প্রাককথন
বাংলা ছোটগল্পের সৌভাগ্য যে, তার জন্ম হয়েছিলো এবং শৈশব-কৈশোরে সে
পরিচর্যিত হয়েছিলো রবীন্দ্রনাথের মতো এক মহান শিল্পীর হাতে। এ কথা
নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না যে, বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের মতো
আর কোনো শিল্প মাধ্যমই এত দ্রুত এমন মানসম্পন্ন ও মর্যাদার আসন
তৈরী করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথের মেধাদীপ্ত মমতা ও ভালোবাসায় বেড়ে
উঠছিলো বলেই হয়ত বাংলা ছোটগল্প অতি অল্প সময়ে পাঠকদের তীব্র মনোযোগ
আকর্ষণ করতে পেরেছিলো। রবীন্দ্রনাথের গল্পচর্চার সময়কাল খুব বেশি
নয় _ বছর বিশেকের মতো _ অথচ এই সময়ের মধ্যেই বহুবিচিত্র বিষয়,
অবিস্মরণীয় সব চরিত্র, অভূতপূর্ব নির্মাণ কৌশলে ঐশ্বর্যবান হয়ে
উঠেছিলো বাংলা গল্পের ভুবন।
তারপর প্রায় একশ' বছরের পথ চলা।
রবীন্দ্রনাথের পর প্রভাতকুমার-শরৎচন্দ্র-প্রমথ চৌধুরীর হাত
পেরিয়ে, কল্লোল গোষ্ঠীর দ্রোহী তরুণদের প্রতিভাদীপ্ত সৃষ্টিশীলতা
আর তিরিশের লেখকদের অসাধারণ স্নেহস্পর্শ ও যত্নে তার বড় হয়ে ওঠা।
বিশ শতকের শুরু থেকে চলি্লশ দশক _ বাংলা ছোটগল্পের এই স্বর্ণসময়ে
কতোভাবেই না তার বাঁক পরিবর্তন ঘটেছে!
তারপর দেশবিভাগ।
বাংলা সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এখন থেকে প্রবাহিত
হতে থাকলো দুটো সমান্তরাল ধারায়। দেশভাগের অর্ধশতাব্দী পর, বাংলা
ছোটগল্পের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের স্থান কোথায়? চলি্লশ দশকের সেই
বিহ্বল সময়ে হাতে গোনা যে কজন নবীন লেখক ভাগ হয়ে যাওয়া দুটো ধারার
একটির দায়িত্ব সযত্নে তুলে নিয়েছিলেন নিজেদের কাঁধে, তাদেরই তো
উত্তরাধিকার আজকের বাংলাদেশের সাহিত্য। কতটকু এগিয়েছি আমরা ?
এই রচনায় বাংলাদেশের ছোটগল্পের ইতিহাস এবং উত্তরাধিকারের
পরিপ্রেক্ষিতটি খুবই সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। বলার
অপেক্ষা রাখে না যে, অর্ধ-শতাব্দীর গল্প _ এর সাফল্য-ব্যর্থতা,
অর্জন বা অক্ষমতা _ নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত দুরূহ, জটিল ও দীর্ঘ
একটি বিষয়, যা কেবল অত্যন্ত মেধাবী, নিরাসক্ত এবং যোগ্য একজন
আলোচকের পক্ষেই করা সম্ভব। অতোটা যোগ্যতা আমার নেই _ এই অযোগ্যতার
দায়ভার নতমস্তকেই গ্রহণ করছি।
রবীন্দ্রনাথ থেকে কমল কুমার: বাংলা
গল্পের স্বর্ণসময়
সাহিত্যের পাঠকদের কাছে রবীন্দ্রনাথের গল্প সম্বন্ধে বলাটা বাতুলতা
মাত্র। রবীন্দ্রনাথের গান সম্বন্ধে একজন ভারতীয় লেখক, অমিত
চৌধুরী, একবার মন্তব্য করেছিলেন জ্জ 'রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এরকম
বলা হয় যে প্রতিটি ভাব, প্রতিটি অনুভূতি, যা একজন বাঙালী সারা
জীবনে অনুভব করেছে তা সবই তিনি তাঁর গানে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু
আমি এ ছাড়াও আরও কিছু অনুভব করি _ আলোর প্রতিটি ডুবে যাওয়া এবং
ভেসে ওঠা, পথিকের প্রত্যেকটি পথ, ভোরের ফুল, যা সেই পথে পড়েছিলো আর
অজানিতে পথিকের পায়ের আঘাতে এলোমেলো হয়ে গেছে, প্রত্যেক হাওয়া,
প্রত্যেক মৃদু বাতাস যা দীপশিখাকে বিচলিত করে _ এ সমস্তই
রবীন্দ্রনাথের গানে গোপন জায়গা নিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।'
রবীন্দ্রনাথের গল্প সম্বন্ধেও বোধ হয় একই কথা বলা যেতে পারে। এত
বিষয় বৈচিত্র্য, এত ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র; অনুভূতির এত ব্যাপক
বিভিন্নতার ব্যবহার তাঁর গল্পে ঘটেছে যে পাঠককে তা মুগ্ধ বিস্ময়ে
বিহ্বল করে তোলে।
রবীন্দ্র সমসাময়িককালে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় খুবই পাঠকপ্রিয়তা
পেয়েছিলেন। স্বল্প পরিসরে গল্প জমিয়ে ফেলার দক্ষতা, রবীন্দ্রনাথের
মতোই বিষয়-বৈচিত্র্য, হাস্য-কৌতুকের সঙ্গে মানুষের প্রতি এক গভীর
মমতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি পাঠক হৃদয় জয় করেছিলেন। তাঁর কথক
ভঙ্গিটিও লক্ষ্য করার মতো _ ফলে, তাঁর গল্পে, পাঠকের কৌতূহলের কথা
বিবেচনা করে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যাদানের একটা প্রবণতা চোখে পড়ে।
পরবর্তীকালে লেখকরা এই বিষয়টিকে পুরোপুরিভাবে পাঠকের ওপরেই ছেড়ে
দিয়েছেন। এমন কি, যে কোনো তথ্য, হোক তা দুর্লভ, ব্যবহার করলেও
লেখকরা এখন আর তার ব্যখ্যা বা পরিচিতি দিতে বাধ্যবাধকতা বোধ করেন
না _ প্রভাতকুমার যা করতেন। এ সময়েরই আরও কয়েকজন গল্পকার _ প্রমথ
চৌধুরী, সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, সুরেন্দ্রনাথ
মজুমদার প্রমুখ _ খানিকটা স্যাটায়ারধর্মী গল্প লিখে দৃৃষ্টি আকর্ষণ
করেছিলেন, যদিও এর সবচেয়ে সফল প্রয়োগ ঘটে পরশুরামের গল্পে। পরশুরাম
অবশ্য নানাদিক থেকেই তীক্ষ্ন সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। সনাতন
মূল্যবোধে বিশ্বাসী এই লেখক একসময় রঙ্গ-ব্যঙ্গের মধ্য দিয়েই
সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে তীব্রভাবে আঘাত করেছেন।
প্রভাতকুমারের পর বাংলা সাহিত্যের আরেক বিস্ময়জাগানিয়া শিল্পী
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অভাবিত পাঠকপ্রিয়তার বিষয়টি নিয়ে
ভাববার অবকাশ আছে। তাঁকে উপেক্ষা করাটা এখন একটি ফ্যাশন হয়ে
দাঁড়িয়েছে, কিন্তু যিনি প্রায় এক শতাব্দী ধরে একটি ভাষার আপামর
পাঠকগোষ্ঠীকে মোহমুগ্ধ করে রাখতে পারেন _ তাঁর ক্ষমতা সম্বন্ধে
সন্দেহ করা চলেনা। সম্ভবত শরৎচন্দ্রই প্রথম লেখক যিনি বাঙালির
আবেগ-আকাঙ্ক্ষার স্থানগুলো সূক্ষভাবে চিহ্নিত করে তাকে নিপুণ
দক্ষতায় ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। পল্লীজীবনের অনুপুঙ্খ বর্ণনায় নয়,
প্রকৃতির মোহমুগ্ধকর চিত্রায়ণে নয়, সামাজিক কুসংস্কার ও
অন্ধবিশ্বাস গুলোকে নির্মম আঘাতে নয়, আমার মনে হয়েছে, তাঁর সাফল্য
বাঙালির আবেগকে ধারণ করার মধ্যে নিহিত।
রবীন্দ্রনাথ-প্রভাতকুমার-শরৎচন্দ্রের পর বাংলা ছোটগল্প প্রথমবারের
মতো বাঁক পরিবর্তন করলো কল্লোল গোষ্ঠীর তরুণদের হাতে। এঁরা ছিলেন
আধুনিক মনস্ক, জীবনের ক্লেদাক্ত চিহ্নগুলোও উপেক্ষা করবার বিষয় নয়
তাঁদের কাছে, নর-নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে শরীরই যে সর্বাধিক
ভূমিকা পালন করে _ একথা বলতে তাঁরা দ্বিধা করলেন না। মূলত তাঁরা
ছিলেন পাশ্চাত্য-দর্শন প্রভাবিত যুবার দল _ মার্কসীয় দর্শন,
ফ্রয়েডের যৌন-মনস্তত্ত্ব, স্বদেশের মাটিতে স্বাধীনতাকামী যুবকদের
সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন নিশ্চয়ই তাঁদেরকে আলোড়িত করেছিলো। এ সময়ে
প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্তকুমার সেনগুপপ্ত ও বুদ্ধদেব বসু _ এই তিন
প্রতিভাবান তরুণের সঙ্গে জুটেছিলেন জগদীশ গুপ্তের মতো এক আশ্চর্য
গল্পকার। আরও ছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও মনীশ ঘটক।
প্রেমেন্দ্র মিত্র জীবনের ক্লেদাক্ত অভিজ্ঞতা, অবক্ষয় ও হতাশার
মধ্যেও মানুষের সম্ভাবনাকে খুঁজেছেন, ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দেননি
মোটেই, চরিত্র চিত্রণে অস্বাভাবিক রকমের সচেতন, প্রকরণে সিদ্ধহস্ত।
তাঁর তেলেনপোতা আবিষ্ক্কার গল্পটি এর নির্মাণ শৈলীর কারণেই
তুলনারহিত হয়ে আছে। এর আগে বা পরে এমন আর একটি গল্পও লেখা হয়নি
বাংলা সাহিত্যে।
মানুষের অবচেতন মনোজগতের খুঁটিনাটি বুদ্ধদেব বসুর কলমে উঠে আসতো এক
আশ্চর্য কুশলতায়, আর তাঁর ছিলো সেই অসামান্য ভাষামাধুর্য _ যে কোনো
লেখকের জন্যই যা ঈর্ষার বস্তু। সেই সংস্কারাচ্ছন্ন সময়টিতে তিনি
ছিলেন সবচেয়ে বিতর্কিত লেখক। অশ্লীলতার অভিযোগে তুমুলভাবে আক্রান্ত
হয়েছিলেন বুদ্ধদেব। 'প্রত্যক্ষ কামক্রীড়ার চিত্র' তিনি অাঁকেননি
'কিন্তু স্বগত চিন্তায়, সম্ভোগ বাসনার বর্ণনায় এবং প্রায় শরীর
ছোঁয়া ভাষার যে দুঃসাহসী পরীক্ষা তিনি করেছেন সে যুগের শালীনতাবোধ
ও রুচিকে সেই পুঙ্খানুপুঙ্খতা ঘা দিয়েছে।'
অবশ্য মানুষের যৌনজীবন ভাবনায় বাংলা গল্পে বুদ্ধদেবই প্রথম নন, এর
আগে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তও এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন।
সম্ভবত বাংলা কথাসাহিত্যে নরেশচন্দ্রই প্রথম 'যৌন-আবেগ ও অপরাধ
মনস্তত্ত্বের' সার্থক চিত্র তুলে ধরেন।
এই সময়েই আরেকজন লেখক অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত। তার গল্পগুলোও
মনস্তাত্তি্বক _ সেই সঙ্গে তাঁর ভাষা ছিল 'আলঙ্কারিক'। সবদিক দিয়েই
তাঁর গল্পের বহুমাত্রিকতা পাঠককে দীর্ঘকাল ধরে মুগ্ধ করে রেখেছে।
জগদীশ গুপ্ত ছিলেন এ সময়ের আরেক আশ্চর্য লেখক। একজন লেখক কিভাবে
সারাজীবন ধরে শুধু জীবনের ক্লেদাক্ত-পরাজিত-জঘন্য-নির্মম-নিষ্ঠুর
অর্থাৎ যাবতীয় নেতিবাচক পরিণতির কথা এত নির্মোহ-নিরাসক্ত ভঙ্গিতে
লিখে যেতে পারেন _ ভাবলে অবাক হতে হয়। প্রেম ও মমতা, স্বপ্ন ও
সম্ভাবনা, আদর্শ ও মূল্যবোধ, সুস্থতা ও সৌন্দর্যবোধ এইসব যাবতীয়
ভালো ভালো কথাবার্তা তাঁর গল্পে চিরদিনই নির্মমভাবে উপেক্ষিত থেকে
গেছে। তাঁর আগে বা পরে এইরকম আপাদমস্তক নৈরাশ্যমণ্ডিত লেখকের কথা
আর মনে পড়ে না।
বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে এই সময়টি এক অসামান্য সৃষ্টিশীলতায় পূর্ণ
হয়ে উঠেছিলো। প্রতিভাদীপ্ত ও মেধাবী গল্পশিল্পীরা আসর জমালেন এই
সময়েই। গড়ে তুললেন ছোটগল্পের সমৃদ্ধ ভূবন। কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের
তুমুল সক্রিয়তার সময়েই ধূমকেতুুর মতো বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ ঘটলো
তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ ও মানিক বন্দোপাধ্যায়ের।
এ তিনজনই একে অপর থেকে যথেষ্ট রকমের আলাদা, কিন্তু তাঁরা
সম্মিলিতভাবেই যেন তৈরী করছিলেন এক সমগ্রতার বোধ _ এ বোধ মানব
স্বভাব, সমাজজীবন ও দার্শনিক উপলব্ধির। একই সময়ে ক্রীয়াশীল
অন্যান্য লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এই তিন বন্দোপাধ্যায়
উত্তরকালে বাঙালি পাঠককে এত তুমুলভাবে আলোড়িত করেছেন যে এর তুলনা
মেলা ভার।
গল্পকার হিসেবে তারাশঙ্করের সাফল্য অবশ্য আমার কাছে খুব ঈর্ষণীয়
মনে হয় না, [উপন্যাসে তিনি এর চেয়ে অনেক বেশ স্বচ্ছন্দবিহারী,
সুদূরপ্রসারী ও সফল, এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র গল্প নিয়ে, অতএব
উপন্যাস সম্বন্ধে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছি।] তবু তিনি পাঠককে
নতুন একটি আস্বাদ দিতে পেরেছিলেন। গ্রামীন জীবনকে উপজীব্য করেছিলেন
তিনি, তার রূপায়নে যথেষ্ট মনোযোগীও ছিলেন এবং প্রথমবারের মতো
ব্যবহার করেছিলেন আঞ্চলিক শব্দাবলী অসাধারণ এক কুশলতায়। অবশ্য
আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে শৈলজানন্দের কথাও স্মরণ করতে হয়।
এই সময়ের লেখকদের মধ্যে বিভূতিভূষণ যেন খানিকটা ব্যতিক্রম।
বিষয়বস্তু হিসেবে তিনিও বেছে নিয়েছিলেন গ্রামকেই, তবু তার
গ্রামগুলো যেন একটু আলাদা। সেখানে দ্বন্দ-সংঘাতমুখর বাস্তবতার চেয়ে
'ছায়া-সুনিবিড় গ্রামখানি'র চিত্রই বেশী প্রকট। তাঁর সৃষ্ট
চরিত্রদের দারিদ্র আছে, গ্লানি ও পরাজয় আছে কিন্তু বেঁচে থাকার
প্রেরণাও আছে। নিত্যদিনের ক্লেদাক্ত জীবন-যাপনের চেয়ে তার কাছে
বৃহত্তর জীবনবোধই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, ফলে তাঁর চরিত্রগুলো
কোনো না কোনোভাবে তাদের সমস্যাগুলো পাশ কাটিয়ে বেঁচে থাকার
প্রেরণায় জারিত হয়। এক গভীর মমতা ও ভালোবাসায় তাঁর চরিত্রগুলো
নির্মিত হয়, গ্রামগুলো চিত্রিত হয় _ যা পাঠককে আবিষ্ট করে তোলে।
রবীন্দ্রনাথের পর এসব উজ্জ্বল লেখকদের হাতেই নির্মিত হচ্ছিলো বাংলা
গল্পের বহু-বিচিত্র ভূবন। এঁদের প্রতিভাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার
উপায় নেই জ্জ আর তাঁদের প্রতি সেই শ্রদ্ধা রেখেই লিখছি _ মানিক
বন্দোপাধ্যায়ের মেধা-প্রতিভা-শিল্পবোধ-সমাজচেতনা যে কোনো
সাহিত্যশিল্পীর চেয়ে ঈর্ষণীয়ভাবে ব্যতিক্রম জ্জ অন্তত কমিউনিষ্ট
পার্টিতে যোগ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আগ পর্যন্ত তাঁর শিল্প চেতনাকে
আমার কাছে অনন্য বলে মনে হয়েছে। এত স্বল্প পরিসরে তাঁর সম্বন্ধে
মন্তব্য করা থেকে সঙ্গত কারণেই বিরত থেকে আনন্দ বাগচীর একটি
মন্তব্য উদ্ধৃত করছি- 'মার্কসীয় অম্বয় এবং বিজ্ঞান বোধের অন্বীক্ষা
নিয়ে যুগপৎ 'কেন'র উত্তর খুঁজেছেন তিনি। প্রায় আত্ন্বঘাতী দুঃসাহসে
ক্লেদপঙ্কিল জীবন ছুঁয়ে ছেনে দেখেছেন। যে চোরাকুঠুরির রুদ্ধশ্বাস
মুহূর্তে সহবাসী জীবন ও যৌনতা পরস্পরের টুটি ছিঁড়ে নিতে উদ্যত
