বাংলাদেশের মানুষের কাছে সংস্কৃতি শব্দটি
প্রায় বিমূর্ত রূপ ধারণ করেছে। শব্দটি বাংলা ভাষায় গৃহীত হবার পর
থেকে আজ পর্যন্ত যত বিভ্রান্তি ও তর্ক-বিতর্ক তৈরি করেছে, আর কোনো
শব্দ তা করেছে বলে মনে হয় না। সংস্কৃতি বিষয়টি বোঝার জন্য যাদেরকে
নিয়ে কথা বলা দরকার_ অর্থাৎ দেশের জনগণ_ তারা এখন পর্যন্ত জানতেই
পারলো না, বুঝতেও পারলো না যে, ওই বস্তুটি কী! দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ
শিক্ষাবঞ্চিত নিরক্ষর জনগণ তো বটেই, এমনকি বহু 'শিক্ষিত' লোককেও
বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগতে দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের
সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এবং উচ্চতর পেশাগত মর্যাদায় অভিষিক্ত অনেক
লোকও সংস্কৃতি বলতে কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেই বুঝে থাকেন।
অর্থাৎ নাচ-গান-নাটক-চলচ্চিত্র-শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদিকেই সংস্কৃতি
বলে মনে করেন। বলাবাহুল্য এগুলো সংস্কৃতিরই অংশ, সংস্কৃতির পুরোটা
নয়। 'সাংস্কৃতিক' শব্দটির সঙ্গে সংস্কৃতির মিল থাকায় এই বিপত্তি।
এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর পেছনে গণমাধ্যমের ভূমিকাও কম নয়। প্রতিদিন
পত্রপত্রিকায় 'সংস্কৃতি সংবাদ' নামে যা কিছু ছাপা হয়, কিংবা
টেলিভিশনের সংবাদে 'এ সপ্তাহের সংস্কৃতি' জাতীয় শিরোনামে যা কিছু
প্রচারিত হয় তা পড়ে বা দেখে মনেই হবে না যে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
ছাড়া সংস্কৃতির অন্য কোনো অর্থ আছে! বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ
বিষয়টি নিয়ে মাথাই ঘামায় না, আর শিক্ষিত লোকদের ধারণা এই রকম।
অনেকে আবার বিষয়টিকে ধর্মবিরোধী বলেও মনে করেন (যেহেতু নাচ গান
ইত্যাদি ধর্মসম্মত নয়)। ধর্মও যে সংস্কৃতিরই অঙ্গ এ কথা শুনলে
সম্ভবত তাদের মাথায় বাজ পড়বে। বাংলাদেশে এই হলো সংস্কৃতি সম্বন্ধে
প্রচলিত ধারণা। তা, সংস্কৃতি-চেতনার এই করুণ হাল কেন? একটা কারণ
হতে পারে_ শব্দটি জনগণের পছন্দ হয় নি, কিংবা গ্রহণযোগ্য মনে হয় নি,
কিংবা বোধগম্য হয় নি। বাংলা ভাষায় শব্দটি চালু করার জন্য
রবীন্দ্রনাথ যে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন তাতে প্রাথমিকভাবে জয়ী হলেও
শেষ বিচারে তাঁর এই বিজয়কে নিস্ফলই বলতে হচ্ছে। অবশ্য সংস্কৃতির এই
ধরনের ইন্টারপ্রিটেশনের জন্য স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও দায়ী করা চলে।
কালচারের প্রতিশব্দ হিসেবে তিনি কৃষ্টিকে পছন্দ তো করেন-ই নি, বরং
তীব্র বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। কৃষ্টি যেহেতু কর্ষন বা কৃষিকাজের
সঙ্গে সম্পর্কিত, এটা তাই তাঁর পছন্দ হয়নি, সংস্কৃতিকে তিনি
নিয়েছিলেন সংস্কার অর্থে । অর্থাৎ মনের কর্ষন নয়, সংস্কারই তার
পছন্দ ছিলো! এ থেকে তাঁর মনোজগতের কাঠামোটিও খানিকটা বুঝে নেয়া
যায়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গ-উপকরণ আর প্রয়োজনকে তিনি
সংস্কৃতির মর্যাদা দিতে চান নি_ হয়তো এগুলোকে তিনি স্থূল হিসেবেই
