দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ইউরোপসহ পশ্চিমা
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষ যখন দাঁড়ালো এক চূড়ান্ত অবক্ষয়ের
সামনে, চারিদিকে ধ্বংসযজ্ঞ, মানবতার নির্মম পদদলন, মূল্যবোধ বলতে
বা আশাবাদী হবার মতো কোথাও আর কিছুই নেই, বেঁচে থাকাটাই যখন এক
বেদনাদায়ক, ক্লান্তিকর, গ্লানিময় অভিজ্ঞতা আর অস্তিত্ব যখন হয়ে
উঠছে এক ভীষণ অর্থহীন বিষয় তখন অস্তিত্ববাদী দর্শনের ব্যাপক
বিস্তার লাভের সঙ্গে সঙ্গে নাট্যসাহিত্যে এলো এক নতুন ফর্ম, যা
পরবর্তীকালে পরিচিতি পেলো অ্যাবসার্ড নাটক হিসেবে। নাটকের এই ফর্ম
বদলের বিষয়টি, বলাইবাহুল্য, নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রাচীনকাল থেকে
নাটক ছিলো প্রধানত রোমান্টিক ভাবালুতায় আচ্ছন্ন _ উনিশ শতকের
মাঝামাঝি এসে সেই ফর্ম ভেঙে পড়ে (তৈরি হয় নতুন ফর্ম, আর এই
পরিবর্তন চলেছে পরবর্তী একশ' বছর ধরে দ্রুততার সঙ্গে)_ সাধারণ
মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন রোমান্টিক নাটকের পাত্রপাত্রীরা পরিবর্তিত
বিশ্ব-সময়ের দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হতে থাকে।
প্রয়োজন হয় নতুন ধরনের নাটকের যা একান্তভাবেই সাধারণ মানুষের কথা
বলবে, দর্শকরা যার সঙ্গে গভীরভাবে একাত্ন বোধ করবে। এই ধারণা থেকেই
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রিয়্যালিস্টিক বা বাস্তবাদী ধারার সূচনা
ঘটে। ১৮৮০ সালে ফরাসী নাট্যকার এমিল জোলা অনেকটা আনুষ্ঠানিকভাবেই
এই নতুন ধারার ঘোষনা দেন, যদিও এর চর্চা চলে আসছিলো আরও কিছুকাল
আগে থেকেই। এ ধারায় এরপর হেনরিখ ইবসেন, নিকোলাই গোগোল, আন্তন চেখভ,
বার্নাড শ, গেরহার্ট হফম্যান, স্ট্রিনবার্গ, ইউজিন ও'নীল, আর্থার
মিলার প্রমুখ অমর সব নাটক রচনা করেন।
রিয়্যালিস্টিক ধারার স্বর্ণসময়েই দেখা গেলো _ মানুষকে এই ধরনের
নাটক দিয়ে পুরোপুরি উপস্থাপন করা যায় না। মানুষের রহস্যময়
অন্তর্জগৎ চিত্রায়নে এই ধরনের নাটকে সাফল্য আসেনি তেমন, বরং এগুলো
ব্যস্ত ছিলো মানব জীবনের বাহ্যিক বাস্তবতা ও সংগ্রাম চিত্রায়নের
চেষ্টায়। মানুষের অন্তর্চেতনা নির্মাণে তাই এলো নতুন ধারার নাটক_
যা পরিচিতি লাভ করলো এক্সপ্রেশনিস্ট ধারা হিসেবে। এসব নাটকে বাস্তব
জীবন ও পরিবেশের অভিঘাতে মানুষের অন্তর্লোকে যে বহুমাত্রিক
প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় সেগুলো চিত্রিত করার চেষ্টা করা হলো।
নাটকের এই মোড় পরিবর্তনে স্ট্রিনবার্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করলেন। এ ছাড়াও ইউজিন ও'নীল, এলমার রাইস, গিয়গ কাইজার, আর্নস্ট
টলার, ওয়েভেকিল্ড, লুইজি পিরেনদেল্লো, মায়াভস্কি, জিরদু, গার্থিয়া
লোরকা প্রমুখের হাতে সৃষ্টি হলো এ ধারার সাড়া জাগানো সব নাটক।
এক্সপ্রেশনিজমের পর নাট্যসাহিত্যে সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের
ঢেউ এসে লাগে_ মানব মনের অবচেতন কার্যকলাপই ছিলো এসব নাটকের
উপজীব্য। স্বাভাবিকতা বা যুক্তির বিন্যাস তেমন নেই এসব নাটকে, যেমন
থাকে না অবচেতন মনের ভাবনা ও কল্পনায়। অবশ্য এই ধারাটি ততোটা
শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি, তবে জঁ কঁকতো, জঁ জিরদু, জঁ আনুঈর
নাটকগুলো ছিলো উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাটকে
আসে অস্তিত্ববাদী ধারা _ ওই সময়টিও ছিলো সব অর্থেই অস্তিত্ববাদের।
জাঁ পল সার্ত্র, আলবেয়ার কামু্য, জঁ জিরদু, জঁ আনুঈ এ ধারার
উল্লেখযোগ্য নাট্যকার। আর এরপরেই আসে অ্যাবসার্ড ধারা, আমরা এই
ধারাটি সম্বন্ধে এই রচনায় একটু বিস্তৃত আলোচনা করতে চাই।
অ্যাবসার্ডিটি, অ্যাবসার্ড নাটক
অ্যাবসার্ড শব্দটির আভিধানিক অর্থ উদ্ভট, হাস্যকর, অসম্ভব,
অবিশ্বাস্য, অযৌক্তিক ইত্যাদি, তবে এগুলো একেবারে নির্ভুল
প্রতিশব্দ নয় বলে আমরা অ্যাবসার্ড শব্দটিই ব্যবহার করবো। আলবেয়ার
কামু্য ১৯৪২ সালে প্রকাশিত তাঁর মীথ অব সিসিফাস গ্রন্থে প্রথম এই
অভিধাটি ব্যবহার করলেও নাটকের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে এর ব্যবহার শুরু
হয় প্রখ্যাত নাট্য সমালোচক মার্টিন এসলিনের থিয়েটার অব দ্য
অ্যাবসার্ড (১৯৬১) বেরুনোর পর। অ্যাবসার্ডটি সম্বন্ধে কামু্যর
বক্তব্য_ 'মানুষের সঙ্গে তার জীবনের আর জীবনের সঙ্গে তার
পরিপাশ্বর্ের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিই অ্যাবসার্ডটি' অথবা 'মানুষের
আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-ভালোবাসা, চেষ্টা-চরিত্র এবং অর্থহীন
পৃথিবী_ যে অর্থহীনতার মধ্যে তাকে ঠেলে দেয়া হয়_ এ দুয়ের ব্যবধান
থেকেই অ্যাবসার্ডটির জন্ম নেয়।' সার্ত্র বলছেন_ 'পৃথিবীতে কোনো
সর্বজনীন নৈতিক মূল্যবোধ নেই। মানুষ মূলত একটি উদ্দেশ্যহীন পৃথিবীর
মধ্যে পতিত যা পরিনামে তার অস্তিত্বকেই অর্থহীন করে তোলে, আর এ
থেকেই অ্যাবসার্ডটির জন্ম।'
অ্যাবসার্ড নাটক সম্বন্ধে জন রাসেল টেইলরের মতামত_ 'অ্যাবসার্ড
নাটক বলতে ১৯৫০ দশকের কতিপয় নাট্যকারের নাটককে বোঝায় যারা বিশ্বে
মানুষের অবস্থান ও অস্তি্বত্বের সংকট বিষয়ে মোটামুটি একই
দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিপাশ্বর্ের সঙ্গে মানুষের
সঙ্গতিহীন অবস্থান এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তার অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন
