প্রাককথন
জিগাতলার যে বাসাটিতে থাকেন তিনি, সেটি এতোই সাধারণ আর
বৈশিষ্ট্যহীন যে কারো পক্ষে ধারণা করাও সম্ভব নয় _ এখানে বাংলা
কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরুষ মাহমুদুল হক বসবাস করেন। আপনি
যদি কখনো যান সেখানে, মৃদুহাস্যে আপনাকে সম্ভাষণ জানাবেন তিনি,
অপরিচয়ের দূরত্ব কয়েক মিনিটেই কেটে যাবে তাঁর আন্তরিকতায় এবং
অচিরেই মেতে উঠবেন তুমুল আড্ডায় _ ভেসে যাবেন তাঁর গল্পের স্রোতে।
তাঁর লেখার মতোই তাঁর কথা বলার ঢংটিও যাদুকরি, একবার সেটি শুরু হলে
আপনার বেরিয়ে আসা কঠিন হবে, ৫/৬ ঘণ্টা এমন এক ভঙ্গিতে গল্প চলবে
যে, আপনি বুঝতেই পারবেন না _ কখন এতোখানি সময় কেটে গেছে! কিন্তু
যদি বলেন _ আপনি তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন, তিনি কোনোভাবেই আর
কথা বলবেন না, আপনার অনেক প্রশ্ন প্রশ্নই থেকে যাবে, উত্তর মিলবে
না। কী এক অজানা কারণে তিনি নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন তাঁর
অতিপ্রিয় সাহিত্যের জগৎ থেকে! 'বাংলা গদ্যে প্রভুত্ব করার ক্ষমতা'
নিয়ে যিনি আবিভর্ূত হয়েছিলেন, আমাদের সেই বটু ভাই গত ২৪ বছরে তিনি
কিছুই লেখেননি (একটিমাত্র গল্প ছাড়া), প্রায় দু-দশক ধরে
স্বেচ্ছানির্বাসন বেছে নিয়েছেন; এখন প্রায় সারাদিনরাত নিজের ঘরে
একা বসে থাকেন তিনি, কোথাও যান না, কারো সঙ্গে মেশেন না, মিডিয়ার
সঙ্গে কথা বলেন না, তবে কেউ তাঁর বাসায় গেলে খুশি হন, আড্ডায় মেতে
উঠতে পছন্দ করেন, গল্পের স্রোতে ভাসিয়ে দেন তাকে _ যদি সুস্থ
থাকেন। কতো বিষয় নিয়ে যে কথা বলেন তিনি! বিশেষ করে যখন তাঁর লেখক
জীবনের স্মৃতিচারণ করেন তিনি, তখন যেন ৫০/৬০/৭০ দশকের ঢাকা শহর, এর
সাহিত্যিক পরিমণ্ডল আর সাহিত্যের মানুষগুলো একেবারে জীবন্ত হয়ে
ওঠে। বহুদিন আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি, বুঝে উঠতে চেয়েছি _ কেন এতো
শক্তিশালী কলমটিকে তিনি খাপবন্দি করে রেখেছেন! এ বিষয়ে তিনি মুখ
খুলতে চান না মোটেই, প্রশ্নটি করলে এড়িয়ে যান, গল্পের মুখ ঘুরিয়ে
দেন এমনভাবে যে প্রশ্নকর্তা ভুলেই যান _ তিনি কী প্রশ্ন করেছিলেন!
তবু একদিন কোনো এক বিশেষ মুহূর্তে তিনি এ বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন,
বলেছিলেন তাঁর ক্লান্তির কথা, ব্রেকডাউন অব কমিউনিকেশনের কথা _
লিখতে লিখতে একসময় একঘেঁয়েমিতে ভুগছিলাম আমি, তাছাড়া এসবকিছুকে
ভীষণ অর্থহীনও মনে হচ্ছিলো আমার কাছে। কি করছি, কেন করছি, এসবের
ফলাফল কি, আদৌ এসব করার কোনো অর্থ হয় কী না _ এইসব আর কি! সব
মিলিয়ে লেখালেখিটা আর ভালোলাগেনি। অবশ্য একেবারে পরিকল্পনা করে,
সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখালেখি বন্ধ করেছিলাম তা নয়। এরকম তো সব লেখকেরই
হয় যে, মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসে, মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে,
মাঝে মাঝে বন্ধ্যাত্নও দেখা দেয়। আমার সেটাই হয়েছিলো। কিন্তু সব
লেখকই সেই সময়টি পেরিয়ে আবার লেখালেখিতে ফিরে আসেন। আমার আর ফিরে
আসা সম্ভব হয়নি... তোমাকে একটা গল্প বলি শোনো _ ডাক্তার নন্দী নামে
এক ভদ্রলোক আমার মায়ের চিকিৎসা করতেন। খুব অদ্ভুত মানুষ ছিলেন
তিনি। পশুপাখির সঙ্গে কথা বলতেন, মনে হতো তিনি ওদের ভাষা বোঝেন,
অন্তত তাঁর কথা বলার ধরনটা ওইরকমই ছিলো। তাঁর পোষা কুকুর ছিলো,
সেগুলোকে তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসতেন, আমি তখন টিয়েপাখি পুষতাম,
তিনি আমাদের বাসায় এসেই আগে টিয়েকে আদর করতেন, কথাবার্তা বলতেন। তো
ওই ভদ্রলোক আমার কাছ থেকে বই নিয়ে যেতেন পড়ার জন্য। একদিন তিনি
বললেন _ 'আমার কি মনে হয় জানো? মনে হয় আমরা সময় কাটাবার জন্য,
ক্লান্তি দূর করার জন্য এসব বইটই পড়ি, অথচ এসব যারা লেখেন তাঁদেরও
একসময় আর এগুলো ভালো লাগে না। বুঝলে, ক্লান্ত লাগে, ক্লান্ত লাগে।'
তাঁর এই কথাটা আজকাল আমার খুব মনে পড়ে। আমারও এখন ক্লান্ত লাগে,
ভীষণ ক্লান্ত লাগে। জীবনটাকে ভীষণ অর্থহীন মনে হয়। আর তাছাড়া, লিখে
কি হয়? লেখালেখি করে কি কাউকে কমিউনিকেট করা যায়? মিউজিক বরং অনেক
বেশি কমিউনিকেটেবল ল্যাংগুয়েজ। লেখালেখিতে যা কিছু বলতে চাই তা বলা
হয়ে ওঠে না, আমি অন্তত বলতে পারিনি। যেটুকু বলেছি তা-ও যে বোঝাতে
পেরেছি বলে মনে হয় না। যাকে বলে ব্রেকডাউন অব কমিউনিকেশন সেটা
আমাদের প্রায় সবার জীবনে ঘটে, আমার জীবনেও ঘটেছে।
কি বলতে চেয়েছিলেন তিনি _ এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। কিন্তু যা
কিছু বলেছেন তার মাধ্যমে কিই-বা বোঝাতে চেয়েছেন _ আমরা অন্তত
সেটুকু খুঁজে দেখার চেষ্টা করতে পারি।
১.
