Page loading ... Please wait.

ব্যাচেলর : সম্পর্ক কিংবা সম্পর্কহীনতার গল্প
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
যদি বলি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আমার বন্ধু, কিংবা আনিসুল হক আমার বন্ধুপ্রতিম অগ্রজ তাহলে অনেকেই ঠোঁট উল্টে বলবেন _ বিখ্যাত লোকদেরেকে অনেকেই অমন বন্ধু বলে দাবি করে, আর এর পেছনে থাকে কোনো না কোনো ধান্ধা। 'ধান্ধাবাজ' অভিধাপ্রাপ্তির রিস্ক নিয়েও তবু আমি বলবো _ এঁরা আমার বন্ধু, আমাদের বন্ধু। এর কারণ শুধু এই নয় যে, একই সময়ে বেড়ে উঠেছি বলে একইরকম যন্ত্রণা আমাদের, একইরকম দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ ও সম্পর্কবোধ; তারচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে _ এঁরা আমাদের সময়টিকে বোঝেন, বোঝেন পারস্পরিক সম্পর্কের ধরন-ধারণ, এবং শুধু বুঝেই ক্ষান্ত হন না, আরো অনেককে বোঝানোর জন্য সেটাকে কোনো না কোনোরকম ভাষায় রূপ দেন; অর্থাৎ নিজেদের বুঝটাকে বিমূর্ত রাখেন না তাঁরা, সেটাকে মূর্ত করে তোলেন নানাভাবে _ লেখায়, বলায়, নাটকে, সিনেমায়। এই কথাটা মনে হলো আনিসুল হক রচিত আর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ব্যাচেলর ছবিটি দেখে। অবশ্য এই জুটির প্রতিভায় এই প্রথম মুগ্ধ হওয়া নয় আমার, এর আগেও আমি অনেকবার মুগ্ধ হয়েছি, তাঁদের টেলিফিল্ম চড়ুইভাতি আমাকে বেশ ভাবিয়েওছিলো। মনে হয়েছিলো _ আমাদের সমকালে যারা বেড়ে উঠেছে তাদের সম্পর্কবোধের এমন চমৎকার প্রকাশ আমি খুব একটা দেখিনি; ব্যাচেলর দেখে কথাটা আবারও মনে হলো আমার।

কিন্তু কেন বারবার সমকালের কথা বলছি, বলছি সম্পর্কবোধের কথা? কারণ আছে _ সেটার ব্যাখ্যাও দিতে পারি। একজন সৃজনশীল মানুষ যে সময়টিতে বেড়ে ওঠেন, যে পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর কৈশোর ও তারুণ্য কাটে _ তাঁর সারাজীবনের কাজে সেই সময় ও পরিপ্রেক্ষিতের অভিঘাত পড়ে। এ প্রসঙ্গে আল মাহমুদের একটা কবিতার কথা মনে পড়ছে _

কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
কবিতা তো ছেচলি্লশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
(কবিতা এমন/ সোনালী কাবিন)

অর্থাৎ কৈশোরের নানা অনুষঙ্গ, সেই সময়, প্রেক্ষাপট আর তার পরিপ্রেক্ষিতই তাঁর কাছে কবিতা। তেমনি একজন গল্পকারের কাছে তাঁর গল্প, একজন চলচ্চিত্রকারের কাছে তাঁর চলচ্চিত্রও ওইরকমই। সব মহান শিল্পীই আসলে তাঁদের শিল্পকর্মে সমকালকেই আঁকেন, তার কোনো কোনোটি মহাকালে গৃহিত হয় মাত্র _ পেরিয়ে যায় সমকালের সীমানা।

