Page loading ... Please wait.

বাংলাদেশের মানুষের মন
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
একজন মানুষ যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণই কিছু-না-কিছু চিন্তা করে, কিছু-না-কিছু ভাবে, এক মুহূর্তও তার ভাবনাহীন কাটে না, কিন্তু এতসব ভাবনা-চিন্তার কতটুকুই-বা সে প্রকাশ করে? শতকরা বিশ ভাগ, বা বড়জোর পঁচিশ ভাগ! এর চেয়ে বেশি নিশ্চয়ই নয়! আর চাইলেই কী প্রকাশ করা যায়? কার কাছে প্রকাশ করবে সে, কার এত সময় আছে এতসবকিছু শোনার, কেই-বা তাকে পুরোপুরি বোঝার চেষ্টা করবে? একজন মানুষকে তাই তার অধিকাংশ ভাবনাচিন্তা বুকের মধ্যে জমা করে কবরে যেতে হয়। এই প্রায়-অপ্রকাশিত মানুষকে কী কেউ কোনোদিন পুরোপুরি বা আধাআধিও বোঝে? আর সেক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি তো অনিবার্যভাবেই আসে যে, এক জীবনে একজন মানুষের মনই যেখানে ঠিকমতো বুঝে ওঠা যায় না, সেখানে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মন কীভাবে বোঝা সম্ভব? কথা বলার জন্য বাংলাদেশের মানুষের মন বিষয়টিকে যতটা মজাদার মনে হয় (যেহেতু যে কেউ এ বিষয়ে দু-চার কথা বলতে পারবেন), আলোচনা করতে গেলে দেখা যায়, বিষয়টি অত সহজ নয়, বরং বেশ দুরূহ (যেহেতু এ সম্বন্ধে যে কোনো কথারই বিপরীতধর্মী কথাও আছে)। কারণ, একজন মানুষের মন বোঝার জন্য আমরা যেভাবে তার বিভিন্ন আচরণ ধরে ধরে ব্যাখ্যা করতে পারি, জনগোষ্ঠীর আচরণ কি সেভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একেক মানুষের প্রতিক্রিয়া তো একেক রকম, সেগুলো দেখে স্বতন্ত্রভাবে একজন মানুষের মন বোঝার চেষ্টা করা গেলেও জনগোষ্ঠীর ওপর এর সামগ্রিক প্রভাব সম্বন্ধে মন্তব্য করা কীভাবে সম্ভব? হঁ্যা সম্ভব, যদি আমরা এই আচরণসমূহের একটি গড় করে নেই। অবশ্য এর মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীর কতগুলো সাধারণ (পড়সসড়হ) বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা গেলেও কখনোই কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। তাহলে কেন আমরা গড়পরতা ফলাফলের দিকে যাবো, অন্য কোনো উপায়ে কি মন বোঝা যাবে না? এর উত্তরের আগে বুঝে নেয়া দরকার _ মানুষের মন বোঝার উপায় কী! মনোবিজ্ঞানীরা মন বোঝার জন্য নানা রকম পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছেন, আমরা সেকথা জানি। আমি মনোবিজ্ঞানী নই, সে-সব তাত্তি্বক আলোচনায় যাওয়ার আগ্রহ বা যোগ্যতাও আমার নেই, আমি কেবল আমার নিজস্ব কিছু বোঝাপড়া ও ভাবনার কথা আপনাদের সামনে হাজির করবো।

সাধারণভাবে একজন মানুষের আচার-আচরণ, বিভিন্ন ঘটনায় তার প্রতিক্রিয়া কিংবা ঘটনাসমূহে তার অংশগ্রহণের ধরন, অন্য মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে এইসব সম্পর্কের উত্থান-পতন ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে আমরা তার মন বোঝার চেষ্টা করতে পারি। প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনায় তার আচরণ দেখেও তার মন খানিকটা বোঝা যায়। কিন্তু তারপরও কথা থেকে যায়। এমন মানুষের তো অভাব নেই যারা নিজেদের আবেগ প্রকাশে কুণ্ঠিত, তারা এমন একটি ঘটনায় আবেগাপ্লুত হন হয়তো, কিন্তু প্রকাশ করেন না, তাদের মন আমরা কিভাবে বুঝবো? অতএব গড় করার মধ্যে যেমন, তেমনি আচরণ দেখে মন বোঝার চেষ্টার মধ্যে বিপদ আছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আমাদের দেশের সমুদ্র উপকূলের মানুষদের কথা একটু ভাবুন আপনারা। এই মানুষগুলোকে সব সময় প্রকৃতির ভয়ংকর রূপ আর ধ্বংসলীলা দেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কি নিদেনপক্ষে গহীন সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে না আসার ঘটনা তাদের কাছে খুব পরিচিত, কারণ ইতোমধ্যে এমন অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হবার দুর্ভাগ্য তাদের হয়েছে। এমন অভিজ্ঞতাও কারো কারো আছে যে, জলোচ্ছ্বাসের মতো ব্যাপক প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিবারের সকলকে হারিয়ে সে নিজে বেঁচে আছে। এই লোকটির কাছে বেঁচে থাকাটাই তো একটা মিরাকল (সরৎধপষব), অর্থাৎ বেঁচে থাকার মতো বিস্ময়কর ঘটনা আর তার কাছে নেই। শুধু তাই নয়, আকস্মিকভাবে সে একইসঙ্গে অনেক স্বজন হারানোর ফলে মৃতু্য তার কাছে খুব স্বাভাবিক ঘটনা, আরেকটি মৃতু্য হয়তো তাকে তেমন বিস্মিত, বেদনার্ত ও একাকী করে দেবে না। অন্যদিকে এদেশে এমন অনেক অঞ্চল আছে যেখানে মানুষ এই ধরনের আকস্মিক মৃতু্যর সঙ্গে পরিচিতই নয়। তারা বাস করে তুলনামূলকভাবে শান্ত-সুনিবিড়-মায়াময় প্রাকৃতিক পরিবেশে, প্রকৃতি তাদের বেঁচে থাকার পক্ষে পালন করে অনুকূল ভূমিকা; ফলে বেঁচে থাকাটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক, মৃতু্যটা অস্বাভাবিক, আর যদি সেটা আকস্মিক মৃতু্য হয় তারা তা মানতেই পারে না এবং সেটা তাদের কাছে দীর্ঘদিনের জন্য আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকে। এই দুই ধরনের মানুষের মন-মানসিকতার গড় আপনি কীভাবে করবেন? এরকম উদাহরণ আরও দেয়া যায়। আমার গ্রামটি পদ্মার পাড়ে, সেখানে পদ্মা খুব ভাঙে। প্রতিবছর অসংখ্য বাড়িঘর, জমিজমা, স্কুল, বাজার ইত্যাদি চলে যায় পদ্মার গর্ভে। মানুষ তাদের সব সম্পদ হারিয়ে হয়ে পড়ে নিঃস্ব, অসহায়, দরিদ্র। একজন মোটামুটি স্বচ্ছল চাষীও সব হারিয়ে নাম লেখায় ভূমিহীনদের খাতায়। সম্পদের মালিক হওয়া নয়, সম্পদ হারিয়ে ফেলাই যেন ওখানকার মানুষের নিয়তি। শুধু সম্পদের কথাই বা বলি কেন? একজন মানুষ যখন তার বাড়ি হারিয়ে ফেলে, তখন কি তার অনেককিছুই হারিয়ে যায় না? যে বাড়িতে তার জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা, যে বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি গাছ ও গাছের পাতা ও ফুল এবং সেই গাছে এসে বসা প্রতিটি পাখির সঙ্গে তার আজন্ম নিবিড় পরিচয় _ সেই বাড়ি এখন অথৈ পানির নিচে, সেখানে ফেরা তো দূরের কথা, এমনকি জায়গাটা চোখে দেখারও আর সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে তার আর থাকেটা কি? যে মানুষের বাড়ি নেই, তার তো আসলে কিছুই নেই। ফেরার জন্য নিশ্চিত কোনো ঠিকানা নেই, প্রশান্তির আশ্রয় নেই, স্থায়ী ঠিকানা লেখার ঘরটি তাকে সবসময় খালিই রাখতে হয়। এই মানুষটির অনুভূতি, তার এই সবকিছু হারিয়ে ফেলার কষ্ট কি আপনারা বুঝবেন? এই আপনাদের, অর্থাৎ যাদের সব আছে তাদের সঙ্গে এই সব-হারানো মানুষদের কি কোনো মিল আছে? এই দুই ধরনের মানুষের মনের গড় আমরা কীভাবে করবো? এভাবে দেখতে গেলে আরও কিছু বিষয়ও এসে পড়ে। ঢাকায় জীবীকার সন্ধানে সারাদেশ থেকেই লাখ লাখ মানুষ এসে জড়ো হয়েছে, এবং এই কর্মজীবী মানুষের একটি বড়ো অংশই নারী _ যারা গার্মেন্টস শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করে মধ্যবিত্তদের তথাকথিত আভিজাত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভাগ্যের সন্ধানে আসা এই বিশাল কর্মজীবী মানুষের মধ্যে আমার গ্রামের মানুষ প্রায় নেই-ই বলতে গেলে। আগেই বলেছি, ওই অঞ্চলের মানুষ পদ্মার ভাঙনের ফলে তাদের সবকিছু হারিয়ে এক করুণ বীভৎস দারিদ্রের মুখোমুখি হয় _ তবু, ঢাকার এত কাছে থেকেও তারা কেন ঢাকায় আসে না বা আসতে চায় না? তাদের এই মানসিকতাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আমি তাদের অনেককে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, এমনকি ঢাকায় এনে কাজের সুযোগ করে দেবার প্রস্তাবও দিয়েছি, কিন্তু তারা রাজি হয় নি। উল্টো শুনিয়ে দিয়েছে _ তারা তাদের দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে রাজি নয়। কথা হচ্ছে _ দেশ বলতে তারা কী বোঝাতে চায়? তাদের বাড়িঘর ভেঙে গেছে, অন্য কোনো গ্রামে এসে হয়তো কোনোরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু করে নিতে পেরেছে। এ গ্রাম তার নিজের নয়, বাড়িটাকেও নিজের বাড়ি বলা যায় না, কারণ এখানে এভাবে আসতে সে বাধ্য হয়েছে, এ বাড়ির সঙ্গে তার কোনো স্মৃতি ও সম্পর্ক নেই। তাহলে এটাকে সে কেন দেশ বলছে? বলছে তার কারণ, আমার মনে হয়, তারা একইসঙ্গে কয়েকটি পরিবার আশ্রয়চু্যত হয়ে একসঙ্গে এসে কোনো এক গ্রামে ঠাঁই নিয়েছে _ এই মানুষগুলো তার পরিচিত, আর তার কাছে এই মানুষগুলোই হচ্ছে দেশ। পরিচিত মানুষকে দেশ হিসেবে ভাবার এই অদ্ভুত বিষয়টি কি খুব সুলভে পাওয়ার মতো? আপনারা কেউ কি এভাবে দেখেন? যারা দেখেন আর যারা দেখেন না তাদের গড় করা যায় কীভাবে?

