Page loading ... Please wait.

তারা তখন পবিত্রতা রক্ষা করছিলো
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
তখন বিকেল, রাস্তায় ঘরমুখো মানুষের স্রোত, রিকশা-বাস-মিনিবাস-ট্যাক্স্রি-সিএনজি অটোরিক্সা, দেয়ালে দেয়ালে মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার আহ্বান সম্বলিত পোস্টার, মোড়ে মোড়ে সেই পবিত্রতা রক্ষার জন্য নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবী দলের শ্যেনদৃষ্টি _ কোথাও পবিত্রতার লঙ্ঘন হচ্ছে কী না, আর ফুটপাত ধরে হেঁটে যাওয়া অসংখ্য মানুষ _ সবার চোখ-মুখ কেমন উদ্ভ্রান্ত-বিহ্বল-উৎকণ্ঠিত _ ঠিক সময়ে সুস্থ শরীরে বাসায় ফেরা যাবে তো! কিন্তু মামুন আর রোজীকে এসবের কিছুই স্পর্শ করছিলো না। তারা বসেছিলো একটা অটোরিক্সায়, মগ্ন হয়ে, পরস্পরের প্রতি একাগ্র মনোযোগ দিয়ে। নব-বিবাহিত দম্পতি তারা, এবং সুখী, বিয়ের পর মাত্র দু-মাস পার হয়েছে, এখনও পরস্পরের প্রতি মুগ্ধ বিস্ময় কাটেনি তাদের, এখনও তারা প্রতিমুহূর্তে নতুন করে পরস্পরকে আবিষ্কার করার আনন্দে বিভোর, এমন ব্যস্ত তারা পরস্পরকে নিয়ে যে, মনে হয়, যেন প্রতিমুহূর্তে এক অপরকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। এর কারণও আছে। রোজীকে বউ হিসেবে পাওয়ার ব্যাপারটাকে মামুন রীতিমতো নিজের সৌভাগ্য বলে মানে। রোজী অতিশয় রূপসী, তার রূপের বর্ণনা দিতে গেলে প্রথমেই তার শরীরের দিকে নজর পড়বে _ প্রায় পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা সে, গায়ের রঙ কাঁচা হলুদের মতো, মুখটা চাঁদের মতো অবর্ণনীয় উজ্জ্বলতায় ঝলমল করে, চোখ দুটো ভেজা ভেজা, ভরাট বুক, কোমরের ভাঁজে শতাব্দীর রহস্য, আর যখন হেঁটে যায় তখন অহংকারী রাজহংসীর হাঁটার কথা মনে পড়ে। এমন রূপসী একটা বউ তার ভাগ্যে জুটে যাবে মামুন তা কল্পনায়ও ভাবেনি, অথচ বাস্তবে তাই ঘটেছে। তার সবসময়ই মনে হয়, সে রোজীর জন্য যোগ্য পাত্র ছিলো না, নিতান্তই বেচারী একটা অভাবী সংসারের মেয়ে বলে, অকস্মাৎ বাপটা মরে গিয়ে তাদেরকে অথই সাগরে ফেলে গিয়েছিলো বলে মামুনকেই তাদের কাছে সুপাত্র বলে মনে হয়েছিলো। এমনকি, মামুন বিশ্বাস করে, ওরা যদি মফস্বলে না থেকে ঢাকার বাসিন্দা হতো, তাহলে, এতসব সমস্যা সত্ত্বেও এর চেয়ে ভালো বিয়ে হতে পারতো রোজীর। অবশ্য রোজীর ভাবনাটা ঠিক এর উল্টো। নিজের রূপ সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন হয়েও তার মনে হয়, মামুন ইচ্ছে করলেই এর