কেন লেখেন? _ লেখকদের উদ্দেশ্যে উচ্চারিত এই
অতি প্রচলিত প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো জবাব আজ পর্যন্ত কেউ দিতে
পেরেছেন বলে মনে হয় না। প্রতিটি লেখকই জীবনের কোনো-না-কোনো সময়ে
প্রশ্নটির মুখোমুখি হন, একটা কিছু উত্তরও দেন _ এভাবে বলা হয়েছে
অনেক কথাই, কিন্তু একজন লেখক কেন লেখেন আজ পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে
সেটা বোঝা যায় নি। কেউ কেউ আবার প্রশ্নটি শুনলে রেগে যান। একজন
লেখক, এই মুহূর্তে নাম মনে পড়ছে না, একবার এই প্রশ্ন শুনে রাগ করে
বলেছিলেন _ 'প্রশ্নটি তো অন্য কাউকে করা হয় না! দৈনন্দিন জীবন
যাপনের বাইরে কত মানুষ কত কিছু করে _ গান গায়, গান শোনে, ছবি আঁকে,
ছবি তোলে, সিনেমা বানায়, খেলাধুলা করে, বই পড়ে _ তাদেরকে তো এসব
কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হয় না! লেখককেই কেন শুধু করতে হয়?
লেখালেখি কি কোনো অপরাধ?' কেউ কেউ আবার প্রশ্নটি শুনে হেঁয়ালি
করেন। যেমন জগদীশ গুপ্ত বলেছিলেন _ তাঁকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখলেই
তাঁর স্ত্রী তাঁকে বাজারে পাঠাতেন, একবার পান আনো তো একবার চুন,
একবার মরিচ আনো তো একবার পেঁয়াজ! অথাৎ তাঁর স্ত্রী তাঁর বসে থাকাটা
পছন্দ করতেন না। বাজারে যাওয়ার এই নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়ার
জন্য তিনি একদিন কাগজ-কলম নিয়ে লেখার ভান করছিলেন! সেদিন তাঁর
স্ত্রী কয়েকবার দরজায় উঁকি দিয়ে তাঁকে 'ব্যস্ত' দেখে ফিরে
গিয়েছিলেন। তিনি দেখলেন _ এভাবে কাগজ-কলম নিয়ে 'বসে' থাকলে বাজারে
যাওয়ার নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, আর বসে থাকতে থাকতেই নাকি
তিনি গল্প লিখতে শুরু করেছিলেন! খামোখা তো আর কাগজ-কলম নিয়ে বসে
থাকা যায় না, একটা কিছু লিখতে হয়, তাই লেখেন _ প্রকৃত কারণটি
হচ্ছে, বাজারে যাওয়ার নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য লেখেন!
ডাহা মিথ্যে কথা _ বলাই বাহুল্য। আসলে তাঁর কাছে প্রশ্নটির কোনো
উত্তর ছিলো না, কিংবা থাকলেও দিতে চান নি। অবশ্য সবাই রেগে যান বা
হেঁয়ালি করেন _ তা নয়, কেউ কেউ সিরিয়াসলি প্রশ্নটির উত্তর দেয়ার
চেষ্টা করেন, কেউ কেউ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান
_ কিন্তু এতসব ব্যাখ্যার পরও একজন লেখক লেখেন কেন তার কোনো
সর্বজনগ্রাহ্য সদুত্তর পাওয়া যায় নি।
কিন্তু একজন লেখককে কেনই-বা এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়?
সৃজনশীলতার অন্যান্য শাখায় যাঁরা কাজ করেন তাঁদেরকে তো এত প্রশ্ন
করা হয় না! অসাধারণ সৃজনশীল কোনো চিত্রকরকে সচরাচর প্রশ্ন করা হয়
না যে, তিনি আঁকেন কেন? সৃজনশীলতার সবচেয়ে রহস্যময়-অব্যাখ্যাত এবং
অসামান্য শাখা সঙ্গীত, বিশেষ করে সুর-সৃষ্টি একটি তুলনাহীন
ব্যাপার, কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত কোনো সুরকারকে এ প্রশ্নের মুখোমুখি
হতে দেখি নি যে, তিনি সুর করেন কেন, আর এ সুর তিনি পানই-বা কোথায়?
