Page loading ... Please wait.

মধ্যবিত্তের পরিচয়চিহ্ন
আহমাদ মোস্তফা কামাল
 

 প্রিন্ট
 
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং সংস্কৃতিচর্চায় নিবেদিত লোকজনের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি বকাবাজি শুনতে হয় যে শ্রেণীটিকে তার নাম মধ্যবিত্ত। যেভাবে এই শ্রেণীটিকে গালাগালি করা হয় তাতে মনে হতে পারে _ এরা একেকজন আপাদমস্তক ভিলেন, তা-ও বীরোচিত ভিলেন নয়, ভীরু-কাপুরুষ ভিলেন। অর্থাৎ ভিলেনদের মতো যাবতীয় কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র, ধান্ধাবাজি, বদমায়েশি এরা করে বেড়ায়, কিন্তু প্রকাশ্যে এগুলো করতে হলে যে সাহসটুকুর প্রয়োজন হয় তা এদের নেই। ফলে কাজগুলো করতে হয় গোপনে গোপনে, ভয়ে ভয়ে _ পাছে কেউ দেখে ফেলে; অনেক সময় কাকের মতো চোখ বন্ধ করে (কাক যেমন গৃহস্থের সাবান চুরি করার সময় নিজে চোখ বন্ধ করে থেকে ভাবে, কেউ তাকে দেখছে না!)। নিজের চোখ বন্ধ রেখে সারা পৃথিবীর চোখ বন্ধ আছে _ এমনটি ভাবার কাক-প্রতিম 'প্রতিভা' যেন শুধু মধ্যবিত্তেরই আছে! প্রগতিশীলদের কাছে এত বেশি গালাগাল এমনকি উচ্চবিত্তদেরও শুনতে হয় না, নিম্নবিত্তদের তো নয়ই। নিম্নবিত্তদের প্রতি এদের এক ধরনের 'সফট কর্নার' আছে _ তা থাকারই কথা, এদের তত্ত্ব-কর্ম তো নিম্নবিত্তদের নিয়েই। তাদের অপরাধগুলোও দেখা হয় সহানুভূতির চোখে, অর্থাৎ অপরাধ সে নিজের ইচ্ছেয় করে নি _ সমাজ করতে বাধ্য করেছে। অপরাধ কেউ-ই নিজের ইচ্ছেয় করে না, কে-ই বা শখ করে অপরাধী হতে চায়! প্রত্যেকটি অপরাধের পেছনেই _ খুঁজে দেখলে পাওয়া যাবে _ সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্তি্বক কারণ আছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের অপরাধসমূহ বর্ণনার সময় প্রগতিশীলরা এ কথা ভুলে যান _ যেন এই শ্রেণীটি স্বয়ম্ভু , যেন এদের ইচ্ছেতেই সবকিছু হয়, যেন এদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই এদেশে বিপ্লব আসি আসি করেও আসছে না!

২.
তা এই মধ্যবিত্তের অপরাধগুলো কি কি? যে কোনো প্রগতিশীল লেখকের এ সংক্রান্ত লেখা পড়লেই সেগুলোর সন্ধান পাওয়া যাবে। মধ্যবিত্তের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ _ এদের কোনো চরিত্র নেই, এরা সুবিধাবাদী _ অর্থাৎ যখন যেদিকে হাওয়া দেখে সেদিকেই পাল খাটায়। সুবিধাবাদী বলেই এরা গিরগিটির মতো ক্ষণে ক্ষণে রঙ পাল্টায়, কোনো রঙকেই দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না। ফলে এদের কোনো একটি রঙ দেখে কেউ যদি তাদেরকে ওই রঙের বলে চিহ্নিত করতে চান _ তাহলে নিশ্চিতভাবেই তিনি বিভ্রান্ত হবেন। এরকম রঙ-বদলপ্রয়াসী শ্রেণীটিকে স্বাভাববিকভাবেই ভন্ড হতে হয়। এরা যে কখন কী বলে, আর কখন কী করে, কখন এদের কোন জিনিসে বিশ্বাস ও আস্থা জন্মে, কখন সেই বিশ্বাস হারিয়ে গিয়ে তৈরি হয় অনাস্থা _ তা তারা নিজেরাই জানে না (এই যদি হয় অবস্থা তাহলে সেই শ্রেণীটিকে কীভাবে বিশ্বাস করা চলে?)। মধ্যবিত্তরা কিছু কিছূ মূল্যবোধ ও সংস্কার দ্বারা জীবনকে পরিচালিত করে এবং সমাজ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীকে সেগুলোর ভিত্তিতেই ব্যাখ্যা করতে চায়। এই মূল্যবোধগুলোর অধিকাংশই প্রগতির চাকাকে পেছনে ঠেলে দিতে চায়, সমাজের কোনো মৌলিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে এবং নিজেকে একটি অনড়, নিঃছিদ্র আবরণের মধ্যে নিরাপদে বন্ধ করে রাখতে চায়। ফলে বাইরের মুক্ত-উদার-প্রগতিশীল চিন্তার আলো-হাওয়া সেখানে আর ঢুকতে পারে না।

৩.
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই বকাবাজি বা সমালোচনাগুলো মধ্যবিত্তদের কান পর্যন্ত পেঁৗছায় না। যাদেরকে গালাগালিটা করা হচ্ছে তারা যদি সেটা না-ই বুঝলো (অন্য কারো তো বোঝার প্রশ্নই ওঠে না) তাহলে তা করে লাভ কী? ফলে এসব সমালোচনা তাদের কার্যকারিতা হারায়। এ প্রসঙ্গে কোনো এক ধর্ম-সংক্রান্ত গ্রন্থে পড়া একটি নীতিকথা মনে পড়ছে _ কাউকে অভিশাপ দিলে, বা কাউকে বকাবাজি করা হলে সেটা যদি তার জন্য প্রযোজ্য না হয় তাহলে সেই অভিশাপ বা বকাবাজি প্রাণ পেয়ে যায় এবং উপযুক্ত পাত্রের খোঁজে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে। শুধু পৃথিবীই নয় _ আকাশ-বাতাস-নক্ষত্রজগৎ অর্থাৎ পুরো মহাবিশ্বেই সে ভ্রমণ করে। কারণ তাকে কারো না কারো ওপরে বর্ষিত হতেই হবে _ এভাবে ঘুরে বেড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়! পুরো মহাবিশ্ব ভ্রমণ করার পরও যদি সে বর্ষিত হবার মতো উপযুক্ত পাত্র খুঁজে না পায় তাহলে সে তার উৎপত্তিস্থলে ফিরে আসে এবং অভিশাপ বর্ষণকারী ব্যক্তিটির ওপরই পতিত হয় (অতএব গালাগালি করা থেকে বিরত থাক!)। মধ্যবিত্তদের গালাগালি করার ক্ষেত্রে তেমনটিই ঘটে, তবে একটু অন্যভাবে। অর্থাৎ যিনি গালাগালিটা করেন, সেটা শেষ পর্যন্ত তার কাছে ফিরে আসে। ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