চেয়ে ভালো পাত্রী পেতে পারতো। রোজী জানে _ রূপই এখন, এই যুগে, মেয়েদের বিয়ের একমাত্র যোগ্যতা নয়; পাত্রপক্ষ আনুষঙ্গিক আরো অনেককিছু দেখে। মেয়ের শিক্ষাদীক্ষা, রূপ-গুণ ছাড়াও পারিবারিক অবস্থা এবং আত্নীয়-স্বজন দেখে, বিশেষ করে অভাবগ্রস্থ পরিবারের বড় মেয়েকে তো কেউ বিয়েই করতে চায় না দায়িত্ব নেয়ার ভয়ে _ অথচ মামুন এসবের কোনোকিছুই তোয়াক্কা করেনি। সে সুদর্শন, সুশিক্ষিত, একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উঁচুপদে চাকরি করে, অনেক টাকা বেতন পায় _ এসবকিছুই তো বিয়ের বাজারে উঁচুদরে বিকোয়, মামুন তবু কেন যে তাকেই বিয়ে করলো রোজী তা ভেবেই পায় না। দুজন একেবারে বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের ব্যাপারটা দেখে বলে দুজন দুজনের কাছে আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, তাদের রোমান্টিকতা আর ফুরোচ্ছেই না, পরস্পরকে একমুহূর্ত ছেড়ে থাকতেও কষ্ট হয় দুজনের। মামুন যতোক্ষণ অফিসে থাকে রোজীর দমবন্ধ হয়ে আসে, যদিও দিনের মধ্যে অনেকবারই ফোনে কথা হয় তবু সময় যেন কাটতেই চায় না। অফিস থেকে ফিরে এসে মামুন প্রতিদিনই বাইরে বেরুবার কথা বলে, কিন্তু কোনোদিনই হয়ে ওঠে না। সন্ধ্যার পর রেস্ট নেয়ার কথা বলে মামুন একটু শোয়, কিন্তু রেস্ট আর নেয় না, বিপুল বিক্রমে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে রোজীর ওপর, রোজীও সানন্দে অংশ নেয়, তারপর কখন যে রাতে খাবার সময় হয়ে যায় টেরই পায় না কেউ। আগে মামুনের উদ্দামতা প্রায় সারারাতই চলতো, রোজা আসার পর রাতে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, ফলে সন্ধ্যার উদ্দামতাটুকু পাগলামীর পর্যায়ে পেঁৗছেছে। রোজীরও বাধা দিতে ইচ্ছে করে না, বেচারা তার শরীরটাকে এত পছন্দ করে, এত তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে _ সে বাধা দেয় কিভাবে? কয়েকদিন ধরেই ঈদের শপিং করার কথা বলছে মামুন, রোজীও যেতে চায়; অনেক শপিং _ এখনই শুরু না করলে শেষ করতে সমস্যা হবে। মামুন খুব দায়িত্ববান ছেলে, বাড়ির সবার জন্যই কিছু না কিছু কিনবে সে, কাজের মেয়েটাও তালিকা থেকে বাদ যায়নি, সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্বশুর বাড়ি। বিয়ের পর এটাই প্রথম ঈদ _ শপিংটা একটু বড়সড় না হলে চলবে কেন, এবং সেটা মানসম্পন্নও হতে হবে। কিন্তু এতসব পরিকল্পনা করেও তাদের আর যাওয়া হয়ে উঠছে না। আজকে সকালে তাই রোজী বলেছে,