তবু আলোচনার স্বার্থে আমাদের গড় করতে হয়, নইলে কথা বলারও কোনো সুযোগ থাকে না। তবে মনে রাখতে হবে, আমরা যা কিছু বলছি তা ওই গড় ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই, ফলে, যা বলা হবে তার ব্যতিক্রম রয়ে যাবার সম্ভাবনা শতকরা একশো ভাগ এবং সেই ব্যতিক্রমকেও খুব একটা হেলাফেলা করার সুযোগ নেই।

বাঙালি সম্বন্ধে প্রচলিত এবং বহুলভাবে প্রচারিত কিছু গড় ধারণাগুলোর দিকে তাকালে ইতিবাচক কিছু পাবার সম্ভাবনা কম। এদেশের বেশিরভাগ মানুষই তার নিজ জাতি সম্বন্ধে খুব একটা ভালো ধারণা পোষণ করে না। এ থেকে অবশ্য বক্তার মনোভাবটিও বুঝে নেয়া যায়। বাঙালি সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণাগুলো কি? কয়েকটির কথা বলি : বাঙালিরা _ অলস ও কর্মবিমুখ, পরশ্রীকাতর, চতুুর ও ধান্ধাবাজ, ঈর্ষাপরায়ন ও হিংসুক _ অন্যের ভালো তারা দেখতে পারে না, হুজুগে, ভীরু, স্বার্থপর ইত্যাদি। এসবের বাইরে যারা এতটা কঠোরভাবে না বলে মোলায়েমভাবে গালি দিতে চান, তারা বলেন _ বাঙালিরা আবেগপ্রবণ। এটাও একটা গালিই। এর মানে হলো _ আবেগপ্রবণ তো, এদের কথা ছেড়ে দাও, কী করলো না করলো তা নিয়ে মাথা ঘামিও না। আমি বলছি না যে, বাঙালি এর কোনোটাই নয়, তবে এ কথা অবশ্যই বলা যায় যে, এগুলোই বাঙালির একমাত্র পরিচয়চিহ্ন নয়। বরং এই ধরনের কথাবার্তার মধ্যে অতি সরলীকরণের প্রবণতা দেখা যায়। যিনি বলেন বাঙালি অলস ও কর্মবিমুখ, তিনি কি খুব ভেবে বলেন কথাটা? তিনি কি কখনো বাঙালিকে কাজ দিয়ে দেখেছেন যে, তারা আসলেই আলস্য দেখায় কী না, আসলেই কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে কী না! আসলে দু-চারজন অলস লোককে দেখেই তিনি এর দায়ভার সমগ্র জাতির ওপর চাপিয়ে দিতে চান। আমার তো মনে হয় বাংলাদেশের মানুষ কর্মবিমুখ তো নয়ই, বরং কর্মপাগল। নইলে যে দেশ তাদের বেঁচে থাকার নূন্যতম চাহিদাটুকু পূরণ করার গরজ দেখায় নি, সেই দেশে তারা কীভাবে বেঁচে আছে? এমন তো নয় যে, এখানে খুব সহজেই কাজ পাওয়া যায়, বরং জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত এই দেশে কাজের চেয়ে কাজের লোক বেশি, ফলে প্রতিযোগিতা বেশি, সেই পরিস্থিতিতেও তো মানুষ নিজের কাজটি ঠিকই খুঁজে নিচ্ছে। এদেশে যখন ফসলের বাম্পার ফলন হয়, তখন আমাদের বাকপটু নেতানেত্রীরা এর কৃতিত্ব নেয়ার জন্য মাঠে-ময়দানে, রেডিও-টিভিতে, সংবাদপত্রে বক্তৃতার তুবড়ি ছোটান; এরা অসৎ এবং বদমাশ _ কারণ এই বাম্পার ফলনে তাদের আদৌ কোনো কৃতিত্ব নেই, তারা কৃষককে সার দেয় নি, পানি সেচের জন্য যন্ত্রপাতি দেয় নি, চাষের জন্য লাঙল দেয় নি; উল্টো সার চাইতে গেলে তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলার উদাহরণ আছে, তাহলে এর জন্য তারা কৃতিত্ব দাবি করেন কোন সাহসে? প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে যা আছে তা হলো _ আমাদের কৃষকদের অপরিমেয় প্রাণশক্তি। যাবতীয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে হলেও তারা নিজেদের কাজটা মন দিয়েই করে। এটা দেখেও কেউ কেউ তাদেরকে অলস বলে গাল দেন কেন? তার কারণ দুটো। প্রথমটি হতে পারে এই যে, তারা কৃষকদের এই প্রাণশক্তির খোঁজ রাখেন না। দ্বিতীয়টি হলো বোঝার ভুল। আমাদের মানুষগুলোকে অলস মনে হয় কারণ তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈষয়িক উদাসীনতা আছে, আর সেজন্যই তারা কখনো প্রয়োজনের চেয়ে বেশিকিছুর জন্য ব্যাকুল হয় না। অল্পতেই খুশি এই মানুষগুলোর মধ্যে তাই বৈষয়িক কারণে সমগ্র জীবন ব্যয় করে দেবার প্রবণতা নেই। বরং নূন্যতম প্রয়োজন মিটে গেলে বাড়তি আয়ের ধান্ধা করার বদলে আড্ডা দিয়ে বা গান শুনে সময় কাটিয়ে জীবনটাকে তারা আরেকটু বেশি উপভোগ্য করে তুলতে চায়। বৈষয়িক লোকজনের কাছে এটা তো অলসতা হিসেবে বিবেচিত হতেই পারে। আবার একজন মানুষ যখন বলেন যে, বাঙালি চতুর ও ধান্ধাবাজ তখন এ কথাটিকে একেবারে বিনাপ্রশ্নে মেনে নেবার কোনো কারণ থাকেনা, বরং উল্টো মনে হয় যে, তিনি নিজেই চতুর ও ধান্ধাবাজ। একজন মানুষ নিজে যদি তা-ই না হন, তাহলে আরেকজনের চাতুর্য ও ধান্ধাবাজি ধরে ফেলা সহজ নয়। অর্থাৎ ঐ লোকটি নিজের কিংবা তার দেখা আরও দু-চারজন মানুষের চাতুর্য ও ধান্ধাবাজির দায়ভার একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছেন। এরকমভাবে দেখলে আমরা এইসব বহুলকথিত বাঙালির স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে অনেকরকম যুক্তিই দাঁড় করাতে পারি। কিন্তু সে-সবই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বরং এটা মেনে নেয়াই ভালো যে, এসব গুনাবলীও এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অল্পবিস্তর আছে। যে দেশের লোকসংখ্যা তেরো কোটি, সেখানে হরেক রকমের মানুষ থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু দু-চার-দশজন মানুষের চারিত্র-বৈশিষ্ট্য দেখে পুরো জাতি সম্বন্ধে এক ধরনের নেতিবাচক সিন্ধান্তে পেঁৗছে যাওয়া কোনো সুবুদ্ধির পরিচয় নয়। তবে বাঙালি যে নিজেদেরকে নিয়ে এতসব বাজে কথা বলে, এর একটা ইতিবাচক দিকও আছে। কেউ একজন যখন কোনো একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে 'বাঙালি তো!' বলে বাঙালিকে উপহাস করেন, তখন নিশ্চয়ই নিজেকে বিযুক্ত করে বলেন না! বাঙালি নিজেকে নিয়ে যেসব কৌতুক তৈরি করেছে, সেগুলোও দেখবার মতো। বাঙালিকে নিয়ে ঠাট্টা করা তো আসলে নিজেকে নিয়েই ঠাট্টা করা। ব্যাপারটা কিন্তু সহজ নয়! নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করাটা একটা প্রতিভা, সেটা বাঙালির আছে। যাহোক, আমরা বরং প্রচলিত ধারণাগুলোর বাইরে গিয়ে বাঙালির আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের খোঁজখবর করতে পারি। আমার নিজের বিবেচনায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আছে _ উদাসীনতা ও নিস্পৃহতা, নিরাসক্তি, রহস্যপ্রিয়তা, ভাববাদী দার্শনিকতা ও আধ্যাতি্নকতা ইত্যাদি। আমার সঙ্গে হয়তো আপনারা অনেকেই একমত হবেন বা হবেন না, অর্থাৎ এসব বিষয় হয়তো আপনারাও ভেবেছেন, তবু আমি আমার এই পর্যবেক্ষণগুলোর ব্যাখ্যা দিতে চাই।

