন _ এদের কাউকেই তিনি চেনেন না, দেখলেও
সনাক্ত করতে পারবেন না, কারণ তাদের মুখে কালো কাপড় বাঁধা ছিলো এবং
ঘটনার সময় তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এ সবকিছুই তিনি করেছিলেন
মাহবুবের নিরাপত্তার কথা ভেবে। এই ঘটনার পর থেকে তিনি প্রচণ্ড
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন। ছেলেকে নিয়ে সেই শংকা, সেই
নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তার আজও দূর হয়নি।
ডাক্তার সাহেব মনোযোগ দিয়ে গম্ভীর মুখে সব কথা শোনেন। তারপর
আলাদাভাবে নাজমুন নাহারকে ডেকে নেন। বলেন, আপনার স্বামীর সম্বন্ধে
আরো কিছু তথ্য আমার জানা দরকার।
বলুন।
তাকে আপনার কেমন মানুষ বলে মনে হয়?
ভালো।
কেমন ভালো?
একজন মানুষের যতোটুকু ভালো হওয়া সম্ভব, সে তাই।
উনি গান শোনেন?
হঁ্যা, শোনে।
মাঝে মাঝে, নাকি প্রায়ই?
প্রায় সবসময়।
বই পড়েন?
হঁ্যা, খুব।
কি ধরনের বই?
সব ধরনেরই।
বিশেষ করে পছন্দ করেন কোন ধরনের বই?
সব রকম বই-ই খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে, তবে সম্ভবত বেশি পছন্দ করে
কবিতা।
সিনেমা দেখেন?
না, বই পড়ে, গান শোনে, সিনেমা খুব একটা দেখে না।
বিশেষভাবে পছন্দ করেন এমন কোনোকিছুর কথা বলতে পারেন?
হঁ্যা, অনেককিছু।
যেমন?
ভোর দেখতে পছন্দ করে, প্রত্যেকদিন ভোরে ব্যালকনিতে গিয়ে বসে থাকে।
বিকেলেও ছাদে গিয়ে বসে থাকে, সন্ধ্যা পর্যন্ত ওখানেই কাটায়।
পূর্ণিমার রাত পছন্দ করে, প্রায় সব পূর্ণিমাতেই আমাকে নিয়ে রিকশায়
চড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে বেড়ায়। বৃষ্টি পছন্দ করে, নদী পছন্দ করে
..
শুনতে শুনতে ডাক্তার সাহেবের ভ্রু কুঁচকে ওঠে। জিজ্ঞেস করেন, আপনার
স্বামী কি কোনো ক্রিয়েটিভ কাজ করেন? যেমন লেখালেখি বা আঁকাআঁকি...
না। ডাক্তার সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন, তারপর আবার বলেন, আর বিশেষ
কিছু?
একটা ব্যাপার আপনাকে বলা যায়, কিন্তু এটা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ
ব্যাপার কী না বুঝতে পারছি না।
বলুন।
ওর মধ্যে শিশুসুলভ কিছু ব্যাপার আছে।
কি রকম?
অনেক গান শুনে ও কাঁদে, বই পড়তে পড়তেও গোপনে কাঁদতে দেখেছি। কখনো
কখনো আমাকে ডেকে ওর প্রিয় কোনো কবিতা পড়ে শোনায়, কিন্তু শেষ করতে
পারে না, গলা ধরে আসে..
এটাকে আপনি শিশুসুলভ ব্যাপার বলছেন কেন?
না, মানে, এই বয়সে কেউ গান শুনে বা বই পড়ে কাঁদে নাকি?
আচ্ছা বুঝলাম। তারপর?
রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলে অনেকক্ষণ ওই ঘোরেই থাকে _ সেটা তো
আগেই বলেছি। কিন্তু ঘোর কাটার পর একটা শিশুর মতো হাত পা গুটিয়ে
আমার গলা জড়িয়ে ধরিয়ে ঘুমায়...
আচ্ছা। আর কিছু?
