Page loading ... Please wait.

বাঙালির সংস্কৃতিচিন্তা
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
বাংলাদেশের মানুষের কাছে সংস্কৃতি শব্দটি প্রায় বিমূর্ত রূপ ধারণ করেছে। শব্দটি বাংলা ভাষায় গৃহীত হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত যত বিভ্রান্তি ও তর্ক-বিতর্ক তৈরি করেছে, আর কোনো শব্দ তা করেছে বলে মনে হয় না। সংস্কৃতি বিষয়টি বোঝার জন্য যাদেরকে নিয়ে কথা বলা দরকার- অর্থাৎ দেশের জনগণ- তারা এখন পর্যন্ত জানতেই পারলো না, বুঝতেও পারলো না যে, ওই বস্তুটি কী! দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষাবঞ্চিত নিরক্ষর জনগণ তো বটেই, এমনকি বহু 'শিক্ষিত' লোককেও বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এবং উচ্চতর পেশাগত মর্যাদায় অভিষিক্ত অনেক লোকও সংস্কৃতি বলতে কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেই বুঝে থাকেন। অর্থাৎ নাচ-গান-নাটক-চলচ্চিত্র-শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদিকেই সংস্কৃতি বলে মনে করেন। বলাবাহুল্য এগুলো সংস্কৃতিরই অংশ, সংস্কৃতির পুরোটা নয়। 'সাংস্কৃতিক' শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃতির মিল থাকায় এই বিপত্তি। এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর পেছনে গণমাধ্যমের ভূমিকাও কম নয়। প্রতিদিন পত্রপত্রিকায় 'সংস্কৃতি সংবাদ' নামে যা কিছু ছাপা হয়, কিংবা টেলিভিশনের সংবাদে 'এ সপ্তাহের সংস্কৃতি' জাতীয় শিরোনামে যা কিছু প্রচারিত হয় তা পড়ে বা দেখে মনেই হবে না যে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছাড়া সংস্কৃতির অন্য কোনো অর্থ আছে! বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বিষয়টি নিয়ে মাথাই ঘামায় না, আর শিক্ষিত লোকদের ধারণা এই রকম। অনেকে আবার বিষয়টিকে ধর্মবিরোধী বলেও মনে করেন (যেহেতু নাচ গান ইত্যাদি ধর্মসম্মত নয়)। ধর্মও যে সংস্কৃতিরই অঙ্গ এ কথা শুনলে সম্ভবত তাদের মাথায় বাজ পড়বে। বাংলাদেশে এই হলো সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণা। তা, সংস্কৃতি-চেতনার এই করুণ হাল কেন? একটা কারণ হতে পারে- শব্দটি জনগণের পছন্দ হয়নি, কিংবা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি, কিংবা বোধগম্য হয়নি। বাংলা ভাষায় শব্দটি চালু করার জন্য রবীন্দ্রনাথ যে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন তাতে প্রাথমিকভাবে জয়ী হলেও শেষ বিচারে তাঁর এই বিজয়কে নিস্ফলই বলতে হচ্ছে। অবশ্য সংস্কৃতির এই ধরনের ইন্টারপ্রিটেশনের জন্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও দায়ী করা চলে। কালচারের প্রতিশব্দ হিসেবে তিনি কৃষ্টিকে পছন্দ তো করেন-ইনি, বরং তীব্র বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। কৃষ্টি যেহেতু কর্ষণ বা কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পর্কিত, এটা তাই তাঁর পছন্দ হয়নি, সংস্কৃতিকে তিনি নিয়েছিলেন সংস্কার অর্থে। অর্থাৎ মনের কর্ষণ নয়, সংস্কারই তাঁর পছন্দ ছিলো! এ থেকে তাঁর মনোজগতের কাঠামোটিও খানিকটা বুঝে নেয়া যায়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গ-উপকরণ আর প্রয়োজনকে তিনি সংস্কৃতির মর্যাদা দিতে চান নি- হয়তো এগুলোকে তিনি স্থূল হিসেবেই বিবেচনা করতেন; বরং শিল্পসাহিত্যের মতো সূক্ষতম অনুভূতির চর্চাকে তিনি সংস্কৃতির মর্যাদা দিয়েছেন [সূত্র: কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি, নীহাররঞ্জন রায়]। 'কৃষ্টি'র বিরুদ্ধে এবং 'সংস্কৃতি'র পক্ষে তিনি কতোটা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন তার উদাহরণ হিসেবে তাঁর কয়েকটি পংক্তি বিচ্ছিন্নভাবে উল্লেখ করছি-

কাল্চার শব্দের একটা নূতন বাংলা কথা হঠাৎ দেখা দিয়েছে; চোখে পড়েছে কি? কৃষ্টি? ইংরেজি শব্দটার আভিধানিক অর্থের বাধ্য অনুগত হয়ে ওই কুশ্রী শব্দটাকে কি সহ্য করতেই হবে? এঁটেল পোকা পশুর গায়ে যেমন কামড়ে ধরে, ভাষার গায়ে ওটাও তেমনি কামড়ে ধরেছে। মাতৃভাষার প্রতি দয়া করবে না তোমরা?..ইংরেজি ভাষার চাষ এবং ভব্যতা একই শব্দে চলে গেছে বলে কি আমরাও বাংলা ভাষায় ফিরিঙ্গিয়ানা করব? ইংরেজিতে সুশিক্ষিত মানুষকে বলে কালটিভেটেড- আমরা কি সেইরকম উঁচুদরের মানুষকে চাষ-করা মানুষ বলে সম্মান জানাব, অথবা বলব কেদারনাথ?...কালচারড ফ্যামিলিকে প্রকর্ষবান বললে সে পরিবার গৌরব বোধ করবে। কিন্তু কৃষ্টিমান বললে চন্দনের সাবান মেখে স্নান করতে ইচ্ছে করবে।...(সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে লেখা চিঠি থেকে, পরিচয়, মাঘ ১৩৩৯)।

সংস্কৃতি বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন সেটাও বোঝা যাবে নিচের অংশটি পড়লে-

...আমাদের পেট ভরাবার জন্য, জীবনযাত্রার অভাব মোচন করবার জন্যে আছে নানা বিদ্যা, নানা চেষ্টা; মানুষের শূন্য ভরাবার জন্যে, তার মনের মানুষকে নানাভাবে নানা রসে জাগিয়ে রাখবার জন্যে আছে তার সাহিত্য, তার শিল্প। মানুষের ইতিহাসে এর স্থান কী বৃহৎ, এর পরিমাণ কী প্রভূত! সভ্যতার কোনো প্রলয়ভূমিকম্পে যদি এর বিলোপ সম্ভব হয়, তবে মানুষের ইতিহাসে কী প্রকাণ্ড শূন্যতা কালো মরুভূমির মতো ব্যাপ্ত হয়ে যাবে! তার 'কৃষ্টি'র ক্ষেত্র আছে তার চাষে-বাসে আপিসে-কারখানায়; তার সংস্কৃতির ক্ষেত্র সাহিত্য, এখানে তার আপনারই সংস্কৃতি, সেখানে তাতে আপনাকেই সম্যকরূপে করে তুলেছে, সে আপনিই হয়ে উঠেছে।... (সাহিত্যতত্ত্ব/সাহিত্যের পথে।)

বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশে সংস্কৃতি সম্বন্ধে যে ধারণাটি প্রচলিত আছে তা আসলে রবীন্দ্র-কনসেপ্টেরই সমপ্রসারণ। আমরা যদি রবীন্দ্র-ভাবনাবিশ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে চাই, তাহলে বাঙালির সংস্কৃতিকে বুঝে নেয়ার জন্য তাদের জীবনাচরণের প্রতিটি অনুষঙ্গ বিচার বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। অর্থাৎ বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ, সংস্কার, বিশ্বাস, ধর্ম, ধর্ম বিশ্বাসের ধরন, ধর্মাচরণের ধরন, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক, শিল্প-সাহিত্য এসবই আলাদাভাবে বিচার-বিবেচনার দাবি রাখে। তার আগে, সংস্কৃতি বলতে আমরা আসলে কী বুঝবো সেটা বলে নেয়া দরকার। সংস্কৃতি বিষয়টি, এমনকি শব্দটিও, যেহেতু বরাবর বিভ্রান্তি তৈরি করে এসেছে; এ সম্বন্ধে নিজের অবস্থানটি পরিষ্কার করার জন্যই একেকজন একেকটি সংজ্ঞাকে প্রমিত হিসেবে ধরে নেন। আমরাও একই কারণে সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রচলিত অন্তত কয়েকশ' মতের মধ্যে দুটোকে আমাদের মতের কাছাকাছি বলে গ্রহণ করতে পারি। একটি-

Culture is the man made part of the environment  (হারস্কোভিটস)।

অধ্যাপক পবিত্র সরকার এটিকে ব্যখ্যা করেছেন এভাবে
-

মানুষ আসার আগে পৃথিবী যে অবস্থায় ছিলো আর মানুষ আসার পর পৃথিবীর যে অবস্থা দাঁড়ালো এই দুইয়ের তফাত হলো সংস্কৃতির তফাত। পৃথিবীর জীবন প্রতিবেশে মানুষের সৃষ্ট যা কিছু সে সবই সংস্কৃতি বাকিটা প্রকৃতি। (সূত্র
: লোকভাষা লোকসংস্কৃতি, পবিত্র সরকার)।

এরকম আরেকটি সংজ্ঞাও নেয়া যায়
-

Historically created designs for living, explicit and implicit, rational, irrational and nonrational which exist at any time as potential guides for the behaviour of men (ক্লাইড ক্লাকহোন ও উইলিয়াম কেলি)।

মানে দাঁড়ালো- ঐতিহাসিকভাবে সৃষ্টি হওয়া জীবনযাপনের নানা ছক (ডিজাইন), যা কখনো প্রকাশ্য কখনো গোপন, কখনো যুক্তিসম্মত, কখনো অযৌক্তিক, কখনো যুক্তি নিরপেক্ষ (অর্থাৎ যেখানে যুক্তি-অযুক্তির প্রশ্ন তোলাই অবান্তর) এবং যা যে-কোনো সময়ে একটি জনগোষ্ঠীর আচরণকে পরিচালিত করে তা-ই হচ্ছে সংস্কৃতি। পবিত্র সরকার যুক্তিসম্মত উপকরণের উদাহরণ হিসেবে খাদ্য, পোশাক ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন, অযৌক্তিক উপাদান হলো ধর্ম বা সংস্কার-কুসংস্কার (যেহেতু এগুলো বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যুক্তির ওপরে নয়), আর ভাষা হচ্ছে যুক্তিনিরপেক্ষ উপাদান।

অর্থাৎ, সংস্কৃতি বলতে একটি জাতির প্রতিটি অনুষঙ্গকেই বুঝবো আমরা- পোশাক-আশাক, পেশা, খাদ্যাভ্যাস, ঘর-বাড়ির প্যাটার্ন থেকে শুরু করে তার বিশ্বাস-অবিশ্বাস-সংস্কার-কুসংস্কার ইত্যাদি সবই সংস্কৃতির অঙ্গ।