মাত্র সাতটি উপন্যাস মাহমুদুল হকের _ জীবন আমার বোন, কালো বরফ,
নিরাপদ তন্দ্রা, খেলাঘর, অনুর পাঠশালা, মাটির জাহাজ এবং অশরীরী,
দুটো গল্পগ্রন্থ _ প্রতিদিন একটি রুমাল ও নির্বাচিত গল্প, আর
একটিমাত্র কিশোর উপন্যাস _ চিক্কোর কাবুক। এছাড়াও অগ্রন্থিত
উপন্যাস আছে একটি, অগ্রন্থিত গল্পও প্রায় শ' খানেক, রয়েছে হারিয়ে
যাওয়া তাঁর প্রথম উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিও। অগ্রন্থিত রচনাগুলো পড়ার
সুযোগ হয়নি, কিন্তু গ্রন্থগুলোর দিকে তাকালে যে-কারো মনে হবে _
মাহমুদুল হকের সবচেয়ে প্রিয় বিষয় _ মুক্তিযুদ্ধ। জীবন আমার বোন,
খেলাঘর এবং অশরীরী উপন্যাসে আর কালো মাফলার, বুলু ও চড়ুই, বুড়ো
ওবােেদর জমা খরচ, বেওয়ারিশ লাশ, প্রতিদিন একটি রুমাল প্রভৃতি গল্পে
মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটিকে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।
কিন্তু এর সবগুলোকেই কেবল ঘটনা-বর্ণনার দায় থেকে মুক্ত রেখেছেন
লেখক, বরং মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্রে রেখে যোগ করেছেন এমন এক নতুন
মাত্রা যা এগুলোকে নিয়ে গেছে এক দৃষ্টিগ্রাহ্য উচ্চতায়।
জীবন আমার বোন-এর কথাই ধরা যাক। উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার
ঠিক আগের সময়টি নিয়ে লেখা। চারপাশে কোলাহল; সারাটি দেশ হয়ে উঠেছে
বিস্ফোরোন্মুখ, মেতে উঠেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উত্তেজনা, আয়োজন ও
উন্মাদনায় _ মিটিং মিছিল বিক্ষোভ বিদ্রোহ _ প্রতিটি মানুষ
কোনো-না-কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ছে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে। রাজপথে
যারা নেই, তারাও চায়ের কাপে তুলছে ঝড় _ টেবিল ভেঙে ফেলছে থাপ্পর
মেরে। অথচ এমনই এক উন্মাতাল সময়ের ভেতর এই উপন্যাসের 'নায়ক' খোকা
বন্ধুদের সঙ্গে কোলাহলমুখর এক রেসঁ্তোরায় আড্ডা দিতে দিতে কী
ভাবছে, আসুন প্রিয় পাঠক, একটু দেখে নেয়া যাক :
খোকা কোনো কথা বললো না। চুপচাপ তাকিয়ে রইলো ঘনায়মান অন্ধকারের
দিকে। ... পানির উপরে হাওয়ার নাচন শুরু হয়েছে। বাংলা কবিতার একটি
বিড়াল অন্ধকারকে ছোট ছোট বলের মতো থাবা দিয়ে লুকিয়ে আনছে, ছড়িয়ে
দিচ্ছে, আর 'চল নামি আষাঢ় আসিয়াছে' ধরনের ঝাঁপ দিয়ে উদ্যানের এক
প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ছোটাছুটি করে নৃত্যরত জিপসী তা কুড়িয়ে
নিচ্ছে, যেন শিলকুড়ু নি শৈশব। শৈশব জীবনে বারবার আসে না কেন? আসলে
জীবন মানেই শৈশব; জীবনভর মানুষ এই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙিয়ে খায়, আর
কোনো পুঁজিপাট্টা নেই তার। এই এক অদ্ভুত জীব, ধাপে ধাপে এরা
নিজেদেরকে ছোট করে তোলে, রক্তে মিশে আছে এদের নিজেদের পতন।
ঐ কোলাহল আর উন্মাদনার ভেতর খোকার এমন পারম্পর্যহীন-অপ্রাসঙ্গিক
ভাবনা আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য হই _ এ নিছক ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং
উত্তুঙ্গ উত্তেজনায় আক্রান্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর ভেতর লেখক অন্তত একজন
ব্যক্তিকে দেখতে চান _ যে স্রোতে ভেসে যাওয়া গড় মানুষ নয়, এবং যার
রয়েছে এক উজ্জ্বল স্বাতন্ত্র্য। বাঙালির ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে
গুরুত্ববাহী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা _ মুক্তিযুদ্ধেও খোকা অংশগ্রহণ
করে না; কেন করে না _ এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান মাহমুদুল হককে
বুঝতে সাহায্য করবে। খোকা শুধু অংশগ্রহণবিহীনই নয়, বরং তার অবস্থান
যেন ঠিক এই সব 'হুজুগের' বিরুদ্ধে। কথাটা একটু রিস্কি শোনায় _ সে
কি তবে শত্রুদের পক্ষ নিয়েছিলো? না তা-ও নয়। তার যেন কোনো
পক্ষ-বিপক্ষ নেই, যেন সে জনতার এই জঘন্য মিতালিটাও মেনে নিতে পারছে
না। সবকিছুকে তার মনে হচ্ছে অসাড়, যুক্তিহীন, পরিকল্পনাহীন, হুজুগ।
নিজের এই অবস্থানের পক্ষে তার রয়েছে অসংখ্য যুক্তি। খোকা হিরো নয়,
ভিলেনও নয় _ এমনকি অ্যান্টিহিরোর ভূমিকাও তার নেই। তাহলে খোকাকে
আমরা কি বলতে পারি? সে সাধারণ মানুষ _ কিন্তু বিবরবাসী _ ঘটমান
ঘটনাসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা স্বপ্নাক্রান্ত (নাকি
দুস্বপ্নাক্রান্ত?) এক পলায়নপর যুবক সে। কিন্তু সবকিছু থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে, নিঃসঙ্গতায় নিজেকে আক্রান্ত করে সে কি পালাতে পারে
বীভৎস বাস্তবতা থেকে? এই উপন্যাসের কূটাভাস এই যে, যতোই বিচ্ছিন্ন
হোক না কেন একজন মানুষ, যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি নেই কারো _
খোকাকেও তাই আক্রান্ত হতে হয়, বোন রঞ্জুকে হারাতে হয়, আর সে
সারাজীবনের জন্য আরো বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে যায়।
আবার খেলাঘর_এ আমরা দেখি ইয়াকুব আর রেহানাকে দিয়ে যুদ্ধের সময়ই এক
স্বল্পকালীন খেলাঘর তৈরি করেছেন মাহমুদুল হক। খেলাঘর _ নামেই এর
ক্ষণস্থায়ীত্ব স্পষ্ট _ দু-দিনেই ভেঙে যাবে, এ-তো জানা কথা; পাঠকের
তেমন প্রস্তুতিও থাকে _ ভেঙে গেলে পাঠক তাই বিমূঢ়, বিব্রত হন না;
কিন্তু এই অল্প সময়েই এই দু-জনের সম্পর্কের ধরন ও কার্যকলাপ পাঠককে
ভীষণ ভাবনায় ফেলে দেয়। ইয়াকুব খোকার মতো নয়, খোকা তার ব্যতিক্রমী
ভাবনার কারণেই কখনো কখনো সাধারণের সীমা পেরিয়ে যায়, ইয়াকুব
নিতান্তই এক সাদামাটা সাধারণ মানুষ, প্রত্যাশাহীন, স্বপ্নহীনও বলা
যায় _ সে যুদ্ধে যাবে, লড়াই করবে _ এমন আশা করাটাই বোকামী। তার
জন্য স্বাভাবিক বরং রেহানার সঙ্গে মিলেমিশে এক অদ্ভুত খেলাঘর গড়ে
তোলা। বস্তুতপক্ষে এই গড়ার পেছনেও আছে সময়েরই কারসাজি _ সময়টিই এমন
যে, সবাইকেই কোনো না কোনো ভাবে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে হয়।
নইলে যে-রেহানা কেবল ইয়াকুবের বন্ধুর কাজিন মাত্র, আর কিছু নয়,
এমনকি তার পূর্বপরিচিতও নয় _ সে-ই কেন এভাবে এসে পড়বে তার জীবনে
এবং গড়ে তুলবে এমন অদ্ভুত খেলাঘর? ঘটনাটি স্বাভাবিক সময়ে ঘটলে হয়তো
একে কাকতালীয় বলে এড়িয়ে যাওয়া যেতো, কিন্তু এ যে যুদ্ধের সময় _ কার
জীবনে যে কী ঘটে যাচ্ছে তা সে নিজেই জানে না। যেমন পাকিস্তানিরা
রেহানাকে রাস্তার থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো, এই 'মিসহ্যাপ'_এর
ফলশ্রুতিতে মানসিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে তার। সাময়িকভাবে তাকে
দেখে রাখার দায়িত্ব পেয়েছে ইয়াকুব _ একে আসলে ঘটনার শিকার হওয়া
ছাড়া আর কীই-বা বলা যায়? এবং এটা তার জন্য প্রয়োজন ছিলো। কারণ পুরো
বিষয়টি তাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, নিজের দিকে ফিরে
তাকানোর সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে সারাটি উপন্যাস জুড়ে রেহানা
স্মৃতিকাতর _ কেবলই শৈশব-কৈশোরের কথা বলতে ভালোবাসে সে। পাঠকের
কাছে তার দুর্ঘটনার সংবাদটি প্রকাশিত হয় উপন্যাসের একদম শেষের দিকে
_ তবু কি মনে হয় না যে, এই অবিরাম স্মৃতিচারণের নিগুঢ় অর্থ আছে
কোনো? প্রশ্ন জাগে _ কেন এই অবিরাম অতীতকথন, কেন এমন স্মৃতিতে ডুবে
থাকা? এ-ও কি পলায়ন নয়? বর্তমানের ভয়াবহ বাস্তবতা ও বিপর্যয় থেকে
যারা মুখ ফিরিয়ে থাকতে চায়, উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে যারা
ঝড়ের তাণ্ডব থেকে নিজেদের বাঁচাতে চায় _ ওই স্মৃতিচারণ ছাড়া তাদের
আর আছেটা কি? ইয়াকুব ও রেহানা তাই যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে থেকেও
নেই। একদিকে আক্রান্ত স্বদেশ, বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা, সহজ-সরল
মানুষগুলোও বদলে যাচ্ছে _ যেমন মুকুল _ কৃষকরা পর্যন্ত লাঙল ফেলে
বন্দুক তুলে নিচ্ছে, অন্যদিকে রেহানা ও ইয়াকুবের এই প্রাপ্তিহীন
ব্যক্তিজীবন _ পাঠককে ভাবনায় ফেলে দেয়। লেখক কি করতে চান এইসব
চরিত্র দিয়ে? বস্তুতপক্ষে এখানেই মাহমুদুল হকের স্বাতন্ত্র্য _
তিনি স্রেফ যুদ্ধের বর্ণনায় অনিচ্ছুক; যুদ্ধ চলাকালিন সময়েও যে
একদল মানুষ কেবল নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে _ তিনি তাদের দিকেও
তাকান। খোকা, রেহানা, ইয়াকুব বা নীলাভাবী _ এরা সবাই সময় থেকে
বিচ্ছিন্ন; বিপন্ন, বিষণ্ন ও নিঃসঙ্গ। সময়ের চাহিদাকে তারা
তোয়াক্কা করে না বরং ব্যস্ত হয়ে থাকে নিজেদের ব্যক্তিগত সংকট নিয়ে,
ফলশ্রুতিতে আরো বেশি করে নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়_ মাহমুদুল হক এদের
দিকে তাকিয়েছেন মমতার চোখে, বাড়িয়েছেন ভালোবাসার হাত _ এসব চরিত্র
নির্মাণে সেই ছাপ স্পষ্ট _ তারা তাই পাঠকের ভালোবাসাও পেয়ে যায়।
কিন্তু এর বাইরেও এসব চরিত্রের মাধ্যমে তিনি হয়তো দিতে চান এই
ধ্রুপদি ইঙ্গিত যে, কোনোকিছুতেই জীবন থেমে থাকে না, এমনকি যুদ্ধের
সময়ও। প্রেম চলে, চলে প্রণয়, চলে সবকিছুই।
২.
