Page loading ... Please wait.

জনপ্রিয় সাহিত্য, জনপ্রিয়তার সাহিত্য
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
বাংলাদেশের সাহিত্যে জনপ্রিয় ধারাটি ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। এ নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়, তর্ক-বিতর্ক হয়, জনপ্রিয় লেখকরা একইসঙ্গে আত্নগরিমা ও আত্নগ্লানিতে ভোগেন। তাদের বই প্রচুর বিক্রি হয়, বইমেলায় তাদেরকে নিয়ে পাঠকদের উচ্ছ্বাস রীতিমতো ক্রেজের পর্যায়ে পৌঁছেছে- তারা তো আত্নগরিমায় ভুগতেই পারেন! কিন্তু গ্লানিতে ভোগার কারণটা কি? অবশ্য এ প্রশ্ন উঠতেই পারে- তারা যে গ্লানিতে ভোগেন তার প্রমাণ কি? এ নিয়ে একটু পরেই কথা বলা হবে, এখন শুধু এটুকু বলি- নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্য তাদের নির্লজ্জ প্রচেষ্টা দেখেই বোঝা যায়, নিজেদেরকে তারা কতোটা গুরুত্বহীন ভাবেন! এই গুরুত্বহীনতার অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় গ্লানি, আর সেটাকে প্রতিরোধ করার জন্য নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করার দৃষ্টিকটু চেষ্টা। এ যেন এক স্বনির্মিত চক্র, যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। তো, তারা যে গ্লানিতে ভোগেন, তার কারণ সম্ভবত এই যে, সাহিত্যের আলোচনায় অধিকাংশ সময়ই তাদের নামগুলো উপেক্ষিত থাকে, এমনকি তাদের কারো-কারো কিছু ভালো লেখাও অনালোচিতই থেকে যায়! সব পেশাজীবীদের যেমন নিজস্ব কমিউনিটি থাকে- চিকিৎসকদের কমিউনিটি, প্রকৌশলীদের কমিউনিটি, সাংবাদিকদের কমিউনিটি, শিক্ষকদের কমিউনিটি, নাট্যজন-চলচ্চিত্রশিল্পীদের কমিউনিটি, শ্রমিকদের কমিউনিটি, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের কমিউনিটি, রাজনীতিবিদদের কমিউনিটি, ইত্যাদি ইত্যাদি- লেখকদেরও তেমনই এক অলিখিত-অপ্রকাশ্য কমিউনিটি আছে। অপ্রকাশ্য, কারণ, এই কমিউনিটির কোনো সাংগাঠনিক কাঠামো নেই, তারা ঠিক পেশাজীবীও নন, বছরশেষে তারা পিকনিক করতে যান না, বা কারণে-অকারণে 'পার্টি থ্রো' করেন না। তবু লেখকরা পরস্পরকে নিজেদের মানুষ বলেই মনে করেন, যেমন শিক্ষকরা মনে করেন শিক্ষকদের, আমলারা আমলাদের ইত্যাদি। যদিও লেখকদের মধ্যে পাস্পরিক বিরোধের (অধিকাংশ সময়ই সেগুলো মতাদর্শগত বিরোধ বা নন্দনতাত্তি্বক বিরোধ, ব্যক্তিগত নয়) ঘটনাও প্রচুর, পত্রপত্রিকায় সেগুলোর ফলাও প্রচারণাও হয়, তবু এই 'কমিউনিটি ফিলিং' টের পাওয়া যায়, যখন, যে-কোনো একজন লেখকের যে-কোনো ধরনের বিপর্যয়ে অন্য লেখকরা সব বিরোধ ভুলে এগিয়ে আসেন! তো, জনপ্রিয় লেখকরা যখন দেখেন নিজেদের কমিউনিটিতে তাঁদের নামটিও সহজে উচ্চারিত হয় না, তখন তারা পীড়ায় ভোগেন, গ্লানিতে ভোগেন। যে-কোনো জনপ্রিয় তারকার মতোই তারাও সমাজে সম্বর্ধিত মানুষ, অনুষ্ঠানে-আয়োজনে তাদের উপস্থিতি ভিড় বাড়িয়ে দেয়, পত্র-পত্রিকার কাটতি বাড়িয়ে দেয় তাদের লেখা, প্রকাশকরা তাদের পেছনে লম্বা লাইন দিয়ে পড়ে থাকেন, অথচ এতকিছুর পরও সতীর্থ লেখকরা তাদেরকে যথার্থ সম্মান দেন না, ব্যাপারটাতো পীড়াদায়কই হবার কথা! তারচেয়েও পীড়াদায়ক ব্যাপার হচ্ছে, একসময় তারা আবিষ্কার করেন- তাদের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে শুরু করেছে, অন্য অনেকে এসে তাদের জনপ্রিয়তায় ভাগ বসাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, 'জনপ্রিয়তা' নামক বিষয়টির এটিই প্রধান বৈশিষ্ট্য। একজন জনপ্রিয় লেখক, একজন জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী, একজন মাঠ-কাঁপানো জনপ্রিয় খেলোয়াড়ের শেষ পরিণতিতে মূলগত কোনো পার্থক্য নেই। একসময় তাঁরা থাকেন সমস্ত আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে, সমাজের শীর্ষবিন্দুতে থাকে তাদের অবস্থান, কিন্তু একসময় তারা হারিয়ে যেতে থাকেন বিস্মৃতির অতলে। এটি জনপ্রিয়তার বৈশিষ্ট্যের কারণেই ঘটে। জনপ্রিয়তা কখনোই চিরস্থায়ী ব্যাপার নয়, এমনকি দীর্ঘস্থায়ীও নয়, বরং নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী বিষয়। 'জনপ্রিয়' মানুষরা তাদের জনপ্রিয়তার তুঙ্গ মুহূর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ভুলে যান, ফলে যখন ধস নামতে শুরু করে, তখন ভেঙে পড়েন, কষ্ট পান, আহত হন। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জনপ্রিয় মানুষই জীবনকালেই তাদের জনপ্রিয়তার মৃত্যু ঘটতে দেখে যান। মজার ব্যাপার হলো এই যে, যিনি যতো দ্রুত প্রতিষ্ঠা পান, খ্যাতি লাভ করেন, জনপ্রিয়তার চূড়ায় আহরণ করেন, তিনি ততোই দ্রুত পতিত হন! (একজন ক্রিকেটারের কথা ভাবুন। ঘটনাক্রমে কোনো একটি ম্যাচে একটি শক্তিশালী দলের বিপক্ষে একজন ব্যাটসমান একটা সেঞ্চুরি যদি করেই ফেলেন, এবং বিশেষ করে এটি যদি হয় ম্যাচ-উইনিং সেঞ্চুরি, তাহলে পরদিন তিনি সারা পৃথিবীর সমস্ত মিডিয়ায় শিরোনামে চলে আসেন! এক সেঞ্চুরিতেই একদিনে বিশ্বখ্যাতি! কিন্তু কদিনের এই খ্যাতি?) অবশ্য অন্য মাধ্যমের জনপ্রিয়তার চেয়ে সাহিত্যে জনপ্রিয়তার ব্যাপারটা বোধহয় একটু আলাদা। এমন হঠাৎ খ্যাতি, হঠাৎ জনপ্রিয়তা সাহিত্যে সম্ভব নয়, খানিকটা সময় লাগে এতে, ফলে পতন ঘটতেও খানিকটা বেশি সময় লাগে।

জনপ্রিয়তা নিয়ে কথা বলতে গেলে এরপরই আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপন করতে হবে। সেটি হলো- এই যে জনপ্রিয়তা, সেটি কি ওই লেখকের নাকি তার লেখার? প্রশ্নটি অন্য মাধ্যমে সম্বন্ধেও করা যেতে পারে। একজন অভিনেতার জনপ্রিয়তা কি তার নিজের নাকি তার অভিনয়ের? কণ্ঠশিল্পীর জনপ্রিয়তা কি তার গায়কীর না তার নিজের? কিংবা আরো সংক্ষেপে, মাত্র একবাক্যেই প্রশ্নটি করা যায়- শিল্প ও জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গটি যখন ওঠে, তখন আমরা শিল্পের জনপ্রিয়তার কথা বলি নাকি শিল্পীর?

২.
এই রচনায় আমরা যেহেতু সাহিত্যের জনপ্রিয়তা নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী, অন্যান্য বিষয় নিয়ে তাই একটু কমই কথা বলবো, দৃষ্টি নিবদ্ধ করবো সাহিত্য ও লেখকদের জনপ্রিয়তা নিয়ে।

