প্রাক কথন
প্রতিটি জাতির জীবনে ক্রান্তিকাল আসে, আর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে
দেখা যায় _ কতিপয় আলোকপ্রাপ্ত মানুষ ওই ক্রান্তিকালে নিজেদের কাঁধে
তুলে নেন এমন সব দায়িত্ব যা সেই জাতির ভবিষ্যৎ চলার পথ তৈরি করে
দেয়। গত শতকের ৪০-এর দশক বাঙালি মুসলমানের জীবনে ছিলো তেমনই এক
ক্রান্তিকাল। দেশভাগের সেই বিহ্বল সময়ে _ দ্বি-জাতি তত্ত্বের আফিম
খেয়ে ভুল স্বপ্নে মেতে ওঠা এক বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠীর সেই সংকটকালে_
যে কজন আলোকপ্রাপ্ত অগ্রসর মানুষ বাঙালি মুসলমানের শিল্পবোধ,
সাহিত্য চেতনা, দর্শন চিন্তা ও জাতিসত্ত্বার স্বরূপ নির্মাণে
অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাদের অন্যতম এবং
অবশ্যই উজ্জ্বলতর, সচেতন, সুদুরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ও
লক্ষ্যমুখী। হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আঘাতে লালিত ও বিক্ষিপ্ত এই
জনপদের মানুষগুলো তাদের সমস্ত সংস্কার ও বিশ্বাস, সংকট ও সম্ভাবনা,
স্বপ্ন ও হতাশা, অর্থাৎ সমস্ত ইতি ও নেতিবাচকতাসহ এই প্রথম ঠাঁই
পেলো কোনো শক্তিমান সাহিত্যশিল্পীর সৃষ্টিতে। এই প্রথম কোনো লেখক
প্রায় পূর্ব ঐতিহ্য ছাড়াই এদেরকে তাঁর চিন্তা ও স্বপ্ন ও সৃষ্টির
অনর্্তগত করে নিলেন। তাঁর আগে বাঙালি মুসলমান লেখকের মধ্যে মীর
মশাররফ হোসেন আর কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া আর কেউই এতোটা শক্তিমত্তার
পরিচয় দেননি। বাংলা কথাসাহিত্য যখন বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ,
শরৎচন্দ্রের যুগ পেরিয়ে মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্করের অসামান্য
প্রতিভায় উদ্ভাসিত _ বাঙালি মুসলমান তখন রচনা করছে 'আনোয়ারা' বা
'আব্দুল্লাহ'র মতো উপন্যাস! সমকাল থেকে এ যে কতোটা পিছিয়ে থাকা,
ভাবা যায় না। এই অবস্থার মধ্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এসে জানিয়ে দিলেন,
বাঙালি মুসলমানের পিছিয়ে থাকার যুগ শেষ হয়েছে _ এখন থেকে রচিত হবে
বাংলা সাহিত্যের নতুন ইতিহাস! মাত্র তিনটে উপন্যাস, দুটো
গল্পগ্রন্থ এবং দুটো নাটক; তাঁর জীবনকালে প্রকাশিত এই কয়েকটি মাত্র
গ্রন্থ এবং আরো কিছু অগ্রন্থিত রচনা, এই নিয়েই তিনি যে আমাদের
প্রধান লেখক, উত্তরকাল যে তাঁকে বরাবরই দেখেছে শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের
চোখে _ তার কারণ তো শুধুমাত্র এই নয় যে, তিনি শুধুই একজন
কথাশিল্পী। তিনি বরং বাঙালি মুসলমানদের কথাসাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে
পালন করেছেন পিতৃপুরুষের ভূমিকা। কী হবে আমাদের ভাষা রীতি,
ক্রিয়াপদের ব্যবহারে কিভাবে পরিবর্তন আনা যায় _ অবিলম্বে এসব বিষয়ে
সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে এই অঞ্চলের জন্য তিনি তৈরী
করেছিলেন এক গ্রহনযোগ্য ভাষারীতি এবং ব্যবহার করেছিলেন সংখ্যাহীন
আঞ্চলিক শব্দ, যা ছাড়া এই জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ সঠিকভাবে ফোটে না।
লক্ষ্যমুখী ছিলেন তিনি, নিজের গন্তব্য সম্বন্ধে ছিলেন সচেতন_ কোথায়
গিয়ে দাঁড়াবেন এ বিষয়ে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিলো না, সংশয় ছিলো না।
পাকিস্তানী ভাবাদর্শ ও মূল্যবোধের যখন জয়জয়াকার চলছে এদেশে, এ
জাতিকে কেবলই মুসলমান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে, তখন
তিনি বাঙালি মুসলমানের বাঙালিত্বকেই বড় করে দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন,
এই অঞ্চলের আবহমান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ছায়ায় বেড়ে ওঠা যে জাতি তারা
শুধু মুসলমানই নয় _ বাঙালিও বটে। তিনি তাই তাঁর পাঠকদেরকে আরব
মুসলিমের গৌরব-গাঁথা শোনাননি, অন্যান্য অনেকের মতো। সৈয়দ
ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন যথার্থই আধুনিক, সব কিছু মিলিয়ে এই যে জনগোষ্ঠী
তিনি তাদেরকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে।
মোটামুটিভাবে আড়াই যুগের সাহিত্যচর্চার ফসল হিসেবে সৈয়দ
ওয়ালীউল্লাহ যা রেখে গেছেন তার পরিমান খুব বেশি নয়। লাল সালু ,
কাঁদো নদী কাঁদো ও চাঁদের অমাবস্যা _ এই তিনটে উপন্যাস, নয়ন চারা ও
দুই তীর _ এই দুটো গল্পগ্রন্থ , তরঙ্গভঙ্গ ও বহিপীর এই দুটো নাটক,
বত্রিশটি অগ্রন্থিত গল্প, একটি কিশোর নাটক ও একটি একাঙ্কিকা _
সাকুল্যে এই তাঁর রচনা।
উপন্যাসে তিনি প্রথম আধুনিক, নাটকেও। আর গল্প তাঁর গড়ে ওঠার
প্রামান্য দলিল। বত্রিশটি অগ্রন্থিত গল্পসহ তাঁর মোট ঊনপঞ্চাশটি
গল্প বেশ কৌতূহল জাগায় _ এখানেই তিনি বারবার বদলে ফেলেছেন নিজেকে,
বারবার ভেঙেছেন এবং গড়েছেন। অবশেষে নানা দিক থেকেই তাঁর ঋজু
চরিত্রটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও গল্পগুলো (বিশেষ করে অগ্রন্থিত
গল্পগুলো) তাঁর নিজেকে ভাঙা-গড়ার দলিল হিসেবেই রয়ে গেছে।
গল্প প্রসঙ্গ
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পগুলোর মধ্যে অগ্রন্থিত গল্পগুলো বেশ কৌতূহল
জাগায়। এর সবগুলোকে সফল গল্প হিসেবে বিবেচনা করা যায় না বরং কয়েকটি
বেশ দুর্বল ও অসফল _ ঠিক যেন গল্প হয়ে ওঠেনি। আবার এগুলোর মধ্যেই
রয়েছে উঁচুমানের কালজয়ী গল্প। আমাদের মনে রাখতে হচ্ছে, তিনিই
নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যরুচি, ফলে তাকে
যেতে হয়েছে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে। আর তাছাড়া একজন
লেখকের প্রথম জীবনের ক'টা লেখাই বা শীর্ষছোঁয়া সাফল্য পায়?