সংকটজনক পরিস্থিতিকে তুলে ধরে। আমাদের সকল কর্মে এই উদ্দেশ্যহীনতার
অনুভূতি একটি অন্তর্গত যন্ত্রণার জন্ম দেয় যা অ্যাবসার্ড
নাট্যকারদের মূল বিষয়বস্তু, বিশেষ করে স্যামুয়েল বেকেট, ইউজিন
ইয়োনেস্কো, আর্থার অ্যাডামোভ, জাঁ জেঁনে ও হ্যারল্ড পিন্টারের
ক্ষেত্রে' (জন রাসেল টেইলর/ পেঙ্গুইন ডিকশনারী অব থিয়েটার)।
আর্ভিং ওয়ার্ডল তাঁর নিউ ইংলিশ ড্রামাটিস্ট গ্রন্থে লিখেছেন_
'অ্যাবসার্ড নাটকের বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো বহির্বিশ্বের জায়গায় একটি
অন্তর-ল্যান্ডস্কেপ নির্মাণ; স্বপ্ন, কল্পনা এবং বাস্তবের মধ্যে
সুস্পষ্ট সীমারেখার অবলুপ্তি; সময় সম্পর্কে মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি_
নিজস্ব প্রয়োজনের তাগিদে যাকে ইচ্ছেমতো সমপ্রসারিত ও সংকুচিত করা
যায়; একটা অস্পষ্ট তরল পরিমণ্ডল যা দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপক প্রতীকের
মাধ্যমে মানসিক অবস্থাকে তুলে ধরতে সক্ষম এবং বাস্তব জীবনের
অভিজ্ঞতার চরম অর্থহীন ডামাডোলের বিরুদ্ধে লেখকের একমাত্র রক্ষাকবচ
হিসেবে ভাষা ও আঙ্গিকের লৌহ-কঠিন অভ্রান্ততা।'
বেকেটের ওয়েটিং ফর গডো'র বাংলা অনুবাদক অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর একটি
চমৎকার বিশ্লেষণও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে_ 'অনেকের জন্য
আজকের পৃথিবীর কোনো কেন্দ্রীয় সর্বাত্নক ব্যাখ্যা বা অর্থ নেই,
কোথাও কোনো নিশ্চয়তা নেই, বিশ্বাসের কোনো দৃঢ় অনড় ভিত্তিভূমি নেই।
এই পরিস্থিতিতে যে আর্টফর্ম পুরনো বিশ্বাসের নীতিমালাকে আশ্রয় করে
গড়ে উঠেছিলো কতিপয় সাহিত্যকর্মী আর তাকে মেনে নিতে পারেন না, তাই
তাদের অনুসন্ধান করতে হয়, নির্মাণ করতে হয় নতুন আর্টফর্ম। তার
মধ্যে দিয়ে এই শিল্পীরা চেষ্টা করেন হতাশাগ্রস্থ, বিভ্রান্ত,
বিপর্যস্ত আধুনিক মানুষের চিত্তে বিশ্ব সম্পর্কে হারিয়ে যাওয়া আদিম
বিস্ময় ও রহস্যের মনোভাব পুনর্জাগ্রত করতে। তারা চান, যে জীবন
গতানুগতিকতায়, বস্তুর চাপে, অভ্যাসের দাসত্বে বিবর্ণ, মলিন ও
অর্থহীন হয়ে গেছে, সেই জীবনে তীব্র বেদনাবোধ সঞ্চারিত করে তাকে
প্রবলভাবে নাড়া দিতে। ... এঁরা নাটকের ভুবনে বিষয়বস্তু এবং প্রকরণ
উভয়ক্ষেত্রে তাদের চিন্তা ও ভাবধারাকে অকুণ্ঠ স্বাধীনতা দেন,
কোনোরকম যৌক্তিক পারম্পর্যের ধার ধারেন না, তার বদলে জীবন আমাদের
নিয়ত যে অর্থহীন, যুক্তিহীন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায় তাকে
সরাসরি মঞ্চে তুলে নিয়ে আসেন। ... আমরা এইসব নাটকে অভ্যাসে জীর্ণ,
তুচ্ছ, বিবর্ণ, গতানুগতিক সমাজের ব্যঙ্গচিত্র পাই।...সমাজ সচেতন
সমালোচনাধর্মী ব্যঙ্গাত্নক সুরের সঙ্গে এইসব নাটকে মিশে আছে উদ্ভট
রঙ্গরস ও তীব্র কৌতুক। ... সকল নিশ্চয়তার অবলুপ্তিতে, যাবতীয়
ধর্মবিশ্বাসের বিসর্জনে, মানুষের বিপর্যস্ত অবস্থায় একটি সামগ্রিক
শূন্যতার মধ্যে এই নাটক মানব সত্ত্বাকে তার চূড়ান্ত বাস্তবতার
মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চায়। এখানে সকল মূল্যবোধ অন্তর্হিত,
সামাজিক অবস্থান বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত লুপ্ত, আঁকড়ে ধরবার মতো
কিছুই নেই। এই পরিস্থিতিতে নগ্ন ও চূড়ান্ত বাস্তবতার সামনে মানুষ
উপস্থাপিত তার যন্ত্রণা নিয়ে, তার হতাশা, নৈরাশ্য, বিদ্রোহ,
আত্নসমর্পণ নিয়ে, তার ফ্যান্টাসি নিয়ে।... অ্যাবসার্ড নাটকে
ভঙ্গিটি যতই উদ্ভট হোক, হাস্য-কৌতুকরসসমৃদ্ধ হোক, জীবনের কতিপয়
মৌল সমস্যা এতে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন জীবন-মৃতু্যর প্রশ্ন,
একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা, শূন্যতা, ভাষার সাহায্যে সংযোগ স্থাপনের
দুরূহতা, বস্তুর ভিড়ে জীবনের বিপর্যস্ত পরিস্থিতি, জীবন থেকে সকল
রহস্য ও মর্যাদাবোধের অন্তর্ধান প্রভৃতি। উপরোক্ত কোনো কোনো বিষয়
প্রাচীন গ্রীক নাটকে এবং বিশ্বের কতিপয় শ্রেষ্ঠ নাটকে পরিবেশিত
হয়েছে একথা সত্য, কিন্তু সেসব নাটকে নাট্যকারের পটভূমিতে ছিলো
সার্বজনীনভাবে গৃহীত কিছু মৌলিক বিশ্বাস, আস্তিক্য-বুদ্ধি
প্রণোদিত কিছু ইতিবাচক প্রেরণাদায়ী রিচু্যয়ালে অবিচল আস্থা যা সব
বিপর্যয় ও সংকটের মুহূর্তেও জীবনের কোষে কোষে একধরনের সঞ্জীবনী
সুধারস সঞ্চারিত করতো। আজ আর তা তাঁদের সামনে নেই। তার জায়গায় আছে
অনাস্থা, অনিশ্চয়তা, ভীতি ও আতঙ্ক, একটা সর্বগ্রাসী শূন্যতার
অনুভূতি। ... অ্যাবসার্ড নাটকের লক্ষ্য দর্শক-পাঠকের মনের গভীরতম
স্তরে গিয়ে আঘাত হানা, তার চিত্তে যে আতঙ্ক, যে নৈরাশ্য, যে
শূন্যতাবোধ, যে অবদমিত
ভালোবাসা-ঘৃণা-লোভ-আশা-আকাঙ্ক্ষা-লালসা-উদ্বেগ আছে তা তুলে আনা,
মুক্ত করা, চারপাশের ক্ষয়িষ্ণুতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে, চূড়ান্ত
বাস্তবতার সত্যকে উপলব্ধি করার পর, প্রত্যেক পাঠক-দর্শককে তার
নিজের মতো করে নতুন সংহতি গড়ার প্রেরণা জোগানো। এই দৃষ্টিকোণ থেকে
অ্যাবসার্ড নাটক মোটেই নেতিবাচক বা নৈরাশ্যবাদী বা দুঃখবাদী নয়'
(কবীর চৌধুরী/অ্যাবসার্ড নাটক)।
কবীর চৌধুরীর শেষ কয়েকটি বাক্যের সঙ্গে হয়তো অনেকেই একমত হবেন না।
কারণ, পাঠক-দর্শক এসব নাটকের সংস্পর্শে এসে চূড়ান্ত বাস্তবতা আর
