বাইরে এমন ফুরফুরে হাওয়া, ঘরে বসে তা ভাবাই যায় না! এক চিলতে
বারান্দায় কখনো আসার সুযোগ হলে টের পাওয়া যায়- কী চমৎকার হাওয়া
বইছে বাইরের পৃথিবীতে। আর অবাক লাগ- চারপাশে ওই উঁচু উঁচু
অট্টালিকা পেরিয়ে বাতাসটুকু এই এক চিলতে বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছায়
কীভাবে, বারান্দা পর্যন্ত এসেই হারিয়েই বা যায় কেন, কেন বাসার ভেতর
পর্যন্ত পৌঁছায় না! বাসার ভেতরে গুমোট গরম। নোনাধরা দেয়াল।
ভ্যাঁপসা। পুরনো-পুরনো গন্ধ। এই গন্ধের নাম কি? সোঁদা গন্ধ? না,
সোঁদা গন্ধটার সঙ্গে মাটির যোগ আছে। বছরের প্রথম বৃষ্টিতে মাটি
থেকে এই গন্ধ বেরোয়। এখানে সারা দিন-রাতই গন্ধ। দুর্গন্ধই বলা
উচিত। অবশ্য বাসায় যারা থাকে তারা টের পায় না। সয়ে গেছে। শব্দ সয়ে
যায়, যে কোনো শব্দের সঙ্গেই কান অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। গন্ধও সয়ে যায়,
নাকও অভ্যস্ত হতে জানে। অভ্যস্ত হওয়াই বড়ো কথা। অভ্যস্ত হতে পারলেই
টিকে থাকা যায়। নইলে নয়।
২.
মা অসুস্থ। বিছানায় পড়ে আছেন, কতোদিন ধরে! বিছানা-বন্দি জীবন!
মুক্তি নেই। সবকিছুর জন্যই কারো না কারো ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁকে।
পিপাসা পেলে নিজে এক গ্লাস পানি ঢেলে খাবার সামর্থ্যও নেই। কারো
আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, এলে ইশারায় তাকে পানির কথা বোঝাতে
হবে, তারপর পিপাসা মিটবে। এই নির্ভরশীলতা বড়ো মর্মান্তিক।
বাসার মানুষগুলোর জীবন এই চলছে, তো, এই থেমে যাচ্ছে। ঠিকমতো চলছে
না, অথচ সবই চালিয়ে নিতে হচ্ছে। বাজার-সদাই থেকে শুরু করে
স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি। চাকরি। সামাজিকতা। বিয়ে, জন্মদিন,
ম্যারেজ ডে, শবে বরাত, ইফতার পার্টি, ঈদ। সব। আবার কিছুই ঠিকমতো
চলছে না। চাইলেই সবাই মিলে যে-কোনো সময় যে-কোনো জায়গায় যাওয়া
যাচ্ছে না; মাকে দেখার জন্য অন্তত দুজনকে সব সময়ই বাসায় থাকতে
হচ্ছে; সারা রাত কাউকে না কাউকে জেগে থাকতে হচ্ছে। মাঝে মাঝেই
মৃতু্য এসে হানা দিচ্ছে। তখন বাইরে কাজে যাওয়া ছেলেমেয়েদেরকে জরুরী
ভিত্তিতে ডেকে আনা হচ্ছে; সবাই শহরের দুঃসহ জ্যাম, অফিসে বসের
বিরক্ত মুখ, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির ক্লাস ফেলে ছুটে আসছে;
কিন্তু যাই যাই করে আর যাওয়াই হচ্ছে না তাঁর। মৃত্যু যদি কাছে এসেও
ফিরে যায়, তাহলে মৃত্যুমুখী মানুষটির আর কী-ই বা করার থাকে! হয়তো
একটু লজ্জাই লাগে তাঁর- সবাই তো প্রায় প্রস্তুতই ছিলো, চলে যেতে
পারলেই ভালো হতো! কিন্তু এই মনে হওয়া-হওয়ির ওপর মৃতু্যর আসা-যাওয়া
নির্ভর করে না। তার যখন সময়-সুযোগ ও ইচ্ছে হবে, তখন আসবে।
মা এর আগেও কয়েকবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এত দীর্ঘস্থায়ী
