প্রাক কথন
আবু ইসহাক বাংলাদেশের সেই আশ্চর্য লেখক যিনি লেখক-সমাজের
প্রথমশ্রেণীর সদস্য হয়েও এই সমাজের সঙ্গে কোনোদিন সম্পর্ক রক্ষা
করে চলেননি। শক্তি ছিলো তাঁর, বিচ্ছিন্ন থেকেও দেশের অন্যতম প্রধান
লেখকে পরিণত হবার ক্ষমতা ছিলো, তবু তাঁর নিভৃতিচারিতা তাঁকে পাঠক ও
সহযাত্রী লেখকদের মনোযোগের কেন্দ্রে আসতে দেয়নি। আমাদের সাহিত্যের
ভূবন এখনও এতটা ঋদ্ধ হয়ে ওঠেনি যে, একজন নিভৃতচারি লেখককে তাঁর
শক্তিমত্তার কারণে সামনে নিয়ে আসবে। মাত্র একুশ বছর বয়সে, ১৯৪৬
সালে, তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস _ সূর্য-দীঘল বাড়ী।
প্রকাশক না পেয়ে বছর পাঁচেক পরে লেখেন রহস্যোপন্যাস জাল _ কিন্তু
সেটা প্রকাশের আগেই সূর্য-দীঘল বাড়ীর প্রকাশ ঘটে, এবং অচিরেই পরিণত
হন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখকে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে
হয়নি তাঁকে। কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক, খুব বেশি সামনেও তাকাননি
তিনি। যে পরিমাণ সক্রিয়তা-সচলতা-নিরবিচ্ছিন্নতা থাকলে একজন লেখকের
পক্ষে সবসময় পাঠক এবং সহযাত্রী ও উত্তরসূরি লেখকদের মনোযোগের
কেন্দ্রে থাকা সম্ভব হয় তা তাঁর ছিলো না কোনোদিন। তিনি যে কতোখানি
অনিয়মিত ছিলেন _ সেটা তাঁর গ্রন্থগুলোর প্রকাশকালের দিকে তাকালেই
বোঝা যায়। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল
বাড়ী। এরপর প্রথম গল্পগ্রন্থ হারেম ১৯৬২ সালে। কিন্তু পাঠকরা বইটির
মুখ দেখার আগেই তা পুড়ে নষ্ট হয়ে যায় _ এই সংবাদ লেখক আমাদেরকে
জানাচ্ছেন বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের সময় _ কুড়ি বছর পর, ১৯৮২ সালে।
তা এতদিন লাগলো কেন দ্বিতীয় সংস্করণ হতে? লেখক জানাচ্ছেন _ তাঁর
কাছে পান্ডুলিপিটির কোনো কপি ছিলো না, অতএব নানা জায়গা থেকে
গল্পগুলো জোগাড় করতে করতে বিশ বছর চলে গেছে! প্রথম গল্পগ্রন্থের এই
পরিণতির ফলেই হয়তো দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থটি একটু তাড়াতাড়ি আলোর মুখ
দেখেছিলো। ১৯৬৩ সালে এটি _ মহাপতঙ্গ _ প্রকাশিত হয়। তারপর দীর্ঘ এক
বিরতি। ১৯৮২ সালে হারেম-এর দ্বিতীয় সংস্করণ _ এক অর্থে প্রথম
সংস্করণই, কারণ এটিই পাঠকের কাছে পৌঁছেছিলো, তারপর ১৯৮৬ সালে
দ্বিতীয় উপন্যাস পদ্মার পলিদ্বীপ। এটির মুখবন্ধে লেখক আবার আমাদের
জানাচ্ছেন _ উপন্যাসটির রচনাকাল ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫! পঁচিশ বছর! এক
অর্থে এটিই তাঁর শেষ রচনা। কারণ ১৯৮৯ সালে তার রহস্যোপন্যাস জাল
প্রকাশিত হলেও এটি তিনি লিখেছিলেন সেই ৫০ দশকের গোড়ার দিকে। তাঁর
শেষ প্রকাশিত গ্রন্থ _ স্মৃতি বিচিত্রা, প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে।
সাকুল্যে এই তাঁর রচনা। অর্থাৎ দুটো উপন্যাস, দুটো গল্পগ্রন্থ,
একটি রহস্যোপন্যাস, একটি স্মৃতিকথা। প্রায় ষাট বছরের দীর্ঘ লেখক
জীবনে এই রচনার পরিমাণকে আমরা কি বলবো _ সামান্য না নগন্য? অবশ্য
সেই ৬০-দশক থেকেই তিনি একটি বড় কাজ করছিলেন _ আঞ্চলিক বাংলা অভিধান
রচনার কাজ _ মৃতু্যর আগ পর্যন্ত সেটা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে করে
গেছেন। যাহোক, প্রশ্ন হচ্ছে _ এত বিচ্ছিন্নতা, এত নিভৃতিচারিতা
সত্ত্বেও কারো পক্ষে আবু ইসহাককে ভুলে থাকা সম্ভব হয়নি কেন? আমাদের
কথাসাহিত্যের কথা উঠলেই কেন অনিবার্যভাবে তাঁর নাম এসে যায়?
