Page loading ... Please wait.

যেভাবে একটি গল্পের অপমৃতু্ ঘটেছিলো
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
আমাদের বন্ধু হাসিব জামিল যে এত অল্প সময়ে নিজেকে আলোচিত চরিত্রে পরিণত করে ফেলেছে _ বিষয়টি আমাদের জন্য যুগপৎ আনন্দের ও বিস্ময়ের। হাসিব আমাদের একমাত্র লেখক বন্ধু, জীবন সম্বন্ধে উদাসীন, অতি মাত্রায় অবৈষয়িক, খানিকটা এলোমেলো, প্রাণখোলা, উদার, আবার কখনও কখনও ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ _ অনেকের কাছেই এক কিম্ভুত চরিত্র; কিন্তু আমরা সত্যিই ওকে নিয়ে গর্ব করি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমরা যখন ক্যারিয়ার নিয়ে খুব চিন্তিত ও ব্যস্ত, ভবিষ্যত ভাবনায় দিশেহারা, তখন ও এসবের থোড়াই কেয়ার করে; বোকা,গাধা, জ্ঞানপাপী,নির্বোধ _ এইসব নানাবিধ বিশেষণ খুশিমনে মেনে নিয়ে উদাসীন হেঁটে যাচ্ছে একা একা [আর কতিপয় রূপসীর মাথা খারাপ করে দিচ্ছে, যার একজন শৈলী _ ইতিমধ্যেই হাসিবকে নিয়ে শৈলীর স্মৃতিচারণমূলক গল্প আপনারা পড়ে ফেলেছেন]; কিংবা নিভৃতে লেখা নিয়ে মগ্ন হয়ে আছে আর মাঝে মাঝে ক্ষেপে গিয়ে বলছে, এখন পাত্তা দিচ্ছিস না, একসময় আমি তোদের বন্ধু _ এই নিয়ে তোদের গর্বের সীমা থাকবে না। ওর এসব বাকোয়াজি আমরা স্বাভাবিক কারণেই কখনো বিশ্বাস করিনি, হেসে উড়িয়ে দিয়েছি, প্রথমদিকে তো পাত্তাই দেইনি। ওই সময় ওর লেখালেখির বিষয়টি এত বেশি গুরুত্ব দেয়ার কোনো কারণও ছিলনা। আজকে ওকে নিয়ে যখন বেশ আলোচনা হচ্ছে, ও নিজেই হয়ে উঠেছে গল্পের চরিত্র, তখন তো গুরুত্ব না দিয়ে কোনো উপায় নেই। আবার ওর সম্বন্ধে যেসব লেখা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে ওর না লেখা গল্পগুলোর আলোচনাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি, ফলে আমাদেরও ইচ্ছে হলো দু-কলম লিখি। আমরা কেউই লেখক নই, অতএব উচ্চমাপের সাহিত্য রচনার কোনো অভিপ্রায়ই আমাদের নেই। লেখক না হলেও আমরা ওর বন্ধু ছিলাম এবং ওর হাতে কতিপয় গল্পের অপমৃতু্য দেখে ব্যথিত হয়েছিলাম _ শুধু এটুকু বলার জন্যই এই লেখা। অবশ্য ওর হাতে গল্পের অপমৃতু্য হলো, না হাতি ঘোড়া হলো এ নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। ছিলোও না। গল্প নিয়ে ও একাই কথা বলতো। তবু স্বীকার করে নেয়া উচিত যে শিল্প-সাহিত্যও যে জীবনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় সেটা আমরা ওর কাছ থেকেই শিখেছিলাম। বিসিএস নামক সোনার হরিণ ধরার চেয়ে জীবনানন্দের কবিতা পড়া এবং বোঝাও যে জীবনের জন্য কম গুরুত্বপূর্ন নয় _ এটাও ওর কাছ থেকেই শেখা। আমরা, প্রথম প্রথম তো ওর কথা শুনতেই চাইতাম না, আঁতেল বলে গালাগালি করতাম। কিন্তু মাঝে মাঝে ও _ আমার কথা তোদের শুনতেই হবে _ বলে কোনো একটি কবিতা আবৃত্তি করে তার অনুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করে, কখনও বা একটি গল্পের ব্যাখ্যা করে আমাদের তাক লাগিয়ে দিতো। অবাক হয়ে আমরা ভাবতাম _ গল্প কবিতা তাহলে জীবনকে, মানুষের মনকে ছিঁড়েখুড়ে দ্যাখে ও দ্যাখায়। ধীরে ধীরে এ বিষয়গুলো আমাদের কাছেও প্রিয় হয়ে উঠেছিলো। হাসিব ওর প্রিয় গল্প উপন্যাস কবিতা পড়াত আমাদের, আলোচনা করতো, আর আমরা প্রতিদিন নতুন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হতাম। তারপর ও যখন নিজেই দু-চারটে গল্প লিখে তাক লাগিয়ে দিলো, তখন 'গল্প' এক নতুন আবেদন সৃষ্টি করলো আমাদের মধ্যে। সহপাঠি ডলি, দু-বছরের সিনিয়র আপা পলিদি ওর গল্পের চরিত্র হয়ে এলো। [ওগুলোকে আবার ও 'গল্প' বলে স্বীকার করতো না, বলতো 'গল্পের খসড়া'। বলতো _ পুতুপুতু প্রেমের গল্প লেখা আমার কর্ম নয়, তার জন্য ইমদাদুল হক মিলন আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ই যথেষ্ট।] সেসব গল্প পড়ে আমাদের চোখ ভিজে উঠলো, ভাবলাম, ডলি কি ভুলটাই না করলো হাসিবকে বাদ দিয়ে আরশাদ ভাইকে বিয়ে করে! মনে হতো ডলির উচিত হাসিবের কাছে চলে আসা। পলিদিকে মনে হতো অচিনপুরের রাজকন্যা। এই দুজন আমাদের কাছে হয়ে উঠলো মায়াবতী রূপসী প্রেমিকার মডেল _ অথচ আগে তো এদেরকে কখনো এমন করে ভাবিনি! গল্প তাহলে এভাবেই বদলে দেয় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি! আমরা গল্প সম্বন্ধে আরো বেশী আগ্রহী হয়ে উঠলাম। এমন পরিচিত মানুষগুলো যদি গল্পের চরিত্র হয়ে যায় আর সেসব পড়ে যদি তাদেরকে নতুন চোখে দেখতে ইচ্ছা করে, নতুন কিছু ভাবতে ইচ্ছা করে _ যা আমরা আগে কখনো ভাবিনি তাহলে তো গল্প জিনিসটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করে নিতেই হয়। হাসিব আমাদের এই উপকারটি করেছিলো, আর আমরা কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলাম ওর লেখালেখি বিষয়ে। একটি ঘটনায় আমরা সবাই অংশগ্রহণ করি, অথচ একমাত্র ও-ই হয়তো সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসে একটি গল্প। কি করে পারে ও, [আমরা কেউ তো পারি না, সত্যি বলতে কি ঘটনাটা সম্বন্ধে আর কিছুই ভাবি না আমরা]; কি করে তৈরী হয় একটি গল্প _ এসব ছিলো আমাদের ভীষণ কৌতূহলের বিষয়। ও কি লিখছে না লিখছে আমরা তাই খোঁজ-খবর রাখতাম, লেখা শুরু করলে অসমাপ্ত গল্পই পড়ে ফেলতাম। এতে অবশ্য ওর খুব আপত্তি ছিল _ বলতো, অসমাপ্ত গল্প হচ্ছে কুমারী প্রেমিকার মতো, একমাত্র প্রেমিকেরই [অর্থাৎ লেখকের] অধিকার আছে ওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করার _ এর মধ্যে তোরা আসিস কেন? কিন্তু বন্ধুত্বের অধিকার এসব বক্তৃতার উধের্্ব, ফলে আমরা ওর কথার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে পড়ে ফেলতাম, আর এই সূত্রেই ওর হাতে কয়েকটি গল্পের অপমৃতু্য দেখেছিলাম।

এই প্রসঙ্গে অন্তত একটা ঘটনা বলি।

একবার আমাদের হলের একটি ছেলেকে _ দীপু, যে ছিল একটি ছাত্র সংগঠনের আর্মড ক্যাডার _ তার প্রতিপক্ষরা মেরে ফেললো। বীভৎস সেই মৃতু্য। রুম থেকে ধরে পুকুর পাড়ে এনে বেধড়ক পিটিয়ে, খুঁচিয়ে, পাড়িয়ে-মাড়িয়ে একেবারে একাকার কাণ্ড। একটা বুলেটই যে মৃতু্যর জন্য যথেষ্ট, তাকে এরকম বীভৎস করে তোলার অর্থ কি এখনও আমরা তা বুঝতে পারি না। ছেলেটির আর্ত চিৎকারে কেউ এগিয়ে এলোনা, কেউ বাঁচালো না ওকে। প্রায় নির্বিকার-নিস্পৃহভাবে, বীভৎস উলা্লসে হত্যা করা হলো ওকে; হলের বিভিন্ন তলার ব্যালকনি এবং বিভিন্ন রুমের জানালা দিয়ে কয়েকশ' ছেলে এই দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলো। দেখলাম আমরাও। না, বীরত্ব দেখানোর মতো বোকামি আমরা করিনি, কে-ই বা পিতৃ প্রদত্ত প্রাণটা অবলীলায় খোয়াতে চায়! বরং ওই মৃতু্যকে দীপুর জন্য অনিবার্য বলেই ধরে নিয়েছিলাম আমরা। বীভৎস ভাবে মারা গ্যালো ছেলেটা, কিন্তুু তার চেয়ে মর্মান্তিক ও ভয়াবহ ব্যাপারটি ছিলো ওর মৃতু্য পরবতর্ী প্রতিক্রিয়া। পরদিন দেখা গ্যালো হলের অধিকাংশ ছাত্র হাসিমুখে দীপুর মরে যাবার সংবাদ বিনিময় করছে, মুখরোচক বর্ণনা দিচ্ছে, ওর আর্তচিৎকারের নানান ভঙ্গি অভিনয় করে দেখাচ্ছে। মুদি দোকানদার, সেলুনের নাপিত, ধোপা, মুচি, চা-সিগারেট বিক্রেতা, হল ক্যান্টিনের বয়, ম্যানেজার সকলের মধ্যে স্বস্তি _ 'আল্লায় বাচাইছে' _ এই ধরনের অভিব্যক্তি। একজন তরতাজা যুবকের মৃতু্য কাউকে এতটুকু স্পর্শ করলো না, কেউ একটু মন খারাপ পর্যন্ত করলো না _ এরচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় আর কী হতে পারে! অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সবাই ভুলে