আমাদের বেড়ে ওঠা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমি এর
আগের লেখাটিতে বলেছিলাম _ আমাদের সময়ে বাংলাদেশ যে-কয়েকটি
অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে মিডিয়ার
আশ্চর্য উত্থান। সমাজ-জীবনে, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে,
সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে মিডিয়ার প্রভাব এখন অপরিসীম।
আমাদের সাহিত্য চর্চা এবং সাহিত্যে আমাদের অর্জন ও ব্যর্থতা,
প্রকৃত লেখক হওয়ার চেয়ে তারকা লেখক হওয়ার প্রবণতা ইত্যাদি নিয়েও
কিছু কথা বলার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলাম। এই লেখাটিতে সেরকম একটা
চেষ্টা করবো। কিন্তু তার আগে আমাদের সময়ের সাহিত্যের পরিমণ্ডল নিয়ে
কিছু কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি।
আমরা যখন লিখতে এসেছিলাম _ নব্বই দশকের শুরুতে _ তখনও আশির উত্তাপ
প্রবলভাবেই টের পাওয়া যাচ্ছিলো, আর এই উত্তাপ একইসঙ্গে আমাদের জন্য
ছিলো স্বস্তি ও অস্বস্তিকর। অস্বস্তির কারণটি আগে বলা যাক। বাংলা
সাহিত্যে দশক বিভাজন নিয়ে বিতর্কটা পুরনো হলেও এখনও এর কোনো সুরাহা
হয় নি। এটা ভালো কী মন্দ সে বিষয়ে কোনো মীমাংসায় পৌঁছুনো যায় নি।
প্রায় সবাই-ই এর সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য করলেও দশক বিভাজন চলছে এবং
আগামীতেও চলবে বলে ধারণা করি। এই বিভাজন একইসঙ্গে সুবিধা ও সংকট
তৈরি করেছে, আর এ দুটোই ভোগ করে প্রধানত তরুণ লেখকরা। এখন এমন একটা
অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, তরুণদেরকে চিহ্নিত করার জন্য এর কোনো বিকল্প
পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু চিহ্নিত করাই নয়, তাদের পরিচিতি পাওয়া সহজ
হয় এবং আলোচনায় তাদের নাম উঠে আসে এই বিভাজনের জন্যই। এটুকু তাদের
জন্য সুবিধাজনক। আবার অসুবিধাটি হলো _ কোনো একটি দশক যদি খুব ফলবান
হয় বা প্রবলভাবে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে পরবর্তী দশকের লেখকদের জন্য
নিজেদের একটি জায়গা তৈরি করে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আগেই বলেছি _ আশির
উত্তাপ আমাদের জন্য ছিলো অস্বস্তিকর _ কারণ, তখনও তারা এমন কিছু
বুড়িয়ে যান নি, বরং অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে তখন তারা নবাগত
তরুণদের কাছে ঈর্ষণীয় চরিত্র, দাঁড়িয়েও আছেন প্রবলভাবে, আমাদের
কাছে একেকটি নাম যেন একেকটি প্রতীক, দ্রোহের ও সৃজনশীলতার প্রতীক।
এই প্রবল লেখকদের পাশে আমরা দাঁড়াবো কীভাবে? অস্বস্তির কারণটি ছিলো
এ-ই। কারণ আরও ছিলো _ আশির লেখকরা শুধু যে দ্রোহী এবং সৃজনশীল
ছিলেন তাই নয় _ একইসঙ্গে ছিলেন নিজেদের সময় ও কাজ নিয়ে অহংকারী,
বহুদিন পর্যন্ত তারা পরবর্তী লেখকদের দিকে ফিরেও তাকান নি, তাদের
গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-উপন্যাস পড়া তো দূরের কথা, খোঁজখবর রাখার বা
এমনকি দেখা হলে কথা বলারও প্রয়োজন অনুভব করেন নি। সুখের কথা _
তাঁদের এই তাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণ তরুণদের মধ্যে হীনমন্যতার জন্ম না
দিয়ে জন্ম দিয়েছিলো জেদের, তারা তাদের মতো করে লিখে গেছেন এবং
কেবলমাত্র লেখার মাধ্যমে _ কোনোরকম গোষ্ঠীবদ্ধতা, কোনোরকম আন্দোলন
ছাড়াই এই দশকটি ফুলে-ফলে বিকশিত হয়ে উঠেছে।
স্বস্তির কথাটি বলতে হলে আমাদেরকে আরেকটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে,
কথা বলতে হবে আমাদের সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে। এই কথাগুলো অবশ্য আমি
অন্যত্র খানিকটা বলেছি, তবু প্রয়োজনের খাতিরে কিছুটা পুনরাবৃত্তি
করতে হচ্ছে। আজকের যে বাংলাদেশের সাহিত্য, তার যাত্রা শুরু হয়েছিলো
চলি্লশের দশকের বিহ্বল একটি সময়ে, বাঙালি মুসলমান তখন অতিক্রম
করছিলো এক অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল _ দ্বিজাতি-তত্ত্বের আফিম খেয়ে
ভুল স্বপ্নে মেতে ওঠা এক বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন-কল্পনা ও
আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার, মূল্যবোধ ও জীবনাচরণের সচিত্র সচল
উপস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন হাতে গোণা কয়েকজন মাত্র
সাহিত্যকর্মী। কবিতা ও কথাশিল্পে এই প্রথম একসঙ্গে বেশ কয়েকজন
মেধাবী তরুণ পাওয়া গেলো এই অঞ্চলে, এর আগে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে
একসঙ্গে এত লেখক কখনো দেখা যায় নি। এঁরা যদিও বহমান বাংলাসাহিত্যের
উত্তরাধিকার ছিলেন, তবু অস্বীকার করা যাবে না _ তাঁদের সামনে খুব
গভীর একটি সমস্যাও ছিলো। একটি নতুন রাষ্ট্র আর তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা
স্বপ্ন, মানুষের জীবনাচরণে নব্য রাষ্ট্রের নতুন ধরনের খবরদারী
ভূমিকায় সৃষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এত সহজে রূপায়ন করা সম্ভব ছিলো না।
তাছাড়া, এ অঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান, এতদিন পর্যন্ত
বাংলা সাহিত্যে মোটামুটিভাবে উপেক্ষিতই ছিলো, ফলে এক্ষেত্রে কোনো
ঐতিহ্যের ভাগীদার তাঁরা হতে পারেন নি। তা সত্ত্বেও একটি বিষয়
স্বীকার করতেই হবে, তাঁদের আন্তরিক চেষ্টা এবং আমৃতু্য সাহিত্যের
প্রতি তাঁদের কমিটমেন্ট আমাদের সাহিত্যর একটি ভিত রচনা করে
দিয়েছিলো। বাংলাদেশের সাহিত্য প্রাথমিক পর্ব পেরিয়ে কৈশোরে পা
রাখলো পঞ্চাশের দশকে। এই সময়টিও ছিলো নানা দিক থেকেই বিহ্বলতার।
স্মৃতিতে তখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে তেতালি্লশের দুর্ভিক্ষ, ছেচলি্লশের
সামপ্রদায়িক দাঙ্গা, আর দেশবিভাগজনিত আবেগ-বিহ্বলতা ও হাহাকার।
