অফিস থেকে
ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে ফেরার পর বেশ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকার অভ্যাস
মাহবুবের। এই সময় কোনো কথা বলতে ভালো লাগে না, কারো কথা শুনতেও ভালো লাগে
না। প্রায় একযুগ ধরে চাকরি করছে সে, তবু অফিস ব্যাপারটাই তার কাছে একটা
বিভীষিকা, সকালে যাওয়ার সময় আর সন্ধ্যায় ফেরার পর তার মেজাজ চড়া হয়ে থাকে -
যদিও সেটা প্রকাশ করে না, কেবল তার গম্ভীর হয়ে বসে থাকা দেখে সেটা বোঝা
যায়। আর রাগটা করবেই বা কার ওপর? চাকরি করতে হচ্ছে - এজন্য তো কাউকে দায়ী
করা চলে না, বড়জোর নিজের ওপর রেগে থাকা যায়। সেটাও অবশ্য তার নিজের কাছে
যুক্তিসঙ্গত মনে হয় না। পড়াশোনা শেষ করার পর সে প্রায় বছর তিনেক একরকম
বেকার ছিলো - সেই সময়টা ছিলো দুঃসহ, শেষদিকে এসে সে একেবারে ভেঙে পড়েছিলো,
নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলো, আত্নবিশ্বাস এসে দাঁড়িয়েছিলো শূন্যের
কোঠায়। সেই বিভীষিকাময় দুঃসময়ের চেয়ে এই যন্ত্রণা অনেক বেশি সহনীয়। সে তাই
অসহায় বোধ করে, কিছুই করার নেই এই পরিত্রাণহীন বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবার
জন্য, প্রতিদিনের সেই একই রুটিন, একই কাজকর্ম, একই লোকজন তাকে ক্লান্তির
শেষ সীমায় নিয়ে এসেছে - একেক সময় ইচ্ছে করে এসব কিছু ছেড়ে দিয়ে বনজঙ্গলে
চলে যেতে, সেটা সম্ভব না হলে অন্ততপক্ষে পিতৃভূমি গ্রামে তো যাওয়া যায়!
এগুলো কিছুই হবার নয়, অন্তত তার পক্ষে এসব সম্ভব নয়, এরকম কিছু করার জন্য
যে তীব্র মনোবল প্রয়োজন সেটা তার নেই - একথা সে জানে। সে তাই অসহায়ের মতো
এই শেকলবন্দী জীবনকেই মেনে নিয়েছে। তার এই অদ্ভুত যন্ত্রণার কথাটি শিউলী,
তার স্ত্রী, না বুঝলেও এটুকু বোঝে যে, এতদিনেও মাহবুব ঠিক চাকরি ব্যাপারটার
সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে নি। বোঝে এটাও যে, অফিসে যাওয়ার সময় আর
ফেরার পর ওর মেজাজ এ কারণেই খুব চড়া থাকে, বিয়ের পর পর এ দুটো সময়ে সাবধান
থাকলেও এখন আর অতোটা কেয়ার করে না সে, বরং ব্যাপারটাকে মাহবুবের স্বভাবের
অংশ হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে। যাওয়ার সময় বাজারের ফর্দ ধরিয়ে
দেয়া আর আসার পর পরই কথার ঝাঁপি খুলে বসাটা তার জন্য নিয়মিত ব্যাপার হয়ে
দাঁড়িয়েছে। বিরক্ত হলেও মাহবুব অবশ্য শিউলীকে তা বলে না, বেচারি সারাদিন
একা একা থাকে, কথা বলার একজন মানুষ নেই বাসায়, কেবল আড়াই বছরের বাচ্চাটা
ছাড়া - ওর সঙ্গে তো আর গল্প করা যায় না! এই সমস্যাটা সমাধানের অযোগ্য। মা
বাবা নেই, বিয়ের আগে বোনের বাসায় থাকতো মাহবুব, তারপর আলাদা বাসায় নেয়ায়