গ্যালো দীপুর কথা। ভুললো না শুধু হাসিব। দীপুর মৃতু্যর পর থেকেই গুম মেরে ছিলো ও, এসব প্রতিক্রিয়া দেখে আরো চুপ করে গ্যালো। কয়েকদিন প্রায় কারো সঙ্গেই কথা বললো না ও। তারও কিছুদিন পর জানতে পারলাম হাসিব দীপুকে নিয়ে গল্প লিখছে। আমাদের ভীষণ কৌতূহল হলো। দীপুকে নিয়ে গল্প! দীপুকে নিয়ে! অদ্ভুত তো! দীপু ছিলো এক দুষ্ট ক্ষত। অকারণে সবাইকে জ্বালাতো, মারা যাওয়ার দু'তিন মাস আগেও আমাদেরই এক বন্ধু আজিজকে ও থাপ্পর মেরেছিলো। কি কারণ? কারণ _ আজিজ হলের কয়েন বক্স থেকে ফোনে কথা বলছিলো, দীপু ওই সময় এসে ফোনটা ছেড়ে দিতে বলে; কিন্তু মিনিট পাঁচেক দেরী হওয়ায় দীপুর ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে যায় এবং আজিজকে থাপ্পর মারে। আজিজ আমাদের সহপাঠী ও বন্ধু, দীপু এর কোনোটাই না হলেও ও আমাদেরই ইয়ারমেট অথচ থাপ্পরটা মারতে এতটুকু দ্বিধা করেনি ও। হলের ক্যান্টিন, সিগারেট বিক্রেতা, মুদি দোকানদার _ এমন কেউ নেই যার কাছ থেকে ও ফাউ খায়নি _ এমনই ছ্যাবলা ছিলো ও। কেউ দেখতে পারতো না দীপুকে, অথচ হাসিবের কি এমন মনে হলো যে ওকে নিয়ে গল্প লিখতে চায়? আর কি-ই বা লিখবে ও? সেইসব বহু ব্যবহৃত নাটকের কাহিনীই তো! আমরা কৌতূহলী হয়ে উঠলাম এবং যথারীতি অসমাপ্ত গল্পাংশ পড়ে হতবাক হয়ে গেলাম। গল্পের দীপু তো আমাদের চেনা নয়! স্কুল শিক্ষক পিতার একমাত্র স্বপ্ন, সহজ-সরল দীপু মায়ের সঙ্গে আহ্লাদ করছে, বোনদের সঙ্গে খুনসুটি করছে _ দেখে আমরা বুঝতেই পারি না ওকে কেন পারিবারিক পরিবেশে দেখানো হচ্ছে। এত মায়াময় করে কেন ওকে উপস্থাপন করা হচ্ছে _ এর অর্থ উদঘাটন করা অসমভব বলে মনে হলো আমাদের। একটি আপাদমস্তক নেগেটিভ চরিত্রকে এরকম পজিটিভ করে উপস্থাপন করে হাসিব কি বোঝাতে চায়? গল্পটি ছিলো অসমাপ্ত _ সে কথা আগেই বলেছি। ইচ্ছে ছিলো এর শেষটুকু দেখে হাসিবকে জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু দিনের পর দিন যায়, গল্প আর শেষ হয় না। আমরা _ ওর বন্ধুরা _ একই হলে থাকি, ওর রুমে যখন তখন যাই, গিয়ে টেবিলে ওর অসমাপ্ত গল্পটি একই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হতাশ হই। কৌতূহলে উসখুস করি, বুঝতে পারি না কেন ও আর লিখছে না। অবশেষে কৌতূহল নিবৃত্ত করতে না পেরে ওকে টাইট করে ধরি।

দীপুর মতো একটি নেগেটিভ চরিত্রকে তুই এরকম পজেটিভলি কল্পনা করলি কেন হাসিব?
এ তো কল্পনা নয়!
কল্পনা নয়!
না।
ও সত্যি শিক্ষক পিতার একমাত্র পুত্র,সহজ-সরল,স্বাপি্নক, মা বোনদের চোখের মণি?
হঁ্যা।
তুই জানলি কিভাবে? তুই তো ওকে আগে থেকে চিনিস না, ওদের বাড়িও যাসনি !
হাসিব তখন একটা ঘটনা বলেছিলো, ওর নিজের ভাষ্যে সেটা এরকম :

দীপু যে আজিজকে মেরেছিলো সেই ঘটনাটি আমাকে খুব উত্তেজিত করে তোলে। মাথা গরম অবশ্য তোদেরও হয়েছিলো কিন্তু তোরা তো এড়িয়ে গেলি পুরো ব্যাপারটা। তোদেরকে না জানিয়ে আমি তাই দীপুকে কয়েকটা কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। জানালে তো আর যেতে দিতি না, তাই চেপে গেছি। সেই রাতেই ওর রুমে গিয়ে ওকে ধরলাম; বলাই বাহুল্য , কথাবার্তাগুলো ছিল উত্তেজক -
কেন তুমি আজিজকে মেরেছ?
তাতে তোমার কি?
আজিজ আমার বন্ধু। আমার তো কিছু অবশ্যই।
আমি তোমার কাছে বলতে বাধ্য নই।
কাজটা তুমি ভালো করনি দীপু।
ভালো-মন্দ কি তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে?
হঁ্যা হবে। ভালো-মন্দের বোধ যেহেতু তোমার নেই, কারো না কারো কাছ থেকে তো শিখতে হবেই।
কথাবার্তা সাবধানে বল হাসিব।
তোর সাথে কি সাবধানে কথা বলবো? তুই হচ্ছিস একটা নর্দমার কীট; তোকে যারা চেনে তারা তোকে এতটাই ঘৃণা করে যে নিকৃষ্টতম জীবকেও মানুষ এত ঘৃণা করে না। সেই তোর সাথে সাবধানে কথা বলতে হবে?