প্রথমেই উদাসীনতা ও নিস্পৃহতার প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাদেশের মানুষ তার পরিপাশ্বর্ের ঘটনাপ্রবাহের ব্যাপারে উদাসীন, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে সেরকমই মনে হয়। চারপাশে যা কিছু ঘটে যাচ্ছে, সে-সব তারা এমন এক গভীর উদাসীনতা ও নিস্পৃহতা নিয়ে অবলোকন করে যে, মনে হয়, এসব তাদের জীবনে নয় _ অন্য কারো জীবনে ঘটছে, এবং সেই অন্য কারো সঙ্গে তাদের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। যদিও এসব ঘটনাসমূহে সে নিজেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তাকে দেখে কিন্তু তা মনে হয় না। কিন্তু নিজে ক্ষতিগ্রস্থ নাই-বা হলো অন্য কাউকে হতে দেখলেও তো একজন মানুষের ভেতর প্রতিক্রিয়া হবার কথা _ আমাদের ভেতরে যেন তা-ও হয় না। (আর এ জন্যই কি সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন এত এত দুর্ঘটনার খবর দেখে, এত এত মানবিক বিপর্যয়ের কথা জেনেও শিউরে উঠি না, লজ্জায়-অপমানে-ঘৃণায়-ক্ষোভে-ক্রোধে জ্বলে উঠি না, কেবল দেখে যাই?) এই নিস্পৃহ অবলোকনের বা শুধুমাত্র দেখে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে কবি শামসুর রাহমানের একটা কথা মনে পড়ছে। আমার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে _ জীবনের কি কোনো অর্থ আছে ? থাকলে সেটা কি? _ এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন _ জীবনের কোনো অর্থ নেই, আমরা অর্থ আরোপ করি। জীবনকে তুমি একটা ঘর হিসেবে কল্পনা করে নিতে পারো, যার চারটি দেয়ালই শূন্য। এই শূন্য দেয়ালগুলো নিয়ে আমরা কী করতে পারি? সুন্দর মনোহর সব ছবি এঁকে শূন্য দেয়ালগুলোকে ভরিয়ে তুলতে পারি, অথবা প্রশ্রাব করে, থুথু দিয়ে দেয়ালগুলোকে নোংরা করে তুলতে পারি, কিংবা কিছুই না করে স্রেফ শূন্য দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারি। তো বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ঐ তৃতীয় দলের সদস্য, অর্থাৎ দেখে দেখেই কাটিয়ে দিচ্ছে সারাটি জীবন। কোথাও যেন তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই, কিংবা অংশগ্রহণের চেয়ে তারা যেন দর্শক হতেই বেশি পছন্দ করে। তা-ও উদ্দাম-উচ্ছ্বল-প্রাণপ্রাচুর্যপূর্ণ দর্শক নয়, বরং নিস্পৃহ, উদাসীন ও বিষণ্ন দর্শক। আর এই ধরনের দর্শকদের যা স্বভাব, সবকিছুই তারা মেনে নেয়, কিংবা নিজেকে মানিয়ে নেয় সমস্ত কিছুর সঙ্গে। যা কিছু ঘটে যাচ্ছে সে-সবের সঙ্গে সে তাই খুব কমই নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে তোলে। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তুমুল অংশগ্রহণের উদাহরণও এই জনগোষ্ঠীর মধ্যেই আছে _ মুক্তিযুদ্ধ, ওই সময় বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে যা ঘটে নি তা-ই ঘটেছিলো, বাঙালি একসঙ্গে সবাই মিলে একই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। আমরা এ প্রসঙ্গে পরে আসবো।

শুধু যে বহমান ঘটনাসমূহের সঙ্গেই তারা সংশ্লিষ্টতাহীন তা নয়, একইসঙ্গে তারা ধারণ করে এক অদ্ভুত বৈষয়িক উদাসীনতা। আমাদের দেশের মানুষ অল্পেই তুষ্ট। মাথা গোঁজার ছোট্ট একটা ঠাঁই আর পেটে সামান্য খাবার থাকলেই তারা রীতিমতো কবি হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে ভীষণ ভাববাদী আর দার্শনিক। বৈষয়িক উদাসীনতার জন্যই এ জাতির কোনো বৈষয়িক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নেই _ তারা কোথাও পেঁৗছাতে চায় না, বিশেষ কিছু পেতেও চায় না। কয়েকবছর আগে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সারা পৃথিবীব্যাপি _ 'কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে সুখী?' _ এরকম একটি বিষয়ে তাদের নির্ধারিত প্রশ্নমালার ভিত্তিতে জরিপ চালিয়ে 'বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে সুখী' _ এই অদ্ভুত ফলাফল প্রকাশ করেছিলো। এই ফলাফল নিঃসন্দেহে অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য, এবং প্রায় ব্যাখ্যার অতীত। যে দেশটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দারিদ্র, ক্ষুধা, হাহাকার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদেশী শাসন ও শোষণে নিস্পেষিত ও পীড়িত সেই দেশের মানুষ সবচেয়ে সুখী হয় কী করে? যতদূর মনে পড়ে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির প্রশ্নমালা ছিলো মূলত বৈষয়িক তৃপ্তি ও সন্তুষ্টি নিয়ে। ফলে তাদের গবেষণায় এরকম ফলাফল বেরিয়ে আসাটা খুব বেশি অস্বাভাবিক নয়, কারণ আমাদের মানুষগুলো যে অল্পেই তৃপ্ত হয়ে আছে! যে দেশের মানুষ দু-বেলা দু-মুঠো ভাত পেলেই খুশি, সে দেশের মানুষের কাছে _ 'কোল্ড ড্রিংকস পাচ্ছেন না বলে কি আপনি অসুখী' _ এই প্রশ্ন করার কোনো মানেই হয় না।

