'মানুষের মৃতু্য হলে তবুও মানব থেকে যায়' _
জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন তাঁর মানুষের মৃতু্য হলে কবিতায়; এবং বলে
মানুষকে তার ব্যক্তিগত জীবন যাপনের দায় থেকে মুক্তি দিয়ে একে একটি
মহাজীবনের অংশ করে দিলেন, জীবনের মহত্তর একটি রূপ প্রত্যক্ষ
করালেন, অর্থহীন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থও দান করলেন।
কথাগুলো হয়তো ঠিক পরিষ্কার হলো না। মহাজীবন! সেটি আবার কি জিনিস?
'ব্যক্তিগত জীবন যাপনের দায়' ব্যাপারটাই বা কি? প্রশ্ন আরও আছে।
মৃতু্যর পর কী হয়, মৃতু্যতেই কী মানব-জীবনের সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি
ঘটে, সমস্ত অর্জন শেষ হয়ে যায়, সব আয়োজন অর্থহীন হয়ে পড়ে _ মানুষ
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে দীর্ঘকাল ধরে। মৃতু্যতেই শেষ
নয়, মৃতু্যর পর আছে আরেক জীবন _ এক অনন্তকালীন জীবন; সেই জীবনের সব
কিছু নির্ধারিত হবে এই জীবনের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে _ এ কথা
বলে প্রায় সব ধর্মই তার অনুসারীদের সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করেছে,
জীবনের সমস্ত কাজকর্মকে পরবর্তী জীবনের পাথেয় হিসেবে বর্ননা করে
এসবের ওপর অর্থ আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ
মানুষ কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও এই আশ্বাসবাণীতে
সন্তুষ্ট হতে পারে নি। নানাভাবে চলেছে জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের
চেষ্টা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে
_ তেমন কোনো অর্থই খুঁজে পাওয়া যায় নি এসবকিছুর। সবার মনের মতো
কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় নি ওইসব প্রশ্নের। তবু চেষ্টা থেমে
থাকে নি, হাজার বছর ধরে মানুষ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছে,
এখনও খুঁজছে, ভবিষ্যতেও খুঁজবে। জীবনানন্দও হয়তো খুঁজেছিলেন এবং
পেয়েছিলেন এই উত্তর। কিন্তু তাঁর উত্তর আমাদের মধ্যে নতুন প্রশ্নের
জন্ম দেয়, কবিতাটির পরের দু-তিনটি পংক্তি পড়লেই প্রশ্নগুলো উঠে আসে
_
মানুষের মৃতু্য হলে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে
এসবের অর্থ কি? যে মানুষের মৃতু্য ঘটে গেছে, সে আবার 'চেতনার
পরিমাপ নিতে আসে' কীভাবে? তার মানে কি এই যে, তার শারীরিক মৃতু্য
ঘটলেও সে থেকে যায় এক প্রবহমান সত্ত্বা? উত্তর মিলছে না। বরং
আরেকটু এগোনো যাক কবিতাটি নিয়ে _
আজকের আগে যেই জীবনের ভিড় জমেছিলো
তা'রা ম'রে গেছে;
প্রতিটি মানুষ তার নিজের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে
অন্ধকারে হারায়েছে;
তবু তা'রা আজকের আলোর ভিতরে
সঞ্চারিত হ\'য়ে উঠে আজকের মানুষের সুরে
যখন প্রেমের কথা বলে
অথবা জ্ঞানের কথা বলে _
অনন্ত যাত্রার কথা মনে হয় সে-সময়
দীপংকর শ্রীজ্ঞানের;
চলেছে _ চলেছে _
এই পংক্তিগুলোই বলে দেয় যে, মরে যাওয়া মানে তিনি ধ্বংস বোঝান না,
অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানে চিরতরে হারিয়ে যাওয়াও বোঝান না, সেটা