আমি তার গল্পগুলোকে অবশ্য তিনভাগে ভাগ করে দেখতে চেয়েছি _ দুর্বল ও
অসফল গল্প, মাঝারি মানের গল্প এবং গভীর জীবনদর্শী উন্নত
শিল্পমূল্যের গল্প। গল্পগুলোকে এই শ্রেণী বিভাগের মধ্যে ফেলে
বিবেচনা করলে আমাদের অবাক হয়ে লক্ষ্য করতে হয়, একই সময়ে তিনি রচনা
করেছেন দুর্বল ও উন্নত গল্প। একি তাঁর দোদুল্যমানতা? এ বিষয়ে
আলোচনায় যাবার আগে শ্রেণীবিভাগটি করে ফেলতে চাই_
দুর্বল ও অসফল গল্প : সীমাহীন এক নিমিষে, চৈত্র দিনের এক
দ্বিপ্রহরে, ঝোড়ো সন্ধ্যা, প্রাস্থানিক, পথ বেধে দিলো...,
অনুবৃত্তি, সাত বোন পারুল, স্বপ্ন নেবে এসেছিল, কালচার, বংশের জের,
মৃতু্য, সতীন, স্বগত।
মাঝারি মানের গল্প : সেই পৃথিবী, পরাজয়, খুনী, রক্ত, খণ্ড চাঁদের
বক্রতায়, দুই তীর, পাগড়ি, কেরায়া, নিষ্ফল জীবন নিষ্ফল যাত্রা,
মালেকা, চিরন্তন পৃথিবী, প্রবল হাওয়া ও ঝাউ গাছ, হোমেরা, স্থাবর,
সূর্যালোক, অবসর কাব্য, স্বপ্নের অধ্যায়, সবুজ মাঠ, নানীর বাড়ির
কেল্লা।
গভীর জীবনদশর্ী ও উন্নত গল্প : নয়নচারা, জাহাজী, মৃতু্যযাত্রা,
একটি তুলসীগাছের কাহিনী, গ্রীষ্মের ছুটি, স্তন, মতিনউদ্দিনের
প্রেম, মানুষ, ছায়া, দ্বীপ, মানসিকতা, ও আর তারা, মাঝি, নকল, রক্ত
ও আকাশ, না কান্দে বুবু।
গল্পের আলোচনায় প্রবেশ করার আগে একটি বিষয় একটু পরিস্কার করে নিতে
চাই। গল্পগুলোর যে শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে এই
ভূমিকা-লেখকের নিজস্ব মতামত। যে কেউ এ মতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ
করতে পারেন এবং লেখক সে মতের প্রতিও এই লেখক পূর্ণ শ্রদ্ধা পোষন
করেন। তবু এ আলোচনাটি এই শ্রেণীবিভাগকে সামনে রেখেই করা হয়েছে।
আগেই বলা হয়েছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গড়ে ওঠার বিষয়টি বোঝা যায় তাঁর
গল্পগুলো পড়লে। তার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, তিনি প্রথমে দূর্বল
গল্পগুলো লিখেছেন, এরপর মাঝারি মানের গল্পগুলো রচনা করে উন্নত ও
শিল্পমূল্যসম্পন্ন গল্পগুলো সৃষ্টির ব্যাপারে মনোযোগী হয়েছেন।
প্রকাশকালের দিকে তাকালে বরং একই বছরে পথ বেঁধে দিলো...,
প্রাস্থানিক, প্রভৃতির মতো অগভীর গল্প এবং ছায়া, দ্বীপ বা মানুষ
প্রভৃতির মতো শক্তিশালী গল্প প্রকাশিত হতে দেখা যায়। একই সময়কালে
সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী গল্প রচনার এই প্রবণতা হয়তো যে কোনো সফল
শিল্পীর গড়ে ওঠার অমসৃণ-রুক্ষ-দ্বন্দ্ববহুল প্রক্রিয়াকেই নির্দেশ
করে। আরেকটি লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে _ এই সময়কালে প্রকাশিত কয়েকটি
মাত্র গল্প তিনি গ্রন্থের জন্য নির্বাচন করেছেন যেমন- কেরায়া, তার
প্রেম (গ্রন্থে _ মতিউদ্দিনের প্রেম), পাগড়ি, শত্রু নাই, (গ্রন্থে
_ নিস্ফল জীবন, নিস্ফল যাত্রা), খন্ড চাঁদের বক্রতায় প্রভৃতি।
অগ্রন্থিত গল্পগুলোর মধ্যে গভীর ও উঁচু মানের গল্পগুলো নিঃসন্দেহে
যে কোনো লেখকের পক্ষেই শ্লাঘার বিষয় হতে পারে _ তবু কেন তিনি
এগুলোকে গ্রন্থভূক্ত করেননি, বোঝা যায় না। আবার অন্যদিকে অগভীর
গল্পগুলো কোনো বিচারেই তাঁর মতো লেখকের কোনো গ্রন্থে অন্তভর্ুক্ত
হওয়ার যোগ্যতা রাখে না, এমনকি সেগুলো সাময়িক পত্রে প্রকাশের
প্রয়োজনও সামান্য। তবু এ গল্পগুলো আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
ওঠে এই জন্য যে, এগুলো দিয়েই তাঁর গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি তীব্রভাবে
টের পাওয়া যায়।
২.
সসৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কয়েকটি গল্প আমি দুর্বল ও অগভীর গল্প হিসেবে
চিহ্নিত করেছি। কারণ আমাদের চেনা ওয়ালীউল্লাহর ভাষাভঙ্গী, ঋজুতা,
মানসিক টানা-পোড়েন নির্মাণে দক্ষতা, সচেতনতা, চরিত্র চিত্রণের
কুশলতা, শিল্পমূল্যের ব্যাপারে তীক্ষ্ন সচেতনতা ইত্যাদি এসব গল্পে
খুব একটা চোখে পড়ে না। বরং চোখে পড়ে হালকা চালে ইচ্ছাপূরণের
প্রবণতা, চরিত্রের ওপর উৎকট জীবনবোধ আরোপের চেষ্টাও খুবই
দৃষ্টিকটুভাবে সহজলভ্য, আর অদ্ভুত অমনোযোগিতা পাঠককে প্রায় বিরক্ত
করে তোলে।
এরকম দুয়েকটি গল্পের কথা বলা যাক। যেমন ঝোড়ো সন্ধ্যা। এই গল্পের
বিষয় এক তরুণ দম্পতির দাম্পত্য সংকট। এ সংকট ও দ্বন্দ্বের মূলে
রয়েছে এক মধ্যবর্তিনী। অনেকরকম ব্যর্থতা সত্ত্বেও প্রথম থেকে অনেক
দূর পর্যন্ত গল্পটি একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ গল্প হয়ে ওঠার যাবতীয়
ঈঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছিলো এবং সৈয়দ ওযালীউল্লাহর রীতিগুলো উপস্থিত ছিলো
স্বমহিমায়। প্রায় অসাধারণ একটি চরিত্রের আভাস দেখা যাচ্ছিলো
আনোয়ারের মধ্যে, দাম্পত্য জীবনের নিয়মবদ্ধ প্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ
করছিলেন লেখক, সামাজিক মূল্যবোধ ও বানোয়াট ধারনাগুলোকে কুয়াশাবৃত
বলে অভিহিত করে যেন ভবিষ্যতকালের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকেই প্রতিষ্ঠিত
করছিলেন যিনি প্রচলিত রীতি-নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন ক্রমাগত এবং
আরোপিত জীবনবোধ থেকে সরে এসে প্রকৃত সত্যের পক্ষেই দাঁড়াবেন শেষ
পর্যন্ত। কিন্তু শেষের দিকে এসে গল্পের ঘটনা প্রবাহ যেভাবে এগিয়ে
গেলো পাঠক তাতে হতাশ ও বিরক্ত না হয়ে পারে না। কি রকম? স্ত্রী
রহিমার বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবার কিছুক্ষণের মধ্যে
মধ্যবর্তিনী মমতাজের আগমন এবং নাটকীয় বক্তব্য পেশ _ 'আপনি ভুল
করছেন আনোয়ার সাহেব'। কি ভুল? আনোয়ারকে মমতাজ ভালোবাসে তবে _ 'সে
ভালোবাসা ইন্টেলেকচুয়াল বন্ধু হিসেবে, স্বামী হিসেবে নয়।' কিন্তু
আনোয়ারের ভুল ধরিয়ে দেবার জন্য লেখক নিজেই যে ভুল করে বসলেন তার কি
হবে? পাঠক নিশ্চয়ই গল্পটি পাঠের সময় লক্ষ্য করেন, মমতাজ এসে
আনোয়ারকে 'তুমি' বলেই সম্বোধন করে_ মুহূর্তের মধ্যে সেই সম্বোধন
'আপনি'তে রূপান্তরিত হওয়ার কারণ কি? সৈয়দ কি খুব অমনোযোগী ছিলেন
গল্পটি লেখার সময়? যাহোক, এরপরের ঘটনা আরো অদ্ভুত। একটু আগেই যে