অবশ্য এই চিন্তাটি নতুন কিছু নয়। রবীন্দ্রোত্তরকালে, এমনকি তাঁর জীবদ্দশায়ই বুদ্ধিজীবীরা তাঁর ভাবনাবিশ্ব থেকে বেরিয়ে এসে সংস্কৃতিকে সামগ্রিক জীবনাচরণ হিসেবে মেনে নিয়েই এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে থাকেন। ৪০-দশকের গোড়ার দিকে (এপ্রিল, ১৯৪১) বিনয়কুমার সরকার 'বেঙ্গলি কালচার অ্যাজ এ সিস্টেম অব মিউচু্যয়াল আককুলটুরেশনস' শিরোনামে যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, সেটি বাঙালির সংস্কৃতি সম্বন্ধে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। গোপাল হালদার, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজি মোতাহার হোসেন, নিহাররঞ্জন রায় প্রমুখের রচনায় এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব চোখে পড়ে। কয়েকটি উদ্ধৃতি দিলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

কালচার, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এইসব শব্দ যে ধ্যানধারনার মূর্ত রূপ তা জীবনের কোনও আংশিক কর্ম ও জ্ঞানকাণ্ডের ধ্যানধারণা নয়, বরং জীবনের সমগ্র কর্ম ও জ্ঞানকাণ্ডের আশ্রয়ে জাত ও বর্ধিত। (সূত্র : কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি, নীহাররঞ্জন রায়।)

গোপাল হালদার মনে করেন_ সংস্কৃতির তিনটি অবয়ব বা তিন ধরনের অবলম্বন আছে : ১. জীবন সংগ্রামের বাস্তব উপকরণসমূহ (
material means) ২. সমাজ যাত্রার বাস্তব ব্যবস্থা (social structure), এবং ৩. মানস-সম্পদ। তিনি সমাজ যাত্রার বাস্তব ব্যবস্থাকে সংস্কৃতির প্রধান আশ্রয় এবং মানস-সম্পদকে সমাজের ওপরতলার উপকরণ (superstructure) হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন -

সংস্কৃতি বলতে যে শুধু ঘরবাড়ি, ধন-দৌলত বুঝায় তাহা নয়। শুধু যে রীতি-নীতি, আচার অনুষ্ঠান বুঝায় তাহাও নয়। সংস্কৃতি বলিতে মানস-সম্পদও বুঝায়- চিন্তা, কল্পনা, দর্শন, ধ্যান-ধারণা, এই সবও বুঝায়... আসলে বাস্তব ও মানসিক সমস্ত 'কৃতি' বা সৃষ্টি লইয়াই সংস্কৃতি- মানুষের জীবন-সংগ্রামের মোট প্রচেষ্টার এই নাম। ... সাধারণভাবে আমরা যে মনে করি কালচার জাতিগত, দেশগত বা ধর্মগত তাহা যেমন অর্ধসত্য, তেমনি সাধারণভাবে আমরা যে মনে করি কালচার অর্থ কাব্য, গান, চারুকলা, বড় জোর দর্শন বা বিজ্ঞান পর্যন্ত, তাহাও তেমনি আর একটি অর্ধসত্য। কথা এই যে, সংস্কৃতি সমাজ-দেহের শুধু লাবণ্যছটা নয়, তাহার সমগ্র রূপ। তাই সমাজের পরিচয় দিয়াই সংস্কৃতির পরিচয়। (সূত্র: সংস্কৃতির রূপান্তর, গোপাল হালদার।)

গোপাল হালদার তিনটি বিষয়কে সংস্কৃতির প্রধান সত্য হিসেবে অভিহিত করেছেন_ ফ্রিডম অব মাইন্ড (মনের স্বাধীনতা), ইউনিভার্সালিজম (বিশ্বমানবতা), এবং আর্বানিটি (নাগরিক শালীনতা)। সাধারণভাবে এই হলো সংস্কৃতির সদর্থ। কিন্তু তিনি মনে করেন- আর একটি বিষয়ও এর সঙ্গে যোগ করতে হবে। সেটি হচ্ছে- ক্রিয়েটিভনেস বা সৃষ্টিশীলতা। 'শুধু জানলে আর বুঝলেই মানুষের জীবনধর্ম শেষ হয়ে যায় না- তাকে কিছু করতে হয়, গড়তে হয়, সৃষ্টি করতে হয়।'
 
পবিত্র সরকার মনে করেন- সংস্কৃতির দুটো প্রধান ভাগ। বস্তুগত এবং অবস্তুগত (অ্যাবস্ট্রাক্ট)। প্রথম ভাগে পড়ে মানুষের জীবনে ব্যবহৃত যাবতীয় নিত্যব্যবহার্য বস্তুসামগ্রী আর দ্বিতীয় ভাগে পড়ে মানুষের যুক্তিসম্মত চিন্তা ও সিদ্ধান্ত, বিশ্বাস ও সংস্কার, সুন্দর (ও অসুন্দরের) কল্পনা। আর এই সমস্তকিছুই যদি সমান ও সংগতভাবে একটি জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায় তাকেই বলা যায় সুস্থ সংস্কৃতি। এর বিপরীতে আছে অপসংস্কৃতি- যা অসাম্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে লোকসংস্কৃতিকে অনাগরিক সংস্কৃতি নাম দিয়ে এর প্রধান লক্ষণ হিসেবে তিনি এর উপাদান সমূহে 'সামাজিক মালিকানাকে' চিহ্নিত করেছেন। (সূত্রঃ লোকভাষা লোকসংস্কৃতি, পবিত্র সরকার)।
 
আবার আবদুল মতীনের মতে- সংস্কৃতির গোড়ার কথাটি হলো মূল্যবোধ। মূল্যবোধ দু-ধরনের হতে পারে : ব্যক্তিগত ও সামাজিক। ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ ও অভিরুচির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধগুলো ব্যক্তির পছন্দ হোক আর না হোক, সংস্কৃতিবান হতে হলে তাকে মানতেই হবে। সামাজিক মূল্যবোধগুলোর কেন্দ্রে আছে নৈতিকতা ও যুক্তিবাদিতা। প্রথমটির তাৎপর্য ব্যবহারিক, দ্বিতীয়টির তত্ত্বীয়। নৈতিকতাকে ঘিরে 'যথার্থ' মানুষের যে সংস্কৃতি, তিনি তাকে বলেছেন 'মৌল সংস্কৃতি', আর যুক্তিবাদকে ঘিরে যে সংস্কৃতি তার নাম দিয়েছেন 'উচ্চতর সংস্কৃতি' বা 'শৌখিন সংস্কৃতি'। সব মানুষের ভেতরেই কম-বেশি মৌল সংস্কৃতির দেখা মেলে, অন্যদিকে শৌখিন সংস্কৃতির চর্চা করেন সমাজের গুটিকয় মানুষ। শৌখিন সংস্কৃতিকে অধিকাংশ মানুষের কাছে পেঁৗছে দেয়াটাই কল্যাণকামী মানুষের প্রধান একটি কাজ। (সূত্র: সংস্কৃতির সন্ধানে, আবদুল মতীন।)

২.
শুধু সংস্কৃতিই নয়, এই শব্দটির গায়ে গায়ে লেগে আছে অন্য যে শব্দ দুটো- লোকসংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতি- আমাদের চিন্তাবিদেরা সেসব নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন।

পবিত্র সরকার তাঁর 'লোকসংস্কৃতির নন্দনতত্ত্ব' শিরোনামের চমৎকার রচনাটিতে লোকজীবনের নিজস্ব নন্দনতত্ত্বের দিকে শিক্ষিত সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন- শিক্ষিত ও উচ্চশ্রেণীর নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে নিম্নশ্রেণীর বা লোকজীবনের নন্দনতত্ত্ব মেলে না- মেলার কথাও নয়। কিন্তু 'ভদ্রসমাজ' লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান- লোকগান, লোকছড়া, ধাঁধা, হেঁয়ালি, প্রবাদ ইত্যাদি নিজ সমাজে উপস্থাপন করার সময় তাদের নিজস্ব নন্দনতত্ত্বের সাহায্যে সেগুলোর শিল্পমূল্য নির্ধারণ করতে চান। এ কাজটি অসঙ্গত- কারণ লোকসংস্কৃতির এসব উপকরণ শুধু সৌন্দর্যসৃষ্টির জন্যই রচিত হয় না, তার আরও বহুবিধ ব্যবহারিক মূল্য থাকে।
 
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও শহুরে-শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দ্বারা লোকসংস্কৃতি-চর্চার বিরোধিতা করে বলেছেন- এই ধরনের চর্চা প্রতারণামূলক। সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে তা করা হয় না, যেহেতু তাদের সঙ্গে এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক এমন কিছু সৌহার্দ্যপূর্ণ নয়। তবে সামগ্রিকভাবে লোকসংস্কৃতির ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। তিনি মনে করেন, লোকসংস্কৃতির জগৎ হচ্ছে ভীতি ও বেদনার জগৎ, এই জগৎ ক্ষুদ্র, স্বাস্থ্যহীন ও অনুজ্জ্বল। এর সমাজতাত্তি্বক মূল্য থাকলেও শিল্পমূল্য সামান্য- একে টিকিয়ে রাখা বা গৌরাবান্বিত করা পেছনে হাঁটারই নামান্তর। (সূত্র: লোকসংস্কৃতির ভদ্রচর্চা, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।)
 
অন্যদিকে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় উপনিষদ থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন- লোকসংস্কৃতির ধারাটি পুরাণের চেয়ে পুরনো এবং লোকসংস্কৃতির যে মূল উপাদান- নৈরাত্নবাদ- তারই প্রাচীন নাম লোকায়ত দর্শন। লোকায়তিকদের কাছে সুস্পষ্টভাবে ইন্দ্রিয়গোচর বিষয়গুলোই শুধু সত্য- যেমন অর্থ ও কাম- পরকাল/পরলোক/আত্না/স্বর্গ-নরক ইত্যাদি কাল্পনিক বিষয়ে তাদের আস্থা নেই। লোকায়ত দর্শন কেবল 'কৌতূহল নিবৃত্তির ব্যাপার নয়', জনগণের 'মতাদর্শগত সংগ্রামের অস্ত্রও' বটে- যার আধুনিক নাম বস্তুবাদ। (লোকসংস্কৃতি ও লোকায়ত দর্শন : দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়)

দিব্যজ্যোতি মজুমদার অবশ্য মনে করেন- লোকসংস্কৃতির উদ্ভব শুধু গ্রামীণজীবনেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ যেখানে বেঁচে রয়েছে, উত্তরপুরুষকে কিছু দিয়ে যাবার প্রবণতা যেখানে রয়েছে, সেই ভূমিই লোকসংস্কৃতির উর্বরক্ষেত্র। সেটা গ্রাম বা শহর যে কোনোকিছুই হতে পারে। লেখক উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন- এমনকি দেশান্তরি হলেও লোকসংস্কৃতির মূল ঐতিহ্যের মৃতু্য ঘটেনি। কেবল সমগ্র জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার মাধ্যমেই লোকসংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটানো সম্ভব। (সূত্র : লোকসংস্কৃতির ভবিষ্যৎ : কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা, দিব্যজ্যোতি মজুমদার।)
 