দু-বাংলার শেকড়হীন মানুষ _ উদ্বাস্তু, অসহায় _ নতুন দেশে বসবাসের
জন্য তাদের চোখ, স্বপ্নে নয়, বেদনায় ম্লান। মানুষ কীভাবে তার
শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবাহী জন্মভূমি, নদী, আকাশ আর প্রান্তর ছেড়ে
ভালো থাকবে? এরই মধ্যে ঘটে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্বব্যাপি
দীর্ঘদিনের লালিত মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ; হতাশা, অবক্ষয় বাড়ছে
_ মানুষ যেন হঠাৎই উপস্থিত হয়েছে তার চূড়ান্ত পরিণতির সামনে।
সামাজিক-রাজনৈতিক-বৈশ্বিক পরিস্থিতি বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে
একজন লেখকের মধ্যেই। যে অদ্ভুত সময়ে পঞ্চাশের লেখকরা লিখতে শুরু
করেছিলেন, সহজ ছিলো না সময়টিকে সাহিত্যে ধারণ করার _ অন্তর্গত
রক্তক্ষরণ যতই হোক না কেন! ততোদিনে অবশ্য চলি্লশের লেখকরা বেশ
স্থিত। নতুন রাষ্ট্রপ্রাপ্তির আফিম মার্কা মোহ ইতিমধ্যেই কাটতে
শুরু করেছে, পূর্ব বাংলার মানুষ জারিত হচ্ছে তাদের প্রকৃত
জাতিসত্ত্বার অহংকারে, প্রস্তুত হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের মতো অনন্য
ইতিহাস নির্মাণ করার জন্য। পাকিস্তান সৃষ্টির অল্প কিছুদিনের
মধ্যেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা এ অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত
জাতিসত্ত্বাকেই মূর্ত করে তুলেছিলো, আর এই জাতির বিকাশ ও মনন
চর্চায় অবদান রাখার জন্য অনিবার্যভাবে মেধাবী সাহিত্যশিল্পীদের
আগমনও ঘটেছিলো। এই সময়ে যারা এলেন তাঁরা অনেকটা নীরবেই একটি যুদ্ধ
করে গেছেন _ রাষ্ট্রের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল উপেক্ষা করে নিজ
ভাষাকে টিকিয়ে রাখার, নিজের ভাষায় সাহিত্য রচনার এবং এর একটি
মানসম্মত রূপদান করার যুদ্ধ। আর এই পটভূমিতেই বাংলাদেশের সাহিত্য
প্রথমবারের মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য বাঁক পরিবর্তন করে ষাটের দশকে। সময়টি
ছিলো অস্থিরতার, কিন্তু ক্ষেত্র তৈরী হচ্ছিলো স্থির লক্ষ্য তৈরী
করার। কী আমাদের পরিচয় _ এই প্রশ্ন প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছিলো তখন।
ততোদিনে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রতত্ত্বের মোহ কেটে গেছে। বাঙালি
দাঁড়িয়ে আছে তার আত্নপরিচয়ের প্রশ্ন সামনে নিয়ে। সেই অর্থে সময়টি
নানাদিক থেকে সংকট ও নির্মাণেরও বটে। একদিকে জাতীয়তাবোধ ও
স্বাতন্ত্র্যবোধ নির্মাণের প্রবল প্রচুর প্রক্রিয়া, অন্যদিকে
বাঙালির বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র। পূর্ববতর্ী অর্থাৎ পঞ্চাশের
লেখকরা যেন কিছুটা হতভম্ব ছিলেন নতুন রাষ্ট্রপ্রাপ্তিতে, ষাটের
লেখকরা অনেক বেশি স্থির হয়ে উঠেছিলেন আত্নপরিচয়ের প্রশ্নে।
সাহিত্যের ভূমিটি তখনো ছিলো কিছুটা নরম-কর্দমাক্ত। বীজক্ষেত্র
কীভাবে নির্মিত হবে সেটি নির্ভর করছিলো লেখকদের ওপরই। আমাদের
সৌভাগ্য এবং এটা মহান শিল্পবোধের একটি ঐতিহ্যও বটে যে, তাঁরা
আত্নপরিচয়ের প্রশ্নে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন, নইলে বাংলাদেশের
সাহিত্য আরও অনেকখানি পিছিয়ে থাকতো। এই দ্বন্দ্ব ও সংকটমুখর সময়ে
ষাটের সাহিত্যকর্মীরা নিয়ে এসেছিলেন প্রথা ভাঙার তীব্র জেদ, নতুন
কিছু নির্মাণের আন্তরিক, উদ্দাম উচ্ছ্বল প্রচেষ্টা। পূর্ববর্তী
লেখকদের ট্র্যাডিশনাল(!) সাহিত্য চর্চাকে তীব্র কণ্ঠে অস্বীকার
করে, তারুণ্যের অহংকারকে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট করে দিয়েছিলেন
সাহিত্যের সঙ্গেই। এর জন্য যে দীপ্ত, উজ্জ্বল তরুণ গোষ্ঠী প্রয়োজন
ষাটের তা ছিলোও। তখন থেকে আজ পর্যন্ত ষাটের লেখকরাই সবচেয়ে বেশি
সক্রিয় এবং প্রভাবশালী হয়ে আছেন। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে,
তাঁদের তুমুল সক্রিয়তা ও সৃজনশীলতা আমাদের সাহিত্যের গতিমুখ ঠিক
করে দিয়েছিলো, তবে এই প্রভাবের পেছনের কারণটি যে শুধু তাঁদের
সৃজনশীলতা এবং বিরামহীন সাহিত্যচর্চা _ তা নয়, ষাটের লেখকরা অবিরাম
নিজেদের সময় এবং সহযাত্রী লেখকদের সম্বন্ধে অবিরাম বলে গেছেন, এখনও
বলে যাচ্ছেন। নিজেদের কথা নিজেরা বলার ক্ষেত্রে ষাটের জুড়ি নেই,
এবং বলতে বলতেই নিজেদের সময় সম্বন্ধে এমন একটা ইমেজ তাঁরা দাঁড়
করিয়েছেন যে, মনে হয় তাঁদের প্রতিভাকে অতিক্রম করার যোগ্যতা আর
কারও নেই। ষাটের এই প্রবল অবস্থানের কারণেই সত্তরের লেখকরা
নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন, এমনকি মাথা তুলে দাঁড়াতেও প্রচুর সময়
লেগেছে তাঁদের, যদিও সত্তর দশক নিয়ে এসেছিলো এক অভূতপূর্ব ও
অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য। উনসত্তরের গণ-অভু্যত্থানের ও
সত্তরের প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসের দাগ তখনো শুকোয় নি এই দেশ থেকে _
তার মধ্যেই এলো একাত্তর। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। শতাব্দী
শতাব্দীতে এরকম ঘটনা একবারই ঘটে। সুমহান ত্যাগ ও বীরত্বের গৌরবে
ভাস্বর, আকাশ-সমান স্বপ্ন, অপরিমেয় রক্তপাত ও নারীর সম্ভ্রমহানী,
নিরীহ-নিরস্ত্র একটি জাতির হঠাৎ যোদ্ধা হয়ে ওঠার অভূতপূর্ব ঘটনা,
একটি শোষণহীন মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় _ এসব নিয়েই তো
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। যে বিশাল স্বপ্ন নিয়ে এই জাতি অংশ নিয়েছিলো
যুদ্ধে তা কি পূরণ হয়েছে? হয় নি তো! মূলত সত্তর ছিলো এক
দ্বন্দ্বমুখর বহুবিচিত্র অভিজ্ঞতার দশক। ত্যাগ ও স্বপ্ন মিলে জাতীয়
জীবনে যে আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিলো _ স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছর
খানেকের মধ্যে শাসককুলের বর্বরতার ফলে তাতে ধুলো জমতে থাকে। আকাশ
সমান স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, অন্তসারশুন্য রাজনীতি,
বিশৃঙ্খলা, নেতৃত্বের ব্যর্থতা, শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন দুনর্ীতি ও
বর্বরতা, রক্তাক্ত যুদ্ধজয়ের পরও প্রিয় স্বদেশভূমিতে বিতর্কিত
রক্তপাত, হতাশা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, হাহাকার, ক্ষুধা, মানবতার
হৃদয়হীন পদদলন, প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার ধারক বাহকদের ওপর শাসকদের
প্রতিহিংসাপরায়ণ রোষ, একাত্তরের ঘাতকদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা,
দুর্ভিক্ষ, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক
মৃতু্য ঘোষণা, সর্বোপরি স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র চার বছরের মাথায়
স্বাধীনতার প্রধান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড _
ইত্যাদি সংখ্যাহীন নেতিবাচক ঘটনা প্রবল আঘাত হানলো মননশীল মানুষদের
মেধা ও চেতনায়। যে সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বাংলাদেশ
যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলো সেই সামরিক জান্তাই ভিন্ন রূপ নিয়ে দখল
করলো এই দেশ। ক্ষমতার মসনদে সদম্ভ প্রত্যাবর্তন ঘটলো ঘাতকদের। এসব
মিলিয়ে সত্তর ছিলো প্রায় সম্ভাবনাহীন নেতিবাচকতার দশক। এমন একটি
সময়েই বেড়ে উঠছিলেন এই সময়ের লেখকরা। কে না স্বীকার করবেন যে,
লেখকরাই সমাজের সবচেয়ে স্পর্শকাতর গোষ্ঠী ; আর তার সঙ্গে যদি যোগ
হয় অসহায় তারুণ্য _ অসহায়, কারণ এসব নেতিবাচকতার বিরুদ্ধে তাদের
করার ছিলো না কিছুই _ তাহলে এসব ঘটনা কতোটা অস্থিরতা ও বিপন্নতা
সৃষ্টি করতে পারে, সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু যে বহুবিচিত্র
অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এঁদের বেড়ে ওঠা, তার কতোটুকু ধারণ করতে
পেরেছেন তাঁরা, তাঁদের রচনায়? অবশ্য এরকম প্রশ্ন তোলাটা খুব বেশি
বিবেচনাপ্রসূত নয়। একজন লেখক যে সবসময়ই তার লেখায় সমকালকে ধারণ
করবেন এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। সাহিত্য তো বহুমাত্রিক _
সমকালকে ধারণ করা তার একটি মাত্র উপাদান। সবদিক বিবেচনা করলে এই
সময়ের কয়েকজন লেখকের অর্জন উল্লেখযোগ্যতার দাবী রাখে; কিন্তু এই
সময়েই সাহিত্যক্ষেত্রে যে গুণগত পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে গেছে তার
দায়-দায়িত্বও তাঁদের ওপরই বর্তায়। বিশেষ করে হুমায়ুন আহমেদ ও
ইমদাদুল হক মিলনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহিত্যে জনপ্রিয় সাহিত্যের
যে ক্ষতিকর ধারাটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার প্রতিক্রিয়া বেশ
দীর্ঘস্থায়ী হবারই কথা। এই সময়ে অসংখ্য সাহিত্যবোধহীন রচনা
পুুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে, পাঠকের কাছে পৌঁছেও গেছে দ্রুত।
সাহিত্যের পাঠক বাড়ানোর যে ক্রেডিট তাদেরকে দেয়া হয়, সেইসব পাঠক
হুমায়ূন বা মিলন ছাড়া আর কিছু পড়েন কীনা সন্দেহ করি। তাহলে আর
সাহিত্যের পাঠক বাড়লো কোথায়? এমনকি তারা হুমায়ূন বা মিলনের উন্নত
শিল্পমূল্য সম্পন্ন লেখাগুলো পড়েন কী না এ নিয়েও সন্দেহের অবকাশ
রয়েছে। এই দুই লেখকের পাঠকরা তাদের প্রিয় লেখকদের উন্নত রচনাগুলো
যদি একটু উল্টেপাল্টে দেখতেন তাহলে নিঃসন্দেহে তাদের
সাহিত্যসংক্রান্ত ধারণাগুলো কিছুটা হলেও পাল্টে যেতো। ষাটের
লেখকদের তুমল সক্রিয়তার ফলে সাহিত্যের গতিমুখ নির্ণিত হয়ে যাওয়ার
পরও সত্তরের অদ্ভুত অাঁধার ও জনপ্রিয় সাহিত্যের ডামাডোলে সাহিত্য
নামক স্পর্শকাতর শিল্পমাধ্যমটি ঘোর দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আশির
দশকে যাঁরা এলেন, প্রথমেই তাঁদের প্রয়োজন হয়ে পড়লো এই নষ্ট স্রোতের
বিরুদ্ধে তারুণ্যের দ্রোহী চেতনা নিয়ে দাঁড়াবার। সাহিত্যের মতো
সমাজ ও জাতীয় জীবনেও তখন অদ্ভুত এক অাঁধার নেমেছে। অমানবিক সামরিক
শাষণ চেপে বসেছে বাংলাদেশের বুকের ওপর। হতাশা ও নৈরাজ্য বেড়ে চলেছে
প্রতিদিন। সামরিক সরকারের কূটচালে দুর্নীতি যেমন সর্বগ্রাসী রূপে
চেপে বসেছে বাংলাদেশে, সাহিত্যভুবনেও পড়েছে তার প্রভাব।
সাহিত্যিকরা শিবির বিভক্ত। একদল বঙ্গভবনে, অন্যদল রাজপথে; কবিতা
শ্লোগান মুখর, কথাসাহিত্যকে পিঠে করে বয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে
'জনপ্রিয়তা' নামক এক উদ্ভট উট। এরকম একটি ক্রান্তিকালে আগমন ঘটেছিল
আশির লেখকদের। এবং এসে তাঁরা কবিতার এই শ্লোগানমুখরতা আর
কথাসাহিত্যের জনপ্রিয় ধারার বিরুদ্ধে তারুণ্যের দ্রোহ নিয়ে
দাঁড়ালেন। আর একথা তো এখন কারোরই অজানা নয় যে, দ্রোহী তারুণ্যকে
একমাত্র লিটল ম্যাগাজিনই ধারণ করতে পারে। দেশের দৈনিক পত্রিকার
সাহিত্য সাময়িকী ও সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক ম্যাগাজিনগুলো যখন পাঠক
মনোরঞ্জনে ব্যস্ত, জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যকে যাবতীয়
আশ্রয়-প্রশ্রয়-প্রেরণা দেয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত তখন অনেকটা
নিঃশব্দেই লিটল ম্যাগাজিনগুলো আশ্রয় দিয়েছে তরুণ লেখকদের। সম্ভবত এ
কারণেই ষাটের পর আশিতে এসে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন আবার মাথা উঁচু
করে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের এই আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থান _
অনেক ভুলত্রুটি সত্ত্বেও _ আমাদের জন্য স্বস্তি বয়ে এনেছিলো।
২.