সাহিত্যে জনপ্রিয়তা কোনো নতুন বিষয় নয়। সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক আগে থেকেই জনপ্রিয় লেখক ছিলেন, জনপ্রিয় লেখাও ছিলো। তবে সময়ের সঙ্গে জনপ্রিয়তার ধরন পাল্টেছে, বিশেষ করে সামপ্রতিককালে জনপ্রিয় সাহিত্য-চর্চার ধরন-ধারণ সাহিত্য-ইতিহাসের কোনো পর্বের সঙ্গেই মেলানো যায় না! বাংলা সাহিত্যের কথাই ধরা যাক। সম্ভবত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ই বাংলা সাহিত্যের প্রথম 'জনপ্রিয়' লেখক; এবং বিস্ময়কর হলো এই যে, মৃত্যুর এত বছর পরও তাঁর জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন রয়েছে। তাঁর এই অভাবিত পাঠকপ্রিয়তার বিষয়টি নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে। তাঁকে উপেক্ষা করাটা এখন একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু যিনি প্রায় এক শতাব্দী ধরে একটি ভাষার আপামর পাঠকগোষ্ঠীকে মোহমুগ্ধ করে রাখতে পারেন- তাঁর ক্ষমতা সম্বন্ধে সন্দেহ করা চলে না। সম্ভবত বাংলাসাহিত্যের তিনিই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাঠকপ্রিয় লেখক- নানাদিক বিবেচনা করেই বলা চলে, জনপ্রিয় সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তাঁর পরেও আরো অনেক জনপ্রিয় লেখক এসেছেন_ ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, শংকর, জরাসন্ধ, যাযাবর (এমনকি রোমেনা আফাজ বা আকবর হোসেনও একসময় খুব জনপ্রিয় ছিলেন)_ কিন্তু প্রায় সকলেই এখন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে বসেছেন। শরৎচন্দ্র যে শুধু তাঁর জীবনকালেই জনপ্রিয়তার স্বাদ পেয়েছিলেন তা নয়, বরং মৃত্যুর এই এতদিন পরও তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে এমন একটি বাড়িও খুঁজে পাওয়া যাবে কীনা সন্দেহ, যেখানে একজন/দুজন শিক্ষিত লোক আছেন অথচ শরৎচন্দ্রের একটি/দুটি লেখা পড়েননি। এই বিস্ময়কর পাঠকপ্রিয়তার কারণ কি? একথা সবাই স্বীকার করবেন যে, শরৎচন্দ্রের বিষয়-নির্বাচন এবং বর্ণনাভঙ্গিতে এমন এক যাদু আছে যে পাঠককে তা আবেগপ্রবণ করে তুলবেই। তাঁর গল্প-উপন্যাস পড়বেন আর চোখের কোণে জল জমবে না- এমন পাষাণ-হৃদয় পাঠক এখনও বাঙালি জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করেনি, করবে কীনা তা-ও সন্দেহ! তাঁর লেখা পড়ে ওই সময়ও পাঠকরা কেঁদেছে, আজও পাঠকরা কাঁদে, ধারণা করি আগামিতেও কাঁদবে। জানি, অজর-অনড় পক্ককেশ অধ্যাপকরা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলবেন- পাঠককে কাঁদানো কোনো লেখকের উদ্দেশ্য হতে পারে না, কেউ তা করতে সক্ষম হলেও সেটাকে লেখকের সাফল্য বলে বর্ণনা করা উচিত নয়! মানছি এ কথা। কিন্তু ওই দাঁত-মুখ খিচানো অধ্যাপকও যে শরৎচন্দ্রের লেখা পড়ে কেঁদেছেন (হয়তো কিশোর-কিশোরীদের মতো বা নরম মনের তরুণ-তরুণীদের মতো বা জীবনযুদ্ধে পরাজিত পরিণত বয়সের বিপন্ন মানুষটির মতো কেঁদে বুক ভাসাননি, কিন্তু তার চোখ যে ভিজে উঠেছে সে ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত), এর ব্যাখ্য কি? মোট কথা- পাঠক যে ধরনেরই হোন না কেন, শরৎচন্দ্রের লেখা যে তার কোমল অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। আর তাঁর সাফল্য ওখানেই। সম্ভবত শরৎচন্দ্রই প্রথম লেখক যিনি বাঙালির আবেগ-আকাঙ্ক্ষার স্থানগুলো সূক্ষভাবে চিহ্নিত করে সেগুলোকে নিপুণ দক্ষতায় ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। একজন মানুষের যেমন কিছু স্পর্শকাতর বিন্দু থাকে, সেসব বিন্দুতে আঘাত পেলে, এমনকি স্পর্শ পেলেও, সে আবেগপ্রবন হয়ে পড়ে- রেগে যায়, স্মৃতিকাতর হয়, উচ্ছ্বসিত হয়, বা চোখ ভিজে ওঠে; তেমনি একটি জাতিরও সেরকম কিছু স্পর্শকাতর আবেগবিন্দু থাকে। সেই আবেগবিন্দুগুলোকে চিনে নেয়া অত্যন্ত দুরূহ বিষয়। শরৎচন্দ্র হচ্ছেন বিশ্বসাহিত্যের সেই বিরলতম লেখক যিনি একটি জাতির তেমনই একটি আবেগবিন্দুকে খুব ভালোভাবে শনাক্ত করেছিলেন আর নিজের করণ-কৌশলকে সেই বিন্দুর অনুগামী করে তুলেছিলেন। তিনি জেনে ফেলেছিলেন, ঠিক কোন বিন্দুতে টোকা পড়লে বাঙালির চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। আর এই জাতির অন্তর্গত পাঠকরা তাঁর লেখায় নিজেদের আবেগ-বিন্দুটিকে আবিষ্কার করে বলেই শরৎচন্দ্র এখনও এত বিপুলভাবে পঠিত হন। তিনি যে শুধু আবেগকে উসকে দেবার জন্যেই লিখেছেন, একথা বললেও তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। বরং পারিবারিক-সামাজিক জীবনপ্রবাহের দৃশ্যবহুল বর্ণনা দিয়েছেন; প্রয়োজন মতো বিষয়গুলোকে নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন; বাংলার গ্রাম, বাংলার প্রকৃতি অনুপুঙ্খ বর্ণনায় ধরা পড়েছে তাঁর লেখায়; সামাজিক কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসগুলোকে নির্মমভাবে আঘাত করেছেন তিনি ইত্যাদি। তবু আমার মনে হয়, তাঁর সাফল্য নিহিত আছে বাঙালির আবেগকে চমৎকারভাবে ধারণ করার মধ্যে। অর্থাৎ, ব্যক্তি শরৎ নন, বরং তাঁর সাহিত্যের উপাদানই তাঁকে এখন পর্যন্ত জনপ্রিয় করে রেখেছে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে- সব লেখকের বেলায়ই কি কথাটি সত্য নয়? অর্থাৎ, লেখক নিজে নন, বরং তাঁর লেখাই জনপ্রিয় হয়, এটিই কি সত্য নয়? না, এটি সর্বাংশে সত্য নয়। বরং সামপ্রতিককালের জনপ্রিয় লেখকরা শুধু তাদের লেখা নিয়েই পাঠক-দরবারে হাজির হন না, বরং সঙ্গে থাকে হরেক রকম ক্যারিশমা। রঙচঙে বিজ্ঞাপন, টেলিভিশনে নানা ধরনের আয়োজন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, এমনকি 'পাঠকদের কথা' ভেবে এইসব লেখকদেরকে সিনেমার তারকাদের সঙ্গে রান্নাবান্নার অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে দেখা যায়! এক্ষেত্রে বিশেষভাবে ভূমিকা পালন করে টেলিভিশনের নাটক। যার নাটক যতো জনপ্রিয়, তিনি লেখক হিসেবেও ততোই জনপ্রিয়। এ বিষয়ে আমরা একটু পরই আরো বিস্তারিত আলাপ করবো।

শরৎ-পরবর্তী জনপ্রিয় লেখকদের এই রূপ পরিবর্তন কিন্তু একদিনে হয়নি। শুধুমাত্র জনপ্রিয় হবার জন্য লেখালেখি করা এই সেদিনের ঘটনা। এর আগ পর্যন্ত লেখকরা লিখতেই আসতেন, ঘটনাক্রমে জনপ্রিয় হয়ে যেতেন, তারপর হয়তো সেই জনপ্রিয়তার ফাঁদে পড়তেন। যাযাবর, শংকর, বিমল মিত্র, ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়- সবাই এই ধরনের লেখক। এমনকি আমাদের দেশের আকবর হোসেনও তাই। তিনি তাঁর ক্ষমতা অনুযায়ী 'ভালো' লেখাটিই লিখেছেন, এরচেয়ে ভালো কিছু করার ক্ষমতাই তাঁর ছিলো না। কিন্তু পরবর্তীকালে এই ধারাটিরও পরিবর্তন হয়েছে।
 
শরৎ-পরবর্তী লেখকদের মধ্যে সৈয়দ মুজতবা আলীর জনপ্রিয়তাই সর্বাধিক। তাঁর অভাবিত জনপ্রিয়তা এখন পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকার কারণটি জটিল নয়। হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে তিনি যে রমনীয়তা উপহার দিয়েছেন, বাংলাসাহিত্যে তার তুলনা কম। হাসতে হাসতেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন জীবন ও পৃথিবী সম্বন্ধে তাঁর গভীর উপলব্ধির কথা। এরকম লেখককে ভালো না লেগে উপায় কি?