তারচেয়ে বড় প্রশ্ন _ তাঁর এই অনিবার্য অবস্থান সত্ত্বেও তাঁকে আমরা
কোথাও ডাকিনি কেন? কেন তাঁকে নিভৃতিচারিতার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে
দিয়েছি? এর কারণ হয়তো এই যে, বাংলাদেশের সাহিত্যের যারা পৃষ্টপোষক
সেই মধ্যবিত্তদের জন্য তাঁর রচিত সাহিত্যকর্ম কেবল অস্বস্তি আর
অশান্তিই উৎপাদন করতো। 'ওসব' পড়ে কোনো 'আরাম' পাওয়া তো দূরের কথা,
নিজেদের 'লজ্জাজনক' শেকড় আবিষ্কার করে বরং শিউরে উঠতে হতো। কারণ,
আজকের যারা মধ্যবিত্ত, ৪০/৫০/৬০ বছর আগেও তারা স্রেফ এক 'গ্রাম্য'
লোক ছাড়া আর কিছুই ছিলো না _ আবু ইসহাক সেটাই চিহ্নিত করে দেখাতেন।
২.
আর ওটাই আসল ব্যাপার। আবু ইসহাক যা লিখে গেছেন তা আমাদের মধ্যবিত্ত
সাহিত্যরুচির পক্ষে হজম করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। তা, কি লিখেছেন
তিনি? সবাই জানেন _ তাঁর লেখার, বিশেষ করে উপন্যাসের, প্রধান বিষয়
আমাদের গ্রাম _ সভ্যতার ছোঁয়াবিহীন সেই প্রাগৈতিহাসিক গ্রাম,
গ্রামের মানুষ, গ্রামীন সমাজ ও জীবন। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগবে _ এ আর
এমন কী নতুন বিষয়? আমাদের আর কোনো লেখক কি গ্রাম নিয়ে লেখেননি?
লিখেছেন, বিস্তর লিখেছেন। কিন্তু অন্য সবার সঙ্গে আবু ইসহাকের একটি
মৌলিক পার্থক্য আছে। আমরা যে গ্রাম নিয়ে লিখি _ সেটা আমাদের
স্মৃতির গ্রাম, শৈশব-কৈশোরের স্বপ্নময় চোখে দেখা মমতাময়ী গ্রাম _
আর সেটাকে আমরা স্থাপন করি বর্তমানে। ফলাফল হয় অদ্ভুত। কেউ মিলিয়ে
দেখতে গেলে বিপদে পড়ে যান _ কারণ বর্তমানের গ্রাম তো আগের মতো নেই,
স্মৃতির সেই গ্রামটিকে বর্তমানে স্থাপন করলে চলবে কীভাবে? এমনকি
৩০/৪০ বছর আগে দেখা গ্রামটিকে আমরা যেভাবে মনে ধরে রেখেছি, ওই সময়ও
হয়তো সেটি সেরকম ছিলো না, কৈশোরের স্বপ্নময় চোখে জনজীবনের দুঃসহ
বাস্তবতা কিংবা অন্যান্য বীভৎস ব্যাপারগুলো হয়তো ধরাই পড়েনি। সেই
গ্রামের প্রকৃত রূপ তাহলে কীভাবে আঁকা যাবে? এই ক্ষেত্রে আবু ইসহাক
ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনিও গ্রামকে দেখেছেন শৈশব-কৈশোর-প্রথম যৌবনে।
শুধু উপরিতলের দেখাই নয়, গ্রামে বসবাসের ফলে গ্রামের মানুষ, সমাজ ও
জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। ভালো-মন্দ-সুন্দর-অসুন্দর
কিছুই তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। কিন্তু সেই গ্রামকে আঁকার সময় ভুল
করেও সেটাকে বর্তমানে টেনে আনেননি। গ্রাম-জীবন অনেক বদলে গেছে,
বদলে গেছে মানুষ, এসেছে অনেক অবকাঠামোগত পরিবর্তন। কিন্তু তাঁর
গ্রামগুলো যেন প্রাগৈতিহাসিক কালের, মানুষগুলো যেন এ যুগের নয়। এ
ব্যাপারে তাঁর অবস্থানও যুক্তিসম্মত। তিনি মনে করতেন _ মানুষের
জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে তা উপরিকাঠামোর পরিবর্তন, মানসজগতে তারা
একই রকম রয়ে গেছে। সেই প্রাচীন বিশ্বাস, অনড় মূল্যবোধ,
সংস্কার-কুসংস্কার তারা আজও বহন করে চলেছে। এমনকি গ্রামের যে
লোকগুলো 'শিক্ষিত' হয়ে শহরবাসী হয়েছে, তারাও মনোজগতে ওই গ্রামের
মানুষই। আধুনিক মানুষ হওয়ার একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে _
বিজ্ঞানমনস্কতা, সেটা এ দেশের মানুষের মধ্যে নেই বললেই চলে। তিনি
মনে করতেন _ শহুরে শিক্ষিত মানুষগুলোকে বুঝতে হলে আগে ওই
প্রাগৈতিহাসিক গ্রামগুলোর প্রাচীন মানুষদেরকে বুঝতে হবে। আমাদের
পশ্চাৎপদতা ও অনগ্রসরতার কারণ নইলে বোঝা যাবে না। আর এভাবেই তিনি
আজকের শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের শেকড় খুঁজে খুঁজে চলে গেছেন
গ্রামে। কী লিখছেন, কেন লিখছেন সেটা তিনি পরিষ্কারভাবে জেনে-বুঝেই
লিখেছেন _ কিন্তু ভুলে যাননি সাহিত্যের শিল্পমূল্যের কথাও। নিজের
মতাদর্শ তাই তিনি চাপাননি কোথাও। তাঁর গল্প-উপন্যাস তাই কোথাও টলে
পড়ে না, ঝুঁকে পড়ে না, ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সবসময়।
৩.
আবু ইসহাকের দুটো উপন্যাসেরই _ সূর্য-দীঘল বাড়ী ও পদ্মার পলিদ্বীপ
_ বিষয়বস্তু গ্রামের মানুষ, গ্রামীন সমাজ ও জীবন। গল্পে তিনি কাজ
করেছেন বিবিধ বিষয় নিয়ে। তাঁর দুটো গল্পগ্রন্থভূক্ত একুশটি গল্পের
মধ্যে জোক এবং আবর্ত _ মাত্র এই দুটো গল্পে তীব্রভাবে গ্রামীন জীবন
এসেছে। দাদীর নদীদর্শন, শয়তানের ঝাড়ু, বোম্বাই হাজী ইত্যাদি গল্পে
গ্রামীন সমাজের দেখা মিললেও এগুলোর মূল উদ্দেশ্য গ্রামীন সমাজ ও
জীবনের বর্ণনা নয় _ ধর্মীয় কুসংস্কারের জালে বন্দি মানুষের গল্প
বলা হয়েছে এগুলোতে। অন্যদিকে উত্তরণ, কানাভুলা, বিস্ফোরণ ইত্যাদি
গল্প নিম্নশ্রেণীর মানুষ নিয়ে লেখা হলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনের
বহুবিধ সংকটের বর্ণনা নেই এসব গল্পে, রয়েছে সাধারণ মানুষদের মধ্যে
অসাধারণ মানবিক বোধের উন্মোচনের গল্প। যেমন কানাভুলা গল্পে ধর্মীয়
কুসংস্কারের (পীরপ্রথা, ঝাড়ফুক, তাবিজ-কবজ ইত্যাদি) বিরুদ্ধে
সুকৌশল প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে এক রিকশাচালকের মাধ্যমে। কিংবা
উত্তরণ গল্পে এক প্রতারক দুধ-বিক্রেতার মধ্যে পিতৃস্নেহের উন্মোচন
চমৎকার একটি গল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। আবার বনমানুষ,
প্রতিবিম্ব, বর্ণচোর প্রভৃতি গল্পের বিষয়বস্তু নাগরিক জীবন।
নাগরিক জীবন নিয়ে তাঁর গল্পগুলো গতানুগতিক নয় _ শহুরে মানুষ ও
জীবনের মধ্যে লুকায়িত ভন্ডামি ও শঠতার উন্মোচন রয়েছে কোনো কোনো