মানিকের সজাগ কলমে তার চতুস্কোন উদ্ভাসিত।... তাঁর গল্পের একটিই
তুলনা যেন যথার্থ হয়, অমৃত _ বিষের পাত্রে।'
কল্লোল গোষ্ঠীর আগে-পরে আরও কয়েকজন গল্পকারের নামোল্লেখ করা যেতে
পারে- উপরোক্তদের মতো এতটা গভীর প্রভাববিস্তারী না হলেও গল্পচর্চায়
যাঁদের আন্তরিকতার অভাব ছিলো না। এঁরা হচ্ছেন- নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত,
জলধর সেন, আবদুল ওদুদ, কাজী নজরুল ইসলাম, দীনেশরঞ্জন দাশ,
মনীন্দ্রলাল বসু, মনোজ বসু, অন্নদাশঙ্কর রায় ও বনফুল।
কল্লোল ও বন্দোপাধ্যায়ত্রয়ের পথ ধরেই এলো চলি্লশের দশক। গল্পকার
হিসেবে এলেন সুবোধ ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র,
সতীনাথ ভাদুড়ী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ। এর পরপরই এলেন বিমল
মিত্র, গৌরকিশোর ঘোষ, বিমল কর, সমরেশ বসু, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রমুখ। সুখের বিষয় _ এই সময়কালেই বাংলাদেশের সাহিত্য ও শিল্পরুচি
নির্মাণের প্রাথমিক দায়িত্ব নেয়ার জন্য আগমন ঘটলো সৈয়দ
ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, আবু রুশদ, আবু জাফর
শামসুদ্দিন, শাহেদ আলী, রশীদ করীম, শামসুদ্দিন আবুল কালাম
প্রমুখের। এঁদের প্রসঙ্গে পরে আসছি।
ততোদিনে বাংলা গল্প তার শৈশব কৈশোর পেরিয়ে সম্ভাবনাময় ও দেদীপ্যমান
তরুণ হিসেবে আবিভর্ূত হয়েছে। এই সময়কালে যাঁরা এলেন পেছনে ফিরে
তাকাবার কোনো পথই তাদের খোলা ছিলো না _ সামনেই ছিলো তাঁদের দৃষ্টি।
এঁদের গল্পের শিল্পচেতনা, জীবনবোধ ও সাহিত্যমূল্য সেই প্রসারিত
দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দেয়।
সুবোধ ঘোষের বহু বিচিত্র চরিত্র ও অভিজ্ঞতার গল্প; নতুন সময়ের নতুন
গল্প, নতুন ভাষা ও ফর্ম নিয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ সন্তোষ কুমার ঘোষের
গল্প; তখন পর্যন্ত উপেক্ষিত মধ্যবিত্ত জীবনের নানাবিধ টানাপোড়েন
নিয়ে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্পের পাশাপাশি সতীনাথ ভাদুড়ী ও
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর অসামান্য গল্পসম্ভার বাংলা ছোটগল্পকে এমন
একটি অবস্থানে পৌছে দিলো, যা যে কোনো শিল্প মাধ্যমের জন্যই একটি
বড় অর্জন বলে বিবেচিত হতে পারে।
সতীনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রের মধ্যে কে বেশী প্রতিভাদীপ্ত সে নিয়ে হয়ত
বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু এঁদের মধ্যে কিছু মিলও আছে। দুজনেই
আশ্চর্য নিমের্াহতায় বর্ণনা করে যান জীবনযাপনের নানা খুঁটিনাটি
চিত্র। সতীনাথের প্রথম দিকের গল্পগুলো পড়লে এর ভাষার অদ্ভুত সারল্য
ভ্রূ কুঁচকে দেয়। এমন সারল্য অর্জন করা দুুরূহ নিঃসন্দেহে। জীবন
যেমন, ঠিক তেমন করেই বর্ণনা করতে চান তিনিজ্জ যেন কোনো বিষয়েই তাঁর
বিশেষ কোনো আবেগ বা আসক্তি নেই। জীবনবোধে, বর্ণনা কৌশলে এতোটা
নিরাসক্তি আজও পাঠককে বিস্মিত করে তোলে।
জ্যেতিরিন্দ্রকে আমার কাছে এক অতুুলনীয়-অনন্য শিল্পী বলে মনে হয়।
তাঁর শিল্প চেতনাকে অর্জিত বলার চেয়ে সহজাত বলাটাই অধিক সঙ্গত।
নইলে, তাঁর নির্লিপ্ত ভাষারীতি, নিরাসক্ত জীবন-ভাবনা,
অ্যাবস্ট্রাক্ট অথচ সচিত্র বর্ণনাভঙ্গির কোনো উত্তরাধিকার আজও
দুর্লভ হবে কেন?
এঁদের পর বিমল কর ও সমরেশ বসু _ এ দুজন দুভাবে বাংলা গল্পকে
গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন।
সমরেশ তীক্ষ্ন সমাজ সচেতন; তীক্ষ্ন তাঁর লেখনি, দুঃসাহসিক বর্ণনায়
পাঠককে প্রায় বজ্রাহত করে তোলেন; বিমল যেন সমাহিত, রোমান্টিক,
প্রকৃতিকে জীবনের সঙ্গে প্রায় অবিচ্ছেদ্দ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে
ফেললেন। এঁদের সঙ্গেই অবশ্য রমাপদ চৌধুরীর নামও এসে যায়- জীবনের
নেতিবাচক পরিণতিগুলো তিনিও নিপুণ কুশলতায় ধরেছিলেন।
মূলত এদের নিয়েই গড়ে উঠছিলো বিভাগ-পূর্ব বাংলা ছোটগল্পের সমৃদ্ধ
ভুবন। দেশ বিভাগের পর সমান্ত-রাল ধারায় প্রবাহিত বাংলা সাহিত্যের
দু'টো শাখায় আরও অনেক প্রতিভাবান লেখক এসেছেন, কিন্তু তাঁরা বহন
করেছেন একটিই ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। খুবই স্বল্প পরিসরে
রবীন্দ্রনাথ থেকে দেশভাগ সময়কালের প্রধান গল্পকারদের সম্বন্ধে
মন্তব্য করেছি _ বলা যেতে পারে একটু করে ছুঁয়ে গেছি, যদিও এঁদের
অনেককে নিয়েই আলাদা রচনা হতে পারে। পাঠক নিশ্চয়ই বুঝেেত পারবেন এই
রচনার মূল লক্ষ্য _ সাতচলি্লশ পরবর্তী বাংলাদেশের গল্প। আমরা যাদের
গর্বিত উত্তরসূরী, মূলত তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাবশতই উপরোক্ত প্রয়াস।
এ রচনার এই অংশ আমরা এখানেই থামিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের গল্প নিয়ে
আলোচনা শুরু করতে পারতাম। কিন্তু আরেকজন অতি বিস্ময়কর লেখক _ কমল
কুমার মজুমদার _ কে নিয়ে অন্তত কয়েকটি পংক্তি না লিখলে
উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গটি খানিকটা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। কমল কুমারের
আবির্ভাব অবশ্য বিভাগ পরবতর্ীকালে, কিন্তু বলতেই হয় _ দেশভাগের পর
তাঁর মতো আর কোনো লেখকই প্রায় ব্যাখ্যাহীনভাবে বাংলা সাহিত্যের
প্রবাহমান দুটো ধারায় এত বিপুল ও গভীর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেননি।
'বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তম ধাঁধা' এই লেখককে নিয়ে কোনোদিনই কেউ
নিশ্চিত ব্যাখা দিতে সাহসী হননি। ফলে, আমার মনে হয়, ব্যাখ্যাহীন
অজ্ঞাত কারণেই তিনি বারবার _ বিশেষ করে তাঁর পরবর্তীকালের প্রায়
সমস্ত তরুণ লেখককে _ বিস্ময়করভাবে ঘোরগ্রস্থ করে রেখেছেন, অন্ততঃ
কিছুদিনের জন্য হলেও। এর কারণ কি ? আমার পক্ষেও তা বলা সম্ভব নয়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বরং এ প্রসঙ্গের ইতি টানা
যাক _ 'কমল কুমার মজুমদার বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তম ধাঁধা। এরকম কোন
লেখক হতে পারে না, হওয়া সম্ভব নয়, অথচ সত্যিই কমল কুমার মজুমদার
নামে একজন লেখক বেশ কয়েক বছর বাংলা সাহিত্যে দাপটের সঙ্গে বিচরণ
করে গেছেন। সাহিত্য নিয়ে তিনি কি ছেলেখেলা করতে চেয়েছিলেন, না
সাহিত্য তার অস্থিমজ্জায় মিশে হৃদপিন্ডের ধমনির সঙ্গে সমন্বিত
হয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ নয়। আমি তাকে প্রায় কৈশোর বয়েস
থেকে দেখেছি, বহু বছর তার সঙ্গ লাভ করেছি, তবু মানুষটিকে ঠিক বুঝতে
পারিনি। তার রচনাগুলির মতো রচয়িতাটিও দুবের্াধ্য ও রহস্যময়।'
এবং বাংলাদেশের গল্প
ছোটগল্পের এই উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই চলি্লশের দশকে যাত্রা শুরু
করেছিলেন পূর্ব বাংলার কয়েকজন মেধাবী তরুণ। তারপর প্রায় ষাট বছরের
ইতিহাস। এরই মধ্যে বাংলাদেশের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে
এসেছে গভীর ও ব্যাপক পরিবর্তন। ভাষা আন্দোলনের মতো অনন্য ইতিহাস ও
মুক্তিযুদ্ধের মতো অসামান্য ত্যাগের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে।
বাঙালির জন্য সৃষ্টি হয়েছে এক পৃথক আবাসভুমি _ বাংলাদেশ। অথচ এত
ত্যাগ ও সংগ্রামের পরও দেশটি নানাদিক থেকেই অন্ধকারের অতল গহ্বরে
নিমজ্জিত। এতসব বহুবিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি পশ্চিম
বাংলার লেখকদের। ফলে দুই ধারায় প্রবাহিত বাংলা সাহিত্য এখন
নিশ্চিতভাবেই পৃথক চারিত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে। এই রচনায়
বাংলাদেশের ছোটগল্পের সেই গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি খুঁজতে চেষ্টা
করেছি।
প্রাথমিক পর্ব
চলি্লশ দশকের সেই বিহ্বল সময়ে, বাঙালী মুসলমান যখন অতিক্রম করছে এক
অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল _ দ্বিজাতিতত্ত্বের আফিম খেয়ে ভুল স্বপ্নে
মেতে ওঠা এক বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন-কল্পনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা,
সংস্কার, মূল্যবোধ ও জীবনাচরণের সচিত্র সচল উপস্থাপনার দায়িত্ব
নিয়েছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র সাহিত্যকর্মী। কবিতা ও কথাশিল্পে
এই প্রথম এক সঙ্গে কয়েকজন মেধাবী তরুণ পাওয়া গেলো এই অঞ্চলে, যেমন
_ কবিতার কথা বলা হচ্ছে না,
কথাশিল্পে _ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, শাহেদ আলী, আবু রুশদ,
আবু ইসহাক, ফজলুল হক, আবু জাফর সামসুদ্দীন, নাজমুল আলম, শামসুদ্দিন
আবুল কালাম, সরদার জয়েনউদ্দিন, রশীদ করীম প্রমূখ।
এঁদের ছিল ঈর্ষা করার মতো উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত গল্প উপন্যাস
সম্ভার, কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না _ তাঁদের সামনে খুব গভীর একটি
সমস্যাও ছিলো। একটি নতুন রাষ্ট্র আর তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্বপ্ন,
মানুষের জীবনাচরণে নব্য রাষ্ট্রের নতুন ধরনের খবরদারী ভূমিকায়
সৃষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এত সহজে রূপায়ন করা সম্ভব ছিলো না। তাছাড়া,
এ অঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান, এতদিন পর্যন্ত বাংলা
সাহিত্যে মোটামুটিভাবে উপেক্ষিতই ছিলো, ফলে এক্ষেত্রে কোনো
ঐতিহ্যের ভাগীদার তাঁরা হতে পারেননি।
দেশভাগের পর ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সাহিত্য-ঐতিহ্য, বিশেষ করে
গল্প চর্চার কথা বলতে হলে প্রথমেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর নাম চলে আসে।
সেই সময়ে এই অঞ্চলের সাহিত্য-রুচি, ভাষারীতি, শিল্পচেতনা প্রভৃতি
নির্মাণে যে কজন আলোকপ্রাপ্ত অগ্রসর মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করেছিলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁদের অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের
আবহমান ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার ধারণ করেও অচিরেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন
_ এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-যাপন, তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা পশ্চিম
বঙ্গীয় জীবন-যাপন, সংস্কৃতি ও ভাষা থেকে বেশ খানিকটা আলাদা।
লক্ষ্যমুখী ছিলেন তিনি, সচেতন তো বটেই, ফলে আমরা দেখতে পাই _ বিভাগ
পূর্বকালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প গ্রন্থে ব্যবহৃত পশ্চিমবঙ্গীয়
ভাষারীতি থেকে তিনি সচেতনভাবেই নিজেকে সরিয়ে এনেছেন। তিনিই প্রথম _
অত্যন্ত সফলভাবে এবং নিপুণ কুশলতায় _ এতদিন পর্যন্ত সাহিত্যে
উপেক্ষিত এ অঞ্চলের মানুষকে তাঁর সাহিত্যে তুলে আনলেন তাদের মৌলিক
ও দৈনন্দিন জীবনাচরণসহই _ তাদের
সংস্কার-বিশ্বাস-স্বপ্ন-সম্ভাবনা-সংকট এমনকি মুখের ভাষাটিও আর
উপেক্ষিত রইলো না। এজন্য তিনি নির্মাণ করলেন এই অঞ্চলের জন্য
গ্রহণযোগ্য এক ভাষারীতি, ক্রীয়া পদের ব্যবহারে আনলেন দৃষ্টিগ্রাহ্য
পরিবর্তন, ব্যবহার করলেন সংখ্যাহীন আঞ্চলিক শব্দ (যা ছাড়া পূর্ব
বাংলার জীবনযাত্রা সঠিকভাবে ফোটে না), যা তাঁকে পশ্চিমবঙ্গীয়
সাহিত্য ঐতিহ্য থেকে স্পষ্টতই আলাদা করে ফেললো। এজন্য তাঁকে পেরুতে
হয়েছে এক রুক্ষ, অমসৃন, দীর্ঘপথ। তাঁর গল্পসমগ্র পড়লে অন্তত একথাই
মনে হয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্প সংখ্যা পঞ্চাশটির মতো _ তাঁর
জীবনকালে গ্রন্থিত অগ্রন্থিতসহ। সমাজ সচেতন ছিলেন তিনি,
রিয়্যালিস্টিক, পরে অস্তিত্ববাদের দিকে তাঁর ঝোঁক দেখা দিলেও,
তাঁকে এ অঞ্চলের প্রথম সফল রিয়্যালিস্টিক কথাশিল্পী বললে ভুল হয়
না। কিন্তু এক জায়গায় থেমে থাকেননি তিনি; উপন্যাসে যেমন _ লাল সালু
ও কাঁদো নদী কাদো'র মধ্যে দুস্তর ব্যবধান, গল্পেও তাই। ফলে নয়ন
তারা\'য় দুর্ভিক্ষপীড়িত বিপন্ন মানুষ যেমন তার গল্পের চরিত্র হলো
কিংবা একটি তুলসী গাছের কাহিনী গল্পে দেশভাগের ফলে শেকড়হারা মানুষ,
তেমনি দুই তীর গল্পে প্রেমহীন সংসার জীবনের ক্লান্ত মানুষ। তাঁর
গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে ভালোভাবে টের পাওয়া যায় _ অগ্রন্থিত
গল্পগুচ্ছ পড়লে। বাঙালি মুসলমানের নানাবিধ জীবনচিত্র এসব গল্পে
রূপায়িত, কিন্তু বোঝা যায় _ কখনো কখনো কোনো কোনো বিষয়ে তিনি যেন
সিদ্ধান্তহীনও। ঠিক কিভাবে এই জনগোষ্ঠী গল্পের বিষযবস্তু হতে পারে
_ এ নিয়ে যেন বেশ খানিকটা চিন্তিত দেখা যায় তাঁকে। ফলে চৈত্র দিনের
এক দ্বিপ্রহরে, ঝোড়ো সন্ধ্যা, প্রাস্থানিক, পথ বেঁধে দিল...