এই বৈষয়িক উদাসীনতার বিষয়টি আমাদের জন্য একইসঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক। নেতিবাচক এই অর্থে যে, একজন মানুষের যদি কোনো বৈষয়িক লক্ষ্য না থাকে তাহলে সে কোথাও পেঁৗছাতে পারে না। অল্পে তুষ্ট হলে সে তার প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে থাকে উদাসীন। একটি জাতির ক্ষেত্রেও এই কথা সত্যি। কে জানে, হয়তো এ কারণেই এদেশে মার্কসবাদী রাজনীতির ব্যাপক সাফল্যের সম্ভাবনা ও বিপ্লবের বহুবিধ কারণ ও উপাদান ছড়িয়ে থাকলেও এই রাজনীতি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় নি। এদেশের মানুষের পক্ষে পুরোপুরি বস্তুবাদী হয়ে ওঠা কঠিন _ প্রায় অসম্ভবই বলা যায়, ফলে একটি বস্তুবাদী দর্শনকে গ্রহণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে নি। মার্কসবাদী রাজনীতির নেতা-কর্মীরা যখন তাদের বক্তব্য নিয়ে মানুষের কাছে গেছে, তখন মানুষ এর মধ্যে তাদের বৈষয়িক মুক্তির সম্ভাবনা দেখতে পেলেও তাদের দার্শনিক প্রশ্ন ও কৌতূহলের কোনো উত্তর পায় নি। এই নেতা কর্মীরা কখনো মানতে পারে নি যে, এদেশের মানুষের কাছে লেলিনের চেয়ে লালন কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ লালন তাদেরকে বৈষয়িক মুক্তির পথ না দেখালেও তাদের দার্শনিক ক্ষুধা অনেকখানিই মেটান। এই মেনে না নেয়ার ফলে মানুষের মনের কাছে তাদের পক্ষে পেঁৗছুনো সম্ভব হয় নি। অথচ ভালো হতো যদি আমরা আমাদের চিন্তা ও চেতনার মধ্যে লালন ও লেনিনকে সমান জায়গা দিতাম (আশা করছি, লালন ও লেনিন এই নাম দুটোকে পাঠকরা আক্ষরিক অর্থে নেবেন না, এই দুটো নাম আসলে দুটো প্রতীক, যা দুটো আপাত বিরোধপূর্ণ চিন্তা-ভাবনাকে রিপ্রেজেন্ট করে)।

কিন্তু বৈষয়িক উদাসীনতার একটি ইতিবাচক দিকও আছে। অতিমাত্রায় বৈষয়িক মানুষ আসলে একজন যান্ত্রিক মানুষ। বৈষয়িক সাফল্যের সিঁড়ি খুব সরু, খাড়া, আর পতনোন্মুখ। এই সিঁড়ি বেয়ে পাশাপাশি দু-জন উঠে যেতে পারে না, উঠতে হয় একজনকেই। কিন্তু ব্যাপারটা তো এমন নয় যে, একজন মাত্র মানুষই শুধু ওই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাইছে _ উঠতে চায় অনেকেই, আর তারা হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রতিযোগী _ সহযোগী নয়। এখানে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই, যেতে হয় একা একা, তা-ও নিষ্ঠুরভাবে। আর এতে করে সমস্ত মানবিক আবেগ অনুভূতিকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হয়। হয়ে উঠতে হয় মানবিক অনুভূতিহীন এক যান্ত্রিক পদার্থ। হয়ে যেতে হয় নিঃসঙ্গ, আত্নকেন্দ্রিক, স্বার্থপর। আজকের দিনে পাশ্চাত্য মানুষের যে সমস্যা, তা আসলে এই-ই। আমাদের দেশের মানুষ যে যান্ত্রিক হয়ে ওঠে নি, এখনও যে এখানে মানুষ পরস্পরের জন্য ভাবে, কাঁদে, অন্যের দুঃখে নিজেই দুঃখিত হয়ে পড়ে (হয়তো সে-সবের প্রকাশ সহসা করে না) _ তার কারণ তারা বৈষয়িক নয়। জীবন তো আসলে শুধু বৈষয়িক সাফল্য পাবার জন্যই নয়, পরস্পরের প্রতি যদি সহমর্মিতাই না থাকলো, যদি ভালোবাসার বোধটাই হারিয়ে গেলো, যদি নিঃসঙ্গতা আর আত্নকেন্দ্রিকতাই জীবনের মোক্ষ হয়ে উঠলো তাহলে সেই জীবনের আর মূল্য রইলো কোথায়?

এই যে উদাসীনতা আর নিস্পৃহতার কথা বললাম, এগুলো আছে বলেই হয়তো বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আছে এক অদ্ভুত নিরাসক্তি। ঘটমান ঘটনাসমূহে তারা এমনভাবে অংশগ্রহণ করে যে, মনে হয় এসবে তাদের কিছুই যায় আসে না। অনেক সময় তারা অংশগ্রহণ পর্যন্ত করে না, কেবল দেখে যায়। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় _ এত যে নিরাসক্তি তাদের, তারা কি একবারও ভেবে দেখে না যে, এসব ঘটনা তাদের জীবনে কী ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে! মাঝে মাঝে আমি কল্পনা করতে চাই _ পলাশির আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব যখন ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন আশেপাশের কৃষকদের ভূমিকা কী ছিলো! তারা হয়তো তাদের দৈনন্দিন জীবনের ধারাবাহিকতায় মাঠে কাজ করছিলো, যুদ্ধ শেষ হলে হয়তো একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেসও করেছিলো _ আজকে কী ঘটলো! হয়তো যুদ্ধের কথা জেনে এ-ও জানতে চেয়েছিলো কে হারলো কে জিতলো, কিন্তু নবাব হেরে গেছেন শুনে তাদের বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো বলে মনে হয় না। এই পরাজয়ের সংবাদটিকে হয়তো তারা একটি মাত্র বাক্য দিয়ে গ্রহণ করেছিলো _ 'ও আচ্ছা।' কিন্তু এই ঘটনা যে তাদের জীবনে কী দীর্ঘস্থায়ী ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনবে তা তারা ভেবেই দেখে নি। এ কথা সত্যি যে, নবাবের সঙ্গে বৃহত্তর জনজীবনের কোনো সম্পর্ক ছিলো না, ফলে নবাবের জয়-পরাজয়ে তাদের বিশেষ কোনো ভাবান্তর না থাকাই স্বাভাবিক। তাই বলে নিজেদের নবাব হেরে গেলো বিদেশী একদল লোকের কাছে এটা কী কোনো প্রভাবই ফেলবে না তাদের মনে? এরকম ঘটনা শুধু দুশো বছর আগেই নয়, আজও ঘটে চলেছে। স্বাধীনতার পর এদেশে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে _ '৯০ এর গণআন্দোলনের কথা মনে রেখেই বলছি _ সেগুলো মূলত ছিলো শহরভিত্তিক, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ, যারা গ্রামে বাস করে, এসবের তোয়াক্কাই করে নি। অথচ বড়ো মাপের পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটেছিলো সেখানে তারা এমন নিরাসক্ত ছিলো না, আমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছি, বরং তাদের তুমুল অংশগ্রহণই আমাদের বিজয়কে অনিবার্য করে তুলেছিলো। এক অদ্ভুত উদাসীনতা, নিরাসক্তি ও নিস্পৃহতা থাকা সত্ত্বেও একাত্তরে এই জাতি যে মুক্তিযুদ্ধে তুমুলভাবে অংশগ্রহণ করেছিলো তার কারণ কি? এ বিষয় নিয়ে আমাদের আরও অনেক কিছু ভাবার ও বলার আছে।