পশ্চিমবঙ্গের প্রতিভাবান লেখক সমরেশ বসুর বোধহয় দুটো হাত, দুটো মন, দুটো কলম ছিলো। এক হাতে লিখতেন 'গঙ্গা'র মতো লেখা, অন্য হাতে 'বিবর' বা 'প্রজাপতি'র মতো মতো লেখা। তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন, কোন লেখাটি 'জনপ্রিয়' হবে, কোনটি হবে না। কোন উপাদানগুলো থাকলে আপামর জনতা লেখাটিকে লুফে নেয়, সেটি তাঁর ভালো করেই জানা ছিলো।
সমরেশ বসুর ধারাবাহিকতাই আরেক পশ্চিমবঙ্গীয় প্রতিভা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনিও একহাতে রচনা করেন 'একা এবং কয়েকজন'-এর মতো দুর্দান্ত উপন্যাস, অন্য হাতে লেখেন অসংখ্য সাহিত্যমূল্যহীন সুড়সুড়িমার্কা পুস্তক! সুনীলের প্রতিভার সাক্ষর শুধুমাত্র উপন্যাসে নয়, প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। একইসঙ্গে আছে প্রতিভার বিপুল অপচয়ের সাক্ষরও! তাঁকে বলা যেতে পারে অপচয়িত প্রতিভার প্রকৃষ্টতর নিদর্শন! সহজ-সরল ভঙ্গি, মেদহীন-কমিউনিকেটিভ ভাষা তাঁর গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কবি হয়েও তিনি কবিতার প্রভাব পড়তে দেননি তাঁর গল্প বা উপন্যাসে। গল্পে যেমন তেমনি উপন্যাসেও তিনি প্রভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর 'একা এবং কয়েকজন' বাংলা সাহিত্যের এক মাইলফলক উপন্যাস। সেই তুলনায় তাঁর অতি বিখ্যাত ট্রিলজি 'পূর্ব পশ্চিম' 'সেই সময়' 'প্রথম আলো' দূর্বল রচনা। যদিও 'পূর্ব পশ্চিম' উপন্যাসের আঙ্গিক পরবর্তীকালের অনেক লেখককে প্রভাবিত করেছে। এটি তাঁর স্বভাবের বাইরের একটি উপন্যাস, এবং এটিকে উপন্যাস না বলে ইতিহাসের সংবাদ-ডকুমেন্টেশন বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। অথচ এই উপন্যাসের আঙ্গিক কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশের লেখকদের পছন্দ হয়ে গেছে। হুমায়ূন আহমেদের 'জোছনা ও জননীর গল্প', আনিসুল হকের 'মা' এই ধারার উপন্যাস। এমনকি সৈয়দ হকের 'বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ' প্রথম সংস্করণে যেমন ছিলো, দ্বিতীয় সংস্করণে তেমনটি নেই, 'পূর্ব পশ্চিমে'র আঙ্গিক গ্রহণ করা হয়েছে এই উপন্যাসেও! অর্থাৎ, সুনীল নিজেই শুধু একটি ব্যর্থ-দূর্বল উপন্যাসের জন্ম দেননি, আরো কিছু অসফল উপন্যাসের জন্ম-প্রক্রিয়াকে তরান্বিত ও উৎসাহিত করেছেন। আর এখানেই সুনীলের প্রভাব-প্রতিপত্তি টের পাওয়া যায়। একজন লেখকের অসফল একটি উপন্যাসের যদি এতখানি অনুকরণ হয়, তাহলে তাঁর প্রভাব যে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সুনীলের সমসাময়িক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অবস্থা আরো জটিল! অসাধারণ গদ্যভঙ্গি তাঁর, চরিত্রচিত্রণে দারুণ পারঙ্গম, কাহিনীর জটিলতা তৈরিতে ওস্তাদ লোক, ঘটনার বিকাশে তাঁর সাবলীলতা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। এতগুলো গুণ থাকা সত্ত্বেও তিনি একজন প্রথমসারির কথাশিল্পী হয়ে উঠতে পারলেন না শুধুমাত্র পাঠকদের সুখী করবার বিচিত্র মানসিকতার জন্য। তার প্রায় নব্বইভাগে উপন্যাসের উপসংহার প্রাচীন রূপকথার মতো_ অবশেষে তাহারা সুখেশান্তিতে বাস করিতে লাগিলো। পুরো উপন্যাসে যে জটিলতা তিনি তৈরি করেন, মনে হয়, এই মানুষগুলোর পক্ষে বাস্তবতার এই দুর্ভেদ্য চক্র থেকে কোনোভাবেই বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। অথচ শেষে এসে দেখা যায়_ লেখকের কারসাজিতে সবাই সুখে আছে, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে! বাস্তব জীবনে এসব সমস্যার সমাধান হয় না, মানুষ দুর্ভেদ্য চক্র থেকে বেরোতে পারে না কোনোভাবেই, অথচ তিনি তাই করে দেখান। পাঠকও সুখ পান তাতে। বাস্তব জীবনে যা ঘটে না, উপন্যাসের পাতায় তা ঘটতে দেখলে ভালো লাগে বৈকি! সুখপিয়াসী পাঠকের ইচ্ছামুখী লেখক বলতে যা বোঝায়, শীর্ষেন্দু তার চমৎকার উদাহরণ!

এরকম আরো কয়েকজন থেকে থাকবেন। তাদের কথা ছেড়ে এবার বরং আমরা বাংলাদেশের দিকে ফিরে তাকাই। তার আগে একটা ব্যাপার বলে নেয়া ভালো- সমরেশ, সুনীল, শীর্ষেন্দু এঁরা সবাই সাহিত্যের মূলধারার লেখক। অর্থাৎ তারা শুরু করেছিলেন এবং সচল থেকেছেন মূলধারাতেই, কেবল মাঝে মাঝে জনরুচির কাছে আত্নসমর্পণ করে নিজেদের সাহিত্যকীর্তিতে কালিমা লেপন করেছেন, এই যা!

৩.
বাংলাদেশে জনপ্রিয় সাহিত্যের জন্ম হয় হুমায়ূন আহমেদ এবং ইমদাদুল হক মিলনের হাতে। তবে একটা কথা শুরুতেই পরিষ্কার করে নেয়া দরকার। সেটা হলো- পশ্চিমবঙ্গের সমরেশ-সুনীলের মতো বাংলাদেশের এই দুই লেখকও সাহিত্যের মূলধারার লেখক হিসেবেই শুরু করেছিলেন। কেবলমাত্র জনপ্রিয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে লেখালেখির জগতে আগমন ঘটেনি তাঁদের। পরবর্তীকালে তাঁদের লেখা ভিন্ন ভিন্ন পাঠকগোষ্ঠী বিপুলভাবে গ্রহণ করেছেন এবং তাঁরাও সেই পাঠকদের চিত্তবিনোদনের কথা মাথায় রেখে তাদের মনমতো পুস্তক রচনা করছেন বটে, কিন্তু এই প্রক্রিয়াটা চলেছে অনেকদিন ধরে, ধীরে ধীরে। হুমায়ূনের প্রথম বই প্রকাশিত হয় সত্তর দশকের শুরুতে, আর তিনি জনপ্রিয় হতে শুরু করেন আশির দশকের মাঝামাঝি। অর্থাৎ প্রায় দেড়-দশকের ব্যবধানে তাঁর জনপ্রিয়তার ব্যাপারটা চোখে পড়তে শুরু করে। মিলনও সত্তরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করলেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আশির মাঝামাঝিতেই। প্রথম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দুজনই মূলধারার পত্রপত্রিকায় নিজেরা লিখে চলেছেন, অন্যদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছেন, সাহিত্যসমাজ তাঁদেরকে যতোই প্রত্যাখান করার চেষ্টা করুক না কেন, তাঁদের সম্বন্ধে নীরব থাকতে পারেনি। একজন লেখক সম্বন্ধে আপনি যদি সোচ্চার হয়ে ওঠেন, সেটি ইতিবাচকই হোক বা নেতিবাচকই হোক, বুঝতে হবে- ওই লেখককে আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন, নইলে তার সম্বন্ধে কথাই বলতেন না (আমরা কিন্তু এইসব আলোচনায় আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন টাইপের কোনো লেখকের নামও উচ্চারণ করি না!)। এবং মজার ব্যাপার হলো এই যে, এই দুজনের 'জনপ্রিয়' সাহিত্যের তুলোধুনো-সমালোচনা করার পর মনে একটু খুঁতখুঁত করতে থাকে এই জন্য যে, তাঁদের অসাধারণ রকমের ভালো কিছু লেখা আছে, তুলোধুনো করার সময় সেগুলোর কথা বলা হয়নি! শক্তিমান লেখকদের শক্তিটা এখানেই যে, তাদের সম্বন্ধে একটি অবস্থান নিতে হয়- ইতিবাচক বা নেতিবাচক- এড়িয়ে যাওয়া যায় না! আমরা যে তাদেরকে এড়িয়ে যাই না, তার কারণও হয়তো এই যে, যতোই 'জনপ্রিয়তা'র মোহে তারা নিজেদের অপচয় করুন না কেন, তারা আসলে মূলধারারই লেখক। তাদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়! ফাল্গুনী-শংকরকে বাদ দিয়েই আপনি পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করলেও ইতিহাস বা সাহিত্যের কোনোটিরই তেমন কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু সমরেশ-সুনীলকে বাদ দিয়ে আপনি ইতিহাস রচনাই করতে পারবেন না! জেদের বশে করে ফেলতে পারেন, সেটি ইতিহাসও হবে না, সাহিত্যও হবে না, হবে আপনার জেদের ইতিহাস! তেমনই বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস রচনার সময় আপনি চোখ বন্ধ করে আকবর-মুসলেহউদ্দীনের নাম বাদ দিতে পারেন, কিচ্ছু যাবে আসবে না, কিন্তু হুমায়ূন-মিলনকে বাদ দেবেন? দিতে পারেন, কিন্তু সেই ইতিহাস হাস্যকর বলে বিবেচিত হবে বোদ্ধামহলের কাছে। এত কথা বললাম একটা বিশেষ কারণে- যাদের হাতে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সাহিত্যের সূচনা হয়েছিলো, তাদের অবস্থাটা ঠিকমতো বুঝতে পারলেই সামপ্রতিককালের জনপ্রিয় সাহিত্যের রূপটা বোঝা যাবে।