এটা মোটামুটি একটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে যে, যে-কোনো প্রজন্মের
লেখকরা লিখতে এসেই তাদের নিকটবর্তী অগ্রজদের অস্বীকার করে। তিরিশের
দশকেই এটা শুরু হয়েছিলো। সবাই জানেন _ তিরিশের কবিরা
রবীন্দ্র-বিরোধিতার নামে মূলত অগ্রজদেরকেই অস্বীকার করতে
চেয়েছিলেন। তাঁদের সামনে যেহেতু রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর তেমন কোনো
শক্ত প্রতিপক্ষ ছিলো না, তাই রবীন্দ্রনাথই টার্গেটে পরিণত
হয়েছিলেন। এরকম ঘটনা পঞ্চাশের দশকে পশ্চিমবঙ্গে, এবং ষাটের দশকে
দুই বাংলায়ই ঘটেছিলো। আরেকটি নিয়মের কথা আগেই বলেছি _ কোনো একটি
দশক প্রবল হলে পরের দশকটি ম্রিয়মান হয়। আশির লেখকরাও তাদের
পূর্ববর্তী প্রজন্মকে অস্বীকার করেছিলেন এবং এই অস্বীকারের মধ্যে
দিয়েই নিজেদের প্রবল ইমেজ দাঁড় করিয়েছিলেন। রীতি-অনুযায়ী নব্বইয়ের
লেখকরা আশিকে অস্বীকার করতে পারতেন, কিন্তু এখানটায় এসে তারা
প্রথমবারের মতো নিয়ম ভাঙেন। তারা আশির লেখকদের অস্বীকার তো করেনই
নি, বরং বরাবর তাঁদের প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে এসেছেন। আশির লেখকরা
অবশ্য বিষয়টি বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছেন, ব্যস্ত থেকেছেন নিজেদের
নিয়ে, ষাটের মতো তাঁরাও নিজেদের কথা নিজেরাই বলে গেছেন অবিরাম,
চারপাশে ফিরে দেখেন নি যে কোথায় কী হচ্ছে, ফলে তরুণদের আগ্রহ থাকা
সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কটি গড়ে উঠতে পারে নি। দ্বিতীয় নিয়মটিও
নব্বইয়ের লেখকরাই ভেঙেছেন। প্রতাপশালী আশির পরে নব্বই ম্রিয়মান হয়ে
ওঠার সম্ভাবনা ছিলো। সেটা হয় নি, বরং এখন, এই এতদিন পর, এসে মনে
হচ্ছে _ নব্বই আশির চেয়েও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এর অনেকগুলো
কারণের মধ্যে প্রথমটি হলো _ নব্বইয়ের লেখকরা কথার চেয়ে কাজ বেশি
করেছেন। অর্থাৎ বেশ কয়েকজন কথাশিল্পী ও কবি কোনোদিকে না তাকিয়ে,
কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে নিয়মিত লিখে গেছেন অর্থাৎ আগাগোড়া
সক্রিয় থেকেছেন, এবং একইসময়ে কোনো এক অজ্ঞাত এবং অনির্ণেয় কারণে
আশির অধিকাংশ লেখকই নিস্ক্রিয় ছিলেন। হাতে গোণা কয়েকজন ছাড়া আশির
অনেক লেখকই কেন তাঁদের লেখালেখিতে দীর্ঘ ছেদ টানলেন সেটা বোঝা
মুশকিল। তাদের এই নিস্ক্রিয়তা এবং অন্যদিকে নব্বইয়ের প্রবল
সক্রিয়তা আমাদের সময়টিকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। নব্বইয়ের লেখকদের
মধ্যে কখনো তেমন কোনো গোষ্ঠিবদ্ধতা তৈরি হয় নি। একসঙ্গে মিলেমিশে
কোনো একটা কিছু করে ওঠা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। এমনকি পারস্পরিক
পরিচয়টিও হয়েছে অনেক দেরিতে, বন্ধুত্ব তো আরও পরের ঘটনা। কিন্তু
একবার সেটা গড়ে ওঠার পর সহসা সেটা ভেঙেও যায় নি, এখন পর্যন্ত
নব্বইয়ের লেখকদের মধ্যে পাস্পরিক বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া অন্যদের কাছে
ঈর্ষণীয় বিষয়। দ্বিতীয় কারণটি হলো _ মিডিয়ার উত্থান, মিডিয়ায় এই
সময়ের তরুণদের প্রভাবশালী অবস্থান এবং তরুণ লেখকদের প্রতি
নানাকারণে মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব। নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর, এরশাদ
সরকার পদত্যাগ করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে প্রথমেই '৭৪-এর বিশেষ
ক্ষমতা আইনে পত্রপত্রিকার বিরুদ্ধে যেসব কালাকানুন ছিলো _ যার
কল্যাণে সরকার যে-কোনো খবর সেন্সর করতে পারতো কিংবা যে-কোনো সময়
যে-কোনো পত্রিকা বন্ধ করে দিতে পারতো _ সেগুলো বিলুপ্ত করে দেন। এই
সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের জগতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন
এনে দেয়। প্রকাশিত হতে থাকে একের পর এক পত্রিকা এবং প্রধানত
তরুণরাই এসব পত্রিকার প্রাণ হয়ে ওঠে। অবশ্য এই পালাবদল শুরু
হয়েছিলো আরও কিছুদিন আগে থেকেই। এরশাদ শাসনামলের শেষদিকে কয়েকটি
সাপ্তাহিক পত্রিকা দুর্দান্ত সাহসিকতার পরিচয় দেয়। এর মধ্যে
সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, বিচিন্তা, প্রিয়প্রজন্ম, পূর্বাভাস,
দেশবন্ধু ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে। তারুণ্যনির্ভর
এসব পত্রিকা সামরিক সরকারের রক্তচক্ষুকে থোড়াই-কেয়ার করে একদিকে
যেমন অসাধারণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে থাকে তেমনই সমাজের অনড়
মূল্যবোধের ওপর হানতে থাকে আঘাত। উদাহরণ হিসেবে সাপ্তাহিক খবরের
কাগজের কথা বলা যায়। এই পত্রিকাটি বিভিন্ন ধরনের কলাম ছেপে একদিকে
যেমন রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছিলো, অন্যদিকে সমস্ত
সামাজিক ও ধর্মীয় প্রচলিত মূল্যবোধের ওপর আঘাত হানার জন্য প্রকাশ
করছিলো তসলিমা নাসরীনের কলাম। মূলত এই কলামগুলোই তসলিমাকে
তারকাখ্যাতি এনে দেয়, নিয়ে আসে আলোচনা সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
কিন্তু এসব কিছুই সম্ভব হতো না যদি সাপ্তাহিক খবরের কাগজের সম্পাদক
এবং প্রকাশক এসব প্রকাশের সাহস না দেখাতেন। (তুলনা হিসেবে বলা যেতে
পারে, এর বছর দশেক পর সাহিত্যপত্রিকা শৈলীতে আকিমুন রহমানের বিবি
থেকে বেগম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করলে আমাদের বৃদ্ধ