যেসব লেখায় মধ্যবিত্তদের গালাগালি করা হয় _ তার পাঠকরা মধ্যবিত্ত, যেসব সভায় তাদেরকে বকাবাজি করা হয় তার শ্রোতারাও মধ্যবিত্তই। অথচ এই পাঠক ও শ্রোতৃকূল ভাবেন বকাবাজিটা তাকে নয়, অন্য কাউকে করা হচ্ছে। এর কারণ কি? কারণ হলো _ যে সমালোচনাটা করা হচ্ছে, ওই পাঠক বা শ্রোতা নিজেকে সেটার উপযুক্ত বলে ভাবছে না। আরেকটি কারণও আছে _ যিনি সমালোচনাটা করছেন পাঠক-শ্রোতা তাকে আবিষ্কার করেন নিজেরই লোক বলে। অর্থাৎ ওই লোকটিও মধ্যবিত্ত। যতই সমালোচনা করুন _ ওই লেখক বা বক্তাও যে মধ্যবিত্তের বৃত্ত ভেঙে, মধ্যবিত্তের নিরাপদ সীমানা ডিঙ্গিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেন নি _ পাঠক-শ্রোতার তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ফলে একজন মধ্যবিত্ত যে তার নিজের শ্রেণীভূক্ত কাউকে এই ভাষায় গালাগালি, বকাবাজি বা সমালোচনা করতে পারেন এটা তাদের বিশ্বাস হয় না। কিন্তু এইসব সমালোচনায় 'মধ্যবিত্ত' শব্দটি বেশ ব্যাপকভাবে ও প্রবলভাবে থাকা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তরা সেটা নিজের গায়ে নেয় না কেন? কেন ভাবে যে, এই বকাবাজি অন্য কাউকে করা হচ্ছে? তাহলে কি সে তার নিজের শ্রেণীগত অবস্থান সম্বন্ধে সচেতন নয়? এ প্রসঙ্গে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর সংস্কৃতির ভাঙা সেতু প্রবন্ধে বলেছেন _ মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বড় অংশ নিজেদের সামাজিক ও শ্রেণীগত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। একজনের অবস্থান সমাজের কোন স্তরে, তিনি কি মধ্যবিত্ত না উচ্চবিত্তের অন্তর্ভূক্ত, মধ্যবিত্তের বিভিন্ন উপবিভাগগুলোর মধ্যে কোনটিতে তিনি বিরাজ করেন _ এ সম্বন্ধে তার কোনো স্পষ্ট বা অস্পষ্ট ধারনা নেই। আর সমস্যটা সেখানেই। নিজের শ্রেণীগত এবং সামাজিক অবস্থান সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় মধ্যবিত্তরা বুঝতে পারে না _ গালাগালিটা তাদেরকেই করা হচ্ছে। আর ধারণা থাকবেই-বা কীভাবে? সমস্যা তো ওই উপবিভাগগুলোই তৈরি করেছে। মধ্যবিত্ত কোনো শ্রেণী কী না _ আপাতত এই বিতর্কে না গিয়ে মধ্যবিত্তকে একটি শ্রেণী হিসেবে ধরে নিলে আমরা দেখবো, এই শ্রেণীটি সমরূপ নয়। এই শ্রেণীর মধ্যেই আছে আরো অনেক শ্রেণীবিভাগ বা উপশ্রেণী _ যেমন : উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্য-মধ্যবিত্ত (বা শুধুই মধ্যবিত্ত) এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত। এরকম উপশ্রেণী কিন্তু উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তদের বেলায় দেখা যায় না। উচ্চ-উচ্চবিত্ত বলে কোনো শ্রেণী নেই, যেমন নেই নিম্ন-নিম্নবিত্তও। উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীতে এই বিভাজন না থাকলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে তা আছে এবং বেশ প্রবলভাবেই আছে। এইসব উপশ্রেণীর মূল্যবোধ-সংস্কার-বিশ্বাস-আচার-ব্যবহারে অনেকখানি সাদৃশ্য থাকলেও জীবনযাপনে তারা বেশ খানিকটা আলাদা। নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জীবনযাপনের মধ্যে যেমন হা-হুতাশ, হতাশা, এবং নিম্নবিত্তের কাতারে চলে যাবার আতংক কাজ করে _ উচ্চ-মধ্যবিত্তের মধ্যে তা করে না। তাদের নিম্নবিত্তে পরিণত হবার আতংক নেই, আছে উচ্চবিত্ত শ্রেণীতে আরোহন করার স্বপ্ন-প্রত্যাশা এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় কূটকৌশল ও কর্মকাণ্ড। সবচেয়ে বিপদে থাকে মধ্য-মধ্যবিত্তরা (প্রকৃতপক্ষে এরাই মধ্যবিত্ত সমাজের পরিচয়চিহ্ন ধারণ করে থাকে)। তাদেরও স্বপ্ন-প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা উচ্চবিত্ত হবার, নিদেনপক্ষে উচ্চ-মধ্যবিত্তের মর্যাদা ভোগ করার, কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি তাকে ক্রমাগত নিম্ন-মধ্যবিত্তের দিকে ঠেলে দিতে থাকে। এর ফলে তারা থাকে এক ভয়ংকর দোদুল্যমান অবস্থায়। শুধু তাই নয়, নিম্ন-মধ্যবিত্তরা জীবনের প্রয়োজনেই কখনো কখনো মধ্যবিত্ত সমাজের অনড়-অচল মূল্যবোধ ও সংস্কারের বেড়াজাল পেরিয়ে ঢুকে পড়ে নিম্নবিত্তের মূল্যবোধের এলাকায়; আবার উচ্চ-মধ্যবিত্তরা উচ্চবিত্ত হবার আকাঙ্ক্ষায় কখনো কখনো উচ্চবিত্তের মূল্যবোধ ও জীবনযাপন-পদ্ধতি ধারণ করতে চায়, নিদেনপক্ষে অনুকরণ করতে চায় _ মধ্য-মধ্যবিত্তরা এর কোনোটাই পারে না। উচ্চ- ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের মধ্যে বিপরীত অর্থে নিজ শ্রেণীর সীমানা ডিঙ্গিয়ে যাবার প্রবণতা থাকলেও মধ্য-মধ্যবিত্তকে বাধ্য হয়েই পড়ে থাকতে হয় নিজের শ্রেণীর যাবতীয় ইতি- ও নেতিবাচকতা নিয়ে।

জীবনযাপন ও জীবনধারণ পদ্ধতি, সুযোগ ও সুবিধা _ এসবকিছুতে ব্যাপক পার্থক্য থাকার ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীভূক্ত এই উপশ্রেণীগুলো পরস্পরকে অপছন্দ করে _ একরকম ঘৃণাই করে বলা যায় (অন্য কোনো শ্রেণী নিজের শ্রেণীর লোকজন সম্বন্ধে এতটা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে না)। ফলে কোনো বুদ্ধিজীবী কতৃক কোনো বকাবাজি যখন এই শ্রেণীর ওপর বর্ষিত হয় তখন এই শ্রেণীভূক্ত একটি উপশ্রেণী ভাবে _ বকাবাজিটা তাকে নয়, অন্য কাউকে _ অর্থাৎ অন্য দুই উপশ্রেণীর যে কোনো একজনকে করা হচ্ছে। এরকম ভাবনায় তার সুবিধা হয়, সে নিরাপদে থাকতে পারে, স্বস্তি ও শান্তিতে থাকতে পারে _ সমালোচনাগুলো নিজের কাঁধে নিয়ে তাকে খামোখা পীড়িত হতে হয় না। অবশ্য মধ্যবিত্তরা যে এত সুস্পষ্টভাবে নিজেদের উপশ্রেণীগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে তা নয়, বরং কোন উপশ্রেণীতে তারা বাস করে সেটা নির্ধারণ করা তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার, সেটা তো আগেই বলেছি। সমস্যাটা শুধু তাদেরই নয়, যারা মধ্যবিত্তদের নিয়ে কথা বলেন, এইসব উপশ্রেণীগুলোকে কোনো না কোনোভাবে চিহ্নিত করতে চান _ সমস্যা তাদেরও। কী কী শর্ত পূরণ করলে একজন লোককে মধ্যবিত্ত বলা যাবে সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলাটা বেশ দুরূহ। তবু তাদেরকে কোনোভাবে কোনো একটি সংজ্ঞায় বাঁধা যায় কী না, আমরা সে চেষ্টা করে দেখতে পারি।

৪.