হলে সেইসব মরে যাওয়া হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা আজকের আলোর ভিতরে
সঞ্চারিত হয়ে আজকের মানুষের সুরে প্রেম অথবা জ্ঞানের কথা বলতো না।
তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, যাদের শারীরিক মৃতু্য ঘটে গেছে তারাও
বর্তমানে প্রবহমান জীবনেরই অংশ রয়ে গেছে, কিংবা আজকে যারা জীবন
যাপন করছে তারা যখন শারীরিক মৃতু্যকে বরণ করবে তখনও তারা প্রবহমান
জীবনেরই অংশ রয়ে যাবে। অর্থাৎ জীবনের শেষ নেই, শেষ হয় না, মৃতু্য
মানেই জীবনের পরিসমাপ্তি নয়, প্রকৃতপক্ষে এ এক অনন্ত যাত্রা।
হয়তো এ কথাটি ভেবেই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেছিলেন (কথাশিল্পী
মামুন হুসাইনের লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি) _ 'লাইফ ইজ টু বি লিভড টু
ইটস ফুলেস্ট সো দ্যাট ডেথ ইজ জাস্ট অ্যানাদার চ্যাপ্টার। যখন তুমি
মরবে... দেখবে স্মৃতি উড়ছে বাতাসে, ... এ্যান্ড অল আওয়ার মেমোরিস,
অল আওয়ার ওয়ার্কস এ্যান্ড অল আওয়ার ডিডস উইল কনটিনু ইন আদার্স।' _
এভাবে ভেবে নিলে জীবন ব্যাপারটা অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের সকল
অর্জন, স্মৃতি ও কর্ম যদি অন্যদের মধ্যেও প্রবাহিত হয় এবং বেঁচে
থাকে তাহলে নিজের জীবনের পরিসমাপ্তি নিয়ে আর হাহাকার কিসের? বরং
একজন মানুষের ক্ষুদ্র একটি জীবনও তখন হয়ে ওঠে সুদূর অতীত থেকে
সুদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত প্রবহমান একটি মাত্র জীবনের অংশ। সৃষ্টির
আদি থেকে আজ পর্যন্ত এবং হয়তো শেষ পর্যন্ত বহমান সেই বিপুল-দীর্ঘ
জীবনের নাম দেয়া যায় মহাজীবন। তাহলে একজন মানুষের একটি মাত্র
ব্যক্তিগত জীবনের কি নাম দেব? অনুজীবন? হতে পারে। কিন্তু
সেক্ষেত্রে একথাও বলে নিতে হবে যে, মহাজীবন যতই মহান হোক না কেন,
সে বিচ্ছিন্ন কিংবা স্বাধীন নয়, সে আসলে সহস্র-কোটি অনুজীবনের
সমষ্টি মাত্র। অনুজীবন ছাড়া তার পূর্ণাঙ্গতা অসম্ভব, তার গন্তব্যে
পৌঁছুনোও অসম্ভব। ব্যাপারটা তুলনা করা যেতে পারে একটি অসীম-দীর্ঘ
মালার সঙ্গে _ মালাটি মহাজীবন _ তাকে গড়ে তুলছে ও তুলবে,
সম্পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার সৌন্দর্য দান করছে ও করবে অনুজীবন নামক
একেকটি ফুল। এই ফুল যতই ক্ষুদ্র হোক, বর্ণহীন বা গন্ধহীন হোক না
কেন, এর যে-কোনো একটির অনুপস্থিতিই মালাটিকে অসম্পূর্ণ করে তুলবে।
প্রকৃতি তা চায় না, সে তাই সচেতনভাবে একেকটি অনুজীবনের জন্ম দেয়।
কথাটি আধিভৌতিক শোনায়, অবিশ্বাস্য লাগে, এমনকি যদি বলি _ একজন
মানুষের জন্ম হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, এ এক সুদীর্ঘ
পরিকল্পনার ফসল তাহলেও কথাটিকে প্রথমত খুব যৌক্তিক বা
বিজ্ঞানসম্মত বলে মনে হবে না। অথচ কথাটির পেছনে শক্ত বৈজ্ঞানিক
যুক্তি আছে। সেটা কি রকম? বিজ্ঞান অনেক আগেই প্রমাণ করেছে _
নারী-পুরুষের একটি মিলনে পুরুষের কাছ থেকে লক্ষ-কোটি শুক্রাণু
নির্গত হয়, আর একটি ভ্রুণের জন্ম হয় ওই অসংখ্য শুক্রাণুর মধ্যে
একটি নির্দিষ্ট বিজয়ী শুক্রাণু একটি নির্দিষ্ট ডিম্বানুকে নিষিক্ত
করার ফলে (সেই অর্থে প্রতিটি মানুষই একেকজন বিজয়ী মানুষ _ সে তার