আনোয়ারকে আমরা দেখেছি অনুতাপহীন, নিজের প্রতি প্রবল আস্থাবান,
এইটুকু সময়ের মধ্যেই তার বোধোদয় ঘটে। সে তার ভুল বুঝতে পারে। এই
বোধোদয়ের অদ্ভুত ঘটনাটিও মেনে নেওয়া যেতো_ কারণ দু'একটি আঘাত অনেক
সময়ই মানুষের জীবন ভাবনা পাল্টে দিতে পারে_ কিন্তু সৈয়দের চমক তখনও
শেষ হয়নি। দু'তিন পংক্তির মধ্যেই জানা গেলো রহিমার মৃতু্য ঘটেছে।
এরপর আর পুরো গল্পটির কোনো গুরুত্ব পাঠকের কাছে থাকে না। গল্পটি
লেখার সময় সৈয়দ শুধু অমনোযোগীই ছিলেন না, বিভ্রান্তও ছিলেন। যে
বিষয়টি নিয়ে তিনি গল্পটি সাজিয়েছিলেন তখনকার সমাজে তা গ্রহণযোগ্য
ছিলো না মোটেই, (এখনও কি গ্রহণযোগ্য?) অতএব সৈয়দের প্রয়োজন হয়ে
পড়লো আনোয়ারের বোধোদয় ঘটানোর এবং সেখানেই তিনি থামলেন না, তাকে
শাস্তি দেয়ার জন্য রহিমাকে মেরেও ফেললেন। দুটো ঘটনাই অযৌক্তিক,
গল্পের জন্য বেমানান এবং আরোপিত। হয়তো পাঠক হৃদয়ে খানিকটা করুণ রস
সঞ্চার করার ইচ্ছে তার থেকে থাকবে, যা গল্পের শিল্পমূল্যকে
মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে দিয়েছে।
প্রাস্থানিক, পথ বেঁধে দিলো ইত্যাদিও ইচ্ছাপূরণের গল্পই। শুধু
ইচ্ছাপূরণই নয়, তাঁর অমনোযোগিতাও এক চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে এসব গল্পে।
আবার চৈত্র দিনের এক দ্বিপ্রহরে গল্পের আনোয়ারকে কোনোভাবেই সৈয়দ
ওয়ালীউল্লাহর তৈরি কোনো চরিত্র বলে মনে হয় না। চরিত্রের সঙ্গে
বেমানান এক উৎকট জীবনদর্শন শুধু ঐ চরিত্রকেই পঙ্গু করে না, গল্পেরও
যে ব্যাপক ক্ষতি করে _ এ গল্পটি তার প্রমাণ। সীমাহীন এক নিমেষে,
কালচার, বংশের জের, মৃতু্য, স্বপ্ন নেবে এসেছিলো, সতীন _ প্রভৃতি
গল্প তাঁর প্রথম দিকের রচনা। এগুলো শিল্পমানের দিক থেকে দূর্বল,
অনেক কথা বলতে গিয়েও কিছুই বলে না, অনেক ক্ষেত্রেই বেশ অমনোযোগী
ছিলেন লেখক, সেটাও বোঝা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চরিত্রগুলো যা
কিছু ধারণ করতে অক্ষম (অথচ লেখক যা বিশ্বাস করেন) সেগুলো চরিত্রের
দুর্বল কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে প্রায় পঙ্গু করে ছেড়েছেন তিনি।
এতোসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এসব গল্পের কোনো না কোনো দিকে তাঁর
প্রতিভার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কখনো কোনো চরিত্র নির্মাণে (যেমন _
ঝোড়ো সন্ধ্যা'র আনোয়ার, প্রাস্থানিক-এর আয়েষা প্রভৃতি), কখনো
প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ ও সংস্কারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে,
কখনো অসাধারণ ভাষার কারুকাজ দেখিয়ে (যেমন_ সীমাহীন এক নিমিষে),
কখনো বা প্রকরণে ভিন্নতা এনে (যেমন _ সাত বোন পারুল) তিনি
ভবিষ্যতের ওয়ালিউল্লাহকে চিনিয়ে দিচ্ছিলেন।
৩.
দদুর্বল ও অগভীর গল্পগুলোর কোনো কোনোটিতে যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর
বৈশিষ্ট্যগুলো ঝলসে উঠতে দেখা যায়, সেগুলো আরো খানিকটা অগ্রসর হয়ে
প্রায় স্থিতি পায় মাঝারি মানের গল্পগুলোতে। এসব গল্পে তিনি জীবন
সম্বন্ধে যেন একটি কনসেপশনে উপনীত হতে চান, নিজের বৈশিষ্ট্যগুলোকে
উজ্জ্বল করে তুলতে চান পাঠকের কাছে; জীবন ও পৃথিবী সম্বন্ধে,
সমাজ-সংস্কার সম্বন্ধে নানাবিধ প্রশ্ন উত্থাপন করে পাঠককে ভাবিয়ে
তোলেন। মনে হয় যেন তিনি এগিয়ে চলেছেন তার ঋজু ও দৃঢ় সংবদ্ধ
ভাষারীতি ও বিশ্লেষনী স্বভাবের দিকে যা দিয়ে উত্তরকালের সমস্ত
পাঠককে চমকে দেবেন তিনি।
এরকম দুয়েকটি গল্প নিয়েও কথা বলা যেতে পারে। চিরন্তন পৃথিবী
গল্পটির কথাই ধরা যাক। শহরবাসী যুবক নওয়াজ বাড়ি ফিরে স্ত্রী
হোসেনাকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে । রোমান্টিক জুটি। অভিমান ও আনন্দ,
মধুর অভিযোগ ও প্রেম তাদেরকে আপ্লুত করে তুলেছে। আর তাদের এই মধুর
সময়ের সঙ্গী মায়াবী প্রকৃতি, সন্ধ্যার সূর্য, বহমান নদী ইত্যাদি
তাদেরকে করে তুলেছে আরো আবেগাক্রান্ত, উজ্জ্বল। গল্পটি হঠাৎ
ভিন্নদিকে মোড় নেবার আগ পর্যন্ত তাদের এ বিহ্বল আচরণ পাঠকের কাছে
তেমন গুরুত্ব পায় না। গল্পটি যে এমন মোড় নেবে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তা
বোঝাও যায় না। একসময় পাঠক আবিষ্কার করেন _ তারা হাঁটতে হাঁটতে
'নদীর খাড়া-ভাঙা পাড়ের নিচে যেখানে জলের রেখা, সেখানে একটা সাদা
বস্তু' দেখতে পেয়েছে। ভালো করে দেখার জন্য নওয়াজ এগিয়ে গিয়ে একটি
লাশ দেখতে পায়। এ পর্যন্ত এসেও গল্পের কোনো পরিণতি টের পাওয়া যায়
না। পরিস্থিতি পাল্টে যায় নওয়াজ তার অপেক্ষমান স্ত্রী কাছে ফিরে
এলে _ 'হোসেনা ব্যগ্র হয়ে প্রশ্ন করলে : কী? কী ওটা? নওয়াজ কোনো
উত্তর দিলে না, সেই মুহূর্তর্ে হয়তো দিতে পারতোও না।' এবং কিছুক্ষণ
পর এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই 'অতি বিস্মিত ও অতি মৃদু জড়িত কণ্ঠে
সে হোসেনাকে প্রশ্ন করলে : তুমি কে?' এখানে এসে পাঠককে
নিশ্চিতভাবেই থমকে দাঁড়াতে হয়। এ প্রশ্নের অর্থ কি? এই বিভ্রম, এই
ঘোরগ্রস্থ আচরণের ব্যাখ্যাই বা কি? ব্যাখ্যাটি সৈয়দ নিজেও দেন না,
বরং _ 'হোসেনা নির্বাক, বিমূঢ়। তার চোখে ভয় মিশ্রিত বিস্ময়। এ
প্রশ্নের উত্তর সে কি করে দেবে? সে যে মানুষের ক্ষমতার বাইরে' _
বলে গল্প শেষ করে দিলে পাঠকও নির্বাক বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েন।
প্রশ্নটি পাঠকের সামনে উজ্জ্বলভাবে ঝুলে থাকে, গল্প শেষ করেও
প্রশ্নটির হাত থেকে রেহাই মেলে না। কি ব্যাখ্যা এই গল্পের? 'তুমি
কে?' _ প্রশ্নটি কি শুধু হোসেনার উদ্দেশ্যেই উচ্চারিত? নাকি যার
লাশ পড়ে আছে অথবা বেঁচে থাকা সত্ত্বেও যাদের কাছে 'জগতটা বিরাট
ছলনা, শুধু ফাঁকি' _ তাদের সবার কাছেই এই প্রশ্ন পেঁৗছে যায়, যার
উত্তর দেয়া 'মানুষের ক্ষমতার বাইরে?' 'তুমি কে?' _ মানুষের প্রতি
উচ্চারিত এ এক মৌলিক প্রশ্ন। জীবনের জন্য তোমার এতো আয়োজন, এতো
আনন্দ, এতো আবেগ, এতো অভিমান, বেঁচে থাকার এতো তীব্র আকুলতা অথচ
মৃতু্য তোমাকে পরিচয়হীন করে দেয়। 'তুমি' তাহলে কে? কি তোমার পরিচয়?
