প্রাককথন
ষাটের দশক বাংলাদেশের সাহিত্য উপহার দিয়েছিলো এক ঝাঁক উজ্জ্বল
সাহিত্য কমর্ী _ কী কথাসাহিত্যে, কী কবিতায়, কি প্রবন্ধ বা
সমালোচনায় _ এক সঙ্গেঁ এত অধিক সংখ্যক শক্তিশালী লেখকের আগমন আর
কোনো সময় ঘটেনি। এই সময় আগত সাহিত্যশিল্পীদের মধ্যে একে অপরের
সঙ্গে মিল সামান্যই, বস্তুত এজন্যই ষাটের দশক নির্মাণ করতে পেরেছে
বহুমাত্রিক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রভূমি। এ সময়ের কয়েকজন
গুরুত্বপূর্ণ গল্পকারের কথা-ই ধরা যাক। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর
আব্দুল মান্নান সৈয়দ একই সময়ের গল্পকার _ ব্যক্তিজীবনে তাঁদের
বন্ধুত্বও ছিলো _ কিন্তু গল্পভাবনা, গল্পের বিষয়,ভাষা ও প্রকরণে
তাদের রয়েছে কয়েকযোজন দূরত্ব। কিংবা রাহাত খান বা জ্যোতিপ্রকাশ
দত্তের মধ্যেও দূরত্ব একই রকম। সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হক,
শওকত আলীও প্রায় একই সময়ের গল্পকার হলেও এবং তাঁদের গল্পের
বিষয়বস্তু মোটামুটি একই _ প্রধানত নিম্নবিত্তের পোড় খাওয়া মানুষের
জীবনযাপন _ হলেও নির্মাণ কৌশলে তাঁরা আলাদা। মাহমুদুল হক আবার
এঁদের সবার থেকে আলাদা। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় _ মাহমুদুল হক
এই সময়ের [এবং তাঁর পরবর্তীকালের] লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে
ব্যতিক্রমী, উজ্জ্বল ও অনন্য কথাশিল্পী। তাঁর সাফল্য উপন্যাসের পথ
ধরে এলেও এবং তাঁর গল্পের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও _ ওই
স্বল্পসংখ্যাক গল্পেই তিনি রেখেছেন তাঁর শক্তিশালী লেখনির
স্বাক্ষর। তিনি যে এক অনন্য প্রতিভাধর গল্পশিল্পী, সেটি তাঁর
কয়েকটি মাত্র গল্প পাঠেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
গল্পপ্রসঙ্গ
১.
মাহমুদুল হক তাঁর গল্পে খুব বেশি কথা বলেন না কখনো, বরং তাঁকে বলা
যায় সংযমী, আবেগের রাশ টেনে ধরা লেখক। অন্যান্য লেখকরা যে
দৃশ্যপটের বিসতৃত বর্ণনার লোভ সামলাতে পারেন না, সেরকম দৃশ্যের
বর্ণনায়ও তিনি থাকেন নিরাসক্ত; এবং পছন্দ করেন ইঙ্গিঁত দিতে _ কখনো
কখনো একেকটি ইঙ্গিতই তাঁর গল্প হয়ে ওঠে, কখনো একটি মাত্র বাক্য
গল্পের পরিণতি নির্ধারণ করে, কখনো বা একটি মাত্র দৃশ্যকল্প গল্পের
প্রেক্ষাপট পাল্টে দেয়।
তিনি সংযমী, কম কথা বলতে পছন্দ করেন -
কিন্তু যেটুকু বলেন সেটুকুতে তিনি স্পষ্ট, লক্ষ্যাভিসারী
- যা বলার
তা তিনি বলে ফেলেন কোনো রাখঢাক ছাড়াই; ফলে,যা বোঝাতে চান সফলভাবে
তা বোঝাতে পারেন তাঁর পাঠকদের।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে তাঁর বুড়ো ওবােেদর জমা খরচ গল্পটির কথা।
গল্পে বর্ণিত সময়টি মুক্তিযুদ্ধের, কিন্তু কোথাও এর ভয়াবহতার কথা
বর্ণনা করেননি লেখক _ যথারীতি কেবল ইঙ্গিতেই সেরেছেন মানুষের
আশ্রয়হীনতা, অসহায়ত্ব ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয় -
প্রাণের ভয়ে পোঁটলাপুঁটলি সম্বল করে কেউবা একেবারে নাঙ্গা হাতে
বনবাঁদার ভেঙ্গে খেতখামার ডিঙ্গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হন্যে
হয়ে ছুটে চলেছে। শহরে শহরে খুনখারাবি, হুলস্থুল; মিলিটারির ভয়ে
কিছুটা দিকভ্রান্তের মতো গ্রামে গ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মানুষ।
কিংবা যুদ্ধের চাপে কেমন আগুনঝরা চেহারা পেয়েছে গ্রামগুলো তার
ইঙ্গিত -
প্রতিটি গ্রামই এক একটি নাড়াক্ষেত, দাউ দাউ করে জলছে আগুন; বিপুল
ক্ষুধায় গনগনে রৌদ্র নিঃশব্দে গিলে ফেলছে লেলিহান শিখা, দিনগুলোর
আদল কতকটা এইরকম।
তো এই অবস্থার মধ্যেও চলে জীবনের আয়োজন; অন্যান্য সবকিছুর সঙ্গে
সুবিধাবাদিরা নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়। তেমনি একজনের কাজ করে দেয়
বুড়ো ওবাদ _ চোরাই মালের বস্তা এদিক ওদিক করে নির্দিষ্ট স্থান থেকে
পেঁৗছে দেয় মালিকের কাছে। এরই মধ্যে একদিন ঘটে যায় প্রলয়ংকরী ঘটনা।
বংশানুক্রমে চুরি যাদের পেশা, তেমনি এক গ্রামে আশপাশের সাত গ্রামের
মানুষ হামলা করে চালায় হত্যার উৎসব; গুনে গুনে 'আড়াইশ' পর্যন্ত
জবাই করা হয় বুড়ো ওবাদের চোখের সামনেই এবং এতবড় একটি ঘটনায়ও সে
থাকে নিস্পৃহ, নির্বিকার, নিরাসক্ত। হত্যার এই মহোৎসবে খানিকটা যেন
অংশগ্রহণও আছে তার। কি কারণ? তার কি স্বার্থ? কারণটি লেখক বলেন
এইভাবে _
জবাই শেষে ধর আর মুন্ডু ফেলে দেওয়া হচ্ছিলো খালে। বোঝা তাকেও টানতে
হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা আর ভালো লাগে না। সে হতাশ হয়েছিলো।
বুড়ো ওবাদের ধারণা ছিলো তাকে ফুটোকপালে জেনে অতু্যৎসাহীদের কেউ না
কেউ তার হাতে নগদ কিছু গুঁজে দেবে, 'চিমড়া হাড্ডিতে মন্দ দেহাইলা
না বুড়া' _ স্রেফ এই সুখ্যাতিটুকুই তার জন্য বরাদ্দ ছিলো, সে তা
আন্দাজ করে নি।
চমকে উঠতে হয়। এই নাকি মানব-স্বভাব? কেবল নগদ কিছু পাবার আশায় কেউ
এমন হত্যাযজ্ঞেও অংশগ্রহণ করতে পারে ? লেখক কি এইরকম নেতিবাচক
হিসেবে দেখতে চান মানুষকে?