বলাবাহুল্য, শ্রেণীর সঙ্গে বিত্তের একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে _ উচ্চবিত্ত বলতেই যেমন প্রাচুর্যপূর্ণ বিত্তসম্পন্ন শ্রেণীটির কথা মনে আসে, নিম্নবিত্ত বলতেই যেমন বিত্তের অভাবে বিপর্যস্ত ও নিগৃহীত শ্রেণীটির চেহারা ভেসে ওঠে, মধ্যবিত্ত বললে সেরকম কোনো সুনির্দিষ্ট চেহারা ভাসে না। ফলে বিত্তের বিচারে কে যে মধ্যবিত্ত সেটাই নির্ধারণ করা দুস্কর হয়ে ওঠে। তবু বিত্তের বিচারে এই শ্রেণীটির একটি সংজ্ঞা দাঁড় করাতে চাইলে কেউ হয়তো বলবেন _ যে শ্রেণীর বিত্ত-সম্পদের পরিমাণ উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সম্পদের পরিমাণের মোটামুটি মাঝামাঝি অবস্থানে আছে তাকে বলা যায় মধ্যবিত্ত। এই সংজ্ঞা দিয়ে মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করা যাবে বলে মনে হয় না, কারণ দেশে দেশে মধ্যবিত্তের সম্পদের পরিমাণ ও জীবনযাপনের ধরন একই নয়। অর্থাৎ এমন কোনো আন্তর্জাতিক পরিমাপ নেই যা দিয়ে সব দেশের মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করা যায়। অন্য দুই শ্রেণীর বিত্তের সঙ্গে তুলনা করতে হলে আগে দেখতে হবে ঠিক কী পরিমাণ সম্পদ থাকলে একজনকে উচ্চবিত্ত বলা যাবে বা ঠিক কতোটুকু বিত্তহীন হলে তাকে আমরা নিম্নবিত্ত বলবো। এই বিবেচনায় একজন ইউরোপীয় বা আরব উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তের সম্পদের পরিমাণ আর বাংলাদেশের একজন উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তের সম্পদের পরিমাণ নিশ্চয়ই এক হবে না। উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত হবারও তো কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নেই! অতএব বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত আর আমেরিকান মধ্যবিত্ত এক জিনিস নয়। আর সমস্যাটা এখানেই। বিষয়টি অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয় বলে তারা একই তত্ত্ব দিয়ে দুই দেশের একটি শ্রেণীকে ব্যাখ্যা করতে চান এবং তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। বিভিন্ন দেশের মধ্যবিত্তদের সম্পদের পরিমাণ যেমন বিভিন্ন হতে পারে, তেমনই এই শ্রেণীতে সম্পদের বিভিন্নতার কারণে তৈরি হতে পারে বিভিন্ন উপশ্রেণী _ যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশে। এইসব উপশ্রেণীর অস্তিত্বই বলে দেয় যে, মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করার একমাত্র উপায় সম্পদ নয়। আরো কিছু আছে। অবশ্য অনেক লেখক বাংলাদেশে এই শ্রেণীর উদ্ভব আলোচনা করতে গিয়ে ব্রিটিশ শাসনামলে তৈরি হওয়া মধ্যসত্ত্বভোগী শ্রেণীটির কথা বলেছেন যারা কখনো উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকতো না, অথচ উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে থেকে সুবিধা লুটে নিতো (অর্থাৎ মধ্যবিত্তের জন্মই একটা সুবিধাভোগী শ্রেণী হিসেবে)। এখন অবশ্য সে চিত্রটি আর নেই। আগের দিনের মধ্যসত্ত্বভোগী মধ্যবিত্তের সঙ্গে আজকের দিনের একজন চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের তুলনাই চলে না। এমনকি চাকরিজীবী লোকটিকে ঠিক মধ্যসত্ত্বভোগীও বলা যায় না। সে-ও ভোক্তারই দলে। অতএব উদ্ভবকালের মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা এখন আর নেই। যাহোক, পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলছিলাম _ বিত্তই মধ্যবিত্তের একমাত্র পরিচহ্ন নয়, আরো কিছু বিষয় আছে। সেগুলো কি? দু-একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা করি। মধ্যবিত্ত শব্দটির সঙ্গে বোধহয় শহর বা নগরের একটা সম্পর্ক আছে, আমরা মোটামুটিভাবে ওই শব্দটি দিয়ে শহুরেদের কথাই বলি। কি রকম? ধরুন, এই আমাদের কথাই _ যারা এই শহরে বাস করছি, চাকরি বাকরি করছি, কিংবা টুকটাক ব্যবসা-বানিজ্য (যে ব্যবসা দোকানদারির ওপরে কোনোদিনই ওঠে না) করে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত আছি এবং সমাজে মধ্যবিত্ত বলে একটা পরিচিতি ও মর্যাদা পাচ্ছি তাদের সঙ্গে গ্রামের মোটামুটি স্বচ্ছল একজন কৃষকের তুলনা করা যেতে পারে। হয়তো ঐ কৃষকের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য আছে এবং সারা বছরে হয়তো তার কিছু উদ্বৃত্তও থাকে। জমিজমা-বাড়িঘর ইত্যাদির হিসাব নিলে বিত্তের বিচারে ওই কৃষক অবশ্যই একজন মধ্যবিত্ত। অন্যদিকে এই আমরা _ সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া মানুষ _ উদ্বৃত্তের কথা ভাবতেই পারি না, খানিকটা সঞ্চয়ের জন্য আমাদের রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়, তবু আমরাই মধ্যবিত্ত _ গ্রামের ওই কৃষকটি 'কৃষক'ই অথবা বড়জোর 'শ্রমজীবী'। আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা আমার দুজন বন্ধুর কথা বলবো আমি, ধরা যাক তাদের নাম লতিফ ও মতিন। এরা দুজনেই স্কুলে আমার সহপাঠী ছিলো। এদের একজন, লতিফ, ক্লাস এইট থেকেই স্কুল ছেড়ে দিয়ে শহরে আসে এবং ড্রাইভিং শিখে একটি বাসের হেল্পার-কন্ডাক্টর-ড্রাইভার (ক্রমান্বয়ে) হয়। এই ২০ বছরে সে নিজেই এখন একটি বাসের মালিক যেটি আবার সে নিজেই চালায়। আরেকজন, মতিন, স্কুলে বেশ ভালো রেজাল্ট করে ঢাকায় পড়তে আসে। অবর্ণনীয় কষ্ট করে সে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়ে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে চাকরি পায়। আমার এই দুই বন্ধুরই পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড একই রকম। উভয়ই দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। তবে গত ২০ বছরে গ্রামে এই দুটো পরিবারেরই সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। লতিফ একটি বাসের মালিকই শুধু নয় _ তার বাড়ির চেহারা ছবিও বেশ পাল্টে গেছে। নতুন ঘর উঠেছে, জমিজমা বেড়েছে, বেড়েছে তার বাবার হাত খরচও, বাজারে গিয়ে সে এখন বড় মাছটিও কিনে আনতে পারে এবং কখনো কখনো আনেও। অন্যদিকে মতিন, আমার ব্যাংকার বন্ধুটি, জীবনকে চালিয়ে নিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে _ বাড়িতে নতুন ঘর তোলা দূরে থাকুক, পুরনো ভাঙাচোরা ঘরগুলোও মেরামত করা হয় না। মা-বাবার শখ-আহ্লাদ মেটানো দূরে থাক, দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য তাকে সন্ধ্যার পর টিউশনি করতে হয়! আমি আমার এই দুই বন্ধুর উদাহরণ টেনেছি _ তাদের বিত্ত ও মর্যাদার ব্যাপারটি তুলনা করার জন্য। বিত্তের বিচারে লতিফ মধ্যবিত্ত, যেহেতু সে-ই ভালো অবস্থানে আছে, একই বিচারে মতিন কিন্তু নিম্নবিত্ত। কিন্তু সমাজে মতিন পায় মধ্যবিত্তের মর্যাদা, লতিফ তা পায় না। গ্রামে এই চিত্রটি আরো প্রকট। লতিফের মর্যাদা লাভের চেষ্টা প্রায় দৃষ্টিকটু _ বাজারে গিয়ে তাকে বড় মাছটি কিনতে হয়, কোরবানীর সময় বড় সড় একটা গরু ঢাকঢোল পিটিয়ে কোরবানী দিতে হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্যদিকে মতিন এসবের কিছুই করে না, কিন্তু গ্রামের মানুষ এই দুজনের মধ্যে মতিনকেই আগে চেয়ারটি এগিয়ে দেয়; যে কোনো আয়োজনে, অনুষ্ঠানে, যে কোনো বুদ্ধি-পরামর্শের জন্য মানুষ মতিনের কাছেই আসে। প্রশ্ন