জীবন ও জগৎ ও মানুষের প্রতি এইরকম মৌলিক প্রশ্ন আমরা আরো অনেকবার
উচ্চারিত হতে দেখেছি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর রচনায়। বস্তুত এ গল্পের
নামকরণই এ প্রশ্নকে একটি সার্বজনীন প্রশ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
করেছে। নইলে একটি তরুণ দম্পতির আবেগ উচ্ছ্বাস অভিমানমাখা প্রেমের
গল্পের নাম চিরন্তন পৃথিবী হবে কেন?
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পে প্রকৃতি নিজেই একটি শক্তিশালী চরিত্র।
অনেক সময়ই আমরা দেখি _ যে কোনো একটি মানব-চরিত্রের চেয়েও শক্তিশালী
হয়ে উঠেছে প্রকৃতি ও নিসর্গ, নির্ধারণ করছে গল্পের গতিপ্রকৃতি,
নিয়ন্ত্রণ করছে চরিত্রগুলোর আচার আচরণ। প্রবল হাওয়া ও ঝাউগাছ
গল্পের নওয়াজ ও সাকিনা আপাত দৃষ্টিতে যথারীতি সুখী দম্পতি।
সন্ধ্যার রূপ, প্রবল হাওয়া কিংবা ঝাউগাছের সাড়া তাদেরকে সুখী করে
তোলে, কিন্তু ক্রমশ আঁধার ঘন হয়ে এলে, আকাশে 'তারার মালা ঝকঝক'
করতে থাকলে 'ওরা ভুলে গেলো পৃথিবীকে, ভুলে গেলো সবকিছু _
অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। ওদের ঝাঁঝালো নেশা হলো, হাওয়ার চেয়েও
দুর্বার স্বপ্ন এলো ওদের দেহ জড়িয়ে, অসংখ্য তারার মতো তাদের হৃদয়
লক্ষ শিরায় দপদপ করতে থাকলো।' এবং সাকিনা 'চেঁচিয়ে উঠলো _ মৃতু্যকে
এই মুহূর্তে আমি তুচ্ছ মনে করি। আমি তারার পানে চেয়ে আছি, তোমাকে
আর ভালোবাসিনে।' যেন নিসর্গের প্রবল গভীর প্রভাব তাদেরকে নগ্ন করে
দিয়েছে। আপাত সুখী দাম্পত্য জীবনে যা বলা সম্ভব নয়, সেই বাক্যও তাই
অবলীলায় বেরিয়ে আসছে _'তোমাকে আর ভালোবাসিনে।' এবং হাওয়া থেমে গেলে
তারা 'ঘুম থেকে জেগে ওঠার চোখ নিয়ে পরস্পরের দিকে তাকালো' _ কারণ
হাওয়া ও সন্ধ্যা ও নক্ষত্র তাদেরকে পরস্পরের কাছে অপরিচিত করে
তুলেছে। দীর্ঘকাল পাশাপাশি বাস করেও যে অপরিচয়ের দূরত্ব ঘোচেনা,
নিসর্গ সেই সত্যকে প্রকটভাবে প্রকাশ করে দেয়। সবুজ মাঠ গল্পের আকবর
ও রাবেয়াও মাঝরাতে ঝড় এলে পরস্পরের কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠে আর
_'রাবেয়া আর্তনাদ করে উঠলো : কে, কে তুমি?' এবং আকবরের উত্তর 'আমি
মানুষ।' কেবলই মানুষ? যে কোনো মানুষ? যেন রাবেয়ার সঙ্গে সম্পর্কহীন
সে, যেন কোনোদিনই তাদের পরিচয় ছিলো না। অতপর আমরা দেখি _ তারা
পরস্পরের কাছে অকথিত অধ্যায় বলে চলেছে _ যেন এই রাতে, এই হঠাৎ ঝড়
নগ্ন করে দিয়েছে তাদের _ যেন আর কিছুই লুকোবার নেই তাদের পরস্পরের
কাছে।
এসব গল্পে নানাভাবেই সৈয়দ জীবন ও পৃথিবী সম্বন্ধে নানারকম কনসেপশনে
উপনীত হবার চেষ্টা করেন। যে প্রশ্ন তিনি চিরন্তন পৃথিবীতে উত্থাপন
করেন, কিংবা মানুষের ওপর তার পরিবেশ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশের প্রভাব
প্রবল হাওয়া ও ঝাউগাছ, সবুজ মাঠ কিংবা সূর্যালোক গল্পে আঁকেন, অথবা
নানীর বাড়ির কেল্লায় একটি কিশোরের মধ্যেমে এই উপলব্ধি ঘটান যে
মানুষের জন্য পরম মমতা বা প্রশান্তির আশ্রয় বলতে কিছু নেই, এবং
অবসর কাব্য-এ দেখান যে, প্রাত্যহিক জীবন থেকে _ বা আরো সুনির্দিষ্ট
ভাবে বলতে গেলে, প্রতিদিনের অভ্যাস থেকে বিচু্যত হয়ে _ মানুষ
কিছুতেই বেশিদিনের জন্য স্বস্তিদায়ক সময় কাটাতে পারে না,
আপাতদৃষ্টিতে তা যতোই শান্তির মনে হোক না কেন; উন্নত
শিল্পমানসম্পন্ন, গভীর জীবনদৃষ্টি ও জীবনবোধ সম্পন্ন গল্পগুলোতে
এসে এগুলোর চমৎকার মেলবন্ধন ঘটে। এতোই অসামান্য কৃতিত্বে এসব গল্প
রচিত হয় যে, তা আর দেশ-কালের সীমানায় আবদ্ধ থাকেনা বরং মনে হয়
মানুষের জন্য এসব প্রশ্ন চিরন্তন যা দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে সব
মানুষের জন্য সব কালের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার ক্ষমতা
রাখে।
৪.
এএই রচনায় যেসব গল্পকে গভীর জীবনদর্শনসমৃদ্ধ ও উন্নত
শিল্পমানসম্পন্ন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে _ সেগুলোর কোনো কোনোটি সব
মিলিয়ে সৃষ্টি করেছে জীবন সম্বন্ধে এক গভীর দার্শনিক বোধ, কোনো
কোনোটির রচনারীতি ও নির্মাণকৌশলের চমৎকারিত্ব পাঠকের দৃষ্টি কাড়ে,
কোনোটি আবার উত্থাপন করে চিরন্তন প্রশ্ন। এর যে কোনো একটি কারণেই
একটি গল্প শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে উঠতে পারে এবং পাঠক হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী
প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
ছায়া গল্পটির কথা ধরা যাক। সৈয়দ ওয়ালীউল্লার অনেক গল্পেই বিভিন্ন
মুহূর্তের বর্ণনায়, আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে 'ছায়া'
ব্যাপারটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। কিন্তু এই
গল্পে ছায়া হয়ে উঠেছে পুরোপুরি প্রতীকবাহী একটি শব্দ। গল্পের
শুরুতে 'থামের আড়ালে ছায়া। সে ছায়ায় ময়লা ও জীর্ণ সবুজ আলখাল্লা
গায়ে' 'বৃদ্ধ ফকির বসে ছিলো' এবং অচিরেই 'কোমল মুখ রিক্ততায় প্রখর
ক্ষীণ দেহ দীনতায় চঞ্চল আর জ্বালায় তীক্ষ্ন চোখ' নিয়ে একটি 'ছেলে'র
আবির্ভাব হলো, যে 'সত্য' খুঁজতে বেরিয়েছে। গল্পের প্রথম কয়েকটি
পংক্তিতেই লেখক পাঠকদেরকে আগ্রহী ও কৌতূহলী করে তোলেন। মানুষ
যেহেতু কোনো না কোনো জীবনসত্য খুঁজে বেড়ায় বুঝে অথবা না বুঝেই, তাই
গল্পটি সম্বন্ধে আগ্রহী না হয়ে উপায় থাকেনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই
আমরা জানতে পারি, বৃদ্ধের কাছে সত্য হচ্ছে খোদা _ কিন্তু ছেলেটির
কাছে? 'খোদা আমি মানি না। যা আমি দেখতে পাইনে, তা আমার কাছে
মিথ্যে।' এবং বৃদ্ধের নানারকম যুক্তিতেও সে অটল _ 'যিনি