নিজের অর্থহীন অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার সকল মিথ্যে আনন্দ
হারিয়ে গভীর বিষণ্নতার সমুদ্রে পতিত হয় এবং তার নিজের দৃশ্যমান
অবস্থান, পরিবেশ ও পারিপাশ্বর্িকতা ভুলে যায়। অ্যাবসার্ড নাটক মূলত
পাঠক-দর্শককে ভিন্ন এক জগতে পরিভ্রমণ করায়। প্রতিটি অ্যাবসার্ড
নাটক, তার প্রেক্ষিত ও চরিত্রাবলী বিচিত্র ও অদ্ভুত। নাটকের
পটভূমি, স্থান, কাল, পাত্র সবই অতিশয় রহস্যময়, একইসঙ্গে পরিচিত ও
অচেনা, এখানে সময় থেমে যায়, কথা ফুরিয়ে যায়, চরিত্রগুলো বারবার একই
শব্দ-বাক্য উচ্চারণ করে, কিন্তু যত কথাই বলুক পরস্পরের কাছে তারা
অচেনা ও দুর্বোধ্যই রয়ে যায়। এসব নাটকে কিছুই ঘটেনা, চরিত্রগুলোর
নির্দিষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় না_ যেন তারা পুরো মানবজাতিরই
প্রতিনিধি_ তাদের কোনো ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি নেই, তাই পাঠক-দর্শক ঐ
চরিত্রগুলোর
ক্লান্তি-হাহাকার-দুঃখকষ্ট-বেদনা-পরাজয়-বিষণ্নতা-বিচ্ছিন্নতা-নিঃসঙ্গতা-বিপণ্নতা-অসহায়ত্ব
ইত্যাদির সঙ্গে নিজেকে একাত্ন করে ফেলে এবং চরম অর্থহীনতার বোধে
নিজেকে জারিত করে নেয়।
স্যামুয়েল বেকেট
অ্যাবসার্ড নাট্যধারার প্রধান পুরোধা, বিশ্ব নাট্যসাহিত্যের অন্যতম
প্রধান পুরুষ স্যামুয়েল বেকেটকে বলা হয় জীবন বিমুখ লেখক। সারাজীবন
ধরে তিনি তার সাহিত্যকর্মে মানব জীবনের অর্থহীনতাকে উপজীব্য করে
মানুষের নিঃসঙ্গতা, জীবনের গতানুগতিকতা, দুঃসহ যন্ত্রণা ও ভার,
জটিল দুর্বোধ্যতা ও অবোধ্যতা, দুঃসহ পৌনপুনিকতা, মানুষের সঙ্গে
মানুষের কার্যকর ও অর্থবহ সংযোগ বা সম্পর্ক স্থাপনে ভাষার
ব্যর্থতা, সর্বোপরি মানব জীবনের
অর্থহীন-বৈশিষ্ট্যহীন-মূল্যহীন-গুরুত্বহীন পরিণতি নিয়ে লিখেছেন
(মৃতু্যই যে জীবনের শেষ পরিণতি, তার আর এমন কী অর্থ আছে, যতই সে
মহান হোক!) বলেই হয়তো তাঁর এমন পরিচিতি। মানুষের যাবতীয় কার্যকলাপ
এমনকি তার ব্যবহৃত ভাষাটিকেও তিনি নিতান্তই অর্থহীন ও ক্লিশে বলে
মনে করতেন, আর এজন্যই তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন এক জটিল, অভিনব এবং
দুর্বোধ্য আঙ্গিক ও ভাষা। তাঁর সৃষ্ট এই ধারাটিই পরে ব্যাপক
বিস্তার লাভ করে এবং অ্যাবসার্ড ধারা হিসেবে পরিচিতি পায়। তাঁকে
অবশ্য আমার কাছে কখনো জীবন-বিমুখ লেখক বলে মনে হয়নি, বরং জীবনের
প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকেই তাঁর এই অর্থহীনতার প্রতি অঙ্গুলি
নির্দেশ এবং জীবনের অনিবার্য পরিণতি মৃতু্যর প্রতি ঘৃণা।
বেকেটের জীবনযাপনও ছিলো অদ্ভুত, খানিকটা খ্যাপাটেও বলা যায়। ১৯০৬
সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল (সঠিক তারিখটি নিয়েও বিতর্ক আছে এবং তিনি
নিজে সেই বিতর্কের অবসান ঘটাননি, নিজে কখনো জন্মদিন পালনও করেননি)
ডাবলিনের কাছে ফক্সরক্স-এ। জাতিগতভাবে তিনি আইরিশ, ভাষাগতভাবে
দ্বিভাষিক_ ফরাসী ও ইংরেজ। মেধাবী ছাত্র বেকেট ১৯২৭ সালে আধুনিক
সাহিত্যে (ফরাসী ও ইতালিয়ান সাহিত্য) ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট হয়ে
ডিস্টিংশন মেডেল জয় করলেন এবং প্যারিসে এসে শিক্ষকতা পেশায় যোগ
দিলেন। এখানেই তাঁর পরিচয় ঘটে আধুনিক ইংরেজি উপন্যাসের অন্যতম
দিকপাল জেমস জয়েসের সঙ্গে আর এই সময়েই লেখালেখি শুরু করেন তিনি।
১৯৩১ সালে ডাবলিনে ফিরে এসে একটি কলেজে ফরাসী ভাষা ও সাহিত্য
বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন বেকেট, কিন্তু সেখানে
বেশিদিন থাকা হলো না তাঁর। ১৯৩২ সালে কলেজ কতৃপক্ষ তাঁকে মানসিক
ভারসাম্যহীনতার অভিযোগে অযোগ্য ঘোষণা করলে তিনি চিকিৎসার জন্য
লন্ডনে আসেন। ১৯৩৭ সালে প্যারিসে ফিরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু
করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফরাসী প্রতিরোধ আন্দোলনে
অংশগ্রহণ করেন এবং গোপন আন্দোলনের সদস্যদের সঙ্গে মিশে এক বিপদজনক
জীবনযাপন বেছে নেন। ১৯৪২ সালে বেকেট গ্রেফতার এড়াতে এক কৃষকের
বাড়িতে এসে মজুর হিসেবে আশ্রয় নেন। এখানেই তিনি রচনা করেন তাঁর
দ্বিতীয় উপন্যাস ওয়াট। এর আগে তার আরও দু-একটি বই বেরুলেও লেখক
হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেননি তিনি তখনো।
মানুষ হিসেবে বেকেট ছিলেন অন্তমর্ুখীন, স্পর্শকাতর, অনুভুতিপ্রবণ,
প্রচার-প্রত্যাশাহীন, নির্জনতাপ্রিয়, বন্ধুকেন্দ্রিক এবং উদার।
সাংবাদিকদের সযত্নে এড়িয়ে চলতেন, নিজের লেখা বা অন্যের লেখা বা
সাহিত্যের কোনোকিছু নিয়ে কাউকে কখনো তিনি কিছু বলেছেন বলে শোনা
যায়নি। নিজের লেখা সম্বন্ধে এতটা চুপ থাকতেও দেখা যায়নি আর কোনো
লেখককে কোনোদিন। তাঁর প্রচার বিমুখতা ছিলো অবাক করার মতো_ এ
প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৬৯ সালে যখন
তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়ার কথা উঠলো তিনি তখন নানান মহলে ধরারধরি
করেছিলেন যেন পুরস্কারটি তাঁকে না দেয়া হয়। পুরস্কার থেকে রেহাই
পেলেন না তিনি, তবে পুরস্কার গ্রহণ করতে হাজিরও হলেন না সুইডিশ
একাডেমিতে। তাঁর মৃতু্যসংবাদও আমাদেরকে তাঁর অদ্ভুত আচরণের কথা মনে
করিয়ে দেয়। ১৯৮৯ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি মারা যাওয়ার চারদিন পর,
যখন তিনি সমাহিত হয়েছেন, ২৬ ডিসেম্বর তাঁর মৃতু্যসংবাদ জনসমক্ষে
প্রচার করা হয়_ কারণ ওরকমই তাঁর ইচ্ছে ছিলো!