হচ্ছে _ বিত্তের বিচারে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও সমাজ লতিফকে মধ্যবিত্তের মর্যাদা দেয় না কেন? কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, কোন জিনিসটি মতিনকে এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে? মতিনের শিক্ষা? হঁ্যা, শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু শিক্ষা সম্ভবত সামাজিক মর্যাদা লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। মতিন যদি কেবল 'শিক্ষিত'ই হতো, রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকের সিনিয়র অফিসারের মতো একটি 'বড়ো চাকরি' না পেতো, তাহলে কি তার পক্ষে এই মর্যাদা লাভ সম্ভব হতো? না হতো না। হতো যে না, তার একটি উদাহরণও দেয়া যায়। একবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প নামে একটি কার্যক্রম চালু করা হয়েছিলো, যার উদ্দেশ্য ছিলো শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এই কার্যক্রমের আওতায় ঢাকার রাস্তায় অনেকগুলো বাস নেমেছিলো _ সম্ভবত সবার তা চোখে পড়েছে। এইসব বাসের চালকরা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু বাসযাত্রীরা এবং সমাজের অন্যান্য মানুষ তাদেরকে কখনোই একজন বাস ড্রাইভারের চেয়ে বেশিকিছু ভাবে নি, তারচেয়ে বেশি কোনো মর্যাদা দেয় নি। অথচ এই ড্রাইভারটির যে সহপাঠী কোনো উচ্চপদে চাকরি করেছে তাকে ঠিকই মর্যাদাপূর্ণ আসনটি ছেড়ে দিতে দ্বিধা করে নি। তাহলে দেখা যাচ্ছে শুধু শিক্ষা হলেই চলে না, চাই একটি ভালো চাকরিও, এমনকি আজও আমাদের সমাজ শিক্ষিত যুবকদের ব্যবসা করাটাকে ভালো চোখে দেখে না। অর্থাৎ বিত্ত-শিক্ষা ছাড়াও সমাজে একটি মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বশীল অবস্থান মধ্যবিত্ত হওয়ার অনেকগুলো উপাদানের অন্যতম একটি উপাদান। তাহলে কি বিত্ত, শিক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক অবস্থান দিয়েই এই শ্রেণীকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার একমাত্র উপায়? এখানে সঙ্গত কারণেই নারীদের প্রসঙ্গ এসে যায়। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার বলে যাদেরকে চিহ্নিত করি, সেসব পরিবারের বেশিরভাগ নারীরই উচ্চশিক্ষা নেই, তারা কোনো সম্পদের বা বিত্তের মালিক নন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত নন, এমনকি অনেকক্ষেত্রে তাদের কোনো আলাদা আইডেন্টিটি নেই _ স্বামী বা বাবার পরিচয়ে তাদেরকে পরিচিত হতে হয় _ তাহলে তাদেরকে কীভাবে মধ্যবিত্ত বলা যাবে, কেনই-বা বলা হয়? কোনো বিচারেই তো তারা এই শ্রেণীতে পড়েন না, তাহলে? এর কারণ অনুসন্ধান করতে হলে আমাদেরকে আরো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। সেটি হলো মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ। প্রকৃতপক্ষে এই মূল্যবোধই মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এবং এই মূল্যবোধগুলো মধ্যবিত্ত পুরুষদের চেয়ে নারীরা অনেক কঠোরভাবে ধারণ করে থাকেন। পুরুষরা অনেকসময় এসব ঝেড়ে ফেলতে চায়, বিশেষ করে যারা মধ্যবিত্তের সীমানা ডিঙিয়ে উচ্চবিত্তের এলাকায় ঢুকতে চায়, তাদের জন্য এই ঝেড়ে ফেলাটা খুবই জরুরী কিন্তু তারা প্রথম বাধাটা পায় নারীদের কাছ থেকেই _ মা, বোন, স্ত্রী, এমনকি কন্যার কাছ থেকেও। যাহোক এ প্রসঙ্গে একটু পরে কথা বলা যাবে। তার আগে বলা দরকার যে, মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় সম্পদ এই মূল্যবোধ। এই শ্রেণীর মূল্যবোধ-নীতিবোধ-ঔচিত্যবোধ সবই বহু ভুলভ্রান্তি, স্ববিরোধিতা ও পরস্পরবিরোধিতায় ভরা; শুধু তাই নয় _ এগুলো প্রায় ভাঙাচোরা, জোড়াতালি মারা। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে, যেমনই হোক এদের একটা মূল্যবোধ আছে। কথাটা অবশ্য কেমন যেন শোনায়, কারণ মূল্যবোধ সব শ্রেণীরই থাকে _ তাদের নিজেদের মতো করে, হতে পারে তা মধ্যবিত্ত-মূল্যবোধের মতো নয় _ অন্যরকম, কিন্তু অন্যরকম মানে তো খারাপ নয়! কিন্তু তা সত্ত্বেও মূল্যবোধের কথা উঠলেই মধ্যবিত্ত-মূল্যবোধের কথা মনে পড়ে কেন? পড়ে কারণ _ এই শ্রেণীর অন্তর্গত চিন্তাশীল অংশটি বেশ জোরেশোরে তাদের মূল্যবোধের কথা বলে, ফলাও করে প্রচার করে, মূল্যবোধে সংযোজন-বিয়োজন ঘটায়, এসবের পক্ষে প্রবলভাবে দাঁড়ায়, ব্যাখ্যা করে, কোথাও এতটুকু ব্যাত্যয় দেখলো গেলো গেলো বলে রব তোলে এবং এসব মূল্যবোধগুলোকেই জগতের পক্ষে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় (এবং অনিবার্য এবং অনস্বীকার্য) মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। অন্য শ্রেণীর লোকজন তা করে না। এরা এতটাই সোচ্চার ও দৃঢ়কণ্ঠ যে, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত শ্রেণীও তাদের কথায় আস্থা রেখে সেই মূল্যবোধকেই সত্য হিসেবে ধরে নেয়। তারা যা বলে তার কতটুকু তারা নিজেরা পালন করে সেটা অবশ্য একটি সঙ্গত প্রশ্ন, এবং সে প্রশ্নের যথাযথ উত্তর কেউ না পেলেও একথা বলা যায় যে, তারা একটি ব্যাপারে তুমুলভাবে সফল হয়েছেন _ নিজেদের কথাগুলো তারা বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পেরেছেন। ফলে, এমনকি, উচ্চবিত্তরা সমাজের সবচেয়ে সুবিধাজনক ও ক্ষমতাশালী অবস্থানে থাকলেও নিজেদের নিজস্ব মূল্যবোধগুলোর কথা জোরেশোরে বলার সাহস পায় না। জোরেশোরে দূরে থাক, নিম্নকণ্ঠেও বলে না _ বরং তাদের আদৌ কোনো ভিন্ন রকমের মূল্যবোধ আছে কী না কেউ তা জানতেই পারে না। সমাজের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার ফলে তাদেরকে নানা সভা সমাবেশে যেতে হয়, প্রিন্ট মিডিয়ায় নানান বাণী দিতে হয়, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চেহারা দেখাতে হয় (বস্তুত এগুলো তাদেরই সম্পত্তি) আর এসব জায়গায় গিয়ে তাদেরকেও মূল্যবোধ, নীতিবোধ, উচিত-অনুচিত ইত্যাদি নিয়ে কিছু কথা বলতে হয়, কিন্তু মজার বিষয় হলো _ তারা যা কিছু বলে তা-ও মধ্যবিত্তদের শিখিয়ে দেয়া, নিজেরা যে মধ্যবিত্তের সীমানা ডিঙ্গানোর সময় এসবকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছিলো (অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একথা বলা যায় যে, এদেশের উচ্চবিত্তরা মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে এসেছে, এবং এই রূপান্তরের জন্য তাদেরকে মূল্যবোধ-বিরোধী অনেক কাজ করতে হয়েছে। অন্তত আমাদের উচ্চবিত্তদের উচ্চবিত্ত হবার পেছেনে একটা না একটা লুটের বা চুরির বা ডাকাতির বা লাম্পট্যের গল্প আছেই। কেউ সৎপথে বড়লোক হয় নি, অন্তত এদেশে), সেটা তারা এমনভাবে চেপে যায় যে, মনে হয়, এটা নিয়ে তাদের মধ্যে অপরাধবোধ রয়েছে। অন্যদিকে নিম্নবিত্তেরও কিছু মূল্যবোধ আছে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে তাদের মধ্যে কথা বলার কেউ নেই। এখানটায় উচ্চ- ও নিম্নবিত্তের মধ্যে চমৎকার মিল আছে _ উভয়েরই কথা বলা জন্য বুদ্ধিজীবী নেই। বুদ্ধিজীবী আছে কেবল মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে, অন্য কোনো শ্রেণীর তা নেই _ মধ্যবিত্তকে চিহ্নিত করার আরেকটি চিহ্ন পাওয়া গেলো।

৫.