গল্পের বাকি অংশে আমরা দেখি বুড়ো ওবাদ বিপদ-বিপত্তির আশংকা মাথায়
নিয়েও নৌকা বেয়ে চলেছে 'বাইল্যারপাড়' লক্ষ্য করে _ নানান কথা
ভাবতে ভাবতে। কেন? তার সংশয়-ভীতি-উদ্বেগ দেখে মনে হয় - সে বুঝি
কোনো অন্যায় কাজ করছে, হয়তো চোরাই মাল নিয়ে যাচ্ছে তার গন্তব্যের
দিকে। ধরা পড়ে যাবার ভয় থেকেই হয়তো ওই উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা। অন্ততঃ
গল্পের ধারাবাহিকতায় তার মধ্যে এমন কোনো মানবিক আচরন তার মধ্যে
দেখা যায়নি, যাতে আমরা অন্য কিছু আশা করতে পারি। গল্পের পরিণতির
জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয় এর শেষ বাক্য পর্যন্ত। আমরা দেখি _ সে
আসলে এত আশংকা নিয়েও এখানে এসেছে হত্যাযজ্ঞে নিহত তিনটি শিশুর লাশ
দাফন করার জন্য। গল্পের শেষে তাদেরকে কবরস্থ করতে করতে _
সে এক অপার্থিব আচ্ছন্ন গলায় বললে, 'সোনারা, তোমাগো বাপ-মায়ে মাটি
পায় নাই, তোমরা পাইলা। দুনিয়াতে তুমাগোর কুনো গুনা নাই। তোমাগোর
মনে কুনো দাগ লাগে নাই, আল্লায় তোমাগোর কথা শুনবো, আল্লায় য্যান
আমারে বেস্ত দেয়, সোনারা তোমরা কয়ো'
এই শেষ বাক্যে এসেই আমরা বুঝতে পারি বুড়ো ওবাদ প্রকৃতপক্ষে এক
ইতিবাচক মানবিক গুনাবলী সমৃদ্ধ মানুষ; যুদ্ধের জন্য ওই গুনাবলী
চাপা পড়ে গেছে নিস্পৃহতা ও নিরাসক্তির আড়ালে। তার নির্লিপ্ততার
পেছনে আছে মমতা ও ভালোবাসা ভরা একটি হৃদয়_ অচেনা শিশুদের লাশ তাই
শত প্রতিকুলতার মধ্যেও সে কবরস্থ করার কথা ভাবতে পারে _ আছে সুন্দর
জীবনের প্রতি আকাঙ্ক্ষা _ মৃত শিশুদের কাছে তাই সে বেহেশতের জন্য
সুপারিশের অনুরোধ জানাতে পারে।
মাহমুদুল হক এভাবেই আবিষ্কার করেন মানব চরিত্র আর ইঙ্গিত করেন সকল
শুভবোধ ও কল্যাণবোধের প্রতি।
২.
মাহমুদুল হক মানুষকে দেখতে চান তার বহুমাত্রিক সম্ভাবনাসহ। ফলে
বুড়ো ওবাদের নিরাসক্ত কার্যকলাপের আড়ালে লুকানো মানবিক হৃদয়টি
আবিস্কৃত হয় যেমন, তেমনি অচল সিকি গল্পে আপাত সহানুভূতির পেছনে
আবিষ্কার করেন এক তরুণীর নিষ্ঠুর ও লম্পট রূপটিও।
এই গল্পে নবদম্পতি বেড়াতে এসেছে নির্জন বনভূমিতে। গল্পের শুরুতেই
দারোয়ানকে পাঁচ টাকা বখশিস দিয়ে আর এই বিরানভূমিতে একাকি বসবাসের
প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে মেয়েটি তার মমতাময়ী অন্তর্লোকের পরিচয়
পাঠকের কাছে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে। তাদের টুকটাক কথাবার্তা আর
খুনসুটিতে গল্প এগিয়ে যায়। বোঝা যায় না, এই খুনসুটিমার্কা
কথাবার্তা, ইয়ার্কি আর দুষ্টুমি দিয়ে লেখক গল্পটিকে কোথায় নিয়ে
যেতে চান। আমরা দেখি তারা লোকালয়ের উদ্দেশে হাঁটছে, হাঁটতে হাঁটতেই
তারা এক বৃদ্ধ চা বিক্রেতার দেখা পায়, ত্রিভূবনে যাকে দেখার কেউ
নেই। মেয়েটি তার প্রতিও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। তারা চা-টা খেয়ে
আবার এগোয়; আর আমরা ক্রমান্বয়ে গল্পের শেষে এসে এক বিমূঢ়
পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে পড়ি ; দেখি মেয়েটি বলছে _
খুব তো ভয় দেখিয়েছিলে যে ঐ আনি সিকিটা চালাতে পারবো না, বুড়ো
কিন্তু টেরই পায়নি। ... সেই অচল সিকিটার সৎকার করে এলাম।
আমাদের কাছে হঠাৎ করেই যেন এই মায়াময়, সহানুভূতিপূর্ণ মানুষগুলোর
ভিন্নতর একটি রূপ পরিস্ফুট হয় আর আমরা আবার চমকে উঠি।
মানুষ তাহলে এমনই! অর্থাৎ বাইরে থেকে তাকে যেমন দেখা যায় সে আসলে
হুবহু তেমনই নয়; তাকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার অবকাশ
আছে, তাকে বোঝার জন্য একটি আলাদা অবলোকনের প্রয়োজন আছে! অন্ততঃ
মাহমুদুল হকের গল্প আমাদের তাই বলে !
৩.