তা আমাদের সমকালের চেহারাটি কেমন? কেমন সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা বড় হয়ে উঠেছি? আমরা, মানে, এই সময়ের তরুণেরা? কেমন ছিলো আমাদের শৈশব-কৈশোর? ওই কবিতার মতো করে সম্ভবত বলা যায়, আমরা হচ্ছি _ আশির দশকে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর। কৈশোরেই আমরা দেখেছি, আমাদের সময়টি বড় বদ্ধ, যেন কিছুতেই আর এগুনো যাচ্ছে না সামনে। মনে আছে, কৈশোরের কোনো এক সুন্দর সকালে ঘুম ভেঙেই শুনেছিলাম _ এই দুর্ভাগ্যপীড়িত জাতিটিকে উদ্ধার করার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে এক মহামানব নাজেল হয়েছেন। নাজেল হয়েই তিনি আদেশ জারি করেছেন _ তার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের কাজকর্মের কোনো সমালোচনা করা যাবে না, করলে এই শাস্তি ওই শাস্তি ইত্যাদি। শুধু তাই নয় _ একসঙ্গে পাঁচজনের বেশি জমায়েতও করা যাবে না, করলে দেখামাত্র গুলি করা হবে! সামরিক শাসনের নামে এমনই এক বীভৎস, ভয়ংকর, পৈচাশিক শাসন চেপে বসেছিলো সারা জাতির বুকের ওপর। এমনিতেই আমাদের পারিবারিক ও সমাজিক কাঠামোটি এমন যে, নানারকম বাধা-নিষেধের মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে বড় হয়ে উঠতে হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও কেবল নিষেধই করে যায়। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, এটা বলা যাবে না, ওটা বলা যাবে না _ কী যে করা যাবে, আর কী যে বলা যাবে সেটা আর বলে না কেউ। নাগরিক জীবনে এই বিধি-নিষেধ আরো ভয়ংকর, _ শৈশব-কৈশোর এখানে বন্দি হয়ে থাকে চারদেয়ালের মধ্যে, কোনো আকাশ নেই যেখানে চোখ মেলে তাকানো যায়, কোনো মাঠ নেই যে খেলা করবে কিশোররা। বাসার সামনে গলিতে? না, তোমার বড় হয়ে ওঠার চেয়ে প্রতিবেশির জানালার কাঁচ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ _ খেলতে গিয়ে যদি সেটা ভেঙে ফেলো! তাহলে বাসার একচিলতে বারান্দায় বা করিডোরে? না ওখানে দৌড়াদৌড়ি করো না _ নিচতলা থেকে, পাশের ফ্ল্যাট থেকে কমপ্লেইন আসবে _ তাদের শান্তি বিঘি্নত করো না। 'তাহলে কি করবো?' গল্পের সেই বুড়োর মতো উত্তর দেয় সবাই _ 'কী' তো করাই যাবে না! তো আমাদের কৈশোরে এইসব নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা। রাষ্ট্রযন্ত্রই বলে দিচ্ছিলো কী কী বলা যাবে না, কী কী করা যাবে না _ ওই যে _ 'তঁাঁর' কোনো সমালোচনা করা যাবে না, একসঙ্গে পাঁচজনের বেশি জমায়েতও করা যাবে না, মিছিল মিটিঙ করা যাবে না, 'তঁাঁর' বিরুদ্ধে কিছু লেখা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি _ কিন্তু কী কী বলা বা করা যাবে, তা আর বলেনি কোনোদিন। মাঝে মাঝে সো কলড গণতন্ত্রের ছদ্মবেশ ধারণ করলেও ওই মহামানবের কল্যাণে আমাদের কৈশোর কেটেছে এমনি সব বিচিত্র নিষেধাজ্ঞায়। শুধু তো তাই নয়, ওই পবিত্র বয়সেই আমরা দেখেছিলাম _ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে অবিশ্বাস-দ্বন্দ্ব-সন্দেহ। কেউ কারো ওপরে আস্থা রাখতে পারছে না, কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না, দেয়ালেরও কান আছে _ ভেবে কথা বলছে ফিসফিসিয়ে। দুজন মানুষের ফিসফিসানি কথা প্রেমময় হতে পারে, কিন্তু আমাদের সময়টি ছিলো এমন যে, ওই ফিসফিসানির মানেই পাল্টে গিয়েছিলো। দুজন ফিসফিস করছে মানে হচ্ছে _ তাদের মধ্যে তৃতীয় কেউ শুনে ফেলার ভয় বা শংকা কাজ করছে। তা তৃতীয় কেউ শুনে ফেললে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো _ তাকে যে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, যদি সে বলে দেয় কাউকে, যদি নেমে আসে পাশবিক (সামরিক) নিপীড়ন! সামরিক শাসনের প্রভাব শুধু রাষ্ট্রীয় জীবনেই নয়, ব্যক্তিজীবনেও এমনভাবে পড়েছিলো। রাষ্ট্রের অবস্থাই বা কেমন ছিলো? আমরা দেখেছি _ কেমন করে আলোর ইশারাবিহীন অতল অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে স্বদেশ, কোথাও কোনো সম্ভাবনা থাকছে না, চারদিকে কেবল গভীর অন্ধকার, কেবল অনিশ্চয়তা, কেবল হতাশা। দেখেছি _ প্রতিবাদী মিছিলে উঠে যাচ্ছে সামরিক ট্রাক, দেখেছি প্রাচীন রাজনীতিবিদরা তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ-তিতিক্ষা বিসর্জন দিয়ে লুটিয়ে পড়ছেন সামরিক প্রভুর কদর্য পায়ে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রকম্পিত হচ্ছে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে, ছাত্রনেতাদের চারপাশে উড়ছে টাকা আর ক্ষমতা _ আর তার লোভে পড়ে আজকের বিপ্লবী কালকেই হয়ে যাচ্ছে প্রভুর চামচা, রাষ্ট্রই উৎসাহিত করছে অসৎ হতে, আদর্শহীন হতে, নীতিহীন হতে, সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে যখন-তখন, লেখক-শিল্পী-সংবাদকর্মীরা নিগৃহিত হচ্ছেন অহরহ, আর এসবকিছুর মধ্যে দিয়ে ধূমায়িত হচ্ছে ক্ষোভ। যে বয়সে তরুণদের মুখে থাকবে প্রেমের মধুর বাক্য _ সেই বয়সে নিজেকে জাগিয়ে তুলতে হচ্ছে ক্ষোভ ও বিদ্রোহের তীব্র-তীক্ষ্ন বাক্য দিয়ে। শুধু জাতীয় জীবনেই নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বেও তখন ঘটছে এক বিপুল বিপর্যয় _ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে দখল করে নিচ্ছে বীভৎস পুঁজিবাদ। একসময় তরুণদের এক বিরাট অংশ ওইসব রাষ্ট্রের আদলে নিজের দেশেও একটি বিপ্লবী পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতো (সেই স্বপ্ন ভুল ছিলো কি শুদ্ধ ছিলো সেটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তরুণদের সামনে ওরকম একটি স্বপ্ন ছিলো, ছিলো আদর্শ) _ আমাদের সময়ে সেই স্বপ্নও ভেঙে যেতে থাকে, পায়ের নিচ থেকে সরে যেতে থাকে দাঁড়াবার মাটি।