ইত্যাদির মতো দুর্বল গল্পও তাঁকে লিখতে দেখা যায়। এসব গল্প
ওয়ালিউল্লাহর লেখা ভাবতে কষ্ট হয়, কিন্তু আমরা যদি তাঁর সময়টিকে
বিবেচনার মধ্যে আনি, তাহলে হয়ত এর একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব
হতে পারে। একটি জনগোষ্ঠীকে যেহেতু প্রায় পূর্ব-ঐতিহ্যহীনভাবে তিনি
তাঁর গল্প উপন্যাসের বিষয়বস্তু করতে চাইছেন _ এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা
তাঁর জন্য প্রয়োজন ছিলো। অতএব মানুষ তার সংকট-সম্ভাবনা-পরাজয়ের
পরিপ্রেক্ষিতে চিত্রিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ব্যক্তি জীবনের
সূক্ষ্ন অনুভব, এমনকি গদগদ প্রেমের পরিপ্রেক্ষিতটিও এলো। ওই একই
সময়ে তিনি নির্মাণ করেছেন ঐসব দুর্বল গল্প, আবার ছায়া, দ্বীপ,
মানুষ, রক্ত ও আকাশ প্রভৃতি অ্যাবস্ট্রাক্ট বর্ণনাসমৃদ্ধ ধ্রুপদি
গল্প, যেগুলো যে কোনো সময়কালে যে কোনো স্থানের জন্যই প্রযোজ্য। এসব
গল্পের একধরনের বিশ্বজনীন গ্রহনযোগ্যতাকে অস্বীকার করা যায় না।
স্বপ্ন নেবে এসেছিলো' র মতো অদ্ভুত প্রেমের গল্প, ও আর তারা'র মতো
ফর্ম ও ভাষা সচেতন প্রেমের গল্প, নকল, স্বপ্নের অধ্যায়'র মতো নতুন
দেশ প্রাপ্তির ফলশ্রুতিতে মানুষের পরিবর্তিত স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার
গল্প, মাঝি'র মতো মানব স্বভাবের চমৎকার ব্যাখ্যা সম্বলিত গল্প _ এই
রকম আরো অনেক ধরনের বিষয় ভাবনা ও চরিত্র চিত্রণের মধ্যে দিয়ে তিনি
বাংলাদেশের গল্পের জন্য একটি চমৎকার ভবিষ্যত গড়ে দিলেন। পরবর্তী
জীবনে উপন্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়া, প্রবাস জীবনের ফলে দেশের
সাহিত্যের সঙ্গে এক ধরনের স্বেচ্ছা বিচ্ছিন্নতা, ও লেখার পরিমাণ
কমিয়ে আনার ফলে তাঁর গল্প চর্চায় ভাটা পড়ে। তবু বলা যেতে পারে,
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ভুবনে তিনি পালন করেছেন পিতৃপুরুষের
ভূমিকা। ওই সময়কালে এত সচেতন, লক্ষ্যমুখী, ও প্রতিভাবান লেখক আর
চোখে পড়ে না। তাঁর গল্পের এই বৈচিত্র্য _ একই সঙ্গে দুর্বল ও
ধ্রুপদী গল্প রচনার এই বিস্ময়কর প্রবণতা _ আসলে একজন লেখকের [বিশেষ
করে তিনি যদি হন ক্রান্তিকালের লেখক] গড়ে ওঠার রুক্ষ, অমসৃন,
রহস্যময় ও বন্ধুর প্রক্রিয়াকেই নির্দেশ করে।
শওকত ওসমানও এই সময়েরই লেখক, প্রাথমিক পর্বের সাহিত্য চর্চায় তিনিও
পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে তাঁকে কখনো আমার কাছে
ছোটগল্পের শিল্পী বলে মনে হয়নি। প্রথম জীবনে রচিত তাঁর পুরনো গল্প
সম্বলিত নির্বাচিত গল্প গ্রন্থটি খানিকটা হতাশাই তৈরী করে। এক
বাক্যে উল্লেখ করার মতো গল্প তিনি খুব একটা রচনা করতে পারেননি।
যদিও কেউ কেউ শওকত ওসমানের নামের সঙ্গে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী কে
সমার্থক করে দেখতে চান, তবু আশির দশকে রচিত এ প্রতীকী গল্পটিকেও
খুব সফল কোনো সৃষ্টি বলে মনে হয়নি আমার। বাংলাদেশের যে সময়কাল নিয়ে
গল্পটি রচিত, সেই পরিপ্রেক্ষিতটি মনে রাখলে গল্পের প্রধান চরিত্রের
সঙ্গে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাযুস্য লক্ষ্য করা যায় _ উভয়েই
ফু দিয়েই দেশ থেকে বালা মুসিবত দূর করতে চায়। কিন্তু গল্পের
চরিত্রটিকে অস্বাভাবিক এবং বিকারগ্রস্থ হিসেবে উপস্থাপন এবং
পরিণতিতে তার প্রশ্নবোধক মৃত্যুর ফলে স্বয়ং ব্যবহৃত প্রতীকটিই
প্রশ্নের মুখোমুখি পড়ে যায়। শওকত ওসমানের গ্রহণযোগ্যতার কারণ
সম্ভবত তাঁর গল্প নয় _ বাংলাদেশের কথা সাহিত্যের ভুবনে সবচেয়ে
দীর্ঘসময় ধরে পরিভ্রমণ, কয়েকটি আলোচিত উপন্যাস, সর্বোপরী তঁাঁর
রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী ভাবমূর্তি _ তঁঁাঁকে অন্যতম আলোচিত লেখকে
পরিণত করেছে।
আবু ইসহাকও এসময়ের ক্ষমতাবান গল্পকার। তাঁর গল্পে সমাজের
নিম্নবিত্ত-শ্রমজীবী-সংগ্রামী মানুষের জীবনযাপনের সূক্ষাতিসূক্ষ
চিত্র খুব সফলভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায়। শ্রেণী সচেতন ছিলেন তিনি,
সামাজিক বৈষম্যগুলো খুব ভালো ধরতে পারতেন _ জোঁক-এর মতো এমন সফল
প্রতীকী গল্পের মাধ্যমে শোষনের সর্বগ্রাসী রূপটিকে চিহ্নিত করার
উদাহরণ বাংলা গল্পে খুব বেশি নেই। একটি কথা এখানে বলা দরকার, আবু
ইসহাকের দুটো উপন্যাসেরই _ সূর্য-দীঘল বাড়ী ও পদ্মার পলিদ্বীপ _
বিষয়বস্তু গ্রামের মানুষ, গ্রামীন সমাজ ও জীবন বলে অনেকেরই ধারণা
যে, তিনি শুধু গ্রাম নিয়েই লিখতেন। বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে সেরকম নয়,
গল্পে তিনি কাজ করেছেন বিবিধ বিষয় নিয়ে, কখনো কখনো বিষয় হিসেবে
এসেছে ধর্মীয় কুসংস্কার কিংবা নিম্নশ্রেণীর মানুষের মানবিক আচরণ,
কখনো বা নাগরিক জীবন। তাঁর দুটো গল্পগ্রন্থভূক্ত ২১ টি গল্পের
মধ্যে জোক এবং আবর্ত _ মাত্র এই দুটো গল্পে তীব্রভাবে গ্রামীন জীবন
এসেছে। দাদীর নদীদর্শন, শয়তানের ঝাড়ু, বোম্বাই হাজী ইত্যাদি গল্পে
গ্রামীন সমাজের দেখা মিললেও এগুলোর মূল উদ্দেশ্য গ্রামীন সমাজ ও
জীবনের বর্ণনা নয় _ ধর্মীয় কুসংস্কারের জালে বন্দি মানুষের গল্প
বলা হয়েছে এগুলোতে। অন্যদিকে উত্তরণ, কানাভুলা, বিস্ফোরণ ইত্যাদি
গল্প নিম্নশ্রেণীর মানুষ নিয়ে লেখা হলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনের
বহুবিধ সংকটের বর্ণনা নেই এসব গল্পে, রয়েছে মানবিক অনুভূতির
উন্মেষের কথা। নাগরিক জীবন নিয়ে তাঁর গল্পগুলো গতানুগতিক নয় _
শহুরে মানুষ ও জীবনের মধ্যে লুকায়িত ভন্ডামি ও শঠতার উন্মোচন রয়েছে
কোনো কোনো গল্পে, কোনো গল্পে রয়েছে নাগরিক যন্ত্রণার চমৎকার বিবরণ।
তবে প্রায় সব গল্পেরই বর্ণনার মধ্যে রয়েছে একটু কৌতুকপূর্ণ
দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়। আর এই বর্ণনাই তাঁর গল্পকে উপভোগ্য করে তোলে
পাঠকের কাছে।
এই সময়ের আরেকটি সফল গল্পের কথা পাঠকদের মনে পড়বে _ শাহেদ আলীর
জীব্রাইলের ডানা। এই একটি গল্পের জন্যই শাহেদ আলীর নামটি বারবার
উচ্চারিত হয়। বলার অপেক্ষা রাখেনা, গল্পটি অত্যন্ত উচ্চমানের,
কিন্তু সব মিলিয়ে শাহেদ আলীকে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ লেখক বলে মনে
হয় না। এই গল্পটির আগে পরে আরো বেশ কিছু গল্প লিখলেও তেমন সফল
গল্পের সংখ্যা সামান্যই। আবু রুশদ আমাদের প্রথম গল্পকার যিনি
নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনকে বিষয়বস্তু করেছিলেন, রশীদ করীমও তাই।
রুশদের শাড়ী বাড়ী গাড়ী কিংবা ছিনতাই তাঁর উজ্জ্বল শিল্পকুশলতার
নিদর্শন হয়ে আছে। রশীদ উপন্যাসে অসাধারণ সাফল্য দেখালেও গল্পে তেমন
স্বচ্ছন্দ নন। আবু জাফর শামসুদ্দিন, ফজলুল হক, সরদার জয়েনউদ্দিন,
সামসুদ্দিন আবুল কালামের দু-একটি করে গল্প আলোচিত হয়েছিলো। এঁরা
সবাই মোটামুটিভাবে মিডিওকার গল্পকার, তবে লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে,
এঁদের সবারই দু-একটি করে উঁচুমানের গল্পে আছে। সকাল দেখে যেমন বোঝা
যায় দিনটি কেমন যাবে, তেমনই আমাদের প্রাথমিক পর্বের এই বৈশিষ্ট্যটি
পরবর্তী প্রজন্মসমূহের মধ্যেও প্রবাহিত হয়েছে _ যাঁরাই গল্প
লিখেছেন (তাঁদের সকলে হয়ত প্রতিভাবান গল্পকার নন), তাঁদের
প্রত্যেকেই অন্তত একটি-দুটি ভালো গল্প লিখেছেন। যাহোক, প্রাথমিক
পর্বের গল্পচর্চায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছাড়া অন্যদের অর্জন তেমন
উল্লেখযোগ্য না হলেও সেই সময়ের প্রেক্ষিতে পূর্ব বাঙলার জীবন চিত্র
নির্মাণে এদের সবারই স্বচ্ছন্দ বিহার হয়ত বাংলাদেশের গল্পের
সম্ভানাময় ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দিয়েছিলো। তাছাড়া একথাও মানতেই হয় যে,
তাঁদের আন্তরিক ও চিন্তাশীল ও লক্ষ্যমুখী পদচারনা পরবর্তী
প্রজন্মের জন্য নির্মাণ করে দিয়েছিলো একটি সম্ভাবনাময় পথ।
কৈশোর কাল
বাংলাদেশের গল্প প্রাথমিক পর্ব পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখলো পঞ্চাশের
দশকে। সময়টি ছিলো নানা দিক থেকেই বিহ্বলতার। স্মৃতিতে তখনও উজ্জ্বল
হয়ে আছে তেতালি্লশের দুর্ভিক্ষ, ছেচলি্লশের সামপ্রদায়িক দাঙ্গা, আর
দেশবিভাগজনিত আবেগ-বিহ্বলতা ও হাহাকার। দু-বাংলার শেকড়হীন মানুষ,
উদ্বাস্তু, অসহায়, নতুন দেশে বসবাসের জন্য তাদের চোখ _ স্বপ্নে নয়
_ বেদনায় ম্লান। মানুষ কিভাবে তার শৈশব কৈশোরের স্মৃতিবাহী
জন্মভূমি, নদী, আকাশ আর প্রান্তর ছেড়ে ভালো থাকবে ? এরই মধ্যে ঘটে
গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্বব্যাপি দীর্ঘদিনের লালিত মূল্যবোধ
ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ; হতাশা, অবক্ষয় বাড়ছে _ মানুষ যেন হঠাৎই উপস্থিত
হয়েছে তার চূড়ান্ত পরিণতির সামনে।
সামাজিক-রাজনৈতিক-বৈশ্বিক পরিস্থিতি বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে
একজন লেখকের মধ্যেই। যে অদ্ভুত সময়ে পঞ্চাশের লেখকরা লিখতে শুরু
করেছিলেন, সহজ ছিলো না সময়টিকে সাহিত্যে ধারণ করার _ অন্তর্গত
রক্তক্ষরণ যতোই হোক না কেন!