গল্পে, কোনো গল্পে রয়েছে নাগরিক যন্ত্রণার চমৎকার বিবরণ। উদাহরণ
হিসেবে বন মানুষ-এর কথা বলা যেতে পারে। গল্পটি ১৯৪৭ সালে লেখা,
কলকাতা শহরের পটভূমিতে। এক যুবক বনবিভাগের চাকরি ছেড়ে নতুন চাকরি
নিয়ে এসেছে শহরে, দ্বিগুন মাইনে ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে।
গল্পটিতে ওই যুবকের ভাষ্যে রচিত হয়েছে কলকাতা শহরে তার একটি দিন
কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা। অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে লেখক দেখেছেন
নাগরিক কার্টেসি, ম্যানার, ফর্মালিটিজ ইত্যাদিকে। যেমন সকালে উঠে
সেভ করতে হবে, সু্যট-কোট পড়ে এবং সেগুলোর ভাঁজ অক্ষত রেখে অফিসে
যাবার চিন্তা করতে হবে। কিন্তু তার সুযোগ কোথায়? যেতে হবে পাবলিক
বাসের গাদাগাদি ভিড়ে কোনোমতে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে, সহযাত্রীদের কাছ
থেকে গালাগালি শুনতে শুনতে। তা-ও যদি নিরাপদে বিনা চিন্তায়
পৌঁছানো যেত! প্রতিমুহূর্তে কোনো একটি দুর্ঘটনার ভয়, কাউকে
বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, যেন সবাই নিজের শার্টের নিচে লুকিয়ে রেখেছে
একেকটি ভয়ংকর ছুরি (ওই সময়টি ছিলো সামপ্রদায়িক দাঙ্গাবিক্ষুব্ধ,
তারই এক চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায় গল্পটিতে)। শেষ পর্যন্ত অফিসে গিয়ে
পৌঁছতে পারলেও, শান্তি মেলে না। দেরিতে পৌঁছানোর জন্য বিব্রত সে,
আসার সময় প্রিয়তম দামি কলমটিও হারিয়ে এসেছে, ওদিকে নতুন মানুষ পেয়ে
অধস্থনরাও তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে চায় এমন ভঙ্গিতে যেন তারাই
উধর্্বতন কর্মকর্তা! অর্থাৎ কোথাও কোনো ইতিবাচকতা নেই এই শহরে _
কেবলই আতংক, যন্ত্রণা, শত্রুতা! কৌতুকপূর্ণ বর্ণনার কারণে গল্পটি
বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠলেও আমাদের মনে জেগে থাকে শহরের এই নিষ্ঠুরতার
কথা। আমাদের তিনি দেখিয়ে দেন এই জীবনের অন্তর্নিহিত
অন্তসারশূন্যতার কথা, নির্মমতার কথা, বহিরঙ্গের চাকচিক্য নয়,
ডুবুরির মতো তিনি গভীর থেকে তুলে আনেন শহুরে জীবনের গ্লানি।
গ্লানিময় এই জীবনের চিত্র আছে প্রতিবিম্ব গল্পেও। অফিসের বড় সাহেব
ঢিলেঢালা পোশাক পছন্দ করেন না বলে তার মন রক্ষার্থে এই গল্পের
নামহীন নায়ক (!) তেতালি্লশ টাকা দিয়ে একটা কোট কিনে ফেলে, যদিও তার
মাসিক বেতন আশি টাকা! সংসারে যদিও হা-করা দারিদ্র, মশারি নেই,
বালিশের ওয়াড় নেই, চুলো জ্বালানোর লাকড়ি পর্যন্ত নেই, তবু তাকে 'এ
সিম্বল অব স্লাগিশনেস' 'ঢিলে বলদ' 'ল্যাবেন্ডিশ' এইসব অভিধা থেকে
নিজেকে রক্ষা করার জন্য কোটটি কেনা ছাড়া উপায় থাকে না _ কারণ 'ওসব