অফিস থেকে আজকে একটু তাড়াতাড়ি বেরুতে পারবে না?
আজকে? হঁ্যা...পারবো। কেন?
তাহলে তোমার আর বাসায় আসার দরকার নেই, ফ্রি হয়ে একটা ফোন করে দিও, আমিই বেরুবো, তারপর শপিং করে একবারে বাসায় ফিরবো।
ইফতারি?
ওটা বাইরে কোথাও করে নিলেই চলবে।
জো হুকুম মহারাণী।
রোজী যে কেন তাকে বাসায় আসতে না করেছে সেটা বুঝতে পেরেও মামুন কিছু বলে না, বাসায় ফিরলে আর বেরুনো হবে না, সেটা সে-ও বুঝে গেছে _ সে তাই বিকল্প প্রস্তাবটা সাগ্রহে মেনে নেয়।

অবশেষে, এখন, এই বিকেলে তারা মার্কেটের পথে। অফিস ছুটির পর মাছি থকথকে ভিড়ের ভেতরেও সৌভাগ্যক্রমে তারা একটা সিএনজি অটোরিক্সা পেয়েছে, আর বহুক্ষণ সানি্নধ্যবঞ্চিত বলে মামুন সেটাতে উঠেই বউকে জড়িয়ে ধরেছে। রোজী কৃত্রিম রাগে _ এই কর কী, রাস্তার লোকজন কী বলবে _ বললেও লাভ হয়নি, উল্টো মামুন শুনিয়ে দিয়েছে _ যা বলার বলুক, নিজের বউকে জড়িয়ে ধরেছি, সেটা তাদের অতো দেখার দরকার কি? _ মামুনের জানা ছিলো না, রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার আহ্বান নিয়ে যে পাহারাদারের দলগুলো দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের কাছে এই দৃশ্য শোভনীয় না-ও মনে হতে পারে। প্রতিদিনি এই দলগুলো দাঁড়িয়ে যায়, কোথাও কোনো রেস্টুরেন্ট খোলা আছে কী না, থাকলে সেখানে বসে কেউ খাচ্ছে কী না, প্রকাশ্যে কেউ সিগারেট ধরাচ্ছে কী না, রিকশা-সিএনজি-ট্যাক্সিতে কোনো প্রেমিক জুটি বসে বেহায়াপনা করছে কী না _ এসবই ঈগলের মতো তীক্ষ্ন চোখে পর্যবেক্ষণ করে তারা। সঙ্গে আছে মাইক, সেখানে সারাদিন চলে মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষার আহ্বান _ দিনের বেলা পানাহার থেকে বিরত থাকুন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট-খাবার দোকান বন্ধ রাখুন, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা পরিত্যাগ করুন, হারাম বর্জন করুন, হালাল উপার্জন করুন, কুরআন পড়ুন, কুরআন বুঝুন, আল কুরআনের সমাজ গড়ুন ইত্যাদি। তারা অবশ্য এসব শ্লোগানের মর্মার্থ বোঝার কোনো চেষ্টাই করে না, তাদের কাজ হচ্ছে অপবিত্রতার বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়া _ গত কয়েকদিনে শহর জুড়ে তাদের অ্যাকশনে শহরের অপবিত্র কার্যকলাপ অনেকখানিই কমে এসেছে। প্রথমদিকে একটু বেশিই অ্যাকশনে যেতে হতো। যেমন, একটা রেস্টুরেন্ট খোলা পেয়ে দল বেঁধে সেখানে ঢুকে খেতে থাকা যুবকদের পেটানো, বুড়োদের কান ধরে উঠবস করানো, ম্যানেজারকে চড় থাপ্পর দেয়া; কোনো যুবক-যুবতীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পেলে তাদেরকে ধরে এনে শরিয়া মোতাবেক বিচার করা ইত্যাদি। একদিন এক কমিউনিস্টের সঙ্গে তো ঝগড়াই বেঁধে গেলো। ব্যাটা বলে কী না _ খাবার দোকান বন্ধ রাখলে অন্য ধর্মের লোকজনের নাকি অসুবিধা হয়, কিংবা রিকশাওয়ালাদের মতো শ্রমজীবীদের পক্ষে যেহেতু রোজা রাখা সম্ভব নয় এবং তাদের সংখ্যাও কম নয়, তাদের জন্য হলেও রেস্টুরেন্ট খোলা রাখা দরকার। আরে শালা এদেশ হলো মুসলমানের দেশ, বিধর্মীদের এদেশে কে থাকতে বলেছে, চলে গেলেই পারে! আর শ্রমজীবী? ওরা যদি রোজা রাখতে না পারে তো ঘরে বসে থাকুক, বাইরে বেরুনোর দরকার নাই, এদেশে থাকতে হলে এখানকার নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে। শালা আবার বলে কী না _ ইসলাম তো এমন বাড়াবাড়ি সমর্থন করে না _ আরে তুই ব্যাটা কমিউনিস্ট, ইসলামের তুই কি বুঝিস; আবার বলে _ এমন কোনো নিয়ম নাকি এদেশে নাই যে রোজা রাখতেই হবে, আরে আমরা যেটা বলবো সেটাই নিয়ম, সব নিয়ম তোর ঐ চুতিয়া মার্কা সংবিধানে লেখা থাকতে হবে নাকি, আমরা ঐ সংবিধানের ওপরে মুতি, আমরা ওইটা মানি না _ আমরা মানি কুরআন-সুন্নাহর সংবিধান। সেদিন ঐ কমিউনিস্টটাকে মেরে আধমরা করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলো তারা। এবং তারা এইসব শাস্তি দেয় প্রকাশ্য রাস্তায়, সবার চোখের সামনেই, এমনকি পুলিশরাও তাদেরকে বিরত করার সাহস পায় না।