ততোদিনে অবশ্য চলি্লশের লেখকরা বেশ স্থিত। নতুন রাষ্ট্রপ্রাপ্তির
আফিম মার্কা মোহ ইতিমধ্যেই কাটতে শুরু করেছে, পূর্ব বাংলার মানুষ
জারিত হচ্ছে তাদের প্রকৃত জাতিসত্ত্বার অহংকারে, প্রস্তুত হচ্ছে
ভাষা আন্দোলনের মতো অনন্য ইতিহাস নির্মাণ করার জন্য।
পাকিসতান সৃষ্টির অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা এ
অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত জাতিসত্ত্বাকেই মূর্ত করে তুলেছিলো। এ
জাতির বিকাশ ও মনন চর্চায় অবদান রাখার জন্য অনিবার্যভাবে মেধাবী
সাহিত্যশিল্পীদের আগমন ঘটলো। সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ সাবের,
আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু বকর সিদ্দিক, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির
রায়হান, সুচরিত চৌধুরী, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর
রহমান প্রমুখ কথাশিল্পী এলেন এ সময়েই।
পঞ্চাশের সবচেয়ে প্রতিভাদীপ্ত গল্পকার সৈয়দ শামসুল হক। বাঙালি
মুসলমান জনগোষ্ঠী তখন নানামাত্রিক নতুন, অভিনব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি
_ সৃষ্টি হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেনী, গড়ে উঠছে নগর। সৈয়দ হকই
প্রথমবারের মতো সেই নাগরিক মধ্যবিত্তের সংকট-সম্ভাবনা,
হতাশা-আকাঙ্ক্ষাকে সফলভাবে তাঁর গল্পের উপজীব্য করলেন। তাঁর ছিলো
সুক্ষ্ন দৃষ্টি; শীতবিকেল, ফিরে আসে, রক্ত গোলাপ প্রভৃতি গল্প তাঁর
মতো শিল্পীর পক্ষেই লেখা সম্ভব। তিনি অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট গন্ডিতে
আবদ্ধ হয়ে থাকেননি। ছুটে বেড়িয়েছেন জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার
সন্ধানে, ক্রমাগত নিজেকে ভেঙেচুরে নিজেকেই অতিক্রম করে গেছেন
ঈর্ষনীয়ভাবে। মানব-জীবন, মানব-স্বভাব, সমাজ-জীবন প্রভৃতির প্রতিটি
চেনা-অচেনা কোণে উজ্জ্বল আলো ফেলে দেখিয়েছেন সেগুলোর অনর্্তগত
চারিত্র-বৈশিষ্ট্য। তাঁর হাতেই নির্মিত হয়েছে প্রাচীন বংশের নিঃস্ব
সন্তান, আরও একজন প্রভৃতি রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন প্রতীকী গল্প;
ফিরে আসে, গাধা জোৎস্নার পূর্বাপর প্রভৃতির মতো প্রেমের গল্প। এই
রকম আরও অনেক রচনা দিয়ে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলাদেশের গল্পের
ভূবন।
আলাউদ্দিন আল আজাদ ছিলেন শ্রেনী সচেতন,সমাজবাদী লেখক। বাংলাদেশে
আজাদই এই ধারার পথিকৃৎ। উপরিকাঠামোর চেয়ে সমাজের অন্তর্কাঠামো
চিত্রায়ণে তাঁর ঝোঁক স্পষ্ট। আজাদ অবশ্য সাহিত্যে রোমািিন্টক
দৃষ্টিভঙ্গিকেও বাতিল করে দেননি। হয়ত তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটিই
তাঁকে খ্যাতিমান করে তুলেছিলো, কারণ তাঁর সফল গল্পের (এবং
উপন্যাসেরও) সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে বৃষ্টির মতো গল্প যিনি লেখেন
তাঁকে বাধ্য হয়েই গুরুত্ব দিতে হয়।
জহির রায়হান গল্পকার হিসেবে বর্তমান কাল পর্যন্ত এক ব্যতিক্রমী
উদাহরণ। বিশেষ করে তার গল্প বলার কৌশলটি এখনো পর্যন্ত
অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর গল্প যেন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। একেকটি
শব্দ দিয়েই একেকটি চিত্র নির্মাণ করেন তিনি _ এই একটি শব্দেই একটি
বাক্য, একটি সম্পূর্ণ অনুভূতি, একটি বর্ণিল দৃশ্য। তার অকাল মৃতু্য
আমাদের সাহিত্যকে কিছু অভিনব গল্পের যোগান থেকে বঞ্চিত করেছে। এই
সময়েরই আরেক গল্পকার সুচরিত চৌধুরী _ বাংলাদেশের জীবনযাত্রা যার
গল্পে অনুপুঙ্খ বর্ণনাসহ উঠে আসে। আব্দুল গাফফার চৌধুরী, আবদুশ
শাকুর, হাসনাত আব্দুল হাই প্রমূখও কিছু ভালো গল্পের স্রষ্টা। মিরজা
আব্দুল হা্ই সম্বন্ধে একই কথা বলা চলে।
তবে আল মাহমুদের কথা একটু বিশেষভাবেই বলা দরকার। কবিখ্যাতির জন্য
তাঁর গল্প নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি, কিন্তু গল্পে তাঁর অর্জনকে
অস্বীকার করার উপায় নেই, এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিকের
চেয়ে তিনি অনেক উঁচুমাপের গল্প রচনা করেছেন।
পঞ্চাশের আরও কয়েকজন গল্পকারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে _ আবুল
খায়ের মুসলেহউদ্দিন, রাবেয়া খাতুন, মাফরুহা চৌধুরী, রাজিয়া খান,
টিপু সুলতান, আহমদ মীর, আনিস চৌধুরী, , শহীদ আখন্দ, হুমায়ুন
কাদির, আফলাতুন প্রমূখ। গল্পচর্চায় এদের আন্তরিকতা প্রশ্নহীন হলেও
অর্জনটি তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।
আরেকজন গল্পশিল্পীর কথা না বললে পঞ্চাশের গল্পচর্চার বিষয়টি
সম্পূর্ণ হয় না। তিনি _ সাইয়িদ আতীকুল্লাহ। যদিও তার পরিচিতি কবি
হিসিবেই এবং দীর্ঘকাল তিনি গল্পচর্চা থেকে বিরত ছিলেন, তবু তাঁর
একমাত্র গল্পগ্রন্থ বুধবার রাতে আজও পাঠককে বিস্ময়াভিভূত করে তোলে।
এত তীক্ষ্ন সমাজ ও রাজনীতি সচেতনতা, প্রতীকের এমন অসামান্য কুশলী
ব্যবহার তাঁর আগে আর কোনো গল্পকারের মধ্যে দেখা যায়নি।
পঞ্চাশের শেষে কিংবা ষাটের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে দুজন
প্রধান পুরুষের আবির্ভাব ঘটে _ হাসান আজিজুল হক ও শওকত আলী।
শওকত আলীর গল্পে উত্তরবঙ্গের মানুষ নিপুণ কুশলতায় চিত্রায়িত।
শ্রেনীসচেতন তিনি, শ্রেনী সংগ্রামেও বিশ্বাসী _ মানুষের পরাজয়ের
কথা জেনেও পরাজয় নয় বরং তার ক্রোধ, ক্ষোভ ও সংগ্রামকেই বড় করে
দেখেন ও দেখান।
হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের সাহিত্য রুচির প্রেক্ষাপটে এক বিস্ময়।
তিনি শুধুই গল্পকার, উপন্যাসের ধারে কাছে খুব একটা যাননি (যা
এদেশের কথাশিল্পীদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য যে, সবাই একই সঙ্গে গল্পকার
ও ঔপন্যাসিক), শুধুমাত্র গল্পচর্চা করেও যে দেশের অন্যতম প্রধান
লেখকে পরিণত হওয়া যায় তিনি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। হাসানের গল্পের
বিষয়বস্তুও অন্য সবার থেকে আলাদা। যে শ্রেনীতে তাঁর বেড়ে ওঠা _
তাকে তিনি বিষয়বস্তু করেননি; সমাজের ক্ষয়ে যাওয়া, নিসপ্রভ,
সম্ভাবনাহীন, পরাজিত মানুষ তার গল্প-ভুবনের প্রধান অনুষঙ্গ।
শ্রেনী-বৈষম্যের এই সমাজে তার গল্পের প্রাসঙ্গিকতা তাই
অনস্বীকার্য। আর শুধু শ্রেণী-সচেতনতার কথাই বা বলি কেন, তিনি তাঁর
গল্পে কতভাবে ভেঙেচুরে যে জীবন ও পৃথিবীকে দেখিয়েছেন, কতগুলো কোণ
থেকে যে জীবনের ওপর আলো ফেলেছেন তার কোনো হিসেব-নিকেশ নেই। এবং
তাঁর ভাষা_ এ এমন এক সম্পদ যে তাঁর গল্প পাঠের সময় কবিতা পাঠের
আনন্দ হয়, গদ্যভাষাকে তিনি এমনই এক উঁচু পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। একটি
প্রসঙ্গ এখানে তোলা দরকার। বাংলাদেশের শিবির বিভক্ত সাহিত্য সমাজে
হাসানের গল্পের যতটা রাজনৈতিক বিচার হয়েছে, ততোটা সাহিত্যিক
বিশ্লেষণ হয়নি। হলে, তাঁকে কিছুটা বুঝে ওঠা যেতো। এই ক্ষুদ্র
মানুষের দেশে তিনি যে কত বড় মহিরুহ সেটা সাহিত্যের প্রয়োজনেই
বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন ছিলো।
ষাটের দশক : গল্পের বাঁক পরিবর্তন ও গভীর অর্জন
বাংলাদেশের গল্প প্রথমবারের মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য বাঁক পরিবর্তন করে
ষাটের দশকে। সময়টি ছিলো অস্থিরতার, কিন্তু ক্ষেত্র তৈরী হচ্ছিলো
স্থির লক্ষ্য তৈরী করার। কী আমাদের পরিচয় _ এই প্রশ্ন প্রবল হয়ে
দেখা দিয়েছিলো তখন। ততদিনে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রতত্ত্বের মোহ কেটে
গেছে। বাঙালি দাঁড়িয়ে আছে তার আত্নপরিচয়ের প্রশ্ন সামনে নিয়ে। সেই
অর্থে সময়টি নানাদিক থেকে সংকট ও নির্মাণেরও বটে। একদিকে
জাতীয়তাবোধ ও স্বাতন্ত্র্যবোধ নির্মাণের প্রবল প্রচুর প্রক্রিয়া,
অন্যদিকে বাঙালির বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্র। পূর্ববতর্ী অর্থাৎ
পঞ্চাশের লেখকরা যেন কিছুটা হতভম্ব ছিলেন নতুন রাষ্ট্রপ্রাপ্তিতে,
ষাটের লেখকরা অনেক বেশি স্থির হয়ে উঠেছিলেন আত্নপরিচয়ের প্রশ্নে।
সাহিত্যের ভূমিটি তখনো ছিলো কিছুটা নরম-কর্দমাক্ত। বীজক্ষেত্র
কিভাবে নির্মিত হবে সেটি নির্ভর করছিলো লেখকদের ওপরই। আমাদের
সৌভাগ্য এবং এটা মহান শিল্পবোধের একটি ঐতিহ্যও বটে যে, তাঁরা
আত্নপরিচয়ের প্রশ্নে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন, নইলে বাংলাদেশের
সাহিত্য আরও অনেকখানি পিছিয়ে থাকতো।
এই দ্বন্দ্ব ও সংকটমুখর সময়ে ষাটের সাহিত্যকর্মীরা নিয়ে এসেছিলেন
প্রথা ভাঙার তীব্র নেশা, নতুন কিছু নির্মাণের আন্তরিক, উদ্দাম
উচ্ছ্বল প্রচেষ্টা। পূর্ববর্তী লেখকদের ট্র্যাডিশনাল সাহিত্য
চর্চাকে তীব্র কণ্ঠে অস্বীকার করে, তারুণ্যের অহংকারকে
ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট করে দিয়েছিলেন সাহিত্যের সঙ্গেই। এর জন্য
যে দীপ্ত, উজ্জ্বল তরুণ গোষ্ঠী প্রয়োজন ষাটের তা ছিলোও। আবদুল্লাহ
আবু সায়ীদের নেতৃত্বে কণ্ঠস্বর'কে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়েছিলেন
তাঁরা। বাংলাদেশের গল্পের দুই দিকপাল আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও
আব্দুল মান্নান সৈয়দ এলেন এই সময়েই। এর কিছু আগে অবশ্য এসেছেন
হাসান আজিজুল হক। এর একটু পর মাহমুদুল হক। এঁরা সবাই অসামান্য
প্রতিভাধর, জাতশিল্পী। ইলিয়াস, মান্নান সৈয়দ ও মাহমুদুল হকের গল্প
যেন সহজাত, কষ্ট করে এসব গল্প নির্মাণ করতে হয়নি। এক সঙ্গে এত
মেধাদীপ্ত লেখক যে কোনো সাহিত্যেরই উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে নির্দেশ করে।
শুধু এঁরা নন, ষাটের লেখকদের তালিকায় আরও কয়েকজনের নাম শ্রদ্ধা
পেতে পারে _ জ্যেতিপ্রকাশ দত্ত, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, রাহাত খান , আহমদ
ছফা, কায়েস আহমেদ, সুব্রত বড়ুয়া, রশীদ হায়দার, সেলিনা হোসেন,
সাযযাদ কাদির, শহীদুর রহমান প্রমূখ।
লেখালেখির প্রাথমিক পর্বে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প অন্তর্মুখী
আত্নকথনে ভরপুর, কিন্তু অচিরেই নিজেকে বদলে ফেললেন তিনি। তাঁর
প্রকাশিত গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোর মধ্যে নিরুদ্দেশ যাত্রা ছাড়া আর
কোনোটিতেই প্রাথমিক পর্বের নিদর্শন নেই। পরবর্তীকালে তিনি
সমাজ-বাস্তবতার ধ্রুপদি চিত্রকর এবং প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। মানিক
বন্দেপাধ্যায়ের পর এই ধারায় তাঁর মতো এত সূক্ষ্নদর্শী নিপুণ
গল্পশিল্পী বিরল। সমাজের আপাদমস্তক তুলে এনেছেন তিনি। বাস্তবতার