এবং এরকম একটি অবলোকনের চোখ আছে বলেই মাহমুদুল হক দেখতে পান, আপাত
নিরীহ জীবনযাপনের মধ্যেও অনবরত জমে উঠছে গ্লানি, কিছুতেই তা থেকে
মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না, কিছুতেই ধুয়ে মুছে ফেলা যাচ্ছে না
অনিবার্যভাবে জমে ওঠা ওই গ্লানির পাহাড়।
জীবনযাপন মানেই তো নানারকম গ্লানিময় অভিজ্ঞতা, কখনো সচেতনভাবে,
কখনো অলক্ষেই জমা হয় হিসেবের খাতায়, কিছুতেই তাকে এড়িয়ে যাওয়া যায়
না। প্রতিদিন একটি রুমাল গল্পে সবুজ তেমনই এক চরিত্র, অবিরাম
গ্লানি সঞ্চয়ই যার একমাত্র নিয়তি। গ্রামের এক কলেজে পড়ায় সে;
ম্লান, ম্রিয়মান, সম্ভাবনাহীন, অনুজ্জ্বল এক জীবন তার। অথচ তার
ফেলে আসা শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য এমন ছিলো না; তার বন্ধু আলতাফের
ভাষায়_
স্কুল লাইফে তুই ছিলি আমাদের মধ্যে আদর্শ চৌকস ছেলে। চমৎকার
ক্রিকেট খেলতিস, ডিবেটে কচুকাটা করতিস বড় বড় চাঁইদের, ছবি আঁকতিস,
কবিতা লিখতিস। স্ট্রাইক হয়ে যেতো দুদ্দাড় তুই ডাক দিলে, আর এখন ?
আআর এখন ? এখন সে এক গ্রামের কলেজের 'মাস্টার' আর _
ছেলেমেয়ে আগলে ঢাকায় পড়ে থাকে রেখা (তার স্ত্রী )। সব দায়ভাগই তার।
সবুজ শুধু মাসের মধ্যে দু'চারবার ঘুরে যায়, মাস পয়লা পয়সা দিয়ে
যায়। ইছাপুরায় পড়ে থাকতে তার নিজেরও খুব একটা ভালো লাগে তা নয়;
কিন্তু নিরুপায়। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। টেনেটুনে চালাচ্ছিলো সে
এতোদিন কোনমতো, এখন আর একেবারেই ভালো লাগছে না। সংসার চলার অন্য
উপায় থাকলে নির্ঘাৎ ছেড়ে দিতো কলেজের চাকরি, আর পেরে উঠছে না সে।
তো, গল্প এখানে নয়। গল্পটা হচ্ছে, আলতাফ - যে উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত,
জীবনের আনন্দকে উপভোগ করতে চায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে _ সবুজকে জোর করে
নিয়ে বাইরে বেরোয় বেড়াতে। বেরিয়ে সে নানারকম কান্ড করে _ জোরসে
গাড়ি হাঁকায়, রাস্তায় অন্য সব গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেয়, হৈ-হল্লায়
মেতে থাকে _ এসব তার চরিত্রের সঙ্গে মানিয়েও যায়, কারণ (সে বলে) _
আমি সারাদিন, সারা জীবনভর ভীষন উত্তেজনার ভেতর থাকতে চাই,
উত্তেজনাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়! কিন্তু সবুজের
চরিত্রের সঙ্গে এসব একেবারেই বেমানান। সে এসব দুদ্দাড় কর্মকাণ্ডে
রীতিমতো পীড়িত বোধ করে। তারা একবার শহরের বাইরে বনভূমির কাছে গিয়ে
বসে _ সেখানেও আলতাফ জীবনের পক্ষে, আনন্দের পক্ষে সোচ্চার, আর সবুজ
যথারীতি ভেঙ্গে পড়া মানুষ _
আমি আর পারছি না। একবার ঢাকা, একবার ইছাপুরা, এ আর ভালো লাগছে না।
ওখানে যা পাচ্ছি এ বাজারে তা এমন হাস্যকর! জীবন চলে না।
ফেরার পথে আলতাফ এক রিকশারোহী বিষণ্ন তরুণীকে তাড়া করে, পাত্তা না
পেয়ে তার রিকশাটাকেই ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়; এবং সবুজকে বাসায়
পেঁৗছে দিয়ে ঘটনাটার ব্যাখ্যা দেয় এভাবে _
দোষগুণ যাই বলিস না কেন আমার ধরনটাই এখন এই। আমার যা প্রয়োজন আমি
তা জোর করে আদায় করে নেই, কারো মুখ চেয়ে বসে থাকি না হা-পিত্যেশ
করে। যেখানে তা সম্ভব নয় সেখানে গায়ের জোর খাটাই, প্রয়োজন হলে
উড়িয়ে দেই, নিজের অস্তিত্বের জন্য এইসব করতে হয় আমাকে। বুঝতে পারছি
খুব খারাপ লাগছে তোর, আমি দুঃখিত। মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা কর,
ভুলে যা সবকিছু, দেখবি সবকিছু আবার কেমন ফর্সা হয়ে গেছে। দুনিয়াটাই
এভাবে চলছে বন্ধু, ভুলে যাবার ক্ষমতা পর্বতপ্রমাণ হওয়া চাই ! br />
ককিন্তু সবুজ কি ভুলতে পারে সবকিছু? তার স্বভাব তো আলতাফের সম্পূর্ণ
বিপরীত, আলতাফ যা সহজেই পারে সবুজের পক্ষে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
নইলে তো আর ঢাকায় কোনো একটা কর্মসংস্থানের জন্য তাকে আলতাফের মুখের
দিকে চেয়ে হা-পিত্যেশ বসে থাকতে হতো না, নিজের জীবনকে এমন
দুর্দশাপূর্ণ করে তুলতে হতো না। গল্প শেষ হয়ে যায় এখানেই। কোনো
কোনো পাঠক হয়তো ভাববেন _ এ গল্পের মানে কি ? কেবল জনৈক আলতাফের
তারুণ্যের উচ্ছ্বাসমাখা কর্মকাণ্ডের বিবরণ ছাড়া এ গল্পের মধ্যে
আছেটা কি? কিন্তু যারা একটু মনোযোগী পাঠক, তারা এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই
তুলবেন যে, সবুজ আলতাফের কথামতো আদৌ সবকিছু ভুলে যেতে পেরেছিলো কী
না। গল্পের কোথাও এ সম্বন্ধে কিছু বলা নেই। কিন্তু আলতাফের _
ভীষণ ঘেমে গেছিস, মুখ মুছে নে _ বলার প্রেক্ষিতে _ সবুজ পকেট
হাতড়ালো। রুমাল খুঁজে পেল না। বাঁশবনের তলায় রুমাল পেতে বসেছিলো,
মনে পড়লো ফেলে এসেছে। প্রায়ই ফেলে আসে, রেখা বলে এতো রুমাল হারাও
কি করে!