ও খুব অসামাজিক। কোনো আত্নীয়স্বজনের সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক নেই,
কোনো বন্ধুবান্ধবও নেই, কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যায় না, কেউ আমাদের
বাসায় এলেও ও বিরক্ত হয়, তাদের সঙ্গে ভালোভাবে কথা পর্যন্ত বলে না।
ডাক্তার সাহেব অনেকক্ষণ কোনো কথা বলেন না। আর কিছু জানতেও চান না।
নাহার অপেক্ষা করে, কিন্তু তিনি যেন ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন। অনেকক্ষণ
পর নাহার জিজ্ঞেস করে _ ডাক্তার সাহেব, এটা কি কোনো অসুখ?
ডাক্তার সাহেবের ধ্যান ভাঙে। বলেন _ আপনাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি।
আপনার স্বামীই শুধু নয়, আপনার শাশুড়িও এক ধরনের অস্বাভাবিকতায়
ভুগছেন। আপনার শ্বশুরের খুন হওয়ার ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে
নিরাপত্তাহীন করে তুলেছিলো এবং সেটাই তার ছেলের মধ্যে প্রবাহিত
হয়েছে। তাছাড়া ছোটবেলায় চোখের সামনে বাবাকে নৃশংসভাবে খুন হতে দেখে
মাহবুব সাহেবের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো। এরকম একটি ঘটনার
প্রতিক্রিয়া ব্যক্তিভেদে বিভিন্নরকম হয়। কারো কারো মধ্যে তীব্র
প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নেয়, কিন্তু মাহবুব সাহেব যেহেতু স্পর্শকাতর
এবং নরম মনের মানুষ _ যেমনটি আপনি বললেন, তিনি গান শুনে বা বই পড়ে
কাঁদেন _ তাই তার মধ্যে জন্ম নিয়েছে ভয়, শংকা ও নিরাপত্তাহীনতার
বোধ। মানুষকে তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না বলেই কারো সঙ্গে মেশেন না
_ আর বিশ্বাস করবেনই বা কীভাবে, পরিচিত লোকরাই তো তার বাবাকে হত্যা
করেছিলো! তো, এইসব ভয়_ভীতি-শংকা ও নিরাপত্তাহীনতা তার অবচেতন মনে
যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে সেখান থেকেই এতসব দুঃস্বপ্নের জন্ম হয়।
আর তার যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ সেটা প্রায় শিশুর মতোই। শৈশবে তিনি
যে দৃশ্য দেখেছিলেন, দুঃস্বপ্নের পরবর্তী মুহূর্তে তিনি সেরকমেরই
একটা অনুভূতিতে ভোগেন, তাই ফের ঘুমোবার সময় শিশুর মতো ঘুমান...
এর কি কোনো চিকিৎসা নেই?
হঁ্যা, নিশ্চয়ই আছে। আমার ধারণা তিনি সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
তার মূল সমস্যা হচ্ছে _ তিনি মানুষকে বিশ্বাস করতে পারেন না,
কিন্তু সেজন্য তিনি পৃথিবীর অন্যসব রূপ-রস-গন্ধ থেকে নিজেকে দূরে
সরিয়ে রাখেননি। প্রকৃতির সৌন্দর্য, শিল্পের সৌন্দর্য তিনি উপভোগ
করেন। মানুষও যে প্রকৃতিরই সৃষ্টি, মানুষের মধ্যেও যে বিপুল
সৌন্দর্য আছে এটা যদি তিনি উপলব্ধি করতে পারেন, তাহলে বিশ্বাসটা
ফিরে পাবেন। এ দেশের অধিকাংশ মানুষই তো সহজ সরল ভালো মানুষ, সম্ভব
