ষাটের দশক বাংলাদেশের সাহিত্যে
উপহার দিয়েছিলো এক ঝাঁক উজ্জ্বল সাহিত্যকর্ম-কী কথাসাহিত্যে, কী
কবিতায়, কী প্রবন্ধ বা সমালোচনায়-এক সঙ্গে এতো অধিক সংখ্যক
শক্তিশালী লেখকের আগমন আর কোনো সময় ঘটেনি। এঁদের আগমনের সময়টি ছিলো
অস্থিরতার, কিন্তু ক্ষেত্র তৈরী হচ্ছিলো স্থির লক্ষ্য তৈরী করার।
কী আমাদের পরিচয়-এই প্রশ্ন প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিলো তখন। ততোদিনে
ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রতত্ত্বের মোহ কেটে গেছে, ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছে
পাকিস্তানিদের প্রকৃত স্বরূপ, বাঙালি দাঁড়িয়ে আছে তার আত্নপরিচয়ের
প্রশ্ন সামনে নিয়ে, ভাবতে শুরু করেছে স্বাধিকারের কথাও। একদিকে
সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সমস্ত মানবতা অন্যদিকে চলছে
আন্দোলন-সংগ্রাম-প্রতিরোধ। একদিকে জাতীয়তাবোধ ও স্বাতন্ত্র্যবোধ
নির্মাণের প্রবল প্রচুর প্রক্রিয়া, অন্যদিকে বাঙালির বিরুদ্ধে
অব্যাহত ষড়যন্ত্র। এই অর্থে সময়টি নানাদিক থেকে সংকট ও নির্মাণেরও
বটে। সাহিত্যের ভূমিটি তখনো ছিলো কিছুটা নরম-কর্দমাক্ত। বীজক্ষেত্র
কিভাবে নির্মিত হবে সেটি নির্ভর করছিলো লেখকদের ওপরই। এই দ্বন্দ্ব
ও সংকটমুখর সময়ে ষাটের সাহিত্যকর্মীরা নিয়ে এসেছিলেন প্রথা ভাঙার
অঙ্গীকার, নতুন কিছু নির্মাণের আন্তরিক-উদ্দাম-উচ্ছ্বল প্রচেষ্টা।
এর জন্য যে দীপ্ত-উজ্জ্বল তরুণ গোষ্ঠী প্রয়োজন, ষাটের তা ছিলোও।
আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁদের অন্যতম। এই সময়ের সাহিত্যশিল্পীদের
মধ্যে একে অপরের সঙ্গে মিল সামান্যই, বস্তুত এজন্যই ষাটের দশক
নির্মাণ করতে পেরেছে বহুমাত্রিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রভূমি।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর আব্দুল মান্নান সৈয়দ একই সময়ের
গল্পকার-ব্যক্তিজীবনে তাঁদের বন্ধুত্বও ছিলো-কিন্তু গল্পভাবনা,
গল্পের বিষয়, ভাষা ও প্রকরণে তাঁদের মধ্যে রয়েছে কয়েক-যোজন দূরত্ব।
এরকম উদাহরণ দেয়া যাবে আরো অনেক। এই সময়ের গল্পশিল্পীদের একটি
অন্যতম বৈশিষ্ট্য 'সমাজ-বাস্তবতার' নির্মাণ। তবে আব্দুল মান্নান
সৈয়দ এর ধারে-কাছেও যাননি। তাঁর গল্প ধ্রুপদি মাত্রা পেয়েছে
মানুষের অন্তর্লোক চিত্রায়ণের কুশলী সফলতায়। মানবমনের বহুবিচিত্র
ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূক্ষ্ন চিত্রণে তার তুলনা মেলা ভার-মানুষকে
তিনি প্রধানত তুলে এনেছেন তার অন্তর্লোকের পরিপ্রেক্ষিতে, তার
সমস্ত আকুলতা-আকুতি, আবেগ-আবেশ, বিস্ময়-বিভিন্নতা, ভয়-ভাবনা আর
এসবের অদ্ভুত-অসাধারণ ব্যাখ্যাসহ। পাঠক তাঁর লেখায় খুঁজে পান তার
নিজের বহুবিচিত্র মনো-কার্যকলাপের অদ্ভুত-অসাধারণ ব্যাখ্যা; তার
সামনে খুলে যায় এক নতুন পৃথিব;ী সে পৃথিবী তার অন্তর্গত
কামনা-বাসনার, চিন্তা-চেতনার, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার।
গল্পপ্রসঙ্গ
সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ। সাহিত্যের প্রায় সমস্ত
শাখায়_কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস, সমালোচনা সাহিত্য_তাঁর
অবাধ-প্রবল-প্রচুর বিচরণ আগ্রহী পাঠকের মুগ্ধ ও বিস্মিত দৃষ্টি
আকর্ষণ করে। বিশেষত গল্প ও সমালোচনা সাহিত্যে তাঁর সাফল্য তুঙ্গ
স্পর্শ করেছে।
তাঁর গল্পগুলোর দিকে তাকালে গল্পের ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয়-ভাবনার
বহুমুখিনতায় মুগ্ধ হতে হয়। স্বতন্ত্র-পটভূমিতে দাঁড়িয়ে এই
বহুমাত্রার নির্মাণ মানব জীবনে বিভিন্নতার উপস্থিতি, এক মানুষের
সঙ্গে আরেক মানুষের মৌলিক পার্থক্য, তার মনোজগতের ভাবনার
বহু-বিচিত্রতাকেই তীব্রভাবে স্পষ্টতর করে তোলে। দু-একটি উদাহরণ
দেয়া যাক।
মাতৃহননের নান্দিপাঠ গল্পের আতিকুল্লাহ -
দর্শনের একজন দারুণ ছাত্র, বুদ্ধিজীবীদের মতোই যার মুখ লম্বাটে,
চোখ স্বপি্নল, যে চোখ অযুত গ্রন্থের চোরাবালি অতিক্রম করে জ্ঞান
নামক বিদেহী সমুদ্রে ভাসছে সারাক্ষণ, কৃশ দীর্ঘর্ শরীর
মায়ের স্নেহের আধিক্যে-অত্যাচারে অতিষ্ট। কারণ -
যেখানেই আমি যাই দু'টি নির্ণিমেষ চোখ পিছনে ছুটছে, পিছলে
পড়ছেনা একবারো, সরে যাচ্ছেনা, এমনকি পলক ফেলছেনা কখনো, যেন মানুষের
চোখ নয়। মানুষের অবশ্য, তবু মানবীয় নয়। দানবীয় এক যন্ত্রে পরিণত
হয়েছে সে...আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে মৃতু্যর অভিমুখে, কবর পর্যন্ত
আমাকে পৌঁছিয়ে না দিয়ে শান্তি নেই তার।... অবিচ্ছিন্ন এই যন্ত্রণা
আমার গা বেয়ে উঠলো চূড়ান্ত পর্যায়ে, যখন দেখলাম আমার আর রিনার
ভেজানো দরজায় আঁকা আছে দু'টি ভয়াবহ রকমের শান্ত চোখ।...তাই মা-র
ভালোবাসা আমার পক্ষে অমনই ভীষণ, অমনই নিঃস্বপ্ন যন্ত্র।
তার এই যন্ত্রণার পরিপ্রেক্ষিতে স্বান্ত্বনা পাওয়ার জন্য সে
যুক্তিপূর্ণ একটি কারণ খোঁজে। নিজেকে বোঝায়-সে যেহেতু মায়ের
একমাত্র সন্তান এবং মাত্র আটাশ বছর বয়সে বিধবা হলেও তিনি আবার বিয়ে
করেনননি কারণ এতে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক উন্নতি আঘাতপ্রাপ্ত
হতে পারে-অতএব মায়ের এই আচরণ অস্বভাবিক কিছু নয়। এগুলো বোঝা
সত্ত্বেও সে কিছুতেই মায়ের ওই 'নির্মম' মমতামিশ্রিত উৎকণ্ঠা মেনে