এমনি একটি লক্ষ্যহীন-আদর্শহীন-নীতিহীন-স্বপ্নবিহীন সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা বেড়ে উঠেছি। কোথাও ছিলো না কিছু আশাবাদী হবার মতো, কোথাও এমন কিছু ছিলো না যাকে অবলম্বন করে একজন তরুণ জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার স্বপ্ন দেখতে পারে। এমন একটি সময়ের মধ্যে দিয়ে যাদের কৈশোর ও তারুণ্য কাটে, তারা ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, কোথাও কোনোকিছুর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয় না। আমাদের সময়টি আসলে সম্পর্কহীনতার সময়। এই সময়ের মানুষগুলো কোথাও সম্পর্কিত নয়, আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে থাকে অবিশ্বাস, আমাদের প্রেমগুলো তুচ্ছ কারণে ভেঙে যায়, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে _ এমনকি পরিবার থেকেও _ আমরা একটি নিরাপদ দূরত্ব রচনা করে চলি। যেন পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি কার্যকর ভাষা নির্মাণের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি আমরা। কি করে প্রেম হবে আমাদের, হবে বন্ধুত্ব? প্রেম তো মানুষের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্তের নাম, আমাদের জীবনে শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত কোথায়? সবই তো অন্ধকার। যে বয়সটিতে মানুষের সর্বোচ্চ মানসিক বিকাশ ঘটে সেই বয়সটি যদি কাটে এমন একটি আবদ্ধ সময়ে, আবদ্ধ পরিবেশে তাহলে সে হয়ে ওঠে অসম্পূূর্ণ মানুষ। আমাদের সময়টি তাই অসম্পূর্ণ মানুষে ভরতি, আমাদের সময়টি, আগেই বলেছি, তাই সম্পর্কহীনতার সময়।

আনিসুল হক এবং ফারুকী তাঁদের চড়ুইভাতি-ব্যাচেলর মিলিয়ে সেই সম্পর্কহীনতার গল্পই দেখালেন আমাদেরকে। না, আমাদের মর্মান্তিক কৈশোর দেখাননি তারা, দেখিয়েছেন আমাদের জীবনযাপন ও সম্পর্কবোধের ওপর ওই সময়ের অভিঘাতটিকে। ব্যাচেলর আসলে চড়ুইভাতিরই এক্সটেনশন বা কন্টিনিউয়েশন। চড়ুইভাতিতে তারা দেখিয়েছিলেন _ কোনো প্রেমই দাঁড়াচ্ছে না কোথাও, প্রেম যেন স্বল্পস্থায়ী এক খেলা _ চড়ুইভাতির মতোই, অবলীলায় মুহূর্তের ঝড়ে তা ভেঙে পড়ে, ভেঙে যায়, ভেঙেই পড়ে থাকে _ জোড়া লাগে না আর, সবার সামনে জোড়া লাগানোর অভিনয় চলে শুধু। ব্যাচেলরে আরেকটু এগিয়ে দেখানো হলো _ প্রেম তো নয়ই, এমনকি দাম্পত্য সম্পর্কও দাঁড়াচ্ছে না, ভেঙে পড়ছে, ভেঙে যাচ্ছে, ভেঙেই থাকছে _ জোড়া লাগাবার কোনো উদ্যোগই চোখে পড়ছে না। চড়ুইভাতির সাথীর (ব্যাচেলরেও তিনি সাথীই _ অভিনয় করেছেন অপি করিম) সমস্যাটি তবু বোঝা যায়, প্রেমিককে অন্য আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে দেখে সহ্য করতে পারেনি সে, সম্পর্কটি ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু ফয়সল? তার সমস্যাটি কোথায়? সাথীর মতো চমৎকার একটি মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েও সে কেন তার শিক্ষিকার (ফাহমিদা _ ইলোরা গওহর) প্রেমে পড়ে? সাথীর জন্য তার ভালোবাসাটাকে তো নিখাদই মনে হয় তার এক্সপ্রেশনে _ তবু কেন একটি অসম সম্পর্কের প্রতি তার এতো গভীর টান? কিংবা ব্যাচেলরের শাম্মার (শাবনূর) সমস্যাটিও বোঝা যায়। স্বামী ফাহিমের (ফেরদৌস) অন্য আরেকটি সম্পর্ক হাতেনাতে ধরে ফেলার পর দাম্পত্য সম্পর্কটিকে তার কাছে অর্থহীন-অসহ্য মনে হয়, ফলে এবারও সম্পর্কটি ভাঙে মেয়েটির পক্ষ থেকেই। কিন্তু ফাহিমের সমস্যাটি কোথায়? সে কেন কেবল একটির পর একটি সম্পর্কে জড়াতে চায় নিজেকে? এমনকি বিয়ের পরও আরেকটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে দ্বিধা করে না সে? ফয়সল কিংবা ফাহিমের মনোজগতের কাঠামোটি কেমন? সরল ভাষায় তাদেরকে 'লুচ্চা' বললেই কি সমস্যা মিটে যায়? না মেটে না। তারা যে একটি মাত্র সম্পর্কে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না তার কারণ অন্য। ওই একটি সম্পর্কের মধ্যে তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতার খোঁজ পায় না _ তারা নিজেরা একেকজন অপূর্ণ মানুষ, প্রেমের মধ্যে তারা পূর্ণতা খোঁজে, একটি সম্পর্কে না পেয়ে আরেকটিতে জড়ায়, কিন্তু সেই সম্পর্কও কোনো পরিণতি পাওয়ার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কের জন্যই তাদের মমতা ও ভালোবাসা অপরিসীম _ কোনোটিকেই তারা হারাতে চায় না, কিন্তু হারিয়ে যায় সবকটিই। যেন সম্পর্কহীনতাই তাদের অনিবার্য নিয়তি।