চিত্রণে আপোসহীন, তবু পাঠকের ওপরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেননি,
চরিত্রগুলোর ওপরে অহেতুক আরোপ করেননি বিপ্লবের বোঝা। তাঁর গল্প
পড়লে পাঠকের মনে হতে বাধ্য যে, এই সমাজ ব্যবস্থা, এই জীবন পদ্ধতি
কোনোভাবেই কাম্য নয় _ কিন্তু কোনটি কাম্য ও গ্রহনযোগ্য, সে
সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব তিনি পাঠকের বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দিতে
ভালোবাসেন। তাঁর গল্প এ জন্যই হয়ে ওঠে পাঠকের নিজস্ব সম্পদ এবং
একটি সফল কালজয়ী গল্পের এটিই প্রধান বৈশিষ্ট্য যে সে পাঠকের একান্ত
সঙ্গী হয়ে ওঠে।
আব্দুল মান্নান সৈয়দ সমাজ বাস্তবতার ধারেকাছেও যাননি। তাঁর গল্প
ধ্রুপদি মাত্রা পেয়েছে মানুষের অন্তর্লোক চিত্রায়ণের কুশলী সফলতায়।
মানব মনের বহুবিচিত্র ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সূক্ষ্ন চিত্রণে তার
তুলনা মেলা ভার। জীবন ও পৃথিবীর বহুমাত্রিক রহস্যময়তা ও জটিলতা,
মানুষের অব্যাখ্যাত কার্যকলাপ তাঁর গল্পে স্বমহিমায় তীব্রভাবে
উপস্থিত। এদিক থেকে দেখলে ইলিয়াসের বিপরীত মেরুতে তাঁর অবস্থান।
বস্তুত ইলিয়াস ও মান্নান সৈয়দ গল্প সাহিত্যের দুটো শাখায় নেতৃত্ব
দিয়েছেন আপন যোগ্যতায়। ইলিয়াসের মিলির হাতে স্টেনগান, উৎসব,
নিরুদ্দেশ যাত্রা, যুগলবন্দী প্রভৃতি গল্প যেমন তেমনি মান্নান
সৈয়দের চাবি, মাছ প্রভৃতি গল্প আরও বহুকাল বাংলা গল্পকে গৌরব
দেবে।
এ সময়েরই আরেকজন জাতশিল্পী মাহমুদুল হক। তাঁর খ্যাতি ও সাফল্য
উপন্যাসের পথ বেয়ে এলেও, তাঁর দুটিমাত্র গল্পগ্রন্থ প্রতিদিন একটি
রুমাল ও নির্বাচিত গল্প এবং আরও কিছু অগ্রন্থিত গল্প পাঠকের
স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। মাহমুদুল হক হচ্ছেন সেই রহস্যময লেখকদের
একজন যাঁর প্রতিটি রচনা পাঠককে আলোড়িত করে, যাঁর গ্রন্থপ্রকাশ
মনস্ক পাঠকদের কাছে একটি সুসংবাদ বয়ে আনে। তাঁর রচনার প্রধান
বৈশিষ্ট্যকে আমি চিহ্নিত করেছি এইভাবে _ তাঁর রচনায় এমন কিছু থাকে
যা একবার পড়লে ভুলে যাওয়া অসম্ভব। মাহমুদুল হক খুব বেশি গল্প
লেখেননি তবু তাঁকে ছাড়া আমাদের গল্পের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রতিদিন একটি রুমাল _ এর মতো অসামান্য প্রতীকী ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ
গল্প খুব বেশি লেখা হয়নি বাংলা সাহিত্যে।
ইলিয়াস, মান্নান ও মাহমুদুল হক আরেকটি বিষয়ে কথাশিল্পীদের কাছে
অগ্রগন্য হয়ে থাকবেন _ সেটি হচ্ছে তাঁদের যাদুভাষা। তাঁদের হাতে
বাংলা ভাষাটি যেন মোহনীয় রূপসী তরুণী হয়ে ওঠে, যার আকর্ষণ উপেক্ষা
করা অসম্ভব।
এঁদের নেতৃত্বেই ষাটের দশক উজ্জ্বল সৃষ্টিশীলতায় পূর্ণ হয়ে
উঠেছিলো। এই ধারার একটু বাইরে হলেও রাহাত খান তাঁর নিজের জন্য একটি
স্বতন্ত্র্য স্থান নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তাঁর গল্প সমান দক্ষতায়
গ্রাম ও নগরজীবনকে ধারণ করতে পারে। নাগরিক ঔদাসিন্য ও নিরাসক্তি
যেমন, তেমনি গ্রামীন জীবনের আবহমান ক্ষুধার হাহাকার তিনি সমান
মুন্সিয়ানায় তুলে আনেন। ভালো মন্দের টাকা কিংবা ইমান আলীর মৃতু্যর
মতো গল্প খুব শক্তিশালী লেখক না হলে লেখা সম্ভব নয়। জ্যোতিপ্রকাশ
দত্ত অন্তর্মুখী জীবনচিত্র নির্মাণে সিদ্ধহস্ত কিন্তু তিনি সাধারণ
মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও অবহেলা করেননি তাঁর গল্পে _ রংরাজ ফেরে
না গল্পটির কথা এ প্রসঙ্গে পাঠকের মনে পড়বে নিশ্চয়ই। আহমদ ছফা
শ্রেণীবিভক্ত সমাজচিত্র নির্মাণে দক্ষতা দেখিয়েছেন। সেলিনা হোসেনও
শ্রেণীসচেতন গল্পকার। গ্রামীন জীবনের খুঁটিনাটি তাঁর গল্পে আশ্চর্য
দক্ষতায় উঠে আসে কিন্তু নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনও তিনি খুব ভালো করে
চেনেন _ একথা তাঁর গল্পই বলে দেয়। সুব্রত বড়ুয়া ও সাযযাদ কাদির
মানুষের অন্তর্লোক আবিষ্কারে সাফল্যবিহারী। সাযযাদ তাঁর গল্পে
শরীরছোঁয়া বর্ণনার যে দুঃসাহসিক নিরীক্ষা করেছিলেন_ আজ পর্যন্ত তার
তুলনা খুব সুলভ নয়। রশীদ হায়দারও মনোজগতকেই প্রাধান্য দেন, যদিও
সমাজ ও রাজনীতি তাঁর গল্পে অনায়াসসাধ্য দক্ষতায় রূপায়িত হয়। সব
মিলিয়ে এই দশকেই নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের গল্পের বহুমাত্রিক
গতিমুখ যা উত্তরকালের গল্পশিল্পীদের দ্বিধাহীন গল্পচর্চায় প্রেরণা
যুগিয়েছে।
সত্তর দশক : অদ্ভুত আঁধার এক
সত্তর দশক নিয়ে এসেছিলো এক অভূতপূর্ব ও অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের জন্য। উনসত্তরের গণ-অভু্যত্থানের ও সত্তরের প্রলয়ংকরী
জলোচ্ছ্বাসের দাগ তখনো শুকোয়নি এই দেশ থেকে _ তার মধ্যেই এলো
একাত্তর। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। শতাব্দী শতাব্দীতে এরকম ঘটনা
একবারই ঘটে। সুমহান ত্যাগ ও বীরত্বের গৌরবে ভাস্বর, আকাশ-সমান
স্বপ্ন, অপরিমেয় রক্তপাত ও নারীর সম্ভ্রমহানী, নিরীহ-নিরস্ত্র একটি
জাতির হঠাৎ যোদ্ধা হয়ে ওঠার অভূতপূর্ব ঘটনা, একটি শোষণহীন মানবিক
সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় _ এসব নিয়েই তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।
যে বিশাল স্বপ্ন নিয়ে এই জাতি অংশ নিয়েছিলো যুদ্ধে তা কি পূরণ
হয়েছে? হয়নি তো। মূলত সত্তর ছিলো এক দ্বন্দ্বমুখর বহুবিচিত্র
অভিজ্ঞতার দশক। ত্যাগ ও স্বপ্ন মিলে জাতীয় জীবনে যে আকাঙ্ক্ষা জন্ম
নিয়েছিলো _ স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছর খানেকের মধ্যে শাসককুলের
বর্বরতার ফলে তাতে ধুলো জমতে থাকে। আকাশ সমান স্বপ্ন ও
স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, অন্তসারশূন্য রাজনীতি, বিশৃঙ্খলা, নেতৃত্বের
ব্যর্থতা, শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন দুনর্ীতি ও বর্বরতা, রক্তাক্ত
যুদ্ধজয়ের পরও সুপ্রিয় স্বদেশভূমিতে বিতর্কিত রক্তপাত, হতাশা,
মূল্যবোধের অবক্ষয়, হাহাকার, ক্ষুধা, মানবতার হৃদয়হীন পদদলন,
প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার ধারক বাহকদের ওপর শাসকদের প্রতিহিংসাপরায়ণ
রোষ, একাত্তরের ঘাতকদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা, দুর্ভিক্ষ,
একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক মৃতু্য
ঘোষণা, সর্বোপরি স্বাধীনতা প্রাপ্তির মাত্র চার বছরের মাথায়
স্বাধীনতার প্রধান স্থপতির মর্মান্তিক হত্যাকান্ড _ ইত্যাদি
সংখ্যাহীন নেতিবাচক ঘটনা প্রবল আঘাত হানলো মননশীল মানুষদের মেধা ও
চেতনায়। যে সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বাংলাদেশ যুদ্ধ করতে
বাধ্য হয়েছিলো সেই সামরিক জান্তাই ভিন্ন রূপ নিয়ে দখল করলো এই দেশ।
ক্ষমতার মসনদে সদম্ভ প্রত্যাবর্তন ঘটলো ঘাতকদের। এসব মিলিয়ে সত্তর
ছিলো প্রায় সম্ভাবনাহীন নেতিবাচকতার দশক।
এমন একটি সময়েই বেড়ে উঠছিলেন সত্তরের লেখকরা। কে না স্বীকার করবেন
যে, লেখকরাই সমাজের সবচেয়ে স্পর্শকাতর গোষ্ঠী ; আর তার সঙ্গে যদি
যোগ হয় অসহায় তারুণ্য _ অসহায়, কারণ এসব নেতিবাচকতার বিরুদ্ধে
তাদের করার ছিলো না কিছুই _ তাহলে এসব ঘটনা কতোটা অস্থিরতা ও
বিপন্নতা সৃষ্টি করতে পারে, সেটা বলাই বাহুল্য। সেই সময়ে, সাহিত্য
ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছিলো। ততোদিনে ষাটের লেখকরা
তারুণ্যের অহংকার মুছে স্থির হয়েছেন, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের
পিতৃপুরুষ সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর মৃতু্য ঘটেছে প্রবাসেই, অনেক অগ্রজ
লেখক নানা কারণে প্রবাসী, মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নে ঘটেছে
বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো জঘন্য ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। তবু থেমে থাকে না
কিছুই, কারো জন্য। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে এলো নতুন মুখ, নতুন কলম
_ আতা সরকার, আবু সাইদ জুবেরী, আলমগীর রেজা চৌধুরী, আহমদ বশীর,
ইমদাদুল হক মিলন, ইসহাক খান, জাফর তালুকদার, তাপস মজুমদার, বারেক
আবদুল্লাহ, বুলবুল চৌধুরী, ভাস্কর চৌধুরী, মঈনুল আহসান সাবের,
মঞ্জু সরকার, মনিরা কায়েস, মুস্তাফা পান্না, রেজোয়ান সিদ্দিকি,
সৈয়দ ইকবাল, শাহরিয়ার কবীর, শেখর ইমতিয়াজ, সুশান্ত মজুমদার,
সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়, হরিপদ দত্ত, হুমায়ূন আহমেদ প্রমূখ।
কিন্তু যে বহুবিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এঁদের বেড়ে ওঠা, তার
কতোটুকু ধারণ করতে পেরেছেন তাঁরা, তাঁদের রচনায়? অবশ্য এরকম প্রশ্ন
তোলাটা খুব বেশি বিবেচনাপ্রসূত নয়। একজন লেখক যে সবসময়ই তার লেখায়
সমকালকে ধারণ করবেন এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। সাহিত্য তো
বহুমাত্রিক _ সমকালকে ধারণ করা তার একটি মাত্র উপাদান। সবদিক
বিবেচনা করলে এই সময়ের কয়েকজন লেখকের অর্জন উল্লেখযোগ্যতার দাবী
রাখে; কিন্তু এই সময়েই সাহিত্যক্ষেত্রে যে গুণগত পরিবর্তনের ঘটনা
ঘটে গেছে তার দায়-দায়িত্বও তাঁদের ওপরই বর্তায়। বিশেষ করে হুমায়ুন
আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহিত্যে জনপ্রিয়
সাহিত্যের যে ক্ষতিকর ধারাটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার প্রতিক্রিয়া
বেশ দীর্ঘস্থায়ী হবারই কথা। এই সময়ে অসংখ্য সাহিত্যবোধহীন রচনা
পুুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে, পাঠকের কাছে পৌঁছেও গেছে দ্রুত।
সাহিত্যের পাঠক বাড়ানোর যে ক্রেডিট তাঁদেরকে দেয়া হয়, সেইসব পাঠক
হুমায়ূন বা মিলন ছাড়া আর কিছু পড়েন কিনা সন্দেহ করি। তাহলে আর
সাহিত্যের পাঠক বাড়লো কোথায়? এমনকি তারা হুমায়ূন বা মিলনের উন্নত
শিল্পমূল্য সম্পন্ন লেখাগুলো পড়েন কি না এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ
রয়েছে। এই দুই লেখকের পাঠকরা তাদের প্রিয় লেখকদের উন্নত রচনাগুলো
যদি একটু উল্টেপাল্টে দেখতেন তাহলে নিঃসন্দেহে তাদের
সাহিত্যসংক্রান্ত ধারণাগুলো কিছুটা হলেও পাল্টে যেতো। কথাটি মিলনের
প্রসঙ্গেই বেশি মাত্রায় প্রযোজ্য।
ইমদাদুল হক মিলন ঠিক কতগুলো জনপ্রিয় উপন্যাস লিখেছেন সেটা হয়ত তিনি
নিজেও ঠিক জানেন না। অথচ তারই শ্রেষ্ঠ গল্প গ্রন্থভূক্ত গল্পগুলো
পড়লে বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করতে হয় যে, তাঁর হওয়ার কথা ছিলো একজন
সফল গল্পকার। মিলন ওই 'জনপ্রিয় উপন্যাস' গুলো না লিখে যদি