বিবেচনা করতেন; বরং শিল্পসাহিত্যের মতো সূক্ষতম অনুভূতির চর্চাকে
তিনি সংস্কৃতির মর্যাদা দিয়েছেন [সূত্র:
কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি, নীহাররঞ্জন রায়]। কৃষ্টির বিরুদ্ধে এবং
সংস্কৃতির পক্ষে তিনি কতোটা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন তার
উদাহরণ হিসেবে তাঁর কয়েকটি পংক্তি বিচ্ছিন্নভাবে উল্লেখ করছি_
কাল্চার শব্দের একটা নূতন বাংলা কথা হঠাৎ দেখা দিয়েছে; চোখে পড়েছে
কি? কৃষ্টি? ইংরেজি শব্দটার আভিধানিক অর্থের বাধ্য অনুগত হয়ে ওই
কুশ্রী শব্দটাকে কি সহ্য করতেই হবে? এঁটেল পোকা পশুর গায়ে যেমন
কামড়ে ধরে, ভাষার গায়ে ওটাও তেমনি কামড়ে ধরেছে। মাতৃভাষার প্রতি
দয়া করবে না তোমরা?..ইংরেজি ভাষার চাষ এবং ভব্যতা একই শব্দে চলে
গেছে বলে কি আমরাও বাংলা ভাষায় ফিরিঙ্গিয়ানা করব? ইংরেজিতে
সুশিক্ষিত মানুষকে বলে কালটিভেটেড_ আমরা কি সেইরকম উঁচুদরের
মানুষকে চাষ-করা মানুষ বলে সম্মান জানাব, অথবা বলব
কেদারনাথ?...কালচারড ফ্যামিলিকে প্রকর্ষবান বললে সে পরিবার গৌরব
বোধ করবে। কিন্তু কৃষ্টিমান বললে চন্দনের সাবান মেখে স্নান করতে
ইচ্ছে করবে।...(সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে লেখা চিঠি থেকে, পরিচয়, মাঘ
১৩৩৯)।
সংস্কৃতি বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন সেটাও বোঝা যাবে নিচের অংশটি
পড়লে_
...আমাদের পেট ভরাবার জন্য, জীবনযাত্রার অভাব মোচন করবার জন্যে আছে
নানা বিদ্য, নানা চেষ্টা; মানুষের শূন্য ভরাবার জন্যে, তার মনের
মানুষকে নানাভাবে নানা রসে জাগিয়ে রাখবার জন্যে আছে তার সাহিত্য,
তার শিল্প। মানুষের ইতিহাসে এর স্থান কী বৃহৎ, এর পরিমাণ কী
প্রভূত! সভ্যতার কোনো প্রলয়ভূমিকম্পে যদি এর বিলোপ সম্ভব হয়, তবে
মানুষের ইতিহাসে কী প্রকাণ্ড শূন্যতা কালো মরুভূমির মতো ব্যাপ্ত
হয়ে যাবে! তার কৃষ্টি'র ক্ষেত্র আছে তার চাষে-বাসে আপিসে-কারখানায়;
তার সংস্কৃতির ক্ষেত্র সাহিত্য, এখানে তার আপনারই সংস্কৃতি, সেখানে
তাতে আপনাকেই সম্যকরূপে করে তুলেছে, সে আপনিই হয়ে উঠেছে।
(সাহিত্যতত্ত্ব/সাহিত্যের পথে।)
বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশে সংস্কৃতি সম্বন্ধে যে ধারণাটি প্রচলিত আছে
তা আসলে রবীন্দ্র-কনসেপ্টেরই সমপ্রসারণ। আমরা যদি
রবীন্দ্র-ভাবনাবিশ্ব থেকে বেরিয়ে আসতে চাই, তাহলে বাঙালির
সংস্কৃতিকে বুঝে নেয়ার জন্য তাদের জীবনাচরণের প্রতিটি অনুষঙ্গ
বিচার বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। অর্থাৎ বাঙালির খাদ্যাভ্যাস,
পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ, সংস্কার, বিশ্বাস, ধর্ম, ধর্ম বিশ্বাসের
ধরন, ধর্মাচরণের ধরন, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক, শিল্প-সাহিত্য এসবই
আলাদাভাবে বিচার-বিবেচনার দাবি রাখে। তার আগে, সংস্কৃতি বলতে আমরা
আসলে কী বুঝবো সেটা বলে নেয়া দরকার। অবশ্য সংস্কৃতি সম্বন্ধে যা-ই
বলি না কেন, তা খুব একটা নতুন শোনাবে না। বহু পণ্ডিত ব্যক্তি এ
সম্বন্ধে বিজ্ঞোজনোচিত মতামত রেখেছেন, সংস্কৃতির সংজ্ঞা দিতে গেলে
কমবেশি তাদের কথাই ধার করতে হবে। তাহলে সংজ্ঞা দেয়ার দরকারটা কি?