শুধু ওই দুটোই কেন, ব্যাচেলরের অন্যান্য চরিত্রও তো একটি প্রেমময় সম্পর্কের জন্য অধীর হয়ে থাকে। আবরার ভাই (হুমায়ন ফরিদী) সর্বদা মেয়েদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েও ফাহমিদার প্রেমে পড়ে, সেটা প্রকাশ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে; হাসান ভাইয়েরও (এই ফিল্মের সবচেয়ে অসাধারণ চরিত্র এটি, হাসান মাহমুদ অভিনয়ও করেছেন দুর্দান্ত) একটি প্রেমের জন্য আকণ্ঠ তৃষ্ণা; মারজুক রাসেল, আহমেদ রুবেল, আরমান পারভেজদের তৃষ্ণাও গভীর, আবেদনময়, প্রায় মর্মস্পর্শী। সম্পর্কিত হওয়ার জন্য এমন তুমুল আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও কেন কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠছে না? এদের প্রত্যেকেরই তো জুটিবদ্ধ হবার জন্য সম্ভাব্য মানুষ আছে, তবু কেন শেষ দৃশ্যে আমাদেরকে দেখতে হচ্ছে _ ফাহিম তার স্বল্পস্থায়ী বিবাহিত জীবনের ইতি টেনে ফিরে যাচ্ছে ব্যাচেলর কোয়ার্টারে; রুবেল সাথীর কাছে গিয়েও প্রেমের কথা বলার বদলে বলছে _ আমি তোমাকে ভালোবাসি না; আবরার ভাইকে নিজের প্রেমের কথাটি বলতে গিয়ে গল্পের আশ্রয় নিতে হচ্ছে আর ফাহমিদা তা শুনতেই চাচ্ছেনা; হাসান ভাই ইঙ্গিতে প্রেমে পড়ার কথা বলেও জয়ার কাছ থেকে ধাক্কা খাচ্ছেন; মারজুককে বলতে হচ্ছে _ এ দেশে আর না, এরপর প্রেমে পড়বো ফরাসী মেয়ের? কেন সম্ভাব্য সম্পর্কগুলো নির্মিত হচ্ছে না, কেন তাদেরকে অনিবার্যভাবেই একাকী জীবনে ফিরে যেতে হচ্ছে? এ যেন এক অনতিক্রম্য বৃত্ত, সবাই প্রাণপনে বেরুতে চেষ্টা করছে এই বৃত্ত থেকে, পারছে না, পারছেই না।

২.

এই যে সম্পর্কগুলো তৈরি না হওয়া, আমার কাছে এর একটি নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। যাকে বলে টিউনিং _ যে কোনো সম্পর্কের জন্যই সেটা খুব জরুরী ব্যাপার। দুজন মানুষ প্রেমময় একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে চাইলে তাদেরকে এক সুরে এক ছন্দে বেজে উঠতে হয়। আমার কাছে এই বেজে ওঠার নামই প্রেম। কিন্তু আমাদের জীবন থেকে যেন সেই সুর ও ছন্দটি হারিয়ে গেছে। এক সুরে এক ছন্দে দুজন মানুষ তো বেজে উঠছেই না, এমনকি কেউ একজন অন্য আরেকজনকে নিজের সুরে ও ছন্দে বাজাতেও পারছে না। ফয়সল-সাথী বা ফাহিম-শাম্মা সম্পর্কের সংকটটিও এখানেই _ তাদের টিউনিংটা হয়নি। কিন্তু বেজে উঠবার বা প্রেমে পড়ার আকাঙ্ক্ষাটি তো আর হারিয়ে যায়নি। আকাঙ্ক্ষা আছে বেজে উঠবার অথবা অন্যকে বাজাবার _ কিন্তু হচ্ছে না, কোনোটাই হয়ে উঠছে না। হচ্ছে না কেন? আমরা কি তবে পরস্পরের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের ভাষাটিও হারিয়ে ফেলেছি? এমনকি অনুভূতি বা এক্সপ্রেশন বোঝার ক্ষমতাটিও? হোয়াট উই ক্যাননট স্পিক এ্যাবাউট উই মাস্ট কনসাইন টু সাইলেন্স (যা আমরা বলতে পারি না, সেখানে নীরব থাকাই উত্তম)_ বলেছিলেন ভিটগেনস্টাইন, এই ফিল্মের প্রতিটি চরিত্র তো তাই করেছে। কিন্তু সাইলেন্স বা নীরবতাও তো একটি ভাষাই, তারও একটি রূপ আছে, সব নীরবতার অর্থ এক নয়, একেক প্রেক্ষিতে একেক নীরবতার অর্থ একেরকম _ এই চমৎকার ভাষাটিকে তো অনুবাদ করতে হবে! মানুষের তো পেঁৗছনোর কথা সেখানেই যেখানে সব কথা শব্দ ব্যবহার করে বলতে হবে না _ মানুষের শব্দভাণ্ডার তো খুবই সীমিত, কটা অনুভূতিই বা শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায়, এমনকি পৃথিবীর সব কটি ভাষার সবগুলো শব্দ দিয়েও একজন মানুষের সব অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব নয় _ যেখানে নীরবতাও ব্যবহৃত হবে এক অসামান্য ভাষা হিসেবে আর মানুষেরই ক্ষমতা জন্ম নেবে সেই ভাষাটি অনুবাদের।

৩.