কালো বরফ উপন্যাসের আব্দুল খালেক _ নামেই যার সাদামাটাসাধারণ
জীবনযাপন স্পষ্ট _ মাহমুদুল হকের অন্যান্য চরিত্রের চেয়ে অনেক বেশি
স্মৃতিকাতর। উপন্যাসে দুটো ভাষ্য সমান্তরালভাবে চলে _ একটি লেখকের
ভাষ্যে তার প্রাত্যহিক জীবনযাপন, অন্যটি আব্দুল খালেকের নিজের
ভাষ্যে তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিময়তা। এটি সে লেখে ডায়রি হিসেবে _
স্ত্রীকে জানায় এক লেখক বন্ধুর অনুরোধে সে এটা করছে (নাকি নিজেকেই
শোনাচ্ছে নিজের কাহিনী?)। কিন্তু পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না _
দৈনন্দিন জীবনের নানাবিধ সংকট (অনিয়মিত বেতন,
অনুজ্জ্বল-সম্ভাবনাহীন ভবিষ্যৎ, স্ত্রীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি, অভাব,
দারিদ্র ইত্যাদি) সত্ত্বেও সে ডুবে আছে নিজেরই মধ্যে _ আশ্রয়
নিয়েছে নিজের শৈশব-কৈশোরের কাছে। দেশভাগের ফলে নিজ ভূমি ছেড়ে আসতে
হয়েছে তাকে, পেছনে ফেলে এসেছে সোনালী সময়। কিন্তু কেনই-বা সেখানে
মুখ লুকাতে চায় সে? কারণ সে ব্যর্থ মানুষ _ অন্তত উপন্যাসটি আমাদের
সেরকমই ভাবতে প্ররোচিত করে। গ্রামের একটি অনুজ্জ্বল বেসরকারী কলেজে
পড়ায় সে _ যেখানে বেতনটা পর্যন্ত নিয়মিত নয়, ছাত্রছাত্রীরা সব
অকৃষ্ট-অপগণ্ড, সহকর্মীরা মেতে থাকে পরচর্চা-পরনিন্দায়। অভাব লেগে
আছে সংসারে, আছে ভুল বোঝাবুঝি, স্ত্রীর অভিযোগ-অবিশ্বাস ও সন্দেহ।
কিন্তু তার কোনো বিকার নেই যেন। সে তো ডুব দিয়েছে নিজেরই সোনার
শৈশবে _ ওপার বাংলায় যা সে ফেলে এসেছে। দেশভাগের নির্মম শিকার সে
(ও তার পরিবার) _ সারাটি উপন্যাসে তার প্রাত্যহিক জীবনচিত্রের
সমান্তরালে সেই সময়ের একটা চিত্রও পাওয়া যায়। শৈশব জুড়েই তো থাকে
কেবল সুখ ও মুগ্ধতা, একটি ফড়িং বা শালিখের জন্যও থাকে বুক পোড়ানো
ভালোবাসা _ জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়ার বালাই থাকেনা বলে, চাওয়া-পাওয়ার
হিসেব মেলানোর দায় থাকে না বলেই সবকিছুতে থাকে অপার আনন্দ। মানুষ
তা-ই জমিয়ে রাখে বুকের ভেতর, (এমনকি, মায়ের বলা _ ও আমার কোলে এলো
_ এমন একটি বাক্য মনে পড়লে পড়ন্ত বয়সেও হু হু করে কেঁদে ফেলতে
দ্বিধা করে না সে।) তারপর ভাঙিয়ে খায় সারাটি জীবন। যখন বয়স বাড়ে _
চাওয়ার সঙ্গে পাওয়ার হিসেব মেলে না কিছুতেই; সম্ভাবনাহীন,
ম্রিয়মান, ব্যর্থ জীবনযাপন যখন নিয়তির মতো কাঁধে চেপে বসে _ তখন
সোনার শৈশবে আশ্রয় নেয়া ছাড়া উপায় কি? আবদুল খালেক আসলে তা-ই করে।
এমনকি স্ত্রীকে সে আদর করে কখনো কখনো মাধু বা গিরীবালা বলে ডাকলে
(এ দুটো চরিত্রই তার শৈশবের সঙ্গী। মাধু আবার এমন এক চরিত্র _
আবদুল খালেকের নিজের ভাষায় _ ভালোবাসার জন্য এমন করে আর কাউকে
কাঁদতে দেখিনি ) আমরা টের পেয়ে যাই _ তার মোহমুক্তি ঘটে নি, আসলে
সে বর্তমানেই নেই। আর উপন্যাসের একেবারে শেষ কয়েকটি পংক্তি _
একসময় বোধহয় তার তন্দ্রা এলো। ঘুমোবার আগে রোজ যা হয়, সেই হাত
পা মুড়ে, হাঁটু দ-করে টুকুর মতো এই এতোটুকু হয়ে গেলো সে। তারপর এক
সময় হাতড়ে হাতড়ে রেখার পায়ের ওপর হাত রেখে সে বললে, আমাকে কোলে নাও
মাধুরী _
আমাদের বিমূঢ় করে দেয়। জীবনযাপনে ব্যর্থ একজন মানুষের এই গুটিয়ে
যাওয়া দেখে আমরা নিজেদের দিকে ফিরে তাকালে আব্দুল খালেকের মধ্যে
নিজেদের ছায়া দেখতে পাই, আর আমাদেরও অমন করে গুটিয়ে যেতে ইচ্ছে
করে।
তবে কি এই আমাদের মাহমুদুল হক যিনি শুধু বিচ্ছিন্নতাকে বোঝেন? যিনি
শুধুমাত্র নিঃসঙ্গ, বিপন্ন, বিচ্ছিন্ন মানুষের জীবনকে দেখাতে চান?