হাসিব তুমি সীমা ছড়িয়ে যাচ্ছো। তুমি জানো এর পরিণতি কি হতে পারে? আমি তোমাকে কি করতে পারি?
তুমি আমার বালটা ছিঁড়তে পারো। আমার বাল ছিড়ে অাঁটি বেন্ধে মাথায় করে নিয়ে বাপকে উপহার দিতে পারো। বাপের কুলাঙ্গার পুত্র এ ছাড়া আর কি-ই বা দেবে?
দেখলাম দীপুর চোখ-মুখ রাগে অপমানে লাল হয়ে গেছে। আমি তো কোনোদিনও বীরপুরুষ ছিলাম না, এখনও নই, দীপুকে বকাবাজি করেছিলাম নিছক ঝোঁকের মাথায়; করে একটু ভয়ও পেয়েছিলাম _ বলা তো যায় না, কখন কি হয়ে যায়! দু'দিন পর গভীর রাতে দীপু এসে ডাকলো _ হাসিব একটু শুনে যাও।

জানতাম যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু দীপুর চোখে-মুখে সেদিন রাগ ছিলোনা, বরং ছিলো বিষণ্ন্নতা ও দুঃখ। একজন বিষণ্ন্ন মানুষ কখনো অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে না _ এই বিবেচনায় এবং বেশ খানিকটা কৌতূহল নিয়ে ওকে অনুসরণ করলাম। তোরা তো জানিসই, নানা কিসিমের মানুষ সম্বন্ধে আমার দারুন কৌতূহল। দীপুর এই অচেনা নতুন রূপটিও তাই আমাকে নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় প্রলুব্ধ করেছিলো। ওর রুমে গিয়ে দেখলাম টেবিলের ওপর হুইস্কির বোতল। বললো,

চলে তো?

মদ খাওয়ানোর জন্য ডেকে এনেছো নাকি?

মনে কর তাই-ই! মৃদু হাসলো ও। বললো, বসো। তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই আমি।

তারপর গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে আমাকে দিলো, নিজের গ্লাস দ্রুত শেষ করে আবার নিলো। বললো,

তুমি সেদিন ঠিকই বলেছো। আমাকে সবাই ঘেন্না করে। আমি যে ব্যাপারটা টের পাইনা তা নয়, ভালোভাবেই টের পাই। কিন্তু আমার প্রতি সবার এই ঘৃণা আমি নিজেই তৈরী করেছি। আমি তোমাদের কাছ থেকে ভালোবাসা চাইনি, প্রশংসা প্রত্যাশা করিনি _ কারণ আমি করি ক্যাডার রাজনীতি, ভোটের রাজনীতি নয় _ এসব আমার প্রয়োজন নেই। দরকার হচ্ছে ভয় ও ঘৃণা। আমাকে সবাই ভয় পাক, ঘেন্না করুক, আর দূরে দূরে থাকুক এই আমার কাম্য ছিলো। অতএব এ নিয়ে আমার দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। কষ্ট আছে অন্য জায়গায়। তুমি আমার সেই জায়গাটায় আঘাত করেছো। তোমাকে যে এত কথা বলছি, এই জন্যই। আজ পর্যন্ত আমাকে কেউ এমন করে বলেনি, তোমাকে আমি পছন্দ করি, জানি তুমি সবার চেয়ে একটু আলাদা _ তাই তুমি যখন ঐসব বললে, আমার পুরোনো দুঃখটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। তুমি যে বলেছো _ আমি বাবার কুলাঙ্গার পুত্র! হঁ্যা, এটাও সত্যি। কিন্তু আমি তা ছিলাম না, হতেও চাইনি। আমার বাবা একজন সহজ সরল সাধারণ স্কুল শিক্ষক। আমি তাঁর একমাত্র ছেলে। পাঁচটি বোন আমার _ আমি তাদেরও চোখের মণি। আর মা! মায়েরা যে কেমন হয় সেতো জানোই! বাবা আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। ভাবেন তাঁর সারা জীবনের সব ব্যর্থতা আমি আমার সাফল্য দিয়ে ঢেকে দেব। তুমি তো জানোই, একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত আদর্শবান বাবা ছেলের সাফল্য বলতে কি বোঝেন। সততা, সত্যবাদিতা, পড়াশোনায় ভালো করা আর সম্মানজনক একটা চাকরি। এই তো! ছোটবেলা থেকে আমি বাবার এই স্বপ্নকে বয়ে বেড়িয়েছি। আমার এলাকায় এখনও আমি শান্ত সুবোধ মেধাবী ছেলে হিসেবেই পরিচিত, তুমি ওই নির্জন মফস্বলে গিয়ে আমার কথা জিজ্ঞেস করলে সবাই আমার প্রশংসাই করবে। এক সময় ওই ছোট্ট শহরটিতে আমিই ছিলাম সবচেয়ে মেধাবী আর সম্ভাবনাময় ছেলে। আর এখন! এক ঘৃণিত জীব। ওতে আমার কষ্ট যতটা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট হয় বাবার কথা ভাবলে। তাঁর একমাত্র স্বপ্ন আমি, অথচ কিছুই হবে না আমাকে দিয়ে, কিছু হওয়ার সম্ভাবনা চিরকালের জন্য অন্তর্হিত হয়ে গেছে। আমি এক পাকচক্রে জড়িয়ে পড়েছি _ ভার্সিটিতে এসে কিভাবে যে এসবে জড়ালাম আমি বুঝতেও পারিনি _ এখন আর বেরুতে পারছি না, পারবোও না কোনোদিন। আদৌ এই চক্র থেকে বেরুতে চাই কী না সে ব্যাপারেও নিশ্চিত নই আমি। হাতে যখন