দরকার এজন্য যে,_ আগেই বলেছি_ সংস্কৃতি বিষয়টি, এমনকি শব্দটিও,
বরাবর বিভ্রান্তি তৈরি করে এসেছে; এ সম্বন্ধে নিজের অবস্থানটি
পরিষ্কার করার জন্যই একেকজন একেকটি সংজ্ঞাকে প্রমিত হিসেবে ধরে
নেন। আমিও একই কারণে সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রচলিত অন্তত কয়েকশ' মতের
মধ্যে দুটোকে আমার মতের কাছাকাছি বলে গ্রহণ করছি। একটি_
culture is the man made part of the environment (হারস্কোভিটস)।
অধ্যাপক পবিত্র সরকার এটিকে ব্যখ্যা করেছেন এভাবে-
মানুষ আসার আগে পৃথিবী যে অবস্থায় ছিলো আর মানুষ আসার পর পৃথিবীর
যে অবস্থা দাঁড়ালো এই দুইয়ের তফাত হলো সংস্কৃতির তফাত। পৃথিবীর
জীবন প্রতিবেশে মানুষের সৃষ্ট যা কিছু সে সবই সংস্কৃতি বাকিটা
প্রকৃতি [সূত্র ঃ লোকভাষা লোকসংস্কৃতি, পবিত্র সরকার]।
এরকম আরেকটি সংজ্ঞাও নেয়া যায়-
Historically created designs for living, explicit and implicit,
rational, irrational and nonrational which exist at any time as
potential guides for the behavior of men (ক্লাইড ক্লাকহোন
ও উইলিয়াম কেলি)।
মানে দাঁড়ালো_ ঐতিহাসিকভাবে সৃষ্টি হওয়া জীবনযাপনের নানা ছক
(ডিজাইন), যা কখনো প্রকাশ্য কখনো গোপন, কখনো যুক্তিসম্মত, কখনো
অযৌক্তিক, কখনো যুক্তি নিরপেক্ষ (অর্থাৎ যেখানে যুক্তি-অযুক্তির
প্রশ্ন তোলাই অবান্তর) এবং যা যে-কোনো সময়ে একটি জনগোষ্ঠীর আচরণকে
পরিচালিত করে তাই-ই হচ্ছে সংস্কৃতি। পবিত্র সরকার যুক্তিসম্মত
উপকরণের উদাহরণ হিসেবে খাদ্য, পোশাক ইত্যাদির উল্লেখ করেছেন,
অযৌক্তিক উপাদান হলো ধর্ম বা সংস্কার-কুসংস্কার (যেহেতু এগুলো
মূলত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যুক্তির ওপরে নয়), আর ভাষা হচ্ছে
যুক্তিনিরপেক্ষ উপাদান।
যা হোক, এ সম্বন্ধে আমার নিজের মতটি হলো_ সংস্কৃতি বলতে একটি জাতির
প্রতিটি অনুষঙ্গকেই বুঝবো আমরা_ পোশাক-আশাক, পেশা, খাদ্যাভ্যাস,
ঘর-বাড়ির প্যাটার্ন থেকে শুরু করে তার
বিশ্বাস-অবিশ্বাস-সংস্কার-কুসংস্কার ইত্যাদি সবই সংস্কৃতির অঙ্গ।
অঅবশ্য এই চিন্তাটি নতুন কিছু নয়। রবীন্দ্রোত্তরকালে, এমনকি তাঁর
জীবদ্দশায়ই বুদ্ধিজীবীরা তাঁর ভাবনাবিশ্ব থেকে বেরিয়ে এসে
সংস্কৃতিকে সামগ্রিক জীবনাচরণ হিসেবে মেনে নিয়েই এর ব্যাখ্যা-
বিশ্লেষণ করতে থাকেন। ৪০-দশকের গোড়ার দিকে (এপ্রিল, ১৯৪১)
বিনয়কুমার সরকার 'বেঙ্গলি কালচার অ্যাজ এ সিস্টেম অব মিউচু্যয়াল
আককুলটুরেশনস' শিরোনামে যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, সেটি বাঙালির
সংস্কৃতি সম্বন্ধে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। গোপাল হালদার,
ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, নিহাররঞ্জন রায় প্রমুখের রচনায় এই নতুন
দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব চোখে পড়ে। আমরা সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসবো।
বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনার জন্য আমরা এর দু-একটি অনুষঙ্গ নিয়ে
প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারি। যেমন, প্রশ্ন করা যায় খাদ্যাভ্যাস নিয়ে।
বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত-মাছ কেন? (সবাই ভাত-মাছ পাচ্ছে কী না
সেটা ভিন্ন প্রশ্ন, পাক আর না পাক তাদের প্রধান এবং প্রিয় খাদ্য যে
ভাত-মাছ সেটা তো আর অস্বীকার করা যাবে না!) কেন ভাত-মাংস নয়? অথবা
রুটি-মাংস নয়? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন নয়। কৃষিপ্রধান একটি
দেশে_ ধান যেখানে প্রধান শস্য_ সেখানে ভাত যে প্রধান খাদ্য হবে তা
আর অস্বাভাবিক কি? আর যে দেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আছে
নদী-নালা-খাল-বিল-হাওড়-পুকুর-দীঘি এবং যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই
প্রচুর মাছের জন্ম হয়_ সেখানে মাছও যে প্রধান খাদ্যতালিকায় স্থান
করে নেবে সে-ও তো বিস্ময়কর নয়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, একটি
জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সেই দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও
ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্টাবলী অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এ দেশের ভূ-প্রকৃতি
যদি পানি প্রধান না হতো, তাহলে মাছ নিশ্চয়ই প্রধান খাবার হতো না!