এবার ভিন্ন একটি প্রসঙ্গ। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র যা প্রচার করে এবং রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা যেসব কথা বলেন তার অধিকাংশই মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে আমি আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলতে চাই। কয়েক বছর আগেও পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালিদের জন্য ছিলো এক নিষিদ্ধ অঞ্চল। এমন একটি ধারণা রাষ্ট্রীয়ভাবেই দেয়ার চেষ্টা করা হতো যে, ওখানে সব ভয়ংকর লোকজন বাস করে, সুযোগ পেলেই তারা আমাদেরকে হত্যা করবে, অতএব নিতান্ত বাধ্য না হলে ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। ওই অবস্থায় আমি দু-বার রাঙামাটি গিয়েছিলাম, কিন্তু ভুলেও কোনো আদিবাসীর সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করি নি, ভয়ে। বলা তো যায় না, কখন কী হয়ে যায়! আমার একজন চাকমা বন্ধু আছে, কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি, খুবই প্রাণের বন্ধু। অথচ এই অমায়িক বন্ধুটির অভয়বাণীও কোনো কাজে আসে নি, দুবারই গিয়েছি ওকে না জানিয়ে। তো শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হবার পর, ওই অঞ্চল যখন বাঙালির জন্য 'মুক্ত' হয়ে উঠেছে তখন আমার সেই চাকমা বন্ধু আমাকে তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে। এই তৃতীয় সফর ছিলো আমার জন্য এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। এই প্রথমবারের মতো আমি আদিবাসীদের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে মেশার সুযোগ পাই এবং আবিষ্কার করি _ এতদিন পর্যন্ত এদের সম্বন্ধে যা যা শুনে এসেছি তার পুরোটাই ভুল। এই সহজ-সরল, দুঃখী, অধিকারবঞ্চিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত অথচ অতিথিপরায়ন জনগোষ্ঠীটি সম্বন্ধে এতদিন কী ভ্রান্ত ধারণাই না পোষণ করেছি ভেবে আমি লজ্জায় বিমূঢ় হয়ে গেলাম। আমার অবস্থানের কয়েকটি দিনে তারা আমাকে কেন্দ্র করে এমন উৎসবে মেতে রইলো যে, মনে হতে পারে _ আমার চেয়ে বড় কোনো অতিথি তাদের জীবনে কখনো আসে নি। একজন 'বাঙালি' লোক সপরিবারে তাদের বাড়িতে গিয়ে থাকছে, খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে, সবার সঙ্গে একই পরিবারের লোকের মতো মিশে গল্প করছে _ এর চেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার যেন আর নেই। মনে পড়ছে সেই বৃদ্ধের কথা যিনি কাপ্তাই জলবিদু্যৎ প্রকল্পের প্রতিক্রিয়ায় ডুবে যাওয়া তার পুরনো বাড়ির কথা বলতে বলতে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন _ বাবা, তোমরা তো কখনো আমাদের দুঃখের কথা জানতেই চাও নি। সত্যিই তো, আমরা কি কখনো তাদের কথা জানতে চেয়েছি? ওই বৃদ্ধের কষ্টের বিষয়টি খানিকটা বুঝতে পেরেছিলাম আমি নদীভাঙন দেখেছি বলেই। একজন মানুষের যখন বাড়ি হারিয়ে যায় তখন কি তার হারানোর কোনো বস্তুগত পরিমাপ হয়? একটি বাড়ি তো শুধু একখণ্ড জমি, দুটো ঘর আর কতগুলো গাছই নয় _ বাড়ির সঙ্গে থাকে অনেক স্মৃতি ও সম্পর্ক। ওই অঞ্চলের বহু পরিবার কাপ্তাই লেকের জন্য সেই স্মৃতিময় বাড়ি হারিয়েছে। যে লেক আমরা মহা-আনন্দে দেখতে যাই, দেখে অভিভূত হই, তার সঙ্গে যে কত মানুষের এমন কান্না জড়িয়ে আছে আমরা কি তার খোঁজ করেছি? তো, আমার মতো যারাই আদিবাসীদের ঘনিষ্ট সানি্নধ্যে গেছেন, তারাই স্বীকার করবেন _ আদিবাসীরা বাঙালিদের ভালোবাসেন, আপন মনে করেন, এবং মিলেমিশে থাকতে চান। তারা কোনো ভয়ংকর মানুষ নন, নিতান্তই সহজ-সরল দুঃখী মানুষ। রাষ্ট্রযন্ত্রের মিথ্যে প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে আমরা তাদেরকে ভুল বুঝেছি, কখনো তাদের মনের খবর নিতে যাই নি। নিলে বুঝতে পারতাম _ সাধারণ বাঙালি জনগণের প্রতি তাদের কোনো রাগ নেই, বিদ্বেষ নেই। তাদের প্রতি যে অবিচার করা হয়েছে তারা কেবল তার প্রতিকার চায়, তারা তাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু আদায় করে নিতে চায়। আর এখানেই আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের আপত্তি। আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামো আর রাজনৈতিক দলগুলো সবচেয়ে ভয় পায় যে শব্দগুচ্ছকে তা হলো _ 'জনগণের অধিকার।' তারা মনে করে অধিকার কেবল তাদেরই আছে, জনগণের আবার অধিকার কী? এই অধিকারের কথা বলতে গিয়ে আদিবাসীরা কেবল নির্মম পীড়নেরই স্বীকার হয় নি, তাদের সম্বন্ধে চালানো হয়েছে ভয়ংকর অপপ্রচার। আমরা কখনো সেই-সব বিষয় বুঝতে না চেয়েই আদিবাসীদেরকে ভুল বুঝেছি।

যাহোক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলছিলাম, বাংলাদেশের মানুষ রহস্যপ্রিয়। এই কথার সত্যতা আপনি খুঁজে পাবেন, যদি এদেশের মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকা হাজার হাজার কুসংস্কারের দিকে তাকান। এদেশের মানুষ ভূত-প্রেত-জি্বন-পরী-দেও-দানব এ সবকিছুতেই খুব বিশ্বাস করে। নিজে এসব দেখেছে _ এমন দাবি কেউ করে না, সবাই শুধু জানে অমুকে দেখেছে, তমুকে দেখেছে, অথচ তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে, এসবের অস্তিত্ব আছে। এগুলো তারা বিশ্বাস করে কারণ এগুলো রহস্যময়, রোমাঞ্চকর, অচেনা এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব বিশ্বাস করতে তাদের ভালো লাগে। শুধু ভালো লাগে বললে হয়তো একটু কমই বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রেই এসব বিশ্বাস তাদের জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে প্রভাবিত ও পরিচালিত করে।

এসবকিছুর বাইরে এ জাতির মধ্যে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আছে তা হলো _ আধ্যাতি্নকতা ও ভাববাদিতা। এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়, যারা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত আছেন, তাদের একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, গ্রামের মানুষের একমাত্র সমস্যা হচ্ছে তাদের দারিদ্র। তারা যে ঠিকমতো খেতে পারছে না, পড়তে পারছে না, তাদের থাকার জন্য ভালো একটি ঘর নেই, অসুখ হলে চিকিৎসার সুযোগ নেই _ এগুলোই হচ্ছে তাদের জীবনের একমাত্র সমস্যা, বাস্তবতা, সংকট। এসব সংকট অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু এগুলো তাদের জীবনের একমাত্র সংকট নয়। গ্রামের অনেক মানুষের মধ্যেই এমন কিছু দার্শনিক সংকট ও প্রশ্ন আছে যা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিকের প্রশ্ন ও সংকটের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা জীবন ও পৃথিবী নিয়ে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির ধারণা নিয়ে, বিশ্বজগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন তোলে যে, হতবাক হয়ে যেতে হয়। এ বিষয়ে আমি একটি উদাহরণ দিতে চাই।