না, তা নয়। পরিপাশর্্বকেও তিনি দেখান সমান গুরুত্ব দিয়ে _ কিন্তু
এসবের ওপর তিনি আলো ফেলেন একটু তীর্যকভাবে। মাহমুদুল হক শুধু
উপরিতলের বাস্তবতা নির্মাণে আগ্রহী নন, বরং ওসব যেন আসে
পারিপাশ্বর্িক অনুষঙ্গ হিসেবে _ তাঁর মূল উদ্দেশ্যটি ভিন্ন। এই
উদ্দেশ্যটি _ আমার মনে হয় _ ব্যক্তিমানুষের নির্মাণ। বাংলাদেশের
উপন্যাসের যে প্রধান সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা _ এখানে কোনো
ব্যক্তিমানুষ নেই, চরিত্রগুলো যেন ছাঁচে ঢালা; তাদেরকে আলাদা করে
চেনার উপায় নেই, সবাই একেকজন গড় মানুষ _ অবয়বহীন, মৌলিক চিন্তায়
অক্ষম। মাহমুদুল হক এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে চেয়েছেন _ নির্মাণ
করতে চেয়েছেন এমন কিছু চরিত্র যাদেরকে অনেকের মধ্যেও আলাদা করে
চেনা যাবে। ঐ যে তীর্যকভাবে দেখা _ তারও মূল কারণ এটিই। খোকার
চরিত্রকে আলাদা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্যই তার
বন্ধুদের ভাবনাচিন্তা, দেশের সমকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে
একাত্নতাবোধ, ও তাদের জীবনদর্শনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ,
দেখানো হয়েছে _ সবার কাছে যা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য, খোকার
কাছে তা নয়, বিনা প্রশ্নে বিপুলভাবে গৃহীত ও সংবর্ধিত কোনো বিষয়কেও
সে মেনে নিতে রাজি নয়। আবার অন্যদিকে, আবদুল খালেক তো প্রায় ব্যর্থ
একজন মানুষই, তবু সে আলাদা হয়ে যায় তার চিন্তার জন্যই। এমনকি
নীলাভাবী বা রেহানা কি ইয়াকুব পর্যন্ত আমাদের কাছে ভিন্নমাত্রিক
হয়ে ওঠে। তাদেরকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়, নিঃসঙ্গ-বিপন্ন-বিষণ্ন মনে হয়,
কারণ তারা গড় মানুষ নয়। তারা সবাই আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। হয়তো
তারা দুঃখী মানুষ (আর তা না হয়েই-বা উপায় কী, যেখানে পরিপাশ্বর্ের
সমস্ত মানুষ অপগণ্ড, নির্বোধপ্রায়!) কিন্তু ভিন্ন, অন্য সবার থেকে
ভীষণরকম আলাদা।
মাহমুদুল হকের এই উদ্দেশ্যটি সবচেয়ে ভালোভাবে ধরা পড়ে নিরাপদ
তন্দ্রা উপন্যাসে। কামরান রসুল (পুরো উপন্যাসে নামটি মাত্র একবারই
ব্যবহৃত হয়েছে) কি অভূতপূর্ব একটি চরিত্র নয়? অলস-অকর্মণ্য, যার
একমাত্র 'বিলাস' হচ্ছে বই পড়া, জীবনের অন্য সব বিষয়ে মারাত্নক
রকমের উদাসীন এই লোকটিও বিবরবাসী। উপন্যাসের পটভূমি একটি বস্তি, আর
এর প্রধান চরিত্র হিরণ নামের একটি মেয়ে। কামরান রসুলের বসবাস এই
বস্তিতেই। কোনো কাজ নেই বলে হিরণের জীবনকাহিনী সে শোনে নানা লোকের
মুখে। ভালোবাসার জন্য ঘর ছেড়ে আসা মেয়েটি কীভাবে এক হাত থেকে অন্য
হাতে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে তার কাছে এসে পড়ে _ এই হচ্ছে উপন্যাসের
কাহিনী। অথচ এসবকিছুর মধ্যেই একটি প্রশ্ন মাথা উঁচিয়ে থাকে _ এই
বস্তিতে কামরান রসুল কেন? অন্য সবার মধ্যে সে-ই একমাত্র বেমানান
এখানে, একমাত্র 'ভদ্রলোক'। তো, এই ভদ্রলোককে এরকম একটি বস্তির
মধ্যে এনে ফেলার দরকারটা কি? আমার তো মনে হয় 'ব্যক্তি' কামরান
রসুলের প্রতিষ্ঠার জন্যই তাকে এখানে স্থাপন করা হয়েছে। এইসব চরিত্র
নিয়েও তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে আমার _ মাহমুদুল হক নিজে অবশ্য কামরান
রসুলের চরিত্রটি সম্বন্ধে আমার এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি। তাঁকে
জিজ্ঞেস করেছিলাম : জীবন আমার বোন তো যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থা নিয়ে
লেখা। সেখানে খোকাকে এতো নিস্পৃহ নিস্ক্রিয় অংশগ্রহণবিহীন দেখালেন
কেন?
মাহমুদুল হক : এরকম দেখাবার কারণ আছে। খোকাকে
বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত দেখাবার জন্যই ওরকমটি করতে হয়েছে।...সবকালেই
সবদেশে ওরকম কিছু মানুষ থাকে যারা প্রবল কোলাহলেও একা, যারা জনতার
সঙ্গে মিলে যেতে পারে না, এদেরকে তুমি যদি অসুস্থ বল তবে তাই,
কিন্তু এদের অস্তিত্ব আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। খোকা তাদের
প্রতিনিধি। আমি এরকম একজন মানুষের চোখে যুদ্ধের পূর্ববর্তী
অবস্থাকে রিপ্রেজেন্ট করতে চেয়েছি। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমি
অন্য সবকিছু অস্বীকার করেছি। অর্থাৎ জনগণের উৎসাহ-উদ্দীপনা, জনতার
কোলাহল বা জেগে ওঠা সবই তো দেখিয়েছি, আর দেখিয়েছি বলেই খোকার ওই
নিরাসক্তি এমন তীব্রভাবে চোখে পড়ে।
কামাল : কিন্তু নিরাপদ তন্দ্রায় কামরান রসুলকে
ওরকম একটি বস্তির মধ্যে এনে ফেলার মানে কি? ওই বস্তিতে কামরান
রসুলই একমাত্র বেমানান, খুব উৎকটভাবে তাকে চোখে পড়ে। আলাদাভাবে
একজন ব্যক্তিকে চেনাবার জন্যই কি আপনি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি তৈরি
করেন?
মাহমুদুল হক : নিরাপদ তন্দ্রায় কামরান রসুল আদৌ
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নয়, আমি তো ওখানে ওই মেয়েটির গল্প বলতে
চেয়েছি, কিন্তু গল্পটা কার কাছে বলবে সবাই, কেই-বা আবার সুন্দর করে
প্রেজেন্ট করবে এসব ভেবে কামরান রসুলকে ওখানে নিয়ে গেছি। কিন্তু
নানা লোকের মুখে মেয়েটির গল্প শোনা ছাড়া তার তো তেমন কোনো ভূমিকা
নেই ওই উপন্যাসে, তাকে দিয়ে আমি ব্যক্তিচরিত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটাতে
চাইনি।
কামাল : কিন্তু আপনার প্রায় সব লেখা পড়েই আমার
মনে হয়েছে কোনো না কোনো চরিত্রের মাধ্যমে একটি ব্যক্তি-চরিত্রের
প্রতিষ্ঠা বা ব্যক্তিচরিত্রের মডেল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।
মাহমুদুল হক : যে সমাজে ব্যক্তিই গড়ে ওঠেনি সেই
সমাজের মানুষ নিয়ে আমি যখন লিখি তখন কিভাবে তাদের দিয়ে
ব্যক্তিচরিত্রের মডেল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব? এটা তোমার ভুল
অবজারভেশন।
কামাল : হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে _ এই
ইঙ্গিত আপনি আপনার লেখাগুলোতেই দিয়েছেন।
মাহমুদুল হক : কোন ইঙ্গিত?
কামাল : এই যে বললেন _ এ সমাজে ব্যক্তিই গড়ে
ওঠেনি। এবং এজন্যই আপনার ব্যক্তিচরিত্রগুলো একেকজন অসম্পূর্ণ
মানুষের প্রতিকৃতি। এরা বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত, এরা নিঃসঙ্গ, অসুস্থ,
পীড়িত, রুগ্ন _ কারণ আপনি সম্ভবত বলতে চান, এ সমাজই এমন রুগ্ন এবং
অসুস্থ যে, একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের জন্ম কিংবা বিকাশ সম্ভব
নয়।
মাহমুদুল হক : তোমার এই ব্যাখ্যাটি সঠিক, কিন্তু
আমার কাছে মনে হয় _ লেখার সময় আমি এসব নিয়ে এতো সচেতন ছিলাম না।
লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি স্বতঃস্ফূর্ততায় বিশ্বাসী,
স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা এসেছে লিখে গেছি _ পরে কাটাছেঁড়াও করেছি অবশ্য
কিন্তু যোগ করেছি সামান্যই, কেটেছি বেশি। আমার প্রায় সব উপন্যাস
একটানে লেখা। এক বসায় সাত-আটদিন লিখে আমি একেকটা উপন্যাস আমি শেষ
করেছি। এতো ভাবাভাবির সময় ছিলো না তো!
৩.
