Page loading ... Please wait.

যে গল্পটি বলতে গিয়ে তার চোখ ভিজে উঠেছিলো
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
হাসিব, আপনারা সবাই যাকে হাসিব জামিল নামে চেনেন, আমার ভালোবাসার সেই মানুষটি আজ অনেকের হয়ে উঠেছে। অল্প সময়েই ও পেয়েছে আশ্চর্য খ্যাতি, এতে কি আমার আনন্দিত হওয়া উচিৎ নয়? উচিৎ; আমি তা হয়েছিও। কিন্তু এই আনন্দ ওর সাথে শেয়ার করার সুযোগ হচ্ছে না _ এটুকুই যা কষ্ট। এখন তো ও অনেক দূরের মানুষ। একটা সময় ছিলো যখন আমি ওর সঙ্গে থাকতাম ছায়ার মতো, প্রায় সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে। সেসব দিন আজ সুদূর অতীত। সেগুলো আজ সোনালী স্মৃতিই শুধু। আমি হয়তো ওর যোগ্য ছিলাম না কোনোদিক থেকেই তবু কি দেখে জানি না, আমাকে কাছে আসার সুযোগ দিয়েছিলো ও। আমি এ কথা জানতে চেয়েছি অনেকবার _ 'তোমার তো অনেক প্রেমাথর্ী, সেখানে আমার মতো সাধারণ মেয়েকে পছন্দ করলে কেন?' ও যে উত্তর দিতো, কোনোদিন তা পুরোপুরিভাবে বিশ্বাস করতে পারিনি আমি। বলতো _ 'একমাত্র তুমিই আবুল হাসানের সেই লাইনটি বুঝতে পেরেছিলে _ অবশেষে জেনেছি মানুষ একা/ জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা _ তুমি ছাড়া এই লাইনের অর্থ আমি অন্য কাউকে, যাদেরকে তুমি আমার প্রেমাথর্ী বলছো, বুঝতে দেখিনি। আসলে মানুষ যে খুব একা, এমনকি তার চিবুকের কাছেও অচেনা ও একা _ এটা হচ্ছে রিয়্যালাইজেশনের ব্যাপার। তোমার ভেতরে যদি এই উপলব্ধি না থাকে তাহলে তোমাকে তা বলে কয়ে বোঝানো যাবে না। আর যদি উপলব্ধিটি থাকে তাহলে বুঝবে _ এই পৃথিবীতে আর একজন মানুষও তৈরি হয়নি যে তোমার কিংবা আমার পুরোপুরি সঙ্গী হতে পারে। এই সত্যটি জেনে নিয়ে পরস্পরের সঙ্গী হলে সুবিধা হয়। নইলে _ অনেক লোকের মাঝে বসে আমার নিজের মুদ্রা দোষে আমি একা হতে চলেছি আলাদা _ আমার মুখে এইসব জীবনানন্দীয় পংক্তি শুনে বলে বসতে পারো _ আমি তো আছি, তুমি একা হবে কেন? সেটা তো একটা মারাত্মক বিরক্তির ব্যাপার।' আপনারাই বলুন _ একটি কবিতার পংক্তি বুঝতে পারাটা হাসিবের মতো একজন মানুষের সঙ্গী হবার যোগ্যতা হতে পারে? আমার কখনো পুরোপুরি বিশ্বাস হয়নি কথাটা। ও তো সুন্দর সুন্দর কথা বলে মেয়েদের মাথা খারাপ করে দিতে পারতো, আমার কখনো কখনো মনে হতো এটাও ওরকম কিছু নয়তো ! কিংবা কে জানে, হয়তো ওর কাছে উপলব্ধির জগতটিই প্রধান! ও তো বলতোই _ 'জীবনানন্দের কবিতা যে উপলব্ধি করতে পারে _ সে সাধারণ মানুষ নয়। অনেকের মধ্যে থেকেও সে আলাদা। তার মধ্যে আমি পাই অসাধারণত্বের সম্ভাবনা। আমি তো আসলে তাই-ই খুঁজি _ সাধারণের মধ্যে অসাধারণের সম্ভাবনা। '

এইসব অনেক রকমের কথা শুনেছি আমি ওর কাছ থেকে, অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। সব বুঝে উঠতে পারিনি _ হয়তো সে জন্যই আমি চিরকাল ওর সঙ্গে থাকতে পারলাম না। এ তো খুব আশ্চর্য ঘটনা নয় _ নয় কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনাও। এরকম তো কতই ঘটে! কত প্রেম শেষ হয়ে যায়, কত মেয়ে তার প্রেমিককে না পেয়ে অন্য একটি পুরুষের ঘরে একটি জীবন কাটিয়ে দেয়! আমিও কি তাই করছি না? তবু যেন অন্য সবার সঙ্গে আমার একটি পার্থক্য রয়ে গেছে। অন্য মেয়েরা, প্রেমিক ছাড়া আর কারো সঙ্গে বিয়ে হলে, কদাচিৎ পূর্ব প্রেমিকের দেখা পায় বা হঠাৎ হয়তো অনেক কথার ভিড়ে ওই প্রসঙ্গ এসে পড়ে। কিন্তু আমি! প্রতিমুহুর্তে ওর প্রসঙ্গ আমার সামনে এসে পড়ছে। ও লেখক; ওর লেখাটাই তো একটা জলজ্যান্ত উপস্থিতি; অন্যদিকে ইদানিং আবার ও নিজেই গল্পের চরিত্র হয়ে উঠছে। প্রায়ই ওকে নিয়ে লেখা গল্প বিভিন্ন পত্রিকায় বেরুচ্ছে। সেসব দেখে মনে হলো, অন্তত একটি ঘটনার কথা জানি, সম্ভবত, আমি ছাড়া আর কেউ সেটি জানে না, ঘটনাটি আমাকে হাসিবের কোমল হৃদয়টি বুঝতে সাহায্য করেছিলো, সেটি আপনাদের কাছে বলা যায়।
আপনারা তো জানেনই হাসিব হচ্ছে সার্বক্ষণিক লেখক। ওর সমগ্র জুড়ে আছে লেখার চিন্তা। একটি সাধারণ ঘটনাকেও ও গল্পে রূপান্তরিত করতে পারে। চারপাশের মানুষের মধ্যে হাসিব গল্পের চরিত্র খুঁজে বেড়াতো। তো ওর একবার ইচ্ছে হলো _ একটু ব্যতিক্রমী চরিত্র নিয়ে গল্প লিখবে এবং চরিত্রটি হবে একজন পতিতার। [পতিতারা গল্প-উপন্যাসের জন্য কোনো ব্যতিক্রমী চরিত্র নয় _ ওদের নিয়ে বহু লেখা হয়েছে, এটা যেমন আপনারা জানেন, হাসিবও জানতো। কিন্তু তারাও যে ওর গল্পে এক ব্যতিক্রমী চরিত্র হয়ে উঠবে _ এ আত্নবিশ্বাস ওর ছিলো।] কিন্তু ওদের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় কি? পতিতালয়ে যাওয়ার সাহস ওর ছিলো না _ ওর ধারণা, দুর্ঘটনা হচ্ছে ওর নিত্যসঙ্গী, ওখানে গেলে একটা কেলেংকারীময় দুর্ঘটনা ঘটবেই। অতএব অন্য কোনোভাবে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। হাসিব সেটা করেছিলোও। ওর ভাষায়ই সেই গল্প বলি ...