ঘরের জিনিস। না থাকলেও কেউ দেখতে আসবে না।' কিন্তু যথার্থ পোশাক না
হলে চাকরি বাঁচানোই দায়। গল্পের প্রায় পুরোটাই জুড়ে আছে এই যুবকের
অনটনময় সংসার-জীবন আর উল্টোপিঠে অফিসিয়াল কার্টেসি রক্ষার দায় _ এ
দুয়ের কৌতুকপূর্ণ বিবরণ। কিন্তু এর পেছনে রয়ে গেছে এক চোখ ভেজানো
মানবিক গল্পের উদ্ভাসন। অফিস থেকে ফেরার পথে একটি বাড়ির সামনে দিয়ে
আসার সময় একটা ছোট্ট ছেলে এসে তাকে আব্বু বলে জড়িয়ে ধরে, সে ফিরে
তাকাতেই বাচ্চাটি বুঝতে পারে যে, সে ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু যুবকের
চোখে বাড়ির ঠিকানাটা আটকে যায় _ ১১ নং হিম্মত সরদার লেন _ মনে হয়
এই ঠিকানা তার চেনা। বাসায় ফিরতে ফিরতে তার মনে পড়ে _ কোটের পকেটে
সে একটা চিঠি পেয়েছিলো, সেখানেই এই ঠিকানাটি লেখা ছিলো। চিঠিটা
ছিলো এই কোটের পুরনো মালিকের লেখা _ তার বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে,
যদিও সেটা শেষ পর্যন্ত পোস্ট করা হয়নি। সে বাসায় ফিরে চিঠিটা পড়তে
পড়তে দেখা পায় এক অশ্রুসিক্ত গল্পের। কোটের পুরনো মালিকও তার
অফিসের বড় কর্তাদের মন জুগিয়ে চলতে গিয়ে একের পর এক পোশাক পাল্টাতে
বাধ্য হচ্ছিলো এবং শেষ পর্যন্ত এটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো,
সন্দেহের দৃষ্টি পড়েছিলো তার ওপরে, এত কম মাইনের একজন কেরানি
কীভাবে এত বাহারি পোশাক পড়ে _ এই সন্দেহের বলি হয়ে সে চাকরিটা
হারিয়েছিলো। তারও ছিলো ঘরভর্তি দারিদ্রের হাহাকার, কিন্তু চাকরি
বাঁচানোর তাগিদে তাকে পোশাকের দিকে নজর দিতে দিতে নিজেই পড়েছিলো এক
দুরারোগ্য ব্যাধিতে, এবং অবশেষে অকালেই মৃতু্যর কাছে হার মানতে
বাধ্য হয়েছিলো। এই গল্পে নাগরিক জীবনে, বিশেষ করে অফিসপাড়ার অহেতুক
কার্টেসি, পোশাক-আড়ম্বর এবং ঊধর্্বতনদের অমানবিক আচরণকে চাবুকাঘাত
করা হয়েছে। কিন্তু সেই সঙ্গে গল্পের নামহীন নায়কের অসহায়ত্বও
চমৎকার কুশলতায় উঠে এসেছে _ ওই যুবক আসলে সে ওই কোটের পুরনো
মালিকের মধ্যে নিজের জীবনের ছায়া দেখতে পায়, অনুভব করে সে-ও ওই একই
জীবনের শিকার, হয়তো পরিণতিও হবে একইরকম।
এদিক থেকে দেখতে গেলে ঘুপচি গলির সুখ গল্পের হানিফের আচরণটিকে
এসবের বিরুদ্ধে একটি নীরব প্রতিবাদ হিসেবে দেখা চলে। গল্পের
শুরুতেই লেখক আমাদেরকে জানাচ্ছেন _'পরীক্ষার খাতায় পঁয়ত্রিশ নম্বর
আর পঁয়ত্রিশ টাকার চাকরি _ এই ছিল হানিফের চরম আকাঙ্ক্ষা।' তার
দুটো আকাঙ্ক্ষাই পূরণ হয় এবং 'ক'- না জানা করিমনকে নিয়ে সে 'নাজিরা
বাজারের এক ঘুপচি গলির শেষে, শাহী নর্দমার পাশে, খানদানী দেয়ালের
বেষ্টনীর মধ্যে একটা কোচোয়ানি কুড়েঘরে' জীবন শুরু করে। ৫৩ টাকার
চাকরিতে আর কুড়েঘরের জীবনে সে সুখি, কারণ _ 'মানুষের আকাঙ্ক্ষার