শুধুমাত্র এই গল্পগুলোই লিখতেন, তাঁকে হয়ত মর্যাদা দেয়া হতো একজন
প্রধান গল্পকারের। তাঁর গল্পকার পরিচিতিটি তেমন গড়ে ওঠেনি, অথচ
তাঁর সমাজ ও জীবন অবলোকনের দৃষ্টিভঙ্গি, নানা ধরনের চরিত্র
চিত্রণের দক্ষতা, তাঁর ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি ঈর্ষনীয় সাফল্যের
দাবিদার; অর্থাৎ একজন সফল ও গুরুত্বপূর্ণ লেখকের যাবতীয় প্রয়োজনীয়
বৈশিষ্ট্যই তাঁর করতলগত। গ্রামীন জীবন নিয়ে তিনি লিখেছেন অসামান্য
কিছু গল্প। গাহে অচিন পাখি তো ইতিমধ্যেই কালজয়ী মাত্রা অর্জন
করেছে। বদ্যি বুড়োর জীবনকথা, নিরন্নের কাল, নেতা যে রাতে নিহত
হলেন, রাজার চিঠি'র মতো অসাধারণ সব গল্পের নির্মাতা তিনি। জোয়ারের
দিন _এর মতো অসামান্য প্রতীকী গল্পও খুব বেশি লেখা হয়নি বাংলাদেশে।
হুমায়ূন আহমেদের সাফল্য অবশ্য এতোটা নয়। তবে উপন্যাসের চেয়ে গল্পে
তিনি অধিক মনোযোগী ও শিল্প সচেতন। তাঁর রয়েছে নানান ধরনের গল্প
লেখার অভিজ্ঞতা _ অদ্ভুত গল্প, ভৌতিক গল্প ইত্যাদি শিরোনাম দিয়ে
তিনি যে গল্পগুলো লিখেছেন, বাংলাদেশের গল্প সাহিত্যে তা পুরোপুরি
নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুধুু এগুলোই নয় _ মধ্যবিত্ত জীবন নিয়েও
তাঁর রয়েছে চমৎকার কিছু গল্প। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের স্পর্শকাতর
বিন্দুগুলো হুমায়ূনের মতো এত ভালো করে আর কেউ চেনেননি। এইখানটায়
আমি শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর মিল খুঁজে পাই। শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বড়
গুণ হলো _ তিনি বাঙালি জাতির আবেগপ্রধান স্পর্শকাতর বিন্দুগুলোকে
চিনতেন, জানতেন ঠিক কোন বিন্দুতে টোকা দিলে বাঙালি কাঁদে
(শরৎচন্দ্রের কোনো না কোনো লেখা পড়ে কাঁদেননি এমন বাঙালি পাঠক
খুঁজে পাওয়া যাবে কী না সন্দেহ করি); একটি জাতির আবেগ-বিন্দু চিনে
ফেলাটা অসামান্য প্রতিভার পরিচয় বহন করে, শরৎচন্দ্রের তা ছিলো।
হুমায়ূন আহমেদ অতখানি না হলেও বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের হাসি-কান্নার
বিন্দুগুলো চেনেন, অনায়াসসাধ্য দক্ষতায় তিনি তাঁর পাঠক-দর্শকদের
হাসিয়ে কাঁদিয়ে চলেছেন।
এই সময়ের সবচেয়ে সফল ও গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার মঈনুল আহসান সাবের।
মাঝে কিছুদিন জনপ্রিয় সাহিত্যের প্রতি আনুগত্যের ফলে তাঁর গায়েও
জনপ্রিয়তার সিলটি বেশ ভালোভাবেই পড়েছে, যদিও তাঁকে কখনোই পুরোপুরি
এই ধারার লেখক হিসেবে মনে হয়নি আমার। অবশ্য তার গল্পকার পরিচিতিটি
উপেক্ষা পেয়েছে অনেকগুলো উপন্যাস রচনার কারণে, তবু মনোযোগী পাঠক
জানেন, বাংলা গল্পের দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় এত সফলভাবে, এত
সূক্ষ্নভাবে আর কেউ নাগরিক জীবনকে তুলে আনতে পারেননি, তাঁর মতো।
সাবেরই এ সময়ের সবচেয়ে বহুমাত্রিক গল্পকার। জীবন ও পৃথিবীর
চেনা-অচেনা কোণগুলোতে তিনি অবিরাম আলো ফেলে যাচ্ছেন। রচনা করেছেন
এমন কিছু গল্প যা নিয়ে গৌরব করা চলে। মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের
সংকট ও স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থতা ও ক্লান্তি ও অবসাদ তাঁর
গল্পেই সর্বাধিক কুশলতায় ধরা পড়েছে। বৃত্ত'র মতো খুব বেশি গল্প
লেখা হয়নি আমাদের সাহিত্যে। লাফ,জীবনযাপন, পুলিশ আসবে'র মতো
জীবনবোধ সম্পন্ন গল্প; মৃদু নীল আলো, আশ্চর্য প্রদীপ-এর মতো
প্রতীকী ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার গল্প; মুখোশ,
গ্রাস-এর মতো হুমকিগ্রস্থ্থ নাগরিক জীবনের গল্প বিশেষ
উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে। নাগরিক মানুষের অবসাদ ও ক্লান্তি নিয়ে,
সেই সঙ্গে এর থেকে মুক্তির জন্য তাদের কার্যকলাপ নিয়ে তিনি
আসামান্য কিছু গল্প লিখেছেন। অবসাদ ও আড়মোড়ার গল্প সব অর্থেই বাংলা
সাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন। শুধু অবসাদ ও আড়মোড়ার গল্পই নয়, আরো
কিছু সিরিজ গল্প রচনায় অসামান্য সাফল্য দেখিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে
স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে উপরোক্তটি ছাড়াও তাঁর
সীমাবদ্ধ, রেল স্টেশনে শোনা গল্প এবং ব্যক্তিগত_ গ্রন্থগুলোর কথা
পাঠকের মনে পড়বে _ এ ধরনের গল্প পাঠের অভিজ্ঞতা দুই বাংলার কোনো
পাঠকেরই এর আগে হয়নি।
সত্তরের সবচেয়ে সিরিয়াস গল্পকার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন হরিপদ
দত্ত, বুলবুল চৌধুরী ও মঞ্জু সরকার। বুলবুল চৌধুরীর গল্প পড়ে মনে
হয় _ আমাদের গ্রামগুলোকে তিনি খুব ভালো চেনেন। টুকা কাহিনী'র কথা
কার না মনে আছে? অল্প কথায় একটি জীবনের সচল বর্ণনা তাঁর গল্পে
চমৎকার কুশলতায় নির্মিত হয়।
হরিপদ দত্ত এবং মঞ্জু সরকার দুজনেই শ্রেনীসচেতন গল্পকার। এই সময়ে
এই দুজনইএই ধারাটিকে সবচেয়ে সফলভাবে ধারণ করতে পেরেছেন।
আরেকজন রাজনীতি সচেতন গল্পকার শেখর ইমতিয়াজও এই সময়েরই লেখক। তাঁর
মতো রাজনীতিবোধের তীব্রতা তাঁর আগে বা পরে সাইয়ীদ আতীকুল্লাহ ছাড়া
আর কারও মধ্যে দেখা যায় না। রাজনীতি সচেতনতার সঙ্গে প্রতীকময়তার
চমৎকার মেলবন্ধনে যে গল্প নির্মাণ করেন তিনি _ পাঠককে তা গভীরভাবে
ছুঁয়ে যায়। তাঁর অগি্ননৃত্যে এইসব মানুষ এবং বিধি নেই অনড় বিধিলিপি
গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলো তার প্রমাণ।
সুশান্ত মজুমদার এই সময়ের সবচেয়ে ফর্ম সচেতন ও ভাষা সচেতন গল্পকার।
রাজনীতি-সচেনতার পরিচয় মেলে তাঁর গল্পেও। তার ছেঁড়া খোড়া জমি আর
রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও _ এর কথা হয়তো অনেকের মনে পড়বে। চমৎকার সব
গল্পের নির্মাতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পরিচিতি গড়ে উঠেছে প্রধানত
সমালোচক হিসেবেই, যদিও তাঁকে সেক্ষেত্রে খুব একটা সফল মনে হয় না
আমার।
মনিরা কায়েস অজ্ঞাত কারণে অনেকদিন প্রায় লেখেনইনি। ইদানিং তাঁর
প্রত্যাবর্তন হয়ত অনেকের মনোযোগী দৃষ্টি কেড়েছে। শেকড় খুঁজে ফেরা
এই লেখক একই সঙ্গে সমকাল ও চিরন্তনকে ধারণ করেন। মাটি পুরাণ পালা'র
কথা এক্ষেত্রে কার না মনে পড়বে?
দীর্ঘ নিস্ক্রিয়তার অভিযোগ অবশ্য শুধু মনিরার বিরুদ্ধেই নয়, উঠবে
এই দশকের আরও অনেকের বিরুদ্ধেই। আতা সরকার বিপজ্জনক খেলা সম্বন্ধে
রিপোর্ট _ এর পরে নিস্ক্রিয় হয়ে গেলেন, আবু সাইদ জুবেরীর সেই
সম্ভাবনাময় লেখনি চোখে পড়ে না বহুদিন, আহমদ বশিরই বা কোথায় হারিয়ে
গেলেন? ইসহাক খান, জাফর তালুকদার, তাপস মজুমদার, মুস্তাফা পান্নাও
বিরলপ্রজ। বারেক আবদুল্লাহ পরলোকে, শাহরিয়ার কবীর শিশুসাহিত্য আর
রাজনীতিতে মগ্ন, রেজোয়ান সিদ্দিকীও এখন নিস্ক্রিয়, সুকান্ত
চট্টোপাধ্যায় কলকাতায় অভিবাসী।
এই নাকি সত্তরের চেহারা? তাঁদের বিচার-বিবেচনার জন্য এটা খুব
নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হবে। তাঁদের সম্মিলিত অর্জনকে অস্বীকার করার
উপায় নেই _ কিন্তু তাঁদের বড় ব্যর্থতা, গল্পকার পরিচিতিটাকে তাঁরা
কেউই খুব বড় করে তুলতে পারেননি।
আশির দশক ও পরবর্তী প্রজন্ম : নতুন সুর ও স্বর
ষাটের গল্পকারদের তুমল সক্রিয়তার ফলে গল্পের গতিমুখ নির্ণিত হয়ে
যাওয়ার পরও সত্তরের অদ্ভুত অাঁধার ও জনপ্রিয় সাহিত্যের ডামাডোলে
কিংবা লেখকদের গল্পকার পরিচয়টি ম্রিয়মাণ হয়ে যাওয়ার ফলে স্পর্শকাতর
গল্প মাধ্যমটি ঘোর দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আশির দশকে যাঁরা এলেন,
প্রথমেই তাঁদের প্রয়োজন হয়ে পড়লো এই নষ্ট স্রোতের বিরুদ্ধে
তারুণ্যের দ্রোহী চেতনা নিয়ে দাঁড়াবার। আর একথা তো এখন কারোরই
অজানা নয় যে, দ্রোহী তারুণ্যকে একমাত্র লিটল ম্যাগাজিনই ধারণ করতে
পারে। দেশের দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী ও
সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক ম্যাগাজিনগুলো যখন পাঠক মনোরঞ্জনে ব্যস্ত,
জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যকে যাবতীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়-প্রেরণা দেয়ার জন্য
প্রতিযোগিতায় লিপ্ত তখন অনেকটা নিঃশব্দেই লিটল ম্যাগাজিনগুলো আশ্রয়
দিয়েছে তরুণ লেখকদের। সম্ভবত এ কারণেই ষাটের পর আশিতে এসে লিটল
ম্যাগাজিন আন্দোলন আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
সাহিত্যের মতো সমাজ ও জাতীয় জীবনেও তখন অদ্ভুত এক অাঁধার নেমেছে।
অমানবিক সামরিক শাষণ চেপে বসেছে বাংলাদেশের বুকের ওপর। হতাশা ও
নৈরাজ্য বেড়ে চলেছে প্রতিদিন। সামরিক সরকারের কূটচালে দুর্নীতি
যেমন সর্বগ্রাসী রূপে চেপে বসেছে বাংলাদেশে, সাহিত্যভুবনেও পড়েছে
তার প্রভাব। সাহিত্যিকরা শিবির বিভক্ত। একদল বঙ্গভবনে, অন্যদল
রাজপথে, কবিতা শ্লোগান মুখর, কথাসাহিত্যকে পিঠে করে বয়ে নিয়ে যেতে
চাচ্ছে 'জনপ্রিয়তা' নামক এক উদ্ভট উট।
এরকম একটি ক্রান্তিকালে আগমন ঘটেছিল আশির লেখকদের। গল্পকে তার
হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়ার প্রশ্নে তাদের আন্তরিকতার কোনো কমতি
ছিলো না। আর এই গুরুদায়িত্ব প্রায় অযাচিতভাবে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন
কতিপয় মেধাবী তরুণ- আশোক কর, ইমতিয়ার শামিম, ওয়াসী আহমেদ, ওয়াহিদ
রেজা, কাজল শাহনেওয়াজ, জাহিদুর রহিম, ঝর্ণা রহমান, তপন বড়ুযা,
তারেক শাহরিযার, দেবাশিষ ভট্টাচার্য, নাসরিন জাহান, পারভেজ হোসেন,
প্রলয় দেব, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, মহীবুল আজিজ, মাখরাজ খান, মামুন
হুসাইন, মুসা কামাল মিহির, শহীদুল আলম, শহীদুল জহির, সামসুল কবির,
সঞ্জীব চৌধুরী, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, সেলিম মোরশেদ, সৈয়দ
রিয়াজুর রশীদ, হামিদ কায়সার, হুমায়ুন মালিক প্রমূখ।
আশির লেখদের গল্প নিয়ে মন্তব্য করাটা একটু কঠিন। এদের অনেকেই এখন
একেবারেই লিখছেন না, অনেকেরই আবার কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি।
কিংবা দু-একটি হলেও তা ইতিমধ্যেই দুসপ্রাপ্য হয়ে উঠেছে।
পত্র-পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনগুলো থেকে তাঁদের গল্প উদ্ধার করা
প্রায় অসম্ভব বিষয়। তাছাড়া দু-একটি গল্প পড়ে কারও সম্বন্ধে মন্তব্য
করাটা খুব বিবেচনা প্রসূত নয়। তবুও মোটা দাগে তাদের দু-একটি
বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
আশির গল্পকারদের প্রধান বৈশিষ্ট্য এঁদের নিরীক্ষা প্রবণতা। সম্ভবত