অসুস্থতা এই প্রথম। এক জানুয়ারির সাত তারিখে স্ট্রোক, কিছুদিন
অচেতন, তারপর ডাক্তারদের 'আর কোনো আশা নেই' সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল
দেখিয়ে আবার জীবনের কাছে ফিরে আসা। তবে একবার যদি ভেতরে-বাইরে কিছু
একটা ভেঙে পড়ে, তাহলে আগের মতো আর ফিরে আসা যায় না বোধহয়। শয্যা
গ্রহণ বলতে যা বোঝায়, তাই ঘটে গেছে মা-র জীবনে। প্রথম প্রথম তাঁর
ছেলেমেয়েরা ঘিরে থাকতো তাঁকে, এখন সবার কাছে ব্যাপারটা স্বাভাবিক
হয়ে গেছে। কেউ কেউ এক সপ্তাহের মধ্যে একটিবারের জন্যও আসার সময় পায়
না! ব্যস্ততা। ভয়াবহ ব্যস্ত সবাই। কিন্তু বাসায় যারা থাকে, তাদেরকে
সব ব্যস্ততার মধ্যেও মা-র কথা ভাবতে হয়, যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে
হলে মা-র চিন্তাটা মাথায় আসে আগে। জীবন থেকে হয়তো অনেককিছু হারিয়ে
যায়, তবু মাকে বাদ দিয়ে কিছু ভাবা সম্ভব হয় না। আমি তো আড্ডাবাজ
ছিলাম খুব, সেটাও ছেড়ে দিয়েছি। কতো আনন্দ-আয়োজন, কতো আড্ডামুখরতা,
কতো কোলাহল- বন্ধুদের কাছে খবর পাই, নিজের অংশগ্রহণ নেই সেসবে! বলা
ভালো, চাকরি করা ছাড়া আর কিছুই করা হয় না। এমনকি লাবণ্যকেও সময়
দেয়া হয় না। সেদিন রাতে লাবণ্যের ফোন এলো -
'তুমি কোথায়?'
'বাসায়।'
'বাসায়ই বসে থাক। তোকে দিয়ে কিছু হবে না!'
'বুঝলাম না!'
'বললাম, বাসায়ই বসে থাক। এখন ফোন ছাড়ছি, পরে আবার করবো।'
ওর কণ্ঠে রাগ নেই, আছে রহস্যময়তা, দুষ্টুমি আর সোহাগ। রাগ থাকলে
'তুমি' থেকে 'তুই'তে চলে যেতো না। ও কখনো রাগ করে না, আমার
সমস্যাগুলো বোঝে বলেই করে না। ওর মতো করে এমনভাবে আমাকে আর কেউ
কখনো বোঝেনি। প্রেম আগেও এসেছে আমার জীবনে। কিন্তু একসময় সেগুলো
আনন্দের চেয়ে ভয়াবহ যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে! দিনের মধ্যে
দশবার ফোন করতে হবে, একশটা এসএমএস পাঠাতে হবে, যখনি ডাকবেন তিনি সব
কাজ ফেলে ছুটে যেতে হবে; প্রেমিক তো নয়, যেন পোষা কুকুর, মনিবের
ডাকে সাড়া দেওয়াই তার একমাত্র কাজ। এরকম প্রেম এক ধরনের অভিশাপ।
স্বাভাবিক কারণেই সেসব থেকে মন উঠে গেছে। লাবণ্য একবারে এর বিপরীত।
আমি নিজে ফোন তো করিই না, কতোবার যে ওর ফোন ধরি না, তার হিসেব নেই।
ও ঠিক বুঝে নেয়! এমন প্রেমকে বুকে করে রাখতে হয়। আমি তা পারি না।
বন্দি হয়ে পড়েছি। জীবনের হা অনেক বড়ো, গ্রাস করে নিয়েছে আমাকে,
একেবারে! তো, একটু পরই ওর ওই রহস্যময়তার কারণ বোঝা যায়। মুঠোফোনে
চিঠি আসে। ও গেছে একটা পার্টিতে। অফিসিয়াল পার্টি। সম্ভবত সেখান
থেকে বেরিয়ে এই এসএমএস- 'চার্লি রোট (চার্লি ওর সহকর্মী, বসও বলা
যায়! চার্লি তার নাম নয়, লাবণ্য ওই নামে তাকে ডাকে। সে লাবণ্যর
প্রেমে পড়েছে বোধহয়। আমার প্রেমিকাদের পেছনে সবসময়ই কেউ না কেউ
লেগে থাকে! অদ্ভুত ব্যাপার!), ... উইথ দিস 'সাজ' ইউ শুড বি ইন এ