নিতে পারে না, কারণ এতে তার ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তি
চূড়ান্তভাবে বিঘি্নত হচ্ছে। অতএব-
আমার একসময় মনে হলো, এমন হয়না যে ঐ শীতল মুখটার ভিতর থেকে
লকলকে ছুরির মতো বেরিয়ে পড়ে জিভ, মার্বেলের মতো চোখের মনি দু'টি
ঠিকরে বেরিয়ে আসে।
কতোটা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লে একজন যুবক তার মায়ের সম্বন্ধে এরকম ভাবতে
পারে তা নিশ্চয়ই অনুমান করা যায়! আর তাই, অবশেষে সে মাতৃহত্যার
সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের বিস্মিত হওয়ার উপায় থাকে না। কিন্তু যেহেতু
সে যুক্তিবাদি, তাই এই হত্যাকার্য সম্পাদন করার জন্য সে সত্যিকার
অর্থেই একটি গভীর যুক্তি বা কারণ খুঁজে পেতে চায়, আর তাতে
পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। সে মায়ের ঘরে একটি লোককে বসে থাকতে
দেখলে আর এতে মা বিব্রত ও আরক্তিম হয়ে উঠলে তার মনে পড়ে-এর আগেও সে
এ ঘরে আধপোড়া সিগারেটের টুকরো দেখেছিলো। তার মানে, লোকটি নিয়মিতই
এখানে আসে! ঘটনাটি তার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। অথচ
বিষয়টি নিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড়ালে মায়ের এই আচরণকে সে যুক্তিহীন
কিংবা অস্বাভাবিক বলে ভাবতে পারে না, বরং মায়ের দীর্ঘকালিন অবদমিত
কামনা কোনো-না-কোনো সময় যে জেগে ওঠাটাই স্বাভাবিক-এই সত্য অনুধাবন
করে সে আরো বেশি মুষড়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে-মায়ের এই আচরণ তার ভেতরে
জন্ম দিয়েছে ঘৃণা, বেদনা ও আক্রোশ যা তার নিজের কাছেই যুক্তিহীন ও
কারণহীন বিদ্বেষপ্রসূত বলে মনে হয়! অতএব এই কারণটি মাতৃহত্যার মতো
জটিল একটি বিষয়কে তরান্বিত করতে পারে না। এই পর্যায়ে এসে তার
মানসিক দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পেঁৗছায়। এবার সে অনুভব করে,
মায়ের ভালোবাসায় সে অত্যাচারিত বোধ করলেও তাঁর মনোযোগে অন্য কারো
অংশীদারিত্বও তার সহ্য হচ্ছে না। সে নিজেকেই বল-
আসলে তুমি এমন প্রকৃতির লোক, যে মাকে কষ্ট দিয়ে চিরকাল আনন্দ
পাবার চেষ্টা করে। কে তাহলে শয়তান? হয়তো তোমার মনোভাব আরো গর্হিত;
মা-র মুখ্য মূলধন আবেগ, নানা আকারে তোমার কাছেই পৌছে যেতে থাক
সারাজীবন-এই তোমার ইচ্ছা অথচ বদলে তুমি দিয়ে যাবে শুধু উপেক্ষা।
গল্পের শেষের দিকে আতিকুল্লাহ মাতৃহননের যৌক্তিক কারণটি খুঁজে
পায়, যা তার দ্বন্দ্ববিক্ষুব্ধ অন্তর্লোকের অতিবিচিত্র
চিন্তাভাবনার একটি ধ্রুপদি চিত্র হিসেবে পাঠককে নাড়া দিয়ে যায়।
আমরা দেখতে পাই দ্বন্দ্বমুখর এই যুবকটি-যে সমস্ত কিছুর একটি
যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে চায়, যে প্রতিটি বিষয়েই নিজের
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্নবানে ক্ষতবিক্ষত করে, রক্তাক্ত করে
তোলে নিজের হৃদয়কেই- নিজেকেই বলছে,
নিজেকে তুমি কিছুতেই আর-দশজনের সঙ্গে মেলাতে পারো না, কি ক'রে
লোকে এত সামান্য কারণে হাসতে পারে, ছোটো বিষয় নিয়ে মেতে ওঠে হিংসার
প্রতিযোগিতায় তুমি তা ভেবে পাওনা - এ নিয়ে মনে হেসেছোও যেমন তেমনি
দুঃখ আছে তোমার: কেন তুমি আর দশজনের মতো হ'লে না, বেলেল্লা হল্লায়
মেতে থাকতে পারলে না আজীবন।
মাকে হত্যা করার কারণটি আমরা এই জটিল যুবকের বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস
থেকে জানতে পারি এভাবে-
অন্তরে-অন্তরে যেহেতু নিশ্চয়ই আমি জানি, আমি একজন অস্বাভাবিক
প্রকৃতির মানুষ-নির্জনতা সর্বনাশ করেছে আমাকে-আর কেউ গুঢ়তর
ব্যাপারটা যেন না জানে, তাই স্বাভাবিক, বাস্তব, সাধারণ হবার জন্য
ভিতরে ভিতরে আমার কি করুণ দ্বন্দ্ববহুল প্রয়াস আমিই তা জানি।
আর-দশজনের মতো হতে না পারার এক অদভুত বেদনায় কাতর একজন অস্বাভাবিক
যুবকের এই দ্বন্দ্বমুখর মানসলোকের সফল ও অসাধারণ চিত্রায়ণ লেখকের
মানব-মনোজগত বিশ্লেষণের তুঙ্গস্পর্শী ক্ষমতারই প্রমাণ দেয়।
মান্নান সৈয়দের গল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে
বিষয়-বৈচিত্র্য। যদিও মানুষ, তার মনোজগত এবং তার কার্যকলাপে পৃথিবী
ও প্রতিবেশের প্রভাব, সর্বোপরী তার অন্তর্লোক ও বহির্জগত এ দুয়ের
সম্মিলনে নির্মিত যে সম্পূর্ণ জীবন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্রায়ণই
তাঁর মূল লক্ষ্য, কিন্তু বিষয়-বৈচিত্র্যে তাঁর বহুগামিতা লক্ষ্য
করবার মতো। আর এভাবেই তাঁর গল্পে উঠে আসে গণ্ডীবদ্ধ ও সীমাবদ্ধ
জীবনযাপনকারী, স্বপ্ন ভঙ্গে ক্লান্ত ও বিপন্ন মানুষ-নানা প্রতীকের
মাধ্যমে। মাতৃহননের নান্দিপাঠ গল্পের আতিকুল্লাহকে আমরা তার শীর্ণ
শরীর ও দ্বন্দমুখর অন্তর্লোকসহ নির্মিত হতে দেখেছি। রাস্তা গল্পের
যুবককে আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রসহ নির্মিত হতে দেখি যার জীবনের
একমাত্র চাওয়া 'সুন্দর শরীর' ও 'সুন্দর চেহারা'। তার সমস্ত
কর্মকাণ্ড চিন্তাভাবনা আবর্তিত হয় এই এই একটিমাত্র চাওয়াকে কেন্দ্র
করে। তার ধারণা- 'মানুষের হীনতা, ক্ষুদ্রতা, জটিলতা বেড়ে যায় যদি
তার শরীর সুস্থ্য ও বলবান না থাকে।' গভীর কোনো ভাবনা তাকে আবিষ্ট
করে না কারণ-'পণ্ডিতি ভাবনার আমার সময় নেই' এবং 'আমি আমার ধারণা
নিয়ে আছি, কেউ আমাকে বুঝুক না বুঝুক আমি তোয়াক্কা করি না।' শরীর