আগেই বলেছি আমাদের এলাকায় খুব নদী ভাঙে। সব হারিয়ে মানুষ খুব নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তো এমনই একটি নদীভাঙা পরিবার আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলো। যাঁর কথা আপনাদেরকে বলতে চাই, তাঁকে আমরা ডাকতাম মনসুর কাকা বলে। আমার বাবার বয়সী তিনি, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নাকি স্কুলে কিছুদিন পড়েছিলেনও, কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মেই বেশিদূর এগোয় নি সেই পড়াশোনা। তো, তাঁর বাড়ি ভেঙে যাবার পর বাবাই তাঁকে আমাদের বাড়িতে এসে থাকতে বলেছিলেন। এতে তাঁর আশ্রয় যেমন জুটেছিলো, তেমনই আমাদের বাড়ি দেখাশোনা করার একজন বিশ্বস্ত মানুষও পাওয়া গিয়েছিলো। বাবা আমাদেরকে বলে দিয়েছিলেন, আমরা যেন এই লোকটিকে শ্রদ্ধা করি। তখন স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছি _ তাঁর বয়সের কারণেই হয়তো একথা বলা হচ্ছে। কিন্তু পরে আমার ভুল ভাঙে। মনসুর কাকা ছিলেন এক অদ্ভুত মানুষ। রাতে যখনই তাঁকে ডাকতাম তিনি সাড়া দিতেন, আমার মনে অনেকবার এই প্রশ্ন জেগেছে যে, তিনি কি সারারাত জেগেই থাকেন! না, হয়তো তা থাকতেন না, হয়তো বাড়ি পাহারার উৎকণ্ঠা-ই ঐ বৃদ্ধ মানুষটিকে জাগিয়ে রাখতো। কিংবা হয়তো ঐ শূন্য বাড়িতে আমার নিরাপত্তার জন্যও উৎকণ্ঠায় ভুগতেন তিনি _ এমনই ছিলো তাঁর কর্তব্যবোধ ও স্নেহের ফল্গুধারা। কিন্তু এসব তখন আমার তেমন চোখে পড়ে নি, যা চোখে পড়তো তা হলো _ তাঁকে আমি প্রায়ই কাঁদতে দেখতাম। প্রথম প্রথম ধারণা করেছিলাম যে, তিনি বাড়ি ভাঙার শোকে কাঁদছেন। আপনাদেরকে আগেই বলেছি আমাদের ঐ অঞ্চলে পদ্মার ভাঙনের ফলে মানুষ একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। মনসুর কাকাও তাই হয়েছিলেন। তাছাড়াও তাঁর স্ত্রী তাঁর আগেই মারা গিয়েছিলেন, তাঁর কোনো ছেলে ছিলো না, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো বেশ দূরে দূরে, ফলে আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন খুব নিঃসঙ্গ মানুষ। আমি ভেবেছিলাম এই বুড়ো বয়সে বাড়ি ভাঙার মত ভয়াবহ বিপর্যয়ের ধাক্কা, আশ্রয়হীন হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া, তাঁর আগেই তাঁর স্ত্রীর বিদায় নেয়া কিংবা এই ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা তিনি একসঙ্গে সামলাতে পারছেন না। এসবই তাঁর ব্যক্তিগত সমস্যা, নাগরিক কার্টেসি ও ম্যানার অনুসারে তাঁকে এসব নিয়ে তো আর কিছু জিজ্ঞেস করা যায় না, কিন্তু ঐ প্রত্যন্ত গ্রামে নাগরিক ম্যানারের যন্ত্রণাদায়ক উপস্থিতি না থাকায় তাঁকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম _ 'আপনি এত কাঁদেন কেন মনসুর কাকা?' তিনি উত্তর দিলেন _ 'তুমি বুঝবা না বাবা।' আমার তখন না বোঝার বয়স নয়, কলেজে পড়ি, তাঁর এই ধরনের সমস্যা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবো, তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম। এভাবে কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর তিনি যা বললেন আমি তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না, কিংবা বলা যায় আমি বিষয়টি সত্যি বুঝলাম না।

তিনি বললেন _ ক্যান যে জন্মাইছিলাম সেইটা বুঝবার পারি না বইলা কান্দি।

এ কথার মানে কী? আমি ভেবেছিলাম, এই দুঃসহ জীবন নিয়ে খুব বেশি বিতৃষ্ণ হয়েই তিনি কথাটা বলেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম ছিলো না। মানে বুঝিয়ে বলতে বললে তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর সবসময়ই মনে হয় _ আল্লাহ যে তাকে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, সেটা একেবারে খামোখা নয়। তাঁর নিশ্চয়ই কিছু করার কথা ছিলো, কিন্তু কী যে করার কথা ছিলো সেটা বুঝতেই পারেন নি সারা জীবনে, তাই তিনি কাঁদেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে আমূল চমকে দিয়েছিলো। তাঁর মৃতু্য পর্যন্ত তাঁকে আমি অনর্গল প্রশ্ন করে গেছি, এবং তাঁর ভাবনা-চিন্তায় বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি। তাঁর ভাষ্যমতে _ জীবনের অন্য কোনো কিছু নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই, আক্ষেপ ঐ একটি বিষয় নিয়েই _ তাঁর জানাই হলো না কেন তাঁকে এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিলো, তাঁর করণীয় কাজটি কী ছিলো (এমনকি বাড়িভাঙা, স্ত্রীর মৃতু্য কিংবা একটি পুত্র সন্তান না হওয়ার মতো বিষয়গুলোও তিনি বিচার করতেন পুরোপুরি ভাববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, মনে করতেন _ করণীয় কাজটি করতে পারেন নি বলেই আল্লাহ তাঁকে শাস্তি দেবার জন্য এইসব ঘটনা ঘটিয়েছেন)!

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এটি একটি দর্শন। লেখক ছিলেন না বলে হয়ত তিনি সেটা গুছিয়ে লিখে যেতে পারেন নি, কিন্তু একটু গুছিয়ে ভেবে নিলে আমরা এর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারবো। এ প্রসঙ্গে আমি দুজন মহান লেখকের রেফারেন্স টানতে চাই। একজন আমাদেরই _ হাসান আজিজুল হক, আরেকজন সমকালীন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরা। জীবন সম্বন্ধে এ দুজনের ভাবনাটা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। মিলান কুন্ডেরা বলেছেন _ আমরা আদৌ জন্মাতে চাই কী না সেটা না জেনেই আমাদের জন্ম দেয়া হয়েছে, যে শরীরে আমাদেরকে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে সেটা আমরা নিজেরা বেছে নেইনি, কিন্তু জন্মেই আমরা দেখেছি আমাদের জন্য অনিবার্য করে রাখা হয়েছে মৃতু্য। অর্থাৎ _ তাঁর মতে _ জীবন একটা ফাঁদ এবং এর সবকিছুই পূর্বনির্ধারিত। এই দুঃসহ ফাঁদ থেকে মুক্তি পাবার কি কোনো উপায় আছে? মিলান কুন্ডেরা বলেন, হঁ্যা আছে। কীভাবে? তিনি পলায়নের সম্ভাবনার কথা বলেন, বলেন _ ইচ্ছে করলে একজন মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনের বাধ্যবাধকতা থেকে পালিয়ে যেতে পারে, ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে পারে। কিন্তু তিনি যা বলেন না, তা হলো _ পালিয়ে একজন মানুষ কখনো এই ফাঁদ থেকে মুক্তি পাবে না, কারণ যেখানেই যাক না কেন, সে আবিষ্কার করবে _ তার জন্য অপেক্ষা করছে আরেকটি নতুন ফাঁদ। সে আবারও পালাতে পারে _ কিন্তু ফলাফল হবে ওই একই _ সে নতুন আরেকটি ফাঁদে পতিত হবে। এভাবে এক ফাঁদ থেকে আরেক ফাঁদে পড়তে পড়তেই তার জীবন কেটে যাবে। অতএব জীবনকে ফাঁদ হিসেবে কল্পনা করার মধ্যে ভয়ংকর বিপদ আছে। এতে করে একজন মানুষ রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না, জীবন অর্থহীনতায় ভরপুর, কিন্তু জেনেও সবসময় আমরা সেটা মনে রাখি না, বরং এই ভয়ংকর সত্যটিকে ভুলে থাকার জন্য, জীবনকে আরেকটু সহনীয় করে তোলার জন্য আমরা নানারকম আয়োজনে মেতে উঠি।
হাসান আজিজুল হকও মনে করেন যে, জীবন একটা ভয়ংকর সংকটের নাম। আমার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে _ জীবনের কি কোনো অর্থ আছে? আপনি কি খুঁজে পান কোনো অর্থ? _ প্রশ্নের উত্তরেও তিনি বলেছিলেন অনেক কথাই, সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি _ 'প্রশ্নটি দার্শনিক। এর কোনো সুরাহা নেই। জীবন তো সত্যিকার অর্থে নাথিং .... আমার জন্মের আগের কিছুই জানা নেই, মৃতু্যর পরেরটাও জানা নেই, অথচ অস্তিত্ব আছে। এর যন্ত্রণা প্রতিমুহূর্তে আমাকে ভোগ করতে হচ্ছে। আমার ইচ্ছাধীন কিছুই নয়, আমি যে স্বাধীনতা চাই না তাই আমাকে দেয়া হয়েছে। ইউ আর ফ্রি; অ্যান্ড ইউ মাস্ট ডিসাইড এভরিথিং ইন্ডিপেন্ডেন্টলি, বাট এন্টায়ার ম্যানকাইন্ড উইল বি অ্যাফেক্টেড বাই ইওর ডিসিশন। দেখ কী জটিল একটি পরিস্থিতি। কোনটা পবিত্র কোনটা কাম্য কোনটা গ্রহণযোগ্য এটা কি কোথাও লিখে দেওয়া আছে? পুরোটাই আমাকে আরোপ করতে হবে। ইন ইটসেলফ, জীবনকে আমি নাথিংই বলবো, এটাকে সামথিং করতে হবে আমাকে। কিন্তু সেটা কিভাবে করা যায়, এই মিনিংলেসনেস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে কীভাবে? প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের জন্য এটা একটা সাংঘাতিক সমস্যা। জীবনের অন্ত ঘটবেই, কিছুই নেই তাহলে, কিছুই নেই। এদিক থেকে দেখতে গেলে জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পাই না আমি। অথচ জীবনটা প্রদত্ত, আই হ্যাভ বিন গিভেন, অতএব জীবনকে আমি শেষও করে দিতে পারছি না। এ জন্যই জীবনের জন্য নানাকিছু আরোপ করি, কোনো না কোনোভাবে জীবনকে যাপনযোগ্য করে তুলতে চাই। তার মানে শুধু আমার জীবন নয়, মানব জীবন _ সমগ্র মানব জীবন।'