কোনো মরুপ্রধান অঞ্চলে মাছ প্রধান খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয় বলে
আমার জানা নেই। এরকম প্রশ্ন তোলা যায় পোশাক-আশাক নিয়েও। বাংলাদেশের
মানুষ রুশদের মতো ফারকোট পড়ে না কেন, কিংবা আরবদের মতো আপাদমস্তক
সাদা কাপড়ে ঢেকে চলাফেরা করে না কেন? কারণ_ বাংলাদেশের জলবায়ু বা
আবহাওয়া ওই ধরনের পোশাককে অনুমোদন করে না, কিংবা এই আবহাওয়ায় ওই
ধরনের পোশাক পড়ার দরকার নেই। রুশরা প্রবল শীত থেকে বাঁচার জন্যই
ওরকম পোশাক পড়ে, অন্যদিকে মরুভূমির লু হাওয়া এবং প্রচণ্ড গরম
আবহাওয়া থেকে বাঁচার জন্য আরবদের তাপ প্রতিরোধক সাদা পোশাক পড়তে
হয়। শুধু জলবায়ু বা আবহাওয়াই নয়, প্রকৃতির
রূপ-সৌন্দর্য-বৈশিষ্ট্যও মানুষের স্বভাব-চরিত্র এবং তার
সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। মরুভূমির রুক্ষতাও সুন্দর, যেমন সুন্দর
আগ্নেয়গীরির অগ্নু্যৎপাত কিন্তু দুটোই আগ্রাসী সুন্দর বা
অ্যাগ্রেসিভ বিউটি। যেসব দেশে এগুলো আছে সেখানকার মানুষ যে একটু
রুক্ষ হবে, কিংবা তারা যে আগ্রেসিভ বিউটি পছন্দ করবে তা আর
অস্বাভাবিক কি? অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোমল ও
মায়াময়, এ দেশের মাটি নরম ও উর্বর। এই রুক্ষ ঢাকা শহরেও প্রায়
অবহেলায় যে পরিমাণ গাছ জন্মায় তা পৃথিবীর আর ক-টি শহরে জন্মায় সে
বিষয়ে সন্দেহ আছে। এ দেশের যে দিকেই তাকাবেন, দেখবেন সবুজ, দেখবেন
শান্ত-রূপময়ী নদী। এমন কোমল, মায়াময় প্রকৃতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠা
মানুষগুলো যে একটু আবেগপ্রবণ হবে সে তো বলাই বাহুল্য, পছন্দের
বেলায় অ্যাগ্রেসিভ বিউটির চেয়ে তারা যে সফট বিউটিকেই বেশি গুরুত্ব
দেবে সেটাই তো স্বাভাবিক। নদীমাতৃক এই দেশের নদীনালা-হাওর-বিল যে
শুধু মানুষের খাদ্যাভ্যাস তৈরিতেই ভূমিকা রেখেছে তা নয়, মানুষের
স্বভাব-চরিত্র নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছে। নদীতীরবর্তী বা পানিপ্রধান
অঞ্চলের মানুষ সাধারণত অবৈষয়িক, উদাসীন এবং ভাববাদী ধরনের হয়।
এদেশের বাউল সমপ্রদায়ের উৎপত্তি ও বিকাশের দিকে নজর দিলেও বিষয়টির
সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে। আমাদের বাউলরা প্রায় সকলেই পানিপ্রধান
অঞ্চলের মানুষ। সম্ভবত নদীর মধ্যে ঘর-ছাড়ার একটা ইঙ্গিত আছে, আছে
ভাববাদিতা।
সংস্কৃতি সম্বন্ধে এভাবে অনেক কথাই বলা যায়, বাঙালি সংস্কৃতির ওপর
আমাদের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলীর প্রভাব নিয়েই রচিত হতে পারে
আলাদা একটি প্রবন্ধ, যেমন হতে পারে খাদ্যাভাস, উৎপাদন পদ্ধতি,
উৎসব-পার্বন, পোশাক-আশাক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি নিয়েও।
কিন্তু এই রচনায় আমি বিশেষভাবে কথা বলতে চাই সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে।
অর্থাৎ আমাদের সংস্কৃতির ওপর ধর্মের প্রভাব এবং প্রচলিত ধর্মসমূহের
ওপর আমাদের সংস্কৃতির প্রভাব কী রূপে প্রত্যক্ষ করা যায়, তার একটু
সুলুক-সন্ধান করে দেখতে চাই। বিনয়কুমার সরকারের যে লেখাটির
('বেঙ্গলি কালচার অ্যাজ এ সিস্টেম অব মিউচু্যয়াল আককুলটুরেশনস')
কথা একটু আগে বলেছি সেটিতে তিনি এ বিষয়ে এক গভীর ও সুদুরপ্রসারী
প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। ১৯৪২ সালে এই লেখাটির বাংলা অনুবাদ করেন
ক্ষিতি মুখোপাধ্যায়। শুধু অনুবাদই নয়, রচনাটির অনুপঙ্খু বিশ্লেষণও
হাজির করেন তিনি। এই লেখা ও এর বিশ্লেষণের মূল কথটি হলো সংস্কৃতির
বিনিময়। আককুলটুরেশনস কথাটির ব্যাখ্যা এরকম
কোনো সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতির ভিতর প্রবেশ করিতে থাকিলে দ্বিতীয়
সংস্কৃতিটার অল্পবিস্তত্ম অথবা বেশকিছু রদবদল ঘটিতে থাকে। এই দুই