অংশটি পড়ে গল্প সম্বন্ধে নতুন করে ভাবতে হয়। আমরা তো প্রতিদিনই
আমাদের দেহে জমে থাকা ঘাম-ধুলো-ময়লা মুছে ফেলি রুমাল দিয়ে _ সেই
রুমাল যদি হারিয়ে যায় তাহলে কি উপায় হবে? সমস্ত
ঘামধুলোবালিময়লাআবর্জনা জমা কি হবে না শরীরে? এই গল্পের রুমালটি তো
কেবল নিছক একটি রুমালই নয় বরং এ যেন এক উজ্জ্বল প্রতীক _ যা দিয়ে
জীবনযাপনের গ্লানিগুলো মুছে ফেলা যায়। কিন্তু প্রতিদিন একটি করে
রুমাল হারিয়ে গেলে মোছা আর হয়ে ওঠে না, কেবল জমা হতে থাকে
গ্লানিগুলো _ জমা হতে হতে গ্লানির পাহাড় জমে ওঠে, জীবনটাই হয়ে ওটে
বিপুল গ্লানিময়।
রুমালের আদলে ব্যবহৃত এই প্রতীকটির কারণেই গল্পটি হয়ে ওটে
অনন্যসাধারন। শুধু মাহমুদুল হকের গল্পগুলোর মধ্যেই নয় _ সমগ্র
বাংলা সাহিত্যেই এমন গল্পের উদাহরণ বিরল। এত অল্প কথায়, এত সংযম,
এত উজ্জ্বল ইঙ্গিতময়তায় মানবজীবনের এক রূঢ় সত্যের এই অসামান্য
রূপায়ন খুব বেশি ঘটেনি আমাদের সাহিত্যে। br />
৪.
মমাহমুদুল হকের চরিত্রগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই _ সবুজের মতো _ জীবন
যাপনে ম্লান-ম্রিয়মান-ব্যর্থ ও নিঃস্ব। তাদের আচার-আচরণ,
কথাবার্তা, হাবভাব স্পষ্টতই বলে দেয় _ তাদের জীবনে কোনো একটা অঘটন
গেছে কিংবা প্রতিনিয়ত অঘটন ঘটেই চলেছে। এই চরিত্রগুলো বিষণ্ন্ন ও
নিঃসঙ্গ, জীবনের প্রাত্যাহিকতায় বেমানান ও বেখাপ্পা _ অনুজ্জ্বল ও
সম্ভাবনাহীন তাদের জীবনযাপন। ফলে দেখা যায়, দৈনন্দিন ব্যর্থতা ও
দুঃখবোধ ঢাকতে তারা আশ্রয় নেয় তাদের ফেলে আসা সোনার শৈশবে। কখনো
কখনো হয়তো শৈশবটিও স্বর্নালী নয়, তবু তারা ফিরতে চায় সেখানেই _
কারণ ওখানে আশ্রয় আছে, অবোধ আনন্দ আছে, দুঃখবোধের বিপরীতে সুখের
বিশাল আকাশ আছে। জোনাকী গল্পের আবুল হোসেনকে আমরা যেমন দেখি এভাবে
_
শৈশবে বিমাতার সংসারে নির্মমভাবে প্রহৃত হয়েছেন আবুল হোসেন, মনে
পড়ে সেইসব। মনে পড়ে গ্রাম, এক একটি দীর্ঘদিন, গ্রামের জলবায়ু,
মেঠোপথ, বিস্তীর্ন শস্যক্ষেত, মাটির গন্ধ, হু হু বাতাস, প্রহৃত
হলেও সেখানে এসব ছিলো ... যতো বলো, শৈশব মানে বিমাতার অত্যাচার,
শৈশব মানে দুঃখ, সে তবু চায়, কিছুতেই তাকে বোঝানো যায় না, বলে আরো
দাও, আরো দুঃখ দাও, আমাকে শৈশব দাও, আমাকে কোলে নাও, আমাকে মারো
.....
আবুল হোসেন শৈশব চায়, কারণ 'প্রহৃত হলেও সেখানে এসব ছিলো' _ তার
মানে, এখন এসব নেই। আসলে এখন কিছুই নেই তার জীবনে।
ব্যর্থ,ম্লান,ম্রিয়মাণ তার জীবনযাপন। সন্তানগুলো পর্যন্ত বেয়াড়া,
হাতছাড়া হয়ে গেছে (এমন কি তাদের মা-ও তাদের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছে _
নিজের দুঃখ-কষ্টগুলো শেয়ার করার মতো একজন সঙ্গীও নেই তার),তার
অপছন্দের কাজগুলো তারা অবলীলায় করে যায় তাকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা
না করেই; পিতা হয়েও তাদেরকে যেন কিছু বলবার অধিকার নেই তার। অবশেষে
একদিন ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেলে, আর এসবকিছুর বিরুদ্ধে অনেকটা হঠাৎ
করেই রুখে দাঁড়ালে নিজ সন্তানের কাছেই প্রহৃত হতে হয় তাকে। এবং
তারপর _ br />
অবসন্নতা ক্রমশ কাবু করে ফেলে তাকে। অবসন্নতা, মনোবেদনা, স্থবিরতা
_ এদের আর এখন কোনো সংকোচ বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। বয়েসের কাছে
নিদারুণ ভাবে তিরস্কৃত আবুল হোসেন, বয়েস তাকে ধিক্কার দেয়। গলা
পর্যন্ত ঠেলে ওঠে গ্লানির গরল, অদ্ভুত এক গ্লানি।
এএই কি তবে মানুষের নিয়তি? একজন মানুষকে সারাজীবন কেবল মারই খেয়ে
যেতে হবে? শৈশবে বিমাতার হাতে মার খাওয়াটা তবু মেনে নেয়া যায়, তাই
বলে এই প্রৌঢ়ত্বে এসে নিজ সন্তানের হাতে ! জীবন কি তবে এমনই ?
এইরকম নিঃস্ব, ব্যর্থ, মার খাওয়া ? কোথাও কি একটু স্নেহস্পর্শও
থাকবে না ? হঁ্যা, থাকবে। মাহমুদুল হক একচক্ষু দৈত্য নন যে, তিনি
শুধু মানুষের উপরিতলটিই দেখবেন। তাঁর আছে অবলোকনের ভিন্নতর একটি
দৃষ্টিকোণ, মানুষের ভেতরটাও যা দেখে নিতে পারে। ফলে গল্পের শেষে
আমরা দেখি, আবুল হোসেনের আপাতভাবে বিগড়ে যাওয়া মেয়ে এবার বাবাকে
খেতে ডাকছে এবং _
কান্নায় কেমন যেন ভেজা বুলুর স্বর, সে একটা হাত রাখলো তাঁর গায়ে।
আবুল হোসেন চোখ মেলে দেখলেন। এই প্রথম তাঁর মনে হলো বুলুর হাত কি
কোমল, চোখ কি স্নিগ্ধ।
মার খাওয়া জীবনেরও কোথাও না কোথাও স্নিগ্ধতা থাকে _ মাহমুদুল হক
সেটুকুই আবিষ্কার করতে চান। এখানেই তিনি ব্যতিক্রম, অনন্য। তিনি
যেমন আপাত মমতার ভেতর থেকে লাম্পট্যের অংশটুকু ছেঁকে বের করে
দেখাতে পারেন, তেমনি আপাত নিষ্ঠুরতার ভেতর থেকে আবিষ্কার করতে
পারেন স্নিগ্ধতা। কোনোকিছুই চূড়ান্ত নয়, একক নয় _ ইতি ও নেতি
মিলেমিশে থাকে জীবনের বাঁকে বাঁকে _ মাহমুদুল হক অতি সূক্ষভাবে
কথাটি আমাদেরকে বুঝিয়ে দেন। br />
৫.