সম্ভবত অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে লেখালেখি সম্বন্ধে মানুষের কৌতূহল
বেশি _ একটি কবিতা বা গল্প বা উপন্যাস হয়তো পাঠককে বিস্মিত করে,
পাঠকরা ওইসব লেখায় কোনো-না-কোনোভাবে নিজেদেরকে খুঁজে পেয়ে অবাক হয়ে
ভাবেন, তার অপরিচিত এই লেখকটি কীভাবে তার কথাটিই লিখলেন! ভাবেন, সব
মানুষই তো শব্দ ব্যবহার করে, লেখকের শব্দে কেন এত মাধুর্য থাকে,
কীভাবে তিনি একটির পর একটি শব্দ সাজিয়ে একটি অসামান্য শিল্প
নির্মাণ করেন! এ বিষয়ে শুধু যে পাঠকের মনেই গভীর কৌতূহল থাকে তা
নয়, থাকে লেখকের মনেও। আমার ধারণা, সব লেখকই জীবনের কোনো-না-কোনো
মুহূর্তে অবাক হয়ে ভাবেন _ এত কাজ থাকতে তিনি পৃথিবীর কঠিনতম শিল্প
মাধ্যমে এলেন কেন? লেখালেখি ব্যাপারটি একজন লেখকের জন্য কঠিনতম
শাস্তি (ভুলে যাচ্ছি না এটা তার জন্য এক গভীরতম আনন্দও বটে) _
লিখতে শুরু করার পর থেকে মৃতু্যর আগ পর্যন্ত, এমনকি মৃতু্যর পরও,
অভিশাপের মতো এই শাস্তি তাকে বহন করে যেতে হয়। কি রকম? প্রথমেই আসে
একটি লেখাকে 'লেখা'র মর্যাদায় নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন। যেনতেন প্রকারে
হেনতেন কিছু একটা লিখলেই তো হলো না! উদাহরণ হিসেবে এ সময়ের একজন
লেখকের কথা ভাবুন _ লেখক হয়ে উঠতে চাইলে তাকে তার পূর্বসূরি সমস্ত
লেখকের কথা মনে রাখতে হবে; তাঁদের বিষয়-প্রকরণ-ভাষা থেকে নিজেকে
সরিয়ে নিতে হবে নিরাপদ দূরত্বে (এটা সে না-ও করতে পারে, সেক্ষেত্রে
নিজস্ব একটি কণ্ঠস্বর নির্মাণ করতে প্রচুর সময় লাগবে তার, কিংবা
আদৌ কোনোদিন সেটা নির্মাণ করা সম্ভব হবেনা তার পক্ষে)। ভেবে দেখুন
_ বেচারা তরুণ লেখক খামোখাই নিজের কাঁধে কী কঠিন দায়িত্ব তুলে
নিয়েছে! প্রশ্ন হচ্ছে _ কেউ তো তাকে বলে নি অমন একটি দায়িত্ব নিতে
_ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সে তা নিলো কেন? এখানেই শেষ হলেও না হয় কথা
ছিলো, শেষ তো নয়ই, বলা যায় তার যন্ত্রণার শুরু হলো মাত্র। কারণ _
চাইলেই তো আর লেখা হয় না, লেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অবশ্য একথা
সবার জন্য সত্যি না-ও হতে পারে _ পৃথিবীর অনেক লেখকই লেখার জন্য
অপেক্ষা করেন না, তারা তাদের মস্তিস্কে একটি মেশিন ফিট করে নিয়েছেন
_ চাইলেই যে কোনো সময় দু-চারটে গল্প-কবিতা এমনকি উপন্যাস পর্যন্ত
নামিয়ে দিতে পারেন! তবে এসব লেখা ছকে ফেলা, ছাঁচে ঢালা _ সমকালে
কতিপয় অগভীর পাঠকের কাছে এগুলো গৃহীত হলেও অল্পদিনের মধ্যেই তা
হারিয়ে যায়। কিন্তু যে কবিতা মানুষ যুগের পর যুগ ধরে মনে রাখে _
অন্তরস্থ বা কণ্ঠস্থ করে রাখে; যে গল্প যুগের পর যুগ ধরে মানুষকে
আলোড়িত করে, যে উপন্যাস বহুকাল ধরে মানুষের জীবনকে নতুন মাত্রা এনে
দেয় _ আমি সেগুলোর কথা বলছি। এসব লেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
অপেক্ষা মানে সাধনা। 'আমার সকল লয়ে বসে আছি'র মতো অপেক্ষা। এ-ও কি
কম কষ্টের? পৃথিবীতে কত আনন্দদায়ক ঘটনা আছে, উজ্জ্বতম বস্তু আছে _
সেগুলোর জন্য অপেক্ষা করাও আনন্দের। অপেক্ষা করা ভালো প্রেমের
জন্য, ভালো অর্থ-কীর্তি-স্বচ্ছলতার জন্য অপেক্ষা, সেসবের জন্য না