শেষ নেই বলে নাকি মানুষ সুখী নয়। তাকে পৃথিবীর অর্ধেক দিয়ে দিলেও
নাকি সে খোঁজ করবে _ বাকী অর্ধেক কোথায়? জীবনে সুখী হওয়ার জন্যে
তাই অনেক সাধ্যসাধনা করে হানিফ আকাঙ্ক্ষা দমনের অনেককৌশল আয়ত্ব
করেছে।' আবু ইসহাকের কৌতুকপূর্ণ বিবরণ তুলে ধরার জন্য এই গল্প
থেকে একটু দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
পোলাও- কোর্মা আমাদের পকেট খালি ও পেট খালাস করে দেয়। তাই ভেবে
আমার স্ত্রী তা রাঁধতে শিখেনি। তবে গুঁড়ামাছ, শাক, ডাল আর ভাত
রান্নায় সে দক্ষহস্ত। মিলের মোটা শাড়ি তালি দিয়ে দিয়ে পড়তে সে
অভ্যস্ত। স্বামীর খেদমতে সর্বক্ষণ ব্যস্ত, কারণ তার পায়ের তলায়
নাকি বেহেশত। মাসের শেষের দিকে নুন-ভাত খেয়ে তৃপ্ত। মিতব্যয়িতার
বুদ্ধিতে দীপ্ত। ম্যালেরিয়া জ্বরে না হয় জব্দ। স্বামীর কটু কথায় না
করে শব্দ।
কিংবা _ স্ত্রী খুশি। কারণ এহেন বাসায় তার পর্দার কোনোরূপ বরখেলাপ
হবে না। আর বাচ্চাকাচ্চাদের গায়ে বাও-বাতাস লেগে অসুখ করবে না। ...
হানিফ মহাখুশী। কারণ বেনারসী, জামদানী, ক্রেপ, জর্জেটের ঝলমলানি আর
সোনা গয়নার চকমকানি তার স্ত্রীর চোখে জ্বালা ধরাবে না। এসেন্স আর
সুবাসিত তেলের সুগন্ধ নর্দমার দুর্গন্ধ ছাপিয়ে তার নাসারন্ধ্রে
প্রবেশ করবে না। রুজ-লিপস্টিক দূরের কথা, হেজলিন পমেডের অস্তিত্ব
আবিষকৃত হবে না কোন দিন। বিজলি বাতির আলো চোখ ধাঁধাবে না। সিনেমার
বিজ্ঞাপন অনধিকার প্রবেশ করবে না। আর রেডিওর গান শরিয়ত বরবাদ করবে
না। ...
অথবা _ ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্যে হানিফ একটুও ভাবে না। বড় ছেলে
মেয়ে দুটো ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে পড়ছে। সরকারী খরচে নাম আর নামতা
গোণা পর্যন্ত শিখলেই হল, তার বেশি নয়। ...বেশি পড়লেই ছেলেগুলোর চোখ
খুলবে, ভ্রু কুঁচকাবে, বড় চাকরির দূরাকাঙ্ক্ষা করবে। কোন মতে একটা
বড় চাকরি যদি জুটে যায় কারো, তবে তার আকাঙ্ক্ষার পাখি খুশিমত উড়তে
না পারলে খালি হায়-আফসোস করবে _ অমুকের তমুক জিনিসটা কিনেছে তার
জিনিসটা বড্ড কদাকার। অমুক জিনিসটা না হলে ইজ্জত বাঁচে না। ...তাই
হানিফের মত হচ্ছে _ অধিক বিদ্যা ভয়ঙ্করী, অল্প বিদ্যা শুভঙ্করী।
চাকচিক্যপূর্ণ ভোগবিলাসের জীবনের প্রতি এ যেন এক তীব্র বিদ্রুপ।
হানিফ তার চারপাশে যে দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে তুলেছে তা হয়তো ওই
জীবনের প্রতি তার অনাগ্রহ নয়, বরং নিজের অক্ষমতার প্রতি সচেতন বলেই
এ ছাড়া তার আর করার কিছুই থাকে না। এবং পাঠকের মনে হয় _ ওই জীবনের
লোভে গ্লানিময় জীবনযাপনে বাধ্য হওয়ার চেয়ে বরং এরকম দুর্ভেদ্য
দেয়াল গড়ে তোলা অনেক ভালো।
৪.