প্রায় পরস্পরবিরোধি এইসব মতামতকে গ্রাহ্যের মধ্যে এনে লোকসংস্কৃতিকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়? অস্বীকার করার উপায় নেই যে, লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান-উপকরণ-অনুষঙ্গ যেমন লোককাহিনী, লোকগান, লোকছড়া, লোককথা, লোকগাথা, রূপকথা, প্রবাদ, প্রবচন, ধাঁধা- এসবই শুনতে ভালো লাগে, পড়তে ভালো লাগে, বলতেও ভালো লাগে। শ্রেণী-পেশা-বয়স নির্বিশেষে এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যিনি এগুলো পছন্দ করেন না। বিশুদ্ধ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে লোকসংস্কৃতির তাই একটি গুরুত্ব আছে। কিন্তু এটিই এর একমাত্র গুরুত্ব নয়, নানা কারণেই এগুলো আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়। এর একটি হলো- লোকজীবনের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটে এসব কাহিনী ও গল্পে, গানে ও ছড়ায়। যে কোনো দেশের লোককাহিনী আসলে ওই দেশের লোকজীবন রচিত আকাঙ্ক্ষার গল্প। একথা সবাই জানেন যে, এসব রচনার কোনো সুনির্দিষ্ট রচয়িতা নেই। দারিদ্রক্লিষ্ট, সংকট ও সমস্যাবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত যে জনগোষ্ঠী তাদেরই মুখে মুখে রচিত হয় এসবকিছু, আর লোকমুখে যুগের পর যুগ ধরে তা প্রবাহিত হতে থাকে। এই প্রবাহমানতাই জনজীবনের কাছে এসবকিছুর গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে। আবার কোনো সুনির্দিষ্ট রচয়িতা নেই বলে এগুলো সামাজিক সম্পত্তি হিসেবেই বিবেচিত হয়। মিহির ভট্টাচার্য যেমন লোকসংস্কৃতি সম্বন্ধে বলেছেন- 'গোষ্ঠীগত জীবনের সঙ্গে জড়িত, সহমর্মিতা ও কণ্ঠস্বরের বিভিন্নতায় সমৃদ্ধ।' (সূত্র: আধুনিক গণমাধ্যম এবং লোকসংস্কৃতির ভবিষ্যৎ, মিহির ভট্টাচার্য), কিংবা পবিত্র সরকার যেমন লোকসংস্কৃতিকে 'অনাগরিক সংস্কৃতি' নাম দিয়ে এর প্রধান লক্ষণ হিসেবে এর উপাদানসমূহে 'সামাজিক মালিকানা'কে চিহ্নিত করেছেন। নাগরিক সাহিত্য-পরিমণ্ডলে সাহিত্যের ওপর লেখকের স্বত্ত্ব থাকে, এগুলো তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি, অন্য কারো অধিকার নেই এসব রচনার পরিমার্জনের- কিন্তু লোককাহিনীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি উল্টো। মানুষের মুখ থেকে মুখে ঘুরে ফেরার সময় অনিবার্যভাবেই এ কাহিনীগুলোর রূপ পাল্টায়, পরিবর্ধন ঘটে, পরিমার্জনও- কখনো সময়ের প্রয়োজনে একই গল্পের মধ্যে নতুন বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটে- এবং যেহেতু এগুলো সামাজিক সম্পত্তি, এসব পরিবর্তনে তাই কারো কোনো আপত্তি থাকে না, থাকলেও খাটে না। কিন্তু কেনই বা এসব গল্প এত দীর্ঘকাল ধরে জনজীবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় বা টিকে থাকে? এর একটি কারণ, আগেই বলা হয়েছে- এগুলোর মধ্যে দিয়ে লোকজীবনের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটে। নিজেদের সমস্যা-সংকট থেকে সহসা যাদের মুক্তি মেলেনা, এসব গল্পের মধ্যে দিয়ে তারা এক ধরনের মুক্তি খুঁজে নিতে চায়। লোককাহিনীর জগৎ এক অর্থে জগণের ফ্যান্টাসির জগৎ। এখানে অহরহ দেখা মেলে দৈত্য-দানবের, ভূত-পরীর, রাজপুত্র-রাজকন্যাদের। এসব দৈত্যরা আবার নিজেদের প্রায় অসীম শক্তিমত্তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তার কাছে পরাজিত হয়, পরীরা হয় সহযোগিতাপ্রবণ আর রাজপুত্ররা প্রায় সাধারণ মানুষের মতোই সমস্যা-সংকটে জর্জরিত, এসব সংকট উত্তরণে সাধারণ মানুষদের নানারকম সহযোগিতা তাদের প্রয়োজন হয়। বলাইবাহুল্য, যারা এসব গল্পের রচয়িতা- এ আসলে তাদের আকাঙ্ক্ষারই প্রকাশ, আর প্রায় সমাধানহীন সমস্যা-সংকটগুলোর সমাধান তারা করে এসব ফ্যান্টাসির মাধ্যমে। কিন্তু এ ছাড়াও লোকসংস্কৃতির নানা উপাদানের- লোককথা, লোকছড়া, গান, প্রবাদ, প্রবচন, ধাঁধা ইত্যাদির- আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যও থাকে। এসবকিছুর মধ্যে এর রচয়িতারা পরবর্তী প্রজন্মসমূহের জন্য রেখে যান নানারকম প্রয়োজনীয় ও শিক্ষণীয় উপাদান। সমাজে প্রচলিত নানরকম সংস্কার-বিশ্বাস-মূল্যবোধ-নীতিবোধ-ঔচিত্যবোধ ইত্যাদি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয় এসবের মাধ্যমে। এই অর্থে লোকসংস্কৃতি সামাজিক-শিক্ষকের ভূমিকাও পালন করে। মনে রাখা দরকার- এগুলোর জন্ম এমন এক সমাজে যেখানে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় কোনোকিছূ রেখে যাবার আধুনিক কোনো পথই তাদের জন্য খোলা ছিলো না। শুধূু তাই নয়, লোকসংস্কৃতি থেকে যে কেউ অন্তত আরো দুটো বিষয় খুঁজে নিতে পারেন- সাধারণ মানুষের কল্পনা প্রতিভা ও তাদের দার্শনিকতা। যে অসামান্য কল্পনা প্রতিভা দিয়ে রূপকথাগুলো রচিত, তা সম্ভবত একজন আধুনিকতম লেখকেরও থাকে না। অন্যদিকে জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে নানা দার্শনিক উপলব্ধির প্রকাশও ঘটে এসবকিছুতে। কিন্তু লোকসংস্কৃতির এতসব ভূমিকা খুঁজে দেখেন নাগরিক ও শিক্ষিত জনগণ। যারা এসব রচনা করেন, উপভোগ করেন- তারা যদি বলেন, নিছক আনন্দের জন্যই এসবকিছুর সৃষ্টি, তাহলে সেটাই সম্ভবত এসব রচনা সম্বন্ধে সবচেয়ে সঠিক কথা। যে জীবন দারিদ্র, দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, সমস্যা ও সংকটে পূর্ণ, যে জীবন পরিবর্তনহীন, প্রায় স্থবির, যে জীবনে আনন্দের বহুবিধ আধুনিক উপকরণ ছড়ানো নেই- সে জীবনে লোকসংস্কৃতির এসব উপাদানের ভূমিকা যদি হয় নিছক আনন্দদান, তাহলে বলতেই হয়, লোকসংস্কৃতি মহান- কারণ একটি দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে সে আনন্দ দিতে পারে, অন্য কোনোকিছুই যা পারে না। প্রকৃতপক্ষে লোকসংস্কৃতি তা-ই।

৩.
সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনায় 'অপসংস্কৃতি' এক অনিবার্য প্রসঙ্গ। এ সম্বন্ধেও আমাদেও চিন্তাবিদরা বহুমাত্রিক ভাবনা-চিন্তার সাক্ষও রেখেছেন। অন্যান্য বিষয়ের মতো অপসংস্কৃতি সম্বন্ধেও পবিত্র সরকারের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য-

যা জীবনকে সুস্থ বিকাশের দিকে এগিয়ে দেয়, সামগ্রিকভাবে সমাজের এবং ব্যক্তির জীবনও মননের পুষ্টিতে সাহায্য করে, তাই সুস্থ সংস্কৃতি। সংস্কৃতির উপাদান-উপকরণগুলো সমান ও সংগতভাবে সবার কাছে পৌঁছে যাবে, সুস্থ সংস্কৃতির ধারণাটি এই আদর্শের সঙ্গে যুক্ত। সমাজের ক্ষমতা, সম্পদ ও ভোগ্যপন্য বন্টনের অসাম্যই অপসংস্কৃতি।... অপসংস্কৃতি এক ধরনের পরিবেশ দূষণ। কফ থুতু মলমূত্রে রাস্তাঘাট নোংরা করা, বা গালিগালাজ করা যেমন অপসংস্কৃতি, ঘুষ নেওয়াও তেমনই, পরীক্ষায় টোকাটুকিও নিশ্চয়ই আর এক ধরনের অপসংস্কৃতি। কিন্তু সাধারণভাবে আমরা অপসংস্কৃতি বলতে বুঝি শিল্পের কুশ্রীতা, মানুষের আদিম লোভ, হিংস্রতা ও কামনাকে উদবেজিত করার লক্ষ্য নিয়ে সংস্কৃতিবস্তুর সচেতন পরিকল্পনা ও বিন্যাস।... অপসংস্কৃতির তিনটি বড়ো জায়গা চিহ্নিত করতে পারি আমরা। প্রথমত আমাদের বিনোদনের উপাদানগুলিতে, দ্বিতীয়ত আমাদের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে, তৃতীয়ত আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত ব্যবহার ও প্রথাতে- অপসংস্কৃতির লক্ষণ সবচেয়ে বেশি করে ধরা পড়েছে। (সূত্রঃ লোকভাষা লোকসংস্কৃতি, পবিত্র সরকার)।

অন্যদিকে সুকুমারী ভট্টাচার্য মনে করেন- সংস্কৃতি মানে যদি হয় নিজেকে সংস্কার করা, তাহলে অপসংস্কৃতি হলো্ল- সমাজের জন্য, সভ্যতা ও প্রগতির জন্য ক্ষতিকর এমন কোনোকিছুকে প্রশ্রয় দেয়া বা তাকে আঁকড়ে থাকা বা তাকে সমাজ থেকে জঞ্জালের মতো ঝেড়ে না ফেলা। অপসংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে কতগুলো নতুন ও মূল্যবান বিবেচনা দাঁড় করিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে- অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার তারা শুধুমাত্র পাশ্চাত্য-প্রভাবিত নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশা, যৌনসম্পর্ক, পোশাক-আশাক নাচ-গান এগুলো নিয়েই কথা বলেন। অথচ এই দেশে-সমাজে বিষবৃক্ষের মতো বাড়তে থাকা সামপ্রদায়িকতা, জাতিভেদ, নারীর প্রতি অবমাননা ও অত্যাচার, নারী-পুরুষে সীমাহীন বৈষম্য- সমাজ ও প্রগতির জন্য ক্ষতিকর এসব বিষয়ও সযত্নে এড়িয়ে যান। তিনি এগুলোকেই অপসংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

এ সম্বন্ধে অন্নদা শংকর রায়ের মতামতটিও কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি মনে করেন- অপসংস্কৃতি নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য কারো কাছে সাহায্যের হাত পাতে না, সরকার কিংবা ধনবান ব্যক্তিদের পৃষ্টপোষকতার ধার ধারে না- কারণ সে স্বাবলম্বী। আর এর জোর হচ্ছে জনতার আগ্রহ। জনগণ যেমনটি চায়, অপসংস্কৃতি নিজেকে সেভাবেই তৈরি করে। আর তাই জনগণের আগ্রহ যেহেতু রাতারাতি শেষ হয়ে যায় না, অপসংস্কৃতিও সহসা বিলীন হওয়ার কারণ নেই। অপসংস্কৃতি রোধ করার জন্য প্রয়োজন জনতার রুচি পরিবর্তন।