করে কেউ কেউ কেন লেখার মতো একটি 'বিপন্ন বিস্ময়ের' জন্য অপেক্ষা
করেন কে জানে! কিন্তু এখানেও শেষ নয় _ ধরা যাক, লেখা এলো, লেখক তার
সাধ্য-অনুযায়ী লিখেও ফেললেন _ তারপরই শুরু হয় লেখক স্বভাবের সঙ্গে
যায় না এমন সব বিষয়ের উৎপাত। যেমন, লেখাটি প্রকাশ করা _ একজন
সত্যিকারের লেখকের জন্য সম্পাদকের মতো ভীতিকর প্রাণী আর কি হতে
পারে? অথচ তাঁকে সেটিরও মুখোমুখি হতে হয়! আর যদি ভুলক্রমে একটি বই
তাঁর প্রকাশিত হয়েই পড়ে, তাহলে নিয়তি-নির্ধারিত অভিশাপের মতো তার
দায় তাঁকে সারাজীবন ধরে বহন করে যেতে হবে! বই হচ্ছে লেখকের জন্য
একটা ফাঁদ _ সারাজীবন ধরে, এমনকি মৃতু্যর পরও, সমালোচিত হওয়ার জন্য
একটা স্বেচ্ছাকৃত ব্যবস্থা। একজন লেখককে অনিবার্যভাবেই এক বা
একাধিক গ্রন্থের জনক হতে হয়, আর একেকটি বইয়ের পেছনে থাকে তাঁর
যন্ত্রণাদগ্ধ হবার ইতিহাস, থাকে অপেক্ষা ও সাধনার ইতিহাস, থাকে
অবিরল রক্তক্ষরণের গল্প, কিন্তু তাঁর এতসব রক্তক্ষরণের খবরই নেয় না
কেউ (এ-কি তাহলে অভিশাপ নয়?)। 'কিচ্ছু হয়নি' বলে খারিজ করে দেবার
মতো বহু 'জ্ঞানী' লোক তাঁর আশেপাশেই ঘুরঘুর করে।
এই জ্ঞানী মানুষদের নিয়েই যত সমস্যা। পৃথিবীতে যাঁরা বড় মানুষ বলে
পরিচিত তাঁরা দু-ধরনের হয় _ জ্ঞানী ও ধ্যানী। ধ্যান ও জ্ঞান
একসঙ্গে যেতেই চায় না; দুটো দুই গুরুত্বপূর্ণ পৃথিবীতে বাস করে;
তবে পৃথিবী দুটো সমান্তরাল _ তাদের দেখা হয় বটে, মিলন হয় না কখনো।
জ্ঞানীরা কখনো ধ্যানের দেখা পান না, ধ্যানীরা জ্ঞানের দেখা পান
বটে, জ্ঞানের চর্চাও করেন, কিন্তু সেইসব জ্ঞান যদি ডমিনেটিং হয়ে
ওঠে, তাহলে তাঁদের ধ্যান-জগৎ ক্ষতিগ্রস্থ হয় _ অর্থাৎ ধ্যানমগ্ন
হওয়ার জন্য জ্ঞান একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। জ্ঞানীদের পক্ষে
সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠা কঠিন, তবে ধ্যানীদের পক্ষে জ্ঞানী হয়ে ওঠা সম্ভব
_ তারচেয়ে বড় কথা, ধ্যানীরাই নতুন জ্ঞানের জন্ম দেন। পৃথিবীতে আজ
পর্যন্ত যতটুকু জ্ঞানের জন্ম হয়েছে সবই ধ্যানীদের সৃষ্টি। কোনো
জ্ঞানী মানুষকে নতুন জ্ঞানের জন্ম দিতে দেখা যায় না। জ্ঞানের
চর্চা, বড় জোর দু-একটু বিশ্লেষণেই তাঁদের প্রতিভা নিঃশেষিত হয়ে
যায়। সম্ভবত জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার মধ্যে একটা সূক্ষ বিরোধ আছে।
সচরাচর তা টের পাওয়া যায় না _ টের পান সৃজনশীলরা। তাঁরা যত বেশি
জ্ঞান অর্জন করেন তত বেশি সৃষ্টিহীনতায় ভোগেন। এমনকি অনেক
সৃষ্টিশীল ব্যক্তির সৃজনশীলতার মৃতু্য ঘটে গেছে জ্ঞান লাভ করতে
করতে। কথাটা বিপদজনক _ সৃজনশীল কেউ ব্যাপারটা বিশ্বাস করে ফেললে
তিনি জ্ঞানের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। সেটা খুব বেশি
সুবিবেচেনার কাজ হবে না। সৃজনশীলদের মনে রাখা দরকার _ তাঁর জন্য
ধ্যান ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ধ্যানস্থ হবার ক্ষমতা তাঁকেই
অর্জন করতে হবে, একবার সেই ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে জ্ঞান আর তাঁর
সৃজনশীলতার পথে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। মোট কথা জ্ঞানজগৎ
যেন তাঁর ধ্যানজগৎকে ডমিনেট না করে। কিন্তু জ্ঞানীরা কি করবেন?