নতুন কিছু সৃষ্টির নেশায় এ সময়ের গল্প-শিল্পীরা নিরীক্ষার দিকে
ঝুঁকে পড়েছিলেন। কী বিষয়ে, কী আঙ্গিকে, কী ভাষায় তাঁরা অচিরেই
নির্মাণ করেছিলেন স্বতন্ত্র্য একটি গল্পের ভূবন _ পূর্বের
গল্প-ঐতিহ্য থেকে যা বেশ খানিকটা আলাদা। ট্র্যাডিশনাল গল্প-চর্চাও
যে হয়নি তা নয়, বরং যা হয়েছে তার সংখ্যা বা শিল্পমূল্যও মনোযোগ
দাবী করার যোগ্যতা রাখে কিন্তু প্রধান সারিতে ছিলেন ওই
নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পকাররাই। 'ছিলেন' বলছি, কারণ তারা অনেকেই এখন
দীর্ঘস্থায়ী নিস্ক্রিয়তায আক্রান্ত। ফলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আশির
সম্মিলিত কণ্ঠস্বরটি ভীষণ ম্রিয়মাণ বলে মনে হচ্ছে।
এ সময়ের ভাষা সচেতন ও নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পকার সেলিম মোরশেদ, সামসুল
কবীর ও কাজল শাহনেওয়াজের গল্প তো বহুদিন ধরেই চোখে পড়ছে না
(সমপ্রতি প্রকাশিত সেলিম মোরশেদের নির্বাচিত গল্প বেরুনোর আগ
পর্যন্ত এক যুগ আগে প্রকাশিত এবং দুসপ্রাপ্য হয়ে ওঠা কাটা সাপের
মুণ্ডুই ছিলো তাঁর একমাত্র গল্পগ্রন্থ)। অথচ তাঁদের সক্রিয়তার সময়ে
পাঠককে চমকে দিয়েছিলেন তাঁরা। সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ ও মাখরাজ খানের
বিস্ময় জাগানিয়া নিরীক্ষা নিশ্চয়ই পাঠকরা ভুলে যাননি। মনে পড়ছে
রিয়াজের আগুনের বিপদ আপদ আর সাদা কাহিনী'র কথা। কী আসাধারণ
কুশলতায়ই না তিনি নির্মাণ করেছিলেন গল্পের শরীর, আঙ্গিকে এনেছিলেন
বিচিত্র সব নিরীক্ষাপ্রবণতা। মনে পড়ছে মাখরাজের বিজ্ঞাপন ও মানুষের
গল্প'র কথাও। তাঁরও ছিলো চমকে দেয়ার মতো নিরীক্ষা। মূলত লিটল
ম্যাগাজিনের লেখক তাঁরা, ফলে সাধারণ পাঠকদের কাছে পেঁৗছতে পারেননি
যেমন, তেমনই নিয়মিত লেখালেখি থেকে দূরেও থেকেছেন কিছুদিন; হয়ত লিটল
ম্যাগাজিনের স্বল্পতা এর একটি বড় কারণ। শহীদুল আলম এবং পারভেজ
হোসেনও অনেকদিন ধরে নিস্ক্রিয়। শহীদ এই সময়ের অন্যতম শক্তিশালী
গল্পকার _ একমাত্র গল্পগ্রন্থ ঘুনপোকার সিংহাসন দিয়েই তিনি পাঠকের
মনোযোগী দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। পারভেজ হোসেনের গল্প বেশ
কমিউনিকেটিভ, তিনি খুব বেশি নিরীক্ষার দিকে যাননি, এক নিরাসক্ত
গদ্যে দিয়ে তিনি মানুষের ক্ষয় ও বেদনার গল্প বলে গেছেন।
অন্যদিকে এ সময়ের সবচেয়ে ব্যস্ত লেখক নাসরীন জাহান। বলা যেতে পারে
তিনিই এখন পর্যন্ত নিরন্তর সক্রিয় রেখেছেন নিজেকে। অবশ্য তাঁর
ব্যস্ততা শুধু গল্প নিয়ে নয়, প্রধানত উপন্যাসকে ঘিরেই, তবু তাঁর
রয়েছে প্রচুর ও বহুমাত্রিক গল্প লেখার প্রবণতা। নাসরীনকে ব্যাখ্যা
করা একটু মুশকিল। হঠাৎ করেই খ্যাতির শিখরে উঠে গেছেন তিনি _ মূলত
উপন্যাসের জন্যই _ কিন্তু তার ভাষাটাকে একঘেঁয়ে, পৌনঃপুনিক ও
বিশেষণের অদ্ভুত প্রয়োগের প্রবল-প্রচুর প্রবণতায় আক্রান্ত বলে মনে
হয় আমার।
শুধু গল্পের কথা উঠলে এ সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী গল্পকার কারা, এ
প্রশ্ন উঠতে পারে। অবশ্য সরলভাবে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া দুরূহ,
কিন্তু সব মিলিয়ে তিনজন লেখকের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে- ওয়াসি
আহমেদ, মামুন হুসাইন ও শহীদুল জহীর।
ওয়াসি আহমেদ আশির নিরীক্ষাবাদীদের দলে ছিলেন না। খানিকটা
ট্র্যাডিশনাল গল্প-চচর্াই করেছেন তিনি। কিন্তু নব্বইয়ের শেষ দিকে
এসে মনে হচ্ছে _ তাঁর সাফল্য আরও অনেক ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর বীজমন্ত্র
গল্পগ্রন্থটির কথা মনে পড়ছে। গল্পের বুননে, ভাষায়, প্রতীকী আবহ
নির্মাণে, সর্বোপরি পাঠকের কাছে একটি 'গল্প' বলার ছলে তার
কাঙ্ক্ষিত মেসেজটি পেঁৗছে দেয়ার কুশলী স্টাইলে তাকে এ সময়ের এক
ব্যাতিক্রমী গল্পশিল্পী বলে মনে হয়।
শহীদুল জহীর লেখেন অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মের গল্প। তাঁরও রয়েছে এক
কুশলী বর্ণনা ও গল্প-নির্মাণ পদ্ধতি। তাঁর গল্প টেনে নিয়ে যায় এর
ভাষা ও বর্ণনার গুনে; শেষ করে বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে কিন্তু এক
ধরনের ভালো লাগার আবেশ ছড়িয়ে পড়ে পাঠ শেষে, আর বুঝে উঠতে পারলে
ভালো লাগাটা বেড়ে যায়।
মামুন হুসাইনও অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মটি পছন্দ করেন বলে মনে হয়। তাঁর
গল্প মুহূর্তে মুহূর্তে
স্বপ্ন-কল্পনা-বাস্তবতা-ঘোরগ্রস্ততা-বিমূর্ততায় ঘুরে বেড়ায়। পাঠক
মেধাবী না হলে তাঁর গল্পের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হবেন
হয়তোবা, কিন্তু এর স্বপ্ন-কল্পনা-বাস্তবতার মিলিত জগত দখল করে
রাখবে দীর্ঘক্ষণ। মামুনের শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি এবং মানুষের
মৃতু্য হলে'র কথা মনে পড়ে। এক চমৎকার কুশলতায় তিনি নির্মাণ
করেছিলেন তাঁর গল্পের আশ্চর্য এক একটি ভুবন।
ওয়াসি, শহীদুল ও মামুন তিনজনই ইতিমধ্যে অর্জন করেছেন নিজস্ব ভাষা ও
বর্ণনাভঙ্গি। তারা গল্প-চর্চায় নিয়মিত হলে আমাদের গল্প মাধ্যমটি
ঘোর দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থাটি আরও কিছুটা কাটিয়ে উঠবে বলে আশা করা
যায়।
এ সময়ের আরও তিনজন গল্পকারের কথা একটু বিশেষভাবে না বললে তাঁদের
প্রতি অবিচার করা হবে। এরা হচ্ছেন ইমতিয়ার শামীম, হামিদ কায়সার,
হুমায়ুন মালিক।
ইমতিয়ার তার নিয়মিত গল্পচর্চা দিয়ে পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছেন
ইতিমধ্যেই। তারও রয়েছে একটি নিজস্ব ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি; তবে তাঁর
ভাষাটি প্রায়ই মনোটোনাস অনুভূতির সৃষ্টি করে। তিনি লেখেন বাস্তবতার
গল্প। চারপাশের মানুষ ও জীবন তাঁর গল্পে আকর্ষণীয় বর্ণনায় চিত্রিত
হয়। ইমতিয়ারের শীত ঘুমে এক জীবন কিংবা গ্রামায়নের ইতিকথা নিশ্চয়ই
পাঠকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে এখনো!
হামিদ কায়সার লিখেছেন সমাজের নানারকম মানুষ নিয়ে। অন্তজ শ্রেনীর
জীবনকে তিনি বেশ ভালোভাবে চেনেন বলে মনে হয়, সেই তুলনায় মধ্য বা
উচ্চবিত্তের জীবন তাঁর কলমে অতোটা সফলভাবে চিত্রিত হতে পারে না।
নানা শ্রেণী পেশার মানুষ নিয়ে কাজ করা এই সমাজ সচেতন গল্পকারটিও
ইতিমধ্যে পাঠকের মনোযোগী দৃষ্টি কেড়েছেন। তাঁর একমাত্র গল্পগ্রন্থ
কলকব্জার মানুষ _ এর কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়।
হুমাযুন মালিকও প্রচুর গল্প লিখেছেন। বরাবরই সিরিয়াস গল্পের লেখক
তিনি। জীবন ও পৃথিবী, সমাজ ও মানুষের নানাবিধ
অসঙ্গতি-অনাচার-দুরবস্থা-দুর্বিপাক তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে
বরাবরই গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। ভাষার তীক্ষ্নতা ও বিষয়ের বিভিন্নতা
তাঁর আরাধ্য, যদিও তাঁর ভাষাটি দুস্পাচ্য বলে মনে হতে পারে অনেকের
কাছে।
ইমতিয়ার, হামিদ ও হুমায়ুনও ছিলেন আশির নিরীক্ষাবাদীদের বাইরে।
তাঁরা যেন দাঁড়িয়েছিলেন আশির স্রোতের বাইরে, আবার সত্তরের স্রোতের
বিরুদ্ধে। বলা যেতে পারে এই সময়ের নিঃসঙ্গ যাত্রী তাঁরা। আশির
অনেকেই অবশ্য সম্ভাবনার পরিচয় দিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে কেন আর
লিখলেন না বা নিস্ক্রিয হয়ে গেলেন বোঝা যায় না। সামসুল কবির,
সঞ্জীব চৌধুরী অনেকদিন ধরেই নিস্ক্রিয়, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ
অনিয়মিত। এদের অসাধারণ সম্ভাবনা _ অতি অল্প সময়ে যা পরিস্ফুটিত হয়ে
উঠেছিলো, এখন একেবারেই ম্রিয়মাণ হয়ে আছে।
এসময়ের আরও কয়েকজন গল্পকারের কথা না বললে সত্যের অপলাপ করা হবে।
আন্দালিব রাশদী, আবদুল আউয়াল চৌধুরী, আহমাদ কামরুল মীজান, ইশতিয়াক
আলম, জাহিদ নেওয়াজ, মনীষ রায়, মনি হায়দার, মাহবুব রেজা, মোস্তফা
হোসেইন, মুজতাহিদ ফারুকী, রাশেদ উন নবী, শরীফ খান, শহীদ খান, শাহ
নিসতার জাহান, স্বপ্না রেজা, সারওয়ার-উল-ইসলাম, সিরাজুল ইমলাম
মুনির, হাসান জাহিদ প্রমুখ। এঁদের অনেকেই পুরোপুরি নিস্ক্রিয হয়ে
গেছেন। যারা সক্রিয় তাঁরাও গল্পকার পরিচয়টি প্রধান করে তুলতে
ব্যর্থ হয়েছে। আন্দালিব রাশদী বুড়ো আঙুলের উপাখ্যান লিখে হৈ চৈ
ফেলে দিয়েছিলেন, মাহবুব মোতানাব্বী'র পরিশীলিত ও গতিশীল গদ্য তাঁর
সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল _ অনেকদিন তাঁদের লেখা চোখে পড়ে
না। শহীদ খান, শরীফ খান,আহমাদ কামরুল মীজান, মনি হায়দারের নিয়মিত
পদচারণা ছিল একসময়। মনি ইঁদুর মডেল নামে একটি চমৎকার গল্প
লিখেছিলেন, তারপর প্রথম গ্রন্থ হিসেবে একটি নিম্নমানের উপন্যাস
প্রকাশ করে গল্পকারদের দল থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেলেন। মোস্তফা হোসেইন
আপাতত কিশোর সাহিত্যে নিমগ্ন। এভাবেই এই দলটি খানিকটা পিছিযে পড়া
অংশে তালিকাবদ্ধ হলেন।
সব মিলিয়ে আশির চেহারাটি আসলে কি রকম? যে নিরীক্ষা নিয়ে শুরু
করেছিলেন তরুণ লেখকরা; বদলে দিতে চাইছিলেন গল্পের খোলনলচে; ভাষায়,
অঙ্গিকে, বর্ণনাভঙ্গিতে আনতে চাইছিলেন দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন;
কতটুকু কি হলো তার? সত্যের খাতিরে বলতে হয় _ যাঁরা এসব
নিরীক্ষা-পরীক্ষায় অধিক মনোযোগী ছিলেন তাঁদের অধিকাংশই এখন নিস্পৃহ
ও নিস্ক্রিয়। অবশ্য এসব নিরীক্ষার প্রভাব কমবেশি পড়েছিলো অন্যান্য
লেখকদের ওপরেও। যাঁরা মোটামুটি ট্র্যাডিশনাল ধারায় গল্প রচনার
মনোযোগী ছিলেন, তাঁদের গল্পগুলোকে এখন আর ট্র্যাডিশনাল বলা যাচ্ছে
না, পূর্ববর্তী অগ্রজদের গল্প থেকে এগুলো নানা দিক থেকেই _ ভাষায়,
বিষয়ে, প্রকরণে, নির্মাণ শৈলীতে _ আলাদা ও ব্যতিক্রমী
বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। মূলত ওই দ্বিতীয় দলই _ নিরীক্ষা থেকে একটু দূরে
থেকে যাঁরা গল্প চর্চায় মনোযোগী ছিলেন _ এখন আশির প্রধান
গল্পকারদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন।
নিরীক্ষাবাদীদের পরিণতি কি শেষ পর্যন্ত নিস্ক্রিয়তা? এরকম করে
ভাবতে ভালো লাগে না। একটি ভালো গল্প লেখার জন্য একজন লেখকের ভেতরে
কতোটা যে রক্তক্ষরণ ঘটে যায়, লেখক মাত্রই তা বোঝেন। তিনি যদি হন
তরুণ লেখক, আর তাঁর যদি থাকে নতুন কিছু সৃষ্টির নেশা _ আমি আমার
কথাটি বলতে চাই কিন্তু সবার মতো করে নয়, একটু অন্যভাবে _ তাহলে
তাঁর রক্তক্ষরণটা হয় সম্ভবত অনেক বেশি। এসব নিরীক্ষার ভেতরে আছে
একজন তরুণের রক্তক্ষরণ, এটাকে ব্যর্থ বলে ভাবতে খারাপ লাগে। আমাদের
নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পকাররা কি সক্রিয় হবেন আবার?