এই যে সম্পর্কহীনতার গল্প, নিঃসঙ্গতার গল্প, অনতিক্রম্য বৃত্তে ঘুরপাক খাবার অকথ্য যন্ত্রণার গল্প _ সবই খুব সিরিয়াস বিষয়, বেদনাভারাক্রান্ত বিষয়ও, কিন্তু সরয়ার তার ফিল্মে সেটা বললেন খুবই ইয়ার্কির ঢংয়ে। কোথাও কোনো ভ্রু-কোচকানো ব্যাপার নেই, দর্শককে গালে হাত দিয়ে দুদণ্ড ভাববার ফুরসৎ দেননি তিনি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, কাহিনীতে কোনো উত্তেজনা না থাকা সত্ত্বেও, দর্শককে টেনে নিয়ে গেছেন এক বিরামহীন স্ফূর্তির মধ্যে দিয়ে। প্রচুর ঠাট্টা-দুষ্টুমি-ইয়ার্কি-ফাজলামো করেছেন, দর্শককে হাসিয়েছেন ক্রমাগত কিন্তু ভাবার সময় দেননি। বুঝতে দেননি এসবকিছুর মধ্যে দিয়ে তিনি আসলে বলতে চাইছেন আমাদের সময়ের এক গভীর গভীরতর অসুখের কথা _ সম্পর্কহীনতার কথা, প্রেমহীনতার কথা, যোগাযোগহীনতার কথা, বিচ্ছিন্নতার কথা। এতোসব সিরিয়াস কথা তিনি ঠাট্টা-ইয়ার্কির ঢংয়ে বললেন কেন? কথাটা জিজ্ঞেস করা হয়নি তাঁকে। কিন্তু আমার যা মনে হয়েছে সেটা বলতে পারি। এ যেন 'দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছি'র মতো ব্যাপার। এ সমস্তকিছু দেখে যেন তিনি খেপে গেছেন, কিন্তু দুঃখে-বেদনায় মুষড়ে পড়েননি, ঠাট্টার ছলে বুঝিয়ে দিয়েছেন _ দ্যাখো, এই সম্পর্কহীনতা নিয়ে কেবল ঠাট্টাই করা চলে, এ আমাদের আরাধ্য নয় _ আরাধ্য একটি শুভ-সুন্দর-প্রেমময় সম্পর্ক।

এ প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলি। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, সরয়ার সচেতনভাবেই তাঁর খেপাটে চরিত্রটি এস্টাবলিশ করতে চান। কথাটা মনে হওয়ার পেছনে কারণ আছে। একদিন চ্যানেল আই খুলে দেখলাম _ ব্যাচেলরের কলাকুশলীরা কথা বলছেন। তো, হুমায়ন ফরিদী ছবিটির সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পরিচালককে একবার পাগল বললেন, পরমুহূর্তেই বললেন উন্মাদ _ অবশ্য স্নেহের সুরে। বাংলদেশের শ্রেষ্ঠতম এই অভিনেতার প্রতি যথার্থ সম্মান রেখেই বলছি _ আপনার এই কথাটি আমার ভালো লাগেনি, এমনকি সেটা স্নেহ করে হলেও নয়, আফটার অল কথাটা আপনি বলছেন, আর বলছেন একটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। ফরিদীর কথা শুনে আমার মনে হয়েছিলো _ সরয়ারকে পাগল বা উন্মাদ বলা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে। এই যে এতোসব সম্পর্কহীনতা, প্রেমহীনতা, যোগাযোগহীনতা, বিচ্ছিন্নতা নিয়েও আমরা যখন একটি 'নিরাপদ' জীবনযাপন করে যাই, 'স্বাভাবিক-সামাজিক' মানুষ বলে স্বীকৃতি পাই, তখন এ নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তোলেন, লেখালেখি করেন, ছবি তৈরি করেন _ তাদেরকে অস্বাভাবিক-অসামাজিক-উন্মাদ বলা ছাড়া উপায় কি? এই দুই পক্ষই তো আর একসঙ্গে স্বাভাবিক মানুষ হতে পারে না!

তো, যা বলছিলাম, কঠিন সব বিষয়ও ঠাট্টা-ইয়ার্কির ভঙ্গিতে বলার ব্যাপারটিকে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? একজন শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মকে কিভাবে উপস্থাপন করবেন সেটা তাঁরই ব্যাপার। শিল্পী তো তাঁর কাজ দিয়ে আসলে কাউকে না কাউকে কমিউনিকেট করতে চান _ আর তার জন্য তিনি নির্মাণ করেন একটি নিজস্ব ভাষাভঙ্গি। এ হচ্ছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নিজস্ব ভাষাভঙ্গি। ব্যাচেলরের চিত্রনাট্য তো আনিসুল হকের, এ কি তাঁরও ভাষাভঙ্গি? না, তা মনে হয় না আমার, তাঁর আরও কিছু নাটক-টেলিফিল্ম দেখার সুযোগ হয়েছে আমার, সুযোগ হয়েছে তাঁর উপন্যাস ও কবিতা পড়ার, এবং মনে হয়েছে _ তাঁর ভাষাভঙ্গি আলাদা _ ফারুকীর হাতে এই ছবিটি নির্মিত না হয়ে অন্য কারো হাতে হলে এর ভাষাই পাল্টে যেতো বলে আমার ধারণা।

৪.