হায়াত মামুদ অবশ্য উল্টো মত পোষণ করেন। তিনি মনে করেন সংস্কৃতি যদি হয় সুন্দর, সুস্থ ও কাম্য জীবনের প্রতীক, তাহলে অপসংস্কৃতি হবে অসুন্দর, অসুস্থ ও অবাঞ্চিত জীবনের প্রতীক। কিন্তু সবার কাছে যদি সেটি অবাঞ্চিতই হবে তাহলে তো বিষয়টির কোনো গ্রহণযোগ্যতাই থাকতো না! আছে, কারণ কেউ কেউ তাকে গ্রহণও করে, সংস্কৃতির সঙ্গে তা কখনো মিলেমিশেও যায়! তবে সংস্কৃতির যেমন কালে কালে বয়ে যাবার ক্ষমতা আছে, অপসংস্কৃতির তা নেই। অপসংস্কৃতি নিতান্তই সময়চিহ্নিত ও সময়শাসিত। তাকে নিশ্চিহ্ন হতে হয় অথবা দীর্ঘকাল ধরে বেঁচে থেকে সংস্কৃতিরই অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়।

৪.
সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনায় লেখকরা সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্ম, সভ্যতা, গণতন্ত্র, সমকাল ইত্যাদি নানা বিষয়ের সম্পর্ক নির্ণয়েও গুরুত্বপূর্ণ মত রেখেছেন। এসব বিষয়ে পরস্পরবিরোধী মতও লক্ষ্য করা গেছে। যেমন ধর্ম ও সংস্কৃতির সম্পর্ক সম্বন্ধে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মত হচ্ছে- এ দুটো বিষয় পরস্পরবিরোধী। কারণ, ধর্ম ও এর নিয়মকানুন-বিধিবিধান সুনির্দিষ্ট, অনড় এবং অপরিবর্তনীয়। অন্যদিকে সংস্কৃতি প্রবহমান ও প্রসারণশীল। এদের মধ্যে তাই আপস হতে পারে না, তবে একটা রফা হতে পারে এই যে, যে যার মতো চলবে- কেউ কারো জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। 'সংস্কৃতি চলতে চায়, বাড়তে চায়, অগ্রসর হতে চায়।...সংস্কৃতি অর্থ সুন্দর, সুষম জীবনচর্চা।' যা কিছু জীবনের সুস্থ-সুন্দর বিকাশে সহায়তা করবে তার সঙ্গে সংস্কৃতির বিরোধ নেই; বরং সংস্কৃতি তা গ্রহণ করবে- হোক তা দেশী বা বিদেশী ভাবধারা বা রীতিনীতি। এই গ্রহণ ধর্মের কাছ থেকেও হতে পারে, আর ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্কও এটুকুই। (সূত্র: ধর্ম ও সংস্কৃতি, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী।)

গোপাল হালদারও মনে করেন- ধর্ম কখনো সংস্কৃতির ভিত্তি হতে পারে না। কারণ সংস্কৃতি হলো চিরপরিবর্তনীয়, চিরবিকাশশীল সর্বব্যাপক- তার বনিয়াদ বাস্তবক্ষেত্রে জীবনযাত্রা; সেই জীবনের তাগিদেই সে আচার-অনুষ্ঠান গড়ে, ভাঙে, বদলায়, সে মানবসম্পদও রচনা করে, বর্জন করে, সৃষ্টি করে। অর্থাৎ সংস্কৃতি গতিধর্মী এবং সৃষ্টিশীল। অন্যদিকে ধর্ম হলো স্থিতিধর্মী, তার লক্ষ্য সৃষ্টি নয়, স্থায়ীত্ব। ধর্ম চায় জগৎ ও জীবনবোধকে চিরন্তন করে রাখতে। ধর্ম তাই সংস্কৃতির অঙ্গ বটে, ভিত্তি নয়।

শুধু সংস্কৃতির সংজ্ঞা নির্মাণই নয়, বাঙালির সংস্কৃতি, বাংলার সংস্কৃতি এবং কখনো সর্বভারতীয় সংস্কৃতি নিয়েও বিশদ ভাবে আলোচনা করেছেন বাঙালিরা চিন্তাবিদরা। বাঙালি সংস্কৃতির আলোচনায় যেমন একটি সমন্বিত রূপ খোঁজার চেষ্টা হয়েছে, সেইসঙ্গে অনিবার্যভাবে এসেছে ধর্মের প্রসঙ্গ, বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ ও ঐক্যের প্রসঙ্গও। অর্থাৎ অস্বস্তিকর বিষয়গুলো 'অস্বস্তিকর' হিসেবে সরিয়ে না রেখে সেগুলো আগাগোড়া বিশ্লেষণ করেছেন তাঁরা, বিরোধের কারণ সন্ধান করেছেন, ঐক্যের সম্ভাবনা ও ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলেছেন। পরস্পর-বিরোধী বক্তব্যও পাওয়া গেছে অনেক। যেমন কেউ কেউ ধর্মকে সংস্কৃতির অংশ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, কেউ কেউ আবার ধর্মকে দেখেছেন সংস্কৃতিবিরোধী বিষয় হিসেবে। বাঙালি সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধানে কেউ বিরোধের বিষয়টিকে প্রকট করে তুলেছেন, কেউ আবার বিরোধ স্বত্ত্বেও ঐক্যের বিষয়গুলোর ওপর জোর দিয়েছেন।

ভারতীয় সংস্কৃতি সম্বন্ধে একটি হৃদয়গ্রাহী বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে গোপাল হালদারের ভারতীয় সংস্কৃতির ধারা : আদিরূপ এবং ভারতীয় সংস্কৃতির ধারা : প্রাচীন ও মধ্যরূপ রচনা দুটোতে। প্রচুর তথ্য ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন_ প্রাচীন ভারত একান্তভাবেই কৃষিজীবী ছিল। এ-ধরনের সমাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো_ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা। ফলে ভারতীয় সাহিত্যে, দর্শনে বা মানসজগতে আত্নপ্রত্যয় নেই_ আছে অদৃষ্টবাদ, ভাববাদ ও সহজ সমর্পণ। প্রাচীন ভারতের এই কৃষিজীবী সংস্কৃতি দীর্ঘকাল তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই টিকে ছিল। প্রাচীন ও মধ্যরূপ আলোচনার জন্য তিনি খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে মুসলিম শাসনের শেষ পর্যন্ত (১৭৬৪ খৃষ্টাব্দ) সময়টিকে বেছে নিয়েছেন। দেখিয়েছেন_ এই দীর্ঘ কালখণ্ডে ভারতীয় জীবনধারা মোটামুটি একই খাতে প্রবাহিত হয়েছে। রাজা বদলেছে, রাজ্য বদলেছে, সমাজ বিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে মানুষের জীবনে বহু ধরনের পরিবর্তন এসেছে কিন্তু কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়নি। এই সময়ে এককেন্দ্রিক কোনো রাষ্ট্র না থাকলেও একটি সাংস্কৃতিক ভাবধারার ঐক্য ও আচার-বিচারের ধারণা প্রচলিত ছিল। যেহেতু ভারতীয় সভ্যতার আর্থিক বুনিয়াদ ছিল কৃষি_ তাই রাজা ও রাজ্যের পরিবর্তন সত্ত্বেও পলি্লসমাজ অটুট থেকেছে। ভারতের যাবতীয় বৈচিত্রময় বিকাশের মূলে আছে কৃষিসভ্যতা, ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। প্রাকৃতিক কারণেই ভারতীয় জনগণের ছিল এক স্বচ্ছন্দ, স্বতন্ত্র আর্থিক জীবনযাত্রা। এর সঙ্গে বহিরাগত বিভিন্ন জাতির জীবন ও চিন্তাধারা মেশার ফলে বহুবিচিত্র সংস্কৃতির মিলনে গড়ে উঠেছে ভারতের ইতিহাস। নদীমাতৃক ভারতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য কৃষিজীবীদের জন্য এক বিরাট সুবিধা, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের অধিবাসীরা পোশাকের ব্যাপারেও প্রকৃতির কাছ থেকে অযাচিত সুবিধা পায়। অর্থাৎ এখানে জীবনযুদ্ধে মানুষের সহজ জয় হয়, আর এই জয়ে জোটে বিশ্রাম ও অবকাশ। এই সুবিধা পাওয়ার ফলে তাদের মধ্যে সহজ জীবিকার জন্য উদ্যমহীনতা ও বিকাশের মন্থরতা দেখা যায়। আর অবকাশভোগী সমাজে অনিবার্যভাবে বাস্তবের চেয়েও কল্পনা বড় হয়ে ওঠে, ভাববাদিতার প্রতি শ্রদ্ধা জাগে বেশি। এর প্রভাব পড়ে বহিরাগত আর্যদের ওপরও। আর্যরা একটিমাত্র গোষ্ঠী নয়, তাদের সভ্যতাও সমস্তরের ছিল না, তবে তারা এক ধর্ম ও সংস্কৃতি মানত। হিন্দুসভ্যতা নিছক আর্যসভ্যতা নয়_ এদেশে আসার পর আদিবাসী দ্রাবিড়, কোল, মুণ্ডা প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে এক নতুন আর্য-সংস্কৃতির জন্ম হয়। প্রাচীন আর্যরা প্রবল ও দুর্ধর্ষ মানুষ_ যুদ্ধজয় ও শত্রুনাশ তাদের প্রধান সাধনা। খাদ্য-পানীয়-নৃত্য-ক্রীড়া_ এসবেই তাদের উৎসাহ, চিন্তা-ধ্যান-বৈরাগ্য তাদের ধর্ম নয়। তবু ভারতীয় প্রকৃতির প্রভাবে তাদের মধ্যে এক মানসিক প্রকর্ষের সৃষ্টি হলো, আর এর পেছনে ছিলো ভাববাদিতা, যা পরিশেষে হিন্দু-আধ্যাতি্নকতায় পরিণত হয়। এর ফল পুরোপুরি ইতিবাচক হয়নি। কারণ_ কায়িক শ্রম ব্রাক্ষণ্যবাদী সমাজে অপমানজনক বিষয় হিসেবে গণ্য হতে থাকে, এবং বস্তুবিমুখ চিন্তার প্রসার, ভাববাদ ইত্যাদিই একমাত্র সত্য বলে গৃহীত হয়। এর মধ্যেই জন্ম নেয় বৌদ্ধধর্ম_ নির্বাণবাদ যার প্রধান স্তম্ভ। নির্বাণবাদ বস্তুবাদ নয়, জীবনবাদও নয়। নির্বাণকেই যারা জীবনযন্ত্রণার চরম অবসান বলে মনে করে, জীবনের প্রতি তাদের মমতা থাকার কথা নয়। তবে বৌদ্ধধর্ম শ্রেণীবিভক্ত ব্রাক্ষণ্য সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল বলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। এই ধর্মকে কেন্দ্র করে একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র গঠনেরও চেষ্টা চলেছিল। শুধু তাই নয়, বৌদ্ধধর্মই ভারতকে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করে দেয়, এর একটি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল। এরপর আসে মুসলিম জনগোষ্ঠী। তবে রাষ্ট্রজয়ের পরও তাদের সংস্কৃতি সর্বতোভাবে গৃহীত হয়নি ভারতীয় জনগণের কাছে। শাসকদের প্রভাবে সমাজগত বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও পরিবর্তন এসেছে অন্যভাবে। নিপীড়িত জনগণের কাছে ইসলামের শান্তি-সাম্যের বাণী বিপুলভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, জন্ম নিয়েছে নতুন ভাষা_ উর্দু, নতুন ধরনের আদব কায়দা, পোশাক-আশাক, নতুন ধরনের নিত্যসামগ্রীর প্রচলন। এই দীর্ঘসময়ে বহিরাগতদের দ্বারা ভারত আক্রান্ত হওয়ার ফলে এককেন্দ্রিক সাম্রাজ্য গঠন সম্ভব হয়নি। ফলে ভারতবাসী এক রাষ্ট্রজাতি বা নেশন হতে পারেনি, ভারত হয়ে আছে বহুজাতির দেশ ও সমাজ।
বাঙালি সংস্কৃতিকে ভারতীয় সংস্কৃতিরই একটি বিশেষ ধারা উল্লেখ করে গোপাল হালদার তাঁর বাঙালী সংস্কৃতির রূপরেখা প্রবন্ধে বলেছেন_ এর নিজস্ব একটি রূপ ও বৈশিষ্ট্য ছিল এবং আছে, আর তা গড়ে উঠেছিল মূলত বাংলাভাষাকে কেন্দ্র করে। এই সংস্কৃতির স্বরূপ আলোচনার জন্য তিনি একহাজার বছর সময়কালকে তিন ভাগে ভাগ করে বলেছেন_ পূর্বযুগে এ অঞ্চলে ব্রত, পার্বণ, মন্ত্রতন্ত্র ও ঝাঁড়ফুকের খুব প্রসার ছিল, জীবনযাত্রা ছিল কৃষিপ্রধান। মধ্যযুগে বৈষ্ণব ও ইসলাম ধর্মের প্রভাবে বাঙালি সংস্কৃতির রূপ বদলে যেতে থাকে। এ সময়ে ব্যাপকভাবে সাহিত্য-সঙ্গীত ও লোকসংস্কৃতির চর্চা হতে থাকে এবং এতে শাসকশ্রেণীর ব্যাপক পৃষ্টপোষকতা ছিল। আধুনিক কালের সংস্কৃতি মূলত পরাধীন জাতির সংস্কৃতি যা ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের চিহ্ন বয়ে চলেছে। এই সময়েই মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি হয় এবং তাদের দ্বারা সৃষ্ট 'ভদ্রলোকের সংস্কৃতি' বিপুল জনগোষ্ঠীর 'লোক সংস্কৃতি'র সঙ্গে সংযোগ ও সম্পর্কবিহীন হয়ে পড়ে।