তো, এই মধ্যবিত্তের পরিচয়-বৃত্তান্তটাও একটু জেনে নেয়া যাক। কারা এরা, এলোই-বা কোত্থেকে? একথা সবাই জানেন যে, বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে মধ্যসত্ত্বভোগীরাই এই শ্রেণীর জন্ম দিয়েছিলো এবং এই অঞ্চলে এই শ্রেণীর জন্ম ও প্রাথমিক বিকাশ ঘটে মূলত হিন্দুদের মধ্যে। তাহলে এদেশের মুসলমান মধ্যবিত্ত এলো কোত্থেকে? বাংলাদেশে এই শ্রেণীর জন্ম একটু ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। '৪০-এর দশকে দেশভাগের ফলে হিন্দু মধ্যবিত্তরা দেশত্যাগ করলে নানা ক্ষেত্রেই একটি শূন্যতা তৈরি হয় এবং বাঙালি মুসলমানরা ব্যাপারটাকে গ্রহণ করে একটি সুযোগ হিসেবে। নিরক্ষর কৃষকরা তাদের সন্তানদেরকে স্কুল-কলেজে পাঠাতে শুরু করেন। তাদের আশা ছিলো _ এই সন্তান শিক্ষিত হয়ে চাকরি বাকরি করবে _ 'বড় অফিসার' হবে, 'ভদ্রলোক' হবে। তাদের সেই আশা পূরণও হয়েছিলো, কিন্তু সমস্যা বাঁধলো অন্য জায়গায়। কৃষকের সন্তান হঠাৎ করে ভদ্রলোকে পরিণত হলে এবং মধ্যবিত্তের জীবনযাপন শুরু করলে তাদের পক্ষে পিতৃপরিচয়টিই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। কারণ বাপ-মা-ভাইবোন বা অন্য আত্নীয়স্বজন তাদের 'মর্যাদা' কমায় বৈ বাড়ায় না। ফলে পিতৃ-মাতৃকুলের সঙ্গে তারা একটি ইচ্ছেকৃত দূরত্ব তৈরি করে নিলো। কৃষকের সন্তানেরা চাকরি-বাকরি করে ভদ্রলোক হবার চেষ্টা করেছিলো এবং যথাসম্ভব দ্রুত নিজেদের শরীর থেকে মাটির গন্ধ মুছে ফেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু এই কাজে তারা পুরোপুরি সফল হয়েছিলো তা বলা যাবে না। যতই চেষ্টা করুক না কেন, হাজার হলেও মা-বাপ, তাদেরকে একেবারে অস্বীকার তো করা যায় না! তবে এই মধ্যবিত্তদের প্রথম প্রজন্ম নানাবিধ কারণে নিজেদের অতীতকে পুরোপুরি অস্বীকার না করতে পারলেও, দ্বিতীয় প্রজন্ম তা অনেকখানিই করেছিলো এবং তৃতীয় প্রজন্মে এসে এই অস্বীকৃতি পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তারা ভুলেই গেছে যে তাদের পূর্বপুরুষ কোনো একসময় কৃষক ছিলো। অর্থাৎ একজন কৃষকের পুত্র ভদ্রলোকে পরিণত হবার পর নিজের বাপ-মাকে অস্বীকার না করতে পারলেও, তার পুত্র অর্থাৎ ওই কৃষকের নাতির জন্য তার দাদাকে অস্বীকার করাটা খুব বেশি অসম্ভব নয়, তবে আফটার অল দাদা তো, তাই পুরোপুরি অস্বীকার সে করে না, কিন্তু তার পুত্র অর্থাৎ ঐ কৃষকের পৌপুত্রের জন্য কৃষকের অস্তিত্ব স্বীকার করবার কোনো প্রয়োজনই নেই। আমাদের দেশে এই ঘটনাটিই ঘটেছে। ৩/৪ পুরুষ ধরে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাউকে খুব শক্ত করে ধরে আপনি যদি জেরা করতে থাকেন, তাহলে তারা একসময় হয়তো স্বীকার করবে যে, তাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ গ্রামে বাস করতেন বটে, তবে তিনি মোটেই কৃষক ছিলেন না, ছিলেন জমিদার! একসময় যেমন মুসলমান সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজন দাবি করতেন যে, তাদের পূর্বপুরুষরা আরব থেকে এসেছেন _ এই দাবিটিও সেরকম। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠবে সবার পূর্বপুরুষই যদি জমিদার ছিলো তাহলে কৃষক ছিলো কে? কিংবা বাংলাদেশে মোট জমিদারের সংখ্যাই-বা কত ছিলো? কতই-বা ছিলো মুসলমান জমিদারের সংখ্যা? ১০/১২ বছর আগেও আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন অন্তত ৫০% ছাত্র আসতো গ্রাম থেকে _ মূলত কৃষক পরিবার থেকে, কিন্তু পারতপক্ষে তারা সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করতো না, প্রসঙ্গ উঠে গেলে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতো, নাছোড়বান্দার মতো কেউ লেগে থাকলে স্বীকার করতো বটে যে সে গ্রাম থেকেই এসেছে _ কিন্তু সেখানে তার বাবা বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক। ঘনিষ্ট বন্ধুরা ছাড়া কেউ আসল সত্যটা জানতে পারতো না। এই অবস্থা এখনও চলছে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অন্তত শতকরা ৫০ ভাগ ছাত্রই গ্রাম থেকে আসে, কিন্তু সেটা তারা স্বীকার করে না। এ অবস্থায় আপনি যদি এ নিয়ে সেখানে জরিপ চালান, তাহলে নিশ্চিতভাবেই ভুল এবং বিভ্রান্তিকর ফলাফল পাবেন। এমন একটি জরিপ নিয়ে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে তর্ক বেঁধেছিলো। জরিপের ফলাফল বলছিলো যে, এখন শতকরা ১০ ভাগ ছাত্রও গ্রাম থেকে আসে না। আমি বললাম এটা অসম্ভব। ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বলার পরও সে বাস্তব অবস্থাটা স্বীকার করে নি। বরং আমার অজ্ঞতা ও মুর্খতা নিয়ে, এবং জরিপের মহান ফলাফলের প্রতি আমার মুর্খসুলভ অনাস্থা দেখে করুণা ও বিদ্রুপের হাসি হেসেছে। আমার এই বন্ধুটি হচ্ছে বই পড়া বুদ্ধিজীবী। জীবনেও কোনোদিন সে তার চারপাশে তাকিয়ে দেখে নি। সে-ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কিন্তু কোনোদিন কাছের বন্ধুটিরও ব্যক্তিগত জীবন জানার চেষ্টা করে নি। তার কাছে সে-ই তার পৃথিবী, অর্থাৎ সে যা ভাবছে অন্য সবাইও নিশ্চিতভাবেই তাই ভাবছে, সে যেরকম পরিবার থেকে এসেছে অন্যরাও নিশ্চিতভাবেই তেমন পরিবার থেকেই এসেছে। কোনোরকম উস্মা প্রকাশের জন্য আমি এই বন্ধুটির কথা উল্লেখ করছি না, করছি এটা বোঝাতে যে _ জনজীবনের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন এই শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের হাতে পড়ে আমাদের চিন্তার জগৎটি কেমন একপেশে তত্ত্বনির্ভর-পরিসংখ্যাননির্ভর-বইনির্ভর হয়ে পড়েছে; যার ফলে আসল সত্য কোনোদিনই আমাদের জানা হয়ে ওঠে না। যাহোক, দেখা যাচ্ছে _ মধ্যবিত্তরা, কিংবা মধ্যবিত্ত হবার প্রক্রিয়ার ভেতরে আছে এমন লোকেরা নিজেদের শেকড়কে অস্বীকার করতে চায় _ এটি মধ্যবিত্তদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য। যেমন, আমাদের মধ্যবিত্তরা ভুলে গেছে তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন এদেশের খেটে খাওয়া মানুষদেরই একজন, আর ভুলে গেছে বলেই নিম্নবিত্তদের সম্বন্ধে অত্যন্ত নিচু ধারণা পোষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়।

৬.