এখন আমি এই দুই মহান লেখকের জীবনদর্শনের সঙ্গে আমাদের মনসুর কাকার জীবনদর্শনের তুলনা করে দেখতে চাই। মনসুর কাকাও মনে করেন, এই জীবন প্রদত্ত কিন্তু সেটা খামোখা বা বিনা কারণে হতে পারে না। কারণটি তিনি বুঝে উঠতে পারেন নি বলেই তাঁর ওই কান্না। জীবনের সমস্ত বঞ্চনা, অপ্রাপ্তি, হাহাকার, দুঃখ, কষ্ট, অনেক কিছু হারিয়ে ফেলার বেদনা, নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্ব এসবকিছু ভুলে গিয়ে তিনি যখন কেবল তাঁর জন্মের কার্যকারণ খুঁজে না পাওয়ার দুঃখে কাঁদেন, তখন ওই কান্না কী মহৎ হয়ে ওঠে, ভেবে দেখুন প্রিয় পাঠক। বিষয়টিকে আরেকটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা যাক। একটি নির্দিষ্ট সময়কালে, একটি নির্দিষ্ট দেশে, একটি নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একজন মানুষের জন্মগ্রহণের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি ন্যাচারাল সিলেকশনে বিশ্বাস করি। আপনি তো এই দেশে জন্ম না নিয়ে আফ্রিকা বা আমেরিকা বা ইউরোপ বা আরব দেশেও জন্ম নিতে পারতেন, এই সময় জন্ম না নিয়ে একশো বা দুশো বছর আগে বা পরেও জন্মাতে পারতেন। তা না করে, প্রকৃতি আপনার জন্মের জন্য ঠিক এই সময়টিকে বা এই দেশটিকে বেছে নিলো কেন? আপনি যে এই দেশে জন্ম নিয়েছেন, তা-ও খামোখা নয়, হয়তো আপনার চলি্লশ পুরুষ আগের কেউ এদেশের বাসিন্দাই ছিলেন না, কোনো একটি বিশেষ ঘটনায় এখানে এসে বসতি গেড়েছিলেন, আর ধীরে ধীরে এখানেই স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছিলেন। অর্থাৎ ঐ সময়ই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিলো যে, আপনার জন্ম হবে এখানেই। এইভাবে যদি আপনি ভাবতে থাকেন তাহলে দেখবেন, আপনাকে জন্ম দেয়ার জন্য প্রকৃতি আপনার জন্মের আগেই কত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। তো, প্রকৃতির এতসব আয়োজন আপনাকে জন্ম দেবার জন্য, সে কী খামোখা? তাতো হতে পারে না! প্রকৃতি নিশ্চয়ই চায় আপনি কোনো না কোনো ভূমিকা পালন করুন ! আর এই কথাটিই বলতে চেয়েছিলেন আমাদের মনসুর কাকা। তাঁর মতো আমরাও যদি একইভাবে চিন্তা করতাম, যদি ভাবতাম যে, আমাদের সবারই কিছু না কিছু করার আছে, আমাদের জীবনটা অর্থহীন নয়, আমাদের সবারই কিছু না কিছু ভূমিকা আছে _ তাহলে এই পৃথিবীটা কি আরও অনেক বেশি সুন্দর আর বাসযোগ্য হয়ে উঠতো না?

ভেবে দেখুন কী চমৎকার, অসামান্য একটি দর্শন আমাদের গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ ধারণ করেন। আমি একটি মাত্র উদাহরণ দিলাম, এমন উদাহরণ আমরা সবাই দু-চারটে করে দিতে পারবো, অন্তত গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা এই বিষয়টিকে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারেন।

এতক্ষণ ধরে আমি যে-সব কথা বললাম সেগুলো বাংলাদেশের মানুষের মন বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। আমি নিরাসক্তি, নিস্পৃহতা এবং উদাসীনতার কথা বলেছি _ কিন্তু এগুলো মেনে নিলে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? বাঙালি তো কোনোদিনই যোদ্ধা জাতি নয়, চিরকাল সে নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে চেয়েছে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই মিলে এমন মরনপণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো কেন? এটা কি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা? সেরকমটি মনে করার কোনো কারণ নেই। হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনায় এত দ্রুত একটি জাতি সংঘবদ্ধ হতে পারে না। তাহলে কি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আগে থেকেই এমন একটি প্রস্তুতি ছিলো? থাকলে তো তাদেরকে আর উদাসীন বলে আখ্যা দেয়া যায় না। বোঝা যায় এ নিয়ে তাদের আগে থেকেই চিন্তাভাবনা ছিলো। তাহলে সেটা বোঝা যায় নি কেন? তবে কি বিষয়টা এরকম যে, বাঙালি যতটা উদাসীনতা দেখায় আসলে তারা অতোটা উদাসীন নয়! এ প্রসঙ্গে আমি অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি তাঁর একমাত্র লিখিত বক্তৃতা 'বাংলাদেশ: জাতির অবস্থা'য় বলেছেন,'বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি, কারণ তারা একটা জাতি হতে চায়, অন্য কিছু নয়। .... এই জাতিকে তৈরি করেছে তার অনমনীয় গর্ব, সুখে-দুঃখে আট কোটি মানুষের সঙ্গে একই পরিচয় বহন করা, অন্য কিছু নয়, শুধু বাঙালি হতে চাওয়ার জেদ।' ১৯৪৭-এর দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাও ভাগ হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য _ 'বাংলাভাষী জনগণের অধিকতর বাঙময় অংশটি (অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি) ভারতীয় জাতির বৃহত্তর পরিচয়ে নিজের অধিকার হারানোকেই ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নিলো।... কিন্তু _ 'বাংলাভাষী জনগোষ্ঠির বৃহত্তর অংশটি (অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের বাঙালি) যদিও ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একলা পথ চলতে গররাজি ছিলো না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের মিলিত হওয়ার পক্ষে রায় দিলো, তবে কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেই। তার এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ভাষা আন্দোলনের জন্ম দিলো যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে জাতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ।'