শিউলীর একা থাকাটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন কি বিশ্বস্ত একজন কাজের
মানুষও পাওয়া দুস্কর, পেলেও বেশিদিন থাকতে চায় না। অথচ এখন একজন কাজের
মানুষ খুবই দরকার, বাচ্চাটাকে সামলাতেই শিউলী হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে, ওরও তো
একজন খেলার সঙ্গী দরকার, সারাদিন মা ছাড়া আর কাউকে পায় না বলে মা-ই তার
সর্বক্ষণিক খেলার সঙ্গী, এর মধ্যে আবার বাসার এত এত কাজ - রান্নাবান্না, ঘর
গোছানো, কাপড়চোপর ধোয়া - শিউলীর সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে আবার
দ্বিতীয়বারের মতো কনসিভ করেছে ও। এই সময় যতোটা বিশ্রাম প্রয়োজন, তার
সিকিভাগও পায় না শিউলী। এই অবস্থায় কী যে করা যায় মাহবুব ভেবেই পায় না। এমন
কোনো আত্বীয়স্বজন নেই যাকে কাছে এনে রাখা যায় - সবারই তো ঘর সংসার আছে, তার
সংসার দেখাশোনা করার মতো সময় বের করবে কে? কাজের মানুষও সে খুঁজছে হন্যে
হয়ে - সমস্ত আত্বীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সহকর্মীদের বলে রেখেছে সে, কিন্তু কী
যে হলো দেশটার, এত এত গরীব মানুষ অথচ কাজের লোক পাওয়া যায় না! তো, আজকে
ফেরার পর শিউলী যে বেশ উত্তেজিত ভঙ্গিতেই খবরটা জানালো, তাতে অবাক হবার
কিছু নেই। বললো,
শোনো, ছোট খালা আজকে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছিলো!
মেয়ে! কোন মেয়ে?
কাজের মেয়ে।
ও, তাই নাকি? নিয়ে এসেছিলো মানে কি, আবার ফেরত নিয়ে গেছে নাকি?
নিয়ে যায় নি, আমিই ফেরত পাঠিয়েছি।
কেন? তোমার শরীরের এই অবস্থা, একটা কাজের লোক কত দরকার! ফেরত পাঠালে কেন?
সমস্যা আছে।
সমস্যা! কি সমস্যা?
মেয়েটার বয়স অল্প, মানে তরুণী।
তাতে সমস্যাটা কি?
খুব সুন্দরীও।
তাতেই বা সমস্যা কি?
তুমি বুঝতে পারছো না, মেয়েটা খুবই সুন্দরী।
বুঝলাম খুবই সুন্দরী, তাতে সমস্যা কি সেটা তো বুঝতে পারছি না।
শিউলী গম্ভীর গলায় বললো -
মেয়েরা কনসিভ করলে স্বামীদের মতিগতির ঠিক থাকে না। এইরকম সময় এমন সুন্দরী
সোমত্ত কাজের মেয়ে রেখে বিপদ ডেকে আনবো নাকি?
মাহবুব হো হো করে হেসে ফেললো, ভালোই বলেছো। এখন ইয়ার্কি রেখে খালাকে ফোন
কর, মেয়েটাকে রেখে যাক।
তোমার আগ্রহটা একটু বেশি মনে হচ্ছে!
শিউলীর গলায় সন্দেহ টের পেয়েও মাহবুব হাসিমুখেই বললো, ফাজলামো করো না তো!
খালাকে ফোন কর, যাও...
ফাজলামো করছি না তো! সুদর্শন পুরুষদের স্বভাবচরিত্র ভালো হয় না, তুমি তো
সুদর্শনই...
সুন্দরী মেয়েদেরও স্বভাবচরিত্র ভালো হয় না, তুমিও তো সুন্দরীই...
অ্যাই, বাজে কথা বলবে না!
ও, আমি বললেই দোষ, তুমি যে বলছো!
বলি কি আর সাধে! যুবতী মেয়েদের দেখলেই তুমি যেভাবে ওদের বুকের দিকে তাকিয়ে
থাকো!
তা থাকি, ওটা তো তাকিয়ে থাকার মতো, তাকিয়ে দেখার মতোই জিনিস!
