Translated Writings
 
 
  আহমাদ মোস্তফা কামাল। জন্ম : ১৪ ডিসেম্বর ১৯৬৯, মানিকগঞ্জ, বাংলাদেশ।
মা : মেহেরুন্নেসা আহমেদ ; বাবা : মরহুম মুহাম্মদ আহমাদুল হক।

পড়াশোনা : পাটগ্রাম হাই স্কুল, মানিকগঞ্জ ; নটরডেম কলেজ, ঢাকা ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স সহ বিএসসি, এমএসসি এবং এমফিল। ছাত্রজীবনে প্রতিটি স্তরে রেখেছেন দুর্দান্ত মেধার সাক্ষর। কিন্তু যাবতীয় বৈষয়িক সাফল্যের সম্ভাবনাকে নাকচ করে শুধুমাত্র লেখালেখিকেই জীবনের সকল স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছেন। পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ [আই ইউ বি] - কর্মরত।

লেখালেখির শুরু '৯০ দশকের গোড়া থেকেই। প্রথম গল্পগ্রন্থ দ্বিতীয় মানুষ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৮ সালে, দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ আমরা একটি গল্পের জন্য অপেক্ষা করছি ২০০১-, তৃতীয় গল্পগ্রন্থ অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে ২০০৪- আর একমাত্র উপন্যাস আগন্তুক -এর প্রকাশকাল ২০০২। ছাড়াও অগ্রন্থিত গল্প রয়েছে বেশকিছু, রয়েছে অগ্রন্থিত উপন্যাসও।

গল্প তাঁর প্রথম প্রেম। ছাড়াও লেখালেখির শুরু থেকেই আলোকসঞ্চারী প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে যাচ্ছেন নিরন্তর। কয়েকবছর আগে একটি দৈনিকের পাতায় কয়েকজন লেখকের ব্যতিক্রমী সাক্ষাৎকার নিয়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে যখন যা লিখেছেন তিনি তাই- মনোযোগী পাঠকদেরকে ভাবনার খোরাক যুগিয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনে নির্জনতাপ্রিয় এই লেখক সমকালের উত্তেজনা কোলাহলকে সযত্নে পরিহার করে লেখালেখি পড়াশোনায় মগ্ন থাকতে পছন্দ করেন। ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি তাঁর প্রিয় বিষয়। এসব নিয়ে রয়েছে তাঁর মৌলিক ভাবনাচিন্তা, সামপ্রতিককালে লেখা তাঁর ব্যতিক্রমী কিছু মননশীল প্রবন্ধে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

সময়ের হিসেবে নব্বই দশকের লেখক আহমাদ মোস্তফা কামাল; কিন্তু সমসাময়িকদের সঙ্গে সাদৃশ্য তাঁর সামান্যই, মিল নেই পূর্বসূরী কারো সঙ্গেও। কী বিষয়ের বহুমাত্রিকতায়, কী প্রকরণের বর্ণিল বৈচিত্র্যে, কী যাদুকরী ভাষার চমৎকারিত্বে তিনি তাঁরই মতো নিঃসঙ্গ অনন্য। কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে তাঁকে আটকানো যায় না, কোনো নির্দিষ্ট টার্ম দিয়ে তাঁকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। প্রতিমুহূর্তে নিজেকেই ছাড়িয়ে যান তিনি, তৈরি করেন বহুমাত্রিক অনুভবের জগৎ। জীবন পৃথিবীর বহু কোণে অবিরাম আলো ফেলে চলেন তিনি, তাঁর গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ তাই গভীর ভাবনার খোরাক জোগায় পাঠককে। জীবনের উপরিতলের বাস্তবতা এঁকেই সন্তুষ্ট থাকেন না তিনি, খুঁজে দেখেন মানুষের মনোজগৎ, আবিষ্কার করেন তাদের দার্শনিক উপলব্ধির জগৎও। শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জীবনই অনায়াস-সাধ্য দক্ষতায় চিত্রিত হয় তাঁর কলমে; আমাদের সমাজ সমকাল, ইতিহাস সংস্কৃতি, আমাদের বিশ্বাস সংস্কার, আমাদের জনজীবনের মধ্যে প্রবহমান দার্শনিকতা_ এসবই এক নিরাসক্ত সন্তের মতো তিনি তুলে ধরেন আমাদের সামনে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন_ এমন একটা সময়ে, এমন এক পৃথিবীতে আমরা বাস করছি যেখানে ইতিবাচকতা খুঁজতে মাইক্রোস্কোপ লাগে। সব কিছুতেই কেবল নেতিবাচকতার জয়জয়াকার। নিজের দেশের দিকে চোখ ফেরালে তো রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়ি _ কেমন দেশ? এতো দারিদ্র, এতো হাহাকার, এতো বঞ্চনা, এতো প্রতারণা, এতো দুঃখ-কষ্ট _ এসব দেখে কেউ কি সুস্থ থাকতে পারে? কিন্তু এতোসবকিছুর পরও আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করি _ এতোসব নেতিবাচকতা নিয়েও মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, এতো দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও একটু সুযোগ পেলেই মানুষ প্রাণখুলে হেসে উঠতে চায়চায় কেন? পরিস্থিতিটা তো আত্নহত্যা করার মতো, বেঁচে থাকার জন্য তবে কেন এই আকুল আয়োজন? জীবনের কাছে কি পায় মানুষ? দারিদ্র-খরা-বন্যা-জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্নিঝড় আর সন্ত্রাস কবলিত এই দেশে মানুষ কিভাবে গান বাঁধে, গান শোনে, গান গায়? তাহলে কি যা কিছু সাদা চোখে দেখি তার বাইরেও আরো কিছু দেখবার আছে? আছে _ আমি বিশ্বাস করি। একজন মানুষের জীবন-ঘরের দরজা কেবল একটিই নয়, যেটা দিয়ে শুধু দারিদ্র আর দুঃখ-কষ্টই ঢোকে _ আমাদের 'গণমুখী' লেখকরা যেটা মনে করেন আর কি _ আরো অনেক অনেক দরজা-জানালা আছে, সেখান দিয়ে ঢোকে আলোবাতাস, ঢোকে সুর ছন্দ, ঢোকে নানারকম দার্শনিক ভাবনা। এসবকিছু মিলিয়ে মানুষের ভেতরে তৈরি হয় এক অসামান্য প্রাণশক্তি, আর মানুষ বাঁচে এসবকিছু নিয়েই। আমি খুঁজে ফিরি এসবকিছু। এসবকিছুই।

তাঁর এই দার্শনিক প্রতীতি, মনোবিশ্লেষণের অসামান্য ক্ষমতা আর লেখালেখির বহুমাত্রিকতা অল্প সময়েই তাঁকে পরিণত করেছে নিজ সময়ের অন্যতম কণ্ঠস্বরে।