বেশ কিছু গল্পে আবু ইসহাক ধর্মীয় কুসংস্কারকে তীব্রভাবে বিদ্রুপ
করেছেন যেমন _ কানাভুলা, প্রতিষেধক, বোম্বাই হাজী, শয়তানের ঝাড়ু,
সাবীল ইত্যাদি। কিন্তু এ-ধরনের গল্পের মধ্যে দাদীর নদীদর্শন
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সবগুলো গল্পেই বিদ্রুপ আছে বটে, কিন্তু তা
এত সূক্ষভাবে, গল্পের মধ্যে এমন সুকৌশলে তা প্রবিষ্ট যে, কখনো
সেগুলোকে আরোপিত বা উচ্চকিত বলে মনে হয় না, মেসেজটি পাওয়ার সঙ্গে
সঙ্গে নিছক একটি গল্পপাঠের আনন্দও পাঠকের মনে সমানভাবে জেগে থাকে।
দাদীর নদীদর্শন গল্পের মৌলবী দাদী তার ষাট বছরের জীবনে কোনোদিন
নদী দেখেননি। কারণ _'ছ'হাত উঁচু দেয়াল-ঘেরা এ মীরহাবেলী তাঁর বাপের
বাড়ি ও শ্বশুর বাড়ি। তাই কৈশোরের পর তাঁকে এ দেয়ালের বাইরে যেতে
হয়নি কোনদিন। মীরহাবেলীতে মৌলবী দাদী বলে একজন আছেন, এটুকুই
বাইরের লোক জানে। তারা কেউ তাঁকে কখনো চোখে দেখেনি। দেখবে কেমন
করে? গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তিনি ভুলেও একবার বাড়ির বৈঠকখানায়
ঢোকেননি।...দাদীর পর্দানিষ্ঠার অনেক কাহিনী উপমা হিসেবে মোল্লা-
মৌলবিরা তাঁদের ওয়াজে বয়ান করে থাকেন।' যেমন বিয়ের আগে চুল
আঁচরানোর সময় চাচাতো ভাই তাকে দেখে ফেললে তিনি মাথা ন্যাড়া করে
ফেলেছিলেন। তিনি ডাক্তারি ওষুধ খান না কারণ হারাম জিনিস ছাড়া নাকি
ওষুধই হয় না। 'ওষুধের মত অনেক কিছুই দাদী খান না। যেমন প্যাকেট করা
বিস্কুট, কৌটোয় ভরা মাখন, লেবেল-লাগানো বোতলের চাটনী, মোরব্বা,
জেলী আরো কত কি! তার মতে এগুলো বিলেতী। নাম-না-জানা চকমকে ঝলমলে
নতুন কিছু হলেই সেটা বিলেতী এবং হারাম।' ... 'মীর-গৃহে গৃহ-বিবাদ
হয়েছে অনেকবার। এই বিবাদকে দাদী বলেন জেহাদ। জেহাদ হয়েছে ছেলেদের
ইংরেজী পড়া নিয়ে, গ্রামোফোন রেডিও বাজানো আর দেয়ালে ছবি টানানো
নিয়ে।' এমনকি 'একবার মেঘের জন্যে ঈদের চাঁদ দেখা গেল না। রেডিওর
ঘোষণা শোনা গেল _ বোম্বাইয়ে চাঁদ দেখা গেছে, কাল ঈদ।' কিন্তু দাদী
মানলেন না, কারণ 'রেডু হইল শয়তানের কল শয়তানই এই খবর দিছে ইনসানকে
দাগা দিবার জন্য। মীর হাবেলীতে ঈদ হল ঈদের পরের দিন।' এহেন দাদী যে
নদী দেখবেন না সে তো বলাইবাহুল্য। কিন্তু নদীই এগিয়ে এলো তাকে দেখা
দেবার জন্যে। মীরহাবেলী ভেঙে গেলো নদীতে। অবশেষে অন্যদের মতো
দাদীকেও নতুন আশ্রয়ে যাবার জন্য নৌকায় উঠতে হলো। 'ভাদ্র মাস।
পদ্মা অসম্ভব ফুলে উঠেছে। দুই পাড় ডুবে যাওয়ায় ধূ-ধূ দেখা যায় অন্য
পাড়। দাদী তাঁর ঘোলাটে বুড়ো চোখ মেলে তাকান খিড়কির পর্দা ফাঁক করে।
ভয় ও বিস্ময়ের ছাপ তাঁর চোখে মুখে। বলেন, এত পানি! খোদার কি কুদরত!