জনকের বিজয়ী শুক্রাণু আর জননীর নিষিক্ত ডিম্বানুর ফল)।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো _ একটি দম্পতি সন্তান কামনা করার পর
অসংখ্যবার মিলিত হয়, অথচ সব মিলনেই সন্তানের জন্ম হয় না, এবং ঠিক
কোন মিলনটিতে ভ্রুণটির জন্ম হয় তা স্বয়ং ওই দম্পতিও জানে না,
অন্যরা তো দূরে থাক। তার মানে কি এই নয় যে, ওই সন্তানটির জন্মের
জন্য ওই বিশেষ মিলনটির প্রয়োজন ছিলো? ধরে নেয়া যাক এই বিশেষ
মিলনটিও দাম্পত্য জীবনে একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু তারপরও প্রশ্ন
থাকে। পৃথিবীর প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় সন্তান জন্মের আগে এক জোড়া
যুবক-যুবতির বিয়ের প্রয়োজন হয় (বিয়ে ছাড়াও সন্তানের জন্ম হতে পারে
বৈকি, সেটা ব্যতিক্রম, কিন্তু সেক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য
হবে), এবং যে কোনো দম্পতি একটু সুস্থির হয়ে চিন্তা করলেই টের পাবেন
_ তাদের বিয়ের ঘটনাটি অনেকগুলো কাকতালীয় ঘটনার সমন্বয় মাত্র। যদি
বলি তাদের মাধ্যমে একটি সন্তানের জন্ম দেয়ার জন্যই এতসব কাকতালীয়
ঘটনা ঘটেছিলো তাহলে বিষয়টিকে আবার আধিভৌতিক বলে মনে হবে। বরং
প্রসঙ্গটিকে আরেকটু পেছন থেকে দেখা যাক। ওই দম্পতির বিয়ে এবং বিশেষ
একটি মিলনের ফলে একটি শিশুর জন্ম _ এই দুটো ঘটনাকেই স্বাভাবিক এবং
বিশেষত্বহীন বলে ধরে নেই। তাদের বিয়ের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আমরা না হয়
তাদের জন্মের প্রসঙ্গটি বিবেচনা করি। যদি তাদের জন্মই না হতো তাহলে
তো আর এত কথার প্রয়োজন পড়তো না! আর সেখানেই রয়েছে প্রাকৃতিক নিয়মের
এক অপূর্ব সংকেত, কারণ তাদের জন্মও যথাক্রমে তাদের নিজ নিজ
মা-বাবার জন্ম-বিয়ে এবং বিয়ে পরবর্তী একটি বিশেষ মিলনের ফলাফল।
সেগুলোও কি কাকতালীয়? এভাবে পেছনে যেতে থাকলে দেখা যাবে কোনো এক
সুদূরতম অতীতে (যখন বিয়ে প্রথার উদ্ভবই হয় নি) এক জোড়া যুবক-যুবতি
যৌথ জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, আর তারই ধারাবাহিকতা আজকের জন্ম
নেয়া শিশুটি। তাহলে এই শিশুর জন্মকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা বলি
কীভাবে? সেই সুদূরতম অতীতেই কি সেটা নির্ধারিত হয়ে যায় নি? কিংবা
দূরতম ভবিষ্যতে যে শিশুটি জন্ম নেবে তার বীজও কি লুকিয়ে নেই আজকের
কোনো এক যুগলের উত্তরাধিকার রেখে যাবার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে? এ
প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয়ের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তবে
এর সমর্থনে খুব শক্ত কোনো বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি দেয়া সম্ভব হবে না।
আগেই একবার বলেছি _ মহাজীবন যদি হয় একটি অসীম দৈর্ঘ্যের বহুবর্ণিল
মালা তাহলে প্রতিটি মানুষের জীবন তার একেকটি ফুল। সব ফুল একরকম নয়
_ বেশিরভাগই বর্ণহীন, গন্ধহীন, বৈশিষ্ট্যহীন। কিন্তু কোনো কোনো ফুল
অসামান্য বর্ণিল, আকর্ষণীয় ও সৌরভময়। এই ফুলগুলোই মালাটিকে
অনিন্দ্য-সুন্দর করে তোলে, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে,
এমনকি কখনো কখনো শুধু তাদেরকেই চোখে পড়ে, অন্যগুলো যেন লুকিয়ে