অস্ত্র আসে, তখন আসে ক্ষমতাও, আর আসে স্রোতের মতো টাকা। কোনোদিন যেসব চোখে দেখা তো দূরের কথা, কল্পনাও করিনি _ সেগুলো এখন আমার করায়ত্তে। এ এক ভয়ংকর নেশা হাসিব। ছাড়তে ইচ্ছা করে না। সবাই আমাকে ভয় পায় _ এ এক পৈশাচিক আনন্দ। মানুষকে ভয় দেখাতে, মানুষকে পেটানোর মধ্যে যে কী ভয়ংকর আনন্দ তুমি তা বুঝবে না হাসিব। সেই পিশাচ-আনন্দটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে অনুভব করার জন্য দিনে দিনে তাই আরো ভয়ংকর হয়ে উঠি; অনেক উল্টাপাল্টা কাজ করি _ যেমন আজিজকে মারলাম _ স্রেফ অন্য সবাইকে ভয় দেখানোর জন্য। জানো, ওই ঘটনার পর থেকে আমি কয়েনবক্সে গেলে এমন কি সিনিয়র ভাইরা পর্যন্ত আমাকে ফোন ছেড়ে দেয়। ভয়, বুঝেছো, সবাই ভয় পায়, কখন কি করে বসি! স্বীকার করছি, বাবার কথা মনে হলে সবকিছু ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারি না। আর ছাড়লেও ওরা আমাকে ছাড়বে না। আমি যে অনেক গোপন তথ্য জানি, আমি যে ইচ্ছা করলেই দুধে ধোঁয়া এসব পবিত্র নেতাদের মুখোশ খুলে তার কুৎসিত রূপটি দেখিয়ে দিতে পারি! সেই সুযোগ ওরা আমাকে দেবে কেন? দেবে না, মেরে ফেলবে। আমি যদি সব ছেড়ে দেই তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবে হাসিব? পারবে বাঁচাতে? যদি পারো তাহলে আজই আমি সব ছেড়ে-ছুঁড়ে ভালো হয়ে যাবো।
বলাই বাহুল্য, আমি সেই নিশ্চয়তা দিতে পারিনি, কিন্তু লক্ষ্য করছিলাম দীপু সত্যি বদলে যাচ্ছে। খানিকটা যেন বিষণ্ন, শান্ত, দুঃখী, একাকী। শেষের দিকে তো দেখেছিসই _ ও আর তেমন কোনো দুর্ঘটনা ঘটাতো না। হয়তো সত্যিই ও সব ছেড়ে দিচ্ছিলো, হয়তো এজন্যই ওকে মরতে হলো। ওর মৃতু্যর জন্য আমি সামান্য হলেও অপরাধবোধে ভুগি। আমার সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই ও বদলে যাচ্ছিলো, সবকিছু ছেড়ে দিতে চাচ্ছিলো _ যদি তা না করতো, হয়তো ওকে মরতে হতোনা !

হাসিব থামে, আর আমরা অবাক হয়ে যাই। হাসিব তাহলে সত্যিই এভাবে মানব-চরিত্র আবিষ্কার করে! গোপনে, কবে, কিভাবে ও এতকিছু করলো আমরা তো বুঝতেই পারলাম না। ঘটনাটা শোনার পর দীপুর জন্য আমাদেরও খারাপ লাগতে থাকে, হাসিবের গল্পে ওর মায়াময় উপস্থিতি আমরাও সর্মথন না করে পারি না। কিন্তু হাসিব তো থেমে আছে। দীপুকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত এনে আর একলাইনও লেখেনি ও। বুঝতে পারছি এটাই দীপুর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট _ হয়তো এই গল্পেরও। হাসিবকে জিজ্ঞেস করলেও বলে না যে, গল্পটাকে ও কোন দিকে নিয়ে যেতে চায়। বলে, ভাবছি। ওর ভাবা আর শেষ হয় না। দিনের পর দিন ওর টেবিলে অসমাপ্ত গল্পটি পড়ে থাকে, একটি নতুন শব্দও যোগ হয় না। আমরা অপেক্ষায় থাকি, ওর রুমে গিয়ে লেখাটা উল্টেপাল্টে দেখি _ না , একটি শব্দও নয়। অবশেষে একদিন গিয়ে দেখি ও খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে আর গল্পটি শতছিন্ন হয়ে মেঝেতে গড়াচ্ছে। আমরা একটি ধাক্কা খাই। ছিঁড়ে ফেলেছে! এত সুন্দর একটা গল্পাংশ ও ছিঁড়ে ফেলেছে! হাসিব অস্বাভাবিক গম্ভীর, এমনিতেও ও একটু মুডি ধরনের, আজকে যেন একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে ওর জীবনে _ এমনই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে ওকে। আমরা কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাই না। কিন্তু একটা দুঃখবোধ, এক তীব্র কৌতূহল আমাদের মধ্যে মাথা উঁচিয়ে থাকে। অচেনা এক দীপুকে আবিষ্কার করে ওই নষ্ট হয়ে যাওয়া ছেলেটির জন্য আমাদের মধ্যে মমতা তৈরী করেছিলো হাসিবই, আমরা গল্পে তার পরিণতি দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু হাসিব কেন যে এমন করলো _ বুঝতে পারি না। অনেকদিন পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেসও করা হয়নি। হাসিব খুব মুডি ছেলে; এমনিতে সদা প্রফুল্ল কিন্তু মাঝে মাঝে একদম নিঝুম হয়ে যেত। তখন ওর ঘনিষ্ট বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও আমরা ওকে ঘাটাবার সাহস পেতাম না। গল্পটা ছিঁড়ে ফেলার পর ওর সেই নিঝুম-দশা চলছিলো। এর বেশ কিছুদিন পর _ চার-পাঁচ মাস তো হবেই _ দেখলাম ও নতুন আরেকটি গল্প শুরু করেছে। আমাদের মনে হলো দীপু- সংক্রান্ত জটিলতা ও কাটিয়ে উঠেছে। এবার আমরা তাই টাইট করে ধরলাম ওকে। হাসিব বলেছিলো _ কেন ও গল্পটা শেষ করেনি। ওর ব্যাখ্যাটাও ছিল এরকম :