ক্যান্ডল লাইট ডিনার উইথ দ্য ইয়াং রাইটার অর দ্য ওল্ড মি!' চিঠিটা
পড়ে আমার একটু অভিমান হয়- কেন চার্লিকে এই কথা বলে দিতে হয়, কেন
তোমার নিজেরই মনে হয় না- এরকম সাজে আমার সঙ্গে মোমবাতির আলোছায়া
মাখা ডিনারে যেতে পারলে তোমার ভালো লাগতো! তুমি তো কখনো আমার
পছন্দের সাজে সাজো না, সাজলেও আমার কাছে ওই সাজে আসো না! একটা
অভিমানী উত্তর লিখে পাঠানোর আগেই আরেকটা চিঠি- 'তুই বাইরে থাকলে
তোকে নিয়ে ক্যান্ডল লাইট ডিনারে যেতাম, বুঝছিস!' আমার অভিমান কাটে
না। উত্তরে লিখি- 'ইয়াং রাইটার যেহেতু বাসাতেই থাকবে, ওল্ড
চার্লিকেই বেছে নাও। আর 'দিস সাজ' তো আমার জন্য নয়, ওই সাজে তো
চার্লির কাছেই গেছ...।' চিঠির উত্তর আসে না! কল্পনার চোখে দেখে
নিই, লাবণ্যর লাবণ্যমাখা হাস্যোজ্জ্বল মুখে বিষণ্নতার ছায়া পড়েছে।
যে যা-ই বলুক না কেন, যে যতোই চেষ্টা করুক না কেন, ও শেষ পর্যন্ত
আমাকেই চাইবে, জানি। তবু, অভিমানে বুক ভরে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই
আবার ফোন করে ও, আমি রিসিভ করি না। গভীর রাতে আবার। আমি এবারও সাড়া
দিই না। পরদিন আবার ফোন করলে 'একটু ব্যস্ত' বলে ফোন রেখে দিই। ও
কোনো অভিযোগ করে না। কখনোই করে না। আর আমার বুকের মধ্যে একটা
স্বপ্ন জেগে থাকে- শুভ্র শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে লাবণ্য বসে আছে
মোমবাতির আলোছায়া মাখা টেবিলের ওপারে, আর এপারে আমি। চুপচাপ। ওকে
দেখাতেই অনেক আনন্দ। স্বপ্ন জেগে থাকে, জেগে থাকতে থাকতে মলিন হয়ে
যায়, একসময় হারিয়ে যায়। হারিয়েই যায়। এইভাবে কতোকিছু যে হারিয়ে
যাচ্ছে! বন্ধুরা ভুল বুঝতে শুরু করেছে। ভাবছে- আমি ইচ্ছে করেই
ওদেরকে এড়িয়ে চলছি। কেউ কেউ অহেতুক খুঁচিয়ে চলেছে; বুঝতে চাইছে না,
এই জীবন বয়ে বেড়াতে বেড়াতে আমি এমনিতেই ক্লান্ত, এই খোঁচাখুঁচি
আমাকে ওদের কাছ থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেবে! আসলে আমার সমস্যাটা
কতোটা জটিল, ওদেরকে বোঝাতেই পারছি না।
মা এখন এত চুপচাপ থাকে যে, কী ভাবছেন বোঝাই যাচ্ছে না। এমনিতেও
একটু চুপচাপ ধরনের মানুষ ছিলেন বরাবর। এখন কথা বলতে কষ্ট হয়, কথা
জড়িয়ে যায়, সবাই বুঝতে পারে না। হয়তো এসব কারণে কিংবা অন্য কোনো
কারণে চুপ করে থাকেন। অথচ এর আগে যখন একবার স্ট্রোক করে অসুস্থ
ছিলেন, তখন খুব বাড়ি বাড়ি করতেন। গ্রামের বাড়ি। বাড়ি বলতে অবশ্য
কিছু নেই। যে বাড়িতে গিয়ে সংসার শুরু করেছিলেন তিনি, যে বাড়িতে
ছেলেমেয়ের জন্ম হয়েছিলো, যে বাড়িতে তার স্বামীর কবর ছিলো- সেই বাড়ি
পদ্মার করাল গ্রাসে বিলিন হয়ে গেছে প্রায় বছর পনের আগে। তারপর
থেকেই গ্রামে একটা বাড়ি করে দেয়ার জন্য ছেলেদের কাছে দাবি তাঁর।
অন্য ছেলেরা কর্ণপাত করেনি, কিন্তু আমি করেছিলাম। ভাইবোনকে সঙ্গে
নিয়েই মা-র নামে একটা জমি কিনলাম, মার জন্য একটা বাড়ি করলাম। যতো