একটি স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গি নির্মাণই শুধু নয়, পরিচালক হিসেবে আরো কিছু সাফল্যের দাবিদার সরয়ার। তিনি জানেন কাকে কিভাবে উপস্থাপন করলে 'সুন্দর' ও 'মনোহর' দেখাবে। শাবনূর যে এতো রূপসী ও আবেদনময়ী _ ব্যাচেলর দেখার আগে আমি তা বুঝতেই পারিনি। পাঠকরা আবার ভাববেন না যে, আমি শাবনূরের আর কোনো ছবিই দেখিনি। দেখেছি, কিন্তু এমন আকর্ষণীয় মনে হয়নি। নায়িকাদের যেমন হওয়া দরকার _ আকর্ষণীয়, আবেদনময়ী এবং সহজ-স্বাভাবিক, যেন নিজের প্রেমিকা বলে তাকে কল্পনা করা যায়, যেন তাকে দূরের নক্ষত্র বলে মনে না হয় _ এই ছবিতে শাবনূর ছিলেন তেমনি। ব্যাচেলর দেখে শাবনূরের জন্য আমার কষ্টই হলো _ এতো চমৎকার একটি মেয়ে ঢাকাই ছবির মাথামোটা (কেন তাদেরকে মাথামোটা বলছি সে ব্যাখ্যা একটু পরেই দেবো) পরিচালকদের হাতে পড়ে কিভাবে প্রোপার ট্রিটমেন্ট থেকে বঞ্চিত হলেন! অপি যথার্থই আকর্ষণীয় _ তার সম্বন্ধে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু ইলোরা গওহর! এই বয়সেও তাকে এতো চমৎকারভাবে প্রেজেন্ট করা হলো যে, যদি এতো এতো ইত্যাদি ইত্যাদি (এই শব্দগুচ্ছ ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব ব্যাচেলরের দর্শকদের) সমস্যা-সীমাবদ্ধতা-বাধাবিপত্তি না থাকতো তাহলে আমি নিশ্চিতভাবেই তার প্রেমে পড়ে যেতাম (কথাটা বলছি এটা জেনেই যে, এতো এতো ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে ইলোরা সেই প্রেম প্রত্যাখান করতেন! _ কেন এটা বলছি সেটা ব্যাখ্যার দায়িত্বও দর্শকদের)। শুধু তাদের কথাই বলি কেন? ফেরদৌস বা রুবেল না হয় অনেকখানি ক্যারিশম্যাটিক ফিগার, কিন্তু হাসান বা মারজুককে নিশ্চয়ই কেউ সুদর্শন বা আকর্ষণীয় বলবেন না, কিন্তু তারাও কী অসম্ভব আকর্ষণীয় চরিত্র হয়ে উঠলেন এই ছবিতে। এর কারণ কি? কি আছে ফারুকীর হাতে, কোন যাদুর কাঠির স্পর্শে এই ছবির চরিত্রগুলো এমন মোহনীয় হয়ে উঠলো? আমার মনে হয় সেই যাদুর কাঠির নাম সহজতা-স্বাভাবিকতা। ঢাকাই ছবির পরিচালকদেরকে মাথামোটা বলি, কারণ, তারা এটুকু বোঝেন না যে, সহজতা বা সিম্পলিসিটির অন্য নাম সৌন্দর্য। তারা তাদের চরিত্রগুলোকে উৎকট মেকাপের আড়ালে ঢেকে দেন, সেই সঙ্গে ঢেকে যায় তাদের স্বাভাবিকতাও। তারা এও বোঝেন না যে, সৌন্দর্য নিজেই একটা জটিল ব্যাপার, কেউ কোনোদিন তাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না, এ কেবল অনুভব করা যায়, আর তাই তাকে উপস্থাপন করতে হয় সহজভাবে _ জটিলভাবে উপস্থাপন করলে জটিলে জটিলে মিলেমিশে সেটা এক ভয়ংকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সরয়ার যেমন তার চরিত্রগুলোকে উৎকট মেকাপের আড়ালে ঢেকে দেননি, তেমনি সো-কলড আর্ট ফিল্ম মেকারদের মতো মেকাপ বিরোধী অবস্থানও নেননি। যাকে যে সাজে মানায় তাকে সেটাই দিয়েছেন। আর এটাই হচ্ছে শিল্পীর চোখ। শুধু যে মেকাপের জন্যই এই চরিত্রগুলো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে তা নয়, তাদের অভিনয়ও ছিলো সহজ-সাবলীল-স্বাভাবিক। সংলাপগুলো ছিলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভাষার মতো, কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা ছিলো না, ছিলো না অতি-অভিনয়, ছিলো না মেলোড্রামা। এই বাংলাদেশে, চলচ্চিত্রশিল্পের এই বিপন্নকালে এমন একটি চলচ্চিত্রের কথা কি ভাবা যায় যেখানে কোনো মেলোড্রামা নেই?