সংস্কৃতি হইতে সংস্কৃতির নতুন গড়ন বা ছাঁচ গড়িয়া ওঠে।...দুই
সংস্কৃতির মেলামেশার প্রণালীকেই আককুলটুরেশনস বলা যায়।...আর
মিউচু্যয়াল আককুলটুরেশনস মানে পারস্পরিক সংস্কৃতি-বিনিময়, বা
সংস্কৃতির লেনদেন। [সূত্র ঃ বাঙলায় দেশী-বিদেশী (বঙ্গ-সংস্কৃতির
লেন-দেন), বিনয় সরকার, ১৯৪২]
তাঁরা দেখালেন, আদি বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির
বিনিময়ের ফলে নতুন সংস্কৃতির ধরন কীভাবে পাল্টে গেলো। সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটার প্রতি তাঁরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, সেটি হলো
বাংলায় বিভিন্ন ধর্মের প্রবেশ এবং এর প্রভাবে বাঙালি সংস্কৃতির
রূপান্তর, একইভাবে বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাবে বাইরে থেকে আসা
ধর্মগুলোর রূপান্তর। তাঁদের মতে_ শুধু ইসলামই নয়, হিন্দু এবং
বৌদ্ধ ধর্মও বাংলা অঞ্চলের বিদেশী ধর্ম। এইসব ধর্মের আগমনের আগেও
এ অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব কোনো ধর্ম ছিলো _ তারা এর নাম দিয়েছেন
বাঙালি ধর্ম। তাঁরা এ-ও বললেন_ ইসলাম আসার আগে এ অঞ্চলের সমস্ত
মানুষ হিন্দু বা বৌদ্ধ ছিলো_ ঐতিহাসিক এই ধারণাটিই ভুল। বরং এক
বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠি অ-হিন্দু বা অ-বৌদ্ধ রয়ে গিয়েছিলো, বা কেউ
কেউ সেসব ধর্ম গ্রহণ করলেও তা এমনভাবে তাঁদের আদি সংস্কৃরি ছাঁচে
ঢেলে পরিবর্তিত করে নিয়েছিলো যে তাদেরকে বড়জোর নিম-হিন্দু বা
নিম-বৌদ্ধ বলা যায়। ইসলাম আগমনের ফলে এই অঞ্চলের অ-হিন্দু বা
অ-বৌদ্ধ এক বিরাট সংখ্যক লোক, সঙ্গে কিছ্থ হিন্দু এবং কিছু
বৌদ্ধও নতুন ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিসর্জন
দেয়া এ ক্ষেত্রেও ঘটেনি। ফলে প্রত্যেক ধর্মই বাঙালি ধর্মের দাপটে
নিজেদের আদি রূপ খুইয়ে নতুন এক রূপ লাভ করে। এ বিষয়ে তাঁদের মত
বাঙালী হিন্দুরা পরধর্মে দীক্ষাপ্রাপ্ত কনভার্ট মাত্র। ইংরেজ
খৃষ্টিয়ানরা, মিশরের মুসলমানরা, ইরানের মুসলমানরা যেমন পরধর্মে
দীক্ষিত, বাঙালীরাও অবিকল তাই।...হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দুধর্ম
সেকালের বাঙলার 'অনার্য' নর-নারীর পক্ষে বিদেশী জিনিস। কিন্তু
বাঙালী জাত এই বিদেশী ধর্ম ও সংস্কৃতিকে নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতির বশে
আনিয়াছিল। তথাকথিত আর্যধর্ম ও সংস্কৃতি অনার্য সংস্কৃতির প্রভাবে
পড়িয়া অনার্যীকৃত হইয়াছে। ইহাকে বলিব অবাঙালী সংস্কৃতির বাঙালীকরণ।
হিন্দুধর্ম বা বৌদ্ধধর্ম অনায়াসে বাঙালীদের জয় করিয়া লইতে পারে
নাই। বাঙালী ধর্মের নিকটও ইহাদের মাথা নোয়াইতে হইয়াছে।...আর্যধর্ম
যেমন বাঙলাদেশকে জয় করিয়াছে, বাঙালী ধর্ম-ও তেমনি ইহাকে নাজেহাল
করিয়াছে। জয়টা এক তরফা হয় নাই _ ধর্মান্তর বা মতান্তর গ্রহণটা
হইয়াছে পারস্পরিক। বাঙলাদেশে খুব বেশী লোককে পরধর্ম (হিন্দুত্ব)
স্বীকার করানো সম্ভব হয় নাই। অসংখ্য নরনারী অহিন্দু, অর্থাৎ বাঙালী
বা অনার্য রহিয়া গিয়াছিল।...বাঙালীর সৃষ্টিশক্তি ইসলামকেও সহজে পথ
ছাড়িয়া দেয় নাই। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মতো ইসলামকেও বাঙালীদের
নিকট পরাজয় স্বীকার করিতে হইয়াছে। এই সকল ক্ষেত্রে ধর্মের সঙ্গে
সংস্কৃতিকেও বুঝিয়া রাখিতে হইবে।...বিদেশী সংস্কৃতিগুলোর উপর
স্বদেশী সংস্কৃতির প্রভাব গভীরভাবে লক্ষ্য করিবার বিষয়। [সূত্র ঃ
বাঙলায় দেশী-বিদেশী (বঙ্গ-সংস্কৃতির লেন-দেন), বিনয় সরকার, ১৯৪২]
এর ফল কী রকম সুদূর প্রসারী হয়েছিলো তার প্রমাণ হিসেবে বলছেন-
ববাঙালী হিন্দু ও বাঙালী মুসলমানদের আচার-ব্যবহার ও চালচলনে মিল
আছে। কারণ কি? সাধারণের ধারণা_ হিন্দুদের কেহ কেহ মুসলমান হইয়া
যাওয়ায় এইরূপ ঘটিয়াছে। কথাটার ভিতর কিছু সত্য আছে। কিন্তু আসল