সহজে বলা হলো, ততো সহজে অবশ্য ব্যাপারটা ঘটেনি। বাড়ি করা যে কতো
ঝক্কি! তো, সেই বাড়িতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো অ্যাম্বুলেন্সে করে।
আর কী অদ্ভুত ব্যাপার, দু-দুদিনের মধ্যে তিনি বিছানা ছেড়ে উঠলেন,
ঘুরে ঘুরে নিজের বাড়ি দেখলেন। চোখভরে তাঁর ছেলেমেয়ে নাতিনাতনিদের
মিলনমেলা দেখলেন।
এবার বোধহয় সেরকম কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই। মনে হয় চান-ও না। মাঝে
মাঝে তাঁকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে একটু বাইরে ঘুরিয়ে আনার কথা ভাবি,
কিন্তু তিনি হুইল চেয়ার পছন্দ করেন না। হাঁটতে চান। একজন শয্যাশায়ী
মানুষকে কি হাঁটানো সম্ভব?
৩.
বড় খালুর কথা মনে পড়ে। খালা মারা গিয়েছিলেন অনেক আগেই, আমি তাঁকে
দেখিইনি। তার পর থেকেই খালু কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। আমি
ছোটবেলা থেকেই তাঁকে ওরকম দেখে এসেছি। প্রথম প্রথম নাকি খুব
ভায়োলেন্ট ছিলেন, আমি অবশ্য তাঁর ওই রূপ দেখিনি। ধীরে ধীরে খানিকটা
ঠিক হয়ে এলেও পুরোপুরি প্রকৃতিস্থ হতে পারেননি কোনোদিনই। তাঁর আট
ছেলেমেয়ে মায়ের মৃতু্যর শোক ভুলে বাবাকে প্রকৃতিস্থ করার চেষ্টা
করেছে। কিন্তু জীবন এক জায়গায় থেমে থাকে না, একসময় অপ্রকৃতিস্থ
বাপের অস্তিত্ব নিজেদের জীবন সংগ্রামের তুলনায় ম্লান হয়ে যায়।
মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়, ছেলেরা এক এক করে বিদেশে পাড়ি জমায়। বুড়ো
বাপকে কে দেখে রাখবে? আত্নীয়-স্বজনের আশ্রয়ে আর যুবক কেয়ারটেকার
ফারুকের যত্নে তাঁর শেষ দিনগুলো নিঃসঙ্গ পার হতে থাকে। আমি মাঝে
মাঝে তাঁকে দেখতে যেতাম। মাঝে মাঝে মানে, মাসে একবার হয়তো।
ব্যস্ততা, দারুণ ব্যস্ততা! এখন মনে হয়, অতোটা ব্যস্ততা আসলে ছিলো
না। কিংবা যেটুকু ছিলো, সেটুকুকে ম্যানেজ করা যেতো। ব্যস্ত
মানুষদের অধিকাংশ ব্যস্ততাই অহেতুক। অন্তত আমার তো তাই মনে হয়! তো,
একবার তাঁকে দেখতে গেছি, তাঁর বিছানার পাশে রাখা সোফায় বসে কথা
বলছি, তিনি হঠাৎ বললেন- 'কাছে এসো, একটু আদর করে দেই।' ততোদিনে
কারো কাছে গিয়ে আদর নেয়ার বয়স পেরিয়ে এসেছি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ি।
খালুর কথা শুনে তাই একটু লজ্জা লজ্জা লাগে। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই
বলে লজ্জাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। আমাকে আসতে দেখে ফারুক
কিছুক্ষণের জন্য ভেগেছে। কতোক্ষণের জন্য, কে জানে! বেচারা! যুবক
বয়সে একজন অসুস্থ মানুষের সঙ্গে ওর দিনরাত একাকার হয়ে যাচ্ছে। যদিও
এটাই তার চাকরি, তবু, চাকরিই বা কতোক্ষণ ভালো লাগে! তা-ও এমন একটা
চাকরি, যেখানে প্রায় চবি্বশ ঘণ্টাই অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে থাকতে হয়!