ঠিক রাখার জন্য প্রতিদিন ভোরে সে দৌড়াতে বের হয়, নিজেকে ডুবিয়ে
রাখে খেলা-ধুলায় ও ব্যায়ামে-তার জীবন এই একটি বিষয়েই গণ্ডিবদ্ধ ও
সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। গল্পটি অনেক দূর পর্যন্ত এরকমভাবে এগিয়ে যায়,
কিন্তু শেষের দিকে এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বিস্ময়কর এক চমক।
আমরা দেখতে পাই, নিত্যদিনের মত ভোরে সে দৌড়াতে বেরিয়েছে, কিন্তু
হঠাৎ গির্জার ঘণ্টা ধ্বনি শুনে সে বুঝতে পারে-সময়টা ভোর নয়,
মধ্যরাত। একটা তীব্র ভয় তাকে গ্রাস করে নেয় মুহূর্তে। এই নির্জন
রহস্যময়ী রাতের শহর তার সমস্ত সাহস ও মনোবল কেড়ে নেয়। সে নিজের ঘরে
ফেরার জন্য ছুটতে শুরু করে-
ছুটতে-ছুটতে ছোট, বড়, সোজা, বাঁকা, অন্ধকার, আলোকিত কত রাস্তা
পার হয়ে গেলাম। ছুটতে ছুটতে আমি অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তাই
আমি, যথাসম্ভব জোরে জোরে হাঁটছিলাম-দৌড়ানোর ক্ষান্ত দিয়ে। পথে
একটি জীবিত প্রাণীরও সাক্ষাৎ পেলাম না আমি, যা অন্য কোন কোন রাতে
পেতাম.. না কোন চোর, পুলিশ, মাতাল, বেশ্যা বা শিল্পী। আমি জানি না,
অন্ধকার রাতে আমি একই রাস্তায় গোলকধাঁধার মত ঘুরে বেড়াচ্ছি না নতুন
নতুন রাস্তায় চলে আসছি। কিন্তু নতুন, পুরনো, হারানো, ছড়ানো যে
রাস্তাই আমি যাই না কেন, সেই আশ্চর্য অন্ধকারে আমি কিছুতেই আমাদের
বাড়ি খুজে পাই না আর। আমার সম্মুখে একের পর এক রাস্তা খুলে যায়,
কেবলি একটি রাস্তা আরেকটি রাস্তায় নিয়ে যায় আমাকে।
গল্পের এই পরিণতি আমাদের একটি সত্য তীব্র ভাবে জানিয়ে দিয়ে যায়-
গণ্ডিবদ্ধ যে মানুষ, গণ্ডির বাইরে তার আর কোনো পৃথিবী থাকে না।
দৈনন্দিন নিয়মের সামান্য ব্যতিক্রম ঘটলেই পৃথিবী তার কাছে হয়ে যায়
গোলোকধাঁধার মতো, পরিচিত পরিবেশে ফেরার পথ কিছুতেই আর খুঁজে পায় না
সে। প্রায় নির্বোধ ওই যুবকের সামনে একের পর এক রাস্তা খুলে যাওয়ার
প্রতীকে তার সংকীর্ণ পৃথিবীর বাইরেও এক বিপুল বিস্ময়কর পৃথিবীর
অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেন লেখক- অচেনা রাস্তা, পরিচিত পথটি খুঁজে না
পাওয়ার প্রতীকে ইঙ্গিত দেন তার ভয়ংকর সীমাবদ্ধতার।
মাছ গল্পের অধ্যাপক সাহেব সবসময় একটি এ্যাকুরিয়াম সঙ্গে নিয়ে
চলাফেরা করেন-যেন সীমাবদ্ধ মানব জীবনের প্রতীকী ইঙ্গিত ওই
এ্যাকুরিয়াম। সামাজিকভাবে ভয়ংকর বিচ্ছিন্ন তিনি,
সহকর্মী-বন্ধু-আত্নীয়-স্বজন কারো সঙ্গেই কোনোরকম সম্পর্ক নেই তার।
দৃষ্টিকটুভাবে তার এই এ্যাকুরিয়াম বহন সবার চোখে
কৌতূহলকর-কৌতুককর দৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়-কিন্তু তার কোনো
ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় না। একদা সামাজিক-স্বাভাবিক এই অধ্যাপক
নানা রকম পোড় খেতে খেতে হয়ে উঠেছেন তীব্রভাবে একাকী আর তার পৃথিবী
হয়ে উঠেছে এ্যাকুরিয়ামকেন্দ্রিক। তার দিনরাত কাটে এখন ওটা ঘিরেই-
এই একটা পৃথিবী...রাত্রিবেলা যখন সারা ঘর অন্ধকার করে
এ্যাকুরিয়ামটা আলোকিত করে রাখি তখন সমস্ত দুনিয়াও অন্ধকার হয়ে যায়।
কেবল জেগে থাকে
ওই এ্যাকুরিয়াম...আমি ইজি চেয়ারে বসে ঐ আলো জ্বলা
এ্যাকুরিয়ামের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকি...তাকিয়ে থাকতে
থাকতে আমি একটি মোটেলের একা ঘরে শুয়ে থাকি। জিনিষটা সামান্য নয়।
সামান্য হলেও অসামান্য। একটা সবুজ মাছের মধ্যে
বিশ্বচরাচর...এমনিভাবে দিন কেটে যায়। আমার আর কাজ কি?
এ্যাকুরিয়ামের পানি বদলে দেই মাঝে মাঝে। নিউ মার্কেট থেকে মাছের
খাবার এনে দেই ওদের। রাত্রিবেলা আলো জ্বেলে মাছের খেলা দেখতে দেখতে
ভোর হয়ে যায়। দিনের বেলা যেখানে যাই ঐ এ্যাকুরিয়াম আমার সঙ্গী।
নাগরিক জীবনের সুগভীর বিচ্ছিন্নতা, অনিবার্য বিপন্নতা, সীমাবদ্ধতা,
পৌনঃপুনিকতা, গণ্ডিবদ্ধ জীবনযাপন, আর হাজারো কোলাহলের মধ্যে
দিগন্তব্যাপি নিঃসঙ্গতার এমন চোখ-ভিজে-ওঠা চমৎকার প্রতীকী চিত্রায়ণ
আর কি হতে পারে? গল্পের শেষের দিকে অধ্যাপক একজন অদ্ভুত লোকের
সঙ্গে পরিচিত হন, লোকে যাকে সাঁইজি বলে ডাকে। সাঁইজি
অধ্যাপককে-'আপনি তো বাবা বাউল'-বলে চমকে দেন, আর শোনান বাউলদের সেই
ঘরছাড়া পৃথিবীর অদ্ভুত তত্ত্ব। লোকটির কথা তাঁকে খুব গভীরে স্পর্শ
করে যায়, যেন হঠাৎ করেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর আত্নপরিচয়। গল্পের
শেষে-
তারপর একদিন কোথাও কিছু না-হঠাৎ একটা লোকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে
এ্যাকুরিয়ামটা ভেঙে যায়। কাঁচগুলো খান খান...একহাজার লোক আসছে
যাচ্ছে, তাদের সামনে ফুটপাতে প'ড়ে পাঁচটি মাছ সাঁতরাতে থাকে
এদিক-ওদিক। আমি হতবাক। শূন্য চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। হতবাক,
স্তব্ধ আমাকে পেছনে ফেলে মাছগুলো এগিয়ে যায় অনেক অনেক দূরে।
এই পরিস্থিতি যেন অধ্যাপকের তুমুল মুক্তিকেই নির্দেশ করে এবং আমরা
দেখি, তাঁর এই মুক্তি এসেছে তখনই যখন তিনি নিজেকে চিনতে পেরেছেন,
যখন নিজের ভেতরে এক বাউলের সন্ধান পেয়েছেন। তবে কি আমরা-এই নাগরিক
মানুষেরা-সবাই ভেতরে ভেতরে একেকজন বাউল? কেবল সচেতনভাবে তা টের পাই
না, আর তাই আমরা বন্দি হয়ে থাকি গণ্ডিবদ্ধতার ভেতরে, পৌণপুনিক এক
যান্ত্রিকতার ভেতরে!