তাহলে! ঘরের মধ্যে সোমত্ত সুন্দরী কাজের মেয়ে থাকলে যে তার দিকেও তাকাবে না
তার নিশ্চয়তা কি?
নিশ্চয়তা দিচ্ছি, তাকাবো, তবে আর কিছু করবো না।
ভদ্রতার খাতিরেও তো বলতে পারতে - তাকাবে না!
তোমার সাথে ভদ্রতা করতে হবে! তুমি না আমার সোনাবউ!
থাক আর আহ্লাদ করতে হবে না।
এইসব কথাবার্তা শেষে মেয়েটা, পারুল, বহাল হয়ে গেলো তাদের বাসায়। এতে শিউলীর
সুবিধা হলো খুব। মেয়েটা কাজে- কর্মে পটু এবং আন্তরিক। দুদিনেই সব বুঝে
নিলো। এখন আর কিছু বুঝিয়ে দিতে হয় না ওকে, নিজেই সব করে ফেলে, কাজের ফাঁকে
বাচ্চাটাকে নিয়ে খেলাধুলাও করে। শিউলীকে প্রায় কোনো কাজই করতে দেয় না।
মেয়েটাকে শিউলী পছন্দও করে খুব, যদিও ইতিমধ্যেই ওর দুটো খুঁত আবিষ্কার করে
ফেলেছে সে। মেয়েটার মাথায় সামান্য সমস্যা আছে বলে শিউলীর ধারণা। প্রায়
সারাদিনই কথা বলে ও, শিউলীর সঙ্গে, সাকিবের সঙ্গে, কখনো কখনো একা একাই। কথা
ছাড়া থাকতেই পারে না, তবে মাহবুব বাসায় থাকার সময়টুকুতে চুপচাপ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়টি হলো - গোসল করতে অতিরিক্ত সময় নেয় পারুল। প্রায় প্রতিদিনই কিছু
কাপড়চোপর জমে ধোয়ার জন্য, সেগুলো ধুয়ে গোসল সেরে বেরুতে নিশ্চয়ই দু-আড়াই
ঘণ্টা সময় লাগার কথা নয়! কিন্তু পারুলের লাগে। মাঝে মাঝে বিরক্ত হলেও শিউলী
অবশ্য কিছু বলে না, মেয়েটা কাজেকর্মে ভালো, ঘরের মানুষের মতো সবার যত্ন নেয়
- এটুকু মেনে না নিলে চলবে কেন!
প্রথম কয়েকদিন মাহবুবের দিকে খুব চোখ রেখেছিলো শিউলী, কিন্তু খারাপ কিছু
চোখে পড়ে নি বলে এখন আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না - উল্টো পারুলকে নিয়ে
মাহবুবকে খেপাতে চেষ্টা করে। বলে, মেয়েটা কি সুন্দর দেখেছ! আমার চেয়েও
সুন্দর তাই না! আচ্ছা সত্যি করে বলো তো তোমার ইচ্ছে টিচ্ছে হয় না?