এখন অবশ্য অতোটা অ্যাকশনে যেতে হচ্ছে না। লোকজন খুব সাবধান হয়ে গেছে। তাদের দেখলে সভয়ে দূরে চলে যাচ্ছে। তাদের হাত নিশপিশ করে _ অ্যাকশনে না যেতে পারলে ভালো লাগে নাকি? একটু আগে তারা এক যুবককে শাসন করেছে বটে, কিন্তু সাধ মেটেনি। ব্যাটা দোকান থেকে সিগারেট কিনছিলো আর তখনই তারা তাকে গিয়ে ঘিরে ধরেছিলো _ ওই শালা দিনের বেলা সিগারেট কিনলি কেন?

ভাই, ইফতারির পর খাওয়ার জন্য কিনেছি।
তার প্রমাণ কি? এখনই যে খাবি না তার কোনো প্রমাণ আছে?
ভাই আমি রোজা রেখেছি, এখন সিগারেট খাবো কেন?

রোজা রাখছস তারই বা প্রমাণ কি? আর অতো ভাই ভাই করস ক্যান, আমরা তর বাপ লাগি খানকির পোলা! _ এই কথা বলে তারা তাকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলো। সিগারেট ধরালে অবশ্য পিটিয়ে চামড়া তুলে ফেলা যেতো! ধরায়নি যখন, আর বলছে যখন যে সে রোজা রেখেছে এইজন্য অল্পতেই ছেড়ে দিতে হলো _ বেআইনি কিছু তো আর করা যায় না! কিন্তু ছেড়ে দিয়ে হাত নিশপিশটা বেড়ে গেছে। আর ঠিক এমনই একটি মুহূর্তে তাদের ঈগল চোখে মামুনদের অটোরিক্সাটি ধরা পড়ে। মামুন তখন তার এক হাতে রোজীর হাত ধরে, আরেক হাত ওর কাঁধের ওপর রেখে নিজের জ্যোতিষ-বিদ্যা ফলাচ্ছিলো। এতই মগ্ন হয়ে ছিলো তারা যে, কখন তাদেরকে ঘেরাও করে ফেলা হয়েছে টেরই পায়নি। অই খানকির পুত বাইর অয়া আয় _ কর্কশ কণ্ঠে এরকম একটি চিৎকার শুনে তাদের ঘোর ভাঙে আর হতভম্ব হয়ে দেখে তাদের চারপাশে বেশ কয়েকজন অচেনা লোক। হাইজ্যাকার ভেবে প্রথমে একটু ভয় পেয়ে যায় মামুন। কর্কশ কণ্ঠে চিৎকারটি আবার শুনতে পেলে তার ভুল ভাঙে, বুঝতে পারে _ এরা মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষাকারী দল। এরাই এখন দেশের সবচেয়ে পাওয়ারফুল মানুষ, একমাত্র এরাই এমন চিৎকার করে যে কাউকে নির্দেশ দিতে পারে, যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। কিন্তু আমাদের ধরলো কেন, আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি _ এরকম একটা বিস্ময় নিয়েই মামুন আর রোজী নেমে আসে। শুরু হয় পবিত্রতাবাদীদের জেরা _ প্রথমে মামুনকে,