এত পানি কোনখান থিকা আসে, আবার কোথায় যায়, খোদা ছাড়া কেউ জানে না।'
এই বিপুল উত্তাল বহমান স্রোতধারাই তার কাল হয়, দাদী অসুস্থ হয়ে
পড়েন এবং মারা যান। নদী যেন এখানে বহমান-চলমান-অগ্রসর জীবনের
প্রতীক, ধর্মীয় কুসংস্কারে বন্দি দাদীর সঙ্গে যার দেখা হয়নি
কোনোদিন। যখন দেখা হলো তিনি তার ভার সইতে পারলেন না, জীবনের ইতি
ঘটলো তার।
৫.
প্রতীকের ব্যবহার শুধু এই গল্পেই নয় আরও অনেক গল্পেই অত্যন্ত
কুশলতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন আবু ইসহাক। তাঁর অতি বিখ্যাত গল্প
জোক শুধু এর অসাধারণ প্রতীকময়তার কারণেই স্মরণীয় হয়ে আছে বহুবছর
ধরে। ভাগচাষীরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলায়, কিন্তু অর্ধেকই
দিয়ে দিতে হয় মালিককে। তেমনই এক ভাগচাষী ওসমান। বুকসমান পানিতে
নেমে সন্তানের স্নেহে গড়ে তোলা পাটগাছগুলোকে কেটে তুলতে তুলতে তার
শরীরে কখনো কখনো জোক ধরে, রক্ত চুষে পুষ্ট হয়। তার দীর্ঘশ্বাস পড়ে
_ আহা তার মেহনতে ফসলে যদি আর কেউ ভাগ না বসাত! কিন্তু করার কিছু
নেই, তার অমানুষিক পরিশ্রমের ফসলের ভাগিদার সে একা নয়, কারণ জমি
তার নয়। জমির মালিক কোনো কাজ না করেই অর্ধেক নিয়ে যায়, কষ্ট হলেও
এতদিন তারা সেটা মেনে আসছিলো। কিন্তু 'শিক্ষিত' মালিক এবার নতুন
ফন্দি আঁটেন, 'তেভাগা' আইন পাশ হওয়ার সম্ভাবনায় নিরক্ষর চাষীদের
কাছ থেকে টিপসই নিয়ে নেন। কী লেখা ছিলো ওই কাগজে সরল চাষীরা তা
বোঝেওনি, এ নিয়ে প্রশ্নও তোলেনি। ফসল ওঠার পর যখন তারা দেখতে পেলো
_ মালিকের লোকজন ফসলের তিনভাগের দুইভাগ নিয়ে যাচ্ছে, তখনই কেবল
প্রশ্ন জাগে এবং জানতে পারে _ মালিক যে তাদেরকে লাঙ্গল-গরু কেনার
জন্য টাকা দিয়েছে ওই কাগজে সেটাই লেখা ছিলো, যদিও মোটেই সেটা
ঘটেনি। তারা প্রতারিত হয়, অনুভব করে _ জোকের মতই এরাও তাদের রক্ত
চুষে খাচ্ছে। পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে পাট তোলার সময় জোকের রক্ত চুষে
খাওয়ার প্রতীকে এই গল্পে আবু ইসহাক এক অসামান্য কুশলতায়
শ্রেণীবিভক্ত এই সমাজের শোষণের চিত্রটি এঁকেছেন। গল্পটিতে পাটচাষের
বিভিন্ন পর্যায়ের যে সূক্ষাতিসূক্ষ বর্ণনা আছে, সেটা একমাত্র একজন
অভিজ্ঞ কৃষকের পক্ষেই দেয়া সম্ভব। আবু ইসহাক কত গভীরভাবে ওই জীবনকে
চিনতেন এই একটি গল্পেই তার সাক্ষ্য রয়েছে। মনে হয় ওই কৃষকের সঙ্গে
সঙ্গে তিনিও ডুব দিয়ে দেখেছেন পাট কাটার দৃশ্য, কিংবা কে জানে হয়তো
নিজেও কেটেছেন তাদের সঙ্গে। আবু ইসহাকের দেখার অতলস্পর্শী চোখ
আমাদেরকে এমনটি ভাবার জন্য প্রলুব্ধ করে।
|
| |
 |
|