হলে উনাকে তাদের সঙ্গে মেশার সুযোগ করে দেবেন। আপাতত আমি কিছু ওষুধ
দিচ্ছি, একটু রিল্যাক্স হওয়ার জন্য, আর নিয়মিত সিটিংটাও চলতে থাকুক
_ আশা করছি আমরা সবাই মিলে তাকে তার সমস্যাটি কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে
সাহায্য করতে পারবো।
এরপর ডাক্তার সাহেব মাহবুব ও মায়ের কাছে এদেশের মানুষ সম্বন্ধে তার
দীর্ঘকালের পর্যবেক্ষণ হাজির করেন। তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় 'শিক্ষিত'
মানুষদের প্রতি বিরক্তি আর 'সাধারণ' মানুষদের প্রতি ভালোবাসার
প্রকাশ মাহবুব ও তার মাকে মুগ্ধ করে বটে, কিন্তু তারা যেহেতু বাস
করে শিক্ষিত মানুষের সমাজে তাই তাদের ভয় ও শংকাটা আর কাটেনা।
ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিত সিটিং চলতে থাকে, কিন্তু মাহবুবের
দুঃস্বপ্নজনিত সমস্যা তো কাটেই না বরং নতুন সমস্যা যুক্ত হয়। আগে
সে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেও অনেকক্ষণ স্বপ্নের ঘোরেই থাকতো, মনে
করতো সে স্বপ্নই দেখছে। এখন অনেক বাস্তব ঘটনাকে সে স্বপ্ন বলে মনে
করে, সে যে জেগেই আছে এবং ঘটনাটি বাস্তবেই ঘটছে সেটা বুঝে উঠতে
পারে না। কবে থেকে এই সমস্যা শুরু হলো, নাহার ধরতে পারেনি, কিন্তু
প্রথম বুঝতে পারে একটি ছোট্ট ঘটনা থেকে। একদিন বিছানায় শুয়ে, খুব
মগ্ন হয়ে, টিভি-তে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একটা সাপ-বিষয়ক অনুষ্ঠান
দেখছিলো মাহবুব। অনেকক্ষণ পর সে নাহারকে ডাকে আর তার
প্রায়-অস্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শুনে নাহার চমকে ওঠে _ কিছু বলবে?
জানো, আমার স্বপ্নগুলো এত জীবন্ত যে, মনে হয় বাস্তবেই ঘটছে। কি রকম?
এই যে এখন যেমন আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি, সেটা বুঝতেও পারছি, তবু মনে
হচ্ছে এটা কোনো স্বপ্ন নয়। মনে হচ্ছে _ তুমি সত্যিই পাশে বসে আছো,
আমি টিভি দেখছি, আর টিভির স্ক্রিনজুড়ে শুধু সাপ আর সাপ। আমি সাপ
দেখলে আতংকিত হয়ে পড়ি, দ্যাখো আমার শরীরটা কেমন ফুলে গেছে, বুঝতে
পারছি এই এক্ষুণি তুমি ধাক্কা দিয়ে আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে দেবে, তবু
আমার এমন ভয় লাগছে... বলতে বলতে সে গোঙানি শুরু করে।
নাহার হতবাক হয়ে যায়। মাহবুব যে স্বপ্ন ও বাস্তবতার পার্থক্যটা
ধরতে পারছে না সেটা বুঝতে পেরে সে দিশেহারা বোধ করে, কি করবে বুঝতে
না পেরে রিমোট কন্ট্রোলটা হাতে নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিয়ে মাহবুবের
শরীরে ধাক্কা দেয় _ এ্যাই কি হয়েছে তোমার?
মাহবুব যেন ঘুম থেকে জেগে ওঠে, বলে _ না একটা স্বপ্ন দেখছিলাম।
স্বপ্ন দেখছিলে!
হঁ্যা।
কি স্বপ্ন?