এই মহিলা আপনার কি হয়?
আমার স্ত্রী।
স্ত্রী! (যেন এমন বিস্ময়কর শব্দ কোনোদিন শোনেনি এমন এক অভিব্যক্তি দিয়ে প্রতিধ্বনি করে ওঠে তারা।)
হঁ্যা, আমার বিবাহিত স্ত্রী! (স্ত্রী যে বিবাহিতই হয় এই সহজ যুক্তিটুকুও আর কাজ করে না মামুনের মাথায়।)
বিবাহিত স্ত্রী! প্রমাণ কি?
প্রমাণ...প্রমাণ...
হঁ্যা, প্রমাণ করেন যে, এই মহিলা আপনার বিবাহিত স্ত্রী।
এটা আবার প্রমাণ করে কিভাবে?
জানো না কেমনে প্রমাণ করতে অয়? কাবিন-নামা নাই?
আছে, কিন্তু সেটা নিয়ে কেউ চলাফেরা করে নাকি?
আমরা সেইটা কইছি নাকি? _ ধমক খেতে হয় _ কিন্তু মুখেও তো সেইটা কইতে পারতা চান্দু! কইবা কেমনে, থাকলে তো কইবা...
আরে কি মুশকিল।
কতা কম ক হালার পুত। নিজের বউরে কেউ রাস্তাঘাটে এমুন বুকে জড়াইয়া ধইরা রাখে? আমাগো চক্ষে ধুলা দিবার চাও চুতমারানীর পুলা!
গালাগালি করছেন কেন? নিজের বউকে জড়িয়ে ধরা যাবে না এমন কোনো নিয়ম আছে নাকি?
আবার কতা কয়। অই, হালারে এই ইলেকট্রিক থাম্বার লগে বাইন্ধা রাখতো...
এইসব আপনারা কি বলছেন?
কি কইতাছি এহনই টের পাইবা বাপধন।