স্যামুয়েল বেকেট তাঁর দীর্ঘ ৮৩ বছর জীবনে, যার মধ্যে সাহিত্যজীবন
পঞ্চাশ বছরেরও বেশি, খুব বেশি লেখেননি। সারা জীবনে তিনি
ছোট-বড়-মাঝারি মিলিয়ে সাকুল্যে ডজন খানেক নাটক, আধ ডজন উপন্যাস,
কিছু ছোট গল্প আর নগন্য সংখ্যক কবিতা লিখেছেন। তার প্রথম
গল্পগ্রন্থ মোর প্রিকস দ্যান কিকস প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালে। তারপর
থেকে ৩৮-এ মারফি, ৪২-এ ওয়াট, ৫১-এ মলয়, ম্যালনি ডাইস এবং দ্য
আননেমেবল প্রকাশিত হয়। ওয়েটিং ফর গডো তাঁর প্রথম নাটক, প্রকাশিত হয়
১৯৫২ সালে। প্রথম নাটকই তাঁকে বিপুল খ্যাতি এনে দেয়। এরপর আরও কিছু
নাটক লেখেন তিনি, যেমন_ এন্ডগেম, ক্র্যাপস লাস্ট টেপ, অল দ্যাট ফল,
এমবার্স, হ্যাপি ডেজ, প্লে, ক্যাসক্যান্ডো, নট আই ইত্যাদি।
বেকেট ভাষা ও আঙ্গিক নিয়ে সারাজীবন পরীক্ষা নীরিক্ষা-করেছেন। দ্য
আননেমেবল উপন্যাসে তিনি প্যারাগ্রাফ বর্জন করেছিলেন, হাউ ইট ইজ -এ
সর্বপ্রকার যতিচিহ্ন বর্জন করেছিলেন, সর্বশেষ উপন্যাস স্টারিংস
স্টিল মাত্র দুহাজার শব্দের! তার স্বল্পতম দৈর্ঘ্যের নাটক ব্রেথ
মাত্র আধ মিনিটের এবং নাটকে কোনো সংলাপ নেই।
বেকেট তাঁর নাটকগুলোতে সচেতনভাবেই সমস্ত গতানুগতিক চরিত্র-চিত্রন
পরিহার করেছেন, অবশ্য সব অ্যাবসার্ডিস্টরাই সেটা করেছেন, তবে প্লট
ও আবহ নির্মাণে তিনি বেশ খানিকটা ভিন্ন, ভাষার অক্ষমতা প্রমাণে
তাঁর সংলাপগুলোকে অধিকতর কার্যকর বলে মনে হয়। তাঁর অধিকাংশ চরিত্রই
অতিশয় রহস্যময়। যেমন ওয়েটিং ফর গডোর ভ্লাডিমির, এস্ট্রাগন, পোজো,
লাকি কিংবা নামহীন বালক_ পাঁচটি চরিত্রের কারোরই সঠিক পরিচয় পাওয়ার
যায় না, অথচ এদেরকে দিয়েই বেকেট তাঁর বক্তব্যকে রূপক প্রতীকময়তার
সাহায্যে পৌঁছে দেন পাঠকের কাছে। এদের অনন্ত প্রতীক্ষা ব্যর্থতায়
পর্যবসিত হয়, সকল প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয়ে পড়ে, তীব্র নৈরাশ্য,
নিঃসঙ্গতা, দুর্বিসহ পৌনঃপুনিকতা ইত্যাদি ঘিরে ফেলে তাদের, তারা
পতিত হয় যন্ত্রণা ও দুঃস্বপ্নে, দুঃসহ জীবনের ভার বইতে বইতে তারা
ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এন্ডগেম নাটকের চারটি চরিত্র _ হ্যাম, ক্লোভ,
ন্যাগ ও নেল সবাই_ যেন একই সঙ্গে চেনা ও অচেনা । এর মধ্যে তিনটি
চরিত্রই অথর্ব, পঙ্গু। যে সুস্থ সে আবার পঙ্গুর ওপর নির্ভরশীল!
তাদের চারপাশে অবক্ষয় ও শূন্যতা, নৈরাশ্য ও ধ্বংসলীলা, এক ভীষণ
বিভীষিকার মধ্যে দিয়ে তারা মৃতু্যর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
এরকম উদাহরণ আরও দেয়া যায়। বেকেটের প্রায় সকল চরিত্রই জীবনের
দুর্বহ ভার বহনে ক্লান্ত, পারস্পরিক অর্থবহ সংযোগে ব্যর্থ।
চরিত্রগুলোর সার্বিক বৈশিষ্ট্য আমাদের জানিয়ে দেয়_ নিস্পৃহ,
নিস্ক্রিয়, নৈরাশ্যবাদী অথবা কর্মতৎপর, আশাবাদী_ মানুষ যেমনই হোক
না কেন, সবার জন্যই নির্ধারিত রয়েছে অবক্ষয় ও শূন্যতা। এই
চরিত্রগুলো নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত ও বিপণ্ন, বিষণ্ন,
নৈরাশ্যবাদী, আত্নধ্বংসকারী, দুঃস্বপ্ন ও বিভীষিকায় আক্রান্ত,
যন্ত্রণাদগ্ধ, ব্যর্থ, পরাজিত, তাদের সবকিছু জুড়ে অর্থহীনতা, তাদের
সব প্রয়াস তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর, এমনকি পরস্পরের সঙ্গে ইতিবাচক
যোগাযোগ স্থাপনেও অক্ষম, তাদের ভাষা শুধু শূন্যগর্ভ শ্লোগান, বহু
ব্যবহারে জীর্ণ, ক্লিশে, পচে যাওয়া অর্থহীন শব্দাবলীর সমষ্টি
মাত্র, তাদের জীবনও ক্লিশে আক্রান্ত, হাস্যকর, অবান্তর, উদ্ভট,
তাদের মানবিক অস্তিত্ব নিষ্ফল, লজ্জাকর, ব্যর্থ। পৃথিবীর সমস্ত
সমস্যার সমাধান হয়ে গেলেও তারা তীব্র বেদনার সঙ্গে আবিষ্কার করে_
মৃতু্য জীবনকে নিরর্থক করে দেয়। আর অ্যাবসার্ডিটির মূল কথা এটিই।
ওয়েটিং ফর গডো
শুধু অ্যাবসার্ড ধারার নয়, বিশ্বসাহিত্যের এক ঐশ্বর্যময় নাটক
স্যামুয়েল বেকেটের ওয়েটিং ফর গডো। ১৯৫২ সালে ফরাসী ভাষায় প্রকাশিত
নাটকটি '৫৩-এর ৫ জানুয়ারি প্যারিসের থিয়েটার ডি ব্যাবিলনে প্রথম
প্রদর্শিত হয় এবং প্রথম মঞ্চায়নেই আলোড়ন তুলে ফেলে নাটকটি। '৫৪-এ
নিউইয়র্কে প্রকাশিত হয় এর ইংরেজি অনুবাদ। তারপর থেকে ঈর্ষণীয়
সাফল্য নিয়ে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে ২২টিরও বেশি দেশে, অনূদিত হয়েছে
৩২টিরও বেশি ভাষায়।
বলাবাহুল্য, নাটকটি রূপকাশ্রয়ী, প্রতীকধর্মী, এবং বহুমাত্রিক
ব্যাখ্যার দাবিদার। এটির একমাত্রিক ব্যাখ্যা করা বিপদজনক, অসম্ভব।
নাটকটির চরিত্র মাত্র পাঁচটি। এর মধ্যে দুটো প্রধান চরিত্র _
ভ্লাডিমির আর এস্ট্রাগন। এই চরিত্রগুলোর প্রত্যেকেই রহস্যময়, নাটকে
তাদের ব্যক্তিগত জীবন বা সামাজিক পরিচয় সম্বন্ধে কিছুই জানা যায়
না, এরা আসলে পুরো মানব জাতিরই প্রতিনিধি, আর এ কারণেই বেকেট এদের
ব্যক্তিগত জীবনের কথা জানাননি। শুধু তাই নয়, পুরো নাটক জুড়ে কিছু
ঘটেও না, কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত, টানাপোড়েন, চরিত্রের বিকাশ, ঘটনার
ধারাবাহিকতা বা অগ্রসরতা চোখে পড়ে না। চরিত্রগুলোও অপেক্ষা করা
ছাড়া আর কিছুই করে না। অপেক্ষা করে গডো নামক অনির্দিষ্ট একজনের
জন্য। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে গডোর জন্য তারা অপেক্ষা করে, তাকে