আগেই বলেছি _ জ্ঞানীদের পক্ষে ধ্যানী হওয়া কঠিন। আর কঠিন বলেই
তাদের পক্ষে সৃষ্টিশীল হওয়া প্রায় অসম্ভব। এরকম উদাহরণ আপনি আপনার
চারপাশে তাকালেই দেখতে পাবেন। আপনার অসম্ভব জ্ঞানী বন্ধুটি _ যার
কথা শুনলে দু-চারটে বই পড়ার পরিশ্রম বেঁচে যায় _ লেখেন না! বলা
উচিত, লিখতে পারেন না। কারণ, লিখতে গেলে তাবৎ জ্ঞান এসে তাকে
আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। আমাদের সামনে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ তো
আছেই। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। প্রায় তিন যুগ ধরে এদেশের জ্ঞানজগৎকে
নেতৃত্ব দেয়া এই মহান মনীষী কিছুই লেখেন নি। কেন লেখেন নি সে
সম্বন্ধে আহমদ ছফা একটি ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আবদুর
রাজ্জাক সাহেব তাঁর যৌবনে ট্রটস্কির 'থিয়োরি অব পার্মানেন্ট
রেভু্যলু্যশন' বাংলায়, এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বাংলার ব্রত'
ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন _ এই তথ্য জানিয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন :
'রাজ্জাক সাহেব সারাজীবনে কিছু লেখেননি কেন সে নালিশ আমি সকলের
কাছে অহরহ শুনে আসছি। রাজ্জাক সাহেব উল্লেখ করার মতো কিছু লেখেননি
কেনো, সে কৈফিয়ত একমাত্র তিনিই দিতে পারেন। তাঁর হয়ে কিছু বলা আমার
উচিত হবে না। তথাপি আমি আমার যে ধারণা জন্মেছে, সেটা বলতে পারি।
যৌবনে যে মানুষ ট্রটস্কির থিয়োরি অব পার্মানেন্ট রেভু্যলু্যশনের
বাংলা এবং অবন ঠাকুরের ইংরিজি অনুবাদ করেছেন, সেই মানুষের পক্ষে
অন্য কোনো মামুলি বিষয়ে কাজ করা অসম্ভব ছিলো। তাঁর মানসিক সূক্ষতার
এমন একটা সমুন্নত উত্তরণ ঘটেছিল, সেখান থেকে তৎকালিন বিদ্যাচর্চার
স্তরটিতে নেমে আসা সত্যি সত্যি দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।' আহমদ ছফার
এই ব্যাখ্যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় নি। 'কোনো মামুলি বিষয়ে
কাজ করা অসম্ভব ছিলো' _ তো তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করেন নি
কেন? 'তৎকালিন বিদ্যাচর্চার স্তরটিতে নেমে আসা সত্যি সত্যি দুরূহ
হয়ে দাঁড়িয়েছিলো' _ তো সেখান থেকে উঁচুতে উঠে যান নি কেন? তাঁকে তো
কেউ মামুলি কাজ করতে বলে নি, বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে নিষেধ করে
নি, তাঁকে তো সমকালীন বিদ্যাচর্চার স্তর থেকে উঁচুতে উঠে যেতেও
নিষেধ করে নি কেউ, বরং সেটাই তাঁর কাছে প্রত্যাশিত ছিলো, কেউ তাঁকে
বলেও নি যে, আপনি নিচে নেমে এসে লিখুন _ তাহলে? আহমদ ছফার কথা শুনে
মনে হয় _ ট্রটস্কির 'থিয়োরি অব পার্মানেন্ট রেভু্যলু্যশন' আর অবন
ঠাকুরের 'বাংলার ব্রত'ই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ সৃষ্টি!
এরপরে এরচেয়ে মহৎ কিছু সৃষ্টি হয় নি, বা কোনোদিন হবেওনা; এবং
এজন্যই এরচেয়ে নিচে নেমে আসা রাজ্জাক সাহেবের পক্ষে সম্ভব ছিলো না
তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণে, আর এর চেয়ে মহৎ কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব
ছিলো না তাঁর প্রতিভার কারণে! কথাটা শুনতে যেন কেমন লাগে! একটি
দেশের জ্ঞান-জগৎকে তিন যুগ ধরে নেতৃত্ব দেয়া এত বড় একজন মনীষী
সারাজীবন ধরে মাত্র ওই দুটো বইয়ের কাছে বন্দী হয়ে ছিলেন কথাটা
ভাবতেও অস্বস্তি লাগে। যাহোক, এটা যেহেতু রাজ্জাক সাহেবের নিজের
কথা নয়, আহমদ ছফার বক্তব্য, অতএব এটাকেই চূড়ান্ত বলে মেনে না নিলেও
চলে। আমার তো মনে হয়, লেখালেখির জন্য যে পরিমাণ ধ্যান ও মগ্নতার
প্রয়োজন হয় _ রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে তার কখনো দেখাই হয় নি, বা হলেও
তাঁর জ্ঞান-জগৎ এত বেশি শক্তিশালী/প্রভাবশালী/ডমিনেটিং ছিলো যে, তা
তাঁর ধ্যান জগৎকে ম্লান করে দিয়েছিলো। জ্ঞান একজন সৃষ্টিশীল
মানুষের সৃজনশীলতার পথে কিরকমভাবে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এটি তার
একটি উদাহরণ।
২.