গল্প লেখকের একটি দায় আছে, সেটি হচ্ছে _ পাঠকের কাছে একটি ঘটনা বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা। যে ঘটনা আমি বর্ণণা করছি _ হতে পারে তা মূল ঘটনার অনুগামী নয়, কিংবা মূল ঘটনার সঙ্গে তার বড় ধরনের একটা পার্থক্য রয়ে গেছে, কিন্তু পাঠকের কাছে যেন তা ধরা না পড়ে, তাদের কাছে যেন গল্পে বর্ণিত ঘটনাটিকে প্রামান্য বলে মনে হয়। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যভাবে কোনো ঘটনা উপস্থাপনের শর্ত কি? শর্তটি হচ্ছে _ লেখক নিজে যা লিখছেন সেটা তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে হবে। এজন্যই বলা হয় _ অভিজ্ঞতা ছাড়া গল্প-উপন্যাস হয় না। সবচেয়ে ভালো হয় লেখক নিজে একটি ঘটনায় অংশগ্রহণ করলে; সেটা সম্ভব না হলে অন্ততপক্ষে বিষয়টি তাকে আত্নস্থ করতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে। একটা উদাহরণ দেই তোদের। শিল্পের সব ক'টা মাধ্যমই স্বয়ংসম্পূ্র্ন। স্বাধীন। এটা মেনে নিয়ে আমরা পথের পাঁচালী আর অপরাজিতা'র কথা ধরতে পারি। বিভূতিভূষনের এ উপন্যাস দুটো সত্যজিৎ চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছিলেন। কিন্তুু উপন্যাস এবং সিনেমার ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে যে একটি বড় ফারাক রয়েছে অনেক দর্শক সেটা ধরতেই পারেননি। উপন্যাসের অপু শহরে আসার পর লীলা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়। লীলা চরিত্রটি কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ _ অপুর বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েটির আগমন এবং পরবর্তীকালে যে পরিণত অপুর দেখা আমরা পাই _ তার মানস গঠনে লীলার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উপন্যাস পড়লে মনে হয় লীলা ছাড়া এর আবেদন অনেক কমে যেত, অপুর চরিত্রটি পরিপূর্ণতা পেতনা; লীলার চরিত্রটি ছেঁটে ফেলে দিয়ে দ্যাখ কেমন বেখাপ্পা লাগছে সবকিছু। কিন্তু সিনেমায় সত্যজিৎ এই চরিত্রটি রাখেনইনি _ স্রেফ বাতিল করে দিয়েছেন _ এ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কোনো উপযুক্ত মুখ পাননি, এই অজুহাতে। এটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, হয়েছেও; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে লীলা ছাড়া পথের পাঁচালী, অপরাজিত, অপুর সংসার _ এই ছবিগুলো কি এতটুকু মার খেয়েছে? যে কখনো উপন্যা দুটো পড়েনি, ছবি দেখে কি তার মনে হয় যে, লীলা নামের একটি মেয়ের চরিত্র থাকা উচিৎ ছিলো? এমনকি যারা উপন্যাস পড়েছে তারাও কি ছবি দেখার সময় লীলার জন্য কোনো অভাব বোধ করে? করে না। সত্যজিতের সাফল্য এখানেই। তাঁর নির্মাণ কৌশলটাই এমন যে, যে চরিত্র ছাড়া উপন্যাস মার খেয়ে যায় তিনি সেটা বাদ দিয়েই চলচ্চিত্র দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন এবং সেটা কত সফলভাবে করেছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর কারণটা কি? কিভাবে তিনি এটা পারলেন? পারলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন _ লীলাকে ছাড়াই ছবি করা সম্ভব। অন্তর থেকে বিশ্বাস করতেন বলেই তিনি সেটা পেরেছিলেন। এই উপন্যাস দুটো আমি কয়েকবার পড়েছি, লীলাকে ছাড়া আমি কিছু কল্পনাই করতে পারি না। সত্যজিৎ নিশ্চয়ই বহুবার এগুলো পড়েছেন, নইলে তো আর এমন সূক্ষ-তীব্র চলচ্চিত্রায়ন সম্ভব হতোনা _ তিনি কিন্তু ঠিকই অন্যরকম ভেবেছিলেন। এ হচ্ছে শিল্পের নির্মাণ কৌশল, শিল্পের সত্য বোঝা ও আত্মস্থ করা এবং অন্তর থেকে বিশ্বাস করার বিষয়। এ উদাহরণটি দিলাম এটা বোঝানোর জন্য যে, শিল্পীর বিশ্বাস অনেক সময় প্রায় অসম্ভব ঘটনাকে সম্ভবপর করে তুলতে পারে। এবার গল্পটির কথা বলি। দীপু আমাকে যে ঘটনাটির কথা বলেছিলো _ সে তার স্কুল-শিক্ষক পিতার স্বপ্ন, মা-বোনদের চোখের মণি, নিজস্ব এলাকায় সুনাম অর্জন করা মেধাবী ছেলে _ ইউনিভার্সিটিতে এসে এমন এক পাকচক্রের মধ্যে পড়ে গ্যালো, আর বেরুতে পারলো না কিংবা বেরুতে গিয়ে মারা পড়লো _ ঘটনাটিকে এত সরল বলে মনে হচ্ছে না আমার কাছে। অর্থাৎ ওর ভাষ্য পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি আমি। প্রথম অংশটুকু অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়-পূর্বর্বতর্ী বর্ণনাটিকে পুরোপুরি সত্য ভেবে ভুল করিনি আমি, কিন্তু আমার সংশয় পরের ঘটনাসমূহ নিয়ে। কারণ, দ্যাখ, আমরা সবাইতো কোনো না কোনো মা আর বোনের চোখের মণি, খোঁজ নিয়ে দ্যাখ এই ইউনিভার্সিটির প্রতিটি ছাত্র তার নিজ পরিমণ্ডলে সুনাম অর্জন করা মেধাবী ছেলে; আমরা সবাই এই একই ভার্সিটিতে, এই একই পরিবেশে একসঙ্গে এসে পড়েছি; কিন্তু সবাইতো দীপুর মতো পাকচক্রে জড়িয়ে পড়িনি। আমরা তো ঠিকই বাবার স্বপ্ন বহন করে চলেছি। একটি ভালো চাকরির প্রত্যাশা, ভালো ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাকে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু করে, একটি ছাপোষা নিরাপদ জীবনের আকাঙ্ক্ষায় খেয়ে না খেয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছি। এই ইউনিভার্সিটির অন্তত ৫০ ভাগ ছাত্র টিউশনি করে চলে, বছরের অধিকাংশ দিন আধপেট খেয়ে চালায়, বেশি খরচের ভয়ে হলের হাত-ধোয়া-পানির-মতো-ডাল দিয়ে ভাত খায়। এ হচ্ছে সাধারণ একটি চিত্র; দীপুর তো এরকমই হবার কথা ছিলো! কেন বদলে গ্যালো ও? তাহলে ও নিশ্চয়ই আমাদের সবার মত নয়, কিছুটা হলেও অন্যরকম! নিশ্চয়ই ও ওই অস্ত্র ক্ষমতা আর টাকার লোভ সামলাতে পারেনি? এটা একটা সম্ভাবনা । কিন্তু এমনও তো হতে পারে, এবং সেই সম্ভাবনাটাই বেশি যে, ওর প্রথম জীবনের আপাত ধীর-স্থির স্বভাবের মধ্যে লুকিয়ে ছিলো একটি ভীষণ ক্ষুব্ধ মন? সব কিছু ভেঙে ফেলার প্রবণতা? নয়তো ওর পরিবার পরিজনকে ও বহু নির্যাতন সইতে দেখেছে, বহু নিপীড়নের শিকার হতে দেখেছে, অপমানিত হতে দেখেছে; আর এসব দেখে-শুনে ওর ভেতরে জন্ম নিয়েছে এক তীব্র ক্ষোভ? নয়তো ও ভেতর থেকে কোনোদিন ওর বাবার ব্যর্থ জীবনযাপনকে মেনে নিতে পারেনি বরং ঘৃণা করেছে; বোনরা যখন বখাটে ছেলেদের উৎপাতে অতিষ্ট হয়েছে তখন হয়তো তীব্র বিদ্বেষে জ্বলেছে, কিন্তু কিছু করতে পারেনি। কিংবা এমনও হতে পারে এই বীভৎস সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলে নতুন এক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখতো ও, কিন্তু সঠিক পথের সন্ধান পায়নি বলে ভুল পথে পা বাড়িয়েছে? কেন এরকম মনে হচ্ছে জানিস? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা ধর। একাত্তরে একজন সাধারণ কৃষক পুত্র, একজন সামান্য শ্রমিক কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন বেকার যুবক বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু পাশাপাশি এমন যুবকের সংখ্যাও তো কম ছিলোনা যারা স্রেফ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থেকে বাড়িতে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছে, চাকরি-বাকরি করেছে কিংবা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পালিয়ে বেড়িয়েছে অথবা সীমান্ত অতিক্রম করে শরণার্থী শিবিরের নিরাপদ আশ্রয়ে মাথা গুজেছে। এই দল হচ্ছে আমাদের মত, ছাপোষা জীবনের স্বপ্নে বিভোর, সাত চড়েও রা না-কাড়ার দল। এই দুই দলই সাধারণ মানুষ। কিন্তু এদেরই একজন অস্ত্র হাতে বীরের মতো যুদ্ধ করলো আরেকজন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আক্রান্ত স্বদেশুুু ছেড়ে পালিয়ে গ্যালো _ এই বিপরীতধর্মী ঘটনার ব্যাখ্যা কি? ব্যাখ্যা হচ্ছে _ অন্তত আমার মনে হয় _ ওই মুক্তিযোদ্ধাদের