হহৈরব ও ভৈরব গল্পের হৈরবও স্মৃতিভারাক্রান্ত মানুষ। ব্যর্থ,
ম্রিয়মাণ, নুইয়ে পড়া, জীবনের কাছে এক পরাজিত মানুষ সে। বংশানুক্রমে
ঢাকী সে; ঢাকঢোল তার জীবন ও জীবীকা। একসময় তাদের জীবনে ঔজ্জ্বল্য
ছিলো _ অন্তত সে তাই-ই মনে করে; তখন 'বাবু'রা ছিলেন, নানান
পালাপার্বনে তাদের বাড়িতে হৈরবদের মতো আরও অনেক ঢাকীদের ডাক পড়তো_
কয়কীর্তনের ঢাকীদের কি দাপটটাই না ছিলো একসময়, পালাপার্বনের আগে
সারাদেশ থেকে বায়না করতে আসতো মানুষজন। বনেদি বাবুদের বাড়ি না হলে
তারা বায়না ফিরিয়ে দিয়েছে কতোবার, সেই তারাই এখন ঋষিদাশদের সঙ্গে
বাঁশ আর বেতের ঝুড়ি বুনে কোনোমতে নিজেদের পেট চালায়, চুরি ডাকাতি
করে বেড়ায়। সময়ে কি না হয়; মাটিতে পড়া ডুমুর , তার আবার গোমর
কিসের। br />
এএখন আর সেই দিন নেই, বাবুরা দেশ গাঁ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে ওই পাড়ে,
সবকিছু ছেয়ে গেছে অভাব, দারিদ্র আর বেেেলল্লাপনায় _ এখন নবমীর রাতে
পূজাকমিটির ছেলেছোকরারা 'খানকি' নাচাতে চায়। হৈরব তাই পা বিছিয়ে
কাঁদে, একা একা। স্মৃৃতির জাবর কাটে, কষ্ট সইতে না পেরে কখনো কখনো
নিজের মৃতু্য কামনা করে _
'ঈশ্বর, ঈশ্বর আমারে তুইলা নাও _' হৈরব নিজের কাছে কাঁদবে বলে পা
বিছিয়ে বসে। কতো কথা মনে পড়ে, মরে পড়ে সিরাজদিখাঁর সেই পাতক্ষীরের
কথা, জিভে স্বাদ লেগে আছে এখনো। মনে পড়ে রামপালের কলামুলোর কথা,
গাদি ঘাটের কুমড়ো, আড়িয়লবিলের কই মাছ, কত কিছু। আতরপাড়ার সেই দই,
আহারে সব গেল কোথায়। গোটাগ্রাম জুড়ে ছিল কদমের বন, বর্ষার নদী ধীরে
মন্থর গতিতে ফেঁপে ফেঁপে উঠে শেষে কদমের বনে গিয়ে ইচ্ছে করে পথ
হারিযে 'এ আমার কি হল গো' ভান ধরে ছেলেমানুষিতে মেতে উঠতো। এখন
গ্রাম কি গ্রাম উজার; দেশলাইয়ের কারখানা গিলে ফেলেছে সবকিছু। কদমের
সে বনও নেই, নদীর সেই ছেলেমানুষিও নেই.....। সবকিছু দেখে, সব কথা
ভেবে হৈরব এ সিদ্ধান্তেই পৌঁছায়, অনেক কিছু তার দেখা হয়ে গেছে,
অনেক , অনেক, আর দরকার নেই তার দেখার, 'চক্ষু তো দুইখান, আর কতো
দেখাইবা, ঈশ্বর আমারে তুইল্লা নাও _'
এই যখন জীবন _ অভাব, দারিদ্রই যখন সার, অন্যের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর
ভরসা করে বেঁচে থাকা, চারদিকে কেবল ভাঙনের সুর, অতীতের
সুখস্মৃৃতিচারণ ছাড়া আর কিছু নেই _ তখন গনি মিয়ার কাছ থেকে ধার করা
টাকা হৈরব শোধ করে কিভাবে? গনি মিয়া এসে টাকার জন্য চোটপাট করে,
ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে বলে, তার বিধবা বোনের 'দয়া'র দিকে কুনজর ফেলে
_ যেন সবকিছু গিলে ফেলতে এসেছে। অবশেষে 'দয়া'র রংঢংয়ের কাছে হেরে
গিয়ে 'বাজনা' শুনতে চায়। হৈরবের ছেলে ভৈরব এবার বাপের মতো করেই
ঢাকে আওয়াজ তোলে _ br />
&'যহন মনিষ্যি আছিলো না, তহন বাজনা আছিলো, পর্বত বাইজা উঠছে, জল
বাইজা উঠছে, মাটি বাইজা উঠছে, ধরিত্রি বাইজা উঠছে, বাইজা উঠছে আকাশ
বাইজা উঠছে মনুষ্যজন্ম, বাইজা উঠছে মনুষ্যধর্ম, বাইজা উঠছে
মানবজীবন, ...বাবু হুনতাছেন? ঢাকে কেমনে কথা কইতাছে হুইনা দ্যাহেন।
দশখুশি বাবু, চৌদ্দমাত্রা, মানবজীবন কথা কইতাছে বাবু! দশখুশি
বাবু, চৌদ্দমাত্রা, মনুষ্যধর্ম বোল তুলতাছে, আখিজলে আখিজলে, টলমল
টলমল, ধরাতর ধরাতল, রসাতল, হা'
ঢাকের বাজনা নিছক বাজনা তো নয় ঢাকীদের কাছে, তাদের হাতে মানবজীবন
বেজে ওঠে, বেজে ওঠে মনুষ্যধর্ম। পাহাড় বাজে, ধরিত্রি বাজে,
জল-মাটি-আকাশ বাজে। ভৈরবের এমনতর বাজনাতে গনি মিয়া ভয় পেয়ে যায়,
কারণ ভৈরব যেন এখন আর ঢাক বাজাচ্ছে না, বাজাচ্ছে অন্য কিছু _
'ফিরান দিয়া বহেন,..দশখুশি বাজাই দ্যাহেন ক্যামনে, মাইনষের চামড়ার
ছানিতে দ্যাহেন কেমুন বাজে...' যেন স্বয়ং মানুষকেই বাজিয়ে চলেছে সে
তার সমস্ত আক্রোশ মিটিয়ে। কিন্তু একসময়_
গনি মিয়ার পিঠ নয়, পরিশ্রান্ত ভৈরব একসময় অবাক বিস্ময়ে দেখে
এতোক্ষণ সে তার নিজের ঢাকের গায়েই সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত হেনেছে;
চামড়ার দেয়াল আর ছানি ফেঁসে গেছে, চুরচুর হয়ে ছিটকে পড়েছে টনটনে
আমকাঠ, বেঘোরে নিজের ঢাকটাকেই চুরমার করেছে এতোক্ষণ।
গল্পের গতিমুখ ঘুরে যায় আবার। নিপীড়িত হৈরব বা ভৈরবদের হাতে ওই গনি
মিয়াদের পিঠের চামড়ার দুরবস্থা দেখে যখন একটু খুশি হওয়ার কথা
ভাববেন পাঠক তখনই লেখক দেখিয়ে দেন _ গনি মিয়ার পিঠ নয়, ভৈরব নিজের
ঢাকটারই বারোটা বাজিয়েছে এতোক্ষণ। ইচ্ছে করলেই তো নিপীড়কদের পিঠের
চামড়া তুলে নেওয়া সম্ভব নয়, ওটা স্লোগানে সম্ভব, কিংবা সম্ভব
তথাকথিত বিপ্লবী লেকখদের ইচ্ছেপূরণের গল্পে। মাহমুদুল হক স্লোগানে
বিশ্বাসী নন, বিপ্লবীও নন, তিনি কেবল মানুষের প্রকৃত রূপটি
আবিষ্কার করতে চান, এবং তা করতে গিয়ে তাদের ব্যর্থতা, হাহাকার আর
বেদনারই আবিস্কার ঘটে যায় তাঁর শক্তিশালী কলমে। br />
৬.