উপরোক্ত ব্যাখ্যাটি সম্বন্ধে আরেকটু বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন বোধ
করছি। মাহমুদুল হকের উপন্যাসগুলো পড়তে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়েছে
_ তিনি একেকটি চরিত্রকে ব্যক্তির মর্যাদা দেয়ার জন্য বিভিন্ন
প্রেক্ষাপটে ফেলে দেখেছেন, এবং দেখিয়েছেন _ তারা ছাঁচেঢালা অবয়বহীন
মানুষ নয়। এখানটায় মাহমুদুল হকের গুরুত্ব অন্তত বাংলা সাহিত্যের
প্রেক্ষাপটে অপরিসীম। কিন্তু যে ব্যক্তির কথা এতোক্ষণ ধরে বলছি _
তার চেহারাটিও আমাদের একটু চিনে নেয়া দরকার। মাহমুদুল হকের
চরিত্রগুলো বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ _ সে কথা আগেই বলেছি। এই
বিচ্ছিন্নতা আর নিঃসঙ্গতার সঙ্গে স্বার্থপরতা আর কুপমণ্ডকতা যুক্ত
হলে এরা কেবল সমাজের জন্য নেতিবাচক ভূমিকাই রাখতে পারবে। এই ধরনের
ব্যক্তি সৃষ্টি করে ক্ষতি বৈ লাভ নেই কিছু। কিন্তু মাহমুদুল হকের
ব্যক্তিরা ক্ষতিকর মানুষ নয়। তারা বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ _ কিন্তু একই
সঙ্গে তারা বিষণ্ন ও দুঃখী। আর একজন বিষণ্ন মানুষ কখনো অন্যের
ক্ষতির কারণ হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তারা প্রচলিত প্রবহমান
স্রোতে গা ভাসানোর অযোগ্য, সমসাময়িক উতরোল কোলাহলে বেমানান _ আর
এজন্যই তারা বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার
ক্ষমতাও তাদের নেই, নেই ভেঙেচুরে নতুন কিছু গড়ে তোলার সাহস ও শক্তি
_ তারা দুর্বল, অসহায়, পলায়নপর; ফলে দুঃখী ও বিষণ্ন। এদিক থেকে
বিচার করলে তাদেরকে বলা যায় অসম্পূর্ণ মানুষ। প্রশ্ন জাগা
স্বাভাবিক যে, মাহমুদুল হক ব্যক্তিমানুষ নির্মাণ করতে গিয়ে কেন এমন
অসম্পূর্ণ মানুষ নির্মাণ করলেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তাঁর
প্রায় প্রতিটি রচনায় তিনি দিয়েছেন কিছু ধ্রুপদী ইঙ্গিত। জনজীবনকে
যে তিনি অস্বীকার করেন না সে তো আগেই বলেছি; কিন্তু ওই জীবন ও
বাস্তবতা, সমাজ ও সংস্কারকে তিনি চিত্রিত করেন এমন এক ভঙ্গিতে যে
পাঠক বুঝে যায় _ এ সমাজ অসুস্থ, দুর্বল, রুগ্ন, ভঙুর,
সংস্কারাচ্ছন্ন, পশ্চাৎপদ, যুক্তিহীন, অসাড়; এক কথায় _ নেতিবাচক।
আর এরকম একটি সমাজে কীভাবে সম্পূর্ণ ব্যক্তি জন্ম নেবে? প্রায়
সবগুলো উপন্যাসেই এই ইঙ্গিত প্রচ্ছন্নভাবে দিয়েছেন তিনি, কিন্তু
সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দিয়েছেন অনুর পাঠশালায়। যে-অনু পাঠ নেয় তার
পরিপাশর্্ব থেকে _ শ্রেণীচু্যত হয়ে, কিশোরকাল থেকেই; যা তাকে পরিণত
করতে পারতো একজন সম্পূর্ণ মানুষে; তারই ঘর ভরে আছে মা-বাবার
পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি, সংকট, সন্দেহ, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, দ্বেষ,
অভিযোগ আর আস্থাহীনতায়। এইসব দেখে দেখে যে শিশুটি বড় হয়ে উঠছে _ সে
যতোই পাঠ নিক প্রকৃতি ও পরিপাশর্্ব থেকে _ তার পক্ষে কীভাবে একজন
সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব? মাহমুদুল হকের চরিত্রগুলো
তাই পূর্ণতা পায় না, এ দোষ তাদের নয়, নয় লেখকেরও। তারা পরিপূর্ণই
হতে চায়, গড়ে উঠতে চায় আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল হয়ে; কিন্তু
পরিপাশর্্ব তাকে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। সমস্ত মানবিক গুণাবলী
থাকা সত্ত্বেও এই ব্যক্তিগুলো তাই অন্য কারো কোনো কাজেই লাগে না;
বরং গুটিয়ে থাকে নিজের ভেতর; রুখে দাঁড়াবার বদলে বা নিদেনপক্ষে
অনেকের সঙ্গে মিলে একটি ঘটনায় অংশগ্রহণ করার বদলে তারা পালাতে চায়
পৃথিবী ও জীবনের সব বীভৎস বাস্তবতা থেকে। এ-তো ক্রান্তিকালের
মানুষেরই চরিত্র। এরকম ভঙুর, পলায়নপর, অসম্পূর্ণ হওয়া ছাড়া তাদের
আর উপায় কি যেখানে সমাজ এবং সময়ই তাদেরকে অমন হতে প্ররোচিত কিংবা
বাধ্য করে?
৪.
মাহমুদুল হকের গল্পেও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ বারবার ঘুরে ফিরে
এসেছে। কিন্তু সেগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথার চেয়ে বেশি
এসেছে যুদ্ধের মধ্যে অবরুদ্ধ স্বদেশভূমিতে আটকে পড়া মানুষের দুঃসহ
দুর্দশা ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কথা। এ বিষয়ে কোথাও-ই তিনি বেশি কথা
বলেননি, কিন্তু যেখানেই তিনি প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছেন _ মনে হয়েছে
যেন একটি দম বন্ধ করা অসহায়-অনিশ্চিত পরিবেশের মধ্যে মানুষগুলো
হাসফাস করছে। বুড়ো ওবাদের জমা খরচ গল্পে এমনকি যুদ্ধের কথাটি
পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি কিন্তু মানুষ কি বিপুল দুর্দশার মধ্যে পতিত
তা বোঝা যায় দুয়েকটি বাক্যেই। কিংবা প্রতিদিন একটি রুমাল গল্পের
সবুজ _ যে ছিলো তার বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে চৌকস ছেলে _ বদলে গেছে
_
আমি মৃতু্যকে ভয় পাই আলতাফ, সত্যি বলছি, ভয় পাই ! পঁচিশে
মার্চের আর্মি ক্র্যাক ডাউন না হলে কখনো হয়তো জানতেও পারতাম না
জীবনকে এতো ভালোবাসি, এতো ভয় করি মরণকে! _ ওদিকে আলতাফ _ আরে গর্দভ
মরণের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েই তো সত্যিকারের আনন্দ। চিলমারি অপারেশনে
থাকলে বুঝতিস, মৃতু্য কতো তুচ্ছ ব্যাপার, মৃতু্যকে নিয়ে কিভাবেই না
ছেলেখেলা করেছিলাম আমরা প্রাইভেট আর্মির দসু্যরা। মরণকে আবার ভয়
কিরে?
একই যুদ্ধ দু'জনকে দুইভাবে জীবনের পক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একজন
যুদ্ধের ভয়াবহতায় ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেছে নিজের মধ্যে, অন্যজন যুদ্ধে
অংশগ্রহণের ফলে হয়ে উঠেছে সাহসী, একরোখা, মৃতু্যকে পরোয়া না করা
মানুষ। যুদ্ধ হয়তো এভাবেই বদলে দেয় একেকজন মানুষকে। কিন্তু এরকম
একটি গল্পকেও তিনি কীভাবে একটি ভিন্নতর মাত্রা এনে দেন, পৌঁছে দেন
দৃষ্টিগ্রাহ্য উচ্চতায় সেটি বোঝা যাবে এটিকে একটু গভীরভাবে পাঠ
করলেই। এই গল্পের 'নায়ক' সবুজ গ্রামের এক কলেজে পড়ায়; ম্লান,
ম্রিয়মান, সম্ভাবনাহীন, অনুজ্জ্বল এক জীবন তার। অথচ তার ফেলে আসা
শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য এমন ছিলো না বরং ছিলো
উজ্জ্বল-প্রাণবনত-সম্ভাবনাময়। তো, গল্প এখানে নয়। গল্পটা হচ্ছে,
আলতাফ _ যে উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত, জীবনের আনন্দকে উপভোগ করতে চায়
তাড়িয়ে তাড়িয়ে _ সবুজকে জোর করে নিয়ে বাইরে বেড়াতে বেরোয়। বেরিয়ে
সে নানারকম কাণ্ড করে _ জোরসে গাড়ি হাঁকায়, রাস্তায় অন্য সব গাড়ির
সঙ্গে পাল্লা দেয়, হৈ-হল্লায় মেতে থাকে _ এসব তার চরিত্রের সঙ্গে
মানিয়েও যায়, কারণ (সে বলে) _ আমি সারাদিন, সারা জীবনভর ভীষণ
উত্তেজনার ভেতর থাকতে চাই, উত্তেজনাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে
বাঁচিতে চায়! কিন্তু সবুজের চরিত্রের সঙ্গে এসব একেবারেই বেমানান।
সে এসব দুদ্দাড় কর্মকাণ্ডে রীতিমতো পীড়িত বোধ করে। তারা একবার
শহরের বাইরে বনভূমির কাছে গিয়ে বসে
সেখানেও আলতাফ জীবনের পক্ষে, আনন্দের পক্ষে সোচ্চার, আর সবুজ
যথারীতি ভেঙ্গে পড়া মানুষ _
আমি আর পারছি না। একবার ঢাকা, একবার ইছাপুরা, এ আর ভালো লাগছে না।
ওখানে যা পাচ্ছি এ বাজারে তা এমন হাস্যকর! জীবন চলে না।
ফেরার পথে আলতাফ এক রিকশারোহী বিষণ্ন তরুণীকে তাড়া করে, পাত্তা না
পেয়ে তার রিকশাটাকেই ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়; এবং সবুজকে বাসায়
পেঁৗছে দিয়ে ঘটনাটার ব্যাখ্যা দেয় এভাবে _
দোষগুণ যাই বলিস না কেন আমার ধরনটাই এখন এই। আমার যা প্রয়োজন
আমি তা জোর করে আদায় করে নেই, কারো মুখ চেয়ে বসে থাকি না
হা-পিত্যেশ করে। যেখানে তা সম্ভব নয় সেখানে গায়ের জোর খাটাই,
প্রয়োজন হলে উড়িয়ে দেই, নিজের অস্তিত্বের জন্য এইসব করতে হয় আমাকে।
বুঝতে পারছি খুব খারাপ লাগছে তোর, আমি দুঃখিত। মন থেকে মুছে ফেলার
চেষ্টা কর, ভুলে যা সবকিছু, দেখবি সবকিছু আবার কেমন ফর্সা হয়ে
গেছে। দুনিয়াটাই এভাবে চলছে বন্ধু, ভুলে যাবার ক্ষমতা পর্বতপ্রমাণ
হওয়া চাই!