মান্নান সৈয়দের মনো-বিশ্লেষক গল্পগুলোতে আমরা যেমন দ্বন্দ্বমুখর
অন্তর্লোকের পরিচয় পাই তেমনি মানুষকে চিত্রিত হতে দেখি তার বিপরীত
ও বহুমুখি সম্ভাবনাসহ। মানুষ তার বিপরীত সম্ভাববনাময় চরিত্রটিকে
মানবিক কারণেই লুকিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু যেভাবে সে পরিচিত তার
পরিপার্শ্বের কাছে সে কি সত্যিই পুরোপুরি ওরকম? নাকি খুব ভালো বলে
পরিচিত একজন মানুষের মধ্যেও বাস করে নিষ্ঠুর ও অসৎ আরেকজন? গল্প
১৯৬৪ গল্পের কবির-সেই দাঙ্গাবিক্ষুব্ধ সময়ে যে ছিল তরুন এবং
দাঙ্গানিবারনি সংগঠনের সক্রিয় এবং বলিষ্ঠ কমর্ী, এতকাল যার কোমল
রূপটিই ছিল প্রধান হয়ে, একসময় তার ভেতরের পশু-রূপটি বেরিয়ে আসে।
তার শৈশব, কৈশোরের বন্ধু অমল, যার সঙ্গে কেটেছে তার অজস্র
সকাল-দুপুর-বিকাল, বহু আনন্দ-বেদনা-সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে কেটেছে
দুরন্ত ও শান্ত সময়, দাঙ্গা শুরু হলে অন্যান্যের সঙ্গে সেই অমলদের
পরিবারকে রক্ষা করার জন্য কবির বিশেষ মনোযোগ প্রদান করে। সেই সময়ের
একটি চিত্র গল্পে পাওয়া যায়-সামপ্রদায়িকতার ভয়াল
উন্মাদনায়-নিষ্ঠুরতায় নিরুপায়-অসহায় হয়ে পড়া মানুষের আহাজারি কানে
বাজে। অনেকের মত অমলরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়-যাবার সময় নিরাপত্তার
খাতিরেই অমল তার বোন শোভাকে কবিরের হেফাজতে রেখে যায় কিছুদিনের
জন্য। কবির কয়েকদিন তার দাযিত্ব পালন করেছিল সঠিকভাবেই কিন্তু একসয়
তার ভেতরের পশু জেগে ওঠে, শোভার অসহায়ত্ব ও আশ্রয়হীনতার সুযোগ সে
গ্রহণ করে-
সব সমস্ত চলছিল ঠিক ভাবে। কিন্তু এক রাতে আমার মধ্যে জানোয়ার
জেগে উঠেছিল; আমি কিছুতেই নিজেকে সংযত করতে পারিনি। শোভাও হয়ত ভয়ে
বাধা দেয়নি, চিৎকার করেনি।
এই যে সুযোগ গ্রহণ তা কি তার বিপরীত মানসিকতারই চরম প্রকাশ নয়? যে
দায়িত্ব নিয়েছে মানুষকে নির্ভরতা দেয়ার, যে তার কার্যক্রমেই প্রমাণ
করেছে এবং বিশ্বাস অর্জন করেছে নির্ভরযোগ্যতার, কেন এমন পশু হয়ে
ওঠে? কেন তার ভেতরে জেগে ওঠে আদিম লালসা আর কিছুতেই সে নিজেকে
নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না? তবে কি মানুষের মধ্যে বাস করে অচেনা এক
পশু? গল্পটি এখানেই শেষ নয়; আমরা দেখি, এটি তার স্মৃতিচারণ এবং
সমস্ত কিছুর শেষে তার ভেতরে জেগে ওঠে এক দিগন্তপ্রসারি অনুতাপ-
আ, আমার নিয়তি। তার পরদিনই সন্ধ্যার অন্ধকারে ফিরে এসেছিল অমল।
আ, যদি একদিন আগে আসতো। আমি বেঁচে যেতুম। শোভা বেঁচে যেতো, আমি
বেঁচে যেতাম।
এএই অনুতাপ অনুশোচনা কি প্রমাণ করে না তার অন্তর্গত সৌন্দর্যের?
মানুষের সত্য রূপ তাহলে কোনটি?
এক অমানুষের গল্প গল্পের রশিদ-যে মেয়ে সরবরাহ করে অথবা মেয়েদের
নগ্ন ও অশ্লিল ছবি তুলে ব্যবসা করে, আমরা দেখি- একটি মেয়েকে সে
নানা পদ্ধতিতে, অনেক টাকা পয়সা খরচ করে, মন ভোলানো কথায়
ভুলিয়ে-ভালিয়ে, উদারতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে অবশেষে নগ্ন ছবি
তোলার জন্য স্টুডিওতে নিয়ে এসেছে। শুধু ছবি তোলাই নয়, সেখানে
প্রথমে স্টুডিওর কর্ণধার তার লালসা চরিতার্থ করে মেয়েটিকে দিয়ে।
অতঃপর-
ক্লিক...ক্লিক। একের পর এক। অনেক ভঙ্গিতে। স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক,
উদ্ভট ও বেয়াড়া আসনে। সব রকম ক্রেতার দিকে নজর রাখতে হয় তার। সে
যখন ব্যবসাতে নেমেছে। r />
অথঅথচ মেয়েটি যখন আহ্বান করে মিলনের, রশিদ প্রত্যাখ্যান করে। কেন? ওই
সময় ওই রকম এক তীব্র যৌবনতীর প্রকাশ্য আহ্বান কেন সে উপেক্ষা করে
যায়? একি তার নীতিবোধ? সে তাকে ভোগ করতে চায় না, শারীরিক মিলন তার
কাছে নিছক খেলা নয়- এই ধরনের একটি আদর্শিক চিন্তা কি তার ভেতরে
খেলা করে? জীবনের তীব্র প্রয়োজন কি আয়োজনে সে হয়তো ব্যবসায় নেমেছে,
জানে সে- আদিম ও অন্যায় এ ব্যবসা, তবু তার ভেতরে কি একজন সৎ ও
সুন্দর মানুষও বাস করে না? গল্পের শেষে দেখতে পাই তারা পরস্পরকে
'তুমি' বলে সম্বোধন করছে, এই সম্বোধনের ভেতর এক গোপন-মোহন
ভালোবাসার কণ্ঠ কি খুব নির্জনে ভেসে আসে না? মানুষের এই
দ্বৈত্বসত্ত্বা তার জন্য খুবই মৌলিক ও একান্ত। কারণ সে
প্রকৃতিগতভাবেই একই সঙ্গে মানুষ ও পশু-সে তার করোটি ও ধমনিতে বয়ে
এনেছে তার সহস্র পূর্বপুরুষের বার্তা-যা ছিল 'নীতিহীন ও বর্বর'
আবার সভ্যতা তাকে শিখিয়েছে হিংস্র নখরকে লুকিয়ে রাখতে। অথচ মানুষ
সব সময় প্রধান করে তুলতে চেয়েছে তার আলোকিত রূপটি, হয়তো চেয়েছে
একটি মাত্র চারিত্র্য বৈশিষ্ট্যের মানুষ হতে। এই চাওয়াও তার জন্য
মৌলিক। সৎ ও সুন্দর মানুষেরা যেমন তাদের সততা ও সৌন্দর্যকে
প্রধান করে তুলতে চায়, হিংস্র মানুষদের লক্ষ্য থাকে যেন তাদের
হিংস্রতাই প্রধান হয়ে ওঠে। একক চরিত্রের মানুষ হওয়ার এই মৌলিক
চাওয়া কি পূরণ হয় মানুষের?