আমরা বোধহয় প্রসঙ্গ থেকে দূরে চলে এসেছি। অবশ্য দূরে এলেও ক্ষতি
নেই কোনো _ প্রসঙ্গটি যেহেতু লেখালেখি নিয়ে, ধ্যান-জ্ঞানের কথা তাই
আসা দরকার। তবু আমরা মূল প্রসঙ্গে ফিরি। মানুষ লেখে কেন এই ছিলো
প্রশ্ন। লেখকদের কথাবার্তা বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় _ এঁদের
প্রায় প্রত্যেকে ছোটবেলায় পড়ুয়া ছিলেন _ মানে বইয়ের পোকা ছিলেন।
পড়তে পড়তেই তাঁরা একসময় লেখার তাগিদ অনুভব করেছেন। আমার এই কথাটি
আগের কথার সঙ্গে বিরোধ তৈরি করবে _ জানি। বই পড়ে মানুষ তো জ্ঞানীই
হয় _ আর আগেই বলেছি, জ্ঞানীরা লেখক হতে পারেন না _ তাহলে এই লেখকরা
লেখা শুরু করলেন কেন? কিংবা প্রশ্নটা এভাবেও করা যায় _ তারা জ্ঞানী
না হয়ে লেখক হলেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে আমাদের আরেকটা
বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে। এ কথা সবাই জানেন, অভিজ্ঞতা দু-ধরনের _
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মানুষ অর্জন করে নিজের
জীবন থেকেই। দৈনন্দিন জীবনযাপন, নানাধরনের সম্পর্ক, নিজের জীবনের
বাইরেও অন্যান্য মানুষের জীবন, পরিপাশ্বর্ের ঘটনাবলী ইত্যাদি থেকে
যেসব অভিজ্ঞতা মানুষ অর্জন করে _ সেগুলো প্রত্যক্ষ। আর পরোক্ষ
অভিজ্ঞতা? সেটা অর্জিত হয় বইপত্র, নাটক-সিনেমা, সঙ্গীত, চিত্রকলা
ইত্যাদি থেকে। কিন্তু পরোক্ষ অভিজ্ঞতার প্রধান অংশটি অর্জিত হয় বই
পড়েই। এই অভিজ্ঞতা আবার একজন মানুষকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের
ব্যাপারে গভীরভাবে সহায়তা করে। সেটা কি রকম? বই আসলে মানুষের
ভেতরের চোখ, অর্থাৎ অন্তদর্ৃষ্টি, খুলে দেয়। ফলে একটি ঘটমান ঘটনা
দেখে একজন অ-পড়ুয়া মানুষ সেটাকে যেভাবে উপলব্ধি করে, গ্রহণ করে,
বিশ্লেষণ করে _ পড়ুয়া মানুষটির উপলব্ধি-গ্রহণ-বিশ্লেষণ হয় তার থেকে
পৃথক। শুধু পৃথক বললে কম বলা হয় _ এই উপলব্ধি অনেক গভীর,
অতলস্পর্শী। একই ঘটনার ব্যাখ্যা বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্নরকম
হতে পারে, একথা যেমন সত্যি তারচেয়ে বড় সত্যটি হচ্ছে _ যার ভেতরে
চোখ খোলা তার ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে গভীর, বিশ্লেষণধর্মী, ব্যতিক্রমী।
সেই ব্যাখ্যা তিনি অন্য কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন, না-ও করতে
পারেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা হিসেবে এটা তার ঝুলিতে জমা পড়ে। এইভাবে
অভিজ্ঞতাগুলো জমতে জমতে একসময় তা এত ভারি হয়ে ওঠে যে, যে-কোনো
মানুষের পক্ষেই সেই ভার বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। একমাত্র
অন্য মানুষের সঙ্গে শেয়ার করার মাধ্যমেই এই ভার থেকে খানিকটা
মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই মানুষ কোথায় যে বসে বসে আপনার
এতসব অভিজ্ঞতার কথা শুনবে? এত সময় কোথায় তার, দায়ই-বা কি? ফলে
অভিজ্ঞতালব্ধ মানুষটিকে অভিজ্ঞতার অকথ্য যন্ত্রণা পোহাতে হয়।
অভিজ্ঞতার যে যন্ত্রণা আছে, যত বেশি অভিজ্ঞতা তত বেশি যন্ত্রণা _
একথা অভিজ্ঞতালব্ধ মানুষমাত্রই জানেন। এই যন্ত্রণার লাঘব ঘটানোর
জন্যই এর প্রকাশ জরুরী হয়ে পড়ে _ আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশটা ঘটে
লেখালেখির মাধ্যমে। অন্যান্য মাধ্যমে এটা প্রকাশ করার সুযোগ কম।
কিন্তু প্রশ্ন হলো অভিজ্ঞতার যন্ত্রণা কি শুধু সৃজনশীল লোকেরাই
পোহান, অন্যরা _ যাঁরা বই পড়ে জ্ঞানী হন _ পোহান না? বলাইবাহুল্য,
পোহান। কিন্তু এঁদের মধ্যে ভার বহন করার দুর্লভ ক্ষমতা থাকে, অসহ্য
যন্ত্রণা সহ্য করার অসামান্য ধৈর্যশক্তি থাকে _ সৃজনশীল লোকের সেটা
থাকেনা। এই দিক থেকে জ্ঞানীরা সৃজনশীলদের চেয়েও মহান। আর এ থেকে এই
দু-ধরনের মানুষের মানসকাঠামোও বুঝে নেয়া যায়। সৃজনশীলরা আবেগতাড়িত
ও স্পর্শকাতর, জ্ঞানীরা বুদ্ধিতাড়িত ও যুক্তিবাদী। সৃজনশীলরা
অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করেন আবেগ মিশিয়ে, জ্ঞানীরা যুক্তি ও
বুদ্ধি দিয়ে।
জ্ঞানীরা তাদের অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রকাশ করেন না বলে, তাদের লব্ধ
জ্ঞানগুলো রয়ে যায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে, ব্যাপক মানুষের কাছে ছড়িয়ে
পড়ার সুযোগ পায় না। ফলে মৃতু্যর পর অচিরেই মানুষের স্মৃতি থেকেও
তাঁদের মৃতু্য ঘটে _ আর তাই তাঁদের মহত্ত্বের গল্প কিছুদিন লোকমুখে
ছড়িয়ে থাকার পর একসময় স্বাভাবিক নিয়মেই হারিয়ে যায়। অন্যদিকে
সৃজনশীল লোকেরা তা প্রকাশ করেন বলেই, মৃতু্যর পরও সেসব রয়ে যায় আর
সেগুলোই নতুন জ্ঞান হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
৩.