কিন্তু সবুজ কি ভুলতে পারে সবকিছু? তার স্বভাব তো আলতাফের সম্পূর্ণ
বিপরীত, আলতাফ যা সহজেই পারে সবুজের পক্ষে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
নইলে তো আর ঢাকায় কোনো একটা কর্মসংস্থানের জন্য তাকে আলতাফের মুখের
দিকে চেয়ে হা-পিত্যেশ বসে থাকতে হতো না, নিজের জীবনকে এমন
দুর্দশাপূর্ণ করে তুলতে হতো না। গল্প শেষ হয়ে যায় এখানেই। মনে হতে
পারে, কেবল জনৈক আলতাফের তারুণ্যের উচ্ছ্বাসমাখা কর্মকাণ্ডের বিবরণ
ছাড়া এ গল্পের মধ্যে আছেটা কি? কিন্তু মনোযোগী পাঠকরা একইসঙ্গে এ
প্রশ্নও নিশ্চয়ই তুলবেন যে, সবুজ আলতাফের কথামতো আদৌ সবকিছু ভুলে
যেতে পেরেছিলো কী না। গল্পের কোথাও এ সম্বন্ধে কিছু বলা নেই।
কিন্তু আলতাফের _
ভীষণ ঘেমে গেছিস, মুখ মুছে নে _ বলার প্রেক্ষিতে _ সবুজ পকেট
হাতড়ালো। রুমাল খুঁজে পেল না। বাঁশবনের তলায় রুমাল পেতে বসেছিলো,
মনে পড়লো ফেলে এসেছে। প্রায়ই ফেলে আসে, রেখা বলে এতো রুমাল হারাও
কি করে!
অংশটি পড়ে গল্প সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে হয়। আমরা তো প্রতিদিনই
আমাদের দেহে জমে থাকা ঘাম-ধুলো-ময়লা মুছে ফেলি রুমাল দিয়ে _ সেই
রুমাল যদি হারিয়ে যায় তাহলে কি উপায় হবে? সমস্ত
ঘামধুলোবালিময়লাআবর্জনা কি জমা হবে না শরীরে? এই গল্পের রুমালটি তো
কেবল নিছক একটি রুমালই নয় বরং এ যেন এক উজ্জ্বল প্রতীক _ যা দিয়ে
জীবনযাপনের গ্লানিগুলো মুছে ফেলা যায়। কিন্তু প্রতিদিন একটি করে
রুমাল হারিয়ে গেলে মোছা আর হয়ে ওঠে না, কেবল জমা হতে থাকে
গ্লানিগুলো _ জমা হতে হতে গ্লানির পাহাড় জমে ওঠে, জীবনটাই হয়ে ওঠে
বিপুল গ্লানিময়।
রুমালের আদলে ব্যবহৃত এই প্রতীকটির কারণেই গল্পটি হয়ে ওঠে
অনন্যসাধারন। শুধু মাহমুদুল হকের গল্পগুলোর মধ্যেই নয় _ সমগ্র
বাংলা সাহিত্যেই এমন গল্পের উদাহরণ বিরল। এতো অল্প কথায়, এতো সংযম,
এতো উজ্জ্বল ইঙ্গিতময়তায় মানবজীবনের এক রূঢ় সত্যের এরকম অসামান্য
রূপায়ন খুব বেশি ঘটেনি আমাদের সাহিত্যে। এতো
আবার অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠীর মনোজগত চমৎকারভাবে চিত্রিত হতে দেখা যায়
গরু ছাগলের গল্প এবং বেওয়ারিশ লাশ গল্পে। প্রথোমোক্ত গল্পে দেখি _
মানুষ কি ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতায় আর অসহায়ত্বের ভেতর দিনযাপন করছে!
যে কোনো মুহূর্তে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা, আশ্রয়হীন হবার সম্ভাবনা,
নিজভূমি ছেড়ে অচেনা-অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেবার
বাধ্যবাধকতা মানুষকে যেন গরু ছাগলের মতো করে তুলেছে। মানবিক জীবনের
সম্ভাবনা যেন চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে গেছে তাদের জীবন থেকে। বেওয়ারিশ
লাশ গল্পে দেখি, একটি বেওয়ারিশ লাশ একটি পরিবারকে কী ভয়াবহ সংকটে
ফেলে দিয়েছে, কী বিপুল নিরাপত্তাহীনতা তাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে।
অতঃপর লাশটি রাজাকারা এসে সরিয়ে নিয়ে গেলে দেখি, প্রৌঢ় দম্পত্তিও
মেতে উঠেছে প্রেমের সৌরভে।
শুধু মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক গল্পেই নয়, মাহমুদুল হক তাঁর অন্যান্য
গল্পেও খুব বেশি কথা বলেন না কখনো, বরং তাঁকে বলা যায় সংযমী,
আবেগের রাশ টেনে ধরা লেখক। অন্যান্য লেখকরা যে দৃশ্যপটের বিসতৃত
বর্ণনার লোভ সামলাতে পারেন না, সেরকম দৃশ্যের বর্ণনায়ও তিনি থাকেন
নিরাসক্ত; এবং পছন্দ করেন ইঙ্গিত দিতে _ কখনো কখনো একেকটি ইঙ্গিতই
তাঁর গল্প হয়ে ওঠে, কখনো একটি মাত্র বাক্য গল্পের পরিণতি নির্ধারণ
করে, কখনো বা একটি মাত্র দৃশ্যকল্প গল্পের প্রেক্ষাপট পাল্টে দেয়।
মাহমুদুল হকের চরিত্রগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই _ সবুজের মতো _ জীবন
যাপনে ম্লান-ম্রিয়মান-ব্যর্থ ও নিঃস্ব। তাদের আচার-আচরণ,
কথাবার্তা, হাবভাব স্পষ্টতই বলে দেয় _ তাদের জীবনে কোনো একটা অঘটন
গেছে কিংবা প্রতিনিয়ত অঘটন ঘটেই চলেছে। এই চরিত্রগুলো বিষণ্ন্ন ও
নিঃসঙ্গ, জীবনের প্রাত্যাহিকতায় বেমানান ও বেখাপ্পা _ অনুজ্জ্বল ও
সম্ভাবনাহীন তাদের জীবনযাপন। ফলে দেখা যায়, দৈনন্দিন ব্যর্থতা ও
দুঃখবোধ ঢাকতে তারা আশ্রয় নেয় তাদের ফেলে আসা সোনার শৈশবে। কখনো
কখনো হয়তো শৈশবটিও স্বর্নালী নয়, তবু তারা ফিরতে চায় সেখানেই _
কারণ ওখানে আশ্রয় আছে, অবোধ আনন্দ আছে, দুঃখবোধের বিপরীতে সুখের
বিশাল আকাশ আছে। জোনাকী গল্পের আবুল হোসেনকে আমরা যেমন দেখি এভাবে
_
শৈশবে বিমাতার সংসারে নির্মমভাবে প্রহৃত হয়েছেন আবুল হোসেন,
মনে পড়ে সেইসব। মনে পড়ে গ্রাম, এক একটি দীর্ঘদিন, গ্রামের জলবায়ু,
মেঠোপথ, বিস্তীর্ন শস্যক্ষেত, মাটির গন্ধ, হু হু বাতাস, প্রহৃত
হলেও সেখানে এসব ছিলো ... যতো বলো, শৈশব মানে বিমাতার অত্যাচার,
শৈশব মানে দুঃখ, সে তবু চায়, কিছুতেই তাকে বোঝানো যায় না, বলে আরো
দাও, আরো দুঃখ দাও, আমাকে শৈশব দাও, আমাকে কোলে নাও, আমাকে মারো
.....