থাকতে বাধ্য হয় দৃষ্টির আড়ালে। গৌতম বুদ্ধ, যিশু, মুহম্মদ,
সক্রেটিস, নিউটন, কার্ল মার্কস, লালন, রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন _
এঁরা হচ্ছেন সেই ধরনের ফুল। এঁরা এবং এঁদের মতো আরও অনেকেই জীবন ও
জগতের বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা দিয়ে অনেক অন্ধকার দূর করেছেন, উজ্জ্বল
মোহনীয় আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন এই পৃথিবীকে, মানবসভ্যতাকে এক ধাক্কায়
অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছেন। আমরা তাই বারবার তাঁদের নাম উচ্চারণ করতে
বাধ্য হই। অদ্ভূত ব্যাপার হলো _ এঁদের বংশপরম্পরায় এক আশ্চর্য মিল
আছে। সেটা হলো _ এঁদের কারোরই পূর্বপুরুষদের নাম ইতিহাসের খাতায়
পাওয়া যায় না। ইতিহাসে তো কেবল 'বিশিষ্ট' মানুষের নামই থাকে,
সাধারণ মানুষেরা ইতিহাসে উপেক্ষিত, এঁদের নাম নেই মানেই হলো _ এঁরা
সবাই ছিলেন সাধারণ মানুষ। অন্যভাবে বলা যায় এই মহাপুরুষদের
পূর্বপুরুষরা ছিলেন সব বর্ণ ও গন্ধহীন ফুল অথচ তাঁরা জন্ম
দিয়েছিলেন মানব-ইতিহাসের উজ্জ্বলতম ফুলগুলোকে। মিল আরও আছে। এই
মহান মানুষগুলোর কোনো উত্তরপুরুষও নেই। নেই যে তার কিছু কিছু আমরা
জানি, কিছু কিছু অজানাই থেকে গেছে। গৌতম বুদ্ধের পুত্র রাহুলের কী
হলো, এই বংশটি আরও বিস্তৃত হয়েছিলো কী না কেউ জানে না, যিশুর কোনো
পুত্র-কন্যা ছিলো না, মুহম্মদের বংশপরম্পরা শেষ হয়ে গেছে
হাসান-হোসেনের শহীদ হওয়ার মধ্যে দিয়ে, সক্রেটিস কিংবা লালনেরও কোনো
উত্তরপুরুষ নেই, এমনকি নিউটন বা রবীন্দ্রনাথেরও কোনো বংশধরদের খোঁজ
আমরা জানি না। যেন এই মানুষগুলোই ছিলেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের শেষ
উত্তরসূরী। এই মিলগুলো হয়তো কাকতালীয়, যেহেতু এর কোনো বিজ্ঞানসম্মত
ব্যাখ্যা দিতে পারছি না _ এর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্বন্ধে কিছু বলা
তাই কঠিন; কিন্তু কেমন করে বিষয়গুলো মিলে গেলো সেটা ভেবে দেখা
দরকার। একে তাহলে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো আমরা? এর মানে কি এই যে, এই
মহান মানুষদের পূর্বপুরুষরা শুধু একটি ধারা বা ব্যবস্থাকে (ংুংঃবস)
বহন করে নিয়ে এসেছেন নির্দিষ্ট সময়ে এঁদের জন্ম দেবার জন্যই! এবং
এঁদের জন্ম ও কর্ম ছিলো প্রকৃতির সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ _
যেহেতু প্রকৃতি ব্যাখ্যাত হতে চায়, তার রহস্যময় আচরণকে উদ্ভাসিত
করে তুলতে চায় এবং কামনা করে মানুষই সেই কাজটি করুক! এবং এঁদের কাজ
ছিলো এতই বড় মাপের যে তাঁদের বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার কোনো
প্রয়োজন প্রকৃতি অনুভব করে নি _ যেন এর উত্তরাধিকার হতে পারে সমগ্র
মানবজাতি! প্রকৃতির কাছে সব মানুষ মিলে তো একটিই জাতি, সবাই তার
সন্তান, কেউ কেউ হয়তো তার বিশেষ সন্তান, সেই বিশেষ সন্তানদের
কর্মকাণ্ডের সুফল যেন তার সব সন্তানই ভোগ করতে পারে _ প্রকৃতি কী
কৌশলে সেই কাজটিই করেছে! যদি এভাবে দেখি, মনে কি হয় না যে,
প্রতিটি জীবনই ইউনিক, গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল?