আহমদ শরীফ মনে করেন বাঙালি তার স্মরণাতীতকাল থেকেই জীবনবাদের চর্চা করেছে_ এমনকি বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদকেও কেটেছেঁটে নিজের বেঁচে থাকার পক্ষের উপাদান করে তুলেছে। 'চিন্তাজগতে বাঙালি চিরবিদ্রোহী। বৌদ্ধ, ব্রাক্ষ্য, মুসলিম ধর্ম সে নিজের মতো করে গড়তে গিয়ে যুগে যুগে চিন্তাজগতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাহ্যত সে ভাববাদী হলেও, উপযোগ তত্ত্বেই তার আস্থা ও আগ্রহ অধিক।' আর তাই বাঙালি হয়ে উঠেছে মানবতাবাদের প্রবক্তা। (সূত্র: বাঙালীর সংস্কৃতি, আহমদ শরীফ।)

৫.
বাঙালীর সংস্কৃতি সংক্রান্ত আলোচনায় একটি অনিবার্য বিষয় হিসেবে এসেছে মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গ। যেহেতু মুসলমানরা বহুদনি পর্যন্ত নিজেদের বাঙালি বলে মনেই করতো না, আবার হিন্দুরাও মুসলমানদেরকে কখনো বাঙালি জনগোষ্ঠীর অন্তভর্ূক্ত বলে মনে করেনি, তাই চিন্তাবিদেরা তাঁদের এ সংক্রান্ত লেখায় মূলত এই ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। মুসলিম সংস্কৃতির চারিত্র-বৈশিষ্ট্য, মুসলমানদের বাঙালিত্ব, হিন্দু-মুসলিম বিরোধ ইত্যাদি নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন তাঁরা।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন_ মুসলমানরা এদেশে এসেছিল জয়ী হতেই, কিন্তু নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি এদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়ে নিজেরাই বাঙালি হয়ে গেছে। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের বয়ে আনা অনেক শব্দ ও আচার-আচরণ খুঁজে পাওয়া যায়, যা জনজীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে তাকে আর আলাদা করার কোনো উপায় নেই। এমনকি 'হিন্দু' নামটিও মুসলমানেরই দেয়া বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। শুধু শব্দই নয়, বাঙালির সমাজজীবনের বহু উপকরণ ও অনুষঙ্গও এসেছে বহিরাগত মুসলমানদের কাছ থেকে। যেমন: পোশাক, বাংলা সন, বিচারব্যবস্থা, হাট-বাজারের ধারণা, মাপনপদ্ধতি, বিলাসদ্রব্যের ব্যবহার, বাগান-চর্চা ইত্যাদি। তিনি আরো দেখিয়েছেন_ বহু সংস্কৃত ও আরবি-ফারসিজাত শব্দ হাত ধরাধরি করে, গলাগলি করে রয়েছে; আর এভাবেই বাঙালিজীবনে মুসলমানরা তাদের স্থায়ী প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। (সূত্র: বাঙালি জীবনে মুসলমান প্রভাব, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।)

অন্যদিকে রমেশ চন্দ্র মজুমদার হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির মিলনে একটি সমন্বিত সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে_ এই ধারণার বিরোধিতা করে বলেছেন, গোড়া থেকে আজ পর্যন্ত 'মুসলমান সংস্কৃতি' তার স্বরূপ পরিবর্তন করেনি এবং এই সংস্কৃতির ভিত্তি হচ্ছে ইসলাম ধর্ম। হিন্দু বা ভারতীয় সংস্কৃতির কিছুটা প্রভাব পড়লেও এই সংস্কৃতি বরাবরই তার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে এসেছে এবং অতি সহজেই তা চিহ্নিত করা যায়। (সূত্র: মুসলমান সংস্কৃতি, শ্রী রমেশ চন্দ্র মজুমদার।)
 
আবদুল মওদুদও মনে করেন_ হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতি এবং মুসলমান ধর্ম ও সংস্কৃতি পৃথক সত্ত্বা নিয়ে অবস্থান করেছে। তাদের মধ্যে সংঘাত ও আদান-প্রদান হলেও 'কখনও দুটিতে সঙ্গম ঘটেনি, সমন্বয় হয়নি।' বরং 'সমান্তরাল রেখার মতো' তারা স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেই পাশাপাশি চলেছে।
বদরুদ্দীন উমর 'মুসলিম সংস্কৃতি\'কে ব্যাখ্যা করেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। তিনি মনে করেন
- ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে একটি জাতির বিভিন্ন অংশের সংস্কৃতিতে যেটুকু পার্থক্য ঘটে তারচেয়ে বেশি ঘটে আর্থিক কারণে। অর্থাৎ একই ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণীতে অবস্থানের কারণে দুজন মানুষের সংস্কৃতিতে ব্যাপক পার্থক্য তৈরি হয়। ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, মুসলিম সংস্কৃতি বলতে যা বোঝানো হয় তার পরিচয় নিহিত আছে সামন্ত্রতান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে- ইসলামের মধ্যে নয়। (সূত্র: মুসলিম সংস্কৃতি, বদরুদ্দীন উমর।)

বিপরীত মত পোষণ করেছেন এস ওয়াজেদ আলী তাঁর মুসলিম সংস্কৃতির আদর্শ প্রবন্ধে। হজরত মুহাম্মদ (স.) এর ঔদার্য ও মহানুভবতার নানাবিধ উদাহরণ দিয়ে তিনি আচার-সর্বস্ব ধর্ম-কর্মের পরিবর্তে ইসলামের দার্শনিক দিকগুলোর প্রতি অধিকতর গুরুত্বারোপ করেছেন_ এবং বলেছেন, শান্তি, সাম্য ও মানবকল্যাণের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিরাম কাজ করে যাওয়াটাই মুসলিম সংস্কৃতির মূল উদ্দেশ্য।
'ইতিহাসের আলোকে বাঙলাদেশের সংস্কৃতি : ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ' শিরোনামের লেখাটিতে তাজুল ইসলাম হাশমী হিন্দু-মুসলমান বিরোধের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন
- ব্রিটিশ সরকার তাদের নিজেদের স্বার্থেই এই অঞ্চলে একটি প্রভুভক্ত সামন্তশ্রেণীর জন্ম দেয়। এই শ্রেণী আবার জন্ম দেয় এমন এক সংস্কৃতির যা মূলত অদৃষ্টবাদী, ধর্মকেন্দ্রিক, শ্রেণীপার্থক্য ও বৈষম্যে বিশ্বাসী। আর এই সামন্ত-সংস্কৃতিই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অমোচনীয় সাংস্কৃতিক বৈষম্য ও দূরত্ব তৈরি করে। তাঁর মতে- বৃটিশপূর্বকালে সমগ্র বাংলায় কখনোই একক সংস্কৃতির অধিকারী কোনো সুসংবদ্ধ জনগোষ্ঠী না থাকলেও সংস্কৃতিক ভিন্নতা নির্ধারিত হতো শ্রেণীচরিত্রের দ্বারা- ধর্মবিশ্বাসের দ্বারা নয়। ১৮ ও ১৯ শতকে বাংলায় যেসব সংস্কার আন্দোলন হয়েছে, তিনি সেগুলোকে প্রগতিশীল কর্মকাণ্ড বলে মনেই করেননি! বরং হিন্দু জমিদারদের সমর্থনপুষ্ট, হিন্দু-এলিটদের এইসব আন্দোলনের কোনো ইতিবাচক প্রভাব বাংলার সাধারণ মানুষের ওপর আদৌ পড়েনি বলেই তাঁর মত। অন্যদিকে মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত আন্দোলনগুলোকে তিনি দেখেছেন জমিদার বিরোধী কৃষক-শ্রমিকের শ্রেণীসংগ্রাম হিসেবে। পরস্পরবিরোধী এই দুই ধরনের আন্দোলন হিন্দু-মুসলমানকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় বলে তিনি মনে করেন, ফলে সামপ্রদায়িকতাই হয়ে ওঠে সমাজের মূল চালিকাশক্তি।
গোপাল হালদারের বিশ্লেষণ অন্যরকম। তিনি মনে করেন
- এদেশে ইসলাম আসার পর বিজেতার ধর্মের স্বাভাবিক মর্যাদায় আকৃষ্ট হয়ে, অন্যদিকে হিন্দুধর্মের বৈষম্য ও অধিকারভেদ এবং উৎপীড়নের বিপরীতে ইসলামের সাম্যের বাণীতে মুগ্ধ হয়ে জনগণ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। কিন্তু এই জনগণ ছিলো দরিদ্র ও পীড়িত, ধর্ম পরিবর্তনও তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারেনি। মুসলমানদের মধ্যে তাই অভিজাত শাসকশ্রেণী এবং নিম্নবিত্তের আধিক্য থাকলেও মধ্যবিত্তশ্রেণী গড়ে ওঠেনি। মধ্যযুগের শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় হিন্দু-মুসলমান সমানভাবে অংশগ্রহণ করে বাঙালি সংস্কৃতির নবজন্ম সম্ভবপর করে তোলে। মুসলমানদের মধ্যে সুফীবাদ ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে এই সময়েই, যা ছিল আচারসর্বস্ব ধর্মের বিরুদ্ধে একটি বৈপ্লবিক প্রতিবাদের প্রকাশ। কিন্তু উনিশ শতকে বৃটিশ-বিরোধিতার নামে ওহাবি মতবাদ ও আন্দোলনের ফলে মুসলমানরা গোঁড়ামিতে আক্রান্ত হয়। নিজ ধর্ম ছাড়া সবই বর্জনীয়- এই একরোখা অবস্থানের কারণে তারা সেই যৌথসংস্কৃতি থেকে নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে জাতিয়তাবাদের উন্মেষকালে হিন্দু চিন্তাবিদেরা মুসলমানদেরকে এদেশের মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করেননি। আর এটাকেই হিন্দু-মুসলমান বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। (সূত্র: মুসলমান বাঙালীর কালচার, গোপাল হালদার।)।