সসাপ। দেখলাম টিভির স্ক্রিন জুড়ে শুধু সাপ আর সাপ।
নাহার মাহবুবের ভুলটা ধরিয়ে দেবে কী না সিদ্ধান্ত নিতে পারে না,
দিলে যদি উল্টো প্রতিক্রিয়া হয়! পরদিনই ডাক্তারের কাছে যায় সে,
তিনি আরো অনেক কথা জানতে চান, পুরনো ওষুধ পাল্টে নতুন ওষুধ দেন,
কিন্তু কোনো লাভ হয় না। দুদিন পরেই একইরকম একটি ঘটনা ঘটে, তা-ও
দিনের বেলায়, রাস্তায়। তারা দুজন গিয়েছিলো মার্কেটে, ফেরার পথে
তাদের সামনেই একটা রোড অ্যাকসিডেন্ট ঘটে, একটা মিনিবাস রাস্তা পার
হতে চাওয়া একটি শিশুকে চাপা দিলে শিশুটি সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়।
বিকট শব্দে তার খুলি ফেটে ঘিলু বেরিয়ে আসে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই
মাহবুব রিকশা থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত শিশুটিকে জড়িয়ে ধরে তারস্বরে
চিৎকার করতে থাকে। তাদের চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে যায়, শিশুটির চেয়ে
তারা মাহবুব আর নাহারের প্রতিই যেন বেশি আগ্রহী। প্রায় সমস্বরে
তারা বলে চলে _ 'এই বাচ্চাটা কি হয় আপনাদের, কি হয়?' নাহার কিছু
বলতে পারে না, লোকজনের দিকে মনোযোগ দেয়ার চেয়ে মাহবুবকে রক্ষা করার
ব্যাপারটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। মাহবুব বাচ্চাটাকে
কোলে তুলে নিয়েছে, তারস্বরে চিৎকার করে চলেছে তো চলেছেই, কিন্তু কী
যে বলছে তা স্বয়ং নাহারই বুঝতে পারছে না। নাহার অনেক কষ্টে
মাহবুবের কোল থেকে বাচ্চাটাকে নামায় _ মাহবুব তাতে অস্বাভাবিক রকম
ক্ষেপে ওঠে, নাহারকে তেড়ে মারতে আসে, তবু তাকে প্রায় জোর করেই
রিকশায় তোলে সে। কিন্তু মাহবুবের চিৎকার থামে না। বাসায় পেঁৗছার
পরও তার চিৎকার অব্যাহত থাকে। তার মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, মাহবুব
শিশুর মতো মায়ের বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে থাকে। মা আর নাহার
মিলে তার চোখেমুখে পানি দিয়ে বিছানায় শুইয়ে মুখে-মাথায়-শরীরে
ক্রমাগত হাত বুলাতে থাকলে সে একটু সুস্থির হয়, যেন এইমাত্র তার ঘুম
ভাঙলো এমনভাবে বলে _ একটা দুঃস্বপ্ন দেখলাম মা।
মা নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকেন, বুঝতে পারেন না, কী বলা বা করা উচিত।
কি দেখলাম জানো?
ককি বাবা?
দেখলাম, আমি আর নাহার মার্কেটে গেছি, ফেরার পথে একটা এ্যাকসিডেন্ট
হলো, একটা মিনিবাস একটা বাচ্চাকে পিষে মেরে ফেললো, আমি রিকশা থেকে
নেমে গিয়ে দৌড়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দেখলাম, ওটা আসলে আমিই। আমিই
মারা গেছি...
মমাহবুব তার এইমাত্র দেখা ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলো আর মা কাঁদছিলেন,
সেটা দেখে সে উল্টো মাকেই স্বান্ত্বনা দেয় _ তুমি কাঁদছো কেন মা,
আমি তো আর সত্যি সত্যি মরিনি! দ্যাখো, আমাকে ছুঁয়ে দ্যাখো।
এরকম একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকলে নাহার একদিন আর সইতে না পেরে
মাহবুবের ভুলটা ধরিয়ে দেয়। প্রথমে সে বিশ্বাস করে না, তারপর হঠাৎ
করেই খুব গম্ভীর হয়ে যায়, অনেকক্ষণ ঝিম মেরে থাকার পর বলে _ তুমি
বলছো, এসব সত্যি ঘটনা, স্বপ্ন নয়?
হহঁ্যা, এগুলো স্বপ্ন না, সত্যি।
তাহলে আমি বুঝতে পারলাম না কেন? কেন ওগুলোকে আমার স্বপ্ন বলে মনে
হলো?
আমারও তো একই প্রশ্ন। কেন তুমি বুঝতে পারো না যে, কোনটা স্বপ্ন আর
কোনটা সত্যি?
আশ্চর্য! কেন আমি বুঝতে পারি না? আমার কি হলো?