একজন জামশেদ গল্পের জামশেদও তেমনি এক চরিত্র। চাকরি খুঁজতে থাকা,
বড় ভাইয়ের কথার বানে জর্জরিত হওয়া যুবক জামশেদ। গল্পটি যেন,
মধ্যবিত্ত পরিবারের সেই একঘেঁয়ে, পুরনো পাঁচালি _ কিন্তু মাহমুদুল
হকের হাতে পড়ে ওই পুরানো গল্পও নতুন হয়ে ওঠে। কারণ একটিই _ তাঁর
আছে একটি ভিন্নতর দেখার চোখ। কিছুই বাদ পড়ে না তার দেখার তালিকা
থেকে _ এমনকি উঠোনে ফুটে থাকা সজনে ফুলও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ একটি
জায়গা করে নেয়। ছোটবেলায় মা সজনে ফুল ভেজে দিতেন _ 'আহা কি তার
স্বাদ, কী তার সুগন্ধ। এইসব টুকিটাকি হাজাগোবজা আনাজপাতি রাঁধায়
মা'র কোন তুলনা ছিলো না, মনে পড়ে।'
আআর এখন _
এখন তো গরু ছাগলে মুতে ভাসাচ্ছে, রোদ ওঠার আগে আর কেউ তোমাদের
কোঁচর ভরে তুলে নিয়ে যাবে না, ইদানিং আমোরা সভ্য হইয়াছি, আমাদের
সামনে পেছনে লেজ গজিয়েছে, মুখের স্বাদ বৃটিশ থেকে পাঞ্জাবি,
পাঞ্জাবি থেকে বাঙালি হয়েছে, এবং ইদানিং আমোরা সভ্য হইয়াছি,
কোকোকোলা খাইতে শিখিয়াছি এবং খাইতেছি, এবং খাইব, হাম্বারগার,
চাউমেন, আন্ডাওলা হাফ বিরিয়ানি, হগলই খাইমু, কেননা আমোরা সভ্য
হইয়াছি _
তার এই ভাবনার ভেতরেই আছে বর্তমান জীবনযাপনের প্রতি তীব্র,
সুতীক্ষ্ন বিদ্রুপ। কারণ কয়েকদিন আগে ভাবীকে সজনে ফুল ভেজে দেয়ার
কথা বললে _ 'ও ম্যাগো। ভাবী আকাশ থেকে পড়ে বলেছিল, তোমার তো
বিদকুটে বিদকুটে শখ, সজনে ফুল আবার মানুষে খায়' _
অথচ এই ভাবী দিন আনি দিন খাই পরিবার থেকে আসা মেয়ে, এখন পেটে
'তিনথাক চর্বি' জমিয়ে, বুলিতে দ'ুচারটে ইংরেজী শব্দ মিলিয়ে
ভদ্দরলোক সেজেছে! এখন জামশেদের দুঃসহ বেকার দিনযাপন, ঘরের মধ্যে
লাম্পট্য, ভাবীর পেটে তিনথাক চর্বি আর কথাবার্তায় ন্যাকামি, আর
বড়ভাই কতৃক স্ত্রীর অনুপস্থিতে কাজের মহিলাটিকে (রোকেয়ার মা) চেপে
ধরা কিংবা 'যা ভালো বোঝ তাই করো' জাতীয় হুমকি _ এসবই তাকে সহ্য করে
যেতে হয়। উপায় কি? সে বেকার, কিচ্ছু করার নেই কেবল তীব্র ক্ষোভ আর
বিদ্রুপে নিজেকে জ্বালিয়ে দেয়া ছাড়া, আত্ন্বহত্যা বা ভাইয়ের নাক
মুখ ফাটিয়ে দেয়া বা ভাবীর মামাত বোনকে রেপ করার পরিকল্পনা করা ছাড়া
কিংবা সংগোপনে মায়ের জন্য কান্না ছাড়া।
মা বলতেন _ 'তোরা দু'জন, তোরা আমার চোখ' _ জামশেদের খুব খারাপ লাগে
এখন। ইচ্ছে করে হাউমাউ করে কাঁদতে। সে মনে মনে বলে 'মা তুমি আমার
একটা চোখ কানা করে দাও, আমার আর ভালো লাগে না।
এসব ছাড়া তার আছেই বা কি? তার জীবনটাই যে নেতিবাচকতায় ভরপুর। নইলে
প্রেমিকার কাছে যাওয়ার জন্য আতিপাতি করে খুঁজেও কোথায় দু'টো টাকা
পাওয়া যাবে না কেন? অতএব তাকে অবশেষে রোকেয়ার মা'র ওপরই চড়াও হতে
হয় _ বড় ভাই সঙ্গমের বিনিময়ে তাকে যত টাকা দিয়েছে তার অর্ধেক বখরা
নিতে হয়। এইবার তার মন ভালো _ 'সবকিছু ভালো আছে, চড়ুইদের মন ভালো
আছে....সবকিছু স্পটলেট, ফ্ললেস, চমৎকার চমৎকার এবং চমৎকার' ...