শিউলীর সন্দেহপ্রবণ স্বভাব মাহবুব মেনে নিয়েছে, বিয়ের পর থেকেই এই যন্ত্রণা
তাকে সহ্য করতে হচ্ছে। তবে পারুল যে সত্যিই রূপসী, একটু বাড়াবাড়ি রকমের
রূপসী, মাহবুব সেটা শিউলীর কাছে স্বীকার করে নিয়েছে। এরকম সুন্দরী একটা
মেয়েকে কোনো স্বামীর পক্ষে বাড়ি থেকে কিভাবে বের করে দেয়া সম্ভব মাহবুব
সেটা ভেবেই পায় না। পারুলের কাছ থেকে শোনা - দেবরের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের
অভিযোগ এনে ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে ওর স্বামী। পারুল ব্যাপারটা
অস্বীকার করলেও শিউলীর ধারণা - পারুলের স্বামীর সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়।
কারণ, বাড়ির কথা উঠলে পারুল যতটা না তার স্বামীর কথা বলে তারচেয়ে অনেক বেশি
বলে ওর দেবরের কথা। দেবরের সবকিছুই তার ভালো লাগে, এমন কি একদিন এ কথাও
বলেছিলো - তার গায়ের গন্ধটা নাকি খুব সুন্দর। এ কথার মানে কি? পুরুষদের
শরীরের গন্ধ টের পায় কেবল তাদের স্ত্রীরা, যেমন কোনো মেয়ের শরীরের গন্ধ
কেমন সেটা কেবল তার স্বামীই জানে, পারুল তাহলে দেবরের গায়ের গন্ধ টের পেলো
কিভাবে? যাহোক, ওখানে যা হবার হয়েছে, এখানে কিছু না ঘটলেই হলো - শিউলী শুধু
এটুকুই চায়। মাহবুবকে সে রাগায় বটে এবং মাহবুব রেগে গেলে সে খুশিই হয়।
একদিন মাহবুব রেগে গিয়ে বলেছিলো -
ব্যাপারটা উল্টো করে ভেবে দেখ। মনে কর পারুলের বদলে আমাদের বাসায় একটা যুবক
কাজের ছেলে আছে। সেক্ষেত্রে তাকে নিয়ে আমি যদি তোমাকে সন্দেহ করতাম...
ছি। তুমি এইসব কি বলছো! ছি।
এখন ছি ছি করছো কেন? আমাকে যে ক্রমাগত বলে যাচ্ছ!
শোনো, পুরুষ মানুষদের কোনো রুচি নেই, আছে রুচি-বিকার। কাজের মেয়েদের সঙ্গে
গৃহকর্তাদের সম্পর্ক কি নতুন কোনো বিষয়? উল্টোটা কখনও শুনেছো তুমি?
তাই বলে ব্যাপারটাকে এমন জেনারালাইজ করে ফেলবে? সবক্ষেত্রে এরকম ঘটে নাকি?
ঘটে না, আচ্ছা যাও, তোমাকে আর এ নিয়ে কিছু বলবো না।
কিন্তু শিউলীর মনটা খুঁতখুঁত করতেই থাকে। পারুলকে ছাড়িয়ে দেয়াটাও কঠিন। এখন
শরীরের যে অবস্থা, এত কাজ শিউলীর পক্ষে সামলানো সম্ভবই নয়। তাছাড়া পারুলের
কর্মপটুতার কারণেই সে এখন অনেকখানি ওর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এদিকে
প্রসবের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে, শিউলী নতুন দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে
যাচ্ছে। হাসপাতালে থাকার দিনগুলোতে মাহবুব আর পারুল একসঙ্গে এই বাসায়
থাকবে, তখন যদি কিছু ঘটে যায়! ঠিক এমনই একটি সময়ে বজ্রপাতের মতো একটা ঘটনা
ঘটে। পারুল একদিন কথায় কথায় বলে ফেলে,
ভাবী, আপনের ভাগ্যটা খুব ভালো।
কেনরে পারুল, এতদিন পরে তোর এই কথা মনে হলো কেন?
না, মনে হইছে আগেই, কই নাই...
কেন মনে হয়েছে সেটা বল।
ভাইজানের শরীলের গন্দ খুব সুন্দর, তাই না ভাবী?
শিউলীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মেয়েটা বলছে কী! মাহবুবের গায়ের গন্ধ ও পেলো
কোত্থেকে? কিছু কি এর মধ্যেই ঘটে গেছে? কখন ঘটলো, কিভাবে ঘটলো? শিউলী
চেঁচিয়ে ওঠে - তুই জানলি কিভাবে? বল, তুই কিভাবে জানলি?
জানি, আমি জানি। পারুল রহস্যময়ীর মতো মিটিমিটি হাসে।
হাসিস না হারামজাদি, বল তুই কিভাবে জানলি?
ক্যান, প্রত্যেকদিন যে ভাইজানের কাপড়চোপর ধুই, আমি সেইগুলা শুইকা দেখি, কি
যে সুন্দর গন্দ, ধুইতে ইচ্ছা করে না, মনে লয় হাতে নিয়া সারাজীবন বইসা
থাকি...। |
|
|
| |
 |
|