ফারুক আমাকে বলে কয়েই পালায় অবশ্য- 'ভাইজান, আইছেন যখন, একটু বসেন,
আমি একটু ঘুইরা আসি।' আমিও ওকে কিছুক্ষণের জন্য ছুটি দিতে পেরে
তৃপ্তি বোধ করি। ফলে, এখন, খালুর আদর-মাখা ডাক শুনে প্রথমে যে
লজ্জা লজ্জা ভাব এসেছিলো সেটি সহজেই কাটিয়ে ওঠা যায়। কিন্তু কাছে
যেতেই তিনি তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে আমার হাত চেপে ধরে বলেন- 'আমাকে
বাইরে নিয়ে যাও। ফারুককে কতো বলি, ও নিয়ে যায় না। আমি বাইরে যেতে
চাই। আমাকে তুমি নিয়ে চলো। আই ওয়ান্ট টু গো আউটসাইড। আমাকে নিয়ে
চলো!' তাঁর কণ্ঠের আকুতি ও তীব্রতা আমাকে গ্রাস করে নেয়। কিন্তু
কীভাবে তাঁকে বাইরে নিয়ে যাবো, বুঝতে পারি না। একজন চলৎশক্তিহীন
মানুষকে বাইরে নিয়ে যাবার মতো শারীরিক সামর্থ্য আমার নেই। সত্যি
বলতে কী, আমি কেন, কারো পক্ষেই একা এই কাজটি করা সম্ভব নয়। তিনি
আমার হাত ধরে উঠে বসার চেষ্টা করেন, আমি জোর করে তাঁকে শুইয়ে দিই।
বলি- 'আমি একা তো পারবো না খালু, ফারুক আসুক, দুজনে মিলে আপনাকে
বাইরে নিয়ে যাবো।'
'না, আমি একাই পারবো, তুমি শুধু পাশে থাকো।'
ব্যাপারটা অসম্ভব, কিন্তু তাঁকে বোঝাই কীভাবে? যিনি বিছানা থেকেই
উঠতে পারেন না, তিনি নাকি একাই পারবেন বাইরে যেতে! আমি শুধু পাশে
থাকলেই চলবে! একবার তাঁকে উঠিয়ে হুইল চেয়ারে বসিয়ে বাইরে থেকে
ঘুরিয়ে আনার কথা ভাবি। কিন্তু সাহস হয় না। হুইল চেয়ারে বসাবো
কীভাবে, আগে তো বিছানা থেকে ওঠাতে হবে! তিনি আবার হুইল চেয়ার পছন্দ
করেন না, হাঁটতে চান। সেটাও আরেক সমস্যা। অনিচ্ছুক একজন মানুষকে
হুইল চেয়ারে বসানো পৃথিবীর প্রায়-অসম্ভব কাজগুলোর একটি। এদিকে,
তিনি অস্থির হয়ে উঠেছেন, বাইরে যাবেনই। মুখে বাচ্চাদের মতো এক
বুলি- 'আই ওয়ান্ট টু গো আউটসাইড। আই ওয়ান্ট টু গো আউটসাইড... আমাকে
তুমি নিয়ে চলো।' বুঝতে পারি, ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছি আমি। নিজের
অসহায়ত্বের ওপর তীব্র রাগ হচ্ছে। বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে
একটু বিরক্ত স্বরেই বলি- 'বললাম তো, ফারুক এলে আমরা দুজনে মিলে
আপনাকে বাইরে নিয়ে যাবো, আমি একা পারবো না!'