হুমায়ূন-মিলন সম্বন্ধে আরো কিছু কথা আমাদের বলে নিতে হবে! এই দুজন একই সময়ে শুরু করলেও দুজনের জনপ্রিয়তার ধরনই ভিন্ন। হুমায়ূন আহমেদ বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তাঁর প্রথম দুটো উপন্যাস 'নন্দিত নরকে' এবং 'শঙ্খনীল কারাগার' আমাদেরকে যে ছবি উপহার দিয়েছিল সেটি এর আগে আর কখনো বাংলা সাহিত্যে দেখা যায়নি। মধ্যবিত্ত জীবনের এমন ছোটখাটো অনুষঙ্গও যে উপন্যাসের বিষয় হতে পারে, সেটি এই উপন্যাস দুটোর আগে কে-ই বা ভাবতে পেরেছিল? আর এই জীবনকে এর খুঁটিনাটিসহ এমন গভীরভাবে চেনার প্রমাণই বা আর কে দিতে পেরেছিলেন, হুমায়ূনের আগে? আমাদের সাহিত্য জগতে মধ্যবিত্তরা তো অবহেলিত চরিত্রই ছিলো, যেন তারা কোনো মানুষই নয়, তাদের কোনো সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা নেই, আর বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের কাছে তো তারা রীতিমতো ভিলেন! হুমায়ূন এসে দেখালেন- মধ্যবিত্তরা যন্ত্র নয়, ভিলেনও নয়; বাংলার কথাশিল্পীদের প্রিয় চরিত্রদের- দরিদ্র মানুষদের- চেয়ে তাদের দুর্দশা এবং সংকটও কম নয়! প্রথা ভেঙে একটি শ্রেণীর দিকে মানবিক চোখে তাকিয়েছিলেন তিনি, মমতা ও সহানুভূতি দিয়ে এঁকেছিলেন তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখদুঃখ কথা। শুধু তাই নয়, তাঁর মধ্যে একজন ভার্সেটাইল লেখক হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও ছিলো। তিনি যখন সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন সেগুলোকে নিয়ে গেছেন এক ভিন্নতর উচ্চতায়। সেগুলো শুধু বিজ্ঞান বা ফিকশন থাকেনি, তাঁর হাতে পড়ে হয়ে উঠেছে মানবিক অনুভূতির দলিল। তাঁর রচিত সায়েন্স ফিকশন এই একটি জায়গায় পৃথিবীর অন্য সব সায়েন্স ফিকশন থেকে আলাদা। 'তোমাদের জন্য ভালোবাসা' 'শূন্য' 'নি' ইত্যাদি উপন্যাস সেই প্রমাণ দেবে। আবার মানবমনের গূঢ়-অপার রহস্য নিয়ে তিনি যে মিসির আলী সিরিজ রচনা করেছিলেন, প্রথম দিকে তা-ও ছিলো এক গভীর মানবতাবোধে উজ্জীবিত। শুধু তাই নয়, মনোবিজ্ঞান যে তিনি কত গভীরভাবে বোঝেন তার প্রমাণও ধরে রেখেছেন 'যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমির চাঁদ' উপন্যাসে। এটি যে হুমায়ূন আহমেদের রচনা, তা বিশ্বাস করাই কঠিন। সামপ্রতিককালের 'মনোবৈজ্ঞিানিক (!) উপন্যাসের' লেখকরা হুমায়ূনের এই উপন্যাসটি পড়ে শিখে নিতে পারেন, মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস বলতে আসলে কী বোঝায়! এমনকি তাঁর হিমু চরিত্র দিয়ে তিনি প্রথমদিকে খুঁজতে চেয়েছিলেন প্রকৃতির অব্যাখ্যাত রহস্য। জীবন নামক একটি ঘরে যদি দুটো দরজা থাকে, তার একটি দরজা বিজ্ঞান ও যুক্তি ও দর্শন ও ইতিহাস ও মনোবিজ্ঞানের, যেগুলো দিয়ে এই জীবনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলছে হাজার হাজার বছর ধরে; আর অন্য দরজাটি এখনো খোলাই হয়নি, সেটি রহস্যময়তায় ভরা, হুমায়ূন সেই দরজাটি খুলতে চেয়েছিলেন হিমুকে দিয়ে। কিন্তু এই কথাগুলো বলা হলো তাঁর প্রথমদিকের রচনা সম্বন্ধে। পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তার পিচ্ছিল পথ তাঁকে নিয়ে গেছে পতনের দিকে, তাঁর অপরিণত-অপরিপক্ক টিনএজ পাঠকগোষ্ঠীর মন জুগিয়ে লিখতে গিয়ে করেছেন ক্ষমতার অপব্যবহার। এমনকি হিমুকে তিনি শেষ পর্যন্ত বানিয়ে ফেললেন এইসব তরুণদের উদ্ভট আনন্দফূর্তির সঙ্গী। শুধু উপন্যাসেই নয়, গল্পেও তিনি বহুমাত্রিক কাজের সম্ভাবনা দেখিয়েছিলেন। তাঁর রয়েছে নানান ধরনের গল্প লেখার অভিজ্ঞতা_ 'অদ্ভুত গল্প' 'ভৌতিক গল্প' 'অতিপ্রাকৃত গল্প' ইত্যাদি শিরোনাম দিয়ে তিনি যে গল্পগুলো লিখেছেন, বাংলাদেশের গল্পসাহিত্যে তা পুরোপুরি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বাংলা সাহিত্য থেকে তো এই ধরনের গল্পগুলো হারিয়েই গিয়েছিল, তিনি সেগুলোকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন। 'ছায়াসঙ্গী' 'ভয়' 'পিপড়া' 'সে' 'কুকুর' 'আয়না' ইত্যাদি গল্পের উদাহরণ বাংলা গল্পের দীর্ঘ ইতিহাসে খুব সুলভ নয়। শুধু এগুলোই নয়- মধ্যবিত্ত জীবন নিয়েও তাঁর রয়েছে চমৎকার কিছু গল্প। সত্যি কথা বলতে কি, হুমায়ূনের লেখায়ই আমরা প্রথমবারের মতো মধ্যবিত্তকে পেলাম তাদের নিত্যদিনের সমস্যা-সংকট-আনন্দ-বেদনা-হাসি-কান্না সহ। অবশ্য তাঁর স্বভাবজাত হালকা মেজাজটি সবক্ষেত্রেই পুরোমাত্রায় উপস্থিত, তবু অল্প কথায় জীবনের ছোটখাটো সুখদুঃখগুলো তাঁর গল্পে চমৎকার কুশলতায় ধরা পড়েছে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের স্পর্শকাতর বিন্দুগুলো হুমায়ূনের মতো এত ভালো করে আর কেউ চেনেননি। এইখানটায় আমি শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর মিল খুঁজে পাই। শরৎচন্দ্র যেমন বাঙালি জাতির আবেগপ্রধান স্পর্শকাতর বিন্দুগুলোকে চিনতেন (এ বিষয়ে একটু আগের্ই কথা বলেছি), হুমায়ূন আহমেদ অতখানি না হলেও বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের হাসি-কান্নার বিন্দুগুলো চেনেন, অনায়াসসাধ্য দক্ষতায় তিনি তাঁর পাঠক-দর্শকদের হাসিয়ে-কাঁদিয়ে চলেছেন। হুমায়ূনের বিপুল গ্রহণযোগ্যতার কারণও এটি। 'নিশিকাব্য' 'জীবনযাপন' 'খাদক' 'চোখ' 'অচিন বৃক্ষ' প্রভৃতি গল্পে তিনি তাঁর ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তিনি তাঁর এই বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে না লাগিয়ে বরং জনরুচির কাছে আত্নসমর্পণ করেছেন। তিনি সবসময়ই বলে এসেছেন- তিনি নিজের আনন্দের জন্য লেখেন। সেটা সব লেখকই লেখেন, কিন্তু তাঁর এখনকার লেখাগুলো পড়লে মনে হয় নিজের আনন্দের জন্য নয়, তিনি লেখেন জনরুচির চাহিদা মেটাতে, ফলে, তাঁর বর্তমানকালের লেখাগুলোতে প্রচুর অমনোযোগিতা চোখে পড়ে, এমনকি, বাক্য গঠন পর্যন্ত শিথিল ও অশুদ্ধ হয়ে ওঠে।
 
ইমদাদুল হক মিলন ঠিক কতগুলো জনপ্রিয় উপন্যাস লিখেছেন সেটা হয়তো তিনি নিজেও ঠিক জানেন না। অথচ তারই 'শ্রেষ্ঠ গল্প' গ্রন্থভূক্ত গল্পগুলো পড়লে বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করতে হয় যে, তাঁর হওয়ার কথা ছিলো একজন সফল গল্পকার। মিলন ওই 'জনপ্রিয় উপন্যাস'গুলো না লিখে যদি শুধুমাত্র এই গল্পগুলোই লিখতেন, তাঁকে হয়ত মর্যাদা দেয়া হতো একজন প্রধান গল্পকারের। তাঁর গল্পকার পরিচিতিটি তেমন গড়ে ওঠেনি, অথচ তাঁর সমাজ ও জীবন অবলোকনের দৃষ্টিভঙ্গি, নানা ধরনের চরিত্র চিত্রণের দক্ষতা, তাঁর ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি ঈর্ষণীয় সাফল্যের দাবিদার। অর্থাৎ একজন সফল ও গুরুত্বপূর্ণ লেখকের যাবতীয় প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যই তাঁর করতলগত। গ্রামীণ জীবন নিয়ে তিনি লিখেছেন অসামান্য কিছু গল্প। সত্যি কথা বলতে কি, গ্রামের জীবন মিলনের আগে একমাত্র আবু ইসহাকই এত কুশলতার সঙ্গে তুলে আনতে পেরেছিলেন, আর কেউ নন। 'গাহে অচিন পাখি' তো ইতিমধ্যেই কালজয়ী মাত্রা অর্জন করেছে। 'বদ্যি বুড়োর জীবনকথা' 'নিরন্নের কাল' 'নেতা যে রাতে নিহত হলেন' 'রাজার চিঠি'র মতো অসাধারণ সব গল্পের নির্মাতা তিনি। 'জোয়ারের দিন'-এর মতো অসামান্য প্রতীকী গল্পও খুব বেশি লেখা হয়নি বাংলাদেশে। বেশ কিছু উপন্যাসেও তিনি তাঁর ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ভাষায় লেখা তাঁর 'কালাকাল' উপন্যাসের তুলনা কি সহজে পাওয়া যাবে? 'পরাধীনতা' 'যাবজ্জীবন' 'ভূমিপুত্র' উপন্যাসগুলোও তো উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে। যেসব পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য তিনি এবং হুমায়ূন আহমেদ রাশি রাশি 'কেচ্ছাকাহিনী' উৎপাদন করেন, সেইসব পাঠকরা কি এই উপন্যাসগুলো পড়েন? পড়েন না, আমি নিশ্চিত। তাঁরাও এটি জানেন। পড়লে 'জোছনা ও জননীর গল্প' পড়ার জন্য হুমায়ূন আর 'নূরজাহান' পড়ার জন্য মিলন বারবার তাঁদের পাঠককে কাতর মিনতি জানাতেন না। যাহোক, প্রতিভার এই অপচয় শুধু যে আমাদের সাহিত্যের ক্ষতি করেছে তাই নয়, ক্ষতি করেছে তাঁদেরও। নিজেদের উৎপাদিত এইসব তুচ্ছ রচনা তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দেবে, এ ব্যাপারে অন্তত আমার কোনো সন্দেহ নেই।