সমীচীন মানব গল্পের সিকান্দর, সেক্রেটারিয়াটের এক সাধারণ কর্মচারী,
চিন্তাভাবনায় বেশ খানিটা ব্যতিক্রম হয়েও পরিপাশ্বর্ের জন্য
গতানুগতিক হয়ে পড়ে, আমরা দেখি-অফিস থেকে বেরিয়ে একটি
সুললিত-সুরভিত-সুন্দর মেয়ের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করছে। অতঃপর তার
সর্বাত্মক চেষ্টা শেষ হলে, মেয়েটি আরো খানিকটা তার নিকটবর্তী হলে
সে এবার আরেকটি পৃথিবীর খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। একজন পতিতাকে অনুসরণ করে
তার ঘর পর্যন্ত যায়, আর সমস্ত সভ্যতার আবরণ থেকে মুক্ত করে নিজেকে
প্রায় অশ্লীল করে তোলে। আর এই পর্ব শেষ হলে সে অবশেষে ফিরে আসে তার
ঘরে-স্ত্রীর কাছে। এবার সে প্রেমিক নয়, নয় সে অসভ্য-অশ্লীল।
স্ত্রীর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সাংসারিক আলাপ, কিঞ্চিৎ খুনসুটি অতি
চমৎকারভাবে সম্পাদন করে। তবু-
সিকান্দার ভাবছিল, আমি সাইফাকে প্রেমের বাক্যে তুষ্ট করেছি;
বেশ্যা মেয়েটিকে অশ্লীল কথা বলেছি; এবং রাফেজার সঙ্গে দরকারি
সাংসারিক আলাপ করেছি। বিভিন্নজনের কাছে আমার আচরণের ও ব্যবহারের এই
বিভিন্নতা সম্ভব হয়েছে এজন্য যে আমি চতুর, আমি বুদ্ধিমান, আমি
সমীচীন। আমি নিজের আশ্চর্য ব্যবহার ও বুদ্ধিতে হো হো করে হেসে উঠতে
পারতাম, কিন্তু কেন জানি না নিজেকে বড় বেশি বিমর্ষ ও ফতুর বলে মনে
হচ্ছে। অমন চাতুর্যভরা সকলের সঙ্গে সার্থক ব্যবহারের পরও কেন আমি
বিমর্ষ? আমার একদিনকার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত জীবনযাত্রার তো কোন
ত্রুটি নেই, তাহলে কেন নিজেকে শূন্য মনে হচ্ছে? আমি মঞ্চে কোনদিন
অভিনয় করিনি, তবু আমি অভিনেতা_আমি তিনটি চরিত্রে অভিনয় করে ঘুমাতে
এসে, এখন জেগে আছি একটি মাত্র মৌল আমাকে নিয়ে। আমি যুদ্ধ জয়ের পরও
ঘুমের আবেগে ছটফট করছি, কেননা কারুকার্য করা বিধাতার কাছে আমি
একদিন একটিমাত্র চরিত্র চেয়েছিলাম, সে প্রেমিক হোক, কি বেশ্যাগামী
হোক, কি সাংসারিক হোক। আমি একটিমাত্র চরিত্র চেয়েছিলাম।
বলাবাহুল্য সিকান্দর তা পায়নি।
চাবি গল্পটিতে মানুষ-মানবজীবন-পৃথিবী এবং শিল্পদর্শন সম্বন্ধে একটি
সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন মান্নান সৈয়দ। তাঁর গল্পের
অধিকাংশ চরিত্রের মতো এই গল্পের প্রধান চরিত্রও-চিত্রকলার তরুণ
অধ্যাপক-বিচ্ছিন্ন ও বিযুক্ত, নিঃসঙ্গ ও বিষণ্ন। কিন্তু একটি অদভুত
ঘটনা তাঁকে প্রতিবেশিদের কাছে যেতে বাধ্য করে এবং নানারকম অভিজ্ঞতা
উপহার দেয়। একদিন তিনি বাইরে থেকে ফিরে নিজের দরজায় দাঁড়িয়ে পকেটে
হাত দিয়ে দেখেন, চাবি নেই। কোথায় রেখেছেন সেটা কোনোভাবেই মনে করতে
না পেরে একে একে প্রতিবেশিদের দরজায় হানা দেন। পাশের ফ্ল্যাটে তিনি
পান সৌজন্যবোধজনিত আতিথেয়তা, কিন্তু চাবি সেখানে নেই। এরপর
নিচতলার প্রথম ফ্ল্যাটে পান শীতল উপেক্ষা, তারপরের ফ্ল্যাটে
তারচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা- চাবির কথা বলতেই গৃহকত্রীর রুদ্ররূপ-
বলেন কি, আমাদের বাড়িরছেলেমেয়েকে আপনি চোর ভাবেন, কখনো নয়, ককখনো
নয়, ককখনো ওরা নিতে পারে না। দেখুন অন্য কোথাও। কী-যে ভাবেন
আপনারা!
তারপরের ফ্ল্যাটে উঁকি দিতেই-
একজন বেরিয়ে এসে প্রায় আমাকে ধমকাতে লাগলো: তার গলায় রাগ;
কিন্তু ছোটো চোখের বিরাট মুখের মণ্ডলে ক্রোধের চিহ্ন নেই, 'বলছেন
আমাদের উপরের তেরো নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন আপনি? অসম্ভব, আপনাকে
কোনোদিন এ অঞ্চলেই দেখিনি। আপনি মশাই চালাকি পেয়েছেন-আসুন বাজি
রাখুন দশটাকা। বললাম : আপনি এ বাড়ির কোনো ঘরেই থাকেন না। এ বাড়ির
লোকদের চেহারা অন্যরকম হয়, জানেন? চাবি খুঁজছেন, হ্যা, চাবির কি
হাত হয়েছে?..যান যান এ অঞ্চল ছেড়েই চলে যান, বেশি গোলমাল করলে
পুলিশে দেবো।' আমি ফিরতে ফিরতে শুনলাম পিছন থেকে একটি স্ত্রী কণ্ঠ
: 'কী জানি বাপু, কী মৎলবে ঘুরছে, যা দিনকাল পড়েছে, কিচ্ছু বিশ্বাস
নেই।'
এর পরেরর অভিজ্ঞতা আবার বিপরীত ধরনের-মন ভালো করে দেবার মতো।
তারপরের ঘরটিতে এক ঝাঁক ছেলেমেয়ে কলালাপ করছিলো, নক্ষত্রের মতো
চলাফেরা করছিলো, আমাকে দেখেই সন্ধেবেলার পাখিদের মতো চ্যাঁচামেচি
করতে করতে বেরিয়ে এলো, বললো সবাই মিলে, 'না তো, আপনার চাবি আমরা
দেখিনি তো, চাবিঅলার কাছে যান না, আরেকটা বানিয়ে নিন। আর সামনের
রাস্তায় চাবি বাজাতে বাজাতে যদি কোনো চাবিঅলা যায়, তো নির্ঘাৎ
আপনার কাছে তাকে ডেকে দেবো। কিংবা চাবিঅলার কাছে যেতে হবে কেন,
আপনি যদি বলেন তাহলে আমরা এক্ষুনি গিয়ে আপনার ঘরের দরজা ভেঙে
দিচ্ছি। কী যে আপনি বলেন, এটা কোনো সমস্যা নাকি?