সর্বসাধারণের নন, তিনি আমার কাছে মিথ্যে।' এবং 'যেখানে তর্ক,
সেখানে সত্য নেই। সত্য তর্কের অতীত, ভাষার অতীত।' 'খোদা' তাহলে
সবার কাছে সত্য নন, তর্কাতীত নন! গল্পটির রচনাকাল ১৯৪৩ _
ধর্মোন্মাদনার সেই যুগে কথাটি লেখা খুব সহজ ছিলো না। যাহোক, যেহেতু
সত্য এখানে পাওয়া গেলো না, ছেলেটি তাই বেরিয়ে পড়লো _ 'তার হাতে
লাঠি পিঠে পুটলি।' (এই বাক্যটি যে গল্পের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ,
প্রথমদিকে তা বোঝা যায় নি।) এবার আমরা তাকে দেখি এক ভিন্ন পরিবেশে
_ সত্য খুঁজতে বেরিয়ে সে দেখা পেয়েছে এমন এক লোকের যে সব সময়
আনন্দে মেতে থাকে; পানাহার, নৃত্য, সঙ্গীত এসবই তার নিত্যসঙ্গী ।
তার কাছে সত্য হচ্ছে আনন্দ _ 'জীবনে আনন্দ ছাড়া আর কিছু নেই, খালি
আনন্দ আর আনন্দ।' কিন্তু অচিরেই ছেলেটি আবিষ্কার করে _ এই আনন্দিত
লোকটি বেদনাভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে তার বিগত প্রেমিকার কথা ভেবে।
তাহলে জগতে নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দ বলে কিছু নেই! অতএব ছেলেটিকে আবার
উঠতে হলো এবং 'তার হাতে লাঠি পিঠে পুটলি।' এবার সে দেখা পেলো এক আধ
বয়সী মহিলার যার শান্ত-কোমল-মায়াময় অভিব্যক্তি এমনকি ছেলেটির
'চোখের জ্বালা ও ক্ষুধাকে'ও ধূসর করে তুললো। 'দেহের ঋজুভঙ্গি করে
তুললো কোমল ও শিথিল, সে ডুবে গেলো ভাষার অতীত শব্দহীন
চিরশান্তিতে।' _ 'তোমার এ মহাশান্তির তলায় আমাকে থাকতে দাও চিরকাল,
আমি বড় অশান্ত।' কিন্তু এবারেও মুদ্রার অন্যপিঠ আবিষ্কার করতে দেরি
হলো না তার । একটি সংবাদ পেয়ে মহিলার ক্রদ্ধ-হিংস্র রূপ বেরিয়ে
পড়লো _ 'ওকে মারো, ওকে খুন করো, ওকে পুড়িয়ে ফেলো, ওকে গুঁড়ো করে
ফেলো।' _ অতএব ছেলেটিকে আবার বেরিয়ে পড়তে হলো _ এবং যথারীতি 'তার
হাতে লাঠি পিঠে পুটলি।' কিন্তু সত্য খোঁজা শেষ হয়নি তার। এবার তার
সঙ্গে দেখা হলো বৈধব্যে ক্লান্ত ক্রন্দনরত এক রমনীর, মৃত স্বামীর
স্মৃতিকাতরতায় সে ম্লান, বিষণ্ন, একাকী ও ক্লান্ত। কিন্তু ছেলেটির
তরফ থেকে আশ্রয়দানের আশ্বাস পেয়ে যখন তার 'রক্তিম অধরের প্রান্তে
একটুখানি মধুর হাসি ফুটে উঠলো' তখন তার বুঝতে বাকি রইলো না যে, মৃত
স্বামীর জন্য তার এই বিলাপ স্রেফ বানোয়াট এবং অন্যের সহানুভূতি
লাভের জন্যই তা করা হচ্ছে। অতএব 'ছেলেটির চোখে আগুন উঠলো জ্বলে।'
এরপর সে আবিষ্কার করলো রোগজর্জরিত যন্ত্রনাকাতর এক বৃদ্ধাকে _ জানা
গেলো তার কাছে একমাত্র জীবনসত্য হচ্ছে দুঃখ। অথচ ছেলেটি একটি
স্বর্ণমুদ্রা তার হাতে দিতেই তার মুখে 'আমাকে তুমি যেমন খুশি করলে,
খোদাও যেন তোমাকে তেমনি খুশি করেন' শুনে ছেলেটির 'সজল চোখে ছায়া
ঘনিয়ে আসলো।' যে দুঃখ সামান্য মুদ্রায় ম্লান হয়ে যায় তাতো জীবনসত্য
হতে পারে না! অতএব আবার তাকে 'হাতে লাঠি পিঠে পুটলি' নিয়ে বেরিয়ে
পড়তে হলো সত্যের সন্ধানে। সত্য খুঁজতে বেরিয়ে পড়া ওই তরুণের আদলে
আমরা আসলে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকেই দেখি। আমরা কৌতূহলী হয়ে উঠি _ কী
তার সত্য জানার জন্য আমাদের প্রবল আগ্রহ জন্মে। ঈশ্বর নন, আনন্দ
নয়, দুঃখ নয়, প্রশান্তিও নয় _ তাহলে কি সেই জীবনসত্য যা আমরা
জীবনভর খুঁজে বেড়াই? ছেলেটির সঙ্গে সঙ্গে আমরাও এগিয়ে গেলে দেখতে
পাই, এবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছে এক রহস্যময় তরুণীর। তরুণী তাকে
ভালোবাসার কথা বলে, অস্থির তরুণের হৃদয়রাজ্যে প্রেমের মোহনীয় আবেশ
ছড়িয়ে পড়ে, হয়তো খানিকটা ঘোরগ্রস্থও হয়ে পড়ে সে। নইলে কোনো কিছুতেই
যে সত্য খুঁজে পায় না সে কেন উচ্চারণ করবে এই বাক্য _ 'সত্য লাভ
করেছি, তাই আর ভয় করিনে কাউকে, আমার আর মৃতু্য নেই। তোমার কণ্ঠে,
তোমার স্পর্শে, তোমার সুধায় আমি সত্য লাভ জেনেছি। তুমি সত্যরূপিনী,
তুমি নির্বিশঙ্ক, তুমি অক্ষয়।' কিন্তু এই ঘোর দীর্ঘস্থায়ী হয় না,
অচিরেই 'দিগন্তে' ধুলোর মতো কী উড়তে দেখে অগ্রসরমান 'দসু্যর দলের'
আশংকায় সেই সত্যরূপিনী চলে গেলো। ছেলেটি আবার একা। প্রেমও সত্য নয়
তাহলে? সত্যের জন্য ছেলেটির এইরকম রহস্যময় পরিভ্রমণ চলতে থাকে।
হাতে তার লাঠি আর পিঠে পুটলি। গল্পের শেষ পর্যায়ে এসে পরিস্থিতি
আরো রহস্যময় ও প্রায় ব্যাখ্যাতীত হয়ে ওঠে। লেখক যেন ইচ্ছে করেই এমন
একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন, কারণ মানব জীবনের সব সত্যই
ব্যাখ্যাহীন রহস্যে আবৃত, প্রায় কখনোই যে রহস্যকে ভেদ করা যায় না।
গল্পের শেষদিকে এসে ছেলেটির সঙ্গে 'রাজপথে গড়াগড়ি' যাওয়া শিশুটির
দেখা হয়ে যাওয়াটা প্রায় ব্যাখ্যাতীত বিষয়। শিশুটি যখন তার পুটলি
হাতড়ে 'কি যেন একটা' তার হাতের মুঠোয় লুকিয়ে ফেলে তখনও বিষয়টি
রহস্যাবৃতই রয়ে যায়, এবং যখন সে বলে যে 'যা সে নিয়েছে তা আর কখনো
ফিরিয়ে দেবে না' _ তখন রীতিমতো ধাঁধায় পড়তে হয়। কী নিয়েছে সে? এরপর
'হঠাৎ ছেলেটি (শিশুটি) মানুষের মতো কথা কইতে আরম্ভ করলে, বললে :
আমাকে শিশু ভাবছো তুমি? আমি শিশু নই, আমি মানুষ। শিশুর দেহে
মানুষের মনকে বন্দি করে রাখা হয়েছে বটে, কিন্তু প্রতিমুহূর্তে আমার
মধ্যে নিরন্তর মুক্তিপ্রয়াস চলছে। ... রাজপথের প্রান্তে একাকী
নিস্কলঙ্ক-নির্বোধ চোখে হঠাৎ ছায়া ঘনিয়ে এলো, ব্যর্থতায় মাথা নুইয়ে
এলো, তবু সে জোর করে উঠে দাঁড়িয়ে নীরবে পথ চলতে শুরু করলে, পিঠের
পুটলি ধুলোতেই রইলো পড়ে; হাতে তার লাঠি আর পিঠ খালি।' এখানে এসে
পুটলি ও লাঠির রহস্য যেন খানিকটা স্পষ্ট হয়। ছেলেটি সত্য না পেয়ে
যতোবার ফিরে এসেছে সব সময়ই তার সঙ্গী ছিলো ওই লাঠি আর পুটলি।