৪.
হুমায়ূন-মিলনের পর বাংলাদেশে জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারাটি বিপদজনক এক খাতে প্রবাহিত হতে চলেছে। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে একমাত্র আনিসুল হক ছাড়া আর কেউই মূলধারার লেখক নন। যে বৈশিষ্ট্য হুমায়ূন-মিলনের মধ্যে দেখা যায়, কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে আনিসুল হকের মধ্যে। প্রতিভা আছে তাঁরও, সাহিত্যের আলোচনায় তাঁর নামও ঘুরেফিরে আসে, উপেক্ষা করা যায় না। এক 'ফাঁদ' উপন্যাস দিয়েই চমকে দিয়েছেন তিনি সাহিত্যের মূলধারার পাঠকদের। বাংলাদেশের সফল উপন্যাসগুলোর যদি একটা তালিকা করা হয়, তাহলে 'ফাঁদ'কে অবশ্যই রাখতে হবে। এছাড়াও তাঁর চেষ্টা থাকে ভালো কিছু কাজ করবার। সেসব সফল হয় কীনা তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু চেষ্টার কথাটা স্বীকার না করে পারা যাবে না। 'মা' 'আয়েশা মঙ্গল' 'চিয়ারি বা বুদু ওরাঁও কেন দেশত্যাগ করেছিল' ইত্যাদি উপন্যাসে তিনি আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নিয়ে কাজ করেছেন। শিল্পমূল্যের বিচারে এসব উপন্যাস হয়তো খুব বেশি মার্কস পাবে না সমালোচকদের কাছ থেকে, কিন্তু তাঁর কমিটমেন্টটাকে উপেক্ষাও করা যাবে না। এসব উপন্যাসের মূল সমস্যা, আনিসুল হক তাঁর স্বতস্ফূর্ততা হারিয়েছেন (একই সমস্যা হুমায়ূনের 'জোছনা ও জননী গল্প' এবং মিলনের 'নূরজাহান' উপন্যাসে ঘটেছে। তাঁদের গদ্যের যে মূল শক্তি, স্বতস্ফূর্ততা- সেটার মারাত্নক অভাব চোখে পড়ে এসব রচনায়।) যা হোক, আনিসুল হকের শক্তিমত্তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু জনপ্রিয়তা চর্চার ক্ষেত্রে পূর্বসুরীদের সঙ্গে তার কিছু মৌলিক পার্থক্য চোখে পড়ে। সত্যি কথা বলতে কি, হুমায়ূন আহমেদকে কখনোই 'জনপ্রিয়' হবার জন্য কাঙাল হতে দেখিনি, মিলনের মধ্যে সেই ব্যাপারটি খানিকটা থাকলেও আনিসুল হকের মধ্যে সেই কাঙালপনা বড়ো দৃষ্টিকটুভাবে চোখে পড়ে, এবং এজন্য মিডিয়াকে যথেচ্ছ এবং সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে ছাড়েন না তিনি। প্রিন্ট মিডিয়ায় নিজের নামে বিজ্ঞাপন দেয়া এবং নিজের লেখা নাটক-সিনেমার অস্বাভিাবিক প্রচার-প্রচারণার ব্যাপার তো আছেই, টেলিভিশনের এহেন কোনো অনুষ্ঠান নেই যেখানে ডাকলে তিনি যান না! আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না, তাঁর মতো একজন লেখককে কেন রান্নাবান্নার অনুষ্ঠানে যেতে হবে! লেখকরা টেলিভিশনে যেতেই পারবেন না, আমি তা বলছি না, বলছি রুচির কথা। আত্নমর্যাদাবোধ সম্পন্ন কোনো লেখকের তো টেলিভিশনে অতো দৌড়াদৌড়ি করার কথা নয়! বিশেষ করে তুচ্ছ অনুষ্ঠানগুলোতে লেখকদের উপস্থিতি চোখের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। একজন লেখককে তার পাঠকরা তো মাথায় করে রাখেন, টিভিতে সেই লেখককে আলুভর্তার রেসিপি দিতে দেখলে, বা রান্নাবান্না প্রতিযোগিতার বিচারক হতে দেখলে পাঠক হিসেবে নিজেকে ছোট মনে হয়! আনিস প্রচুর নাটক লেখেন, এবং আমি তাতে আপত্তিও করি না। নাটক রচনা করা আর নিজেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ অনুষ্ঠানে হাজির করা এক কথা নয়! এইসব তিনি করেন কেন? আমার ধারণা, করার কারণ_ তাঁর 'জনপ্রিয়' রচনার সম্ভাব্য পাঠকরা ওই রান্নাবান্না অনুষ্ঠানের দর্শক! অতএব এই দর্শক-পাঠকদের কাছে নিজেকে আরো খানিকটা পরিচিত করে তুলতে মেকাপ মেখে হাজির হতেও দ্বিধা নেই তাঁর। আমি এটাকেই বলছি কাঙালপনা। জনপ্রিয়তার জন্য হুমায়ূন আহমেদকে তো এইসব করতে হয়নি, লেখা ছাড়া জনপ্রিয় হবার অন্য কোনো কৌশল তিনি ব্যবহারই করেননি, তাহলে আনিসুলকে কেন করতে হয়? অবশ্য মিলনও টেলিভিশনমুখী এবং যে-কোনো ধরনের অনুষ্ঠানেই তাকে দেখা যায়। তবে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, মিলনের যেহেতু সুনির্দিষ্ট পেশা নেই আনিসের মতো, টেলিভিশনও তাঁর উপার্জনের একটা ক্ষেত্র। যা হোক, বাংলাদেশের জনপ্রিয় সাহিত্যের বিকাশে টেলিভিশনের ভূমিকা আছে। এ বিষয়ে একটু পরই কথা বলবো আমরা। আনিসও তার সুফলভোগী।

একজনের কথা আমি এ পর্যন্ত বলিনি, যদিও তিনি তুমুল জনপ্রিয়, তবে তাঁর বিষয়টি ঠিক জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে মাপা যাবে না। তিনি মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এই লেখক জনপ্রিয় হয়েছেন প্রধানত তাঁর কিশোর রচনা ও সায়েন্স ফিকশনের কারণে। শিশু-কিশোররা তাঁকে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়েছে। যে-কোনো জায়গায় তাঁর উপস্থিতিতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে যে আলোড়ন পড়ে, তাঁকে ঘিরে এই দেবদূতদের যে মেলা বসে, তার মতো নয়নাভিরাম দৃশ্য খুব কমই চোখে পড়ে। জনপ্রিয় হওয়ার জন্য তাঁকে অদ্ভুত-উদ্ভট কার্যকলাপ করতে হয়নি, লেখাই তাঁর একমাত্র সম্পদ। বরং নানারকম সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এখানে এসেই শিল্প ও শিল্পীর জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গটি আবার উত্থাপন করা যায়। মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর লেখাগুলোর কারণে যেমন তাঁর পাঠকদের কাছে অস্বাভাবিকরকমের জনপ্রিয়, তেমনি তাঁর ব্যক্তি-ইমেজের কারণে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে রয়েছে তাঁর অভাবিত গ্রহণযোগ্যতা। এই যুগপৎ জনপ্রিয়তা/গ্রহণযোগ্যতা আমাদের অন্য কোনো জনপ্রিয় লেখকের নেই।