তারপরের অভিজ্ঞতা আবার অন্যরকম-একজন বুড়ো মতন লোক বলে উঠলেন,
চালাকি পেয়েছো ছোকরা? চাবির নাম করে ঘরে এস বসবে, খাবে, গল্প
করবে, তারপর আমার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করবে, ওসব চালাকি বুঝি আমি।
যাও যাও...
আর এভাবেই এক চমকপ্রদ বর্ণনায় লেখক নাগরিক জীবনকে তুলির এক আঁচড়ে
এঁকে ফেলেন। নাগরিক জীবনের মধ্যে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা,
সম্পর্কহীনতা, অন্যের প্রতি মনোযোগহীনতা, নিস্পৃহতা, জটিল
মনোবৃত্তি, নিষ্ঠুরতা, সন্দেহ, অবিশ্বাস সবই উঠে আসে তাঁর এই চাবি
খোঁজার উছিলায়। কিন্তু যে ঘরে ঢোকার জন্য এত চেষ্টা ও আয়োজন, কী
এমন আছে ওই ঘরে, কী এমন গুরুত্ব তার?
কী আছে ঐ ঘরে? আছে আমার সর্বস্ব, আমার সারা জীবনের সাধনা; কতো
সমাপ্ত অসমাপ্ত ছবি, কতো ভাবনা আর স্মৃতি, কতো গুঞ্জরণ। ছেলেবেলা
থেকে আমার সাধ ছিলো, আমার নিজের একটি ঘর হবে, সেখানে আমি আমার
ভাবনা নিয়ে স্বপ্ন নিয়ে, অসম্ভব নিয়ে কাটাতে পারবো। আর বড়ো হয়ে যখন
দেখলাম; আমরা কেউই ঠিক পরস্পরের নই, যখন আরো-একলা গহন-একলা হয়ে
উঠলাম, তখন তো ওই ঘরই হয়ে উঠলো প্রিয়তম। তাইতো ঐ ঘরকে ফিরে পেতে
চাই।
বলাবাহুল্য ওই স্বপ্নঘরের চাবিটি এই বর্ণনার পর আর আক্ষরিক চাবি
হয়ে থাকে না, পরিণত হয় মোহন প্রতীকে, আর ওই ঘরের প্রবেশের
চেষ্টাটিও আর আক্ষরিক অর্থে ঘরে ঢোকার ব্যাপার হয়ে থাকে না বরং তার
চিরকালীর স্বপ্নের কাছে, প্রত্যাশার কাছে, আশ্রয়-ভালোবাসা ও
নির্ভরতার কাছে, প্রবল নিঃসঙ্গতায় একটুখানি স্বস্তি পাবার মতো
বিষয়ের কাছে পেঁৗছবার চেষ্টায় পরিণত হয়। অধ্যাপক সাহেব কারো কাছেই
চাবিটি খুঁজে পান না, বরং মুখোমুখি হন নানাবিধ বিরূপ অভিজ্ঞতার-তবে
কি কেউ-ই সন্ধান দিতে পারে না সেই মোহন চাবির যা দিয়ে আমরা আমাদের
স্বপ্নলোকে প্রবেশ করতে পারবো? তবে কি এই খুঁজে বেড়াবার বাঁকে
বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকবে কেবলই সন্দেহ অবিশ্বাস, জটিলতা, কূটিলতা?
গল্পের শেষে আমরা দেখি অধ্যাপক অবশেষে এসে পৌছেছেন পতিতাদের ঘরে,
বলাবাহুল্য চাবি এখানেও নেই, তবে এই মেয়েরা গল্পটিকে একটি নতুন
মাত্রা এনে দেয়। তারা তার মনোরঞ্জনের চেষ্টা করছিলো, কিন্তু তার
আগ্রহ ছিলো না বলে তিনি যখন ফেরার পথ ধরলেন, তখন-
মেয়েরা বললো, যাচ্ছেন তাহলে? আমি উত্তর দেবার আগেই আরেকটি মেয়ে
বললো, উনি তো চাবি খুঁজতে এসেছিলেন, যান, আপনার যখন চাবি নেই, তখন
এখানে থেকে কি করবেন? চাবি পেলে আসবেন, এখানে কয়েকটি দরজা-বন্ধ-করা
ঘর আছে। আমরাও যে চাবি খুঁজছি গো...ওরা হাসছিলো, আমি ওদের জন্য মনে
মনে কাঁদছিলাম। ওরা খিলখিল করে হাসছিলো, চাবি খুঁজছিগো মহারাজ। আমি
মনে মনে হু হু করে কাঁদছিলাম চাবি খুঁজছি গো মহারাজ।
সারা গল্প জুড়ে কোনো চরিত্রই অধ্যাপকের চাবি খোঁজার মর্মার্থ ধরতে
পারেনি, পেরেছে এই মেয়েগুলো, এবং বিষয়টিকে তারা আরো তীব্রভাবে
ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছে, কারণ কারণ তাদেরও আছে 'কয়েকটি
দরোজা-বন্ধ-করা ঘর' এবং তারাও খুঁজছে সেই মোহন চাবি। যেন আমাদের,
এই সুবেশী নাগরিকদের চেয়ে তাদের বোধ অনেক তীব্র কারণ তারা অন্তত
জানে, স্বপ্নলোকের সন্ধান তারা পায়নি, আর আমরা-তীব্র গতানুগতিকতায়
আচ্ছন্ন, এই নাগরিক মানুষরা-তাও জানিনা। চাবি খুঁজছি গো মহারাজ এই
তীব্র আকুলতা ও হাহাকার তাই মানুষের সমস্ত না পাওয়াকে মূর্ত করে
তোলে। গল্পের সেই অধ্যাপক শেষ পর্যন্ত চাবি খুঁজে পাননি-'আমি নিজের
ঘরের বাইরে নির্বাসিত ও প্রবাসী থেকে এখনো দিনরাত সেই পুরনো ঘরের
চাবি সন্ধান করে যাবো-এই আমার নিয়তি।'-এবং আর কোনোদিনই তাঁর ফেরা
হয়নি কাঙ্খিত স্বপ্নলোক।
জীবন হয়তো এমনই। স্বপ্নের পৃথিবী থেকে, প্রত্যাশা ও স্বপ্নপূরণ
থেকে আমাদের অবস্থান বহুদূরে রয়ে যায় আজীবন। তবু কী এক ঘোরে আমাদের
দিন কেটে যায়। আমরা বেঁচে থাকি; কারণ আমরা বেঁচে থাকতে চাই। জীবনের
চারপাশে এতসব নেতিবাচকতা, এতসব যুদ্ধ-দ্বেষ-হিংসা ও হানাহানি, এতসব
সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা, এতসব মৃতু্য ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, তবু
সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে আমাদের বেঁচে থাকার আয়োজন। হয়তো এজন্যই অস্তিত্ব
অন্যত্র গল্পের মন্টু তার অতিপ্রিয় পিতামহের মৃতু্যকে পাশে রেখে
মেতে উঠেছে জীবন ভাবনায়। মন্টু তার গল্প লেখা নিয়ে, তার
সাহিত্যভাবনা নিয়ে একটি নিজস্ব পৃথিবীর মধ্যে ডুবে আছে। সামাজিক
বিচ্ছিন্নতা তার চিরসঙ্গী, স্বভাবে অস্বাভাবিক, এমনকি প্রেমের
জন্যও সে নিজস্ব স্বভাবের বাইরে যেতে পারে না। গল্পের প্রথম দিকেই
আমরা মন্টুকে দেখতে পাই তার পিতামহের মৃতু্যজনিত কারণে তাঁর
স্মৃতিবাহিত ভাবনা ও বর্তমানের প্রাসঙ্গিক শোকসহ। কিন্তু পরবতর্ী