অন্যদিকে এ কে নাজমুল করিম তাঁর বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি প্রবন্ধে বাঙালি সংস্কৃতি মানে হিন্দু সংস্কৃতি বা বাঙালি মুসলমান হিন্দুদের মতো মনেপ্রাণে বাঙালি নয়
- এই ধরনের বহুল প্রচারিত ধারণাগুলো খণ্ডন করে দেখিয়েছেন- বাঙালি মুসলমানই বাঙালি সংস্কৃতির মূল ধারক ও বাহক। তিনি বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতিকে উত্তর ভারতীয় আর্য-সংস্কৃতির একটি 'উপশাখা' হিসেবে বর্ণনা করে, মুসলমানদের সংস্কৃতিকে এই মাটির সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন- এই সংস্কৃতির ওপর ইসলামের প্রভাব আছে বটে, তবে সেই ইসলাম বাঙলার পলিমাটিতে নতুন রূপ পেয়েছে, পরিণত হয়েছে প্রেম ধর্মে। বাঙালি মুসলমানের গড়ে তোলা হাজার বছরের লোকসাহিত্যে এর প্রমাণ মেলে। এই সংস্কৃতিকে 'জন সংস্কৃতি নাম দিয়ে তিনি বলেছেন- 'এর দৃষ্টি ও লীলাক্ষেত্র মূলত বাংলাদেশ।'

৬.
বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনার জন্য আমরা এবার এর দু-একটি অনুষঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারি। যেমন, প্রশ্ন করা যায় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত-মাছ কেন? (সবাই ভাত-মাছ পাচ্ছে কী না সেটা ভিন্ন প্রশ্ন, পাক আর না পাক তাদের প্রধান এবং প্রিয় খাদ্য যে ভাত-মাছ সেটা তো আর অস্বীকার করা যাবে না!) কেন ভাত-মাংস নয়? অথবা রুটি-মাংস নয়? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন নয়। কৃষিপ্রধান একটি দেশে
- ধান যেখানে প্রধান শস্য- সেখানে ভাত যে প্রধান খাদ্য হবে তা আর অস্বাভাবিক কি? আর যে দেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আছে নদী-নালা-খাল-বিল-হাওড়-পুকুর-দীঘি এবং যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর মাছের জন্ম হয়- সেখানে মাছও যে প্রধান খাদ্যতালিকায় স্থান করে নেবে সে-ও তো বিস্ময়কর নয়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, একটি জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সেই দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্টাবলী অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এ দেশের ভূ-প্রকৃতি যদি পানি প্রধান না হতো, তাহলে মাছ নিশ্চয়ই প্রধান খাবার হতো না! কোনো মরুপ্রধান অঞ্চলে মাছ প্রধান খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয় বলে শোনা যায় না। এরকম প্রশ্ন তোলা যায় পোশাক-আশাক নিয়েও। বাংলাদেশের মানুষ রুশদের মতো ফারকোট পরে না কেন, কিংবা আরবদের মতো আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢেকে চলাফেরা করে না কেন? কারণ- বাংলাদেশের জলবায়ু বা আবহাওয়া ওই ধরনের পোশাককে অনুমোদন করে না, কিংবা এই আবহাওয়ায় ওই ধরনের পোশাক পরার দরকার নেই। রুশরা প্রবল শীত থেকে বাঁচার জন্যই ওরকম পোশাক পরে, অন্যদিকে মরুভূমির লু-হাওয়া এবং প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া থেকে বাঁচার জন্য আরবদের তাপ প্রতিরোধক সাদা পোশাক পরতে হয়। শুধু জলবায়ু বা আবহাওয়াই নয়, প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য-বৈশিষ্ট্যও মানুষের স্বভাব-চরিত্র এবং তার সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। মরুভূমির রুক্ষতাও সুন্দর, যেমন সুন্দর আগ্নেয়গীরির অগ্নু্যৎপাত কিন্তু দুটোই আগ্রাসী সুন্দর বা অ্যাগ্রেসিভ বিউটি। যেসব দেশে এগুলো আছে সেখানকার মানুষ যে একটু রুক্ষ হবে, কিংবা তারা যে আগ্রেসিভ বিউটি পছন্দ করবে তা আর অস্বাভাবিক কি? অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোমল ও মায়াময়, এ দেশের মাটি নরম ও উর্বর। এই রুক্ষ ঢাকা শহরেও প্রায় অবহেলায় যে পরিমাণ গাছ জন্মায় তা পৃথিবীর আর ক-টি শহরে জন্মায় সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। এ দেশের যে দিকেই তাকাবেন, দেখবেন সবুজ, দেখবেন শান্ত-রূপময়ী নদী। এমন কোমল, মায়াময় প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো যে একটু আবেগপ্রবণ হবে সে তো বলাই বাহুল্য, পছন্দের বেলায় অ্যাগ্রেসিভ বিউটির চেয়ে তারা যে সফট বিউটিকেই বেশি গুরুত্ব দেবে সেটাই তো স্বাভাবিক। নদীমাতৃক এই দেশের নদীনালা-হাওর-বিল যে শুধু মানুষের খাদ্যাভ্যাস তৈরিতেই ভূমিকা রেখেছে তা নয়, মানুষের স্বভাব-চরিত্র নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছে। নদীতীরবর্তী বা পানিপ্রধান অঞ্চলের মানুষ সাধারণত অবৈষয়িক, উদাসীন এবং ভাববাদী ধরনের হয়। এদেশের বাউল সমপ্রদায়ের উৎপত্তি ও বিকাশের দিকে নজর দিলেও বিষয়টির সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে। আমাদের বাউলরা প্রায় সকলেই পানিপ্রধান অঞ্চলের মানুষ। সম্ভবত নদীর মধ্যে ঘর-ছাড়ার একটা ইঙ্গিত আছে, আছে ভাববাদিতা।

সংস্কৃতি সম্বন্ধে এভাবে অনেক কথাই বলা যায়, বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আমাদের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলীর প্রভাব নিয়েই রচিত হতে পারে আলাদা একটি প্রবন্ধ, যেমন হতে পারে খাদ্যাভাস, উৎপাদন পদ্ধতি, উৎসব-পার্বন, পোশাক-আশাক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি নিয়েও।

৭.
বিনয়কুমার সরকারের যে লেখাটির ('বেঙ্গলি কালচার অ্যাজ এ সিস্টেম অব মিউচু্যয়াল আককুলটুরেশনস') কথা একটু আগে বলেছি সেটিতে তিনি এক গভীর ও সুদুরপ্রসারী প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। ১৯৪২ সালে এই লেখাটির বাংলা অনুবাদ করেন ক্ষিতি মুখোপাধ্যায়। শুধু অনুবাদই নয়, রচনাটির অনুপঙ্খু বিশ্লেষণও হাজির করেন তিনি। এই লেখা ও এর বিশ্লেষণের মূল কথটি হলো সংস্কৃতির বিনিময়। আককুলটুরেশনস কথাটির ব্যাখ্যা এরকম
-

কোনো সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতির ভিতর প্রবেশ করিতে থাকিলে দ্বিতীয় সংস্কৃতিটার অল্পবিস্তর অথবা বেশকিছু রদবদল ঘটিতে থাকে। এই দুই সংস্কৃতি হইতে সংস্কৃতির নতুন গড়ন বা ছাঁচ গড়িয়া ওঠে।...দুই সংস্কৃতির মেলামেশার প্রণালীকেই আককুলটুরেশনস বলা যায়।...আর মিউচু্যয়াল আককুলটুরেশনস মানে পারস্পরিক সংস্কৃতি-বিনিময়, বা সংস্কৃতির লেনদেন। [সূত্রঃ বাঙলায় দেশী-বিদেশী (বঙ্গ-সংস্কৃতির লেন-দেন), বিনয় সরকার, ১৯৪২]

তাঁরা দেখালেন, আদি বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির বিনিময়ের ফলে নতুন সংস্কৃতির ধরন কীভাবে পাল্টে গেলো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটার প্রতি তাঁরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, সেটি হলো
- বাংলায় বিভিন্ন ধর্মের প্রবেশ এবং এর প্রভাবে বাঙালি সংস্কৃতির রূপান্তর, একইভাবে বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাবে বাইরে থেকে আসা ধর্মগুলোর রূপান্তর। তাঁদের মতে- শুধু ইসলামই নয়, হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মও বাংলা অঞ্চলের বিদেশী ধর্ম। এইসব ধর্মের আগমনের আগেও এ অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব কোনো ধর্ম ছিলো- তারা এর নাম দিয়েছেন বাঙালি ধর্ম। তাঁরা এ-ও বললেন- ইসলাম আসার আগে এ অঞ্চলের সমস্ত মানুষ হিন্দু বা বৌদ্ধ ছিলো- ঐতিহাসিক এই ধারণাটিই ভুল। বরং এক বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী অ-হিন্দু বা অ-বৌদ্ধ রয়ে গিয়েছিলো, বা কেউ কেউ সেসব ধর্ম গ্রহণ করলেও তা এমনভাবে তাঁদের আদি সংস্কৃতির ছাঁচে ঢেলে পরিবর্তিত করে নিয়েছিলো যে তাদেরকে বড়জোর নিম-হিন্দু বা নিম-বৌদ্ধ বলা যায়। ইসলাম আগমনের ফলে এই অঞ্চলের অ-হিন্দু বা অ-বৌদ্ধ এক বিরাট সংখ্যক লোক, সঙ্গে কিছু হিন্দু এবং কিছু বৌদ্ধও নতুন ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিসর্জন দেয়া এ ক্ষেত্রেও ঘটেনি। ফলে প্রত্যেক ধর্মই বাঙালি ধর্মের দাপটে নিজেদের আদি রূপ খুইয়ে নতুন এক রূপ লাভ করে। এ বিষয়ে তাঁদের মত-