৫.
এবার আনিস-পরবর্তী জনপ্রিয়দের নিয়ে দু-চার কথা বলা দরকার। আমার মনে হয়, আনিস-পরবর্তী প্রজন্মের 'জনপ্রিয়' লেখকগণ কোনো কোনো ব্যাপারে আনিসের উত্তরসুরী। মেধা-প্রতিভার দিক থেকে অবশ্য তারা আনিসের কেশাগ্রের সমানও নয়, তবে প্রচার-প্রচারণার ধরন-ধারণ, জনপ্রিয় হবার জন্য কাঙালপনা- এসবই যেন আনিসের কাছ থেকে পাওয়া। অর্থাৎ এরা সবাই জনপ্রিয় হবার জন্য দৃষ্টিকটু সব কাজকর্ম করেন। তবে পূর্বসুরীদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য হলো এই যে, পূর্বসুরীরা মূলধারা থেকেই জনপ্রিয় হয়েছেন, আর এই তরুণরা জনপ্রিয় হবার জন্যই লেখালেখি শুরু করেছেন এবং চালিয়ে যাচ্ছেন। মূলধারায় না থাকার কারণেই সারাবছর ধরে সাহিত্যজগতে এদের কোনো উপস্থিতি চোখে পড়ে না, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন না তারা, সাহিত্যের আলোচনায় তাদের নামটি ভুলক্রমেও উচ্চারিত হতে দেখা যায় না, নিজেরাও কোনো সাহিত্যিক আড্ডায় বা সভায় বা অনুষ্ঠানে শরিক হন না, লেখকদেও যে আলাদা একটা কমিউনিটি আছে তারা বোধহয় সেটা জানেনও না; অথচ ফেব্রুয়ারির বইমেলার সময় এদের হম্বিতম্বিতে মনে হয়- এরাই সাহিত্যের একমাত্র প্রতিনিধি- অন্য কোনো লেখকও নেই, অন্য কোনো লেখাও নেই (এটি তারা সত্যি সত্যিই মনে করেন, একটু পরেই সেই উদাহরণ দেব আমি)। মজার ব্যাপার হলো- মূলধারার পত্রপত্রিকা বা ছোটকাগজগুলো কিন্তু তাদের নিয়ে মাতামাতি করে না, নিজেদেরকে নিয়ে তারা নিজেরাই মাতামতি করেন। এটি তথাকথিত 'জনপ্রিয় সাহিত্যের' নতুন একটি ধারা। এই ধারার অগ্রজ লেখক হলেন প্রনব ভট্ট। তবে প্রনবের আগেও এই ধরনের আরেকজন লেখক ছিলেন, যিনি কাজেকর্মে অনেকটা একইরকম হলেও বিশেষ জনপ্রিয়তা পাননি। তিনি আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন। এই লেখক পুলিশের উচ্চপদস্থ এবং অতি ক্ষমতাবান কর্মকর্তা ছিলেন। তার সময়ে দেশে খুব কম সংখ্যক ঈদসংখ্যা বেরুতো, কিন্তু এমন একটি ঈদসংখ্যাও ছিলো না যেখানে এই লেখকের একটা উপন্যাস না থাকতো! সেইসব উপন্যাস নিতান্তই অখাদ্য রচনা, দু-পাতার বেশি পড়া যেত না, অথচ বৈধ-অবৈধ উপায়ে নানারকম চাপ প্রয়োগ করে তিনি সাহিত্য জগতে টিকে ছিলেন। বিস্মৃত হতেও সময় লাগেনি। প্রনব ভট্ট এক অর্থে আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীনের উত্তরসুরী। তিনি অবশ্য মানুষ হিসেবে ভালো ছিলেন, কিন্তু তার কোনো পুস্তকই তিন পৃষ্ঠার বেশি পড়া যায় না! এইরকম বীভৎস লেখা কোন শ্রেণীর পাঠকরা পড়েন খোদা মালুম! লেখালেখির মানের কথা যদি বলি, তাহলে আজকালকার জনপ্রিয় লেখকরা প্রণব ভট্টের উত্তরসুরী। যেহেতু লেখালেখিতে তাদের মেধা শূন্যের কোঠায়, ফলে জনপ্রিয় হবার জন্য তাদেরকে নানা কৌশল করতে হয়। বইমেলার সময় বহুলপ্রচারিত দৈনিকে দিনের পর দিন ধরে নিজের টাকায় রঙচঙে বিজ্ঞাপন দিতে হয়, প্রথম মুদ্রণ ছাপা হবার সময়ই দ্বিতীয়/তৃতীয় মুদ্রণ ছাপা হয়ে যায়, এবং নিয়মমাফিক প্রতি সপ্তাহের বিজ্ঞাপনের ভাষা পরিবর্তিত হয়ে যায়_ প্রথম মুদ্রণ শেষ, তৃতীয় মুদ্রণ শেষের পথে ইত্যাদি। অবশ্য পাঠকদের মনে এ প্রশ্ন জাগতেই পারে_ তারা যে নিজেদের টাকায় বিজ্ঞাপন দেন, তার প্রমাণ কি? প্রকাশকরাও তো দিয়ে থাকতে পারেন! প্রমাণের জন্য আপনার কমনসেন্সই যথেষ্ট, প্রিয় পাঠক। ধরা যাক একজন 'জনপ্রিয়' লেখকের পাঁচটি বই পাঁচ প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেরিয়েছে। এই পাঁচজন প্রকাশক কি একত্রিত হয়ে ওই লেখকের পাঁচটি বইয়ের বিজ্ঞাপন একটিমাত্র বক্সের মধ্যে সেঁটে দেবেন? প্রশ্নই ওঠে না। প্রকাশকরা বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে শুধুমাত্র নিজেদের প্রকাশিত বইটির বিজ্ঞাপন দিতে পারেন। সেটি তারা দেনও। হুমায়ূন বা মিলনের বা আরো অনেক লেখকের শুধুমাত্র নিজের প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটির বিজ্ঞাপনও দিয়ে থাকেন কোনো কোনো প্রকাশক। সেটি খুবই গ্রহণযোগ্য। প্রকাশক তো ব্যবসা করতে এসেছেন, 'বই' তার কাছে পণ্যই, নিজের পণ্যের কথা তিনি সম্ভাব্য ক্রেতাকে জানাবেন সেটি তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু লেখক নিজেও কি নিজের বইটিকে 'পণ্য' মনে করেন? নইলে একই কাণ্ড তিনি করেন কিভাবে? শুধু তাই নয়, মেলাপ্রাঙ্গণে তাদের দৌড়ঝাঁপ একটা দেখার মতো দৃশ্য হয়ে দাঁড়ায়! এক প্রকাশনীর স্টল থেকে অন্য স্টলে ছুটে বেড়ান তারা, নিজেই সেলসম্যানের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে পড়েন, ক্রেতা এলে নিজে থেকে নিজের বইটি এগিয়ে দেন, কখনো বা ক্রেতা একটা বই নিজে থেকে তুলে নিলে এরা স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে নিজের আরেকটা বই তার হাতে তুলে দিয়ে সেটিতে কী আছে তার বর্ণণা দেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। আত্নমর্যাদা শব্দটির সঙ্গে এদের পরিচয়ই নেই। নূন্যতম আত্নমর্যাদাবোধ থাকলে কোনো লেখকের পক্ষে এরকম নির্লজ্জ আচরণ করা সম্ভবই নয়! এরা কেউই মূলধারার লেখক নন, এদের লেখায় সাহিত্যমূল্য বলতে কোনো ব্যাপারও নেই, অথচ এদের আত্নম্ভরিতা সীমাহীন। মাসকয়েক আগে টেলিভিশনে এই প্রজন্মের একজন তরুণ 'জনপ্রিয়'র সাক্ষাৎকার 'অবলোকনের' মহাসৌভাগ্য হয়েছিলো। স্মার্ট উপস্থাপিকা তাকে- 'আপনার ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনা কি?' জিজ্ঞেস করার পর তার উত্তর ছিলো এরকম : আমি সারাদেশ থেকে 'মেধাবি' লেখক 'হান্ট' করবো। আপনারা (মানে, টেলিভিশনওয়ালারা) যেমন বিভিন্ন বিষয়ে ট্যালেন্ট হান্ট করেন, আমার কাজটিও সেইধরনের হবে। 'কেন?' কারণ, বাংলাদেশে মাত্র চার/পাঁচজন লেখক আছেন, বইমেলার সময় লেখার সময় লেখকই পাওয়া যায় না। এই চার/পাঁচজন ছাড়া আর কারো বই বিক্রিও হয় না। এই অভাব পূরণ করার জন্যই আমি লেখক হান্ট করতে চাই।' আহা, কী মহৎ ইচ্ছা! চার/পাঁচজন ছাড়া নাকি দেশে কোনো লেখকই নেই! বলাবাহুল্য, তিনি লেখক বলতে ওই জনপ্রিয়দেরই বুঝিয়েছেন, যাদের বই 'বিক্রি' হয়! তবে এই কথাগুলো বলার সময় কাশেম বিন আবু বকরের কথা ওই 'জনপ্রিয়' সাহেবের মনে ছিলো কী না, জানা হয়নি। প্রিয় পাঠক, আমি নিশ্চিত, এই নামটি শুনে আপনারাও চমকে উঠেছেন। নামটি কখনো শুনেছেন বলেও আপনার মনে পড়ছে না। তাহলে, শুনুন। বাংলাবাজারের বইয়ের বাজার সম্বন্ধে যাদের একটু-আধটু ধারণা আছে, তারা জানেন- বাংলাদেশে বই বিক্রির শীর্ষে আছেন যে লেখক, তার নাম হুমায়ূন আহমেদ নয়, কাশেম বিন আবু বকর! এ কথা প্রকাশকরাও স্বীকার করেন। তাহলে আমরা তাঁর নাম জানি না কেন? কারণ তিনি মূলধারার লেখক নন, তাকে নিয়ে কখনো আলোচনা হয় না পত্রপত্রিকায়, রেডিও-টেলিভিশনে। নিজেকে রঙচঙে বিজ্ঞাপনে রঞ্জিত করে হাজির করার পদ্ধতিও তার অজানা, অথবা জেনেও তিনি এর প্রয়োজন বোধ করেন না! এদিক থেকে দেখতে গেলে বলতে হয়, তরুণতর জনপ্রিয়রা কাশেমের চেয়েও অযোগ্য লেখক। কারণ তিনি বাংলাদেশের সর্বাধিক বিক্রিত লেখক, আর রঙ মেখেও কুলোয় না বলে এই তরুণদেরকে বইমেলায় নিরন্তর ছুটোছুটি করতে হয় নিজের দু-একটা বই সম্ভাব্য ক্রেতার হাতে পৌঁছে দেবার জন্য!