তারপর জেরা করার জন্য আলাদা দুটো দল তাদের দুজনকে একটু দূরে দু-জায়গায় সরিয়ে নেয়। একইরকম প্রশ্ন করা হয় তাদেরকে _ আপনার নাম কি, উনার নাম কি, বাবার নাম কি, শ্বশুরের নাম কি, বাপের বাড়ি কোথায়, শ্বশুর বাড়ি কোথায় ইত্যাদি। এটাই পদ্ধতি _ তারা আসলে দেখতে চাইছিলো দুজনের কথার মধ্যে কোনো গরমিল আছে কী না। এবং ঘটনাক্রমে তারা তা পেয়েও যায়। মামুন সব প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর দিলেও পরিস্থিতির আকস্মিকতায় রোজী ছিলো খানিকটা বিহ্বল এবং নার্ভাস। সে মফস্বলের মেয়ে _ এই শহরের হাবভাব তার জানা নেই, এতসব কীর্তি দেখে তাই নার্ভাস হয়ে পড়াটা ছিলো তার জন্য স্বাভাবিক। ফলে বাবার নামের জায়গায় শ্বশুরের নাম আর শ্বশুরের নামের জায়গায় বাবার নাম বলে ফেলে সে গণ্ডগোল লাগিয়ে দেয়। দুজনের উত্তর ক্রস চেকিংয়ের জন্য দুটো দল যখন একত্রিত হয় তখন গরমিলটা ধরা পড়ে। ভুলটা সংশোধন করতে চাইলেও রোজীকে সে সুযোগ না দিয়ে তারা উল্লাসে ফেটে পড়ে। গরমিলটুকু পবিত্রতাবাদীদের কাছে ভীষণ উপভোগ্যও হয়ে ওঠে। কারণ দুজনের বাপের নাম একই হলে সমপর্কে তারা হয় ভাই-বোন, অথচ বলছে স্বামী-স্ত্রী! আসলে তাদের মধ্যে সম্পর্কটি কি সেটা তাদের কাছে আদৌ গুরুত্ব পায় না, তারা যে সত্যি কথা বলছে না, শাস্তি দেয়ার জন্য সেটাই যথেষ্ট। তারা প্রথমে রোজীকে লঘু শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, হাজার হোক নারী জাতি, কঠিন শাস্তি দেয়া ঠিক হবে না। আলোচনা করে রোজীকে তেত্রিশবার কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু মামুন এর প্রতিবাদে চেঁচিয়ে উঠলে রোজীর শাস্তিটা কার্যকর না করেই তারা একযোগে মামুনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলোপাথারি চড়কিলঘুসিলাথিতে তাকে রক্তাক্ত করে ফেলা হয়। স্বামীর এই দুরবস্থা দেখে রোজী চেঁচাতে থাকলে তারা এবার মামুনকে ছেড়ে রোজীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেউ তার শাড়ির আঁচল ধরে টানে, কেউ ব্লাউজ ছিঁড়ে ফেলে, কেউ ব্রার হুক খুলে দেয়, কেউ পেটিকোটের ফিতে কেটে ফেলে _ তার সারা শরীরে অসংখ্য 'পবিত্র' হাত ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ায়। অনেকক্ষণ পর তাকে যখন ছেড়ে দেয়া হয় তখন দেখা যায় তার শরীরে একটি সুতোও আর অবশিষ্ট নেই।

রক্তাক্ত মামুন অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে আর মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষাকারী দল অবশেষে পবিত্রতা রক্ষা করতে পেরে স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে।

তখন বিকেল। ঘণ্টাখানেক পর সূর্য ডুবে গিয়ে রোজাদারদের সামনে পবিত্র ইফতারির ক্ষণ উপস্থিত হবার কথা, অথচ সেদিন হঠাৎ করে তারা আবিষ্কার করে _ ঘণ্টাখানেক আগেই সূর্য ডুবে গেছে এবং গোধূলিক্ষণ একটুও স্থায়ী না হয়ে দ্রুত রাতের আঁধার নেমে এসেছে। সেদিন আকাশে কোনো চাঁদ ওঠে না, নক্ষত্রগুলোও ঘন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়, ন্যাশনাল গ্রিডে হঠাৎ অচেনা বিপর্যয় দেখা দেওয়ায় সারা শহরে আর বাতি জ্বলে না, যেসব বাড়িতে বা প্রতিষ্ঠানে জেনারেটর ছিলো সেগুলোও কী এক অজানা কারণে একযোগে নষ্ট হয়ে যায়, এমনকি ঘরে ঘরে মোমবাতি বা হারিকেন জ্বালানোর চেষ্টাও ব্যর্থ করে দেয় কোত্থেকে এক দমকা হাওয়া এসে; চার্জার, টর্চলাইট, গাড়ির হেডলাইট বা ইনডিকেটর এমনকি মোবাইল ফোনের ব্যাকলাইট জ্বালাবার চেষ্টা করেও কোনো এক অজানা কারণে সবাই ব্যর্থ হয়।

এক অভূতপূর্ব ঘন অন্ধকারে রোজী তার উন্মুক্ত শরীর নিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে।



অক্টোবর, ২০০৪