কিন্তু এবার শিশুটি পুটলি হাতড়ে কি একটা নিয়ে গেলে পুটলির
কার্যকারিতা হারিয়ে যায়। বলার অপেক্ষা রাখেনা এ দুটো জিনিস তখন
প্রতীকী ব্যঞ্জনা নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। তবে কি এ দুটো
জিনিস মানুষের জন্য দুই অনিবার্য প্রসঙ্গ _ শরীর (লাঠি) ও প্রাণ
(পুটলি)? অল্পক্ষণ পরেই বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যায় যখন দেখি _
'মৃতু্যর ভাবশূন্য অর্থহীন আবরণ তাকে আবৃত করে ফেলেছে।' অতপর
ছেলেটির পছন্দের সেই রহস্যময় মেয়েটি ফিরে আসে এবং _ 'ছেলেটির বুকের
কাপড় সরিয়ে দেখলে সেখানে একটি আমূল ছোরা বিঁধিয়ে দেয়া হয়েছে, দেখে
হাতের মধ্যে মুখ ঢেকে সে ডুকরে কেঁদে উঠলো।' _ সন্দেহের আর অবকাশ
থাকেনা যে, এ এক প্রাণহীন (পুটলিবিহীন) শরীর (লাঠি) মাত্র। কিন্তু
সত্য? যে সত্যের জন্য এই দীর্ঘ পরিভ্রমণ এবং জীবনদান, যুবকটি কি
দেখা পেলো তার? গল্পের একবারে শেষের দিকে আমরা দেখি ওই মেয়েটির
ডুকরে কেঁদে ওঠাটাও দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কারণ অচিরেই সে 'দেখলে
অদূরের একটি ছোট গাছে ফুল ধরেছে অজস্র, বিচিত্র সেগুলোর রঙ দেখে
তার অধরের প্রান্তে হঠাৎ অতি মৃদু অতি উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠলো,
নয়নে এলো চাঞ্চল্য। দ্রুতভঙ্গিতে মায়ার অবগুণ্ঠন টেনে দিয়ে নূপুরের
ঝঙ্কার তুলে লঘুপায়ে সে এগিয়ে গেলো সম্মুখ পানে, পেছনে আর তাকালো
না।' মানুষের জন্য সত্য তাহলে ওটাই _ তার নিজের বেঁচে থাকা। মানুষ
কেবল বেঁচে থাকতেই চায়, কোনোকিছুই তাকে জীবনের স্বপ্ন-গন্ধময়
বর্ণিল আয়োজন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না। প্রিয়জনের লাশের ওপর
থেকে চোখ তুলে সে দেখতে পায় 'ছোট গাছে ফুল ধরেছে অজস্র।' এ-তো আসলে
জীবনেরই প্রতীক, জীবনের কাছে ফিরে আসারই আয়োজন। এই গল্পটি পুরোপুরিই প্রতীকী _ এর ভাষা, আবহ, চরিত্রচিত্রণ,
বিষয়বস্তু _ সবই প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উজ্জ্বল। এই ধরনের প্রতীকী গল্প
নির্মাণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাফল্য ঈর্ষনীয়। রক্ত ও আকাশ, দ্বীপ,
মানুষ ইত্যাদিও তাঁর এই ধরনের গল্প।
রক্ত ও আকাশ গল্পটি বেশ রহস্যময় _ খানিকটা যেন অ্যাবসার্ড নাটকের
আদলে রচিত। চরিত্রগুলোর সম্পর্ক প্রায় অসংজ্ঞায়িত, তাদের আচরণ
প্রায় উদ্ভট, কথাবার্তা পারম্পর্যহীন, পরস্পরের সঙ্গে অর্থপূর্ণ
সম্পর্ক স্থাপনেও যেন অক্ষম তারা। কোনো সুসামঞ্জস্য ঘটনা নেই
গল্পটিতে, নেই কোনো সম্পর্ক নির্মাণের চেষ্টা। বরং পুরো গল্প জুড়ে
তারা একের পর এক অর্থহীন সংলাপ বিনিময় করে চলে কিন্তু কিছুতেই
পরস্পরকে কমিউনিকেট করতে পারে না। যুবক চরিত্রটি থেকে থেকে কেবল
একটি মেয়েকে 'রক্ত ও আকাশের গল্প' শোনাতে চায় কিন্তু শোনায় না এবং
গল্পের শেষদিকে বলে _ 'দেখো মেয়ে, লক্ষ্নী মেয়ে, তোমাকে আমি
নিশ্চয়ই সেই রক্ত ও আকাশের গল্প শোনাবো ... যদি তুমি আমাকে তোমার
চোখের পানে তাকাতে দাও, তোমার দেহ ছুঁতে দাও। আমার আর কোনো
আবিষ্কার করার বাসনা নেই, আমি কেবল বাঁচতে চাই। ' _ ছায়ার মতোই এ
গল্পটিও আমাদের জানিয়ে দেয় _ বেঁচে থাকাটাই জীবনের প্রধানতম
লক্ষ্য। গল্পের একদম শেষ বাক্য _'নকল সত্যের সন্ধানে যে চোখ
এতোক্ষণ চঞ্চল ছিলো, খাঁটি সত্যলাভে এই মুহূর্তে সে চোখে মৃতু্য' _
দিয়ে শেষ পর্যন্ত লেখক 'আমি কেবল বেঁচে থাকতে চাই' _ এই চাওয়াকেই
'খাঁটি সত্য' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। গল্পটির গঠনশৈলীও আমাদের
ভাবনার উদ্রেগ করে। পারম্পর্যহীন ওই ঘটনাসমূহের (?) ব্যাখ্যা কি এই
যে, আমাদের জীবনের যাবতীয় কার্যকলাপই পারম্পর্যহীন? অর্থহীন
সংলাপের কারণ কি এই যে, আমাদের বেশিরভাগ কথাবার্তাই অর্থহীন, এমনকি
তা পরস্পরের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনেও অক্ষম? এই সব অর্থহীন
ও প্রয়োজনহীন কার্যকলাপ এবং কথাবার্তার কারণেই কি আমরা জানতে পারি
না যে, আমাদের জীবনের খাঁটি সত্য কি? আমাদের এতোসব আয়োজন, এতোসব সব
প্রেম-মমতা-হিংসা-বিদ্বেষ-ক্ষোভ-দ্রোহ-যুদ্ধ-সংগ্রাম-বিজয়-পরাজয়
এসবের প্রয়োজন কী, মানুষ কি কখনো তা ভেবে দেখেছে? সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
এসব গল্পের মাধ্যমে তাঁর উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে যান এই মেসেজ
যে, এই এতো সব কিছুর আয়োজন কেবলই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য, কেবলই
আমাদের জীবনকে আরেকটু স্বপ্ন-গন্ধময় ও বর্ণিল করে তোলার জন্য। আমরা
দেখেছি, এরপরে এই একই সত্যের প্রকাশ ঘটে আরো অনেক লেখকের লেখায়
একেকভাবে। শামসুর রাহমানের কবিতার চরিত্র তাই বন্ধুর লাশ দেখতে
গিয়ে বন্ধুর 'রোরুদ্যমান স্ত্রীর ব্লাউজ উপচে পড়া স্তন আড়চোখে'
দেখে নেয় আর তার 'অবাধ্য অসভ্য রক্তে ডাকে বারবার লালচক্ষু তৃষিত
কোকিল' _ এ তৃষ্ণা তো জীবনেরই জন্য। মৃতের সৌধের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা
রচনা করি জীবনের স্বপি্নল আয়োজন।
মানুষ গল্পটিও প্রতীকী তাৎপর্যময়। আগের গল্পদুটোর মতোই এ গল্পের
পরতে পরতে লেখক তৈরি করেন বিস্ময়। গল্পের প্রধান চরিত্র মনির অন্ধ
মেয়ে মুলকিকে রঙের ধারণা দেয়। বলে, পৃথিবীতে কালো ছাড়া অন্য কোনো
রঙই নেই। একেক সময় মনে হয় মনির এক প্রতারক চরিত্র, নইলে সে লাল
রঙের ফুলকে কালো বলে পরিচয় করিয়ে দেবে কেন? কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে
হয় _ সে তো ঠিকই বলেছে_ জন্মান্ধ মেয়ের কাছে লাল এমন কি বিশেষ অর্থ