তবে কি শুধুমাত্র যন্ত্রণালাঘবের জন্যই লেখকরা লেখেন, অন্য কোনো
প্রাপ্তি নেই তাঁদের? আছে। গভীরতম এক আনন্দ আছে। সৃষ্টির আনন্দ।
পৃথিবীতে সৃষ্টির আনন্দের চেয়ে গভীর, তীব্র কোনো আনন্দ নেই।
সৃষ্টির মুহূর্তের চেয়ে উজ্জ্বলতম কোনো মুহূর্ত নেই মানুষের জীবনে।
কোনোকিছুর সঙ্গেই এর তুলনা চলে না। তবু যদি তুলনা করতেই হয় তো বলতে
হবে _ দম্পতির প্রথম সন্তান জন্মের আনন্দের কথা। কিন্তু দাম্পত্য
জীবনে সন্তানের জন্মটা যেহেতু প্রায় অনিবার্য আর স্বাভাবিক ঘটনা
বলে ধরে নেয়া হয়, অন্যদিকে লেখকের জন্য লেখার জন্ম নেয়াটা অনিবার্য
নয় _ হতেও পারে না-ও হতে পারে, তাই তুলনাটি যথার্থ হয় না।
উদাহরণটিকে বরং আরেকটু কঠিন করে তোলা যাক। ধরা যাক, দাম্পত্য জীবন
শুরু করার বহুদিন পরও কোনো এক দম্পতির সন্তান হচ্ছে না। বহু
চেষ্টা-তদবির, বহু চিকিৎসা, বহু ডাক্তার-কবিরাজ-পীর-ফকির ধরেও কোনো
কাজ হচ্ছে না। সেই মুহূর্তে কোনো এক অলৌকিক ইশারায় যদি তাদের একটি
সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে তাদের আনন্দটি কেমন হবে? নিশ্চয়ই
স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি! একজন লেখকের জন্য একটি সফল লেখার জন্ম
ওই সন্তান জন্ম নেয়ার চেয়েও অনেক বেশি। এই তীব্র আনন্দের লোভ একজন
লেখককে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। কিন্তু যন্ত্রণা লাঘব আর তীব্র আনন্দ লাভ
_ এ দুটোই হয়তো সব নয়। সব মানুষের মধ্যেই অমরত্বের তৃষ্ণা আছে।
মানুষ নিজেকে প্রবাহিত দেখতে চায়, বাঁচিয়ে রাখতে চায় তার পরবর্তী
প্রজন্মের মধ্যে দিয়ে। লেখকরাও নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে চান তাঁদের
লেখার মধ্যে দিয়ে। তাহলে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি, তীব্র আনন্দ লাভ আর
অমরত্বের লোভই কি সব? সম্ভবত এগুলোই প্রধান। তবে এর সঙ্গে যুক্ত
হতে পারে অর্থ, যশ, খ্যাতি ইত্যাদির লোভও। এগুলো অবশ্য মূল নয়,
কেবল অর্থের জন্য, যশের জন্য, খ্যাতির জন্য কারো পক্ষে ক্রমাগত
লিখে যাওয়া সম্ভব নয়। সত্যি বলতে কি, শুধু এগুলোর জন্য একজন
মানুষের পক্ষে লেখকই হওয়া সম্ভব নয়।
৪.