'না, তুমি পারবে। আমাকে নিয়ে চলো। আমি বাইরে যেতে চাই। আই ওয়ান্ট
টু গো আউটসাইড।'_ তাঁর ওই একই কথা।
'আচ্ছা ঠিক আছে, হাত ছাড়ুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।'
আমার কৌশলে কাজ হয়। তিনি হাত ছেড়ে দিলে আমি একটু নিরাপদ দূরত্বে
গিয়ে দাঁড়াই। বলি_ 'আমি ফারুককে ডেকে নিয়ে আসছি, তারপর আপনাকে
বাইরে নিয়ে যাবো।'
তাঁকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমি বাইরে চলে আসি। গেটের বাইরে
ফারুকের জন্য দাঁড়িয়ে থাকি ঘণ্টাখানেক। হারামজাদাটা আমাকে ফাঁসিয়ে
দিয়ে কোন চুলায় গিয়ে মরেছে কে জানে! ভেতরে খালু একা। কাজটা অনুচিত
হচ্ছে বুঝতে পেরেও আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি, ভেতরে যেতে ইচ্ছে করে
না। ফারুক এলে কষে ধমক লাগাই। ও আমার এই রূপের সঙ্গে পরিচিত নয়।
আমি এলে সে সবসময়ই ছুটি পায়, ফিরে না আসা পর্যন্ত আমিই খালুর কাছে
থাকি। আমার এই বদান্যতায় সবসময়ই কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে থাকে সে। আজকে
আমার আচমকা ধমকে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। তারপর কিছুক্ষণ চুপ
করে থেকে জিজ্ঞেস করে- 'কি হইছে ভাইজান?' আমি একটু স্থির হয়ে
ঘটনাটা ওকে বলি। কিন্তু ফারুক তাঁকে বাইরে নিয়ে আসতে রাজি হয় না।
বলে 'একদিন হুইল চেয়ারে বসায়া নিয়া আসছিলাম, আর ভিতরে যাইতে চায়
না! হুইল চেয়ারে কতোক্ষণ বসায়া রাখা যায়? পারে না তো বইসা থাকতে!
তারপরও ভিতরে যাইতে চায় না!'
ফারুকের কথা শুনে আমার আর রিস্ক নেয়ার সাহস হয় না। ভেতরে আর না
ঢুকে, খালুকে না বলেই, বাইরে থেকে চলি আসি।
তার কয়েকদিন পরই খালু মারা গেলেন।
আমি তাঁর লাশ দেখতে যাইনি। পরিচিত মানুষের মৃত মুখ দেখার মতো
মানসিক জোর আমার কোনোদিন ছিলো না। অথচ আমাকে বারবার এই পরিস্থিতির
মুখোমুখি হতে হয়েছে।
আমার কানে এখনও ওই কথাগুলো বাজে 'আমি বাইরে যেতে চাই। আই ওয়ান্ট টু
গো আউটসাইড। আমাকে নিয়ে চলো!' কথাগুলো শুধু কানে নয়, মনের মধ্যেও
কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে!
৪.
খালু মারা যাওয়ার পর হুইল চেয়ারটা আমাদের বাসায় এলো। অবশ্য তখনও মা
সুস্থই ছিলেন, বুড়ো হলেও বাসার মধ্যে চলাফেরা করতে পারতেন। মা-র
কথা ভেবে আনাও হয়নি ওটা। বড় ভাইয়ের ছেলেটা- রাহুল- অসুস্থ। ওর কথা
ভেবেই আনা হয়েছে। মায়োপ্যাথি নামক এক জটিল রোগে আক্রান্ত ও।
ছোটবেলায় বোঝা যায়নি। ক্লাস সিক্স পড়ার সময় সাইকেল চালাতে গিয়ে
হঠাৎ পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলে কারণ খোঁজা শুরু হলো। এবং বছর খানেক
নানা কিসিমের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের চেম্বারে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে
স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ জানালেন এই রোগটির কথা; জানালেন ভয়াবহ তথ্য- এই