মনে কি হয় না _ আমরা আসলে একটি বিশেষ ধারাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছি,
যেন সুদূর ভবিষ্যতে আরও একজন আইনস্টাইন বা রবীন্দ্রনাথের জন্ম
সম্ভবপর হতে পারে! মনে কি হয় না _ একটি নির্দিষ্ট সময়কালে, একটি
নির্দিষ্ট দেশে, একটি নির্দিষ্ট সমাজব্যবস্থায় একজন মানুষের জন্ম
কোনো অর্থহীন ঘটনা নয়; আমি বা আপনি যে একশো বছর আগে বা পরে
জন্মগ্রহণ করি নি, আফ্রিকা-আমেরিকা-ইউরোপ বা আরবে জন্ম না নিয়ে যে
এই ক্রান্তিকালে এই দেশেই জন্মেছি _ এর পেছনেও আছে এক নিগূঢ় কারণ,
আছে কোনো অজানা পরিকল্পনা! স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে _ এই
পরিকল্পনা কার? সেই মহাজীবনের যে নিজেকে পূর্ণাঙ্গরূপে বিকশিত করতে
চায়? নাকি প্রকৃতির যে একটি মহাজীবনকে প্রবহমান দেখতে চায় এবং এর
একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ কামনা করে? নাকি ঈশ্বরের _ যাকে মানুষ কল্পনা
করে সবকিছুর স্রষ্টা হিসেবে? যার-ই হোক না কেন, এ প্রশ্নের আপাতত
কোনো উত্তর নেই। কারণ, আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না _ সত্যি
সত্যি এমন কোনো মহাজীবনের অস্তিত্ব আছে কী না, প্রকৃতির কার্যকলাপ
আর কার্যকলাপের কার্যকারণ সম্বন্ধেও আমরা এ পর্যন্ত খুব কমই জানতে
পেরেছি, আর কল্পিত ঈশ্বর সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারি নি। কিন্তু এসব
প্রশ্নের উত্তর না মিললেও নতুন নতুন প্রশ্নের উদ্ভব হতেই থাকে।
প্রশ্ন জাগে _ মহাজীবনের অস্তিত্ব যদি না-ই থাকে তাহলে একেকজন
মানুষের এই ক্ষুদ্র জীবনের অর্থ কি? মৃতু্যতেই যার পরিসমাপ্তি
প্রকৃতি তেমন জীবন সৃষ্টি করে কেন? নিছক 'মজা' করার জন্য? 'খেলা'
দেখার জন্য? মনে হয় না। প্রকৃতির নিয়মগুলো _ অন্তত এ পর্যন্ত যা
আবিস্কৃত হয়েছে _ এত শৃঙ্খলাপূর্ণ (ফরংপরঢ়ষরহবফ ), এত সুপরিকল্পিত
(বিষষ ফবংরহমবফ) যে, তার কার্যকলাপকে নিছক 'মজা' হিসেবে মেনে নিতে
কষ্ট হয়। একটি উদাহরণ দিয়ে প্রকৃতির এই শৃঙ্খলাপূর্ণ নিয়মের কথা
বলার চেষ্টা করি। দুটো ভরবিশিষ্ট পদার্থ (তা সে মানুষই হোক আর
পাথরই হোক), পরস্পরকে একটি বল (ভড়ৎপব) দিয়ে আকর্ষণ করে, এই বলের
নাম মাধ্যাকর্ষণ বল (মৎধারঃধঃরড়হধষ ভড়ৎপব)। গাছ থেকে যে আম নিচের
দিকেই পড়ে, পাখির মতো উড়ে যায় না বা উঁচু জায়গা থেকে লাফ দিলে
মানুষ যে আকাশে না উঠে ভূপাতিত হয় তার কারণ পৃথিবী এবং ওই আমটি বা
মানুষটির মধ্যে ক্রিয়াশীল মাধ্যাকর্ষণ বল। এই বলের পরিমাণ কি হবে
সেটা নির্ধারণ করার জন্য মহান বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন সপ্তদশ
শতকে একটি সূত্র প্রণয়ন করেন, যা নিউটনের বিখ্যাত মাধ্যাকর্ষণ
সূত্র (ঘবঃিড়হ্থং ষধ িড়ভ মৎধারঃধঃরড়হ ) হিসেবে পরিচিত। এসব কথা
সবারই জানা। তবু এ প্রসঙ্গের অবতারণা করা হলো একটি প্রশ্ন উত্থাপন
করার জন্য। দুজন মানুষের কথা ভাবা যাক। দুজনেরই তো ভর আছে, ধরা যাক
একজনের ৭০ কেজি আরেকজনের ৬০ কেজি, তাহলে নিয়মানুযায়ী তারা পরস্পরের
মধ্যে আকর্ষণ বলটি অনুভব করে না কেন? বলটি কি এক্ষেত্রে নিস্ত্রিয়
থাকে? না থাকে না, সে প্রশ্নই ওঠে না, নিস্ক্রিয় থাকলে প্রকৃতির
নিয়ম লঙ্ঘিত হয় _ প্রকৃতি কিছুতেই তার নিয়ম লঙ্ঘন করতে দেয় না।
তাহলে বলটি অনুভূত না হওয়ার কারণ কি? অনুভূত যে হয় না তার প্রমাণ
তো আমরা নিজেরাই। দুজন কি দশজন পাশাপশি বা মুখোমুখি বসে বা দাঁড়িয়ে
থাকলেও তো আমরা মাধ্যাকর্ষণের টানে পরস্পরের দিকে এগিয়ে যাই না!