অধ্যাপক রাজ্জাক মনে করেন যে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার ব্যাপারে এদেশের মানুষের কোনো আপত্তি না থাকলেও বৃহত্তর ভারতীয় জাতিসত্ত্বায় নিজেকে বিলীন করে দেয়াতে তাদের আপত্তি ছিলো, ফলে বিকল্প হিসেবে তারা পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিলো এবং সেটা তারা করেছিলো নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেই। এই বৈশিষ্ট্যগুলোরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভাষা আন্দোলনসহ, বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে চালানো পাকিস্তানি বিভিন্ন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে নানাবিধ আন্দোলন ও পরিশেষে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।

কেন মুক্তিযুদ্ধ এদেশের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো _ এ প্রশ্ন করলে যেসব উত্তর বিভিন্ন তরফ থেকে পাওয়া যায় তাতে অবশ্য এ কথা মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে প্রায় সবাই-ই পাকিস্তানি শাসন-শোষণের কথা বলেন। এসব কথা শুনলে মনে হয় যে, পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠী যদি আমাদের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক নির্যাতন না চালাতো, কিংবা কেন্দ্রে যদি বাঙালি শাষক থাকতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না। এ কথার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আমাদের যুদ্ধটি হয়েছিলো পাকিস্তান কনসেপ্টের বিরুদ্ধে নয়, পাকিস্তানি শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে। বলাবাহুল্য যে, এটা একটা কারণ বটে তবে একমাত্র কারণ নয় মোটেই, একমাত্র কারণ যদি হয়েই থাকে তাহলে একে মহান একটি ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করার মধ্যে ঝুঁকি আছে। কারণ, সেক্ষেত্রে মনে হতে পারে _ পাকিস্তান নামক একটি চাপিয়ে দেয়া কনসেপ্টের বিরুদ্ধে না গিয়ে এদেশের মানুষ স্রেফ ওদের শোষণ থেকে মুক্তি চেয়েছিলো। অর্থাৎ এই যুদ্ধ অনিবার্য ছিলো না, ছিলো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা, ওদের শাসনটা শোষণে পরিণত না হলে ঘটনাটি আর ঘটতো না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই মতের পক্ষে থাকার কোনো কারণ খুঁজে পাই না। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য ছিলো, কারণ এই দেশের মানুষ নিজেদেরকে একটি জাতি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলো, আর যেহেতু একটি জনগোষ্ঠীকে জাতি হয়ে উঠতে হলে তাদের জন্য একটি আবাসভূমির প্রয়োজন হয় তাই তারা নিজেদের জন্য একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি চেয়েছিলো (আমি এ-ও মনে করি পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ হতো, হয়ত সেটা '৭১-এ নয়, তবে হতোই) ফলে একটি যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র নির্মাণ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিলো না। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্য এ দেশের মানুষের প্রতীক্ষা ও আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘকালের (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মানে শুধু '৭১-এর মার্চ থেকে ডিসেম্বরের ইতিহাস নয়, এমনকি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর ইতিহাসও নয়, এই ইতিহাসের মূল খুঁজতে গেলে আমাদেরকে আরও সুদূর অতীতে যেতে হবে _ অধ্যাপক রাজ্জাকও তাঁর বক্তৃতায় সেদিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন); মুক্তিযুদ্ধ তাদের সুযোগ করে দিয়েছিলো যুদ্ধের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রটি নির্মাণের। অতএব কেবল মাত্র পাকিস্তানি শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির জন্যই যুদ্ধটি হয়েছিলো _ এরকম ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বিষয়টিকে বন্দি করে ফেলার কোনো সুযোগই নেই। বরং নিজস্ব জাতিসত্ত্বার পরিপূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে এটাই ছিলো বাঙালির ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র পদক্ষেপ, এবং এতে অংশগ্রহণ ছিলো এদেশের আপামর জনসাধারণের। এদেশের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ছিলো এর জন্য, পাকিস্তানি শোষণ কেবল এক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিলো। একটি জনগোষ্ঠী যখন নিজেদেরকে একটি জাতি হিসেবে আত্নপরিচয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং একটি স্বতন্ত্র রাষ্টের আকাঙ্ক্ষা থেকে এরকম ব্যাপক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার অর্থও হয়ে ওঠে ব্যাপক, ঘটনাটি হয়ে ওঠে মহান। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধও ছিলো তেমনই একটা মহান ব্যাপার।

বিষয়টি এভাবে দেখলে আমরা বলতে পারি যে, '৪৭-এ মানুষ যে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলো সেটা তাদের মনের কথা ছিলো না, তারা শুধু বৃহত্তর ভারতীয় জাতিসত্ত্বার অংশ হয়ে উঠতে চায় নি বলেই একটি বিকল্প বেছে নিয়েছিলো এবং সুযোগ আসা মাত্র অবিলম্বে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। অতএব '৪৭-এ বাংলাদেশের মানুষের পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়ায় যারা দুঃখ পান, তারা দুঃখ মুছে ফেলুন। এ ছিলো তাদের একটি কৌশল। অতএব বাঙালিকে খুব বেশি উদাসীন বলা যায় না। যে জাতি এমন একটি কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে তাকে পুরোপুরি উদাসীন বলা যায় কীভাবে?

তাহলে দেখা যাচ্ছে এদেশের মানুষ কখনো কখনো কৌশলেরও আশ্রয় নেয়। প্রশ্ন হচ্ছে _ দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির এমন ভয়াবহ, করুণ, মর্মান্তিক ও হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা দেখে কি আমরা আমাদের স্বপ্নকে বাক্সবন্দি করে দীর্ঘনিদ্রায় যাবো, এবং ভাববো যে, এই ঘুম ভাঙার পরে নিশ্চয়ই অবস্থা ভালো হয়ে যাবে? আমার মনে হয় না _ মানুষের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলার কোনো কারণ আছে। যে জাতি মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি ঘটনা ঘটায় _ এত সহজে তাদের প্রতি আস্থা হারালে চলবে কীভাবে? আস্থা হারালে তো চলবেই না, বরং খুঁজে নিতে হবে যার যার করণীয় কাজটি, মনে রাখতে হবে _ আমাদের জন্ম খামোখা হয় নি, আমাদের সবারই কিছু না কিছু করার আছে _ মনসুর কাকা যেমনটি বলেছিলেন।

কথা হচ্ছে আমরা যা বলি তার সবই হয়ত মনের কথা নয়। মুখ দেখেও সবসময় মনের কথা বলা বা বোঝা যায় না। এমন অনেকেই আছেন যারা কোনোভাবেই মনের কথা প্রকাশ করতে চান না, বা পারেন না। এদের সংখ্যাও কম নয়। বাংলাদেশের মানুষ আসলে এমনই। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই নীরব থাকে, নিজেকে প্রকাশ করে না। তাহলে তাদের মনের কথা জানার উপায় কি? উপায় একটাই। আর তা হলো _ একজন মানুষের মনের কাছাকাছি যাওয়া। আপনারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন _ আমরা যাদেরকে মনের মানুষ হিসেবে ভাবি তাদেরকে মনের গোপনতম কথা বলতেও দ্বিধা করি না! আমরা যদি বাংলাদেশের মানুষের মন বুঝতে চাই _ তাহলে তাদের মনের কাছে যেতে হবে। আমরা কি কখনো সে চেষ্টা করেছি? আমরা কি তাদের কাছে গিয়ে বসেছি _ আপনজনের মতো তাদের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছি _ কী তাদের দুঃখ, কী তাদের স্বপ্ন, কী তাদের আকাঙ্ক্ষা ? করি নি তো! আমরা যারা স্বপ্ন দেখি এবং দেখাতে চাই _ তাদের সবাইকেই এই নীরব জনগোষ্ঠীর আপনজন হতে হবে। একমাত্র তাহলেই আমরা জানতে পারবো বাংলাদেশের মানুষের মন _ বুঝতে পারবো তারা আসলে কী চায়, আর তা যদি বুঝতে পারি তাহলে আমাদের স্বপ্নের কথাটিও আমরা তাদের মনের মতো করেই বলতে পারবো। আর সেটাই হবে এই নীরব জনগোষ্ঠীর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রদর্শন।




জানুয়ারি, ২০০২ - জুন, ২০০২।