অনুচ্ছেদই আমাদের চমকে দেয়, কারণ এবারের ভাবনার বিষয় তার পিতামহ
নয়, বরং তার সাহিত্যভাবনা, এমনকি প্রেম বিষয়ক ভাবনাও তাকে এলোমেলো
করে দেয়। এভাবে গল্পের একটি অনুচ্ছেদ চিত্রিত হয় লোকটির মৃতু্যজনিত
প্রতিক্রিয়া, স্মৃতিচারণ, শোক ও বিলাপের চিত্র, পরবতর্ী অনুচ্ছেদে
মণ্টুর স্মৃতিচারণ-তার দাদাকে নিয়ে যা খুব ঘনিষ্ঠভাবে
জীবনসংশ্লিষ্ট, তার সাহিত্যভাবনা ও প্রেমচিন্তা। গল্প এগিয়ে যায়,
আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি ধীরে ধীরে ওই ভাবনাগুলো আর অনুচ্ছেদ
মানছে না বরং মৃতু্য ও জীবন ও প্রেম ও সাফল্য ও ব্যর্থতা ও
পরশ্রীকাতরতা ও ভালোলাগা ও জীবন-তৃষ্ণা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে
যাচ্ছে। যেন এসবের কোনোকিছুই আর বিচ্ছিন্ন নয়, জীবন ও মৃতু্য এখানে
একাকার হয়ে গেছে-
রাতে এক ফোঁটা চোখ বোজেনি মন্টু, সারাদিন ধকল গেছে, বিকেলে
মণ্টুর প্রথম গল্পগ্রন্থের ওপর আলোচনা সভা। দাদাকে নামিয়ে দেওয়া
হলো কবরে, আব্বা বলছেন, 'সবার দিতে হয় নিজের হাতে একটু মাটি ছিটিয়ে
দে-' ঝুরঝুর করে মুঠো গলে মাটি ঝরে পড়ে মৃত প্রেমের ওপর, একজন
আলোচক বলছেন, 'এই বই-এ যে-ধরনের গল্প আছে তা প্রচলিত গল্প ধারণাকে
বদলে দ্যায়। এগুলোও গল্প, কিন্তু এক নতুন নিয়মে... 'জোরে মাটি
ছুঁড়ে দিতে পারে না মন্টু,...দরোজা খুলে যায়, বিবির মা 'দাঁড়াও
ডেকে দিচ্ছি' বলে ভেতরে চলে যান, চোখ বুজে আসতে চায় আমার, জোর করে
চোখের পাতা টেনে ধরে রাকি, ক্লান্ত কিন্তু ভেতরটা আমার ক্লান্তিহীন
জেগে আছে, প্রতিটি সেকেন্ডে আমার স্নায়ুর ভিতর অতিক্রম করে যায়,
পায়ের শব্দ, শাড়ির খসখস, পর্দা সরে যায় 'বিবি আমি এসেছি।
তীব্র জীববোধ সমৃদ্ধ এই অসাধারণ গল্পটি আমাদের জানিয়ে দেয়-মৃত্যু
তা সে যত প্রিয়জনেরই হোক না কেন তা পরিশেষে আমাদের জীবন-তৃষ্ণাকেই
তীব্রতর করে তোলে। আমরা তো জানি, আমাদেরই চারপাশে প্রিয়জনের
মৃতু্যজনিত শোক সত্ত্বেও চলে জীবনের আয়োজন, মৃতের স্বজন তার লাশ
ঘরে রেখে একটু আড়াল খোঁজে, সুযোগ খোঁজে হেসে ওঠার, ভিন্ন বাড়ি থেকে
রান্না করা খাবার আসে, পিতার লাশ পাশে রেখে সন্তান সেই খাদ্য গ্রহণ
করে, একটি প্রিয় মুখ চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্মৃত হতে হয় শোক ও
বিলাপ, জেগে ওঠে ভালোবাসা ও প্রেম-এ সবই এক প্রবল জীবন-তৃষ্ণার
কারণে ঘটে যায়।
আর এজন্যই সব কিছুর পরও মানব-জীবনে জীবন-তৃষ্ণা একটি ধ্রুবতারার
মতো জ্বলতে থাকে। সব কিছুর চেয়ে বড় হয়ে ওঠে জীবন এবং বেঁচে থাকা।
অধঃপতন গল্পে আমরা এই সত্যের চিত্রায়ণ দেখতে পাই। গল্পের তরুণ
'ছোকরা' অধ্যাপক যখন তার চিকিৎসকের কাছে জানতে পারে এই সংবাদ যে
তার মৃতু্য নিকটর্তী, আমরা দেখি-কী এক তীব্র অভিমানে সে বদলে ফেলছে
তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। যে ছিলো লাজুক, গভীর আত্মমগ্ন ভাবুক ও
সর্বক্ষণিক চিন্তাবিদের মতো চুপচাপ; সে তার আসন্ন মৃতু্যর সংবাদটি
শুনে প্রথমত সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমায়। উল্টোপাল্টা অর্থহীন ও
বিচ্ছিন্ন স্বপ্ন দ্যাখে-যেন স্থবির হয়ে গেছে। অতঃপর জীবনকে যেন
নতুনভাবে নির্মাণ করতে চায় সে-বাইরে বেরুবার সময় চাকরানিকে দেখে
চোখ টেপে-এই প্রথম; বাইরে বেরিয়ে পথ দিয়ে চলার সময় চোখ তুলে
বিভিন্ন বাড়ির মেয়েদের দ্যাখার চেষ্টা করে; যদিও তার এই সুনাম আছে
যে সে কখনো চোখ তুলে তাকায়না, শীষ বাজাবার ব্যর্থ চেষ্টা
করে_ব্যর্থ, কারণ এটাও প্রথম চেষ্টা, সিনেমা হলে গিয়ে রগরগে সিনেমা
দ্যাখে, 'উল্লোল নায়িকা-কর্তৃক প্রবল নিতম্ব-আন্দোলন' দেখে
অন্যান্যের মতো সেও চিৎকার-শিৎকার ইত্যাদিতে মেতে উঠতে চায়। অতঃপর
এবার আরেকটু এগিয়ে যায় জীবনের পথে_ নিশিকন্যার সঙ্গে গিয়ে তার
শরীরের স্বাদ গ্রহণ করে, বলাবাহুল্য, এটাও প্রথম আর অবশেষে মদ খেয়ে
নিজেকে ভাসিয়ে দেয় অচেনা-অদেখা নেশাময় সাগরে-
বমির মধ্যে শুয়ে উচ্চারণ করে করে নিজেকে শুনিয়ে সে বলতে লাগলো,
'আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে অদ্ভুত পার্থিব জীবনের আর এক মুহূর্ত নষ্ট
না করে এইভাবে আগামী বৎসরখানেক অর্থাৎ যতদিন আমি বাঁচি ততদিনের
মধ্যে এতকাল-সঞ্চিত সম্ভ্রান্তির ভ্রান্তিময় সম্পদ সকল হারিয়ে
ফেলার চেষ্টা করবো।
কেন এই চেষ্টা? কার ওপর, কেন এই অভিমান? এই গভীর অভিমান কি তার
প্রবল জীবনতৃষ্ণা থেকে উৎসাহিত নয়? এতকাল সে একটি আদর্শিক জীবন
যাপন করেছে, মূল্যবোধ দিয়ে গড়তে চেয়েছে জীবনের সৌধ, মৃতু্য তাকে
সময় দেয়নি। অথচ সে জানে সব কিছুর চেয়ে বড়, মহৎ ও সুন্দর এই জীবন ও
বেঁচে থাকা-
অন্য মনে বসে ছিলো সে_এইসব আলো-প্রেম-নীলিমা ছেড়ে চলে যাবে কোনো
নামহীন, তৃপ্তিহীন পরোক্ষে, চৈতন্যে তার নিবিড় ঘণ্টা বাজছে, হাওয়ায়
ছেড়ে-দেওয়া সন্তানকে রক্তের শিকড়গুচ্ছ ধরে অবিরাম ডাক দিচ্ছে কারাঃ