এই শহরে রিক্সা আর মসজিদের মতো বেশ্যারাও খুব সহজলভ্য। সন্ধার পর বেরুলেই শহর জুড়ে তুমি এদের উপস্থিতি টের পাবে। তবে একেক জায়গায় পতিতাদের একেক রকম তরিকা। যেমন হাইকোর্টের উল্টোদিকে ওরা বসে থাকে রিকশার মধ্যে। দরকষাকষি ছাড়া পারতপক্ষে রিকশা থেকে নামে না। এরা সাধারণত খদ্দেরদের সঙ্গে তাদের বাসায় বা হোটেল_টোটেলে যায়। আবার সোহরোওয়ার্দী পার্কের মেয়েরা কখনো পার্কের বাইরে দাঁড়ায় না। সেজেগুজে পাকের্র ভেতরেই ঘুরে বেড়ায়, খদ্দের ধরে এবং পার্কের বেঞ্চ বা ঘাসই হচ্ছে ওদের কাজ সারার স্থান। আবার রমনা পার্কের চিত্র একটু অন্যরকম। ওখানে তুমি ওদেরকে পাবে লেকের আশেপাশে বা পার্কের বাইরের রাস্তার ধারে। এখানকার মেয়েরা খদ্দেরদের সঙ্গেও যায় আবার পার্কেও কাজ সারে। এই তিন জায়গার মেয়েরাই একটু নিম্নশ্রেণীর। কিন্তু সংসদ ভবনের আশপাশে যারা থাকে তারা একটু সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত। এখানেও অবশ্য দুটো শ্রেণী আছে। সংসদ ভবনের সামনের দিকে অর্থাৎ মানিক মিয়া এভিনু্যর রাস্তার ধারে যারা থাকে, তারা একটু সস্তা ধরনের। আর পেছনের দিকে, অর্থাৎ ক্রিসেন্ট লেকের আশপাশে যারা থাকে _ এরা হচ্ছে সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর ভোগ্য [বুঝতেই পারছেন প্রিয় পাঠক, কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করেই হাসিব এ বিষয়ে কেমন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিলো! ] তো আমি গেলাম সবখানেই, মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলাম সবাইকেই এবং মনে হলো _ এদের সবারই গল্পের চরিত্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আপাতত আমার একজনকেই দরকার _ যার সঙ্গে আমি কথা বলবো এবং কমিউনিকেট করতে পারবো। আমার পছন্দও হলো একজনকে। মেয়েটি ক্রিসেন্ট লেকের আশপাশেই ঘুরছিলো। দেখতে রূপসী এবং রুচিশীল। বোঝাই মুশকিল যে, ওর পেশা পতিতাবৃত্তি। তো একদিন দেখলাম মেয়েটি একজনের সঙ্গে গাড়িতে করে চলে গ্যালো। আরেকদিন ওই মেয়েটিকেই দেখলাম একজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ব্রিজ পার হয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে চলে যাচ্ছে। আমি পিছু নিলাম এবং দেখলাম উদ্যানের ঘাসই এবার তার শয্যা। এই ব্যাপারটিই আমাকে বাধ্য করলো মেয়েটিকে নির্বাচন করতে। যে মেয়েটি গতকালই কোনো এক ধনী লোকের বেডরুমে কি হোটেলকক্ষে রাত কাটিয়েছে _ সেই মেয়েটিই আজকে ঘাসে শয্যা পেতেছে। মেয়েটির সাইকোলজি জানার খুব সাধ হলো আমার। অতএব কাজ সেরে লোকটি যখন চলে গ্যালো _ আমি ওকে ডাকলাম। আমাকে হয়তো মেয়েটি অবিশ্বাস করেছিলো। কিংবা উল্টো অর্থে [অথর্াৎ তার পেশার পক্ষে] বিশ্বাস করেছিলো। দেখে-জেনে একজন পতিতাকে তো কেউ আর স্রেফ গল্প করার জন্য ডাকে না! কিন্তু আমি ডেকেছিলাম। ও হয়তো ভেবেছিলো _ আমি ওর শরীর ব্যবহারের জন্যই ডেকেছি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন দেখলো আমি স্রেফ গল্প জমাবার চেষ্টা করছি _ তোমার নাম কি, বাসা কোথায়, কে কে আছে ইত্যাদি _ ও বললো,