তারা চেনে না, কোনোদিন দেখেওনি। তবে তারা বিশ্বাস করে, গডো এলে
তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, পৃথিবী তাদেরকে যে ক্লেদাক্ত
জীবন উপহার দিয়েছে তা থেকে তারা মুক্তি পাবে। কিভাবে সেটা হবে তা
অবশ্য তারা জানে না, তাঁর কাছে প্রত্যাশাটা কি তা-ও তাদের কাছে
পরিস্কার নয়, এমন কি তারা এ-ও নিশ্চিত নয় যে, তিনি আদৌ আসবেন কী
না! জানা যায়, তাদের অতীত খুব উজ্জ্বল ছিলো_ যেমন প্রতিটি মানুষই
তার ফেলে আসা দিন সম্বন্ধে ভাবে_ কিন্তু সময় তাদেরকে নিঃসঙ্গ,
বিপণ্ন্ন এবং বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এমনকি পরস্পরের সঙ্গে কার্যকর
যোগাযোগ স্থাপন করার মতো যুতসই ভাষাও তাদের আর নেই_ যেমন আমরা কেউই
নিজেদেরকে অন্যদের কাছে সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করার ভাষা জানি না।
জীবন তাদের কাছে এক বোঝাস্বরূপ। জীবনকে টেনে নিয়ে যাওয়াই এক বিরাট
সমস্যা। সময় কাটানোর জন্য যা কিছুই করুক না কেন তারা, কিছুক্ষণ পর
পর ফিরে আসে ওই অপেক্ষার প্রসঙ্গ আর তারা ককিয়ে ওঠে। বোঝা যায়_ এক
মুহূর্তের জন্যও তারা ব্যাপারটি ভুলে যেতে পারেনি। পরপর দুদিন তারা
অপেক্ষা করে কিন্তু গডো দুদিনই খবর পাঠান যে, তিনি আজ আসতে পারছেন
না_ কালকে নিশ্চয়ই আসবেন। তাদের এই অনন্ত অপেক্ষা ব্যর্থতায়
পর্যবসিত হয়। তারা আত্নহত্যার কথা ভাবে কিন্তু পারে না। পুরো
নাটকটি পড়লে মনে হয়_ তারা চিরদিনই অপেক্ষা করে ছিলো, এখনও আছে,
ভবিষ্যতেও থাকবে। কোনোদিনই তাদের এই অপেক্ষার অবসান হবে না এবং গডো
কোনোদিনই আসবেন না।
আগেই বলেছি দু-অংকের এ নাটকে কিছুই ঘটেনা, কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত,
টানাপোড়েন, চরিত্রের বিকাশ, ঘটনার ধারাবাহিকতা বা অগ্রসরতা_ এসবেরই
কিছুই চোখে পড়ে না। নাটকের শুরুতে আমরা দেখতে পাই দুজন ভবঘুরে
ধরনের লোক_ ভ্লাডিমির ও এস্ট্রাগন_ একটি ধূসর প্রান্তরে কোনো এক
মিঃ গডোর জন্য অপেক্ষা করছে, নাটকের শেষেও তারা প্রতীক্ষারত।
মাঝখানের সময়ের ব্যবধান মাত্র একদিনের, অথচ এই এতটুকু সময় কাটাতে
তাদের এত বেশি কষ্ট করতে হয় যে, মনে হয় অনন্তকাল ধরে তারা
প্রতীক্ষা করছে। তারা গডোর জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য, কারণ এর সঙ্গে
তাদের জীবন-মৃতু্যর প্রশ্ন জড়িত। যদিও অর্থহীন এই প্রতীক্ষা, কারণ
গডো আসেন না, কখনো আসবেন এমন নিশ্চয়তা বা সম্ভাবনাও দেখা যায় না,
তবু এর থেকে মুক্তি নেই তাদের। পুরো নাটক জুড়ে নিষ্ফল ও অর্থহীন
প্রতীক্ষার যন্ত্রণা, হাহাকার, অসহায়ত্ব, হতাশা, অর্থহীনতা,
অনিশ্চয়তা, বিস্ময়কর বিস্মৃতি, ভাষার মাধ্যমে অর্থবহ ও কার্যকর
যোগাযোগ স্থাপনের দুরূহতা, দুর্বিসহ পৌনঃপুনিকতা, জীবনের জটিল ও
দুর্বহ ভার, প্রগাঢ় ক্লান্তি ইত্যাদি ছড়িয়ে আছে আর এসবকিছু তাদেরকে
নিক্ষিপ্ত করে যন্ত্রণা আর দুঃস্বপ্নে। নাটকের শুরুতেই আমরা
এস্ট্রাগনের মুখে একটি সংলাপ শুনতে পাই_ 'না কিছু করা যাবে না।' এই
কিছুই করতে না পারা, জীবনে কিছুই না হওয়া, পরিণতিহীন জীবনের দুর্বহ
ভারের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে নাটকে। শুরুতে যেমন দেখি কিছুই করার
নেই তাদের, নাটকের শেষদিকেও মাঝে মাঝেই তাদের নিরুপায়,
যন্ত্রণাক্লিষ্ট, বেদনাক্লান্ত কণ্ঠে শোনা যায়_ 'কি করবো, আমরা কি
করবো?' কিছুই করার নেই একমাত্র প্রতীক্ষা করা ছাড়া, কারণ সবকিছু
অন্তর্হিত হয়ে গেছে, দুর্বিনীত সময় তাদের সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছে।
কি-ই বা করতে পারে তারা একমাত্র গডোর জন্য প্রতীক্ষা করা ছাড়া, যে
গডো তাদের এই ক্লেদাক্ত জীবন-যাপন থেকে মুক্তি দেবেন, আলোকিত
জীবনের সন্ধান দেবেন! কিন্তু সেই প্রতীক্ষা যখন নিষ্ফল হয়ে যায় তখন
জীবনে আর কি বাকি থাকে প্রবল অর্থহীনতা আর প্রগাঢ় বিপণ্ন্নতা ছাড়া?
নাটকে ভ্লাডিমির, এস্ট্রাগন ছাড়াও আরও তিনটে চরিত্র আছে_ পোজো,
লাকি এবং সংবাদবাহক বালক। প্রধান দুটো চরিত্রের একটি, এস্ট্রাগন,
কিছুটা স্বাপি্নক এবং নৈরাশ্যবাদী, আরেকজন ভ্লাডিমির আবেগপ্রবণ
কিন্তু বাস্তববাদী ও আশাবাদী। অনেক সমালোচক এই দুটো চরিত্রকে
মানবচরিত্রের দুটো দিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন_ অর্থাৎ তারা আসলে
একই চরিত্র, শুধু মানব-স্বভাবের দুটো দিক দেখাবার জন্য তাদেরকে
আলাদা করে দেখানো হয়েছে, যাকে বলে স্প্লিট পার্সোনালিটি তারা হচ্ছে
তাই। আমরা যদি কথাটা মেনে নিয়ে বিশ্লেষণে যাই তাহলে দেখবো_
স্বাপি্নক ও নৈরাশ্যবাদী এস্ট্রাগন কথায় কথায় ঘুমিয়ে পড়ে, যেন
ঘুমিয়ে পড়াটা শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক। এই ঘুমিয়ে পড়াটা কি
ক্রমাগত তলিয়ে যাবার, ক্ষয়ে যাবার, পরাজিত হবার প্রতীক? নাকি এ তার
পলায়নপর মনোবৃত্তির প্রকাশ, বাস্তব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার
জন্যই সে ঘুমিয়ে পড়ে? এস্ট্রাগন ঘুমোলেই দুঃস্বপ্ন দেখে, কেন দেখে?
ঘুম বা স্বপ্নেও কি জীবনের দুর্বিসহ বাস্তবতা থেকে, কষ্ট ও
ক্লান্তি থেকে, নৈরাশ্য ও হাহাকার থেকে মুক্তি মেলে না তার?