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির কথাই এখনো আমি বলি নি। মানুষ
লেখে তার আত্নতৃপ্তির জন্য। শুধু লেখকরা কেন _ দৈনন্দিন জীবনযাপনের
বাইরে যারা অন্য কিছু করেন _ লেখালেখি, আঁকাআঁকি, সঙ্গীত চর্চা,
নৃত্যচর্চা, অভিনয়, চলচ্চিত্র পরিচালনা, এমনকি রাজনীতিও _ তা ওই
আত্নতৃপ্তির জন্যই করেন। এই তৃপ্তি মূলত জীবনকে খানিকটা অর্থময় করে
তোলার আনন্দ থেকে উদ্ভুত। এই ধরনের একজন মানুষ _ স্বীকার করুন আর
না-ই করুন, নিশ্চয়ই জানেন এবং মনে মনে হলেও মানেন যে, জীবন খুবই
অর্থহীন একটা ব্যাপার। যাপনের জন্য যে একটিমাত্র জীবন সে পায়
মৃতু্যর সঙ্গে সঙ্গে সেই জীবনের যাবতীয় অর্জন ও আয়োজন শেষ হয়ে যায়;
আর কোনোকিছুই পাবার থাকেনা তার। অমরত্বের তৃষ্ণা সব মানুষের মধ্যেই
আছে _ এ কথা ঠিক, কিন্তু মৃতু্যর পর সে এই অমরত্ব পেলো কি পেলো না
তাতে তার কিছুই যায় আসে না। এই কথাটি একজন বুঝে গেলে তার কাছে
জীবনটা খুব ভারি হয়ে ওঠে, জীবনটাকে যাপনযোগ্য করে তোলা তার জন্য
কঠিন হয়ে পড়ে। যাপনযোগ্য করে তোলার জন্য তার সামনে তখন একটি পথই
খোলা থাকে _ জীবন যে অর্থহীন এই কথাটি ভুলে থাকা। কিন্তু চাইলেই তো
ব্যাপারটা ভুলে থাকা যায় না! ভুলে থাকার জন্য একটি ঘোরলাগা সময়
চাই। আর লেখকরা থাকেন সেই ঘোরলাগা সময়ের মধ্যেই। আমি একেই বলছি
ধ্যান, বলছি মগ্নতা। এই সময়গুলোতে সৃষ্টিশীলতার চিন্তাই প্রধান হয়ে
ওঠে তাঁর কাছে, অন্য সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মেলে, অন্যসব আয়োজনের
কথা ভুলে থাকা যায়। জীবন যে অর্থহীন এই কথাটা ভুলে থাকার চেষ্টা
করাকে কেউ কেউ অবশ্য পলায়নপর মনোবৃত্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন।
সেক্ষেত্রে আরেকটি কাজ করা যায় _ কথাটা সত্যি জেনেও _ ভাবনাটাকে
উল্টে দেয়া যায়। ভাবা যেতে পারে _ প্রতিটি জীবনই ইউনিক, অনন্য _
একটু এদিক ওদিক হলে এই জীবনটির সৃষ্টি হতো না, এত অনন্য একটি ঘটনা
অর্থহীন হতে পারে না। এবং সেই অর্থটা কী, সে ব্যাপারে প্রকৃতির
মধ্যেই আছে ইঙ্গিত ও ইশারা। আছে এই ইঙ্গিত যে, এই সময়ে এই সমাজে
আমার একটি ভূমিকা আছে। সেই ভূমিকা সবার জন্য একরকম হবে না,
বলাইবাহুল্য, কিন্তু কী হবে সেটা খুঁজে বের করতে হবে আমাকেই। মানুষ
সেই ভূমিকা রাখার জায়গাটি খুঁজে পায় সৃজনশীলতার নানা অনুষঙ্গে, কেউ
কেউ এমনকি রাজনীতিতেও (আমি অবশ্যই অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা আর
হালুয়া-রুটি ভাগাভাগির যে রাজনীতি তার কথা বলছি না, বলছি সেই
রাজনীতির কথা যা সমাজটাকে পাল্টে দেবার স্বপ্ন দেখায়, দেশ ও
মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য অনুপ্রাণিত করে)। আমার এক বন্ধু
প্রচলিত ও গতানুগতিক ধারার রাজনীতি করে বলে আমি তার খুব সমালোচনা
করতাম। তো, একদিন সে বললো _ প্রতিটি জাতিরই একটি গন্তব্য থাকে, আর
সেই গন্তব্যে পেঁৗছানোর জন্য ওই জাতির অন্তর্গত প্রতিটি মানুষ কোনো
না কোনো ভূমিকা রাখে _ কেউ কম, কেউ বেশি। আমি সারাজীবন ধরে যদি
আমার জাতিটিকে ওই গন্তব্যের দিকে এক ইঞ্চিও এগিয়ে দিতে পারি _ মনে
করবো আমার জীবনটা স্বার্থক হলো। আমার বন্ধুটি তার ভূমিকা রাখার
জায়গা খুঁজে পেয়েছে ওইখানটায়, বুঝতেই পারছেন। এভাবেই একেকজন একেকটি
জায়গা খুঁজে পায়। একসময় এদেশের বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীরা স্বপ্ন
দেখতেন যে, বিপ্লব আসন্ন; এই বুঁদ হয়ে থাকাটাও ওই ঘোরের মধ্যে
থাকারই নামান্তর। তবু তাঁদের স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু এখন যারা
বামপন্থি রাজনীতি করেন তারা প্রায় সবাই জানেন, বিপ্লব এত সহজে আসে
না, দিবাস্বপ্নে ভোগার মতো বিশ্বপরিস্থিতি এখন আর নেই, এমনকি অনেকে
এটাও মনে করেন _ এদেশে হয়তো কোনোদিনই বিপ্লব আসবে না, তবু তারা এই
লক্ষ্যকে সামনে রেখে একটি জীবন ব্যয় করে যাবার দুঃসাহস দেখান।
কিভাবে সেটা সম্ভব হয়? এখানেও সেই আত্নতৃপ্তিরই ব্যাপার। আমি জানি
আমার জীবদ্দশায় এদেশে বিপ্লব না-ও আসতে পারে, কিন্তু এ-ও জানি, যদি
আসে তাহলে এ জাতির মুক্তি ঘটবে। আমি তাই আমার এই তুচ্ছ জীবনটি
বিপ্লবের জন্যই ব্যয় করে যাচ্ছি। পৃথিবীর ক-জন লোকই বা তা পারে!