সময় নষ্ট করতেছেন ক্যান। যা করার, তাড়াতাড়ি কইরা ফালান।
আমি তো কিছু করব না ।
তাইলে ডাকছেন ক্যান?
তোমার সাথে গল্প করার জন্য।
রঙ্গ করেন! ব্যাশ্যার লগে আবার গপ্প কিয়ের!
আমি তো তোমাকে আর বেশ্যা হিসেবে ডাকিনি, একজন মানুষ মনে করেই ডেকেছি।
ইয়ার্কি করেন নাকি? একজন মানুষ মনে করেই ডেকেছি! হুহ! ফাইজলামির জাগা পান না!
তুমি রেগে যাচ্ছ কেন?
রাগুম না তো তোমারে সোহাগ করুম?
ইচ্ছে করলে তা করতে পারো। আমার বিশেষ আপত্তি নেই। তুমি তো খুব রূপসী, সোহাগ করলে ভালোই লাগবে।
মেয়েটি হয়তো এই উত্তর আশা করেনি। অনেকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে চুপ করে বসে থেকে বললো _ আপনে তো আজব মানুষ!
তা বলতে পারো। তো এই আজব মানুষটার সাথে একটু গল্প করতে কি তোমার আপত্তি আছে?
জি আছে! গপ্প করার জন্য এইখানে আসি নাই। প্যাট বাঁচানোর দায় আছে _ বলে সে উঠলো।
ধরো, এইজন্য যদি তোমাকে আমি টাকা দেই?
মেয়েটি চলেই যাচ্ছিলো। আমার কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে তীব্র কণ্ঠে বললো _
গতর খাটাইয়া টাকা লই। ভিক্ষা করিনা। বুঝছেন?
এভাবে ভাবছো কেন? মনে কর আমি তোমাকে সময়ের দাম দিচ্ছি। তোমার সময়েরও তো একটা মূল্য আছে!
আমি হইলাম গতর-খাটানো শ্রমিক। আমার আবার 'সময়ের মূল্য' কি? গতর আছে তো দাম আছে, গতর নাই তো কিছু নাই _ বুঝলেন আজব মানুষ? হুহ!

মেয়েটি আর দাঁড়ায় না। কিন্তু আমার মনে হয়, একেই আমার দরকার। মেয়েটির কথায় লজিক আছে। আর শেষ বাক্যটি আসলে ওর জীবনদর্শন। যে মানুষের একটি নির্দিষ্ট দর্শন আছে _ সেটা ভালো বা খারাপ যা-ই হোক _ সে বুদ্ধিমান এবং ভাবুক। এই বিবেচনা থেকে আমি পরদিন আবার গেলাম। মেয়েটির সঙ্গে দেখাও হলো। কিন্তু আমাকে ও পাত্তাই দিলোনা। শুধু _ আইজও গপ্প করতে আইছেন? ক্যান, সাথে ওইটা নাই? দেইখা তো সুপুরুষই মনে অয়? ইচ্ছা করে তো আসেন, নইলে ভাগেন _ বলে চলে গ্যালো।
কিন্তু আমি হাল ছাড়ার পাত্র নই। পরদিন আবারও হাজির হলাম যথাস্থানে। মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলো। আজ যেন সে একটু বিস্মিত। আমি ডাকতেই কাছে এলো _

আপনি কি সত্যিই শুধু আমার সাথে গল্প করতে প্রতিদিন এখানে আসেন?
হঁ্যা।
হঠাৎ ওর শুদ্ধ ভাষার কথায় আমি অবাক এবং প্রায় ভড়কে গিয়েছিলাম। সেটা চেপে রেখেই উত্তর দেই। মেয়েটি এবার বলে,
ঠিক আছে , চলুন।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে উদ্যানের ভেতরে যাই। খুঁজেপেতে একটা বেঞ্চিতে একটু দূরত্ব্ব রেখে পাশাপাশি বসতে বসতে সে বলে,
বলুন, কি বলবেন!
আমি একা বলবো কেন? তুমিও বলবে। নইলে তো আর গল্প হবে না।
মেয়েটি হাসে _ ঠিক আছে। আপনি অন্তত শুরু করুন। গল্প করার শখ তো আপনারই।
তোমার শখ নেই?
নাহ। আমার কোন শখই নেই।
কেন?
শখ-টখ সব হারিয়ে ফেলেছি!
কেন হারিয়ে ফেলেছো?
সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? _ মেয়েটির চোখ তীব্র হয়ে ওঠে।
হঁ্যা স্বাভাবিক। কিন্তু কিভাবে, কেন সেটা হলো আমি তাই-ই জানতে চাইছি।
এই আপনার গল্প করা?
ননা, গল্প শোনা।

কি গল্প শুনবেন? _ মেয়েটি এবার বিষণ্ন্ন। আমাদের সবার তো একই গল্প । প্রতারিত হওয়ার গল্প। এই পেশার সবাই কোনো না কোনোভাবে প্রতারিত। প্রেমিকের কাছে, নয়তো সংসারের কাছে, নাহলে ভাগ্যের কাছে, নইলে জীবনের কাছে। তুমি কার কাছে হয়েছ?

একটুক্ষণ চুপ করে থাকে ও। এরপর যখন কথা বলে তখন ওর কণ্ঠস্বর আরো বিষণ্ন্ন আর দূরাগত বলে মনে হয় _

আপনার কি মনে হয়না, এর যে কোনো একটির কাছে প্রতারিত হওয়া মানে সবকিছুর কাছেই প্রতারিত হওয়া?

আমি মেয়েটির কথা শুনতে শুনতে ভেতরে ভেতরে চমকে উঠছিলাম। জীবন সম্পর্কে ওর ধারণা এত পরিষ্কার! আর কথাও বলছে এমন এক ভাষায়, এতো চমৎকার যুক্তি ব্যবহার করে যে আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না _ ও একজন পতিতা। বেশ কিছুদিন ধরেই এদের পর্যবেক্ষণ করে আমি দেখেছি _ লোকজনের সঙ্গে এরা মোটামুটি একইরকম হিংস্র ভাষা ব্যবহার করে। আমার সঙ্গেও প্রথম প্রথম মেয়েটি তাই করেছিলো। আমি প্রায় ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছি। এমনিতেই ও রূপসী ও রুচিশীল তারপর এরকম কথাবার্তা ওর সম্বন্ধে শুধু প্রশ্নই তৈরী করছে।

প্রশ্ন করে ও আমার দিকে তাকিয়েছিলো, আমি উত্তর দেই, হঁ্যা ,ব্যাপারটা তাই ।

আলাদা করে তাহলে আর আমার গল্প শুনে কি লাভ?

আমি চুপ করে থাকি। ওই আবার বলে _
হঁ্যা, একটা গল্প বলা যায় অবশ্য। কিন্তু আজকে আমার ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া কাজও তো করতে হবে! আপনার লগে গপ্প মারলে আমার প্যাট ভরবো না_ বুঝলেন আজব মানুষ!