নব্বই-এর লেখকরা যখন লিখতে শুরু করলেন তখন আশির লেখকদের তুমুল
সক্রিয়তার কাল চলছে, শুধু আশিরই বলি কেন, পূর্ববর্তী সব দশকের
লেখকরাই কমবেশি সক্রিয়। নবীন লেখকদের পায়ের নিচে দাঁড়াবার মাটিটি
ততদিনে শক্ত হয়ে উঠেছে। পূর্বসুরিদের সকল অর্জন স্বীকার করে নিয়েই
৯০-এর গল্পকার হিসেবে আগমন ঘটলো- অদিতি ফাল্গুনী, আকমল হোসেন নিপু,
আকিমুন রহমান, আদিত্য কবির, আনোয়ার শাহাদাত, আবু জাফর রাজীব, আহমাদ
মোস্তফা কামাল, আহসান ইকবাল, কামরুল হুদা পথিক, খোকন কায়সার, চঞ্চল
আশরাফ, জহির হাসান, জাকির তালুকদার, জামশেদ বাবুন্টু, জিয়া হাশান,
জিয়াউদ্দিন শিহাব, নজরুল কবীর, নাসিমা সেলিম, নাফিজ আশরাফ, পাপড়ি
রহমান, প্রশান্ত মৃধা, ফয়জুল ইসলাম, ব্রাত্য রাইসু, মশিউল আলম,
মামুন সিদ্দিকি, মাসুদুল হক, মাসুমুল আলম, মাহবুব মোর্শেদ,
মোহাম্মদ হোসেন, মির্জা তাহের জামিল, শামীম কবীর, শাহাদুজ্জামান,
শাহীন আখতার, শাহনাজ মুন্নী, শহিদুল ইসলাম, শিবব্রত বর্মন, শিমুল
মাহমুদ, সরকার আশরাফ, সরকার মাসুদ, সাদ কামালী, সালাম সালেহউদ্দিন,
সুমন লাহিড়ী, সেলিম মোজাহার, ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ, রনি আহম্মেদ,
রবিউল করিম, রাজা সহিদুল আসলাম, রোকন রহমান, রাজীব নূর, রাখাল
রাহা, রায়হান রাইন প্রমূখের (এই তালিকা আরো অনেক দীর্ঘ হতে পারে,
ঠিক কতজন লেখক এই সময়ে লিখতে এসেছিলেন তার তালিকা করা কঠিন কাজ,
তবে সংখ্যাটি ৭০/৭৫ ছাড়িয়ে যাওয়াটা অসম্ভব নয়। এই সংখ্যার একটি
গুরুত্বও আছে। বহুসংখ্যক তরুণ যে এই সময়ে গল্পচর্চায় আগ্রহী হয়ে
উঠেছিলেন এই সংখ্যাটি তার প্রমাণ দেয়)।
এতগুলো নাম দেখে পাঠক ভড়কে যেতে পারেন, কিংবা গল্প নিয়ে খুব
আশান্বিত হতে পারেন, যে, এতজন তরুণ যখন এসেছেন গল্পচর্চায় _ গল্পের
দুর্দশা নিশ্চয়ই কেটে যাবে। প্রকৃত চিত্রটি এত সুন্দর নয়। সততার
খাতিরে নামগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, এই সময়ে এদের গল্পচর্চা _ অল্প
হোক, বেশি হোক _ চোখে পড়েছে, কিন্তু এও ঠিক ১৫/১৬ জন ছাড়া এঁদের
প্রায় সবাই ইতিমধ্যেই লেখা থামিয়ে দিয়েছেন। হয়ত একটি-দুটি গল্প
লিখে খুব প্রত্যাশা জন্ম দিয়েছিলেন কেউ কেউ, কিন্তু তাঁরাই গত দশ
বছরে একটি গল্পও লেখেননি। এঁদের সম্বন্ধে আর কি বলা যায়? এই
প্রবন্ধের রচয়িতা নিজেও এই সময়ের একজন লেখক, নিজের সময়টিকে
বিশ্লেষণ করা খুব কঠিন কাজ _ এ কথা নিশ্চয়ই সবাই জানেন! নব্বইতে যে
কোনো কারণেই হোক না কেন, গল্পকাররা পরস্পর থেকে মোটামুটি
বিচ্ছিন্ন। মিলেমিশে কিছু একটা করা তো দূরের কথা, পারস্পরিক
যোগাযোগটাও অনেক ক্ষেত্রে নেই।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অন্যান্য দশকের তুলনায় এই সময়ের
লেখকরা কিছুটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছেন। সাহিত্যচর্চা হয়ে পড়েছে
পুরোপুরি দৈনিক পত্রিকা নির্ভর। সাহিত্য সম্পাদকদের বেঁধে দেয়া ছকে
ও মাপে কি আর গল্প হয়! তারপরও আছে মিডিয়ার উৎপাত, ছোট লেখককে বড়
করে দেখানোর প্রবণতা, গল্পগ্রন্থ প্রকাশে প্রকাশকদের সীমাহীন
অনীহা; প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ভুল সূত্র (ফলে দেখা যায় 'প্রতিষ্ঠান
বিরোধী' উচ্চকণ্ঠ তরুণটি বাঙলা একাডেমি 'তরুণ লেখক প্রকল্পে'
অংশগ্রহণ করছে সানন্দে, বই প্রকাশ করছে, বিলিও করছে নিজ দায়িত্বে _
যেন ওটা কোনো প্রতিষ্ঠান নয়! কী অদ্ভুত বৈপরীত্য!) আগেই বলেছি,
নব্বুইয়ের কোনো সম্মিলিত কণ্ঠস্বর এখনো তৈরী হয়নি। আগের প্রজন্মের
মতোই এ সময়ের গল্পকাররা বিভিন্ন ধারার গল্প লেখার চেষ্টা করেছেন _
কেউ অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মে, কেউ রিয়্যারিস্টিক ধারায়, কেউ বা আবার এ
দুয়ের সম্মিলন ঘটাতে চেয়েছেন।
ব্রাত্য রাইসু, রনি আহম্মেদ, জামশেদ বাবুন্টু, শিবব্রত বর্মন, সুমন
লাহিড়ি প্রমুখ অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মের গল্পকার। এদের কাছে গল্প যেন
হয়ে উঠেছে ঘোরগ্রস্থ হেঁয়ালিতে পূর্ণ রহস্যময় কথামালা। রাইসুর
বিষয়, ভাষা, গল্প নির্মাণ আঙ্গিক পাঠককে প্রায় চমকে দিয়ে যায়। রনি
এবং জামশেদের ভাষাও ভ্রু কুঁচকে দেয় পাঠকের _ এ কি কোনো গল্পের
ভাষা কিংবা এসব বিষয় কি কোনো গল্পের বিষয় হতে পারে? এ ধারার সবাই
বিরলপ্রজ, খুবই কম লিখেছেন, কিন্তু অল্পেই চমকে দেয়ার মতো কিংবা
দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো ক্ষমতা তাদের ছিলো। এদের নিস্ক্রিয়তা এই
ধারাটিকে প্রবল হতে দেয়নি।
এ সময় বরং রিয়্যালিস্টিক ধারাটিই প্রবল হয়ে উঠেছে। শাহাদুজ্জামান,
আকমল হোসেন নিপু, রোকন রহমান, জাকির তালুকদার, খোকন কায়সার,
প্রশান্ত মৃধা, রাজীব নূর, মশিউল আলম, অদিতি ফাল্গুনী প্রমুখ এ
ধারার গল্পকার। শাহাদুজ্জামান এ সময়ের এক শক্তিশালী গল্পকার। তার
গল্প অনুভূতিপ্রধান, অর্থাৎ গল্পের মধ্যে একটি 'গল্প' বলার চেয়ে
একটি পাঠক হৃদয়ে কোনো একটি অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসেন তিনি। তার
বলার ভঙ্গিটিও অন্য সবার থেকে বেশ আলাদা। আকমল হোসেন নিপুর গল্পে
অন্তজ শ্রেণীর মানুষ উঠে আসে নিপুণ কুশলতায়। এই শ্রেণীর মানুষকে
তিনি চেনেন খুব ভালো করে। তার গল্প নির্মর্াণ কৌশলটিও লক্ষ্য
করবার মতো। প্রকৃতি আর মানুষ আর সমাজজীবন তার গল্পে মিলেমিশে
একাকার হয়ে যায়। মশিউল আলম এই সময়ের আরেক জন পরিচিতি পাওয়া
গল্পকার। তিনি গল্প লেখেন প্রায় কথক ভঙ্গিতে, কীভাবে একটি গল্প
বললে তা সব পাঠকের কাছে দ্রুত এবং সহজে পৌঁছে যাবে খুব ভালো জানেন
তিনি। তার গল্পের বিষয় গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে নগর, নগর থেকে
বিদেশ-বিভুঁই পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়। জাকির তালুকদার তার গল্পে
ইসলামিক মীথের প্রবল-প্রচুর ব্যবহার করে দেখিয়ে দিচ্ছেন _ আমাদের
চারপাশেই অব্যবহৃত অথচ ব্যবহারযোগ্য কত অসংখ্য উপাদান ছড়িয়ে আছে।
তবে এই ধরনের প্রবণতা যে কখনো কখনো ক্ষতিকরও হয়ে উঠতে পারে সে
প্রমাণও তিনি ইতিমধ্যেই দিয়ে ফেলেছেন। তার অতি সামপ্রতিক কালের
গল্পগুলো আমাকে হতাশ করেছে। কোনো কোনো গল্প পড়ে মনে হয়েছে, গল্পের
কাহিনী দাবি না করলেও তিনি জোর করে মীথের প্রবেশ ঘটাচ্ছেন। সঙ্গম
এবং ধর্ষণের মধ্যে পার্থক্য কি সেটা একজন লেখকের জানার কথা, জাকির
বোধহয় সেটা বিস্মৃত হয়েছেন। আবার কিছু গল্প এত দুর্বল যে বিশ্বাস
করতে কষ্ট হয় এগুলো জাকিরেরই লেখা। সম্ভবত যে কোনো মূল্যে মিডিয়ায়
নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্যই তিনি বাছবিচারহীন ভাবে লিখে
যাচ্ছেন। অন্যদিকে খোকন কায়সার তার গল্পে ঘটিয়েছেন লোকবাক্য,
লোকাচার, লোকবিশ্বাস ও সংস্কারের বিপুল সমাহার, যা তাকে ব্যতিক্রমী
করে তুলেছে। প্রশান্ত মৃধার ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গিও লক্ষ্য করবার মতো,
বিষয়ের সঙ্গে তার ভাষা বদলে যায়, যদিও মাঝে মাঝে তা একঘেঁয়ে ও
ক্লান্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি করে। রবিউল নাগরিক সমস্যাগুলো ভালো
বোঝেন, নাগরিক নিঃসঙ্গতা ও ক্লান্তি তার গল্পে চমৎকার কুশলতায়
নির্মিত হয়। মাহবুব মোর্শেদের কিছু গল্পে যৌনতার শিল্পোত্তীর্ণ
ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। এই সময়ের আরও দুজন গল্পকারের কথা বিশেষভাবে
বলা দরকার- শাহনাজ মুন্নী ও অদিতি ফাল্গুনী। এদের দুজনের কেউই
পুরোপুরি রিয়্যালিস্টিক বা অ্যাবস্টা্রক্ট নন। মুন্নী গল্পে
ব্যবহার করেন মীথ। তার বর্ণনায় এক ধরণের ইলু্যশন তৈরি হয়। মীথ
ব্যবহারের প্রাচুর্য অদিতির গল্পেও চোখে পড়ে। তার বিষয়ও অন্য
অনেকের চেয়ে আলাদা। আদিবাসী জীবন নিয়ে লিখেছেন তিনি বেশ কিছু গল্প,
কিন্তু তার বিষয়ের সঙ্গে ভাষাটি যেন ঠিক খাপ খায় না। তার গল্প পড়ে
মনে হয় শিল্পবোধের দিক থেকে তিনি সৃষ্টি বা ক্রিয়েশনের চেয়ে
নির্মাণ বা কন্সট্রাকশনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
খুব স্বল্প পরিসরে নব্বই সম্বন্ধে মন্তব্য করা হলো, এই মন্তব্য
থেকে এই সময়টিকে বোঝা যাবে না। এই সময়ের লেখালেখি সম্বন্ধে এতটুকু
বলা যায় যে, কেউ যদি নব্বইয়ের ৭/৮ জন গল্পকারের গল্প খুব মনোযোগ
দিয়ে পড়েন, তাহলে বাংলাদেশের গল্প কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সে সম্বন্ধে
একটা ধারণা পেয়ে যাবে তিনি।
নব্বই দশক শেষ হয়ে গেছে, এসেছে নতুন দশক, নতুন লেখক, নতুন কলম। তবে
এ কেবল তাদের শুরু, এখনই কোনো মন্তব্য না করাই ভালো। লেখালেখি করতে
চাইলে ধৈর্যের পরীক্ষায় আগে উত্তীর্ণ হওয়া দরকার। সব কালেই অনেক
সম্ভাবনাময় লেখকের অকাল মৃতু্য ঘটেছে শুধুমাত্র নিজেকে চলমান রাখতে
পারেননি বলে। নতুন লেখকরা নিজেদের চলমান রাখবেন এবং অচিরেই আমাদের
সামনে তুলে ধরবেন তাদের সম্ভাবনার জগত আমরা সেরকমই প্রত্যাশা করি।
উপসংহারের পরিবর্তে
এই নিবন্ধের শিরোনামে 'উত্তরাধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে' শব্দ দুটো
ব্যবহৃত হয়েছে। চলি্লশ দশকের মাত্র কয়েকজন লেখকের হাতে যে
গল্পচর্চার সূচনা হয়েছিল, পাঁচ দশক পর এতদিনে তা একটি পরিণতি লাভ
করেছে। এক নিমেষে উচ্চারণ করার মতো কয়েকজন গল্পকার, অহংকার করার
মতো অসংখ্য গল্প উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছেন এই সময়ের
লেখক-পাঠকরা। কতটুকু এগিয়েছি আমরা? এ নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে সে
মীমাংসায় পৌছানো যাবে না। এ নিয়ে আরও বহু আলোচনার অবকাশ রয়ে গেছে।
তবু যারা মনে করেন 'বাংলাদেশে কিছুই হচ্ছে না', বা বাংলাদেশের গল্প
নিয়ে যারা হীনমন্যতায় বা উনা্নসিকতায় ভোগেন তাদের প্রতি একটি
প্রশ্ন উচ্চারিত হতে পারে _ গল্প বলতে তারা কি বোঝেন? আমার মনে হয়,
তুলনামূলক সাহিত্যবিচারের কথা যদি ওঠে _ তার আগে কিছু কিছুু বিষয়
পরিষ্কার করে নেয়া উচিত। গল্প বা উপন্যাস বা কবিতা বা নাটক আমরা
কেন লিখব, কেন পড়ব, কাকেই বা এসব অভিধা দেব সেটা পরিষ্কার হওয়া
ভালো। গল্প যদি কোনো না কোনোভাবে জীবনের কথা বলে, সময়কে ধারণ করে,
মানুষের ব্যক্তিগত-সামাজিক- অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পটভূমি ফুটিয়ে
তুলতে পারে, চিরন্তন বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন ও ব্যাখ্যা প্রদান করে
_ অর্থাৎ এগুলোই যদি একটি গল্পের বৈশিষ্ট্য বা প্রধান কাজ হয়ে
থাকে, তাহলে বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দীর গল্পে এর কোন দিকটি ধরা পড়েনি
_ সে প্রশ্ন উন্নাসিক ও হীনমন্যদের প্রতি উচ্চারন করা প্রয়োজন।
নাকি বাংলাদেশের মানুষ ও সমাজ জীবনকেই তারা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে
করেন না বলে এসবের চিত্রায়ণ তাদের চোখে পড়ে না? বাংলাদেশের
অর্ধশতাব্দীর গল্পের মোটামুটি পাঠ শেষে আমার মনে হয়েছে _ আমাদের
অর্জন খুব সামান্য নয়। জীবন ও পৃথিবীর চেনা-অচেনা কোণে আমাদের
লেখকরা ক্রমাগত আলো ফেলেছেন এবং ফেলছেন _ এ কাজটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
হবে না ? আমার মনে হয় আমাদের পুরো গল্প নিয়ে গর্ব করতে পারি আমরা।
প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র :
১. শতবর্ষের বাঙলা ছোট গল্প : একটি রূপরেখা/উজ্জ্বল কুমার মজুমদার।
২.সামপ্রতিক বাঙলা গল্পসাহিত্য/ আব্দুল মান্নান সৈয়দ।
৩.ছোটগল্পের রূপান্তর/আনন্দ বাগচী।
৪. বাঙলা ছোটগল্পের তিন দিকপাল/সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
৫. মাঝারি মাপের আয়না/ সরোজ বন্দোপাধ্যায়।
৬. বাংলাদেশের নির্বাচিত ছোটগল্প ২য় ও ৩য় খন্ডের ভূমিকা/আব্দুল
মান্নান সৈয়দ/বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র।
৭. বাংলাদেশের গল্প _ সত্তর দশক/সুশান্ত মজুমদার সম্পাদিত/বাঙলা
একাডেমি।
৮. বাংলাদেশের গল্প _ আশির দশক/নাসরীন জাহান সম্পাদিত/বাঙলা
একাডেমি।
৯. তরুন প্রজন্মের গল্প/মুসা কামাল মিহির সম্পাদিত/শব্দশিল্প
প্রকাশনী।
১০. নব্বই দশকের গল্প/ রবিউল করিম সম্পাদিত/ব্যাস প্রকাশনা।
|
| |
 |
|