রহস্যটি আসলে কোথায়? একজন আরেকজনের হাত ধরে টান দিলে যেখানে এগিয়ে
যেতে বাধ্য হই আমরা (এই টানও এক ধরনের বল, তবে তা মাধ্যাকর্ষণ বল
নয়), সেখানে এই বলটির অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও আমরা অনুভব করি না
কেন? কারণ, এই বলটি অতিমাত্রায় দূর্বল, এত দূর্বল যে বাস্তব
ক্ষেত্রে তাকে প্রায় শূন্য বলেই ধরে নেয়া হয় (যদিও পৃথিবীর সঙ্গে
অন্য কোনো বস্তুর আকর্ষণটি দূর্বল নয়, কারণ পৃথিবীর ভর অত্যন্ত
বেশি, আর দূর্বল নয় বলেই বস্তু ভূপাতিত হয়, উড়ে চলে যায় না)। আর এই
বল দূর্বল হওয়ার জন্য দায়ী একটি ধ্রুবক, এ, যার নাম বিশ্বজনীন
মাধ্যাকর্ষণ ধ্রুবক (ঁহরাবৎংধষ মৎধারঃধঃরড়হধষ পড়হংঃধহঃ)। এই
ধ্রুবকের মান অত্যন্ত ক্ষুদ্র (১ এর পিঠে ১১টি শূন্য বসালে যে
সংখ্যাটি পাওয়া যায়, অর্থাৎ এক লক্ষ কোটি, সেই সংখ্যা দিয়ে ৬.৬৭
সংখ্যাটিকে ভাগ দিলে যে ভাগফল পাওয়া যাবে, এই ধ্রুবকের মান সেটাই।
ভেবে দেখুন এত বড় একটি সংখ্যা দিয়ে ৬.৬৭ কে ভাগ দিলে ভাগফলটি কি
সাংঘাতিক ক্ষুদ্র হয়ে যায়!)। প্রশ্ন হলো, এই ধ্রুবকের মান কি নিউটন
নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন? না, এই ধ্রুবক প্রকৃতিরই সৃষ্টি,
মহাবিশ্বের জন্মলগ্নেই এই ধ্রুবক নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিলো, নিউটন
শুধু সেটা আবিষ্কার করেছিলেন। বিজ্ঞান এখন অনেকখানিই তত্ত্ব,
পরিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে, দার্শনিক দিকটি প্রায়
উপেক্ষিত _ ফলে এসব আলোচনা এখন আর হয় না বললেই চলে। নইলে
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতো, এই ধ্রুবকের মান এত ক্ষুদ্র কেন? কে
এই মানটি নির্ধারণ করে দিয়েছিলো _ সে প্রশ্নে না যাওয়াই ভালো, কারণ
এর কোনো উত্তর নেই। বিশ্বাসীরা হয়তো ঈশ্বরের কথা বলবেন, কিন্তু
আগেই বলেছি _ তাঁর সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না। তবে ধ্রুবকের
মানটি এত ক্ষুদ্র করে তৈরি করা হলো কেন সে প্রশ্ন নিশ্চয়ই উত্থাপন
করা যায়। যদি বলি এই মহাবিশ্বের পৃথিবী নামক অতি সামান্য একটি
গ্রহে একদিন প্রাণের উদ্ভব ঘটিয়ে তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান
নিশ্চিত করতেই এ কাজটি করা হয়েছিলো _ তাহলে কি খুব ভুল বলা হবে?