এখানেই ওই বিপ্লবীর তৃপ্তি।
এ প্রসঙ্গে স্যামুয়েল বেকেটের ওয়েটিং ফর গডো'র একটি দৃশ্যের কথা
মনে পড়ছে। নাটকটির দুটো প্রধান চরিত্র _ ভ্লাডিমির আর এস্ট্রাগন
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করে না; অপেক্ষা করে গডো নামক
অনির্দিষ্ট একজনের জন্য। নাটকের শুরুতে আমরা দেখি তারা অপেক্ষা
করছে, শেষেও তারা অপেক্ষারত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে গডোর জন্য
তারা অপেক্ষা করে, তাকে তারা চেনে না, কোনোদিন দেখেও নি। তবে তারা
বিশ্বাস করে, গডো এলে তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, পৃথিবী
তাদেরকে যে ক্লেদাক্ত জীবন উপহার দিয়েছে তা থেকে তারা মুক্তি পাবে।
কীভাবে সেটা হবে তা অবশ্য তারা জানে না, তাঁর কাছে প্রত্যাশাটা কী
তা-ও তাদের কাছে পরিষ্কার নয়, এমনকি তারা এ-ও নিশ্চিত নয় যে, তিনি
আদৌ আসবেন কী না! তাদের সকল প্রচেষ্টা নিস্ফল হয়ে পড়ে _ তীব্র
নৈরাশ্য, নিঃসঙ্গতা, দুর্বিসহ পৌণপুনিকতা আর গতানুগতিক জীবনের ভার
তাদেরকে নিক্ষেপ করে যন্ত্রণা আর দুঃস্বপ্নে। জানা যায়, তাদের অতীত
খুব উজ্জ্বল ছিলো _ যেমন প্রতিটি মানুষই তার ফেলে আসা দিন সম্বন্ধে
ভাবে _ কিন্তু সময় তাদেরকে নিঃসঙ্গ, বিপন্ন এবং বিচ্ছিন্ন করে
দিয়েছে। যা হোক, পরপর দু-দিন তারা অপেক্ষা করে কিন্তু গডো দু-দিনই
খবর পাঠান যে, তিনি আজ আসতে পারছেন না _ কালকে নিশ্চয়ই আসবেন।
তাদের এই অনন্ত অপেক্ষা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তারা আত্নহত্যার
কথা ভাবে কিন্তু পারে না। পুরো নাটকটি পড়লে মনে হয় _ তারা চিরদিনই
অপেক্ষা করে ছিলো, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কোনোদিনই তাদের এই
অপেক্ষার অবসান হবে না এবং গডো কোনোদিনই আসবেন না। তো, গডোর জন্য
অপেক্ষা করতে করতে, তিনি আসবেন না জেনে, একসময় ভ্লাডিমির একটা কথা
বলে _ আমরা সেইন্ট নই, কিন্তু আমরা আমাদের এ্যাপয়েন্টমেন্ট রক্ষা
করেছি। কজন লোক এইটুকু বলতে পারে? হঁ্যা, সান্ত্বনা ওটুকুই,
তৃপ্তিও। আমরা কেউ সেইন্ট নই, কিন্তু জীবনের কাছ থেকে কিছুই পাবার
নেই জেনেও, জীবনটা নিছক অর্থহীন একটা ব্যাপার জেনেও, আমরা আমাদের
কাজটুকু করে যাচ্ছি। ওই তৃপ্তি _ জীবনের অর্থহীনতা ভুলে থাকা অথবা
জীবনকে অর্থময় করে তোলার জন্য চেষ্টার তৃপ্তিই মানুষকে তার
দৈনন্দিন কাজগুলোর বাইরে নিয়ে আসে। আর এজন্যই হয়তো সে লেখালেখি
করে, গান গায়, সুর তৈরি করে, নাটক-সিনেমা বানায়, ছবি আঁকে, কিংবা
রাজনীতি করে।
জুন, ২০০৩ _ জুলাই, ২০০৩। |
| |
 |
|