আবুল হোসেন শৈশব চায়, কারণ 'প্রহৃত হলেও সেখানে এসব ছিলো' _ তার
মানে, এখন এসব নেই। আসলে এখন কিছুই নেই তার জীবনে। ব্যর্থ, ম্লান,
ম্রিয়মাণ তার জীবনযাপন। সন্তানগুলো পর্যন্ত বেয়াড়া, হাতছাড়া হয়ে
গেছে (এমন কি তাদের মা-ও তাদের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছে _ নিজের
দুঃখ-কষ্টগুলো শেয়ার করার মতো একজন সঙ্গীও নেই তার), তার অপছন্দের
কাজগুলো তারা অবলীলায় করে যায় তাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করেই;
পিতা হয়েও তাদেরকে যেন কিছু বলবার অধিকার নেই তার। অবশেষে একদিন
ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলে, আর এসবকিছুর বিরুদ্ধে অনেকটা হঠাৎ করেই
রুখে দাঁড়ালে নিজ সন্তানের কাছেই প্রহৃত হতে হয় তাকে। এবং তারপর _
অবসন্নতা ক্রমশ কাবু করে ফেলে তাকে। অবসন্নতা, মনোবেদনা,
স্থবিরতা _ এদের আর এখন কোনো সংকোচ বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। বয়েসের
কাছে নিদারুণ ভাবে তিরস্কৃত আবুল হোসেন, বয়েস তাকে ধিক্কার দেয়।
গলা পর্যন্ত ঠেলে ওঠে গ্লানির গরল, অদ্ভুত এক গ্লানি।
এই কি তবে মানুষের নিয়তি? একজন মানুষকে সারাজীবন কেবল মারই খেয়ে
যেতে হবে? শৈশবে বিমাতার হাতে মার খাওয়াটা তবু মেনে নেয়া যায়, তাই
বলে এই প্রৌঢ়ত্বে এসে নিজ সন্তানের হাতে! জীবন কি তবে এমনই? এইরকম
নিঃস্ব, ব্যর্থ, মার খাওয়া? কোথাও কি একটু স্নেহস্পর্শও থাকবে না?
হঁ্যা, থাকবে। মাহমুদুল হক একচক্ষু দৈত্য নন যে, তিনি শুধু মানুষের
উপরিতলটিই দেখবেন। তাঁর আছে অবলোকনের ভিন্নতর একটি দৃষ্টিকোণ,
মানুষের ভেতরটাও যা দেখে নিতে পারে। ফলে গল্পের শেষে আমরা দেখি,
আবুল হোসেনের আপাতভাবে বিগড়ে যাওয়া মেয়ে এবার বাবাকে খেতে ডাকছে
এবং _
কান্নায় কেমন যেন ভেজা বুলুর স্বর, সে একটা হাত রাখলো তাঁর
গায়ে। আবুল হোসেন চোখ মেলে দেখলেন। এই প্রথম তাঁর মনে হলো বুলুর
হাত কি কোমল, চোখ কি স্নিগ্ধ।
মার খাওয়া জীবনেরও কোথাও না কোথাও স্নিগ্ধতা থাকে _ মাহমুদুল হক
সেটুকুই আবিষ্কার করতে চান। এখানেই তিনি ব্যতিক্রম, অনন্য। তিনি
যেমন আপাত মমতার ভেতর থেকে লাম্পট্যের অংশটুকু ছেঁকে বের করে
দেখাতে পারেন, তেমনি আপাত নিষ্ঠুরতার ভেতর থেকে আবিষ্কার করতে
পারেন স্নিগ্ধতা।
বুলু ও চড়ুই গল্পটির কথাই ধরা যাক। পুরো গল্প জুড়ে 'আনু' নামের এক
সদ্য তরুণের কৈশোরিক হৈ-হল্লা জ্জ সে তার বোন বুলুকে নানাভাবে ডেকে
চলেছে, 'বুলু-অ্যাই
বুলু-বুলটি-বুলিয়া-বুলুপা-বুলুমনি-বুলবুলি-আপামনি'জ্জ ইত্যাদি
ইত্যাদি; আর এই ডাকের পরিপ্রেক্ষিতে বুলুর নানান ধরণের ভাবনা।
আনুটা সারাজীবনই এমন। হৈ-চৈ-হল্লা-চিল্লা করতে পছন্দ করে,
একমুহূর্ত সুস্থির থাকতে পারেনা। তার নানান কাণ্ডকারখানা এই
পরিবারটিকে বহুভাবে ভুগিয়েছে, এমনকি তারই জন্য তার বাবাকে সরকারী
চাকরিটি হারাতে হয়েছে। তো, এই আনু যুদ্ধে গিয়েছিলো। ব্যাপারটি চেপে
রাখা সম্ভব হয়নি। ঘটনা প্রকাশিত হয়ে পড়লে পাকিস্তান আর্মিরা তার
বাবা আর বুলুকে ধরে নিয়ে যায়।
যুদ্ধ শেষ।
সবাই ফিরে এসেছে।
কিন্তু সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেছে। যুদ্ধ এক ভয়াবহ সর্বনাশের
চিহ্ন রেখে গেছে তাদের পরিবারে, যার শিকার বুলু।
বুলু এখন একা একা ঘরে শুয়ে রাজ্যের কথা ভাবে; সময়কে চলে যেতে দেখে।
পুরো গল্পেই আমরা বুলুকে এভাবে একটি ঘরে শুয়ে আনুর ওই ডাকাডাকির
প্রেক্ষিতে এসব ভাবতে দেখি। কিন্তু এতো ডাকাডাকি করে আনু তাকে কি
বলতে চায় ? গল্পের শেষে আমরা দেখি, আনু বুলুর ঘরে ঢুকে তাকে টেনে
হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে _
'এই দেখো' _ মেঝের ওপর পড়ে থাকা খড়কুটো আর চড়ুইপাখির একটি
শাবকের দিকে সে আঙুল তুলে দেখায়। _ 'বাসা থেকে বাচ্চাটি পড়ে
গিয়েছিলো, কি জানি কি করে। যতোবার তুলে দিই ততোবারই ওরা ঠুকরে
ঠুকরে ওকে নিচে ফেলে দিচ্ছে, অবাক কাণ্ড না?'
বুলু বললে, 'ওরা তো তোদের মতো মানুষ নয়!'
'তার মানে? তোর কথার মাথা মুন্ডু বুঝি না' _
'মানুষ বড় ভালো,' বুলু বললে, তার চোখ তখন ভেজা ভেজা। বললে, 'মানুষ
বড় সুন্দর'।
এই তো গল্প। কিন্তু কী অসামান্য মহিমায় ভাস্বর ! যে বুলু
নির্যাতিত, যে বুলুর স্বপ্নের মৃতু্য ঘটেছে বীভৎসভাবে_ ওই মানুষের
মতো দেখতে পশুদের দ্বারাই; বুলু সেই মানুষকেই বলছে ভালো, সুন্দর!
কারণ সে তবু বেঁচে আছে মানুষেরই স্নেহছায়ায়, মমতায় ও যত্নে।
বুলুর কণ্ঠে আমরা যেন মাহমুদুল হককেই শুনতে পাই, যেন তিনি তাঁর
পাঠকদের কানে কানে বলছেন _ যতো কিছুই ঘটুক, মানুষ খুব ভালো, মানুষ
খুব সুন্দর।
৫.
আরেকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি না দিলে মাহমুদুল হককে বোঝা কঠিন হয়ে
দাঁড়াবে। আমাদের চারপাশে যে ভাষাহীন বিপুল সৃষ্টিজগৎ রয়েছে তাদেরকে
দিয়ে তিনি কথা বলিয়েছেন তাঁর গল্প-উপন্যাসে । তাঁর রচনায় পাখি কথা
বলে, কথা বলে বৃক্ষ ও নদী, ফুল ও পাতা, এমনকি জড়জগৎকেও তিনি করে
তোলেন অনুভূতিসম্পন্ন।
কালো বরফ থেকে কিছু অংশ পড়ে দেখা যাক _
যা কিছু নিঃশব্দ, যা কিছু শব্দময়, যা কিছু দৃশ্যগোচর,
দৃশ্যাতীত, সবকিছুই একজোট হয়ে হাত ধরাধরি করে ঘিরে ধরে; অদভুত এক
বাজনার তালে তালে আসত একটি রাত মোমের মতো গলে পড়ে...পোকা (আবদুল
খালেক) শোনে, শুনতে পায়। পোকা পোকা হয়ে যায়। (কালো বরফ, পৃ.৩৮)
নিঃশব্দ বা শব্দময়, দৃশ্যগোচর বা দৃশ্যাতীত জগৎটির মধ্যে তিনি
কীভাবে প্রাণসঞ্চার করেছেন, তার কিছু নমুনা দেখা দেয়া যাক।
...ঐ গাছটার সঙ্গে কথা বলতাম। গাছটা উত্তর দিত না ঠিকই, কিন্তু
জন্তুর কানের মতো চওড়া চওড়া পাতা নেড়ে খুব
মনোযোগ দিয়ে সব শুনতো। (কালো বরফ, পৃ.৩৪)
...একটা মাছরাঙা গলাপানিতে নামা হিজলের ডালে গিয়ে বসলো। এটা
একটা সম্পর্ক... অলিখিত _ যুগ যুগ ধরে এইভাবে চলে আসছে সবকিছু। না
বসলেও চলে মাছরাঙার, একটা আধডোবা খাড়া কঞ্চির ওপর বসলেও তার
উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, তবু হিজলের একটা শাখা,
গোছা গোছা পাতার মনোরম একটা আড়াল সে যখন বেছে নেয়, তখন এক
ধরনের নির্ভরশীলতা সত্য হয়ে ওঠে। বড় ক্ষণিকের এই সম্পর্ক, তবু
দিব্যকান্তি। (কালো বরফ, পৃ.৬৫-৬৬)
...এ পথে যতোবারই এসেছে, চোখে পড়েছে গাছটা; কেমন যেন ছন্নছাড়া
চেহারা ছিলো। মনমরা মনমরা।
(কালো বরফ, পৃ.৬৫)
...কি অবিরল নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলো মা। এমনকিছুই ছিল না, যার
কোনো প্রয়োজন নেই, যা কখনো সংসারের কোনো কাজে লাগবে না। সবকিছু
ছিলো আদরের।... তুচ্ছ কুটোগাচা থেকে হাত-বেড়ি-খুন্তিরও
অভিমান ছিল, তারাও বোধহয় মা বলে ডাকতে
শিখেছিল। মনে হতো অপরাধী, ঘটিবাটির কাছে, ঘরদোরের কাছে,
বিছানা-বালিশ-লেপ-তোষকের কাছে। সামান্য যে ফেনফেলা গামলা, হাঁড়িধরা
ন্যাতা, ঘরপোছা ন্যাতা, তিল তিল করে সে অপরাধের কথা তাদেরও বোধহয়
এক সময় জানা হয়ে যেতো। (কালো বরফ, পৃ.৬৭)
বুনো ঝাঁঝে মাথা ঝিমঝিম করে। এই
গাছগুলোর প্রাণ আছে। এক একটা ছেঁড়া পাতার গায়ে হালকা
নিঃশ্বাসের গন্ধ, 'আমাকে মারলে' _ এই রকম।...
রেখার নিজেকে খুব হালকা মনে হলো। গা জড়াজড়ি
করা কদমের বন তাকে পথ ছেড়ে দিচ্ছে, এক একটি লতা খুশিতে উপচে উঠে
দোল খেয়ে বলছে, তাহলে তুমি এসেছো, এতোদিন পর মনে পড়লো আমাদের...
(কালো বরফ, পৃ.১১৮)
...গোটাগ্রাম জুড়ে ছিল কদমের বন, বর্ষার নদী ধীরে মন্থর গতিতে
ফেঁপে ফেঁপে উঠে শেষে কদমের বনে গিয়ে ইচ্ছে
করে পথ হারিযে 'এ আমার কি হল গো' ভান ধরে ছেলেমানুষিতে মেতে উঠতো।
এখন গ্রাম কি গ্রাম উজার; দেশলাইয়ের কারখানা গিলে ফেলেছে সবকিছু।
কদমের সে বনও নেই, নদীর সেই ছেলেমানুষিও নেই; এখন
ইচ্ছে হলো তো এক ধারসে সব ভাসিয়ে
দিলো, সবকিছু ধ্বংস করে দিলো, 'আমি তোমাদের
কে, আমার যা ইচ্ছে তাই করবো' ভাবখানা এমন। (হৈরব ও ভৈরব/
প্রতিদিনি একটি রুমাল)
এরকম নমুনা আরও প্রচুর দেয়া যাবে, আর না বাড়িয়ে বরং শেষ করা যাক
আরেকটি উদাহরণ দিয়ে _
যহন মনিষ্যি আছিলো না, তহন বাজনা আছিলো,
পর্বত বাইজা উঠছে, জল বাইজা উঠছে, মাটি বাইজা উঠছে, ধরিত্রি বাইজা
উঠছে, বাইজা উঠছে আকাশ বাইজা উঠছে মনুষ্যজন্ম, বাইজা উঠছে
মনুষ্যধর্ম, বাইজা উঠছে মানবজীবন, ...বাবু হুনতাছেন? ঢাকে কেমনে
কথা কইতাছে হুইনা দ্যাহেন। দশখুশি বাবু, চৌদ্দমাত্রা, মানবজীবন
কথা কইতাছে বাবু! দশখুশি বাবু, চৌদ্দমাত্রা, মনুষ্যধর্ম বোল
তুলতাছে, আখিজলে আখিজলে, টলমল টলমল, ধরাতর ধরাতল, রসাতল, হা
(হৈরব ও ভৈরব/ প্রতিদিনি একটি রুমাল)
প্রিয় পাঠক, আমি কয়েকটিমাত্র উদাহরণ দিয়ে এবং সেগুলোর কিছু অংশ
আন্ডারলাইন করে বিষয়টির প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা
করেছি, কিন্তু আপনারা একটু লক্ষ্য করলেই এরকম আরো অসংখ্য উদাহরণ
খুঁজে পাবেন।
আমাদের চারপাশের এই বিপুল সৃষ্টিজগৎ _ যা কিছু নিঃশব্দ, যা কিছু
শব্দময়, যা কিছু দৃশ্যগোচর, দৃশ্যাতীত _ তার সবকিছুরই যে নিজস্ব
ভাষা আছে, আমরাই কেবল তা বুঝতে পারি না; তিনি যেমন সেদিকে আমাদের
চোখ ফিরিয়েচেন তেমনি সেই ভাষাটিকে বুঝতে চেয়েছেন, চেয়েছেন এই
সৃষ্টিজগতের সঙ্গে মানুষের অলিখিত দিব্যকান্তি সম্পর্কটি আবিষ্কার
করতে। পাঠক, মনে কি হয় না _ আমরা জগদীশ চন্দ্র বসুরই কণ্ঠস্বর
শুনছি একজন লেখকের জবানে!
উপসংহারের পরিবর্তে
মাত্র সাতটি উপন্যাস, দুটো গল্পগ্রন্থ, আর একটি কিশোর উপন্যাস, এই
নিয়ে মাহমুদুল হক যে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হয়ে
উঠলেন_ তার কারণ কি? একটি প্রধান কারণ তাঁর ভাষা, নিঃসন্দেহে। এমন
নির্মেদ, নির্মোহ, নিরাবেগ _ অথচ আকর্ষণীয়, মনোমুগ্ধকর, হৃদয় ছুঁয়ে
যাওয়া ভাষার তুলনা আর কোথায় মিলবে ? আঞ্চলিক শব্দের প্রচুর মানানসই
ব্যবহার যেমন তাঁর গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তেমনই বহু নতুন শব্দের
স্রষ্টাও তিনি। শুধু কি ভাষা? একটি ঘটনার বিশ্লেষণে তিনি যে তীর্যক
দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করেন _ যা একটি রচনাকে স্রেফ ঘটনা-বর্ণনার দায়
থেকে উদ্ধার করে দার্শনিক ঋদ্ধতায় পেঁৗছে দেয় _ তার উদাহরণও তো খুব
সুলভ নয় আমাদের সাহিত্যে।
জীবনের উপরিতলে বাস্তবতার যে তীব্র কষাঘাতে মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে
পড়ে, তিনি শুধু তাই-ই বর্ণনা করেন না, একই সঙ্গে খুঁড়ে দেখেন
মনোজগতের নানাবিধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া-অনুভব-অনুভূতি। জনজীবনের
উত্তুঙ্গ উত্তেজনার নিরাসক্ত-নির্মোহ বিবরণ দিয়ে, ভাষাহীন ও
জড়জগৎকে প্রাণবন্তরূপে উপস্থাপন করে, ইঙ্গিত বা ইশারা দিয়ে, কখনো
অসামান্য প্রতীকের ব্যবহার করে তিনি আমাদের নিয়ে যান এক আশ্চর্য
জগতে, যেখানে গেলে আমরা আবিষ্কার করে উঠি আমাদের সঙ্গে এই বিপুল
মহাবিশ্বের অলিখিত, দিব্যকান্তি সম্পর্কটি। তাঁর রচনা তাই ভাবায়
আমাদের, নতুন করে তাকাতে শেখায় জীবন ও পৃথিবীর দিকে।
|
| |
 |
|