বহন করে? তার কাছে তো পুরো জগতটাই কালো! যাহোক, গল্পের এক পর্যায়ে
মুলকির 'তুমি কে?' এই প্রশ্নের উত্তরে সে জানায় _ 'আমি মানুষ। এই
পৃথিবীতে জন্মেছি, এই পৃথিবীতেই মরবো; তাই আমরা মানুষেরা শুধু
প্রতিশোধ নিতে চাই, কার বিরুদ্ধে জানিনে। আমরা এখানে কামড় দেই,
ওখানে আঁচড় কাটি, সত্য চিনিনে বলে থুথু ফেলে মিথ্যে বলি, আর আমরা
স্নেহ-মমতা সৃষ্টি করে সে স্নেহমমতা লাথি মেরে ভেঙে দেই, বেদনায়
হাসি।' _ মানুষের স্বভাব সম্বন্ধে এ এক চমৎকার বিশ্লেষণ।
দ্বীপ গল্পে আমরা কতোগুলো জীবন্মৃত মানুষের জীবনাচরণ দেখে শিউরে
উঠি। শুধুমাত্র একটি কিশোরী মেয়ে যেন হঠাৎ করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে _
বাকি সবাই পাথরের মতো। তারা হাঁটাচলা করে, কাজকর্ম করে কিন্তু
তাদের কোনো অনুভূতি নেই। পুরো গল্প জুড়ে এসব অনুভূতিহীন পাথর-সদৃশ
মানুষের আচরণ আমাদেরকে হতবাক করে দেয়। ওই একটি মাত্র মেয়ের
অনুভূতিপ্রবণ হয়ে ওঠাটাকে রীতিমতো তার দুর্ভাগ্য বলে মনে হয়
আমাদের। এই সব পাথর-মানুষের মৃতপ্রায়-ব্যবহারে বিহ্বল হয়ে মেয়েটি
যখন আত্নাহুতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আমাদের কাছে তখন সেই
সিদ্ধান্তকেও খুবই স্বাভাবিক ও বিবেচনাপ্রসূত বলে মনে হয়। প্রায় ৬০
বছর আগে লেখা এই গল্পটি পড়ে মনে হয় _ এ যেন একালের নাগরিক জীবনকে
নিয়ে লেখা প্রতীকী গল্প, যখন কারো পক্ষে অনুভূতিপ্রবণ হয়ে ওঠাটাই
বিপদজনক, যখন সব মানুষই প্রায় পাথরে পরিণত হয়ে যাচ্ছে, যখন আর
পাশের মানুষটির কান্নায়ও কারো কিছু যায় আসে না। ধারণা করি, আরো ৫০
বছর পর এই গল্প আরো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে মানুষের জীবনে।
অর্থাৎ সৈয়দ যখন গল্পটি লেখেন তখন তখন তিনি সময়ের চেয়ে কমপক্ষে এক
শতাব্দি এগিয়ে ছিলেন।
এই গল্পগুলোর কোনো কোনোটিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হয়ে উঠেছিলেন দারুণ
আঙ্গিক সচেতন। নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা এসব গল্পকে আকর্ষনীয় করে
তুলেছে। ও আর তারা গল্পের ঘটনা তেমন কিছু নয়, কিন্তু এর
বর্ণনা-কৌশল, নির্মাণ-শৈলী ও রসবোধ গল্পটিকে দারুণ উপভোগ্য করে
তুলেছে। কিংবা না কান্দে বুবু গল্পের নির্মাণ-শৈলীও পাঠককে
দারুণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। শুধু মাত্র নির্মাণ-কুশলতার জন্যই গল্পটি
পাঠকের কাছে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন রেখে যেতে পারে।
নির্মাণ কুশলতা ছাড়াও এসব গল্পে সৈয়দের মনোবিশ্লেষণ ক্ষমতা ধ্রুপদী
মাত্রা পাবার যোগ্যতা রাখে। যেমন মাঝি গল্পের মাঝি নানাভাবে তার
আরোহীদের নদী পাড়ি দিতে নিরুৎসাহী করতে চায় কারণ মাঝপথে ঝড় ওঠার
সম্ভাবনা আছে। সে মাঝি, সে যেমন নদী চেনে, চেনে ঝড়কেও _ এমনি এক
ঝড়ে তার বাপ নদীতেই ডুবে মরেছিলো। কিন্তু তার এই শুভকামনাকে
আরোহীরা সন্দেহের চোখে দেখলে সে নৌকা ছাড়ে ঠিকই, কিন্তু মাঝ
নদীতেও যখন ঝড় ওঠে না তখন _'হঠাৎ কেমন এক আকুলতায় মনিরুদ্দিন মনে
মনে বললে, খোদা ঝড় কি আসবো না?' _ এই পরিস্থিতি পাঠককে বিপুলভাবে
নাড়া দিয়ে যায়। আরোহী তাকে বিশ্বাস করেনি, এই অপমান, এই কষ্ট
মাঝিটির কাছে এমনকি মৃতু্যর চেয়েও বিশাল হয়ে ওঠে।
৫.
সসৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মৃতু্যর আগে প্রকাশিত দুটো গল্পগ্রন্থে তার
মাত্র সতেরটি গল্প গ্রন্থিত হয়েছিলো। ধারণা করি, তাঁর অগ্রন্থিত
গল্পগুলোর মধ্যে অনেকগুলো তিনি নিজেই বাতিল করে দিতেন _ অন্তত তাঁর
প্রকাশিত গ্রন্থদুটোর গল্প নির্বাচনের দিকে তাকালে সে কথাই মনে হয়
_ কিন্তু অসামান্য কিছু গল্প তিনি কেন গ্রন্থভূক্ত করেননি সেটা
বোঝা দায়। সম্ভবত গল্পগুলোকে তিনি খানিকটা দলছুট বলেই বিবেচনা
করতেন। মানুষ, ছায়া, দ্বীপ, রক্ত ও আকাশ, না কান্দে বুবু প্রভৃতি
গল্প তাঁর সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণা পাল্টে দেয়। এসব গল্পের গভীর
রহস্যময়তা, কুশলী প্রতীকময়তা, অসামান্য দার্শনিকতা, চমৎকার
নির্মাণশৈলী আজো পাঠককে আপ্লুত করে। তার জীবনকালে গ্রন্থিত
গল্পগুলো ঠিক এসব বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেনি। কোনো সুনির্দিষ্ট
ধারাভূক্ত না হলেও মূলত সৈয়দের মনোবিশ্লেষনের প্রবণতা গ্রন্থভূক্ত
গল্পগুলোতে বেশ ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। তাঁর চরিত্ররা যে
শ্রেণী-পেশারই হোক না কেন _ তাদের দৈনন্দিন জীবনের নির্মম
বাস্তবতার চেয়ে তাঁর কাছে তাদের মানসজগতটিই অধিকতর গুরুত্ব পেয়েছে।
নয়নচারা, জাহাজী, মৃতু্যযাত্রা, একটি তুলসীগাছের কাহিনী, গ্রীষ্মের
ছুটি, স্তন, মতিনউদ্দিনের প্রেম প্রভৃতি গল্পে তিনি যতোটা না
বাস্তবতা নির্মাণের কারিগর, তারচেয়েও বেশি মনোবিশ্লেষক _ যদিও তাঁর
সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণাটি ঠিক এর উল্টো।
উদাহরণ হিসেবে নয়নচারা গল্পটির কথা বলা যেতে পারে। গল্পের শুরু
থেকেই স্মৃতিকাতরতা প্রাধান্য পেয়ে যায় _ 'ঘনায়মান কালো রাতে
জনশূন্য প্রশস্ত রাস্তাটাকে ময়ূরাক্ষী নদী বলে কল্পনা করতে বেশ
লাগে।' এবং লেখক জানিয়ে দিচ্ছেন 'মনের চরে ঘুমের বন্যা' এলে 'জেলে
ডিঙিগুলোর বিন্দু বিন্দু লালচে আলো ঘন আঁধারেও সর্বংসহা আশার মতো
মৃদু মৃদু জ্বলে।' কিন্তু পাঠককে খুব বেশি আশার আলো নিয়ে ভাববার
সময় না দিয়েই বাস্তবে ফিরিয়ে আনেন লেখক _'ময়ূরাক্ষী! কোথায়
ময়ূরাক্ষী! এখানে তো কেমন ঝাঁপসা গরম হাওয়া।' এবং পরক্ষণেই আমরা
দেখতে পাই _ 'ফুটপাতে ওরা সব এলিয়ে পড়ে রয়েছে। ছড়ানো খড় যেন।