তো এই দুঃসময়ে এমন মেলোড্রামাহীন একটি ছবি নির্মাণের পেছনে কোন বিষয়টি কাজ করেছে? আমার মনে হয় _ ফারুকীর শিল্পবোধই তাঁকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। আমরা সবসময় শিল্পের ভাষা নিয়ে কথা বলি। যেমন কবিতার ভাষা, গল্প বা উপন্যাসের ভাষা, সাংবাদিকতার ভাষা, চলচ্চিত্রের ভাষা ইত্যাদি _ বুঝতে চাই না যে, প্রত্যেকটি শিল্পমাধ্যম নিজেই একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা। একটি কবিতা যে পর্যন্ত না নিজেই একটি ভাষা হয়ে উঠতে পারে, সে পর্যন্ত সেটা সফল কবিতা নয়, অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চলচ্চিত্রও তেমনই। একে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা হয়ে উঠতে হবে। ভাষার কাজ হচ্ছে কমিউনিকেট করা, আমরা শিল্পের নানা মাধ্যমে সেই কাজটিই করতে চাই, চলচ্চিত্রও তাই করবে _ চলচ্চিত্রকারের উপস্থিতি ছাড়াই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের চলচ্চিত্র নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা প্রায় কেউই একে একটি 'ভাষা' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি। তাঁরা 'চলচ্চিত্রের ভাষা' কেমন হবে, হওয়া উচিত সেটা নিয়ে কথা বলেছেন, ভেবেছেন কিন্তু ভাষা হিসেবে চলচ্চিত্র মাধ্যমটিকে ব্যবহার করার তথা ভাবেননি। আমাদের অধিকাংশ সো কলড আর্ট ফিল্মে পরিচালকদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। তারা দর্শকদেরকে নিজের বিশ্বাস ও চিন্তাচেতনাটিকে গিলিয়ে দিতে চান, তাতে করে বদহজম ছাড়া আর কিছুই হয় না। সরয়ার সেটা করেননি। ব্যাচেলর দেখে আমার মনে হয়েছে _ তিনি চলচ্চিত্রকে একটি ভাষা হিসেবেই দেখেন এবং এমনভাবে সেটা তৈরি করেন যে, দর্শকদের কষ্ট করে মনে রাখতে হয় না _ এর পেছনে একজন পরিচালক আছেন, মনে হয় যা বোঝার তা ছবিটি দেখেই বোঝা গেলো। ভবিষ্যতে সরয়ার কেমন ছবি নির্মাণ করবেন আমি জানিনা, কিন্তু এ ছবিটি দেখে আমি তাঁর ব্যাপারে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ খুঁজে পেয়েছি।

৫.

এতোসব প্রশংসাবাক্য দেখে পাঠকরা আবার ভাবতে পারেন, আমি বুঝি বন্ধুকৃত্য করতে বসেছি। অবশ্য বন্ধুরা কীর্তিমান হলে তাদের কৃত্য করায় আমি কোনো দোষ দেখি না। তাছাড়া আমি কোনো চলচ্চিত্র সমালোচকও নই, ফিল্মের খুঁটিনাটি বিষয় আমি ঠিক বুঝি না, ব্যাচেলরের বিষয়টি আমাকে আকৃষ্ট করেছে বলেই লিখতে বসেছি। আমার কাছ থেকে অসাধারণ কোনো সমালোচনা আশা করাটা ঠিক হবে না। তবু কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার। এই ফিল্মের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত অভিযোগটি হচ্ছে _ এটাকে ঠিক সিনেমা বলা যায় না, মনে হয়েছে নাটক দেখছি। যারা এটা বলছেন তাদের প্রায় সবারই একই বক্তব্য _ ফিল্মের নিজস্ব একটি ভাষা আছে, ব্যাচেলরে যেটা খুঁজে পাওয়া যায় না। এ সম্বন্ধে জবাব যা দেবার সরয়ারই দেবেন। আমি এ সম্বন্ধে আগেই একটু বলেছি _ ফিল্মের ভাষা নিয়ে কথা বলার লোক এ দেশে অনেক, তারা তাদের বিধিবদ্ধ ধারণার বাইরে আসতে চান না। সরয়ার যদি সাহসের সঙ্গে একটি অবস্থান নিয়ে বলতে পারেন, এ আমার নিজস্ব ভাষা _ আপনাদের এটা পছন্দ না হতে পারে কিন্তু আমি এই ভাষায়ই কথা বলবো _ তাহলে বোধহয় সমস্যাটা মিটতে পারে। আমি যেহেতু 'চলচ্চিত্রের ভাষা' ব্যাপারটা ঠিক বুঝি না, এ বিষয়ে আমার কিছু না বলাই শোভন হবে। কিন্তু চিত্রনাট্য নিয়ে আমার একটি অভিযোগ আছে _ এই ফিল্মে কোনো চরিত্রকেই আনিস বা সরয়ার কোথাও দাঁড়াতে দেননি, কোনো চরিত্রের বিকাশ ঘটেনি তেমন (ফরিদীর চরিত্রটি যথেষ্ট সম্ভানাময় হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের অবহেলায় তার কোনো বিকাশ ঘটেনি, আর হাসান এমন আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছেন তাঁদের মনোযোগ পেয়েছেন বলেই) _ এটা এই সিনেমার একটা দুর্বল দিক বলে মনে হয়েছে আমার। ফেরদৌস-শাবনূরের বিয়ের পর কাহিনীটা অনেকক্ষণ তাদেরকে ঘিরেই ঘুরপাক খেয়েছে, অন্য সব চরিত্রগুলোর যেন তখন কিছুই করার ছিলো না _ এটাও বেশ চোখে লেগেছে। সম্পর্কহীনতার গল্প বলেছেন তারা, কিন্তু কেন এই সম্পর্কহীনতা _ এ বিষয়ে কোথাও কোনো ইঙ্গিত নেই এই ফিল্মে। দর্শকেরও অনেককিছু বুঝে নেয়ার দায়িত্ব আছে সেটা স্বীকার করছি, কিন্তু ইঙ্গিতটা তো থাকতে হবে! কোনো চরিত্রের কোনো তুঙ্গ মুহূর্তকে ধরার চেষ্টা তেমন করা হয়নি _ কারো কোনো বিষণ্ন মুহূর্ত, বিষাদময় মুহূর্ত বা তীব্র আনন্দময় মুহূর্ত। ফিল্মে অনেকসময় কথাবার্তার চেয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের একেকটি এক্সপ্রেশন অনেক বেশি কমিউনেকিটেবল হয়ে ওঠে _ এই সিনেমায় সেটা তেমন পাওয়া গেলো না। (দুয়েকটা দৃশ্য ছাড়া _ যেমন, হাসান ভাই যখন ব্যালকনির রোয়াকে বসে 'ফাইভ হান্ড্রেড মাইল' গাইছিলেন, তখন তার এই একা বসে থাকা, একা গান গাওয়া, তার চোখ, ঠোঁট ও মুখের এক্স্রপ্রেশনই বলে দিচ্ছিলো তার নিঃসঙ্গতা কতোটা তীব্র, তার জীবনযাপন জুড়ে কী গভীর হাহাকার ছড়িয়ে আছে! আমি এমন দৃশ্যের অনুপস্থিতির কথাই বলছি।)