রোগ চিকিৎসার অতীত। ওর মাংসপেশীগুলো ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকবে,
চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলবে ও, তারপর একসময়...। অনিবার্য নিয়তির মতো এই
সত্য আমরা মেনে নিয়েছি। ডাক্তারদের কথা ধীরে ধীরে সত্য প্রমাণিত
হতে থাকে। রাহুল এখন আর ঠিকমতো হাঁটতে পারে না, সিঁড়ি ভাঙতে পারে
না একেবারেই, বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে গেলে যে পরিমাণ কষ্ট করতে হয়,
সেটা চোখে দেখার মতো কোনো দৃশ্য নয়। বুক ভেঙে আসে। ওর ভাইবোনেরা,
মানে কাজিনরা, যখন বাইরের পৃথিবীর উজ্জ্বল আলোতে বড় হয়ে উঠছে, ও
তখন ক্রমাগত বন্দি হয়ে পড়ছে ছায়াছন্ন চারদেয়ালের মধ্যে। কিন্তু
রাহুলের মনোবল অদম্য। একদিনও স্কুলে না গিয়ে সে কেবল পরীক্ষাগুলো
দিতে দিতে একটার পর একটা ক্লাস পেরিয়ে যায়! একসময় এসএসসি। সেখানেও
চমকপ্রদ রেজাল্ট। তারপর কলেজ। এইচএসসি। আবার চমকপ্রদ রেজাল্ট।
প্রকৃতি ওকে অসাধারণ মেধা দিয়েছিলো, কিন্তু চলাফেরার ক্ষমতা কেড়ে
নিয়েছে। আমি ওকে বইয়ের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই, আর সেই জগৎ
তাকে পেয়ে বসে। আমার কালেকশনের প্রায় সব বই ওর পড়া হয়ে গেছে।
কবিতা-গল্প-উপন্যাস-ইতিহাস-ধর্ম-দর্শন-বিজ্ঞান সবকিছু নিয়ে রাহুলের
অদম্য আগ্রহ আর জটিল সব প্রশ্ন। নতুন একটি জগতের সঙ্গে ওর পরিচয় হয়
বটে, কিন্তু সেই জগৎ লেখকদের তৈরি করা জগৎ। তার খানিকটা সত্যি,
বাকিটুকু মিথ্যে, অথবা বাকিটুকু স্বপ্ন। রাহুল এই সত্য আর স্বপ্নের
পার্থক্যটুকু আর আলাদাই করতে পারে না।
মধ্যবিত্ত পরিবারের নানাবিধ জটিলতার ফাঁদে পড়ে বড় ভাই একসময় আলাদা
বাসা নেয়। পারিবারিক ভাঙন শুরু হয়। এক এক করে সব ভাই-ই আলাদা বাসায়
চলে যায়। কেবল আমিই রয়ে যাই মা-র কাছে। বড় ভাইয়ের বাসা বদলের পর
হুইল চেয়ারটা যায় তার সঙ্গেই। কিন্তু রাহুল কিছুতেই হুইল চেয়ারটা
ব্যবহার করতে রাজি নয়।
অসুস্থ মানুষগুলো হুইল চেয়ার পছন্দ করে না কেন?
মা অসুস্থ হয়ে পড়লে হুইল চেয়ারটা আবার আমাদের বাসায় ফিরে আসে।
কিন্তু সমস্যাটা রয়েই যায়। মা-ও ওটা পছন্দ করেন না।
তারপর একদিন এ বাসায় হুইল চেয়ারের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। আমরা সব
ভাইবোন মিলে মাকে নিয়ে তাঁর সাধের গ্রামের বাড়িতে যাই তাঁকে রাখতে।
এই প্রথম রাহুলও আমাদের সঙ্গী হয়। মাকে রাখা হয় তাঁর বাড়িতে,
যেমনভাবে রাখতে হয়, তেমন করেই। শোক ও মাতম চলে দু-একদিন, তারপর
থিতিয়ে আসে এমনিতেই।
বাড়িতে যে দালানটা করেছি সেটির ডিজাইন আমার নিজের হাতে করা।
বিশেষভাবে তৈরি করেছিলাম মা আর রাহুলের জন্য রুম দুটো। রাহুলের রুম
থেকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে অদূরে ছোট্ট নদীটি দেখা যায়। ও শুয়ে
শুয়ে সেই নদী দেখে। ওর চোখেমুখে এক স্বর্গীয় আভা। জানালা দিয়ে এক
চিলতে আকাশ আর এক চিলতে নদী দেখার সৌভাগ্যও যে কোনোদিন হয়নি ওর!