বুদ্ধিজীবীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং এর মধ্যে পনের জন প্রথম সারির
বুদ্ধিজীবী (!) আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে এর প্রকাশনা বন্ধ করার দাবি
জানান এবং শৈলী কতৃপক্ষও সেই দাবির প্রতি মাথা নুইয়ে সম্মান জানায়
ও আকিমুনের লেখা প্রকাশ করা বন্ধ করে দেন। এই লেখাটি সমস্ত প্রচলিত
মূল্যবোধের ওপর তীব্র আঘাত হানছিলো বলেই এর এই পরিণতি ভোগ করতে হয়,
কিন্তু তসলিমার মতো সৌভাগ্য আকিমুনের হয় নি, তাঁর পাশে দাঁড়াবার
মতো কোনো সাহসী সম্পাদক ছিলেন না।) যাহোক সাপ্তাহিক খবরের কাগজের
সাফল্যই হয়তো এর প্রকাশক ও সম্পাদককে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের
সাহস জুগিয়েছিলো, এবং এর ধারাবাহিকতায় দৈনিক আজকের কাগজ প্রকাশিত
হয়ে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকার জগতে একটি বিপ্লব সাধন করেছিলো।
আজকের কাগজ বাংলাদেশকে ইত্তেফাক, সংবাদ, দৈনিক বাংলা বা বাংলার
বাণীর যুগ থেকে মুক্তি দিয়েছিলো। এর গেট-আপ, মেকাপে যেমন ছিলো
অভিনবত্ব তেমনি এর নিউজ ট্রিটমেন্ট, ফিচার পাতাগুলোর বিষয়-আশয়েও
ছিলো নতুন যুগ-সূচনার ইঙ্গিত। (মনে পড়ে, কবি রুদ্র মুহম্মদ
শহীদুল্লাহর মৃতু্যর পর আজকের কাগজের সাহিত্য সাময়িকী একটি বিশেষ
সংখ্যা বের করে। চারপাতা জুড়েই ছিলো রুদ্রকে নিয়ে নানারকম লেখা যার
অনেকখানি জুড়ে ছিলো তাঁর বেহিসেবি জীবন যাপনের বর্ণনা। একজন তরুণ
কবির মৃতু্যর পর তাঁর স্মরণে প্রকাশিত হওয়া বিশেষ সংখ্যায় তিনি
মদ্যপান করতেন বা পতিতালয়ে যেতেন _ এসব কথা যে লেখা যায় তা আমার
কল্পনায়ও ছিলো না। এই একটি সংখ্যাই একথা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ঠ
যে, এর সম্পাদক ছিলেন চিন্তাচেতনার দিক থেকে সংস্কারমুক্ত ও
সাহসী।) আজকের কাগজের সাফল্য আরও অনেক দৈনিক পত্রিকার জন্মকে
সম্ভবপর করে তোলে। একে একে প্রকাশিত হয় ভোরের কাগজ, জনকণ্ঠ,
বাংলাবাজার পত্রিকা, মুক্তকণ্ঠ, ট্যাবলয়েড মানবজমিন, প্রথম আলো,
যুগান্তর এবং অধুনা আমার দেশ, আমাদের সময় এবং সমকাল (এর বাইরে আরও
বহু দৈনিক-সাপ্তাহিক বেরিয়েছে এই সময়ে, কিন্তু সবগুলো প্রভাবশালী
মিডিয়া হিসেবে আবিভর্ূত হতে পারে নি)। আগেই বলেছি, এই পত্রিকাগুলো
সমাজ-জীবনে, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে, সাহিত্য-সংস্কৃতি
চর্চার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এই লেখায় শুধুমাত্র
সাহিত্যের ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলোর ভূমিকা নিয়ে দু-চারটি কথা বলতে
চাই। আমাদের সংবাদপত্র জগতে যেমন পরিবর্তন এসেছে, বেড়েছে পাঠক,
তেমনি প্রতিযোগিতাও বেড়েছে অনেক। আরো অনেক বিষয়ের মতো সাহিত্যও
এইসব পত্রিকার সৌন্দর্যবর্ধন এবং গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে ভূমিকা
রেখেছে। বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে সাহিত্যের
পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া গতি নেই, সেটা এইসব পত্রিকার মালিক-সম্পাদকদের
বুঝে নিতে দেরি হয় নি। কিন্তু এত পত্রিকা, সেই তুলনায় লেখকের
সংখ্যা কম, অতএব তরুণদের দিকে চোখ ফেরাতে বাধ্য হলো পত্রিকাগুলো।
আর তাছাড়া, এখন অধিকাংশ পত্রিকার সাহিত্যপাতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট
আছেন নব্বই দশকের লেখকরাই। শুধু সাহিত্য পাতাই বলি কেন,
পত্রপত্রিকার অন্যান্য বিভাগে বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এই সময়ের
তরুণরা পালন করছেন পলিসিমেকারের ভূমিকা। তারা যে নিজেদের সময়ের
লেখকদের খানিকটা হাইলাইট করবেন তা আর অস্বাভাবিক কি? এসব কারণেই
নব্বইয়ের লেখকরা অল্প বয়সেই মিডিয়ার কাছ থেকে ব্যাপক প্রশ্রয়
পেয়েছে। মিডিয়াগুলো শুধু তাদের লেখা ছেপেই ক্ষান্ত হয়নি, তাদের বই
নিয়ে আলোচনা- সমালোচনা করেছে, তাদের লেখা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ করে
দিয়েছে। আমাদের সময়ের আগে অন্য কোনো সময়ের লেখকরা মিডিয়ার কাছে
এতখানি প্রচার পায়নি। শুধু প্রচারই নয়, মিডিয়ার কল্যাণে কোনো কোনো
লেখক রীতিমতো তারকাখ্যাতি পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে একটু বিস্তারিতভাবে
কথা বলা যায়। তবে এসব কথা বলতে হলে দু-চারজনের নামও চলে আসবে
উদাহরণ হিসেবে। যাদের নাম আসবে তারা সবাই আমার বন্ধু বা
বন্ধুস্থানীয় _ আশা করি তারা বিষয়টিকে সহজভাবে গ্রহণ করবেন।
৩.
আমাদের সময়ে প্রথম তারকাখ্যাতি পাওয়া লেখক ব্রাত্য রাইসু। আমরা যখন
লেখালেখির জগতে হাঁটি-হাঁটি-পা-পা করছি তখন রাইসু একটি দৈনিকে সৈয়দ
মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে যৌথভাবে যোগাযোগের সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা
একা লোক _ এরকম একটি চমকপ্রদ শিরোনামে ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন।
ধারাবাহিক উপন্যাস! দৈনিকে! তা-ও যৌথভাবে! এবং সৈয়দ মনজুরুল
ইসলামের সঙ্গে! এর কোনোটিই আমরা তখনও কল্পনাও করতে পারি না, আর
রাইসু সেটাই করে দেখাচ্ছেন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তখন তাঁর বিখ্যাত
কলাম অলস দিনের হাওয়ার কারণে আমাদের কাছে রীতিমতো আকর্ষণীয়
ব্যক্তিত্ব। যৌথভাবে একটা উপন্যাস লেখা তো দূরের কথা, তাঁর সঙ্গে