মনে ছিলো ক্ষোভ ও ক্রোধের আগুন। এই ক্ষোভ এবং ক্রোধ একদিনে তৈরি হয়নি, এই আগুন একদিনে জ্বলে ওঠেনি _ শেখ মুজিবের বক্তৃতা বা জিয়ার ঘোষণায় সব লোক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো, বিষয়টি এতো সরল নয়। আর এই যে আগুন, এ যে শুধু পাকিস্তানি শোষনে সৃষ্টি হয়েছে তা-ও নয়। ওই ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ যুবকটি আসলে কোনোদিনই বিদ্যমান সমাজকে মানতে পারেনি। সে তার সমাজের ভিতর থেকেই নানানভাবে নিগৃহীত হয়েছে, নিপীড়িত, নির্যাতিত হয়েছে _ শাসক, জমিদার, জোতদার, মহাজন, ক্ষমতাশালী ধনী, রাজনীতিবীদ _ সবার দ্বারা; ক্রোধের আগুনে পুড়েছে কিন্তুু কিছু করতে পারেনি। আমাদের ইতিহাস তো আসলে শোষিত-নির্যাতিত-নিগৃহীত-নিপীড়িত হবার ইতিহাস; অথচ এসবের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি তারা কোনোদিন; একাত্তরে সুযোগ পাওয়া মাত্র তাই ঝাঁপিয়ে পড়লো তারা, নেতৃত্ব আঙ্গুল তুলে বললো _ এই তোমাদের শত্রু। তারা সেটাকেই বেদবাক্য মনে করে শত্রু নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লো _ একবারও ভাবলো না তাদের শত্রু এই নেতৃত্বও। ভাবলো, বাইরের এই শত্রুকে তাড়াতে পারলেই তাদের জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আসবে। নিগ্রহ-নিপীড়ন-নির্যাতনের অবসান ঘটবে। ঘরের মধ্যেও শত্রু আছে সেটা তাদের মনেই হলোনা, ফলে যুদ্ধ হল স্বল্পস্থায়ী। সমাজকে বদলাতে হলে যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রয়োজন সেটা ভুলে গিয়ে এই জনগণ অস্ত্র জমা দিলো সরকারি কোষাগারে। কী অদ্ভুত! আসলে তাদের কোনো পরিকল্পনাই ছিলো না; প্রাথমিক ক্ষোভ প্রশমনের পর তারা ফিরে গ্যালো নিজ গৃহের অন্ধকার গহ্বরে আর শোষক শ্রেণী যুদ্ধকালীন সময়ের বন্ধুসুলভ চেহারার খোলস ছেড়ে নিজরূপে আত্নপ্রকাশ করলো প্রবল বিক্রমে। তবু ওই সময়ের যুবকদের সৌভাগ্য, যে তারা একটা সুযোগ পেয়েছিলো। সেই ক্ষোভ, ক্রোধ, বেদনা কি এখনও নেই যুবকদের মধ্যে? আছে তো! কিন্তু সুযোগটা পাচ্ছে না তারা। আর এই সুবিধাটা নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। ক্ষুব্ধ যুবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ভুল টার্গেট দেখিয়ে দিচ্ছে। সঠিক নেতৃত্বশুন্য বিভ্রান্ত যুবকের দল সেই ভুল নিয়ে নিজেদের মধ্যে হানাহানি করছে আর ক্ষমতার চেয়ারের হাতল ধরে বদমাশ নেতৃত্ব সাফল্যের হাসি হাসছে। শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বদলে যুবকরা নিজেরাই হয়ে উঠছে নির্যাতনকারী। এ এক ট্র্যাজিক পরিস্থিতি। দীপু হচ্ছে সেই ষড়যন্ত্রের শিকার এক ট্র্যজিক চরিত্র। ও নিজেও হয়তো তা বুঝতে পারেনি; অন্তত ওর বক্তব্য থেকে এ-ই মনে হয়।
এখন তোরাই বল, আমি কোনটা বিশ্বাস করবো _ দীপু নিজে যেটা বলেছে সেটা নাকি আমার যেটা মনে হয় সেটা? এখন আর এই সিদ্ধান্ত নেয়ার উপায় নেই। দীপু বেঁচে থাকলে না হয় কথা ছিলো, আলাপ করে বোঝা যেতো। আর আমার সমস্যাটা এখানেই। গল্পের গতিমুখ নির্ণয়ে কিংবা ঘটনা নিয়ন্ত্রণে একজন লেখকের স্বাধীনতা থাকাটা খুব জরুরী। এখানে ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে গেছে _ দীপুর মৃতু্য সকল সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে। আর কিছু ঘটার নেই এখন, মৃতু্য হচ্ছে এক চূড়ান্ত পরাজয়। আর কোনো সম্ভাবনাই থাকেনা এখানে। আমি তাহলে কিভাবে দীপুকে নিয়ে গল্প লিখবো? বহু ভেবেছি আমি, কিন্তু দ্বন্দমুখর এক ধাঁধাময় পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাইনি আমি। বল তাহলে ওই গল্প ছিঁড়ে ফেলা ছাড়া আমার আর কি করার ছিলো?

আমরা কোনো কথা বলি না। বরং ক্যাডার রাজনীতির এক অদ্ভুত ব্যাখ্যা আমাদের বিমূঢ় করে দেয়। আমরা ভয় পাই, দ্রুত এসব ভুলে যেতে চেষ্টা করি এবং হাসিবের কাছ থেকে একটি নিরেট প্রেমের গল্পের প্রত্যাশায় _ যা পড়ে আমাদের বুক হু হু করবে, চোখ ভিজে উঠবে _ আমাদের দিন কাটতে থাকে।