এবার এদের চরিত্রটা একটু বুঝে নেয়া দরকার। আগেই বলেছি _ মধ্যবিত্তদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাদের মূল্যবোধ। এরা মূল্যবোধ তৈরি করে _ এই মূল্যবোধ অবশ্যই নিজেদের স্বার্থে, নিজেদের মতো করে। মধ্যবিত্ত হবার জন্য যেহেতু শিক্ষা একটি অপরিহার্য মাধ্যম _ এদের চরিত্র বোঝার জন্য তাই বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থাটাও বুঝে দেখা দরকার। আমি শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক ইত্যাদিকেই বোঝাচ্ছি না। শিক্ষা লাভের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বটে, কিন্তু এ-ও সত্য যে, শিক্ষাটা শুধু প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে আরো বহু ধরনের বই থেকে, মিডিয়া _ অর্থাৎ রেডিও-টেলিভিশন-সংবাদপত্র-নাটক-সিনেমা ইত্যাদি _ থেকেও একজন মানুষ নানারকম শিক্ষা লাভ করে থাকে। এসবকিছু বিবেচনায় আনলে আমরা দেখতে পাবো _ আমাদের পরিবারগুলো, বিদ্যমান সমাজকাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপকরণগুলো (বই-পুস্তক, শিক্ষক, ক্লাসরুম, পরিবেশ ইত্যাদি), মিডিয়াগুলো (আগেই বলেছি অধিকাংশ মিডিয়ার মালিক উচ্চবিত্ত হলেও সেসব দখল করে আছে মধ্যবিত্তরা এবং তারা প্রচার করছে মধ্যবিত্তেরই মূল্যবোধ) একজনকে কেবলই মধ্যবিত্ত হবার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। একজন দরিদ্র পিতা যখন তার সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলার স্বপ্ন দেখেন তখন একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখেন যে, তার পুত্র শিক্ষিত হয়ে 'বড় অফিসার' হবে, 'ভদ্রলোক' হবে। এই ভদ্রলোক কিন্তু মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক। অর্থাৎ তার সামনে আদর্শ ও স্বপ্ন বলতে মধ্যবিত্তরাই আছে এবং সে সফলভাবে এই স্বপ্ন সন্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করতে পেরেছে, ফলে পুত্রটিও কেবল মধ্যবিত্তই হতে চায়। শুধু পরিবার কেন _ স্কুলের প্রথম বইটি তাকে নীতিবাক্য শেখায় _ সদা সত্য কথা বলিবে, অসৎসঙ্গ পরিত্যাগ কর ইত্যাদি _ এগুলোও মধ্যবিত্তেরই নীতিবাক্য। এই সত্য মধ্যবিত্তের সত্য, এই সৎ-অসতের সংজ্ঞাটিও মধ্যবিত্তেরই তৈরি। তারচেয়ে বড় কথা _ সদা সত্য কথা বললে বা অসৎসঙ্গ পরিত্যাগ করলে বড়জোর মধ্যবিত্তই হওয়া যাবে, কোনোভাবেই উচ্চবিত্ত হওয়া যাবে না। শুধু পাঠ্যপুস্তকই নয়, যাঁরা এইসব নীতিবাক্য খুব মন দিয়ে শেখান সেই শিক্ষকরাও মধ্যবিত্ত। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টেবিল-চেয়ারগুলো পর্যন্ত (অর্থাৎ পরিবেশের যাবতীয় অনুষঙ্গ) তাকে মধ্যবিত্তই হতে বলে। কি রকম? তুমি এই হও, সেই হও, হলে তুমি মর্যাদা পাবে। সেই মর্যাদা আবার মধ্যবিত্তের সীমা ছাড়ায় না। আজ পর্যন্ত কোনো পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, মা-বাবা, বইপুস্তক কাউকে উচ্চবিত্ত হওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে বলে আমার জানা নেই। বরং সিনেমা নাটকে, গল্প-উপন্যাসে উচ্চবিত্তদের চিত্রিত করা হয় রীতিমতো ভিলেন হিসেবে, উচ্চবিত্তদের নিয়ন্ত্রাধীন মিডিয়াগুলো যে ভাষায় উচ্চবিত্তদের নিন্দনীয় কীর্তিকাহিনী তুলে ধরে তা অন্য কোনো শ্রেণীর ক্ষেত্রে করে না। মধ্যবিত্তের চিন্তাশীল অংশটি অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা তো এ বিষয়ে রীতিমতো সোচ্চার। তারা একদিকে যেমন উচ্চবিত্তদের গালাগাল করে, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত হবার জন্য কিংবা থাকার জন্য নানারকম যুক্তিতর্কের ও রীতি-নীতির অবতারণা করে। আগেই বলেছি _ মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা তার শ্রেণীকে অনড় একটি অবস্থানে দেখতে চান।

মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে তার শ্রেণীকে নীতি শেখান তার একটা উদাহরণ দেয়া যাক। মহান গল্পকার-ঔপন্যাসিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নিজে মধ্যবিত্ত হয়েও মধ্যবিত্তদের সমালোচনায় ছিলেন মুখর, নিজেও সারা জীবন ধরে মধ্যবিত্তদের অনড়-অচল মূল্যবোধের সীমানা ডিঙিয়ে চলে যেতে চেয়েছেন, এবং এইসব রীতি-নীতিকে তীব্রভাবে আঘাত করেছেন। কিন্তু এসব করতে গিয়ে তিনি নিজেই যে বেশকিছু মূল্যবোধের জন্ম দিচ্ছেন, সেটা হয়তো খেয়ালও করেন নি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন _ সাধারণ মানুষ যে ভালোভাবে বাঁচবে এটা আমি কোনো নীতিবোধ থেকে বলিনা _ বলি কাণ্ডজ্ঞান থেকে; সাম্যের সমাজ চাওয়াও কাণ্ডজ্ঞানেরই চাওয়া। _ বলাইবাহুল্য তিনি যে