মেয়েটি চলে যাবার উপক্রম করতে পেছন থেকে ডাকি এই শোন।
আবার কি?
তোমার নাম কি?
হেইদিন না কইলাম! ময়ূরী।
না, তোমার সত্যি নাম কি?
কেন, এটা কি মিথ্যে নাম?
আমার মনে হচ্ছে এটা তোমার আসল নাম নয়।
কেন মনে হচ্ছে?
তা জানি না ।
আমাদের সম্বন্ধে কিছু ধারণা খুব প্রচলিত। আমরা পরিচয় লুকাই, মিথ্যে কথা বলি _ এই সব। কিন্তু এসব কি খুব অস্বাভাবিক? আমাগো কোনো আলাদা নাম নাইগো আজব মানুষ _ সবাইর একটাই নাম, ব্যাশ্যা।
মমেয়েটি চলে যায়।

কিন্তু আমার তো জানা হলো না সব। পরদিন তাই আবার যাই। সত্যি কথা বলতে কি ব্যাপারটা আমার প্রায় নেশায় পরিণত হয়ে যায়। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর মেয়েটি আমাকে চুম্বকের মতো টানতে থাকে। এবং একটু অবাক হয়ে খেয়াল করি সে-ও আমার জন্য অপেক্ষা করে। প্রতিদিন আমাদের কিছু সময় কাটে একসঙ্গে। গল্পে এবং দুষ্টুমিতে। হাঁ, আস্তে আস্তে ও বেশ সহজ হয়ে উঠছিলো আমার কাছে। একদিন মেয়েটি তার গল্প বলে ...

আপনাকে একদিন বলেছিলাম না _ আমরা হচ্ছি কোনো না কোনোভাবে প্রতারিত। আমার ঘটনাটা শুনুন। খুব ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়ে এক রোড একসিডেন্টে তাদের দুজনকেই হারিয়েও আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই। আমি বড়ো হয়ে উঠেছি একটি অপরিচিত পরিবারে। গৃহকতর্া _ যাকে আমি বাবা বলে ডেকেছি _ ঘটনাস্থল থেকে আমাকে নিয়ে আসেন। তারপর বহু চেষ্টা করেও _ মাইকিং করে, রেডিও-টিভি-নিউজ পেপারে বিজ্ঞাপন দিয়ে _ তিনি আমার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। সেই অর্থে আমি আমার প্রকৃত পরিচয় জানি না। কিন্তু আমার বাবা _ যিনি আমাকে দুর্ঘটনাস্থ্ল থেকে উদ্ধার করেছিলেন _ ছিলেন অসম্ভব মানবিক অনুভূূতিসম্পন্ন মানুষ। আমাকে তিনি বড় করেছেন নিজের মেয়ের মতো করেই। পড়াশোনা করিয়েছেন _ গানের গলা ভালো বলে ওস্তাদ রেখে গান শিখিয়েছেন। জন্মের পরপরই ভাগ্য আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছিলো _ মা-বাবার মৃতু্য ঘটিয়ে _ কিন্তু এ নিয়ে খুব বেশি আফসোস নেই আমার। মা-বাবার স্মৃতি আমার কাছে বহুকাল আগে দেখা এক ধূসর স্বপ্নের মতো। আমার পালক মা-বাবার কাছে আমি অনেক পেয়েছি। বকা ঝকা শুনেছি, বোনদের ঈষর্ার কারণ হয়েছি কিন্তু ওসব তো নিজের মা-বাবার কাছে থাকলেও হতো। তারা আমাকে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আমার সর্বনাশ হলো তখনই। হলে থাকতাম। গান জানতাম বলে বিভিন্ন জায়গায় গাইতে যেতাম। এরকম একটি অনুষ্ঠানে পরিচয় হলো এক লোকের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম। কিন্তু আমি একজন ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিলাম। লোকটি ছিলো বিবাহিত। সে নিজেই বলেছে। বিবাহিত কিন্তু অসুখী। আমাকে নিয়ে নতুন করে জীবন সাজাতে চায়। আমার উচিৎ ছিলো সরে আসা। পারিনি। আমার যে কী হয়েছিলো, যে, সে বিয়ের কথা বলতেই রাজি হয়ে গেলাম। ওর সঙ্গে চলে গেলাম চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম কেন?