ওর ভাইবোনেরা যখন বাড়ির উঠোনে হৈ চৈ করে খেলে, রাহুল তখন দরজার
দাঁড়িয়ে দেখে। দৃশ্যটার কারুণ্য আমার চোখ ভিজিয়ে তোলে। একদিন ওকে
বললাম, 'নদী দেখতে যাবি বাবা?' ওর চেহারায় বিমূঢ় ভাব ফুটে ওঠে।
বুঝি, ও ভাবছে, কীভাবে যাবো! আমি তো হাঁটতে পারি না। আমি হুইল
চেয়ারটা নিয়ে এসে বলি, এখানে বস, আমি তোকে নিয়ে যাই।
ভালো লাগে না কাক্কু।
না লাগুক, তবু বস, নদীর কাছে গেলে ভালো লাগবে।
ও খুব কষ্ট করে হুইল চেয়ারে এসে বসলে আমি ঠেলে নিয়ে নদীর পাড়ে
দাঁড়াই। পদ্মার মতো আগ্রাসী রূপ নেই এ নদীর, আছে এক সি্নগ্ধ
সৌন্দর্য। আমি নদীর পাড় ধরে ওর চেয়ার ঠেলে নিয়ে যাই। ও যেন
একেবারে স্তব্ধ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। নদীর বুকে নেমে আসা আধো
অন্ধকার আর ভয়াবহ নির্জনতা, রাহুল আর আমি দুজনেই চুপচাপ। একসময় খুব
আস্তে করে ও ডাকে- কাক্কু।
আমি সামনে গিয়ে দেখি, ওর চোখ ভেজা। জিজ্ঞেস করি- কি রে বাবা!
আনন্দ ভৈরবী কথাটার মানে কি?
হঠাৎ এই শব্দটা মনে পড়লো কেন তোর?
তুমি সেদিন একটা কবিতা শোনালে না, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের?
হ্যাঁ- 'আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি/ এমন ছিলো না আষাঢ় শেষের বেলা/
উদ্যানে ছিলো বরষা পীড়িত ফুল/ আনন্দ ভৈরবী'...
হ্যাঁ, এটাই। শোনার পর থেকেই মাথার মধ্যে ওই শব্দটা ঢুকে গেছে।
এটার মানে কি!
আমি চুপ করে থাকি। কি মানে এই আনন্দ ভৈরবীর?
৫.
বিছানায় শুয়ে শুয়ে এইসব আকাশপাতাল ভাবি। এসব কতোদিন আগের কথা?
কতোকাল? কতোকিছু হারিয়ে গেলো জীবন থেকে! হৃদযন্ত্রটা বিট্রে করে
বসলো। লেখালেখিটা থেমে গেলো। কলমই তো ধরতে পারি না, লিখবো কিভাবে?
বন্ধুরা দূরে চলে গেলো। একসময় যাদের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসা ছিলো,
সুখদুঃখের বিনিময় ছিলো- তারা এখন কোথায়, কেমন আছে কে জানে! লাবণ্যও
আসেনি আমার জীবনে। হয়তো হারিয়েই গেছে। কতোদিন যোগাযোগ নেই! একসময়
প্রতিদিন দু-চারবার ফোনে কথা না বললে, অসংখ্য এসএমএস বিনিময় না
করলে দিনটাই অসম্পূর্ণ মনে হতো। এখন! কতোদিন হলো, জানতেও পারিনি,
কোথায় আছে ও, কেমন আছে! এইভাবে সব হারিয়ে গেছে। আমাকে দেখাশোনার
জন্য একজন কেয়াটেকার এসেছে কেবল, আর রয়ে গেছে হুইল চেয়ারটা- ঘরের
এক কোণায় মুখ ব্যাদান করে দাঁড়িয়ে আছে। ওটাকে দেখলেই মেজাজ বিগড়ে
যায় আমার। কিন্তু দেখতেই হবে, কোনো বিকল্প নেই। আমি অবশ্য ওটাকে
ধারেকাছেও আনতে দিই না। শুয়ে থাকি, তবু ওটাতে চড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে
করে না। ইচ্ছে করে, নিজের পায়ে হেঁটে হেঁটে একচিলতে বারান্দায় গিয়ে
দাঁড়াই, অন্তত বাইরের পৃথিবীর হাওয়ামুখরতা টের পাওয়া যাক। হয় না।
যদি কখনো সুযোগ ঘটে, তাহলে ওই হুইল চেয়ারের কল্যাণেই। ওটাই নিয়ে
যায় আমাকে। ব্যালকনিতে গেলে তুমুল হাওয়া এসে আমার চুলগুলো এলোমেলো
করে দেয়, আর আমার মনে পড়ে, লাবণ্য আমার চুলে আঙুল ডুবিয়ে বলতো- তোর
আউলা চুল আরো আউলা করে দিতে ভাল্লাগে!
এইসব কতোদিন আগের কথা?
আমি নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকি, অট্টালিকাগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে যতোদূর
দেখা যায়, ততোদূর। আর ভাবি, আনন্দ ভৈরবী কথাটার মানে কি!
রচনাকালঃ সেপ্টেম্বর - ২০০৮ |
| |
 |
|