কাণ্ডজ্ঞানের কথা বলেন তা মধ্যবিত্তেরই কাণ্ডজ্ঞান। উচ্চবিত্তের এই কাণ্ডজ্ঞান থাকার প্রশ্নই আসেনা, কারণ তা তাদের শ্রেণীস্বার্থের বিপক্ষে যাবে, নিজের শ্রেণীর ধ্বংস ডেকে আনবে। আবার এমন কাণ্ডজ্ঞান যে থাকতে পারে বা থাকা উচিৎ নিম্নবিত্তরা তা ভাবতেই পারেনা, এমনকি কল্পনাও করে না বা কল্পনা করার সাহস পায়না। মধ্যবিত্তের এই যে কাণ্ডজ্ঞান তাকে কি আপনি ভালো বলবেন না খারাপ বলবেন? যদি ভালো বলেন তাহলে আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে, মধ্যবিত্তরা এমন কিছু কাণ্ডজ্ঞান বা মূল্যবোধ বা নীতিবোধ তৈরি করে যা নিজ শ্রেণীর সীমানা ডিঙিয়ে অন্য শ্রেণীর জন্যও কল্যাণকর বলে বিবেচিত হয়। এখানটায় এসে মধ্যবিত্তদের প্রশংসা না করে পারা যায় না। যুগ যুগ ধরে এরা এইসব মূল্যবোধের কথা বলে আসছে। সততা, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়নতা, দেশপ্রেম, মানবকল্যাণ ইত্যাদি নিয়ে মধ্যবিত্ত চিন্তাবিদদের চিন্তার অন্ত নেই। এবং বিষয়গুলো তারা নিজ শ্রেণীর মধ্যে এমনভাবে ঢুকিয়ে দিতে পারে যে, সবকিছুর চেয়ে এগুলোই তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে, এবং শুধু তত্ত্বেই নয়, বিষয়টি তারা প্র্যাকটিসও করে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। বাংলাদেশের সমস্ত গণআন্দোলনে মধ্যবিত্তদের অংশগ্রহণ ছিলো চোখে পড়ার মতো। সত্যি বলতে কী _ '৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে '৯০-এর গণআন্দোলন পর্যন্ত সবই পরিচালিত হয়েছে মধ্যবিত্তদেরই নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে। আরো পরিস্কার ভাবে বলা যায় '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া অন্য সবগুলো আন্দোলন আসলে মধ্যবিত্তদেরই আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধে আপামর মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও এর পটভূমি তৈরি করেছিলো মধ্যবিত্তরা এবং এর নেত্বত্বেও ছিলেন মধ্যবিত্তরাই। এইসব আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধ মধ্যবিত্তরা কেবল নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার জন্যই করেছে এমনটি ভাবা খুব ভুল হবে। এর মধ্যে দেশপ্রেম ছিলো, ছিলো জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, মানুষের জন্য কল্যাণচিন্তা। এই ভাবনা-চিন্তাগুলো তাদের মধ্যে এতটাই প্রবল ছিলো যে, নিজেদের প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করতে দ্বিধা করে নি তারা। মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া অন্যান্য আন্দোলন সংগ্রামগুলোতে যারা প্রাণ দিয়েছে তাদের প্রায় ৯৯ ভাগই মধ্যবিত্ত। যারা মধ্যবিত্তদের বাছবিচারহীনভাবে গালাগালি করেন তারা এই বিষয়টি ভুলে যান। এদের ইতিবাচক কোনোকিছুই তারা খুঁজে পান না, পেলেও প্রশংসা করতে দারুণ কার্পন্য করেন, যদিও এই প্রশংসা তাদের প্রাপ্য। মধ্যবিত্তরা, বিশেষ করে এই শ্রেণীর তরুণ অংশটি, যখন নিজ শ্রেণীর মূল্যবোধগুলোকে তীব্রভাবে ধারণ করে, তখন তারা কী ঘটিয়ে ফেলার ক্ষমতা অর্জন করে তার প্রমাণ তারা রেখেছে ভাষা আন্দোলনে, শিক্ষা আন্দোলনে, ৬৯-এর গণঅভু্যত্থানে, মুক্তিযুদ্ধে এবং ৯০-এর গণআন্দোলনসহ অন্যান্য আন্দোলন ও সংগ্রামে। প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তারা নিরংকুশ বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু এই সঙ্গে এ-ও বলা দরকার যে, তারা তাদের এই বিজয় ধরে রাখতে পারে নি। যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে তারা আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলো, বিজয় অর্জিত হবার পর তারা আবিষ্কার করে _ এই বিজয় ছিনতাই হয়ে গেছে, এবং যারা ছিনতাই করেছে তারাও তাদেরই শ্রেণীর লোক। মধ্যবিত্তরা কী পরিমাণ সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে তার প্রমাণও তারা রেখেছে মুক্তিযুদ্ধের পর ব্যাপক লুটতরাজ-চুরি-ডাকাতি-কালোবাজারি-রাহাজানি-ছিনতাই করে। ওই সময় জনগণের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার বারোটা বাজিয়ে তারা নিজেরা ফুলে ফেঁপে বিকট চেহারা ধারণ করেছে, এতটাই বিকট যে তাকে আর মধ্যবিত্ত বলে চিহ্নিতই করা যায় না। একই ঘটনা একটু সীমিত আকারে হলেও ঘটেছে '৯০-এর গণআন্দোলনের পর। তবে বলা দরকার _ যে মধ্যবিত্ত যুদ্ধ করেছিলো আর যে মধ্যবিত্ত এই লুটতরাজে অংশ নিয়েছিলো তারা একই মধ্যবিত্ত নয়। বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা হয়তো কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাবো।

৭.