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে মাধ্যাকর্ষণ সূত্রটিও প্রকৃতিরই সৃষ্টি (নিউটন
শুধু সেটা আবিষ্কার করেছিলেন), এই আকর্ষণ বল না থাকলে মানুষ
পৃথিবীতে থাকতেই পারতো না, আমরা যে মাটিতে হেঁটে বেড়াচ্ছি তার কারণ
তো ওই আকর্ষণই, নইলে তো মহাশূন্যে অবস্থিত পৃথিবী থেকে আমরাও
মহাশূন্যেই ছিটকে পড়তাম! অন্যদিকে সূত্রটি কার্যকরী থাকলে বলের
পরিমাণ হতে পারে বৃহৎ, ফলে এমনভাবে ধ্রুবকটি পছন্দ করা হলো যেন
দু-কূলই রক্ষা হয় _ অর্থাৎ এই প্রাণীকূল যেন পৃথিবীতে বাস করতে
পারে পরস্পরের প্রতি কোনো আকর্ষণ বল অনুভব না করেই। আরেকটি কথা বলে
এই প্রসঙ্গ শেষ করি _ ধ্রুবকটির মান যদি অতখানি ক্ষুদ্র না হয়ে
আরেকটু বড় হতো তাহলে দুজন মানুষের মধ্যে আকর্ষণ বল হতো এতই প্রবল
যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকা তাদের পক্ষে অসম্ভব হতো, বরং
অপ্রতিরোধ্য এক টানে তারা পরস্পরের সঙ্গে লীন হয়ে যেত, কিংবা একজন
মানুষ চেয়ারে বসলে সেখান থেকে আর উঠতে পারতো না বা চায়ের কাপ ঠোঁটে
ছোঁয়ালে সেটাকে আর ঠোঁট থেকে সরাতে পারতো না! এইসব দুর্ঘটনা যেন না
ঘটতে পারে সে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো সেই সুদূরতম অতীতে _
মহাবিশ্বের জন্মলগ্নে। এমন উদাহরণ আরও বহু দেয়া যায় এবং বলা যায়
একথাই যে, আমাদের এই দৃশ্যমান (এবং দৃশ্যাতীত) মহাবিশ্ব প্রকৃতির
এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই ফসল। যে বিশ্ব এত পরিকল্পনা করে এত
সুশৃঙ্খলভাবে নির্মাণ করা হয়েছে তা নিছক 'মজা' করার জন্য, সেটা
মেনে নেই কী করে? মনে কি হয় না _ এর নিগূঢ় কোনো অর্থ আছে যার
পাঠোদ্ধার আজও সম্ভব হয় নি?
প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কথা হচ্ছিলো মহাজীবনের আদৌ কোনো অস্তিত্ব আছে
কী না, থাকলে বা না থাকলে প্রতিটি মানুষের এই ক্ষুদ্র জীবনের অর্থ
কী, আর কেনই বা এই জীবন সৃষ্টি করা হয় _ সেই প্রসঙ্গ নিয়ে।
অন্যদিকে মহাজীবনের অস্তিত্ব থাকলে মানুষ কেন তা অনুভব করে না?
প্রকৃতি কেন এই তথ্যটি মানুষের কাছ থেকে গোপন করে রেখেছে? আর যদি
প্রতিটি মানুষের জীবন একেকটি ফুলের মতো হয় যা একটি অনিন্দ্য-সুন্দর
মালার পূর্ণাঙ্গতা দানে ভূমিকা রাখে তাহলে মানুষ তার ক্ষুদ্র জীবন
নিয়ে বেদনাবোধ করে কেন, কেন মরে যেতে হবে এ কথা ভাবলে কষ্টে বুক
ভরে যায় প্রতিটি মানুষের, মৃতু্যকে নিয়ে কেন এত হাহাকার তার? কেন
সে ভাবে _ তার সমস্ত কীর্তি ও কর্ম, সমস্ত সাফল্য ও অর্জন, সমস্ত
ব্যর্থতা ও দায়ভার, সকল সুখ ও দুঃখ, সকল আনন্দ ও বেদনা রেখে যেতে
হবে মৃতু্য নামক কালো যবনিকার এপারে, আর ওপারে কী আছে সে সম্বন্ধে
আমরা কিছুই জানি না! মানুষের অস্তিত্বের সংকটটি আসলে এখানেই। তার
জীবন যে একটি মহাজীবনেরই অংশ, চাইলেই এটা ভেবে নেয়া যায় না। বরং
মানুষ তার নিজের জীবনটিকে বিবেচনা করে একটি পরিপূর্ণ জীবন হিসেবে
এবং সেটা স্বাভাবিকও _ যাপনের জন্য সে তো একটিমাত্র জীবনই পায়।
জীবন যদি ইউনিকই হয়, একটিই হয় তাহলে তো মৃতু্যতেই সব শেষ। জীবনকে