দেখা হওয়াটাও একটা বিরাট ব্যাপার! রাইসু তাহলে কোথায় ছিলেন, বুঝতেই
পারছেন! আর তাছাড়া, দু-জনে মিলে যে একটি উপন্যাস লেখা যায় তা-ও
আমরা এই প্রথম দেখলাম, যদিও আজ পর্যন্ত আমি বুঝে উঠতে পারি নি
ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে সম্ভব! রাইসু ছিলেন বরাবরই চমকপ্রবণ, অর্থাৎ
চমক দেয়াটা ছিলো তার একটা নেশা। শুধু যে ওই উপন্যাসেই তিনি সেটা
দিয়েছেন তা নয়, দিয়েছেন তার মূলক্ষেত্র _ কবিতায়ও। তার কবিতার বিষয়
এবং ভাষাভঙ্গি ছিলো অভিনব, অদ্ভুত। স্যাটেয়ার করা প্রায় তার
স্বভাবে পরিণত হয়েছিলো এবং এজন্য তথাকথিত অশ্লীল শব্দের অজস্র
ব্যবহার করে পাঠককে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। এর বাইরে সেই সময়ে এবং
তার পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রের খ্যাতিমান কয়েকজন ব্যক্তির ব্যতিক্রমী
এবং আলোচিত সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন রাইসু, এর অনেকগুলো আবার সাজ্জাদ
শরীফের সঙ্গে যৌথভাবে নেয়া। সেই সাক্ষাৎকারগুলোতেও তিনি অনেক
চমকপ্রদ প্রশ্ন ও মন্তব্য ছুঁড়ে দিতেন, যেগুলো ছিলো অসাধারণ
বুদ্ধিদীপ্ত এবং আকর্ষণীয়। আর সাজ্জাদ শরীফের সঙ্গে তার জুটিও তার
তারকাখ্যাতির পেছনে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। সাজ্জাদ শরীফ নানা
কারণে এক ঈর্ষণীয় চরিত্র। আমার দেখা এই সময়ের অন্যতম জ্ঞানী মানুষ
তিনি, কিন্তু তাঁর একটি বড় গুণ, জ্ঞান নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য বড়াই
নেই। অনেককে দেখেছি _ সন্ধ্যায় তরুণদের সঙ্গে কী কথা বলবেন সেই
প্রস্তুতি সকাল থেকেই নিয়ে রাখতেন, এবং অবশ্যম্ভাবিভাবে কয়েকটি
কোটেশন মুখস্থ করে আসতেন, এবং সেগুলো পরিকল্পিতভাবে তরুণদের কাছে
বলে নিজের জ্ঞান জাহির করতেন। সাজ্জাদ ভাইকে কখনো তেমনটি করতে দেখি
নি। তিনি একইসঙ্গে জ্ঞানী এবং বিনয়ী। তাঁর আরেকটি গুণ _ সব
পরিস্থিতিতেই তিনি অসম্ভব রকমের নিরাসক্ত থাকতে পারেন। কোনো
উত্তেজনাই যেন তাঁকে স্পর্শ করে না, অথচ গত দেড় যুগের সাহিত্যজগতের
অধিকাংশ উত্তেজনা তাঁর নিজের তৈরি করা। বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে
তিনিই প্রথম সৃজনশীল এবং মননশীল বইয়ের তালিকা করে সেগুলোর আলোচনা
প্রকাশ করতে শুরু করেন তাঁর সম্পাদিত সাহিত্যপাতায়। এই বইগুলো
কীভাবে নির্বাচন করা হয় তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন, নিশ্চয়ই অনেক
ভেবেচিন্তে তাঁকে কাজটি করতে হয়! কিন্তু দেখা যায় এর অনেকগুলো
বইয়ের সমালোচনা করা হয় অত্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। একটি
নির্বাচিত মননশীল বা সৃজনশীল (এই টার্মগুলোও তিনিই প্রতিষ্ঠিত
করেছেন) বইয়ের সমালোচনা এত নেতিবাচক হয় কীভাবে তার উত্তরে হয়তো
তিনি বলবেন _ সমালোচকদের স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করেন বলেই
লেখাগুলোর কোনো সম্পাদনা তিনি করেন না! সংখ্যাটি প্রকাশিত হওয়ার পর
থেকে সাহিত্যমহলে উত্তেজনা তৈরি হয়, সেটা চলতেও থাকে। নিজের সৃষ্টি
করা এই উত্তেজনা থেকে তিনি নিজে থাকেন নিরাপদ দূরত্বে, কেউ তাঁর
সামনে সেই উত্তেজনা প্রকাশ করলে তিনি স্মিতহাস্যে শুনতে থাকেন,
গ্রহণ করলেন না বর্জন করলেন নাকি পাত্তাই দিলেন না, সেটা তার
হাসিমুখ দেখে বোঝা যায় না। তাঁর ওই মৃদু হাসিই তাঁকে অনেক ঝামেলা
থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তারকা লেখক তৈরির প্রক্রিয়াটি তাঁরই
মস্তিস্কজাত, অথচ এ জন্য তাঁকে তেমন কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়
নি কোনোদিন। শুধু সৃজনশীল এবং মননশীল বইয়ের তালিকা করেই ক্ষান্ত হন
নি তিনি, তরুণদের দশটি বই নিয়েও প্রতিবছর তিনি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ
করেন। এই তরুণ কিসের ভিত্তিতে নির্বাচিত হন তা-ও রহস্যময়। কারণ,
দেখা যায় কোনো কোনো তরুণ লেখকের বই চলে গেলো সৃজনশীল এবং মননশীল
বইয়ের তালিকায়, আর তারই সমসাময়িক অন্যদের বই আলোচিত হলো তরুণদের
নিয়ে আয়োজিত বিশেষ সংখ্যায়। শুধু তাই নয় তরুণ-সংখ্যায় একটি বইকে
আবার সাময়ীকির বিশেষ বাছাই শিরোনামে মর্যাদা দেয়া হয়, এই বাছাইয়ের
মাজেজাও বোঝা মুশকিল। আসলে কে যে কখন কোথায় যাবেন, কিংবা কে কখন
নির্বাচিত হবেন নাকি আদৌ হবেন না _ এইসব রহস্যের কূলকিনারা করা
কঠিন। তরুণদের নির্বাচিত বই নিয়ে এই বিশেষ সংখ্যাটিও যথারীতি
উত্তেজনা তৈরি করে এবং যথারীতি সাজ্জাদ ভাই থাকেন উত্তেজনাহীন।
যাহোক রাইসুর তারকা হওয়ার পেছনে যে সাজ্জাদ ভাইয়ের ভূমিকা ছিলো সে
কথা অনেকেই জানেন। অবশ্য ভূমিকা রাখলেই কেউ তারকা হতে পারে না।
রাইসু হতে পেরেছিলেন, কারণ, তারকা হওয়ার কৌশল তার জানা ছিলো। তার
বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য, দুর্বিনীত আচরণ, নানারকম কলাকৌশল তাকে সবসময়
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতো, তাকে পছন্দ বা অপছন্দ যা-ই করা হোক
না কেন ওই সময় তার সম্বন্ধে উদাসীন থাকা অসম্ভব ছিলো _ আর তাই
নিত্যদিনের আলোচনায় রাইসু ছিলেন অনিবার্য প্রসঙ্গ। শুধু রাইসুই নয়,
অদিতি ফালগুনী এবং কামরুজ্জামান কামুও তারকাখ্যাতি লাভ করেন
সাজ্জাদ ভাইয়ের কল্যাণেই। প্রথম আলোর সাময়ীকিতে কামুর গুচ্ছকবিতা
ছাপা হয় তার ছবি সহ, তার বইও পায় বিশেষ বাছাইয়ের মর্যাদা। সম্ভবত
কামুর আগে বাংলাদেশের আর কোনো কবি এত অল্প বয়সে একটি প্রথম সারির
প্রভাবশালী দৈনিকের কাছ থেকে এরকম ট্রিটমেন্ট পান নি। ওই ঘটনার আগে
এবং পরেও কামুকে নানাভাবে প্যাট্রোনাইজ করেছে প্রথম আলো। তবে কামু
সম্ভবত এসবের প্রতি খুব বেশি মোহগ্রস্ত ছিলেন না কখনো, তার সারল্য
এবং নিস্পৃহতা তাকে কখনো এইসব উত্তেজনার কেন্দ্রে আনে নি। অন্যদিকে
'শুক্রবারের সাময়ীকির বিশেষ বাছাই' শিরোনামে অদিতির বই নিয়ে
সাজ্জাদ ভাইয়ের আলোচনা তাকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বসিয়ে দেয়।
অবশ্য তারও অনেক আগে থেকেই অদিতি তাঁর প্রশ্রয় পেয়েছেন। তাঁর
সম্পাদিত সাহিত্য পাতায় গল্পকার-প্রাবন্ধিকদের জন্য 'স্পেস' একটি
নিয়মিত সমস্যা হলেও অদিতির জন্য সেটা খাটে নি। প্রথম আলো একমাত্র
অদিতির গল্পই পর পর দুই সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে ছেপেছে, যে সুবিধা
কোনো সিনিয়র লেখকও পান নি কখনো। অদিতি অবশ্য দৈনিক সংবাদ সাময়ীকির
সম্পাদক আবুল হাসনাতেরও বিপুল প্রশ্রয় পেয়েছেন। তাঁর চার পাতার
সাময়ীকির দেড় পাতা জুড়ে অদিতির গল্প ছাপা হয়েছে। একজন তরুণ লেখকের
জন্য এ এক অভাবনীয় প্রাপ্তি। ধারাবাহিক গল্প প্রকাশের সুযোগ অবশ্য
প্রশান্ত মৃধাও পেয়েছেন। আবু হাসান শাহরিয়ার সম্পাদিত খোলা জানালায়
(মুক্তকণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকী) এবং মঈনুল আহসান সাবেরের সম্পাদনায়
ভোরের কাগজ সাময়িকীতে তার একাধিক ধারাবাহিক গল্প ছাপা হয়েছে।
ধারাবাহিক উপন্যাসের কথা আমরা আগেই শুনেছি, কিন্তু ধারাবাহিক গল্প
নব্বইয়ের এই লেখকদের আগে কেউ ছাপার সুযোগ পেয়েছেন বলে আমার জানা
নেই। টোকন ঠাকুরও মিডিয়ার আনুকূল্য পেয়েছেন প্রচুর। তবে যে অর্থে
অদিতি, কামু বা রাইসুকে মিডিয়াগুলো প্যাট্রোনাইজ করেছে টোকন সেটা
পান নি। বরং তিনি তার অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন প্রচুর
লিখে। ছোটকাগজই হোক আর বড় কাগজই হোক, কিংবা সেইসব কাগজের চরিত্র
যা-ই হোক না কেন, যে-ই তার কাছে লেখা চেয়েছে, কাউকেই তিনি বিমুখ
করেন নি। এবং একসময় যে কোনো কাগজ খুললেই টোকনের কবিতা বা গদ্য চোখে
পড়তো। কেউ প্যাট্রোনাইজ না করলেও যে শুধুমাত্র লিখেই বিপুল পরিচিতি
এবং তারকাখ্যাতি লাভ করা যায়, টোকন তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ।
আবু হাসান শাহরিয়ার সম্পাদিত মুক্তকণ্ঠের সাময়ীকি খোলা জানালা
তরুণদের অনেকখানি প্রশ্রয় দিয়েছে। অন্তত তাঁর পাতায় 'স্পেস' কোনো
সমস্যা হয়ে ওঠে নি তরুণদের জন্য। কোনো লেখাকে ভালো মনে হলে পুরো
পৃষ্ঠা ছেড়ে দিতে বা পর পর কয়েকটি সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে ছেড়ে দিতেও
কার্পণ্য করেন নি তিনি। খোলা জানালাও অনেকরকম বিতর্ক এবং উত্তেজনা
তৈরি করেছে, এবং মজার ব্যাপার হলো শাহরিয়ার ভাই নিজের তৈরি
উত্তেজনায় নিজেই উত্তেজিত থাকতেন। ফলে দেখা গেছে _ আজিজ মার্কেটে
কে তাঁর বিরুদ্ধে কী বলেছেন তাই নিয়ে উত্তেজিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে
নিজের সম্পাদিত পাতায় একের পর চিঠি ছাপিয়ে চলেছেন! উত্তেজিত থাকার
ফলে তিনি বুঝতেও পারেন নি, চিঠিগুলো খোলা জানালায় ছাপা না হলে
সারাদেশের বিপুল সংখ্যক পাঠক জানতেই পারতো না যে, আজিজ মার্কেটে কে
তাঁর বিরুদ্ধে কী বলছে। কয়েকজন তরুণ কবি এসময় অযথাই শাহরিয়ার
ভাইয়ের আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন। খোলা জানালার অসংখ্য ভালো কাজের
মধ্যে এই কাজটি একটি কাঁটা হয়ে ঝুলে আছে।
এমনই একটি কাঁটা ঝুলিয়ে রেখেছেন শামীম রেজা তার সম্পাদিত আজকের
কাগজ সাময়ীকি সুবর্ণরেখার মাথায়। নব্বই দশকের তরুণদেরকে (এবং
পরবর্তী প্রজন্মের তরুণদেরকেও) সবচেয়ে বেশি প্যাট্রোনাইজ করেছেন
শামীম রেজাই (তিনি নিজেও এই সময়েরই একজন প্রতিষ্ঠিত কবি)।
সুবর্ণরেখায় এই সময়ের প্রায় সবার লেখা প্রকাশিত হয়েছে, এবং এখানেও
'স্পেস' কোনো সমস্যা হয়ে ওঠে নি । শুধু লেখা প্রকাশই নয়, তরুণদের
বই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, তাদেরকে নিয়ে বৈঠকি, লিটলম্যাগাজিন নিয়ে
নিয়মিতভাবে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে সুবর্ণরেখা তরুণদের প্রতি তার
পক্ষপাত সরাসরিভাবেই প্রকাশ করেছে। অথচ ওই একই সাময়ীকিতে রহমান
হেনরীর লেখা প্রভু নষ্ট হয়ে যাই শিরোনামের নিন্দাকীর্তন ছেপে একটি
খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সম্পাদক। এই লেখাটি কোনো সাহিত্যিক
সমালোচনা ছিলো না, ছিলো ব্যক্তি-বিশেষের নিন্দায় মুখর এবং যেসব
ব্যক্তি সম্বন্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিলো তার কতোটুকু
সত্য কতোটুকু মিথ্যে তা যাচাই করার সুযোগ হয় নি। বরং খোন্দকার
আশরাফ হোসেন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি উত্তর দেয়ায় লেখক রহমান
হেনরী প্রতিউত্তর না দিয়ে তার ম্যাজিস্ট্রেট সুলভ মেজাজ দেখিয়ে
খোন্দকার আশরাফকে আদালত অবমাননার ভয় দেখান। কবিদের মধ্যে বিরোধ ও
মতপার্থক্যের ঘটনা এদেশে নতুন নয়, কিন্তু একজন কবি আরেকজন কবিকে
আদালত অবমাননার ভয় দেখাতে পারেন সেটা এখন পর্যন্ত আমাদের জন্য
কল্পনাতীত ব্যাপার। ম্যাজিস্ট্রেট কবি রহমান হেনরী সেটাই করেছিলেন!