আগেই বলেছি মধ্যবিত্তের চিন্তাশীল অংশটি অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা যুগ যুগ ধরে সততা, সত্যবাদিতা, ন্যয়পরায়নতা, দেশপ্রেম, মানবকল্যাণ ইত্যাদি মূল্যবোধ সৃষ্টি ও তা রক্ষা করার উপায় নিয়ে কথা বলে আসছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এসব নীতিবাক্য প্রায়ই মাঠে মারা যাচ্ছে। যাঁরা এগুলো বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, স্বয়ং তাঁদের সন্তানরাই এগুলোর থোড়াই কেয়ার করে। তারা সত্যবাদিতাকে নিয়ে হাসাহাসি করে, সততাকে মনে করে বোকামী, ন্যায়পরায়নতাকে মনে করে দুর্বলতা আর দেশপ্রেমকে মনে করে কুপমণ্ডকতা। এর কারণ কি? কারণ হচ্ছে _ মধ্যবিত্তের প্রথম জেনারেশনে এসব নীতিবাক্য বেশ কাজ দিলেও, দ্বিতীয় প্রজন্মই এর মধ্যেকার ফাঁকফোকরগুলো ধরে ফেলে এবং আবিষ্কার করে যে, একটু চালাকচতুর হলে আর এসব মূল্যবোধকে খানিকটা সরিয়ে রাখতে পারলেই মধ্যবিত্তের সীমানা ডিঙ্গিয়ে উচ্চবিত্তের উজ্জ্বল জগতে প্রবেশ করা যায়, ওপরে ওঠা যায় (দেখা যাচ্ছে, যারা ওপরে উঠতে চায় তারাই এসব মূল্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখায়। মধ্যবিত্তের এই অংশটিই স্বাধীনতার পর নীতিহীন লুটতরাজে অংশ নিয়েছিলো।) এবং ওপরে ওঠার সিঁড়িটি যে খুবই সরু, একসঙ্গে একজনের বেশি ওই সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যায় না, সে অচিরেই সেটাও আবিষ্কার করে ফেলে। ফলে প্রথমেই তাকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়, ওঠার সময় পেছন থেকে কেউ তার পাশে আসার চেষ্টা করলে সে তাকে কনুই মারে, ধাক্কা মারে; সামনে থাকা লোকটিকে ল্যাং মারে আর পেছনে উঠতে থাকা লোকটিকে মারে পিছ-লাথি। এতসব কনুই, ধাক্কা, ল্যাং, পিছলাথি মারতে গেলে প্রথম তার জন্য যেটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেটা হচ্ছে এতকাল ধরে শিখে আসা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ। ফলে ওপরে ওঠার জন্য তাকে অনিবার্যভাবেই এসব মূল্যবোধ ঝেড়ে ফেলতে হয় _ আর এভাবেই জন্ম নেয় (সামাজিক ভাষ্যমতে) নীতিবিবর্জিত, লুটেরা, আদর্শহীন (এই নীতি ও আদর্শের মানদণ্ডটি কিন্তু মধ্যবিত্তের তৈরি করা) উচ্চবিত্ত সমপ্রদায়। এর ফলে কি মধ্যবিত্তের মূল্যবোধগুলো সমাজ থেকে উধাও হয়ে যায়? না যায় না। নীতিবাগিশ অনড় পুরনো চিন্তাবিদদের পাশাপাশি নতুন নতুন চিন্তাবিদদের উদ্ভব হয় মধ্যবিত্তদের ভেতর থেকেই। এদের কথাবার্তা তার নিজ শ্রেণীকে প্রভাবিত করুক আর নাই করুক, নিম্নবিত্ত থেকে যারা মধ্যবিত্ত হতে চাইছে তাদের কাছে এগুলো খুবই মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে _ কারণ তার সমাজে এগুলো নেই, সে মনে করে এগুলো শিখলেই সে তার স্বপ্নের মধ্যবিত্তে পরিণত হতে পারবে। ফলে এসব নীতিবাক্য, মূল্যবোধ কিংবা আদর্শের আবেদন সহসা ফুরিয়ে যায় না। অতএব বলা যায় _ মধ্যবিত্ত হচ্ছে একটা ট্র্যানজিশন পিরিয়ড। নিম্নবিত্তরা স্বপ্ন দেখে মধ্যবিত্ত হবার, আবার মধ্যবিত্ত হয়েই বড়জোর এক বা দুই প্রজন্ম _ তারপর উচ্চবিত্ত হবার জন্য তোড়জোর শুরু করে সে _ অর্থাৎ মধ্যবিত্ত অবস্থানটিতে কেউ দীর্ঘদিন থাকতে চায় না।

৮.
মধ্যবিত্তদের নিয়ে কথা বলতে গেলে সবচেয়ে সাধারণ যে প্রশ্নটি ওঠে তা হলো _ এই শ্রেণীর ভবিষ্যৎ কি? মার্কসবাদী চিন্তাবিদরা মধ্যবিত্তকে কোনো শ্রেণী হিসেবেই মানতে নারাজ। কেউ যদি মানেনও তাহলে সঙ্গে সঙ্গে গলার রগ ফুলিয়ে উচ্চকণ্ঠে এ কথাও বলতে ভোলেন না যে, এই শ্রেণীর অবস্থা মুমূর্ষু এবং অচিরেই এরা মৃতু্যবরণ করবে। যুগের পর যুগ ধরে তারা এই কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে দেখা যাচ্ছে মধ্যবিত্ত তো মরছেই না বরং তাদের আকার ও আয়তন দিন দিন বেড়েই চলেছে। তারা শুধু বেঁচে আছে তাই নয়, বরং বেশ দাপটের সঙ্গে বেঁচে আছে। অবশ্য ২০ বছর আগের মধ্যবিত্ত সমাজের সদস্যরা যে এখনো মধ্যবিত্তই আছে তা বলা যায় না। কেউ চেষ্টাচরিত্র করে উচ্চবিত্তের জগতে চলে গেছে, কেউ বা যুদ্ধে টিকতে না পেরে নিম্নবিত্ত হয়ে গেছে। এই নিম্নবিত্তকেই মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলা হচ্ছে। বিত্তের বিচারে এরা নিম্নবিত্তই, কিন্তু যেহেতু মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধগুলো তারা বেশ শক্তভাবেই আঁকড়ে ধরে থাকে তাই তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতে গেলে অমন একটি সমাসবদ্ধ নামে ডাকতে হয়। অন্যদিকে যারা উচ্চবিত্ত হবার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে _ অর্থাৎ যথেষ্ট বিত্তবান হলেও যারা মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধগুলো এখনও পুরোপুরি বিসর্জন দিতে পারে নি তাদেরকে বলা হচ্ছে উচ্চ-মধ্যবিত্ত। আর দু-তিন প্রজন্ম ধরে যারা স্রেফ মধ্যবিত্তই রয়ে গেছে তারাই আসলে মধ্যবিত্ত বলে পরিচিতি পাচ্ছে। মধ্যবিত্তের চরিত্র বুঝতে হলে বুঝতে হবে এদেরকেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এতসব রূপান্তর প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে তারা কতদিন তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে? বলা বাহুল্য মধ্যবিত্ত অবস্থাটি বজায় রাখা বেশ কষ্টসাধ্য _ যে কোনো সময় নিম্নবিত্তের কাতারে চলে যাবার একটি ভয় থাকে। অনেক সময় দেখা যায় মাত্র এক প্রজন্মের ব্যবধানে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছে। এরকম দু-একটি উদাহরণ দেখে অবশ্য এই শ্রেণী মৃতু্যমুখে পতিত এমনটি ভাবার কোনো মানে হয় না। কারণ যতদিন পর্যন্ত সমাজে নিম্নবিত্তরা থাকবে এবং তাদের জন্য শিক্ষার দ্বার স্থায়ীভবে বন্ধ করে দেয়া না হবে _ ততদিন পর্যন্ত নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে রূপান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ হবে না। আর বন্ধ হবে না বলেই নতুন করে মধ্যবিত্ত সমাজের সদস্য সংখ্যা বেড়ে যাবে _ অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আকার আয়তন বাড়তে থাকবে। মধ্যবিত্তদের মৃতু্য ঘটতে পারে শুধুমাত্র শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলেই। তা-ও এই যুক্তিতে যে, যে সমাজে শ্রেণীই নেই সে সমাজে উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত নামধারী শ্রেণীগুলো আসবে কোত্থেকে? ব্যক্তি মালিকানায় কোনো সম্পদ থাকবে না বলেই এসব শ্রেণী থাকার প্রশ্নও আসে না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এরকম একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে বিদ্যমান সমাজ কাঠামো যেমন আমূল বদলে যাবে, তেমনি বদলে যাবে সামাজিক মূল্যবোধগুলোও। কিন্তু ওরকম একটি শ্রেণীহীন সমাজেও, বিত্তের বিচারে, এই মানুষগুলোর যে সামাজিক অবস্থান থাকবে _ এখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে সেটাকে হয়তো মধ্যবিত্ত শ্রেণীই নাম দেয়া যেতে পারে, যদিও তাদের মূল্যবোধগুলো এখনকার মধ্যবিত্তদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নরকমের হবে। এ-দিক থেকে দেখলে বলতেই হয় _ মধ্যবিত্তরা অমর ও অক্ষয় _ কোনোদিনই এদের মৃতু্য হবে না।



আগস্ট, ২০০২ _ জুন, ২০০৩।