বইবিক্রির পরিমাণ দিয়ে জনপ্রিয়তার ব্যাপারটা ঠিকভাবে বোঝা যায় না, আবার 'জনপ্রিয়তা' লেখক হিসেবে শক্তিমত্তার পরিচয়ও বহন করে না। করলে, বলতেই হবে, কাশেম বিন আবু বকরই এদেশের সবচেয়ে শক্তিমান লেখক! এ কথা নিশ্চয়ই তরুণ জনপ্রিয়রাও স্বীকার করবেন না, এমনকি মহামূর্খ হলেও আবছাভাবে দু-চারজন শক্তিমান লেখকের কথা মনে পড়ে যাবে তাদের!

৬.
বাংলাদেশে জনপ্রিয় সাহিত্যের বিকাশে টেলিভিশনের একটা বড়োসড়ো ভূমিকা আছে! আগেই বলেছি, গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝিতে এসে প্রধানত হুমায়ূন আহমেদের কল্যাণে এবং দ্বিতীয়ত মিলনের টিন-এজ ক্রেজের কারণে জনপ্রিয় সাহিত্যের বিকাশ শুরু হয়। তাঁদের আগেও যে সাহিত্যে জনপ্রিয় উপাদান ছিলো না, তা নয়! রোমেনা আফাজ বা আকবর হোসেনের মতো মূলধারার বাইরের লেখকদের কথা বাদ দিলেও, আরো কেউ কেউ ছিলেন যাদের লেখা জনপ্রিয় হতে পারতো। এঁদের মধ্যে রাহাত খানের নাম সর্বপ্রথম নিতে হবে। প্রাঞ্জল-কমিউনিকেটিভ ভাষা, চমৎকার বিষয়, উইট, হিউমার সবই ছিলো তাঁর লেখায়। সৈয়দ হকের কিছু লেখাও জনপ্রিয় উপাদানে ভরপুর ছিলো। কিন্তু তাঁদের সময়ে জনপ্রিয় সাহিত্যের বিকাশ ঘটেনি কেন? আশির দশকেই বা এমনটি হলো কেন? হুমায়ূন বা মিলন দুজনেই লিখতে শুরু করেছিলেন ৭০ দশকে, শুরু থেকেই কেন তাঁরা জনপ্রিয়তা পাননি? এর উত্তর পাওয়া যাবে টেলিভিশনের নাট্যইতিহাসের দিকে তাকালে। আশির গোড়াতে হুমায়ূনের 'এইসব দিনরাত্রি' সারাদেশব্যাপি বিপুল সংখ্যক দর্শকদের কাছে সমাদৃত ও অভিনন্দিত হয়। এবং এর পরপরই হুমায়ূনের বইয়ের বিক্রি বাড়তে শুরু করে। বোঝা যায়, টেলিনাটকের কিছু দর্শক শুধুমাত্র হুমায়ূনের নাটক দেখে সন্তুষ্ট থাকতে পারছিলেন না, তারা তাদের প্রিয় নাট্যকারের উপন্যাসও পড়তে চাইছিলেন। এই দর্শকদের একাংশই হুমায়ূনের পাঠকে পরিণত হয়েছেন, এবং তাদের মাধ্যমে হুমায়ূনের আরো নতুন নতুন পাঠক তৈরি হয়েছে। শুধু 'এইসব দিনরাত্রি' নয়, প্রায় একদশক ধরে হুমায়ূন ছিলেন টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটকের রাজলেখক। হুমায়ূন মানেই হিট, হুমায়ূনের নাটক মানেই রাস্তাঘাট খালি হয়ে যাওয়া, টেলিভিশনের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়া পেশা-বয়স নির্বিশেষে সব ধরনের দর্শকদের ক্লান্তিহীন উপভোগ! 'কোথাও কেউ নেই' 'বহুব্রিহী' 'অয়োময়' 'আজ রবিবার' ইত্যাদি ধারাবাহিকের কথা এখনো দর্শকরা ভোলেননি। সঙ্গে একক নাটক তো ছিলোই। তখন বিটিভিই ছিলো একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল, হুমায়ূনকে তাই তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও পড়তে হয়নি। কিন্তু নাটকেই বা হুমায়ূন এমন বাজিমাত করলেন কিভাবে? তখন কি নাট্যকার-নাটক সংকটে ভুগছিলো টেলিভিশন বা দর্শকরা? না, তা নয়। বরং ওই সময়টাই ছিলো বাংলা টেলিনাটকের স্বর্ণযুগ। আতিকুল হক চৌধুরী, মমতাজউদ্দিন আহমদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন এবং আরো পরে এসে আখতার ফেরদৌস রানা- টেলিনাটকে একেকটা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো নাম। তবু হুমায়ূন কিভাবে সব এমন দখল করে নিলেন? তার কারণ ওই 'এইসব দিনরাত্রি'। টেলিভিশনের মধ্যবিত্ত দর্শকরা নিজেদেরকে দেখতে পেলেন এই নাটকে; দেখলেন নিজেদের সুখদুঃখ-আনন্দবেদনা-হাসিকান্না-ঠাট্টাদুষ্টুমি-আবেগঅভিমান এবং সর্বোপরী আকাঙ্ক্ষার চিত্র। উল্লেখ্য যে, তখনো বাংলাদেশে টেলিভিশন ব্যাপারটা আজকের মতো এত সহজলভ্য ছিলো না। ঘরে ঘরে টেলিভিশন পৌঁছেনি, নিম্নবিত্ত তো দূরের কথা, অনেক মধ্যবিত্তের ঘরেও তখন টেলিভিশন ছিলো না। মফস্বলে কিছু ঘরে থাকলেও গ্রামে ব্যক্তিগত সংগ্রহে টেলিভিশনের সংখ্যা ছিলো খুবই কম, বাজারে বা ইউনিয়ন পরিষদে রাখা একমাত্র টেলিভিশন দেখার জন্য লোকজন জড়ো হতো; ফলে, তখন পর্যন্ত টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক ছিলো মূলত শহুরে মধ্যবিত্তই। এই দর্শকরাই 'এইসব দিনরাত্রি'র মাধ্যমে হুমায়ূনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচিত হয়েছিলেন। সত্যি বলতে কি, 'পারিবারিক কাহিনী' বলতে যা বোঝায় 'এইসব দিনরাত্রি' ছিলো তারই প্রথম স্বার্থক রূপায়ন, পারিবারিক বিনোদন বলতে যা বোঝায় সেটাও এই প্রথমবারের মতো উপভোগ করলো টেলিনাটকের দর্শককূল। এদের একটি বড়ো অংশ যেহেতু মধ্যবিত্ত শিক্ষিত দর্শক, তারা যে এই নাট্যকারের বই পড়ে দেখতে চাইবেন, তা আর অস্বাভাবিক কি? এই পাঠকরা হয়তো সাহিত্যের মূলধারার কোনো খবরই রাখতেন না, হুমায়ূন ছাড়া যে আর কোনো লেখক আছেন দেশে, সাহিত্য বলে যে একটা বিষয় নিয়ে কিছু লোক মাতামাতি করেন, তা-ও হয়তো তাদের অজানাই ছিলো। এই নতুন পাঠকগোষ্ঠী, যারা প্রধানত টেলিনাটকের দর্শক, যখন হুমায়ূনের বই কেনা শুরু করলেন তখন একটা অভাবিত ঘটনা ঘটলো। বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস নতুন একটা বাঁক নিলো, পণ্য হিসেবে 'বই' নামক অত্যন্ত স্লো আইটেম (এবং প্রায়শই অলাভজনক) দ্রুতই একটা লাভজনক পণ্যে পরিণত হলো। হুমায়ূন কিন্তু থামলেন না, ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের নাটক উপহার দিয়েই চললেন। 'বহুব্রিহী' এবং 'আজ রবিবার'-এ ব্যাপক হিউমার উপহার দিলেন, 'অয়োময়'-এ ইতিহাসের এক অনালোকিত অধ্যায়কে টেলিভিশনের পর্দায় হাজির করলেন, 'কোথাও কেউ নেই'-এ শহুরে জীবনের হাসিকান্নামাখা কাহিনীচিত্র নিয়ে এলেন। ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার এই কাজগুলো তাঁকে দর্শকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তুললো। তবে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো_ হুমায়ূন যে শুধু নাটক নিয়েই পড়ে রইলেন তা নয়, লেখালেখিও চালিয়ে গেলেন পূর্ণ মাত্রায়। শুধু মধ্যবিত্তের হাসিকান্নার ইতিহাসই লিখলেন না, নিয়ে এলেন মিসির আলী এবং হিমু নামক দুটো অভাবনীয় চরিত্র, লিখলেন চমৎকার সব সায়েন্স ফিকশনও। ফলে তাঁর পাঠকরা সর্বদাই একটা নতুনত্বের স্বাদ পেতে থাকলেন তাঁর কাছে। তাঁর জনপ্রিয়তা উত্তোরত্তর বেড়েই চললো, তৈরি হলো নতুন নতুন পাঠক, আর সেইসব পাঠকদের সর্বগ্রাসী চাহিদা পূরণের জন্য অনিবার্যভাবেই তাঁকে যোগান দিয়ে যেতে হলো নানা ধরনের কল্পকাহিনী। একজন মানুষের ভাণ্ডারে কতোটুকুই বা জমা থাকে? সব উজার করে দিতে গেলে 'ভালো' জিনিস ফুরিয়ে গিয়ে একসময় উচ্ছিষ্টটুকু বেরিয়ে আসে, তাঁর ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটতে লাগলো। একসময় 'নিজের আনন্দের জন্য' যে 'শিল্পী' তাঁর 'শিল্প' রচনা করতেন, তিনিই ঘটনাচক্রে জনরুচির কাছে আত্নসমর্পণ করার লোভ সামলাতে পারলেন না। এক কথায়, তাঁর পতন ঘটলো। এক হিমুকে নিয়ে বাড়াবাড়ির ঘটনা থেকেই ব্যাপারটা টের পাওয়া যায়! (বইমেলায় একদল অর্ধউন্মাদ তরুণের হলুদ পাঞ্জাবি পরে ছুটোছুটি করা, হিমুর বিয়ে নামক বিচ্ছিরি একটা ব্যাপারের আয়োজন করা- প্রকাশকের এইসব কর্মকাণ্ডকে তাঁর মতো একজন মানুষ কিভাবে অনুমোদন করেন, ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়!) শুধু লেখালেখিতেই নয়, টেলিনাটকেও তিনি সচল আছেন, তবে আগের সেই আনন্দ-বিনোদন খুঁজে পাওয়া যাবে না তাঁর নাটকে, পাওয়া যাবে নিছক ভাঁড়ামি। এ হচ্ছে জনরুচির কাছে আত্নসমর্পণের ফল।