কিন্তু দুপুরের দিকে লঙ্গরখানায় দুটি খেতে পেয়েছিলো বলে তবু তাদের
ঘুম এসেছে _ মৃতু্যর মতো নিঃসাড় নিশ্চল ঘুম।' মাত্র কয়েকটি বাক্যের
মধ্যে স্বপ্ন ও বাস্তবতার কী অসামান্য সমন্বয় _ ভাবলে অবাক হতে হয়।
গল্প এগিয়ে চলে আমুর (গল্পের প্রধান চরিত্র) স্মৃতিকাতরতার মধ্যে
দিয়ে। তার অতীত খুব মধুর ছিলো এমনটি ভাবার অবকাশ নেই, নইলে এখন এমন
দুর্দশায় পতিত হতে হতো না _ তবু বর্তমানের কঠোর বাস্তবতায়,
দুর্ভিক্ষের সর্বগ্রাসী হা-এর মুখে ওই নিসপ্রভ অতীতকেও মধুর লাগে,
সুন্দর ও কাঙ্ক্ষিত বলে মনে হয়, ফেলে আসা নয়ন চারা গাঁ হয়ে ওঠে
আমুর স্বপ্নের অংশ। আমুকে তাই চলতে হয় প্রতিমুহূর্তে অতীত ও
বর্তমানকে একাকার করে। এই শহরের যা কিছু সুন্দর তার কাছে তাই-ই
কোনো কোনো ভাবে নয়নচারার সঙ্গে তুলনীয় হয়ে ওঠে, যা কিছু অসুন্দর,
হিংস্র তা কিন্তু কোনোভাবেই নয়নচারা সঙ্গে সম্পর্কিত নয় _ 'শহরের
কুকুরের চোখে বৈরিতা নেই। (এখানে মানুষের চোখে, এবং দেশে কুকুরের
চোখে বৈরিতা।) ... ময়রার দোকানে মাছি বোঁ বোঁ করে। তার চোখে এত
হিংস্রতা যে মনে হয় চারধারে ঘন অন্ধকারের মধ্যে দু'টো চোখ ধকধক করে
জ্বলছে।' _ পাঠক লক্ষ্য না করে পারেন না, সারা গল্পে শুধু ওই একটি
বাক্যই ব্র্যাকেটবন্দি করে তিনি কী অসামান্য কুশলতায় গাঁয়ের কুকুর
ও শহরের মানুষকে একই সমতলে নামিয়ে এনেছেন। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে
ওঠে, যখন দেখি আমুর ভাবনার ধরনটি এইরকম _ 'ওধারে কুকুরে কুকুরে
কামড়া কামড়ি লেগেছে। ... আমু দূর দূর করে চেঁচিয়ে উঠলো, তারপর
জানলো যে ওরা মানুষ, কুকুর নয়! অথবা ভেতরে কুকুর, বাইরে কুকুর নয়।'
শহর সম্বন্ধে, শহরের মানুষ সম্বন্ধে এই যার দৃষ্টিভঙ্গি সেই
ক্ষুধার্ত আমু ঝুলন্ত পাকা কলা দেখে যা তার কাছে 'হলুদ-রঙা
স্বপ্নের মতো' _ 'কোথায় গো নয়নচারা গাঁ' বলে কেঁদে উঠবে সে আর
অস্বাভাবিক কি! কিংবা শহরের একটি মেয়ের সুন্দর চুল দেখে তাকে
গাঁয়ের মেয়ে ঝিরার চুল বলে ভেবে নেবে তাই-ই বা অবাক করার মতো হবে
কেন? এই শহরের যেটুকু তার ভালো লাগে সেটুকু যে গাঁয়ের বলে ভাবতেই
ভালো লাগে তার! গল্পের শেষে তাই সারাদিন ক্ষুধার্ত ও অভূক্ত থেকে
কোনো এক মায়াবতীর কাছ থেকে ভাত পেয়ে দাত্রী মেয়েটিকে _'নয়নচারা
গাঁয়ে কী মায়ের বাড়ি' বলে সে যে প্রশ্ন করে তা পাঠকের চোখ ভিজিয়ে
তুলতে পারে। আমুর এই স্মৃতিকাতরতার অর্থ কি? এ কি বর্তমানের ভয়াবহ
বাস্তবতা থেকে পলায়নের মনোবৃত্তি নাকি লেখকের এক ধরনের কৌশল? পুরো
গল্পটি লেখা হয়েছে ভয়াবহ মন্বন্তরের পটভূমিতে অথচ কোথাও তার তেমন
কোনো বর্ণনা নেই, বরং আমুর মনোজগতের ভাবনা-কল্পনাই গল্পে প্রধান
হয়ে ওঠে। _ 'এ সন্ধ্যায় তুমি আমাকে নির্মমভাবে কন্টকাকীর্ণ
প্রান্তরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছো। কে তুমি, তুমি কে?' _ এই চিন্তা কি
কোনো ক্ষুধায় আক্রান্ত মানুষের চিন্তা? তবু আমুর প্রায় দার্শনিক
চিন্তাগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় না কেবলমাত্র সৈয়দের অসামান্য
নির্মাণ কুশলতার কারণে। শুধু নয়নচারার আমুই নয়, জাহাজীর বৃদ্ধ
সারেঙ্গ, রক্তর খালাসি আবদুল _ এরা সবাই নিম্নশ্রেণীর চরিত্র,
কিন্তু তাদের জীবন-সংগ্রাম বা বেঁচে থাকার যুদ্ধ বা নিদেনপক্ষে
নিত্যদিনের হা হুতাশের চিত্র গল্পে নেই, তারা নির্মিত তাদের
মনোজগতের রহস্যময় কার্যকলাপের প্রেক্ষাপটে। যেন জীবনের একটি
পর্যায়ে এসে তারা উপস্থিত হয়েছে গভীর কোনো রহস্যের সামনে, বহু
অমীমাংসিত প্রশ্নের সামনে। অবশ্য শুধু এই কারণেই নয়, বিবিধ কারণে
গল্পগুলো পাঠককে নাড়া দিয়ে যায়। একটি তুলসিগাছের কাহিনী গল্পের
অসামপ্রদায়িক চেতনা ও জীবনবোধ এদেশের প্রগতিশীল ও অসামপ্রদায়িক
মানুষকে আরো বহুদিন আলোড়িত করে যাবে, কিংবা মৃতু্যযাত্রার সুগভীর
জীবনবোধ, দুই তীর এর অসামান্য মানসিক টানাপোড়েনের চিত্র ইত্যাদি
পাঠককে ভাবাবে আরো অনেকদিন।
৬.
এই রচনার শুরুতেই যে আলোচনার সূত্রপাত করেছিলাম শেষের দিকে এসে
আবারও সেই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করতে চাই। বলা হয়েছিলো বাঙালি
মুসলমানের শিল্প-সংস্কৃতির বোধ নির্মাণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পালন
করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাঙালি মুসলমানকে তিনি দাঁড় করাতে
চেয়েছিলেন দৃঢ় ভিত্তিভূমির ওপর। স্বপ্নের অধ্যায় গল্পে এই জাতি
সম্বন্ধে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার রূপায়ন দেখি। গল্পটি রচিত হয়েছিলো
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই, কিন্তু সেখানে তিনি পাকিস্তানি
ভাবাদর্শে লালিত মুসলমানের কথা শোনাননি, শোনাননি আরব মুসলমানের
গৌরব গাঁথাও, এ জাতিকে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বিবেচনা করে
তাকে সংস্কারমুক্ত, উদার, প্রগতিশীল করে গড়ে তোলার স্বপ্ন তাঁর এ
গল্পে ধরা পড়েছে। তবে স্বীকার করে নেয়া ভালো যে, তাঁর গল্পে
রাজনীতি ভাবনা বা সচেতনতা খুব সুলভ নয়। বরং তাঁকে বলা যেতে পারে
বাংলাদেশের প্রথম এবং প্রধানতম দার্শনিক কথাশিল্পী। আর তাঁর গল্পের
গুরুত্ব এখানেই। মানুষের মনোজগতের নানাবিধ কার্যকলাপ আর দার্শনিক
ভাবনাচিন্তা রূপায়নে তাঁর সাফল্য প্রশ্নাতীত। একটি নতুন দেশে তিনি
খুলেছিলেন কথাসাহিত্যের এক নতুন স্কুল যার ভাষা-বিষয়-দার্শনিক
প্রতীতী ছিলো তাঁর পূর্বসুরীদের চেয়ে আলাদা _ আজকের বাংলাদেশের
কথাসাহিত্যিকরা সেই স্কুলেরই গর্বিত ছাত্র।
|
| |
 |
|