আমার কি হলো, আমার কি হলো _ এইরকম অবস্থায় আরো কয়েকদিন কাটালো
মাহবুব। তাতে তার সমস্যাটা তো কমলোই না, বরং তার স্বপ্ন আর
বাস্তবতার বোধ আরো জট পাকিয়ে গেলো। স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে সে
নাহারকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো _ আমি কি স্বপ্ন দেখেছি, নাকি সত্যিই
ঘটেছে? সমস্যাটা রইলো বাস্তব ঘটনা নিয়েও। যে কোনো দুর্ঘটনার
মুখোমুখি হয়েই তার মধ্যে প্রশ্ন জাগতে লাগলো _ ব্যাপারটা কি সে
সত্যি দেখছে, নাকি এটা স্বপ্ন? নাহারের মনে হলো, মাহবুব বরং আগেই
ভালো ছিলো, শুধু দুঃস্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কোনো জটিলতা ছিলো না, এখন
তার চোখে মুখে পরিষ্কার বিভ্রান্তির ছাপ, দৈনন্দিন কাজগুলোও ঠিকমতো
করতে পারছে না। এমনকি গান ছাড়া যে থাকতেই পারে না, এখন সে গানও
শুনছে না, বই ছাড়া যে প্রায় অচল এখন সে বই হাতে নিয়েও দেখছে না,
সবসময়ই কেবল কী যেন ভেবে চলেছে। এখন তার সারাটি সময় কাটে স্বপ্ন ও
বাস্তবের পার্থক্য নির্ণয়ের চেষ্টায়, এবং বলাবাহুল্য, খুব কম সময়েই
সে সেটা করতে সফল হচ্ছে। নাহার নিজের মতো করে মাহবুবকে এই সংকট
থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করে যায়। সমস্যাটা পুরোপুরি না কাটুক,
অন্তত ওকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় কী না সেই ভাবনা থেকেই সে
আবার মাহবুবের হাতে বই তুলে দেয়, ক্যাসেট বা সিডি প্লেয়ারে তার
প্রিয় গানগুলো বাজিয়ে শোনায়, নিজে গেয়েও শোনায় কখনো কখনো, আবার
কখনো বা মাহবুবের কাছে এসে বলে, আমাকে একটা কবিতা পড়ে শোনাও না!
এসব করতে করতে একসময় মাহবুব যেন কিছুটা ধাতস্থ হয়।
তারপর কোনো এক জোৎস্নাপ্লাবিত হাওয়ামুখর বসন্তের রাতে নাহারকে নিয়ে
রিকশায় করে ঘুরতে ঘুরতে, গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে, নাহারের মদির
কণ্ঠে আনন্দধারা বহিছে ভুবনে বা মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি'র মতো
রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুনতে, রিকশাওয়ালার খোশগল্প ও উদাত্ত গান এবং
রাস্তার পাশের চা-র দোকানদারের প্রীতিময় আপ্যায়নে মুগ্ধ হতে হতে
মাহবুব স্বপ্নঘোরগ্রস্ত হয়ে বাসায় ফেরে। মনে হয় _ পৃথিবীটা সত্যিই
বড় সুন্দর জায়গা, জীবনটা ভারি মনোরম; এখানে কোনো আতংক নেই, নেই ভয়
বা শংকা, শোক নেই, দুঃখ নেই, দুঃস্বপ্নের দুঃসহ যন্ত্রণা নেই। মনে
হয় _ সত্যিই যেন এক আনন্দধারা বয়ে চলেছে পৃথিবী জুড়ে। বাসায় ফিরে,
এমনকি, মায়ের দুঃচিন্তাক্লিষ্ট-দুঃখী-ক্লান্ত মুখটিকেও মনে হয়
আনন্দে ভরপুর _ মাকে জড়িয়ে ধরে সে বলে _ 'চিন্তা করছিলে না মা? আর
ভেবো না, আমি সুস্থ হয়ে গেছি। পৃথিবীটা তো আসলে অতো খারাপ জায়গা
নয়। আর এই দেশ, কী সুন্দর মা, এমন সুন্দর চাঁদ কী পৃথিবীর অন্য
কোথাও ওঠে, আর কোনো দেশে কী এমন সুন্দর বৃষ্টি হয়, পাখিরা কী অন্য
কোনো দেশে এমন মধুর সুরে ডাকে, এত নদী এত সবুজ কী আর কোনো দেশে
আছে' _ তার সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে ভালো লাগছিলো _ 'আর
এই দেশের মানুষগুলো কী যে ভালো! জানো মা, আজ আমাদের রিকশাওয়ালাটা
আমাদেরকে গান শোনালো, এতক্ষণ ঘুরলাম কিন্তু কিছুতেই বেশি ভাড়া নিলো
না, রাস্তার পাশে চা খেতে বসেছিলাম _ সেই চাওয়ালা দামই নিতে চাইলো
না, বলো মা, আর কোনো দেশে এমন আন্তরিকতা আছে, আর কোনো দেশের মানুষ
অচেনা একজন মানুষকে এত ভালোবাসতে পারে!' ছেলের কথা শুনতে শুনতে মা
কাঁদেন, আর মাহবুব সান্ত্বনা দেয় _ 'কেঁদো না মা, আমি তো সুস্থ হয়ে
গেছি... কেঁদো না, তোমার কান্না দেখলে আমার কষ্ট হয় ...'