এস্ট্রাগন সবকিছু ভুলে যায়, সবসময় ক্লান্ত বোধ করে, কেন এই প্রবল
বিস্মৃতি ও ক্লান্তি? সময়কে যেন সে ভুলে থাকতে চায়, কারণ সময়ই তাকে
ক্লান্ত করে দিচ্ছে, যদিও পারে না কিছুতেই, তাই ক্লান্তি থেকেও
মুক্তি মেলে না সহসা। এস্ট্রাগনের বিস্মৃতির একটা উদাহরণ দেয়া যাক।
গতকাল এখানে তার সঙ্গে পোজো ও লাকির দেখা হয়েছিলো, সে কথা আজই সে
বেমালুম ভুলে গেছে, এমনকি গতকাল রেখে যাওয়া নিজের জুতো জোড়াও চিনতে
পারছে না সে, অন্যের বলে ভুল করছে। কিন্তু ভ্লাডিমির যখন তাকে মনে
করিয়ে দেবার চেষ্টা করছে, তার শুধু মনে পড়ছে এক উন্মাদ (লাকি) তাকে
লাথি মেরেছিলো, আর এক লোক তাকে মুরগীর হাড় খেতে দিয়েছিলো। বোঝা
যায়, এস্ট্রাগনের অবস্থা ভালো নয়, শোচনীয়ও বলা যায়। আমরা জানতে
পারি, সে ওদিকের একটা খাদে রাত কাটিয়েছে এবং ওরা তাকে পিটুনি
দিয়েছে (এই ওরা কারা তা স্পস্ট নয়, যেন মার খাওয়ার খবরটি দেয়াই
নাট্যকারের কাছে বড় ব্যাপার, কে দিলো সে বিষয়ে তাঁর আগ্রহ নেই)।
অথচ আমরা এ-ও জানতে পারি একসময় তারা কত উজ্জ্বল ছিলো_
ভ্লাডিমির ঃ আইফেল টাওয়ারের ওপর থেকে হাত ধরাধরি করে একেবারে পয়লা
কজনার মধ্যে। হঁ্যা সেসব দিনে দেখার মতো ছিলাম বটে আমরা, এখন
আমাদের ওপরে উঠতেই দেবে না।
কেন দেবে না? কি হয়েছে তাদের? কি হয়েছে সেই তথ্যও আমাদের জানা হয়ে
যায় তাদের সংলাপেই। উদাহরণ দেই_ এস্ট্রাগন যখন আগের দিনের জায়গাটা
চিনতে পারছে না আর ভ্লাডিমির বারবার চেনাবার চেষ্টা করছে তখনকার
একটি সংলাপ_
ভ্লাডিমির ঃ তুমি জায়গাটা চিনতে পারছো না?
এস্ট্রাগন ঃ [হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে] চিনবো? চিনবার কি আছে? চিরটাকাল
আমার এই জঘন্য জীবনে আমি শুধু কাদার মধ্যে কিলবিল করেছি। আর তুমি
আমার কাছে সিনারীর গল্প করছো! [উন্মাদের মতো চারদিকে দৃষ্টি
নিক্ষেপ করে] এই আবর্জনা স্তুপের দিকে তাকিয়ে দেখ একবার। আমি
কোনোদিন এখান থেকে এক পা-ও নড়িনি ... তোমাকে বলেছি, আমার কেন্নোর
জীবন, কেন্নোর মতো চিরটাকাল আমি এইখানে কাটিয়েছি, এইখানে!
আমরা বুঝতে পারি কোনো এক বা একাধিক কারণে তারা নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে
গেছে, নৈরাশ্যপীড়িত এস্টা্রগনের কাছে তাই নিজের অতীত জীবনের মধুর
গল্পও অবিশ্বাস্য মনে হয়। এই নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া, শেষ
হয়ে যাওয়া অর্থাৎ অবক্ষয়ের প্রতীকগুলো পুরো নাটক জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
পোজো-লাকির কথা ধরা যাক। প্রথম অংকে আমরা পোজোকে দেখতে পাই এক
আরামপ্রিয়, অত্যাচারী, বিলাসী, কল্পনাপ্রবণ এবং প্রভাববিস্তারকারী
মনিবরূপে। লাকিকে_ যে একসময় তার শিক্ষক ছিলো_ সে শেকলে বেঁধে,
চাবুক দিয়ে পিটিয়ে, অকথ্য বকাবাজি করে নিজের বন্য ও ভয়ংকর কতৃত্বকে
প্রকাশ করে। সেই পোজোই দ্বিতীয় অংকে এসে দেখা দেয় অন্ধরূপে।
একদিনের ব্যবধানে সে অন্ধ হয়ে গেছে এবং পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হয়ে
পড়েছে লাকির ওপর। এখানেও সেই অবক্ষয়। পোজো-লাকি চরিত্র দুটো
আমাদেরকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়। লাকি একসময় পোজোকে
যাবতীয় সৌন্দর্যবোধ ও চিন্তাশীলতা শিক্ষা দিয়েছিলো, তারও অতীত
ছিলো ঝলমলে উজ্জ্বল _
পোজো ঃ ও (লাকি) না হলে আমার সব চিন্তাভাবনা, আমার সব অনুভূতি
সাধারণ জিনিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। [থামে একটুক্ষণ। তারপর
অস্বাভাবিক তীব্রতার সঙ্গে] সৌন্দর্য, কমনীয়তা, মহৎ সত্য_ আমি
ভাবতাম ওসব আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে।... একসময় ও নানান নাচ পারতো।
ফ্যারানডোল, ফ্রিংগ, ব্রল, জিল, ফ্যানডাঙ্গো, এমনকি হর্নপাইপও। কী
সব কঠিন নাচ। ... একসময় সুন্দর চিন্তা করতো ও, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা
শুনতাম।
অথচ এখন তার কী প্রবল দুর্দশা! লাকি কি মানব জীবনের সৌন্দর্যবোধ,
চিন্তাশীলতা, নন্দনশীলতা তথা ইতিবাচকতার প্রতীক? নাটকটি কি আমাদের
বলছে না_ যখনই আমরা আমাদের সৌন্দর্যবোধ, চিন্তাশীলতাকে বন্দী করে
ফেলি, নির্বোধের মতো শাসন করি তখনই কেবল বন্য ও হীংস্র হয়ে উঠি,
যেমন ওঠে পোজো? দ্বিতীয় অংকে আমরা দেখি পোজো লাকির ওপর পুরোপুরি
নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, আগে সে-ই তাড়িয়ে নিতো লাকিকে, এখন লাকিই তাকে
পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, যদিও পোজোর শাসন ও নির্যাতন থেকে মুক্তি পায়নি
সে এবং ইতোমধ্যে সে বোবা হয়ে গেছে। আমাদেরকে শেষ পর্যন্ত তাহলে
ইতিবাচকতার ওপরই নির্ভরশীল হতে হয়, যদিও ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে
গেছে, কিছুই করার থকেনা তার, সে অক্ষম, অচল, বোবা হয়ে যায়।
দ্বিতীয় অংকে পোজো-লাকি মঞ্চে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এক বিমূঢ়
অবস্থার তৈরি হয়। মঞ্চে ঢুকে মালপত্রসহ লাকি ভারসাম্য হারালে পোজোও
পড়ে যায় এবং 'বাঁচাও' বলে চিৎকার করতে থাকে। তার চিৎকার, তার
আবেদন, তার আহ্বান, তার আর্তি ভ্লাডিমির ও এস্ট্রাগনের কাছে
পেঁৗছায়, তারা সাহায্য করার কথা ভাবে_
ভ্লাডিমির ঃ ... সাহায্যের জন্য ওই আবেদন যা আমাদের কানে এখনো
তীব্রভাবে বাজছে তা সমস্ত মানবজাতির উদ্দেশ্যে উচ্চারিত, কিন্তু এই
স্থানে, মহাকালের এই মুহূর্তে আমরাই সমগ্র মানবজাতি_ আমরা তা চাই
বা না চাই। দেরি হয়ে যাবার আগে চলো এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করি আমরা।
নিষ্ঠুর নিয়তি আমাদের যে ক্লেদাক্ত প্রাণীতে পরিণত করেছে, এসো,
অন্ততঃ একটিবারের জন্য হলেও তার মহৎ রূপটি আমরা প্রদর্শন করি।
কিংবা_