এমনকি রোকেয়ার মা'র জন্যও এখন তার মন সহানুভূতিতে দ্রবীভূত _ 'আহা,
চুল ধরা উচিৎ হয়নি ওভাবে, আচ্ছা পায়ে ধরে মাফ চেয়ে নিলে হয় না _'
সারাটি গল্প জুড়ে যে তীব্র বিদ্রুপে পৃথিবীর সবকিছুর ওপর কালিমা
লেপন করে ছেড়েছে, সে-ই এখন কী রকম দ্রভীভূত, নরম মনের মানুষ। কারণ
এখন সে তার প্রিয় মানুষের কাছে যেতে পারছে। এত অল্পে যে তুষ্ট, এত
সামান্যে যে এমন ভালোমানুষ হয়ে ওঠে তার কপালে কেন কিছুই জোটেনা?
তাকে কেন বেকার হয়ে অন্যের ঘাড়ে বোঝা হয়ে থাকতে হয়? জীবন কি এমনই
নাকি? br />
৭.
মমাহমুদুল হকের গল্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ বারবার ঘুরে ফিরে
এসেছে। কিন্তু তা যতোটা না মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কাহিনীসমৃদ্ধ
হয়ে, তার চেয়ে বেশী এসেছে যুদ্ধের মধ্যে অবরুদ্ধ স্বদেশভূমিতে আটকে
পড়া মানুষের দুঃসহ দুর্দশা ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার আলোকে। এ বিষয়ে
কোথাও-ই তিনি বেশি কথা বলেননি, কিন্তু যেখানেই তিনি প্রসঙ্গটি
উত্থাপন করেছেন _ মনে হয়েছে যেন একটি দম বন্ধ করা অসহায়-অনিশ্চিত
পরিবেশের মধ্যে মানুষগুলো হাসফাস করছে। বুড়ো ওবাদের জমা খরচ গল্পে
এমনকি মুক্তিযুদ্ধ কথাটি পর্যন্ত উচ্চরিত হয়নি কিন্তু মানুষ কি
বিপুল দুর্দশার মধ্যে পতিত তা বোঝা যায় দু'কয়েকটি বাক্যেই
(পূর্বোক্ত)। কিংবা প্রতিদিন একটি রুমাল গল্পের সবুজ _ যে ছিলো তার
বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে চৌকস ছেলে _ বদলে গেছে _
আমি মৃতু্যকে ভয় পাই আলতাফ, সত্যি বলছি, ভয় পাই ! পঁচিশে মার্চের
আর্মি ক্র্যাক ডাউন না হলে কখনো হয়তো জানতেও পারতাম না জীবনকে এতো
ভালোবাসি, এতো ভয় করি মরণকে! _ ওদিকে আলতাফ _ আরে গর্দভ মরণের
সঙ্গে পাঞ্জা লড়েই তো সত্যিকারের আনন্দ। চিলমারি অপারেশনে থাকলে
বুঝতিস, মৃতু্য কতো তুচ্ছ ব্যাপার, মৃতু্যকে নিয়ে কিভাবেই না
ছেলেখেলা করেছিলাম আমরা প্রাইভেট আর্মির দসু্যরা। মরণকে আবার ভয়
কিরে?
একই যুদ্ধ দু'জনকে দুইভাবে জীবনের পক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একজন
যুদ্ধের ভয়াবহতায় ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেছে নিজের মধ্যে, অন্যজন যুদ্ধে
অংশগ্রহণের ফলে হয়ে উঠেছে সাহসী, একরোখা, মৃতু্যকে পরোয়া না করা
মানুষ। যুদ্ধ হয়তো এভাবেই বদলে দেয় একেকজন মানুষকে। আবার অবরুদ্ধ
জনগোষ্ঠীর মনোজগত সবচেয়ে চমৎকারভাবে চিত্রিত হতে দেখি গরু ছাগলের
গল্প এবং বেওয়ারিশ লাশ গল্পে। প্রথোমোক্ত গল্পে দেখি _ মানুষ কি
ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতায় আর অসহায়ত্বের ভেতর দিনযাপন করছে ! যে কোনো
মুহূর্তে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা, আশ্রয়হীন হবার সম্ভাবনা, নিজভূমি
ছেড়ে অচেনা-অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেবার বাধ্যবাধকতা
মানুষকে যেন গরু ছাগলের মতো করে তুলেছে। মানবিক জীবনের সম্ভাবনা
যেন চিরতরে অন্তর্হিত হয়ে গেছে তাদের জীবন থেকে। বেওয়রিশ লাশ গল্পে
দেখি, একটি বেওয়ারিশ লাশ একটি পরিবারকে কী ভয়াবহ সংকটে ফেলে
দিয়েছে, কী বিপুল নিরাপত্তাহীনতা তাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে। অতঃপর
লাশটি রাজাকারা এসে সরিয়ে নিয়ে গেলে দেখি, প্রৌঢ় দম্পত্তিও মেতে
উঠেছে প্রেমের সৌরভে। কিন্তু মাহমুদুল হকের এই শ্রেনীভুক্ত
গল্পগুলোর মধ্যে বুলু ও চড়ুই গল্পটি ভিন্নমাত্রিক ঔজ্জ্বল্যে
ভাস্বর। ছোট্ট্ব একটি গল্প। পুরো গল্প জুড়ে 'আনু' নামের এক সদ্য
তরুণের কৈশোরিক হৈ-হল্লা জ্জ সে তার বোন বুলুকে নানাভাবে ডেকে
চলেছে, 'বুলু-অ্যাই
বুলু-বুলটি-বুলিয়া-বুলুপা-বুলুমনি-বুলবুলি-আপামনি'জ্জ ইত্যাদি
ইত্যাদি; আর এই ডাকের পরিপ্রেক্ষিতে বুলুর নানান ধরণের ভাবনা।
আনুটা সারাজীবনই এমন। হৈ-চৈ-হল্লা-চিল্লা করতে পছন্দ করে,
একমুহূর্ত সুস্থির থাকতে পারেনা। তার নানান কান্ডকারখানা এই
পরিবারটিকে বহুভােেব ভুগিয়েছে, এমনকি তারই জন্য তার বাবাকে সরকারী
চাকরিটি হারাতে হয়েছে। তো, এই আনু যুদ্ধে গিয়েছিলো। ব্যাপারটি চেপে
রাখা সম্ভব হয়নি। ঘটনা প্রকাশিত হয়ে পড়লে পাকিস্তান আর্মিরা তার
বাবা আর বুলুকে ধরে নিয়ে যায়। br />
যুদ্ধ শেষ।
সসবাই ফিরে এসেছে।
কিন্তু সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেছে। যুদ্ধ এক ভয়াবহ সর্বনাশের
চিহ্ন রেখে গেছে তাদের পরিবারে যার শিকার বুলু।
বুলু এখন একা একা ঘরে শুয়ে রাজ্যের কথা ভাবে; সময়কে চলে যেতে দেখে।
পুরো গল্পেই আমরা বুলুকে এভাবে একটি ঘরে শুয়ে আনুর ওই ডাকাডাকির
প্রেক্ষিতে এসব ভাবতে দেখি। কিন্তু এতো ডাকাডাকি করে আনু তাকে কি
বলতে চায় ? গল্পের শেষে আমরা দেখি, আনু বুলুর ঘরে ঢুকে তাকে টেনে
হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে _
'এই দেখো' _ মেঝের ওপর পড়ে থাকা খড়কুটো আর চড়ুইপাখির একটি শাবকের
দিকে সে আঙুল তুলে দেখায়। _ 'বাসা থেকে বাচ্চাটি পড়ে গিয়েছিলো, কি
জানি কি করে। যতোবার তুলে দিই ততোবারই ওরা ঠুকরে ঠুকরে ওকে নিচে
ফেলে দিচ্ছে,অবাক কান্ড না?' br />
বুলু বললে, 'ওরা তো তোদের মতো মানুষ নয়!'