তারপর রাত আরেকটু গভীর হলে তারা যখন খেয়েদেয়ে ঘুমানোর আয়োজন করছে,
তখন তাদের দরজায় নক হয়। কে? ওপাশে একজন চেনা লোক_ 'দরজাটা একটু
খুলুন, একটা খবর দিতে এসেছি।' তাকে সবাই চেনে, এ পাড়ায় সে পরিচিত
লোক, তার নূরানী চেহারা থেকে যেন দু্যতি ঠিকরে পড়ে, নিজেকে নিজেই
'সৎ লোক' বলে দাবি করে সে, আর দেশটা যে 'সৎ লোকের শাসন' বঞ্চিত বলে
রসাতলে যাচ্ছে এ নিয়ে আফসোস করে মরে এবং সবাইকে বিষণ্ন করে তোলে।
মায়ের নিষেধ সত্ত্বেও মাহবুব দরজা খোলে, আর খুলতে না খুলতেই তার
সঙ্গে হুড়মুড় করে ঢোকে আরও তিনজন, ঢুকে নিজেরাই দরজা বন্ধ করে দেয়
এবং মুহূর্তেই মাকে বেঁধে ফেলে, তারপর মাহবুবকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে
তার বেডরুমে নিয়ে আসে। ঘটনার আকস্মিকতায় নাহার তখন বিমূঢ়, কী করবে
বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু তাকে কিছু করতেও হয় না, যা করার করে
তারাই। মাহবুবকে দাঁড় করিয়ে হুংকার ছাড়ে _ এক পা-ও নড়বি না, নড়লেই
খুন কইরা ফালামু....খানকির পুত গান শোনো, কবিতা পড়, চাঁদ দ্যাখো,
শুয়ারের বাচ্চা বাংলার রূপ দেইখা মুগ্ধ হও, তোমার মুগ্ধ হওয়া
ছুটাইতেছি... বলতে বলতে তারা _ চার দুর্বৃত্ত _ নাহারকে জোর করে
শুইয়ে দেয়, একটানে খুলে নেয় তার পোশাক। সে চিৎকার করার চেষ্টা করলে
একজন তার লোমশ-কর্কশ-নির্মম-বীভৎস হাতে নাহারের সুন্দর মুখটি চেপে
ধরে _ একফোঁটা শব্দ করবি না মাগী, করলে তর সামনে তোর ভাতাররে খুন
করুম... বলতে বলতে ওরা তার সকল সারল্য ও সহজতা, সমস্ত সৌন্দর্য ও
ঐশ্বর্য লুট করে নেয়।
নাহার তার স্বামীর গান শোনা ও কবিতা পড়া ও চাঁদ দেখা ও বাংলার রূপে
মুগ্ধ হওয়ার 'অপরাধে' ধর্ষিত হয়।
তারপর... তারপর হাসপাতাল, মেডিকেল চেক-আপ, থানা-পুলিশ, তদন্তকারী
কর্মকর্তা, আদালত, উকিল, বিচারক। মাহবুবকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় _
ঘটনার সময় তো আপনি সামনেই ছিলেন, আপনার স্ত্রীকে রেপ করা হলো আর
আপনি কিছুই বললেন না, এটা কেমন কথা? _ তখন তাকে বিভ্রান্ত দেখায়,
বলে _ আমার মনে হচ্ছিলো... মনে হচ্ছিলো...
হঁ্যা বলুন, কি মনে হচ্ছিলো?
মনে হচ্ছিলো... ওটা কোনো সত্যি দৃশ্য নয়... মনে হচ্ছিলো... মনে
হচ্ছিলো আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি...
মার্চ - এপ্রিল, ২০০৪ |
| |
 |
|