এস্ট্রাগন: সমস্ত মানবতা ও।
যে কথাটি আগে একবার বলেছি যে, ভ্লাডিমির ও এস্ট্রাগন বিচ্ছিন্ন
কোনো চরিত্র মাত্র নয়, তাদের মাধ্যমে আসলে পুরো মানবজাতিকেই
উপস্থাপন করেন বেকেট, এবং মানবজাতির আর্তচিৎকারের প্রতীকী রূপায়ন
প্রায় প্রতিটি অ্যাবসার্ড নাটকের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য_ এই দুটো
সংলাপে সেটা পরিষ্কার হয়ে যায়। যাহোক, তারা এসব বলে বটে কিন্তু
সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায় না। তারা প্রথমে গতকালের আচরণের প্রতিশোধ
নিতে পোজো ও লাকিকে বেদম পিটুনি দেবার কথা ভাবে, তারপর টাকার
বিনিময়ে সাহায্য করার কথাও ভাবে, এর মধ্যে আবার জীবনদর্শন নিয়েও
আলোচনা করে, অনিবার্যভাবে তাদের প্রতীক্ষার প্রসঙ্গটিও এসে পড়ে,
তারপর সময় কাটানোর জন্য হলেও কাজটি করা উচিত বলে অভিমত প্রকাশ করে।
আটবার 'বাঁচাও' বলার পর পোজো যখন বলে অর্থ দেবো তোমাদের, তখন
এস্ট্রাগন তার কথার জবাব দেয়। যে চিৎকারকে তারা চিহ্নিত করে সমগ্র
মানবতার চিৎকার বলে এবং বলে_ ওই চিৎকার সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশ্যে
উচ্চারিত, তাকেও কেন বিনা শর্তে, বিনা প্রশ্নে সাহায্য করে না
তারা? তাহলে কি আমরা যাকে মানব জাতির করুণ আর্তি বা অসহায় আহ্বান,
প্রার্থনা বা আর্তনাদ বলে জানি ও মানি তাতেও কান দেই না,
সুযোগ-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সাহায্য করি না, যদি সেখানে নিজেদের
স্বার্থ-উদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা না থাকে! সমগ্র মানবতা 'বাঁচাও'
বলে চিৎকার করছে অথচ আমরা কিছুই করছি না, কারণ আমরা আবদ্ধ হয়ে আছি
নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডী, ভ্রান্ত প্রতিশোধস্পৃহা,
অপ্রয়োজনীয় দর্শন ইত্যাদিতে।
পোজোর অন্ধ হয়ে যাওয়া এবং লাকির বোবা হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটিও
আমাদেরকে ভাবায়। পরাক্রমশালী পোজো অন্ধ, যার মুখ দিয়ে লাভাস্রোতের
মতো শব্দ বেরোতে দেখেছি আমরা সেই লাকি বোবা, তা-ও মাত্র একদিনের
ব্যবধানে_ এই পরিস্থিতি আমাদের হতবাক করে দেয়। সময় সম্বন্ধে আমাদের
ধারণাও পাল্টে যায়। পোজো কখন অন্ধ হয়ে গেছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি
তৈরি হয়। গতকাল তাদের সঙ্গে ভ্লাডিমির-এস্ট্রাগনের এখানে দেখা
হয়েছিলো। গতকালই কি?
ভ্লাডিমির ঃ কাল আমাদের দেখা হয়েছিলো। [একটু চুপ করে থাকে] তোমার
মনে নেই? পোজো ঃ গতকাল কারু সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা আমার মনে নেই। কিন্তু আজ
যে কারু সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে একথাও আগামীকাল আমার মনে থাকবে না।
কাজেই এ ব্যাপারে আমার কাছ থেকে কিছু জানবার আশা করো না।
কেন এই বিস্মৃতি? কেন এই ভুলে যাওয়া বা ভুলে থাকা? কখন অন্ধ হয়েছে
এ ব্যাপারে পোজো বলে_
ঃঃ এক সুপ্রভাতে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে দেখলাম, আমি ভাগ্যদেবীর মতো অন্ধ
হয়ে গেছি। [একটু চুপ করে থেকে] মাঝে মাঝে আমার সন্দেহ হয় এখনও আমি
ঘুমিয়ে আছি।
লাকি কখন বোবা হলো জানতে চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পোজো_ তোমার এই অভিশপ্ত সময়ের কথা বলে তুমি আর কত যন্ত্রণা দেবে আমাকে!
অসহ্য! কখন! কখন! একদিন, তাই কি তোমার কাছে যথেষ্ট নয়! যে কোনো
একদিনের মতো একদিন, একদিন সে বোবা হয়ে গেছে, একদিন আমরা বধির হয়ে
যাবো, একদিন আমরা জন্মগ্রহণ করেছিলাম, একদিন আমরা মরবো, সেই একই
দিন, একই ক্ষণ, তাই কি যথেষ্ট নয় তোমার জন্য? [অপেক্ষাকৃত শান্ত
হয়ে হয়ে] কবরের ওপর তারা জন্ম দেয়, মুহূর্তের জন্য আলো ঝলমল করে,
তারপর আবার রাত্রি।
স্থান ও কালের এই অবলুপ্তি যেন জীবন ও পৃথিবীর সবকিছুকেই
অপ্রয়োজনীয় ও অর্থহীন করে তোলে।
জীবনের অর্থহীনতা ও বিপণ্নতার জন্যই তারা অপেক্ষা করে গডোর জন্য,
যিনি এলে তারা রক্ষা পাবে। কিন্তু তিনি আদৌ আসবেন কী না সেটা
নিশ্চিত নয়_
ভভ্লাডিমির: তিনি তো নিশ্চিত করে বলেননি
যে আসবেনই।
এস্ট্রাগনঃ যদি না আসেন? ভ্লাডিমির: তাহলে আমরা আবার কাল আসবো।
এস্ট্রাগন: এবং তারপর পরশু।
ভ্লাডিমির: সম্ভবত।
এস্ট্রাগন: এবং অতঃপর তাই চলতে থাকবে।
ভ্লাডিমির: কথাটা হচ্ছে_
এস্ট্রাগন: যতক্ষণ তিনি না আসেন।
তারা বলে বটে গডো এলে তারা রক্ষা পাবে, কিন্তু তারা ঠিক কি চায় বা
গডো তাদেরকে কি দেবেন তা-ও স্পষ্ট নয়_এস্ট্রাগন: তাকে ঠিক কি জন্যে ডেকেছি
আমরা বলতো?
ভ্লাডিমির: ওহ...তেমন সুনির্দিষ্ট কিছু
নয়।
এস্ট্রাগন: এক ধরনের প্রার্থনা।
ভ্লাডিমির: ঠিক।
এস্ট্রাগন: একটা অস্পষ্ট অনুনয়।
ভ্লাডিমির: যথার্থ।
এস্ট্রাগন: এবং উত্তরে কি বললেন তিনি?
ভ্লাডিমির: তিনি দেখবেন।
এস্ট্রাগন: কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া সম্ভব
নয় তার পক্ষে।
ভ্লাডিমির: তাঁকে ভেবে দেখতে হবে।
কিন্তু গডো আদৌ তাদেরকে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন কী না কিংবা বললেও
কখন, কবে তা-ও স্পষ্ট হয় না_এস্ট্রাগন: তুমি নিশ্চিত যে আজ বিকেলেই
ছিলো?
ভ্লাডিমির: কি?
এস্ট্রাগন: আমাদের অপেক্ষা করার কথা?
ভ্লাডিমির: বলেছিলেন শনিবার। [একটুক্ষণ
চুপ করে থাকে] তাই তো মনে হচ্ছে আমার।
এস্ট্রাগন: মনে হচ্ছে!
ভ্লাডিমির: নিশ্চয়ই কোথাও টুকে
রেখেছিলাম আমি।
এস্ট্রাগন: [অত্যন্ত কূটিল ভঙ্গীতে]
কিন্তু কোন শনিবার? আর শনিবারের কথাই কি বলেছিলেন? নাকি রবিবার?
[চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ] কিম্বা সোমবার? [নীরবতা] কিম্বা শুক্রবার?
ভ্লাডিমির: [পাগলের মতো চারদিকে তাকায়,
যেন দৃশ্যপটে তারিখটা কোথাও আঁকা আছে] তা সম্ভব নয়।
এস্ট্রাগন: কিংবা বৃহস্পতিবার?