কারণ_ হিন্দু ধর্মের মতো মুসলমান ধর্মেও অনার্য বাঙালী আদিম লোকদের
আচার-ব্যবহার আর চালচলন ঢুকিয়া গিয়াছে। হিন্দু ও মুসলমান দুই
ধর্মেই 'বাঙ্লামি'র প্রলেপ পড়িয়াছে। হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের উপর
খাঁটি স্বদেশী সংস্কৃতি দিগবিজয় চালাইতেছে। এই কথাটা মনে রাখিলে
বাঙালী হিন্দু এবং মুসলমানদের রীতিনীতির ভিতর ঐক্য ও সাদৃশ্যগুলো
সহজে বুঝিতে পারিব। দুই সংস্কৃতিই 'বাঙালীকরণের' প্রভাবে অনেকটা
একরূপ দেখাইয়া থাকে। [সূত্র ঃ বাঙলায় দেশী-বিদেশী (বঙ্গ-সংস্কৃতির
লেন-দেন), বিনয় সরকার, ১৯৪২]
অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মের আগমনে আদি বাঙালি সংস্কৃতি তার রূপ পরিবর্তন
করেছে বটে, কিন্তু এই সংস্কৃতি এতটাই শক্তিশালী এবং
আধিপত্যবিস্তারী ছিলো যে প্রবল পরাক্রমশালী হিন্দুধর্ম বা ইসলাম
ধর্মও তাদের নিজেদের 'আদি' রূপ ধরে রাখতে পারেনি, বরং আদি বাঙালি
সংস্কৃতির প্রভাবে দুটো বিপরীত মেরুর ধর্ম কখনো কখনো একইরূপ
প্রদর্শন করতে বাধ্য হয়েছে, এখনও হচ্ছে। লেনদেন হয়েছে বটে, তবে
বাঙালি সংস্কৃতি পরাজয় স্বীকার করেনি।
এ বিষয়ে একটি বিস্তত্মারিত আলোচনা আছে আবু জাফর শামসুদ্দীনের
লোকায়ত সমাজ ও বাঙালী সংস্কৃতি গ্রন্থভূক্ত বাঙালীর সমন্বিত লোক
সংস্কৃতি প্রবন্ধে। তিনি অবশ্য বিনয় সরকারের মতো আর্যপূর্ব বাঙলার
ইতিহাস খুঁজে দেখেন নি, চর্যাপদের সময়কাল থেকে (অষ্টম-নবম
খৃষ্টাব্দ) বর্তমানকাল পর্যন্ত ইতিহাসকে নির্ভর করে বাংলার
লোকজীবনে প্রবহমান সংস্কৃতির সমন্বিত রূপটির ধরন-ধারণ ব্যাখ্যা
করেছেন।
হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে এখনও বাংলাভাষাভাষী অঞ্চলের গান বাজনা
তাল সুর লয় এবং নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্র অভিন্ন। নির্দিষ্ট কয়েকটি
ধর্মানুষ্ঠান এবং মৃত্রে সৎকার প্রভৃতি ব্যতিরেকে বাকী সকল প্রকার
আনন্দোৎসব মেলা প্রভৃতিতে সকলে একত্রিত হয়। লাঠি খেলা, তরবারি ও
রামদার খেলা, হাডুডু ও দাইড়া খেলা প্রভৃতি সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের
ক্রীড়া। বাসগৃহের নির্মাণ কৌশল ভিতরের আসবাব, নকশি কাথা, শয্যা,
তৈজসপত্র, কৃষি যন্ত্রপাতি, অস্ত্র-শস্ত্র সবকিছু অভিন্ন। এ মাঠের
জমিতে সকলে পাশাপাশি চাষ করে এবং একই ফসল ফলায়। উৎপাদন পদ্ধতিও
অভিন্ন। ধর্মীয় বিধানে বিশেষভাবে নিষিদ্ধ কয়েকটি দ্রব্য ব্যতিরেকে
ধর্ম-সমপ্রদায় নির্বিশেষে সকল বাঙালীর খাদ্য তালিকা ও পাক প্রণালী
অভিন্ন।...সকল বাঙালী পলস্নীবাসীর পোশাক পরিচ্ছদ অলংকারপত্র
প্রসাধন দ্রব্য প্রভৃতি আগেও অভিন্ন ছিল, কিঞ্চিত উন্নতির পর এখনও
অভিন্ন আছে। [সূত্র ঃলোকায়ত সমাজ ও বাঙালী সংস্কৃতি আবু জাফর
শামসুদ্দীন] আর্যরা এ দেশে আসার আগেই যে এখানকার জনগণের
স্বাধীন সাংস্কৃতিক জীবন ছিলো তার অনেক প্রমাণের কথা উল্লেখ করে
তিনি বলেছেন_ বাংলার গ্রামগুলো ছিলো স্বয়ংসম্পূর্ণ, বিভিন্ন পেশার
লোকজন এক গ্রামে একসঙ্গে বাস করতো, রাজ-রাজড়াদের উত্থান-পতন তাঁদের
এই স্বাধীন জীবনে খুব কমই প্রভাব ফেলতো। কিন্তু আর্যদের আগমন,
পরবর্তীকালে বৌদ্ধ-হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের আগমন তাদের সাংস্কৃতিক
জীবনে প্রভাব ফেলে। তবে এই প্রভাব যতো না রাজনৈতিক কারণে তারচেয়ে
বেশি দার্শনিক কারণে পড়েছে। যখনই যে ধর্ম এখানে এসেছে, তখনই
এখানকার জনগণ তাদের নিজেদের সুবিধামতো একে 'সংশোধন' করে গ্রহণ
করেছে। তিনি মনে করেন 'ফান্ডামেন্টাল' বলে জগতে কোনো জিনিসই নেই,
এমনকি ইসলাম নিজেও তার জন্ম থেকেই যে 'ফান্ডামেন্টাল' নয়, বরং এতে
তার পূর্ববর্তীকালের অনেক ধর্ম ও সামাজিক আচার ব্যবহারের সুস্পষ্ট
প্রভাব রয়েছে। তিনি অনেকগুলো উদাহরণ দিয়ে সেটি প্রমাণও করেছেন। আর
ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন সম্বন্ধে তাঁর মত
ভারতে যে ইসলাম রাজকীয় ধর্মরূপে পাকাপাকিভাবে প্রবেশ করে সেটা হযরত
মোহাম্মদ (দঃ) প্রবর্তিত আরবমরুর 'নির্ভেজাল' ইসলাম ছিল না। এ
ইসলাম ইরান, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তত্মান প্রভৃতি দেশ পার হওয়ার
কালে সে সব দেশের বহু লোকাচার সহ, প্রবর্তিত হওয়ার ৬০০ বছর পর,
তুর্ক আফগান বিজয়ীদের সঙ্গে আসে। [সূত্র ঃলোকায়ত সমাজ ও বাঙালী
সংস্কৃতি আবু জাফর শামসুদ্দীন] ববাংলাদেশে মুসলমান জনগোষ্ঠীই সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু যে ইসলাম ধর্মের
বিধিবিধান তারা মেনে চলেন, তার স্বরূপটি বুঝে নিতে হলে আমাদের
প্রয়োজন হয়ে পড়ে ইসলামের ইতিহাস নিয়ে কথা বলার। আমি যে ইতিহাসের
কথা বলছি সেটা রাজা বাদশাহদের ইতিহাস নয়_ জনগণের ইতিহাস। মুশকিল
হলো জনগণের ইতিহাস সবসময় অলিখিতই থেকে যায়_ লিখিত ইতিহাসে জনগণ
থাকে বরাবরই উপেক্ষিত, ইতিহাস মানেই যেন রাজ-রাজড়াদের ব্যাপার,
জনগণের যেন কোনো ভূমিকাই ছিলো না ইতিহাসের কোনো পর্বে, কোনো ঘটনায়।
ফলে এই ইতিহাস থেকে জনগণের মন বুঝতে হলে আমাদেরকে অকেখানিই কল্পনার
আশ্রয় নিতে হয়। বিষয়টি অল্প কথায় সারা অসম্ভব, এর জন্য ব্যাপক
আলোচনার প্রয়োজন। কিন্তু এখানে সে সুযোগ নেই বলে খুবই সংক্ষেপে
দু-একটি তথ্য উল্লেখ করবো। প্রথমেই যা বলা দরকার তা হলো_ বাংলা
ভাষাভাষী অঞ্চলে ইসলাম গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে মূলত সুফি-সাধক
ধর্মপ্রচারকদের কারণে, শাসক শ্রেণীর জন্য নয়। শাসকদের ধর্ম দেখে
যারা ধর্ম পরিবর্তন করে তারা আর যাই হোক সাধারণ জনগণ নয়,
উচ্চশ্রেণীর সুবিধাবাদী লোকজন। শাসকদের কাছ থেকে সুদৃষ্টি পাওয়ার
আশায় কেউ কেউ ধর্ম পরিবর্তন করলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এতে কিছুই যায়
আসে না। শাসকদের ধর্ম কি, তা নিয়ে জনগণের কোনো কৌতূহল থাকার কথা
নয়। এ অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো তার
অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্তত তিনটি কারণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
হিসেবে চিহ্নিত করা যায় : ১. ব্রাক্ষ্রণ্যবাদীদের বর্ণভিত্তিক
বিভেদনীতি, অত্যাচার-নিপীড়ন, চাপে ও তাপে সাধারণ জনগণ অতিষ্ঠ ছিলো,
২. ঠিক সেই রকম একটি ক্রান্তিকালে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ও শান্তির
বাণী নিয়ে ইসলাম ধর্ম এদেশে প্রবেশ করেছিলো, এবং ৩. এ বাণী যারা
বহন করে নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা ছিলেন সুফি সাধক_ অনাড়ম্বর জীবনযাপন,
মানুষের মন বুঝে কাজ করা ও কথা বলার ক্ষমতা, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান
দার্শনিক হওয়া সত্ত্বেও নিরহংকারী সন্তের মতো সাধারণ মানুষদের
দুঃখ-দুর্দশা-সংকট-সমস্যার সঙ্গী হতে পারার সহজাত প্রবণতা যাঁদেরকে
এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলো। এ
অঞ্চলের মানুষ যে ইসলাম আগমনেরও বহু আগে থেকেই শান্তিপ্রিয় ছিলো
সেটা বৌদ্ধধর্মের জনপ্রিয়তা দেখেও বোঝা যায়_ ইসলামের আগে
বৌদ্ধধর্মেও শান্তি ও সমপ্রীতির কথা বলা হয়েছিলো। বৌদ্ধদেরকে
হটিয়ে দিয়ে ব্রাক্ষ্রণ্যবাদীদের পুনরুত্থান এবং তাদের একচ্ছত্র
আধিপত্য এ অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় মানুষ মন থেকে মেনে নিয়েছিলো এবং
বৌদ্ধধর্মের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছিলো_ এমনটি মনে করার
কোনো কারণই নেই। কিন্তু রাজশক্তি-সামাজিক শক্তির বিরুদ্ধে তাদের
কিছু করারও ছিলো না। শান্তির বাণী নিয়ে আগত ইসলামকে তারা দেখেছিলো
নতুন আশ্রয় হিসেবে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে_ সুফিরা যে ইসলাম নিয়ে