(আশংকা করছি এই লেখার জন্য তিনি হয়তো আমাকেও আদালতের অবমাননার
অভিযোগে অভিযুক্ত করবেন। তিনি যে ম্যাজিস্ট্রেট সেটা সবাইকে সবসময়
মনে করিয়ে দিতে হবে না!) শামীম রেজা কেন এই লেখাটি ছেপেছিলেন সেটা
বলা মুশকিল। হয়তো তিনি সাহিত্যজগতে একটি উত্তেজনা তৈরি করতে
চেয়েছিলেন। এবং শাহরিয়ার ভাইয়ের মতো তিনিও নিজের সৃষ্ট উত্তেজনায়
নিজেই উত্তেজিত থাকতে পছন্দ করেন। হয়তো এই উত্তেজনা-প্রিয়তার
কারণেই তিনি জগতের নানাবিধ দুঃখময় ও কষ্টকর জটিলতা থেকে নিজেকে
মুক্ত রাখতে পারেন। তরুণদের প্রতি পক্ষপাত শুধু সুবর্ণরেখাই
দেখায়নি। আজকের কাগজ কতৃপক্ষ তরুণদের অপ্রকাশিত প্রথম পাণ্ডুলিপিকে
পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করেও এই পক্ষপাত প্রদর্শন করেছেন, এবং এই
আয়োজনের পেছনে যে শামীম রেজার সক্রিয় ভূমিকা ছিলো সেটা এখন সবারই
জানা। যদিও এরকম আয়োজন বাংলাদেশে প্রথম চালু করে মাওলা ব্রাদার্স।
তরুণ লেখকেদের অপ্রকাশিত-প্রথম পাণ্ডুলিপি নিয়ে আয়োজিত এই
প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়ে তারকাখ্যাতি পান শাহাদুজ্জামান। কিন্তু
মাওলা ব্রাদার্স মাত্র একবারই এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে অজ্ঞাত
কারণে এর ইতি টানে। অন্যদিকে আজকের কাগজ কতৃপক্ষ গত ছয় বছর ধরে
প্রক্রিয়াটি চালু রেখেছেন। এ পর্যন্ত আটজন তরুণ এই পুরসকার
পেয়েছেন, তাদের পান্ডুলিপিগুলোও গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছে কাগজ
প্রকাশন। আশির দশকে ফিলিপস পুরস্কার যেমন নাসরীন জাহানকে
তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছিলো, এই পুরস্কার অতখানি না হলেও
পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণদের খ্যাতিমান করে তোলার পেছনে যথেষ্ট ভূমিকা
রেখেছে।
এই সময়ের কথাশিল্পীদেরকে খ্যাতিমান করে তোলার পেছনে ঈদসংখ্যারও
একটা ভূমিকা আছে। আগে একটা উপন্যাস প্রকাশের জন্য লেখকদেরকে
সাপ্তাহিক বিচিত্রা বা রোববার বা সচিত্র সন্ধানির ঈদসংখ্যার দিকে
সারাবছর তাকিয়ে থাকতে হতো। কিন্তু হাতে গোণা কয়েকটি ঈদসংখ্যা সব
লেখকদের সেই সুযোগ দিতে পারতো না। এখন চিত্রটা একেবারে বিপরীত।
প্রতিবছর ঈদসংখ্যা বেরোয় কমপক্ষে বিশটি। একেকটি সংখ্যায় উপন্যাস
প্রকাশিত হয় কম হলেও দশটি করে। তার মানে কমপক্ষে ২০০টি উপন্যাসের
প্রয়োজন হয়। কিন্তু এত ঔপন্যাসিক কোথায়? ফলে পৃষ্ঠা ভরানোর জন্য
হলেও তরুণ লেখকদের খোঁজ পড়ে। প্রশান্ত মৃধা বা জাকির তালুকদার এ
পর্যন্ত যতগুলো উপন্যাস ঈদসংখ্যায় লিখেছেন তা আমাদের প্রধান কয়েকজন
লেখকের (যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা মাহমুদুল
হক) চেয়ে বেশি! মাত্র দশ-বারো বছর লেখালেখি করেই মিডিয়ার এমন একটি
শক্ত অবস্থান তৈরি করার ইতিহাস বাংলাদেশে এই প্রথম।
আমার বন্ধুদের ব্যাপারে এইসব কথা বলার অর্থ এই নয় যে, শুধুমাত্র
মিডিয়ার কল্যাণে এরা লেখক হতে পেরেছেন, বরং নব্বইয়ের লেখকরা
মিডিয়ার কী রকম আনুকূল্য পেয়েছেন তার সামান্য কিছু উদাহরণ হিসেবেই
এই কথাগুলো বলা। তবে মিডিয়ার এতসব প্রচার-প্রপাগান্ডা, এতসব
কলাকৌশল আর কারসাজিতে বিভ্রান্ত আমাদেরই কোনো কোনো বন্ধুর মধ্যে
লেখক হওয়ার চেয়ে তারকা লেখক হওয়ার, কবি হওয়ার চেয়ে প্রধান কবি
হওয়ার মানসিকতা জন্ম নিয়েছে। এই বিষয়টিকেই আমি আমাদের সময়ের সবচেয়ে
নেতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই।
এই সময়ে বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতেও তরুণদের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
প্রায় প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর অন্তত
একটি হলেও তরুণদের বই প্রকাশ করে। এ ছাড়াও কোনো কোনো নতুন প্রকাশক
শুধু তরুণদের বই প্রকাশ করেই খ্যাতিমান হয়ে উঠেছেন। এর মধ্যে
শ্রাবণ অন্যতম। শ্রাবণ এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন লেককের গ্রন্থ
প্রকাশ করে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ব্যাপক মিডিয়া
কাভারেজ পায়। ঐতিহ্যও তাদের প্রকাশনার প্রথম বছরে একসঙ্গে বেশ
কয়েকজন তরুণের বই প্রকাশ করে বিস্ময়কর মিডিয়া কাভারেজ পায় (এই দুটো
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এখনও প্রতিবছর কয়েকটি করে তরুণ লেখকদের বই
প্রকাশ করে চলেছে)। তরুণদের বই প্রকাশ করলেই যে এমন মিডিয়া কাভারেজ
পাওয়া যায় তার কারণ কি? কারণ ওই একটিই _ মিডিয়ায় তারুণ্যের
প্রভাবশালী অবস্থান। বেশ কয়েক বছর ধরে বইমেলার সময় প্রতিটি দৈনিক
পত্রিকা বইমেলা নিয়ে ব্যাক কভার পৃষ্ঠায় বিস্তারিতভাবে রিপোর্ট
প্রকাশ করে, এবং রিপোর্টাররা প্রধানত তরুণ। তারা স্বাভাবিকভাবেই
তরুণ লেখকদের বইয়ের প্রকাশকদের প্রতি পক্ষপাত দেখান।
সব মিলিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে এই সময়ের তরুণদের প্রতিষ্ঠার পেছনে
মিডিয়াগুলো নানাভাবে ভূমিকা রেখেছে। এর আগের প্রজন্মের কোনো লেখক
এমন সুবিধা পেয়েছেন বলে মনে হয় না। তাহলে কি মিডিয়াই এই সময়ের
নায়ক, তরুণরা কিছু নয়? সেকথা বলা খুবই অসঙ্গত হবে। বাংলাদেশের
সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে
বহুমাত্রিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া চলছে, তরুণরা সেখানে রাখছে একটি
প্রধান ভূমিকা। তরুণদের উপেক্ষা করে এই পরিবর্তনকে কোনোভাবেই বোঝা
যাবে না। তরুণ লেখকরাও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ। নব্বই দশকের
নানারকম ডামাডোলের মধ্যে থেকেও এই সময়ের তরুণ লেখকরা এমন কিছু
গল্প-কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ রচনা করেছেন যে একটু সচেতন হয়ে পাঠ
করলেই বোঝা যায়, এই লেখকরা কোনোরকম উচ্চবাচ্য ছাড়াই বাংলাদেশের
সাহিত্যকে পাশ ফেরাতে ভূমিকা রাখছেন।
আমাদের বেড়ে ওঠা আর সমকাল নিয়ে যত কথা বলা যায় এখানে তার সামান্যই
বলা হলো _ আমাদের সাহিত্যচর্চায় মিডিয়ার ভূমিকা ছিলো এই রচনার
ফোকাস পয়েন্ট। বাকি রয়ে গেলো আরো অনেক কথাই। আমাদের এই সময়ে
বাংলাদেশ যেসব অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে _ যেমন স্বরূপে
আত্নপ্রকাশ করা এনজিওগুলোর তৎপরতা, সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদের
উৎপাত, মুক্তবাজার অর্থনীতির ফাঁদ, বামপন্থী রাজনীতির হালচাল ও
তাদের কাছে প্রত্যাশা, আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি-চর্চার
অন্যান্য দিক _ সেসব নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। ভবিষ্যতে তা বলার
আকাঙ্ক্ষাও রইলো।
|
| |
 |
|