বোঝা যায় সব প্রতীক্ষাই নিরর্থক ও নিষ্ফল, সবকিছুই অনিশ্চিত ও
ফলাফলশূন্য। তবু তারা প্রতীক্ষাই করে। জীবনের দুর্বিসহ ভার বইতে
বইতে তারা ক্লান্ত, প্রতীক্ষা করা ছাড়া আর উপায়ই বা কি? সময়
কাটানোই তাদের কাছে এক বিরাট সমস্যা, সময় যেন এক ভারি পাথর হয়ে
চেপে বসেছে বুকের ওপর। সময় পার করার জন্য তাই তারা অনেক কিছু করে _
অর্থহীন আলাপ করে, পরস্পরের কথার প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে,
পরস্পরকে অর্থহীন প্রশ্ন করার ও গালাগাল করার চেষ্টাও বাদ যায় না,
সৌজন্য ও ভদ্রতার অভিনয় করে, নিজেদের অন্য চরিত্রে কল্পনা করে
ছেলেমানুষি খেলায় মেতে থাকে কিছুক্ষণ, টুপি আদান-প্রদান কিংবা জুতো
পড়ার চেষ্টায়ও কিছুটা সময় কাটে, এবং তারা যে টিকে আছে 'সে ধারণা
জন্মাবার মতো একটা না একটা কিছু' সবসময় পেয়েই যায় বলে সন্তুষ্টি
বোধ করে। আর এরই মধ্যে তাদের হাহাকার ও বিপণ্নতা, কষ্ট ও বেদনা,
নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতার ভয়াবহ চিত্রটিও চিত্রিত হতে থাকে। বারবার
একই জিনিসের পূণরাবৃত্তি ঘটে_ একই সংলাপ, একই ঘটনা এবং তারা যে
পরস্পরের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে অক্ষম সেই সত্যের
প্রতিভাস। মাঝে মাঝে তাদের সংলাপে মানুষের প্রতি ঘৃণা এবং ভালোবাসা
উচ্চারিত হয়, কখনো বা তাদের বেদনা-হাহাকার-কষ্ট-নিঃসঙ্গতা-বিপণ্নতা
তীব্র হয়ে ওঠে, কখনো আবার সংলাপগুলো আমাদেরকে বহু দার্শনিক
প্রশ্নের মুখোমুখিও করে দেয়। দ্বিতীয় অংকে পোজো চলে যাবার পর
ভ্লাডিমিরের একটা সংলাপ লক্ষ্য করা যাক। এস্ট্রাগন তার জুতো খোলার
জন্য ভ্লাডিমিরকে অনুরোধ করে কিন্তু সে শোনে না, বলতে থাকে_
ঃ অন্যরা যখন কষ্ট পাচ্ছিলো আমি কি তখন ঘুমোচ্ছিলাম? আমি কি এখনও
ঘুমন্ত? কাল আমি যখন জেগে উঠবো বা ভাববো জেগে উঠেছি, তখন কি আজকের
কথা বলবো? যে বন্ধুবর এস্ট্রাগনের সঙ্গে এইখানে, রাত নেমে না আসা
পর্যন্ত, আমি গডোর জন্য অপেক্ষা করেছিলাম? যে পোজো তার বাহককে নিয়ে
এই পথে গিয়েছে? আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে? হয়তো। কিন্তু এসবের সমধ্যে
কতটুকু সত্য থাকবে? [এস্ট্রাগন জুতো খোলার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে আবার
তন্দ্রায় ঢুলে পড়ে। ভ্লাডিমির তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে
থাকে] ও কিছু জানবে না। কি রকম পিটুনি খেয়েছে সেই কথা বলবে আমাকে,
আর আমি তাকে গাজর দেবো। [একটু থামে] কবরের উপরে, আর কঠিন জন্ম।
গর্তের মধ্যে ধীরে সুস্থে গোর খোদক ছুরি ধরে। সময় আছে আমাদের বুড়ো
হওয়ার। সারা আকাশ আমাদের ক্রন্দনে পূর্ণ।[কান পেতে শোনে] কিন্তু
সময় সবকিছুকে অসাড় করে দেয়। [আবার এস্ট্রাগনের দিকে তাকায়] আমার
দিকেও কেউ একজন তাকাচ্ছে, আমার সম্পর্কেও একজন কেউ বলছে, ও
ঘুমুচ্ছে, ও কিছুই জানে না, ঘুমাক ও। [একটু থামে] আমি আর পারি না।
এই সংলাপটি আমাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোেেল। 'সারা আকাশ
আমাদের ক্রন্দনে পূর্ণ' _ অংশটি যেমন মানুষের অপরিসীম যন্ত্রণা,
হাহাকার, বেদনা, দুঃখ ও কান্নাকে মূর্ত করে তোলে, তেমনই 'আমার
দিকেও কেউ একজন তাকাচ্ছে, আমার সম্পর্কেও একজন কেউ বলছে, ও
ঘুমুচ্ছে, ও কিছুই জানে না, ঘুমাক ও' _ অংশটি আমাদেরকে বহু
প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়। আমরা তো জেগে আছি, তবু আমাদের সম্বন্ধে
কেন কেউ একজন বলবে ও ঘুমুচ্ছে, ঘুমাক ও! তাহলে কি আমরা জেগে নেই বা
বেঁচে নেই, আমাদের অস্তিত্ব কি অন্য কারো স্বপ্নের মধ্যে? তার
স্বপ্নটি ভেঙে গেলেই আমাদের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে? নাকি আমরা
আমাদের আদলে একটা মিথ্যা জীবন যাপনের অভিনয় করছি মাত্র? তাহলে কি
আসল 'আমি' অন্য কোথাও আছে, অন্য কোনোভাবে, অন্য কোনো জীবন যাপনের
মধ্যে? সেই অন্য আমিটা কে? অথবা এই আমি? যাকে 'আমি' 'আমার
অস্তিত্ব' বলে ভাবছি সেকি তাহলে মিথ্যে? অলীক? স্বপ্ন? মানব জীবনের
পুরোটাই কি তাহলে একটা মিথ্যে, অলীক, অর্থহীন স্বপ্নের অভিনয়
মাত্র? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না নাটকে, এবং বেকেট উত্তর
দিতেও চান না, তিনি শুধু প্রশ্ন তোলেন এবং ইঙ্গিত দেন। প্রশ্ন আরো
আছে। গডোর পুরো ব্যাপারটি জুড়ে বিভ্রম ও বিভ্রান্তি জড়ানো। যার
জন্য এত প্রতীক্ষা সে যে কে, কেমন দেখতে, জীবনে তার ভূমিকা কী, সে
এলে কিভাবে কতটুকু বদলে যাবে জীবন এর কোনোকিছুরই উত্তর নেই নাটকে,
শুধু ইঙ্গিত আছে_ আমরা সবাই তো কিছু না কিছুর জন্য, কারো না কারো
জন্য অপেক্ষা করি, ভাবি সে এলে জীবনটা পাল্টে যাবে, যদিও জানি না
সেটা কিভাবে হবে, আর বদলে গিয়ে যে জীবন পাওয়া যাবে সেটাই বা
কতোটুকু কাম্য, কতটুকু সুন্দর হবে। বলাবাহুল্য মানুষের এই সংকটটি
দার্শনিক_ তাকে কারো না কারো জন্য অপেক্ষা করতে হয়, এই সত্যের
অসামান্য রূপায়ন ঘটিয়েছেন লেখক নাটকটিতে। আরেকটি ইঙ্গিতের কথা বলে
এই আলোচনা শেষ করা যাক। আগেই বলেছি, পুরো নাটকটি পড়লে মনে হয়_ তারা
চিরদিনই অপেক্ষা করে ছিলো, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কোনোদিনই
তাদের এই অপেক্ষার অবসান হবে না এবং গডো কোনোদিনই আসবেন না। তো,
গডোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে, তিনি আসবেন না জেনে, একসময় ভ্লাডিমির
একটা কথা বলে_ আমরা সেইন্ট নই, কিন্তু আমরা আমাদের এ্যাপয়েন্টমেন্ট
রক্ষা করেছি। কজন লোক এইটুকু বলতে পারে? হঁ্যা, সান্ত্বনা ওটুকুই,
তৃপ্তিও। আমরা কেউ সেইন্ট নই, কিন্তু জীবনের কাছ থেকে কিছুই পাবার
নেই জেনেও, জীবনটা নিছক অর্থহীন একটা ব্যাপার জেনেও, আমরা আমাদের
কাজটুকু করে যাচ্ছি।
|
| |
 |
|