বাঙালী হিন্দুরা পরধর্মে দীক্ষাপ্রাপ্ত কনভার্ট মাত্র। ইংরেজ খৃষ্টিয়ানরা, মিশরের মুসলমানরা, ইরানের মুসলমানরা যেমন পরধর্মে দীক্ষিত, বাঙালীরাও অবিকল তাই।...হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দুধর্ম সেকালের বাঙলার 'অনার্য' নর-নারীর পক্ষে বিদেশী জিনিস। কিন্তু বাঙালী জাত এই বিদেশী ধর্ম ও সংস্কৃতিকে নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতির বশে আনিয়াছিল। তথাকথিত আর্যধর্ম ও সংস্কৃতি অনার্য সংস্কৃতির প্রভাবে পড়িয়া অনার্যীকৃত হইয়াছে। ইহাকে বলিব অবাঙালী সংস্কৃতির বাঙালীকরণ। হিন্দুধর্ম বা বৌদ্ধধর্ম অনায়াসে বাঙালীদের জয় করিয়া লইতে পারে নাই। বাঙালী ধর্মের নিকটও ইহাদের মাথা নোয়াইতে হইয়াছে।...আর্যধর্ম যেমন বাঙলাদেশকে জয় করিয়াছে, বাঙালী ধর্ম-ও তেমনি ইহাকে নাজেহাল করিয়াছে। জয়টা এক তরফা হয় নাই
- ধর্মান্তর বা মতান্তর গ্রহণটা হইয়াছে পারস্পরিক। বাঙলাদেশে খুব বেশী লোককে পরধর্ম (হিন্দুত্ব) স্বীকার করানো সম্ভব হয় নাই। অসংখ্য নরনারী অহিন্দু, অর্থাৎ বাঙালী বা অনার্য রহিয়া গিয়াছিল।...বাঙালীর সৃষ্টিশক্তি ইসলামকেও সহজে পথ ছাড়িয়া দেয় নাই। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মতো ইসলামকেও বাঙালীদের নিকট পরাজয় স্বীকার করিতে হইয়াছে। এই সকল ক্ষেত্রে ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতিকেও বুঝিয়া রাখিতে হইবে।...বিদেশী সংস্কৃতিগুলোর উপর স্বদেশী সংস্কৃতির প্রভাব গভীরভাবে লক্ষ্য করিবার বিষয়। [সূত্রঃ বাঙলায় দেশী-বিদেশী (বঙ্গ-সংস্কৃতির লেন-দেন), বিনয় সরকার, ১৯৪২]

এর ফল কী রকম সুদূর প্রসারী হয়েছিলো তার প্রমাণ হিসেবে বলছেন
-

বাঙালী হিন্দু ও বাঙালী মুসলমানদের আচার-ব্যবহার ও চালচলনে মিল আছে। কারণ কি? সাধারণের ধারণা
- হিন্দুদের কেহ কেহ মুসলমান হইয়া যাওয়ায় এইরূপ ঘটিয়াছে। কথাটার ভিতর কিছু সত্য আছে। কিন্তু আসল কারণ- হিন্দু ধর্মের মতো মুসলমান ধর্মেও অনার্য বাঙালী আদিম লোকদের আচার-ব্যবহার আর চালচলন ঢুকিয়া গিয়াছে। হিন্দু ও মুসলমান দুই ধর্মেই 'বাঙ্লামি'র প্রলেপ পড়িয়াছে। হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের উপর খাঁটি স্বদেশী সংস্কৃতি দিগবিজয় চালাইতেছে। এই কথাটা মনে রাখিলে বাঙালী হিন্দু এবং মুসলমানদের রীতিনীতির ভিতর ঐক্য ও সাদৃশ্যগুলো সহজে বুঝিতে পারিব। দুই সংস্কৃতিই 'বাঙালীকরণের' প্রভাবে অনেকটা একরূপ দেখাইয়া থাকে। [সূত্রঃ বাঙলায় দেশী-বিদেশী (বঙ্গ-সংস্কৃতির লেন-দেন), বিনয় সরকার, ১৯৪২]

অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মের আগমনে আদি বাঙালি সংস্কৃতি তার রূপ পরিবর্তন করেছে বটে, কিন্তু এই সংস্কৃতি এতটাই শক্তিশালী এবং আধিপত্যবিস্তারী ছিলো যে প্রবল পরাক্রমশালী হিন্দুধর্ম বা ইসলাম ধর্মও তাদের নিজেদের 'আদি' রূপ ধরে রাখতে পারেনি, বরং আদি বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাবে দুটো বিপরীত মেরুর ধর্ম কখনো কখনো একইরূপ প্রদর্শন করতে বাধ্য হয়েছে, এখনও হচ্ছে। লেনদেন হয়েছে বটে, তবে বাঙালি সংস্কৃতি পরাজয় স্বীকার করেনি।

এ বিষয়ে একটি বিস্তত্দারিত আলোচনা আছে আবু জাফর শামসুদ্দীনের লোকায়ত সমাজ ও বাঙালী সংস্কৃতি গ্রন্থভূক্ত বাঙালীর সমন্বিত লোক সংস্কৃতি প্রবন্ধে। তিনি অবশ্য বিনয় সরকারের মতো আর্যপূর্ব বাঙলার ইতিহাস খুঁজে দেখেননি, চর্যাপদের সময়কাল থেকে (অষ্টম-নবম খৃষ্টাব্দ) বর্তমানকাল পর্যন্ত ইতিহাসকে নির্ভর করে বাংলার লোকজীবনে প্রবহমান সংস্কৃতির সমন্বিত রূপটির ধরন-ধারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে
- বাংলার জনগণ যেহেতু কৃষিজীবী অতএব গ্রামকে কেন্দ্র করে তাদের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। প্রাচীনকালে একেকটি গ্রামে নানা পেশার লোকজন একসঙ্গে বাস করতো বলে গ্রামগুলো ছিল প্রায় স্বনির্ভর। রাজরাজড়াদের উত্থান-পতন বা রাজ্যের সীমা পরিবর্তন তাদের জীবনে কোনো প্রভাবই ফেলেনি। তাদের মধ্যে একটা সাধারণ সমঝোতা ছিল, যেমন: ধর্মবিশ্বাসকে তারা তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো কিংবা শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হলে সম্মিলিতভাবেই রুখে দাঁড়াতো। আর্যরা এদেশে আসার আগেই জনগণের যে স্বাধীন সাংস্কৃতিক জীবন ছিলো তার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। আর্যরা বঙ্গভূমি বা এর অধিবাসীদের সুনজরে দেখতো না, কারণ সম্ভবত এদের জীবনযাপনের অনুষঙ্গসমূহ আর্যদের থেকে পৃথক ছিল। তাই বলে একথা বলা যাবে না যে, আর্যরা শ্রেষ্ঠ ছিল, কারণ- ভিন্নতা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে না। লিখিত বাংলাভাষার জন্মকালকে লোকসংস্কৃতির শৈশবকাল বলা যায়। আর এর প্রথম লিখিত নিদর্শন চর্যাগীতি 'আধ্যাতি্নক প্রেরণাজাত' হলেও তা ইহজাগতিক প্রতীকে রচিত। এতে মনে হয় 'লোকায়ত দার্শনিক চিন্তাপ্রসূত সামাজিক শ্রেণীচেতনা সেকালেও এ অঞ্চলের জনজীবনকে প্রভাবিতি করেছে।'

এরপর এ অঞ্চলে ইসলামের প্রবেশ ঘটে। তবে এ ইসলাম হযরত মুহাম্মদ (স.) প্রবর্তিত অবিকৃত ও নির্ভেজাল ইসলাম নয়। প্রবর্তিত হওয়ার প্রায় ৬০০ বছর পর এদেশে আসার সময় ইসলাম ইরান, মধ্যএশিয়া, আফগানিস্তানের বহু লোকাচার সঙ্গে নিয়ে আসে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়
- সুফীগিরী, দরবেশী ইত্যাদি আদি ইসলামে নেই। সুফী-দরবেশদের অধিকাংশই ছিলেন মানবতাবাদী ও বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়কারী। আর এরা এদেশে এসে ভারতীয় দর্শনের চারটি মূলধারার সঙ্গে পরিচিত হন- ১. স্রষ্টা ও সৃষ্টি পৃথক সত্ত্বা। ২. স্রষ্টা ও সৃষ্টি অভিন্ন সত্ত্বা। ৩. নিরীশ্বরবাদিতা বা ঈশ্বর সম্বন্ধে নীরবতা। ৪.স্থুল জড়বাদিতা। তাঁরা দ্বিতীয় ধারাটিকে পুষ্ট করে তোলেন। তারা আসার আগে এদেশে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছিল এবং ব্রাক্ষ্রন্যবাদ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বৌদ্ধমত দূর্বল হয়ে পড়লেও জনগণের মধ্যে এর প্রভাব বিদ্যমান ছিল। মুসলিম সুফি সাধকরা এইসব ধারা সম্বন্ধে জানতেন এবং ব্রাক্ষ্রন্যবাদের বর্ণভেদ বুঝতেন না বা মানতেন না; ফলে মানবতাবাদী, প্রেমভক্তিতে পূর্ণ পরিবর্তিত ইসলাম ধর্ম জনগণের মধ্যে আবেদন সৃষ্টি করে। তবে জনগণ ধর্মান্তরিত হলেও হাজার বছরের ঐতিহ্য ও অনুষঙ্গসমূহের সঙ্গে নতুন ধর্মের সমন্বয় করে নিয়েছে। সুফীদের আগমনের ফলে প্রেমভক্তিবাদ হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। এটা সব ধর্মের এক ধরনের সমন্বয়ও বটে- যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে অভিন্ন মানবিক সমতলে নিয়ে আসে। সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ব এর মূলমন্ত্র।

মুসলিম শাসনামলেই 'বাঙলা' ও 'বাঙালি' শব্দদ্বয়ের উদ্ভব ঘটে। মুসলিম শাসকরা এ অঞ্চলকে একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সর্বনগ্রাহ্য সমন্বিত সামাজিক জীবনবোধ নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্টপোষকতা করেছিলেন। এই সময়কালকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভবকাল বলা যেতে পারে। এই সময়ে মানবতাবাদী লোকসংস্কৃতির চর্চা, উদার-অসামপ্রদায়িক প্রেমভক্তিবাদী ধর্মচর্চার ফলে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী একটি অবিভাজ্য জাতি হিসেবে গড়ে ওঠে এবং তার লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্য পূর্ণতা পেতে থাকে। এই সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্য
- আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব, অনড় বিধিবিধান সম্বলিত ধর্মের প্রতি উদাসীনতা। এই ঔদাস্যকে এক ধরনের বিদ্রোহও বলা যায়।
বাংলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে সুফী-দরবেশ, সাধু-সন্ন্যাসী, বাউল- বৈরাগীরা যে সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিলেন তা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ নির্বিশেষে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে একইরকম জীবনযাপেনে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। আর এজন্যই
-

হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে এখনও বাংলাভাষাভাষী অঞ্চলের গান বাজনা তাল সুর লয় এবং নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্র অভিন্ন। নির্দিষ্ট কয়েকটি ধর্মানুষ্ঠান এবং মৃতের সৎকার প্রভৃতি ব্যতিরেকে বাকি সকল প্রকার আনন্দোৎসব মেলা প্রভৃতিতে সকলে একত্রিত হয়। লাঠি খেলা, তরবারি ও রামদার খেলা, হাডুডু ও দাইড়া খেলা প্রভৃতি সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের ক্রীড়া। বাসগৃহের নির্মাণ কৌশল, ভিতরের আসবাব, নকশি কাঁথা, শয্যা, তৈজসপত্র, কৃষি যন্ত্রপাতি, অস্ত্র-শস্ত্র সবকিছু অভিন্ন। একই মাঠের জমিতে সকলে পাশাপাশি চাষ করে এবং একই ফসল ফলায়। উৎপাদন পদ্ধতিও অভিন্ন। ধর্মীয় বিধানে বিশেষভাবে নিষিদ্ধ কয়েকটি দ্রব্য ব্যতিরেকে ধর্ম-সমপ্রদায় নির্বিশেষে সকল বাঙালীর খাদ্য তালিকা ও পাক প্রণালী অভিন্ন।...সকল বাঙালী পল্লীবাসীর পোশাক পরিচ্ছদ অলংকারপত্র প্রসাধন দ্রব্য প্রভৃতি আগেও অভিন্ন ছিল, কিঞ্চিত উন্নতির পর এখনও অভিন্ন আছে। [সূত্রঃ
লোকায়ত সমাজ ও বাঙালী সংস্কৃতি আবু জাফর শামসুদ্দীন]