ও বোঝালো _ ওখানে ওর এক ব্যাচেলর বন্ধুর বাসায় বিয়ে হবে। তারপর ঢাকায় এসে দুজনে মিলে নতুন বাসা নেব। কিন্তু ওখানে গিয়ে ভুল ভাঙলো আমার। গিয়েই বিয়ের কথা ছিলো। হলো না। অথচ আমাদের রাত কাটতে লাগলো একসঙ্গে। ভেতর থেকে মানতে পারছি না, কিন্তু কিছু করারও নেই। আমাদের বিয়ে হলো চতুর্থ দিন। তারও চার-পাঁচদিন পর ও আমার প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করে আমাকে রেখেই চলে এলো। বলে এলো _ ঢাকায় বাসা ঠিক করেই ও আমাকে নিযে যাবে। ও চলে আসার পরই আমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। সেই রাতেই কয়েকজন অচেনা লোক এলো আমার ঘরে। সারারাত আমাকে পুতুলের মতো ব্যবহার করলো তারা। এভাবে প্রায় একমাস। প্রতিরাতে নতুন নতুন মানুষ আমাকে ছিড়েখুঁড়ে খেতে থাকলো। বুঝতে পারছিলাম _ আমি প্রতারিত হয়েছি; কিন্তু তবু মনে ক্ষীণ আশা যে, ও নিশ্চয়ই এসব কিছু জানতে পারছে না, ও নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। এদিকে আমি বন্দী। কিছুতেই বেরুতে পারছি না। ওর সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছি না। অবশেষে ওর একটা চিঠি এলো ... সব কিছু গুছিয়ে উঠতে সময় লেগে গেলো। তুমি রাগ করেছো সোনামণি? ঢাকায় চলে এসো। তোমার জন্য কি সুন্দর করে বাসা গুছিয়েছি _ দেখলে তোমার রাগ থাকবে না। আমি যেতে পারছি না - একটা কাজে আটকা পড়েছি বলে। তুমি সোজা বাসায় চলে এসো। ... এরপর বাসার ঠিকানা দেয়া। চিঠি পড়ে আমি আকুল হয়ে কাঁদলাম। দুঃখ-কষ্ট-অভিমানে আমার বুক ভেঙে এলো। এবার আর ওরা আটকালো না। ট্রেনের টিকেট কেটে দিলো; ষ্টেশনে বিদায় দিতে এসে একজন আবার দর্শনও দিলো _ লাইফ ইজ আ ফান। টেক দি হোল থিংস, হোয়াট আর হ্যাপেনড ইন ইওর লাইফ রিসেন্টলি, অ্যাজ ইজি অ্যাজ পসিবল। বেটার টু টেক ইট অ্যাজ আ ফান অর অ্যাজ আ গেম। চমৎকার দর্শন যত যা-ই বলুন। জীবন হচ্ছে একটা খেলা অথবা কৌতুকের মতো। যা কিছু ঘটে যায় সহজভাবে এবং কৌতুকের মতো করে গ্রহণ করলেই হয়। ট্রেনে আসতে আসতে আমি ভাবছিলাম _ ওকে এসব আমি বলবো কি করে! কতদিনই বা লুকিয়ে রাখবো! কিন্তু ঢাকায় ফিরে নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে আমার আর কিছুই বলতে হলো না। তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করলো। সেখানে ও ছিলো না। আবারও বন্দী জীবন। আবারও বহু অচেনা পুরুষ। তারপর এ হাত থেকে ও হাত ঘুরে এক সময় ইংলিশ রোড পতিতালয়। একসময় সেটাও উচ্ছেদ হয়ে গেলে এই রাস্তা বা পার্ক। এই তো গল্প। কিন্তু আমার মতো যে কারো কাছেই আপনি এ রকম একটি গল্প শুনতে পাবেন। প্রতারিত হওয়ার গল্প; হয়তো সেখানে চরিত্রগুলো বদলে যাবে কিন্তু মূল গল্প ওই একটাই ।
একটানা কথা বলতে বলতে মেয়েটির কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে। আর আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। এ গল্প না শুনলেই বোধহয় ভালো হতো। এখন এই ভয়াবহ নীরবতা অসহ্য যন্ত্রণা হয়ে মাথায় সাতশ' হাতুড়ির বাড়ি দিচ্ছে। অনেকক্ষণ পর মেয়েটিই আবার কথা বলে ,
আপনার তো গল্প শোনার শখ ছিলো। শুনলেন। নিশ্চয়ই কাল থেকে আপনি আর আসবেন না!
আমি চুপ করেই থাকি।
আচ্ছা, আপনার হঠাৎ আমাদের গল্প শোনার কথা মনে হলো কেন? আপনি কি লেখক? গল্প-উপন্যাস লিখবেন?
হঁ্যা। আমি লেখক, কিন্তু এ বিষয়ে গল্প লিখবো কী না ভেবে দেখতে হবে!
দেখেছেন, আমার কেমন নিখুঁত আন্দাজ! আপনি তাহলে একজন লেখকই। তাই তো বলি _ এত গভীর আগ্রহ কেন এসব বিষয়ে! আচ্ছা আপনার নাম কি?
হাসিব জামিল।
না, আপনার কোনো লেখা পড়িনি। তা লেখক সাহেব, গল্পের মালমসলা কি কিছু পাওয়া গ্যালো?
আমি কোনো কথা বলি না। এরকম একটি ভয়াবহ-বীভৎস অভিজ্ঞতা বর্ণনার পর মেয়েটি এমন সহজ ব্যবহার করছে কিভাবে _ ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমারই তো উচিৎ ছিলো অন্য প্রসঙ্গে কথা বলে ওকে সহজ করে তোলা। উল্টো ও-ই সেটা করছে _ অনবরত কথা বলে চলেছে।
জানেন, পতিতাদের নিয়ে লেখা অনেক গল্প আমি পড়েছি। কী সঁ্যাতসঁ্যাতে! কী সব বানোয়াট সহানুভূতি! ওই আসল ব্যাপারটি কেউ বোঝে না _ আমরা সবাই মন ভেঙে যাওয়া স্বপ্নহীন প্রতারিত মানুষ।
সেদিন ফিরে এসে সারারাত আমার ঘুম এলো না। মেয়েটি আমাকে দখল করে রইলো সারাক্ষণ। পরদিন ওর আশঙ্কা মিথ্যে প্রমাণিত করে সন্ধ্যায় গিয়ে হাজির হলাম আবার। কিন্তু ওর কাছে আমার আর কি জানার আাছে? ওর সঙ্গে আর কি কথা বলতে চাই আমি? এসব প্রশ্নের উত্তর জানি না। তবে কি কেবল ওকে দেখতেই এ যাওয়া? আমাকে দেখে মেয়েটি স্পষ্টতই আনন্দিত হয়। বলে,
ভেবেছিলাম আর আসবেন না।
এলাম তো।
হঁ্যা, এলেন। কিন্তু কেন এলেন বুঝতে পারছি না।
তোমার সাথে গল্প করতে!
আবার কিসের গল্প? গল্পতো শেষ।
মানুষের গল্প কখনো শেষ হয় না, বুঝেছো মেয়ে!
সেদিন আরেক অদ্ভূত অভিজ্ঞতা হলো আমার। আমার সাথে কথা বলতে বলতেই ও উঠে গিয়ে একজন লোকের সঙ্গে ফিসফিস করে কী যেন আলাপ করলো! তারপর প্রায় আমার চোখের সামনেই একটি বেঞ্চিতে তার সঙ্গে মিলিত হলো। ইতস্তত ঘুরতে থাকা অনেক লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখলো; দেখলাম আমিও। ওদের কাজ শেষ হলে দর্শকদের মধ্য থেকে আরেকজন মেয়েটির সঙ্গে কথা বললে সে একটু দূরে লেকে গিয়ে ধুয়ে এলো। দ্বিতীয় দৃশ্যটা ঘটলো দু-মিনিটের মাথায়। আমি নির্বাক হয়ে গেছি। এ-ও সম্ভব! কিন্তু আমার জন্য তৃতীয় একটি দৃশ্য অপেক্ষা করছিলো। আরেকজন লোক _ এ একটু অল্পবয়সী _ এবার দৃশ্যে এলো। কিন্তু সে বোধহয় মিলিত হতে চায় না _ তার দুই হাত সচল মেয়েটির বুকে _ একটুক্ষণ পর মেয়েটি এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তীব্র কন্ঠে চিৎকার করে উঠলো _ খানকির বাচ্চা, তোর মা'র দুধ টিপ গা।

ঘটনাটি আমার জন্য ছিলো ভীষণ বিপর্যয়কর। সবই জানি, তবুও পরপর দুজন, আবার তৃতীয়জনের প্রতি অমন একটি ভয়ংকর উক্তি আমাকে প্রায় বজ্রাহত করে ফেললো। মেয়েটি একটু পরিষ্কার হয়ে এসে আবার আমার পাশে বসলে আমি বহুক্ষণ কোনো কথাই খুঁজে পেলাম না। এবারও ও-ই প্রথম মুখ খুললো।
ঘেন্না হচ্ছে, না! সবই তো জানেন! ঘেন্না করার কি হলো?