ইমদাদুল হক মিলনও টেলিভিশনে খুব দর্শকনন্দিত নাটক লিখেছেন। নব্বই দশকের শুরুর দিকে 'যতো দূরে যাই'-এর কথা মনে পড়ছে আমার, এই মুহূর্তে। এরকম অসংখ্য খণ্ড নাটক, ধারাবাহিক নাটক (যেমন, 'বারো রকমের মানুষ'), একঘণ্টার নাটক আছে তাঁর, যেগুলো দর্শকরা লুফে নিয়েছিলেন। তবু, আমি বলবো, তাঁর জনপ্রিয়তার ধরনটি হুমায়ূন থেকে আলাদা। মিলনের দর্শক-পাঠকরা প্রধানত টিনএজার। শুরু থেকেই তিনি এদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বইটিও তখনকার টিনএজারদের কাছে প্রিয় ছিলো। কিন্তু, টিনএজাররা যেহেতু চিরকাল টিনএজার থাকে না, তাদের বয়স বাড়ে, বুদ্ধি বাড়ে, আবেগের ধরন বদলায়, অতএব তাদের একসময়ের প্রিয় 'এইসব' লেখাকে একসময় বালখিল্যসুলভ মনে হয়। এই পাঠকদের মধ্যে যারা বোধবুদ্ধি ও অনুভূতির তীব্রতা দিয়ে জীবন ও জগতের জটিল রহস্যময়তার অস্তিত্ব অনুভব করে উঠতে পারেন, তারা মিলনের ভালো লেখাগুলো খুঁজে নেন। আর যারা তা পারেন না, যারা একটা অনতিক্রম্য গণ্ডির মধ্যেই জীবন কাটিয়ে দেন, যাদের মানসিক বিকাশের হার প্রায় একটা জড় পদার্থের মতোই, যদিও সময়ের নিয়মে তাদের বয়স বেড়েছে, তাদের কাছে মিলনের উন্নত শিল্পরুচিসম্পন্ন লেখাগুলোকে কঠিন মনে হয়! হুমায়ূনের প্রায় সব লেখাই যেমন সব বয়সী পাঠকদের কাছে 'মজাদার' ও 'আরামদায়ক', মিলনের লেখাগুলো তা নয়! বরং তাঁর উন্নত লেখাগুলো জীবনের এক জটিল দিক উন্মোচন করে পাঠককে দেখায়, পাঠক ভাবতে বাধ্য হন, তার 'আরাম' নষ্ট হয়ে যায়! জড়বুদ্ধিসম্পন্ন পাঠকরা তাই মিলনের কাছ থেকে দূরে সরে যান দুটো কারণে- বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে টিনএজারদের জন্য লেখা কেচ্ছাকাহিনীগুলো ভালো লাগে না, আবার ভালো লেখাগুলো তারা বুঝতে পারেন না বা পারলেও যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়! মিলন এভাবেই তাঁর পুরনো পাঠক হারান, কিন্তু হুমায়ূন কখনোই হারান না।

সময় পাল্টায়, নতুন সময়ের টিনএজারদের জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, ঔচিত্যবোধ, নৈতিকতার বোধ- সবই পুরনো সময়ের টিনএজারদের চেয়ে বদলে যায়। বয়স বেড়ে যাওয়া মানুষগুলো নতুন সময়ের এই টিনএজারদের চিনতে পারেন না, বুঝতেও পারেন না। আর তাই বয়স্ক মানুষদের মুখে প্রায়ই এই আক্ষেপ-অভিযোগ শোনা যায়- 'তোদের বয়সে তো আমরা এমন ছিলাম না!' থাকবেন কিভাবে? সময় পাল্টে গেছে যে! বয়সটা একই হলে কি হবে, সময়ের কারণেই এই তরুণদের জীবনে যে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে, আপনাদের জীবনে তো তা ছিলোই না! আপনার তারুণ্যের সময় সেলফোন নামক কোনো বস্তু ছিলো না, যে, সময়ে-অসময়ে প্রিয় বন্ধু/বান্ধবীকে কল/মিসকল/এসএমএস দিয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দেবেন, ছিলো না ইন্টারনেট নামক যোগাযোগ মাধ্যমটিও যে চিঠির বদলে ইমেইল করবেন, চ্যাট করবেন ইত্যাদি। এগুলো দু-একটি উদাহরণ, একটু ভালো করে আপনার চারপাশে চোখ বুলালেই আপনি দেখতে পাবেন- কতো কতো পরিবর্তন ঘটে গেছে চারপাশে! তরুণরা এই পরিবর্তনের গর্বিত অংশিদার, আপনার সেটা ভালো লাগুক আর না লাগুক, তারা তা উপভোগ করবে। সেক্ষেত্রে যে বইটি আপনার কৈশোরে বা সদ্য তারুণ্যে আপনার বুকে হাহাকার তুলেছিলো, চোখ ভিজিয়ে তুলেছিলো, তা যে আজকের তরুণদেরও মনে ঝড় তুলবে এমন কোনো নিশ্চয়তা তো নেই! আর তাই, একসময়ের টিনএজারদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় একটি লেখা সময়ের ফাঁদে পড়ে অজনপ্রিয় হয়ে যেতে পারে। নতুন সময়ের টিনএজারদের মন জয় যদি করতেই হয়, তাহলে এদের মনটা বুঝতে হবে, সময়টিকে বুঝতে হবে, এদের জীবনযাপন ও মূল্যবোধের ধরনটি বুঝতে হবে। পুরনো সময়ের লেখকরা কি তা পারবেন? মনে হয় না! তারা তো এই জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে যান না! মিলনের জনপ্রিয়তার ক্রমাবনতির এই হলো কারণ। কিন্তু তিনি জনপ্রিয়তার হ্রাসের এই ব্যাপারটা বোধহয় মানতে পারেন না, ফলে নানাভাবে চেষ্টা করে যান নব্য তরুণদের মন জয়ের, সেটা আর হয়ে ওঠে না, বরং সেগুলো সাক্ষর হয়ে থাকে শিল্পী হিসেবে তাঁর পতনের। সেই একই ব্যাপার- জনরুচির কাছে আত্নসমর্পণ!

৭.
সত্যি কথা বলতে কি, শিল্পসাহিত্য বিষয়টা কখনোই জনগনের জিনিস নয়। সূক্ষ ও উন্নতরুচির মানুষই শিল্পের ভোক্তা ও পৃষ্টপোষক। এবং একটা বিষয় খেয়াল করলে দেখা যাবে- শিল্প যত বেশি মূর্ত ততো বেশি ভোক্তা, বিমূর্ত শিল্পের ভোক্তা কম, এবং খানিকটা জনবিচ্ছিন্নও বলা যায়! চলচ্চিত্র-নাটক ইত্যাদির ভোক্তা সবচেয়ে বেশি, কারণ এগুলো সরাসরি মূর্ত শিল্পমাধ্যম, ভিজুয়াল মিডিয়া। বিমূর্ত চলচ্চিত্রও হতে পারে ('দেখে কিছুই বোঝা গেল না' ধরনের), তবে তা কখনো 'জনপ্রিয়' হয় না। কবিতা-গল্পের চেয়ে উপন্যাসের পাঠক বেশি। কারণ ওই একটাই। উপন্যাস যেভাবে ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এগোয় সেটা পাঠকের সামনে কাহিনীকে মূর্ত করে তুলতে সহায়তা করে এবং ভোক্তার মনের ওপর চাপ কম পড়ে, কবিতা তা করে না। গল্প করে, তবে কম মাত্রায়। চিত্রকলার ভোক্তা আরো কম। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বাণী-সুর সমৃদ্ধ গানগুলো ধ্রুপদী সঙ্গীতের চেয়ে জনপ্রিয় হয়ে থাকে। এই যে জন-গ্রহণযোগ্যতার ধারাক্রম, এটা দেখে নিশ্চয়ই কেউ বলবেন না যে, পপ সঙ্গীতের চেয়ে ধ্রুপদী সঙ্গীত কম শিল্পমান সম্পন্ন, কারণ তার ভোক্তা কম; বা কবিতা শিল্পমাধ্যমটি উপন্যাসের চেয়ে দূর্বল কারণ তার পাঠক কম। বরং উল্টোটাই বলবেন। আসলে জনরুচি দিয়ে শিল্পবিচার হয় না। সত্যি কথা বলতে কি জনরুচি-শিল্পরুচি একসঙ্গে যায়ই না। জনরুচি সবসময়ই চটুলতার পক্ষে থাকে, কখনোই তা শিল্পাভিমুখী নয়। আর এই চটুল জনরুচির দায় মেটাতে গিয়ে নিজের শিল্পরুচির কথা বিস্মৃত হন জনপ্রিয়রা। তাদের শিল্পীজীবনের এটিই সবচেয়ে ট্র্যাজিক পরিণতি। জনপ্রিয় লেখকেরা ক্রমাগত সেই অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছেন, ব্যাপারটা কি তারা জানেন?


রচনাকালঃ জুলাই ২০০৯