কি অতীন্দ্রিয় দুঃখ-মূর্তি ফলে উঠছে, চরাচরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে
তারই শতদল বেদনা, একমাত্র তার কেননা এইসব আলো-প্রেম-নীলিমার ভিতরে
সুখে-দুঃখে জড়িত কত মানুষ_হায়, ওরা জানে না সমস্ত সুখের চেয়ে জীবন
বড়ো, সমস্ত দুঃখের চেয়ে জীবন বড়ো-ওদের উপরে কত আসন্ন বৎসরের ধারা,
কত সুখ-দুঃখ, ওদের দুঃখকেও হিংসা লাগে, কেননা সব দুঃখই শেষ-পর্যন্ত
গভীরতম সুখের শিহরণ, ওরা গাধা, ওরা মুর্খ, ওরা না-বুঝে অনর্থক
দুঃখের কষ্টে অভিভূত, তবু একজন মৃত রাজার চেয়ে একটা জ্যান্ত গাধার
জীবন কত বড়ো, তাদের উপরে আসন্ন বৎসরের ধারা, শুধু সে ফুরিয়ে গেলো,
এতো তাড়াতাড়ি, যেন এক মুহূর্তের মতো চলে গেলো এক জীবন।
এই ভাবনা, এই তৃষ্ণা, এই চোখ-ভিজে-ওঠা জীবনবোধ, বেঁচে থাকার এই
গভীর-তীব্র আকুতিই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে আর আয়োজন ও উৎসবে ও আনন্দে
ও গৌরবে ভরিয়ে রাখে মানবজীবন।
উপসংহারের পরিবর্তে
জীবনের এই বোধ, অন্তর্লোক নির্মাণ আর শিল্পের দায় আবদুল মান্নান
সৈয়দকে পরিণত করেছে একজন সফল কথাশিল্পীতে। তাঁর গল্পগুলো সম্বন্ধে
কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পেঁৗছানো তাই খুবই দুরুহ। তবু
ব্যক্তিগত কিছু উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করা যায়।
তাঁর গল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং আকর্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে তাঁর
কাব্যিক সুষমামণ্ডিত গদ্যভাষা। প্রায় অচেনা ও অপ্রচলিত শব্দসমুহের,
উপমা-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্পের বহুবিচিত্র ব্যবহার তাঁ গদ্যভাষাকে
আরো মধুর ও মোহনীয় করে তোলে, গল্পের পরিবেশ ও চরিত্রের আকর্ষণ
বহুমাত্রায় বাড়িয়ে দেয়। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। সুন্দর অবদমন গল্পের
'নায়িকা' কুলসুম সম্বন্ধে কয়েকটি বাক্য-কুলসুমের এই প্রশ্ন যেন
একটা সি্নগ্ধ চাবুকের মতো এসে পড়লো আমার উপরে অথবা খিলখিল ক\'রে
হেসে উঠলো কুলসুম। আমি মাথার ওপর দেখলাম নিসর্গ প্রকৃতি ভেদ ক\'রে
ইলেকট্রিক তার চলে গেছে।... অথবা কুলসুম বৈকালিক বাতাসে শুকনো পাতা
খ\'শে পড়ার মতন আস্তে করে যেন স্বগতেক্তির মতন বললো... কিংবা
পাশাপাশি কুলসুম আর আমি হেঁটে চলেছি। আমার বুকের মধ্যে অজর্ুন
গাছের পাগল ছায়ারা চলাফেরা করে বেড়ায়।... কিংবা ওর আর আকাশের
নীরবতার মধ্যে পুস্পিত হয়ে আছে রাধা-চুড়ার হলুদ মঞ্জুরী,
কৃষ্ণচূড়ার লালে লাল প্রকাশ। ওর না-বলা কথারা সুরমা ব্রিজকে ঘিরে
এক হাজার পায়রা হয়ে ঘুমিয়ে আছে।... অথবা কুলসুম নাম্নী আমার
অনন্ত-আনন্দ, অনন্ত-বেদনা.. কিংবা একমুষ্ঠি রাতুল পায়ের
পাতা-ইত্যাদি।
আবদুল মান্নান সৈয়দের গল্পের প্রতীকময়তাও লক্ষ্য করবার মতো।
প্রতীকময়তার জন্য তাঁর গল্পগুলোর একমাত্রিক ব্যাখ্যা করা বিপদজনক _
চাবি, রাস্তা, অস্তিত্ব অন্যত্র, মাছ প্রভৃতি গল্প বহুমাত্রিক
ব্যখ্যার দাবি রাখে।
একটি উল্লেখ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে এই লেখায় খুব বেশি কথা বলা
হয়নি, সেটা হলো-গল্পের প্রকরণ বা নির্মাণ-শৈলী। দৃষ্টি আকর্ষণ করার
মতো উল্লেখযোগ্য নির্মাণ-শৈলী তার গল্পগুলোতে ছড়িয়ে আছে, আর এই
একটি বিষয়ে তিনি এখনও তরুণ লেখকদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছেন।
অস্তিত্ব অন্যত্র গল্পে তিনি স্বপ্ন-বাস্তবতা ও কল্পনাকে মিলিয়ে
মিশিয়ে একাকার করে ফেলেছেন। যাত্রা গল্পে আমরা দেখি ১, ২, ৩, ...
এভাবে ১০০ পর্যন্ত, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করে তিনি নির্মাণ
করছেন একটি ফেরি-স্টিমার আরোহীদের কার্যকলাপ যা পরিশেষে মানব
জীবনের একটি সম্পূণৃ চিত্র হয়ে উঠেছে। হোসেন মিয়ার সঙ্গে গল্পে
তিনি 'পদ্মা নদীর মাঝি' উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে পূণনির্মাণ করেছেন,
আবার জীবনানন্দ দাশের একটি অপ্রকাশিত গল্প পড়ে বুঝে ওঠাই কঠিন হয়ে
পড়ে যে, এটি কোনো সত্যি ঘটনা নয়, গল্প মাত্র। একই কথা বলা যায়
নারীর হৃদয় প্রেম গৃহ অর্থ কীর্তি সচ্ছলতা গল্পটি সম্বন্ধেও। আবদুল
হাফিজ : জীবন ও সাহিত্য গল্পে আবদুল হাফিজের বেদনা-যন্ত্রণা ও
গ্লানির প্রকাশ ঘটাবার জন্য তিনি যে কৌশল ব্যবহার করেছেন তা
সত্যিই অভিনব। রাজা, আম্র কাননে প্রভৃতি গল্পের ভাষাভঙ্গিই পাঠককে
বলে দেয় _ এগুলো একালের 'গল্প' নয়, অথচ প্রাচীনকালের এইসব কাহিনীতে
যে সত্য প্রতিভাত তা সমকালের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য, আবহমান
সত্যের প্রকাশ তিনি এভাবেই ঘটান গল্পে।
আর এই সবকিছু নিয়েই আবদুল মান্নান সৈয়দ হয়ে ওঠেন এক গুরুত্বপূর্ণ
গল্পকার, যাঁর গল্প ছাড়া আমাদের গল্পসাহিত্যের আলোচনা পূর্ণতা পায়
না। r />
আহমাদ মোস্তফা কামাল
জানুয়ারি ২০০৭
|
| |
 |
|