এসেছিলেন তা আরবে উদ্ভাবিত মূল ইসলাম নয়, বরং দার্শনিকভাবে
অনেকখানি পরিবর্তিত ও আচারসর্বস্বতা-বর্জিত ইসলাম। সুফিবাদের জন্ম
মূলত পারস্যে, মূল ইসলাম ওখানে গিয়ে অনেকখানি পরিবর্তিত হয়ে যায়;
আবার এই সুফিরা যখন ভারতবর্ষে এলেন সেই সুফিবাদেরও খানিকটা
পরিবর্তন সাধন করতে হলো। কোনো দর্শনই যে দেশকালের পরিপ্রেক্ষিতে
তার অবিকৃত রূপ ধরে রাখতে পারে না_ এই প্রগতিশীল ধারণাটি সুফিদের
মধ্যে ছিলো; তাই তাঁরা ভারতবর্ষে এসে এই জনগোষ্ঠীর মন বুঝতে চেষ্টা
করলেন। এবং আবিষ্কার করলেন_ এই জনগোষ্ঠীর কাছে ইসলামকে গ্রহণযোগ্য
করতে হলে প্রেমের কথা বলতে হবে, ভক্তির কথা বলতে হবে_ কারণ এ
অঞ্চলে দুটোরই জয়জয়াকার। অতএব সুফিবাদ নিজেকে খানিকটা বদলে নিলো_
মানুষের কাছে তারা বলতে লাগলেন প্রেমের কথা, বোঝাতে লাগলেন
স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক দ্বন্দ্বের নয়, প্রেমের। একমাত্র
প্রেমের মাধ্যমেই পাওয়া যাবে স্রষ্টাকে_ অন্য কোনোভাবে নয়। প্রেম ও
ভক্তির এই কথাগুলো এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আগে থেকেই পরিচিত ছিলো_
তার সঙ্গে যুক্ত হলো মানুষে-মানুষে সমতার কথা, ভ্রাতৃত্বের কথা,
সমান অধিকারের কথা, শান্তি ও সমপ্রীতির কথা। তরবারী দিয়ে নয়, কঠোর
ধর্মীয় আচারসর্বস্বতা দিয়ে নয়, ভয়-ভীতি-হুংকার দিয়েও নয়_ স্রেফ
শান্তি-সমপ্রীতি-মানবতা-সাম্য-প্রেম-ভক্তি-ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদির কথা
বলে সুফিরা জয় করে ফেললেন একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে। এমনকি
রাজশক্তি-সামাজিক শক্তি বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কোনোরকম
দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হয়েই তাঁরা সেটা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁদের
দার্শনিক প্রজ্ঞার কারণে। এ অঞ্চলে ইসলামের জয়ের ইতিহাস বলতে
বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের কাহিনী বোঝায় না, বোঝায় এই দার্শনিক
বিজয়ের ইতিহাস। আর এই ইতিহাস না জানলে বাঙালি মুসলমানের মনোজগৎ
বোঝা সম্ভব নয়। এই রচনায় বিষয়টি নিয়ে বিস্ততৃত আলোচনার অবকাশ নেই,
মোদ্দা কথা হলো_ এ দেশের মানুষের মনোজগতে আছে
শান্তি-সমপ্রীতি-ভ্রাতৃত্ব-মানবতা ও সাম্যের প্রতি প্রেম। কোনো
মৌলবাদী কঠোর কঠিন তত্ত্ব দিয়ে তাদেরকে জয় করা যায় নি_ ভবিষ্যতেও
যাবে না।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের ভাষায়-
ফান্ডামেন্টাল বলে কোনো বস্তু মানবজাতির সামাজিক জীবনে কোন কালে
ছিল না, সুতরাং তার পুনঃপ্রবর্তন প্রচেষ্টাও সাফল্যমন্ডিত হওয়ার
নয়। [সূত্র ঃলোকায়ত সমাজ ও বাঙালী সংস্কৃতি আবু জাফর শামসুদ্দীন]
ককিন্তু চেষ্টাটি বহুকাল থেকেই চলছে, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে
এখন পর্যন্ত একদল ধর্মান্ধ লোক ও কয়েকটি সামপ্রদায়িক রাজনৈতিক দল এ
দেশকে একটি ধর্ম-রাষ্ট্রে পরিণত করার দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে।
সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোও তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয়-সমর্থন দিয়ে
চলেছে। এমনকি প্রগতিশীলতার মুখোশ পড়ে কিছু ছদ্মবেশী বুদ্ধিজীবীও
তাদের এই প্রচেষ্টার সঙ্গে সামিল হয়েছেন। তাদের এই চেষ্টা অব্যাহত
থাকবে বলেই ধরে নেয়া যায়। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির যে হাজার বছরের
ইতিহাস তাতে নিশ্চিত করেই বলা যায়, একে পরাজিত করা যাবে না। বাঙালি
তাদের সংস্কৃতিকে চিরকাল অপরাজেয় রূপে দেখতে চেয়েছে, আর চেয়েছে
বলেই পরাজিত হতে দেয় নি। এই এতকাল পর এসে তাদেরকে পরাজিত করা যাবে,
এটা কোনো মূর্খ ছাড়া আর কে-ই বা ভাববে!
|
| |
 |
|