এভাবে দেখা হয় বলে জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের নানামাত্রিক চেষ্টা চলে
এবং সবক্ষেত্রেই ফলাফল হয় প্রায় একই _ মৃতু্যই যার শেষ কথা, সে
জীবন নিশ্চিতভাবেই অর্থহীন। মানুষের এই চিন্তা খুব ফেলে দেবার মতোও
নয় _ রবীন্দ্রনাথের নাম আমরা কোটিবার উচ্চারণ করি, সে তো আমাদের
নিজস্ব প্রয়োজনে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের তাতে কী আসে যায়? মৃতু্যর পর
কী হয় এ নিয়ে মানুষের প্রশ্ন-কৌতূহল ও অনুসন্ধান দীর্ঘদিনের। আগেই
বলেছি _ পৃথিবীতে প্রচলিত ধর্মসমূহ মৃতু্যর পরও একটি ভিন্নতর
জীবনের লোভ দেখিয়েছে, সে জীবন পাপের শাস্তি অথবা পূণ্যের
পুরস্কারের জীবন। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় নব্বইভাগ মানুষ কোনো না
কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হয়েও, ধর্মকথিত পারিলৌকিক জীবনের প্রতি
বিশ্বাস রেখেও ইহলৌকিক জীবন নিয়ে _ বলা ভালো এই পৃথিবীতে তার
অস্তিত্ব নিয়ে _ অসুখী বোধ করে কেন, কেন অস্তিত্বের অর্থ অনুসন্ধান
করতে চায়? তার কারণ হয়তো এই যে, মানুষ অবচেতনভাবে অনুভব করে _ এই
সমস্ত ধ্যান-ধারণা তার ওপর চাপিয়ে দেয়া, এগুলো কিছুই সে নিজে বেছে
নেয় নি _ এমনকি তার নিজের জীবনটিও তার নিজের বেছে নেয়া নয় ( মিলান
কুন্ডেরা যেমন বলেছিলেন _ ষরভব রং ধ ঃৎধঢ় বি্থাব ধষধিুং শহড়হি, বি
ধৎব নড়ৎহ রিঃযড়ঁঃ যধারহম ধংশবফ ঃড় নব, ষড়পশবফ রহ ধ নড়ফু বি হবাবৎ
পযড়ংব ধহফ ফবংঃরহবফ ঃড় ফরব _ আমরা আদৌ জন্মাতে চাই কী না সেটা
জিজ্ঞেস না করেই আমাদের জন্ম দেয়া হয়েছে, যে শরীরে আমাদের আবদ্ধ
করে রাখা হয়েছে সেটা আমরা নিজেরা বেছে নেই নি, এবং আমাদের জন্য
অবধারিত করে রাখা হয়েছে মৃতু্য)। প্রতিটি জীবন তাই এই চাপিয়ে দেয়া
মূল্যবোধ থেকে মুক্তি চায়, প্রতিটি জীবনই স্বাধীন হতে চায়, অথচ সে
আবিষ্কার করে _ জন্ম থেকেই সে শৃঙ্খলিত। ধর্ম-সমাজ-জাতীয়তার
পরিচয়চিহ্ন লেপ্টে দিয়ে প্রথমেই তাকে শৃঙ্খলিত করে ফেলা হয়। অথচ সে
শৃঙ্খলিত হতে চায় না, এই বিপুল মহাবিশ্বে সে তার ক্ষুদ্র
অস্তিত্বের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চালায়। কে আমি, কেন আমি,
কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি, কোথায় যাবো _ এইসব প্রশ্নের উত্তর তাকে
কেউ দেয় না, এমনকি ধর্মবর্ণিত উত্তরও বিশ্বাসীদের কাছে মনপূত হয়
না, সে নিজেও কোনোভাবেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না। উত্তর না
নিয়েই তাকে মরে যেতে হয়, তার অনুজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। মানুষ তাই
শেষ পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের দায় থেকে মুক্তি পায় না। সে
চলে যায় এ কথা না জেনেই যে, যত তুচ্ছই হোক না কেন তার জীবন, তার
সমস্ত কর্ম, এবং অস্তিত্বও, বহমান থাকবে মহাজীবনের মধ্যে দিয়ে,
কারণ মহাজীবন থেমে নেই, সে চলছে, চলবে। কতদিন চলবে, কতদিন চললে সে
সম্পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতা লাভ করবে কেউ তা জানে না।
নভেম্বর, ২০০৪ _ অক্টোবর, ২০০৫। |
| |
 |
|