না ঘৃণা নয়। কিন্তু পরপর দুজন...

ও, এই ব্যাপার! দুজন কি দশজন সেটা তো আমি ফিল করি না। এ-তো শূধু অভ্যাস _ আপনার সিগারেট খাওয়ার মতোই। উদাহরণটা হয়তো ঠিক হলো না। সিগারেট খেতে আপনি হয়তো পছন্দ করেন। কিন্তু এমন কি কখনো হয়না যে আপনি সিগারেট খাচ্ছেন অথচ টেরই পাচ্ছেন না। খুব উদাসীন হয়ে খাচ্ছেন! আমার ব্যাপারটাও তাই। আমি আসলে টেরই পাই না। একই শারীরিক ঘটনা প্রতিদিন একাধিকবার ঘটলে কি আর কোনো অনুভূতি থাকে? অভ্যাসবশত শুয়ে পড়ি, কিছু একটা ঘটে যায় কিন্তু আমার কোনো অনুভূতি হয় না। আগে _ প্রথম প্রথম _ খুব তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করতে চাইতাম। অশুচিতে ভুগতাম, নিজের ওপর ঘেন্না হতো। এখন হয় না। অনেক ভেবে দেখেছি _ আমি আসলে কোনোদিনই এসবে অংশগ্রহণ করিনি। এজন্য আমার এখন আর কোন পাপবোধ নেই। যে ঘটনায় আমার কোনো অংশগ্রহণ নেই, তার জন্য কি কোনো পাপ হতে পারে বলুন! কথাগুলো কি ফিলোসফির মতো মনে হচ্ছে? বেশ্যার আবার জীবনদর্শন কি, তাই না?

কথাটি আমাকে ভীষণ ছুঁয়ে যায়। বেশ্যার আবার জীবনদর্শন কি? কিন্তু এ বিষয়ে কিছু না বলে একটুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করি,
অন্য একজনকে এরকম ভয়ংকর কথা বললে কেন?
ওর বয়স কম। মেয়েদের শরীর এখনো ওর কাছে বিশাল রহস্য। সবটুকু করার সাহস এখন সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি, তাই বুকে হাত দিয়েই সন্তুষ্ট। এই করে করেই ও একদিন এসবের কবলে পড়ে যাবে। বহুদিনের অভিজ্ঞতা তো, এগুলো বুঝি। কিন্তু আজকে ওরকম একটা কথা শোনার ফলে আমাদের সম্বন্ধে ওর একটা ভীতি জন্মাবে। এ মুখো হবে না; ও রহস্য উন্মোচন করবে ওর প্রিয়জনকে দিয়ে _ সেটাই কি ভালো নয়?
আমি অবাক হয়ে যাই। এদের কাজকর্মে এতটা লজিক থাকে? ওদের ব্যবহৃত ভাষার তীব্রতার কি কোনো কারণ আছে? আমার জানতে ইচ্ছে করে। ও বলে,
হঁ্যা। ইচ্ছে করেই আমরা ওই ভাষায় কথা বলি। আপনারা, অর্থাৎ সভ্য মানুষরা তো আমাদেরকে অন্ধকার জগতে ঠেলে দিয়েছেন, আপনাদের গালাগালি করতে, বিদ্রুপ করতে খুব আনন্দ লাগে।
ওর কথা শুনে আমি হাসতে থাকি।
হাসছেন কেন?
তোমার যুক্তিগুলো চমৎকার। এদিক থেকে দেখতে গেলে তোমাদের ভাষাটা একধরণের প্রতিবাদ এবং সেটা সমর্থনযোগ্য।
এভাবে কথা চালাচালি হতে থাকে। একসময় হঠাৎই আমি জিজ্ঞেস করি _ আচ্ছা তোমার বাসা কোথায়?
আমার তো বাসা নেই!
নেই? তাহলে থাকো কোথায়?

ঠিক নেই। বাসা থাকবে কিভাবে বলেন! যে মেয়ে সারারাত বাইরে কাটায়, আত্বীয়-স্বজনও নেই; এ রকম একটি মেয়েকে কে বাসা ভাড়া দেবে! _ মেয়েটি এবার বিষণ্ন্ন হয়ে ওঠে _ আমার কিংবা আমাদের নিশ্চয়ই এমন কোন স্বপ্ন ছিলোনা যে, বড় হয়ে বেশ্যা হবো? আরো অনেকের মতো _ আপনার বোন বা প্রেমিকার মতো _ আমারও তো স্বপ্ন ছিলো একটি ঘরের, একজন প্রিয়তম মানুষের, একটি ফুটফুটে সন্তানের, একটি ছোট্ট সংসারের। অথচ কি অদ্ভূত ব্যাপার দেখুন _ সংসার দূরে থাক, প্রিয়তম মানুষ বা সন্তানও দূরে থাক _ মাথা গোঁজার মতো একটা ঘরও আমাদের নেই। ইংলিশ রোড কি টানবাজারে, গোয়ালন্দ কি বানিয়াশান্তায় অন্তত আমাদের একটা ঠাঁই ছিলো। কিন্তু এর সবখানেই বারবার আমাদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে, আমাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। পৃথিবীর সবকিছুই ঠিক থাকে, কেবল আমরাই _ যাওয়ার মতো যাদের কোনো জায়গা নেই _ বারবার উচ্ছেদ হয়ে যাই কেন বলতে পারেন?