আর্যরা এ দেশে আসার আগেই যে এখানকার জনগণের স্বাধীন সাংস্কৃতিক জীবন ছিলো তার অনেক প্রমাণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন- বাংলার গ্রামগুলো ছিলো স্বয়ংসম্পূর্ণ, বিভিন্ন পেশার লোকজন এক গ্রামে একসঙ্গে বাস করতো, রাজ-রাজড়াদের উত্থান-পতন তাঁদের এই স্বাধীন জীবনে খুব কমই প্রভাব ফেলতো। কিন্তু আর্যদের আগমন, পরবর্তীকালে বৌদ্ধ-হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের আগমন তাদের সাংস্কৃতিক জীবনে প্রভাব ফেলে। তবে এই প্রভাব যতো না রাজনৈতিক কারণে তারচেয়ে বেশি দার্শনিক কারণে পড়েছে। যখনই যে ধর্ম এখানে এসেছে, তখনই এখানকার জনগণ তাদের নিজেদের সুবিধামতো একে 'সংশোধন' করে গ্রহণ করেছে। তিনি মনে করেন 'ফান্ডামেন্টাল' বলে জগতে কোনো জিনিসই নেই, এমনকি ইসলাম নিজেও তার জন্ম থেকেই 'ফান্ডামেন্টাল' নয়, বরং এতে তার পূর্ববর্তীকালের অনেক ধর্ম ও সামাজিক আচার ব্যবহারের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। তিনি অনেকগুলো উদাহরণ দিয়ে সেটি প্রমাণও করেছেন। আর ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন সম্বন্ধে তাঁর মত-

ভারতে যে ইসলাম রাজকীয় ধর্মরূপে পাকাপাকিভাবে প্রবেশ করে সেটা হযরত মোহাম্মদ (দঃ) প্রবর্তিত আরবমরুর 'নির্ভেজাল' ইসলাম ছিল না। এ ইসলাম ইরান, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তত্দান প্রভৃতি দেশ পার হওয়ার কালে সে সব দেশের বহু লোকাচার সহ, প্রবর্তিত হওয়ার ৬০০ বছর পর, তুর্ক আফগান বিজয়ীদের সঙ্গে আসে। [সূত্রঃ লোকায়ত সমাজ ও বাঙালী সংস্কৃতি আবু জাফর শামসুদ্দীন]

বাংলাদেশে মুসলমান জনগোষ্ঠীই সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু যে ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান তারা মেনে চলেন, তার স্বরূপটি বুঝে নিতে হলে আমাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে ইসলামের ইতিহাস নিয়ে কথা বলার। যে ইতিহাসের কথা বলছি সেটা রাজা বাদশাহদের ইতিহাস নয়- জনগণের ইতিহাস। মুশকিল হলো, জনগণের ইতিহাস সবসময় অলিখিতই থেকে যায়- লিখিত ইতিহাসে জনগণ থাকে বরাবরই উপেক্ষিত, ইতিহাস মানেই যেন রাজ-রাজড়াদের ব্যাপার, জনগণের যেন কোনো ভূমিকাই ছিলো না ইতিহাসের কোনো পর্বে, কোনো ঘটনায়। ফলে এই ইতিহাস থেকে জনগণের মন বুঝতে হলে আমাদেরকে অকেখানিই কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়। বিষয়টি অল্প কথায় সারা অসম্ভব, এর জন্য ব্যাপক আলোচনার প্রয়োজন। কিন্তু এখানে সে সুযোগ নেই বলে খুবই সংক্ষেপে দু-একটি তথ্য উল্লেখ করবো। প্রথমেই যা বলা দরকার তা হলো- বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ইসলাম গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে মূলত সুফি-সাধক ধর্মপ্রচারকদের কারণে, শাসক শ্রেণীর জন্য নয়। শাসকদের ধর্ম দেখে যারা ধর্ম পরিবর্তন করে তারা আর যাই হোক সাধারণ জনগণ নয়, উচ্চশ্রেণীর সুবিধাবাদী লোকজন। শাসকদের কাছ থেকে সুদৃষ্টি পাওয়ার আশায় কেউ কেউ ধর্ম পরিবর্তন করলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এতে কিছুই যায় আসে না। শাসকদের ধর্ম কি, তা নিয়ে জনগণের কোনো কৌতূহল থাকার কথা নয়। এ অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্তত তিনটি কারণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় : ১. ব্রাক্ষ্রণ্যবাদীদের বর্ণভিত্তিক বিভেদনীতি, অত্যাচার-নিপীড়ন, চাপে ও তাপে সাধারণ জনগণ অতিষ্ঠ ছিলো, ২. ঠিক সেই রকম একটি ক্রান্তিকালে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ও শান্তির বাণী নিয়ে ইসলাম ধর্ম এদেশে প্রবেশ করেছিলো, এবং ৩. এ বাণী যারা বহন করে নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা ছিলেন সুফি সাধক- অনাড়ম্বর জীবনযাপন, মানুষের মন বুঝে কাজ করা ও কথা বলার ক্ষমতা, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান দার্শনিক হওয়া সত্ত্বেও নিরহংকারী সন্তের মতো সাধারণ মানুষদের দুঃখ-দুর্দশা-সংকট-সমস্যার সঙ্গী হতে পারার সহজাত প্রবণতা যাঁদেরকে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলো। এ অঞ্চলের মানুষ যে ইসলাম আগমনেরও বহু আগে থেকেই শান্তিপ্রিয় ছিলো সেটা বৌদ্ধধর্মের জনপ্রিয়তা দেখেও বোঝা যায়- ইসলামের আগে বৌদ্ধধর্মেও শান্তি ও সমপ্রীতির কথা বলা হয়েছিলো। বৌদ্ধদেরকে হটিয়ে দিয়ে ব্রাক্ষ্রণ্যবাদীদের পুনরুত্থান এবং তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য এ অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় মানুষ মন থেকে মেনে নিয়েছিলো এবং বৌদ্ধধর্মের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছিলো- এমনটি মনে করার কোনো কারণই নেই। কিন্তু রাজশক্তি-সামাজিক শক্তির বিরুদ্ধে তাদের কিছু করারও ছিলো না। শান্তির বাণী নিয়ে আগত ইসলামকে তারা দেখেছিলো নতুন আশ্রয় হিসেবে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- সুফিরা যে ইসলাম নিয়ে এসেছিলেন তা আরবে উদ্ভাবিত মূল ইসলাম নয়, বরং দার্শনিকভাবে অনেকখানি পরিবর্তিত ও আচারসর্বস্বতা-বর্জিত ইসলাম। সুফিবাদের জন্ম মূলত পারস্যে, মূল ইসলাম ওখানে গিয়ে অনেকখানি পরিবর্তিত হয়ে যায়; আবার এই সুফিরা যখন ভারতবর্ষে এলেন সেই সুফিবাদেরও খানিকটা পরিবর্তন সাধন করতে হলো। কোনো দর্শনই যে দেশকালের পরিপ্রেক্ষিতে তার অবিকৃত রূপ ধরে রাখতে পারে না- এই প্রগতিশীল ধারণাটি সুফিদের মধ্যে ছিলো; তাই তাঁরা ভারতবর্ষে এসে এই জনগোষ্ঠীর মন বুঝতে চেষ্টা করলেন। এবং আবিষ্কার করলেন- এই জনগোষ্ঠীর কাছে ইসলামকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে প্রেমের কথা বলতে হবে, ভক্তির কথা বলতে হবে- কারণ এ অঞ্চলে দুটোরই জয়জয়াকার। অতএব সুফিবাদ নিজেকে খানিকটা বদলে নিলো- মানুষের কাছে তারা বলতে লাগলেন প্রেমের কথা, বোঝাতে লাগলেন স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক দ্বন্দ্বের নয়, প্রেমের। একমাত্র প্রেমের মাধ্যমেই পাওয়া যাবে স্রষ্টাকে- অন্য কোনোভাবে নয়। প্রেম ও ভক্তির এই কথাগুলো এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আগে থেকেই পরিচিত ছিলো- তার সঙ্গে যুক্ত হলো মানুষে-মানুষে সমতার কথা, ভ্রাতৃত্বের কথা, সমান অধিকারের কথা, শান্তি ও সমপ্রীতির কথা। তরবারী দিয়ে নয়, কঠোর ধর্মীয় আচারসর্বস্বতা দিয়ে নয়, ভয়-ভীতি-হুংকার দিয়েও নয়- স্রেফ শান্তি-সমপ্রীতি-মানবতা-সাম্য-প্রেম-ভক্তি-ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদির কথা বলে সুফিরা জয় করে ফেললেন একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে। এমনকি রাজশক্তি-সামাজিকশক্তি বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কোনোরকম দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হয়েই তাঁরা সেটা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁদের দার্শনিক প্রজ্ঞার কারণে। এ অঞ্চলে ইসলামের জয়ের ইতিহাস বলতে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের কাহিনী বোঝায় না, বোঝায় এই দার্শনিক বিজয়ের ইতিহাস। আর এই ইতিহাস না জানলে বাঙালি মুসলমানের মনোজগৎ বোঝা সম্ভব নয়। এই রচনায় বিষয়টি নিয়ে বিস্ততৃত আলোচনার অবকাশ নেই, মোদ্দা কথা হলো- এ দেশের মানুষের মনোজগতে আছে শান্তি-সমপ্রীতি-ভ্রাতৃত্ব-মানবতা ও সাম্যের প্রতি প্রেম। কোনো মৌলবাদী কঠোর কঠিন তত্ত্ব দিয়ে তাদেরকে জয় করা যায়নি- ভবিষ্যতেও যাবে না।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের ভাষায়

ফান্ডামেন্টাল বলে কোনো বস্তু মানবজাতির সামাজিক জীবনে কোন কালে ছিল না, সুতরাং তার পুনঃপ্রবর্তন প্রচেষ্টাও সাফল্যমন্ডিত হওয়ার নয়। [সূত্র ঃলোকায়ত সমাজ ও বাঙালী সংস্কৃতি আবু জাফর শামসুদ্দীন]

কিন্তু চেষ্টাটি বহুকাল থেকেই চলছে, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত একদল ধর্মান্ধ লোক ও কয়েকটি সামপ্রদায়িক রাজনৈতিক দল এ দেশকে একটি ধর্ম-রাষ্ট্রে পরিণত করার দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোও তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয়-সমর্থন দিয়ে চলেছে। এমনকি প্রগতিশীলতার মুখোশ পড়ে কিছু ছদ্মবেশী বুদ্ধিজীবীও তাদের এই প্রচেষ্টার সঙ্গে সামিল হয়েছেন। তাদের এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেই ধরে নেয়া যায়। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির যে হাজার বছরের ইতিহাস তাতে নিশ্চিত করেই বলা যায়, একে পরাজিত করা যাবে না। বাঙালি তাদের সংস্কৃতিকে চিরকাল অপরাজেয় রূপে দেখতে চেয়েছে, আর চেয়েছে বলেই পরাজিত হতে দেয়নি। এই এতকাল পর এসে তাদেরকে পরাজিত করা যাবে, এটা কোনো মূর্খ ছাড়া আর কে-ই বা ভাববে!

জানুয়ারি ২০০