এবার একটি অভিযোগ, সরয়ারের দায়িত্ব এই অভিযোগের উত্তর দেয়া। ব্যাচেলরে একটি গান তিনি ব্যবহার করেছেন _ মানুষ হইয়া আমার কেন পাখির মতো মন, তাইরে নারে না... এই গানটি বিপ্লব চক্রবর্তীর লেখা, সুরও তাঁরই। অন্তত আমরা (আমি ও আমার বন্ধুরা) সেটাই জানি। বহুদিন আগেই এই গানটি তাঁর কণ্ঠে শুনেছি আমরা অনেকেই। এরপর বিপ্লব দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন। সরয়ার গানটি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু রচয়িতার নাম ব্যবহার করেননি, কোনোরকম কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেননি। তিনি যদি না-ও জানতেন যে এটি বিপ্লবের লেখা, সেক্ষেত্রে অন্তত সেটা আলাদাভাবে উল্লেখ করা যেতো! ক্রেডিট লাইনে গান রচয়িতা হিসেবে যাঁদের নাম দেয়া হয়েছে, এই গানটি যে তাঁদের কারোরই লেখা নয় এটা তো তিনি জানতেন! তাহলে? এটি কার লেখা তা জানার চেষ্টা করেননি কেন সরয়ার? ইদানিং আমাদের বিখ্যাত অনেক গানই 'সংগ্রহ' বলে চালিয়ে দেবার কালচার শুরু হয়েছে, এমনকি মরমী সাধক রাধারমণ দত্তের গানও 'সংগ্রহ' বলে চালিয়ে দেন অনেকে! জানতেও চেষ্টা করেন না, কার লেখা এসব গান। সরয়ারও সেই স্রোতে গা ভাসাবেন, ভাবতেও পারিনি আমি। আশা করছি, সরয়ার এই অভিযোগের লিখিত জবাব দেবেন, এবং খোঁজখবর নিয়ে জানার চেষ্টা করবেন, গানটি কার লেখা। বিপ্লবের লেখা হলে, তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করাটাও সরয়ারের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

৬.

এতো কথা বলার পর মনে হচ্ছে _ আনিস-সরয়ার যদি বলে বসেন, আমরা এসবের কিছুই মিন করতে চাইনি, এখনকার তরুণরা কিরকম জীবনযাপন করে শুধুমাত্র সেটাই দেখাতে চেয়েছি _ তাহলে? তাঁরা বা অন্য যে কেউ সেটা বলতেই পারেন, এবং সেক্ষেত্রে বলতেই হবে _ তাঁরা সফল হয়েছেন। কিন্তু তাতে কি আমার এইসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-মন্তব্য সব মাঠে মারা যাবে? মনে হয় না। একটি শিল্পকর্মের যদি বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা (মাল্টিডাইমেনশনাল ইন্টারপ্রিটেশন) না-ই থাকে, তাহলে সেটা কোনো শিল্পকর্মই নয়। আমি মনে করি, ব্যাচেলর একটি শিল্পকর্ম হয়ে উঠেছে, এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকবেই। তারচেয়ে বড় কথা _ এটা এমন এক ফিল্ম যে, এটি যিনি বা যারা দেখবেন, তাকে বা তাদেরকে হয় এর পক্ষে অথবা বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে, স্রেফ নীরবতা অবলম্বন করা সম্ভব হবে না। আর ব্যাচেলরের স্বার্থকতা এখানেই যে, এর সম্বন্ধে কেউ উদাসীন থাকতে পারছে না, কোনো না কোনো পক্ষ নিতেই হচ্ছে।