মেয়েটির চোখ ভিজে ওঠে। আমি অপরাধীর মতো চুপচাপ বসে থাকি।
কিছুক্ষণ পর অসাধরণ মেয়েটি নিজে থেকেই চোখ মুছে নেয়, চমৎকারভাবে হেসে বলে _
সত্যি করে বলুন তো, এই যে এতদিন ধরে আমার সাথে গল্প-স্বল্প করছেন, আপনার কি একবারও ইচ্ছে হয়নি? আপনার মধ্যে তেমন কিছু দেখলাম না তো! বেশ্যাদের দেখলে করার ইচ্ছা হয়না এরকম পুরুষমানুষ যে পৃথিবীতে আছে, আমি কল্পনাও করিনি। আচ্ছা আপনাকে একটু ছুঁয়ে দেখি?
আমি হেসে সম্মতি দেই, দ্যাখো।
ও দুই হাত দিয়ে আমার মুখ ধরে। ওর চোখে আবার পানি। ভেজা কণ্ঠে বলে,
আপনি না আমার নাম জানতে চেয়েছিলেন? আমার তো কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই; বারবার পাল্টাই। আসল নাম ইচ্ছে করেই ভুলে থাকি। আপনি আমার একটা নাম দেবেন?
নদী । আমি কিছুমাত্র না ভেবে বলে ফেলি।
নদী? সুন্দর নাম। কিন্তু এ নাম দেয়ার কি কোনো কারণ আছে?
নদী হচ্ছে আমার গল্পের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র। আমি যে রকম নারীর স্বপ্ন দেখি _ বাস্তবে যার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে _ নদী হচ্ছে সেই রকম নারী।
তাহলে আমাকে এরকম নাম দিলেন কেন? আমি কি ওই রকম?
সম্ভবত।
মেয়েটি অনেকক্ষণ কোনো কথা বলে না। তারপর হঠাৎ করেই _ আমার হাতটা একটু ধরবেন? _ বললে আমি বিনা দ্বিধায় ওর হাত ধরি। ও-ও শক্ত করে আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে থাকে আর হু হু কান্নায় ভেসে যায়। তারপর হঠাৎ, কিছু না বলে দ্রুত চলে যায়।
এরপর ওকে বহু খুঁজেছি আমি। কোথাও পাইনি।

হাসিবের গল্প শেষ হলে অনেকক্ষণ আমি কোনো কথা বলতে পারি না। ও যতই আমার মধ্যে সাধারণের মধ্যে অসাধারণত্বের সম্ভাবনা দেখুক না কেন, আমি তো আসলে অতি সাধারণ একটা মেয়ে। সেই আমি যখন বুঝে ফেলেছি হাসিব আসলে ওই মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছে, তখন কি আমার কষ্ট লাগাটাই স্বাভাবিক নয়? কিন্তু সেই কষ্ট আমি চেপে যাই। জিজ্ঞেস করি,
তুমি না এরকম একটি চরিত্র নিয়ে গল্প লিখতে চেয়েছিলে, লিখেছো?
না।
লিখবে না?
না, নীলা, লিখবো না।
কেন?