'ুতার মানে? তোর কথার মাথা মুন্ডু বুঝি না' _
&'মানুষ বড় ভালো,' বুলু বললে, তার চোখ তখন ভেজা ভেজা। বললে, 'মানুষ
বড় সুন্দর'।
এই তো গল্প। কিন্তু কী অসামান্য মহিমায় ভাস্বর ! যে বুলু
নির্যাতিত, যে বুলুর স্বপ্নের মৃতু্য ঘটেছে বীভৎসভাবে_ ওই মানুষের
মতো দেখতে পশুদের দ্বারাই; বুলু সেই মানুষকেই বলছে ভালো,সুন্দর!
কারণ সে তবু বেঁচে আছে মানুষেরই স্নেহছায়ায়, মমতায় ও যত্নে। br />
যযতো কিছুই ঘটুক _ মানুষ খুব ভালো, মানুষ খুব সুন্দর _ এই হচ্ছে
পাঠকের কাছে মাহমুদুল হকের মেসেজ। সমস্ত গল্পের মধ্যে দিয়ে তিনি
তাঁর পাঠকদের কাছে প্রধাণত এই কথাটিই বলতে চান _ সব কিছুর পরও
মানুষ ইতিবাচক প্রণী; মানবতার পক্ষে, মানুষের পক্ষে, মানবজীবনের
পক্ষে মাহমুদুল হকের এই দৃঢ় অবস্থানই তাঁর গল্পের প্রাণ।
উপসংহারের পরিবর্তে
ক. br />
আআলোচনা পড়ে কোনো পাঠক যদি মাহমুদুল হকের গল্প সম্বন্ধে ধারণা পেতে
চান, তাহলে তিনি যে জিনিষটি থেকে বঞ্চিত হবেন, তা হলো _ তাঁর
অসামান্য ভাষামাধুর্য এবং নির্মাণকৌশলের অসাধারণ রূপ। তাঁর
সম্বন্ধে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন _ বাংলা গদ্যে
প্রভুত্ব করার ক্ষমতা এঁর আছে। সুনীল অতিশয়োক্তি করেননি _ অন্তত
মাহমুদুলের পাঠকরা তাই মনে করেন। তাঁর গল্প-উপন্যাস নিয়ে আলোচনা
করার বিপদ হলো এই, যে _ অসংখ্য উদ্ধৃতি দেয়ার লোভ সংবরণ করতে হয়।
তাঁর বর্ণনা এতো চমৎকার যে, কোনো আলোচক যদি উদ্ধৃতি দিতে শুরু
করেন, তাহলে পুরো রচনাটিই উদ্ধৃতিস্বর্বস্ব হয়ে যেতে পারে।
খ.
শুধু ভাষামাধুর্যই নয় _ তাঁর রয়েছে চরিত্রচিত্রণের অসামান্য
দক্ষতা। হৈরব, ভৈরব, বুড়ো ওবাদ, হলধর নিকারী, বুলু, সপুরা, পরাগল,
নুনি, তপা _ এসব অভূতপূর্ব চরিত্র বাংলা গল্পে খুব সুলভ নয়। পাঠকরা
লক্ষ্য না করে পারেন না যে, এদের নামগুলোও ঠিক প্রচলিত নয় _ যেন
নাম নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই তিনি বুঝিয়ে দিতে চান যে, এরা ঠিক
সাধারণ চরিত্র নয় কিংবা ব্যতিক্রমী মর্যাদা পাওয়ার যোগ্যতা এদের
আছে।
গ.
তাঁর চরিত্রগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জীবনযাপনে
ম্লান-ম্রিয়মান-ব্যর্থ। এই ব্যর্থতাবোধ থেকে দূরে থাকার জন্য তারা
আশ্রয় নেয় নিজেদের ফেলে আসা শৈশবে-কৈশোরে। মাহমুদুল হকের এটি একটি
প্রধান বৈশিষ্ট্য যে, তিনি তাঁর প্রায় সকল চরিত্রকে তাদের
আপাত-সোনালী অতীতে পরিভ্রমণ করিয়ে আনেন । দৈনন্দিন বাস্তবতার কঠিন
কষাঘাত থেকে মুখ ফিরিয়ে অতীতে আশ্রয় নেয়ার ফলে তাঁর চরিত্রগুলোকে
কখনো কখনো পলায়নপর বলে মনে হয়। তিনি জীবনের বাস্তবতাগুলো বোঝেন
বলেই জানেন যে, দৈনন্দিন জীবনের দুরূহ বাস্তবতা থেকে সহসা মানুষের
মুক্তি মেলে না, অতএব পলায়ন এবং পলায়নই একমাত্র মুক্তির উপায়।
ঘ.
আর তাই এসব গল্প পড়তে গিয়ে আমরা অনুভব করে উঠি যে, সবকিছু মিলিয়ে
তিনি আমাদের কথাই লিখেছেন। যে জীবন তিনি তাঁর গল্প উপন্যাসে আঁকেন
তা তো আমাদেরই যাপিত জীবন। তাঁর অসামান্য ভাষামাধুর্য,
চরিত্রচিত্রণ আর নির্মাণকৌশল দিয়ে তিনি আমাদেরকে তাঁর রচনাসমূহের
সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে নেন, আমাদের সঙ্গে তৈরী করেন এক গভীর নৈকট্য _
আর হয়ে ওঠেন আমাদের কালের অন্যতম কুশলী কণ্ঠস্বর।
|
| |
 |
|