একটি চরিত্রের সন্ধানেই আমি মেয়েটির সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে মিশেছিলাম। কিন্তুু অনেক ভেবে দেখলাম _ ও কোনো গল্পের চরিত্র হতে পারে না। ওকে নিয়ে গল্প লিখলে সেটা হবে ওর জীবনের প্রতি সুস্পষ্ট বিদ্রুপ বা ইয়ার্কি। অ্যাজ এ রাইটার আই ডোন্ট কিপ এ্যানি রাইট টু স্যাটায়ার এ ডিসহার্টেড এ্যান্ড ড্রিমলেস হিউম্যান বিইং। পৃথিবীতে পতিতাদের নিয়ে বহু গল্প- উপন্যাস লেখা হয়েছে। আর আর্টিস্টদের আদর্শ মডেল তো ওরাই। এত সহজে, এত সস্তায় নগ্ন নারীদেহ আর কোথায় পাওয়া যাবে _ পতিতা ছাড়া? কিন্তু ভেবে দ্যাখো, এটা কতো বড়ো একটা অপরাধ _ শিল্পের দোহাই দিয়ে আমরা জীবনের কাছে প্রতারিত, স্বপ্নহীন একটি মেয়েকে ব্যবহার করছি। পতিতালয়ে যাতায়াতকারী লোকটির সঙ্গে এখানে আমাদের পার্থক্য কোথায়? ঐ লোকটি তার শরীরের চাহিদা মেটাচ্ছে _ আমরাও তাই করছি _ শুধু গালভরা একটা একটা নাম দিয়ে _ শিল্পের চাহিদা! এসব গল্প উপন্যাসে পতিতাদের প্রতি লেখকদের একধরনের সহানুভূতির প্রকাশ ঘটে। কী হাস্যকর _ একটি মেয়ের সঙ্গে দু-চারদিন মিশে আমরা সহানুভুতিপূর্ণ গল্প কি উপন্যাস লিখে বেশ একটা বাহবা নিচ্ছি। প্রশংসায়, প্রাপ্তিতে ভরে উঠছি। কিন্তু মেয়েটি? ভুলেই গেছি তার কথা। তার জীবনে কিন্তু এতটুকু পরিবর্তন আসেনি। প্রতিরাতে সে শায়িত হচ্ছে অচেনা পুরুষের নিচে _ পরিবর্তনহীন, পরিত্রাণহীন এই শয়ন! এসব দিক বিবেচনা করে গল্প লেখাই উচিৎ নয়। তবু যদি লিখতে চাই _ এসব চিন্তা উপেক্ষা করে _ সমস্যা কিন্তু থেকেই যায়। ধরো, এই মেয়েটির কাহিনী আমি যদি লিখতে চাই তাহলে তার প্রেমের প্রসঙ্গটি আসবেই। আমি এখনো বিশ্বাস করি _ পৃথিবীতে প্রেমই সবচেয়ে বিশুদ্ধ অনুভূতি, সবচেয়ে পবিত্র ও সুন্দর জিনিস। আমার এই বিশ্বাস প্রায় ধ্রুপদী। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্নরকম। এই মেয়েটির জীবনে যা ঘটে গেছে তাতে অন্তত ওর ক্ষেত্রে প্রেমকে কোনো মর্যাদা দেয়া যায়না। বরং প্রেম এখানে এক বীভৎস, ভয়াবহ রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। এটাই হচ্ছে ধ্রুপদী বিশ্বাস ও বাস্তবতার চিরন্তন দ্বন্দ্ব। একজন লেখক হিসেবে আমি কোনদিকে যাবো? আমার বিশ্বাসের দিকে নাকি বাস্তবতার দিকে? প্রবল বিশ্বাসী একজন আস্তিকও যেমন মাঝে মাঝে অবিশ্বাসের শংকায় কেঁপে ওঠে, কোনো ঘটনা মানতে না পেরে ভাবে _ 'ঈশ্বর কি সত্যিই আছেন? থাকলে এমন ঘটনা ঘটে কিভাবে?' _ তার জন্য কোনটা সত্যি? তার চিরন্তন বিশ্বাস নাকি তার সন্দেহ, শংকা ও অবিশ্বাস? আবার, গভীর বিপদে পড়ে একজন আত্নঘোষিত নাস্তিকও তো আল্লাকে ডাকাডাকি করে। তার জন্যই বা কোনটি সত্যি? আমাকে যদি যে কোনো একদিকে যেতে হয় আমি কোনদিকে যাবো? কিংবা মেয়েটির কথা ভাবো। আমরা ওদেরকে পতিতা বলি, বেশ্যা বলি; ওরা অচ্ছুৎ-অস্পৃশ্যের মতো ব্যবহার পায় সবার কাছে _ কিন্তু ভেবে দ্যাখো, ও কতটা সৎ। তোমরা _ অর্থ্যাৎ সভ্য সমাজের মেয়েরা _ প্রাণপণে সতীত্ব রক্ষা করছো। আসলে তো রক্ষা করছো শরীরের সতীত্ব, কিন্তু মনে মনে! কোন মেয়েটি মনে মনে একাধিক পুরুষের সঙ্গে মিলিত না হয়? এমনকি স্বামীর সঙ্গে মিলিত হবার সময় কোন মেয়েটি একাধিকবার অন্য পুরুষকে ভাবনায় আনেনি? তাহলে? তাহলে, মানসিক সততা রইলো কোথায়? অথচ ওই মেয়েটি শারীরিকভাবে বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়েও মানসিকভাবে থাকছে অংশগ্রহণহীন! অর্থাৎ মনের দিক থেকে সে পুরোপুরি সৎ। বলো, আমি কোনদিকে যাবো? মেয়েটির দিকে গেলে সামাজিক মূল্যবোধ ভেঙে পড়ে, যথেচ্ছাচার চলে আসে। আবার তোমাদের দিকে গেলে মানসিক অসততাকে মেনে নিতে হয়। আমি তাহলে কোন পক্ষ নেব? ওকে নিয়ে গল্প লিখতে গেলে এসব দ্বন্দ্ব আছে নিজের কাছেই। কিন্তুু তারচেয়েও একটি বড় কারণ আছে নীলা, তোমার কাছে সেটা অস্বীকার করবোনা। মেয়েটির সঙ্গে মিশতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে _ এ পর্যন্ত যেসব মেয়ে আমার জীবনে এসেছে _ ও তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আমি ওকে অনেক খুঁজেছি _ ভেবেছি ওকে আমি আশ্রয় দেব। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে _ মনে হচ্ছে আমি তা পারবো না। পারবো না, তার কারণ, সে ক্ষেত্রে এ সমাজ আমাকে পুরোপুরি বয়কট করবে। এই বাস্তবতাও আমি মানতে পারবো না। আমি তো আমার মাকেও ভালোবাসি; মেয়েটিকে আনলে মা আমার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করবে। এটা হচ্ছে কঠোর বাস্তবতা _ সবাই বয়কট করবে, ছি ছি করবে, যদিও আমি একটি মহৎ কাজ করছি। যতই আমি বুঝতে পারছি মেয়েটিকে নিয়ে আমার কোনো ভাবনাই বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব নয় _ এমন কি একটি গল্প লেখাও সম্ভব নয় _ আমার কষ্ট ততই বাড়ছে। আমার কোনো ভবিষ্যত নেই নীলা। এটা যে খুব ব্যতিক্রমী কিছু _ তা নয়। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনেক মানুষেরই থাকে না। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার কোনো বর্তমানও নেই। আমি বাস করি পুরোপুরি অতীতের মধ্যে। আমি একজন স্মৃতি কাতর মানুষ। স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকি। কখনো কখনো যেন পুরো অতীত আমার সামনে এসে হাজির হয়। একের পর এক ঘটনা চলচ্চিত্রের মতো আমার চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যেতে থাকে। মাঝে মাঝে ভাবি _ একি আমার পলায়নপর মনোবৃত্তি? আমি কি এসকেপিস্ট? আমি কি আসলে বর্তমান থেকে পালাতে চাই? ঘটমান ঘটনাসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে চাই? হয়তো তাই হবে। ভবিষ্যৎ কেমন জানি না, ভাবিও না। কিন্তু বর্তমান যে বড় বীভৎস। মানুষের জীবন কি বীভিষিকাময়, কি বীভৎস বাস্তবতা চারপাশে! এতটা জটিল তো না-ও তো হতে পারতো মানব জীবন! আরেকটু সহজ-সরল-সুন্দর হলে কি এমন ক্ষতি হতো পৃথিবী ও প্রকৃতির? এসব বিভিষিকাময় বাস্তবতাগুলো মানতে পারি না বলে আমার কষ্ট হয় নীলা, ভীষণ কষ্ট। মেয়েটিকে নিয়ে তাই কিছুই করা হয় না আমার, এমনকি একটি গল্প পর্যন্ত লিখতে পারি না। লিখতে চাই কিন্তু পারি না।

বলতে বলতে হাসিবের চোখ ভিজে ওঠে। এটা আমার জন্য এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। হাসিবকে আমি কখনো কাঁদতে দেখিনি; এমনকি প্রিয়জনের মৃতু্যতেও ও কাঁদে না; আজ ওর ভেজা চোখ আমাকে স্তব্ধ করে দেয়। বুঝতে পারিনা _ আমার কী করা উচিৎ, শুধু মনে হয় _ ওকে আমি আজও ঠিকমতো চিনি না _ কোনোদিন হয়তো চেনাও হবেনা। কিংবা কে জানে ওকে হয়তো কোনোদিন পাওয়াই হবেনা আমার!